Saturday, April 4, 2026
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পহোম-স্টে - অনুষ্টুপ শেঠ

হোম-স্টে – অনুষ্টুপ শেঠ

আহা!

যেমন সবুজ ঘন জঙ্গল, তেমনি চোখ জুড়োনো পাহাড়ি দৃশ্য। কিছুটা হলেও, এ-বছর হিমালয়ে যেতে না পারার দুঃখ ফিকে হয়ে গেল শ্রীনাথের।

তামিল ছেলে, বছরছয়েক ধরে মুম্বইয়ের বাসিন্দা। বয়স ত্রিশ ছুঁই-ছুঁই হলেও বিয়ে করেনি, এক্ষুনি করার কোনো ইচ্ছেও নেই। তামাটে পেটানো চেহারা, কুচিকুচি করে কাটা চুল আর চোখে চশমা। বেড়াতে ও বরাবর ভালোবাসত। সহকর্মী অনিকেতের পাল্লায় পড়ে প্রথম হিমালয়ে ট্রেক করতে যায় চার বছর আগে— ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস আর হেমকুণ্ড সাহিব। সেই যে ও হিমালয়ের প্রেমে পড়ল, তারপর আর কিছু ভালো লাগত না। পরের তিন বছরে কেদার-বদ্রী, গঙ্গোত্রী-গোমুখ আর বৈষ্ণোদেবী ট্রেক করে এসেছিল।

এ-বছর মদমহেশ্বর যাওয়ার পুরো ব্যবস্থা করা হয়েও গেছিল। কিন্তু কপাল মন্দ। জার্নি শুরুর ঠিক দু’দিন আগে অফিস থেকে ফেরার পথে স্টেশনের সিঁড়িতে পা স্লিপ করল। অতঃপর হাসপাতালেই যেতে হল। পায়ের পাতায় মেটাটার্সাল বোন বলে কিছু থাকে তা না জেনেও দিব্যি চলে যাচ্ছিল এতকাল। কিন্তু সেগুলোর তিন নম্বরটায় সরু সুতোর মত ফ্র‍্যাকচার হলে যে এত ব্যথা হয়, সেটা আক্ষরিক অর্থেই হাড়ে-হাড়ে মালুম হল এবার। ট্রেকিঙের বদলে পায়ে প্লাস্টার বেঁধে শ্রীনাথ শুয়ে রইল পনেরো দিনের ছুটিতে।

ওর ভাগ্য ভালো, হাড়টা ভাঙেনি। তাতেও প্লাস্টার কাটার পরও আরো মাসতিনেক ফিজিওথেরাপি করাতে হল। একটু-একটু করে শ্রীনাথ ফিরে এল হাঁটাচলা আর দৌড়োনোর রুটিনে। অফিস আর ঘরের রুটিন অসহ্য হয়ে উঠছিল। পনেরোই অগাস্টের ছুটি আর শনি-রবি জুড়ে যাচ্ছে দেখেই ও বেরিয়ে পড়ল। অনিকেত আসতে পারেনি। শ্রীনাথ একাই চলে এল মহারাষ্ট্রের এই সবচেয়ে উঁচু হিল স্টেশনে।

মুম্বই থেকে ভোরবেলার ট্রেন ধরে সাওন্তওয়াডি পৌঁছোতে দুপুর হয়ে গেছিল। খুব খিদে পেয়েছিল। রাস্তার ধারের একটা হোটেলে থালি লাঞ্চ সেরে, একটা প্রাইভেট গাড়িতে দরদস্তুর করে উঠে পড়েছিল শ্রীনাথ। স্টেট বাস-ও যায়, কিন্তু আর সেটার জন্য দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না। এ লোকটা যাবে কামটওয়াডে। আম্বোলি তার পথেই পড়বে।

“হোটেল বুকিং ঝালা না? মানডে ছুট্টি আহে, টুরিস্ট ভরপুর য়েতিলঅ।”

বুকিং করেনি। তবে আসার আগে গতকাল এমটিডিসিতে ফোন করে জেনে নিয়েছে তিনটে ঘর খালি আছে, এলেই পেয়ে যাবে। কাজেই লোকটাকে সংক্ষিপ্ত ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছিল শ্রীনাথ।

ততদূর অবধি গাড়িতে যাওয়া হয়নি শেষ অবধি। রাস্তার দু’ধারের দৃশ্য দেখেই মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠেছিল ওর। তারপর আম্বোলি ঘাট ওয়াটারফলস দেখে শ্রীনাথ আর থাকতে পারেনি, গাড়ি থেকে নেমেই পড়েছিল। ম্যাপ অনুযায়ী ওখান থেকে আরও তিন কিলোমিটার মতো রাস্তা যাওয়ার ছিল। ওটুকু হেঁটে মেরে দেওয়া ওর কাছে কিছুই না। তাছাড়া, এখানে তো সন্ধের পর বেরোনো সম্ভব নয়। তাই আজকের দিনের আলোটা যথাসম্ভব কাজে লাগিয়ে আশপাশটা দেখে নিতে চাইছিল শ্রীনাথ।

না, হিমালয়ের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। সে রাজকীয় অভিজাত হিমাদ্রীর সৌন্দর্যের চেয়ে একদম আলাদা এই শ্যামল পাহাড়ি সরল রূপ। কিন্তু এই রূপ বড়ো স্নিগ্ধ। ছবি তুলে আশ মিটছিল না। তখনই বৃষ্টি নামল হঠাৎ। ব্যাগ থেকে ওর প্রিয় নীল রেইনকোটটা বের করে মাথা-পিঠ ঢেকে এগোল শ্রীনাথ।

কী নির্জন জায়গা! এতক্ষণে একটা বাস ওকে ওভারটেক করে যাওয়া ছাড়া আর মানুষ চোখেই পড়ল না। মনে হচ্ছিল ও অনন্তকাল এভাবে হেঁটে যেতেই পারে, ছবি তুলতে তুলতে। কিন্তু পেটের মাঝে খিদেটা মাথাচাড়া দিল বেশ কিছুক্ষণ পর। ক্যামেরাও বলে দিল, আলো কমে এসেছে। ঘড়ি দেখে চমকে উঠল শ্রীনাথ।

দেড় ঘণ্টা ধরে সে এমন রাস্তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এবার হোটেলে যাওয়া দরকার। অন্ধকার হয়ে গেলে মুশকিল। রাস্তা হয়তো হারাবে না, কিন্তু সাপখোপ বেরোতে পারে। ক্যামেরা ব্যাগে পুরে হনহন করে পা চালায় শ্রীনাথ। এখনো অবধি হোটেলের চিহ্ন নেই, বাঁকটা ঘুরলে হয়তো চোখে পড়বে।

ক্যাঁয়্যাঁচ্!

জিপটা শেষ মুহূর্তে থেমে না গেলে বড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারত আজ। শ্রীনাথ তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল বনেটের ওপর। জিপ যিনি চালাচ্ছিলেন, সেই মাঝবয়সী ভদ্রলোক ধড়মড় করে ছুটে এসে ওকে ধরে তুললেন। ভদ্রলোকের কাঁচাপাকা চুল, অল্প দাড়ি-গোঁফ, ছোটো-ছোটো ঈষৎ ছলছলে চোখ। তিনি এতবার মাফ চাইতে লাগলেন যে শ্রীনাথের লজ্জাই লাগল। উনি হর্ন দেননি সেটা যেমন ভুল, তেমনি সেও তো মনের আনন্দে রাস্তার মাঝখান দিয়ে গটগট করে হাঁটছিল! ভদ্রলোক যখন হোটেল অবধি লিফট দিতে চাইলেন, সে আর আপত্তি করেনি।

এমটিডিসি-তে এসে মাথায় বজ্রাঘাত হল তার। একদল ইয়ং ছেলেমেয়ে আজই এসে পৌঁছেছে। ওকে পাশ কাটিয়ে আসা বাসটাতেই এসেছে। তিনটে ঘরই তাদের দখলে, আর কিছু ফাঁকা নেই। আগে এসে ঘরটা বুক করেনি বলে নিজেকেই চড় মারতে ইচ্ছে করছিল শ্রীনাথের। এখানের রিসেপশনেই বলে-কয়ে কাছের অন্য হোটেলটায় ফোন করিয়ে দেখল, সেখানেও ঘর নেই। তবে এটুকু জানা গেল যে এই রাস্তা ধরে কিছুদূর ফিরে গেলে আরেকটা ছোটো হোটেল পড়বে। বেজার মুখে ব্যাকপ্যাক ঘাড়ে ফেলে বেরিয়ে এল শ্রীনাথ।

“নো রুম?”

আরেহ্! ভদ্রলোক যাননি। বরং জিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তার পাশে। চালকের আসনে বসে ওকেও উঠে আসতে বললেন ভদ্রলোক। অন্ধকারে রাস্তায় চলার হাত থেকে রেহাই মিলল ভেবে শ্রীনাথও দ্বিরুক্তি না করে বসে পড়ল পাশের সিটে।

“সদাশিউ উসগাঁওকর। প্রাইভেট বিজনেস।” নিজে থেকেই আলাপ শুরু করলেন ভদ্রলোক।

শ্রীনাথও নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “এস.এম. শ্রীনাথ। ফ্রম মুম্বই। সফটওয়্যার প্রোফেশনাল।”

ভদ্রলোক চট করে একবার ওর দিকে তাকিয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “ডু ওয়ান থিং। ওই হোটেলটা খুব একটা ভালো না। আপনি থাকতে পারবেন না। আর ঘর আছে কিনা তাও তো জানা নেই, লং উইকেন্ড বলে কথা। আপনি বরং আমার বাড়িতে চলুন।”

শ্রীনাথ ইতস্তত করল। এভাবে একজন অজানা-অচেনা লোকের বাড়িতে যাওয়া কি ঠিক হবে?

“আরে ভাই, না হয় কিছু মূল্যই ধরে দেবেন।” সহাস্যে বললেন সদাশিউ, “ওই ‘হোম স্টে’, না কি যেন বলে আজকাল? এ আমরা মাঝেমাঝেই করে থাকি। গেস্ট রুম আছে, সব ব্যবস্থা আছে, কিচ্ছু অসুবিধে হবে না। আমার গিন্নির হাতের খানা খাবেন। আপনারও লাভ, আমারও কিছু এক্সট্রা ইনকাম হবে। মন্দ কী?”

এইবার গেটের বাইরে ভদ্রলোকের দাঁড়িয়ে থাকার কারণটা শ্রীনাথের কাছে স্পষ্ট হয়। তবে প্রস্তাবটা খারাপই বা কি? পায়ের একটু বিশ্রাম দরকার এবার। হোম স্টে ব্যবস্থা ভালোই হয় বলে শুনেছে ও। সম্মতি জানিয়ে দিল শ্রীনাথ।

জিপটা পাকা রাস্তা ছেড়ে মেঠো পথ ধরে বেশ খানিকটা ভিতরে ঢুকেছিল। আশপাশটা দেখতে-দেখতে শ্রীনাথ ভাবছিল, এত ঘন জঙ্গলে কেন কেউ বাড়ি বানায়? যাকগে, ঘরগুলো পরিষ্কার হলেই হল। গাছের ফাঁক দিয়ে হেঁটে ভদ্রলোকের পিছু-পিছু ও যখন দাওয়ায় উঠল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। হয়তো তাই একতলা বাংলো বাড়িটা কেমন কালো-কালো ছোপ ধরা, মলিন আর হতশ্রী লাগছিল। ভিতরে ঢুকে আলো জ্বালালেন সদাশিউ। আলোটাও মিটমিটে, ভোল্টেজ কম নির্ঘাৎ!

“আসুন।” হেসে বললেন সদাশিউ, “ঘর-বাথরুম সব দেখিয়ে দিই। অ্যাটাচড বাথ নয় ঠিক, তবে পাশেই। আর রাত্রে দাল, ভিন্ডি ভাজি, রোটি আর আন্ডা পুলাও বলি? মানে বুঝছেনই তো আগে জানা ছিল না তো, ঘরে যা আছে তাই..”

নাহ্, মানতেই হবে যে ঘরটা চমৎকার। পরিষ্কার প্রিন্টেড চাদর টানটান করে পাতা রয়েছে ডাবল বেডের ওপর। পাশে চেয়ার-টেবিল। দেওয়ালে গোল আয়নার কাচ ঝকঝক করছে। এমনকি দেওয়াল-লাগোয়া কাবার্ড খুলেও ধুলোর চিহ্নমাত্র দেখতে পেল না শ্রীনাথ। ভদ্রলোকের গিন্নি বা কেয়ারটেকার যে খুবই এফিসিয়েন্ট— এ-কথা মানতেই হচ্ছে।

দরজায় ছিটকিনি দিয়ে তার পিছনের ব্র‍্যাকেটে ভিজে রেইনকোট ঝোলাল শ্রীনাথ। পা থেকে জুতো খুলে মোজাদুটোও ওখানেও ঝোলাল। পাশের ছোটো কিন্তু পরিষ্কার বাথরুমে ফ্রেশ হল। পোশাক বদলে ঢিলে টি-শার্ট, বারমুডা, আর হাওয়াই চটি পরতেই আরাম একটা কম্বলের মতো ওকে জড়িয়ে ধরল। একবার উঁকি মেরে দেখল, বাইরের ঘরের আলো নেভানো। কিচেন কোনদিকে কে জানে। থাক, ভদ্রলোক ডাকবেন তো রান্না হলে।

ঘরে টিভি না থাকলেও শ্রীনাথ ঘাবড়াল না। সময় কাটানোর। ব্যাগ থেকে খাতা, পেন আর সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে দেখল অ্যাশট্রে নেই। খাতার আধখানা পাতা ছিঁড়ে ছাই ফেলার মতো একটা ব্যবস্থা হল। কোলে বালিশ নিয়ে, সিগারেট ধরিয়ে গুছিয়ে বসল শ্রীনাথ। এই রকম বেড়াতে এসে প্রতিদিনের খুঁটিনাটি খাতায় লিখে রাখা ওর অনেকদিনের অভ্যেস। পরে এই জিনিসগুলোই গুছিয়ে আর্টিকল হিসেবে লিখে একটা পত্রিকায় পাঠায় ও। লেখায় তন্ময় হয়ে গেল ও একটু পরেই।

“এক্সকিউজ মি!”

হুংকারের চোটে আরেকটু হলেই ও খাট থেকে পড়ে যেত। সামলে উঠে দেখল, সদাশিউ হাতে ট্রে-তে কাপ-ডিশ নিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকেছেন। ছলছলে চোখ দুটো ভীষণ ক্রুদ্ধ ভাবে চেয়ে আছে ওর দিকে।

“স্মোকিং নট অ্যালাউড।”

প্রত্যেকটি শব্দ কেটে কেটে, ‘নট্’-এর ওপর বিরাট জোর দিয়ে বললেন ভদ্রলোক। মেজাজ খিঁচড়ে গেল শ্রীনাথের। লেখালেখির সময় মনঃসংযোগ করতে সিগারেট ওর লাগেই। এটা কোনো কথা হল!

“আগে বলেননি কেন?” গালাগাল দেওয়া থেকে নিজেকে অতিকষ্টে আটকাল শ্রীনাথ। তবু ওর প্রশ্ন থেকে ঝাঁঝটা কমল না।

কোনো জবাব না দিয়ে, টেবিলে ট্রে নামিয়ে ভদ্রলোক একদম ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ওকে হতচকিত করে দিয়ে হাত জোড় করে বললেন, “প্লিজ! আমাদের বাড়িতে স্মোকিং চলবে না। ওটা নেভান।”

ভদ্রলোকের দৃষ্টি ততক্ষণে বদলে গেছিল। গলার মতো চোখেও ফুটে উঠেছিল আর্ত অনুনয় আর উদ্বেগ। একরকম বাধ্য হয়ে সিগারেট নিভিয়ে সেটা ফেলে দিল শ্রীনাথ। সদাশিউ ঝুঁকে বিছানার ওপর থেকে ওর সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিলেন। সেটা দেখে রাগে ওর গা জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে শ্রীনাথ ঠিক করল, কাল সকালেই ও এখান থেকে চলে যাবে। এত রাত না হয়ে গেলে আজই, এক্ষুনি যেত।

“গলতি সে ভি না পি লে, ইস লিয়ে হটায়া। সমঝা না? বিলকুল নট অ্যালাউড, ইয়াদ রখনা।”

যত্তসব!

গরম মাথা ঠান্ডা করার আশায় আবার খাতা-পেন নিয়ে বসল ও। মন লাগছেই না। ক’টায় যেন শাওন্তওয়াডি ছেড়েছিল? বারোটা না সাড়ে বারোটা? ধুত্তোর! খালি খালি হাত নিশপিশ করছে। সর পড়ে যাওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে অখাদ্য লাগল। তাছাড়া চা যেমনই হোক না কেন, তারপর সিগারেট না খেলে থাকা যায়?

ঠকাস!

বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠেছিল। দেওয়ালে চোখ চালিয়ে একটা গাবদা টিকটিকি দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হল। পোকা ধরার তাড়ায় দেওয়ালের একটা ছবিকে ধাক্কা মেরে বেঁকিয়ে গেছে টিকটিকিটা। তারই আওয়াজ ছিল বোধহয়। ছবি… মানে একটা পুরোনো অয়েল পেইন্টিং। এক মারাঠি বউ জবরজং সাজ করে তাকিয়ে আছে। সদাশিউয়ের গিন্নি নাকি? উঠে ছবিটা সোজা করে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙল শ্রীনাথ। তৎক্ষণাৎ ওর ঘাড়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেল। শ্রীনাথের স্পষ্ট মনে হল, কে যেন ওকে দেখছে।

কিন্তু বন্ধ ঘরে ওকে কে দেখবে? মাথা ঝাঁকিয়ে অনুভূতিটা কাটিয়ে দিতে চাইল শ্রীনাথ। উলটে আরো তীব্র হয়ে উঠল সেটা। জানলার কাছে গিয়ে ভালো করে চোখ চালাল। এমনকি দরজা খুলে বাইরে উঁকিও মারল একবার। কোথাও কেউ নেই! থাকবেই বা কে?

একটা সিগারেট পেলে এইসব ভুলভাল ভাবনা কাটত।

আরেহ্! ব্যাগে তো আরো প্যাকেট আছে। রিমোট জায়গা, যদি না পায় তাই ভেবে বেশি করে স্টক নিয়ে এসেছিল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, ব্যাগ থেকে সিগারেট বের করে ধরাল শ্রীনাথ। তারপর লেখায় বুঁদ হয়ে গেল। সে টেরও পেল না, তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকা একজোড়া চোখে বারদুয়েক পলক পড়ল। তারপর তেলরঙে আঁকা অধরোষ্ঠে ফুটে উঠল এক ভয়াল ক্রূর হাসি।

খুব মন দিয়ে সফরের কথা লিখছিল শ্রীনাথ। পাশে কাগজের দোনায় ছাই ভরে উঠেছে। মেঝেতেও রয়েছে দুটো সিগারেটের ধ্বংসাবশেষ। সব আবার তুলে ফেলতে হবে খেতে ডাকার আগেই। লেখাটা হয়ে যাক। একটু না ফেনালে আবার পত্রিকার এডিটর খুঁতখুঁত করে। বাধ্য হয়ে সফরের মধ্যে এক কলেজ-পড়ুয়া মেয়েকে এনে একটা সেমি-রোমান্টিক অ্যাঙ্গল বানাচ্ছিল শ্রীনাথ। তখনই টপ করে কী একটা যেন এসে পড়ল খাতায়।

জল? ঘাম?

না। কালচে সবুজ কিছু। গা ঘিনঘিনে। চোখ তুলে দেখতে গিয়ে সত্যি সত্যি খাট থেকে পড়ে গেল শ্রীনাথ।

সেই টিকটিকিটা একটা লম্বা পেরেক মতো কিছু দিয়ে সিলিং এর সঙ্গে গাঁথা রয়েছে! টপ করে আরো এক ফোঁটা রক্ত পড়ল খাতার ওপর। টিকটিকির এমন সবুজ রক্ত হয়?

খামোকা ভয় পাচ্ছে ও! নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল শ্রীনাথ। ওই গজাল মার্কা ব্যাপারটা আগে থেকেই নিশ্চয় সিলিঙে ছিল। টিকটিকিটা বেশি লাফঝাঁপ করতে গিয়ে কোনোভাবে তাতে গেঁথে গেছে। মাঝখান থেকে খাতাটা গেল। সদাশিউ-কে ডেকে বলতে হবে সাফ করতে, নইলে রাতে ঘুমোবে কী করে? তবে তার আগে এ-সব ছাই-ফাই সরাতে হবে।

আরেকটা পাতা ছিঁড়ে সব কুড়িয়ে তুলতে-তুলতে আবার সেই অস্বস্তির শিহরণ টের পেল শ্রীনাথ। ঝট করে উঠে দাঁড়াতেই ওর শরীর কেঁপে উঠল। ঝরঝর করে হাত থেকে পড়ে গেল এতক্ষণ কষ্ট করে জড়ো করা সিগারেট ও ছাই।

কাচের জানলার ঠিক ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন সদাশিউ উসগাঁওকর। কাঁচে মুখটা প্রায় ঠেকানো, ঘরের ঢিমে আলোয় লালচে মুখটা হিংস্রভাবে বেঁকে আছে। দু’ চোখে জ্বলন্ত ঘৃণা নিয়ে সটাং চেয়ে আছেন ভদ্রলোক শ্রীনাথের দিকে।

শ্রীনাথ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখল, সদাশিউয়ের ক্রোধে বিকৃত মুখ হাঁ হল চেঁচানোর জন্য। পাশ থেকে তাঁর ডান হাতটাও উঠে এল উপরে।

গলা দিয়ে উঠে আসা আর্তনাদটা গিলে ফেলে এক দৌড় মারল শ্রীনাথ। ঘর থেকে বেরিয়ে, হল পেরিয়ে, কোনোরকমে বাইরের দরজা খুলে সোজা জঙ্গলের মধ্যে এলোপাথাড়ি দৌড়ল ও। সদর দরজা পেরোনোর সময় ও শুনতে পেয়েছিল পিছনে জানলার কাঁচ ঝনঝন করে ভেঙে পড়ার আওয়াজ।

উদ্যত হাতটায় একটা প্রমাণ সাইজের ঝকঝকে কুঠার ছিল।

এ-রকম রুদ্ধশ্বাস দৌড় জীবনে কখনো দৌড়য়নি শ্রীনাথ। পথে একবার বেকায়দায় পা পড়ায় আগের ভাঙা জায়গাটা চিড়িক দিয়ে উঠেছিল, গ্রাহ্যই করেনি। এমনকি দূরে একটা আলো দেখার পরও স্পিড কমায়নি ও। বরং ফুরিয়ে আসা দম একত্র করে আরো জোরে ছুটতে চেষ্টা করেছিল। কাছে আসার পর দেখতে পেয়েছিল, সাদা রঙের দোতলা কটেজ স্টাইলের একটা বাড়ির কাছে এসে পড়েছে ও। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে গেটের পাশে, নাম পড়া যাচ্ছে দূর থেকেও— ডিভাইন ফরেস্ট লজ। সেই অন্য হোটেলটা নিশ্চয়।

কোনরকমে শেষ ক’টা কদম শরীরকে প্রায় টেনে এনে দরজায় ধাক্কা দেয় শ্রীনাথ।

খোলাই ছিল দরজা। রিসেপশনে কেউ ছিল না। চারদিকের ডেকোরেশন দেখতে-দেখতে একটু যখন দম ফিরে এসেছে ওর, তখনই ভদ্রমহিলা এলেন। মুখটা আলগা লাবণ্যে বেশ শ্রীময়ী। পরিপাটি শাড়িতে সর্বাঙ্গ ঢাকা। স্পষ্ট ইংলিশ উচ্চারণ, চোস্ত হিন্দি। ওকে প্রথমে দেখে চমকে গেছিলেন মহিলা। কিন্তু ওর কিছুটা এলোমেলো ভাবে বলা কথাগুলো শুনে মহিলার চোখে একেবারে নিখাদ দুশ্চিন্তা আর সহানুভূতি ফুটে উঠল। ওকে সোফায় বসতে বলে মহিলা এক গ্লাস জল এনে দিলেন। তারপর ডেস্কের পেছনের সিটে বসে বললেন, “আজ রাতটা এখানেই থাকুন। স্পেয়ার রুম আছে একটা, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খুব জোর বেঁচে ফিরেছেন আজ।”

“সে আর বলতে!” উদ্ভ্রান্তের মতো বলল শ্রীনাথ, “যা পাগলের পাল্লায় পড়েছিলাম!”

মহিলা মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আগের চেয়েও ধীর গলায় বললেন, “পাগল নয়। সত্যিই একটা হোম স্টে ছিল ওইদিকে বছরপাঁচেক আগে অবধিও। স্বামী-স্ত্রী মিলে চালাতেন। সুনামই ছিল। তারপর, একদল ছেলে এসেছিল বেড়াতে। তখন সবে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো আসছে পুনেয়। সেখানেই চাকরি করত তারা।”

বলতে বলতেই আরও কিছুটা জল এগিয়ে দেন মহিলা। ঢকঢক করে গ্লাস খালি করল শ্রীনাথ। তারপর বলল, “তারপর?”

“তারপর এক রাত্রে বাড়ি পুড়ে ছাই। ভাঙাচোরা স্ট্রাকচার এখনো আছে। ছেলেছোকরার দল! এন্তার সিগারেট খাচ্ছিল, তাদেরই কেউ অসাবধানে ছুঁড়ে ফেলেছিল হবে সোফায় বা বিছানায়। আগুন একবার ধরলে আর ছড়াতে কতক্ষণ! ভদ্রলোক বাইরে গেছিলেন একটু জিনিসপত্র আনতে, এসে দেখেন গোটা বাড়ি দাউদাউ জ্বলছে। ছেলেগুলো কোনরকমে জানলা ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু ভদ্রলোকের স্ত্রী কিচেন থেকে প্রথমে কিছুই টের পাননি। যখন পেলেন তখন খুব দেরি হয়ে গেছে।”

“মানে, বাঁচেননি?”

“সেভেনটি পারসেন্ট বার্ন নিয়ে কেউ বাঁচে?”

“ওহো!” সত্যিই দুঃখিত হয় শ্রীনাথ, “সেই শোকেই কি ভদ্রলোক পাগল হয়ে গেছেন?”

ভদ্রমহিলা ফিরে তাকান ওর দিকে। তাঁর দু’চোখ জ্বলে ওঠে উত্তেজনায়।

“বলছি না, পাগল নয়! বউ মারা যাবার দেড় মাসের মাথায় বিষ খেয়ে সুইসাইড করেছিল। জায়গাটা বেওয়ারিশ পড়ে আছে সেই থেকে।”

শ্রীনাথের হতভম্ব লাগছিল। মাথা ঘুরছিল। এ-সব কী শুনছে সে? আজ কার সঙ্গে গাড়ি করে এল ও, তাহলে?

“চলুন। আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিই।”

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে করিডোরের শেষ প্রান্তে নিয়ে যান মহিলা। ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে বলেন, “ওই টেবিলে জলের বোতল আছে দেখবেন। আর এই অ্যাটাচড বাথ। আমি যাই এবার।”

হ্যাঁ, এই হল একটা ঠিকঠাক হোটেল! বিছানার পরিপাটি সাদা চাদর, দেওয়ালের ঝকঝকে আয়াতাকার আয়নার দিকে সপ্রশংস হয়ে তাকিয়েছিল শ্রীনাথ। মহিলার কথায় সম্বিত পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। এক লহমার জন্য বন্ধ হতে থাকা দরজার ফাঁক দিয়ে ওর চোখে পড়ল, মহিলার গায়ে আর আঁচল মুড়ি নেই। গলার নীচ থেকে ব্লাউজের লাইন অবধি অনাবৃত অংশের চামড়া কেমন কালো, কুঁচকোনো। যেন দগদগে পোড়া চামড়া!

চমক কাটার আগেই দরজাটা ক্লিক করে বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। সেই মুহূর্তেই শ্রীনাথের সারা শরীর জুড়ে হিমস্রোত খেলে গেল। ওর মনে হল, ওর পা দুটো কেউ যেন পেরেক দিয়েই গেঁথে ফেলেছে মাটিতে।

নতুন হোটেলের এই ঘরের বন্ধ দরজার পিছনের ব্র‍্যাকেটে ওর খুব পরিচিত একটা নীল রেইনকোট আর একজোড়া মোজা ঝুলছে!

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor