Friday, April 3, 2026
Homeবাণী ও কথাখাঁচার ভিতর সুচিন পাখি কমনে বাঁইচে রয় - শওকত আলী

খাঁচার ভিতর সুচিন পাখি কমনে বাঁইচে রয় – শওকত আলী

খিলগাঁও-এর বাসায় ঘরগুলো বেশ বড় ছিল, বারান্দাটাও ছিল চওড়া। ওদিকে আবার বাচ্চার স্কুল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড—সবই ছিল কাছাকাছি। অসুবিধা ছিল শুধু একটাই, আর তা হল, সন্ধ্যাবেলায় প্রায়ই ইলেকট্রিসিটি থাকতো না। একদিন-দু’দিন পরপর সন্ধ্যাটি হতো আর অমনি ঝপ করে নেমে আসতো অন্ধকার। তখন মোমবাতি ধরাও, নইলে কুপি জ্বালাও, কেরোসিন আছে না ফুরিয়ে গেছে তা দেখে লণ্ঠনের চিমনি। মোছে—এইসব হাঙ্গামায় পড়তে হতো। হাঙ্গামা-টাঙ্গামা শেষ করে মেয়েকে পড়াতে বসতে বসতে রাত সাড়ে সাতটা/আটটা বেজে যেতো তখন আবার একসঙ্গে দুই কাজ-মেয়েকে পড়ানো একদিকে আর অন্যদিকে রান্না করা। দুই কাজই একসঙ্গে করতে হতো। শুধু একটা করতে গেলে অন্যটা বাদ পড়ে যেতো। মেয়েকেই যদি শুধু পড়াতো, তাহলে রাতের খাওয়া নিয়ে ঝামেলা হয়ে যেতো। কারণ কর্তার শুধু ভাত নয়, তরকারিও সদ্য রান্না হওয়া চাই। তবু ঝামেলা-টামেলা থাকা সত্ত্বেও সে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিল। নীলফামারী থেকে বাস উঠিয়ে ঢাকার এই খিলগাঁওয়ের বাসায় ঠাই গাড়া, সোজা ব্যাপার নয়। তবু সে সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সংসার পেতেছিল। শুধু সংসার পাতাই নয়, নিজে কিছু করতে পারে কি না, সেই চিন্তাও তার মগজের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।

সকাল ন’টার দিকে আতিক বেরিয়ে যেতো, সেই জন্যে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করতে হতো আটটার মধ্যেই। স্বামী বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই মেয়েকে নিয়ে স্কুলের পথে বেরুতে হতো। মেয়েকে ক্লাসে ঢুকিয়ে দেওয়ার পরে আর তার কোনো কাজ নেই। সে স্কুলেই থেকে যেতো তারপর। মেয়ের ছুটি না হওয়া পর্যন্ত। বাসায় ফিরে সে করবেটাই বা কী? একাকি শুধু এঘর-ওঘর করা, নইলে জানালা দিয়ে রাস্তায় মানুষ দেখা তাছাড়া তিন ঘন্টা পর তো আবার মেয়েকে নেওয়ার জন্য আসতেই হবে। সুতরাং সে বাসায় ফিরতো না। অন্য বাচ্চাদের মায়েদের সঙ্গে সে স্কুলের। বারান্দায় নয়তো মাঠের গাছতলায় ঘাসের ওপর বসে আড্ডা দিতো।

স্কুলের নতুন টিচার তাজিন বেগমের সঙ্গে ঐ সময় তার আলাপ হয়। মহিলা একদিন বলে বসেন, আচ্ছা, আপনারা ওভাবে গল্প করে সময় নষ্ট করেন কেন, বলুন তো? অতক্ষণ ধরে কথা বললে মুখ ব্যথা করে না আপনাদের?

তাহলে কী করব?

বইটই সঙ্গে করে আনলেই তো পারেন। বই পড়ে দিব্যি সময়টা কাটিয়ে দেবেন।

বান্টির মা মোটাসোটা ভারিক্কি ধরনের মহিলা। তিনি বলে ওঠেন, বইয়ের কথা বলবেন না ভাই, স্কুল-কলেজে থাকার সময় ওসব অনেক পড়েছি, আর না এখন আমরা সংসারের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, অন্য পরীক্ষা দিতে পারব না।

আহা, পরীক্ষার কথা আপনাদের কে বলেছে! পরীক্ষার কথাতো আমি বলি নি। তাজিন বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু বান্টির মা কোনো কিছু বলার সুযোগ দেয় না। বলে, হয়েছে ভাই, ঐ পড়াপড়ির মধ্যে আমরা নেই।

তাজিন সমবয়সী হবে বলে মনে হয় শাহিনার; তাই সামান্য ঘনিষ্ঠতাও হয়। একদিন সে জিজ্ঞেস করে বসে, আপনি আগে কোথায় ছিলেন মানে কোন্ স্কুলে?

কোনো স্কুলে ছিলাম না। তাজিন বলতে থাকে। বলে, বাসায় ছিলাম, রান্নাঘরে—এই স্কুলেই আমার প্রথম চাকরি।

নিজের থেকেই তাজিন আরও গল্প শোনায়। তাতে জানা যায়, স্বামীর উৎসাহে সে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হয়ে পরীক্ষা দিয়ে বি.এ. পাস করেছে, তারপর চেষ্টাচরিত্র আর ধরাধরি করেই স্কুলে চাকরিটা পাওয়া।

ওই গল্প শুনে শাহিনা কৌতূহলী হয়েছিল। জানতে চেয়েছিল, আপনার স্বামী নিশ্চয়ই কলেজে-টলেজে আছে?

নাহ্, কীসের কলেজে থাকবেন? এম. এ. পাস করলে তবে না কলেজে চাকরি হবে, ওতো বেকারই থাকে বেশির ভাগ সময়।

তার মানে?

নতুন নতুন সব খবরের কাগজে ঢুকে পড়ে, তার কিছুদিন পর কাগজ বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে যায়।

তাহলে পুরনো ভালো কাগজে ঢুকলেই পারেন।

আরে নাহ্, তাজিনের গলায় কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। বলেছিল, ভালো কাগজে ঢুকলে ওঁর রাজনীতিটা কে করবে?

তাজিন আরও দুঃখের কথা শুনিয়েছিল। কিন্তু সেসব সে মনে রাখে নি। ওর ঐ প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হয়ে বি.এ. পাস করার খবরটা তার মগজের ভেতরে ঠাই নিয়ে নেয় এবং তাকে খোঁচাতে শুরু করে। তার ফলে সে মনে মনে সুযোগ খোঁজে। স্বামী রত্নটিকে কিছু জানায় না। কেননা তিনি আবার মেয়েদের স্কুল কলেজে লেখাপড়া শেখানোর ঘোর বিরোধী। এমনকি নিজের বাচ্চা মেয়ে সামিনাকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করানোর সময়ও তার আপত্তি ছিল—তার ইচ্ছে ছিল মেয়েকে মসজিদের মক্তবে পাঠানোর। শেষে অনেক বলে কয়ে যখন বোঝানো হলো যে কেজি স্কুলেও আজকাল ইসলাম ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়, তখন সাহেবের সম্মতি পাওয়া গেল। সবই ভাল চলছিল। সে দিব্যি তাজিনের কাছ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসটাও চেয়ে নিয়েছিল, তার দেখাও হয়ে গিয়েছিল যে শুধু বাংলা আর ইংরেজিতেই এখন যা আলাদা। অন্যসব বিষয়ের সিলেবাস একই রকম, আট বছর আগে যা ছিল। সে মনে মনে আশা করতে শুরু করে তখন যে, প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে সে আল্লাহর ইচ্ছায় অনায়াসে বি. এ. পাস করতে পারবে। আর যদি সে পাস করতে পারে, তাহলে একটা কাজটাজ জোটানো কি অসম্ভব কিছু? সামিনাদের এই এ্যাপোলো কিন্ডারগার্টেনেই কি তার কাজ জুটতে পারে না?

তার আরও মনে হয়, সে যদি কাজটাজ জুটিয়ে নিতে পারে তাহলে আতিককে এখনকার মতো উদয়াস্ত খেটে বেড়ানোর দরকার হবে না। এইরকম চিন্তাভাবনা আর। আশা-আকাঙ্খ নিয়ে সে বলা যায় একরকম গুছিয়েই বসেছিল। বাড়িওয়ালার শালা সাবিদ আলীও বি.এ. পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছিল। খবরটা জেনে সে তাকেই ধরল বইপত্র যোগাড়ের ব্যাপারে। আতিককে কিছু বলে নি, কেননা বললে সে হাসাহাসি করবে। ভেবেছিল নিজে তৈরি হয়ে উঠতে পারলে তখন সে সবাইকেই জানাবে।

কিন্তু পারা যায় নি। মাস্টার মানুষ ঘরে বই থাকলে তার নজরে না পড়ে পারে?

প্রথম দিন ইয়োরোপের ইতিহাস বইখানা টেবিল থেকে তুলে হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, এ বইখানা কোত্থেকে এল?

শাহিনা তখন পাশের ঘরে ছিল। মেয়ে সামিনা জানিয়ে দিল, ও বই তো সাবিদ চাচার। আম্মুকে পড়তে দিয়েছে। বলেছে, আরও বই দেবে।

কবে দিয়েছে?

কেন, কাল দিয়ে গেল। আমরা স্কুল থেকে আসবার পর আমার হাতে দিয়ে গেছে।

আতিক বইখানা উল্টেপাল্টে দেখে আবার টেবিলের ওপর রেখে দেয়। দিন দুয়েক পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান-এর বই চোখে পড়লে আতিক ফের মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, সাবিদ চাচা আবার কবে এসেছিল?

বাহ্ এই তো, সকাল বেলা, যখন স্কুলে যাচ্ছিলাম, সামিনা হাসতে হাসতে জবাব দেয়।

তখন কিছু বলে না আতিক। কিন্তু রাতের বিছানায় বউকে এক প্রস্থ ভোগ করার পর জিজ্ঞেস করে, ঐ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বইখানা কি তুমি পড়ছে?

হ্যাঁ, শাহিনা ব্লাউজের বোতাম লাগাতে লাগাতে জবাব দেয়। বলে, দুপুরে কোনো কাজ থাকে না, তাই…..।

হুঁ, কাজ না থাকলে বই পড়া ভাল কিন্তু ও তো পাঠ্যবই, ছাত্ররা পড়ে—তুমি কী বুঝবে ওসব বই পড়ে?

দেখি পড়ে, শাহিনা বলে। বলে, একসময় তো পড়তাম, আমিও তো ছাত্রী ছিলাম।

সে তো এক যুগ আগের কথা।

একটু থেমে ফের বলে আতিক, পরীক্ষা-টরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে-টিচ্ছে হচ্ছে নাকি?

ইচ্ছে তো হয়ই।

তা ইচ্ছেটা কি সাবিদ আলী জাগিয়ে দিয়েছে?

শাহিনা লু হাসে। বলে, বাহু তা কেন হবে, ও এবার পরীক্ষা দিচ্ছে, তাই ওর কাছ থেকে বই চেয়ে নিলাম।

আতিক আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে।

শাহিনার মনে হয়েছিল, ব্যাপারটার ওখানেই শেষ কিন্তু পরে দেখে ব্যাপারটা নতুন সমস্যা তৈরি করে বসে আছে। দিন দুই পর থেকেই দেখে কর্তার মেজাজ একটুতেই খিচড়ে উঠছে। একই বাড়ি নিচতলায় বাড়িওয়ালা থাকে। সিঁড়ির মুখে কেন পানি জমে থাকে তাই নিয়ে গজর গজর করে। কলে যদি পানি না থাকে, তাহলে চাচামেচি জুড়ে দেয় আর নিচতলা সিঁড়ির পাশে, ড্রেনের ওপর বাড়িওয়ালার দু’বছরের নাতিটিকে যদি হাগতে বা মুততে দেখে তাহলে গালাগাল করে বাড়িওয়ালার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দেয়।

ঐ একই সময়ে শাহিনা স্বামীর মুখে এক নতুন আফসোস শুনতে পায়—কেন সে ছেলের বাপ হতে পারল না! বাপ সে হল, কিন্তু ছেলের নয়, মেয়ের। বিয়ে সে করল, তাতেও তার দান-যৌতুকহীন খটখটে কপাল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যে সংসার পাতল, সেখানেও আয় বরকত বলে কিছু ছিল না। আর বউটাও এমন যে বেটাছেলে পেটে ধরতে পারে না। আর যদি ছেলেপুলে না হয় বউয়ের, তখন?

শাহিনা বুঝতো, মানুষটার বড় আশা ছিল যে প্রথম সন্তানটি ছেলে হবে, কিন্তু তা না হওয়াতে মনের ভেতরে ক্ষোভ জমে আছে।

কিন্তু ঐ ক্ষোভ দূর যে করবে, সেই সাহস তার তখন কোথায় মফস্বলের প্রাইভেট স্কুলের অস্থায়ী চাকরি, কোনো মাসে বেতন হয়, কোনো মাসে হয় না–সরকারি অনুদানের টাকা আসে তিন মাস পর পর। অমন অবস্থায় সে কেমন করে ছেলে হওয়ার ঝুঁকি নেয়! লুকিয়ে লুকিয়ে পিল খাওয়া ধরেছিল, সেটাই সে চালিয়ে যেতে থাকে।

আতিক টের পেয়েছিল কি না সে জানে না। তবে ওব্যাপারে নজর দেওয়ার মতো অবস্থা তার তখন একেবারেই ছিল না। চাকরি খুঁজবে না বউয়ের পেট কেন বানাতে পারছে না তার খোঁজ করবে? সৈয়দপুর জংশন-এর রেলওয়ে স্কুলে লিভ ভ্যাকান্সিতে বছরখানেক কাজ করা পরও যখন চাকরি হল না তখন গেল বদরগঞ্জ। সেখানে সুবিধা না হলে বলীগ জামাতের এক লোক ধরে লম্বা পাড়ি দিয়ে একেবারে টঙ্গীর এক স্কুলে, তারপর সবার শেষে এই ঢাকার মাতুয়াইলে। তবু তো। প্রথম প্রথম মনস্থির করতে পারে নি চাকরিতে থাকতে পারবে কি পারবে না করতে করতে একটা বছর পুরো পার হলে তারপর বউ বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় আসা। আর সেই তবলীগ জামাতের মানুষটির সুপারিশেই তার খিলগাঁওয়ের বাসা ভাড়া নেওয়া। এখন সকালে স্কুল, বিকেলে কোচিং সেন্টার আর রাতে একটা টিউশনি। রোজগার যা হচ্ছে তাতে সংসার মন্দ চলছে না। কিন্তু মানুষটার পরিশ্রম যে চোখে দেখা যায় না, তার কী হবে! তার খুব খারাপ লাগে। সংসারের জন্য মানুষটা একা একা খেটে মরবে? সংসারটাতো তারও। কিছুই কি সে করতে পারে না?

কিন্তু তার চিন্তাভাবনা যা-ই হোক, তাকে পাত্তাটা দিচ্ছে কে? কর্তাটির মুখে তখন উঠতে বসতে বউকে খোঁটা আর সর্বক্ষণ বাসাবদলের হুমকি। একেকদিন মেয়েকে কোলে বসিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করে, সাবিদ বই দিতে এসেছিল? আসে নি? বই দিতে এলে কি ঘরে ঢোকে? ঢোকে, তাই না? তখন কি দরজাটা খোলা থাকে?

শাহিনা একটু আড়ালে নিজেদের রাখলে কী হবে, কানে আসে সব কথাই, তখন সে কাদবে না হাসবে বুঝে উঠতে পারে না। সাবিদের মতো একটা অল্পবয়সী ছেলেকে জড়িয়ে বউকে যে মানুষ সন্দেহ করে, সে মানুষকে কী বলা যায়? প্রতিবাদ করারও তো রুচি হয় না তার। সে এও বোঝে—কোনোরকম প্রতিবাদ করে লাভ হবে না। সে বোঝাতে চেষ্টা করে আর সেজন্যে সে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। অবশ্য অমন স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারটা যে আসলেই শারীরিক সেটা তার অজানা ছিল না। যে মানুষ সকাল নয়টায় বেরিয়ে দুটোয় বাসায় ফেরে তারপর আবার তিনটায় বেরিয়ে ন’টায় দশটায় ফেরে, তার সঙ্গে কী ধরনের ঘনিষ্ঠতা হতে পারে সে ভেবে পায় না। শোয়ার পর একটু এটাওটা সংসারের কথা হয়। তারপর ধামসাধামসি চলে কিছুক্ষণ। শেষে বাবুসাহেব একেবারে কাত এবং শুরু হয় তার নাসিকা গর্জন।

এমন অবস্থায় শাহিনার আর কী উপায়? সে পিল খাওয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর একদিন রাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, সামিনা তো ছ’বছরের হল, এখন আমাদের আর একজন দরকার, তাই না?

তার অমন দৃঢ় স্বরের কথার প্রতিক্রিয়ায় বীর পুরুষটির মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোয় না—যা হয় তার সবই শারীরিক এবং ধামসাধামসিটা সে রাতে এতো বেশি জোরে হয় যে দশ মাস আগে রাস্তার ধার থেকে কেনা পুরনো খাটখানি ভেঙে পড়ে।

শাহিনার ধারণা হয়েছিল তার পিল খাওয়া বন্ধের খবর এবং সন্তান ধারণের ইচ্ছা জানার পর আতিকের বাসাবদলের বাতিকটা কেটে যাবে। দেখা গেল আতিক সত্যিসত্যিই বাসা বদল সম্পর্কে কিছু বলছে না। উপরন্তু বাসায় ফেরার সময় কলাটা, কমলাটা, আপেলটা, প্রায় প্রতিদিনই আনছে। আর বাসায় ফিরতে বেশি রাতও করছে না।

দেখতে দেখতে এক মাস কেটে যায়। আতিক বউয়ের মুখের দিকে তাকায়, শরীরের দিকে তাকায়। কিন্তু উঁহু! কোনো লক্ষণই আবিষ্কার করতে পারে না। শাহিনারও চিন্তা হয়, ব্যাপারটা কী? সে বাঁজাটাজা হয়ে গেল নাকি? ছবর বার্থ কন্ট্রোল করলে মেয়েরা কি বাঁজা হয়ে যায়? সে ভেবে পায় না কার কাছে জিজ্ঞেস করবে কথাটা।

তার চিন্তা হয়, কিন্তু তবু বেশি পাত্তা পায় না চিন্তাটা। কারণ পড়াশেনার দিকে ততোদিনে তার মন বেশি ঝুঁকে পড়েছে। ইতিহাসের ফার্স্ট সেকেন্ড দুটো পেপারই মোটামুটি তার আয়ত্তে এসে গেছে। এখন বাকি শুধু থার্ড পেপারটা—সে ওটা নিয়েই তখন ব্যস্ত। তাকে বই জোগানো, প্রশ্ন তার সঙ্গে আলোচনা সাবিদ আলীই করছে।

একদিন দুপুরের আগে, বেলা তখন বোধহয় এগারোটা, হঠাৎ আতিককে আসতে দেখা যায়। তখন সাবিদের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করছিল। অবশ্যি সাবিদ আতিককে দেখামাত্র নিচে নেমে যায়। আর সেও চলে আসে নিজের ঘরে। তাই প্রথমে মনে হয়েছিল আতিক তাদের দেখে নি। কারণ দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করল। রান্না খুব ভাল হয়েছে বলে প্রশংসা করল, কটার সময় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাবে, তাও জিজ্ঞেস করল। তার অমন কথাবার্তা শুনে কে আন্দাজ করবে যে মানুষটা মনের ভেতরে অন্যরকম শয়তানি প্যাঁচ কষছে।

বিছানায় গড়িয়ে পড়ার সময় আতিক ডেকে বলে, একটা কথা শোনো, আমি কিন্তু রোজ দুপুরের আগেই বাসায় এসে যাবো, বুঝলে?

শাহিনার অবাক লাগে, কী এমন ঘটল যে সাহেবের এমন সুমতি! কথাটা তার মনে হয় কিন্তু মুখে সে কিছুই বলে না।

কী বললাম, বুঝলে? আতিক পরে জিজ্ঞেস করে। তারপরে জিজ্ঞেস করে, ঐ সময় আমি যদি বাসায় আসি তাহলে কি তোমার অসুবিধা হবে?

বাহ্, আমার কেন অসুবিধা হবে? শাহিনার রীতিমতো রাগ হয়। সে সোজাসুজি জবাব দেয়। বলে, তুমি যখন খুশি আসবে-যাবে, তাতে কার কী? তুমি সংসারের কর্তা ওভাবে ন্যাকার মতো কথা কেন বলেছে?

ও, আমি তাহলে ন্যাকামি করছি তাই না?

চোখে চোখ রেখে আতিক কুটিল হাসি হাসে। বলে, দুপুরের আলাপটা তোমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করো, নাকি ঘরের ভেতরেও তোমাদের আলাপ চলে?

শাহিনার শরীর-মন থমকে স্থির হয়ে যায়–ছি!! এসব কী বলছে মানুষটা? যার মন এতো নিচু আর প্রশ্নটা এতো নোংরা! সে কী জবাব দেবে? সে জবাব না দিয়ে বলে, তুমি তোমার নোংরা মন নিয়ে যতো ইচ্ছে নোংরা ঘাঁটো, আমি মেয়েকে আনতে স্কুলে গেলাম।

সে ঘর থেকে ঐ মুহূর্তেই বেরিয়ে পড়ে।

ফিরতে সে দেরি করে না। বলা যায় আধঘন্টার মধ্যেই সে ফিরে আসে এবং দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাবিদের সঙ্গে গল্পে আতিক মশগুল। তার ভাবসাব দেখে মনে হয়, যেন কতোকালের আপনজনের সঙ্গে কথা বলছে।

শাহিনার দৃশ্যটা দেখতে ভাল লাগে। আশা হয়, হয়তো সাবিদ আলীর সঙ্গে যে ভুল ধারণাটা আতিকের রয়েছে, সেটা কেটে যাবে। কিন্তু খানিক পরই তার মনের ঐ আশা উবে যায়।

মেয়েকে নিয়ে তখন সে খেতে বসেছে। ঐ সময় বারান্দা থেকে ঘরে এসে আতিক জানায়, আমি এবার যাই। অনেক দেরি হয়ে গেছে, সাবিদ ছেলেটা তো মহা ধুরন্ধর। সহজে কিছুই বলতে চায় না।

শাহিনা মুখের দিকে তাকালে সে ঠাট্টার ভঙ্গিতে ফের বলে, অন্য কিছু না, শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুপুরবেলা যে অততক্ষণ ধরে আলাপ করো, তাতে কী বুঝছো, তোমার ভাবী কি পরীক্ষা দিতে পারবে? তো ছোঁড়া স্বীকার করল যে হ্যাঁ, পরীক্ষা দিলেই পাস করে যাবে। কিন্তু এটা কিছুতেই স্বীকার করল না যে রোজ দুপুরবেলা

সে তোমার সঙ্গে আলাপ করে। যখন বললাম, যদি আলাপই না করো, তাহলে কীভাবে বুঝলে যে ও পরীক্ষা দিলেই পাস করবে? তখন আমার ঐ প্রশ্ন শুনে বাছাধন বেকায়দায় পড়ে গেল, মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না, বুঝলে? সব আমি বের করে ফেলতে পারি।

খাওয়া তখন লাটে উঠেছে শাহিনার। বুকের ভেতরটা ভয়ে তখন হিম। মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হয় না রাগ-ঘেন্না-বিরক্তি-এসবের শেষ সীমায় পৌঁছা’লে মানুষ কী করতে পারে? আসলে এমন অবস্থায় মানুষ কিছুই করতে পারে না। সে বোবার মতো স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে আর আতিক এমন ভাব নিয়ে বেরিয়ে যায় যে মনে হয়, সে দুনিয়া জয় করে ফেলেছে।

শাহিনা ঐ দিন থেকে চুপ হয়ে যায়। আতিকের মুখের ওপর কোনো কথা বলে। দুপুরে রোজ বাসায় ফেরে। গোসল, খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় গড়ায়, ততক্ষণে শাহিনা মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফেরে। তিনটের দিকে আতিক ফের বেরিয়ে যায়। ফেরে রাত নটার পর। টিভিতে দশটার খবর আরম্ভ হলে খেতে বসে। খাওয়া দাওয়া শেষ হরে বাসন-কোশন ধোয়া-পাকলা সেরে যতোক্ষণ পর্যন্ত বউ বিছানায় না। আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত জেগে থাকে। বিছানায় বউ এলে কাছে টেনে নিয়ে ঘাড়ে-পিঠে। হাত বোলায়। তারপর নিত্যকার গরম শরীর থেকে খালাস করে দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়। শাহিনার কিন্তু ঘুম আসে না। এ কেমন জীবন হয়েছে তার? অতীত বর্তমান মনের ভেতরে ওলটপালট করে। মফস্বল শহরের কালো বরন মেয়ে। বাপ স্কুলের মাস্টার, ছাত্রী ভাল হলেই বা কী, মেয়ের শেষ গতি তো বিয়েতে। যতোদিন বিয়ে না হচ্ছে, ততোদিন পড়ুক। আর বিয়ে হবেই বা কীভাবে? মেয়ের বিয়ে দিতে যৌতুক লাগে না? ছেলে গ্র্যাজুয়েট হলেই তার দাম এক লাখ। আর যদি মোটর সাইকেল দিতে পারে শ্বশুর তাহলে তো আরও ভাল। মেয়ের বিয়ে সহজেই হয়ে যায়। যে পারে না, তার মেয়ের বয়স শুধু বেড়েই চলে, আই.এ. পাস করুক কি বি.এ. কিছুতেই কিছু হয় না। শাহিনার যখন ঐ রকম বয়স বাড়ছিল, বি. এ. ক্লাসের ফোর্থ ইয়ারে উঠেছে, ঐ সময় সম্বন্ধটা আসে। ছেলের আসল বাড়ি বর্ডারের ওপারে। জলপাইগুঁড়ি। এপারে বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন কিছুই নেই, বি.এসসি. পাস. দিতে থুতে হবে না। ছেলের শুধু বসবাস করার জন্য বাড়ি চাই। তবে হ্যাঁ, ঘরজামাই কিন্তু সে থাকবে না।

আতিকুল ইসলাম প্রধান, বি.এসসি. কে পেয়ে বেলাল মাস্টার যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যান। পছন্দ না করার কোনো যুক্তি নেই। আলাদা জায়গা তো তার নেই। একই উঠোনের একদিকে একখানা শুধু ঘর তুলে দেবেন, কেন পারবেননা—খুব পারবেন। মেয়ের মা খুঁতখুঁতে করে উঠেছিল ছেলের নাকি বয়স বেশি। তা হোক বয়স বেশি, বউকে ধমকে উঠেছিল বেলাল মাস্টার। বলেছিল, তোমার মেয়ের বয়স কি কম, এ্যাঁ? বলো, কম তোমার মেয়ের বয়স?

ধমকে উঠলে কী হবে, বেলাল মাস্টার নিজেও জানজ্ঞে ছেলের বয়স মেয়ের। তুলনায় বেজায় বেশি, ১৯৭২ সালে স্কুলের পড়া শেষ করলে ১৯৯৪ তে কত বয়স হয় ছেলের! কম করে হলেও ৩৭/৩৮। তাহলে? ২৩/২৪ বছরের মেয়ের বয়স হলে ফারাকটা কতো হয়?

হোক ফারাক, বেলাল মাস্টার কথার নড়চড় করেন না। পঞ্চাশ হাজার টাকা দেনমোহরের পঁচিশ হাজার টাকা উসুল দেখিয়ে কাবিননামায় সই হয় শাহিনা আখতার বেগমের। বাপের বাড়ি থেকে বিদায় দেওয়া হয় না তাকে। বাপের বাড়িরই একখানা ঘরে সে একজন পুরুষ মানুষকে নিজের বিছানায় পেয়ে যায়। তারপর আটটা বছর পার হয়ে গেল। এখন কি তার অন্য কিছু ভাব্বার উপায় আছে? বাপের বাড়িতেই বা সে কয়দিন থাকতে পারবে? এখন স্বামীর ইচ্ছাতেই তার ইচ্ছা, স্বামীর খুশিতেই তার খুশি, স্বামীর পছন্দেই তার পছন্দ। এখন স্বামীর যদি সন্দেহ হয় তার ওপর, তাহলে যাতে সন্দেহ না হয়, তাকে সেইভাবে চলতে হবে। সে আর বই হাতে। তোলে না। পরীক্ষা দিয়ে বি.এ. পাস করার চিন্তাটাকে সে মন থেকে হটিয়ে দেয়। দুপুরবেলা স্বামী বাসায় ফিরলে তার সামনে দাঁড়ায়, স্নানের আগে লুঙ্গি গেঞ্জি গামছা তেল সাবান এগিয়ে দেয়, স্বামী তার দিকে তাকিয়ে হাসলে সেও পাল্টা হাসে। ঘাড়ে হাত চাপলে সে আরও গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। কোনো কোনোদিন আতিকুল ইসলাম আট বছরের পুরনো বউয়ের বুকে হাত দেয়। গাল টিপে ধরে। চুমু খাবার সময় ঠোঁট কামড়ে ধরে। কিন্তু শাহিনা আখতার উঃ আঃ কিছুই করে না—শুধুই হাসে। কখনো দুষ্টু হাসি হাসে। কখনো ধন্য হওয়ার হাসি হাসে। কখনো কৌতুকের হাসি হাসে। একইভাবে খুশি হওয়ার, কী কৃতজ্ঞ হওয়ার, কিংবা চমক লাগার হাসিও সে হাসতে পারে।

এরই মধ্যে একদিন সাবিদ আলী খবর নিয়ে আসে যে, প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের জন্য টেস্ট পরীক্ষার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এখন ভাবীর দরখাস্ত করা দরকার।

শাহিনা শোনে, কিন্তু দরখাস্ত দেওয়া কিংবা না-দেওয়া সম্পর্কে কিছুই বলে না। শুধু জানায় সামিনার আব্বা আসুক। উনিই যা করার করবেন।

সেদিন দুপুরে ফের আসে সাবিদ আলী। আতিককে খবরটা জানানো হলে সে একটু যেন থমকায়। তারপর গলা খুলে হাসে একদফা। হাসতে হাসতেই শাহিনাকে ডেকে বলে, দেখো কী খবর এনেছে সাবিদ আলী। তুমি কি পরীক্ষা দেবে? প্রিপারেশন হয়েছে তোমার?

শাহিনা সামনে আসে কিন্তু মুখ তোলে না। মুখ নিচু করেই জানায়না, আমি পরীক্ষা দেবো না।

সে কী! সাবিদ আলীর বিশ্বাস হতে চায় না। বলে, এ আপনি কী বলছেন? আপনি যা জানেন, রেগুলার স্টুডেন্টদের অনেকেই তা জানে না। ভাবী, প্লিজ দিন পরীক্ষাটা, দেখবেন, আপনি ভালোভাবে পাস করে যাবেন।

সাবিদ এমনভাবে বলে, যেন শাহিনার পরীক্ষা দেওয়াটা তারই কোনোরকম দায়ের ব্যাপার। সে রীতিমত অনুরোধ করে। কিন্তু শাহিনা মুখ তোলে না, তার নিচু মুখ নিচুই থেকে যায়। ওদিকে আতিকও কিছু বলে না। ব্যাপারটা তার কাছে নাটকের মতো লাগে। সে একবার বউয়ের দিকে তাকায়। একবার বাড়িওয়ালার শালার দিকে। দু’জনের ভাবসাব দেখে সাবিদ আলীর ও সম্ভবত ভাল লাগে না। সে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলে, আমি এবার যাই।

আর তখনই শাহিনা মুখ তুলে পেছনে থেকে ডাকে। বলে, তোমার বইগুলো নিয়ে যাও। ওগুলো এখানে থাকলে খামোকা নষ্ট হবে। অন্য কাউকে দিলে তার কাজে লাগবে।

সাবিদের যে কী হয় বোঝা যায় না। সে এমন ভাব দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় যে মনে হয়, শাহিনার কথা শুনতেই পায়নি।

ওদিকে আতিকুল ইসলাম কী বোঝে সেই জানে। সে বলে ওঠে, আহা ছোঁড়া বোধ হয় দিলে বড় দাগা পেয়েছে গো! তুমি ওভাবে কথাটা বললে কেন?

শাহিনা জবাবে কিছু বলে না, চুপচাপ স্বামীর সামনে থেকে সরে যায়।

আর পরের দিনই আতিকুল ইসলাম বাড়িওয়ালা সোহারাব মিয়াকে জানিয়ে দেয় যে মাসের শেষে সে বাসা ছেড়ে দিচ্ছে।

খবরটা শুনে শাহিনা থ হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, এসময় বাসা বদলালে সামিনার লেখাপড়ার ক্ষতি হবে না! বছরের আর তিনটে তো মাস। ওর স্কুলের কাছে কি বাসা পাওয়া যাবে?

ধরে নাও, পাওয়া যাবে না। আতিক শান্ত গলায় বলে।

তাহলে?

তাহলে কী?

একটা বছর নষ্ট হবে না ওর?

হ্যাঁ, হবে। আতিক হাসতে হাসতে বলে, মেয়েদের দু-একটা বছজ্ঞ নষ্ট হলে খুব কি যায়-আসে?

অমন কথার পর শাহিনা বলার মতো আর কিছু খুঁজে পায় না।

দিন দুই পরে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাবার তাড়া দেখে আতিক বউকে ডেকে বলে, স্কুলে যাওয়ার জন্যে অতো তাড়া কীসের? ঐ স্কুলে তো মেয়ে আর পড়বে না। ওকে বরং তুমি বাড়িতেই পড়াও। ওতে মেয়ের ভাল হবে। একটু হেসে ফের স্ত্রীর মুখের দিকে তাকায় আতিক। তারপর চোরা হাসি হাসতে হাসতে বলে, আমার কিন্তু তোমার জন্যই বেশি চিন্তা হচ্ছে। আসলেই তোমার খুব কষ্ট হবে এই বাসাটা ছাড়লে, মেয়ের স্কুলে তোমরা বান্ধবী জুটেছিল অনেক তার ওপর সাবিদ আলীর মতো অমন একজন হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যান নির্জন দুপুরের সঙ্গী, এমন তো সব জায়গায় পাওয়া যাবে না।

শাহিনা শোনে আর দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে আল্লাহকে বলে, খোদা, সহ্য করার শক্তি দাও, আর যে সহ্য হয় না।

বলা হয়েছিল মাসের শেষে যাবে। কিন্তু কেমন করে যেন দু’পক্ষের কী যোগাযোগ হয়ে গেল। আর তাতেই দিন দশেক পরেই একদিন সকালে আতিক এসে বলল, এবার গাঁটরি-বোচকা বাঁধো; আমরা অন্য বাসায় যাবো।

দেখতে দেখতে সব কিছু বাঁধাছাদা হয়ে গেল। কিন্তু সাবিদ আলীর বইগুলো নিয়ে সমস্যা দাঁড়াল। শাহিনা বুঝতে পারে না কী করবে। বইগুলো ঐ বাসাতেই রেখে যাবে, না বাড়িওয়ালার বাসায় দিয়ে আসবে। সাবিদ আলী ওদিকে পরীক্ষার পর দেশের বাড়ি বেড়াতে গেছে। সে বউগুলো নিয়ে ওর বড়বোনকে দিতে গেল, মহিলা বলে ওঠেন, ওর বইয়ের ঝামেলা আমার ওপর কেন চাপাচ্ছেন? ওগুলো আপনিই নিয়ে যান। একটু থেমে ফের বলেন, যদি না নেন, তাহলে ঐ বাসাতেই কোথাও রেখে যান।

শাহিনা শেষে কী করে, বইগুলো বসার ঘরে তাকে সাজিয়ে রেখে বাসা ছেড়ে চলে যায়।

যাত্রাবাড়ির নতুন বাসায় কয়েদিন খুব মনমরা ভাব থাকে শাহিনার। কিন্তু সেও অল্প দু-চার দিন। তারপর সেটা আর থাকে নি। কারণ হতে পারে এই যে, নতুন বাসায় আতিক বেশিক্ষণ বাসায় থাকছে। তাছাড়া সাজানো-গোছানো এসব কাজ তো ছিলোই।

নতুন বাসাও দোতলাতেই। কিন্তু ঘরগুলো ছোট। একেবারেই খুপড়ি খুপড়ি। ডাইনিং স্পেস এমন একটুখানি যে তাতে খাবার টেবিলের পর মাত্র দু’খানা চেয়ার বসানো যায়। শোয়ার ঘরে একখানা খাট পাতলে আর দ্বিতীয় খানার জায়গা হয় না। সুরাং দুই ঘরে দুই খাট পাততে হয়। বারান্দা এমনই চিকন যে ওখানে শুধু দাঁড়ানো যায়। চেয়ার পেতে বসা যায় না। আতিক হাসে খাট পাবার সময়। বলে, মেয়েকে নিয়ে এ ঘরে শোবে তুমি। আমি ও ঘরে। অসুবিধাটা অবশ্যি তোমাকেই পোহাতে হবে, এক রাতে দুই ঘরে শোয়া সোজা কথা নয়। বলতে বলতে মানুষটা এমন অশ্লীল হাসে যে শাহিনার কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে।

যত অসুবিধার কথা ওঠে সব আতিক একের পর এক হেসে উড়িয়ে দেয়। রান্নাঘর এতো ছোট যে নড়াচড়া করা যায় না–আতিকের সে ব্যাপারে জবাব, তুমিতো রান্নাঘরে লাফঝাপ করতে যাচ্ছে না। বসে বসে শুধু রান্না করবে। তাতে আর অসুবিধা কী?

শাহিনীর গোছগাছে ঝামেলা পোহাতে পোহাতে বেশ ক্লান্তি লাগে। স্বামীর অমন ফাজলামি তার ভাল লাগে না।

মেয়ে যখন বাপকে জিজ্ঞেস করে, আব্দু আমি স্কুলে কবে যাবো? তো বাপের জবাব, তোমার স্কুল তিন মাস ছুটি, এখন তুমি মায়ের কাছে বাসায় পড়ো, তিন মাস পর তুমি নতুন স্কুলে যাবে।

বাপের কথা শুনে মেয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকালে মা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকায়।

মনের ক্লান্তি শরীরেও ছড়ায় সম্ভবত। ক্লান্তি আর আলস্যে শরীর শিথিল হয়ে থাকে।

এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন বিকেলে সাবিদ আলী বইয়ের দুটো বড় বড় প্যাকেট নিয়ে হাজির।

আতিক বাসায় ছিল। সে অতিথিকে খাতির করে বসাল। শাহিনাকেও ডেকে সামনে আনল। সাবিদ আলীর গলায় অনুযোগ-অভিযোগ দুইই শোনা যায়। সে বলে, ভাইজান, এভাবে হঠাৎ করে আপনার চলে আসা উচিত হয় নি, বুজি-দুলাভাই দু’জনেই খুব কষ্ট পেয়েছেন। অসুবিধা কী হচ্ছিল বলতে পারতেন, দুলাভাই বুজি দুজনেই আপনাদের কথা খুব বলেন। ভাবী, আপনি কিন্তু যানে, বুজি আপনাকে যেতে বলেছেন।

বলতে বলতে সাবিদ আলী বইয়ের প্যাকেট দুটো দেখায়। বলে, বইগুলো কেন রেখে এসেছিলেন? আমার তো এখন আর লাগবে না। ভাবী, পরীক্ষাটা কিন্তু আপনি দেবেন, পরীক্ষা দিলেই আপনি পাস করবেন, আমি সিওর।

বেশ খাতির যত্ন করেই সাবিদ আলীকে বিদায় দেয় আতিকুল ইসলাম। তার অতিথি বিদায় হলে বইয়ের প্যাকেট দুটো দেখিয়ে বউকে বলে, তুমি দেখছি সম্পর্কটা ছাড়তে পারছে না।

ঐ কথা শুনে শাহিনা মুখোমুখি তাকালেও আতিক থামে না। বলে, না হলে ছোঁড়া ঠিকানা জানল কার কাছ থেকে? বলো? আমার তো মনে হচ্ছে এ বাসাটাও ছাড়তে হবে।

শাহিনার ভাল লাগে না স্বামীর অমন নোংরা আর বাজে ইঙ্গিত রা কথা শুনতে। সে কোনো কথা না বলে স্বামীর সামনে থেকে সরে আসে।

পরের দিন যখন দুপুরে সে একাকি বিছানায় শুয়ে, তখন হঠাৎ তার স্মরণ হয় কয়েক বছর আগে ঠিক এমনই ক্লান্ত লাগতো নিজেকে, যখন সামিনা পেটে এসেছিল। সে মনে মনে দশমাসের হিসেব করে। আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনের ভেতরে খুশি ছলকে ওঠে, তাহলে ফের সে মা হতে যাচ্ছে। মনের খুশিতে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে সে। তারপর মেয়েকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে তাকে খুব আদর করে চুমু খায় আর মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, এবার কী? ছেলে না মেয়ে? মনের ভেতর থেকে উঠে আসা জবাবটাই সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে, হ্যাঁ, এবার ছেলে আমার এবার ছেলে হবে।

বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে আতিক খানিক অবাক হয়। বউকে অহেতুক লাজুক আর হাসিখুশি দেখতে পায়। লক্ষ করে, বউ কেমন যেন গায়ে গায়ে লেগে থাকতে চায়। অমন আদিখ্যেতা কেন সে বুঝতে পারে না, খানিক ধাঁধা লাগে তার।

শেষে একসময় শাহিনা খবরটা জানায়। বলে, এই শোনো, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো, আমি বোধহয় প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছি।

খটা শুনে একটু যেন হাসে আতিকুল ইসলাম প্রধান বি.এসসি.। তারপর মাথা দুলিয়ে বলে, আমিও তাই ভেবেছিলাম। ছোঁড়া কেন এসেছিল সেদিন?

তোমাকে দেখতে তাই না? তুমিই ওকে খবর দিয়েছিলে, ঠিক না?

শাহিনার নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না। এ কী শুনছে সে! পাথরের মতো স্থির হয়ে যায় তার শরীর। চোখের পলক পর্যন্ত পড়ে না।

আর ঐ মুহূর্তে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বউয়ের মুখোমুখি তাকায় আতিকুল ইসলাম প্রধান বি.এসসি। তারপর জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা একটা কথা তুমি সত্য করে বলো তো? তোমার পেট থেকে যে বাচ্চাটা বের হবে সেটা কার? শাহিনার চোখের সামনে দুনিয়া ওলটপালট করে। নিজের মন তাকে ধিক্কার দেয় বলে, মর তুই। মরে যা এক্ষুণি! তার দুই চোখ জ্বালা করে, বমি বমি লাগে, কিন্তু তারপরও সে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়েই থাকে। কাঁদে না সে, রাগে-অপমানে চিৎকার করে না, এমন একটা নোংরা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য ভাষাও সে খুঁজে পায় না। নির্বোধ নির্বাক পাথরের মূর্তির মতো স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi