Saturday, April 4, 2026
Homeথ্রিলার গল্পভৌতিক গল্পজ্যোৎস্নারাতে আপদ-বিপদ - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

জ্যোৎস্নারাতে আপদ-বিপদ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ছোটমামার সঙ্গে পাশের গ্রামে যাত্রা শুনতে গিয়েছিলুম। যাত্রার আসর যখন হোভাঙল তখন অনেক রাত। ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। ছোটমামা বললেন, এত রাতে আর বাস পাওয়া যাবে না। আয়, বরং হাঁটাপথে শর্টকাট করি।

পিচের রাস্তা থেকে ছোটমামার পিছন পিছন মাঠে নেমে বললুম,–পথ কোথায় ছোটমামা? আপনি যে হাঁটাপথ বলছেন?

ছোটমামা সবে গুনগুন করে কী গান ধরেছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন,–দিলি তো মুডটা নষ্ট করে! হাঁটাপথ বুঝিসনে? যেখান দিয়ে তুই হাঁটবি, সেটাই হাঁটাপথ। চুপচাপ চলে আয়।

নির্জন মাঠে হু হু করে বাতাস বইছে। এদিকে-ওদিকে দু-একটা গাছ কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শনশন শব্দে ডালপালা দুলছে। ছোটমামার গানের মুডটা ফিরে এসেছে। এবার গলা ছেড়ে গান ধরেছেন। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সুরটা চেনা ঠেকছিল। ছোটমামা তাহলে যাত্রার আসরে শোনা বিবেকের গানই গাইছেন। একটু পরে আমরা একটা দিঘির পাড়ে পৌঁছলুম! অনেকগুলো তালগাছ সেখানে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাতাগুলো অদ্ভুত শব্দে নড়ছে। হঠাৎ কে ধমক দিয়ে বলে উঠল, কী হে ছোকরা, আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে?

কেমন খ্যানখেনে গলার স্বর। ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, অদ্ভুত তো! ঘর ছেড়ে দিঘির পাড়ে ঘুমোতে এসেছ। কে হে তুমি?

–আবার তুমি বলা হচ্ছে? ভারি বেয়াদপ ছোকরা দেখছি।

ছোটমামা একটু ভড়কে গিয়ে বললেন, আপনি কোথায় ঘুমোচ্ছেন?

–তালগাছের ডগায়।

এতক্ষণে টের পেলুম, সামনে একটা তালগাছের মাথা থেকে কেউ কথা বলছে। ছোটমামা হাসতে-হাসতে বললেন, তালগাছের ডগা কি ঘুমোনোর জায়গা? ঘুম পেলে বাড়ি গিয়ে ঘুমোন।

–এটাই তো আমার বাড়ি।

–তার মানে?

–মানে আবার কী? যাও, বিরক্ত কোরো না। আবার বড্ড ঘুম পাচ্ছে।

বিকট হাই তোলার শব্দ শোনা গেল। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ছোটমামা গোঁ ধরে বললেন,-এর একটা এসপার-ওসপার না করে যাব না। তালগাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে বলে তো শুনিনি। গাছের তলায় অবশ্যি অনেক মানুষকে ঘুমোতে দেখেছি। ও মশাই, শুনছেন?

–জ্বালাতন! শোনো হে ছোকরা, এখনই কেটে না পড়লে বিপদ হবে বলে দিচ্ছি।

ছোটমামার হাত ধরে টেনে বললুম,–আমার বড্ড ভয় করছে। চলুন ছোটমামা।

ছোটমামা রেগে গিয়ে বললেন,–তুই বড্ড ভিতু ছেলে দেখছি। ব্যাপারটা তোর গোলমেলে মনে হচ্ছে না? তালগাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে! লোকটা নিশ্চয় চোর। পুলিশের ভয়ে ওখানে লুকিয়ে আছে।

এবার ওপর থেকে হুঙ্কার শোনা গেল, কী বললে! কী বললে? আমি চোর? আমি পুলিশের দারোগা বংকুবিহারী ধাড়া। আমাকে চোর বলা হচ্ছে? রোসো, দেখাচ্ছি মজা।

তালগাছের ডগায় পাতাগুলো প্রচণ্ড নড়তে লাগল। এবার ছোটমামা হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন। চাপাস্বরে বললেন, দরকার হলে দৌডুতে হবে। রেডি হয়ে থাক।

দৌড়নোর দরকার হল না। বংকুবিহারী পাড়ার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না আর। কিছুটা চলার পর ছোটমামা বললেন,-ব্যাপারটা বড় রহস্যজনক। বুঝলি পুঁটু? আমার ধারণা, দারোগাবাবু কোনও চোরকে ধরার জন্যে ওখানে লুকিয়ে আছেন।

ছোটমামার কথা শেষ হওয়ামাত্র কে চাপাস্বরে বলে উঠল,–কোথায় লুকিয়ে আছেন দারোগাবাবু?

চমকে উঠে দেখি, সামনে একটু তফাতে কেউ সদ্য উঠে দাঁড়াল। জ্যোৎস্নায় চেহারাটা আবছা কালো। ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন,–কে, কে?

–আজ্ঞে আমি।

–আমি মানে কী? তোমার নাম?

–নাম শুনে কী হবে? দারোগাবাবু কোথায় লুকিয়ে আছেন বলুন।

ছোটমামা কিছু বলার আগে আমি বলে দিলুম,–দিঘির পাড়ে একটা তালগাছের ডগায়।

অমনি ছায়া কালো লোকটা বলে উঠল, ওরে বাবা! আমি তো ওখানেই ঘুমোতে যাচ্ছিলুম। সর্বনাশ!

বলেই সে উধাও হয়ে গেল। ছোটমামা হেসে ফেললেন,–এই লোকটাই চোর। বুঝলি তো পুঁটু? একে ধরার জন্যই দারোগাবাবু ওখানে ওত পেতেছেন।

বললুম,–কিন্তু উনি তো ঘুমোচ্ছেন বললেন! নিজের বাড়িও বললেন!

–ধুর বোকা! পুলিশের কথা ওইরকমই। আসল কথাটা বললে চলে? চোর সাবধান হয়ে যাবে না?

–কিন্তু শেষপর্যন্ত চোর সাবধান হয়ে গেল তো!

ছোটমামা গুম হয়ে বললেন, আমার কী দোষ? চোর যে এখানে লুকিয়ে আছে, জানতুম নাকি?

আবার দুজনে হাঁটতে থাকলুম। ছোটমামার গানের মুডটা চলে গেছে মনে হচ্ছিল। চুপচাপ হাঁটছেন আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। বরাবর দেখেছি, ছোটমামার সঙ্গে রাতবিরেতে বেরোলে বড্ড গোলমেলে কাণ্ড হয়। আমার গা ছমছম করছিল। ছোটমামাকে এদিক-ওদিক তাকাতে এবং কখনও হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে কান ধরে কিছু শুনতে দেখছিলুম। তারপর বললেন,–শোন পুটু! কথাটা মনে আছে তো? দরকার হলে দৌড়নোর জন্য রেডি থাকতে হবে।

ভয়ে ভয়ে বললুম, আবার দৌড়তে হবে কেন ছোটমামা?

–কিছু বলা যায় না! সামনে কালোমতো যে গাছটা দেখছিস, ওটা জটাবাবার থান। একবার এমনি রাত্তিরে জটাবাবার পাল্লায় পড়েছিলুম। ওঃ! সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড।

আরও ভয় পেয়ে বললুম,-তাহলে ওখান দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না ছোটমামা।

ছোটমামা পা বাড়িয়ে বললেন, আয় না দেখি কী হয়। সেবার আমি একা ছিলুম। এবার দুজনে আছি। জটাবাবা আমাদের ঘাঁটাতে সাহস পাবে না!

–জটাবাবা কে ছোটমামা?

–একটা বুড়োমতো লোক। মাথায় প্রচুর জটা।

–সে ওখানে কী করে?

–বললুম না ওখানে ওর থান আছে? দিনের বেলা লোকেরা এসে ওখানে মানত করে। ঢাকঢোল বাজিয়ে জটাবাবার পুজোও দেয়। তবে দিনের বেলা জটাবাবা কাকেও দেখা দেয় না।

–দিনের বেলা জটাবাবা কোথায় থাকে?

ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, চুপচাপ আয় তো, জটাবাবা শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি।

গাছটা প্রকাণ্ড। তলায় ঘন ছায়া। বাতাসে ডালপালা কেমন অদ্ভুত শব্দ করছিল। ছোটমামা আবার একটুখানি দাঁড়িয়ে গাছটাকে দেখে নিলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, রেডি স্টেডি, গো-ও।

ছোটমামার পিছন পিছন গাছটার তলায় যেই গেছি, আমার মাথায় কী একটা ঠেকল। চমকে উঠে হাত তুলে দেখি, একটা পা। বারণ ভুলে চেঁচিয়ে উঠলুম, ছোটমামা! ছোটমামা!

–ধ্যাত্তেরি! চ্যাঁচিচ্ছিস কেন? বললুম চুপচাপ চলে আয়।

–একটা পা বড় ঠান্ডা, ছোটমামা!

–চলে আয় না হতভাগা!

আমাকে যেতে দিচ্ছে না যে?—কাঁদ-কাঁদ হয়ে বললুম। বরফের মতো ঠান্ডা একটা পা আমার গলা আঁকড়ে ধরে আছে। দু-হাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলুম। দম আটকে যাচ্ছিল।

ছোটমামা কাছে এসে বললেন, কই, কোথায় পা?

–আমার গলায়।

ছোটমামা সেই ঠান্ডা ঝুলন্ত পা ধরে টানাটানি শুরু করলেন। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। খুব জোরে পায়ে চিমটি কেটে দিলুম। অমনি পা টা গলা থেকে সড়ে গেল আর কে ওপর থেকে আর্তনাদ করে উঠল, উচ্ছ। গেছি, গেছি! কী বিষ্টু ছেলে রে বাবা!

আমিও সাহস পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম,–ছোটমামা! টানুন! দুজনে টেনে নামাই জটাবাবাকে।

ছোটমামাও ততক্ষণে সাহসী হয়ে উঠেছেন। দুজনে ঠান্ডা পা ধরে টানতে থাকলুম। জটাবাবা ঠ্যাং ঝুলিয়ে ডালে বসে থাকার বিপদ টের পেল এতক্ষণে। কাকুতিমিনতি করে বলতে থাকল,–ঘাট হয়েছে বাবারা! ছেড়ে দে! উঁহুহুহ, বড্ড ব্যথা করছে রে!

ছোটমামা পা ছেড়ে দিলেন। আমিও ছেড়ে দিলাম। তারপর ছোটমামা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, কী জটাবাবা! সেবার তো আমাকে একা পেয়ে খুব ভয় দেখিয়েছিলে? এবার আর ভয় পাচ্ছি না। কই নেমে এসো। দেখি তোমার কত বুজরুকি?

গাছের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে। ওপরের ডালে জটাবাবাকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। পায়ে হাত বুলিয়ে আহা-উঁহু করছে। মাথার প্রকাণ্ড জটা পুঁটুলির মতো দেখাচ্ছে। ছোটমামার চ্যালেঞ্জ শুনে কোনও জবাব দিল না! চিমটিটা খুব জোর হয়ে গেছে–তাহলে।

বললুম,–আমার ঘুম পাচ্ছে। চলুন ছোটমামা!

ছোটমামা বীরদর্পে হাঁটতে থাকলেন। বললেন,–তোর বুদ্ধি আছে পুঁটু! খুব জব্দ হয়ে গেছে জটাবাবা।

–জটাবাবার পা অত ঠান্ডা কেন ছোটমামা?

–ঠান্ডা হবে না? জটাবাবাকে তুই জ্যান্ত মানুষ ভেবেছিস নাকি?

চমকে উঠে বললুম, জ্যান্ত মানুষ নয়? তা হলে কী?

ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, বাড়ি ফিরে বলবখন। রাত-বিরেতে নিরিবিলি জায়গায় ওসব কথা বলতে নেই।

এবার ছোটমামার মনে সাহস জেগেছে। তাই যাত্রদলের বিবেকের সেই গানটা গাইতে শুরু করলেন। কিছুটা চলার পর হঠাৎ গান থামিয়ে বললেন, ভুল হয়ে গেছে। বুঝলি পুঁটু?

–কী ভুল ছোটমামা?

ডান দিকে আঙুল তুলে ছোটমামা বললেন, ভুল করে কঙ্কালিতলায় ঝিলের ধারে এসে পড়েছি। এখানে কোথায় একটা শ্মশান আছে যেন। বড় বিপদে পড়া গেল দেখছি।

একটু ভেবে নিয়ে ঝিলের ধারে ধারে হাঁটতে শুরু করলেন। ঝিলের জল জ্যোৎস্নায় ঝিকমিক করছে। ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কিছুটা চলার পর কারা কথা বলছে শোনা গেল। ছোটমামা বললেন,–মনে হচ্ছে, জেলেরা ঝিলে মাছ ধরতে এসেছে। আয় তো! ওদের কাছে রাস্তাটা জেনে নিই।

ঝোঁপঝাড়ের পর একটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে একটা ঝুপসিকালো গাছ। তার তলায় কারা বসে চাপাস্বরে কথাবার্তা বলছে! কিন্তু যেই আমরা সেখানে গেছি, লোকগুলো, ওরে বাবা! এরা আবার কারাবলে চ্যাঁচিমেচি করে দৌড়ে উধাও হয়ে গেল।

ছোটমামা বললেন,-যা বাব্বা! আমাদের দেখে ওরা ভয় পেল কেন? আমরা মানুষ না ভূ-ভূত?

গাছটার তলায় গিয়ে দেখি, কে খাঁটিয়ায় শুয়ে আছে। ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন,–সর্বনাশ! এখানেই তো তাহলে কঙ্কালিতলার শ্মশান। ওরা একটা মড়া পোড়াতে এসেছিল।

মড়াটা দেখে গা ছমছম করছিল। গলা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে। জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোটমামা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে পা বাড়িয়েছেন, সেই সময় খাঁটিয়া থেকে মড়াটা বলে উঠল,–চিতা সাজানো হয়েছে?

ছোটমামা বললেন, ওরে বাবা। এ যে দেখছি জ্যান্ত মড়া! পালিয়ে আয় পুঁটু!

মড়াটা তড়াক করে উঠে বসে বলল,–পালিয়ে যাবেন না, পালিয়ে যাবেন! একা থাকতে আমার বড্ড ভয় করবে।

পুঁটু! রেডি স্টেডি গো! বলে ছোটমামা দৌড়তে শুরু করলেন।

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছোটমামার পিছনে ছুটতে থাকলুম। কিন্তু বড় বিচ্ছিরি ঝোঁপঝাড়। কোথাও চষা খেতের মাটি গাদা হয়ে আছে! তার ওপর দৌড়নো কঠিন। বারতিনেক আছাড় খেলুম। ছোটমামা একবার থেমে পিছনে তাকিয়ে বললেন, সর্বনাশ! মড়াটা ছুটে আসছে যে!

মড়াটার আর্তনাদ শুনতে পেলুম, দাদা! আমাকে ফেলে যাবেন না!

আবার আমাদের দৌড়নো শুরু হল। এবার এসে পৌঁছলুম গাছপালা ঘেরা একটা বাড়ির কাছে! ছোটমামা বললেন, আবার ভুল হয়ে গেছে রে পুঁটু! অন্য একটা গ্রামে চলে এসেছি মনে হচ্ছে। আয় তো এদের ডাকি!

কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর দরজা খুলে কে একজন বলল, কাকে চাই?

ছোটমামা বললেন,–দেখুন, আমরা বড় বিপদে পড়েছি। তাই…

–বিপদটা কী আগে শুনি?

–কঙ্কালিতলার শ্মশানের ওখানে একটা মড়া ছিল। হঠাৎ সে…

লোকটা ঝটপট বলল,–থাকারই কথা। আমাদের ছোটকর্তার মড়া। তা এখনও চিতেয় ওঠেননি বুঝি?

ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, আমাদের ফলো করে আসছিলেন ভদ্রলোক। বলছিলেন শ্মশানে ওঁর একা থাকতে বড্ড ভয় করবে।

–মলোচ্ছাই! আমাদের লোকগুলো কোথায় গেল? তারা ছিল না?

–ছিল তো! হঠাৎ ওখানে দেখে ওরা কেন যে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল!

লোকটা খি-খি করে হেসে বলল,–তা ভয় পাওয়ারই কথা। রাতবিরেতে কাকেও চেনা কঠিন। এই তো আপনাদের দেখেও আমি দিব্যি ভয় পাচ্ছি।

ছোটমামা জোরে হাত নেড়ে বললেন,–আমরা মানুষ! মানুষ! আমাদের ভয় পাবেন কেন?

–কিছু বলা যায় না মশাই! দিনকাল যা পড়েছে। কে জানে কে কোন রূপ ধরে ঘোরে।

ছোটমামা তার দিকে এক পা এগিয়ে বললেন, আপনি আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখুন। আমরা মানুষ। এই ছেলেটা আমার ভাগ্নে। আমি ওর মামা। আমরা যাত্রা দেখে বাড়ি ফিরছিলাম। রাস্তা ভুল করে এই অবস্থা। এই নিন, আমার হাতটা ঠান্ডা না গরম দেখুন। আমরা ভূত হলে হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হবে।

ছোটমামা হাত বাড়িয়ে আর এক পা এগোতেই লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, হাত সরান! হাত সরান। ওরে বাবা! হাত বাড়িয়ে ঘাড়টি ধরে মটকাবার মতলব? বড়কর্তা? বড়কা! একবার আসুন তো!

হেঁড়ে গলায় বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বলল, কী হল রে ভূতু?

লোকটা বলল,-কারা এসে গণ্ডগোল বাধাচ্ছে।

–দরজা বন্ধ করে দে।

আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ছোটমামা বললেন,–কোনও মানে হয়?

বললুম, চলুন ছোটমামা! অন্য কোনও বাড়ির লোক ডেকে জিগ্যেস করে নিই।

দুজনে হাঁটতে থাকলুম। আশেপাশের আর কোনও বাড়ি নেই। ঝোঁপজঙ্গলে আর উঁচু-নিচু সব গাছ বাতাসে দুলছে। একটু পরে আর একটা বাড়ি দেখতে পেলুম। ছোটমামার ডাকাডাকিতে বাড়ির ভেতর থেকে কে ঘুমজড়ানো গলার সাড়া দিল, কী হয়েছে?

ছোটমামা বললেন, দয়া করে একটু বাইরে আসবেন?

–না বাইরে যাওয়ার সময় নেই। আমি ঘুমুচ্ছি।

ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন,–কোথায় ঘুমুচ্ছেন? এই তো দিব্যি কথা বলছেন।

–ঘুমুতে-ঘুমুতে কথা বলা আমার অভ্যাস।

–কী অদ্ভুত! আচ্ছা, ঠিক আছে। ঘুমুতে-ঘুমুতে বলুন, আমরা কনকপুর যাব কোন রাস্তায়?

–কনকপুর? সে আবার কোথায়?

–কনকপুর চেনেন না? বাসরাস্তার ধারে অত বড় গ্রাম।

–বাসরাস্তার ধারে তো কত বড়-বড় গ্রাম আছে।

ছোটমামা হতাশ ভঙ্গিতে বললেন,–ভারি বিপদে পড়া গেল দেখছি। আচ্ছা, এ গ্রামের নাম কী?

জবাব এল তেমনি ঘুমজড়ানো গলায়, নাম একটা ছিল যেন। মনে পড়ছে না।

ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন, আপনি দেখছি ভারি অদ্ভুত লোক। নাম ছিল মানে কী!

এবার জোরালো নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল। ছোটমামা খুব রেগে গেছেন। দরজায় দমাদ্দম লাথি মারতে শুরু করলেন। কপাট ভেঙে পড়ল মড়মড় করে। আমার ভয় করছিল ছোটমামার কাণ্ড দেখে। পাশের বাড়ির লোকেরা জেগে গিয়ে হইচই বাধায় যদি? রাতদুপুরে কারও বাড়ির দরজা ভেঙে ঢোকা কি ঠিক হচ্ছে?

কিন্তু ছোটমামা একেবারে মরিয়া। ভেতরে পা বাড়িয়ে বললেন,–আয় পুঁটু! লোকটাকে ঘুম থেকে জাগানো দরকার। ঘুমের ঘোরে মাথামুণ্ডু কী সব বলছে।

ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখলুম, একটা লোক উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার নাক ডাকছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমুতে পারে মানুষ? উঠোনে সাদা হয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে। লোকটার নাক থেকে ঘড়র-ঘড়র শব্দ হচ্ছে। ছোটমামা তার গায়ে ধাক্কা দিয়েই পিছিয়ে এলেন। বললুম, কী হল ছোটমামা?

ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না, পুঁটু। লোকটার গা বরফের মতো ঠান্ডা!

আঁতকে উঠে বললুম,–চলে আসুন ছোটমামা!

ছোটমামা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে রে। বরং এক কাজ করি আয়। ওই বারান্দায় দুজনে শুয়ে পড়ি। ভোরবেলা নিশ্চয় মানুষজনের দেখা পাব। তখন জিগ্যেস করে নেব।

উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ঘুমন্ত লোক, যার গা নাকি বরফের মতো ঠান্ডা এবং এই বাড়িটাও তার। এখানে ঘুমননা কি ঠিক হবে? কিন্তু ছোটমামা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বারান্দায়। তারপর চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন। আমারও খুব ঘুম পাচ্ছিল। শুয়ে পড়লুম শানবাঁধানো বারান্দায়। দুজনেই ক্লান্ত।

তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।

ঘুম ভাঙল ছোটমামার ডাকাডাকিতে। চোখ খুলে উঠে বসলুম। তারপর খুব অবাক হয়ে গেলুম। এ কোথায় শুয়েছিলুম আমরা? ভোরের আলোয় সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা বটগাছের তলায় শুকনো ন্যাড়া মাটিতে মামা-ভাগ্নে খুব ঘুমিয়েছি। কোথাও ঘরবাড়ির চিহ্ন নেই। শুধু জঙ্গল।

ছোটমামা বললেন,–হাঁ করে কী দেখছিস? রাতবিরেতে বেরুলে একটু গণ্ডগোল হয়েই থাকে। চল, বাড়ি ফিরি।

হাঁটতে-হাঁটতে বললুম,–রাস্তা চিনতে পারবেন তো ছোটমামা?

ছোটমামা করুণ হেসে বললেন,–দিনের বেলা আর ভুল হবে না। আমরা কোথায় চলে এসেছিলুম জানিস? কঙ্কালিতলার জঙ্গলে। প্রবলেম হল। রাতবিরেতে কিছু চেনা যায় না। চেনা জায়গাও অচেনা হয়ে যায়।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor