Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথানবনী - হুমায়ূন আহমেদ

নবনী – হুমায়ূন আহমেদ

০১. আজ আমার বিয়ে

দুপুরে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা এসে গায়ে হাত দিয়ে ঘুম ভাঙালেন। ব্যাকুল গলায় ডাকলেন, নবনী! নবনী!! আমি চোখ মেলতেই তিনি আমার মুখের কাছে মুখ এনে কাতর গলায় বললেন, ওঠ মা। ওঠ!

আমি হকচকিয়ে উঠে বসলাম। মা এভাবে আমাকে ডাকছেন কেন? কিছু কি হয়েছে? বাবা ভাল আছে তো? খাট থেকে নামতে গেছি, মা হাত ধরে আমাকে নামালেন। যেন আমি বাচ্চা একটা মেয়ে। একা একা খাট থেকে নামতে পারি না। আমি বললাম, কি হয়েছে মা?

মা জবাব দিলেন না, অস্পষ্টভাবে হাসলেন। বারান্দায় এসে দেখি, বাবা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর গায়ে ইন্ত্রি করা পাঞ্জাবি। চুল আঁচড়ানো। আজ দুপুরেও গাল ভর্তি খোচা খোচা কাঁচা-পাকা দাড়ি ছিল। এখন নেই, গাল মসৃণ, শান্ত পরিচ্ছন্ন একজন মানুষ! খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার। মাস দুই হল তিনি শয্যাশায়ী। ডান পা অবশ হয়ে আছে। দেয়াল ধরে হাঁটাহাঁটি করেন। তবে বেশির ভাগ সময় খবরের কাগজ হাতে নিয়ে শুয়ে থাকেন নিজের ঘরে। কাগজ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কঠিন এবং তিক্ত গলায় এ বাড়ির সবার সঙ্গে ঝগড়া করেন। যেন তাঁর এই অসুখের জন্যে আমরাই দায়ী। আজ কি হাসি-খুশি লাগছে বাবাকে। আমার দিকে চোখ পড়তেই তিনি বললেন, দুপুরে ঘুম তো খুব খারাপ অভ্যাস রে মা। ব্যাড হেভিট। হাত-মুখ ধুয়ে আয় আমার কাছে।

আমি হাত-মুখ ধুতে রওনা হলাম। বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে। বড় ধরনের কিছু। পুরো বাড়িটা বদলে গেছে। নিশ্চয়ই আনন্দময় কোন ঘটনা ঘটে গেছে। বাবার সুখী সুখী গলা আবার শুনলাম, ওগো, আমাকে আর নবনীকে চা দাও। বাপ-বেটিতে একসঙ্গে চা খাই। এত সুন্দর করে বাবা অনেক দিন কথা বলেন নি।

বাবা আজ আমার সঙ্গে চা খেতে চাচ্ছে কেন? আমার শরীর ঝিম ঝিম করছে।

আমি চাপা উত্তেজনা নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম।

আমাদের বাথরুম সব সময় অন্ধকার। দুপুরবেলায়ও বাতি না জ্বালালে আয়নায় মুখ দেখা যায় না। আশ্চর্য! আমি সুইচটা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার বুক ধ্বক ধ্বক করছে। তীব্ৰ এক অজানা ভয়ে মন অভিভূত হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলাবার জন্যে আমি দরজায় হাত রাখলাম, আর তখন ইরা বাথরুমে ঢুকে বাতি জ্বালাল। ইরার হাতে সাবান, তোয়ালে। সাবানটা নতুন, এখনো মোড়ক খোলা হয় নি।

আমি বললাম, কি হয়েছে। ইরা?

ইরা হাসতে হাসতে বলল, তোমার এত বুদ্ধি, তুমি এখনো বুঝতে পারছি না?

না। বুঝতে পারছি না।

অনুমান করতে পারছি?

ইরা ঝলমলে গলায় বলল, আজ তোমার বিয়ে। রাত দশটার ট্রেনে বর আসবে। রাতেই বিয়ে হবে। কোন উৎসব-টুৎসব কিছু হবে না। তোমাকে নিয়ে তারা ঢাকা চলে যাবে সকালের ট্রেনে।

আমি একদৃষ্টিতে ইরাকে দেখছি। সে আজ তার সেই প্রিয় শাড়িটা পরেছে। সাদা রঙের শিফন শাড়ি। মা তাকে কখনো এই শাড়ি পরতে দেন না। এই শাড়িতে তাকে না-কি বিধবার মত লাগে। কিন্তু আমি আর ইরা শুধু জানি এই শাড়িতে তাকে কত সুন্দর লাগে। ও বোধহয় ক্রমাগতাই কাঁদছে। ওর মুখ শুকনো। চোখ ভেজা। সে হাসতে হাসতে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।

ইরা বলল, সবাই খুব খুশি। সবচে খুশি বাবা। আপা, তুমি মুখটা নিচু কর, আমি সাবান দিয়ে তোমার মুখ ধুইয়ে দেই।

তোর মুখ ধুইয়ে দিতে হবে না। তুই যা।

ইরা বলল, আপা শোন— বাবা যে সবচে খুশি তা না। সবচে খুশি হয়েছি আমি। খবরটা শোনার পর থেকে আমি আনন্দে শুধু কাঁদছি।

তুই এখন যা। আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।

ইরা পুরোপুরি চলে গেল না। বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। আমি তোকালাম আয়নার দিকে। আয়নায় কি সুন্দর দেখাচ্ছে আমাকে! শান্ত সরল চেহারার একটা মেয়ের মুখ। আয়নার মুখ কখনো হাত দিয়ে ছোয়া যায় না। আমার প্রায়ই আয়নার মুখটাকে ছুঁতে ইচ্ছা করে। আজও করছে। আমি হাত দিয়ে সেই মুখ ছুঁতে গিয়ে আয়নায় সাবানের ফেনা লাগিয়ে ফেললাম।

আজ আমার বিয়ে।

আমার কেমন লাগছে?

এখনো বুঝতে পারছি না। আমার সমস্ত বোধ অসাড় হয়ে আছে। তবে এক ধরনের শান্তি বোধ করেছি। আমার একটা সমস্যা ছিল, ভয়াবহ ধরনের সমস্যা আজ হয়তো তা মিটে যাবে–এই শান্তি। বাথরুম থেকে বের হয়ে আমি সবার খুশি মুখ দেখব। এ-ও তো কম না।

আমার বিয়ে নিয়ে সবাই খুব সমস্যার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। সবাই ধরেই নিয়েছিল, আমার কোনদিন বিয়ে হবে না। এমন কোন দোয়া নেই। যা মা আমার জন্যে পড়েন নি। আজমীর শরীফ থেকে আনা লাল সুতা এখনো আমার গলায় ঝুলছে। বিয়ে হয়ে যাবার পর এই সুতা খুলে ফেলতে হয়। যদি সত্যি সত্যি বিয়ে হয় তাহলে নিশ্চয় বাসর ঘরে ঢোকার আগে ইরা এসে কাঁচি দিয়ে সুতা কাটবে। সুতা কাটতে গিয়ে হয়ত সে কিছুক্ষণ কাঁদবে। ইরা খুব কাঁদতে পারে।

সত্যি কি আজ বিয়ে হবে? কেন জানি এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। স্বপ্ন দেখছি না তো? গল্পের বই পড়তে পড়তে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয়ত ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখছি। বিয়ের স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি। স্বপ্নের মধ্যেই একটা ঝামেলা হয়ে বিয়ে ভেঙে যায়। আমি দেখি একটা সুন্দর ছেলে আমার পাশে বসা। এক সময় সে উঠে চলে যায়। আমি চোখ ভর্তি জল নিয়ে জেগে উঠে খুব লজ্জিত হই। বাস্তব কখনো স্বপ্নের মত নয়। বাস্তব অন্যরকম। বাস্তবে অনেক কথাবাতাঁর পর বিয়ে ঠিক হয়। আলাপ আলোচনা একটা পৰ্যায় পর্যন্ত যায়, তারপর তারা সুন্দর একটি চিঠি রেজিস্ট্রি করে পাঠায়–

গভীর দুঃখ ও বেদনার সাহিত্য আপনাকে জানাইতেছি যে, আমার মধ্যম পুত্ৰ হঠাৎ বলিতেছে সে এক্ষণ বিবাহ করবে না। আমি এবং তাহার মাতা তাহাকে বুঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া বিফল মনোরথ হইয়াছি। তাহার সহিত আমাদের কিঞ্চিৎ মনোমালিন্যও হইয়াছে। যাহা হউক, আপাতত বিবাহ অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা ভিন্ন কোন পথ দেখিতেছি না। পুত্র রাজি হইলে ইনশাআল্লাহ আবার ব্যবস্থা হইবে। তবে আপনারা অপেক্ষা করিয়া থাকিবেন। না। যদি কোন ভাল পাত্রের সন্ধান পান–কন্যার বিবাহ দিবেন। আমাদের দোয়া থাকিবে ইহা জানিবেন। শ্রেণীমত সকলকে সালাম ও দোয়া দিবেন।

এইসব চিঠি সব সময় সাধু ভাষায় লেখা হয়। হাতের লেখা হয় প্যাঁচানো। চিঠির উপর আরবিতে লেখা থাকে। ইয়া রব। প্রতিটি চিঠির ভাষা ও বক্তব্য এক ধরনের হয়। কেউ সাহস করে কথাটা লেখে না। কেউ লেখে না-আপনার মেয়ে খুব সুন্দর। আমাদের পছন্দ হয়েছে কিন্তু তার সম্পর্কে যে এত ভয়াবহ একটি গুজব আছে তা জানতাম না। জানার পর বিয়ে নিয়ে এগুতে আমাদের সাহস হচ্ছে না। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।

ইরা বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, আপা, এত দেরি করছ, কেন? হাতমুখ ধুতে এতক্ষণ লাগে?

আমি জবাব দিলাম না। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে নিজেকে দেখছি। আয়নার মানুষটার ভেতর মনে হয় প্রাণপ্ৰতিষ্ঠা হয়েছে। সে আমাকে অনেক কথা বলতে চাচ্ছে। এমন সব কথা যা আমি এই মুহূর্তে শুনতে চাই না।

আপা, তোমার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

আমি বের হয়ে এলাম। বাবা বললেন, নবু মাকে বসার কিছু দাও না। ইরা ঘরের ভেতর থেকে মোড়া এনে দিল। বাবার সামনের ছোট্ট সাইড টেবিল দুকাপ চা। একটা প্লেটে কয়েকটা পাপড় ভাজা। বাবা নিজেই একটা কাপ আমার হাতে তুলে দিলেন। আমার লজ্জা-লজা লাগছে।

বাবা চায়ে চুমুক দিয়ে খুশি-খুশি গলায় বললেন, চা ভাল হয়েছে। ভেরী গুড। কি রে নবু, চা ভাল হয় নি?

আমি হাসলাম। রান্নাঘর থেকে মা গলা বের করে বললেন, তোমরা ধীরে সুস্থে চা খাও— কুমড়া ফুলের বড়া ভাজছি।

কুমড়া ফুলের বড়া আমার জন্যে ভাজা হচ্ছে। আমাদের বাড়ির পেছনে কয়েকটা কুমড়ো গাছ ফুলে ফুলে ভর্তি হয়ে গেছে। আমি কবে যেন কথায় কথায় বলেছিলাম— কুমড়ো ফুলের বড়া করতো মা। মা বিরক্ত গলায় বলেছিলেন, সব ফুল খেয়ে ফেললে কুমড়ো আকাশ থেকে পড়বে?

ইরা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মা ইরার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, ইরা, তুই এখানে ঘুরঘুর করছিস কেন? তোকে কি করতে বলেছি?

অর্থাৎ মা ইরাকে সরিয়ে দিলেন। বাবাকে সুযোগ করে দিলেন–যেন তিনি আমার সঙ্গে একা কথা বলতে পারেন। বুঝতে পারছি বাবা ছোটখাট একটা বক্তৃতা দেবেন। এরকম বক্তৃতা তিনি আগেও কয়েকবার দিয়েছেন। এসব ঘরোয়া বক্তৃতার শুরুটা খুব নাটকীয় হয়। বাবা এমন কিছু কথা দিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন যার সঙ্গে মূল বক্তব্যের কোন সম্পর্ক নেই। আজও সেই ব্যাপার হবে।

নবনী!

জ্বি বাবা।

সক্রেটিসের একটা কথা আছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। সক্রেটিস বলেছেন, মানুষের একটাই সৎ গুণ, সেটা তার জ্ঞান। আর মানুষের দোষও একটা। দোষ হল অজ্ঞানতা— Ignorance, পশুদের কোন গুণ নেই, কারণ তাদের জ্ঞান নেই। বুঝতে পারছিস?

পারছি।

সক্রেটিসের এই বাণী মনে থাকলে জীবনটা সহজ হয়। জটিলতা কমে যায়। ঠিক না মা?

হ্যাঁ।

আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। বাবা কি করে সক্রেটিস থেকে আমার বিয়ের ব্যাপারে আসবেন। তিনি নিশ্চয়ই চিন্তা-ভাবনা করে রেখেছেন। আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই বাবার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করছি। বাবা খুব গম্ভীর গলায় কলেজে লেকচার দেবার ভঙ্গিতে বললেন

বিয়ে নামক যে সামাজিক বিধি প্রচলিত আছে, তার মূল উদ্দেশ্য হল পূর্ণতা। একজন পুরুষ পূর্ণ হয় না যতক্ষণ না একজন সঙ্গিনী তার পাশে আসে। এই জ্ঞান পশুদের নেই। মানুষের আছে। বুঝতে পারছিস?

পারছি।

বিবাহ পশুদের প্রয়োজন নেই, মানুষের প্রয়োজন, কারণ সক্রেটিসের ভাষায় মানুষ সৎগুণসম্পন্ন প্রাণী। অর্থাৎ জ্ঞানী প্রাণী। পরিষ্কার হয়েছে?

জি।

তোর বড় মামা খবর পাঠিয়েছেন। হাতে-হাতে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিটা পড়লেই তোর কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। মিনু, চিঠিটা দিয়ে যাও।

মা সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন। মা রান্নাঘরে চিঠি আঁচলে নিয়েই বসেছিলেন। বলে মনে হয়। তাঁর এক হাতে চিঠি। অন্য হাতে প্লেট ভর্তি কুমড়ো ফুলের বড়া। এই খাদ্যদ্রব্যটি আমার একার নয়। বাবারও প্রিয়। কোন বিশেষ আনন্দের ব্যাপার হলে ফুলের বড়া তৈরি হয়। তখন শিশুদের মতাই বাবা চোখ চকচক করতে থাকে।

বাবা গভীর আগ্রহে বড়া খাচ্ছেন। আমি চিঠি পড়ছি। মামার হাতের লেখা ডাক্তারদের লেখার মত— অপাঠ্য। এই চিঠি যেহেতু তিনি অনেক বেশি যত্ন নিয়ে লিখেছেন সেহেতু কিছুই পড়া যাচ্ছে না— আমি চিঠিতে চোখ বুলাচ্ছি। মা আমার পাশে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। অনেকদিন পর মার পরনে ইস্ত্রি করা সুন্দর শাড়ি। হাতে আজ দুগাছা সোনার চুড়িও পড়েছেন। চুড়িতে সোনা সব ক্ষয়ে গেছে। তামা বের হয়ে আছে। তবু চুড়ি পরা হাতে মাকে সুন্দর লাগছে। মার হাত ভর্তি চুড়ি থাকলে বেশ হত। যেখানে যেতেন রিনারিন করে হাতের চুড়ি বাজতো।

দোয়াপর সমাচার,
তোমাদের একটি আনন্দ সংবাদ দিতেছি। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায়— ঢাকার পাটির সংবাদ পাওয়া গিয়াছে/ তাহদের নিকট হইতে খবর পাইয়া আমি ঢাকায় চলিয়া যাই এবং কথাবার্তা বলি। তাহদের সহিত অনেক বিষয় নিয়া বিস্তারিত আলাপ হইয়াছে। আলোচনার ফলাফল নিম্নরূপ।
তাহারা নবনী মাকৈ পছন্দ করিয়াছে। ছেলে তাহার কিছু আত্নীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবসহ আগামী পরশু। ১২ই আগস্ট রাতের ট্রেনে নেত্রকোনা পৌঁছবে। আল্লাহ চাহেত ঐ রাতেই শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হইবে। পরদিন প্রাতে তাহারা নববধু নিয়া ঢাকা যাত্ৰা করিবে।
আমি এই সংবাদ তোমাদের শেষ সময়ে দিতেছি, কারণ আমি চাহি না তোমরা এই সংবাদ নিয়া হৈ-চৈ শুরু কর।
পাড়া প্রতিবেশী, নিকটজন, পরজন কেহই যেন কিছুই না জানে। শুভকর্ম আগে সমাধা হোক, তখন সবাই জানিবে। দশজনের মত লোকের খাবার আয়োজন করিয়া রাখিবে। মোজাম্মেল সাহেবকে বলিয়া তাঁহার জীপ গাড়িটি ইষ্টিশনে রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। বিবাহ-সংক্রান্ত কোন আলাপ তাহার সঙ্গে করিবার প্রয়োজন নাই। অসীম গোপনীয়তা কাম্য।
বিবাহ পাড়াইবার কাজী আমি সঙ্গে নিয়া আসিব। বিবাহ রেজিষ্টি হইবে ময়মনসিংহ শহরে।
খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনের মধ্যে পোলাও, কোরমা, ঝাল গোশত, মুরগির রোস্ট রাখিবে। চিকন চালের সাদা ভাত যেন থাকে। মুরাব্বী কেহ থাকিলে সাদা ভাতাই পছন্দ করবেন। আমি বড় মাছ নিয়া আসার চেষ্টা করিব। মেছুনীকে বড় মাছের কথা বলিয়া রাখিয়াছি। ভাত এবং পোলাও বরযাত্রী অ্যাসার পর রাঁধিবে। দৈ-মিষ্টি অ্যামি সঙ্গে করিয়া নিয়া আসিব।
মুখ দেখিবার পর জামাইকে সেলামী হিসেবে এক হাজার টাকা দিলেই চলিবে। আমি একটি স্বর্ণের আঙটি প্রস্তুত করাইয়া রাখিয়াছি। স্যুটের কাপড় দিতে পারিলে ভাল হইত। আমি সন্ধানে আছি, ভাল কাপড় পাওয়া গেলে নিয়া আসিব।
নবনীকে চোখে-চোখে রাখিবে। যদিও জানি ইহার কোন প্রয়োজন নাই। তাহাকে ভালভাবে বুঝাইবে। অতীত নিয়া সে যেন চিন্তা না করে। গাঁতস্য শোচনা নাস্তি। আমি নিজেও তোহর সঙ্গে কিছু কথা বলিব। গায়ে-হলুদের একটা ব্যাপার আছে–ইহা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নহে। গায়ে-হলুদ হিন্দুয়ানী ব্যাপার, তবুও যেহেতু ইহা মেয়েদের একটা শখের ব্যাপার সেহেতু নিজেরা নিজেরা গায়ে-হলুদের ব্যবস্থা নিবে। কাহাকেও কিছু জানাইবার কোনই প্রয়োজন নাই। আসল কথা গোপনীয়তা। কেহ কিছু জানিবার আগেই কার্য সমাধা করিতে হইবে। আল্লাহ সহায়–অসুবিধা হইবে না।
নব-বিবাহিত দম্পতি যেহেতু তোমাদের বাড়িতেই রাত্রিযাপন করবে: সেহেতু তাহদের জন্যে একটা ঘর আলাদা রাখিবে। খাটে বিছাইবার জন্যে আমি একটা ভেলভেটের চাদর সঙ্গে নিয়া আসিতেছি। বরযাত্রীরা রাতে কোথায় থাকিবে তা নিয়াও দুঃশ্চিন্তাগ্ৰস্ত হইবে না। পাবলিক হেলথের ডাকবাংলোয় আমি তিনটে ঘরের ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছি। শুভ কার্যের পর পরই তাহদের সেখানে নিয়া যাইব। বাকি আল্লাহপাকের ইচ্ছা।
অতঃপর তোমাদের সংবাদ কি? আমার স্ত্রীর শরীর ভাল যাইতেছে না। সে বলিতে গেলে শয্যাশায়ী। শরীর খারাপের জন্য মন-মিজাজেরও ঠিকঠিকানা নাই। চিৎকার ও হৈ-চৈ করিয়া সবার জীবন সে অতিষ্ঠা করিয়া তুলিয়াছে। তাহাকে সঙ্গে আনা ঠিক হইবে না। আমি একাই আসিব। যাহা হউক, শুভ কাজ যেন নির্বিয়ে সম্পন্ন হয়। সে জন্যে তোমরা আল্লাহপকের দরবারে ক্রমাগত প্ৰাৰ্থনা করিতে থাক। আর বিশেষ কি লিখিব। দোয়া গো।

আমি চিঠি মার হাতে ফেরত দিলাম। মা আগ্রহ নিয়ে বললেন, সবটা পড়েছিস?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

বাবা হৃষ্টচিত্তে বললেন, তোর বড় মামার কাজ সব গোছানো। কোন ফাঁক নেই। ভেরী প্রাকটিক্যাল ম্যান। ভেরী ডিপেনডেবল। উনার ব্যবস্থা দেখেছিস? আগে থেকে কিছু বলবে না। সব ঠিকঠাক করে তারপর বলবে। মিনু, আরেক কাপ চা দাও দেখি। আজকের বড়াগুলোও হয়েছে মারাত্মক। মাখনের মত মোলায়েম। মুখে দেবার আগেই গলে যাচ্ছে। নবনী, তোর জন্যে দুটা রেখে দিয়েছি, খা। তুই একটা নে, ইরাকে একটা দে।

আমার বড়া খেতে ইচ্ছা করছে না। তবু বাবাকে খুশি করার জন্যে বড়া হাতে নিলাম। হাত বেয়ে তেল পড়ছে। বিশ্ৰী লাগছে। মা চলে গেছেন চা বানাতে। মা যেভাবে ছোটাছুটি করছেন, মনে হচ্ছে তাঁর বয়স অনেকখানি কমে গেছে। তাঁর তাকানোর ভঙ্গি, ছোটাছুটির ভঙ্গি সব কিছুতেই একটা খুকী-খুকী ভাব চলে এসেছে। বাবা ঝুঁকে এসে বললেন, নবনী, তোর মামা একটা গ্রেট ম্যান, কি বলিস?

হ্যাঁ বাবা।

বিয়ের মত এতবড় একটা ঝামেলা। কিন্তু আমরা কিছুই বুঝতেও পারছি না। সব অটোসিস্টেম হয়ে যাচ্ছে। এই মানুষটা না থাকলে যে কি হত— ভাবতেও পারি না! আই লাইক হিম। অসাধারণ একজন মানুষ।

বড়মামা অসাধারণ একজন মানুষ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাবা তাকে পছন্দ করেন এটা ঠিক না। বাবা তাকে পছন্দ করেন না। মাও করেন না। আমরা কেউই বোধহয় করি না। শুধু আমরা না, তাঁর পরিবারের কেউই তাকে পছন্দ করে না। অথচ তার জীবনের একমাত্ৰ লক্ষ্য অন্যের উপকার করা। আদর্শ মানুষ বলতে যা বোঝায় তিনি তাই। মনে হয়, আদর্শ মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। আদর্শ মানুষ ডিসটিল্ড ওয়াটারের মত–স্বাদহীন। সমাজ পছন্দ করে অনাদর্শ মানুষকে। যারা ডিসটিল্ড ওয়াটার নয়–কোকা কোলা ও পেপসীর মত মিষ্টি কিন্তু ঝাঁঝালো।

আমি উঠে আমার ঘরে চলে গেলাম। ইরা সেখানে কাপড় ইন্ত্রি করতে বসেছে। টেবিল ক্লথ, জানালার পর্দা ইন্ত্রি হচ্ছে। আমাদের একটা ইলেকট্রিক ইন্ত্রি আছে। বড় মামা দিয়েছেন। ইলেকট্রিসিটি বেশি খরচ হবার ভয়ে এই ইন্ত্রি আমরা কখনো ব্যবহার করি না। আজ ব্যবহার হচ্ছে।

ইরা আমাকে দেখে ইন্ত্রির প্লাগ খুলে রাখল। ইরাকে কেন জানি খুব কাহিল। লাগছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। ওর বোধহয় রাতে ঘুম-টুম হচ্ছে না। ইরা খুব চাপা ধরনের মেয়ে। ওর কি হয়েছে তা সে কাউকেই বলবে না। আমি বললাম, ইরা, তোর কুমড়া ফুলের বড়া পড়ে আছে। খেয়ে আয়।

ইরা বের হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে হাসিমুখে বলল, বাবা খেয়ে ফেলেছেন। শরীর দুলিয়ে ইরা হাসছে—সুন্দর লাগছে দেখতে।

আপা!

কি?

তোমার কেমন লাগছে বলো তো? এই যে হঠাৎ তোমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলা হল— বিয়ে…।

কোন রকমই লাগছে না।

সত্যি বলছো আপা?

আমি হাসলাম। এই মুহূর্তে আমার কোন রকমই লাগছে না। আমি সত্যি কথাই বলছি। হয়ত এমনও হতে পারে যে, ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। যখন সত্যি সত্যি বরযাত্রীরা চলে আসবে তখন হয়ত অন্য রকম লাগা শুরু হবে। বরযাত্রী কি আসবে শেষ পর্যন্ত? একবার রাত আটটায় বরযাত্রী আসার কথা। আমি সেজেগুজে অপেক্ষা করছি। রাত বারটায় খবর এল–তারা আসবে না। মা খবরটা শোনার পর হঠাৎ মেঝেতে পরে গেলেন। নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগল। কি বিশ্ৰী অবস্থা।

ইরা বলল, কার সঙ্গে বিয়ে বুঝতে পারছে আপা?

না।

ভদ্রলোক ছিলেন রোগামত। ফর্সা। চোখে লালচে রঙের ফ্রেমের চশমা। সারাক্ষণ রুমাল দিয়ে চশমার কাচ পরিষ্কার করছিলেন। বসেছিলেন বেতের চেয়ারে। উঠার সময় পেরেক লেগে তাঁর পাঞ্জাবি খানিকটা ছিড়ে গেল। তিনি তখন খুবই অবাক হয়ে ছেড়াটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তুই এত কিছু দেখেছিস?

যার সঙ্গেই তোমার বিয়ের কথা হয় তাকেই আমি খুব মন দিয়ে দেখি।

কেন?

ইরা মাথা দুলাতে দুলাতে বলল, যার সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে তার একটা ছবি আমার মনে আঁকা আছে। সেই ছবির সঙ্গে আমি মিলিয়ে দেখি।

ইরা খাটে পা বুলিয়ে বসছে। বাচ্চা মেয়েদের মত পা নাচাচ্ছে। সে মনে হয় আরো অনেক কিছু বলতে চায় কিন্তু আমার শুনতে ইচ্ছা করছে না।

আপা!

হুঁ।

যাঁর সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে তার চেহারা কেমন হওয়া উচিত তুমি জানতে চাও?

না। জানতে না চাইলেও আমি বলি তুমি শোেন-তোমার নিজেরও নিশ্চয়ই একটা কল্পনা আছে। তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখ। আমার ধারণা, একশ ভাগ মিলে যাবে। তোমার বরকে হওয়া উচিত অবিকল শুভ্রের মত।

শুভ্ৰ কে?

শুভ্ৰ হচ্ছে উপন্যাসের একটা চরিত্র। সবাই তাকে বলে কানাবাবা। চোখে কম দেখে এই জন্যে কানাবাবা। দেখতে অবিকল রাজপুত্রের মত। অসম্ভব ভদ্র, হৃদয়বান ছেলে। পৃথিবীর সব কিছুই সে বিশ্বাস করে। খুব অসহায় ধরনের ছেলে।

অসহায় কেন?

তার পৃথিবীটা একদম অন্যরকম। তার পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে মিল নেই। এই জন্যেই অসহায়। আপা, তোমার কল্পনা কি মিলছে?

না।

তোমার কল্পনাটা কি?

আমি কিছু বললাম না। ইরাও আর কিছু বলল না। কোন কিছু নিয়ে চাপাচাপি করা ইরার স্বভাব না। সে পা দুলাচ্ছে। আমি খানিকটা অসহায় বোধ করছি। অন্যদিন বিকেলে ছাদে হাঁটাহাঁটি করতাম। আজ ছাদে যেতে ইচ্ছা! করছে না। ঘরে বসে থাকতেও ভাল লাগছে না।

আমার বিছানার কাছে গল্পের বইটা পড়ে আছে। এই বইটা আর বোধহয় পড়া হবে না। বইটার নাম অদ্ভুত— তিথির নীল তোয়ালে। তবে বইটা অদ্ভুত না। সাদামাটা গল্প। বইয়ের নায়িকা তিথির সঙ্গে একসঙ্গে তিনটি ছেলের প্ৰেম। তিথি আবার খুব নোংরা নোংরা কথা বলতে ভালবাসে। পড়তে খারাপ লাগছিল না। এখানকার পাবলিক লাইব্রেরির বই। ফেরত পাঠাতে হবে।

আপা!

কি?

এসো তোমার সুটকেস গুছিয়ে দেই। কি কি জিনিস নিয়ে তুমি ঢাকা যাবে বের করে দাও, আমি গুছিয়ে দেই।

আমি কিছুই নেব না।

এক কাপড়ে তো তুমি ঢাকায় উঠবে না। তোমাকে অনেক কিছুই নিতে হবে। তুমি জিনিসগুলো বের করে দাও, আমি গুছিয়ে দেই। এতে তোমার লাভ হবে। আপা।

কি লাভ?

তোমার সময় কাটবে। সময় কাটানো এখন তোমার খুব সমস্যা। আমি তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি।

যে মেয়ের এখনো বিয়ে হয় নি। সে স্বামীর কাছে যাবার জন্যে সুটকেস গুচ্ছাচ্ছে–এই দৃশ্য ভাবতেও লজ্জা লাগে। আমি চুপ করে রইলাম। ইরা খাটের নিচ থেকে কালো রঙের বিশাল সুটকেস বের করে ঝাড়ামোছা করতে লাগল। বড় মামার স্বভাবের খানিকটা ইরার মধ্যে আছে। সেও খুব গোছানো। আমি কিছু বলি আর না বলি সে ঠিকই সুটকেস গুছিয়ে দেবে। আমি ঢাকায় পৌঁছে সুটকেস খুলে দেখব–আমার যা যা প্রয়োজন সবই সেখানে আছে।

মা এসে ঢুকলেন। তাঁর গা থেকে ভুড় ভুড় করে এলাচের গন্ধ আসছে। মনে হয় পোলাও-কোরমা বসিয়ে দিয়েছে।

নবনী?

জ্বি মা।

আয় তোকে গোসল দিয়ে দি। ইরা তুই আয়।

আমি নিঃশব্দে উঠে এলাম। বাথরুমটা ছোট। দুজন মানুষেরই সেখানে জায়গা হয় না। তার মধ্যে বড় একটা বালতি রাখায় দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত নেই।

ইরা বলল, মা, আপাকে বরং ছাদে নিয়ে যাই।

মা ভীত গলায় বললেন, কেউ যদি আবার দেখে-টেখে ফেলে?

ইরা কঠিন গলায় বলল, দেখলে দেখবে।

মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আচ্ছা যা, ছাদে নিয়ে যা। এই ভারী বালতি কে টেনে তুলবে? অন্তু তো এখনো এল না। কোন একটা কাজ যদি সে ঠিকমত করে। মোরগ এনেছে কালো হয়ে আছে পায়ের চামড়া। একশ বছরের বুড়া মোরগ। দশ বছর ধরে জ্বাল দিলেও সিদ্ধ হবে না।

ইরা বলল, মুরগি সিদ্ধ না হলে না হবে। তুমি এত চিন্তা করো না তো মা। দরকার হলে ওরা ছরতা দিয়ে মাংস কেটে খাবে। তুমি টেনশান ফ্রি থােক। অন্তু ভাইয়া আসুক। সে আসার পর গায়ে-হলুদ হবে।

মা বললেন, আচ্ছা। ইরা বলল, তাহলে সন্ধ্যার পরই গায়ে-হলুদ হবে। সন্ধ্যার পর করলে কেউ কিছু দেখবেও না। ভাইয়াকে বাদ দিয়ে কি আর গায়েহলুদ হবে?

মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা। কেন জানি মা ইরাকে খুব ভয় পান।

গোসল করে আপা হলুদ শাড়ি পরবে না? শাড়ি তো নেই। তুমি টাকা দাও, আমি হলুদ শাড়ি কিনে আনিব।

তুই কিনে আনবি, কেউ যদি কিছু জিজ্ঞেস করে?

জিজ্ঞেস করলে বলব, আমার বড় আপার বিয়ে। আমি এমন ফকিরের মত আপার বিয়ে হতে দেব না।

আচ্ছা আচ্ছা, যা, চিৎকার করিস না। অন্তু আসুক, ওকে নিয়ে দোকানে যাবি। তুই একটু রান্নাঘরে আসবি? আমাকে সাহায্য করবি?

না, আমি অন্য কাজ করছি।

মা আবার রান্নাঘরে চলে গেলেন। ভাজা ঘিয়ের গন্ধ আসছে। কি কি রান্না হচ্ছে একবার গিয়ে দেখলে হত। এত কিছু রান্না সব মার একা করতে হচ্ছে। আমাদের কাজের মেয়ে দু দিনের ছুটি নিয়ে দেশে গেছে, এখনো আসছে না। আসবে বলে মনে হয় না। এক দোকানদারের সঙ্গে খুব খাতির ছিল। সেখান থেকে কোন সমস্যা বাঁধিয়েছে কি-না কে জানে। ইরার ধারণা ঘোরতর সমস্যা। তাকে না-কি গোপনে বলছে।

আমি বারান্দায় খানিকক্ষণ এক-একা দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি ইজিচেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁর কোলের উপর রাখা খবরের কাগজ ফর ফর করে বাতাসে উড়ছে। তিনি দুপুরে অনেকক্ষণ ঘুমান। আজ সে সুযোগ হয় নি।

রান্নাঘর থেকে হাঁড়িকুড়ি নাড়ার শব্দ আসছে। আমি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি। আমাদের এ বাড়িটা হিন্দুবাড়ি। আমার দাদা এই বাড়ি জলের দামে এক হিন্দু ব্ৰাহ্মণের কাছ থেকে কিনেছিলেন। বেচারা এত সস্তায় একটিমাত্র কারণেই বাড়ি বিক্রি করে— দাদাজান যেন তার ঠাকুরঘরটা যে রকম আছে সে রকম রেখে দেন। সেই ঠাকুরঘরটাই আমাদের এখনকার রান্নাঘর।

মা আমাকে দেখেই বলল, তুই এখানে কেন? যা তো। যা।

আমি বললাম, এক-একা কি করছ? আমি তোমাকে সাহায্য করি।

কোন সাহায্য লাগবে না। তুই দরজা বন্ধ ঘরে চুপচাপ খানিকক্ষণ শুয়ে থাক।

রান্না-বান্না কদুর করেছ?

দুটা তরকারি নেমেছে। চেখে দেখবি?

না।

আমি নরম গলায় বললাম, মা, আমি বসি তোমার পাশে?

ধোঁয়ার মধ্যে বসতে হবে না। তুই যা।

আমি বুঝতে পারছি মার প্রচণ্ড পরিশ্রম হচ্ছে। কিন্তু তার চোখে-মুখে পরিশ্রমের ক্লান্তি নেই। মনে হচ্ছে তিনি খুব আনন্দে আছেন। প্রয়োজন হলে আজ সারারাত তিনি রান্না করতে পারবেন।

নবনী!

জ্বি মা।

বৃষ্টি হবে না-কি রে মা?

বুঝতে পারছি না। হবে মনে হয়। আকাশে মেঘা জমছে।

অবশ্যই বৃষ্টি হবে। শুভদিনে বৃষ্টি হওয়া খুব সুলক্ষণ। তোর বাবা কি করছে?

ঘুমুচ্ছে।

তুইও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়। যা এখন। চা খাবি? বানিয়ে দেখ এক কাপ? পানি গরম আছে।

দাও, বানিয়ে দাও। দুকাপ বানাও মা। তুমি নিজেও খাও।

মা কেতলিতে চা-পাতা ছেড়ে দিলেন। মার রান্না-বান্না দেখার মত ব্যাপার। অসম্ভব রকম গোছানো ব্যবস্থা। আমি এখন পর্যন্ত কোন মহিলাকে এত দ্রুত এত কাজ করতে দেখি নি।

মশলা কি তুমিই বাটছ?

গুড়া মশলা আছে, কিছু নিজে বাটলাম। অস্তুকে বললাম, একটা ঠিকা লোক আনতে। কোথায় যে উধাও হয়েছে! কাজের বাড়ি, একজন পুরুষ মানুষ থাকলে কত সুবিধা।

কিছু লাগবে?

জিরা কম পড়েছে।

আমি এনে দেই মা। রাস্তার ওপাশেই তো দোকান।

হয়েছে, তোর গিয়ে জিরা আনতে হবে না। চা নিয়ে চুপচাপ বসে খা।

তোমার পাশে বসে খাই মা?

আমার পাশে বসে খেতে হবে না। ধোয়ার মধ্যে বসে চা খাবি কি?

তোমার পাশে বসেই খাব।

মা বললেন, আয় আয়, বোস। আমি মার পাশে বসলাম। তিনি এক হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাসি-খুশি মা হঠাৎ বদলে গেলেন। তিনি শিশুদের মত শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। এই কান্না কোন আনন্দের কান্না না গভীর দুঃখের কান্না। আমাকে নিয়ে মার অনেক দুঃখ।

আমি বললাম, মা কান্না থামাও তো। মা কাঁদতে কাঁদতেই উঠে গেলেন। আমি মার পেছনে পেছনে যাচ্ছি। মা গিয়ে দাঁড়ালেন বাবার সামনে।

বাবা জেগে উঠে অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন। ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছেন। না। ইরাও এসেছে বারান্দায়। মা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, এরকম ফকিরের মত চুপি চুপি আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।

বাবা হতভম্ব গলায় বললেন, কি বলছি তুমি!

মা ধরা গলায় বললেন, অতুকে বল সে যেন ডেকোরেটরকে দিয়ে গেট বানায়। আলোকসজ্জা যেন হয়।

পাগল হয়ে গেলে না-কি?

হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গেছি। আমি এই ভাবে মেয়ে বিয়ে দেব না। ইরা, তুই যা, সবাইকে খবর দে।

বাবা পুরোপুরি হকচকিয়ে গেছেন। এমনভাবে তাকাচ্ছেন যে, দেখে মায়া লাগছে। তিনি নির্জীব গলায় বললেন, চুলার গরমে থেকে থেকে তোর মার ব্রেইন সর্ট সার্কিট হয়ে গেছে। নিগেটিভ পজিটিভ এক হয়ে গেছে।

মা তীব্র গলায় বললেন, আমার মেয়ে কোন পাপ করে নাই। কেন তাকে আমি চোরের মত বিয়ে দেব?

বাবা ইরার দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড ধমক দিলেন, হা করে দেখছিস কি? তোর মার শরীর কাঁপছে দেখছিস না? তাকে ধর। মাথায় পানি ঢাল। বিছানায় শুইয়ে দে।

আমরা দুজনেই মাকে ধরে ফেললাম।

বাবা হতাশ গলায় বললেন, আচ্ছা যাও, হবে। সবই হবে। অন্তু আসুক। গাধাটা গেল কোথায়!

বাড়ির চেহারা পাল্টে গেছে। গিজগিজ করছে মানুষ। আমাদের যেখানে যত আত্মীয় ছিলেন সবাই চলে এসেছেন। শুনছি। অতিথিপুরে ছোট খালাকেও খবর দেয়া হয়েছে। তিনিও না-কি আসছেন।

বাড়ির সামনে শুধু যে গোট বসেছে তাই না। আলোকসজ্জা হচ্ছে। কাঁঠাল গাছে লাল, নীল, সবুজ রঙের আলো জোনাকি পোকার মত জ্বলছে নিভছে।

স্টেশন থেকে বর আনার জন্যে দুটা গাড়ি জোগাড় হয়েছে। ফুল দিয়ে সেই গাড়ি সাজানো হচ্ছে।

ইরার বান্ধবীরা এসেছে। তারা বাসরঘর সাজাচ্ছে। কাউকে সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। আমার কোথাও বসার জায়গা নেই। বাবার পিঠের ব্যথা উঠেছে বলে তিনি তার ঘরে শুয়ে আছেন। আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন— তোর মামা এসে কি যে করবে ভাবতেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। চুপি চুপি কাজ। সারতে বলেছে, এস দেখবে মচ্ছব বসে গেছে। কেউ কিছু বুঝতে চায় না। সব নির্বোধ। অন্তু না-কি ব্যান্ডপার্টি আনতে গেছে। শুনেছিস?

না।

কেউ কারো কথা শুনছে না। সবাই নিজের মত কাজ করছে। এটা কি হিন্দুবাড়ির বিয়ে যে ব্যান্ডপার্টি লাগবে?

তুমি ডেকে নিষেধ করে দাও।

আমার নিষেধ কি কেউ শুনবে? কেউ শুনবে না। যার যা ইচ্ছা করছে। তোর বড় মামা আসার পর দেখবি গজব হয়ে যাবে। পুরোপুরি ইসলামিক কায়দায় আল্লাহু আকবর বলে আমাকে কোরবানী করে দেবে।

বড় মামা এসেছেন। ব্যান্ডপার্টিও একই সঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। তারা এসেই তুমুল বাজনা শুরু করল। মামা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ কাণ্ডকারখানা দেখে বললেন, ঠিক আছে। বিয়েবাড়ি বিয়েবাড়ির মতাই হওয়া উচিত। চুপি চুপি বিয়ে দিলে ওরাও সন্দেহ করত। আল্লাহ যা করেন ভালর জন্যেই করেন। আল্লাহ ভরসা।

মামার এই কথাতেই বাবার পিঠের ব্যথা কমে গেল। তিনি ক্র্যাচে ভর দিয়ে নিজেই গেলেন ব্যান্ডপার্টি দেখতে। গম্ভীর গলায় বললেন, তোমরা সারাক্ষণ বাজনা বাজাবে না। বর আসার পর খানিকক্ষণ বাজাবে। ব্যস। তারপর কমপ্লিট স্টপ। মুসলমান বাড়ির বিয়ে, বাদ্য-বাজনা ভাল না। দেখি তোমাদের বাজনা কেমন একটু শুনি। স্যাম্পল শোনাও।

আমি আমার বাবাকে চিনি। বাচ্চারা যেমন ব্যান্ডপার্টি ঘিরে থাকে। তিনিও থাকবেন বাচ্চাদের সঙ্গে। তাঁর একমাত্র তফাৎ হবে তিনি কিছুক্ষণ পর পর বলবেন— ব্যান্ডপার্টি আনার বেকুবি ক্ষমার অযোগ্য। এই বাক্য বলা ছাড়া ব্যান্ডপার্টি ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাদের সঙ্গে তাঁর আর কোন তফাৎ খুঁজে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শ্রাবণ মাসের ১৩ তারিখ রাত ১১টা দশ মিনিট আমার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। মেয়েরা নেমে গোল বৃষ্টিতে কাদাখেলা খেলার জন্যে। উঠোন ভর্তি মেয়ে। এ তাকে কাদায় ফেলে দিচ্ছে, ও তাকে ফেলছে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য।

বাবা এক ফাঁকে বিরক্ত গলায় ব্যান্ডপাটির লোকদের বললেন–আনন্দের একটা সময় যাচ্ছে কাদাখেলা হচ্ছে আর তোমরা চুপচাপ বসে আছ। এখর বাদ্য-বাজনা না বাজালে কখন বাজাবে? কেউ মারা যাবার পর? তোমাদের টাকা দিয়ে আনা হয়েছে কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমানোর জন্যে? যত সব ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার। বাজাও!

তুমুল বাদ্য শুরু হয়ে গেল। বাবা হৃষ্টচিত্তে কাদাখেলা দেখতে গেলেন তবে মুখ শুকনো করে বললেন, খবরদার আমার গায়ে কেউ কাদা ছিটাবে না। সব কিছুর বয়স আছে। আমার এখন কাদাখেলার বয়স না। তাছাড়া শরীর দুর্বল। পিঠে প্ৰচণ্ড ব্যথা।

বাবাকে কেউ কান্দা মাখাতে গেল না। তবে তিনি যে মনেপ্ৰাণে এই জিনিসটি চাচ্ছেন তা আমরা সবাই বুঝলাম। আমি ইরাকে কানে কানে বললাম, কাউকে বল না বাবার গায়ে একটু কাদা মাখিয়ে দিক।

ইরা বলল, ছোটখালা এসে পড়বেন। তিনি খবর পেয়েছেন। খালা এলেই বাবাকে তিনি কাদায় চুবাবেন। তুমি নিশ্চিন্ত থােক।

বড় মামা এসে আমাকে বললেন, খুকী তুই আমার সঙ্গে একটু আয়তো। তোর সঙ্গে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।

বড় মামা আমাকে খুকী ডাকেন। আমি হচ্ছি। বড় খুকী। ইরা ছোট খুকী। তার নিজের চার মেয়ে। তাদেরও নাম বড় খুকী, মেজো খুকী, সেজো খুকী, ছোট খুকী।

নিরিবিলি কথা বলার কোন জায়গা নেই। মামা আমাকে ছাদে নিয়ে গেলেন। আমাদের কথা হল ছাদে উঠার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। ছাদে যাবার উপায় নেই। মুষল ধারে বর্ষণ হচ্ছে। সিঁড়ি অন্ধকার, তবে মামা টর্চ হাতে উঠে এসেছেন। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বললেন, বড় খুকী! তোকে কয়েকটা কথা বলা দরকার মা।

বলুন।

টৰ্চটা নিভিয়ে দেই। খামাখা ব্যাটারি খরচ। অন্ধকারে তোর আবার ভয় লাগবে না তো?

ভয় লাগবে না।

বড় মামা বাতি নিভিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। সম্ভবত কথা গুছিয়ে নিলেন।

মামা কিছু বলছেন না। টর্চ লাইটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। একবার জ্বালাচ্ছেন একবার নিভাচ্ছেন। তাঁর বোধহয় কাশিও হয়েছে। খুব কাশছেন। আমি বললাম, আপনার কি শরীর খারাপ মামা?

হু। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। বোধহয় মাইগ্রেন পেইন শুরু হবে। টেনশান হলে এরকম হয়। বয়স হয়ে গেছে এখন টেনশান সহ্য হয় না। বয়সতো মা কম হল না।

টেনশনের তো আর কিছু নেই মামা। বিয়ে হয়ে গেছে।

হুঁ।

জরুরি কি কথা যেন বলবেন?

তেমন জরুরি কিছু না। বিয়েশাদী ভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহ পাক যা ঠিক করে দেন। তাই হয়। জোড়া মিলানোই থাকে। আমরা খামাখাই দৌড়াদৌড়ি করি, হৈ চৈ করি। এর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করি তার সঙ্গে ঠিক করি। নিতান্তই পণ্ডশ্রম করা হয়। যার যেখানে হবার সেখানেই হবে। তুই তোর বিয়ে নিয়ে মন খারাপ করিস না।

আমি মন খারাপ করছি না মামা।

তোর আরো ভাল বিয়ে হতে পারত। হওয়া উচিত ছিল। সম্ভব হল না। চেষ্টা কম করি নাই।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, চেষ্টা করেও তো লাভ হত না। আপনিইতো বললেন, জোড়া আগেই মিলানো।

মামা বড় করে নিঃশ্বাস ফেললেন। মনে হচ্ছে তিনি নিজের কথা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে জোড়া মিলানোর কথা বলছেন, তবে তাঁর বিশ্বাস অন্য।

বড় খুকী!

জ্বি মামা।

ছেলে দরিদ্র তবে ছেলে খারাপ না।

আমি এসব নিয়ে ভাবছি না। তোমাদের যে আমি মুক্তি দিতে পারলাম এতেই আমি খুশি।

আমি নিজে খাস দিলে আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করেছি। তুই সুখী হবি। সুখটাই বড় কথা। তবে সুখী হবার জেন্য চেষ্টা করতে হয়রে মা। খুব চেষ্টা চালাতে হয়।

আমি চেষ্টা চালাব।

তুই বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোর উপর আমার ভরসা আছে। তোর বরও বুদ্ধিমান। তোদের অসুবিধা হবে না।

মামা তুমি কি আমার সমস্যার কথা তাদের বলেছ?

পরিষ্কার করে বলি নি। তবে ইঙ্গিত দিয়েছি।

পরিষ্কার করে বল নি কেন?

মামা আবার কাশতে লাগলেন। টর্চের আলো এদিক ওদিকে ফেলতে লাগলেন। আমি বললাম, মামা আমি কি বলব। উনাকে?

এখন বলাবলির দরকার নাই। তোদের দুজনের মধ্যে ভাব ভালবাসা হোক। তারপর বলবি। তাছাড়া দেখবি বলার দরকারও পরবে না। চল নিচে যাই। সাবধানে নামিস-সিঁড়ি পিছল। ধরা আমার হাত ধর।

আমি মামার হাত ধরে সাবধানে নিচে নামছি। সিঁড়ির গোড়ায় ইরা দাঁড়িয়ে আছে। তার সুন্দর সাদা শাড়ি কাদায় মাখামাখি হয়েছে। ইরা বলল, আপা যে কজন বরযাত্রী এসেছে তাদের সবাইকে কাদায় চুবিয়ে দেয়া হয়েছে। একজন দৌড়ে পালাতে গিয়েছিল সে নিজেই খাদে পড়ে গেছে। আমাদের কিছু করতে হয় নি। তার অবস্থাই সবচে করুণ। হি-হি-হি।

বড় মামা বললেন, কাজটা ঠিক হচ্ছে না ছোট খুকী। এরা সম্মানিত মেহমান।

সম্মানিত মেহমানদের অবস্থাটা একটু দেখে আসুন মামা। সম্মানিত মেহমানরা এখন মনের আনন্দেই কাদায় গড়াগড়ি করছেন। হিহিহি।

০২. বাসরঘর

বাসরঘরে ঢুকতে ঢুকতে রাত দুটা বেজে গেল। এর মধ্যে কত সমস্যা যে হল। ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। বরযাত্রী একজনের মানিব্যাগ হারিয়ে গেল। ইরার এক বান্ধবীর কানের দুল খুলে পড়ে গেল। কলেজে পড়ে মেয়ে অথচ আকাশ ফাটিয়ে কান্না। এটা তার মার দুল। মা না-কি তাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে ফেলবে। আমার বড় মামার শুরু হল মাইগ্রেন পেইন। এই বিশেষ ধরনের মাথাব্যথা যে এমন পর্যায়ে যেতে পারে আমার ধারণা ছিল না।

বড় মামা মাথার যন্ত্রণায় ছট্‌ফট্‌ করছেন, অন্তু প্ৰবল বেগে তাকে বাতাস করছে এই অবস্থায় আমি বাসর ঘরে ঢুকলাম। ইরার বান্ধবীরা খাট ভালমত সাজাতে পারে নি। কাগজের ফুল দিয়ে জবরজং কি বানিয়ে রেখেছে। মামা যে ভেলভেটের চাদর এনেছেন সেটা সাইজে ছোট হয়েছে। চারদিকে তোশক বের হয়ে আছে। চাদরে গোলাপ ফুল দিয়ে লিখেছে ভালবাসা। তাকালেই লজ্জা লাগে। খাটের পাশে একটা একটা বেতের চেয়ার। রাখলই যখন দুটা বেতের চেয়ার রাখলেই পারত। একটা কেন রেখেছে? সেই বেতের চেয়ারে সে বসে। আছে। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়িয়ে আবার নিজেই লজ্জা পেল। ধাপ করে বসে পড়ল। ইরার সব বান্ধবীরা জানালার পাশে উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিল। ওরা হেসে উঠল খিলখিল করে। আমি খাটের উপর বসলাম।

খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে আমি বসলাম সহজভাবেই। লজ্জায় অভিভূত হলাম না। তার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও আমার লজ্জা লাগল না। আমি তাকলাম আগ্রহ নিয়ে। এই জীবন যার সঙ্গে কাটাব তাকে ভাল করে দেখতে ইচ্ছা করল। ইচ্ছাটা কি অন্যায়?

বিশেষত্বহীন চেহারার একজন মানুষ। মাথা খানিকটা নিচু করে বসে আছে। এরকম মানুষ পথে ঘাটে, ট্রেনে বাসে কত দেখি। আগ্রহ নিয়ে এদের দিকে কখনো কেউ তাকিয়ে থাকে না। যেহেতু কেউ তাকিয়ে থাকে না সেহেতু তারাও বেশ নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাটা তরমুজ কিনে সারামুখে রস মাখিয়ে খায়। রাস্তায় যেতে যেতে শব্দ করে নাক ঝাড়ে।

ঘরে আলো কম। ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ায় এরা একটা হারিকেন এবং একটা মোমবাতি দিয়ে গেছে। বাতাসে মোমবাতি যেভাবে কাঁপছে তাতে মনে হয় যে কোন মুহূর্তে নিভে যাবে। সে আমাকে দেখছে না। তার হয়তো লজ্জা লাগছে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মোমবাতির দিকে। এক সময় মোমবাতি নিভে গেল। সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মোমবাতি জ্বালালো। যেন বাতি জ্বালিয়ে রাখাই তার প্রধান কাজ। ইরার বান্ধবীরা আবারও হাসছে খিলখিল করে। সে খুব লজ্জা পাচ্ছে। অসহায়ের মত তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমি হোসে ফেললাম। কেন হাসলাম নিজেই জানি না। আমি হাসি শাড়ির আঁচলে লুকানোর চেষ্টা করলাম না। মনে হয় সহজভাবে হেসে আমি মানুষটাকে অভয় দিতে চেষ্টা করলাম। সে অন্যদিকে তাকিয়ে প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলল,

তোমার মামার মাথাব্যথা কি খুব বেশি?

আমার সঙ্গে এই তার প্রথম কথা। আমি বললাম, হ্যাঁ বেশি।

সে তৎক্ষণাৎ বলল, আমার এক বন্ধুর স্ত্রীরও মাইগ্রেন আছে। ওর নাম অহনা। অকুপাংচারে চিকিৎসা করিয়েছিল, এতে কমেছে।

মানুষটা কথা বলে সহজ হবার চেষ্টা করছে। আমি তাকে সুযোগ করে দেবার জন্যেই বললাম, অকুপাংচার কি? যদিও আমি খুব ভাল করেই জানি অকুপাংচার কি।

সে নড়েচড়ে বসল। খুব আগ্রহের সঙ্গে বলল, অকুপাংচার হল এক ধরনের চায়নীজ চিকিৎসা। সুচ ফুটিয়ে দেয়।

ব্যথা লাগে না?

লাগে, খুব অল্প।

তার কথা ফুরিয়ে গেল। সে এখন আবার তাকিয়ে আছে মোমবাতির দিকে। বোধহয় মনে-প্ৰাণে চাচ্ছে মোমবাতিটা নিভে যাক, তাহলে সে একটা কাজ পাবে, ছুটে গিয়ে মোমবাতি জ্বালাতে পারবে।

আমার বলতে ইচ্ছা করছে—তুমি মোমবাতি নিয়ে এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? তুমি আমার দিকে তাকাও। আমাকে এত লজ্জা পাবার কিছু নেই। তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে।

আসলেই মানুষটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। সে ইরার নায়ক শুভ্ৰ নয়। সে সাধারণ একজন মানুষ। অস্বস্তি, দ্বিধা এবং খানিকটা লজ্জা নিয়ে সে বেতের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। কোন কথা পাচ্ছে না বলেই অকুপাংচার নিয়ে এসেছে। সেই বিষয়েও বেচারা বোধহয় কিছু জানে না। জানলে আরও কথা বলত।

সফিকেরও আমার সঙ্গে আসার কথা ছিল। সে হঠাৎ চলে গেল ব্যাঙ্কক।

সফিক কে?

যার কথা একটু আগে বললাম–অহনা। তার স্বামীর নাম সফিক। আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমি ওর অফিসেই কাজ করি। আমার বস।

ও আচ্ছা।

আমার বস শুধু না প্রতিষ্ঠানের মালিকও তবে আমার সঙ্গে ব্যবহার বন্ধুর মত। বিরাট বড়লোক। তার বাড়ি দেখলে তোমার মাথা ঘুরে যাবে। ছাদে সুইমিং পুল।

খুব সুন্দর?

খুবই সুন্দর। মাঝে মাঝে জোছনা রাতে সুইমিং পুলের পাশে সে পার্টি দেয়। অপূর্ব লাগে।

সে খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে। আমি লক্ষ্য করছি মানুষটার উপর আমার মায়া পড়ে যাচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগছে, তার কথা শুনতে ভাল লাগছে। শুরুতে তার চেহারা যতটা সাধারণ মনে হচ্ছিল এখন ততটা সাধারণ মনে হচ্ছে না। তার চোখ দুটা খুব সুন্দর লাগছে। মাথা ঝুকিয়ে কথা বলার ভঙ্গিও সুন্দর।

কেন এত অল্প সময়ে লোকটির উপর আমার মায়া পড়ল? এই মায়ার উৎস কি? এই ব্যাপারটা কি সব মেয়ের ক্ষেত্রেই ঘটে, না শুধু আমার বেলায় ঘটল? এই লোকটির সঙ্গে বিয়ে না হয়ে অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে হলে তার উপরও কি এত দ্রুত মায়া পড়ে যেত। তার চোেখও কি সুন্দর লাগত?

মোমবাতি আবার নিভে গেছে। সে উৎসাহের সঙ্গে আবার ছুটে গেছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তার মোমবাতি জ্বালানো দেখছি। দেয়াশলাইয়ের কাঠি বার বার নিভে যাচ্ছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাদের এখানে খুব বাতাস। তোমাদের বাড়িটা কি দক্ষিণমুখী?

না।

তোমাদের এদিকে বোধহয় খুব বৃষ্টি হয়।

হ্যাঁ খুব বৃষ্টি।

যে ভাবে বৃষ্টি হচ্ছে, শিওর বন্যা হবে।

দরজায় ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। সে আমার দিকে তাকালো। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। কি আশ্চর্য! ছোটখালা। অতিথিপুর থেকে ছোটখালা চলে এসেছেন। তিনি খবরই পেলেন। কিভাবে, এলেনই বা কিভাবে? ছোটখালার হাতে ট্রে। ট্রেতে দুকাপ চা। ছোটখালা হাসি মুখে বললেন–চা দেয়ার অজুহাতে জোর করে ঢুকে পড়লাম। ও নবনী, তোর বরের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দে।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, উনি আমার ছোটখালা। আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ।

সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পা ছুঁয়ে সালাম করল।

ছোটখালা বললেন, ও নবনী, তোর বর যে আমাকে সালাম করল— আমি খালি হাতে এসেছি। যাই হোক, দেখি সকালে ব্যবস্থা করা যায় কি-না। তোরা দু জন দু মাথায় বসে আছিস কেন? বাবা, তুমি নবনীর পাশে গিয়ে বস। ছোটাছুটি করে মোমবাতি জ্বালাতে তোমাকে কে বলেছে? চা খেয়ে মোমবাতি হারিকেন দুটাই নিভিয়ে প্রাণভরে গল্প কর। মেয়েরা সব জানালায় ভিড় করে আছে। বাতি নিভিয়ে দিলে কিছু দেখা যাবে না। ওরা ভিড় কমাবে। বুঝতে পারছি?

ছোটখালা ওকে হাত ধরে আমার পাশে বসিয়ে দিয়ে বললেন, নবনীর মত সুন্দর মেয়ে কি তুমি এর আগে কখনও দেখেছি? বল হ্যাঁ কিংবা না।

ও হাসল। ছোটখালা আমাদের চা খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে রইলেন। যাবার সময় বাতি নিভিয়ে গেলেন। ও উঠে গিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ছিটিকিনি লাগল। খাটের দিকে আসতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আমি উঠে এসে তাকে ধরলাম। ও লাজুক গলায় বলল, মোটেও ব্যথা পাই নি। তোমাকে ধরতে হবে না।

আমি হাত ধরে তাকে খাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। মনে মনে ভাবছি–ইরার উপন্যাসের সেই নায়ক শুভ্ৰকেও কি তার স্ত্রী ধরে ধরে খাটের দিকে নিয়ে যেত?

নবনী!

উঁ।

তুমি খুব বেশি সুন্দর। আরেকটু কম সুন্দর হলে ভাল হত।

কম সুন্দর হলে ভাল হত কেন?

এম্‌নি বললাম, কথার কথা। সফিক তার স্ত্রীকে সবসময় এই কথা বলে।

উনার স্ত্রী কি খুব সুন্দর?

হ্যাঁ খুব সুন্দর। কালো কিন্তু সুন্দর। তার নামটাও অদ্ভুত। অহনা। আর কোন মেয়ের এমন নাম শুনেছ?

না।

নবনী!

কি?

আমি এর আগে কখনও কোন মেয়ের হাত ধরি নি। এই যে তোমার হাত ধরেছি। কেমন যেন ভয়-ভয় লাগছে। এই দেখ, আমার শরীর কাঁপছে।

ওর কথা শুনে আমার কি যে ভাল লাগল! চোখে পানি এসে গেল। বাসররাতে সব মেয়েই বোধহয় কোন-না-কোন উপলক্ষে চোখের পানি ফেলে। আমি ফেললাম। আমার সেই চোখের পানিতে আনন্দ ছিল, সুখ ছিল। সেই সুখ ও আনন্দের তেমন কোন কারণ ছিল না। অকারণ সুখ অকারণ আনন্দও তো মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে আসে।

রাত এখন কত আমি জানি না। আমার হাতে ঘড়ি নেই। একটা ঘড়ি ছিল। ইরার বান্ধবীরা ঘড়ি খুলে নিয়েছে। বাসর ঘরে না-কি ঘড়ি নিয়ে ঢুকতে নেই। ঘড়ি নিয়ে ঢুকলেই কিছুক্ষণ পরপর ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করবে। বাসর রাতটা হবে এমন যেখানে সময় বলে কিছু থাকবে না। আমি ইরার বান্ধবীদের সঙ্গে কোন তর্ক করি নি। ওরা ঘড়ি খুলতে চেয়েছে। আমি খুলে দিয়েছি। ওরা যদি ভাবে ঘড়ি খুলে রাখলেই সময় বন্ধ হয়ে যাবে-ভাবুক।

ও বিছানার একপাশে গুটিশুটি মেরে ঘুমুচ্ছে। খাটের একেবারে শেষপ্রান্তে চলে গেছে। আমার কেবলই ভয় হচ্ছে এই বুঝি গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল। ইচ্ছে করছে তাকে নিজের কাছে টেনে নেই। ইচ্ছে করলেও সম্ভব না। মানুষের সব ইচ্ছা পূর্ণ হবার নয়। তবে আমি বেতের চেয়ারটি খাটের পাশে এনে রেখেছি। গড়িয়ে পড়লেও মেঝেতে পারবে না। চেয়ারের উপর পারবে।

বৃষ্টি কিছু সময়ের জন্যে থেমেছিল। এখন আবার প্রবল বেগে শুরু হয়েছে। বাতাসও দিচ্ছে। শো শো শব্দ হচ্ছে। এ বাড়ির কেউই বোধহয় ঘুমায়নি। বারান্দায় তাদের হাঁটাহাটির শব্দ পাচ্ছি। হাসাহাসির শব্দও হচ্ছে। সবচে বেশি। হাসছে ইরা। খিলখিল খিলখিল। হাসছেতো হাসছেই। ইরা বোধহয় আজ হাসির বিশ্ব রেকর্ড করল। কি নিয়ে তাদের এত হাসাহাসি? কাদাখেলা কি শেষ হয় নি? না-কি আজ সারারাতাই চলবে?

আমার ঘুম আসছে না। আমি ভোর হবার জন্যে অপেক্ষা করছি। ভোরবেলা একা একা ছাদে খানিকক্ষণ হাটব। ও যদি জেগে থাকে–ওকেও সঙ্গে নেব। আমার ধারণা এই পৃথিবীতে অল্প যে কয়টি সুন্দর জায়গা আছে আমাদের বাসার ছাদটা তার একটা। উঁচু রেলিং দিয়ে ছাদটা ঘেরা। শ্যাওলা জমে রেলিং হয়েছে গাঢ় সবুজ। মনে হয় ইট পাথরের রেলিং নয়–সবুজ লতার রেলিং। বাড়ির পেছনের প্রকাণ্ড শিরীষ গাছটা বেঁকে এসে ছাতার মত ছায়া ফেলেছে ছাদের উপর। গাছ ভর্তি টিয়া পাখি। সকাল এবং সন্ধ্যায় বাক বেঁধে টিয়া পাখি উড়তে থাকে। তীক্ষ্ণ গলায় ডাকে ট্যা ট্যা। টিয়া পাখিগুলো খুব অদ্ভুত এরা মানুষের দেয়া খাবার কখনো খায় না। আমি কতবার ছাদে চাল ছড়িয়ে দিয়েছি–কাক এসে খেয়ে গেছে। টিয়ারা কাছে আসে নি।

ভোরবেলা যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে আমি ইরাকে বলব আমাদের দুজনকে ছাদে চা দিতে। ইরা মনে মনে হাসবে। পরে হয়ত ঠাট্টাও করবে। করুক ঠাট্টা। এমন একটা সুন্দর জিনিস ওকে না দেখিয়ে নিয়ে যাব তা হয় না। তাছাড়া আমি ঠিক করেছি–চা খেতে খেতে ভোরের প্রথম আলোয় ওকে বলব–আমার জীবনের ভয়াবহ সমস্যার কথা। ওকে সমস্যাটা বলে রাখা দরকার। সব শোনার পর সে যদি বলে—নবনী! তুমি এইখানেই থাক। তোমাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব না। তাহলে এখানেই থেকে যাব। বিশাল এই বৃক্ষের ছায়ায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে আমার খুব খারাপ লাগবে না। সেই মানসিক প্ৰস্তুতি আমার আছে।

ওকে আমি কি ভাবে কথাটা বলব? শুরু করাটাই সমস্যা। একবার শুরু করলে বাকিটা আমি তরতার করে বলে যেতে পারব। শুরু করব কি ভাবে? এই ভাবে কি শুরু করা যায়?

এই শোন, আমার এক সময় একজনের সঙ্গে খুব ভাব ছিল।

না এভাবে শুরু করা যায় না। পৃথিবীর কোন স্বামীই বিয়ের পরদিন এ ধরনের কোন কথা শুনতে চায় না। কোন স্বামীই গোপন সত্য শুনতে চায় না। তারা শুনতে চায় মধুর মিথ্যা।

একসময় একজনের সঙ্গে খুব ভাব ছিল এটা এমন ভয়াবহ কোন ব্যাপারও নয়। ভাবতো থাকতেই পারে। তবে খুব ভাব ছিল— সমস্যাটা এইখানেই। খুব বলে একটা ছোট্ট বিশেষণ আছে। আমি ইচ্ছা করে বসাই নি। নিজের অজান্তেই চলে এসেছে।

উনার নাম…।

থাক নামটা বাদ থাক। নামের দরকার নেই। উনি ছিলেন। আমাদের কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক। বয়স অল্প। পাস করে প্রথমেই এই কলেজে এসেছেন। এখানেই তার চাকরি জীবনের শুরু। তাকে দেখে আমাদের মেয়েদের মধ্যে খুব হাসা।হাসি পরে গেল। হাসাহাসির প্রধান কারণ তাঁর পরনে জোব্বা ধরনের পোশাক। গোড়ালী পর্যন্ত পায়জামা। থুতনীতে ছাগল দাড়ির মত ফিনফিনে এক গোছা দাড়ি। তিনি চোখে সুরমা দেন। ক্লাসে যখন পড়ান। তখন কখনো মেয়েদের দিকে তাকান না। মেঝের দিকে তাকিয়ে পড়ান। হঠাৎ কারো চোখে চোখ পড়ে গেলে লজ্জায় লাল হয়ে যান। তবে পড়ান খুব সুন্দর। এরকম অল্প বয়স্ক একজন মৌলানাকে বেছে বেছে তারা মেয়েদের কলেজে কেন দিল কে জানে। কলেজের সব স্যারদের নাম থাকে। তাঁর নাম হল চেংড়া হুজুর।

আমরা নানাভাবে তাকে যন্ত্রণা করি। যেমন তিনি রেজিস্ট্রার খাতা হাতে যখন ক্লাসে ঢুকেন তখন আমরা সব কয়টি মেয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলিআসসালামু আলায়কুম। আমাদের এই সমবেত চিৎকারে কলেজ কেঁপে উঠে। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অসহায় ভঙ্গিতে বলেনওয়ালাইকুম সালাম। তাঁকে ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে হয়। যেমন একদিন ক্লাসের পড়া শেষ করে বললেন, কারো কোন প্রশ্ন আছে। আমাদের ক্লাসের সবচে স্মার্ট মেয়ে মবকুলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জ্বি স্যার আছে।

বল।

আপনি এমন অদ্ভুত পোশাক পরে ক্লাসে আসেন কেন?

অদ্ভুত পোশাকতো না। আমাদের নবীজী এই পোশাক পরতেন।

নবীজীতো উটে চড়ে ঘোরাফেরা করতেন। আপনি উটে না চড়ে রিকশায় আসেন কেন?

উটের প্রচলন। এখানেই নেই। থাকলে হয়ত আসতাম।

হো হো করে আমরা হেসে উঠলাম। স্যার চোখ মুখ লাল করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে করুণ গলায় বললেন, আচ্ছা যাই আসসালামু আলায়কুম।

আমরা সমস্বরে হুংকার দিয়ে উঠলাম— ওয়ালাইকুম সালাম। আমাদের হুংকারে কলেজ বিল্ডিং কেঁপে উঠল।

একদিন বিকেলে ছাদে হাঁটছি, মা এসে বলল, বাইরে এক ভদ্রলোক এসেছেন। তোর বাবা চা চাচ্ছে। চা দিয়ে আয়। আমি দুকাপ চা নিয়ে ঢুকে অবাক হয়ে দেখি— আমাদের চেংড়া হুজুর। আজ তাঁর পোশাক আরো চমৎকার। মাথায় পাগড়ি পরেছেন। বিয়ের আসরে ছেলেরা পাগড়ি পরে বলে জানি কিন্তু কেউ যে পাগড়ি পরে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে আসতে পারে তা জানা ছিল না। ভদ্রলোক কি উন্মাদ? তিনি আমাকে দেখে মাথা নিচু করে ফেললেন। বাবা বললেন, নবনী উনি মহিলা কলেজের একজন শিক্ষক। আমাদের যে বাড়তি দুটা ঘর আছে। ঐ ঘর দুটা তিনি ভাড়া নেবেন।

আমি বললাম, বাবা আমি উনাকে চিনি। উনি আমাদের ইতিহাস পড়ান।

ইতিহাস পড়ান? বলিস কি। আমিতো ভেবেছি এরাবিকের টিচার।

স্যার মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনারেল হিস্ট্রীতে এম. এ. করেছি।

বাবা উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ও আচ্ছা। তাহলে তো ভালই হল। গুড। ভেরী গুড। একসেলেন্ট।

আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, কেমন আছেন স্যার? তিনি ঠিক আগের মতই মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাল। তুমি ভাল আছ নবনী?

স্যার যে আমার নাম জানেন তা জানতাম না। আমি চমকে উঠলাম।

চা নিন স্যার। চুমুক দিয়ে দেখুন চিনি হয়েছে কি-না।

স্যার আমার দিকে তাকালেন। কি আশ্চর্য এত সুন্দর চোখ! কি শান্ত! কি মায়াকাড়া! না-কি এসব আমার কল্পনা। স্যার চোখ নামিয়ে নিয়েছেন। আমার বলতে ইচ্ছা করছে, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে চা খানতো স্যার। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? মেঝেতে কি আছে দেখার?

টিয়া পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শোনা যাচ্ছে।

ভোর হয়ে গেছে। বৃষ্টি এখনো থামে নি। আমি দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি আমাদের বিদায়ের আয়োজন চলছে। ভোর বেলা ট্রেন। এক্ষুণি রওনা না হলে ট্রেন ধরা যাবে না। বড় মামা সবাইকে তাড়া দিচ্ছেন।

আমার সমস্যার গল্প আজ আর বলা হল না।

০৩. ঢাকার বাসা

আমি ঢাকায় ওর বাসায় উঠে এলাম।

সেগুন বাগিচায় অফিসের সাথেই বাসা। একতলা দোতলা জুড়ে অফিস। দোতলার পেছন দিকে ওর বাসা। একটা মোটে ঘর। বারান্দার খানিকটা অংশ আলাদা করে রান্নাঘর। গ্যাসের ব্যবস্থা নেই। কেরোসিনের চুলায় রান্না। বারান্দায় অন্য মাথায় বাথরুম। বাথরুম এবং রান্নাঘরের মাঝের ফাঁকা জায়গাটার আট-দশটা ফুলের টব। সপ্তম আশ্চর্যের মত সেখানে একটা পাখির খাঁচায় ময়না পাখি।

ও খুব আগ্রহ করে বলল, বুঝলে নবনী! এই ময়না মানুষের চেয়ে সুন্দর করে কথা বলে। দুদিন যাক, দেখবে তোমার গলা হুবহু নকল করবে। ও নকলে খুব ওস্তাদ।

ময়না বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। কোন কথা বলছে না। আমি বললাম, কই, কথা বলছে না তো?

হঠাৎ তোমাকে দেখেছে— এই জন্যে। কয়েকদিন যাক, তারপর দেখবে ওর কথার যন্ত্রণায় থাকতে পারবে না। আমার বাড়ি-ঘর তোমার পছন্দ হয় নি, তাই না নবনী?

হয়েছে।

পছন্দ যে হয় নি সেটা তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। একা মানুষ তো, বিরাট বাড়ি নিয়ে কি করব? তাছাড়া বাড়িটা কিন্তু ভাল। খুব হাওয়া। ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। ছাদে যাওয়া যায়। ছাদে যাবে? আচ্ছা, পরে তোমাকে নিয়ে যাব। টায়ার্ড হয়ে এসেছ, এখন রেষ্ট নাও। আমি চা নিয়ে আসি।

ও ঘর থেকে ফ্লাস্ক নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে গেল। এই বাসার সব কিছুই ছোট ছোট। সে যে ফ্লাস্কটা নিয়ে বের হয়েছে সেটিও ছোট। এক কাপ চা ধরবে কি-না কে জানে। আমি ঘুরে-ফিরে তার সংসার দেখতে লাগলাম।

শোবার ঘরে একটা খাট। সেই খাটে একটাই বালিশ। আমার জন্যে দ্বিতীয় বালিশ কেনে নি। হয়ত আজি সন্ধ্যাবেলা বালিশ কিনতে যাবে। কিংবা কে জানে হয়তো একটা বালিশেই দুজনকে ভাগাভাগি করে ঘুমুতে হবে। একটা লেখার টেবিল খাটের সঙ্গে লাগানো। টেবিলের সঙ্গে চেয়ার নিই। কাজই ধরে নেয়া যায় লেখালেখির কাজ খাটে বসে। সারা হয়। টেবিলের পাশে মিটাসেফের মত আছে। সেখানে নতুন একটা টি-সেট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই টি-সেট এখনো ব্যবহার করা হয় নি। কাপড় রাখার আলনা আছে। আলনায় কাপড় নেই। কয়েকটা তোয়ালে এবং গামছা–ভাজ করে রাখা। কে জানে হয়ত তোয়ালে রাখার জন্যেই এই আলনা।

দেয়ালে কিছু বাঁধানো ছবি আছে। একটি তার বাবার ছবি। চেহারার মিল থেকে বলে দেয়া যায়। তার পাশের ছবিটি বোধহয় তার মার। এই মহিলা খুব রূপবতী ছিলেন।

ফ্রেম বাধানো নজরুল ইসলামের একটা হাতে আঁকা ছবি আছে। ছবির নিচে লেখা Art by Noman Class VIII, Section B. সাহেব তাহলে ছেলেবেলায় শিল্পী ছিলেন।

খাটের নিচে রাজ্যের জিনিস। তার মধ্যে মাটির পালকি এবং পুতুল আছে। এইগুলি কি জন্যে রাখা কে জানে। জিজ্ঞেস করতে হবে।

আমি হাত-মুখ ধোবার জন্যে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমটা ঝকঝকে। আমাদের নেত্রকোনার বাড়ির বাথরুমের মত অন্ধকার এবং স্যাঁতসেঁতে নয়। সবচে বড় কথা-বাথরুমের উপরের দিকে ভেন্টিলেটারের মত আছে, যে ভেন্টিলেটার দিকে আকাশ দেখা যায়। গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে আকাশ দেখার মত আনন্দের আর কি আছে?

মুখে পানি ঢালতেই শরীর জুড়িয়ে গেল। হঠাৎ করে মনে হল আমাদের দুজনের জন্য এরকম একটা ঘরেরই দরকার ছিল।

ও শুধু চা আনেনি, একটা ঠোঙায় কিছু জিলাপী। আরেক ঠোঙায় কিছু নোনতা বিসকিট। সে মিটসেফ থেকে কাপ বের করছে। আমি দেখলাম, দুটা না, সে একটা কাপ বের করেছে। ঐ কাপটি সে এগিয়ে দিল আমার দিকে। নিজে চা ঢালিল ফ্লাস্কের মুখে। যেন আমি খুব সম্মানিত একজন মেহমান। বাইরের কেউ।

নবনী! টি-সেটটা নতুন কিনেছি। সুন্দর না?

হ্যাঁ, খুব সুন্দর।

সেট হিসেবে কিনলে দাম বেশি লাগে। আমি আলাদা আলাদা কিনে সেট বানিয়েছি অনেক সস্তা পড়েছে।

আচ্ছা।

বিকালে তোমাকে নিয়ে বের হতে হবে। টুকটাক অনেক জিনিস কিনতে হবে। তোমার কি কোলবালিশ লাগে?

না।

তোমার জন্য একটা ড্রেসিং টেবিল কিনেছি। এগার তারিখ ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল, নিতে গেলাম, বলে–পালিশ হয় নাই। এখন বোধহয় পালিশ হয়ে গেছে, নিয়ে আসব। আরেকটু চা দেই, ফ্লাস্কে চা আছে। তিন কাপ চা আটে।

আমি ওকে খুশি করার জন্যেই আরেকটু চা নিলাম। শরবতের মত মিষ্টি চা। মুখে দিলেই পেটের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত মিষ্টি হয়ে যায়।

নবনী শোন, আমি অফিসে যাই। কিছু জরুরি কাজ ছিল। তুমি একা থাকতে পারবে তো?

পারব।

গোসল সেরে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়। তুমি টায়ার্ড হয়ে আছ তোমার ঘুম দরকার।

ও আচ্ছা।

এক-একা ভয় পাবে না তো?

ভয় পাবার কিছু আছে কি?

ভয় পাবার কিছুই নেই। খুব সেইফ জায়গা। অফিসের তিনজন দারোয়ান আছে। এরা সব সময় পাহারা দেয়। আর আমি তো আছিই। আমি মাঝে মাঝে খোঁজ নিয়ে যাব।

খোঁজ নিতে হবে না। আমি ভালই থাকব।

ছোট বাসা দেখে তোমার মন খারাপ হয়নি তো নবনী?

না।

দিন এরকম থাকবে না। নিজেই এক সময় ব্যবসা শুরু করব। এ্যাড ব্যবসার ব্যাপার-স্যাপার। আমি এখন সবই জানি। সাহস করে শুরু করলেই হয়। আরেকটু চা দেই? ফ্রাস্কে আছে খানিকটা।

ও চা ঢেলে দিল। তার মুখ হাসি-হাসি। বারান্দায় ময়নাটার কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে বলল–কথা বল, এই ময়না, কথা বল। বল দেখি– নবনী! নবনী!

ময়না খাঁচার ভেতর ছটফট করছে। কথা বলছে না। আমি খাটে বসে। দেখছি, ও পকেট থেকে কলা বের করে খোসা ছাড়িয়ে সে ময়নাকে দিচ্ছে। গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে প্রায় অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলছে–কথা বল না রে বাবা। বলী–নবনী! নবনী! কি হয় কথা বললে?

আমাকে শুনানোর জন্যেই বেচারার এই চেষ্টা। এই পৃথিবীতে তার যা কিছু দেখানোর আছে সবই সে আমাকে দেখাতে চায়। আমাকে অভিভূত করাই তার व्लझा। ऊाद्ध अgशा७न छिल्ल না।

আমি বললাম, নজরুলের এই ছবি কি তোমার আঁকা? সে লজ্জিত গলায় বলল, হুঁ। ফেলে দেয়া উচিত। ফেলতে পারি না। মায়া লাগে।

ফেলার দরকার কি সুন্দর ছবিতো। এখনো কি ছবি আঁক? না না। কিযে তুমি বল। স্কুলে পড়ার সময় খুব আঁকতাম। নবনী আমি যাই। তাড়াতাড়ি চলে আসব।

সম্পূর্ণ নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। অচেনা ঘরের অচেনা খাটে আমি শুয়ে আছি। ঘরের আলো কমে এসেছে। আবারও মেঘ করেছে। মনে হয়। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। নামুক বৃষ্টি, সব ভাসিয়ে নিয়ে যাক। বৃষ্টি নামলে ময়নাটা ভিজবে। আমি কি ওকে নিয়ে আসব ভেতরে? না-কি ওর পানিতে ভিজে অভ্যাস আছে?

নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন না, একটা পাখির কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। গাঢ় ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বৃষ্টি পড়ছে। ঘুমের মধ্যেই পাখিটার ছটফটানি কানে গেল এবং একসময় পাখিটা নবনী নবনী বলে আমাকে ডাকতেও লাগল। এটা হয়ত আমার ভুল। হয়ত আমার স্বপ্নের ক্ষুদ্র অংশ। কিছু কিছু সময়ে মানুষের স্বপ্ন ও সত্য মিলে-মিশে এক হয়ে যায়। পাখিটা আমাকে ক্ৰমাগত ডাকছে— নবনী, নবনী। কি মিষ্টি, কি সুরেলা তার গলা! বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারদিক।

আমার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। বৃষ্টি নেই— চারদিক খটখট করছে। পুরোটাই তাহলে স্বপ্ন ছিল? আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। নোমানকে দেখা যাচ্ছেহাতে পলিথিনের দুটা ব্যাগ। ব্যস্ত ভঙ্গিতে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। সে কি অফিস থেকে আবার বাজারে গিয়েছিল?

বারান্দার দরজা খুলে আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি। ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। ও আসুক। ও এলেই বাতি জ্বালাব।

নবনী, খুব দেরি করে ফেললাম। অফিস থেকে বের হতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। নতুন একটা পার্টি এসেছে। কাজ নেই, শুধু বকর বকর করে। অফিস থেকে বের হয়েই একবার উঁকি দিয়েছি। দরজা বন্ধ কয়েকবার ঠিক ঠক করলাম। দরজা খুলল না। বুঝলাম তুমি ঘুমোচ্ছ চলে গেলাম ড্রেসিং টেবিলটার খোঁজে। ওদের সঙ্গেও নানান ঝগড়া।

ঝগড়া কেন?

আর বল কেন? এখনো পালিশ হয় নি। কারিগর না-কি ছুটিতে গেছে। পুরো টাকা অ্যাডভান্স দেয়া, নয়ত অন্যখান থেকে কিনতাম। তোমার ঘুম হয়েছে?

হ্যাঁ।

চল আমরা বের হই। মেলা কাজ। টুকটাক জিনিস কিনব। রাতে আবার দাওয়াত।

দাওয়াত খেতে ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছা না করলেও যেতে হবে। উপায় নেই। আমার বস দাওয়াত দিয়েছে। সফিক। তোমাকেতো আগেই বলেছি আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। তারই এ্যাড ব্যবসা। সফিকের আমার বিয়েতে যাবার কথা ছিল। যেতে পারল না–ব্যাংকক যেতে হল। ও আজ সকালের ফ্লাইটে এসেছে।

তোমার খুব ভাল বন্ধু?

অবশ্যই ভাল বন্ধু। তুই তোকারি সম্পর্ক। আমি যে এত ছোট একটা কাজ করি এটা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। শুধু যে আমার সাথেই এই ব্যবহার তা না, সবার সাথে। অফিসের দারোয়ানের মেয়ের বিয়ে। অফিসের কেউ যায় নি–সফিক গিয়েছিল। তোমাকে নিয়ে এসেছি শুনে তৎক্ষণাৎ সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসছিল। তুমি ঘুমোচ্ছ ভেবে আনি নি।

এলে সমস্যাও হত। তাকে বসাতে কোথায়? শোবার ঘর ছাড়া এখানে আর ঘর কোথায়?

শোবার ঘরেই বসতাম। সমস্যা নেই। ও পা মেলে মেঝেতে বসে কতদিন চা খেয়েছে। মানুষ হিসেবেও অসাধারণ। দেখলেই বুঝবে। ফ্লাস্কটা দাও তো নবনী। চা নিয়ে আসি। চা খেয়েই বের হয়ে পড়ি।

ঘরে চা বানানোর ব্যবস্থা নেই?

না। আজ সব কিনব। আমি চা খাই না তো, এই জন্যে ব্যবস্থা রাখি নি। তুমি তো আবার খুব চা খাও।

কে বলল?

বাসররাতে তোমার ছোটখালা চা নিয়ে এলেন, তুমি খুব আরাম করে খেলে— সবটা চা শেষ করলে। সেখান থেকেই বুঝলাম।

ও হাসছে। সুন্দর করে হাসছে। আমার গোপন রহস্য ধরে ফেলেছে, সেই রহস্যভেদের হাসি। আনন্দ ও তৃপ্তির হাসি।

ফ্লাস্ক নিয়ে যাবার পথে ও আবার ময়নাটার সামনে দাঁড়াল। আবার সেই অনুনয়-বিনয়–বল ময়না, বল, বল— নবনী। বল তো দেখি। সুন্দর করে বল— নবনী। ন-ব-নী। কলা খেতে দেব। কলা।

ময়না কথা বলার সেই আশ্চর্য বিদ্যা গোপন করেই রাখল। একবার ডেকে ফেললে কি হয়? বেচারা এত চেষ্টা করছে। কে জানে আমার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই সে হয়ত নবনী ডাক শেখানোর চেষ্টা করছে।

ও ফ্লাস্ক নিয়ে চলে যাবার পরপরই ময়না ডেকে উঠল। অবিকল ওর মত গলায় ডাকল— নবনী! নবনী! আমার সারা গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। শরীর ঝিম ঝিম করতে লাগল। কি অদ্ভুত ব্যাপার!

নোমান গেটের কাছ থেকে আবার ফিরে আসছে। হনাহন করে আসছে। পাখির কথা শুনতে পেয়ে আসছে বলে মনে হয় না। পাখির গলা এতদূর যাবে না। অন্য কিছু হবে। হয়ত মানিব্যাগ ফেলে গেছে।

নবনী!

কি?

তোমার জ্বর-টর আসে নি তো? অফিস থেকে ফিরে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল জ্বর এসেছে।

না, জ্বর আসে নি। তুমি কি জ্বরের খোেজ নেবার জন্যে ফিরে এসেছ?

হ্যাঁ। দেখি কাছে আস তো। জ্বর আছে কি-না দেখি।

আমি ওর কাছে এগিয়ে এলাম। ও আমার কপালে হাত রাখল। বেচারা আমার শরীর ছুঁয়ে দেখার জন্যে ছুটে এসেছে। জ্বরের মত একটা বাজে অজুহাত তৈরি করেছে। আমার বলতে ইচ্ছা করছে— শোন, তোমার যখনই আমাকে ছয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, ছয়ে দেখবে। লজ্জা, দ্বিধা বা সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। আমি তা বলতে পারলাম না। কিছু কথা আছে যা অতি প্ৰিয়জনদেরও বলা যায় না। তবে ওর এই ছেলেমানুষী কৌশল আমি আমার পরবর্তী জীবনে অনেক অনেকবার কাজে লাগিয়েছি।

যখন আমার নিজের ইচ্ছে করেছে ও আমাকে ছুঁয়ে দেখুক, তখনি বলেছিএই, দেখ তো আমার জ্বর কি-না। শরীরটা ভাল লাগছে না। ও আমার কপালে হাত রেখে বলেছে— গা পানির মত ঠাণ্ডা, জ্বর নেই তো।

আমি হোসে ফেলেছি। ও আমার হাসি দেখে হকচকিয়ে গেছে। তবে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে। বড়দের ছেলেমানুষী এক খেলা।

০৪. সফিক সাহেবের বাড়ি

দেখলে কত বড় বাড়ি?

সে এমনভাবে বলল যেন বাড়িটা ওর নিজের। আমি হাসলাম। ওর ছেলেমানুষিগুলো এখন আমার চোখে পড়তে শুরু করেছে। দোকানে কেনাকাটার সময় প্রথম চোখে পড়ল। যা দেখছে তা-ই দাম করছে। জাপানি একটা ডিনার সেট দাম করল। বাহান্ন পিসের সেট— দাম তের হাজার টাকা। সে গম্ভীর গলায় বলল, ফিক্সড প্রাইস? ভাবটা এ-রকম যেন ফিক্স্ড প্রাইস না হলে সে দরদাম করে কিনে ফেলবে। দোকানদাররা মানুষ চেনে। কে কি কিনবে বা কিনবে না তা চট করে ধরে ফেলে। সে জবাব পর্যন্ত দিল না। নোমান তাতে অপমানিত বোধ করল না বা রাগ করল না, পাশের দোকানে ফুলদানি দরদম করতে লাগল। এক একটার দাম দুহাজার টাকা। এমনভাবে দাম করছে যেন দুহাজার টাকা দামের ফুলদানি কয়েকটা কিনবে।

সফিক সাহেবের বাড়িতে ঢোকার পর থেকে সে আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে যে এত সুন্দর বাড়ি এই শহরে আর নেই। বাড়িতে কয়টা ঘর, কয়টা বাথরুম সমানে বলে যাচ্ছে। আমরা বসার ঘরে বসে আছি। ঝাড় বাতি টাতি দিয়ে এই ঘর এমন সাজানো যে এখানে বসে থাকতে ভাল লাগে না। মনে হয়। সিনেমার একটা বাড়িতে বসে আছি। সফিক সাহেবকে খবর পাঠানো হয়েছে। তিনি এখনো নামছেন না। আমরা যেখানে বসে আছি সেখান থেকেই দোতলার সিঁড়ি চলে গেছে। ভদ্রলোক এই সিঁড়ি ধরেই নামবেন। মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। এই সিঁড়িতে কোনদিন হয়ত এক কণা ধূলিও পড়ে থাকে না। আমি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছি।

নবনী, বল তো এ বাড়ির বৈশিষ্ট্য কি?

তা তো বটেই, এ ছাড়া কি?

বলতে পারছি না।

এ বাড়ির ছাদে কি আছে বল?

ফুলের বাগান?

বাগান তো আছেই। রোজ গার্ডেন। এ ছাড়া কি আছে বল তোমাকে আগে বলেছিলাম। বাসর রাতে। মনে নেই?

মনে করতে পারছি না।

সুইমিং পুল। বিশাল সুইমিং পুল। বাড়ির ছাদে সুইমিং পুল থাকে কখনো শুনেছ?

না।

সফিকের আছে। চাঁদনী রাতে যে কি সুন্দর দেখা যায়! পানিতে চাঁদের ছায়া পড়ে। তখন বাড়ির সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়। মেজাজ ভাল থাকলে অহনা ভাবী গান গান। উনি খুব সুন্দর গান জানেন।

তাই না-কি?

হ্যাঁ। উনি টিভির এ গ্রেডের শিল্পী। তবে টিভিতে খুব কম যান। গত মাসে প্রোগ্রাম পেয়েছিলেন যান নি।

সফিক সাহেব দোতলা থেকে নামছেন না। আমরা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। নোমানের তাতে অসুবিধা হচ্ছে না। সে বাড়ির গল্প করেই যাচ্ছে। আমার অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে খানিকক্ষণ পর দোতলা থেকে একটা কাজের লোক নেমে এসে বলবে, আজ উনার শরীরটা ভাল না, আরেকদিন আসুন। বুঝতে পারছি না। আমরা কতক্ষণ বসে থাকব। নোমানের মনে হয় বসে থাকতে ভালই লাগছে।

নবনী!

উঁ।

ছাদের উপর এই যে এত বড় সুইমিংপুল কিন্তু সফিক এখন পর্যন্ত পানিতে নেমে দেখে নি।

কেন?

ও না-কি সুইমিং পুল বানিয়েছে পানি দেখার জন্যে। গোসলের জন্যে তার শাওয়ারই ভাল। অন্যের গোসল করা নোংরা পানিতে সে নামবে না। হা হা হা। ওর কথাবার্তার তুমি কোন ঠিক পাবে না। তবে ও যা বলবে মনে হবে সেটাই সত্যি।

উনাদের ছেলেমেয়ে কি?

এখানো ছেলেমেয়ে হয় নি। মাত্র দুবছর আগে বিয়ে করেছে। ভাবী হলেন খুলনার মেয়ে।

ও আচ্ছা।

এত সুন্দর বাড়ি কিন্তু সফিকের পছন্দ না। ও তার নিজের ডিজাইনে আরেকটা বাড়ি বানাবে। ডিজাইন না-কি করা শুরু করেছে।

উনি কি আর্কিটেক্ট?

আরে না। পড়াশুনা করেছে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে, তবে সে ইচ্ছা করলে বাড়ি ডিজাইন আর্কিটেক্টের চেয়ে অনেক ভাল করবে। যে কোন আর্কিটেক্টের কান কেটে নিয়ে আসবে। ও পারে না এমন জিনিস নেই। এখন কি ঠিক করেছে জান? ছবি বানাবে। মুভি ক্যামেরা, লাইট ফাইট কিনে এলাহি কারবার করেছে।

তাই বুঝি?

মুভি ক্যামেরার দামই পড়েছে ১৪ লাখ টাকা। টাকা অবশ্যি তার কাছে কোন ব্যাপার না। ওর কাছে ১৪ লাখ যা ১৪ হাজারও তা।

উনি এখনো আসছেন না কেন?

আসবে। কাজে আটকা পড়ে গেছে আর কি? তোমার কি বসে থাকতে খারাপ লাগছে?

হ্যাঁ লাগছে।

এসো তাহলে সফিকের লাইব্রেরিটা দেখ। লাইব্রেরি দেখলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। দেখার মত জিনিস। হেন বই নাই যা তুমি লাইব্রেরিতে পাবে না। আসি তোমাকে লাইব্রেরি দেখাই।

লাইব্রেরি দেখতে ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছা করছে না কেন?

বুঝতে পারছি না। মনে হয়। শরীর খারাপ করেছে।

মাথা ধরেছে?

হুঁ।

জ্বর না-কি দেখি, কাছে আস তো।

সে আমার জ্বর দেখল। আর তখনি সফিক সাহেব দোতলা থেকে নেমে এলেন।

ফর্সা লম্বা একজন মানুষ। মাথাভরতি কোঁকড়ানো চুল। বড় বড় চোখ। তার গায়ে নীল রঙের। হাফ হাওয়াই শার্ট। পরনের প্যান্ট ধবধবে সাদা। ভদ্রলোক নামছেন হাসতে হাসতে। পায়ে চটি থাকার জন্যেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে ফটফট শব্দ হচ্ছে। চটিতে এত শব্দ হবার কথা না। তিনি বোধহয় ইচ্ছে করেই শব্দ করছেন। কিংবা কে জানে বড়লোকরা হয়ত এই ভাবেই নামে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভঙ্গিতে বললেন, দাঁড়িয়ে পড়েছ যখন তখন আর বসার দরকার নেই—চল আমরা সরাসরি গাড়িতে উঠবো। আর শোন নবনী, তোমার আমি তুমি করে বলছি। নোমানকে তুই করে বলি, তার স্ত্রীকে আপনি করে বলা সেই কারণেই শোভন না। তবু তোমার আপত্তি থাকলে এক্ষুণি বলে ফেল। প্রথমেই ডিসিসান হয়ে যাক। আপনি না তুমি?

আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।

আমার ইচ্ছা ছিল এ বাড়িতেই তোমাদের খাওয়াব। আমার স্ত্রী সেই উপলক্ষে রান্নাবান্নাও করেছে। কিন্তু সন্ধ্যার পর ঝগড়া করে সে বাড়ি থেকে উধাও হয়েছে। কাজেই হোটেল ছাড়া গতি নেই। আমি যে নিচে নামতেই দেরি করেছি তার মূল কারণ অহনাকে টেলিফোনে ট্রেস করার চেষ্টা করছিলাম। ঢাকা শহরে তার একলক্ষ পরিচিত মানুষ। সে কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে।

নোমান বলল, ভাবী নেই! বলিস কি?

তুই দেখি আকাশ থেকে পড়লি! ও তো এরকম করেই।

আমি বললাম, আজ না হয় বাদ থাকুক। আমরা অন্য একদিন আসব।

অন্য একদিন যে অহনাকে পাওয়া যাবে তোমাকে কে বলল? হোটেলে রিজার্ভেশন নেয়া আছে। চল যাই।

ভদ্রলোক এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। অপরিচিত একজন মানুষ যখন এভাবে তাকিয়ে থাকেন তখন অস্বস্তি লাগে। কিন্তু উনি যে তাকিয়ে আছেন— তাতে অস্বস্তি লাগছে না। কেন লাগছে না, তাও আমি বুঝতে পারছি না। তিনি হঠাৎ বললেন, নবনী দাড়াও। তোমার একটা ছবি তুলে রাখি। এই মুহূর্তে তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। সৌন্দর্য কোন ধ্রুব ব্যাপার না। ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। আজ তোমাকে অপূর্ব লাগছে তার মানে এই না যে কালও লাগবে। সুন্দর যখন লাগছে তখন তা ধরে রাখা যাক। তুমি দাড়াও।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। নোমান বলল ওর আচার-আচরণ আধা পাগলের মত। তুমি ওর কথায় অস্বস্তি বোধ করছ না তো?

না।

অস্বস্তি বোধ করবে না। সফিকের স্বভাবই এরকম। ওর মধ্যে লোকাছাপার কোন ব্যাপার নেই।

এত বড় হোটেলে আমি আগে কখনো আসি নি। পুরোপুরি হকচকিয়ে যাবার মত ব্যাপার। অথচ নোমান খুব সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছে। মনে হচ্ছে ও তার বন্ধুর সঙ্গে আগেও অনেকবার এসেছে। সফিক সাহেব হোটেলে পা দেবার পর থেকে আমার দিকে তেমন লক্ষ্য করছেন না। তিনি তাঁর বন্ধুকেই নিচু গলায় ক্রমাগত কি-সব যেন বলছেন। সেও খুব চিন্তিত মুখে শুনছে। আমি যে তার সামনে আছি। এটা বোধহয় সে আর জানে না।

ডাইনিং হলের ঠিক মাঝখানে চারজনের টেবিলে আমরা আছি। আমি এবং নোমান পাশাপাশি বসেছি। সফিক সাহেব বসেছেন আমাদের সামনে। তিনি নোমানের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে হঠাৎ আমাকে বললেন, চারজনের টেবিল কেন নিয়েছি জানি নবনী? চারজনের টেবিল নিয়েছি, কারণ হঠাৎ অহনা এসে উপস্থিত হতে পারে। তার রাগ যেমন চট করে উঠে আবার তেমনি চট করে পড়ে যায়। যদি এ রকম কোন ঘটনা ঘটে তাহলে সে খুঁজে পেতে বের করবে আমরা কোথায় আছি। তারপর হাসিমুখে উপস্থিত হবে। যেন কিছুই হয় নি। এ জন্যেই আমি খাবারের অর্ডার এখনো দিচ্ছি না। অপেক্ষা করছি। তোমার খিদে পায় নি তো?

জি না।

গুড। খিদেটা জমুক। খিদে ভালমত না জমলে খেতে পারবে না। যে হোটেল যত জমকালো তার খাবার তত খারাপ। নোমান, তুই মৃণালদের বাড়িতে একবার টেলিফোন করে দেখ তো। অহনা সেখানেও থাকতে পারে। আমি করেছিলাম, আমাকে নো বলে দিয়েছে। তোকে বোধহয় বলবে না।

ও উঠে চলে গেল। সফিক সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে আমার দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ করে বললেন, নবনী শোন! তোমার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা

কথা শুনে ওর মনে বোধহয় কনফিউশন তৈরি হয়েছিল। আমি তাকে বলেছি এসব কথাবার্তায় কান না দিতে। মফস্বল শহরে মোটামুটি যারা রূপবতী তাদের নিয়ে নানা গল্পগাথা তৈরি হয়। মেয়েগুলোর জীবন হয় অতিষ্ঠ। তুমিতো আর মোটামুটি রূপবতী না। ভয়ঙ্কর রূপবতী। তোমাকে নিয়ে একশ একটা গল্প তৈরি হবার কথা। যাই হোক আমি নোমানকে বলে দিয়েছি ও যেন তোমার অতীত নিয়ে কখনোই প্রশ্ন না করে। ওকি কিছু জিজ্ঞেস করেছে?

না।

একবার যখন না বলে দিয়েছি তখন আর প্রশ্ন করবে না। আর যদি করেও তুমি কিছু বলবে না।

আমার বলার মত কিছু নেই।

থাকলেও বলবে না। নতুন বিয়ে হওয়া স্বামীর সঙ্গে দ্রুত ভাব করার জন্যে গড় গড় করে অনেক কিছু বলে দেয়। পরে সমস্যা হয়। নোমান ভাল ছেলে। আমি তাকে খুব পছন্দ করি। আমি চাই না— তুচ্ছ সব বিষয় নিয়ে…

সফিক সাহেব চুপ করে গেলেন, কারণ নোমান ফিরে আসছে। আমার বিরক্ত লাগছে। আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপারে উনি কথা বলছেন কেন? তাছাড়া আমার সঙ্গে আজই তার প্রথম কথা হচ্ছে। প্রথম আলাপে এ জাতীয় প্ৰসঙ্গ তোলার কোন কারণ আছে কি?

সফিক সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে বললেন–পাওয়া গেছে?

না।

কোথায় আছে কিছু বলল?

নোমান মিটিমিটি হাসছে। কোন একটা আনন্দের খবর গোপন করতে গিয়ে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা যেভাবে হাসে সে রকম হাসি। সফিক ওর হাসি দেখেই বললেন, ও কি হোটেলের দিকেই রওনা হয়েছে?

হ্যাঁ।

গুড। তাহলে খাবারের অর্ডার দেয়া যাক। আমি আমার পছন্দেই খাবার দিতে বলি। এদের সব খাবার মুখে দেয়া যায় না। দু-একটা আইটেম শুধু এরা ভাল করে।

সফিক সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, আমি যে একটা ছবি বানাচ্ছি। নোমান কি তোমাকে বলেছে?

জ্বি বলেছে।

সেই ছবির নায়িকাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবে। তবে নায়িকার গায়ের রং কালো। কালো রঙের নায়িকা বাংলাদেশে চলবে বলে মনে হয় না। এদেশের নায়িকাদের গায়ের রং হতে হয় দুধে আলতায় এবং ওজন হতে হয় তিন মণের বেশি।

আমি লক্ষ্য করলাম। সফিক সাহেব আনন্দে ঝলমল করছেন। স্ত্রী আসছে। এই খবরে কারও মুখ এত আনন্দময় হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। ভদ্রলোককে এখন আমার ভাল লাগছে। অহনা নামের মেয়েটি মনে হচ্ছে খুব ভাগ্যবতী। আমি ভদ্রমহিলার জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।

তিনি চলে এলেন দশ মিনিটের মাথায়। তার গায়ের রঙ কালো। বেশ কালো। কিন্তু সেই কালো রঙেও একটা মানুষকে যে এত সুন্দর দেখা যায় আমি জানতাম না। হালকা কমলা রঙের সিল্ক শাড়ি পরেছেন। বেণী করা চুলের গোড়ায় ছোট ছোট নীল রঙের ফুল। নিশ্চয়ই প্লাস্টিকের ফুল। সত্যিকার ফুল নীল হয় না। তবে দেখাচ্ছে সত্যি ফুলের মতই। তিনি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলেন। তার ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ডাইনিং রুমটাও যেন হেসে উঠল।

সফিক সাহেব বললেন, তুমি যে আসবে আমি জানতাম। এই দেখ তোমার জন্যেই ডাইনিং রুমের মাঝখানে টেবিল নিয়েছি। নবনী শোন, এই কালো মেয়েটা কোণার দিকের টেবিলে বসতে পারে না। ও সব সময় বসবে মাঝখানে।

অহনা বললেন, অবশ্যই আমি মাঝখানে বসব। এমনভাবে বসব যেন সবাই তাকায় আমার দিকে। এই দেখ এক্ষুণি তাকানো শুরু করেছে।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি। ওরা নিজেদের মধ্যেই কথা বলছেন। আমরা দুজন যে আছি সেদিকে ওঁদের খেয়াল নেই। সফিক সাহেব একবার বললেন, অহনা, নোমানের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বল। ওর নাম নবনী। দেখা কি ভয়ঙ্কর সুন্দর! প্ৰায় তোমার কাছাকাছি।

ভয়ঙ্কর বলছি কেন? সুন্দর কি ভয়ঙ্কর হয়?

মাঝে মাঝে হয়।

অহনা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। হেসেই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন–চিংড়ি মাছ খেলে কোলেস্টরেল বাড়ে না কমে এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হল। অহনার ধারণা, কোলেক্টরেল কমে যায়। সফিক সাহেবের ধারণা তা না।

সফিক সাহেব বললেন, এত জিনিস থাকতে আমরা চিংড়ি মাছ নিয়ে আলোচনা করছি কেন?

অহনা এতে খিলখিল করে হাসতে শুরু করলেন। যেন দারুণ মজার কথা। এদের সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকতে আমার এত খারাপ লাগছে! নোমানের লাগছে না। ওরা যখন হাসছে নোমানও হাসছে। এরা যখন গভীর কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছে তখন সেও গম্ভীর মুখে কথা শুনছে। অহনা বললেন, নোমান, চিংড়ি মাছ সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?

আমার কোন ধারণা নেই ভাবী।

চিংড়ি মাছ খাওয়াটা কি মকরু না হালাল?

তাও জানি না।

তুমি দেখি কিছুই জান না। আচ্ছা একটা কাজ কর। চট করে হোটেলের শাপ থেকে আমার জন্যে একটা জিনিস নিয়ে এসো… মাথা ধরার টেবলেট। প্ৰচণ্ড মাথা ধরেছে। মাথা ধরা না কমলে কিছু খেতে পারব না।

ও সঙ্গে সঙ্গে রওনা হল। আমার ভাল লাগছে না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই মহিলা খুব সূক্ষ্মভাবে আমাকে দেখিয়ে দিতে চাচ্ছেন যে আমার অবস্থান অনেক নিচে। তাদের চাকর-বাকদের কাছাকাছি।

সফিক সাহেব কি বুঝতে পারছেন যে আমি নোমানকে এভাবে উঠিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা পছন্দ করি নি। কারণ তিনি কেমন যেন লজ্জিত ভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি কোমল গলায় বললেন, নবনী!

জ্বি।

চিংড়ি মাছ সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? এটা খাওয়া কি হালাল, মকরু না নিষিদ্ধ।

সামুদ্রিক চিংড়ি যদি হয় তাহলে হালাল। আমার একজন স্যার ছিলেন এই সব ব্যাপার খুব ভাল জানতেন। তিনি বলেছেন কোরান শরীফের একটা আয়াত আছে তাতে বলা হয়েছে— সমুদ্রের শিকার ও তার খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল।

সমুদ্রেতো সাপও আছে। সেই সাপও কি হালাল?

আমি কিছু বললাম না। সফিক সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। যেন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বিশেষ কিছু ধরার চেষ্টা করছেন। উনি কি আমার স্যারের ব্যাপারটা জানেন? জানলে কতটুকু জানেন?

অহনা আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, আপনাদের বিয়েতে আমাদের দুজনেরই যাবার কথা ছিল। ও ব্যাংকক চলে যাওয়ায় যেতে পারি নি।

আমি কিছু বললাম না। অহনা বললেন, আমি ডিনারের সঙ্গে রেড ওয়াইন নেব। এবং ডিনারের শেষে একটা সিগারেট খাব। আশা করি কিছু মনে করবেন না।

জ্বি না। কিছু মনে করব না।

খাবার চলে এসেছে। কত পদের খাবার যে আসছে। আমার ভালই খিদে কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না। নোমান ওষুধ নিয়ে ফিরে এসেছে। অহনা সেই ওষুধ টেবিলের এক কোণায় ফেলে রেখেছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে না এই ওষুধ তিনি খাবেন।

অহনা বললেন, চিংড়ি মাছ বিষয়ে আমি একটা কথা বলতে পারি। এই কথা শোনার পর নবনী আর চিংড়ি মাছ খাবে না বলে আমার ধারণা। কথাটা হল— চিংড়ি, কাঁকড়া এবং মাকড়শা এরা তিনজনই একই গোত্রের প্রাণী। এদের ডিম থাকে শরীরের বাইরে। চিংড়ি মাছ খাওয়া আর মাকড়সা খাওয়া একই ব্যাপার।

অহনার কথা শোনার পর আমি সতি সত্যি চিংড়ি মাছ খেতে পারলাম না। নোমান কয়েকবার সাধাসাধি করল। মুখ কাচুমাচু করে বলল, খাও না, খাও না। কত বড় বড় চিংড়ি। এগুলো তো আর মাকড়সা না।

অহনা কিছুই বললেন না। শুধু হাসলেন। সেই হাসি আমার ভাল লাগল না।

আমার খুব ক্লান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে এই খাবার টেবিলেই আমি ঘুমিয়ে পড়বা। আমার এ রকম মাঝে মাঝে হয়। হঠাৎ নিজেকে অসহায় এবং খুব ক্লান্ত মনে হয়। আশেপাশে কোথায় কি হচ্ছে, কে কি বলছে কিছুই বুঝতে পারি না। কারোর কোন কথাবার্তাও তখন কানে আসে না। চারপাশের কোলাহলের শব্দ স্তিমিত হয়ে আসে। মনে হয় আমি একাকী দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি। এইত আমার পাশেই নোমান বসে আছে। সে মাঝে মাঝেই হো হো করে হোসে উঠছে। গল্প শুনে হাসছে। হাসির গল্পগুলো যিনি বলছেন তার নাম অহনা। কালো একটি মেয়ে। কালো হয়েও পৃথিবীর সব রূপ যিনি নিজের শরীরে নিয়ে নিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই খুব ভাল গল্প করতে পারেন। কারণ গল্প শুনে শুধু যে নোমান হাসছে তা-না। সফিক সাহেব হাসছেন, অহনা নিজেও হাসছেন। তাদের হাসির শব্দে আশেপাশের সবাই ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। মজার মজার সব গল্প কিন্তু আমার কানে আসছে না। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। সফিক সাহেব হঠাৎ আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, নবনী তোমার কি শরীর খারাপ?

আমি বললাম, না।

তুমি কিছু খাচ্ছ না। খাবার ভাল লাগছে না?

লাগছে। চামচ দিয়ে আমি খাবার নাড়াচাড়া করছি। চামচগুলো কি রূপার? ঝকঝাক করছে। সারাক্ষণই ভয় হচ্ছে এই বুঝি হাত থেকে চামচ পড়ে যাবে। রূপার চামচ মেঝেতে পড়লে কেমন শব্দ হয়? রিনিঝিনি করে বাজে?

সফিক সাহেবের গাড়ি আমাদের বাসায় নামিয়ে দিল। নোমান বাসায় ঢুকতে ঢুকতে বলল, এরা কি রকম অসাধারণ মানুষ লক্ষ্য করলে? অহঙ্কার বলে এক বস্তু স্বামীস্ত্রী কারো মধ্যে নেই। ওয়াইন খেতে দেখলে তুমি অস্বস্তি বোধ কর, এই জন্যে অহনা ভাবী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওয়াইন নেয় নি। সিগারেটও খান নি। অহনা সিগারেট ছাড়া থাকতে পারে না। নবনী! নাও এই খামটা যত্ন করে তুলে রাখ।

আমি বললাম, কি আছে। এই খামে?

নোমান হতভম্ব গলায় বলল, কি আছে তুমি জান না।

না।

কি আশ্চৰ্য। অহনা নিজের হাতে এই খাম আমাকে দিল। তোমার সামনেই তো দিল। আমাদের বিয়ে উপলক্ষে গিফট?

আমি লক্ষ্য করি নি?

লক্ষ্য করি নি মানে?

অন্যমনস্ক ছিলাম।

সফিক তাহলে ঠিকই ধরেছিল–তোমার শরীর খারাপ।

কি আছে। এই খামে?

দশ হাজার টাকার একটা চেক আছে। ক্যাশ টাকা দিয়েছে আমরা নিজেরা যাতে নিজেদের পছন্দ মত কিছু কিনতে পারি। এই খাম নিয়ে কত কথাবার্তা হল— তুমি কিছুই শুনানি?

না।

খাম হাতে নোমান বোকা বোকা মুখ করে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল। আমার এই আচরণ সে যেন মিলাতে পারছে না। এক সময় বলল, চল ঘুমুতে যাই।

আমি বললাম, তুমি ঘুমাও আমি একটু পরে যাব।

তুমি কি করবে?

নিজের হাতে চা বানিয়ে এক কাপ চা খাব। তারপর ইরাকে একটা চিঠি লিখব। আসার পর ইরাকে কোন খবর দেয়া হয় নি। ও নিশ্চয়ই চিঠির জন্যে অপেক্ষা করছে।

চিঠি দিনের বেলা লিখলেই হয়।

দিনে আমি চিঠি লিখতে পারি না।

ও আচ্ছা।

তুমি কি চা খাবে? বানাবো তোমার জন্যে?

আমিতো চা একেবারেই খাই না। রাতে খেলে ঘুম হবে না।

প্রতি রাতে ঘুমুতে হবে। এমনতো কোন কথা নেই। চা খেয়ে তুমি জেগে। থাক। আমি এর মধ্যে চিঠি শেষ করে ফেলি। তারপর দুজন এক সঙ্গে ঘুমুতে যাব।

আচ্ছা।

আমি চা বানাচ্ছি। ও বসে আছে বারান্দায়। তার মাথার উপর ময়নার খাঁচা। খাঁচাটা এখন আবার কালো কাপড়ে ঢাকা। ময়নার খাঁচা না-কি কালো কাপড় দিয়ে না ঢাকলে ময়না ঘুমুতে পারে না। নোমান মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছে আমার দিকে। সম্ভবত আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে।

ইরা,
এই কিছুক্ষণ আগে আমি আমার সংসার শুরু করেছি। কেরোসিনের চুলায় চা বানিয়েছি দুজনের জন্যে। আমাদের বিবাহিত জীবনের প্রথম রান্না। চা তেমন ভাল হয় নি। ও কোথেকে যেন সস্তা ধরনের চায়ের পাতা এনেছে। অনেকক্ষণ জ্বাল দেবার পরেও রং আসেনি। পানসে ধরনের চা খেয়ে সে। বলেছে–এত ভাল চা সে জীবনেও খায় নি। এখন থেকে সে না-কি রোজ রাতে বারান্দায় বসে চা খাবে।
এখনো সে বারান্দায় বসে আছে। বেচারার বোধহয় ইচ্ছা আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমুতে যাবে। যেহেতু আমি চিঠি লিখতে বসেছি সে অপেক্ষা করছে। বারান্দায়। একজন আদর্শ স্ত্রীর উচিত এই অবস্থায় চিঠি লেখা বন্ধ করে। স্বামীর সঙ্গে ঘুমুতে যাওয়া। আমার মনে হয় আমি কোনদিনও আদর্শ স্ত্রী হতে পারব না–কারণ তোকে চিঠি লিখতেই আমার ভাল লাগছে। ও অপেক্ষা করুক। অপেক্ষায় আনন্দ আছে।
অপেক্ষা করুক। অপেক্ষায় আনন্দ আছে। তাছাড়া আমার মনে হয় বারান্দায় বসে থাকতেও তার ভাল লাগছে। অন্তত বসে থাকার ভঙ্গি থেকে তাই মনে হয়। বসে থাকার মধ্যেও সুখী সুখী এবং দুখী দুখী ভঙ্গি আছে। ও বসে আছে সুখী সুখী ভঙ্গিতে।
আমি কেমন আছি। এই দিয়ে শুরু করি। ভাল আছি। নিরিবিলিতে শান্তিতে আছি। আমাদের দুজনের ছোট্ট এক কামরার ঘর। দুটি মাত্ৰ প্ৰাণী। ভুল বললাম, দুটি না তিনটি প্রাণী। একটা পোষা ময়না। ও বলছে ময়না না-কি রাজনীতিবিদদের মত ক্রমাগত কথা বলে। তবে আমি এখনো তার কোন কথা শুনি নি। ও আচ্ছা একবার শোনেছি। ময়নাটা পুরুষের মত গলায় বলেছে নবনী! ঠিক করেছি। কাল ভোর থেকে সংসার গুছাব। তবে সংসা গুছানোরও কিছু নেই। সবই গোছানো। আমার কাজ হল এই গোছানো সংসারে নিজের জায়গা করে নেয়া। সেই জায়গা করে নিতে খুব অসুবিধা হয় নি। কোন মেয়েরই বোধহয় হয় না। নোমান সম্পর্কে বলি (স্বামীর নাম ধরে লিখলাম বলে ভুরু কুঁচকাচ্ছিসনাতো?) মানুষটা ভালই। ওর মধ্যে সরল সরল ব্যাপার আছে। জটিলতা তেমন নেই। নেই বলেই ভয়ে ভয়ে আছি। আমরা মানুষের জটিলতা দেখেই অভ্যস্ত। সারল্যাকে আমরা ভয় করি। কারো ভেতর ঐ ব্যাপারটি দেখতে পেলে থমকে যাই এবং আমাদের মনের একটি অংশ বলতে থাকে–নিশ্চয়ই কোন একটা রহস্য আছে।
মানুষটার ভেতর রহস্য তেমন নেই। সাদাসিধা মানুষ। একটু বোধ হয় কৃপণ। প্রতিটি পয়সা হিসেব করে খরচ করে। চা খাব বলে চিনি কিনে এনেছে–ছোট্ট একটা পুটলায় এতটুকু চিনি। তার ময়না পাখিটার জন্যে কলা কিনে এনেছে। একটা কলার অর্ধেকটা কেটে খাইয়েছে বাকি অর্ধেক পলিথিনের ব্যাগে মোড়ে রেখে দিয়েছে। পরে খাওয়াবে।
আমি বাথরুমে গোসল করলাম। সাবানটা মেঝেতে ফেলে এসেছিলাম। পরের বার ঘরে ঢুকে দেখি সেই সাবান সে সোপকেসে তুলে রেখে বাথরুমের মেঝে ন্যাকরা দিয়া মুছেছে। যাতে মেঝেটা শুকনো খটখট করে। আমাকে অবশ্যি কিছু বলে নি। পৃথিবীর সব স্বামীই বিয়ের পর পর স্ত্রীদের উপর তাদের যে অধিকার আছে সেই অধিকার ফলাতে চেষ্টা করে। কেউ কেউ স্থূলভাবে করে কেউ সূক্ষ্মভাবে করে। যেমন ধরা হঠাৎ বলবে—এক গ্রাস পানি দাওতো। অথচ হাতের কাছেই হয়ত পানির গ্লাস। এই মানুষটা এখন পর্যন্ত তা করছে না। মনে হয় করবে না। শুরুতে যে করে না সে পরেও করে না। মানুষের চরিত্রের সব দোষ গুণ চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরই ধারা পড়ার কথা।
ইরা, তোকে বসিয়ে রেখে আমি এখন বারান্দায় যাব। দেখে আসিব মানুষটা কি করছে। এখনো জেগে আছে না ঘুমিয়ে পড়েছে। তাছাড়া কলামটাও বদলাতে হবে। এই কলম দিয়ে ভাল লিখতে পারছি না। আরেকটা কলম দরকার। ঘরে আর কলম আছে কি-না জানি না। ওকে বলতে হবে। যদি দেখি ও ঘুমিয়ে পড়েছে তাহলে আজ আর চিঠি শেষ হবে না। তোকে যে কথা দিয়েছিলাম পৌঁছেই চিঠি দেব তা আর সম্ভব হবে না। দেরী হয়ে যাবে। কাল হয়ত আর চিঠি লিখতে ইচ্ছা করবে না।
মানুষটা জেগেই ছিল। আমাকে দেখে আগ্রহ নিয়ে বলল, চিঠি লেখা কি শেষ? আমার মায়াই লাগল, আহা বেচারা। কিন্তু মায়াকে প্রশ্ৰয় দিলাম না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বললাম, ঘরে কি আর কলম আছে? সে বলল, ড্রয়ারে আছে। দাঁড়াও আমি বের করে দি। দুটা কলম টেবিলের উপর রেখে মুগ্ধ গলায় বলল, তোমার হাতের লেখা এত সুন্দর! তার বলার ভঙ্গিটি এমন যেন আমি আমার মস্তবড় কোন গুণ এতক্ষণ তার চোখের আড়াল করে রেখেছিলাম।
আমি বললাম, তোমার হাতের লেখা কি খুব খারাপ?
সে বলল, না। আমার হাতের লেখাও খুব সুন্দর। দাঁড়াও তোমাকে দেখাই বলেই এক টুকরা কাগজ নিয়ে লিখল–নবনী। নবনী!
ইরা তোকে বললাম না, লোকটা সরল ধরনের। সরল না হলে কখনোই কাগজ নিয়ে তার হাতের লেখার পরীক্ষা দিতে বসতো না। বুদ্ধিমানরা এই কাজ কখনো করে না।
আমি বললাম, তোমার হাতের লেখা আমার চেয়েও সুন্দর। এখন এক কাজ করা বিছানায় শুয়ে থাক। আমার চিঠি প্ৰায় শেষ হয়ে এসেছে। আর মাত্ৰ দশ পনেরো মিনিট। চিঠি শেষ করেই আমি চলে আসিব। ও বাধ্য ছেলের মত ঘুমুতে গেল। আমি চিঠি নিয়ে বসলাম।
অনেক কিছুই তোকে লিখতে ইচ্ছা করছে। যেমন ধর, আমরা যে অ্যাজ ওরা এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল তাঁর কথা। সেই ভদ্রলোকের নাম সফিক। তিনি ওর অফিসের প্রধান ব্যক্তি। অফিসটাই তাঁর। মানুষের কি পরিমাণ টাকা যে থাকতে পারে তা তাঁকে না দেখলে বোঝা যাবে না। ভদ্রলোক ওরা ছেলেবেলার বন্ধু। এতে আমার আনন্দিত হওয়া উচিত। কিন্তু আনন্দিত হতে পারছি না। আকাশের সঙ্গে পাতালের বন্ধুত্ব হয় না। হওয়া বোধহয় ঠিকও নয়। ভদ্রলোকের ব্যবহার চমৎকার, কথাবার্তা চমৎকার। কিন্তু তবু আমার ভাল লাগল না। কেন লাগল না তাও বুঝতে পারছি না। ভদ্রলোকের স্ত্রীর নাম হল অহনা। আমি প্ৰথম ভেবেছিলাম–নামি গহনা। পরে শুনি অহনা। নামটা সুন্দর তাই না? এই ভদ্রমহিলার গায়ের রঙ কালো। কালো রঙ্গের মেয়ে যে এত রূপবতী হতে পারে কে জানত–ইনাদের সম্পর্কে তোকে আরো লিখব। আপাতত এইটুক।
তোদের কথা আমি কিছুই জানতে চাচ্ছি না। জানি তুই নিজ থেকেই সব লিখবি। কিছুই বাদ দিবি না।
তোকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার। সুটকেস খুলে দেখি লাইব্রেরি থাকে আনা উপন্যাসটা তিথির নীল তোয়ালে। তুই স্যুটকেসে দিয়ে দিয়েছিস। বই পড়ার সময় পাচ্ছি না। কাহিনী কি তাও ভুলে গেছি। আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। তোর চোখ কান এতটা খোলা তা বুঝতে পারি নি। তোর এত বুদ্ধি কেন?
ভাল থাকিস। ইতি তোর আপা।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দুটা দশ। ও বিছানায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে। বারান্দায় দরজা খোলা। তাকে যতটা সাবধানী এবং গোছানো বলে মনে হচ্ছিল। আসলে সে ততটা না। বারান্দার দরজা খোলা রেখে সে ঘুমাতো না।

আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। চাঁদের আলো পড়েছে বারান্দায়। সরল ধরনের আলো আসত। সে রকম জটিল নকশাদার আলো নয়। ও জেগে থাকলে তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসা যেত। এমন চট করে ঘুমিয়ে পড়বে তা ভাবি নি। ওকে কি ডেকে তুলব?

আমি এসে তার গায়ে হাত রাখলাম। সে পাথরের মত হয়ে আছে। ঘুমন্ত মানুষের গা স্পর্শ করলে সে একটু না একটু নড়ে উঠবেই। নোমান নড়ল না। সমান তালে তার নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। আমরা দুজন পাশাপাশি হয়ে আছি। ওর গায়ের পুরুষ পুরুষ ঘামের গন্ধে আমি কি অভ্যস্ত হয়ে গেছি? আজতো তেমন খারাপ লাগছে না। বরং ইচ্ছা করছে। ওর গা ঘেঁসে ঘুমুতে। একটা হাত ওর শরীরে তুলে দিলে ওকি জেগে উঠবে? না-কি ঘুমের ঘোরে সে হাত সরিয়ে দেবে? দীর্ঘদিন ধরে সে নিশ্চয়ই একা একা ঘুমুচ্ছে। একা ঘুমিয়েই সে অভ্যস্ত। শরীরের উপর একটা বাড়তি হাতের চাপ কি সে সহ্য করবে?

জানালা গলে চাঁদের আলো আমাদের হাঁটুর উপর এসে পড়েছে। শরীরের একটি অংশ আলোকিত হয়ে আছে। নোমান বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। দুঃস্বপ্ন দেখছে কি? বারান্দায় কালো কাপড়ে ঢাকা ময়নাটাও ছটফট করছে। কে জানে হয়ত এরা দুজন একই সঙ্গে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে। পাখিদের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন বলে কি কিছু আছে?

আমি ওর গা থেকে হাত সরিয়ে নিজের মত শুয়ে পড়লাম। শাড়ির আঁচলে শরীর ঢেকে শোয়া। পাশ ফিরতেই খাট নড়ে উঠল। এই খাটের পায়াগুলো সমান না, বড় ছোট আছে। একটু নড়লেই খটখট শব্দ হয়। আমি একটা হাত ওর গায়ে রাখলাম ও ধড়মড় করে উঠে বসে ভয়ার্তা গলায় বলল, কে?

আমি বললাম, কেউ না। তুমি ঘুমাও।

সে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল। আবার তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে যে উঠে বসে, কে বলে চেঁচিয়েছে তা ঘুমের মধ্যেই করেছে। ঘুমন্ত মানুষের আচার-আচরণ আমার মত ভাল কেউ জানে না। রাতের পর রাত আমি অম্বুমো কাটিয়েছি। আমার পাশে শুয়ে ঘুমিয়েছে ইরা। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি— ঘুমন্ত মানুষ কি করে। ঘুমন্ত মানুষের আচার আরণের ব্যাপারে আমাকে একজন এক্সপার্ট বলা যেতে পারে।

আজো ঘুম আসছে না। প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে। ওকে ডেকে তুলে বলি–এই শোন আমার ঘুম আসছে না। আমার খুব খারাপ ধরনের একটা অসুখ আছে। আমার রাতে ঘুম হয় না। একা একা জেগে থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি এসে আমার সঙ্গে বারান্দায় খানিকক্ষণ বস। আমার জীবনের ভয়াবহ একটা গল্প আছে। গল্পটা এখনো তোমাকে বলা হয় নি–আজ খানিকটা বলব।

চাঁদের আলো ওর হাঁটুর উপর থেকে সরে গেছে। এখন আলো এসে পড়েছে বিছানার উপর। যেন টর্চ ফেলে ফেলে কেউ বিছানাটা পরীক্ষা করছে।

আমি উঠে বসলাম। খাটটা আবার ক্যাচ করে শব্দ করে উঠল। ও বলল, কে? আমি এবার কোন জবাব দিলাম না। ও আবারো গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ল। খাঁচার ময়না পাখি খচ খচ শব্দ করছে।–

আশ্চর্যের ব্যাপার আমাদের স্যারেরও একটা পাখি ছিল। তিনি একটা কাক পুষেছিলেন। তার কোন খাঁচা ছিল না। কাকটা এসে প্রায় সারাদিনই রেলিং-এ বসে থাকত। কাকটার বোধহয় বয়স হয়ে গিয়েছিল। খাবার খুঁজে বেড়াবার সামর্থ্য ছিল না। কিংবা কে জানে হয়ত স্যারকে তার পছন্দ হয়েছিল।

স্যার যখন আমাদের বাড়িতে থাকতে এলেন তখন ব্যাপারটা আমার তেমন পছন্দ হয় নি। মৌলানা। টাইপের একজন লোক বাসায় থাকবে। নানা ধরনের উপদেশ দেবে। কি দরকার? বাড়ি ভাড়া দিয়ে আমাদের যে টাকা পেতে হবে এমনও না। কিন্তু বাবার তাকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। তিনি দরাজ গলায় বললেন, সুফি টাইপের একজন মানুষ থাকছে। থাক না। অসুবিধা কি? পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে। আল্লাহ বিল্লাহ করবে। এই বাড়ি থেকেতো আল্লাহ খোদার নাম উঠেই গেছে।

মা ক্ষীণ গলায় বললেন, বাইরের একজন মানুষ!

বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, সেতো আর তোমার বিছানায় এসে শুয়ে থাকবে না। সে থাকবে তার মত। উত্তরের দরজাটা পার্মানেন্ট বন্ধ করে দিলেই সে আলাদা হয়ে যাবে। নিজের মত থাকবে। নিজে রান্না করে খাবে।

উত্তরের দরজা আমরা ভেতর থেকে বন্ধ করে স্যারকে থাকতে দিলাম। তিনি তাঁর জিনিসপত্র নিয়ে একদিন দুপুর বেলা দুটা রিকশা করে উপস্থিত।

প্রথম কিছুদিন আমি শঙ্কিত ছিলাম— হয়ত যখন স্যারকে দেখা যাবে আমাদের বসার ঘরে বসে আছেন। হয়ত ছাদে গিয়েছি দেখব জায়নামাজ হাতে তিনিও ছাদে উঠে এসেছেন নামায পড়ার জন্যে। কিংবা কলেজে দেখা হলে তিনি পরিচিত ভঙ্গিতে বলবেন, এই যে নবনী খবর কি? আর ক্লাসের সব ছাত্রী আমাকে ক্ষেপাবে।

বাস্তবে তার কিছুই হল না। স্যার কলেজে যান। কলেজ থেকে ফিরে বাসায় আসেন। আর তার কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। আমাদের বাড়ির একটা অংশে যে একজন মানুষ বাস করে তা মনেই হয় না। শুধু ছাদ থেকে আমি মাঝে মাঝে দেখি তিনি বারান্দায় রান্না চড়িয়েছেন। একদিন তাঁর পোষা কাকটাকে দেখলাম। শুরুতে কাকটা রেলিং-এ বসেছিল। তারপর রেলিং থেকে নেমে গম্ভীর ভঙ্গিতে হেঁটে স্যারের পাশে বসে থাকল। ভাবটা এ রকম যেন সেও রান্নাবান্না তদারক করছে। এরকম মজার দৃশ্য আমি আমার জীবনে আর দেখি নি।

আমি যখনই ছাদে উঠতাম কিছুটা সময় কাটাতাম কাকটাকে দেখার জন্যে। কি করে সে এ বাড়ির একজন সদস্যের মত চলাফেরা করে। গম্ভীর তার ভাবভঙ্গি।

একদিন ছাদে গিয়ে যথারীতি উঁকি দিয়েছি–দেখি বাঁশের চাটাই দিয়ে বারান্দার অংশটা ঢাকা। ছাদ থেকে বারান্দা দেখার কোনই উপায় নেই। আমার খুব মেজাজ খারাপ হল। কাণ্ডটা নিশ্চয়ই স্যার করেছেন। যাতে বারান্দা থেকে তাকে একজন তরুণী মেয়ের মুখ দেখতে না হয়। ধর্মে বাধা নিষেধ আছে। আমার কাছে মনে হল তিনি ইচ্ছা করে আমাকে অপমান করলেন।

সেদিন সন্ধ্যায়। মা তালের পিঠা করেছেন। ইরাকে বললেন, মাস্টার সাহেবকে কয়েকটা পিঠা দিয়ে আয়তো ইরা। বেচারা একা একা থাকে। কি খায় না খায় কে জানে? ইরা বলল, আমি পারব না। আপাকে পিঠা নিয়ে যেতে বল। ওর কলেজের স্যার। ওরই নিয়ে যাওয়া উচিত।

আমি আপত্তি করলাম না। স্যারকে কিছু কঠিন কথা শুনাতে ইচ্ছা করছিল। পিঠা দিতে গিয়ে সেই কথাগুলো শুনিয়ে আসা যাবে।

স্যার আমাকে দেখে এতাই অবাক হলেন যে বলার কথা নয়। যেন এ রকম অস্বাভাবিক ঘটনা। এর আগে তাঁর জীবনে কখনো ঘটে নি। আমি বললাম, স্যার মা আপনার জন্যে কিছু তালের পিঠা পাঠিয়েছেন।

তিনি হড়বড় করে বললেন, শুকরিয়া। শুকরিয়া। তোমার মাকে হাজার শুকরিয়া।

স্যার আমাকে বসতে বলছেন না। আমি যে কথাগুলো বলব বলে ভেবে এসেছি সেগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলে চলে যাওয়া যায় না। আমাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বসতে হবে। আমি বললাম, স্যার আমি কি কিছুক্ষণের জন্যে আপনার এখানে বসতে পারি?

অবশ্যই পার। বোস। বোস।

তিনি অতিরিক্ত রকমের ব্যস্ত হয় পড়লেন। নিজেই ছুটে গিয়ে বারান্দা থেকে চেয়ার নিয়ে এলেন। আমি বসলাম না। কঠিন গলায় বললাম, স্যার বসতে ভয় লাগছে। আমারতো বোরকা পরা নেই। এইভাবে আপনার সামনে আসাই হয়ত ঠিক হয় নি। মা পিঠা দিয়ে যেতে বললেন বলেই এসেছি। নয়ত আসতাম না। আপনাকে বিব্রত করার আমার কোন ইচ্ছা নেই।

আমি বিব্রত হচ্ছি না।

অবশ্যই হচ্ছেন। বিব্রত না হলে বারান্দায় চাটাইয়ের বেড়া দিতেন না। এই কাণ্ডটা করেছেন কারণ চাটাইয়ের বেড়াটা না দিলে বোরকা নেই এমন একটা মেয়েকে মাঝে মাঝে আপনার দেখতে হয়। বিরাট একটা পাপ হয়। এত বড় পাপের শাস্তি হল দোজখ। আমাকে দেখার কারণে আপনি দোজখে যাবেন তা-কি হয়? দোজখে সুন্দর সুন্দর পরী অপেক্ষা করছে।

আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে শেষ করলাম। কঠিন কিছু কথা বলার ছিল বলতে পারলাম না, কারণ আমি দেখলাম। তিনি খুবই দুঃখিত ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম, স্যার যাই।

তিনি বললেন, একটু বোস। এক মিনিট। আমার উপর এরকম রাগ করে চলে গেলে আমার খারাপ লাগবে। একটু বসে যাও।

আমি বসলাম।

তিনি বললেন–চাটাইয়ের বেড়াটা আমি আমার জন্যে দেই নি। তোমার জন্যে দিয়েছি। আমার মনে হয়েছিল–তোমার একা একা ছাদে হাঁটার অভ্যাস— আমার জন্যে স্বাধীনভাবে তা করতে পারছ না। তোমাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেবার জন্যেই এটা করেছি। তুমি যে এমন রেগে যাবে বুঝতে পারি নি। তোমর রাগ কি একটু কমেছে?

আমি কিছু বললাম না। তিনি যেন নিজের মনে কথা বলছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন–বোরকা নিয়ে তোমার মনে বড় ধরনের ক্ষোভ আছে বলে মনে হয়। এরকম থাকা উচিত না। আমাদের প্রফেটের সময়ের যুগটা ছিল আলমে জাহিলিয়াতে যুগ। মানুষের প্রবৃত্তি ছিল পশুদের কাছাকাছি। মেয়েরা রাস্তায় বের হলে মানুষেরা নানাভাবে তাদের উত্যক্ত করত। মেয়েরাও যে ছেলেদের চেয়ে আলাদা ছিল তা না। তারাও এতে মজা পেত। তারাও চাইতো যেন পুরুষরা তাদের উত্যক্ত করে, তাদেরকে দেখে অশ্ৰীল অঙ্গ ভঙ্গি করে। কারণ যুগটাই হচ্ছে পশুত্বের যুগ। কাজেই আমাদের নবী এমন একটা ব্যবস্থা করলেন যাতে সবাই বুঝতে পারে— মুসলমান মেয়েরা অন্যদের মত না। তারা পবিত্র। তারা আলাদা। তাদেরকে নিয়ে এসব করা যাবে না। তারা তা চায়ও না। কাজেই নবী আদেশ দিলেন মেয়েরা যেন চাদরে তাদের শরীর ঢেকে নিজেদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করে ফেলে। চাদরে ঢাকা একটা মেয়ে দেখলে সবাই যেন বোঝে এই মেয়ে আর দশটা মেয়ের মত না। এর সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতে হবে। তুমি কি বুঝতে পারছি নবনী?

আমি কিছু বললাম না। স্যার বললেন, বেহেশতে পরী পাওয়া সম্পর্কে তুমি যা বললে সেটা নিয়েও কথা আছে। তুমি যেমন স্থূলভাবে বললে তা কিন্তু না। পরে তোমাকে বুঝিয়ে বলব।

আমাকে বুঝিয়ে বলার কোন দরকার নেই। আপনি বুঝলেই হল।

আমি দাঁড়ালাম। স্যার হেসে ফেললেন। এত সুন্দর করে আমি বোধহয় কাউকে হাসতে দেখি নি। আমার সারা শরীর ঝনঝনি করে উঠল। ঘণ্টা বেজে উঠার মত শব্দ। এই ঘণ্টা সর্বনাশের ঘণ্টা। আমি প্ৰায় ছুটে চলে এলাম। মেয়েরা ঠিক কিভাবে ছেলেদের প্রেমে পড়ে? একজনের প্রতি অন্যজনের তীব্র আকর্ষণটা কিভাবে তৈরি হয়। গল্প উপন্যাসের ব্যাপার। আর বাস্তবের ব্যাপার কি এক রকম না আলাদা? প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা তার ভালবাসও কি আলাদা?

একজন আরেকজনকে দেখেই পাগলের মত হয়ে গেল এমনকি সত্যি কখনো হয়েছে? না-কি এগুলি শুধু কথার কথা?

আমার কি হয়েছে? আমি কি এই মানুষটির প্রেমে পড়ে গেছি? প্রেমের মত কি আছে। এই মানুষটার? মানুষটি যদি বিবাহিত হত, তার কয়েকটা ছেলেমেয়ে থাকতো তাহলেও কি আমি ঠিক এইভাবেই আকৰ্ষিত হতাম।

সারারাত আমার ঘুম হল না। জীবনে এই প্রথম আমার ঘুমহীন রাত্রি যাপন। কি যে এক ভয়ঙ্কর কষ্ট। বিছানায় এপাশ ও পাশ করছি আর ভাবছি ভোর হচ্ছে না কেন? ভোর হোক। মনে হচ্ছে ভোর হলে আমার কষ্টটা কমবে।

সূৰ্য উঠার আগে আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দরজা খুলে বারান্দায় এসে দেখি মা ফজরের নামাযের জন্যে অজু করছেন। আমাকে দেখে বললেন, কিরে আজ এত সকালে ঘুম ভাঙলো যে।

একবার ভোরবেলা উঠে দেখলাম কেমন লাগে।

রোজ ভোরে উঠে ছাদে ঘোরাঘুরি করবি দেখবি শরীরটা কেমন ভাল লাগে।

তুমি তাই কর না-কি মা?

হুঁ। তোরা ছাদে যাস সন্ধ্যাবেলায় আমি যাই ভোরবেলায়।

মা আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসছেন। আমি ছাদে চলে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় মনে হতে লাগল আচ্ছা ছাদে উঠে যদি দেখি স্যার ছাদে হাঁটাহাঁটি করছেন। তাহলে কি হবে? ব্যাপারটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। খুবই স্বাভাবিক। উনি নিশ্চয়ই নামায পড়ার জন্যে ভোরবেলায় উঠেছেন। একবার উঠলে ছাদে কি আর যাবেন না। এত সুন্দর একটা ছাদ।

ছাদে কাউকে পেলাম না। আশাভঙ্গের তীব্ৰ কষ্টে প্রায় কান্না পাওয়ার মত হয়ে গেল। আমার ইচ্ছা করতে লাগল–এক্ষুণি ছুটে গিয়ে উনার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলি– স্যার আমাদের ছাদটা খুব সুন্দর। আসুন আপনাকে দেখাই। এখন থেকে রোজ ভোরবেলা ছাদে বেড়াতে আসবেন। এতে আপনার শরীর খুব ভাল থাকবে।

সিঁড়িতে কার পায়ের শব্দ। উনি কি আসছেন। ছাদে? অবশ্যই আসছেন। উনি ছাড়া আর কে হবে? আমি আমার শাড়িটার দিকে তাকালাম। বেছে বেছে আজকের দিনে আমি এমন একটা বাজে শাড়ি পরেছি। আচ্ছা আমার চোখে ময়লা জমে নেইতো? আমার বুক ধ্বক ধ্বক করছে। কি বলব আমি স্যারকে?

না। স্যার না। মা এসেছেন। মার হাতে দুকাপ চা। আমার জন্যে চা এনেছেন। এত ভাল আমার মা কিন্তু সেদিন ভোরবেলায় মাকে দেখে মনটা ভেঙে গেল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল, তুমি এসেছ কেন মা? কেন তুমি এসেছ? কে তোমাকে আসতে বলেছ?…

চাঁদের আলো খাট থেকে নেমে গেছে। নোমানের ঘুম ভেঙে গেছে। সে উঠে বসতে বসতে অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে?

আমি বললাম, কিছু হয় নি?

ঘুমুচ্ছ না?

না। আমার ঘুম আসছে না।

শরীর খারাপ করেছে না-কি?

জ্বর? সে হাত বাড়িয়ে আমার কপাল স্পর্শ করল। আহ তার হাতটা কি ঠাণ্ডা।

০৫. দরজার কড়া

অনেকক্ষণ ধরে দরজার কড়া নাড়ছে।

আমাদের বাসায় কলিংবেল নেই। কেউ এলে কড়া নাড়ে। বিশ্ৰী খটাং খটাং শব্দ হয়। আমি বাথরুমে গায়ে পানি ঢালছি আর কড়া নাড়ার শব্দ শুনছি। কে এসেছে ভর দুপুরে? আমি কি করব? ভেজা গায়ে দরজা খুলিব? কে হতে পারে?

তাড়াতাড়ি গায়ে কোনমতে একটা শাড়ি জড়িয়ে দরজা খুলে দেখি বড়মামা। বড়মামার পেছনে ছোট্ট টিনের ট্রাঙ্ক হাতে নয় দশ বছর বয়েসী একটা মেয়ে। আমি চেঁচিয়ে বললাম, বড়মামা। আপনি?

কেমন আছিস মা?

ভাল। সাথে এটা কে?

তোর জন্যে কাজের মেয়ে নিয়ে এসেছি। তুই ইরার কাছে চিঠি লিখেছিস। চিঠি পড়ে বুঝলাম ঘরে কাজের লোক নেই। তাই নিয়ে এসেছি। এর নাম মদিনা। তুই কাপড় বদলে আয় ভেজা গায়ে ঠাণ্ডা লাগাবি। জামাই কোথায়?

ও ঢাকার বাইরে আছে।

তুই এক?

জ্বি।

আচ্ছা যা কাপড় বদলে আয়। পরে কথা বলব।

বড়মামা বেশিক্ষণ থাকলেন না। দুপুরে কিছু খেলেনও না। রোজা রেখে এসেছেন। সন্ধ্যাবেলা ইফতার করবেন। অফিসের কাজ নিয়ে এসেছেন। এখন কােজ সারিতে যাবেন। রাতে আমার সঙ্গে দেখা করে ট্রেনে উঠবেন।

চিঠি লেখার থাকলে লিখে রাখিস। হাতে হাতে নিয়ে যাব। জামাই কদিন ধরে বাইরে?

চার দিন।

আসবে কবে?

ঠিক নেই মামা। সপ্তাহ খানিক লাগবে বলেছিল। ছবির কি একটা কাজ করছে।

একা ফেলে চলে গেল। এটা ঠিক হয় নাই। আমাকে খবর দিলে তোকে এসে নিয়ে যেতাম।

আমার অসুবিধা হচ্ছে না মামা। রাতে দারোয়ানের বউটা এসে বারান্দায় শুয়ে থাকে।

মামা কৌতূহলী চোখে আমার সংসার দেখছেন। খাটের নিচটাও এক ফাঁকে দেখলেন। চেয়ারে বসেছিলেন, চেয়ার ছেড়ে খাটে বসলেন। খাটটা নড়ে উঠল। ব্যাপারটা বোধহয় পছন্দ হল না। তিনি নিঃশ্বাস ফেললেন।

এখানকার খবরাখবর সব ভালতো?

জ্বি ভাল।

কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ও আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।

ওরা আসে না?

জ্বি না।

তোর আগের ব্যাপার ট্যাপার কিছু জানতে চায় নি তো?

জ্বি-না।

নিজ থেকে কিছু বলার দরকার নেই।

বাবার শরীর কেমন আছে মামা?

কিছু বুঝতে পারছি না। কখনো বলে ভাল। কখনো বলে মন্দ।

ইরার খবর কি?

ভাল। ওর বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। জামাই মংলা পোর্টের ইনজিনিয়ার। দেখে গেছে। পছন্দ হয়েছে বলেইতো মনে হয়। দেখি আল্লাহ আল্লাহ করছি। বিয়ে শাদীর ব্যাপার কলমা না পড়ানো পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। তোর বাসাটা বড় থাকলে তোর এখানে এনে রাখতাম। বিয়ের কোন আলাপ-আলোচনায় নেত্রকোনা হওয়া উচিত না। ফন্ট করে কেউ কান ভাঙনি দিবে। তোর বাসাওতো ছোট।

জ্বি।

জামাই কি বলে? বড় বাসা নেবে না। এইখানেই থাকবে?

এই নিয়ে কথা হয় নি মামা।

তুই কিছু বলতে যাবি না। চাপ দেয়া ঠিক না। শুরুতে একটু কষ্ট করাই ভাল। কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না। সংসারে ভালবাসা থাকলে আর কিছু লাগে না। চাঁদের আলো ঢোকে ভাঙা ঘরে।

পাকা দালানের জানোলা খুলে দিলেও আলো ঢোকে মামা।

তার জন্যে জানোলা খুলতে হয় রে বড় খুকী। কয়জন আর জানালা খুলে? কেউ খুলে না।

বড়মামা শুধু যে মদিনাকে নিয়ে এসেছেন। তাই না। কয়েক ধরনের আচার এনেছেন। আমের আচার, তেঁতুলের আচার, চালতার আচার। একটিন মুড়ি এনেছেন। হরলিক্সের কোটায় এক কৌটা গাওয়া ঘি। একটা প্যাকেট খুলে দেখি ঘরে পরার দুটা শাড়ি। একটা গামছা।

বড় খুকী!

জ্বি মামা।

জামাইয়ের জন্যে স্যুটের কাপড় কিনে দেব বলে ঠিক করেছিলাম। ওকে সাথে নিয়েই কেনার ইচ্ছা ছিল। স্যুট কিনে দোকানে দিয়ে দরজির খরচটাও দিয়ে দেয়া। নয়ত খাজনার থেকে বাজনা বড় হয়ে যায়। এখন কি করি বলতো।

সুটের কাপড় লাগবে না মামা। ও সুট পরে না। ছোট চাকরি করে। এই চাকরিতে স্যুট পরলে লোকে হাসবে।

ওর ছোট চাকরির জন্যে মন খারাপ করিস না মা।

এম্‌নি বললাম। আমার মন খারাপ না। আলহামদুলিল্লাহ শুনে ভাল লাগল। আচ্ছা পরের বার যখন আসব। তখন বানিয়ে দিয়ে যাব।

মামা আপনার শরীর কেমন?

আছে ভালই আছে। মাথা ব্যথাটা হয়। টিউমার হয়েছে কি-না কে জানে। আমাদের এখানে একজন ডাক্তার আছেন ওয়াদুদ সাহেব–বন্ধু মানুষ। তিনি বলছিলেন টিউমারের টেস্ট ফেস্ট করাতে। কাগজে কি সব লিখেও দিয়েছেন।

করাবেন না?

করাব। পরের বার করাব। ও আচ্ছা ভুলে গেছি–ছোট খুকীর চিঠিটা নে। জবাব লিখে রাখিস। বার বার বলে দিয়েছে জবাব নিয়ে যেতে। জবাব ছাড়া গেলে খুব রাগ করবে। আর মদিনাকে কিছু খেতে দে। ওর বোধহয় ক্ষিধে পেয়েছে। এদের কিন্তু পেটের আন্দাজ নেই। যা দিবি তাই খেয়ে পেটের অসুখ বাঁধাবে। হিসেব করে দিস। আমি এখন উঠি রে মা…

মদিনাকে খেতে দিয়ে আমি ইরার চিঠি নিয়ে বসলাম। ইরা লিখেছে–

আপা,
তোমার চিঠি লিখতে এত দেরী হল কেন? তোমার এত কি কাজ? তুমি বিশ্বাস করবে না, আমি নিজে প্রতিদিন একবার পোস্টাপিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছি— চিঠি এসেছে কি-না!
এর মধ্যে এমন এক কাণ্ড হল–বাবা গভীর রাতে চেঁচামেচি শুরু করলেন–নবনী এসেছে। নবনী এসেছে। সে কি হৈ চৈ। আমরা দরজা খুললাম। কেউ নেই। আসলে বাবা স্বপ্ন-টপ্ল দেখে এই কাণ্ড করেছেন। বাবার শরীর আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে।। হলে কি হবে চিকিৎসা করাবেন না। এখন কোন ওষুধ খাচ্ছেন না। একজন জ্বীন সাধকের খোঁজ পাওয়া গেছে। তার কাছ থেকে ওষুধ নিচ্ছেন। সেই ওষুধ না-কি জুীনারা এনে দিচ্ছে কোহিকাফা নগর থেকে। গাছের কি সব শিকড় বাকড়। মা সেসব হামানদিস্তায় পিষে পিষে দিচ্ছেন। আমি খানিকটা চোখে দেখেছি–বিশ্রণী দুৰ্গন্ধ। খানিকটা মুখে দিলে মুখ আঠা আঠা হয়ে থাকে।
ভাল কথা–মা স্বপ্নে দেখেছেন তোমার ছেলে হয়েছে। ছেলের নামও স্বপ্নে দেখেছেন। ছেলের নাম জুলহাস। আমি মাকে বললাম— ছেলে হওয়া স্বপ্নে দেখেছ ভাল কথা। ছেলের নাম কিভাবে স্বপ্নে দেখলে? আর দেখলেই যখন একটু ভাল নাম দেখতে পারলে না?
অন্তু ভাইয়ারও খবর আছে। সে ফুটবল খেলতে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছে।
লোকজন বল খেলতে গিয়ে পায়ে চোট পায়। ভাইয়ার সবই উল্টা সে চোট পেয়েছে মাথায়। তোমার ঘরটা এখন ভাইয়ার দখলে। এত সুন্দর ঘরটা সে যে কি করেছে তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না। তার উপর একদিন তার ঘরে ঢুকে দেখি–না থাক এখন বলব না। খুবই মজার ব্যাপার মুখোমুখি বলতে হবে।
আপা তুমি কবে আসছে? আমি দুলাভাইকে তার অফিসের ঠিকানায় খুব করুণ একটা চিঠি লিখেছি। এত করুণ যে চিঠি পড়ার পরপরই অন্তত কিছুদিনের জন্যে দুলাভাই তোমাকে আমাদের এখানে রেখে যাবেন।
আমার যে বিয়ের কথা হচ্ছে তা নিশ্চয়ই এর মধ্যে বড় মামা তোমাকে বলেছেন। ছেলে নিজেই আমাকে দেখতে এসেছে। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল–রবীন্দ্রনাথ কবে নবেল পুরস্কার পান বলতে পারেন?
আমার এমন রাগ লাগছিল যে ইচ্ছা করল বলি–রবীন্দ্ৰনাথ কে? নাম শুনিনিতো? এরকম বলতে পারি নি। শুধু বলেছি কবে নবেল পুরস্কার পেয়েছেন জানি না।
আপা তুমি কি জান? আমার মনে হয় এখন আমার একটা সাধারণ জ্ঞানের বই দরকার। নিয়ত কখন কি প্রশ্ন করবে–জবাব দিতে পারব না। বিয়ে আটকে যাবে।
তবে জবাব দিতে না পারলেও ঐ লোক আমাকে পছন্দ করেছে। সেটা আমি ঐ লোকের ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকা থেকেই বুঝেছি। বড় কোন সমস্যা না হলে এই শীতে বিয়ে হয়ে যাবে। আপা কিছু ভাল লাগছে না। তুমি আস।

মামা বিকেলে একটা ইলিশ মাছ হাতে নিয়ে এলেন। তাঁর গায়ে জ্বর। বেশ জ্বর। ইফতার কিছু খেতে পারলেন না। আমি বললাম, চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকুন। কাল যাবেন। মামা রাজি হলেন না। রাজি হবেন না জানতাম। তাকে ফেরানো মুশকিল। নিজে যা ভাল মনে করবেন। তাই করবেন। অন্যের কোন

কথাই শুনবেন না।

বড় খুকী!

জ্বি মামা।

ছোট খুকীর বিয়েটা মনে হয় হয়েই যাবে। ওরা মুখে অবশ্যি কিছু বলে নাই। ছোট খুকীকে কি সব প্রশ্ন ট্রশ্ন করেছে উত্তর দিতে পারে নাই। তারপরেও মনে হয় পছন্দ হয়েছে বিয়েটা হয়ে গেলে দায়িত্ব শেষ হয়। একটু দোয়া করিস মা।

দোয়ায় কি কাজ হয় মামা?

অবশ্যই হয়। হবে না কেন?

আপনাকে লেবুর সরবত বানিয়ে দেব?

দে। লেবুর সরবত বলকারক। ঘরে কি লেবু আছে?

আছে।

আমি লেবুর সরবত বানিয়ে এনে দেখি দরজায় হাতুড়ি পেটার শব্দ হচ্ছে। বড়মামা ঘরে ঢোকার মূল দরজায় হাতুড়ি দিয়ে কি যেন করছেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কি করছেন মামা? ছিটিকিনি লাগাচ্ছি। ডাবল প্ৰটেকশান থাকা দরকার। আগের ছিটকানিটা দুর্বল।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম মামা হাতুড়ি, ছিটিকিনি সব কিনে এনেছেন। একটা স্কু ড্রাইভারও আছে। কি আশ্চর্য মানুষ।

হাতুড়ি টাতুড়ি সব কিনে নিয়ে এসেছেন? হুঁ। কাজ ফেলে রাখলেতো হয় নারে মা। যখনকার কাজ তখন করতে হয়। মামা ছিটিকিনি ফিট করে খাটটা ঠিক করলেন। খাটের পায়ার নিচে কাগজ দিয়ে পাগুলি সমান করলেন। লেবুর সরবত খেলেন। মদিনাকে দশটা টাকা দিয়ে নানান উপদেশ দিলেন। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে আমার মাথায় ফুঁ দিয়ে বললেন, এবার তাহলে যেতে হয় রে বড় খুকী। একটা চিঠি আন। জামাইকে দু লাইনের চিঠি লিখে যাই।

দু লাইনের চিঠি লিখতে মামার অনেক সময় লাগল। টপ টপ করে মাথা থেকে ঘাম ঝড়ছে। পানি চেয়ে পানি খেলেন।

আপনার শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে মামা?

না। ঘাম হচ্ছে জ্বর ছেড়ে দিচ্ছে বলে মনে হয়।

চিঠি শেষ করে মামা উঠে দাঁড়ালেন। দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়ার পর্ব। আবার হল। আমি বললাম, মামা আমার ধারণা আপনার শরীর বেশি খারাপ আপনি রাতটা থেকে যান।

না রে বেটি না। জামাই এলেই চিঠিটা দিবি।

আমি কি পড়তে পারব মামা।

অবশ্যই পারবি। না পারার কি আছে?

ঘর থেকে বের হবার ঠিক আগে মামা বাথরুমে ঢুকে বমি করলেন। আমি মাথা মুছিয়ে দিলাম। মামা বললেন, বমি হয়ে যাওয়ায় ভাল হয়েছে। শরীরটা ফ্রেশ লাগছে। তুই আমাকে নিয়ে শুধু শুধু চিন্তা করিস না।

কি হয় একটা রাত থেকে গেলে।

খালি বাসা ফেলে এসেছি। না গেলে হবে না।

খালি বাসা কেন? মামী কোথায়?

আর বলিস না। খামাখা ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে গেছে। কয়েকবার আনতে গেছি আসে না। ঝগড়া করে জীবনটা শেষ করল। বড়ই আফসোস। ঝগড়া দিয়ে জীবন শুরু করলে— ঝগড়া দিয়ে শেষ করতে হয়। এটাই নিয়তি।

মামা সিঁড়ি দিয়ে নামছেন আমি তাকিয়ে আছি। আমার খুব খারাপ লাগছে। বিচিত্র একটা মানুষ, সবার সমস্যাই তাঁর সমস্যা। কিন্তু কেউ জানতে চায় না–এই মানুষটার নিজস্ব কোন সমস্যা কি আছে।

নোমানের কাছে লেখা চিঠিটা পারলাম। মামা লিখেছেন–

বাবা নোমান,
দোয়াপর সমাচার এই যে, ঢাকায় কার্যোপলক্ষে আসিয়াছিলাম। তোমার সাহিত সাক্ষাত হয় নাই। বড় খুকীর নিকট সমস্ত বিস্তারিত জানিয়া সুখী হইয়াছি। এক্ষণে আমার একটি আবদার। বড় খুকীকে নিয়া এক দুই দিনের জন্য হইলেও নেত্রকোনা যাইবা। বড় খুকীর মাতা তাহার কন্যার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়াছে। তাহাছাড়া ছোট খুকীরও বিবাহের কথাবার্তা হইতেছে। এমতাবস্থায় দুই বোন কিছু দিন একত্ৰ থাকিলে বড় ভাল হয়। বিবাহ সম্পন্ন হইলে কে কোথায় যাইবে কেহই বলিতে পারে না। হয়ত দীর্ঘদিন আর দুই বোনের সাক্ষাত হইবে না। কাজেই বাবা এই বৃদ্ধের প্রস্তাব একটু বিবেচনা করিবে।

আমি দেখলাম বড়মামা চিঠিতে নাম সই করতে ভুলে গেছেন। তাঁর শরীরটা তাহলে সত্যি সত্যি খারাপ করেছে। এত বড় ভুল মামা কখনোই করবেন না। পরিষ্কার করে নাম লিখবেন। তারিখ দেবেন, ঠিকানা দেবেন। নাম তারিখ এবং ঠিকানা ছাড়া চিঠি আমিও লিখেছি। দুটা চিঠি। দুটাই স্যারকে লেখা। প্রথমটা যখন লিখি তখন থর থর আমার হাত পা কাঁপছে। কি লিখছি নিজেই জানি না। কাউকে চিঠি লিখতে হলে গুছিয়ে লিখতে হয় সুন্দর করে লিখতে হয়। এসব কিছুই আমার মাথায় নেই। তাঁকে চিঠি লিখছি। এই আনন্দেই আমার তখন শরীর কাঁপছে। প্রথম চিঠিতে তাঁকে কি লিখেছিলাম। আমার কিছুই মনে নেই। আমার স্মৃতিশক্তি ভাল। সবকিছুই আমার মনে থাকে। কিন্তু ঐ চিঠিটির কথা কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে রোলটানা কাগজে চিঠিটা লেখা। যে বল পয়েন্টে লিখছিলাম। সেই বল পয়েন্টটা ঠিকমত কালি ছাড়ছিল না। অনেকগুলো অক্ষর ছিল অস্পষ্ট। চিঠি শেষ করে আমি দুহাতে মুখ ঢেকে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। আমি পোষ্ট আপিস থেকে নিজেই খাম। কিনলাম। খাম কেনার সময় মনে হল যিনি খাম দিচ্ছেন তিনি সব বুঝে ফেলেছেন। তিনি জেনে গেছেন–এই চিঠি আমি কাকে দিচ্ছি। কি আছে চিঠিতে।

ইকনমিক্সের একটা বাইয়ের ভেতর খামটা লুকিয়ে আমি যাচ্ছি। চিঠি পোস্ট করতে পথে বাবার সঙ্গে দেখা। বাবা বললেন, কই যাচ্ছিস রে? আমার শরীর কেঁপে উঠল। আর মনে হল বাবা বুঝে ফেলেছেন আমি কোথায় যাচ্ছি। তিনি জানেন আমার এই বইটার ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একটা খাম আছে।

কি রে কথা বলছিস না কেন? কি হয়েছে তোর?

বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি।

এখন কলেজ আছে না? কলেজ বাদ দিয়ে বন্ধুর বাসায় কি?

ওখান থেকে কলেজে যাব।

আচ্ছা যা। তোর কি শরীর খারাপ?

না। বাবা শরীর ভাল।

আচ্ছা আচ্ছা।

চিঠি পোস্ট করে আমি কলেজে গেলাম। থার্ড পিরিয়ডে স্যারের ক্লাস। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। স্যার ক্লাসে ঢুকলেন সব মেয়েরা উঠে দাঁড়াল। আমি দাঁড়াতে পারলাম না। মনে হচ্ছে আমার হাত-পা পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে।

স্যার রোল কল করছেন। মেয়েরা নানান রকম ফাজলামি করছে। ইয়েস স্যার না বলে সবাই বলছে হাজির হুজুর। একজন বললো— বান্দা হাজির হুজুর। হাসির হল্লা শুরু হল। স্যার রোল কল বন্ধ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। মনে হল কিছু বলবেন। বললেন না। রোল কল করে যেতে লাগলেন। আমার রোল তিপান্ন। যখন তিনি ডাকলেন রোল ফিফটি খ্ৰী। আমি চুপ করে রইলাম। কোন শব্দ করলাম না। স্যার আবার ডাকলেন রোল ফিফটি থ্রী। আমি চুপ করে রইলাম। স্যার কৌতূহলী হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি মাথা নিচু করে আছি। আমার ধারণা হয়েছে স্যার আমার চোখের দিকে তাকালেই সব জেনে যাবেন। তখন আমি কি করব। এ লজ্জা আমি কোথায় রাখব?

স্যার সেদিন পড়ালেন সমাট বাবরের সিংহাসনের আরোহণ পর্ব। ক্লাসের হৈচৈ একসময় থেমে গেল। তিনি ভারী এবং খানিকটা কাঁপা গলায় গল্প বলার ভঙ্গিতে কথা বলছেন। কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হাত নাড়ছেন—

বাবরের মার নাম হযরত খানম।

দেখেছ কি অদ্ভুত নাম। এই নাম মনে রাখা সহজ না? খুব সহজ। আবার শোন বাবরের মা হযরত খানম। ৯১০ হিজরীর কথা। রবিউস-সানি। রবিউস সানি কি আগে একবার বলেছি। আজ আর বলব না।

এই সময় কি হল? হযরত খানম জ্বরে পড়লেন। মাত্র ছয় দিনের জ্বরে তিনি মারা গেলেন। বাবরের বয়স তখন কত? কে বলতে পারে কত? নবনী তুমি বলতে পোর।

আমার শরীর কেঁপে উঠল। স্যার কি সুন্দর করে ডাকলেন নবনী। আর কেউ কি কোনদিন এত সুন্দর করে আমার নাম ডাকবে?

নবনী তুমি জান তখন বাবরের বয়স কত?

আমি চুপ করে আছি। আমার পেছন থেকে বেনু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার নবনী জানে কিন্তু বলবে না।

ক্লাসের সবাই হাসছে। স্যার সবার হাসি অগ্রাহ্য করে পড়াতে শুরু করলেন–হযরত খানমের মৃত্যুর চার দিনের দিন আরেকটি ঘটনা ঘটল…

ঘটনা সামান্য হলেও মুঘল সাম্রাজ্যে তার ফল ছিল সুদূর প্রসারী। আজ সেই সামান্য ঘটনা এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্ৰবাহ তোমাদের বলব…। ইতিহাস থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হবে। আপাতত তুচ্ছ ব্যাপার যে এক সময় সাম্রাজ্য পরিবর্তনের মত বড় ব্যাপারে রূপান্তরিত হতে পারে। এই শিক্ষা বার বার ইতিহাস আমাদের দেয়। প্ৰথম চিঠিটি পাঠাবার এক সপ্তাহ পর আমি দ্বিতীয় চিঠিটি পাঠালাম। কোন চিঠিতে নাম ঠিকানা ছিল না। তবু স্যার ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। একদিন কলেজে রওয়ানা হচ্ছি। ওনার সঙ্গে দেখা। ওনি বললেন, নবনী শোন। তোমার তো পরীক্ষা এসে গেলো। এখন মন দিয়ে পড়াশুনা করা উচিত তাই না?

জ্বি।

তোমার হাতের লেখা সুন্দর। তবে হাতের লেখা সুন্দর হলেই তো হয় না–বানানের দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। মুহূর্ত বানানে হ-য়ের নীচে আছে দীর্ঘ উকার।

আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললাম— আমাকে এসব কেন বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমি সেদিন কলেজে গেলাম না। বাড়িতে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে সারাদিন কাঁদলাম। সন্ধ্যাবেলা ছাদে উঠে মনে হল— ছাদ থেকে যদি নিচে লাফিয়ে পড়তে পারতাম তাহলে কি সুন্দর হত। কেন মানুষ শুধু শুধু পৃথিবীতে বেঁচে থাকে?…

০৬. নোমান ফিরল

সাতদিনের জায়গায় দশদিন পার করে নোমান ফিরল। রোদে পুড়ে চেহারা এমন হয়েছে যে তাকানো পর্যন্ত যায় না। এর সঙ্গে আছে কাশি। খুক খুক, খুক খুক কাশি লেগে আছে। ঘরে ঢোকার পর থেকেই কাশছে।

খুব পরিশ্রম হচ্ছে নবনী। ছবি তৈরি যে কি কঠিন কাজ তুমি ধারণাই করতে পারবে না। একটা সাধারণ দুই মিনিটের দৃশ্য করতে লাগল সারাদিন। দৃশ্যটা কি জান? দৃশ্যটা হল— নায়িকা পুকুর ঘাটে গোসল করতে গিয়েছে। একটা সবুজ কচুপাতায় তার গায়ে মাখা সাবানটা রাখা। হঠাৎ বাতাস লেগে সাবানটা পানিতে পড়ে গেল। নায়িকা পানিতে ড়ুব দিয়ে সাবান খুঁজছে।

অহনা তোমাদের নায়িকা?

হুঁ। আমাদের ছবিতে ওর নাম হল জাহেদা। গ্রামের মেয়ে হিসেবে তাকে যে কি মানিয়েছে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। স্টিল ছবি নেয়া আছে, তোমাকে দেখাব। এখন ভাল করে চা করা দেখি, চা খাব। আউট ডোরে থেকে থেকে চায়ের অভ্যাস হয়েছে।

আমি চা বানিয়ে এনে দেখি খাটে পা বুলিয়ে সে ভোস ভোঁস করে সিগারেট টানছে। তার শুধু যে চায়ের অভ্যাস হয়েছে তাই না। সিগারেটের অভ্যাসও হয়েছে।

নবনী!

উঁ।

গোসলের পানি দাও। গোসল করে বেরুব। অহনার খোঁজে যেতে হবে। ও রাগারগি করে কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছে। আমরাতো কিছুই জানি না। সন্ধ্যাবেলা স্যুটিং। জাহেদা হাতে এক মুঠি পাঠখড়ি নিয়ে যাচ্ছে। পাটখড়ির মাথায় আগুন, সেই আগুনের আভায় পথ চলছে… দারুণ দৃশ্য। লাইট ফাইট করতে রাত দশটার মত বেজে গেল। সফিক আমাকে বলল, যা অহনাকে নিয়ে আয়। আমি আনতে গিয়ে শুনি সে সন্ধ্যাবেলা ব্যাগ গুছিয়ে স্টেশনের দিকে গেছে। বোঝ অবস্থা।

তোমাদের স্যুটিং হল না?

কিভাবে হবে? রাতে যে ফিরে আসব সেই উপায়ও নেই… ট্রেন হল পরদিন ভোর সাতটায়।

নোমান প্ৰায় এক ঘণ্টা লাগিয়ে গোসল করল।

মাথায় পানি ঢালে আর কাশে। কি বিশ্ৰী কাশি। এর মধ্যে এত ঠাণ্ডা লাগানো কি উচিত হচ্ছে? বাথরুম থেকে বের হয়ে সে কেমন জবু থবু হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে কিছুতেই উৎসাহ নেই। বাসায় যে নতুন একটা কাজের মেয়ে আছে সেদিকে তার চোখ পড়ল না। তার পোষা ময়না সম্পর্কেও সে তেমন উৎসাহ দেখালো না। একবার শুধু বলল, ময়নাটাকে ঠিকমত খাওয়া দাওয়া দেয়া হয়েছে। নবনী? ব্যাস এই পর্যন্তই।

নোমান বলল, আরেক কাপ চা দাও নবনী। গোসল করে শরীরটা ফ্রেস হয়ে গেছে। তোমার একা একা অসুবিধা হয়নিতো?

না।

সফিক একবার বলছিল, তুই তোর বৌকে নিয়ে আয়–সে একা আছে।

নিয়ে গেলেই পারতে।

অহানা রাজি হল না।

রাজি হলেন না কেন?

অহনাকে বোঝা মুশকিল। ও কখন কি করে খুব স্ট্রেঞ্জ মেয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ.। অনার্স, এম. এ. দুটাতেই ফার্স্টক্লাস। ইউনিভার্সিটিতে চাকরি পেয়েছিল— বলল চাকরি করবে না। ঘর সংসার করবে। বছর বছর বাচ্চা দিয়ে–ঘর ভর্তি করে ফেলবে, ছেলেপুলেয়… হা হা হা। এই যুগের কোন মেয়ের মুখে এই জাতীয় কথা শুনেছ?

না।

ওর আরো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এক সময় বলব। কই চা দিলে না?

আমি চা এনে দিলাম। নোমান চা শেষ করেই বের হয়ে গেল। তার চোখ টকটকে লাল। কে জানে হয়ত জ্বর এসেছে। মদিনা বলল, আম্মা লোকটা কে?

আমি বললাম, কেউ না।

ইচ্ছা করে বলা না। মুখ ফসকে বলে ফেলা।

নোমান জ্বর গায়ে রাত নয়টার দিকে ফিরল। চোখ লাল, জ্বরের ঘোরে শরীর কেঁপে উঠছে। আমি বললাম, অহনাকে পাওয়া গেল?

দেখা হয় নি, তবে খোঁজ পাওয়া গেছে। চলে গেছে রাজশাহী। তোমাকে বলেছি না–অদ্ভুত মেয়ে।

এসো শুয়ে থাক। তোমার জ্বর বাড়ছে। ঘরে কি থার্মোমিটার আছে?

আছে। তবে কাজ হয় না।

কাজ হবে না কেন?

থার্মোমিটারের মাথাটা ভাঙা।

আমি অবাক হয়ে বললাম, মাথা ভাঙা থার্মোমিটার রেখে দিয়েছ কেন?

ফেলতে মায়া লাগে।

রাতে সে কিছু খেল না। মাঝরাতের দিকে তার জ্বর খুব বাড়ল। আমি তার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছি। সে বিড়বিড় করে নানান কথা বলছে—। জ্বরের ঘোরে বলছে বলেই আমার ধারণা।

কোটিপতি হওয়া কঠিন কিছু না। ইচ্ছা করলে হওয়া যায়। দরকারটা কি বল? কোন দরকার নাই। অহানার কথাই ধর–অহনাও কিন্তু কোটিপতি। গরিব ঘরের মেয়ে ছিল। কি যে ভয়ঙ্কর গরিব চিন্তাই করতে পারবে না। অথচ এমন ভাল ছাত্রী। পড়াশোনার এত আগ্রহ। ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ত তখন হলের সীটরেন্ট দেয়ার পয়সা নেই। সফিক আমার হাত দিয়ে টাকা পাঠাতো। সফিক একটা কথা বলে—নো ফ্ৰী লাঞ্চ। এই পৃথিবীতে সব কিছুই নগদ অর্থে কিনতে হবে। হো হো হো। বুঝতে পারছ কিছু?

বুঝতে পারছি না। বুঝতে চাচ্ছিও না। টাকা দিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে সফিক কিনেছে। এখন চাকা ঘুরে গেছে মেয়েটা কিনে নিয়েছে সফিককে। ঢাকা শহরে যত প্রোপার্টি সফিকের আছে সব কিন্তু ঐ মেয়ের নামে। এখন একবার যদি এই মেয়ে সফিককে ছেড়ে যায়–সফিক পথে বসবে। আজিমপুর কবরস্থানে বসে ভিক্ষা করতে হবে। সুর করে গান গাইতে হবে–আল্লাহুম্মা, সাল্লেআলা সাইয়াদেনা, মৌলানা মোহাম্মদ!

প্লিজ চুপ করে থাক। ঘুমানোর চেষ্টা কর।

আহা কথা বলতে ভাল লাগছে তো। শোন না কি বলি–দারুণ ইন্টারেস্টিং। আমি করতাম কি মাসের দুই তিন তারিখে টাকা নিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। হল গেইট থেকে স্লীপ পাঠাতাম–জাহেদা খাতুন, সেকেন্ড ইয়ার অনার্স— রুম নাম্বারা…।

উনার নামতো অহনা।

অহনা পরে হয়েছে–তখন তার নাম ছিল জাহেদা খাতুন। বিয়ের পর হল অহনা। বুঝলে নবনী। খামে ভর্তি করে টাকা নিয়ে যেতাম। সব নতুন চকচকে নোট। জাহেদা টাকাগুলো হাতে নিত। আমি সঙ্গে করে মনিঅৰ্ডার ফরম নিয়ে যেতাম। এইখানে বসেই সে মনিঅৰ্ডার ফরম পূরণ করত। দেশে টাকা পাঠাতো। মনিঅৰ্ডার ফরমে লিখত–মা, তোমাকে কিছু টাকা পাঠালাম। এখানে দুটা মেয়েকে প্রাইভেট পড়িয়ে যা টাকা পাই তাতে আমার চলে গিয়েও কিছু থাকে।

পানি খাব নবনী। পানি দাও।

আমি পানি এনে দিলাম। দুচুমুক খেয়েই রেখে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল, একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। জ্বর জ্বরি হলে ঠাণ্ডা পানি খেতে ইচ্ছা করে। একটা ফ্রিজ কিনতে হবে। ফ্রিজ কেনার টাকা আছে। কালই একটা ফ্রিজ কিনে ফেলব। কি বল?

আচ্ছা।

আর একটা ক্যাসেট প্লেয়ার। তুমি একা একা থাক গান শোনার একটা কিছু থাকলে সময় কাটবে।

আচ্ছা কেনা হবে।

ড্রেসিং টেবিলটা এখনো দিয়ে যায় নি?

না।

কি রকম হারামজাদা চিন্তা করে দেখতো। ইচ্ছা করছে পিটায়ে লাশ বানায়ে ফেলি। জ্বর কমলে কাল সকালে একবার যাব।— এমন পিটন দিব। অবশ্যি অহনাকে আনার জন্যে কাল রাজশাহীও যেতে হতে পারে। আমি হলাম তার চড়নদার। বুঝতে পারছ?

পারছি।

সপ্তাহের ছুটি যখন হত তখন অহনাকে আমি সফিকের কাছে পৌঁছে দিতাম। যেতাম রিকশা করে। ওর আবার সেই সময় পেট্রোলের গন্ধ সহ্য হত না। প্রথম প্রথম রিকশা করে যাবার সময় খুব কাঁদতো। এই মেয়ে যে কি পরিমাণ কাঁদতে পারে তুমি বিশ্বাসও করবে না। আচ্ছা নবনী তুমি কি রকম কাঁদতে পারো?

আমি জবাব দিলাম না। জ্বরের ঘোরে ও ঝিমিয়ে পড়ল। আমি পাশেই জেগে বসে আছি। একটু দূরে হাতপা ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছে মদিনা। মেয়েটা খুবই শান্ত। দোষের মধ্যে একটাই হঠাৎ দেখা যায় কাজ কর্ম বন্ধ রেখে কাঁদতে বসে। আমি যখন জিজ্ঞেস করি— কাঁদছিস কেনরে? সে দুহাতে চোখ মুছে কান্না বন্ধ করে ফিক করে হেসে ফেলে বলে, এম্নেই কান্দি। অভ্যাস।

ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছে। আমি কাঁদি কি-না। না। আমি কাঁদি না। অতি বড় দুঃসময়েও না। কি হবে কেঁদে? প্রবল জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে সে পড়ে আছে। আমি চুপচাপ বসে আছি তার মাথার কাছে। মানুষ কি আশ্চর্য প্রাণী। আজ আমি যার মাথার পাশে বসে আছি তার বদলে অন্য একজনের মাথার পাশেও বসতে পারতাম। পারতাম না? বিয়ে নামের একটা ব্যাপার দুজন অচেনাকে একসঙ্গে করে দিয়েছে। আমিতো স্যারের মাথার পাশেও বসে থাকতে পারতাম।

স্যারের কথা এই মুহূর্তে ভাবটা কি ঠিক হচ্ছে। মুহূর্তে বানান কি যেন? হয়ের নীচে দীর্ঘ উকার। শুনুন স্যার, এই বানান আমি আর কোন দিন ভুল করিনি। করবও না শব্দটা মনে হলেই আপনাকে মনে পড়ে।

একজন মানুষ কি তার প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা করতে পারে? আমি পারি। স্যারের সঙ্গে মুহূর্তগুলি আমি পারি। যদিও তাঁর সঙ্গে আমার তখন দেখাই হয় না। চাটাইয়ের যে ঢাকনি তিনি দিয়েছেন তা তিনি সরান নি। একদিন দেখি উত্তরের দরজাটাও তিনি তার দিকে থেকে বন্ধ করে দিয়েছেন। তখন তার ঘরে যেতে হলে বাইরে দিয়ে যেতে হবে।

আমি নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা এসে গেছে। দরজা বন্ধ করে রাত দিন পড়ার ভাণ করি। বই এ একেবারেই মন বসে না। চিঠি লেখার একটা খাতা করেছি। রোজ একটা করে চিঠি লিখি। মজার মজার সব চিঠি। কোনটাতে হাসির কথা থাকে। কোনটাতে রাগের কথা থাকে। কোন কোন চিঠি লিখে নিজেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। ঠিক করে রেখেছি। এক বছরে ৩৬৫টা চিঠি লিখব। চিঠি লেখা শেষ হলে একদিন খাতা নিয়ে স্যারের কাছে যাব। তাকে বলব— স্যার দেখুন তো এখানে কি কি বানান ভুল আছে।

অতিথিপুরে আমার ছোটখালার ননদের বিয়ে। খালা খবর পাঠিয়েছেন আমি যেন অবশ্যই যাই। মেয়েকে সাজিয়ে দিতে হবে। মা বললেন— নবনী যাবি?

আমি বললাম পাগল হয়েছ? আমার পরীক্ষা না? ইরাকে পাঠিয়ে দাও। ইরা যাক।

যা না মা এত করে লিখেছে। তোকে তোর খালা কত পছন্দ করে। না গেলে মনে কষ্ট পাবে।

আমার যেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু যাব কি করে? যদি যাই তাহলে কি আর রোজ একটা করে চিঠি লিখতে পারব? তাছাড়া স্যারকে ফেলে রেখে আমার যেতে ইচ্ছা করছে না। তার সঙ্গে আমার কথা হয় না। রোজ দেখাও হয় না। তবুওতো আমরা পাশাপাশি আছি। উত্তরের দরজার পাশে দাঁড়ালে তার হাঁটার শব্দ কানে আসে। এটাই বা কম কি?

ঠিক হল ইরা যাবে। বাবা তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। যেদিন যাবার কথা সেদিন দেখি বাবা যাচ্ছেন না। ঠিক হয়েছে। ইরাকে পৌঁছে দেবেন। আমাদের স্যার। আমার বুক ধ্বক করে উঠল। আমি মাকে গিয়ে বললাম— মা শোন, ইরা থাক। আমি যাব। আমি না গেলে ছোটখালা মনে কষ্ট পাবেন।

মা বললেন, ইরা সব কাপড় গুছিয়ে রেখেছে–এখন তুই যাবি কি?

আমি বললাম, আমার কাপড় গোছাতে এক মিনিট লাগবে।

না না তুই থাক, পড়াশোনা করছিস কর।

ইরা স্যারের সঙ্গে চলে গেল। আমার মনে হল আমি যদি একটা ধারালো ছুরি দিয়ে ইরাকে ফ্যালাফ্যালা করে ফেলতে পারতাম! আমার জীবনের সবচে কষ্টের মুহূর্ত কি যদি কেউ জানতে চায় আমি বলব—স্যারের সঙ্গে ইরার অতিথিপুরে যাবার সময়টা।

তখন ঝমোঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। বাবা একটা রিকশা ডেকে এনেছেন। ইরা রিকশায় উঠে বসেছে। স্যার বললেন, আমি আরেকটা রিকশা নিয়ে আসি। বাবা ধমকের স্বরে বললেন, আরেকটা রিকশা লাগবে কেন? তুমি এইটাতেই উঠতো মাস্টার। তোমাদের বড় বাড়াবাড়ি।

তারা দুজন একটা রিকশায় করে চলে যাচ্ছে। আমি পাথরের মত মুখ করে তাকিয়ে আছি।

ইরা ফিরে এসে কত গল্প, আপা জান তোমার স্যার কিন্তু দারুণ রসিক লোক। এমিতে বোঝা যায় না। কিন্তু এমন সব রসিকতা করেন যে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে হয়। একদিন কি হয়েছে শোন, ছোটখালা স্যারকে খেতে দিয়েছেন। পাংগাশ মাছের বড় একটা পেটি দেয়া হল। তখন স্যার…

আমি বললাম, চুপ করতো ইরা। কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করিস না। পড়ার চেষ্টা করছি দেখছিস না?

একদিন খুব কষ্ট লাগল। বড় মামা একটা টাঙ্গাইলের শাড়ি পাঠিয়েছেন। সবুজের উপর কালো ডোরা। শাড়ি পরার পর মা বললেন, ও আল্লা তোকে তো পরীর মত সুন্দর লাগছে রে। ইরাকে নিয়ে যা তো স্টুডিও থেকে একটা ছবি তুলে আয়। বিয়ের কথাবার্তায় কাজে লাগবে।

আমি ছবি তুলতে গেলাম না। তবে আমাদের বাড়ির সামনের বাগানে হাঁটতে গেলাম। বাগান থেকে স্যারের ঘরের ভেতরটা দেখা যায়। আমার মন বলছিল। ভেতর থেকে স্যার আমাকে দেখতে পাবেন এবং অবশ্যি বাইরে বের হয়ে আসবেন।

সে রকম কিছুই হল না। আমি দেখলাম গভীর মনযোগে তিনি কি যেন পড়ছেন। জানালার সামনে দিয়ে আমার বার বার যাওয়া আসা তার মনযোগ নষ্ট করতে পারল না। আমার ইচ্ছা করছে তাঁর ঘরে গিয়ে ঢুকি। তীব্র গলায় বলি– বেহেশতে আপনি যেসব পরী পাবেন তারা কি আমার চেয়েও সুন্দর? আপনি দিনের পর দিন আমাকে অগ্রাহ্য করবেন তা হবে না। না না না।

এই সময় স্যার অসুখে পড়লেন। বাসার কেউ বুঝতে পারল না। কিন্তু আমি বুঝলাম। বুঝেই বা কি করব? আমি তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখি না। তিনি কলেজেও যান না। আমি কলেজের অফিসে খোঁজ নিয়ে জানলাম অসুস্থতার জন্যে তিনি ছুটির দরখাস্ত করেছেন। আমার ভয়ঙ্কর খারাপ লাগছে। একটা মানুষ অসুখ হয়ে পড়ে আছে। এ বাড়ি কেউ সেটা বুঝতে পারছে না কেন? এ বাড়ির সবাই কি অন্ধ? মার কি উচিত না খোঁজ-খবর করা? আমি নিজ থেকে কাউকে কিছু বলব না। মরে গেলেও না।

একদিন মা বললেন, কিরে তোর স্যারের কি অসুখ বিসুখ করল না-কি? একজন ডাক্তারকে মনে হয় ঢুকতে দেখলাম।

আমি বললাম, অসুখ বিসুখ করেছে কি-না জানি না। করতেও পারে। আল্লাহর পিয়ারা বান্দাদেরওতো অসুখ বিসুখ হয়।

খোঁজ নিয়ে আয়তো।

আমি খোঁজ নিতে পারব না, মা। আমার এত মাথা ব্যথা নেই। অন্তুকে পাঠাও।

অন্তু খোঁজ নিয়ে এল— চোখ বড় বড় করে হাসি মুখে বলল, মওলানা ফ্ল্যাট হয়ে গেছে বুঝলে মা–ছয়দিন ধরে বিছানায় শোয়া। কথা বলে চিঁচিঁ করে।

মা বললেন, তাতে হাসির কি হল। হাসছিস কেন?

উনি কেমন চিঁচিঁ করে কথা বললেন ঐ জন্যেই হাসছি। উনার কথা শুনলে মনে হবে মানুষ কথা বলছে না। চিকা কথা বলছে। কথা শুনলে তুমিও হাসবে।

মা তৎক্ষণাৎ তাঁকে দেখতে গেলেন। পৃথিবীর সমস্ত মাদের মত তিনিও খুব দুঃখিত হলেন। একটা লোক দিনের পর দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে তিনি বলতেও পারেন না। এই লজ্জাতেই মা অস্থির। মা বললেন, কেন তুমি আমাদের কোন খবর দেবে না? তুমি রান্না করে কিছু খেতে পার না, আমাদের বলবে আমরা ব্যবস্থা করব। না-কি ইসলাম ধর্মে এরকম নিয়ম নেই?

তিনি মিনমিন করে বললেন, আপনাদের কষ্ট দিতে চাই নি। ভেবেছি সেরে যাবে।

এখন থেকে তোমার সব খাওয়া দাওয়া এ বাড়ি থেকে যাবে। বুঝতে পারছি? কি খাও তুমি?

বার্লি আর সাগু। এই দুটা ছাড়া আর কিছু খেতে পারি না।

তোমার হয়েছে কি? ডাক্তার কি বলল?

ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। এখনো কিছু বলতে পারছেন না।

দুপুরে আমি খাবার নিয়ে গেলাম।

মামার পাঠানো সেই সবুজ শাড়িটা পারলাম। চোখে কাজল দিলাম। হাতে একটা ট্রে। ট্রেতে এক বাটি বার্লি এক গ্লাস দুধ। স্যার আমাকে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠলেন। পৃথিবীর আশ্চৰ্যতম ঘটনাটা তিনি যে ঘটতে দেখলেন। বিছানায় উঠে বসতে গিয়ে কাত হয়ে পড়ে গেলেন। আমি বললাম, স্যার আপনি উঠবেন না। চুপ করে শুয়ে থাকুন। আপনার খাবার নিয়ে এসেছি।

শুকরিয়া। অশেষ শুকরিয়া। রেখে দাও।

আপনি নিজে নিজে খেতে পারবেন? না-কি আমি চামচ দিয়ে খাইয়ে দেব?

না না পারব। আমি পারব।

স্যার আমার চামচ দিয়ে খাইয়ে দিতে কিন্তু অসুবিধা নেই। আপনি যদি অস্বস্তি বা লজ্জা বোধ না করেন আমি খাইয়ে দিতে পারি। যদি পাপ হয় আমার হবে। আপনার হবে না। আপনি ঠিকই বেহেশতে যাবেন।

তিনি দুঃখিত গলায় বললেন, তুমি আমার ধর্ম কর্মটাকে এমন কঠিন দৃষ্টিতে দেখ কেন? আমিতো কারো কোন ক্ষতি করছি না। আমি নিজের মতো থাকি। এই নিজের মতো থাকতে গিয়ে তোমাকে যদি কোন কারণে কষ্ট দিয়ে থাকি তুমি কিছু মনে রেখ না।

আমি অস্বস্তির সঙ্গে বললাম, আপনি কষ্ট দেবেন। কেন? আমি কথার কথা বললাম। স্যার আমি যাই।

একটু বোস নবনী। বসতে ইচ্ছা না হয়–দাঁড়িয়ে থাক। আমি কয়েকটা কথা বলব। এই কথাগুলো তোমার জানা খুব জরুরি। আমি মানুষ হয়েছি এতিমখানায়। এতিমখানার জীবনটাতো আদর ভালবাসার জীবন না। কষ্টের জীবন। আমাদের একজন হুজুর ছিলেন আমরা ডাকতাম মেজো হুজুর। তিনি আমাদের সবাইকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ধর্ম কর্মের প্রতি আমার এই অনুরাগ তার কাছ থেকে পাওয়া। আমি মনে করি না এটা ভুল। মাদ্রাসা থেকে উলা পাস করে আমি কলেজে ভর্তি হই। আমার ভাগ্য ভাল ছিল, ইন্ডিয়া সরকারের একটা স্কলারশীপ পেয়ে যাই। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ. করার একটা সুযোগ ঘটে। এম. এ. পাস করি।

আমি বললাম, স্যার আমাকে এত কথা বলার দরকার নেই।

তিনি খানিকটা উত্তেজিত গলায় বললেন, দরকার আছে। দরকার আছে বলেই বলছি–তোমরা আজ যে পোশাকে আমাকে দেখছি সব সময় এই পোশাকেই আমি সারা জীবন পরেছি। মেজো হুজুর সেই নির্দেশ আমাকে দিয়েছেন।

কোন দিলেন?

কারণ আমাদের নবী এই লেবাস পরতেন।

নবী আরবে জন্মেছিলেন বলে এই লেবাস পরতেন। তিনি যদি তুন্দ্ৰা অঞ্চলে জন্মাতেন তাহলে নিশ্চয়ই এই লেবাস পরতেন না। তখন গায়ে পরতেন সীল মাছের চামড়ার পোশাক। এই অবস্থায় আপনি কি করতেন? আপনিও কি সীল মাছের চামড়ার পোশাক জোগাড় করতেন?

নবীজী যেহেতু তুন্দ্ৰা অঞ্চলে জন্মাননি কাজেই সেই প্রশ্ন আসে না। তাছাড়া নবীজীর পোশাক পরার অন্য একটা অর্থ হল— তাকে সম্মান দেখানো। সম্মান দেখানোয়তো দোষের কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথকে সম্মান দেখাতে গিয়ে এক সময় অনেকে লম্বা দাড়ি রাখত বাবড়ি চুল রাখতো।

আমি চুপ করে গেলাম। স্যার সহজ ভঙ্গিতে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে যুক্তিতে পারবে না। নবনী। বোধহয় তোমার ধারণা ছিল এই জাতীয় পোশাক পরা টুপীওয়ালা লোক সব অল্প বুদ্ধির হয়। এই রকম মনে করার কোন কারণ নেই। আমার বুদ্ধি ভালই আছে। আমার পড়াশোনাও অনেক। তোমাকে এত কথা বললাম কারণ… কারণ…।

কারণটা কি বলুন?

আরেকদিন বলব। আজ একদিনে অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি।

আপনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন।

না নবনী আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তবে খুব গুছিয়ে চিন্তা করতে পারি।

একটা কাক যে আপনার কাছে আসতো সেটা কি আর আসে না?

আসে। বিকালের দিকে আসে। একা আসে না–তার কয়েকটা বন্ধুবান্ধব জুটেছে। সব কটাকে নিয়ে আসে। এরা কেউই আমাকে ভয় পায় না।

আপনাকে বোধহয় কাক মনে করে।

করতে পারে। পশুপাখির মনের কথা বোঝা বড়ই দুষ্কর। তবে কাক আমার খুব প্রিয় পাখি। এতিমখানায় যখন ছিলাম তখনও আমার কয়েকটা পোষা কাক ছিল।

কাক আপনার প্ৰিয় পাখি?

হুঁ।

কেন?

কাকই একমাত্র পাখি যে মানুষের কাছাকাছি থাকে, অন্য কোন পাখি কিন্তু মানুষের কাছে আসে না। তারা দূরে দূরে থাকে।

আপনার কি ধারণা আমাদের সবার কাক পোষা উচিত?

উনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হো হো করে হেসে উঠলেন। কোন মানুষকে এত আনন্দিত ভঙ্গিতে আমি হাসতে শুনি নি। আমার ইচ্ছা করতে লাগল। আমি আরো কিছু হাসির কথা বলে স্যারকে হাসিয়ে দি।

স্যার হাসি থামিয়ে বললেন, এক হাসিতে আমার অসুখ অনেকখানি কমে গেছে। এখন ঘরে যাও নবনী।

না। আমি ঘরে যাব না।

তোমার পড়াশোনা আছে। পড়াশোনা কর। রুগীর পাশে এতক্ষণ থাকা ঠিক না।

আমার ঠিক অঠিক আমি বুঝব আপনাকে এই নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।

তিনি একটু যেন ভয়ে ভয়ে বললেন, তুমি আমার কাছে কি চাও বলতো নবনী।

আমি কিছু চাই না। স্যার অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে ক্লান্ত গলায় বললেন, আমার কাছে দুটি চিঠি কি তুমি লিখেছিলে?

জানি না। লিখতেও পারি।

শোন নবনী, তুমি একটা অসম্ভব ভাল মেয়ে। আমি চাই না আমার কারণে তোমার কোন ক্ষতি হোক।

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, ক্ষতির কথা আসছে কেন? কি আবোল তাবোল কথা বলছেন? স্যার আরেকটা কথা আমি কোন চিঠি ফিঠি কাউকে লিখিনি— আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই মৌলবীকে চিঠি লিখব। অসুখে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আপনার এখানে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে।

স্যার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, আমি আর আপনার কাছে খাবার নিয়ে আসব না।

সেদিন রাতে খুব বৃষ্টি। আমি আবার তাঁর খাবার নিয়ে গেলাম। স্যারের ঘরে পা দেয়া মাত্র ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। স্যার ব্যস্ত গলায় বললেন, দাঁড়াও দাঁড়াও মোমবাতি আছে। মোমবাতি জ্বালাচ্ছি।

আমি অদ্ভুত গলায় বললাম–না মোমবাতি জ্বালাতে হবে না। অন্ধকারই ভাল।

স্যার চমকে উঠে বললেন, নবনী ঘরে যাও। প্লীজ ঘরে যাও। আমি বললাম, না।

কি প্ৰচণ্ড ঝড় হল সে রাতে। আমাদের শিরীষ গাছের একটা ডাল প্ৰচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ে গেল। হোক যা ইচ্ছা হোক। আজ আমার আর কিছুই যায় আসে না। প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। হোক বর্ষণ। সারা পৃথিবী তলিয়ে যাক।

০৭. ড্রেসিং টেবিল

আমাদের ড্রেসিং টেবিলটা চলে এসেছে। গাবদা ধরনের একটা জিনিস। আয়নাটাও বোধহয় সস্তা— মুখ কেমন বাঁকা দেখা যায়। যে পালিশের জন্যে এতদিন দেরী হল সেই পালিশে ড্রেসিং টেবিলের কোন উন্নতি বলে মনে হল না। ম্যাট ম্যাটে রঙ।

নোমান হাসি মুখে বলল, কি জিনিসটা সুন্দর না?

আমি বললাম, সুন্দর। খুব সুন্দর।

সস্তায় পেয়ে গেছি। সেগুন কাঠ। ঘুণ ধরবে না। দুশ বছর পরেও কিছু उश नां।।

আমি বললাম, দুশ বছর পর্যন্ত আমাদের কোন ড্রেসিং টেবিল কিনতে হবে। না। এটা দিয়েই চালিয়ে দেব।

সে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে অস্বস্তি। আমার রসিকতটা বোধহয় বুঝতে পারছে না। এটা দোষের কিছু না। অধিকাংশ মানুষই রসিকতা বুঝতে পারে না। আমার বাবাও পারেন না। অথচ তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান।

নোমানকেও আমার বুদ্ধিমান মনে হয়। সরল ধরনের বুদ্ধি। এই জাতীয় বুদ্ধির মানুষ রসিকতা করতেও পারে না। রসিকতা বুঝতেও পারে না। এরা খুব কর্মঠ হয়। বিশ্বস্ত হয়। এরা যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করে সেই প্রতিষ্ঠানের জন্যেই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তবে তাদের কোন উন্নতি হয় না। নিজের অবস্থার উন্নতির জন্যে এদের মাথা ব্যথা থাকে না। এরা অল্পতেই তুষ্ট।

ড্রেসিং টেবিলটা ঘরে আসার পর থেকে তার হাসিমুখ দেখে আমার খুব মজা লাগছে। এর মধ্যে গামছা দিয়ে সে দুবার এটা মুছল। কাছ থেকে, দূর থেকে নানান ভঙ্গিমায় নিজেকে দেখল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব কায়দা করে চুল আঁচড়াল তার চুল আঁচড়ানোই ছিল— দুই হাতে সেই চুল আউলা ঝাউলা করে আবার আঁচড়াল। আশ্চর্য ছেলেমানুষী।

নবনী।

বল।

ড্রেসিং টেবিলের জন্যে একটা ঢাকনি বানানো দরকার। নয়ত ধুলা পড়ে পালিশ নষ্ট হয়ে যাবে।

ড্রেসিং টেবিলে ঢাকনি থাকে না।

কে বলল থাকে না। ড্রেসিং টেবিলে ঢাকনি বেশি দরকার। রাতের বেলা আয়না ঢেকে রাখতে হয়। রাতের বেলা আয়নায় মুখ দেখা খুবই অলক্ষণ। তুমি বোধহয় এসব বিশ্বাস কর না?

না।

পামিস্ট্রি বিশ্বাস কর? হাত দেখা।

না।

অহনা আবার এসব খুব বিশ্বাস করে। কেউ হাত দেখতে জানে বললেই হল সে হাত মেলে দিবে।

ও আচ্ছা।

একবার সে খবর পেয়েছে হ্নীলা বলে একটা জায়গা আছে সেখানে খুব বড় একজন পামিস্ট্র থাকেন। যুগানন্দ আচার্য। স্কুলের সংস্কৃতের টিচার। সে সেখানে যাবেই। সফিক বিরক্ত হয়ে বলল, নোমান তুই ওকে নিয়ে যা। ঝামেলা চুকিয়ে আয়।

তুমি নিয়ে গেলে?

না নিয়ে উপায় আছে? অহনা মুখ দিয়ে যা বলবে তা করে ছাড়বে। সে বিরাট ইতিহাস। জায়গাটা হল টেকনাফের কাছাকাছি। অতি দুৰ্গম। আমি মাইক্ৰবাস নিয়ে আগে চলে গেলাম। অহনা প্লেনে করে গেল কক্সবাজার। সেখান থেকে ওকে নিয়ে মাইক্রবাসে করে রওনা হলাম। রাস্তা গেছে পানিতে ডুবে। রাস্তার দুই ধারে লাল ফ্ল্যাগ পুঁতে রেখেছে। ফ্ল্যাগ দেখে দেখে যাওয়া। এর মধ্যে টায়ার গেল পাংচার হয়ে।

শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল যুগান্দ আচার্যকে?

মজাতো এই খানেই। কেউ এই লোকের নামও শুনে নাই। স্কুলই নেই। স্কুল টিচার কোত্থেকে আসবে?

তোমরা কি করলে ফিরে এলে?

ফিরে আসব কি করে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঐ সব অঞ্চলে সন্ধ্যার পর গাড়ি ঘোড়া চলে না। ডাকাত পড়ে। তারচেয়ে বড় কথা কয়েকদিন ধরে পাহাড়ে বুনো হাতি নেমেছে, তিনটা মানুষ মেরেছে। আমারতো মাথায় বাড়ি। কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। হোটেল নেই রেস্ট হাউস নেই। কিছুই নেই। গেলাম টেকনাফ। সেখানে বনবিভাগের একটা রেষ্ট হাউস পাওয়া গেল। একটাই রুম। আহনাকে সেখানে রেখে আমি মাইক্রবাসের ভেতর শুয়ে আছি। খবর পাওয়া গেছে রাস্তায় হাতি নেমে গেছে। সব বাতি টাতি নিভিয়ে দিতে বলেছে। বাতি দেখলেই না-কি হাতি ছুটে আসে। কত কাণ্ড! চা করতো নবনী।

চা খাই! আর তুমি এক কাজ কর পাউডার টাউডার এইসব দিয়ে ড্রেসিং টেবিলটা সুন্দর করে সাজাও অহনা দেখতে আসবে।

উনি এই ড্রেসিং টেবিল দেখতে আসবেন?

হ্যাঁ। তাকেও বলেছি।

ভাল করেছ।

আমি চা বানাতে গেলাম। নোমান একটা মোড়া নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রইল। আনন্দিত মুখ, সুখী সুখী চেহারা।

আজ তার অফিস আছে। অথচ সারাদিন দিব্যি অফিস বাদ দিয়ে ঘরে বসে আছে। অফিসে তার কাজটা কি আমি জানি না। আমার ক্ষীণ সন্দেহ তার প্রধান কাজ বন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে থাকা। ফুট ফরমাশ খাটা। একদিন জিজ্ঞেসও করেছিলাম–অফিসে তোমার কাজটা কি বলতো?

সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। যেন খুব বোকার মত প্রশ্ন করেছি। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, যখন যে কাজ দেয় সেটাই করতে হয়। ধরা বাধা কিছু না। এড ফ্লিম করার জন্যে আর্টিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ তাদের আনা নেয়া–কাজের কি শেষ আছে? প্রয়োজনে লাইটবয়ের কাজও করতে হয়।

সেটা কি?

আর্টিস্টের উপর লাইট ফেলা।

ও আচ্ছা। খুব কঠিন কাজ?

দেখে মনে হবে খুব সহজ কাজ আসলে তা না। কঠিন আছে। টেকনিক্যাল কাজ সবই কঠিন।

তুমি যে কাজটা কর সেটার নাম কি?

তোমার কথাই বুঝতে পারছি না— নাম আবার কি?

অফিসে কত রকম পোস্ট আছে–কেউ ম্যানেজার, কেউ সুপারভাইজার, কেউ ক্যাশিয়ার, হেড ক্লার্ক… তুমি কি?

ও আমার অজ্ঞতায় হো হো করে কিছুক্ষণ হেসে বলল— আমাদের এসব কিছু নেই। তবে আমার বেতন হয় অহনার পি এ এই খাতে।

তুমি অহনার পি এ?

কাগজে কলমে তাই। আসলে অফিসের কাজ করে ফুরসুত পাই না।

আজ অফিসে গেলে না? আমার হল স্বাধীন চাকরির মত— ইচ্ছা হল গেলাম ইচ্ছা হল গেলাম না। আজ ছুটি নিলাম। চল বিকালে তোমাকে নিয়ে বের হব মিরপুরের দিকে যাব।

তুমি না বললে— অহনা আসবেন।

সে এলেও আসবে রাত নটার পরে। তার লেডিস ক্লাবের মিটিং আছে।

অহনার সঙ্গে তার স্বামীর যে সমস্যা ছিল সেটা মিটে গেছে?

হুঁ মিটে গেছে। এখন আবার গলায় গলায় ভাব।

তোমাদের ছবির স্যুটিং শুরু হবে না?

হবে। এইবার তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার অবশ্যি ভাল লাগবে না। খুবই বিরক্তিকর কাজ। ছবি মানে ধৈর্য পরীক্ষা আর কিছু না।

চা খেতে খেতে নোমান বলল, কাপড় পরে নাও চল ঘুরে আসি।

কোথায় যাবে চিড়িয়াখানায়?

হ্যাঁ। আর কোথায়? এই পর্যন্ত আমরা ছবার বাইরে গেছি। এই ছবারের মধ্যে পাঁচবারই গিয়েছি চিড়িয়াখানায়। খানিকক্ষণ ঘুরেই সে এসে দাঁড়াবে বান্দরের খাঁচার সামনে। মুগ্ধ বিস্ময়ে বলবে–কি আজিব জানোয়ার। সে অবাক হয়ে আজিব জানোয়ার দেখে, আমি দেখি তাকে। বাঁদরদের সঙ্গে সে নানা কথাবার্তা বলে সেইসব শুনতেও মজা লাগে।

এই লাফ দে। লাফ দে… কিচ কিচ কিচ… ঐ লম্বুটার ল্যাজ ধরে টান মার না। দেখছিস কি? আবার দেখি হাসে… কিচ কিচ কিচ…

আমাদের চিড়িয়াখানায় যাওয়া হল না। কাপড় চোপড় পরে বেরুবার মুখে অহনা এসে উপস্থিত হলেন। চোখ ধাঁধানো উগ্ৰ পোশাক। শাড়ি এমন পাতলা যে এই শাড়ি গায়ে থাকা না থাকা অর্থহীন। ব্লাউজটিও ভিন্ন ধরনের কাচুলী জাতীয়–নাচের মেয়েরা বোধহয় এরকম পরে। ঠোঁটে তিনি এমন লিপিষ্টিক মেখেছেন যে দেখে মনে হয় ঠোঁটে আগুন লেগে গেছে। এমন আগুন রঙা লিপিষ্টিক আমি আগে দেখি নি। অহনা এসেছেন নোমানের ড্রেসিং টেবিল দেখতে। তিনি নানা দিক থেকে ঘুরে ফিরে ড্রেসিং টেবিল দেখলেন। মুগ্ধ স্বরে বললেন, অপূর্ব!

নোমান বলল, অরিজিনাল সেগুন কাঠ দুশ বছরেও কিছু হবে না।

অহনা বললেন, সেগুন কাঠ ছাড়া এত ভাল পালিশ হত না। অদ্ভুত সুন্দর। আয়নাটায় একটু ঢেউ ঢেউ ভাব আছে। এটা এমন কিছু না।

অহনা আমাদের খাটে পা বুলিয়ে বসলেন। পা দুলাতে দুলাতে বললেন, নোমান জিলাপী খাব। তোমার সেই বিখ্যাত জিলাপী নিয়ে এসো। ভাল কথা তোমরা কি কোথাও বেরুচ্ছিলে?

হুঁ। আরেকদিন যাব অসুবিধা নেই।

যাচ্ছিলে কোথায়? বাঁদর দেখতে নিশ্চয়ই। বাঁদর দেখা মোটেই জরুরি নয়। আমি খুব জরুরি কাজ নিয়ে এসেছি। গোরানে একজন পামিস্ট আছে। আমি ঠিকানা নিয়ে এসেছি। তুমি আমাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। পারবে না?

অবশ্যই পারব।

অহনা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, আপনার স্বামীকে কিছুক্ষণের জন্যে ধার নিচ্ছি। পামিস্টের কথা শুনলে আমার আবার মাথায় ঠিক থাকে না। আমার পামিস্ট প্রীতির কথা নোমান আপনাকে বলে নি?

বলেছে।

পামিস্ট নিয়ে আমার অসংখ্য গল্প আছে। কিছু কিছু বোধহয় শুনেছেন। হীলাতে পামিষ্টের খোজে গিয়ে যে পাগলা হাতির খপ্পরে পড়েছিলাম। সেই গল্প শুনেছেন?

শুনেছি।

অহনা পা দুলিয়ে দুলিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলেন। জিলাপী খেলেন চা খেলেন। মদিনার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করলেন, ময়নাটার সঙ্গেও কিছু কথা বললেন। খাঁচাটাকে দোলা দিয়ে বললেন, এই ময়না বল দেখি, অহনা! অহনা! অহনা।

ময়না সঙ্গে সঙ্গে বলল, অহনা! অহনা! আহনা!

যাবার সময় তিনি মদিনাকে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে গেলেন। মদিনা সারা সন্ধ্যা এই নোট হাতে বারান্দায় স্থানুর মত বসে রইল।

মদিনা তার পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে বারান্দায় বসে আছে। আমি চলে এসেছি ছাদে। এই বাড়িটার ছাদটায় ওঠা এক সমস্যা। খানিকটা অংশ দেয়ালের গায়ে আটকানো খাড়া লোহার সিড়ি বেয়ে উঠতে হয়। শুরুতে এই ছাদটা আমার পছন্দ হয় নি। এখন পছন্দ। খুব নিরিবিলি। হঠাৎ কেউ ছাদে উঠে আসবে সে সম্ভাবনা নেই। কেউ আসবে না। তাছাড়া বাড়ির চারদিকে পুরানো পুরানো গাছ আছে বলেই ছাদটায় এক ধরনের আব্রু আছে।

ইরার গল্পের বইটা এক হাতে নিয়ে বেশ ঝামেলা করে ছাদে উঠলাম। গল্পের বই পড়ার জন্য ছাদে আমি সুন্দর একটা জায়গা বের করেছি। পশ্চিম দিকের ছাদে পানির ট্যাঙ্কে হেলান দিয়ে বসলেই হয়। খুব সুন্দর জায়গা। মজার ব্যাপার হচ্ছে বই পড়ার এত সুন্দর জায়গা থাকলেও আমি এখন এখন পর্যন্ত একটা বইও পড়ে শেষ করতে পারি নি। তিথির নীল তোয়ালে বইটা কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরই হাই উঠে। বই বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকি। হাতে একটি বই থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে সব সময় মনে হবে। আমি অকারণে বসে নেই। আমার একটা কাজ আছে।

আমি পানির ট্যাঙ্কে হেলান দিয়ে বসে আছি। গাছের মাথায় রোদ এখনো ঘণ্টা খানিক সময় আছে। বইটা খুলতেই ইরার চিঠি বের হয়ে এল। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি দিচ্ছে। এটা সর্বশেষ চিঠি কিনা বুঝতে পারছি না। ইরা চিঠিতে তারিখ থাকে না।

আপা,
তোমার কি হয়েছে বলা তো? তোমাকে এত করে আসতে লিখলাম, আসলে না। বড় মামা প্ৰচণ্ড জ্বর নিয়ে তোমার ওখান থেকে গেলেন। খুব ভুগলেন। প্রায় যমে-মানুষে টানাটানি। তুমি মামাকেও চিঠি দাও নি। আমাকে সেই যে প্ৰথম একটা চিঠি লিখলে তারপর আর না। বাবাকে দায়সারা গোছের একটা চিঠি দিয়েছ। বড় মামার ধারণা–তুমি সবার উপর রাগ করে আছ, কারণ তোমাকে গরিব ধরনের একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আসল কারণটা কি আপা বলা তো? আমি ভাইয়াকে বলেছি আমাকে তোমার ওখানে নিয়ে যেতে। আমি নিজের চোখে দেখতে চাই ব্যাপারাটা কি | ভাইয়া প্ৰতিবারই বলে— আচ্ছা। আচ্ছা। ফুটবল খেলতে গিয়ে সে। মাথায় চোট পেয়েছে বলেছিলাম না? এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার কোমরে কি না-কি হয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বাঁকা হয়ে দাঁড়ায়। বাঁকা হয়ে হাঁটে। ঐ দিন বাবা কি কারণে ভাইয়্যার উপর রাগ করে। বললেন, এই যে বক্রবার, শুনে যাও। এতে ভাইয়ার খুব লেগেছে। সে বিছানা-বালিশ নিয়ে চলে গেছে। তার এক বন্ধু আছে— সজল। এখন তাদের বাড়িতে থাকে। মাঝে মাঝে বাঁকা হয়ে আমাদের দেখতে আসে। আমার বিয়ের ব্যাপারে যে কথাবার্তা হচ্ছিল তা আরো কিছুদূর এগিয়েছে। জামালপুর থেকে বরের বোন আমাকে দেখতে এলেন। ওজন পাঁচ মণের কাছাকাছি। আমাদের খাটে বসলেন। খাটে মটমট শব্দ হতে লাগল। আমি ভাবছি সর্বনাশ! এখন উনি যদি খাট ভেঙে পড়েন তাহলে আমাদের খাঁটও যাবে বিয়েও যাবে। যাই হোক, খাট ভাঙে নি। তবে বিয়ে ভেঙে গেছে। ভদ্রমহিলার আমাকে পছন্দ হয় নি। কাজেই, আপা, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আমার মন খারাপ। তোমার পায়ে পড়ি, আমার মন ঠিক করার জন্যে হলেও এসো।
ইতি
ইরা!

পুনশ্চঃ আপা, তুমি আসার সময় অবশ্যি লাইব্রেরির বইটা নিয়ে আসবে। অনেক ফাইন হয়ে গেছে।

ইরার বিয়ে ভেঙে গেছে–এটা বড় ধরনের দুঃসংবাদ। বিয়ে একবার ভাঙতে শুরু করলে শুধু ভাঙতেই থাকে। তখন বিয়ের কোন সম্বন্ধ এসেছে শুনলেই আতঙ্ক লাগে।

ইরার বিয়ে কি আমার জন্যে ভাঙল? সে যদিও কিছু লিখে নি তবু আমার তাই ধারণা। তবে আমার বড় মামা যতদিন আছেন। ততদিন কোন চিন্তা নেই। তিনি একের পর এক সম্বন্ধ আনতেই থাকবেন এবং এক শুভলগ্নে দেখা যাবে ইরারও বিয়ে হয়ে গেছে। মামা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলবেন, যাক, দায়িত্ব শেষ হয়েছে।

এই পৃথিবীতে কেউ কেউ প্রচুর দায়িত্ব নিয়ে জন্মায়, আবার কেউ কেউ জন্মায় কোন রকম দায়-দায়িত্ব ছাড়া। যেমন আমার বাবা। তাঁর জীবনের একমাত্র দায়িত্ব সম্ভবত খবরের কাগজ পড়া। এই দায়িত্বটি তিনি খুব ভালভাবে পালন করেন। ইলেকশনের সময় এলে হঠাৎ দেখা যায় তিনি স্বতন্ত্র দল থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। বাবার যুবক বয়সের কালো চশমা-পরা একটা ছবির পোস্টারে সারা নেত্রকোনা শহর ঢেকে ফেলা হয়। গুণ্ডা-পাণ্ডা ধরনের কিছু ছেলেপুলে এই সময় আমাদের বাড়িতে চা-নাশতা খেতে থাকে এবং হাতখরচ নিতে থাকে। তারা প্ৰত্যেকেই না-কি বিরাট অর্গানাইজার। এতসব অর্গানাইজার চারপাশে নিয়েও বাবা যথারীতি ফেল করেন। বেশির ভাগ সময়ই তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ইলেকশনের রেজাল্টের পর তিনি দরজা বন্ধ করে ঘণ্টা দুইতিনেক শুয়ে থেকে গম্ভীর মুখে মাকে ডেকে বলেন, বুঝলে মিনু, এই দেশে রাজনীতি করে লাভ নেই, বরং ছাতা সেলাই করাতেও লাভ। রাজনীতি আর করব না। হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললাম— No more politics, যে দেশের মানুষ সৎ-অসৎ বুঝে না সেই দেশে কিসের পলিটিকস্?

মা জানতেন, আমরাও জানতাম, এগুলো বাবার কথার কথা। আবার কোন নির্বাচন চলে আসবে। বাবার চারপাশে কিছু লোকজন জুটে যাবে, যারা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বাবাকে বলবে— আরো চৌধুরী সাহেব, আপনি না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে! একটা-দুটা সৎ মানুষ তো থাকা দরকার, যাদের পিছনে আমরা থাকব। সৎ মানুষের সঙ্গে হারাতেও আনন্দ।

বাবা বলবেন, না না, ইলেকশনের নাম আমি শুনতে চাই না। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি কানে ধরেছি।

চৌধুরী সাহেব, আপনার শিক্ষা হলে তো হবে না। দেশবাসীর একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। এইবার আমরা জিতে এই শিক্ষাটা দিব।

না না, টাকা পয়সাও নেই।

টাকা পয়সা নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। দশের লাঠি একের বোঝা। এইবার আমরা পকেট থেকে পয়সা খরচ করে ইলেকশন করব। আপনাকে ঘর থেকে বের হতেও হবে না। আপনি দরজা বন্ধ করে নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। দেখেন আমরা কি করি।

বাবা তখন খানিকটা নরম হয়ে জিজ্ঞেস করেন–দাঁড়াচ্ছে কে কে কিছু খবর পেয়েছ?

যারা দাঁড়াচ্ছে তারা কেউ আপনার নখের কাছাকাছিও না। আপনার সামনে চেয়ারে বসার যোগ্যতাও তাদের নেই। তারা একটা জিনিসই পারে–রিলিফের গাম বেচে দেয়া। একজনের তো নামই পড়ে গেল আবদুল মজিদ গমচোরা।

মজিদ ইলেকশন করছে? চক্ষুলজ্জাও দেখি নাই।

তবে আমরা আপনাকে বলছি কি?

বাবা নড়েচড়ে বসেন। গলা উঁচিয়ে আমাকে ডাকেন, নবু কইরে, তোর মাকে বল চা বানাতে।

আমরা বুঝে ফেলি–আবারও বাবা কিছু ধানী জমি বিক্রি করবেন।

আমার দাদাজান মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অমানুষিক পরিশ্রম করে যে সম্মানজনক বিষয়-সম্পত্তি করে গিয়েছিলেন আমার বাবা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার সর্বনাশ করে যাচ্ছিলেন। সবই শেষ করে দিতেন, বড় মামার জন্যে পারলেন না। নেত্রকোনায় আমাদের একটা বড় ফার্মেসী, একটা রাইস কল এবং দুটা বাড়ি বাবা অনেক চেষ্টা করেও বিক্রি করতে পারলেন না। পারলেন না মূলত বড় মামার জন্যে। মামা এইসব যক্ষের ধনের মত আগলে রাখতেন। বাবা ভীরু ধরনের মানুষ ছিলেন। বড় মামাকে যমের মত ভয় পেতেন। তাকে অগ্রাহ্য করার মত সাহস তিনি কোনদিনই সঞ্চয় করে উঠতে পারেন নি।

আমার এই সরল ধরনের রাজনীতি পাগল বাবার কাছে এক সকাল বেলা আমার স্যার উপস্থিত হলেন। বাবা তখন বারান্দায় চায়ের এবং আগের দিনের বাসি কাগজ নিয়ে বসেছেন। স্যার বাবার সামনে বসলেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আপনার কাছে আমার একটা প্ৰস্তাব আছে।

বাবা খুব উৎসাহের সঙ্গে বললেন, বল। বল।

আমি আপনার বড় কন্যাকে বিবাহ করতে চাই।

বাবার মুখ হা হয়ে গেল। তার কোল থেকে খবরের কাগজ মাটিতে পড়ে গেল। এই সম্ভাবনা হয়ত তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। বাবা বললেন, কি বললে?

আমি ওকে অত্যন্ত পছন্দ করি। সেও করে…।

কি বললে তুমি? নবনী পছন্দ করে। নবনী নবনী…

বাবা চটি ফটফট করে আমার খোঁজে এলেন। আমি তখন পড়তে বসেছি। বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, মৌলনা এসব কি বলছে?

আমি শঙ্কিত গলায় বললাম, কি বলছেন?

তোকে বিয়ে করার কথা বলছেন কেন?

আমিতো জানি না। বাবা কেন?

এই হারামজাদার কথায় তো আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। বলে কি নবনী আমাকে পছন্দ করে। ব্যাটা তুই কোথাকার রসোগোলা যে আমার মেয়ে তোকে পছন্দ করবে? তুই নিজেকে ভাবিস কি? চাল নাই। চুলা নাই। মানুষ হয়েছিস এতিমখানায় তুই কোন সাহসে এত বড় কথা বললি?

বাবার চিৎকারে মা ছুটে এলেন, ইরা ছুটে এল। আমাদের কাজের মেয়ে বিন্তি এল। মা সব শুনে ভীত গলায়–ও এসব কেন বলছেরে নবনী?

আমি বিড় বিড় করে বললাম, আমি জানি না মা।

ইরা বলল, আপা যে উনার কাছে রোজ দুবেলা করে খাবার নিয়ে যায়। এই জন্যেই বোধহয় তাঁর ধারণা হয়েছে আপা তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।

বাবা বললেন, হাবুডুবু খাওয়া আমি বের করছি। কত বড় সাহস। কানে ধরে আমি তাকে চর্কি ঘুরান ঘুরাব।

আমি ভীত গলায় বললাম, এইসব করার কোন দরকার নেই বাবা–তুমি উনাকে বড় মামার কথা বল। বলে দাও বিয়ে-টিয়ের ব্যাপার সব বড়মামা জানেন।

মা বললেন, এইটাই ভাল। লোক জানাজানি করার কোন দরকার নেই। আজেবাজে কথা ছড়াবে।

বাবা হুংকার দিলেন, ছড়াক কথা। আমি কি কাউকে ভয় পাই?

নির্বোধ মানুষরা কাউকে ভয় পায় না। যা মনে আসে করে ফেলে। বাবাও তাই করলেন। স্যারের জিনিসপত্র নিজেই ছুড়ে ছুড়ে রাস্তায় ফেলতে লাগলেন।

চারদিকে লোক জমে গেল। স্যার বললেন, আপনি অকারণে বেশি রকম উত্তেজিত হয়েছেন। আপনি শান্ত হয়ে আমার দুটা কথা শুনুন।

বাবা হুংকার দিলেন, চুপ যথেষ্ট হয়েছে।

স্যার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।

ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এমন মুখরোচক ঘটনা মফস্বল শহরে সচরাচর ঘটে না। লোকজনদের উৎসাহের সীমা রইল না। সন্ধ্যা বেলায় চলে এল বাবার অতি পেয়ারের লোেকরা। তারা গভীর মুখে বলল, এইসব কি শুনছি। চৌধুরী সাহেব?

বাবা ফ্যাকাশে হাসি হেসে বললেন, কিছু না। কিছু না।

শুনলাম আপনার মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে। অশ্লীল প্ৰস্তাব দিয়েছে।

না না। এসব কিছু না। অন্য ব্যাপার।

জারজ সন্তানের কাছ থেকে এরেচে বেশি কি আশা করা যায়? এখন বলুন কি করব?

কিছু করার দরকার নেই। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। আর কি?

আপনি ক্ষমা করলেতো হবে না। আমাদের একটা দায়িত্ব কর্তব্য আছে না?

বাদ দেন। ঘটনা যা ভাবছেন তা না। বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ভদ্র ভাবেই দিয়েছিল।

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কোন দরকার নাই চৌধুরী সাহেব। ঘটনা সবই জানি। আপনি কাটান দেয়ার চেষ্টা করলেও লাভ হবে না। উচিত শিক্ষা দেয়া হবে।

লোকজন বাড়তেই লাগল। সবাই আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। মা আমাকে নিয়ে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখলেন। অন্তুকে পাঠানো হল পোস্টাপিস থেকে বড় মামাকে টেলিফোন করার জন্যে। তিনি যেন এক্ষুণি চলে আসেন।

রাত দুটার দিকে হাজার হাজার মানুষ গিয়ে স্যারকে ধরে নিয়ে এল। আমি কাঁদছি এবং সমুদ্রের গর্জনের মত মানুষের গর্জন শুনছি। কি হচ্ছে বাইরে? সব কোলাহল ছাপিয়ে স্যারের গলা শুনলাম— আতংকে অস্থির হয়ে তিনি চিৎকার করে ডাকছেন— নবনী! নবনী।

তাকে তখন রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়েছে। একদল মানুষ চেষ্টা করছে ইট দিয়ে মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। মা ছুটে গেলেন স্যারকে বাঁচানোর জন্যে। ইরাও ছুটে গেল।

স্যারের মৃত্যু হয় সীমাহীন অপমান ও সীমাহীন যন্ত্রণায়। প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোনা হাসপাতালে। সেখানের ডাক্তাররা জবাব দেবার পর তাঁকে পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহে। পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে স্যারকে যে ট্রেনে ময়মনসিংহ নেয়া হচ্ছিল। আমিও সেই ট্রেনেই বড় মামার সঙ্গে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। অথচ আমি কিছুই জানতাম না। আমাকে বলা হয়েছে স্যার নেত্রকোনা হাসপাতালে আছেন। মাথায় চোট পেয়েছেন। তবে এখন ভাল হওয়ার পথে। ভয়ের কিছু নেই।

সে বছর আমার পরীক্ষা দেয়া হয় নি, কারণ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সে অসুখ বিচিত্র এবং ভয়াবহ। আমি মাঝে মাঝেই কাউকে চিনতে পারতাম না। পরিচিত কারো সঙ্গে হয়ত কথা বলছি, হঠাৎ এক সময় অস্বস্তি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, যার সঙ্গে কথা বলছি তাকে চিনতে পারছি না। ভয়ে শরীর যেন কেমন করতে থাকে। আমি কথা বলা বন্ধ করে দেই, আর তখনি দেখি দু-তিনটা কাক অপরিচিত মানুষটার চারদিকে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছে। এদের মধ্যে একটা কাককে আমি চিনি-বুড়ো কাক। কাকগুলো হাঁটে অবিকল মানুষের মত। যেন এরা কাক না। ছোট ছোট মানুষ যারা কালো রঙের চাদর গায়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে আমি স্যারকেও দেখতাম-। তাকে দেখে মোটেও ভয় লাগত না। বরং ভরসা পাওয়া যেত। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন এমনভাবে যেন তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা হত খুব ঘরোয়া ধরনের। যেমন, তিনি এসে বললেন, নবনী, পেন্সিলটা কোথায় রাখলাম দেখেছ?

আমি বললাম, না তো। কলম আছে। কলমে হবে?

না, হবে না। আমার দরকার পেন্সিল। একটু আগে কাজ করছিলাম। হঠাৎ কোথায় গেল! বাবু নিয়ে যায় নি তো?

নিতে পারে।

ছেলে তো বড় দুষ্ট হয়েছে। ডাক তো দেখি। আজ একটা ধমক দেব।

না না, ধমকাতে পারবে না। ছেলেমানুষ।

অতিরিক্ত আদর দিয়ে তুমি ওকে নষ্ট করছ।

নষ্ট করছি ভাল করছি। আরো নষ্ট করব।

এ কি! রেগে গেলে কেন?

রেগেছি। ভাল করেছি। আরো রাগব…

আমাদের সঙ্গে সব সময় একটা শিশু থাকত। কখনো সে ছেলে, তার নাম বাবু; কখনো-বা মেয়ে, নাম টিনটিন। এদের অবশ্যি আমি কখনো দেখি নি।

আমি কতদিন অসুখে ভুগেছি। আমি নিজেও জানি না। কেউ আমাকে কখনো পরিষ্কার করে কিছু বলে নি। আমি শুধু অস্পষ্টভাবে জানি, আমার এই অসুখ দীর্ঘদিন ছিল। বড় মামা আমাকে চিকিৎসা করান। আমার পেছনে টাকা

বাসা ভাড়া করে থাকতেন। কেউ যেন অসুস্থ অবস্থায় আমাকে বিরক্ত করতে না পারে সে জন্যে ঐ বাসার ঠিকানাও তিনি কাউকে দেন নি। বাবা-মা, ইরা, অন্তু কেউই আমাকে দেখতে যেতে পারত না। এক সময় আমি সুস্থ হয়ে উঠি। বড় মামা আমাকে ফিরিয়ে দেন। বাবা-মার কাছে।

বড় মামা সব সময়ই কম কথার মানুষ। আমাকে সুস্থ করে বাবা মার কাছে রেখে যাবার সময় হঠাৎ তাঁর কি হল, তিনি বললেন, বড় খুকী, আয় তোকে আদর করে যাই। আমি এগিয়ে গেলাম। বড় মামা গম্ভীর গলায় বললেন, শোন বড় খুকী, তুই নিশ্চিন্ত মনে থাকিবি। তোর অসুখটা পুরোপুরি সেরে গেছে। আর কোনদিন হবে না। ডাক্তাররা আমাকে বলেছেন। তারচেয়েও বড় কথা, আমি খাস দিলে আল্লাহ্‌পাকের কাছে দোয়া করেছি। আমার দোয়া আল্লাহ্‌পাক কবুল করেছেন। বুঝলি বড় খুকী, আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন মাগরেবের ওয়াক্তে শুধুই তোর জন্যে দুরাকাত নফল নামায পড়বা। আচ্ছা এখন যা।

আমি বললাম, আদর করবার জন্যে ডাকলেন–কই আদর তো করছেন না।

বড় মামা হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলেন না বা মাথায়ও হাত রাখলেন না। তিনি যেভাবে বসেছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন। শুধু দেখা গেল, তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে বললেন, ট্রেনের সময় হয়ে গেল, চলি রে।

০৮. বাড়িতে গিয়েছি

প্রায় ন মাস পর বাড়িতে গিয়েছি।

নিখুঁত হিসাব হল আট মাস সতেরো দিন। নোমান আমার সঙ্গে আসতে পারে নি। তার ছবির কাজ পুরোদমে চলছে। তাদের না-কি দু মাসের মধ্যে ছবি শেষ করতে হবে। চল্লিশ মিনিটের ছবি। তারা চেকোস্লোভাকিয়ায় শর্ট ফ্রিম ফেষ্টিভ্যালে ছবি পাঠাবে। সময় পেলে ইংরেজিতে ডাব করবে। সময় না পেলে সাব টাইটেল করা হবে।

নোমানের উৎসাহ এবং ব্যস্ততা দেখার মত। মনে হচ্ছে সে-ই ছবির পরিচালক, সে-ই নায়ক এবং সে-ই ক্যামেরাম্যান। যদিও আমার ধারণা তার মূল কাজ ছোটাছুটি করা এবং অন্যদের ধমক খাওয়া। কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের দেখলেই মনে হয় এদের ধমক দিলে এরা রাগ করবে না। এদের ধমক দেয়া যায়। শুধু ধমক না, অতি তুচ্ছ কাজও এদের দিয়ে করিয়ে নেয়া যায়। নোমান সেই জাতীয় একজন মানুষ।

আমাদের সঙ্গে মদিনাও দেশের বাড়িতে যাচ্ছে। তার গায়ে নতুন জামা। পায়ে নতুন রবারের জুতা। তার আনন্দ চোখে দেখার মত। মনে হচ্ছে এই মেয়েটির জীবনে এমন আনন্দময় মুহুর্ত আর আসে নি।

আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অন্তু। নোমান স্টেশনে তুলে দিতে এসেছে। ট্রেন আজ এক ঘণ্টা লেট আমরা অনেক আগে ভাগে এসে পড়েছি। নোমানের মুখ শুকনো। বুঝতে পারছি তার মন খারাপ লাগছে। সে এই মন খারাপ ভাবটা লুকাতে পারছে না। সে অন্তুকে বলল, তোমাদের টিকিট দুটা দাওতো অন্তু।

অন্তু বলল, টিকিট দিয়ে কি করবেন?

আহা দাও না।

অন্তু টিকিট দিল। সে টিকিট নিয়ে হন হন করে চলে গেল। অন্তু বলল, আপা দুলাভাই টিকিট দিয়ে কি করবে?

আমি বললাম, জানি না।

দুলাভাই সঙ্গে গেলে খুব ভাল হত। সবাই আশা করে আছে, তোমরা দুজন একসঙ্গে যাবে।

ছবি নিয়ে ব্যস্ত। ছবি না থাকলে যেত।

কি ছবি?

ওর বন্ধু একটা শর্ট ফ্রিম বানাচ্ছে।

তাতো জানি। গল্পটা কি?

নির্দিষ্ট কোন গল্প নেই। গ্রামের একটা মেয়ে পুকুরে গোসল করতে করতে একসময় ঠিক করল সে তার স্বামীকে খুন করবে। ঠিক করার পর থেকে খুন করার আগ পর্যন্ত মেয়েটার মনের অবস্থা।

স্বামীকে খুন করবে কেন?

সেটা কখনো বলা হয় না। ছবির জন্যে এটা না-কি অপ্রয়োজনীয়।

অভিনয় কারা করছে?

একজনই অভিনেত্রী। সফিক সাহেবের স্ত্রী অভিনয় করছেন। তার নাম অহনা।

ছবিটা কি ভাল হচ্ছে?

নোমানের ধারণা অসাধারণ হচ্ছে। এই ছবি দেখলে না-কি মৃণাল সেনের ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে যাবে। সত্যজিৎ রায়ের মাইন্ড স্ট্রোক হবে।

নোমান আসছে। তার হাতে একগাদা ম্যাগাজিন। দু প্যাকেট বিসকিট। পানির বোতল। অন্তু বলল, টিকিটগুলো কি করলেন দুলাভাই?

চেঞ্জ করে নিয়ে এসেছি। ফার্স্টক্লাস করে আনলাম। আরাম করে যাও। তোমরা চা খাবে না-কি?

অন্তু বলল, না।

ট্রেন ছাড়তেতো এখনো দেরী আছে চল না।যাই। এখানে ভাল রেস্টুরেন্ট আছে।

অন্তুর যাবার তেমন ইচ্ছা নেই। আমি বললাম, অন্তু তুই জিনিসপত্র নিয়ে এখানে বসে থাক। আমি চা খেয়ে আসি, আমার চা খেতে ইচ্ছা করছে।

আমরা চা খেলাম। ও একটা সিগারেট ধরিয়ে শুকনো মুখে টানতে লাগল। আমি বললাম, তুমি কি ছবি বানানোর এক ফাঁকে চলে আসতে পারবে?

মনে হয় না। আমি চলে এলে কাজ কর্মের খুব ক্ষতি হবে।

ক্ষতি হলে থাক।

এদিকে অহনাকে আবার সামলে সুমলে রাখতে হয়। ওর মেজাজেরতো কোন ঠিক নেই।

তুমি ছাড়া আর কেউ ওকে সামলাতে পারে না?

তা না। ও আমার কথা শুনে। অনেকদিন থেকে দেখছি তো।

ও আচ্ছা।

তারপর ধর হঠাৎ তার মাথায় এসে গেল কোন একজন পামিস্টের কাছে যাবে তখন তাকে সেখানে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। কে নিয়ে যাবে?

সেটা বিরাট সমস্যাতো বটেই। তাহলে তুমি একটা কাজ কর তাঁকে বল নেত্রকোনায় বড় একজন পামিস্ট আছে তাহলে দেখবে সব ছেড়ে ছুড়ে তোমাকে নিয়ে নেত্রকোনায় চলে আসবে।

সে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। আমি বললাম, ট্রেন ছাড়তে কত দেরি?

এখনো কুড়ি মিনিট। আরেক কাপ চা খাবে?

আমি বললাম, খাব। আর দেখতো আমার জ্বর কি-না কেমন জানি জ্বর জ্বর লাগছে। সে আমার আমার কপালে হাত রেখে বলল, জ্বর নাতো!

আমি হেসে ফেললাম। সেও হাসল। জ্বর দেখার আমাদের এই পুরানো এবং একান্ত গোপন কৌশল ব্যবহার করতে এত ভাল লাগে। রেস্টুরেন্ট ভর্তি মানুষ–এরা কেউ কিছু ভাববে না। সবাই জানবে একজন অসুস্থ মানুষের জ্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ও প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে। ওর দিকে তাকাতে আমার খুব কষ্ট লাগছে। আমি ব্যস্ত হয়ে ম্যাগাজিনের ছবি দেখছি। শুধু অন্তু গলা বের করে খুব হাত দুলাচ্ছে। হঠাৎ অন্তু বিস্মিত গলায় বলল, আপা দেখ দেখ দুলাভাই কাঁদছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ও সত্যি সত্যি পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মুছছে। আমাকে দেখে সে চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। আমি অন্তুকে বললাম, তোর দুলাভাইকে এইভাবে হাঁটতে নিষেধ কর— পরে হুমড়ি খেয়ে ট্রেনের চাকার নিচে পড়বে।

বলতে বলতে আমার গলা ধরে গেল। চোখ ভিজে উঠল। ট্রেনের গতি বাড়ছে আমার মনে হচ্ছে। আমি এই পৃথিবীর সব প্রিয়জন ছেড়ে—অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। ট্রেনের চাকায় ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। ট্রেনটা যেন তালে তালে বলছে–ভালবাসি। ভালবাসি।

আমাকে দেখে বাড়িতে একটা হৈচৈ পড়ে গেল। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে বাবা ভুরু কুঁচকে বললেন, মরা কান্না জুড়ে দিলে কেন? বড়ই যন্ত্রণা হল তো। ইরা তোর মাকে নিয়ে যাতো। মা আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

কেউ আমাকে ছাড়ছে না। সবারই মনে অসংখ্য কথা জমা হয়ে আছে। সবাই আমাকে একসঙ্গে সব কথা শুনাতে চায়।

ইরা চাচ্ছে আমাকে নিয়ে ছাদে চলে যেতে। তার নাকি অসম্ভব জরুরি কিছু কথা এক্ষুণি না বললেই না। তার জরুরি কথার আভাস পেয়েছি। মা কাঁদতে কাদতেই এক ফাঁকে আমাকে বলে ফেলেছেন। ইরার ভাঙা বিয়ে আবার জোড়া লেগেছে। ইরার ভাবি বর না-কি বলেছে, এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। প্রয়োজন হলে সবার অমতে সে কোর্টে বিয়ে করবে।

এদিকে বাবারও অনেক কথা বলার আছে–তিনি আবার ইলেকশন করবেন বলে স্থির করেছেন। তবে এবার স্বতন্ত্র না। আওয়ামী লীগের টিকিটে। নমিনেশন পাওয়া যাবে এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।

বুঝলী নবনী ময়মনসিংহের যে কুদ্দুস সাহেব আছেন এডভোকেট। উনি হলেন বঙ্গবন্ধুর ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। শেখ হাসিনা তাকে দেখলে ছুটে এসে কদমবুচি করেন। কুদ্দুস সাহেবই বললেন, নমিনেশনের ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দিন এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। এটা কোন ব্যাপারই না।

আমি বললাম, আওয়ামী লীগের টিকিট পেলেতো মনে হয়। জিতে যাবে।

জেতাটা বড় কথা না। ইলেকশনে জেতা আমার উদ্দেশ্য না। আমার উদ্দেশ্য এই দেশের জন্যে কিছু করা। বড়ই অভাগা দেশ।

তুমি এবার তাহলে খুব জোড়ে সোড়ে ইলেকশন করছ?

মানুষের চাপে পড়ে করতে হচ্ছে। সবাইতে চায় সৎ লোক পাস করে আসুক। চাওয়াটাতো অন্যায় না।

তাতো বটেই।

এদিকে তোর বড় মামা চিঠি লিখেছে। আমি যেন ইলেকশন নিয়ে মাথা না ঘামাই। কঠিন ভাষায় লেখা চিঠি। আশ্চর্য কথা আমি কি করব না করব এটা বাইরের একজন এসে বলে দেবে কেন?

বড় মামাতো বাইরের কেউ না বাবা।

অবশ্যই বাইরের। আর বাইরের না হলেও আমার স্বাধীন চিন্তায় তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। ফার্মেসি থেকে এক পয়সা আয় হয় না–বিক্রি করে দিতে চাচ্ছি। বিক্রি করতে দেবে না। এই সম্পত্তিগুলো আমার না তাঁর তাইতো বুঝলাম না।

সবচে ভাল লাগছে ইরাকে দেখতে। সে খুব সুন্দর হয়েছে। মনে হচ্ছে এই আটমাসে সে খানিকটা লম্বাও হয়েছে। ইরা ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। গা ধুতে বাথরুমে গিয়েছি সে তোয়ালে হাত বাইরে দাড়িয়ে কথা বলছে। এত কথাও থাকে একটা মানুষের পেটে? তার সব কথাই তার বিয়ে নিয়ে। সব নদী যেমন সমুদ্রে পড়ে তার সব কথাই তেমনি বিয়েতে গিয়ে শেষ হয়।

বুঝলে আপা একদিন সন্ধ্যাবেলা ছাদে হাঁটছি— নতুন কাজের মেয়েটা এসে বলল, একটা লোক আসছে। আপনারে ডাকে। আমিতো অবাক! এই সন্ধ্যাবেলা আমাকে কে ডাকবে। নিচে নেমে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ও বসে আছে।

ও টা কে?

ওটা কে তুমিতো বুঝতেই পারছি। আমি স্তম্ভিত। বিয়েতো ভেঙেই গেছে। এখন আমার সঙ্গে কি কথা? রাগও লাগছে। এদিকে দেখি বাবু আবার খুব সেজে গুজে এসেছেন। গায়ে সেন্ট দিয়েছেন। সেন্টের গন্ধে চারদিক ভুড় ভুড় করছে। আমি ভাণ করলাম যেন চিনতে পারছি না। বললাম, আপনি কাকে চাচ্ছেন? হি হি হি…

স্যার যে ঘরে থাকতেন। সেখানে দেখি একজন কে। অল্প বয়সী একটা ছেলে। ব্যাংকে চাকরি করে। একদিন তাঁকে দেখতে গেলাম। আপা বসুন, আপা বসুন বলে সে খুব খাতির যত্ন করল। আমি বললাম, আপনার কাছে কি একটা বুড়ো কাক আসে?

সে বিস্মিত হয়ে বলল, কাক আসবে কেন? আমি বললাম, এম্নি বলেছি। ঠাট্টা করছি।

রাতে ঘুমের সময় খুব অসুবিধা হতে লাগল। মা আমার সঙ্গে ঘুমাতে চান। ইরা কিছুতেই দেবে না। সে আমার সঙ্গে শুবো। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করবে। আমাকে চোখের পাতা এক করতে দিবে না।

মা একদিন সুযোগ পেলেন। গভীর রাতে আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন, কোন খবর আছে রে মা?

কি খবর জানতে চাও মা?

নতুন কোন খবর। খোকা খুকুর খবর।

চুপ করতো মা।

বল না রে মা। আছে কোন খবর?

তুমিতো বড্ড বিরক্ত করছ মা। সেদিন মাত্র বিয়ে হল এখনই কিসের খবর।

আমি যে স্বপ্নে দেখলাম।

রাখতো তোমার স্বপ্ন। ঘুমাও।

মা ক্লান্ত গলায় বললেন, তোর একটা খোকা খুকু হলে বেশ হয়। বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত বিয়েকে বিয়ে বলে মনে হয় না।

মা চুপ করবে?

নবনী তোর অসুখটা তো আর হয় না?

না।

আর হবে না। আচ্ছা শোন জামাই কি তোর স্যারের ব্যাপারে কোনদিন কিছু জানতে চেয়েছে?

না।

এতদিন যখন চায় নি আর চাইবে না।

মা ঘুমাও।

মা ঘুমালেন না। অনেক রাত পর্যন্ত আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

সাতদিনের জন্যে বাড়ি গিয়েছিলাম। সাতদিনের জায়গা দশদিন কাটিয়ে ফিরছি। রওনা হবার সময় মার কাছে একটা চিঠি লিখে গেছি। শর্ত হচ্ছে এই চিঠি মা ট্রেন ছাড়ার আগে পড়তে পারবে না।

চিঠিতে লিখেছি–-

মা, তুমি খবর জানতে চেয়েছিলো। হ্যাঁ খবর আছে। তুমি ঠিকই স্বপ্নে দেখেছ। মুখে বলতে লজ্জা লাগল। তোমার পায়ে পড়ি মা— আর কাউকে জানিও না।

০৯. মানুষের চরিত্র

মানুষের চরিত্রের একটা অংশ উদ্ভিদের মত।

উদ্ভিদ যেমন মাটিতে শিকড় ছেড়ে দেয়, মানুষও তাই করে। কিছু দিন কোথাও থাকা মানে সেখানে শিকড় বসিয়ে দেয়া। মাটি যদি চেনা হয়। আর নরম হয় তাহলেতো কথাই নেই।

দশদিন মার কাছে ছিলাম। এই দশদিনে শিকড় গজিয়ে গেল। সেখান থেকে উঠে আসা মানে শিকড় ছেড়ে উঠে আসা। কি তীব্ৰ কষ্ট। পুরুষরা এই কষ্টের স্বরূপ জানে না। এই কষ্ট আরো অনেক কষ্টের মত একান্তই মেয়েদের কষ্ট।

আমি এসেছি। একা। অস্তুর আমাকে নিয়ে আসার কথা ছিল। সে হঠাৎ জ্বরে পড়ায় তাকে রেখে এসেছি। বাবা তার একজন চেনা লোককে বলে দিয়েছিলেন। তিনিও ঢাকায় আসছেন। তাঁর উপর দায়িত্ব আমার দিকে লক্ষ্য রাখা। ভদ্রলোক শুধু যে লক্ষ্য রাখলেন। তাই না। একেবারে আমাদের বাসার দরজায় নামিয়ে দিলেন। আমি বললাম, চাচা আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এখন আপনি চলে যান।

উনি বললেন, মা তুমি দরজা খুলে ভেতরে ঢোক তারপর যাব। কড়া নাড়তেই নোমান এসে দরজা খুলে দিল। সে অপ্ৰসন্ন মুখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি ভদ্রতা করে বললাম, আপনি কি ভেতরে এসে বসবেন? চা খেয়ে যাবেন?

তিনি বললেন, না। আমি পরশুদিন নেত্রকোেনা চলে যাব। তোমার বাবাকে বলব তুমি ঠিক মত পৌঁছেছ।

জ্বি আচ্ছা।

নোমান আমার সুটকেস, ব্যাগ ভেতরে এনে রাখছে। তার মুখ এমন অন্ধকার হয়ে আছে কেন কিছু বুঝতে পারছি না। আমি বললাম, তুমি ভাল ছিলে?

সে বলল, হ্যাঁ।

সাত দিনের জায়গায় দশদিন থেকে এলাম। রাগ করানিতো? তারা কিছুতেই ছাড়বে না। অতিথিপুর থেকে আমার ছোটখালা এসেছিলেন উনি আবার একদিনের জন্যে অতিথপুর নিয়ে গেলেন।

মদিনা। মদিনাকে আনলে না?

ও আসল না। ওর না-কি এখানে থাকতে ভাল লাগে না।

ভাল লাগালাগির কি আছে? থাকবে বেতন পাবে।

তুমি এমন রেগে আছ কেন?

রেগে আছি কোথায়?

চোখ মুখ শক্ত করে আছ। জুর-টির নাতো— দেখি কাছে আসতো?

ও কাছে এল না। ভুরু কুচকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, চা খেতে ইচ্ছা! হচ্ছে। চুলার কাছে যেতে ভাল লাগছে না। ফ্লাস্কে করে একটু চা এনে দেবে?

সে কিছু না বলে ফ্লাঙ্ক হাতে বের হয়ে গেল। আমার কাছে সব কেমন যেন অন্য রকম মনে হতে লাগল। ঘরের সাজ-সজ্জাও পাল্টানো। খাটটা জানালার কাছ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। জানালার কাছে এখন দুটা বেতের চেয়ার।

ড্রেসিং টেবিলটার জন্যে ঢাকনি বানানো হয়েছে। কোন জানালার আগে পর্দা ছিল না। পর্দার প্রয়োজনও ছিল না। বাইরে থেকে কিছু দেখা যেত না। এখন দেখি সব কয়টা জানালায় বেগুনি রঙের পর্দা। এমন কি বাথরুমের জানালায় পর্দা ঝুলছে।

সবচে যেটা আশ্চর্যের ব্যাপার মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। ও ফ্যান কিনেছে। শুধু ফ্যান না ওয়ার্ড ড্রোবের উপর একটা ক্যাসেট প্লেয়ার।

নোমান চা নিয়ে ফিরে এলো। চায়ের সঙ্গে গরম জিলিপী। আমি দেখলাম তার মুখের কঠিন ভাবটা আর নেই। সে চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল, আগে চা খাও। চা খেয়ে তারপর জিলাপী খ্যাও। আগে জিলাপী খেলে চায়ের স্বাদ পাবে না। তোমার স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে। নবনী। বাপের বাড়িতে খুব আরামে ছিলে, তাই না?

হুঁ। তুমি কি কষ্টে ছিলে?

কষ্ট মানে–দোজখের ভেতর ছিলাম। সফিক আর অহনার মধ্যে এমন ঝামেলা বেঁধে গেল। স্যুটিং ফুটিং কিছুই হয় নাই।

তুমি মিটমাটের চেষ্টা চালাচ্ছ না?

চালাচ্ছি। কাজ হবে কি-না বুঝতে পারছি না। সফিক এখন আমাকেও ঠিক বিশ্বাস করে না। অবশ্যি বিশ্বাস না করার কারণ আছে। অহনা করল কি সফিকের সঙ্গে ঝগড়া করে রাত দুপুরে আমার এখানে এসে উপস্থিত। আমার বাসায় না-কি লুকিয়ে থাকবে। লুকিয়ে থাকার জন্যে এইটাই না-কি আদর্শ জায়গা। সফিক সব জায়গায় খুঁজবে এইখানে খুঁজবে না।

তুমি রাজি হলে?

রাজি না হয়ে উপায় আছে? আহনাকে তুমি এখনো চিনলে না।

কদিন ছিল?

দু রাত ছিল। দু রাতের জন্যে পর্দা দিতে হয়েছে। ফ্যান লাগাতে হয়েছে। রাতে গান না শুনলে তার ঘুম আসে না। শেষে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে আনতে হল। অহনা টাকা দিল। এতটুকু একটা জিনিস দাম নিয়েছে ন হাজার টাকা। গান শুনবে নবনী?

শুনব।

নোমান খুশি মনে ক্যাসেট চালু করে দিল। নিচু গলায় গান হতে লাগল—

আমি কেবলই স্বপন
করেছি বপন বাতাসে
তাই আকাশ কুসুম
করিনু চয়ন হতাশে।।

নবনী!

কি?

অহনার সঙ্গে থেকে থেকে আমারো বিশ্ৰী অভ্যাস হয়ে গেছে। রাতে গান না শুনলে ঘুম আসে না। এসব বড়লোকী অভ্যাস কি আর আমাদের মত গরিবের পোষায়?

অহনা যে তোমার এখানে ছিলেন সফিক সাহেব টের পান নি?

পাগল কোত্থেকে টের পাবে? সফিক চলে পাতায় পাতায় অহনা চলে শীরায় শীরায়। তবে দু রাত ছিল বলে রক্ষা। এরচে বেশি থাকলে ধরা পড়ে যেত। থার্ড নাইটে রাত একটার সময় সফিক এসে উপস্থিত। অহনার একটা খোঁজ না-কি পাওয়া গেছে আমাকে নিয়ে যাবে। আমি মনে মনে বলি আল্লাহ রক্ষা করেছে।

এখন উনি কোথায় আছেন?

জানি না কোথায়। আমি জানি না, সফিকও জানে না। তবে সফিকের বোধহয় ধারণা হয়েছে আমি জানি তার কাছে লুকাচ্ছি।

রাতের খাবার জন্যে ভাত রাঁধতে বসেছি নোমান পাশে এসে বসল। নরম গলায় বলল, জানি করে এসেছ এখন চুলার কাছে বসতে হবে না। চল বাইরে কোথাও যাই খেয়ে আসি। চাইনিজ খাবার আমার অসহ্য লাগে– তবু চল যাই।

আমরা বাইরে খেতে গেলাম। ও খাবারের মেনু অনেকক্ষণ চোখের সামনে ধরে রেখে বলল, শালার দাম কি রেখেছে। খেয়ে না খেয়ে দাম। একবাটি সুপ তার দাম একশ কুড়ি টাকা। পানি ছাড়া এর মধ্যে আর কি আছে। নবনী চল এক কাজ করি এক বাটি সুদৃপ খেয়ে চলে যাই। টাকা পয়সা এখন খুব সাবধানে খরচ করতে হবে। আমার ধারণা সফিক আমার চাকরি নট করে দেবে। গেট আউট করে দেবে।

নোমান চিন্তিত মুখে সু্যুপ খাচ্ছে। আমার খুব মায়া লাগছে। আহা বেচারা। শুধু স্যুপে কি তার পেট ভরবে?

নবনী!

কি?

অচেনা একটা লোককে নিয়ে বাসায় এসেছিলে রাগে আমার গা জ্বলে গেছে। ঐ দিন অফিসে এক লোক এসে উপস্থিত। তোমাদের ওদিকে বাড়ি। তোমাদের সবাইকে চেনে। আমি যত্ন করে বসায়েছি—চা খাইয়েছি তারপর ব্যাটা বলে কি নবনীর প্রথম পক্ষের সন্তানটি কি আপনার সঙ্গে থাকে?

তুমি কি বললে?

আমিতো। হতভম্ব। সফিক আমার সঙ্গে ছিল সে বলল, হ্যাঁ ওর সঙ্গেই থাকে। কেন দেখা করতে চান? শুধু যে এই একজন তা না। আগেও আরেকজন এসেছে আমাকে পায় নাই অফিসের লোকজনের সঙ্গে গল্প করে গেছে বিশ্ৰী সব কথাবার্তা।

আমি চুপ করে আছি। নোমান বলল, স্যুপ খেয়ে ক্ষিধে আরো বেড়ে গেল। একি যন্ত্রণা বল দেখি। একটা ফ্রায়েড চিকেন নিয়ে নিই?

না।

নবনী তুমি আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছ। এত সুন্দরী বৌ পাশে নিয়ে হাঁটাহাটি করতে অস্বস্তি লাগে। লোকে এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি তোমাদের বাড়ির দারোয়ান। তুমি বাইরে বেরুবার সময় সাজগোজ একেবারেই করবে না।

আচ্ছা যাও করব না।

এত ভাল লাগছে তোমাকে দেখে।

আমি বললাম, আমাকে দেখে এত ভাল লাগছে তাহলে আজ আমাকে দেখে মুখটা এমন কাল করে ফেলেছিলে কেন?

মন মেজাজ অসম্ভব খারাপ। সফিক চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিলে খাব কি? একা থাকলে অসুবিধা ছিল না। এখন আমরা দুজন।

আমি চাপা গলায় বললাম, বাড়তেও পারে। কিছুদিন পর হয়ত দেখা যাবে তিনজন।

নোমান বলল, হ্যাঁ তাতো হবেই। চাকরি চলে গেলেতো ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

ভিক্ষা করতে হলে করব। এই দেশে ভিক্ষা করা এমন অন্যায় কিছু না। সবাই ভিক্ষা করছে। আমরাও না হয় করব। তুমি এখন আরাম করে খাওতো। শুধু শুধু চিকেন খাবে কি করে কিছু ভাত নাও।

নোমান হাসি মুখে বলল, যা থাকে কপালে চল খাই। খাওয়া দাওয়ার পর আইসক্রিীম খাব। আইসক্রীম খেতে ইচ্ছা করছে। যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্তান্ন খরচ হচ্ছে যখন হোক।

রাতে দুজন ঘুমাতে গেছি। নোমান গান দিয়ে দিয়েছে। আমি বললাম, গান থাক। এসো তোমাকে দারুন আরেকটা খবর দেই।

কি খবর?

দিচ্ছি। এত তাড়া কিসের? তুমি আগে আমাকে একটু আদর কর। তারপর খবর শুনবে। আচ্ছা আমি যে কিছুদিন পাগল ছিলাম তা-কি তুমি জান?

জানব না কেন। জানি।

কে বলেছে?

অহনা বলেছে।

উনি কি ভাবে জানেন?

অহনা সব জানে। তোমার সঙ্গে যখন বিয়ে ঠিক হল তখনি সব খোঁজ খবর করেছে। তারপর বলেছে— মেয়েটা বেশ কিছুদিন মাথা খারাপ অবস্থায় ছিল। এখন সুস্থ, তুমি বিয়ে করতে পার, ভাল মেয়ে। বেশ ভাল।

আমি কঠিন গলায় বললাম, তিনি অনুমতি দিলেন। তারপর তুমি বিয়ে করলে?

নোমান জবাব দিল না। আমি ওর গায়ে হাত দিয়ে দেখি সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তৃপ্তির ঘুম।

১০. কলিংবেল

ক্রিং ক্রিং করে কলিংবেল বাজছে।

আমাদের বাসায়তো কলিংবেল ছিল না। কলিং বেল কোথেকে এল? নতুন কলিং বেল লাগিয়েছে না-কি? আমি অবাক হয়েই দরজা খুললাম। কে এসেছে সেটা দেখার চেয়ে কলিং বেলটা দেখার জন্যেই আমার আগ্রহ বেশি।

দরজা খুলে দেখি সফিক সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আজো তাঁর গায়ে নীল হাফ সার্ট। তিনি কি নীল রঙের সার্ট ছাড়া আর কিছু পরেন না? তিনি চোখের সানগ্লাস খুলতে খুলতে বললেন, কেমন আছ নবনী!

আমি বললাম, ভাল।

কর্তা কোথায়?

ও বাজারে গেছে। কাঁচা বাজারে।

আমি কি অপেক্ষা করব তার জন্যে?

জ্বি বসুন। ওর আসতে মনে হয় দেরি হবে। হেঁটে গেছে। হেঁটে ফিরবে।

সফিক সাহেব ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, হোক একটু দেরি। এই ফাঁকে আমি বরং তোমার হাতের চা খাই। নোমানের ধারণা এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে ভাল চা আর কেউ বানাতে পারে না।

তিনি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন। বসলেন বারান্দায়। আমি বললাম, আপনি ভেতরে গিয়ে বসুন। বারান্দায় বসেছেন কেন?

কারো শোবার ঘরে ঢুকতে ভাল লাগে না। শোবার ঘর হচ্ছে খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। বাইরের লোকের সেখানে প্ৰবেশাধিকার থাকা উচিত না। তোমাদের বারান্দাটা সুন্দর।

আমি চা বানিয়ে দিয়েছি। একটু অস্বস্তি লাগছে কারণ শুধু চা দিতে হয়েছে। ঘরে কিছু নেই। একটা কিছু থাকলে ভাল হত। আমি দেখেছি খুব যারা বড়লোক তারা সাধারণ খাবার বেশ আগ্রহ করে খায়। তিনি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, নবনী! আমি নোমানের কাছে আসি নি। আমি আসলে তোমার কাছেই এসেছি। অফিস থেকে দেখলাম নোমান বাজারের ব্যাগ হাতে বেরুল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে তোমার কাছে চলে এসেছি। যাতে ওর সঙ্গে দেখা না হয়।

আমি শঙ্কিত গলায় বললাম, আমাকে কিছু বলবেন?

হ্যাঁ। লম্বা বক্তৃতা দেব। ধৈর্য ধরে তোমাকে শুনতে হবে। কথার মাঝখানে হাই তুলতে পারবে না। দেখ নবনী, আমি নোমানকে খুব পছন্দ করি। সে হচ্ছে জটিলতা বিহীন একজন মানুষ এবং ইন্টারেস্টিং মানুষ। স্কুলে একসঙ্গে পড়েছি তারপর আর কোন যোগাযোগ ছিল না। একদিন গাড়ি কিনতে বিজয় নগরের একটা শো রুমে গিয়েছি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম এক ভদ্রলোক গম্ভীর ভঙ্গিতে লেটেস্ট মডেলের গাড়ির দরদাম করছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, নোমান না? এখানে কি করছিস?

সে লজ্জিত গলায় বলল, কিছু করছি না।

আমাকে চিনতে পারছিস তো?

পারছি। সফিক।

চাকরি বাকরি কি করছিস?

কিছু করছি না।

বেকার?

হুঁ বেকার।

গাড়ি দাম করছিস কি জন্যে?

সে হাসল। আমি বললাম, দে তুই পছন্দ করে একটা গাড়ি কিনে দে। আজ তোর পছন্দেই কিনব।

সেই থেকে সে আমার সঙ্গে আছে। Unconditional loyalty বলে একটা ব্যাপার আছে যা মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। নিম্ন শ্রেণীর প্রাণী কুকুরের মধ্যে খানিকটা আছে। সেই শর্তহীন আনুগত্য আছে নোমানের মধ্যে। পাশবিক গুণ হলেও এটা অনেক বড় গুণ। নোমানকে পছন্দের আমার এই একটা কারণ।

সম্প্রতি তার মধ্য আমি একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। সে আমার কাছে অনেক কিছু গোপন করছে। যেটা আমার একেবারেই পছন্দ না। আমি খুব রাগ করেছি। অসম্ভব রাগ করেছি।

সফিক সাহেব থামলেন। সিগারেট ধরালেন।

আমি বললাম, আপনি কি ওকে বিদেয় করে দিচ্ছেন?

হ্যাঁ দিচ্ছি। সে জানে আমি অহানার চিন্তায় অস্থির হয়ে আছি। তারপরেও সে তাকে তার বাসায় লুকিয়ে রাখে। অথচ আমাকে কিছুই বলে না। সে আমাকে বোকা ভাবে। মনে করে আমার বুদ্ধিও তার স্তরে। অথচ আমি তার ঘরে পা দিয়েই বুঝেছি, অহনা এখানেই ছিল। বেগুনি ওর প্রিয় রঙ। বেগুনি রঙের পর্দা নোমানের ঘরে ঝুলবে আর আমি কিছুই বুঝব না?

আমি বললাম, সফিক ভাই আপনি এসব কথা ওকে সরাসরি না বলে আমাকে বলছেন কেন?

তোমাকে বলছি তার কারণ আছে। অহনা একটা ভয়ঙ্গর খেলা খেলার চেষ্টা করছে। এই খেলায় নোমানের একটা ভূমিকা আছে। সে তা জানে না। সে কিছুই বুঝতে পারে না। সে জানে না যে অহনা তার ভ্যানিটি ব্যাগে ইদানীং একটি ছোট পিস্তল রাখে। এই পিস্তলটিা সে কেন রাখে? সেলফ প্রটেকসনের জন্যে না। তার উদ্দেশ্য অন্য।

উদেশ্যটা কি?

আমি পরিষ্কার জানি না। একটা অনুমান আমার আছে। অনুমানটা স্পষ্ট নয়। অস্পষ্ট। ওকে ওর জীবনের শুরুতে আমি নানানভাবে ব্যবহার করেছি। আমি ফেরেশতা না–আমার অনেক দোষ ত্রুটি আছে। অহনার উপর কিছ অন্যায় আমি শুরুতে করেছি। পরবর্তী সময়ে সে অন্যায় আমি দূর করার চেষ্টা করেছি। ওকে বিয়ে করেছি। ভালবাসায় ভালবাসায় ডুবিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। তুমি বোধহয় জান না— আমার যাবতীয় বিষয় সম্পত্তি ওর নামে লিখে দেয়া হয়েছে। সবটা অবশ্যি ভালোবাসা থেকে করা না টেক্স ফাকি দেয়াও একটা উদ্দেশ্য।

বুঝলে নবনী! অহনা হচ্ছে পারদের মত, যত তাকে ধরতে যাওয়া যায় ততই সে পিছলে যায়। আঙুলের ফাঁক দিয়ে সহস্র খণ্ড হয়ে ঝড়ে পড়ে। আমি অঞ্জলি পেতেই তাকে ধরতে চেয়েছিলাম। সম্ভব হল না। সে এখন যেটা চাচ্ছে তা হচ্ছে আমাকে কঠিন শাস্তি দেয়া। কিভাবে সে তা দেবে আমি জানি না। নোমান জানে, সে আমাকে বলবে না। অহনা নোমানের উপরও পুরোপুরি ভরসা করছে না। তার আরো লোক আছে। প্ৰাইভেট ডিটেকটিভ ধরনের লোকজন। ওরা আমার পেছনে পেছনে ঘুরছে। শুধু যে আমার পেছনে ঘুরছে তাই না–তারা আরো কিছু কাণ্ড কারখানা করছে যার কারণ আমি ধরতে পারছি না। যেমন তারা এতিমখানায় এতিমখানায় ঘুরছে। শুনতে পাচ্ছি আমার ধানমণ্ডির বাড়িটায় অহনা একটা মহিলা দুঃস্থ কেন্দ্র করবে। এটা কি অদ্ভুত পাগলামি না?

সফিক সাহেব চুপ করলেন। হাতের আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে আরেকটা ধরালেন। তাঁকে খুব অস্থির লাগছে। আমি বললাম, আপনি কি আরেক কাপ চা খাবেন?

হ্যাঁ খাব।

আমি চা ঢেলে দিলাম। তিনি বললেন, থ্যাংকস–রাগের মাথায় হড়মড় করে তোমাকে অনেক কথা বলে ফেললাম।

এখন কি আপনার রাগ কমেছে?

আমার স্বভাব অহনার মত না। আমি যেমন চট করে রাগী না, তেমনি চট করে আমার রাগ পড়েও না। যাই হোক নবনী শোন— আমি নোমানকে আমার কাছে আর রাখব না। তোমার জন্যে সবচে ভাল হবে তুমি যদি ওকে নিয়ে দূরে কোথায় চলে যাও। অহনার Sphere of Influence এর বাইরে। আমি কিছু টাকা পয়সা দিয়ে দেব যাতে ও ছোটখাট ব্যবসা ট্যাবসা করে খেতে পারে।

সফিক সাহেব ওঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, আমি কি নোমানকে আপনার সিদ্ধান্তের কথা আজই বলব?

না। আজ না। আমার ছবির অল্প কিছু কাজ বাকি আছে। কাজটা শেষ হোক। তারপর বলবে। নবনী যাই। ভাল কথা তোমার যে ছবি তুলেছিলাম সেই ছবি খুব সুন্দর এসেছে। আমি বাঁধিয়ে রেখেছি— আজি সন্ধ্যায় পাঠিয়ে দেব। আরেকটা কথা অহনা এখন আমার বাসায়। কাল তাকে নিয়ে সুটিং এ যাব। নোমানকে বলবে যেন যায় এবং আমি চাচ্ছি তুমিও থাক। ছবি শেষ করাটা আমার জন্য খুব জরুরি। এই জীবনে আমি কোন কাজই আধাআধি করে রাখি নি। তোমার চা খুব ভাল হয়েছে। মেনি মেনি থ্যাংকস!

যাই বলেও সফিক সাহেব দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে। এতগুলো কথা বলার তার ইচ্ছা ছিল না। বলার পর বিব্রত বোধ করছেন। আমার স্তরের একটি মেয়েকে তাঁর এত কথা বলার প্রয়োজনও নেই। তিনি ইতস্তত করে বললেন, নবনী একটা শেষ কথা না বললে তুমি অহনাকে ভুল বুঝতে পার। তুমি ভাবতে পার আহনা বোধহয় পিস্তল নিয়ে ঘুরছে আমাকে মারার জন্যে।

আমি এ রকম কিছু ভাবছি না।

না ভাবাই ঠিক। ঘৃণা থেকেও ভালবাসা জন্মায়। আমার প্রতি ওর যে প্রবল ভালবাসা তা উঠে এসেছে ঘৃণা থেকে। সমস্যা এইখানেই। এই পৃথিবীতে দুধরনের মানুষ খুন হয়। প্রবল ঘৃণার মানুষ এবং প্রচণ্ড ভালবাসার মানুষ। কাজেই অহানা যদি আমাকে মেরেও ফেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, উল্টাটাওতো হতে পারে। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, হতে পারে। অবশ্যই হতে পারে।

১১. ছবির স্যুটিং

নোমান বলছিল ছবির স্যুটিং খুব বিরক্তিকর। আমি দেখছি ব্যাপারটা মোটেই সে রকম না। আমার বিরক্তিতো লাগছেই না। বরং মজা লাগছে। আমি ছবির কিছুই জানি না। তবু বুঝতে পারছি। সফিক সাহেব ছবির কাজ খুব ভালই বুঝেন। একেবারে এলাহি কারবার। দিনের বেলা কাজ হচ্ছে অথচ মাঠের মাঝখানে মাঝখানে লাইট জ্বলছে। বড় বড় রাংতা মোড়া বোর্ড হাতে লোকজন ছোটাছুটি করছে। এই বোর্ডগুলো রিফ্রেকটর।

ক্যামেরাম্যান একজন বিদেশী, কলিন্স বোধহয় নাম। অসীম ধৈর্য এই সাহেবের। ঝাঁঝাঁ রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে।

সারাদিন ধরে একটা দৃশ্য হচ্ছে। জাহেদা ছুটতে ছুটতে বনে ঢুকে গেল।

সফিক সাহেব বললেন, দৃশ্যটা এমনভাবে নিতে হবে যেন দর্শকের মনে ভয়ের ছাপ পড়ে। মেয়েটা যখন দৌড়ে যাবে তখন মাঠে কয়েকটা ছাগল থাকবে। মেয়েটার দৌড়ে যাওয়া দেখে ছাগলগুলো উল্টো দিকে ছুটতে থাকবে। এতে দৃশ্যটি অন্য রকম হয়ে যাবে। মেয়েটা যখন বনে ঢুকবে তখন বনের পাখিরা কিচকিচ করে উঠবে। এতে ভয়টা আরো বাড়বে।

উনার কথাগুলো আমার ভাল লাগল। বলতে ইচ্ছা করল বাহ বেশতো। অহনা অভিনয়ও করছে এত সুন্দর। ছাগলগুলো যখন তাকে দেখে ছুটছে তখন সে এক পলকের জন্যে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকাল ছাগলগুলোর দিকে তারপর আবার ছুটতে শুরু করল। দাঁড়ানোর কথা সফিক তাকে বলেন নি। এটা সে করেছে নিজ থেকে।

সফিক বললেন, তোমার দাঁড়িয়ে পড়াটা খুব সুন্দর হয়েছে। ওয়ান্ডারফুল।

ক্যামেরাম্যান সাহেব বললেন, Well done!

অহনা হাসতে হাসতে বলল, থ্যাংকস।

সফিক বললেন, আজকের মত প্যাক আপ। কাল সকাল থেকে আবার সুটিং। আশা করছি কাল দিনের মধ্যে শেষ করে ফেলব।

অহনা বললেন, আমি আজ আরো খানিকক্ষণ কাজ করতে রাজি আছি। আজ আমার কাজ করতে খুব ভাল লাগছে।

সফিক বললেন, আজ থাক। আমি টায়ার্ড। কলিন্সের দিকে তাকিয়ে দেখ রোদে টমেটোর মত লাল হয়ে গেছে। নোমান বেচারাও টায়ার্ড। ছাগলের পেছনে দৌড়ে দৌড়ে তার অবস্থা কাহিল। এসো নৌকায় বসে সবাই চা খাই।

অহনা বললেন, চল যাই।

সফিক বললেন, আজ চাঁদনী আছে। রাতের খাবার পর আমরা কিছুক্ষণ নৌকায় করে ঘুরব। কি বল অহনা?

আচ্ছা যাও ঘুরব।

রাতের নৌকায় গানের আসর হবে। অহনা দু একটা গান কি আজ আমাদের শুনাবে?

অহনা হাসতে হাসতে বললেন, খুব ভালমত অনুরোধ করলে শুনাতেও পারি।

অনুরোধ মানে তুমি চাইলে আমি সবার সামনে দূর থেকে ক্রলিং করে এসে তোমার পায়ে ধরতে পারি।

সফিক হাসছেন। অহনা হাসছেন। কে বলবে এদের মধ্যে কোন সমস্যা আছে। এদের হাসি কৃত্রিমও নয়। সহজ সরল হাসি। এই হাসির উৎস ভালবাসা। অন্য কিছু নয়। সেই ভালবাসার জন্ম যদি ঘৃণাতে হয় তাতে কিছু যায় আসে না।

রাতে অনেকক্ষণ গান হল। নৌকা ঘাটে বাঁধা। বেশ বড় নৌকা। ছাদ খোলা। পাটাতনে তিরপল বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা চারজন শুধু আছি। সাহেব গান শুনতে আসেন নি। তিনি নাকি একা একা গাজা খাবেন। বাংলাদেশে এসেছেন আরাম করে গাঁজা খাবার জন্যে। নোমান আজকের দিনের পরিশ্রমের জন্যেই বোধহয় পাটাতনে কান্ত হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। বেশ কয়েকটা তাকিয়া আছে। বেচারার মাথার নিচে একটা দিয়ে দিলে আরাম করে ঘুমাতে পারত। আমার দিতে লজা লাগছে।

সফিক সাহেব বসেছেন অহনার পাশে। আমি অন্য দিকে। অহনা পরপর তিনটি গান করলেন। সবার শেষে গাইলেন

নিশীথে কী করে গেল মনে কী জানি, কী জানি।
সে কি ঘুমে, সে কি জাগরণে কী জানি, কী জানি।।

গাইতে গাইতে টপ টপ করে তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। চাঁদের আলোয় কান্নাভেজা মুখ এত সুন্দর দেখায়? আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি। এমন একটি গুণী মেয়েকে ভালবেসে কষ্ট পাওয়াতেও আনন্দ আছে। এদেরতো অঞ্জলি পেতেই ধরে রাখতে হয়।

অহনা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে হঠাৎ কঠিন স্বরে বললেন, রাত একটার সময় এখান থেকে একটা ট্রেন যাবে ঢাকায়। আমি ঐ ট্রেনে চলে যাব। নোমান যাবে আমার সঙ্গে।

সফিক অবাক হয়ে বললেন, তার মানে?

অহনা বললেন, মানে টানে জানি না। আমার ভাল লাগছে না। এই নোমান উঠতো। ওঠ। তুমি আমাকে নিয়ে ঢাকা যাবে।

সফিক বললেন, তোমার যদি যেতেই হয় তুমি যাবে কিন্তু একা যাবে কেন? আমরা সবাই যাব। তুমি চলে গেলে আমরা এখানে থেকে করব কি?

না। আমি একা যাব। তোমরা পরে আসবে। শুধু নোমান আমার সঙ্গে যাবে।

সফিক সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, দেখ অহনা–নোমানের স্ত্রী এখানে আছে। সে তার স্ত্রীকে ফেলে চলে যাবে এটা তুমি কেন ভাবছ? হঠাৎ করে তোমার কি হয়েছে। আমি জানি না। তবে তুমি পাগলের মত আচরণ করছি।

মোটেই পাগলের মত আচরণ করছি না। যা করছি ঠাণ্ডা মাথায় করছি।

নোমান তোমার সঙ্গে যাবে। আর তার স্ত্রী এখানে থাকবে?

অহনা তীব্ৰ গলায় বলল, হ্যাঁ এতে তেমন কোন সমস্যা হবার কথা না। আশা করা যেতে পারে গভীর রাতে তুমি তার ঘরের দরজায় ধাক্কা দেবে না। আর যদি দাও তাতেও ক্ষতি নেই এই মেয়ের অন্য পুরুষের সঙ্গে শুয়ে অভ্যাস আছে।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। কি বলছে এই মেয়ে? সে কি সত্যি এসব বলছে না। আমি ভুল শুনছি?

সফিক চিৎকার করে বললেন—চুপ কর। You are out of your mind.

তুমি চেঁচিও না। I am not out of my mind. I never was. যা বলছি ঠিকই বলছি। এই দারুণ রূপবতী এবং পুণ্যবতী মহিলার একটি অবৈধ মেয়ে আছে। এতিমখানায় বড় হচ্ছে।

আমি মূর্তির মত বসে রইলাম। নোমানের ঘুম বোধহয় ঠিকমতো ভাঙেনি। সে হতভম্ব হয়ে একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে একবার অহনার দিকে। আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আমি কি পানিতে পরে যাচ্ছি? সফিক ছুটে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। শান্ত স্বরে বললেন–নোমান তুই অহনাকে নিয়ে যা। আমি নবনীকে দেখব। তুই চিন্তা করিস না। যা প্লীজ যা।

নোমান অহানার সঙ্গে চলে যাচ্ছে। আশ্চর্য সে একবারও পেছনের দিকে তাকাছে না। সফিক বললেন, নবনী তুমি কিছু মনে করো না। ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ও এরকম করে। আমি হাত জোড় করে ওর হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, সফিক ভাই! আপনি কি আমাকে আমার বড়মামার কাছে পৌঁছে দেবেন?

অবশ্যই দেব। তুমি যেখানে আমাকে নিতে বলবে আমি সেখানেই তোমাকে নিয়ে যাব। অহনার ব্যবহারে আমি যে কি পরিমাণ লজিত তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।

আপনার লজ্জিত হবার কিছু নেই। আমি দীর্ঘদিন মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। আমার জীবনের একটা অংশ আমার কাছে অস্পষ্ট। আমার ধারণা অহনা ভাবী সত্যি কথাই বলেছেন।

আমার এমন লাগছে কেন? শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। আমি নৌকার উপর বসে আছি। নৌকাটা খুব দুলছে। এত দুলছে কেন নৌকাটা? নৌকার পাটাতনে এটা কি কাক না? ঐ বুড়ো কাকটা না? আবার কতদিন পর কাকটাকে দেখলাম— আমি বললাম, এই এই আয়।

তলপেটে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। আমার শরীর একটি শিশু বাস করছে। ওর কোন ক্ষতি হচ্ছে নাতো? ও ভাল থাকবে তো? প্ৰচণ্ড মানসিক যাতনায় না-কি আপনা। আপনি এবোরসান হয়ে যায়। এটা যেন না হয়। সব কিছুর বিনিময়ে আমি তার মঙ্গল চাই।

নবনী তোমার কি খারাপ লাগছে? এক কাজ কর এই পাটাতনে শুয়ে পর। তাকিয়াটা মাথার নিচে দাও।

সফিক ভাইয়ের কথা খুব অস্পষ্ট শোনাচ্ছে। তিনি আমাকে শুইয়ে দিলেন। চাঁদটা এখন ঠিক আমার চোখের উপর। চাঁদের আলো এত তীব্ৰ হয়? আমার চোখ বলছে যাচ্ছে।

নদী থেকে পানি নিয়ে তিনি আমার চোখে মুখে দিচ্ছেন। শান্তি শান্তি লাগছে। নদীর পানি এত ঠাণ্ডা।

নবনী শোন, হা করে নিঃশ্বাস নাও। হা করে নিঃশ্বাস নিলে ভাল লাগবে।

আমি নিজের জন্যে না। আমার বাচ্চাটির জন্যে হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। এই পৃথিবীতে তাকে আসতেই হবে।

আমার ঘুম ঘুম পাচ্ছে। আমি প্ৰায় ফিসফিস করে বললাম, সফিক ভাই। আমার পেটে তিন মাসের একটা শিশু আছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এবোরসান হয়ে যাবে। প্ৰচণ্ড ব্যথা হচ্ছে।

তুমি নড়বে না। যেভাবে আছ সেই ভাবে শুয়ে থােক। একটুও নড়বে না।

তিনি দৌড়ে চলে যাচ্ছেন। একটু বাতাস নেই তারপরেও নৌকাটা এত দুলছে কেন? মনে হচ্ছে। আমি গড়িয়ে পানিতে পড়ে যাব। নৌকার পাটাতনে বুড়ো কাকটা গুটি গুটি পায়ে আসছে আমার দিকে। আমি বললাম, এই যা যা। কাউকেই এখন আমার কাছে আসতে দেয়া যাবে না। নিজেকে রক্ষা করতে হবে। শিশুটির জন্যেই নিজেকে রক্ষা করতে হবে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। আধো ঘুম আধো জাগরণে বুঝতে পারছি— আমার শরীরের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে রক্ষা করার যে প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করছি, এরকম তাগিদ। আগেও একবার অনুভব করেছিলাম। আমার আজকের অনুভূতি নতুন নয়। আরো একবার জীবন বাজি রেখেছিলাম একটি শিশুর জন্যে। অস্পষ্ট ধোয়ার মত স্মৃতি, গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা। বড় মামা আমাকে নিয়ে অনেক দূরে কোথাও চলে গিয়েছিলেন। যেন কেউ আমার খোঁজ না জানে। মামা কেন এই কাণ্ডটি করেছিলেন এখন স্পষ্ট হচ্ছে।

কেমন আছে আমার ঐ বাচ্চাটা? কত বড় হয়েছে? ওকি ওর বাবার মত হয়েছে? পরিচয়হীন ঐ মেয়েটির মাথায় ভালবাসার মঙ্গলময় হাত কেউ কি ফেলবে না?

চাঁদটা মনে হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসছে। কি তীব্র তার আলো?

রক্তে আমার শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। এত রক্ত মানুষের শরীরে থাকে?

পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এত রক্ত পায়ের শব্দ। নোমান কি আসছে? সে যদি আসে তাহলে তাকে একটা কথা বলে যেতে চাই। কথাগুলো বলার মত শক্তি আমার থাকবেতো? আমি বলব, এই দেখ আমি মরে যাচ্ছি। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, তার উপর কোন রাগ কোন ঘেন্না থাকা উচিত না। আমি অনেককাল আগে একটা মানুষকে যে ভাবে ভালবেসেছিলাম তোমাকেও ঠিক সেই ভাবেই ভালবেসেছি। ভালবাসার দাবি আছে। সেই দাবি খুব কঠিন দাবি। ভালবাসার সেই দাবি নিয়ে তোমার কাছে হাত জোড় করছি। আমার একটা মেয়ে আছে। কোন একটা এতিমখানায় বড় হচ্ছে তুমি কি ওকে তোমার কাছে এনে রাখবে? প্রথমে হয়ত তাকে ভালবাসতে পারবে না। কিছুদিন পর অবশ্যই পারবে। ওতো আমারই একটি অংশ। আমিতো তোমাকে ভালবেসেছি।

এক খণ্ড বিশাল মেঘ চাদটাকে ঢেকে দিয়েছে। চাঁদের আলো এখন আর চোখে লাগছে না। চারদিকে কি সুন্দর লাগছে। কি অসহ্য সুন্দর। হতাশা, গ্লানি, দুঃখ ও বঞ্চনার পৃথিবীকে এত সুন্দর করে বানানোর কি প্রয়োজন ছিল কে জানে?*

————-

  • নবনীর প্রতিটির চরিত্র কাল্পনিক।

(সমাপ্ত)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel