Sunday, March 29, 2026
Homeবাণী ও কথাঅবেলায় - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অবেলায় – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ব্রতীন

খুব ভোরবেলায় আমি ঘুম থেকে উঠেছিলাম। ঘুম থেকে ওঠা বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয় অবশ্য। আসলে রাতে আমার সত্যিকারের ঘুম একটুও হয়নি। একটু-একটু তন্দ্রা এসেছিল হয়তো বা, আর সঙ্গে-সঙ্গে অস্বস্তিকর সব স্বপ্ন। পাগলাটে, অযৌক্তিক সব স্বপ্ন। ভয় পেয়ে বার বার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে বিছানা ছাড়লাম। ঘড়িতে দেখি সোয়া পাঁচটা প্রায়। শীতকাল বলে আলো ফোটেনি। পাছে মায়ের ঘুম ভেঙে যায় সেই ভয়ে নিঃসাড়ে উঠে কলঘরে গিয়ে চোখে জল দিয়ে এলাম। না ঘুমোনো চোখ কর–কর করে উঠল। স্নায়ু শিরা সব উত্তেজিত হয়ে আছে, মাথার মধ্যে এলোমেলো অস্থির চিন্তা। আমি পাথরের মতো ঠান্ডা বাসি জল ঘাড় মাথার তালু কনুই আর পায়ে ঘষে থাবড়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। হাড়ের ভিতরে চলে গেল শীতের ভাব তবু একটুও সতেজ লাগল না নিজেকে।

ভোর রাতের দিকেই মার একটু ঘুম হয়। সকালের দিকে আমার ডিউটি থাকলে আমি মার সেই সামান্য ঘুমটুকুও কেড়ে নিই। অত সকালে বিশেষত শীতকালে বড় কষ্ট হয় মার। খদ্দরের একটা পুরোনো খাটো চাদর জড়িয়ে জড়সড়ো হয়ে মা যখন আমাকে চা করে বাসি রুটি তরকারি সাজিয়ে দিতে থাকে, তখন প্রায়ই মনে হয়, মাকে সারাজীবন বড় কষ্ট দিলাম। মার গলায় কিছু একটা অসুখ আছে, সকালে সারাক্ষণ মা কাশতে থাকে। শুকনো কাশি, কিন্তু সেই শব্দে আমার বুকের ভিতরটা কেমন গুলিয়ে ওঠে। মনে হয় আমারও ওইরকম কাশি শুরু হয়ে যাবে।

আজ মাকে আমি ঘুমোতে দিলাম। জানালাটা খুলে দিয়ে একটু বাইরের বাতাসে শ্বাস টানতে ইচ্ছে করছিল। ঘরের মধ্যে কেমন একটা ভেজা চুলের গন্ধ, পুরোনো কাপড়-চোপড়ের গন্ধ। স্যাঁতসেঁতে ঘর, অস্বাস্থ্যকর। ইচ্ছে করলেও জানালা খু লোম না। মায়ের কাশিটার কথা মনে পড়ল। গতকাল রাতে এক প্যাকেট সিগারেট কেনা ছিল। তোশকের তলায় লুকিয়ে রেখেছিলাম। বের করে দেখি প্যাকেটটা চেপটে গেছে। কোনওদিনই অভ্যাস ছিল না, কিন্তু কয়েক দিন খাচ্ছি সিগারেট। খুব যে কিছু হয় খেলে তা বুঝি না। অন্তত মন বা শরীরের কোনও পরিবর্তন টের পাই না, গলাটা কেবল খুশখুশ করে, আর ধোঁয়া লেগে চোখে জল আসে। তবু সিগারেট ধরালে নতুন খেলনার মতো একটা কিছু নিয়ে খানিকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়।

পাশের ঘরে যাওয়ার দরজাটা খোলা। ঘরটা আমার দাদা মতীনের। পাগল মানুষ। ঘরটায় আমার আজকাল আর ঢাকাই হয় না। আমি আর মা ঘরটা দাদাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছি। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি দাদার মাথার কাছে জানালাটা খোলা। সারা রাত ধরে হিম এসে ঘরটাকে ঠান্ডা করে রেখেছে। মেঝেয় অনেক সিগারেটের টুকরো। আমার দাদা মতীন সত্যিই সিগারেটের স্বাদ জানে। সস্তা বাজে সিগারেট, তবু কতগুলো খায় দিনে! কতবার মাকে ঘর ঝাঁট দিতে হয়। অনেক দিন পরে এ ঘরে এলাম। তাও সিগারেট খাওয়ার জন্য। খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটা সিগারেট খাব। কোনওদিন দাদার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে এরকম সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবা যায়নি। ঘুমন্ত দাদার শিয়রে দাঁড়িয়েও না। আমার দাদা মতীনকে ছেলেবেলা থেকেই আমি ভয় করি। সাত-আট বছরের তফাত তো ছিলই। তা ছাড়া ছিল আমাদের সবাইকে আড়াল করে রেখে দাঁড়ানোর অদ্ভুত গুণ। তাই সিগারেট ধরাতে আমার বাধোবাধো লাগছিল একটু। একবার চেয়ে দেখলাম। গা থেকে লেপ সরে গেছে, মশারির চারটে খুঁট ছিঁড়ে সেটাতে জড়িয়েছে সারাটা শরীর। মুখটা দেখা যায় না। বালিশের ওপর চুলের ভারে প্রকাণ্ড একটা মাথা পড়ে আছে। আসবাব বলতে চৌকি বাদ দিলে একটা টেবিল আর চেয়ার, একটা শেলফে বই। এ সবই দাদার মাস্টারির চাকরির সময় কেনা। তখন সামান্য আসবাবেরই কত গোছগাছ ছিল, যত্ন ছিল বইয়ের। মাঝে-মাঝে টেবিলের ফুলদানিতে নিজেই ফুল এনে সাজাত, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিত সন্ধেবেলায়। দেখলাম সুন্দর পাতিলেবুর রঙের ফুলদানিটার গায়ে সন্ন্যাসীর শরীরের মতো ছাই মাখা। বোধহয় ওতে এখন সিগারেটের ছাই ফেলা হয়। ভালো করে দেখলে দেখা যাবে সারা ঘরেই সন্ন্যাসীর শরীরের সেই ছাই রং। উদাসীন ঘরখানা। সারা ঘরে ছড়ানো চিঠির প্যাডের নীল কাগজ। সুন্দর কাগজ। প্রতি কাগজেই খুদে খুদে কী যেন লেখা। সারাদিন লেখে আমার দাদা মতীন। চিঠি লেখে। কাকে লেখে কে জানে। শুনেছি বালিগঞ্জে কোথায় যেন পাথরের কড়িওয়ালা একটা প্রকাণ্ড বাড়ি ছিল, তার চারধারে ছিল ঘেরা পাঁচিলে ঘেরা প্রকাণ্ড বাগান, আর সেই বাড়িতে ছিল একটি মেয়ে। না, তাদের সঙ্গে কোনও কালে বিন্দুমাত্র পরিচয় ছিল না দাদার। দাদা কেবল দূর থেকে তাকে মাঝে-মাঝে দেখেছিল। আমার দাদা মতীনকে সে মেয়েটি বোধ হয় দেখেওনি। বোধ হয় দুর্বল লোকেদেরই অসম্ভব কিছু করার দিকে ঝোঁক বেশি থাকে। আমার দাদারও ছিল। কথাটা হয়তো একটু কেমন শোনাবে। একটু আগেই বললাম দাদা আমাদের সবাইকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিল। তবু কথাটা কিন্তু সত্যি। আমার বিশ্বাস দাদা দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। অতি বেশি টান ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। আমার এবং মায়ের প্রতি দাদার অসম্ভব ভালোবাসা দেখে বরাবর মনে হয়েছে দাদা বড় দুর্বল মানুষ! মার সঙ্গে রাগারাগি করে আর ভাব করার জন্য চিরকাল ঘুরঘুর করেছে মায়ের আশেপাশে। যা বলছিলাম, অসম্ভব কিছু করার দিকে এই দুর্বল মানুষটির হয়তো প্রবল একটা ঝোঁক ছিল। নইলে আমাদের মতো ঘরের সাধারণ ছেলে হয়ে কেউ ওই বড় বাড়ির মেয়ের জন্য পাগল হয়! তাও পরিচয় নেই, নাম জানা নেই, ভালো করে চোখাচোখি অবধি হয়নি। সঠিক ঘটনাটা আমি জানি না। শুনেছি ওই অসম্ভব সুন্দর নির্জন পাড়ার রাস্তায়–রাস্তায় ঘুরে আমার দাদা মতীন তার অবসরের সময় বইয়ে দিত। সম্ভবত মা ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। মায়েরা পায়। মাঝে-মাঝে মাকে বলতে শুনেছি, ‘কী জানি কোন ডাইনি ধরেছে।’ আমি তখন সদ্য বেহালার। একটা কারখানায় ঢুকেছি, প্রথম মাসের মাইনে পাইনি। সে সময়ে একদিন দাদা ফিরলে দেখলাম তাকে খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। অবাস্তব। জ্বলজ্বল করছে চোখ, মুখখানা লাল, আর ক্ষণে-ক্ষণে হাসির লহর তুলে সে যে কত কী কথা! খেতে বসেছি পাশাপাশি, সামনে মা, দাদা হঠাৎ হেসে বলল , ‘একটা ব্যাপার হয়ে গেল মা।’ বলে নিজেই খুব হাসল। ‘একটা মেয়ে বুঝলে বেশ সুন্দর চেহারার পবিত্র মেয়ে সন্ন্যাসিনী হলে মানাত–তাকে দেখলাম স্কুটারের পিছনে বসে বিচ্ছিরি গুন্ডা টাইপের একটা ছেলের সঙ্গে হাওয়া হয়ে গেল।’ বলেই ভীষণ হাসল দাদা। ‘সমাজটা যে কী হয়ে যাচ্ছে না মা! কার বউ যে কার ঘরে যাচ্ছে! কী ভীষণ যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে সব, তোমরা ঘরে থেকে বুঝতেই পারছ না।’ বলতে-বলতে বিষম খাচ্ছিল দাদা। মা মাথায় ফু দিয়ে বলল , ‘কথা বলিস না আর। জল খা।’ কার বউ কার ঘরে যাচ্ছে! আমার দাদা মতীনের ওই কথাটা আমার আজও বুকের মধ্যে লেগে আছে। আমরা তখন পাশাপাশি চৌকিতে দু-ভাই শুই, অন্য ঘরে একা মা। সে রাতে দাদাকে দেখলাম খুব হাসিখুশি মনে শুতে এল। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে শোয়ার আগে কী যেন লিখছিল। চিরকালই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা কম হয়। সে রাতে দাদা জিগ্যেস করল হঠাৎ, ‘তুই যেন কত মাইনে পাস?’ বললাম। শুনে দাদা একটু ভেবে আপনমনে বলল , ‘চলে যাবে।’ নতুন চাকরির পরিশ্রমে খুব নিঃসাড়ে ঘুম হত তখন। মাঝরাতে সেই চাষাড়ে ঘুম ভেঙে গেল। চমকে উঠে দেখি আমার শরীরের ওপর দু-খানা হাত ব্যাকুল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উঠে বসলাম। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে দাদা, মাথাটা চৌকির ওপর রাখা, হাত দু-খানা দিয়ে আমাকে জাগানোর শেষ একটা চেষ্টা করছে সে। আমি উঠতেই তার অবশ শরীর মাটিতে পড়ে গেল। তখনই আমাদের পরিবারের একজন কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু কমল না। ছারপোকা মারার যে বিষ দাদা খেয়েছিল হাসপাতালের ডাক্তাররা সেটা তার শরীর থেকে টেনে বের করে দিল। বের করল কিন্তু পুরোটা নয়। খানিকটা বোধ হয় দাদার মাথার মধ্যে রয়ে গেল।

ওই তো এখন বিছানায় মশারি জড়িয়ে শুয়ে আছে আমার দাদা মতীন। পাগল মানুষ। দাদা কিছুই দেখে না, লক্ষও করে না আমাদের। ঘুমিয়ে আছে। তবু তার শিয়রে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতে কেমন বাধোবাধো লাগে। ভেবে দেখলে আমার সেই দাদা মতীন তো আর নেই। তবু না থেকেও যেন আছে।

সিগারেট ধরিয়ে আমি খোলা জানালার কাছে দাঁড়ালাম। অমনি হি–হি বাতাস নাক গলা চিরে ভিতরে ঢুকে অবশ করে দিল। চোখে জল এসে গেল। শরীরে উত্তেজিত অসুস্থ ভাবটা সামান্য নাড়া খেল। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আছে, তবু একটুও ঘুম হয় না আজকাল। কারখানা বন্ধ না থাকলে শীতের এই ভোরে সামনের ওই রাস্তাটা দিয়ে আমি কাজে যেতাম। এই ভোরবেলার চারপাশ কী সুন্দর থাকে। ঠিক কতখানি সুন্দর তা বলে বোঝানোই যায় না। একমাত্র এই ভোর রাত্রেই কলকাতাকে নিঃঝুম মনে হয়। অন্ধকারে পাখিরা ডাকাডাকি করে বাসা ছাড়ে না। রাস্তায় পা দিয়ে মনে হয় গ্রামের রাস্তায় চলেছি। বাতাস খুব পরিষ্কার থাকে, জীবাণুশূন্য। একটু অন্ধকার আর একটু কুয়াশা থাকে বলে চারপাশে নানা রহস্যময় ছবি ভেসে ওঠে, চেনা জায়গার গায়ে অচেনার প্রলেপ পড়ে যায়। চারদিকের বাড়িগুলো আবছা আর ঝুপসি গাছের মতো দেখায়। প্রকৃতির সঙ্গে তারা এক হয়ে যায়। দাদার ঘরে একখানা বই আছে, সংবাদপত্রে সেকালের কথা। তাতে পুরোনো কলকাতার দুটো চারটে ছবি আমি দেখেছি। কাঁচা রাস্তা, পুকুর আর গাছগাছালিতে ভরা কলকাতা, শেয়াল ঘুরে বেড়ায়। পুরোনো আমলের গোল গম্বুজ আর থামওয়ালা বাড়ির সামনে ঘোড়ায় টানা ব্রহাম গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, বাঙালিবাবুদের মাথায়। টোপরের মতো টুপি, পায়ে নাগরা, আর পরনে কাবাকুর্তা। ভোর রাত্রের কলকাতা সেই পুরোনো কলকাতা। পুকুর আর গাছগাছালির গ্রাম্য শহর। আমি সেই পুরোনো শহর ধরে হেঁটে যাই কসবা থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনের ট্রাম ডিপো পর্যন্ত। ভোরের প্রথম ট্রাম ধরি।

কারখানার মধ্যে বিলিতি শহর। ফুলগাছে আধো-ঢাকা কাঁচের বাড়ি যত্নে লাগানো ঝাউ আর ইউক্যালিপটাসের সারির লন। স্বয়ংক্রিয় লন-মোয়ার বটবট করে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। দয়ালু পাদরির মতো সুন্দর হাসিমাখা মুখে সাহেব ম্যানেজার ডিলান সারা দিন আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। ভাবতেই এখন বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। আমি মুখ ঘুরিয়ে ঘরের দেওয়াল খুঁজলাম। দাদার ঘরে কোনও ক্যালেন্ডার নেই। না থাক। গতকাল ছিল ষোলো, আজ ধর্মঘটের সতেরো দিন। মনে হচ্ছে আমরা একটা হারা–লড়াই লড়ে যাচ্ছি। প্রবেশন পিরিয়ডে বিশ্বনাথকে ছাঁটাই করা হল। সেটা কোম্পানির ইচ্ছে। শিক্ষানবিশের চাকরির কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। বিশ্বনাথের হাতের জব বারবার স্ক্রাপ হয়ে যেত। কোম্পানির দোষ ছিল না। তবু ইউনিয়ন রুখে। দাঁড়াল। তিনদিন ধর্মঘটের পর কোনও বিজ্ঞ লোক এসে বলল –এটা বে-আইনি হচ্ছে। স্ট্রাইক টিকবে না। তোমরা বরং চার্টার অব ডিমান্ড দাও। রাতারাতি চার্টার অব ডিমান্ড তৈরি হল। চোদ্দো দফা দাবি। তবু বোঝা যাচ্ছিল হারা-লড়াই। ট্রাইব্যুনালে চলে গেল দাবিপত্র। কোথাকার কোন আনাড়ি কারিগর বিশ্বনাথের জন্য সুন্দর মনভোলানো বিলিতি শহর থেকে আমি চললুম নির্বাসনে। যেমন নাম-না-জানা অচেনা একটা বড় বাড়ির মেয়ের জন্য আমার দাদা মতীন চিরকালের জন্য হয়ে রইল পাগল মানুষ। কেমন যেন অদ্ভুত যোগাযোগ। বললে অবিশ্বাস্য শোনাবে। তবু এটা সত্য যে, সেই অচেনা মেয়েটার জন্য দাদা পাগল না হলে আমি ইউনিয়নে নামতামই না। সে ছিল বড় বাড়ির মেয়ে, আমার খ্যাপা দাদা মতীন তার কাছাকাছিই যেতে পারল না। বলতেই পারল না, ‘তোমাকে চাই।’ কেবল ঘুরে বেড়াল রাস্তায়–রাস্তায়। তারপর একদিন তার চোখের ওপর দিয়ে চালাক একটি সাহসী ছেলে মেয়েটিকে স্কুটারের পেছনে নিয়ে চলে গেল। কেন এরকম হবে? কেন এরকম দুষ্প্রাপ্য হয়ে থাকবে একটি মেয়ে আমার দাদার কাছে? কেন থাকবে তাদের এরকম দামি বাগানের চারদিকে ওই অত উঁচু ঘেরা–পাঁচিল, যার মধ্যে আমরা কোনওদিনও যেতে পারব না? মেয়ে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কারও কারও থাকবে স্কুটার, যা কেন আমাদেরও নেই? নিজের ঘরসংসার বজায় রেখে, পাগল ভাই আর বিধবা মায়ের দায় নিয়ে সমাজের সেই অব্যবস্থা আমি কী করে পালটে দেব? তেমন কোনও উপায় আমার ছিল না হাতের কাছে। টিমটিম করে অফিসের ইউনিয়নটা চলছিল তখন। আমার মাত্র একুশ কি বাইশ বছর বয়স। রাগে আক্রোশে ক্ষোভে আমি সেই ইউনিয়নের মধ্যে ফেটে পড়লাম। যদি তা না পড়তাম তবে আজ আমার পিছিয়ে যাওয়ার রাস্তা থাকত। আমি ইউনিয়নের চিহ্নিত কর্মী, দাঙ্গাবাজ, আক্রমণকারী মনোভাবাপন্ন লোক; আমার পিছনে ঘুরছে চার্জসিট আর। তিনটে পুলিশ কেস। ভেবে দেখলে আমার দাদা মতীনের জন্যই আজ আমার এই রাত জাগার ক্লান্তি, অনভ্যাসের সিগারেট আর ভয়। হাইস্কিলড অপারেটরের সুন্দর বেতন থেকে শূন্যতা। কিংবা এই সবের জন্য সেই মেয়েটাই দায়ী, যাকে আমি চিনি না, যাকে চিনত না আমার দাদা মতীনও। তা হোক। তবু সমাজের ব্যবস্থা পালটে যাওয়াই ভালো। আজ বরং আমি একটা হারা লড়াই না-হয় হেরেই গেলাম। মেয়েটিকে ধন্যবাদ।

চিঠির একটা নীল কাগজ সামান্য উড়ে এসে আমার পায়ের গোঁড়ালিতে লাগল। কৌতূহলে তুলে নিলাম। খুদে খুদে অক্ষরে লেখা–’কেউ ঠিকঠাক বেঁচে নেই। পুরোপুরি মরেও যায়নি কেউ। ওরকম কিছু কি হয় কোনওদিন? ঠিকঠাক বেঁচে থাকা, কিংবা পুরোপুরি মরে যাওয়া? …’ আমি আর পড়লাম না। কী যে লেখে পাগল। মাঝে-মাঝে ঠিকানা-না-লেখা খাম আমাকে দিয়ে বলে, ‘ডাকে দিয়ে দিস।’ কখনও নিজেই গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে আসে ভাঁজ করা কাগজ। পিওনেরা হয়তো ফেলে দেয়, কিংবা হয়তো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়ে হাসাহাসি করে। সারা ঘরময় ছড়ানো এই কাগজ আর সিগারেটের টুকরো। পয়সা নষ্ট। হঠাৎ রাগ হয়ে গেল বড়। তোমার জন্যই, তোমার জন্যই এত সব গণ্ডগোল।

আমি মশারির ঢাকাটা রুক্ষ হাতে সরিয়ে নিলাম। রোগা একখানা মুখ। চমকে চোখ খুলল। জুলজুল করে ভীত সন্ত্রস্তভাবে আমাকে দেখতে থাকল। মশারির মুঠ ধরে থাকা আমার লোহাকাটা প্রকাণ্ড হাতখানার দিকে তাকিয়েই আমি লজ্জা পেলাম। আবার ঢাকা দিয়ে দিলাম দাদার মুখ। ও তো খুব বেশি কিছু চায় না। কেবল চিঠির কাগজ আর সস্তা সিগারেট। দেখলাম ওর ময়লা ঘেমো গন্ধের গেঞ্জি, গালে না-কামানো দাড়ি, আ-ছাঁটা চুল। বড় যত্নে নেই আমার দাদা মতীন। ঘুম ভেঙে ও এখন সন্দেহের চোখে ভীত মুখে আমাকে দেখছে। না, আমি ওর স্বপ্নের কেউ না। আমি বাস্তব, যার সঙ্গে ওর পাট অনেক দিন চুকে গেছে। আমি তাই আস্তে-আস্তে ও ঘর থেকে এ ঘরে চলে এলাম।

থাক, আমার দাদা মতীন ওরকমই থাক। আমরা যা দেখতে পাই না, ও হয়তো তাই দেখে। বনের পাখিপাখালিরা এসে হয়তো ওর সঙ্গে কথা বলে যায়, হয়তো মায়ারাজ্য থেকে আসে ওর চেনা পরিরা, ওকে ঘিরে আছে স্বপ্নের সব মানুষ। মনে হয় আমার দাদা মতীনের এখন আর কোনও দুঃখ নেই। সেই অচেনা মেয়েটি যদি এসে এখন সামনে দাঁড়ায়, যদি বলে, ‘আমাকে চাও?’ তা সে ওইরকম ভয় পাওয়া চোখে জুলজুল করে চেয়ে দেখবে। চিনবেই না; সেও তো এখন আর দাদার সেই স্বপ্নরাজ্যের কেউ নয়। কী হবে ওকে আর সুখ-দুঃখের বাস্তবের মধ্যে টেনে এনে? তার চেয়ে এই বেশ আছে আমার দাদা মতীন। পাগল মানুষ।

মা

কাল রাতে যেন খুব বৃষ্টি হয়ে গেল। ঘুমের মধ্যেই শুনছিলাম টিনের চালের ওপর খই–ফোঁটার মিষ্টি শব্দ। করমচা গাছের ডালপালায় বাতাস লাগছে। কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি! সেই বৃষ্টির মধ্যে দেখি কর্তা খোলা জানালা বন্ধ করবার চেষ্টা করছে। বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাচ্ছে মানুষটা। সেদিকে খেয়াল না করে আমি রাগে দুঃখে মানুষটাকে জিগ্যেস করছি–তুমি বেঁচে থাকতেও আমার বিধবার দশা কেন! সেই শুনে খুব হাসছিল মানুষটি। বেঁচে থাকতে একটা হাড়জ্বালানো শ্লোক বলত প্রায়ই–’সেই বিধবা হলি আমি থাকতে হলি না।’ দেখলাম জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বিড়বিড় করে সেই শ্লোকটাই বলছে। এই দেখতে-না-দেখতেই ঘুম ভেঙে গেল। ওমা, কোথায় বৃষ্টি। আর কোথায়ই বা সেই মানুষ। টিনের চালই বা কোথায়, কোথায়ই বা সেই করমচার গাছ। মরা মানুষের স্বপ্ন দেখা ভালো না। তবু আমি প্রায়ই দেখি। তাঁর মরার পর বারো বছর হয়ে গেল। ধর্মকর্মের দিকে ঝোঁক ছিল খুব। বলত–’যদি জন্মান্তর থাকে–বুঝলে, তবে আমি বতুর ছেলে হয়ে আসব।’ বোধহয় সেইজন্যেই এখনও পৃথিবীতে জন্মায়নি মানুষটা। আত্মাটা আমাদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করে। দেখে যায় তাঁর আসার রাস্তা কতদূর তৈরি হল। ঘুম ভেঙে উঠে বসে চুলের জট ছাড়াচ্ছিলাম। কর্তার স্বপ্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওদের তো বাড়িঘর নেই, আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ানো। হয়তো শীতে বৃষ্টিতে বড় কষ্ট পেতে হয়। ওম পাওয়ার জন্য আমাদের কাছে চলে আসেন। ইচ্ছে করে কয়েকজন ব্রাহ্মণ ডেকে ছাতা আর কম্বল দান করি। অনেক টাকার ঝক্কি! মাঝরাতে বসে কত কথা ভাবছিলাম। শুনি বাইরে কাক ডাকছে। রাতে কত ডাকা ভালো নয়। হয়তো জ্যোৎস্না ফুটেছে খুব। তবু বড় বুক কাঁপে। মঙ্গলের কোনও চিহ্ন তো দেখি না। টের পেলাম বতু তার বিছানায় পাশ ফিরল। আগে এক কাতের ঘুম ছিল ওর। ভোরবেলা তুলে দিতে গেলে ময়দার দলার মতো বিছানার সঙ্গে লেগে থাকত। বাচ্চাবেলার মতো খুঁতখুঁত করে বলত–আর একটু মা, আর একটু। ডান কাতের ঘুম হল, এবার বাঁ-কাতে একটু ঘুমোতে দাও। পাঁচ মিনিট। কষ্ট হত তুলতে। তবু চাকরি উন্নতি এসব ভেবে মায়া করতাম না। তুলে দিতাম। যখন চা করে রুটি তরকারি খেতে দিতাম তখনও দেখতাম, ওর দুচোখে রাজ্যের ঘুম লেগে আছে। আর, এখন কয়েক দিন হল রাতে ওর পাশ ফেরার শব্দ পাই। সারা রাত কেবলই পাশ ফেরে। ঘুম হয় না বোধ হয়। ও এখন জামিনে খালাস আছে। পরশু দিনও পুলিশের লোক এসে বলে গেল–ও যেন বাড়িতে থাকে, কোথাও না যায়। কারখানার ব্যাপারটা আমি একটু একটু জানি। বেশি জানতে ভয় করে। তবু একদিন সাহস করে জিগ্যেস করেছিলাম–’তোরা কি জিতবি?’ ও ঠোঁট ওলটাল। বুঝি অবস্থা ভালো নয়। বললাম –কী দরকার ওসব হাঙ্গামা করে! মিটিয়ে ফেল।’ ও শুকনো হেসে একটা কবিতার লাইন বলল  –’যে পক্ষের পরাজয় সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান…!’ ভালো বুঝলাম না। কারখানা থেকে ওর বন্ধুরা আসে। আমি রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকি, এ ঘরে ওরা মিটিং করে। মাঝে-মাঝে একটু চেঁচামেচি হয়, এ ওকে শাসায়। বুঝি ওদের মধ্যে মিল হচ্ছে না। সবাই এককাট্টা নয়। বতু গোঁয়ার। তবু জানতে ইচ্ছে করে ও এখন কোন দলে। ওর অবস্থাটা কী! আবার ভাবি বাইশ বছর বয়স থেকে সংসার ঘাড়ে নিয়েছে। ও কি আর ওর দায়িত্ব বোঝে না! আমার চেয়ে বরং ভালোই বোঝে। আমি তো মাত্র রান্না করি আর ঘর আগলাই। ওকে কত কষ্ট করতে হয়, হয়তো অপমান সহ্য করে বকাঝকা খায়, শীতে বৃষ্টিতে কতটা পথ পার হয়ে যাতায়াত করে। খুঁটে এনে আমাদের খাওয়ায়। গত আশ্বিনে আঠাশে পা দিল বতু। কারখানায় যখন ঢুকল তখনও দাড়িতে ভালো করে ক্ষুর পড়েনি, কচি মুখখানি। এখন বয়েসকালের। গোটাগুটি মানুষ হয়ে উঠেছে। মতু যদি ঠিক থাকত তবে বতুর বিয়ে দিতাম। এটাই ঠিক বয়স। কর্তাকে আবার আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনবার রাস্তা তৈরি হয়ে যেত। বতুর ছেলে হলে রোদে বসে তেল মাখাতাম, চুপচুপে করে। ঠাট্টা করে বলতাম, ‘হ্যাঁ রে, সত্যিই কি আর জন্মে তুই আমার ভাতার ছিলি?’ ভাবতেই গায়ে কেমন শিরশির করে কাঁটা দেয়। বতুর ছেলে হয়ে কর্তা যদি সত্যিই আসত তবু নতুন সম্পর্কে কেমন লাগত আমার!

আজকাল কেমন যেন ভুলভাল হয়ে যায়। পুরোনো কথার সঙ্গে আজকালের কথা গুলিয়ে ফেলি। তাল থাকে না। বোধ হয় পরশু দিন দুপুরে একটু ঘুমিয়েছি। ঘুম ভাঙল যখন তখন শীতের বেলা ফুরিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে-উঠতে সুদর্শন চাকরের নাম ধরে ডাকছিলাম। মনে হয়েছিল শ্বশুরমশাই কাছারি থেকে ফিরে এলে বড়ঘরের বারান্দায় পুবমুখো। ইজিচেয়ারটায় বসে আছেন, এখনও তাঁকে তামাক দেওয়া হয়নি। সুদর্শনকে ডাক দিয়ে আমি মাথার ঘোমটা ঠিক করে উঠতে যাচ্ছি, শ্বশুরমশাইয়ের পা থেকে জুতো খুলে দেব বলে। ভুল বুঝতে পেরে কেমন যেন অবশ-অবশ লাগল। কতকালকার কথা, সব তবু যেন মনে হয় গতকালের দেখা। সুদর্শন সাতাশ বছর চাকরি করে শ্বশুরবাড়ির কাছারিঘরে মারা গেল। তখন বতুর বয়স বোধ হয় চার কি পাঁচ। সুদর্শনের কাঁধে চড়ে সে অনেক ঘুরেছে। সুদর্শন মরে গেলে বাড়িসুষ্ঠু লোক কেঁদেছিল। সাতাশ বছরে ও আর চাকর ছিল না। যে কথা বলছিলাম, যে ভুল পেয়ে বসেছে আমাকে। বতু মাঝে-মাঝে জিগ্যেস করে, সারাক্ষণ বিড়বিড় করে কী বকো মা? চমকে উঠি। বিড়বিড় করি। হয়তো করি। সারাদিন বড় কথা বলতে ইচ্ছে করে। মাথার মধ্যে ঠাসা সব পুরোনো দিনের কথা। শোনার লোক নেই। তাই বোধ হয় আকাশ বাতাসকে শোনাই। তোরা তো কাছে থেকেও নেই। বতুর চাকরি আর ইউনিয়ন, সারা দিনে কথা দূরে থাক, আমার। দিকে ভালো করে তাকায় না পর্যন্ত। আর মতু! সে আমাকে চেনেই না। সারাদিন নীল চিঠির মধ্যে ডুবে থাকে। কর্তা বলত, ‘তোমার দুটো ঘোড়া, গাড়ি চলবে ভালো।’ গাড়ি বলতে আমাকেই বোঝাত, যেন আমার চলার ক্ষমতা নেই ছেলেরা না চালালে। কাছে তাকে পেলে এখন বলতাম–ঘোড়া দুটো কেমন দু-মুখো ছিটকে গেল দ্যাখো। খাদের মুখে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, একটু জোর বাতাস এলেই গড়িয়ে পড়বে। আর উঠবে না।

মরতে অবশ্য আমার একটুও দুঃখ নেই। কিন্তু মতু-বতুর কথা ভাবলে মরার ইচ্ছেটাই চলে যায়। ওরা দুজন দুরকমের পাগল। আবার ভাবি, ওদের জন্যেই যদি বেঁচে থাকতে হয় তবে তো আরও বহুকাল বেঁচে থাকতে হবে। সে যে বড্ড একঘেয়ে। আবার যদি মরে যাই তবে ওদের দেখবে কে? বিশেষ করে মতুকে! হয়তো ততদিনে বতুর বউ এসে যাবে। কিংবা এমনও তো হতে পারে যে, মতু ভালো হয়ে গেল আবার আগের মতো চাকরি–বাকরি করল। হতে পারে না কেন! এরকম কি হয় না।

সামনের শনিতে একটু বারের পুজো দেব। আর প্রতি বিষ্যৎ বারে একটা বামুন ছেলেকে ডেকে এনে পাঁচালি পড়াব। নিজে কয়েক দিন পড়বার চেষ্টা করেছি। চোখে বড় জল এসে যায়। তিনটে মানসিক করা আছে আমার মতুর জন্য। অনেক দিন হয়ে গেল। মনের ভুলে একটা মানসিক করে রেখেছি ময়মনসিংহের কালীবাড়িতে। কালীর সোনার চোখ গড়ে দেব। এখানে বসেই করেছি সেই মানসিক, এখন ভাবি মতু ভালো হলে কী করে ওখানে পুজো পাঠাব? ওরা কি দেবে আমাকে যেতে? বতুই কি ছাড়বে? কিন্তু বুঝি না, গেলে কী হয়! ওসব তো আমাদেরই দেশ জায়গা ছিল। বতু মতু দুজনেই, জন্মেছে ওখানে। কত যে বালাই তৈরি করছে মানুষ।

বতুর বউ এসে মতুকে দেখবে–এইরকম একটা বিশ্বাস আঁকড়ে আছি। মরার সময় হলে –যদি বতু ততদিনে বিয়ে না করে—

তবে ওই বিশ্বাস নিয়েই আমাকে যেতে হবে। তবু বড় ভয় করে। যদি বতুর বউ তেমন লক্ষ্মীমন্ত না হয়! যদি মায়াদয়া না থাকে তার! মাঝে-মাঝে এসব কথা ভেবে উতলা হয়ে বলে ফেলি। বতু রাগ করে–সমাজ-সংসারের কথা ভাবো মা, কেবল নিজেরটুকু চিন্তা করে করেই গেলে। দ্যাখো না, সমাজের চেহারা এমন পালটে দেব যে, মানুষকে আর নিজের সংসারের কথা ভাবতেই হবে না। তখন সবাইকেই দেখবে সমাজ। বতুটাও একরকমের পাগল। সমাজ কি আমার ঘরে এসে হাড়ির খোঁজ নেবে! কিংবা হয়তো ও ঠিকই বলে। সমাজ-সংসারের আমি কতটুকু দেখেছি? ঘোমটার মধ্যেই তো আদ্দেক বয়স কেটে গেল। যখন সহজভাবে চারদিকে তাকাতে পারলাম তখন চোখে ছানি আসছে। তবু আমি বতুর সমাজের ওপর ভরসা না করে ওর বউয়ের ভরসাই করে আছি। যদি সে মেয়েটার মনে একটু মায়ের ভাব থাকে তবে মতুর জন্য চিন্তা নেই। ওকে বালাই বলে না ভাবলেই হল। ও তো কাউকে জ্বালায় না, চেঁচামেচি করে না। খুব শান্ত থাকে। সারাদিন কেবল চিঠি আর সিগারেট। আমি মাঝে-মাঝে ঘরটা পরিষ্কার করি। চিঠির কাগজ জড়ো করে টেবিলে গুছিয়ে দিই। ওই কাগজগুলো ফেলতে গেলেই ভীষণ রাগ করে মতু। মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ‘উঃ’ ‘উঃ’ বলে ওপর দিকে হাত ছুঁড়তে থাকে। তবু জোর করে যদি ফেলি তবে মাথার চুল ছেড়ে, দুমদুম করে দেওয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদে। নিজের মাথাটার ওপরেই ওর চিরকালের রোখ। চুল ঘেঁড়া, মাথা ঠোকা সেই ছেলেবেলায় মতোই আবার ফিরে এসেছে। ছেলেবেলায় আমার ওপর রাগ হলে ও মাথা দিয়ে আমাকে ছুঁ মারত। একবার বুকের মাঝখানে ঢু মেরেছিল। এমনিতেই অম্বলের ব্যথা আমার, সেই টু খেয়ে দম বন্ধ হয়ে চোখে কপালে উঠল। এখনও বুকের হাড়ে পাঁজরায় সেই ব্যথা একটুখানি রয়ে গেছে। আর কোনওদিন কি মতু আদর করতে গিয়ে আমার বুকে মুখ গুজবে কিংবা রেগে গিয়ে মারবে টু? না, মতু আর সে মতু তো নেই। তাই বুকের সেই ছোট্ট ব্যথাটুকু আমার চিরকাল থাক। সেই ব্যথাটুকুই মতু হয়ে আমার কাছে আছে।

খুব ভোরবেলাতেই বতু উঠে তার দাদার ঘরে গিয়েছিল আজ। এমনিতে বড় একটা যায় না। কি জানি আজ বোধহয় দাদার জন্য মায়া হয়েছিল একটু। তাই দেখে এল। কিংবা হয়তো রাতে কোনও স্বপ্ন দেখেছিল দাদাকে নিয়ে। বতুর ভালোবাসা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মতুরটা যেমন যেত। তবু বতুর মনেও বড় মায়া–আমি জানি। মানুষের জন্য ও ভাবে, সমাজ-সংসারের জন্য ভাবে। পাড়ার লোকেদের দায়ে দফায় ও দেখে। মতুরও ভালোবাসা ছিল, তবে সেটা অন্য রকমের। অন্যের দুঃখ দেখলে মন খারাপ করে থাকত, হয়তো লুকিয়ে কাঁদতও, কিন্তু বুক দিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত না, বতু যেমন করে। হয়তো মতুর লজ্জা সংকোচ বেশি ছিল। তা ছাড়া ছিল ওর কুনো স্বভাব, মাথার মধ্যে ছিল চিন্তার কারখানা। তাই ওর ভালোবাসা ছিল ভাবের।

চা খেয়েই সকালেই বতু বেরিয়ে গেল। বলে গেল–’ভাত ঢাকা দিয়ে রেখো, ফিরতে দেরি হবে।’ ওর মুখ চোখের অবস্থা ভালো না। কী জানি কী হবে। ওর বন্ধুরা আমাকে বলে যায়–ওর কিছু হবে না। চাকরি গেলেও ও আবার চাকরি পাবে। পুলিশের কথা ভাবি। ওরা নাকি বড্ড মারে!

অনেক বেলা পর্যন্ত মতু শুয়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম–ওঠ রে। উঠল। পারতপক্ষে অবাধ্যতা করে না। চায়ের কাপ হাতে দিলাম। বাসি মুখে চা খেতে লাগল। অনেক করেও ওকে দাঁত মাজাতে পারি না, স্নান করাতে পারি না। গায়ে চিট হয়ে ময়লা বসেছে। ওকে যে জোর করে কলঘরে টেনে নিয়ে যাব এমন আমার সাধ্যে কুলায় না। ছুটির দিনে মাঝে-মাঝে বতু জোর করে স্নান করিয়ে দেয়। ওই জোর করাটা দেখতে আমার ভালো লাগে না। বুকের মধ্যে একটু কেমন করে। বেশ কয়েক দিন হল বতু দাদাকে স্নান করায় না।

মেঝে থেকে সিগারেটের টুকরোগুলো তুলে বাঁ-হাতে তেলোয় জমা করছিলাম। শিউলি ফুল কুড়োনোর কথা মনে পড়ে। সামান্য একটু শ্বাস বুক থেকে বেরিয়ে গেল। আস্তে-আস্তে অথর্ব হতে চ লোম। অথচ খুব বেশি দিন আগে জন্মেছি বলে মনে হয় না। বে-ভুল মনে কেবল পুরোনো দিনের কথা কালকের কথার মতো মনে হয়। কিন্তু সেটা তো সত্যি নয়। মতুরই বয়স ছত্রিশ পার হয়ে গেল। ওর আগেও একটা হয়েছিল। বাঁচল না। ভালোই হয়েছে। সেটা আবার কোন রকমের পাগল হত কে জানে!

মতু একটুক্ষণ আমাকে দেখল। যেন চেনে না। তবু আমি জানি মতু মাঝে-মাঝে খুব স্বাভাবিক হয়ে যায়। একদিন মাঝরাতে ওর ডাক শুনলাম–মা, ওমা, আমার টেবিলে জল রাখোনি কেন? ভীষণ চমকে উঠেছিলাম। আনন্দে ধক করে উঠল বুকের ভিতরটা। জল খাওয়ার পর কিন্তু আর চিনল না আমাকে। তারপর মাঝে-মাঝে ইচ্ছে করে জল না রেখে দেখেছি আবার ‘মা’ বলে ডাকে কি না। ডাকত মাঝে-মাঝে। কিন্তু জল খাওয়ার পরই ভুলে যেত। জল না রেখে কষ্ট দিয়ে ওকে পরীক্ষা করতে আর ইচ্ছে হয় না। বেশি সিগারেট খায় বলেই বোধ হয় ওর জলতেষ্টা খুব। তেষ্টার জলের চেয়ে কি মা ডাকটা বেশি? তাই আমি জল রাখতে ভুলি না।

ওর এ অবস্থা হওয়ার সময়ে প্রথমদিকে বন্ধুরা খুব আসত। এখন আর আসে না। লজ্জার মাথা খেয়ে তাদের কাছে মেয়েটির কথা জিগ্যেস করতাম। কেমন মেয়ে, কীরকম বয়স, কোন জাত! তারাও কেউ দেখেনি। মতুর কাছেই শুনেছে বেশি বয়স না তার, খুব পবিত্র সুন্দর চেহারা, আর খুব অহংকারী। কোনওদিকে নাকি তাকাই না। তার নাম, জাত কেউই জানে না। এসব শুনে আমি একদিন বতুকে বলেছিলাম–’কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দে। তাতে মেয়েটার চেহারার বর্ণনা দিয়ে লেখ যে, আপনার জন্যই আমার দাদার এই অবস্থা, আপনি এসে তাকে বাঁচান। আমরা আপনার কাছে কেনা হয়ে থাকব।’ বতু রাজি হল না, ঝাঁকি দিয়ে বলল –’সে মেয়েটা কী করে বুঝবে যে, এটা তাকেই লেখা? তা ছাড়া আমরা এত হীন হতে যাবই বা কেন?’ তারপরেই বতু মেয়েটাকে গালাগাল দিতে লাগল, সে বড় লোকের মেয়ে বলে। আমি কিন্তু বতুর মতো করে বুঝি না। মেয়েটাকে চিনতে পারলে আমি গিয়ে তাকে সাধ্যসাধনা করতাম, দরকার হলে পায়ে ধরতাম। সম্মানের চেয়েও যে ছেলেটা আমার বেশি। হয়তো বিজ্ঞাপন মেয়েটা দেখত না, হয়তো দেখলেও বুঝত না, তবু চেষ্টা করলে দোষ কী ছিল? তা না করে বতু গেল সমাজের ব্যবস্থা পালটাতে। দূর থেকে যে এত ভালোবাসা যায় আর পাগল হওয়া যায় তা বতু বোঝেই না। আমি কিন্তু একটু-একটু বুঝি। বতু-মতুর বাবা এখন তো বহুদূরের লোক, তার শরীর নেই, ডাকলেও তার সাড়া পাওয়া যাবে না। তবু আমার এই বুকটাতে ওই লোকটার জন্য ভালোবাসা টলটলে হয়ে আছে। যদি ভগবানকে দেখতে চাই তবে হয়তো বলব–’তুমি ওই চেহারা ধরে এসো।’ কী জানি হয়তো মতুর ভালোবাসা সেরকম নয়। আমি তো তাকে পেয়েছিলাম কোনওদিন, মতু তো পায়ইনি। কিংবা হয়তো মতুও সেই মেয়েটিকে তার নিজের মতো করে মনে-মনে পেয়েছে। ঠিক

জানি না। আমার ভাবনা-চিন্তায় অনেক গণ্ডগোল। মতুর মনের ভিতরটা তো আমরা কেউ দেখতে পাই না।

একটা নীল কাগজ কুড়িয়ে টেবিলে রাখতে গিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। ছানিকাটা চোখ, মোটা চশমা, তাই ভালো পড়া গেল না। মনে হল যেন লেখা আছে যে, পৃথিবীতে কেউই ঠিকঠাক বেঁচে নেই, পুরোপুরি মরেও যায়নি কেউ। সুন্দর কথাটা। মতুর মাথায় চিরকালই সুন্দর-সুন্দর কথা আসে। মনে-মনে বললাম–’ঠিকই লিখেছিল মতু। পৃথিবীতে কেউই ঠিকঠাক বেঁচে নেই, আবার পুরোপুরি কেউই মরে যায়নি। তোর অনেক জ্ঞান, তুই বড় ভালো বুঝিস।’

ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখি মতু তাকিয়ে আছে। ঠিক যেমন ছেলে মায়ের দিকে তাকায়। মনে হল এক্ষুনি ‘মা’ বলে ডাকবে, বলবে, ‘খিদে পেয়েছে, খেতে দাও।’ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রইলাম ওর একটু কথা শোনার চেষ্টায়। ও চোখ ফিরিয়ে নিল।

সেই মেয়েটার ওপর মাঝে-মাঝে বড় রাগ হয় আমারও। কেন রে পোড়ারমুখী, কোন কপালে আমার ছেলের চোখে তুই পড়েছিলি? হ্যাঁ, ঠিক ওইরকম গ্রামের ভাষায় মেয়েটার সঙ্গে আমি মনে-মনে ঝগড়া করি। আবার ভাবি, আমার মতু যাকে অত ভালোবেসেছিল তাকে আমি কী করে ওরকম ঘেন্না করব! তাই আবার মনে মনে বলি, ‘তোমাকে চিনি না, তবু বলি, মা, সুখে থাকো।’

মতীন

কেউ ঠিকঠাক বেঁচে নেই। পুরোপুরি মরেও যায়নি কেউ। ওরকম কিছু কি হয় কোনওদিন? ঠিকঠাক বেঁচে থাকা, কিংবা পুরোপুরি মরে যাওয়া?

তবু দ্যাখো মাঝে মাঝেই মানুষেরা মরে যায়। হঠাৎ সময় চলে আসে। অসময়ে। কেউ বুঝতেই পারে না। সখেদে বলে–বহু কাজ বাকি রয়ে গেল। বাস্তবিক মানুষের, পিঁপড়ের, পাখিদেরও বহু কাজ বাকি থেকে যায়। ঠিক সময়ে-সময়ে হয় না।

আবার একটু পুরোনো হলে সকলেই নতুন জীবন চায়, নতুন শরীর কিংবা চায় দুঃখ–দূর, কিংবা চায় তাকে, যাকে এবার পাওয়া হল না।

তাই নির্বাসনে কেউ যায় না, কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে। কেউ একজন করপুটে ধরে নেয়। আবার ফিরিয়ে দেয় খেলার ভিতরে।

ফিরে এলে আবার সেই অবিরল মাটিকাটার শব্দ। ধুপ ধুপ ধুপ। দিনরাত। খুব দূরে নয়। মাঝে-মাঝে অন্য সব শব্দের সঙ্গে মিশে যায়। তবু শোনা যায়, ঠিকমতো কান পাতলে। যেন গভীর মাটির নীচে নেমে যাচ্ছে একজন মাটি–মজুর। পরিশ্রমী সে। সারাক্ষণ তৈরি করছে বিচিত্র সুড়ঙ্গ, সঁড়িপথ। হয়তো তুচ্ছ কাজ, অকাজের। তবু তার কত মনোযোগ! সে ফিরেও দেখে না কতখানি কাটা হল, হিসেবও করে না আর কতখানি বাকি। সারাদিন রাত অবিশ্রান্ত তার কাজ চলতে থাকে। শব্দ উঠে আসে, গর্ত গভীরের দিকে নেমে যায়।

মনে হয় ওটা বুকের শব্দ! কিন্তু তা নয়।

কিংবা হয়তো ওটা বুকের শব্দই! আমারই ভুল হয় কেবল।

কোনও কাজ নেই। তাই মাঝে-মাঝে মিঠিপুর ঘুরে আসি। তুচ্ছ শহর। জানালার তাকের ওপর এক দুই দানা চিনি ফেলে দিই। শূন্য শহরের লুকোনো জায়গা থেকে অমনি উঠে আসে পরিশ্রমী পিঁপড়ের সারি। মিঠিপুরে সচ্ছলতা দেখা দেয়। ওরা কি জানে পরিশ্রমই সচ্ছলতা? কিংবা মনে করে সচ্ছলতা ঈশ্বরের দয়া?

হামাগুড়ি দিয়ে আমি জেলেদের গ্রামে চলে আসি। আমার টেবিলের তলায় ঘন ছায়ায় নিবিড় সেই গ্রাম। জাল ছড়িয়ে অপেক্ষা করছে তিনজন জেলে। শান্ত, ধৈর্যশীল, আশাবাদী তিন। মাকড়সা। কখনও মুড়ির টুকরো  ছুঁড়ে মারলে জালে একটু আটকে থাকে। সঙ্গে-সঙ্গে তারা নড়ে ওঠে। শান্ত ধৈর্যশীল তিনজন আশাবাদী মাকড়সার কাছে জ্ঞানলাভের জন্য বসে থাকি।

খনিশ্রমিকের মতো আঁকাবাঁকা পথ কাটছে উইপোকা আমার বইয়ের তাকে। তাক থেকে বইয়ের ভিতরে। আমার বইগুলো ঝুরঝুরে হয়ে এল। তবু আমি বাধা দিই না। তাদের ক্লান্তিহীন কাজ দেখি। দ্যাখো, কেমন তৈরি করছে গভীর জালিপথ, নকশা ছাড়াই মিলিয়ে দিচ্ছে এ ধারের সঙ্গে ওধারের সুড়ঙ্গ। যশোলাভ নেই, বাহবার ধারও ধারে না।

দেখে যাই। আশ্চর্য এইসব শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে খনির কাছাকাছি। সুন্দর ভ্রমণ। লোভ বেড়ে যায়। দেখতে ইচ্ছে করে আরও কত গ্রাম, গঞ্জ, পাহাড় ও প্রান্তর পড়ে আছে এইখানে, রয়েছে নিস্তব্ধ জীবাণুদের বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র, ধুলোর কণার মধ্যে নিহিত রয়েছে পরমাণুর দিক–প্রদক্ষিণ। দ্যাখো আমাদের ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা কত কম। সব আছে চারধারে, দেখা যায় না।

দুঃশীল রত্নাকর বসে আছে গাছতলায়। পথিকের অপেক্ষায়। এ পথে এখন আর কোনও পথিক আসে না। সম্ভবত ঈশ্বর তাদের নিরাপদ ঘুরপথ চিনিয়ে দিয়েছেন। তবু অপেক্ষায় বেলা যায়। জীর্ণ হয়ে আসে ঘরদুয়ার, বয়স বেড়ে যায়, ক্ষুধা বাড়ে। রত্নাকর বসে থাকে গাছতলায় পথিকের অপেক্ষায়। বহুকাল কেটে যায়। অভ্যাসবশত রত্নাকর বসে আছে, পাশে রাখা বশংবদ খাড়া, হঠাৎ দূরে শোনা গেল পথিকের গান, সর্বাংস্তবানুরঞ্জয়ানি…।’ অমনি শরীরে রক্ত ছলকে ওঠে। রত্নাকর খড়গ তুলে নেয় শূন্যে, দৌড়ে যায়। তারপরই ঢলে পড়ে, ভয়ংকর ভারী খড়গ তাকে টেনে রাখে।  ঝাঁপসা চোখে রত্নাকর চেয়ে দেখে অদূরে পথিক। তরুণ, ঐশ্বর্যবান। রত্নাকর কেঁদে ওঠে। পথিক সামনে এসে দাঁড়ায়, ‘কী চাও রত্নাকর?’ রত্নাকর হাতজোড় করে বলে, ‘আমার পরিবার উপোস করে আছে, দয়াময়, দয়া করো। ভগবান তোমার মঙ্গল করবেন।’

মাঝে-মাঝে তাকে ডাক দিই, ‘রত্নাকর, ওহে রত্নাকর।’ বুড়ো ভিখিরিটা জানালার কাছে চলে আসে। আমি তাকে একটা দুটো পয়সা দিই। জিগ্যেস করি, ‘কখনও কি ডাকাত ছিলে?’ সে মাথা নাড়ে। হাসে। চলে যায়।

প্রায়ই তাকে দেখি বসে আছে গাছতলায়। পথিকের অপেক্ষায়। একমাত্র সঙ্গী তার কর্মফল।

কোনও মানে নেই। তবু দেখি ভাঙা, ভেঁড়া, অবান্তর দৃশ্য ভেসে যায়। কিছুতেই মেলানো যায় না।

কখনও দেখি একটা বল গড়িয়ে যাচ্ছে ঘাসের ওপর। খেলুড়ির দেখা নেই। তবু বল গড়িয়ে যাচ্ছে। একা, সাদা, রৌদ্রের ভিতরে।

কখনও দেখি প্রকাণ্ড ভাঙা একটা মসজিদবাড়ি। আগাছায় ভরা, পরিত্যক্ত, দেউলিয়া। তবু পড়ন্ত বেলায় তার উঠোনে কে একজন নীরবে নমাজ পড়ছে।

দেখি আল্লা বুড়ো দরজি। আল্লার বুকের ভিতরে হঠাৎ জেগে উঠছে ধানভানার তোলপাড় শব্দ। ফসলের মতো উঠে আসছে ভালোবাসা। তাই তার ছুঁচের মুখে সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছে বারবার। আল্লা বুড়ো দরজি অন্যমনে চেয়ে আছে। কিছুই মেলানো যায় না। কিছুতেই মেলানো যায় না। তবু চেয়ে দেখি আমার ছেলেবেলায় হারানো বল তার কোলের কাছে পড়ে আছে।

একদিন সুসময়ে তিনি সব ফিরিয়ে দেবেন।

চায়ে চিনি কম হয়েছিল, খুব কম। হয়তো দেওয়াই হয়নি। কদাচিৎ কখনও টের পাই চায়ে চিনি কম কিংবা বেশি। আজ পেলাম। তার মানে আজ আমি স্বাভাবিক আছি। অন্য অনেক দিনের চেয়ে ভালো।

আমি ভালো আছি। তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। তুমি কেমন আছ? মনে হয় তুমি একরকমের ভালো আছ। আমি আর-একরকমের। তবু হয়তো চেনা মানুষেরা একে অন্যকে ডেকে মতীনের দুঃখের কথা বলে, ‘দেখ হে, এতদিনে সুখেই মতীনদের দিন কেটে যাচ্ছিল। সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু তারপর একদিন মতীনের চোখে পড়ে গেল সুন্দর একটি মেয়ে…।’ এইভাবেই মতীনের দুঃখের কথা ছড়িয়ে যাচ্ছে। হয়তো তোমার কানেও যাবে একদিন। চিন্তা কোরো না। আমি ভালো আছি। ভালো থাকা এক-একরকমের।

চায়ে চিনি কম হয়েছিল। কেন? কোথাও কি কোনও গণ্ডগোল হচ্ছে খুব! দূরে কোথাও যুদ্ধ বাধলে আমাদের চায়ে মাঝে-মাঝে চিনি কম হয়ে যায়। মনে হয় কি যেন একটা টানাপোড়েন চলছে চারপাশে। হয়তো এটা এ-বাড়িতে, হয়তো সেটা বাইরের জগতে কোথাও। সংসারে কি খুব অভাব চলছে! কে জানে। বাইরে কোথাও কি হচ্ছে কোনও গণ্ডগোল? কে জানে! আমি শুধু জানি, আজ চায়ে, চিনি কম হয়েছিল।

সকালের দিকে কে একজন ঘরে এসেছিল। আমার মুখের ঢাকা সরিয়ে তাকাল। চোখে চোখ। মনে হল তার চোখে বড় আক্রোশ। হয়তো মারবে। কিন্তু মারল না। আবার আমার মুখ ঢেকে দিল। যখন চলে যাচ্ছে লোকটা, তখন পিছন থেকে দেখে চিনতে পারলাম না। বতু। আমার ভাই ব্রতীন। ঘরে পোড়া সিগারেটের গন্ধ। বতু কি সিগারেট খায়? আগে তো খেত না। কেমন যেন দেখলাম ওর মুখ চোখ! ইচ্ছে হল ডেকে জিগ্যেস করি, ‘তোর কিছু হয়নি তো বতু? ভালো আছিস তো?’ কিন্তু কেমন লজ্জা করল।

একটু পরেই ঘরে এল মা। চিনতে পারলাম। দেখলাম মা মেঝে থেকে আমার সিগারেটের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে; চিঠির একটা কাগজ পড়ার চেষ্টা করল ভ্রূ কুঁচকে। কী যেন বিড়বিড় করল একটু। ইচ্ছে হল জিগ্যেস করি, ‘চোখে আজকাল কেমন দেখছ মা?’

মায়েরা হয়তো কিছু টের পায়। দরজায় দাঁড়িয়ে মা ফিরে তাকাল। যেন তক্ষুনি বলবে, ‘মতু, তুই কি কিছু বলবি?’ লজ্জা করল। চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

জানলার রোদ এসে লেগে আছে। জানালার কাছে এসে দাঁড়াই। খুবই স্বাভাবিক দেখি চারপাশ। রাস্তার তেমাথায় বকুল গাছ, চৌধুরীদের বাগানের ঘেরা পাঁচিলের ইট বেরিয়ে আছে, দেখা যাচ্ছে একটা চৌখুপি জমি–বাড়ি উঠবে বলে ইট সাজানো হয়েছে, পাল্লাখোলা লরি থেকে বালি খালাস করছে কয়েকজন কুলি, ইলেকট্রিকের তারে লটকে আছে পুরোনো  ছেঁড়া সাদা একটা ঘুড়ি। চিন্তিত মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। উঁচুতে নীল ছাদের মতো আকাশ, কয়েকটা কাক চিল উড়ছে।

খুবই স্বাভাবিক আছে চারপাশ। তবে কেমন চায়ে চিনি কম হয়েছিল। দূরে কিংবা কাছে কোথাও কি যুদ্ধ হচ্ছে খুব? সংসারে কি খুব অভাব চলছে? অতি তুচ্ছ ঘটনা। চায়ে চিনি কম। মাঝে-মাঝেই তো এরকম ঘটে। ভুল হতে পারে। তবু দ্যাখো, সারাদিন বিস্বাদ চায়ের স্বাদ মুখে লেগে আছে।

মাঝে-মাঝে মনে হয় আমি থেমে আছি। বড় বেশি থেমে। মৃত্যু এরকমই হয়। নিস্তব্ধতার মতো। অথচ দ্যাখো সারাদিন আমার চারদিকে চলছে কাজ। পরিশ্রমী পিঁপড়েদের, ধৈর্যশীল মাকড়সার, উইপোকার। সারা পৃথিবীময় জঘন্য জীবাণুরাও ঘুরছে কাজের সন্ধানে, কিংবা আশ্রয়ের। আমিই থেমে আছি কেবল। ইচ্ছে করে জাল ফেলে বসে থাকি, গর্ত খুঁড়ি, কিংবা চাষ। করে ফসল নিয়ে আসি ঘরে। এরকম ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ যেন আমার ভিত নড়ে যায়। যেন ঘুম থেকে জেগে উঠি। প্রশ্ন করি, ‘আমি এরকম হয়ে আছি কেন? কেন আর সব জীবন্ত প্রাণীর মতো আমারও নেই সুখ দুঃখ? আমি কি মরে গেছি? কিংবা, আমার জন্মই হয়নি? আমি কি সব পাওয়া পেয়ে গেছি? কিংবা কিছুই পাইনি।’ আস্তে-আস্তে কারণমুখী হতে চেষ্টা করি। অমনি জীবন বড় জটিল বলে বোধ হয়। আমি সারা ঘরময় বেড়াই, দেওয়ালে হাত চেপে ধরি, ঢকঢক করে মাথা ঠুকি। বেরিয়ে পড়ব বলে দরজার কাছে চলে যাই। তখনই মনে পড়ে–আমি অস্ত্রহীন। যথেষ্ট পোশাক নেই গায়ে। অবহেলা সহ্য করার মতো যথেষ্ট শক্তি নেই। যাওয়া হয় না। ফিরে আসি ঘরের ভিতরে। স্বপ্নের ভিতরে।

পাশের ঘরে কারা কথা বলছে! বিকেলে ঘুম থেকে উঠে শুনি খুব গণ্ডগোল। চিৎকার। আস্তে আস্তে উঠি, ঘরের মধ্যে বেড়াই। চিৎকার খুব বেড়ে যায়। বিরক্তি বোধ হয়। মাঝখানের দরজা বন্ধ। সেই বন্ধ দরজায় টোকা দিয়ে বলি–’চুপ করো।’ কেউ চুপ করে না। মাঝে মাঝেই ওই ঘরে কারা যেন আসে। গোপনে কথা বলে। হয়তো পরস্পরকে ভালোবাসার কথা। কিন্তু আজ বড় গণ্ডগোল। আমি আবার চিষ্কার করে বলি–”চুপ করো।’ কেউ চুপ করে না; হতাশ লাগে বড়। শুনতে পাই মোটা ভাঙা বিশ্রী গলায় কে যেন চিৎকার করে বলছে–’আমারও পাগল ভাই, বিধবা মা আছে, আমি স্বার্থত্যাগ করছি না?’ কথাটা শুনে লোকটার জন্য আমার সামান্য দুঃখ হয়। আহা রে, লোকটা! পাগল ভাই আর বিধবা মা নিয়ে দুঃখে আছে বড়। ইচ্ছে করে ওকে এই ঘরে ডেকে আনি, একটি দুটি সান্ত্বনার কথা বলি। বলা হয় না। ওরা ভয়ংকরভাবে চিৎকার করে ওঠে। ইমপস্টার। সোয়াইন। তোমার জন্যই আমরা ডুবে যাচ্ছি।…বাঁচার জন্য…সংগ্রামের জন্য…। তুমি আমাদের খুন করছ, খুন……স্বার্থত্যাগ করতে শেখো…।

আমি ঘরের মাঝখানে যাই, কোণে চলে যাই, কিন্তু গণ্ডগোল সমানভাবে কানে আসতে থাকে। জানালার কাছে যাই, বাইরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকি। চেয়ারে বসে সিগারেট ধরিয়ে নিই। গণ্ডগোল, বড় বেশি গণ্ডগোল। হঠাৎ মনে পড়ে সকালে চায়ে চিনি কম হয়েছিল। বিকেলে চা দেওয়াই হয়নি। ইচ্ছে করে পাশের ঘরে গিয়ে ওদের ধমক দিয়ে বলি–’আমি জানতে চাই আমাকে কেন চা দেওয়া হয়নি? কেন আমার চায়ে চিনি কম হবে?’

বোধ হয় অনেক দিন বৃষ্টি হয়নি। আখের চারা গাছগুলি অসময়ে মরে গেছে। আমাদের দেশে তাই চিনি তৈরি হল না এবার। আমি মনে-মনে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে থাকি। বিস্বাদ চায়ের স্বাদ মুখে লেগে থাকে।

টের পাই মাথার চুলের ভিতরে বিলি কেটে দিচ্ছে একখানা হাত। বুঝি, মা। ইচ্ছে হল জিগ্যেস করি, ‘আমার চায়ে চিনি দাওনি কেন মা? কোথাও যুদ্ধ বেধেছে খুব? চিনি আজকাল পাওয়া যায় না!’ কিন্তু সে প্রশ্ন করা হয় না। টের পাই পাশের ঘর থেকে দুড় দাঁড় লোক বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে। গালাগালি শুনতে পাচ্ছি। দাঁত ঘষার শব্দ। কোনও উত্তেজনা বোধ করি না। কেবল মাকে বলতে ইচ্ছে করে, “চিন্তা কোরো না মা। দূরের যুদ্ধ থেকে গেলে আবার সব ঠিকমতো পাওয়া যাবে। আগের মতোই।’ কিন্তু সে কথাও বলা হয় না। শুনি মা বিড়বিড় করে বলছে, ‘তুই কেন এমন হয়ে রইলি মতু! তুই থাকলে সব ঠিক হয়ে যেত।’ অমনি আমি ভয়ে। জড়সড়ো হয়ে যাই। চারপাশেই বড় গণ্ডগোল চলেছে। দুঃসময়। তাই বসে থাকি। অন্ধকারে চুপ করে বসে থাকি। চাল–ধোয়া হাতের গন্ধ পাই। অন্ধকারে ঘরে বসে টের পাই চারদিকে যোজন জুড়ে অনাবৃষ্টির নিস্ফলা মাঠ পড়ে আছে। আখের চারাগুলি মরে গেল। দুঃসময়।

ভয় করে। চায়ে চিনি কম। পাশের ঘরে গণ্ডগোল। কোথাও যাওয়ার নেই। যেতে ইচ্ছে করে অথচ যথেষ্ট পোশাক নেই গায়ে। অবহেলা সহ্য করার মতো শক্তি নেই। অস্ত্রহীন যাওয়া যায় না তাই বসে থাকি। অন্ধকারে চুপ করে বসে থাকি।

পাশের ঘরে গণ্ডগোল থেমে গেল। লোক বেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই। নিস্তব্ধতা। শুনতে পাই মা কাঁদছে। অস্থির লাগে বড়। আমার মাথার ওপর একখানা হাত কাঁপে। বড় শান্ত ও সুন্দর বিশ্রামের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে শহর মিঠিপুর, জেলেদের গ্রাম, কিংবা সেই আশ্চর্য খনিগুলির বসতি। শান্ত ও সুন্দর বিশ্রামের রাত্রি আমার চারপাশে। তার মধ্যে মার কান্নার শব্দ হয়। খুব শব্দ হয়। বলে, ‘বতুকে ওরা কোথায় নিয়ে গেল? কি করবে ওকে? বতু কেন গেল?’ আমি চুপ করে। থাকি। নিস্তব্ধতার মধ্যে মা কাঁদতে থাকে। বুঝতে পারি না। দূরে বোধ হয় খুব যুদ্ধ চলছে। আর অনাবৃষ্টি। দুঃসময়। অস্থির লাগে। সিগারেট ফেলে দিয়ে আবার ধরাই। কিছুই মেলাতে পারি না। শুধু দেখি হিংসাশূন্য স্থবির ও অক্ষম রত্নাকর বসে আছে গাছতলায়, পথিকের অপেক্ষায়। আবার দেখি পশ্চিমের প্রকাণ্ড খোলা বারান্দায় একটি শিশু একা-একা হাঁটতে শিখছে। বতু না? হ্যাঁ, বতুই। আমার ছেলেবেলায় হারানো বল কোলে করে বসে আছে আল্লা বুড়ো দরজি, দেখতে পাই দুপুরের ঘুমে শুয়ে আছে মা, এলো চুলের ওপর প্রকাণ্ড খোলা মহাভারত উপুড় করে রাখা। শুনতে পাই কাছেই কোথাও যেন দিন রাত চলছে এক মাটি-মজুরের গর্ত খোঁড়ার কাজ। দেখি কুয়াশার মধ্যে তুমি দূরে চলে যাচ্ছ। মনে পড়ে চায়ে চিনি কম হয়েছিল। দূরে কোথাও খুব যুদ্ধ চলছে। আর অনাবৃষ্টি। কিছুই মেলাতে পারি না। বতুর নাম ধরে কাঁদছে মা। ইচ্ছে করে বলি –’ঈশ্বর প্রতিটি রাস্তাকেই নিরাপদ রাখছেন। কোনও ভয় নেই।’ পরমুহূর্তেই বোধ করি, এই কথার পিছনে আমার বিশ্বাস বড় কম। মা কাঁদে। মেলাতে পারি না। কিছুতেই মেলাতে পারি না।

চোখে জল চলে আসে। আমি আস্তে-আস্তে তোমার জন্য কাঁদতে থাকি।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor