Friday, April 3, 2026
Homeরম্য গল্পবোলপুরের রেল - লীলা মজুমদার

বোলপুরের রেল – লীলা মজুমদার

ট্রেনে চাপলেই আমার মেজাজ অন্যরকম হয়ে যায়। অবিশ্যি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার রেলের দৌড়ও কমতে কমতে এখন কলকাতা থেকে বোলপুর আর বোলপুর থেকে কলকাতায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাই বলে রেলযাত্রার রোমাঞ্চ একটুও কমেনি। হাওড়া থেকে বোলপুরের দূরত্ব ৯৫ মাইল হলেও, মনে হয় এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেলাম। কালো এঁটেল মাটির বদলে দেখা যায়, লাল ঝরা মাটি। লতাগুল্মের ঝাড়ের বদলে ভাঙা ডাঙার ওপর দেখা যায় বেঁটে বেঁটে খেজুর গাছ। রেলগাড়িও বাঁধের ওপর না চলে, কাটিং-এর মধ্যে নামে। সহযাত্রীদের ধরনটাও দেখি অন্যরকম। কালো, লম্বা, কোঁকড়া চুল, সাজের ঘটা কম, কিন্তু চালাক-চালাক মুখ, বন্ধুসুলভ হাবভাব।

এই দুই সীমানার মধ্যিখানে ৮০-৯০ মাইল পথের বিচিত্র ব্যাপার। একবার বর্ধমানে গাড়ি ছাড়ব-ছাড়ব করছে, এমন সময় একসঙ্গে অনেকগুলি যাত্রী উঠলেন। একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা আধা-বয়সি ভদ্রলোক, দুঃখী-দুঃখী মুখের একজন ৪০-৫০ বছরের মহিলা, তাঁর সঙ্গে একটি বছর তিনেকের খুকি আর কটকটে হলুদ হাওয়াই শার্ট গায়ে এক লম্বা-চুলো ছোকরা। জায়গা-টায়গা খুব বেশি ছিল না। আর আমাদের পাশেই দাঁড়াল। ভদ্রমহিলাকে একটু বসবার জায়গা করে দেওয়া হল। খুকিও বসল।

দুঃখী-দুঃখী মুখের ভদ্রমহিলা হলদে-শার্ট ছোকরার সামনে একটা বড় সাইজের হ্যান্ডব্যাগ খুলে ধরলেন। হ্যান্ডব্যাগে পাঁচ টাকা দশ টাকার নোট যেমন তেমন করে ঠাসা। ব্যাগের পেট ফুলো হয়ে আছে। ছোকরা তার ভেতর থেকে গোটা তিনেক দশ টাকার আর গোটাতিনেক পাঁচ টাকার নোট তুলে নিয়ে বলল, ‘তা হলে এগুলোও নেব?’ এই বলেই পিছোতে পিছোতে শেষটা কামরা থেকে নেমেই গেল!

সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলা খোলা অবস্থাতেই হ্যান্ডব্যাগটাকে টাকাকড়িসুদ্ধ আমাদের সামনের বেঞ্চিতে ফেলে, ‘কোথায় গেল? কোথায় গেল?’ বলে আর্তনাদ করতে করতে উঠি-পড়ি দরজার দিকে ছুটলেন। খুকিও এই বড় হাঁ করে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল।

আমরা শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ও কে? আপনার ছেলে নাকি?’ বাধা পেয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘না না, আমার ছেলে হতে যাবে কেন? এর আগে কখনও চোখেও দেখিনি। প্ল্যাটফর্মে দেখা হল, বলল আমার ভাইকে চেনে। আমেদপুরে দুজনেই এক আপিসে চাকরি করে। সেখানে নাকি নোট ভাঙানো যায় না। তাই আমার নোটগুলো ভাঙিয়ে দেবে বলে কিনা নোট নিয়ে গাড়ি থেকেই নেমে গেল!’

ভদ্রলোক বললেন, ‘নিয়ে গেল আবার কী! আপনিই তো একরকম গুছিয়ে দিলেন। বসুন। দেখি কী করতে পারি।’ বলে তিনিও নেমে গেলেন।

আমরা ভদ্রমহিলাকে টেনে বসিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ও টাকার আশা ছাড়ুন। আপনার বাকি টাকাগুলোও আমেদপুর অবধি পৌঁছবে কি না সন্দেহ। এতক্ষণ যে ভাবে ব্যাগটা খুলে ফেলে রেখে দিয়েছেন, আমরা যে-কেউ একগোছা তুলে নিতে পারতাম!’

তিনি আঁতকে উঠে ব্যাগ বন্ধ করলেন। খুকি ‘খিদে পেছে’ বলে চ্যাঁচাতে লাগল। গাড়ি ছেড়ে দিল।

এমন সময় চলন্ত গাড়িতে খচমচ করে সেই ভদ্রলোক উঠে পড়ে, ভদ্রমহিলাকে তিনটে দশ টাকার তিনটে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, ‘নিন, ধরুন। কখনও কোথাও কোনও অচেনা লোককে বিশ্বাস করবেন না। এমনকী আমাকেও না।’

ভদ্রমহিলা তো অবাক, ‘ওমা! অচেনা কোথায়? বলল যে ভাইকে চেনে! নিজের থেকে আলাপ করল। পান কিনে দিল।’

আমরা আর থাকতে না পেরে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু তাকে ধরলেন কী করে?’

তিনি হাসলেন, ‘তাও পারব না? ওই তো আমার কাজ। ২৫ বছর ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ডে আছি না! বেরুবার ফটকে ক্যাঁক করে ধরেছি বাছাধনকে! অমনি নোটগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে পগার পার! রেলওয়ে পুলিশকে জিম্মা করে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হলে এত কষ্টে পাওয়া ছুটিটা মাঠে মারা যেত। আর দেখলেন তো কী ইনকম্পিটেন্ট! ছিনতাই করবি তো হলুদ শার্ট কেন? ভিড়ের সঙ্গে মিশে থাকতে হয় তাও জানিস না আবার চুরি করতে আসিস!’

আরেকবার যেই না জনাই রোডে গাড়ি থেমেছে, একজন যাত্রী বললেন, ‘আবার রোড কেন? জনাই নামই তো বেশ ছিল।’ আরেকজন বললেন, ‘তিন মাইল দূরে জনাই গ্রাম আছে কিনা, তার সঙ্গে তফাত করবার জন্য স্টেশনের নাম জনাই রোড।’

তৃতীয় যাত্রী বললেন, ‘মোটেই তিন মাইল নয়। বড় জোর দেড় মাইল।’ আগের বক্তা বিরক্ত হলেন, ‘বলছি মশাই পাক্কা তিন মাইল।’ পরের বক্তাও তেরিয়া হয়ে উঠলেন, ‘আজ্ঞে না মশাই, যা-তা বললে তো আর হবে না। দেড় মাইলের এক পা-ও বেশি নয়।’

কামরায় বেশ একটা গরম হাওয়া জমে উঠল। কোনও পক্ষেরই পৃষ্ঠপোষকের অভাব হল না। শেষ পর্যন্ত প্রথম ভদ্রলোক বললেন, ‘কী মুশকিল, এতে এত তপ্ত হবার কী আছে? আচ্ছা দেখাই যাক না, কার কথা ঠিক। আপনিই আগে বলুন অত নিশ্চয়তার সঙ্গে কী করে বলছেন দেড় মাইল?’

সে বলল, ‘আমি জানব না তো কে জানবে বলুন? একরকম বলতে গেলে আমি এখানকার একজন ইনহ্যাবিট্যান্ট। আজকাল কলকাতায় থাকলেও এইখানেই আমার বাড়ি। ওই পথের প্রত্যেকটা ইট-পাটকেল ঝোপ-ঝাড় নেড়িকুত্তো আমার চেনা।’

তখন অন্য লোকটিকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘তা হলে আপনিই বা তিন মাইল বলছেন কেন?’ ভদ্রলোক কাষ্ঠ হাসলেন, ‘বলছি কী সাধে! ওই তিন মাইলের প্রত্যেকটা ইঞ্চি ট্যাঙস্ ট্যাঙস্ করে হেঁটেছি বলে বলছি। দু’বছর আগে আমরা ফুটবল ম্যাচ খেলতে এলাম। ওঁরা স্টেশন থেকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে ট্রাকে চড়িয়ে খেলার মাঠে নিয়ে গেলেন। কী আর বলব মশাই, হেরে ভূত হয়ে গেলাম! আর এনারা করলেন কী, আমাদের খেলার মাঠে ফেলে, ট্রাকটি নিয়ে বিকট জয়ধ্বনি দিতে দিতে শোভাযাত্রায় বেরুলেন। অগত্যা হেঁটে স্টেশনে আসা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। হুঁঃ!’

মধ্যস্থ তখন বললেন, ‘তা হলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দূরত্বটা দুই মাইল।’

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi
  • slot gacor