টাকা চুরির খেলা – লীলা মজুমদার

টাকা চুরির খেলা - লীলা মজুমদার

প্রথম যখন গণশার সঙ্গে আলাপ হল সে তখন সদ্য সদ্য নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস থেকে নেমেছে। চেহারাটা বেশ একটু ক্যাবলা প্যাটার্নের, হলদে বুট পরেছে–তার ফিতেয় আবার দু-জায়গায় গিট দেওয়া; খাকি হাফ প্যান্ট, আর গলাবন্ধ কালো কোট– তার একটাও বোম নেই, গোটা তিনেক বড়ো বড়ো মরচে-ধরা সেফটিপিন আঁটা। তার উপর মাথায় দিয়েছে সামনে বারান্ডওয়ালা হলদে কালো ডোরাকাটা টুপি। দেখে হেসে আর বাঁচিনে।

ছোটোকাকা সঙ্গে ছিল, গণশার দাদাকে ডেকে বলল, ওহে হরিচরণ, এটি আমার ভাইপো। তোমার ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে মিলবে ভালো। তাই শুনে গণশা রেগে কাই, অত ছোটো ভাই ছোটো ভাই করবেন না মশাই। আর ওই কুচো চিংড়িটার সঙ্গে মিলব ভালো, শুনলেও হাসি পায়।

ছোটোকাকার মুখের রংটা কীরকম পাটকিলে মতন হয়ে গেল। সেঁক গিলে বললেন বটে! সে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ! অথচ শেষ অবধি ওই গণশাকেই আমি বিষম ভক্তি করলুম।

সে এক মস্ত উপাখ্যান।

ছুটির দিন দুপুর বেলায় নিরিবিলি ছাদের ঘরের মেঝেতে বেশ আরাম করে উপুড় হয়ে শুয়ে, পা দুটোকে উঁচুবাগে তুলে একটা চেয়ারের পায়াতে লটকে, দিব্যি করে নিজের মনে দাদার টিকিটের অ্যালবামে নতুন নতুন পাঁচ পয়সার টিকিট সারি সারি মারছি, কারু কোনো অসুবিধা করছি না, কিছু না, এমন সময়ে ওরে গবা, গবা রে! বলে বাপরে সে কী চিল্লানো! আর এরা আমায় কিনা বলে যে গোলমাল করি! সেই বিকট গোলযোগ শুনে তাড়াতাড়ি টিকিট অ্যালবামটা লুকিয়ে ফেলে নীচে যেতে যাব, ভুলেই গেছি যে পা দুটো চেয়ারে লটকানো, তাড়াতাড়ি না টেনে নামাতে গিয়ে চেয়ার উলটে গেল, তার উপর দিদিটা হাঁদার মতন দুটো কাঁচের ফুলদানি রেখেছিল, সে তো গেল ভেঙে; সবচেয়ে খারাপ হল, আমার আধ-খাওয়া পেয়ারাটা ছিটকে গিয়ে ঘরের কোণে পিসিমার গঙ্গাজলের হাঁড়ির মধ্যে পড়ে গেল।

এই সমস্ত ঘটনাতে আমার যে একেবারে কোনো দোষ ছিল না একথা যে শুনবে সেই বলবে। অথচ এই একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে দাদা, দিদি, পিসিমা এমন হইচই লাগাল, যেন তাদের ঘরে চোর সিঁদ কেটেছে! বাবা পর্যন্ত আমার দিকটা বুঝলেন না, বললেন–দোষ করে আবার কথা!

এরপর যখন ছোটোকাকা গোলমাল শুনে দাড়ি কামাতে কামাতে এসে একটু কাষ্ঠহাসি হেসে বলল– অনেক দিন থেকেই বলছি ও ঝুরিভাজা ছেলেকে বিদেয় কর। তা তো কেউ শুনলে না। এখন জেলখানাতেও ওকে নিতে রাজি হবেনা। সময় থাকতে নারানবাবুর ইস্কুলে দিয়ে দাও, নইলে নাকের জলে চোখের জলে এক হবে। মনে মনে বুঝলাম, ছোটোকাকার নতুন সাদা জুতোয় সেই যে কলম ঝাড়বার সময়ে সামান্য তিন-চার ফোঁটা কালি পড়েছিল, ছোটোকাকা এখনো সেকথা ভোলেনি।দিকগে বোর্ডিঙে, এদের চেয়ে খারাপ বোর্ডিঙে কেন নরকেও কেউ হতে পারে না। তাই রেগে, চেঁচিয়ে, হাত-পা ছুঁড়ে বলতে লাগলাম–তাই দাওনা, তাই দাওনা, তাই দাওনা। এদিকে নিজে যখন বায়োস্কোপ দেখে দেরি করে ফিরে বাবার কাছে তাড়া খাও, তখন

বাবা বললেন– চোপ!

এরই ফলে ছুটির পর যখন ইস্কুল খুলল, আমি গেলুম নারানবাবুদের বোর্ডিঙে। বেশ জায়গা, বাড়ি থেকে ঢের ভালো। প্রথমটা সকাল বেলা হালুয়া খেতে বিশ্রী লাগত। তারপর দেখলাম ওতে খুব ভালো ঘুড়ি জুড়বার আঠা হয়। এ ছাড়া বোর্ডিঙের আর সব ভালো। গণশাও দেখলাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, তবে সে আমাদের ঘরে থাকে না।

প্রথম দিন শুতে গিয়ে দেখি আমাদের ঘরে ছ-জন ছেলে, পাঁচজন ছোটো আর একজন বড়ো। আমাদের ঘরের বড়ো ছেলেটি ঠিক বড়ো নয়, বরং মাঝারি সাইজের বললে চলে। কিন্তু তার তেজ কী! তার নাম পানুদা, তার কাজ নাকি আমাদের সামলানো, আর তাই করে করে নাকি তার ঠান্ডা মেজাজ খ্যাকখ্যাক করার ফলে দিন দিন বিগড়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানলুম পানুদা সেকেন্ড ক্লাসে পড়ে। নিয়ম করে ক্লাসের লাস্ট বয়ের ঠিক উপরে হয়। কিন্তু তার মন খুব ভালো, লাস্ট বয়কে খুব সাহায্য করে। আমাদের ঘরের নীলু বলল, সেই সাহায্যের ফলেই নাকি লাস্ট বয় বেচারা চিরটা কাল লাস্টই হচ্ছে!

যাই হোক, আমি এ-সমস্ত কথা বিশ্বাস করিনি, কারণ আমাদের ঘরে দেখতাম তার খুব বুদ্ধি খোলে। নিজে লুকিয়ে ডিটেকটিভ বই পড়তে আর আমরা কোনো অন্যায় করলে ধরে ফেলতে তার মতন ওস্তাদ আর দুটি হয় না। এই পানুদাই যেদিন বিপদে পড়ল, আমরা তো সবাই থ! সে এক অদ্ভুত আশ্চর্য ব্যাপার!

পানুদা আর তার গুটি পাঁচেক ক্লাসের বন্ধু প্রায়ই ভোজ মারে। সবাই মিলে টাকা জমিয়ে পানুদার কাছে দেয় আর এক শনিবার বাদে এক শনিবার চপ, কাটলেট, ডিমের ডেভিল– আরও কত কী-র ব্যবস্থা হয়! আমায় একবার একটা ঠোঙা ফেলতে দিয়েছিল, আমি সেটা একটু শুকে আর একবার চেটে সারারাত কী পেলুম না, কী পেলুম না করে আর ঘুমুতে পারিনি।

পানুদার কাছে তো পিঁপড়েটি আদায় করা দায়, তাই আমরা ছোটো ছেলেরা নিজেরা একবার পয়সা জমাতে চেষ্টা করেছিলাম। সে আর এক কেলেঙ্কারি! জগা আজ চার আনা দিল, আবার কাল বলে, দে বলছি আমার চার আনা, আমি পেনসিল কিনব। যত বলি পেনসিল কিনবি কীরে, ও দিয়ে যে আমরা চপ কাটলেট খাব রে! জগা বলে, ইয়ার্কি করবার আর জায়গা পাসনি! দে বলছি, নইলে এইসা এক রদ্দা কষিয়ে দেব! পারলে বোধ হয় চার আনার জায়গায় ছ-আনা নেয়। এমনি করে আমাদের সাড়ে তিন আনার বেশি জমলই না। তাও জমত না, নেহাত মন্টুর জ্বর-টর হয়ে বাড়ি চলে গেল, আর পয়সাগুলো চেয়ে নিতে ভুলে গেল।

যাই হোক, পানুদারা এদিকে সাড়ে তিন টাকা জমিয়েছিল। রাত্রে শুনলাম পাশের খাট থেকে পানুদা বলছে– আট আনার বরফি, আট আনার চিংড়ি মাছের কাটলেট, চার আনার ছাঁচি পান শুনে শুনে আমার গা জ্বলতে লাগল। জিভের জল গিলে গিলে পেটটা ঢাক হয়ে উঠল।

পরদিনই কিন্তু পানুদা বিষম বিপদে পড়ল। লাইব্রেরিতে পানুদা আর সমীরদা আর কে যেন একটা ছেলে পেল্লায় আড্ডা দিচ্ছে, পানুদা চাল মেরে কী-একটা কুস্তির প্যাঁচ দেখাতে গেছে আর স্লিপ করে কাঁচের আলমারির দরজা-টরজা ভেঙে চুরমার! পানুদা উঠে দাঁড়িয়ে কী-একটা বলতে যাচ্ছে, এমন সময়ে হেডমাস্টারমশাই এসে এমনি বকুনি লাগালেন যে পানুদা চমকে গিয়ে নিজের আলজিভ-টিভ গিলে বিষম-টিষম খেয়ে যায় আর কী! হেডমাস্টারমশাই এমনি রেগে গিয়েছিলেন যে এসব কিছু না দেখে বললেন– বাঁদুরে ব্যাবসা ছেড়ে এখন মানুষের মতন ব্যবহার শেখো। তোমাকে বেশি জরিমানা কোত্থেকে আর করি, কিন্তু তোমার বাক্সে যা টাকাকড়ি আছে সমস্ত দিয়ে যতগুলি কাঁচ হয় কিনে দেবে, তা দিয়েও যে অর্ধেকের বেশি হবে তা তো মনে হয় না।

সেদিন পানুদার মেজাজ দেখে কে! রাত্রে আমরা ঘরে বসে শুনলাম সিঁড়ি দিয়ে পানুদার চটির শব্দ–অন্যান্য দিনের মতন চটচট চটাং চটচট চটাং না হয়ে একেবারে চটাং চটাং চটাং! বুঝলাম পানুদা রেগেছে।

যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে দেখলাম আসলে আরও ঢের বেশি রেগেছে। ঘরে ঢুকেই পানুদা আমার আর কেষ্টর মাথা একসঙ্গে ঠুকে দিয়ে বললে অত হাসি হাসি মুখ কেন রে বেয়াড়া ছোঁড়ারা? আমরা তক্ষুনি গম্ভীর হয়ে গেলাম। তারপর পানুদা জগার দিকে চেয়ে বলল, ফের ফোঁস ফোঁস করছিস রাস্কেল? বলে তার কানে দিল এক প্যাঁচ। হিরু বলল, ওর সর্দি হয়েছে কিনা–পানুদা তার গালে এক চড় কষিয়ে দিয়ে বলল-চুপ কর বেয়াদপ, তোর কে মতামত চেয়েছে?তারপর সময় কাটাবার জন্য শিবুর কানের কাছে খোঁচাখোঁচা চুলগুলো নখ দিয়ে কুটকুট করে টানতে টানতে দাঁতে দাঁত ঘষে বললে– আজ তোদের কাছ থেকে যদি টু শব্দটি শুনি, সব ক-টাকে কচুকাটা করে ফেলব বলে রাখলাম।

ঘরের মধ্যে একদম চুপ। পানুদা খাটে বসে পা দোলাতে লাগল আর বোধ হয় হেডমাস্টারমশাইয়ের কথা ভাবতে লাগল। এমন সময়ে সেই গণশাটা এসে হাজির। এসেই পানুদার পিঠ থাবড়ে একগাল হেসে বললে– কী রে পেনো, ফিস্টিটা ভেস্তে গেছে বলে বুঝি মুখোনা হাঁড়ি আর কচি ছেলের উপর উৎপাত? রোজ বলি:ওরে পেনো, একা একা অত খাসনি!

পানুদা গুম হয়ে রইল।

গণশা বলল– তাই বলে কি টাকাগুলো সত্যি দিবি না কি?

পানুদা বলল, দেব না তো কি তুমি আমার হয়ে দিয়ে দেবে?

গণশা হেসে বললে, আরে রামঃ! এমন এক উপায় বাতলাতে এলুম, তোকেও দিতে হবে না, আমাকেও দিতে হবে না। আজ রাত্রে দরজা খুলে শুবি, দেখবি একটা ডাকাত এসে সব টাকা নিয়ে যাবে। পরে হয়তো ফিরে পাবি, কিন্তু ডাকাতটাকে খাওয়াতে হবে বলে রাখলুম।

পানুদা হাঁ করে খানিক তাকিয়ে বলল–সে দেখা যাবে এখন। এ সময়ে তুমি এঘরে যে বড়ো এসেছ, জানো না রুল থ্রি?

গণশা বললে– সাধে শাস্ত্রে বলে কদাচ কাহারও উপকার করিয়ো না।

মুখে পানুদা যতই তেজ দেখাক না কেন, শোবার সময়ে দেখলুম দরজাটা ঠিক খুলে শুল। অন্য দিন তো পারলে জানলাও বন্ধ করে, আমাকে দিয়ে খাটের নীচে খোঁজায়, রাত্রে উঠবার দরকার হলে জগাকে আগে একবার পাঠায়, আর সেদিন দেখি বেজায় সাহস! বালিশে মুখ গুঁজে একটু হেসে নিলাম।

উৎসাহের চোটে আমার অনেকক্ষণ ঘুম হয়নি, অনেক রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখি কে যেন টর্চের আলো ফেলেছে। পানুদা ভোঁসভাঁস করে ঘুমোচ্ছে আর বাকিরা কেউ যদি জেগেও থাকে। ভয়ের চোটে চোখ বুজে পড়ে আছে। আমি দেখলুম কে একটা লোক পা টিপে টিপে এসে পানুদার বালিশের তলা থেকে চাবি বের করল, পানুদার বাক্স খুলল, কী যেন নিল, আবার বাক্স বন্ধ করে চাবি বালিশের নীচে রেখে আস্তে আস্তে চলে গেল। পরদিন সকালে ইস্কুলময় হইচই, পানুদার টাকা চুরি গেছে। হেডমাস্টারমশাই সবাইকে ডেকে যাচ্ছে-তাই করে বলেন, সকলের বাক্স খোঁজা হল। কোথাও কিছু নেই। গণশার বাক্সে তো এত কম জিনিস, এবং তাও এত নোংরা যে তাই নিয়ে গণশা। বেজায় বকুনি খেল।

সেদিন রাত্রে পানুদার হাসি হাসি মুখ।

আজ কাউকে কিছু তো বললই না, এমনকী যে-পানুদা শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেলে আমাদের শার্ট থেকে বোতাম ফেটে নিজের শার্টে লাগিয়ে নিত সে নিজের থেকেই জগাকে দুটো আস্ত খড়ি দিয়ে ফেলল!

এমন সময়ে গণশা আবার ঘরে ঢুকল।

কী রে পেনো! শেষটা সত্যি ডাকাত পোলো তোদের ঘরে?

পানুদা খুব হেসে বলল– দিস ভাই, তোরও নেমন্তন্ন রইল। গণশা যেন আকাশ থেকে পড়ল– কী দেব রে পেনো! বলছিস কী?

কেন, টাকা!

কীসের টাকা? টাকা আবার কোথায় পাব রে? দানছত্তর খুলেছি না কি? আর তা যদি খুলিও, তোকে টাকা দেব কেন রে এত যোগ্য লোক থাকতে?

পানুদা ভয়ংকর চটে বললে– দেখ গণশা, ইয়ার্কি ভালো লাগে না। দে বলছি!

গণশা বললে– ইয়ার্কি কি আমারই ভালো লাগে নাকি রে?

তারপর গুনগুন করে গাইতে লাগল–

নিশুত রাতে চোরের সাথে টাকা চুরির খেলা,
         ওই চোর বেটা নিলে সেটা পেনো বুঝল ঠেলা!

সেই অবধি গণশাকে আমি ভক্তি করি।

Facebook Comment

You May Also Like