Friday, April 3, 2026
Homeবাণী ও কথাজলকন্যা - হুমায়ূন আহমেদ

জলকন্যা – হুমায়ূন আহমেদ

জলকন্যা – হুমায়ূন আহমেদ

রাত আটটার দিকে বীনুর মনে হল সে একটা ভুল করেছে। ছোটখাটো ভুল না, বড় ধরনের ভুল–-মনিকার জন্মদিনে তার আসা ঠিক হয়নি। মনিকা তার এমন কেউ না যে তার জন্মদিনে আসতেই হবে। তাছাড়া মনিকা তাকে সেভাবে দাওয়াতও করেনি। ভদ্রতা করে বলেছে। মনিকা তার জন্মদিনের কথা নীতুকে বলছিল, সেই সময় বীনুর দিকে তাকিয়ে বলল, বীনু তুমিও এসো। বীনু তৎক্ষণাৎ হ্যাংলার মত বলেছে—আচ্ছা। এটা যে নিতান্তই কথার কথা তাও বুঝেনি।

মনিকা বলেছে, পার্টিতে যারা আসবে তাদের কিন্তু সারারাত থাকতে হবে। সারারাত আমরা হৈ চৈ করব। তোমার কোন অসুবিধা হবে না তো?

বীনু বলল, না, অসুবিধা হবে না।

অথচ তার ভয়ঙ্কর অসুবিধা হবে। তাদের বাসা এরকম না যে ঊনিশ বছর বয়েসী মেয়েকে রাতে অন্য বাড়িতে থাকতে দেবে। তার নামে বাসায় কোন চিঠিপত্র এলে তার হাতে দেয়া হয় না, আগে বীনুর মা মনোয়ারা খুলে পড়েন। পড়ার পর যদি মনে হয় সাধারণ চিঠি তবেই তার হাতে দেয়া হয়। সাধারণ চিঠিতেও সমস্যা আছে। তার এক বান্ধবী সুরমা, ক্লাস টেনে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, সে তার স্বামীর সঙ্গে চলে গিয়েছিল সেতাবগঞ্জ নামের একটা জায়গায়। সেখান থেকে সে মাসে দু’টা তিনটা করে চিঠি লিখতো। মনোয়ারা একদিন বললেন, মেয়েটা এত চিঠি লেখে কেন? ঘন ঘন চিঠি লেখার দরকার কি?

বীনু অবাক হয়ে বলল, চিঠি লিখলে অসুবিধা কি মা?

মনোয়ারা থমথমে গলায় বললেন, অসুবিধা আছে, তোর বাবা রাগ হয়। বাবা রাগ হয়–এর উপর কথা চলে না। বীনুদের সংসার তার বাবা ইদ্রিস আলির চোখের ইশারায় চলে। ইদ্রিস আলি ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। রোগা পটকা মানুষ, থুতনীতে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশটার মত দাড়ি আছে। নিতান্তই সাধারণ চেহারার একজন মানুষ। অথচ সেই সাধারণ চেহারার মানুষের চোখের ইশারার বাইরে যাবার সাহস কারো নেই। বীনুর ছোট ভাই জহির কলেজে ভর্তি হবার পর একবার সাহস দেখালো, বাসায় ফিরল রাত সাড়ে এগারোটায়। তার এক বন্ধুর বাসায় নাকি দাওয়াত ছিল। বাসায় ফিরেই সে নিজের ঘরে ঢুকে তাড়াহুড়া করে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। তখন ইদ্রিস সাহেব ছেলের ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালালেন। কোমল গলায় বললেন, জহির ওঠ (ইদ্রিস সাহেবের গলার স্বর খুবই কোমল)। জহির ধড়মড় করে উঠে বসলো। জহির সাহেব বললেন, কোথায় ছিলি?

বন্ধুর বাসায় দাওয়াত ছিল।

খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করেছিস?

জ্বি।

কি খাওয়ালো?

পোলাও আর খাসির রেজালা।

বোরহানি ছিল না?

জ্বি না।

গরমের মধ্যে বোরহানি দেয়া তো উচিত ছিল। রিচ ফুড বোরহানি ছাড়া হজম হবার কথা না। খাওয়া-দাওয়ার পর মিষ্টি পান খাস নাই?

জ্বি খেয়েছি।

সিগারেট খাস নাই? মিষ্টি পানের সাথে তো সবাই সিগারেট খায়। তুই খাস নাই?

জ্বি না।

আমিতো গন্ধ পাচ্ছি। দেখি হা করতো, বড় করে হা কর। আরো বড়। এখন নিঃশ্বাস ফেল।

জহির নিঃশ্বাস ফেলল এবং কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আর কোনদিন খাব না বাবা। ইদ্রিস সাহেব মধুর গলায় বললেন–খাবি না কেন, অবশ্যই খাবি। বন্ধুবান্ধব আগ্রহ করে দেয়, না খেলে ওরা মনে কষ্ট পাবে। কারো মনে কষ্ট দেয়া ঠিক না। আচ্ছা এখন নাম বিছানা থেকে।

জহির বিছানা থেকে কাঁপতে কাঁপতে নামলো।

সার্ট গায়ে দে।

জহির সার্ট গায়ে দিল।

ইদ্রিস সাহেব বললেন, যা এখন বাসা থেকে চলে যা। তোকে আর পুষব না। তুই আমাকে বাপ ডাকবি তার জন্যে তোকে পোষার দরকার দেখি না। ঢাকা শহরে শত শত লোক আছে যাদের তিনবেলা ভাত খাওয়ালে খুশি মনে আমাকে বাপ ডাকবে।

.

জহিরকে অবশ্যই সে রাতে বাসা ছাড়তে হত যদি না ইদ্রিস সাহেবের মা ভাগ্যক্রমে বাসায় থাকতেন। এই ভদ্রমহিলার বয়স সত্তরের উপর। চোখে দেখতে পান না। কিন্তু কান খুব পরিষ্কার। হাঁটা চলা করতে পারেন। হৈ চৈ শুনে তিনি দেয়াল ধরে ধরে বের হয়ে এলেন এবং তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, আবু কি হইছে?

ইদ্রিস সাহেব বললেন, কিছু না মা, ঘুমান।

বাসাত থাইক্যা কারে বাইর করতাছস?

আম্মা আপনে ঘুমান।

আমি জীবিত থাকতে তুই আমার নাতিরে রাস্তায় বাইর কইরা দিবি, তোর সাহসতো কম না। সাহস বেশি হইছে?

কাউরে বাইর করতেছি না।

এইটা ভাল কথা।

থুরথুরি বুড়ি বিছানায় শুতে গেলেন। তবে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাক্ষণই কথা বলতে লাগলেন–সিগারেট খাইছে তো কি হইছে? তার বয়সে তুই বিড়ি খাইচস। নিজের বাপের মাইর তোর মনে নাই। বাপগিরি ফলাস। অত বাপগিরি ভাল না।

.

বীনুর ভরসা তার দাদীজান। দাদীজান এখন তাদের বাসায় আছেন। তিনি পালা করে তার চার ছেলের বাসায় তিন মাস করে থাকেন। রোজার ঈদ পর্যন্ত বীনুদের সঙ্গে থাকার তারিখ পড়েছে। দাদীজানকে দিয়ে বাবার অনুমতি বের করে নেয়া খুব সমস্যা হবে না বলেই বীনুর ধারণা। বীনুর খুব শখ মনিকার সঙ্গে একটা রাত কাটায়। এত সুন্দর একটা মেয়ে আর এত বড়লোক। ওদের বাড়িটাও নিশ্চয়ই দেখার মত হবে। বীণুর ক্ষীণ আশা একটা রাত থাকলে মনিকার সঙ্গে তার ভাব হতে পারে। এরকম। একটা মেয়ের সঙ্গে ভাব হওয়াও ভাগ্যের কথা। মনিকা যাদের সঙ্গে ঘুরে বীনু দূর থেকে তাদের দেখে, তাদের চালচলন কথাবার্তা সবই অন্য রকম। সেদিন মনিকারা চারজন (ওরা চারজন সব সময় এক সঙ্গে থাকে। সেই জন্যে ওদের নাম হয়েছে চতুর্ভুজ)। ওয়াদুদ স্যারের ঘরে ঢুকে পড়ল। মনিকা তখন স্যারের রুমে। সে গেছে তার। পার্সেন্টেজ দিতে। দেরিতে ক্লাসে এসেছিল বলে পার্সেন্টেজ দিতে পারেনি।

ওয়াদুদ স্যার বললেন, কি ব্যাপার, চতুর্ভুজ এক সঙ্গে? মনিকা হাসি মুখে বলল, আপনি স্যার কফি বানিয়ে খান। রোজ এত সুন্দর গন্ধ পাই। আজ আমাদের কফি খাওয়াতে হবে।

বেশতো, কফি খাও।

ওয়াদুদ স্যার বেয়ারাকে কফি বানাতে বললেন। বীনু মুগ্ধ হয়ে গেল মেয়ে চারটার সাহস দেখে।

আরেকবার বীনু সাবসিডিয়ারী ক্লাসের শেষে বেরুচ্ছে। একটা বদ ছেলে ভিড়ের অজুহাতের সুযোগে বীনুর বুকে হাত দিল। বীনু লজ্জা এবং ভয়ে প্রায় জমে গেল। মনিকা ছিল তার পেছনে। সে ছেলেটার সার্ট খামছে ধরে বলল, তুমি ওর গায়ে হাত দিলে কেন? চারদিকে ভিড় জমে গেল। বীনু প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কেউ আমার গায়ে হাত দেয়নি। মনিকা, ওকে ছেড়ে দাও।

মনিকা শীতল চোখে কিছুক্ষণ বীনুর দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটাকে ছেড়ে দিল। মনে মনে সে নিশ্চয়ই বীনুর মুখে থু থু দিয়েছে। বীনুর দিকে তাকাতেও নিশ্চয়ই তার

ঘেন্না করছিল। করাটা স্বাভাবিক। বীনু যদি তার অবস্থাটা ব্যাখ্যা করতে পারতো তাহলে হয়তো মনিকা তাকে এতটা ঘৃণা করতো না। তাদের বাসা অন্য সব বাসার মত না। তার বাবা-মা অন্য সব বাবা-মা’র মত না। তারা আলাদা। কি রকম যে আলাদা তা মনিকা বা মনিকার মত বান্ধবীরা জানে না।

.

বীনু যখন কলেজে পড়ে তখন হঠাৎ দেখা গেল একটা ছেলে প্রায়ই তাদের বাসার। সামনে হাটাহাটি করে। জানালার দিকে তাকিয়ে সিগারেট ফুকে। বীনু ব্যাপারটা শুরুতে লক্ষ্যই করেনি। লক্ষ্য করলেন বীনুর মা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বীনুর বাবাকে জানালেন। ইদ্রিস আলী ঐ ছেলেকে কিছু বললেন না। তিনি ঝিম ধরে সারা দুপুর বসে রইলেন (অফিসে গেলেন না, অফিস কামাই করলেন)। মাগরেবের নামাজের পর মিষ্টি গলায় ডাকলেন–বীনু কইরে?

বীনু সামনে এসে দাঁড়াল।

বাসার সামনে ঘুরাঘুরি করে ছেলেটা কে?

বীনু অবাক এবং খানিকটা ভীত গলায় বলল, কোন ছেলে?

ইদ্রিস সাহেব আরো শান্ত গলায় বললেন, কোকরা চুলের একটা ছেলে, গলাটা লম্বা।

জানি নাতো বাবা।

জান না?

জ্বি না।

তুমি বলতে চাচ্ছ তুমি তাকে চেন না জান না, এম্নি সে তোমার ঘরের সামনে ঘুরাঘুরি করে?

বীনু এই পর্যায়ে ভয়ে অস্থির হল। কারণ দাদীজান বাসায় নেই। তিনি তাঁর ছোট ছেলের বাসায়। জুলাই মাস পর্যন্ত সেখানে থাকবেন। বীনুকে রক্ষা করার এখন আর কেউ নেই।

ইদ্রিস সাহেব শান্ত গলায় বললেন, শরীরে বিষ ঢুকে গেলে মন্ত্র পড়ে বিষ নামাতে হয়। সেই মন্ত্র আমি জানি। যাও–ঘরে যাও, আমি আসছি। তোমার মাকে বল উপস্থিত থাকতে।

বীনুর খুব ইচ্ছা হল দরজা খুলে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তারপর রাস্তা ধরে দৌড়াতে থাকে। রাস্তার দু পাশে যদি কোন বাড়ি থাকে এবং তার দরজা খোলা থাকে তাহলে সে সেই খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বে এবং বাড়ির মালিককে বলবে—-আপনাদের কোন কাজের বুয়া লাগবে?

যাই হোক বীনু সেই সব কিছুই করল না। সে তার মাকে সঙ্গে নিয়ে শোবার ঘরে খাটের উপর বসে রইল। বাতি জ্বালালো না। যথাসময়ে ইদ্রিস সাহেব এলেন এবং মেয়ের চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টান দিলেন। মেয়ে বড় হয়েছে তার গায়ে হাত দেয়া যায় না। তাকে শাস্তি দিতে হলে চুলের মুঠি ধরেই দিতে হয়। পরবর্তী আধঘন্টা ইদ্রিস সাহেব শাস্তি দিলেন। তার হাত ভর্তি মুঠো মুঠো চুল উঠে আসতে লাগলো। বীনুর মা পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন। অন্ধকারে তার মুখ দেখা গেল না। দেখা গেলে দেখা যেত। শাস্তি প্রক্রিয়ায় তাঁর অনুমোদন আছে। শাস্তির শেষে বীনু মরার মত মেঝেতে পড়ে রইলো। ইদ্রিস সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন–যন্ত্রণা ঘরে রেখে লাভ নেই। বিয়ে দিয়ে দাও। আমার দায়িত্ব শেষ হোক। হাতে ছেলে একটা আছে, বয়স সামান্য বেশি। পুরুষ মানুষের জন্যে বয়স কোন বড় ব্যাপার না। বীনুর মা বললেন–তুমি যা ভাল বোঝ কর।

সেই ছেলেটির সঙ্গে বীনুর বিয়ে হয়ে যেত। ঠেকালেন বীনুর দাদীজান। বীনু তার কাছে কেঁদে গিয়ে পড়েছিল। তিনি ছেলেকে ডেকে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন, বীনুর নাকি বিবাহের কথা চলতেছে?

ইদ্রিস বললেন, জ্বী।

আলহামদুল্লিাহ। ছেলে কি করে?

ছোটখাট ব্যবসা আছে। মুগদা পাড়ায় নিজের বাড়ি আছে।

বয়স কত?

বয়স সামান্য বেশি।

অনুমান কত।

সঠিক জানি না, ত্রিশ বত্রিশ হতে পারে, কিছু বেশিও হতে পারে। পুরুষ মানুষের বয়স কোন ব্যাপার না।

গাধার মত কথা কচ ক্যান। পুরুষ মানুষের বয়স কোন ব্যাপার না তরে কে শিখাইছে? মেয়েটা ভাল লেখাপড়া করতেছে। তারে ঘাটের মরার সাথে বিয়া দিবি? তুই তিনবারে মেট্রিক পাস করছস। তোর মেয়ে মেট্রিকে বৃত্তি পাইছে। আমরার পরিবার থাইক্যা একটা মেয়ে এমএ পাস করব। এইটা দেখনের জন্যে এখনো বাঁইচ্যা আছি। বুঝছস?

লেখাপড়াতো বিয়ের পরেও হয়।

বিয়ার পর প্রত্যেক বছরে একটা কইরা বাচ্চা হয়। আর কিছু হয় না। তুইতো আইএ পাস বউ বিয়া করছিলি। বিয়ার পরে হে কি বিএ পাস দিছে? আমারে চেতাইস না। খবর্দার কইলাম। খবর্দার।

.

বিয়ে হয়নি। এবং খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার বীর্ন ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে গেল। তার দাদীজান তাকে সেদিন দুহাজার টাকা দিয়ে বললেন, যা–ভাল ভাল জামা কাপড় কিন্যা আন। যেটা পছন্দ সেটা কিনবি। আইজ-কাইলের মেয়েরা যেগুলি পরে। বুজচস?

বীনু দুটো সালোয়ার কামিজ কিনেছে। নিজে একা একা গিয়েই কিনেছে। একটা শাদার উপর গোলাপী কাজ, অন্যটা লালের উপর লাল সূতার কাজ। কামিজ দুটোর কোনটাই সে পরতে পারেনি। ইউনিভার্সিটিতে যাবার প্রথম দিন সে লাল কামিজটা পরল। বীনুর মা বললেন, প্রথম ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছিস তোর বাবাকে সালাম করে তার দোয়া নিয়ে যা। বীনু তার বাবাকে সালাম করল। ইদ্রিস সাহেব বললেন, প্রথম ক্লাসতো এগারোটায়, এখন বাজে নটা চল্লিশ। এখন কোথায় যাচ্ছিস। বীনুর মা বললেন, প্রথম দিন একটু আগে আগে যাবে। কোন রুমে ক্লাস খুঁজে পাবে না।

ইদ্রিস সাহেব বললেন, খুঁজে না পাওয়ার কি আছে? তাছাড়া আমিতো সঙ্গে যাচ্ছি।

বীনুর মুখ শুকিয়ে গেল। বাবা সঙ্গে যাবেন। তার সঙ্গে ক্লাস রুম খুঁজে বের করবেন। কে জানে ক্লাস চলাকালীন সময়ে হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। সবাই। হাসাহাসি করবে।

ইদ্রিস সাহেব বীনুর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, তুই অপেক্ষা কর। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকিস না। সামনে থেকে যা। বলেই কঠিন গলায় ডাকলেন, সুরমা-সুরমা।

সুরমা মাছ কাটছিলেন, হাতে মাছের রক্ত নিয়েই ছুটে গেলেন। ইদ্রিস সাহেব থমথমে গলায় বললেন, মেয়ে যে জামাটা পরেছে সেই জামাটা দেখেছ? গলার কাটা কত বড় দেখেছ?

সুরমা ক্ষীণ গলায় বললেন, আজকালতো সবাই এইসবই পরে।

ইদ্রিস সাহেব বললেন, ন্যুড ক্লাবে আজকালতো অনেকে ন্যাংটাও ঘুরে বেড়ায়। তোমার মেয়েতো পড়াশোনা করার জন্যে যাচ্ছে। সেকি তার বুক দেখানোর জন্যে যাচ্ছে? সে দেখাতে চায় যে তার বুক বড়?

ইদ্রিস সাহেব কথাগুলো চাপা গলায় বললেও বিনু বারান্দা থেকে শুনে ফেলল। তার ইচ্ছা করল ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যায়। সে লাফ দিয়ে পড়ল না। যথাসময়ে সাধারণ একটা শাড়ি পড়ে বাবার সঙ্গে রিকশা করে রওনা হল। রিকশায় ইদ্রিস সাহেব মেয়েকে কয়েকটা উপদেশ দিলেন। কখনো কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলবে না। মেয়েদের সঙ্গে মেশার ব্যাপারেও সাবধান। বেশি মেশামেশিরও দরকার নেই। ইউনিভার্সিটি কোন আড্ডাখানা না। ক্লাস করবে, ক্লাস শেষ হবে বাসায় চলে আসবে। ব্যাস।

কোন পরিবেশে বীনু বড় হচ্ছে তা মনিকা বা মনিকার বান্ধবীরা জানে না। জানলে বুঝতো একটা বদ ছেলে তার গায়ে হাত দেয়ার পরেও সে কেন বলছে–কেউ গায়ে হাত দেয়নি। এই নিয়ে কোন সমস্যা হলে বাবার কানে চলে যাবে। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, যথেষ্ট হয়েছে আর না। পড়াশোনার দরকার নেই। বিয়ে দিয়ে ঝামেলা মিটাও। কবুল কবুল কবুল–ঝামেলা শেষ।

মনিকার চোখে বীনু খুব ছোট হয়ে আছে। বীনু ভেবে রেখেছে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সুযোগ পেলে সে মনিকাকে তার কথাগুলো বলবে। তারা যেহেতু সারারাত থাকবে সুযোগ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। সমস্যা একটাই বাবার অনুমতি। বীনু ঠিক করল সে কেঁদে দাদীজানের পায়ে পড়ে যাবে। তিনি একটা ব্যবস্থা করবেন। অবশ্যই করবেন।

.

তিনি ব্যবস্থা করলেন। কিভাবে করলেন বীনু জানে না। জানতেও চায় না। সে বিস্ময়ের সঙ্গে তার বাবাকে বলতে শুনলো–ওরা থাকে যেন কোথায়?

গুলশানে।

ওদের টেলিফোন নাম্বার জান?

জ্বি জানি।

ঐ বাড়ির ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার একটা কাগজে লিখে যাও। জহির তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে, বাসাটাও চিনে আসবে। আমি রাতে তোমার খালার বাসা থেকে একবার টেলিফোনে খোঁজ নেব।

তার দরকার নেই বাবা।

অবশ্যই দরকার আছে। আরেকটা কথা তোমাকে বলি, তুমি আজ যা করছ তা ঠিক না। অন্যায়। আমার মা মৃত্যুশয্যায়–তিনি একটা কথা বললেন, ফেলতে পারলাম না। মায়ের আদেশ আমি কোনদিনই অগ্রাহ্য করি নি। যতদিন বাঁচবেন অগ্রাহ্য করবো না। এখন যাও, টেলিফোন নাম্বার, ঠিকানা সুন্দর করে কাগজে লিখে ফেল।

বাবা তাকে তুই তুই করে বলেন, এখন তুমি করে বলছেন। বাবার মনটন যে অসম্ভব খারাপ সেটা বোঝা যাচ্ছে।

বন্ধুর জন্মদিন খালি হাতে যাওয়া ঠিক না। আমি উপহার কিনে নিয়ে আসছি। সাথে করে নিয়ে যাও।

জ্বি আচ্ছা।

ইদ্রিস সাহেব চারটা গ্লাসের একটা সস্তা সেট নিয়ে এলেন। এই উপহার মনিকার হাতে দিলে বীনা নিজেই লজ্জায় মরে যাবে এবং চারদিকে হাসাহাসি পড়ে যাবে।

.

সন্ধ্যা সাতটার সময় যাওয়ার কথা বীনু ঘড়ি ধরে ঠিক সন্ধ্যা সাতটার সময়ই উপস্থিত হল। বড়লোকের বাড়ি সবই নিশ্চয়ই নিয়ম মত হবে। গিয়ে দেখে সে ছাড়া আর কেউ আসেনি। মনিকা নিজেও সাজগোজ কিছু করেনি। গোসল করার জন্যে বাথরুমে শুধু ঢুকতে যাচ্ছে। সে বীনুকে দেখে বলল, ও আচ্ছা, তুমি চলে এসেছ। অন্যরাতত কেউ আসেনি। সারারাত থাকবে তো ধীরে সুস্থে আসছে। তুমি কি সারা। রাত থাকবে না চলে যাবে?

থাকব।

বাসায় অসুবিধা থাকলে রাত দশটা এগারোটার দিকে চলে যেতে পার। গাড়ি আছে, গাড়ি দিয়ে আসবে।

না, অসুবিধা হবে না।

অসুবিধা না হলে খুব ভাল। আমরা সারারাত ফান করব। তুমি এখন টিভি দেখ বা বই টই পড়। মজু আঙ্কেল টেলিফোন করেছেন, কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবেন। তখন তার সঙ্গে গল্প করতে পারবে।

উনি কে?

বাবার বন্ধু। আমাদেরও বন্ধু। ম্যাজিক টেজিক অনেক কিছু জানেন। ফান করার আইডিয়াতে তার মাথা একেবারে ভর্তি।

বীনু বলল, তোমাদের বাড়িটা কি একবার ঘুরে দেখব? এত সুন্দর বাড়ি আমি জীবনে দেখিনি।

দেখ, ঘুরে ঘুরে দেখ। রহিমাকে বলে দিচ্ছি ও তোমাকে সব ঘুরে ঘুরে দেখাবে। কি খাবে? চা, কোল্ড ড্রিংকস বা অন্য কিছু?

না।

আমাদের ডিনারের কিন্তু দেরি হবে। আজকে আমাদের ডিনার খাওয়াচ্ছেন মজু আঙ্কেল। বিশেষ একটা খাবার তৈরি হচ্ছে। সেটা আসবে রাত এগারোটার দিকে। ভাল কথা, তুমি কি সুইমিং কস্টিউম এনেছ? ও আচ্ছা, তোমাকে বোধ হয় বলা হয়নি আমাদের বাড়ির ছাদে সুইমিং পুল আছে। গভীর রাতে আমরা সবাই সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে কাটতে গান শুনব। তুমি কি সাঁতার জান?

বীনু সাঁতার জানে। তার নানার বাড়ির পুকুরে দাপাদাপি করে ছোটবেলাতেই সাঁতার শিখেছে। তারপরেও বলল,–সাঁতার জানি না। তার এতগুলো মেয়ের সঙ্গে পানিতে নামতে ইচ্ছা করছে না। তাছাড়া তার মনে ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে পানিতে মজু আংকেল নামের ভদ্রলোকও নামবেন।

.

রহিমা মধ্যবয়স্ক হাসি খুশি একজন মহিলা। তার পরনের শাড়িটা পরিষ্কার, পায়ে সুন্দর চামড়ার স্যান্ডেল। মনিকা আগে বলে না দিলে বীনা তাকে মনিকার মা বা তার কোন আত্মীয় ভেবে পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলতো। রহিমা’র মা বীনাকে খুব খুশি মনেই ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখালো। লাইব্রেরী ঘর, কম্পিউটার ঘর, বার, হল ঘর, গ্যালারি, লন্ড্রি রুম। মাথা ঘুরে যাবার মত অবস্থা। রহিমা’র কাছ থেকেই বীনা জানতে পারল মনিকার বাবা মা দেশে নেই। মনিকার মা’র হার্টে স্পেসমেকার লাগানো আছে। সেখানে কি যেন সমস্যা হচ্ছে। লন্ডনে ডাক্তার দেখাতে গেছেন। মনিকার বাবাও গেছেন সঙ্গে। আজকের জন্মদিনে মনিকার আত্মীয়-স্বজন সবাইকে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। আজ শুধু তার বন্ধু-বান্ধবরা থাকবে। মজু আংকেল থাকবেন কারণ ফান আইডিয়া সব তার মাথাতেই আসে।

মনিকার বান্ধবীরা এখনো আসেনি। তবে মজু আংকেল এসে গেছেন। লম্বা একজন মানুষ। গায়ের রং সাহেবদের মত দুধে আলতায়। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। সর্বক্ষণ পাইপ টানছেন। তাকে ঘিরে আছে তামাকের গন্ধ। তবে সেই গন্ধ খারাপ লাগছে না। ভদ্রলোক গরমের মধ্যেও হলুদ একটা কোট পরে আছেন। কোটটা অন্য সব কোটের মত না। পাঞ্জাবির মত লম্বা। মনিকা তাকে বীনুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।

মজু আংকু, এর নাম বীনু। আমার সঙ্গে পড়ে। কেউতো এখনো আসেনি, তার বোধ হয় একা একা লাগছে। আপনি তাকে একটু কোম্পানী দিন। আমার সাজগোজ কিছুই এখনো হয়নি। আর বীনু শোন, মজু আংকেলের কথাতো তোমাকে আগেই বলেছি। আর্কিটেক্ট। কনফারমড ব্যাচেলার। তার যে কি পরিমাণ টাকা আছে তিনি তা নিজেও জানেন না। দারুন ক্লোজআপ ম্যাজিক দেখাতে পারেন। আজও দেখাবেন, সেই জন্যেই হলুদ কোট পরে আছেন। তাঁর যাবতীয় ম্যাজিক কোটের ভেতরে।

মজু আংকেল মনিকার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, তুমি সব কথাই ঠিক বলেছ তবে কনফারমড ব্যাচেলার কথাটা ঠিক বলোনি। পছন্দসই মেয়ে পাইনি বলেই ব্যাচেলার। আমি সারাক্ষণই পছন্দের মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছি। যখন কোন মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় তখন প্রথমেই যে কথাটা মনে হয় তা হচ্ছে–এই কি সে? তোমার বান্ধবীকে দেখেও সেই কথাই মনে হচ্ছে এবং আমার মনে হচ্ছে এই হল সে।

মনিকা হাসতে হাসতে বলল, তাহলে তো আপনার সমস্যা সমাধান হয়েই গেল।

বীনু বুঝতেই পারছে না এসব কি ধরনের কথাবার্তা। বয়স্ক একজন মানুষ কি এই ধরনের কথা বলতে পারেন? না বলা উচিত? কি করে তিনি বললেন, এই হল সেই মেয়ে। ছিঃ ছিঃ।

মনিকা চলে যাচ্ছে। যাবার আগে বলল, মজু আংকেল আপনি কিন্তু বীনুর সঙ্গে সিরিয়াস কোন রসিকতা করবেন না। সে আপনাকে প্রথম দেখছে। আপনার রসিকতা বুঝতে পারবে না। ঘাবড়ে যাবে। আপনি বরং ওকে ম্যাজিক টেজিক দেখান।

.

মনিকা চলে গেছে। একা একা এই ভদ্রলোকের পাশে বসে থাকতে বীনুর প্রচন্ড ভয় লাগছে। তার শুধুই মনে হচ্ছে তিনি বলবেন,–দেখি তোমার হাত দেখি। আমি হাত দেখতেও জানি। বীনুর ফুপাতো বোন সুরমা আপার বাসায় এরকম হল। বীনু সুরমা আপার ছেলের আকিকায় গিয়েছিল। সেখানে দেখা গেল আসর জমিয়ে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। ইঞ্জিনিয়ার। বেশ বয়স্ক, মাথার চুল সবই পাকা। তিনি নাকি খুব ভাল পামিস্ট, হাত দেখে সব বলে দিতে পারেন। সবাই হাত দেখাচ্ছে। সুরমা আপা বলল, বীনু তোর হাত দেখা না। বীনু বলল, না। ভদ্রলোক খপ করে বীনুর হাত টেনে নিলেন। তারপর হাত আর ছাড়েনই না। এইভাবে ধরেন ঐভাবে ধরেন। রীতিমত কচলানো। মজু আংকেলও কি এই রকম কিছু করবেন? বীনু ঘড়ি দেখলো, আটটা বাজে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এই প্রথম তার মনে হল ভুল হয়েছে। মনিকার জন্মদিনে আসা ভুল হয়েছে।

মজু আংকেল বোধহয় বীনুর ভয় বুঝতে পারছেন। তাঁর পাইপ নিভে গেছে। তিনি পাইপ ধরাতে ব্যস্ত। দেয়াশলাইয়ের আগুন বারবার নিভে যাচ্ছে। বীনু প্রায় মূর্তির মতই বসে আছে। ভদ্রলোকের পাশে বসেছে বলে সে ভদ্রলোকের মুখ পরিষ্কার দেখতে পারছে না। বীনুর মনে হল ভদ্রলোক হাসছেন। মজু আংকেল পাইপে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, তোমার নাম হচ্ছে বীনু তাই না? বীনা থেকে বীনু।

বীনু মাথা নাড়াল। তার নাম বীনু ঠিকই তবে বীনা থেকে কি না তা জানে না।

তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ?

জ্বি না।

তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ভয় পাচ্ছ। ভয় পাবার কিছু নেই।

আমি ভয় পাচ্ছি না।

তুমি থাক কোথায়?

কলা বাগানের পেছনে ভূতের গলি নামে একটা জায়গায়।

ভূতের গলি নাম কি জন্যে? ভূত আছে?

বীনু জবাব দিল না। সে আবার ঘড়ি দেখল। আশ্চর্য এখনো আটটা বাজে। ঘড়িটা কি বন্ধ হয়ে গেছে?

তোমার বাবা কি করেন?

ব্যাংকে চাকরি করেন।

কোন ব্যাংকে?

সোনালী ব্যাংকে।

কোন ব্রাঞ্চ?

নীলক্ষেত ব্রাঞ্চ।

উনার পোস্ট কি?

ক্যাশিয়ার।

উনার কাজ তাহলে পরের টাকা গোনা?

বীনু জবাব দিল না। তার মনে হল তার বাবা ক্যাশিয়ার এটা শোনার পর মজু আংকেলের উৎসাহ কমে গেছে। এবং তিনি বোধ হয় একটু বিরক্তও বোধ করছেন। কেমন যেন সরু চোখে তার দিকে তাকালেন। ভদ্রলোকের পাইপ আবার নিভে গেছে। তিনি আবারো পাইপ ধরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পাইপ ধরাবার পর লম্বা করে ধোয়া ছেড়ে বীনুর দিকে তাকিয়ে কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না–উঠে হল ঘরের দিকে গেলেন। বীনু আবার ঘড়ি দেখলো। এখনো আটটা বাজে। ঘড়িটাকি নষ্ট হয়ে গেছে? মজু আংকেল ফিরে আসছেন। তার হাতে পেটমোটা লম্বা একটা গ্লাস। গ্লাসে লেবুর টুকরা ভাসছে। বীনু শিউরে উঠল। ভদ্রলোকের হাতে কি মদের গ্লাস? মদ খেলে মানুষ অদ্ভুত কাণ্ড করে বলে সে শুনেছে। মদ খাবার এক পর্যায়ে সবাই বমি করে। ইনিও নিশ্চয়ই করবেন। উনি কি করবেন কে জানে। এত কাছ থেকে সে কখনো কাউকে মদ খেতে দেখেওনি। ভদ্রলোক একবারে তার সামনে বসে আছেন।

বীনু?

জ্বি।

মনিকার সব জন্মদিনে আমি থাকি। তোমাকে এই প্রথম দেখলাম।

বীনু কিছু বলল না। ভদ্রলোক ছোট ছোট চুমুক দিয়ে গ্লাস ভর্তি জিনিসটা খাচ্ছে। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তার খেতে ভাল লাগছে না। মজু আংকেল এবার পুরোপুরি তার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, মনিকার সব জন্মদিনে আমাকে নতুন নতুন ফান আইডিয়া বার করতে হয়। আই এম রানিং আউট অব আইডিয়াস। আমি মনিকাকে বলেছি–এই শেষ, আর আমার কাছে আইডিয়ার জন্যে আসবে না। এবারের ফান আইডিয়াটা কি তুমি জান?

বীনু ক্ষীণস্বরে বলল, না।

তোমাকে দেখে আমারো মনে হচ্ছে তুমি জান না–সুইমিং পুলে গোসলের কথা তোমাকে বলেনি?

জ্বি বলেছে।

ও, তাহলেতো তুমি জান। আইডিয়া আমার দেয়া, আমি নিম্ফ সাজার আইডিয়া দিয়েছি। নিম্ফ কি জান?

জ্বি না।

নিম্ফ হচ্ছে পরী যারা জলকেলি করতে ভালবাসে—জলকন্যা। আমি বলেছি আজ পূর্ণিমা’র রাত আছে। গভীর রাতে তোমরা সব বান্ধবীরা মিলে সুইমিং পুলে নেমে যাবে। ছাদের সব বাতি থাকবে নেভাননা। চাঁদের আলো পড়বে সুইমিং পুলের পানিতে। দূরে বাজবে সিম্ফনী –মুনলিট সোনাটা। পানিতে ভেসে বেড়াবে একদল জলকন্যা। এ ওর গায়ে পানি ছিটাবে, খিলখিল করে হাসবে। তাদের গায়ে কোন কাপড় থাকবে না। কারণ জল কন্যাদের গায়ে কাপড় থাকে না। তাদের নগ্ন শরীরে চকচক করবে চাঁদের আলো। অসাধারণ একটা দৃশ্য, তাই না?

বীনু কিছু বলল না। মজু আংকেল খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, কবিতা শুনবে? বীনু না বলার আগেই ভদ্রলোক ভারী গলায় আবৃত্তি শুরু করলেন

ঘুমে চোখ চায়না জড়াতে,
বসন্তের রাতে।
বিছানায় শুয়ে আছি
একন সে কত রাত
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর
স্কাইলাইট মাথার উপর।
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।

বীনু কাঠ হয়ে বসে রইলো। মদ খেয়ে ভদ্রলোক কি মাতাল হয়ে গেছেন? বীনু এত কাছে থেকে কাউকে মদ খেতে দেখেনি। অনেক দূর থেকে একবার দেখেছে। যশোহরে মঞ্জু খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। রাত এগারোটার দিকে শুনে ছাদে হৈ চৈ হচ্ছে। মঞ্জু খালা কার সঙ্গে যেন খুব রাগারাগি করছেন, কান্নাকাটিও করছেন। সে মঞ্জু খালার মেয়েকে জিজ্ঞেস করলো, কি হচ্ছেরে? সে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল, বাবা মদ খাচ্ছে তাই মা চেঁচামেচি করছে। বীনু আঁৎকে উঠলো। কি সর্বনাশ। সে কৌতূহল সামলাতে পারেনি। চুপিচুপি ছাদে দেখতে গিয়েছিল। ছাদে তখন খালা ছিলেন না। মেজো খালু সাহেব একা একা গ্লাস আর সবুজ রঙের একটা বোতল নিয়ে বসেছিলেন। বোতলটার রঙ কালোও হতে পারে। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। সে ভেবেছিল আড়াল থেকে এক নজর দেখে চলে আসবে। কিন্তু খালু সাহেব তাকে দেখে ফেললেন, এবং অত্যন্ত মিষ্টি গলায় ডাকলেন, কে বীনু মা? আয় আয়। ছাদে খুব সুন্দর গোলাপের বাগান করেছি, বাগান দেখে যা। তোর মুখটা এমন শুকনো কেনরে মা? খালু সাহেবের কথাবার্তা এত সুন্দর এত স্বাভাবিক। কথা জড়ানো না কিছু না।

মজু আংকেলও খুব সুন্দর করে কথা বলছেন। মদ খেলে লোকজন হয়তো সুন্দর করে কথা বলে। তবে ভয়ংকর কথা বলে। এই ভদ্রলোক হয়তো জানেনও না তিনি কি ভয়ংকর কথা বলছেন। নগ্ন শরীরে চকচক করবে চাঁদের আলো। কি ভয়ংকর কথা!

মজু আংকেল হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। তিনি পাইপে টান দিতে দিতে বললেন, একদল রূপবতী তরুণী নগ্ন হয়ে সাঁতার কাটবে ভাবতেই ভাল লাগছে। ভিডিও করে রাখলে ভাল হত। এটাতে মনিকা রাজি হচ্ছে না। দেখি রাজি করানো যায় কি না। আজ থেকে কুড়ি বছর পর যখন তোমরা লোলচর্ম বুড়ি হয়ে যাবে তখন এই ভিডিও দেখে খুব ভাল লাগবে।

মজু আংকেলের গ্লাস শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আবার গ্লাস ভরতি করতে গেলেন।

মনিকার বন্ধুরা আসতে শুরু করেছে। এদের কাউকে বীনু চিনতে পারছে না। বীনু যেমন ওদের অবাক হয়ে দেখছে ওরাও বীনুকে অবাক হয়েই দেখছে। একটা অদ্ভুত পোশাক পরা মেয়ে ঘরে ঢুকেই বলল, আমাদের জলকন্যা সাজার প্রোগ্রাম ঠিক আছে তো? বীনু আবার ঘড়ি দেখলো। আটটা বাজে। তার ঘড়ি কি নষ্ট? এই প্রথম তার মনে হল সে ভুল করেছে। খুব বড় ভুল করেছে।

.

রাত কত বীনু জানে না। তার ঘড়িতে আটটা বেজে আছে। তবে রাত যে অনেক এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। সে এখন মনিকাদের ছাদের একটা বাথরুমে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। জীবনে এত সুন্দর বাথরুম সে দেখেনি। কোনদিন হয়তো দেখবেও না। ধবধবে শাদা বিশাল একটা ঘর। সেই ঘরে নীল বাথটাব, নীল কমোড, নীল বেসিন। বাথরুমে নানান মাপের তোয়ালে। সেগুলোর রঙও নীল। আর কি বিশাল একটা আয়না। নিজেকে পুরোপুরি দেখতে হলে এরকম একটা আয়না লাগে।

মনিকার সব বান্ধবী সুইমিং পুলে নেমে গেছে। সুইমিং পুলে নামা’র আগে নাকি খুব ভাল করে গায়ে সাবান মেখে গোসল করে নিতে হয়। অন্যরা তাই করেছে। সে শুধু বাকি। সেওকি অন্যদের মত করবে? না দরজা বন্ধ করে বাথরুমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদবে? মনিকা তাকে বলেছে, আমাদের জলকন্যা সাজার ব্যাপারটা যদি তোমার ভাল না লাগে তোমাকে জলকন্যা সাজতে হবে না। তুমি আমার ঘরে বসে ভিসিআরে ছবি। দেখ কিংবা গল্পের বই পড়। মজু আংকেল থাকবেন। তার সঙ্গে গল্পও করতে পার। আর তুমি যদি বাসায় চলে যেতে চাও তাও করতে পার। আমাদের ড্রাইভার আছে। ও তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। রাত অবশ্যি অনেক বেশি হয়ে গেছে। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এনজয় করছ না। তোমাকে কি নামিয়ে দিয়ে আসবে?

বীনু বলল, না। অথচ সে হ্যাঁ বলতে গিয়েছিল। তার মাথা বোধহয় এলোমেলো হয়ে গেছে।

সে জলকন্যা সাজতে চায় না। অথচ সে বাথরুমে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে বাজনা বাজছে। বাজনাটা কি সুন্দর। কি আশ্চর্য সুন্দর। মনিকার বান্ধবীদের খিলখিল হাসির শব্দ আসছে। এরা বোধ হয় একজন আরেকজনের গায়ে পানি ছিটাচ্ছে। এদের এই আশ্চর্য জীবনের সঙ্গে তার কোন যোগ নেই। এই বাড়ির ছাদে যে চাঁদ উঠেছে সেই চাঁদ তাদের বাড়ির ছাদে কখনো ওঠে না। মনিকাদের ছাদে পা দিয়েই চাঁদটার দিকে তাকিয়ে কি যে অদ্ভুত অন্য রকম লাগলো।

বীনু কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই সে তার গায়ের কাপড় খুলছে। সে জলকন্যা সাজছে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi