Tuesday, April 7, 2026
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পপিঁপড়া - হুমায়ূন আহমেদ

পিঁপড়া – হুমায়ূন আহমেদ

পিঁপড়া – হুমায়ূন আহমেদ

আপনার অসুখটা কী বলুন?

রুগী কিছু বলল না, পাশে বসে থাকা সঙ্গীর দিকে তাকাল।

ডাক্তার নূরুল আফসার, এমআরসিপি, ডিপিএস, অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। তার বিরক্তির তিনটি কারণ আছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, আটটা বেজে গেছে–রুগী দেখা বন্ধ করে বাসায় যেতে হবে। আজ তার শ্যালিকার জন্মদিন। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, গ্রাম থেকে আসা রুগী তিনি পছন্দ করেন না এরা হয় বেশী কথা বলে, নয় একেবারেই কথা বলে না। ভিজিটের সময় হলে দর দাম করার চেষ্টা করে। হাত কচলে মুখে তেলতেলে ভাব ফুটিয়ে বলে–কিছু কম করা যায় না ডাক্তার সাব। গরীব মানুষ।

আজকের এই রুগীকে অপছন্দ করার তৃতীয় কারণটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবু নুরুল আফসার সাহেবের কাছে এই কারণটিই প্রধান বলে বোধ হচ্ছে। লোকটির চেহারা নির্বোধের মত। এই ধরনের লোক নিজের অসুখটাও ঠিক মত বলতে পারে না। অন্য একজনের সাহায্য লাগে।

বলুন, তাড়াতাড়ি বলুল। আমার অন্য কাজ আছে।

লোকটি কিছু বলল না। গলা খাকারী দিয়ে সঙ্গীর দিকে তাকাল। ভাবখানা এরকম যে অসুখের কথা-বার্তা সঙ্গীটিই বলবে। সে-ও কিছু বলছে না। ডাক্তার নূরুল আফসার হাত ঘড়ির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বললেন, গরু ছাগল তার কী অসুখ বলতে পারে না। তাদের অসুখ অনুমানে ধরতে হয়। আপনি তো আর গরু ছাগল না। চুপ করে আছেন কেন? নাম কি আপনার?

রুগী কিছু বলল না। তার সঙ্গী বলল, উনার নাম মকবুল। মোহম্মদ মকবুল হোসেন ভূঁইয়া।

নামটাও অন্য আরেকজনকে বলে দিতে হচ্ছে। আপনি কি কথা বলতে পারেন, না–পারেন না?

পারি।

কী নাম আপনার?

মোহম্মদ মকবুল হোসেন ভূঁইয়া।

বয়স কত?

বায়ান্ন।

আপনার সমস্যাটা কি? রুগী মাথা নীচু করে ফেলল। নূরুল আফসার সাহেবের ধারণা হল অস্বস্তিকর কোন অসুখ, যার বিবরণ সরাসরি দেয়া মুশকিল।

আর তো সময় দিতে পারব না। আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে। যদি কিছু বলার থাকে এক্ষুনি বলবেন। বলার না থাকলে চলে যান।

রুগী আবার গলা খাকাড়ি দিল।

তার সঙ্গী বলল, উনার অসুখ কিছু নাই।

অসুখ কিছু নেই এসেছেন কেন?

উনারে পিঁপড়ায় কামড়ায়।

কী বললেন?

পিঁপড়ায় কামড়ায়। পিপীলিকা।

ডাক্তারী করতে গেলে অধৈর্য হওয়া চলে না। রুগীদের সঙ্গে রাগারাগিও করা চলে না। এতে পশার কমে যায়। রোগের বিবরণ শুনে বিস্মিত হওয়াও পুরোপুরি নিষিদ্ধ। রোগের ধরন-ধারন যতই অদ্ভুত হোক ভান করতে হয় যে, এ জাতীয় রোগের কথা তিনি শুনেছেন এবং চিকিৎসা করে আরাম করেছেন। নূরুল আফসার সাহেব ডাক্তারীর এই সব সহজ নিয়ম কানুন নিষ্ঠার সঙ্গে মানেন। আজ মানতে পারলেন না। ধমকের স্বরে বললেন, পিঁপড়ায় কামড়ায় মানে?

রুগী পকেটে হাত দিয়ে একটুকরা কাগজ বের করে বলল, চিঠিটা পড়েন। চিঠির মধ্যে সব লেখা আছে।

কার চিঠি?

কাশেম সাহেব।

কাশেম সাহেব কে?

এমবিবিএস ডাক্তার। আমাদের অঞ্চলের। খুব ভাল ডাক্তার। উনি আপনার কাছে আমারে পাঠাইছেন। বলছেন নাম বললে আপনি চিনবেন। উনি আপনের ছাত্র।

নূরুল আফসার সাহেব কাশেম নামের কোন ছাত্রের নাম মনে করতে পারলেন। কাশেম বহুল প্রচলিত নামের একটি। ক্লাসের প্রতি বছরই দু’একজন কাশেম থাকে। এ কোন কাশেম কে জানে।

স্যার চিনেছেন?

চিনি না বলাটা ঠিক হবে না। পুরানো ছাত্ররা রুগী পাঠায়। এদেরকে খুশী রাখা দরকার। কাজেই আফসার সাহেব শুকনো হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ চিনেছি। কি। লিখেছে দেখি।

উনি স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছেন।

আচ্ছা ঠিক আছে। দেখি চিঠিটা দেখি।

চিঠি দেখে ডাক্তার সাহেবের ভ্রু কুঞ্চিত হল। বাঙ্গালী জাতির সবচে দোষ হল এরা কোন জিনিষ সংক্ষেপে করতে পারে না। দুই পাতার এক চিঠি কেঁদে বসেছে। তিনি পড়লেন।

পরম শ্রদ্ধেয় স্যার,

আমার সালাম জানবেন। আমি সেভেন্টি থ্রি ব্যাচের ছাত্র। আপনি আমাদের ফার্মাকোলজী পড়াতেন। আপনার বিষয়ে আমি সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছিলাম। সেই উপলক্ষে আপনি আপনার বাসায় আমাকে চায়ের দাওয়াত করেছিলেন।

আশা করি আপনার মনে পড়েছে। যাই হোক, আমি মকবুল সাহেবকে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। মকবুল এই অঞ্চলের একজন অত্যন্ত ধনবান ব্যক্তি। সে বছর চারেক ধরে অদ্ভুত এক ব্যাধিতে ভুগছে। একে ব্যাধি বলা যাবে না কিন্তু অন্য কোন নামও আমি পাচ্ছি না। ব্যাপারটা হচ্ছে তাকে সব সময় পিঁপড়ায় কামড়ায়।

বুঝতে পারছি বিষয়টা আপনার কাছে খুবই হাস্যকর মনে হচ্ছে। শুরুতে আমার কাছেও মনে হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম এটা এক ধরনের মানসিক ব্যধি। বর্তমানে আমার সেই ধারণা পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। আমি নিজে লক্ষ করেছি মকবুল সাহেব কোথাও বসলেই সাড়ি বেঁধে পিঁপড়া তার কাছে। আসতে থাকে।

পীর-ফকির, তাবিজ, ঝাড়-ফুক জাতীয় আধি ভৌতিক চিকিৎসা সবই করানো হয়েছে। কোন লাভ হয়নি। আমি কোন উপায় না দেখে আপনার কাছে পাঠালাম। অপনি দয়া করে ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেবেন না।

বিনীত
আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র
আবুল কাশেম।
ব্লুষ্টার ফার্মেসী। নান্দাইল। কেন্দুয়া।

ডাক্তার সাহেব রুগীর দিকে তাকালেন। রুগী পাথরের মত মুখ করে বসে। আছে। গায়ে ফতুয়া ধরনের জামা। পরনে লুঙ্গী। অত্যন্ত ধনবান ব্যক্তির পোষাক নয়।

ডাক্তার সাহেব কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। কিছু একটা বলতে হয় আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এই জাতীয় উদ্ভট যন্ত্রণার কোন মানে হয়?

পিঁপড়া কামড়ায় আপনাকে?

জ্বি স্যার। কোন এক জায়গায় বসে থাকলেই পিঁপড়া এসে ধরে।

নুরুল আফসার সাহেব একবার ভাবলেন বলবেন, আপনি কি রসোগোল্লা নাকি যে পিঁপড়া ছেকে ধরবে? শেষ পর্যন্ত বললেন না।

বড় কষ্টে আছি স্যার। যদি ভাল করে দেন সারাজীবন কেনা গোলাম হইয়া থাকব। টাকা পয়সা খরচ কোন ব্যাপার না, স্যার। টাকা যা লাগে লাগুক।

আপনার কি অনেক টাকা?

জ্বি স্যার।

কী পরিমাণ টাকা আছে?

রুগী কোন জবাব দিল না। রুগীর সঙ্গী বলল, মকুবল ভাইয়ের কাছে টেকা পয়সা কোন ব্যাপার না। লাখ দুই লাখ উনার হাতের ময়লা।

নূরুল আফসার সাহেব এই প্রথম খানিকটা কৌতূহলী হলেন। লাখ টাকা ফতুয়া গায়ে লুঙ্গী পরা এই লোকটির হাতের ময়লা এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তিনি নিজেও ধনবান ব্যক্তি। ফিক্সড ডিপোজিটে তাঁর এগারো লাখ টাকার মত আছে। এই টাকা সঞ্চয় করতে গিয়ে জীবন পানি করে দিতে হয়েছে। ভোর ছ’টা থেকে রাত বারোটা এক মুহূর্তের বিশ্রাম নেই।

একমাত্র ছুটির দিন শুক্রবারটাও তিনি কাজে লাগান। সকালের ফ্লাইটে চিটাগাং যান লাষ্ট ফ্লাইটে ফিরে আসেন। ওখানকার একটা ক্লিনিকে বসেন। ঐ ক্লিনিকের তিনি কনসালটিং ফিজিসিয়ান। আর এই লোককে দেখে তো মনে হয় না সে কোন কাজ কর্ম করে। নির্বোধের মত এই লোক এত টাকা করে কী করে? নুরুল আফসার সাহেবের মেজাজ খারাপ হয় গেল।

মকবুল ক্ষীণ স্বরে বলল, রোগটা যদি সারায়ে দেন।

এটা কোন রোগ না। আমি এমন কোন রোগের কথা জানি না যে রোগে দুনিয়ার পিঁপড়া এসে কামড়ায়। অসুখটা আপনার মনে। আমি সাইকিয়াট্রিষ্টের ঠিকানা লিখে দিচ্ছি — তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। আপনার যে সমস্যা এই সমসার সমাধান আমার কাছে নেই।

নূরুল আফসার সাহেব বাক্যটা পুরোপুরি শেষ করলেন না। কারণ একটা অদ্ভুত দৃশ্যে তাঁর চোখ আটকে গেল। তিনি দেখলেন, টেবিলের উপর রাখা মকবুলের ডান হাতের দিকে এক সাড়ি লাল পিঁপড়া এগুচ্ছে। পিঁপড়ারা সচরাচর এক লাইনে চলে, এরা তিনটি লাইন করে এগুচ্ছে।

ডাক্তার সাহেবের দৃষ্টি লক্ষ্য করে মকবুলও তাকাল পিঁপড়ার সাড়ির দিকে। সে কিছু বলল না, বা হাতও সরিয়ে নিল না।

নূরুল আফসার সাহেব বললেন, এই পিঁপড়াগুলি কি আপনার দিকে আসছে?

জ্বি স্যার।

বলেন কী?

পায়েও পিঁপড়া ধরেছে। এক জায়গায় বেশীক্ষণ বসতে পারি না স্যার।

নূরুল আফসার সাহেব কাছে এগিয়ে এলেন উঁচু হয়ে বসলেন। সত্যি সত্যি দু’সাড়ি পিঁপড়া লোকটির পার দিকে এগুচ্ছে।

মকবুল সাহেব।

জ্বি স্যার।

আমার একটা জরুরী কাজ আছে চলে যেতে হচ্ছে। আপনি কি কাল একবার আসবেন।

অবশ্যই আসব। যার কাছে যাইতে বলেন যাব। বড় কষ্টে আছি স্যার। রাত্রে ঘুমাইতে পারি না। নাকের ভিতর দিয়ে পিঁপড়া ঢুকে যায়।

আপনি কাল আসুন। কাল কথা বলব।

জি আচ্ছা।

মকবুল উঠে দাঁড়াল। পর মুহূর্তেই যে ঘটনাটা ঘটল তার জন্যে নূরুল আফসার সাহেব মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর কাছে মনে হল মকবুল কিছুক্ষণের জন্যে হলেও বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। চিন্তা ও বিচার শক্তি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। তিনি দেখলেন মকবুল হিংস্র ভঙ্গিতে লাফিয়ে লাফিয়ে, পা ঘসে ঘসে পিঁপড়া মারার চেষ্টা করছে। এক পর্যায় সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল টেবিলে, দু’হাতে পিষে ফেলল পিঁপড়ার সাড়ি। মকবুলের মুখ ঘামে চট চট করছে চোখের তারা ঈষৎ লালাভ। মুখে হিস হিস শব্দ করছে এবং নীচু গলায় বলছে হারামজাদ, হারামজাদ।

তার সঙ্গী কিছুই বলছে না। মাথা নীচু করে সিগারেটের কাঠি দিয়ে দাঁত খুচাচ্ছে। তার ভাবভক্তি থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এ জাতীয় ঘটনার সঙ্গে সে পরিচিত। এই ঘটনায় সে অস্বাভাবিক কিছু দেখছে না।

নূরুল আফসার সাহেব মলীর জন্মদিনের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলেন। রুগীর দিকে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর দু’জন এ্যসিসটেন্টও ছুটে এসেছে। তারা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে মুখে বিস্ময়ের চেয়ে ভয় বেশী।

মকবুল হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। নীচু গলায় বলল, স্যার মনে কিছু নিবেন না। এই পিঁপড়ার ঝাঁক আমার জেবন শেষ কইরা দিছে। হারামজাদা পিঁপড়া। এক গেলাস ঠাণ্ডা পানি দিবেন?

ডাক্তার সাহেবের এ্যসিসটেন্ট অতি দ্রুত ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে নিয়ে এল। একজন ভয়ংকর পাগলের পাগলামী হঠাৎ থেমে গেছে এই আনন্দেই সে আনন্দিত।

মকবুল পানির গ্লাস হাতে নিয়ে বসে রইল পানি মুখে দিল না। মাথা নীচু করে বিড় বিড় করে বলল, যেখানে যাই সেইখানে পিঁপড়া, কি করব কন। যে খাটে ঘুমাই সেই খাটের পায়ার নীচে বিরাট বিরাট ঘটির সরা। সরা ভর্তি পানি। তাতেও লাভ হয় না।

লাভ হয় না?

জ্বি না। ক্যামনে ক্যামনে জানি বিছানায় পিঁপড়া উঠে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিছানার চাদর বদলাতে হয়।

বলেন কি?

সত্যি কথা বলতেছি জনাব। এক বর্ণ মিথ্যা না। যদি মিথ্যা হয় তা হইলে যেন আমার শরীরে কষ্ট হয়। আমি জনাব এক জায়গায় বেশীক্ষণ থাকতেও পারি না। জায়গা বদল করতে হয়। আমার জীবন শেষ।

ডাক্তার সাহেব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। যে লোকটিকে শুরুতে মনে হয়েছিল কথা বলতে পারে না, এখন দেখা যাচ্ছে সে প্রচুর কথা বলতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। গ্রামের লোকজনের প্রাথমিক ইনহিবিশন কেটে গেলে প্রচুর কথা বলে। প্রয়োজনের কথা বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনের কথাই বেশী বলে।

চিকিৎসায় কোন ত্রুটি করি নাই জনাব। কেরোসিন তেলে কপূর দিয়ে সেই জিনিস শারীরে মাখছি যদি গন্দে পিঁপড়া না আসে। প্রথম দুই একদিন লাভ হয় তারপর হয় না। পিঁপড়া আসে। এমন জিনিস নাই যে শরীরে মাখি নাই। যে যা বলেছে মাখছি। একজন বলল বাদুরের গু শরীরে মাখলে আরাম হতো। সেই বাদুরের গৃও মাখলাম। এরচেয়ে জনাব আমার মরণ ভাল।

ডাক্তার সাহেব তার এাসিসটেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাসায় টিলিফোন করে দাও যে আমি একটা ঝামেলায় আটকে পড়েছি। আসতে দেরী হবে। আর আমাদের চা দাও।

আপনি চা খান তো?

জ্বি চা খাই।

চা খেতে খেতে বলুন কী ভাবে এটা শুরু হল, প্রথম কখন পিঁপড়া আপনার দিকে আকৃষ্ট হল।

একটু গোপনে বলতে চাই জনাব।

গোপনে বলার ব্যাপার আছে কি?

জ্বি আছে।

বেশ গোপনেই বলবেন। আগে চা খান।

লোকটি চা খেল নিঃশব্দে। চা খাবার সময় একটি কথাও বলল না। তার কথা বলার ইচ্ছা সম্ভবত ঢেউয়ের মত আসে। ঢেউ যখন আসে তখন প্রচুর বক বক করে, ঢেউ থেমে গেলে চুপ চাপ হয়ে যায়। তখন কথা বলে তার সঙ্গী। এখন সঙ্গীই কথা বলছে–

ডাক্তার সাব, সবচে বেশী ফল হয়েছে যে চিকিৎসায় সেইটাই তো বলা হয় নাই। মকবুল ভাই, ঐ চিকিৎসার কথা বলেন।

তুমি বল।

এই চিকিৎসা মকবুল ভাই নিজেই বাইর করছে। বিষে বিষক্ষয় চিকিৎসা। গুড়ের গন্ধে পিঁপড়া সবচে বেশী আসে। মকবুল ভাই করলেন কি, সারা শইলে গুড় মাখলেন। এতে লাভ হইছিল। সাতদিন কোন পিঁপড়া আসে নাই।

মকবুল গম্ভীর গলায় বলল, সাতদিন না পাঁচদিন।

ডাক্তার সাহেব বললেন, পাঁচদিন পরে আবার পিঁপড়া আসা শুরু হল?

জি।

পিঁপড়ার হাত থেকে বাঁচার জন্যে মনে হয় অনেক কিছু করেছেন।

জি। নদীর মাঝখানে নৌকা নিয়া কয়েকদিন ছিলাম। তিন দিন আরামে ছিলাম। চাইর দিনের দিন পিঁপড়া ধরল।

সেখানে পিঁপড়া গেল কি ভাবে?

জানি না জনাব। অভিশাপ।

কিসের অভিশাপ?

আপনারে গোপনে বলতে চাই।

ডাক্তার সাহেব গোপনে বলার ব্যবস্থা করলেন। পুরু ব্যাপারটায় তিনি এখন উৎসাহ পেতে শুরু করেছেন। শালীর জন্মদিনের কথা মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে। খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছেন। এই পর্যন্তই। কোন রুগীর ব্যাপারে এ জাতীয় কৌতূহল তিনি এর আগে বোধ করেন নি। অবশ্যি এই লোকটিকে রুগী বলতেও বাধছে। কাউকে পিঁপড়া ছেকে ধরে এটা নিশ্চয়ই কোন রোগ ব্যধির পর্যায়ে ফেলা যাবে না।

ঘর থেকে সবাইকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। মকবুলের সঙ্গীও নেই। দরজা ভেজানো। মকবুল নীচু গলায় কথা শুরু করল

জনাব, আপনেরে আমি আগেই বলছি আমি টাকা পয়সা ওয়ালা লোক। আমাদের টাকা পয়সা আইজ কাইলের না। ব্রিটিশ আমলে আমার দাদাজান পাকা দালান দেন। দাদাজানের দুইটা হাতী ছিল একটার নাম ময়না অন্যটার নাম সুরভী। দুইটাই মাদী হাতী।

ঐ প্রসঙ্গ থাক, আপনার পিঁপড়ার প্রসঙ্গে আসুন।

আসতেছি। আমি পিতা মাতার একমাত্র সন্তান। বিরাট ভূ-সম্পত্তির মালিক। টাকা পয়সা, ক্ষমতা এইসব জিনিস বেশী থাকলে মানুষের স্বভাব চরিত্র ঠিক থাকে না। আমারো ঠিক ছিল না। আপনারা যারে চরিত্র দোষ বলেন তাই হইল। পনের ষোল বছর বয়সেই। বিরাট বাড়ি–সুন্দরী মেয়েছেলের অভাব ছিল না। দাসী বাদি ছিল। দরিদ্র আত্মীয় স্বজনের মেয়ে বউরা ছিল।

আমারে একটা কঠিন কথা বলার বা শাসন করার কেউ ছিল না। আমার মা অবশ্য জীবিত ছিলেন। কেউ কেউ তার কাছে বিচার নিয়ে গেছে। লাভ হয় নাই। উল্টা আমার ধমক খাইছে।

আপনি বিয়ে করেন নি?

জ্বি বিবাহ করেছি। বিবাহ করব না কেন? দুটি বিবাহ করেছি। সন্তানাদি আছে। স্বভাব নষ্ট হইল বিয়ে সাদী করলেও ফয়দা হয় না। মেয়েছেলে দেখলেই…

আপনি আসল জায়গায় আসুন। আজে বাজে কথা বলে বেশী সময় নষ্ট করছেন।

জ্বি আসতেছি। বছর পাঁচেক আগে আমার দূর সম্পর্কীয় এক বোনের মেয়ের উপর আমার চোখ পড়ল। চইদ্দ পনের বছর বয়স। গায়ের রঙ একটু ময়লা, কিন্তু স্বাস্থ্য ভাল। আমার চরিত্র তো কারো অজানা না। মেয়ের মা মেয়েকে আগলায়ে রাখে। খুবই বজ্জাত মা, মেয়েকে নিয়ে আমার মার ঘরে মেঝেতে ঘুমায়। এত কিছু কইরাও লাভ হইল না। এক রাতে ঘটনা ঘটে গেল।

কি বললেন, ঘটনা ঘটে গেল?

জ্বি।

আশ্চর্য ব্যাপার। আপনি যে ভাবে বলছেন তাতে মনে হচ্ছে খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপার।

জিনিসটা তুচ্ছই। কিছুই না। হে হে হে।

হাসবেন না। হাসির কোন ব্যাপার না।

জ্বি আচ্ছা। তারপর কি হল–ঐ বজ্জাত মা সেই রাইতেই মেয়েটারে ইঁদুর মারা বিষ খাওয়াইয়া দিল। আর নিজে একটা দড়ি নিয়ে বাড়ির পিছনে একটা। আমগাছে ফাঁস নিল। আমারে বিপদে ফেলার চেষ্টা। আর কিছু না। মাগী চূড়ান্ত বজ্জাত। আমি চিন্তায় পড়লাম। দুইটা মিত্যু সোজা কথা না। থানা পুলিশ হবে। পুলিশ তো এই জিনিসটাই চায়। এরা বলবে খুন করা হয়েছে।

আপনি খুন করেন নি?

আরে না। খুন করব কি জন্যে। আর যদি খুনের দরকারও হয় নিজের ঘরে খুন করব? কাউরে খুন করতে হইলে জায়গার অভাব আছে? খুন করতে হয় নদীর উপরে। রক্ত ধুইয়ে বয়ে যায়। তারপর লাশ বস্তার ভিতর বইরা চুন মাখায়ে চার পাঁচটা ইট বস্তার ভিতর দিয়ে বিলে ফালায়ে দিতে হয়। এই জন্মের নিশ্চিন্ত। কোনো সম্পুদ্ধির পুত কিছু জানব না। যা আপনি খুনও করেছেন?

জ্বি না। দরকার হয় নাই। যেটা বলতেছিলাম সেইটা শুনেন, ঘরে দুইটা লাশ। আমি বললাম, খবরদার লাশের গায়ে কেউ হাত দিবা না।

যে রকম আছে সে রকম থাক, আমি নিজে গিয়ে থানায় ওসি সাহেবেরে আনতেছি, ওসি সাহেব আইয়্যা যা করবার করব। থানা আমার বাড়ি থাইক্যা পনের মাইল দূর। পানসি নৌকা নিয়া গেলাম। দারগা সাহেব আর থানা স্টাফের জন্যে পাঁচ হাজার টাকা নজরানা নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি বিরাট সমস্যা। দারোগা সাব গিয়েছেন বোয়ালখালী ডাকাতি মামলার তদন্তে। ফিরলেন পরের দিন। তারে নিয়ে আমার বাড়িতে আসতে লাগল তিন দিন।

বর্ষাকাল। গরমের দিন। তিন দিনেই লাশ গেছে পচে। বিকট গন্ধ। দারোগা সাবরে নিয়া কাঁঠাল গাছের কাছে দেখি অদ্ভুদ দৃশ্য। লাখ লাখ লাল পিঁপড়া লাশের শরীরে। মনে হইতেছে মাগীর সারা সইলে লাল চাদর।

মেয়েটারও একই অবস্থা। মুখ হাত পা কিছুই দেখার উপায় নাই। পিঁপড়ায় সব ঢাকা। মাঝে মাঝে সবগুলি পিঁপড়া যখন একসঙ্গে নড়ে, তখন মনে হয় লাল চাদর কেউ যেন ঝাড়া দিল।

ডাক্তার সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, আপনি তো দেখি খুবই বদলোক।

জ্বি না, আমার মত টেকা পয়সা যারার থাকে তারা আরো বদ হয়। আমি বদ না। তারপর কি ঘটনা সেইটাই শুনেন–আমি একটা সিগারেট ধরাইলাম। সিগারেটের আগুন ফেলার সাথে সাথে মেয়েটার শরীরের সবগুলি পিঁপড়া নড়ল। মনে হল যেন একটা বড় ঢেউ উঠল। তারপর সবগুলি পিঁপড়া একসঙ্গে মেয়েটারে ছাইড়া মাটিতে নামল। মেয়েটার চোখ মুখ সব খাইয়া ফেলেছে–জায়গায় জায়গায় হাড্ডি বের হয়ে গেছে। দারোগা সাহেব রুমাল দিয়ে নাক চেপে ধরে বললেনমাবুদে এলাহী। তারপর অবাক হয়ে দেখি সবগুলি পিঁপড়া একসঙ্গে আমার দিকে আসতেছে। ভয়ংকর অবস্থা। আমি দৌড় দিয়ে বাইরে আসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে পিঁপড়াগুলি বাইরে আসল। মনে হইল আমারে খুঁজতেছে। সেই থাইক্যা শুরু। যেখানে যাই পিঁপড়া। জনাব আপনার এই ঘরে কি সিগারেট খাওয়া যায়? খাওয়া গেলে একটা সিগারেট খাইতে চাই।

খান।

শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

মকবুল সিগারেট ধরাল। তার মুখ বিষন্ন। সে আনাড়িদের মত ধুয়া ছাড়ছে। খুক খুক করে কাশছে। খানিকটা দম নিয়ে বলল–আমার কাশি ছিল না। এখন কাশি হয়েছে। নাকের ভিতর দিয়া পিঁপড়া ঢুকে গেছে ফুসফুসে। ওরা ঐখানেই বসবাস করে। ক্যামনে বুঝলাম জানেন? কাশির সাথে রক্ত আসে। আর আসে মরা পিঁপড়া।

ডাক্তার সাহেব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

মকবুল সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, সিগারেট খাইতেছি যাতে ভাল মত কাশি উঠে। কাশি উঠলে কাশির সাথে পিঁপড়া ও পিঁপড়ার ডিম বাইর হবে। আপনি দেখবেন নিজের চোখে। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, যে আমারে পিঁপড়ার হাত থাইক্যা বাঁচাইব তারে আমি নগদ দুই লাখ দিব। আমি বদ লোক হইতে পারি কিন্তু আমি কথার খেলাপ করি না। আমি টাকা সাথে নিয়া আসছি। আপনে আমারে বাঁচান।

ডাক্তার সাহেব কিছু বললেন না। তিনি তার বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উপরের কাচের দিকে তাকিয়ে আছেন। মকবুলের বাম হাত টেবিলের উপর। দুই সাড়ি পিঁপড়া টেবিলের দু’প্রান্ত থেকে সেই হাতের দিকে এগুচ্ছে। মকবুলেরও সেই দিকে চোখ পড়ল। সে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনের কিছু করা সম্ভব না। ঠিক না ডাক্তার সাব?

হ্যাঁ ঠিক।

আমি জানতাম। আমার মরণ পিঁপড়ার হাতে।

মকবুল মন্ত্র মুগ্ধের মত এগিয়ে আসা পিঁপড়ার সাড়ি দু’টির দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ চক চক করছে। সে তার বাঁ-হাত আরেকটু এগিয়ে দিয়ে নীচু গলায় বলল,–নে খা।

পিঁপড়ারা মনে হল একটু থমকে গেল। গা বেয়ে উঠল না–কিছুক্ষণ অনিশ্চয়তায় ভুগল।

মকবুল বলল, নিজ থাইক্যা খাইতে দিলে এরা কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে, সঙ্গে সঙ্গে শরীরে উঠে না। শলা-পরামর্শ করে। এই দেহেন ডাক্তার-সাব উঠতেছে না।

তাই তো দেখছি।

দুই এক মিনিটের ব্যাপার। দুই এক মিনিট শলা পরামর্শ শেষ হইব, তখন শইল্যে উঠা শুরু হইব।

হলও তাই। ডাক্তার সাহেব লক্ষ্য করলেন, পিঁপড়ার দল মকবুলের বাঁ হাতেই উঠতে শুরু করেছে। দু’টি সাড়ি ছাড়াও নতুন এক সাড়ি পিঁপড়া রওনা হয়েছে। এই পিঁপড়াগুলির মুখে ডিম। ডাক্তার সাহেব ভেবে পেলেন না, মুখে ডিম নিয়ে পিঁপড়াগুলি যাচ্ছে কেন? এরা চায় কী? কে তাদের পরিচালিত করছে? কে সেই সূত্রধর?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet