Friday, April 3, 2026
Homeবাণী ও কথাইংলিশ ম্যান - হুমায়ূন আহমেদ

ইংলিশ ম্যান – হুমায়ূন আহমেদ

কক্সবাজারে পর্যটনের কিছু কটেজ আছে। এদের বলে ওল্ড কটেজ। সুন্দর সুন্দর নাম–তন্ময়, তটিনি …। এক সময় এই কটেজগুলি সমুদ্রের কাছাকাছি ছিল। কটেজের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলে সমুদ্র দেখা যেত। আজ আর দেখা যায় না। সমুদ্র দূরে সরে গেছে। কটেজগুলি আলাদা হয়ে গেছে। সমুদ্রের সঙ্গে আজ আর তাদের যোগ নেই। পর্যটন নতুন নতুন কটেজ বানিয়েছে, আধুনিক মোটেল তৈরি করেছে–তন্ময় তটিনিকে নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।

আমি এবার কি মনে করে পুরানো কটেজগুলির একটায় উঠলাম। এই কটেজে রান্না করে খাবার ব্যবস্থা আছে। মনে করলাম, ব্যাপারটা মন্দ হবে না, বাজার করে। রান্নাবান্না করে খাওয়া হবে। পিকনিক-পিকনিক ভাব।

কল্পনা এবং বাস্তবের ভেতরকার দূরত্ব অনেক বেশি। বাস্তবে দেখা গেল, রান্না করে খাওয়ার ব্যাপারটায় যন্ত্রণার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সন্ধ্যাবেলা বাজারে গিয়ে দেখি, অপরিচিত চেহারার কিছু সামুদ্রিক মাছ ছাড়া আর কিছু নেই। গোশত পাওয়া গেল। যিনি গোশত বিক্রি করছেন তিনি নিতান্তই সত্যবাদী। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, কিসের গোশত? তিনি অম্লান বদনে বললেন–বুড়া মহিষ। ইচ্ছা হইলে নেন।

ঢাকার নিউমার্কেট থেকে না জেনে মহিষের গোশত প্রায় রোজই খাচ্ছি। জেনে শুনে বৃদ্ধ মহিষ খাওয়া অসম্ভব। দুটা মুরগী পাওয়া গেল। মুরগী দু’জনও যথেষ্ট অভিজ্ঞ। ঘণ্টা দুই গনগনে আগুনে জ্বাল দেবার পর অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেল। যতই জ্বাল হচ্ছে মাংস ততই শক্ত হচ্ছে।

রাত ন’টায় আমাদের কাজের মেয়েটি এসে বলল, লাকড়ি শেষ হয়ে গেছে। আরো লাকড়ি লাগবে।

আমি লাকড়ি আনতে বের হলাম এবং প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম, ঢাকার বাসিন্দা যারা গ্যাসের চুলায় রান্না করছেন তারা কত সুখেই না আছেন।

আমাদের খাওয়া শুরু হতে হতে রাত সাড়ে বারোটা বাজল। আমার বড় মেয়ে নোভা খেতে খেতে তার মাকে বলল, নিজে রান্না করে খাওয়ার এই বুদ্ধি আব্দুকে কে দিয়েছে মা?

নোভার মা আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, তোমার বাবার কি বুদ্ধির কোন অভাব আছে যে অন্যদের কাছ থেকে ধার করবে? সে চলে তার নিজের বুদ্ধিতে। সেই বুদ্ধির ফলাফল তো তোমরা দেখছ–সবাই সমুদ্র দেখে, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমুচ্ছে। আমরা কেবল খেতে বসেছি। মুরগী এখনো সিদ্ধ হয়নি।

‘মুরগী সিগ্ধ হচ্ছে না কেন মা?’

‘তোমার বাবা নিজের বুদ্ধি খরচ করে মুরগী কিনেছে তো, তাই সিদ্ধ হচ্ছে না। এই যন্ত্রণার আজই শেষ–কাল থেকে আমরা হোটেলে খাব।‘

খাওয়ার শেষে কটেজের বারান্দায় বিরস মুখে বসে মশার কামড় খাচ্ছি। স্বাস্থ্যকর স্থানের মশারাও স্বাস্থ্যবান হবে, বলাই বাহুল্য। এরা মনের সুখে কামড়ে যাচ্ছে। আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। গতকাল পূর্ণিমা ছিল। আজ পূর্ণিমার দ্বিতীয় দিবস। পূর্ণিমা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়। কক্সবাজার রওনা হবার আগে পঞ্জিকা দেখে। রওনা হয়েছি। সমুদ্রে চাঁদের আলো দেখার মত ব্যাপার। সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্যে

আজ তেমন আগ্রহ বোধ করছি না। বাচ্চারা সব ঘুমিয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের মা যে। পরিমাণ রেগে আছে তাতে মনে হয় না সে আমার সঙ্গে সমুদ্র দেখতে যাবে।

মোটামুটি শীত পড়েছে। চাঁদরে শরীর ঢেকে আমি বসে আছি। এত সুন্দর জোছনা যে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে না। একা সমুদ্রের কাছে যেতেও ইচ্ছা করছে না। সৌন্দর্য একা দেখার জিনিস নয়।

রাত একটার দিকে গুলতেকিন শাল গায়ে দিয়ে বাইরে এসে বলল, চল, তোমার সমুদ্র-জোছনা দেখে আসি।

আমি আমার স্ত্রীর এই বাক্যটির জন্যে তার পূর্বের এক হাজার অপরাধ ক্ষমা করে দিলাম।

সমুদ্রের কাছে কিন্তু যাওয়া হল না। কটেজের বাইরে পা দিয়েই এক ধরনের অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। দৃশ্যটি বর্ণনা করার চেষ্টা করি–

আমাদের কটেজের ডানপাশে অনেকখানি খালি জায়গা। জায়গাটার এক অংশে বেশকিছু বাশ পোঁতা। বাঁশগুলি সুতলি দিয়ে বাঁধা। সেই সব সুতলিতে রঙিন কাগজ, ছেঁড়া কাগজ, কাপড়ের টুকরা সাজানো। বোঝাই যাচ্ছে, যে সাজিয়েছে সে খুব যত্ন করে সাজিয়েছে। কিন্তু সেই সাজানোয় সুন্দরের চেয়ে অসুন্দর অনেক বেশি। তাকালেই মনে এক ধরনের ধাক্কা লাগে।

সাজানোর কাজটি যে করেছে তাকে আমরা এখন দেখলাম। খালি গায়ে রোগা লম্বা একজন মানুষ। তার জ্বলজ্বলে চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে–মানুষটা স্বাভাবিক। নয়। আস্তাকুঁড় থেকে সে রাজ্যের ময়লা নিয়ে এসেছে। ময়লা থেকে বেছে বেছে রঙিন কাগজ নিয়ে সুতলিতে সাজাচ্ছে। কাজটা সে মোটেই হেলাফেলার সঙ্গে করছে না। কয়েকটা রঙিন কাগজের টুকরা বের করে সে প্রথমে তার সামনে রাখে। দীর্ঘ সময় কাগজের টুকরাগুলির দিকে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবে। তারপর একটা একটা করে কাগজ লাগায়। লাগিয়ে দূর থেকে, কাছে থেকে নানানভাবে সে পরীক্ষা করে।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, পাগলদের খুব ভদ্র ভঙ্গিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা জবাব দেয়। ভালভাবেই জবাব দেয়। আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি করছেন?

লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। আমি আবার বললাম, আপনি কি করছেন?

লোকটি চিটাগাং-এর কথ্য ভাষায় যা বলল তা হল–তুমি কি দেখতে পারছ না। আমি কি করছি?

আমার প্রশ্নটা ছিল বোকার মত। উত্তর শুনে খানিকটা হকচকিয়ে যেতে হল। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম–সাজাচ্ছেন কেন?

লোকটি সেই প্রশ্নের জবাব দিল না। গভীর মনোযোগে কাগজ বাছতে লাগল। সমুদ্র-জোছনার চেয়ে লোকটির কাণ্ডকারখানা আমার কাছে অনেক আকর্ষণীয় মনে হল। আমি কটেজের বারান্দায় ফিরে গেলাম। গভীর আগ্রহে পাগলের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম। কটেজের নাইট গার্ড আমাকে বলল–এই পাগল অনেকদিন থেকে কক্সবাজারে আছে। সারাদিন সে রঙিন কাগজ খুঁজে বেড়ায়। রাত বারোটার পর থেকে সাজাতে শুরু করে। সাজানো শেষ হলে কয়েকটা ইট বিছিয়ে আগুন জ্বালায়। সেই আগুনে নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খায়। খাওয়া শেষ হবার পর নিজের শিল্পকর্মের সামনে মূর্তির মত বসে থাকে। রাত এই ভাবে কাটিয়ে ভোর হবার আগে আগে আবার বের হয়ে পড়ে রঙিন কাগজের খোঁজে।

নাইটগার্ড যা বলল সবই ঘটতে দেখলাম। যা সে বলেনি বা বলতে ভুলে গেছে তাও দেখলাম। লোকটি যে তার শিল্পকর্ম মুগ্ধ হয়ে দেখে তা না, শিল্পকর্মের সামনে কিছুক্ষণ আত্মভোলা ভঙ্গিতে নাচে।

এই লোকটির অতীত ইতিহাস কি?

কেন সে রঙিন কাগজে ঘর সাজায়? কি ভাবে সে? এই রহস্য কোনদিনও জানা হবে না। জগতের অনেক রহস্যের মত এই রহস্যও ঢাকা থাকবে অনেক দিন।

পাগলদের প্রতি আমার আগ্রহ এবং কৌতূহল সীমাহীন। এদের সবারই আলাদা নিজস্ব লজিক আছে। সেই লজিকের কারণে কাউকে কাউকে দেখা যায় গভীর একনিষ্ঠতায় ট্রাফিক কনট্রোল করছে, আবার কাউকে কাউকে দেখা যায় রঙিন কাগজ জড়ো করে বিচিত্র শিল্পকর্ম তৈরি করছে।

ঢাকা কলেজে যখন পড়ি তখন আমার ক্লাসেরই এক ছাত্রের সঙ্গে আমার। খানিকটা ঘনিষ্ঠতা হয়। চমঙ্কার ছেলে। ভদ্র, বিনয়ী, মেধাবী। দোষের মধ্যে একটিই–বড় বেশি ইংরেজি বলে। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ইংলিশম্যান। ইন্টারমিডিয়েট সে আমার সঙ্গেই পাস করল। স্টার মার্কস পেল। তারপর আর তার সঙ্গে আমার। কোন যোগাযোগ রইল না। দীর্ঘদিন পরের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করছি। হঠাৎ অবাক হয়ে দেখি, আমার ছাত্রদের মাঝে মাথা নিচু করে ইংলিশম্যান বসে আছে। আমি পড়ানো বন্ধ করে বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি অমুক না?

সে স্নান গলায় বলল, ইয়েস স্যার।

‘ক্লাস শেষ হবার পর তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে।‘

‘জ্বি, আচ্ছা স্যার।‘

ক্লাসের শেষে সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। বেচারা লজ্জায় মরে যাচ্ছে। চেয়ারে বসতে বললাম, কিছুতেই বসবে না। খুবই অস্বস্তিকর অবস্থা। তার কাছ থেকে যা জানলাম তা হল–ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর পর তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। শেষ পর্যায়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানো হয়। এখন সে সুস্থ। আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।

আমি তাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিলাম। দীর্ঘদিন পার করে আবার পড়াশোনা শুরু করার সৎসাহস তুচ্ছ করার বিষয় নয়। আমি তাকে বললাম, কখনোই আমাকে স্যার ডাকবে না। আগের মত হুমায়ুন করেই ডাকবে।

আমি দূরত্ব দূর করতে চাইলাম, দূর হল না। রাস্তা ঘাটে দেখা হলে অন্য ছাত্রদের মতই বিনীত ভঙ্গিতে সে আমাকে সালাম দেয়। ক্লাসে মাথা নিচু করে বসে থাকে। আমি প্রায়ই আমার রুমে তাকে ডেকে নিয়ে আসি চা খাবার জন্যে। নানান ধরনের গল্প করার চেষ্টা করি। গল্প জমে না। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, পাগল হবার সময়ের কথা কি কিছু মনে আছে?

সে ইতস্তত করে বলল, না।

‘কোন কিছুই মনে নেই?’

সে চুপ করে রইল। আমি বললাম, যদি মনে থাকে আমাকে বল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।

সে নিচু গলায় বলল, পাগল হবার আগের সময়টার কথা মনে আছে।

‘বল শুনি।‘

‘আমি আমার পড়ার ঘরে বসেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম ঘরটা ছোট হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালগুলো আমার কাছে চলে আসছে। তখন ভয় পেয়ে আমি একটা বিকট চিৎকার দেই।‘

‘এর পরের কথা তোমার আর কিছু মনে নেই?’

‘না। শুধু মনে আছে–সারাক্ষণ একটা কুকুরের মুখ দেখতাম। মুখটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।‘

‘কি রঙের কুকুর?’

‘ঘিয়া রঙের। কুকুরটার শরীর ছোট কিন্তু মুখটা অনেক বড়। গরুর মুখের মত বড়।‘

‘আর কিছু তোমার মনে নেই?’

‘না।‘

ইংলিশম্যান রসায়ন বিভাগে দুই বছর পড়াশোনা করল। থার্ড ইয়ারে উঠে সে আবার পাগল হয়ে গেল। একদিন ক্লাসে এসে উপস্থিত হল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। ভয়াবহ ব্যাপার! আমি তাকে ডেকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। আমি বললাম, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?

সে হেসে বলল, হ্যাঁ, তুমি হুমায়ূন।

আমি একটি এপ্রন এনে তাকে পরতে দিলাম। সে কোন আপত্তি না করেই এপ্রন। পরল। আমি বললাম, তুমি যে কোন কাপড় ছাড়া ডিপার্টমেন্টে এসেছ–এটা কি ঠিক হয়েছে? তোমার বন্ধুরা খুব লজ্জা পাচ্ছে। কেউ কেউ ভয়ও পাচ্ছে। তুমি কি তা বুঝতে পারছ না?

‘পারছি।‘

‘তুমি অসুস্থ।সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টে আসার তোমার কোন দরকার নেই। আর যদি আস কাপড় পরে আসবে, কেমন?’

ইংলিশম্যান ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কাপড় পরলে সে রাগ করে।

‘কে রাগ করে?’

‘কুকুরটা রাগ করে।‘

 ‘কোথায় কুকুর?’

‘এইখানে নাই। রাস্তায় গেলেই আসে।‘

‘কুকুর রাগ করুক আর যাই করুক–তুমি সবসময় কাপড় পরে থাকবে।‘

‘আচ্ছা।‘

ইংলিশম্যানের এক ভাই পড়তো ফার্মেসী বিভাগে। তাকে খবর দিলাম। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে বড় ভাইকে বাসায় নিয়ে গেল। সমস্যার শেষ হল না। এটা ছিল সমস্যার শুরু। ইংলিশম্যান দু-তিন দিন পর পরই ডিপার্টমেন্টে আসতে শুরু করল। এসেই সে খোঁজে আমাকে। ব্যাকুল হয়ে ডাকে–হুমায়ূন, হুমায়ুন। আমি একদিন তার ভাইকে ডেকে ধমকে দিলাম। এসব কি! অসুস্থ একটা ছেলেকে আটকে রাখতে হবে। তারা ছেড়ে দিচ্ছে কেন?

আমি তখন বাবর রোডের বাসায় থাকি। এক ছুটির দিন ভোরবেলায় সে আমার বাসায় উপস্থিত। আগের মত অবস্থা। গায়ে কোন কাপড় নেই, শুধু মাথায় একটা রুমাল বাঁধা। কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক। আমি বললাম–বাসা চিনলে কিভাবে?

সে হাসল।

আমার বাসা তার চেনার কোনই কারণ নেই। আগে কোনদিন বাসায় নিয়ে আসিনি। ডিপার্টমেন্ট থেকে ঠিকানা জোগাড় করে আসবে, তাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেউ তাকে ঠিকানা দেবে না।

আমি তাকে বসার ঘরে এনে বসালাম। নিজের একটা পুরানো প্যান্ট পরিয়ে দিলাম। সে আপত্তি করল না। বরং আগ্রহ করে পরল। চা খেতে দিলাম। চা খেল।

আমি বললাম, ঠিকানা কোথায় পেলে?

ইংলিশম্যান বলল, ঠিকানা লাগে না। আমি আতংকিত বোধ করলাম। সে তো এখন রোজই এখানে আসবে। আমাকে অস্থির করে মারবে।

যা ভাবলাম তাই ঘটল। ইংলিশম্যান কয়েকদিন পরপরই আসে। তবে বিরক্ত করে না। প্রথম দিন সোফার যে জায়গায় বসেছিল রোজ এসে সেই জায়গাটায় বসে। চা দিলে খায়। ঘণ্টা দুই বসে থেকে চলে যায়। আমি তাকে অনেক বুঝালাম–রোজ এভাবে আসা ঠিক না। অনেক সমস্যা হয়। প্রতিবারই সে আন্তরিক ভঙ্গিতে বলে–আর আসব না। কিন্তু আবারো আসে। ইংলিশম্যানের যন্ত্রণায় অবস্থা এমন হল যে আমি বাসা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতে লাগলাম। নতুন কোন জায়গায় গিয়ে উঠব যাতে সে আমার খোঁজ না পায়। সেটাও সম্ভব হল না। আমার তখন আর্থিক সামর্থ্য নেই বললেই চলে। কোন রকমে জীবন ধারণ করে আছি। নতুন বাসা ভাড়া নেয়ার অবস্থা। নেই। বাবর রোডের যে বাসায় থাকি তা সরকারী বাসা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে বরাদ্দ দেয়া। নামমাত্র ভাড়া। আমি মাটি কামড়ে সেখানেই পড়ে রইলাম। ইংলিশম্যান নিয়তির মতো হয়ে গেল। ধরেই নিলাম সে আসবেই। আসেতই থাকবে। হলও তাই।

পাগলদের প্রতি আমাদের সমাজ খুব নিষ্ঠুর আচরণ করে। এই নিষ্ঠুরতা সবচে’ বেশি দেখা যায় শিশুদের বেলায়। যে কোন কারণেই হোক শিশুরা পাগল সহ্য করতে পারে না।–ইংলিশম্যান যতবার আমার এখানে এসেছে ততবারই শিশুদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে। শিশুরা তাকে তাড়া করে। পাথর ছুঁড়ে। বড়রা তাদের আটকায় না। দূরে দাঁড়িয়ে হাসে। মজা দেখে।

ইংলিশম্যানের উপদ্রব হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেল। চার মাস কেটে গেল, তার দেখা নেই। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আশংকা পুরোপুরি গেল না। এটা হয়ত সাময়িক বিরতি। আবার আসতে শুরু করবে। জীবন অর্থহীন করে দেবে। সে এল না। দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল। মানুষ অস্বস্তিকর স্মৃতি মনে রাখে না। আমিও মনে রাখলাম না। ইংলিশম্যানের কথা ভুলে গেলাম।

এক শীতের সকালের কথা। ছুটির দিন। নিউমার্কেটে এসেছি–কাগজ কিনব। হঠাৎ দেখি ইংলিশম্যান। সুন্দর একটা বাদামী রঙের স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। স্যুটটায় তাকে খুব মানিয়েছে। তার গায়ের রঙ ফর্সা। সেই রঙ যেন আরো খুলেছে। মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চোখে চশমা। চশমার ফ্রেমটাও সুন্দর। ইংলিশম্যানের হাতে একটা শপিং ব্যাগ, অনেক কেনাকাটা করেছে বলেও মনে হল।

আমি একবার ভাবলাম দেখা না করে চলে যাই। পরমুহূর্তেই সেই চিন্তা পাথর চাপা দিয়ে এগিয়ে গেলাম। ইংলিশম্যান আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এল।

আমি বললাম, কেমন আছ?

সে বলল, ভাল। মাঝখানে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। এখন ভাল।

‘করছ কি এখন?’

‘বিজনেস করি। বড় ভাই একটা বিজনেসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।‘

‘কিসের বিজনেস?’

‘ডাই বিজনেস। কাপড়ে রঙ দেয়া হয় যে সেই রঙ।‘

‘একদিন আস আমার বাসায়। ইংলিশম্যান বলল, অবশ্যই যাব। তোমার বাসার ঠিকানা দিয়ে যাও। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি আমার বাসার ঠিকানা জান না?’

‘না। তুমি তো কখনো বাসার ঠিকানা দাওনি।‘

আমি একটা কাগজে বাসার ঠিকানা লিখে দিলাম। ইংলিশম্যান সেই কাগজের টুকরা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, আমি অবশ্যই যাব। আমার বউকে নিয়ে যাব।

আমি বিয়ে করেছি ভাই।

‘কবে বিয়ে করলে?’

‘বেশিদিন হয়নি–মাস চারেক। আমার তো পড়াশোনা কিছুই হয়নি–এদিকে লাবনী জেনারেল হিস্ট্রিতে এ বছর এম. এ. পাস করেছে।‘

‘বাহ, ভাল তো।‘

‘দাঁড়াও তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ও পনীর কিনতে গেছে। ভাই, তোমার কাছে সিগারেট আছে? আমাকে একটা সিগারেট দাও। লাবনীর জন্যে সিগারেট খেতে পারি না।‘

আমার কাছে সিগারেট ছিল না। আমি দু’টি সিগারেট কিনে নিয়ে এলাম। লাবনীর সঙ্গে পরিচয় হল। শ্যামলা রঙের বড় বড় চোখের মিষ্টি একটা মেয়ে। খুব হাসি-খুশি।

ইংলিশম্যান বলল, হুমায়ূন, আমার খুব ভাল বন্ধু। লাবনী বলল, আপনি ভাল বন্ধু, তাহলে আপনি আমাদের বিয়েতে আসেননি কেন?

.

ইংলিশম্যান সম্পর্কে আমার লেখা এখানে শেষ করতে পারলে ভাল হত। তা পারছি না। তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় প্রায় দশ বছর পর। সম্পূর্ণ নগ্ন গায়ে সে বসেছিল ফুটপাতে। তার গা ঘেঁষে একটা ঘিয়া রঙের কুকুর। কুকুরটার মুখ শরীরের তুলনায় বড়। ইংলিশম্যানকে দেখলাম কুকুরটাকে খুব আদর করছে।

পরম রহস্যময় এই জগতের কোন রহস্যই কি আমরা পুরোপুরি জানি?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi