Friday, April 3, 2026
Homeকিশোর গল্পবোতল ভূত - সালমান হক

বোতল ভূত – সালমান হক

বোতল ভূত – সালমান হক

সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। লম্বা একটা সময় পর বৃষ্টি হওয়াতে গ্রামের আর দশজন মানুষ খুশি হলেও ছোট্ট টুকুন খুশি হতে পারেনি। আজ এষার সঙ্গে নদীর ধারে জাহাজ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তার। এষা বলেছে জাহাজটা নাকি দোতলা। শুনে টুকুনের বিশ্বাস হয়নি। জাহাজ আবার দোতলা হয় নাকি?

এষা যে জিনিসটাকে জাহাজ বলছে, তা আপনি আমি দেখলে হয়তো মুখ টিপে হাসবেন। টেনেটুনে বড়জোর ট্রলার বলা যায়। কিন্তু সাড়ে ছয় বছর বয়সী একটা মেয়ের কাছে জাহাজ মনে হতেই পারে। আগে তো কখনো আর বাস্তবে জাহাজ দেখেনি সে। বইয়ে জ–তে জাহাজ লেখাটার পাশে একটা ছবি দেখেছিল কেবল।

অবশ্য জাহাজ দেখার সুযোগ হারানোয় টুকুনের যতটা না মন খারাপ, তার চেয়ে বেশি মন খারাপ এষার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারানোয়। কিন্তু মুখ ফুটে ব্যাপারটা কখনো স্বীকার করবে না সে। প্রিয় বন্ধুর সামনে সব সময়ই উঁচু নাকটা আরেকটু উঁচু করে রাখে ছেলেটা। হয়তো বুঝতে দিতে চায় না আবেগটুকু। কিন্তু পৌনে সাত বছর বয়সী একটা ছেলে এ রকম জটিল আবেগের সমীকরণ বোঝে কী করে? হয়তো বোঝে না, না বুঝেই করে। এই বয়সী ছেলেদের সঙ্গী সাধারণত ছেলেরাই হয়। মেয়েদের সঙ্গে খেলা কিংবা কথা বলার বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করে এ সময়। স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে ছেলেরা ক্রিকেট কিংবা ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও মেয়েরা ব্যস্ত থাকে অন্য কিছু নিয়ে।

কিন্তু এষা মেয়েটা একটু ব্যতিক্রম। এ বছর যখন স্কুল খোলে, টুকুন ভেবেছিল দৌড় প্রতিযোগিতায় সবাইকে হারিয়ে দেবে। সেই লক্ষ্যে ছুটির সময় নিজেকে প্রস্তুতও করেছিল। সমবয়সী অন্যান্য ছেলের তুলনায় গায়েগতরে একটু ছোটখাটো আমাদের টুকুন। তবে সেই ঘাটতিটুকু সমীহ দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। দৌড়ে প্রথম হলে আবারও সবাই তাকে আগের মতো খেলায় গুরুত্ব দেবে। ফুটবল খেলায় গোলপোস্ট আগলে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে না তার। খেলার সবচেয়ে ‘দুধভাত’ সদস্যই যে গোলকিপার হয়, এটা তো জানা কথা। যা–ই হোক, স্কুলের প্রথম দিনেই টিফিনের সময় দৌড়ের জন্য প্রস্তুত হয় ছেলেরা। ছোটবেলায় দুর্ঘটনার কারণে এক পা বেঁকে গেছে কামালের। তাই এ ধরনের খেলায় সরাসরি অংশ নিতে পারে না সে। তবে তার উৎসাহ অন্য সহপাঠীদের তুলনায় কম, এই কথা বলারও অবকাশ নেই। খুশিমনে রেফারির দায়িত্ব পালন করে সে। কামাল এক-দুই-তিন বলামাত্র প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করে সবাই। টুকুনের মাথায় একটাই ভাবনা। যে করেই হোক, মাঠের অপর প্রান্তে সবার আগে পৌঁছাতে হবে। অনুশীলন কাজে দেয়

একে একে সবাইকে পেছনে ফেলে সে। বিজয় একদম হাতের মুঠোয়, ঠিক এই সময় তার খেয়াল হয় পাশে পাশে কে যেন দৌড়াচ্ছে। কিছুতেই পেছনে ফেলা যাচ্ছে না। ইটের গুঁড়া দিয়ে বানানো লাল দাগটার থেকে কিছুটা দূরে টুকুনকে পাশে ফেলে সামনে এগিয়ে যায় ছেলেটা। সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় হয় টুকুন। ছুটির মধ্যে প্রতিদিন সকালে উঠে অনুশীলনে ফল শূন্য। দৌড় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় কে হয়েছে, সেই বিষয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা থাকে না।

কিন্তু সেবার ছিল।

কারণ, প্রথম যে হয়েছে, সে কোনো ছেলে নয়, মেয়ে। এষা। ক্লাস ওয়ানে মেয়েটাকে কখনো দেখেনি ওরা। সরাসরি ক্লাস টুতে ওদের সঙ্গে ভর্তি হয় মেয়েটা। লজ্জায় কান রীতিমতো লাল হবার জোগাড় হয় টুকুনের। কোনো ছেলের কাছে হারলে তা–ও কোনোমতে মেনে নেওয়া যেত। তাই বলে একটা মেয়ের কাছে! সেদিন আর কোনো ক্লাসে মন বসেনি টুকুনের।

এরপর সে যা ভেবেছিল, তা-ই হলো। খেলায় আবারও ব্রাত্য হয়ে পড়ল টুকুন। আর খেলার মাঠে ঘনিষ্ঠতা না হওয়ায় ক্লাসেও অন্য ছেলেদের সাথে সখ্য কমে আসতে থাকে বেচারার। কেবল বাসায় ফিরে সিমিন দিদির সঙ্গে কাটানো সময়টুকুই যা ভালো লাগে। বাবা তো সারা দিন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। দাদি অবশ্য ওর খেয়াল রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু টুকুনই পাত্তা দেয় না। স্কুলের বাইরে তার সবকিছুই আবর্তিত হয় একমাত্র বোন সিমিনকে ঘিরে। ও হ্যাঁ, টুকুন-সিমিনের মা মারা গেছেন পাঁচ বছর হতে চলল। এক রাতে হঠাৎই কলঘরে অজ্ঞান হয়ে যান ভদ্রমহিলা। বেশ কিছুদিন ডাক্তার-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়াদৌড়ির পর জানা যায় ক্যানসার। শেষ স্টেজ। তিন মাস পরেই প্রিয় টুকুন-সিমিনকে বাবার কাছে রেখে চিরবিদায় নেন তিনি। টুকুন অবশ্য মায়ের চেহারা মনে করতে পারে না। কেউ মায়ের কথা বললেই কেবল একটা গন্ধ এসে নাকে লাগে তার। ভীষণ মায়া মায়া একটা গন্ধ। কিন্তু ঘ্রাণটা কি ওর মায়ের শরীরের? ছোট্ট টুকুন তা বলতে পারবে না।

সিমিন এ বছর ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে। রেজাল্টও বেশ ভালো। বাবার সঙ্গে পুরো দেশে ঘুরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও দিয়েছে। তার ইচ্ছা ভালো কোথাও ইংরেজি বিষয়ে পড়ার। টুকুন-সিমিনের বাবা রহমান সাহেবও চান তার মেয়ে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। তার পরিবারে কেউ আজ অবধি উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। তার মেয়েই শিকলটাকে কাঁচকলা দেখাক। সাধারণত গ্রামে এই বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে সবাই। কিন্তু রহমান সাহেব বরাবরই অন্য ধাতে গড়া। বরং সিমিনেরই ইচ্ছা ছিল স্থানীয় ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এরপরেই শুরু হয় মূল সমস্যা। বোনের ভীষণ ভক্ত ছোট্ট টুকুন। মায়ের অভাব মূলত বোনই পূরণ করে দিয়েছিল তার। খেয়াল রাখা, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো—সবকিছু। কোচিংয়ে পড়তে জেলা শহরে ফুফুর বাড়িতে থাকতে হয়েছিল সিমিনকে।

বোন ফুফুর বাড়ি চলে যাওয়ার কষ্টটা টুকুন টের পায় রাতের বেলায়। সকালে তাকে অনেক বুঝিয়ে–শুনিয়ে দিদি চলে যায়। টুকুনকে বলে যায়, ‘তুই তো এখন বড়! তোকেই কিন্তু বাবার খেয়াল রাখতে হবে।’ চোখমুখ শক্ত করে আমাদের টুকুনও ঘাড় নাড়ে। আসলেই তো বড় হয়ে গেছে সে। দিব্যি পারবে দিদিকে ছাড়া থাকতে। কিন্তু ব্যাটারি রিকশাটা চোখের আড়াল হওয়ামাত্র কেমন যেন একটা শূন্যতা চেপে বসে ছোট্ট বুকটায়। এই ধরনের অনুভূতির অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে থেকে জানা না থাকায় বিহ্বল হয়ে পড়ে বেচারা।

রাতে বাবার কাছে শোয় ঠিকই, কিন্তু ঘুম আসে না। একটা মানুষের অনুপস্থিতি যে এতটা প্রগাঢ় হতে পারে, তা বুঝতে পারেনি টুকুন।

তিন মাস পর ভর্তি পরীক্ষার পালা চুকিয়ে ফিরে আসে সিমিন। যে কটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, কোনোটাতেই হয়নি। শেষ ভরসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেটার রেজাল্ট দিতে এখনো প্রায় এক সপ্তাহ বাকি। বাড়িতে ফিরেই হতভম্ব হয়ে যায় সিমিন। টুকুন এই নব্বই দিনেই শুকিয়ে কাঠ। এমন নয় যে কেউ তার খেয়াল রাখেনি বা কিছু খেতে দেয়নি। যে যার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছে ছেলেটাকে দেখেশুনে রাখতে। কিন্তু পেটের ক্ষুধা মেটানো সহজ হলেও মনের ক্ষুধা সহজে মিটতে চায় না।

দাদি আর বাবাকে আচ্ছামতো কথা শোনায় সিমিন। শুনে দুজনেরই মাথা নিচু করে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তারা তো কম চেষ্টা করেনি, কিন্তু সিমিনকে সেই কথা বিশ্বাস করানো যাবে বলে মনে হয় না। অনেক দিন পর সেই রাতে ভালো ঘুম হয় টুকুনের। ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে।

‘এ রকম বোনপাগল ছেলে আগে দেখিনি,’ রাতে খাওয়ার সময় মাথা নেড়ে মাকে বলেন রহমান সাহেব।

তবে সেটা দুই দিন আগের কথা। এখন আবারও পুরোনো রূপে ফিরে এসেছে ছোট্ট টুকুন। দিনভর বোনের পেছনে ছোটাছুটি আর বিকেলবেলায় একটু এষার সাথে টইটই করে পাড়া বেড়ানো। হ্যাঁ, সেই এষার সাথেই বন্ধুত্ব হয়েছে তার। যার কারণে বছরের শুরুতে ও রকম অপমানিত হতে হয়েছিল।

এষাদের বাড়ি ওদের বাড়িটা থেকে কয়েক বাড়ি পরেই। টুকুন-এষাদের গ্রামটার নাম শনতলা। তবে এষাদের পরিবার শনতলায় থাকছে দুই বছর ধরে। আগে নদীর ওপারে পানলা গ্রামে থাকত তারা। দুই গ্রামেই অঢেল পৈতৃক সম্পত্তি এষার বাবার। ছয় ছেলেমেয়ের প্রত্যেকেই চাইলে বসে খেতে পারবে সারা জীবন। ভাইবোনদের মধ্যে এষা পঞ্চম। নির্দিষ্ট একটা বয়স হবার পরে সে আবিষ্কার করে যে বাড়ির কেউ আর তার দিকে সেভাবে খেয়াল রাখছে না। যখন যা ইচ্ছা, করতে পারে সে। কেবল ঠিক সময়ে স্কুলে গেলেই হলো। এই স্বাধীনতার পূর্ণ সুযোগ নেয় মেয়েটা। গ্রামে এমন কোনো জায়গা নেই, যা সে চেনে না। দুষ্টুমিতে অনেক ছেলেকেও হার মানায়।

ছিল টুকুন। ‘তুমি কি দুধভাত নাকি?’ হঠাৎই কে যেন বলে ওঠে তার উদ্দেশে। মুখ তুলে দেখে এষা। এই মেয়ের কাছেই কয়েক দিন আগে দৌড় প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে সে। ইচ্ছা করে পিঠের ওপর দুই ঘা বসিয়ে দিতে। কিন্তু সাহসে কুলায় না। অগত্যা উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে বেচারা। কিছুক্ষণ পর টের পায়, মেয়েটাও তার পেছন পেছন আসছে।

বিরক্ত হলেও কিছু বলে না টুকুন। কত দূর আর আসবে। একটু পরেই বাসায় ঢুকে যাবে সে। কিন্তু বাসার একদম কাছাকাছি পৌঁছানোর পরও তার পিছু ছাড়ে না এষা। এবার বিরক্ত হয় ছোট্ট টুকুন। ‘অ্যাই, তোমার সমস্যা কী?’ চোখ পাকিয়ে বলে।

‘সমস্যা হবে কেন? হাঁটছি।’

‘আমার পেছন পেছন আসছ কেন?’

‘আমাদের বাড়িও এদিকে। তোমার পেছনে আসব কেন?’

মাথায় রক্ত চড়ে যায় টুকুনের। ‘মিথ্যে কথা।’

‘দেখবে? এসো আমার সাথে।’ বলে ওকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে শুরু করে এষা।

‘শেষ দেখে ছাড়ব’ ভঙ্গিতে তার পিছু নেয় টুকুন। তবে হতাশ হতে হয় বেচারাকে। আসলেও মিথ্যে বলেনি এষা। ওদের বাড়িটা টুকনদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই। তবে আগে এই বাড়ির কারও সঙ্গে দেখা হয়নি ওর। অল্প কিছুদিন ধরে শনতলা গ্রামে থাকছে এষাদের পরিবার। না দেখা হওয়াই স্বাভাবিক।

কিন্তু সেদিন অত তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফেরার ইচ্ছা ছিল না এষার। টুকুনকে জ্বালানোর জন্যই পিছু নিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটার কাছ থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে কিছুটা হতাশ সে। ভেবেছিল, নিদেনপক্ষে চুলোচুলি তো করবেই। একটু বেশিই ভদ্র ছেলেটা। এই গ্রামে ওদের বাড়িটার আশপাশে সমবয়সী আর কেউ না থাকায় একা একাই বেশির ভাগ সময় ঘুরে বেড়ায় সে। টুকুনকে বন্ধু বানাবে কি না ভেবে দেখে। চেহারায় কেমন যেন ভিতু ভিতু একটা ভাব। এদের কারণে প্রায়ই বিপদে পড়তে হয়। তবে নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

‘মড়া পোড়ানো দেখতে যাবে নাকি?’ হঠাৎই কী মনে করে সেদিন টুকুনের উদ্দেশে বলে বসে সে।

আর যা-ই হোক, মেয়েটার মুখ থেকে এ রকম কিছু শোনার আশা করেনি টুকুন। কথার খেই হারিয়ে ফেলে সে। কোথায় ভেবেছিল ঝগড়া করবে। কিন্তু কেন যেন অদ্ভুত প্রস্তাবটায় না করতে পারেনি সেদিন। কৌতূহলই হবে খুব সম্ভবত। টুকুনের চেহারায় আগ্রহের প্রচ্ছন্ন আভাস দেখতে পাওয়ামাত্র উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে এষা। জানত যে বড়শিতে মাছ গেঁথেছে। ছেলেটা আসবে পেছন পেছন। সেটাই করে টুকুন।

সেদিনের পর দুজনের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। পাজলের হারানো দুটো টুকরা যেন জোড়া লাগার অপেক্ষায় ছিল। অবশ্য মড়া পোড়ানো আর দেখা হয়নি ওদিন। স্থানীয় শ্মশানঘাটটা ফাঁকাই ছিল।

তখন থেকে সুযোগ পেলেই একসঙ্গে সময় কাটায় দুজন। এষা কিংবা টুকুন, কারও বাড়িতেই এই বন্ধুত্ব নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। প্রত্যেকেই জানত যে সময়ের ফেরে একসময় আলাদা হয়ে যাবে দুজনের পথ। তবে এষা টুকুনদের বাড়িতে এসে প্রায়ই এটা–সেটা করলেও টুকুন এষাদের বাড়িতে খুব বেশিবার যায়নি। কেন যেন এষাদের বাড়ির পরিবেশটা বড্ড অস্বস্তিকর ঠেকে তার কাছে। ওখানকার কারও হাসিতেই প্রাণ নেই। বাচ্চারা এই বিষয়গুলো বড়দের তুলনায় ভালো ধরতে পারে।

হাসিতে প্রাণ না থাকার কারণটা অবশ্য পরে জানতে পারে টুকুন। ঘনিষ্ঠতা বাড়লে এষা একদিন খুলে বলে তাকে। এষার এক বোন বছর দুই আগে নদীতে ডুবে যায়। লাশ অবশ্য পাওয়া যায়নি। তাই মারা গেছে কি না, নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সবাই সবচেয়ে খারাপ পরিণতিটাই মেনে নিয়েছে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীটায় বেশ স্রোত। এখানে–সেখানে ঘূর্ণি। সাঁতার না–জানা কারও মারা যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। মূলত সেই ঘটনার পরই শনতলা গ্রামে চলে আসে এষাদের পরিবার।

‘কিন্তু ডুবে গেল কী করে?’ নিরীহ কণ্ঠে জানতে চায় টুকুন।

‘জানি না,’ এষা বলে।

প্রিয় বন্ধুর চেহারায় সেদিনই প্রথম ভয় ফুটতে দেখে টুকুন। কিন্তু কথা বাড়ায়নি সে। তত দিনে এষার প্রতি মন নরম হয়ে এসেছে তার। এমন কিছু করতে চায়নি যাতে বন্ধুর মন খারাপ হয়।

কিন্তু আজ জাহাজ দেখার সুযোগ হারিয়ে অন্য রকম একটা অনুভূতি হচ্ছে। তবে খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সেই অনুভূতি। প্রজাপতি যেমন রঙিন ফুল দেখলে অন্য সব ভুলে যায়, তেমনি টুকুনও সিমিনকে দেখে ভুলে গেল যাবতীয় দুশ্চিন্তা।

তবে দিদিকে কেমন যেন দেখাচ্ছে। কিছু একটা নিয়ে খুশি হয়েও যেন খুশি হতে পারছে না। চাপা উচ্ছ্বাসের মুখোশ চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে হতাশার স্বেদবিন্দু।

‘টুকুন সোনা,’ ভাইকে ডাকে সিমিন।

‘দিদি…’ বোনের কণ্ঠে গুরুতর কিছুর আভাস পায় টুকুন।

‘আমার মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়বে!’ হঠাৎই চারপাশ ভেঙেচুরে সেখানে হাজির হন ওদের বাবা।

হ্যাঁ, স্বপ্নের পানে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার খবরটা কিছুক্ষণ আগেই পেয়েছে সিমিন। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে তার অবস্থান বেশ ওপরের দিকেই। ইংরেজি বিভাগে হলেও হতে পারে। মৌখিক অবশ্য এখনো বাকি। কিন্তু সে জন্য বেশি কষ্ট করতে হবে না।

তবে তার যাবতীয় চিন্তা এখন একমাত্র ভাইকে নিয়ে। বোনকে ছাড়া তিন মাসই তো থাকতে পারেনি ছেলেটা। আর এখন…ভাবতে পারে না সিমিন।

টুকুনের চোখের তারায় খেলা করছে অবিশ্বাস। বুঝেও যেন কিছু বুঝতে পারছে না সে। এই তো সকালবেলায়ও দিদি বলল যে শনতলাতে থেকেই পড়াশোনা করবে। কিন্তু এখন? কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই গাল বেয়ে টপটপ করে ঝরতে শুরু করে পানি।

টুকুন প্রায় দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। কিছুই না। যতবারই সিমিন কিছু খাওয়াতে চেষ্টা করেছে, খাবার মুখে নিয়ে বসে থেকেছে ছেলেটা। একবারের জন্য কথাও বলেনি।

‘তোকে সাথে নিয়ে যাব আমি।’

এবারে নড়েচড়ে বসে টুকুন।

‘সত্যি?’ ভাতের নলা মুখের ভেতরে নিয়েই কোনোমতে বলে।

‘হ্যাঁ, একটা বোতলে ভরে ভূত বানিয়ে নিয়ে যাব। আমার পড়ার টেবিলে থাকবি।’

জবাবটা শুনে টুকুন খুশি হয় কি না বোঝা যায় না। স্বপ্নালু চোখে চেয়ে থাকে বোনের দিকে।

সেদিন রাতেই প্রথম বোতল ভূতের দেখা পায় টুকুন।

ছোট থেকেই ভূতে প্রচণ্ড ভয় টুকুনের। কিন্তু এবার ভয় পায়নি। সে-ও তো কিছুদিনের মধ্যে ভূতই হবে। ভয় পেলে চলবে?

‘কী রে?’

বাথরুমের বেসিনের ওপরে রাখা কাচের বোতলের ভেতর থেকে আসে শব্দটা।

‘ভেতরে আসবি?’

কিছু না বলে কেবল ওপর–নিচে মাথা নাড়ে টুকুন।

ভূতটার চেহারা–সুরত ওর মতোই। নীল হাফপ্যান্ট, সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। কিন্তু চেহারার যেখানটায় নাক, কান, মুখ থাকার কথা সেখানটায় কিছু নেই। অন্য কোনো সময় হলে হয়তো ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেত টুকুন। কিন্তু ঘুমের মধ্যে কি অজ্ঞান হওয়া যায়?

পরদিন রাতের বেলায় আবারও বোতল ভূতের সন্ধান পায় টুকুন। তবে এবার তাকে দেখা যায় না। একটামাত্র শব্দ কেবল কানে বেজেই চলেছে, ‘আয়, আয়, আয়, আয়, আয়…’

‘মুখ ওই রকম বাংলার দশের মতো করে রেখেছিস কেন?’ কয়েক দিন পর বিকেলবেলায় স্কুলমাঠের দেয়ালের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে এষা। সকালবেলাতেই আম্মুকে সে বলতে শুনেছিল, ‘মুখ ওই রকম বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস কেন?’ কিন্তু মেজ আপার তুলনায় টুকুনের চেহারাটা অনেক বেশি শুকনো দেখাচ্ছে। তাই পাঁচের চেয়ে দশ বলাটাই শ্রেয় মনে হয়েছে ওর কাছে।

‘ভূত হব।’

‘টুকুন, আবার?’

প্রতিদিন যে বোতল ভূতের সঙ্গে কথা হয় টুকুনের, এটা এষাকে বলা হয়নি। বলবেও না। কিছু বিষয় গোপন রাখাই ভালো। বোতল ভূত বলেছে যে কীভাবে ভূত হওয়া যায়, সেটা নাকি ওকে নিজেই বের করে নিতে হবে।

‘হতেই হবে।’

‘না হলে কী হবে?’

‘দিদি আমাকে সঙ্গে নেবে না।’

এষা কথা খুঁজে পায় না। বন্ধুকে রেখে চলে যাওয়ার কথা কি অবলীলায়ই না বলল টুকুন। ছোট্ট এষার মনে কি এ জন্য অভিমান হয়? সাড়ে ছয় বছর বয়সী মন কি অভিমান বুঝতে পারে? তবে বন্ধুকে এ রকম মনমরা দশায় দেখতে দেখতে সে ক্লান্ত।

‘আসলেই ভূত হতে চাস?’

‘হ্যাঁ।’ চোখেমুখে আগ্রহ ফোটে টুকুনের। ‘তুই জানিস কীভাবে হতে হবে?’

হয়তো বড় কেউ থাকলে টুকুনের এই অতি আগ্রহ একটু অন্যভাবে নিত। কিন্তু এষা বন্ধুর কৌতূহল মেটাবে বলেই পণ করেছে আজ।

‘জানি।’

‘সত্যি?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তুই কাউকে বলে দিবি না তো?’

‘না! বল আমাকে।’

‘আমার বড় আপু ভূত।’

‘মানে?’

জবাবে কিছু না বলে চোখ পাকিয়ে তাকায় এষা।

‘মানে কহুয়ার পানিতে ডুবে গেছিল যে?’

‘হ্যাঁ, এরপরই তো আপু ভূত হয়ে গেছে। সে জন্যই আমরা পানলা থেকে শনতলা এসে পড়ি। আগে আপু রোজ রাতে আমাদের বাড়িতে আসত।’

রাত তখন কত হবে? দুইটা কি তিনটা।

বাইরে আবারও বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামের সবাই আরামে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে আজ। ঘুমানোর জন্য এ রকম আবহাওয়াই তো আদর্শ।

কিন্তু ছোট্ট টুকুনের চোখে আজ ঘুম নেই। ঘুম আসবে কী করে? সব ঘুম যে কেড়ে নিয়েছে বোতল ভূত। একটু আগেও ডাকছিল। আর নাকি বেশি দেরি করা যাবে না। বেশি দেরি করলে আর বোতলের ভেতরে ঢুকতে পারবে না টুকুন। যা করার আজ রাতেই করতে হবে। সিমিন দিদির সঙ্গে ও যাবেই।

সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে পা রাখল টুকুন। বৃষ্টির ঝাপটা আর ঠান্ডা হাওয়ায় পুরো শরীর কেঁপে উঠল একবার। নাকি ভয়ে? সেটা বলা মুশকিল। কিছুক্ষণ পর তো ভূতই হয়ে যাবে, এখন আবার ভয় কিসের?

শনতলা আর পানলা গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদীটার নাম কহুয়া।

এক পা, দুই পা করে কহুয়ার তীরে চলে এল টুকুন। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু ওকে ঠিকই পথ দেখিয়ে আজ নিয়ে এসেছে বোতল ভূত। হাতে চেপে ধরা বোতলটার ভেতর থেকে ‘আয় আয়, আয়…’ বলে নির্দেশ দিয়ে চলেছে। ওদের বাড়ির চুলা জ্বালানোর খড়ি রাখার ঘরে ঢুকলে অবশ্য চমকে যাবে যে কেউ, ঘরটা ভর্তি এখন নানা রকম বোতল। গত কয়েক দিনে টুকুনের সংগ্রহ।

এষা মিথ্যে বলেনি। কহুয়ার তীরে ওই তো দাঁড়িয়ে আছে একটা জাহাজ। আজ সন্ধ্যাবেলাতেই সিমিন দিদির সঙ্গে ব্রিজ টু টেরাবিথিয়া সিনেমাটা দেখেছিল টুকুন। ওর মনে হলো একটা বিশাল দানো যেন টেরাবিথিয়ার রূপকথার জগৎ থেকে উঠে এসে ঘাপটি মেরে বসে আছে তীরের অন্ধকারে।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে জাহাজের গলুইয়ে আবিষ্কার করল টুকুন। নিচে কহুয়ার পানিতে আজ কে যেন কালি গুলে দিয়েছে। একটু কান পাতলেই শোনা যাবে বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীর পানির এক হয়ে যাওয়ার শব্দ।

ক্যাপ খুলে হাতের বোতলটা সর্বশক্তিতে সামনের দিকে ছুড়ে মারল টুকুন। ভূত তো তাকে হতেই হবে।

নদীর তীরে আপনি বা আমি দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো একটু পরেই ভারী কিছু পানিতে পড়ার শব্দ পেতাম। কিংবা কে জানে, বাতাস হয়তো শব্দটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেত দূর কোনো দেশে।

আচ্ছা, টুকুন কি ভুতুড়ে জাহাজের পিঠে চেপে বোতল ভূত হতে পেরেছিল?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi