Thursday, February 22, 2024
Homeকিশোর গল্পরূপকথার গল্পছোট পরী ও রাখালের রূপকথার গল্প

ছোট পরী ও রাখালের রূপকথার গল্প

ছোট পরী ও রাখালের গল্প

চারিদিকে পাহাড় ঘেরা উপত্যকার মাঝে ছিল অপূর্ব সুন্দর এক জলাশয়। তা দেখে যেন স্বর্গও লজ্জা পাবে এমন সুন্দর পরিবেশ সেখানে।

সেই জলাশয়ের তীরে প্রতি বছর গ্রীষ্ম পূর্নিমায় বেড়াতে আসে পরিরাজ্যের সাত পরী, তারা সাত বোন। তাদের ডানাগুলো একটা গাছের নিচে লুকিয়ে রেখে আনন্দ করে জলে নেমে জলকেতি খেলা করে।

জলাশয়ের চারপাশ জনশূন্য। তার ভরা পূর্নিমার আগে ও পরে মিলে সাতদিন আনন্দ করে তারপরে আবার ডানাগুলো পরে উড়ে যায় নন্দনকাননে তাদের পরীরাজ্যে নিজের দেশে।

এদিকে কাছাকাছি যে কিছু গ্রাম আছে সে খবর তারা না রাখলেও পরীদের সব খবর রাখে কিন্তু সেই গ্রামেরই এক অনাথ রাখাল ছেলে। সে গরু চরায়, বাঁশি বাজায় আর দূর থেকে দেখতে থাকে পরীদের কান্ডকারখানা। একসময় তার খুব ভালো লেগে যায় সবচেয়ে ছোট পরীটিকে। কি অপরূপ মিষ্টি চেহারা! ওকে দেখলেই রাখালের বাঁশিতে বেজে ওঠে স্বর্গীয় সব সুর। দূর থেকে পরীরা তা শোনে আর অবাক হয়ে ভাবে এমন সুন্দর সুর কে বাজায়, এ সুর তো নন্দনকাননের পাখিদেরও অজানা! তারা মুগ্ধ হয়ে শোনে, কিন্তু রাখাল থাকে আড়ালে, তাকে কেউ দেখতে পায় না।

একবার হলো কি রাখালের মাথায় একটা দুষ্টবুদ্ধি জাগলো। পরীরা যখন স্নানে ব্যস্ত, সে চুপিচুপি এসে দাঁড়ালো সেই গাছতলাটিতে যেখানে খুলে রাখা আছে পরীদের ডানাগুলো। ভাল করে দেখে সবচেয়ে ছোট ডানাজোড়া নিয়ে সে লুকিয়ে রেখে দিল একটা বড় গাছের ফোকরে। তারপর সেখান থেকে সরে পড়ল সে। এরপর দেখতে দেখতে সাত দিন কেটে গেল পরিদের আনন্দ করার সময়, সাতদিন পরে পরীদের যাবার সময় হলে দেখা গেল তাদের ছোটবোনের ডানাজোড়া নেই সেখানে, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তারা সেটা পেল না।

এদিকে বাবার কড়া হুকুম, একসপ্তাহের বেশি তাদের পরিরাজ্য ছেড়ে থাকতে পারবে না।

এখন কি করে চিন্তায় পরে গেল সাত বোন, সবচেয়ে যে বড় পরী সে তার ছোট বোনকে বুঝিয়ে বলল, ‘উপায় নেই রে বোন, আমাদের যেতেই হবে, আর না গেলে পরের বছরের আগে আর আসতে পারব না। তুই বরং এখানে থেকে ডানা জোড়া ভাল করে খুঁজে দেখ, পেলেই দেশে চলে আসিস, কেমন? আমরা বাবাকে বুঝিয়ে বলব তিনি যেন রাগ না করেন।

বড় ছয় পরী ছোট বোনকে একা জলাশয়ের পাড়ে ফেলে রেখে তো উড়ে চলে গেল, বেচারী ছোটপরী মনের দু:খে বসে বসে কাঁদতে লাগলো।

তাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে রাখাল সাহস করে আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। সব শুনে সে তাকে নিজের বাসায় নিয়ে গেল, তারপর অনেকক্ষণ ধরে বাঁশি বাজিয়ে শোনাল। এই রাখালের বাঁশিই যে তাকে দূর থেকে এত আনন্দ দিয়েছে ভেবে পরীর খুব ভালো লাগলো, তাদের বন্ধুত্ব হতে দেরী হলো না।

রাখাল আর পরী গ্রামের একপ্রান্তে একটি কুঁড়েঘরে থাকে, দু’জন একত্রে সারা দিন ধরে মাঠে গরু চরায়।

রাখাল বাঁশি বাজায় আর পরী দোপাট্টা উড়িয়ে নাচে, তাই দেখে গ্রামের লোকেরা ঠিক করলো এদের বিয়ে হওয়া উচিত। রাখাল তো রাজি ছিলই, পরীও কি আর করে, রাজি হয়ে গেল। তারপর এক শুভ দিন দেখে বেশ উৎসবের মধ্যে দিয়ে তাদের দু’জনের বিয়ে হয়ে গেল।

রাখাল আর পরীর দিনগুলো বেশ সুখেই কাটে। আবার পরীর চোখ মাঝে মাঝে জলে ভরে ওঠে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, তার আপনজনদের কথা ভেবে আর বড় বোনদের কথা মনে করে।

কি আনন্দই না করত তারা সাতজন মিলে। পরিরাজ্যের নন্দনকাননে অপূর্ব শোভা, বাবার স্নেহ আর বাবা তাঁর প্রিয় ছোট মেয়েকে ছেড়ে আছেন কি করে সে কথা ভেবে অভিমানও হয়।

এরকম কষ্টের সময়ে রাখাল তাকে বাঁশিতে মিষ্টি সুর বাজিয়ে শোনায়, পৃথিবীর, মানুষদের সব গল্প বলে, শেষে একসময় ছোট পরি সব ভুলে ঘুমিয়ে পড়ে।

এক বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে, এদিকে ছোট পরীর কোল আলো করে একটি ছেলে জন্ম নিল। ছেলে হওয়ার পর ছোটপরী যেটুকু দু:খকষ্ট ছিল তাও সে ভুলে গেল। দেখতে দেখতে বছরটি পার হয়ে গেল এবং সেই পূর্নিমার সময় হয়ে এল। ছোটপরী এতদিনে তা ভুলেই গেছিল কিন্তু রাখালের কিন্তু তা মনে ছিল, তার দিদিদের আসার সময় হয়ে এসেছে যে।

রাখালের চোখে পড়ল ছোটপরীর দিদিরা এক এক করে জলাশয়ের তীরে নামল। কিন্তু তারা জলে না নেমে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো। রাখাল তখন তাদের সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিল, তারা তো ছোটপরী ভালো আছে শুনে খুশি হয়ে তখনি রাখালের সাথে চলে এলো তাদের বাসায়। তারপর তো সাতবোনের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না, হাসি আর গল্প চলল সারারাত ধরে। ছোটপরীর ছেলেটিকে মাসীরা মিলে খুব আদর করলো।

দেখতে দেখতে সাতদিন শেষ হয়ে গেল, যখন তাদের যাবার সময় হলো, রাখাল একফাঁকে ছুটে গিয়ে ছোটপরীর ডানাজোড়া নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে সব কাহিনী খুলে বলল।

পরী স্তম্ভিত হয়ে শুনলো। শেষে ছোটপরি রেগেমেগে ডানাজোড়া পরে বলল, ‘তুমি যা করেছ, তার জন্যে ক্ষমা নেই।

তুমি থাক এখানে তোমার ছেলে নিয়ে একা, আমি চললাম দিদিদের সাথে। তারপর সে সত্যিই জলাশয়ের তীরে এসে দিদিদের সাথে দেখা করে ওদের সঙ্গে উড়ে চলে গেল পরিরাজ্যে তাদের দেশে।

কিন্তু পরিরাজ্যে এসেও ছোটপরির শান্তি নেই। ছোটপরীর মন পড়ে আছে জলাশয়ের তীরের সেই পাহাড়ি গ্রামের ছোট্ট এক কুঁড়েঘরে, যেখানে আছে তার ছেলে আর স্বামী রাখাল।

এক এক করে তার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগলো, সেই রাত জেগে তাদের গল্প করা, নির্জন মাঠে রাখালের বাঁশি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। একটা চাতুরী রাখাল করেছিল, কিন্তু মানুষটা তো সে খারাপ নয়, চাইলে তো সে পাখাগুলো ফেরত না দিলেও পারত। এখানে তার সব আছে, সব কিছুই সুন্দর এখানে, কিন্তু ভালবাসা নেই, বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই।

আর দু:খের স্বাদ যে একবার পেয়েছে সেই জানে একটানা সুখও বড় একঘেয়ে- পরিরাজ্যে তো দু:খ বলে কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা সে ভুলতে পারছে না সেই ছোট্ট বাচ্চাটিকে যে আর ক’দিন পরেই তাকে মা বলে ডাকত, না জানি সে কত কাঁদছে, রাখাল কি একা সামলাতে পারছে ঐটুকু বাচ্চাকে?

ছোট পরীর চোখে ঘুম নেই, চোখ বুজলেই কানে আসে ছোট শিশুর কান্নার আওয়াজ। সেও কাঁদে আর শুধু এইসব কথা চিন্তা করে।

ছোটপরি যাই করুক বড়দিদিদের চোখ এড়ায় না। শেষে ব্যাপারটা তাদের বাবাও জানতে পারলেন। তিনি বললেন ‘ মানুষের দুনিয়ায় সংসার পেতে তুমি তো পরীদের দুনিয়ার নিয়ম ভেঙ্গেছ।

এর জন্য আমারও কিছুটা সম্মানহানি হয়েছে । তা শুধু শুধু তোমার শাস্তি বাড়িয়ে তো সে সম্মান আমি ফিরে পাব না, তুমি যাও, যেখানে গিয়ে সুখ পাও যেতে পার’। রাজা চলে গেলেন, বোধহয় তাঁর চোখেও জল এসে পড়েছিল।

এদিকে রাখালেরই কি আর খুব সুখে দিন কাটছিল? না পরী চলে যাবার পর থেকে ঘর-দোর অগোছালো, ছেলেকে সে না পারে ঠিক ভাবে খাওয়াতে, না পারে ঘুম পাড়াতে। তার জন্য এক বুড়ি দাই দেখাশোনা করে বলেই কোনমতে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। যাবার সময় পরী তার উপর রাগ করে গেছে। সেটাই স্বাভাবিক, তা বলে সে একবারও ভাবলো না তার কোলের ছেলেটির কথা। আর কি সে ফিরে আসবে কোনদিন! রাখাল ভাবে আর অভ্যাসমত ছেলেকে কোলে করে রোজই এসে বসে থাকে জলাশয়ের পাড়ে, সেই গাছটির তলায়। তার আজকাল আর বাঁশি বাজানোতেও মন নেই।

সেদিনও অমনি বসে আছে জলাশয়ের ধারে, হঠাৎ তার মনে হলো আকাশ থেকে কি যেন একটা নামছে। প্রথমে ঈগলপাখি ভেবে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে লুকোতে যাচ্ছিল, তারপর বুঝতে পেরেই তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এ যে তার ভালবাসার ছোটপরী। রাখাল ভাবলো পরী বোধহয় ছেলের জন্য থাকতে না পেরে তার তাকে নিয়ে যেতে এসেছে। রাখাল ধীরে ধীরে ছেলে কোলে পরীর দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু একি করছে ছোটপরী, সে মাটিতে নেমে ডানাজোড়া প্রথমে খুলে রাখল। তারপর কোথায় থেকে একটা চকমকি বের করে তা ঠুকে কাঠে আগুন জ্বালালো। তারপর পাখাজোড়াটাকে নিয়ে সেই দৃঢ়ভাবে সেই আগুনে ফেলে দিল।

‘একি, একি করলে তুমি’, ছুটে এলো রাখাল, জিজ্ঞাসা ভরা দৃষ্টিতে তাকাল পরীর দিকে। ‘আর তো তুমি ফিরে যেতে পারবে না’।

‘আর আমি যেতে চাইও না; এখানে তুমি আছো, আমার ছেলে আছে, আমার পরিবার ছেড়ে আমি কোথাও গিয়েই আনন্দে থাকতে পারব না।’

এই বলে ছুটে এসে সন্তানকে কোলে তুলে নিল ছোটপরী।

তারা পরম নিশ্চিন্তে হাঁটা দিল গ্রামের পথে। পিছনে পুড়ে ছাই হতে থাকলো পরীর ডানাজোড়া।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments