Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাবাতাসের রং নেই - কল্যাণ মৈত্র

বাতাসের রং নেই – কল্যাণ মৈত্র

সুজয়া বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যায় শোবার ঘরে। উত্তর-দক্ষিণ দু দিকেই বড় বড় জানলা এই ঘরটাতে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেই ডাইনে বাঁয়ে দুটি ঘর, মাঝে ছোট এক ফালি বারান্দা। সুজয়া এ ঘরটাকেই বেছে নিয়েছে। দক্ষিণের জানলা দিয়ে চোখে আসে পুজ মাঠ, ঝাউ অশ্বথের সারি দিয়ে ঘেরা। উত্তরের জানলা দিয়ে চোখ মেললে ভেসে আসবে কর্মচঞ্চল কিছু মানুষের মুখ। ধানের গোলা, দু পাশে বোঝাই করা সরষের ডাল। আদুল গায় দুটো মেয়ে ধান সেদ্ধ করছে। শরীর নিয়ে ওদের বিশেষ চিন্তা নেই। খোলা পিঠে রোদ বড়ই বেয়াদপ। মাঝে মাঝে ওরা নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা তামাশা করছে।

অলস দুপুরের এ চিত্র কদিন ধরেই সুজয়া এক মনে দেখে আসছে। জানলার ধারেই খাটটা। তাই সুবিধা, পিঠে বালিশ দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে থাকলেই হল—মন ভরে যাবে। আসলে সুজয়া এ সবের মধ্যে হারিয়ে যায়। তাই এত ভালোবাসে এ সব দেখতে। নিচ থেকে ওপরে খাবার দিয়ে যায়। কোনো কোনো সময়ে ছোট কাকিমার মেয়েও আসে খাবার দিতে। অবশ্য যে দিন স্কুলে যেতে বাধ্য হয় সেদিন ও আসে না। কোনো অসুবিধেই নেই এখানে। এ বাড়িতে লোকজনও কম। যারা আছে তারাও চাষবাসের কাজে ব্যস্ত থাকে।

সুজয়ার এখানে ভালো লাগছে। অন্তত কেউ ডিসটার্ব করে না বা পার্সোন্যাল কথাবার্তা জানতে চায় না। নিজের মত থাকা যায়। এ বাড়ির লোকজন সবাই একটু চুপচাপ। কেউ কিছু জানতে চায় না। সুজয়ার কথাও হয়তো এরা জানে বা জানে না। কোনো কৌতূহল নেই।

নতুন মা-ই বলেছিলেন অরিন্দমকে : খোকা বৌমাকে একটু বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত। সবাই বিয়ের পর বাইরে যায়। পরে ত সময় হবে না, ব্যস্ত হয়ে যাবি। তার চেয়ে বরং ঘুরে আয়। অরিন্দমের আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি ছিল। তাই হবে খন, বলে এড়িয়ে গিয়েছিল সে তখন। নতুন মা কিন্তু কথায় ইতি টানেননি। ধমকের সুরে বলে উঠেছিলেন—তুমি মানুষের মন বোঝে না, বড়ই অবুঝ, দেখছ বলে উঠেছিলেন—তুমি মানুষের মন বোঝে না, বড়ই অবুঝ, দেখছ না সুজয়া কেমন মন মরা, এখনো ও এ বাড়ির সঙ্গে মানাতে পারেনি। তাকে আমাদের বোঝা উচিত। অরিন্দম তার মায়ের ইঙ্গিত বুঝেছিল। তাই মুখ নামিয়ে বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলে : আমি ত’ বলেছিলাম যেতে। পুরীর টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছিল। সুজয়াই ত’ যেতে চায়নি। এখন আমার সময় নেই, কলেজে টেস্ট পরীক্ষা চলছে, খাতা দেখা, এ সময়ে কি করে যাই? নতুন মা ঈষৎ কর্কশ স্বরে বলে ওঠেন : মিথ্যা অপবাদ দিও না; তোমাদের বিয়ের পর ওর যাবার মত মনের অবস্থা ছিল না; তাই যায় নি।

তুমি গভীরে যাওনি, তাই বুঝতে পারনি। নতুন মা কিছুটা চিন্তা করে বলেন : তার চেয়ে তুমি এক কাজ কর, ওকে দেশের বাড়িতে ছোটকাকুর ওখানে দিয়ে এসো। তোমায় থাকতে হবে না, তুমি দিয়েই চলে এসো। ওখানে তোমার কাকিমা, কৃষ্ণা, সবাই আছে; ওর অসুবিধা হবে না। আমি সময় বুঝে নিয়ে আসবো। মাসখানেক থাকুক ওখানে।

অরিন্দম ফস্ করে বলে ফ্যালেও কি গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারবে? তাছাড়া ওখানে লাইট নেই, ডাক্তার নেই।

কে বললো নেই, তুমি নিজের দেশের বাড়ির কোনো খবর রাখ? আমরা যদি পারি তবে ও তা পারবে না কেন? আমিও খোদ কলেজ স্ট্রিটের মেয়ে, আমি যাইনি? থাকিনি দিনের পর দিন। যা বলছি শোন, ওখানে এখন স্ব কিছুই আছে, তুমি দিয়ে এসো। অরিন্দম এই পর্যন্ত শুনে নিঃশব্দে চলে যায়। ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যাবার সময় দেখতে পায় সুজয়া জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ওপারের রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছে

অরিন্দম বুঝতে পারে সুজয়া সব কিছুই শুনেছে। ধীরে ধীরে তার কাছে যায়, তারপর আলতো করে দুটো শব্দ ছুঁড়ে দেয়যাবে রামমাটি? সুজয়া ঘাড় নাড়ে কেবল। সুজয়া বই শুনেছিল। নতুন মা খুবই ভালো। আজকালকার দিনে এমন মানুষ আর দেখা যায় না। এই দুমাস নতুন মাকে দেখেছে সুজয়া। কতো খবর রাখেন নতুন মা। কতো বোঝেন। শ্রদ্ধায় হৃদয় ভরে যায়।

বৌভাতের পর দিন নতুন মা তাকে তার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। আলমারি খুলে বলেছিলেন-দেখ মা এ ধ্ব তোর। থোকা আমার খুব খামখেয়ালি। সব কিছু তোকেই দেখতে হবে। তোর হাতে দিয়ে তবে আমি শান্তি পাব। এইটুকু বলে চাবিগোছা তার হাতে দিয়েছিলেন। সুজয়া কেঁদে ফেলেছিল হাউমাউ করে। চোখের জলে দুটো গাল ভাসছিল। ওর মনে পড়ে যায় ঠিক ঠিক এমন ভাবে বৌভাতের দিন রাতদুপুরে অভিও টানতে টানতে সুজয়াকে নিয়ে গিয়েছিল বড় ঘরটাতে। সেখানে কেউ, কেউ ছিলনা, কেবল দুটো ফটো ছাড়া। একটা অভির মায়ের আর একটা অভির বাবার। দুজনেই নেই। তবু সুজয়ার মনে হয়েছিল ওরা দেখছে। আনন্দে অধীর হয়ে সুজয়াকে কোলে তুলে সারা ঘর দাপাদাপি করেছিল অভি। তারপর আলমারির চাবিটা দিয়ে অভি সামনের চেয়ারে বসে বলেছিল—আলমারিটা খোলো।

সুজয়া খুলেছিল। এবারে লকারটা খোলো-সুজয়া খুলেছিল। একটা বাক্স আছে বার করো। সুজয়া তাও করেছিল। তারপর বাক্সটা খুলে সুজয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল। একটা সীতা হার রয়েছে কেবল—মায়ের; তাই রেখে দিয়েছি তোমায় দেব বলে। বাকি সব ব্যাংকে। সুজয়া তখন আলমারির সব কিছুই স্পর্শ করতে শুরু করেছে। এ যেন সেই ছোট বেলার দিদিমার সিন্দুক হাতড়ানো।

অভি হারটা পরিয়ে দিয়েছিল খানিক পরেই। পিছন ফিরে অভির দিকে তাকিয়ে সুজয়া দেখতে পায় অভির দুটো চোখ ঘুমে ভেসে যাচ্ছে। সুজয়ার তখন ওই ঘরেই থাকতে বেশি ইচ্ছে করছিল। আলমারিটা বন্ধ করে দিয়ে অভিকে উদ্দেশ্য করে। বলে—আজ যদি এ ঘর থেকে না যাই তাহলে কিছু হবে? সুজয়ার কথা শেষ হয় না। অভি দু হাত দিয়ে ওকে ততক্ষণে বেঁধে ফেলেছে। সে রাতটা ওঘরেই দু জনে অনেকক্ষণ কাটিয়েছিল। অভিদের বনেদি বংশ। চৌধুরি পরিবার। এককালে এই বংশের নামডাক ছিল। অভির দাদামশায়ও বড় মানুষ ছিলেন। চৌধুরিদের যেমন বিত্ত ছিল তেমনই ছিল বংশ মর্যাদাবোধ। অভির ঠাকুরদাদা কলকাতা হাইকোর্টের জজ হয়েছিলেন। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে চৌধুরিদের সেই সময় অগ্রণী ভূমিকা ছিল। অভির বাবা বড় ডাক্তার হলেও কি কালীদাস পাঠকের কাছে বৈঠকি বাংলা গান শিখতেন, ঠুমরি চর্চা করনে। সুজয়া এই ঘরের মধ্যে পুরোনো আমলের বাদ্যযন্ত্র—এসরাজ, বীণা, ছবি ইত্যাদির ওপর চোখ রাখলেই এসব কথা ভাবে। ঘরের এক কোণে একটা পিয়ানোজার্মান রিডের। সম্ভবত অভিজ্ঞ মার ছিল সেটা।

আজ সে সবই সুজয়ার মুহূর্তেই মনে পড়ে যায়। নতুন মা কিছু বুঝতে না পেরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর আলতো করে সুজয়ার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেছিলেন—এত কষ্ট তোর কোথায় রাখিস মা? আমায় বল্ মা। দেখ আমি ত’ আছি। সুজয়া তখন মুখে কিছুই বলতে পারে নি কেবল নতুন মার বুকে মাথা রেখে খানিকটা কেঁদে নেয়।

অরিন্দমও বুঝতে পারে এ ভাবে ঝোকের মাথায় তার বিয়ে করা ঠিক হয় নি। নিজের তরফে কোনো অসুবিধা ছিল না। তার মা অনেক বেশি উদার।

ঘটনাচক্রে সুজয়াদের বাড়িতে অরিন্দমের মা গিয়ে পড়েছিলেন। সেখানে সুজয়ার সাথে আলাপ। নতুন মা প্রস্তাবটা সৃজয়াদের বাবা মাকে দিয়েছিলেন। সুজয়ার বাবা মারও বিশেষ আপত্তি ছিল না। তারাও চাইছিলেন যাতে সুজয়ার একটা গতি হয়। কিন্তু ছ মাসের বিধ্বা মেয়ের বিয়ে সহজ কথা নয়। এখন এইকালেও। কার বুকের পাটা এত বড়? তাই তারা নতুন করে কিছু ভাবেন নি। অরিন্দমের মা প্রভাব দেওয়াতে সুজয়ার বাবার বিশ্বাসে জোর আসে। সুজয়ার আত্মীয়স্বজন সবাই একপ্রকার মত দিয়েছিলেন। নম্র, ভদ্র, সুন্দরী সুজয়ার প্রতি সবাই এক প্রকার গুণমুগ্ধ ছিলেন। সুজয়ার ছোট কাকিমা ত’ বলেই ফেললেন কাঁচা বয়স, বিয়ে দিয়ে দাও বড়দি। এ কথায় কি ছিল সুজয়ার জানা নেই। সুজয়ার ইচ্ছা ছিল চাকরি করার। লেখাপড়া তবে কিসের জন্য?

বাবা-মার মুখের দিকে তাকিয়ে সুজয়ার কষ্ট হত। সবার অনুকম্পা, প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে সুজয়ার প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। তাছাড়া নতুন মাকে সুজয়ার কত ভীষণ ভালো লাগতো। স্বার থেকে নতুন মা একটু আলাদা। অনুকম্পা ও দরদ দেখাতেন না। তবে হৃদয় নির্মল। স্নেহ ভরপুর। এজন্যও অনেকটা সুজয়া রাজি হয়। অভি চলে গেলে কিছুটা সামলে ছিল সুজয়া কেবল পরিবেশকে মনে রেখে। অরিন্দমের সাথে বিয়ের পর তার কাটা ঘায়ে যে নুনের ছিটে লাগতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। এ এক নতুন যন্ত্রণা সুজয়ার। সুজয়ার কাছে অরিন্দমের নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আর সুজয়ার মনে হয়। অভির কাছে। বুক ফেটে যায় সুজয়ার। অভির দেওয়া শেষ টাইটেলটাও নেই। কেবল সেই হারটা আছে। তাকে সুজয়াকাছ ছাড়া করে না। কিন্তু এখন মাঝে মাঝে। হারটাকে ফাঁসি বলে মনে হয়। হারটাই অভির কথা মনে করিয়ে দেয়। সুজয়ার পুরোনো যন্ত্রণাটা আবার বাড়ে।

একদিন রাতে অরিন্দম দেরি করে ফিরেছিল। সেদিন সারাক্ষণ সুজয়া অভির জন্য কেঁদেছিল। রাতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎই ঘুম ভাঙতে দেখতে পায় অরিন্দম তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কি যেন দেখছে। আর বাঁ হাতটা দিয়ে তার সারা মুখে স্পর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাগে দুঃখে ফেটে পড়েছিল সুজয়া। ঝট করে উঠেই অরিন্দমের পাঞ্জাবির ধারটা ধরে চিৎকার করে বলেছিল—তুমি? আমায় ধরেছো কেন? কেন? তোমায় কে এই অধিকার দিল? তারপর কিল ঘুসি মেরে পাঞ্জাবীটা ছিঁড়ে দিয়ে হঠাৎই বোবা হয়ে যায়। অরিন্দম সুজয়াকে ধরে শুইয়ে দেয়। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সুজয়ার প্রতি গভীর স্নেহে অরিন্দম সব ব্যাপারেই চুপ থাকতো। ডাক্তার বন্ধু, সমীর তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, এই সময়টা একটু ধৈর্য ধরতে হবে। ও মেন্টালি ডিপ্রেসানে ভুগছে। ওকে বুঝতে হবে নইলে বিপদ। ইনস্যানিটি দেখা দিতে পারে। অরিন্দম আরও দু’একবার চেষ্টা যে করেনি তা নয়। সবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। সুজয়া তাকে বোঝেনি। অভির স্মৃতি তাকে এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এ ঘটনার পর দিনই জানলায় দাঁড়িয়ে সুজয়া নতুন মা আর অরিন্দমের কথাবার্তা শুনতে পায়। সে সময় নতুন মার কথাগুলোই ঠিক মনে হয়েছিল। এ সময় তার একটু একা থাকা উচিত। তাই সহজেই রামমাটি যাবার কথায় সায় দিয়েছিল সুজয়া।

কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। খেয়াল ছিল না। কৃষ্ণা চা দিতে এলে বুঝতে পারে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আবার হারিয়ে যায় সুজয়া। কেন জানে না এই মুহূর্তে নতুন মা অরিন্দম—ওদের কথা মনে পড়ছে। এই প্রথম অরিন্দমের মুখটা সুজয়ার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সুজয়া বোঝে, নতুন মা ছাড়া তাকে আর কেউ ঠিক বোঝে না। লু অরিন্দমের কথা মনে হতেই কেমন করুণা হয়। ওর জন্যই অরিন্দমের এত কষ্ট। তাছাড়া অরিন্দমের প্রতি আর একটা কারণে সুজয়ার শ্রদ্ধা জাগে। তা হল, সেদিন রাতটা ছাড়া এই তিন মাসে অরিন্দম তাকে একটু ডিসটার্ব করে নি। জোর খাটায়নিও। ও ইচ্ছা করলেই পারতো। জোর করে ওর পাওনা সুদে আসলে মিটিয়ে নিতে। তা কিন্তু অরিন্দম করে নি। সিঁড়ির নিচ থেকেই কৃষ্ণা ডাকতে থাকে—ও বৌদিদি মা ডাকচে। নিচে এসো। একা একা যে তুমি কি কর? নিচের ঘরে কত লোক এসেছে, তোমাকে মা তাই ডাকছে। সুজয়া তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। হাতের বইটা রেখে দিয়ে কৃষ্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলে আমি এখুনি আসছি মাকে বলগে। কৃষ্ণা চলে যায়। সুজয়া হাত মুখ ধুয়ে নেয়। কাপড়টাও বদলে নেয়। নীল রঙের একটা হালকা তাঁতের শাড়ি পরে। সাদা রঙের ব্লাউজ। হাল্কা নীল টিপ। আজ তার অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ব্লাউজের হুকটা লাগাতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, ঠিক এরকমই একদিন শাড়ি পরার সময় অভি ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সুজয়া বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় নি। অভি প্রতিবর্ত ক্রিয়ায়, চোখে হাত দিয়ে বলে ‘সরি’—তাড়াতাড়ি সেরে নাও। আমি কিন্তু এখন। কানামাছি। সুজয়ার হাসি পায় অভিকে বিব্রত হতে দেখে। অভি শান্ত ভদ্র অথচ দুষ্টু। একটু যা মিচকে মিচকে হাসে। অভিকে আরো লজ্জায় ফেলেছিল সুজয়া একইভাবে। রয়ে গিয়ে বলেছিল : হয়ে গেছে। চোখ খোলো। সেদিন অবশ্য অভি এ জন্য সুজয়াকে শাস্তি দিয়েছিল, একটু অন্যভাবে। অরিন্দম কিন্তু তেমন নয়। ঘরে ঢোকার আগে জানায়। যেন অফিসারের খাস কামরায় ঢুকছে। সুজয়া বোঝে অরিন্দমের ঠিক দোষ নেই। ও যথেষ্ট সহ্য করেছে, করছেও। ও সুজয়া মন দিতে পারেনি। অরিন্দমও দূরে সরে থেকেছে। ওর পড়া আছে। বাইরে যাওয়া আছে। নিজের লাইব্রেরিতেই বেশিক্ষণ থাকে অরিন্দম। কিংবা পড়ায়। অরিন্দম এ সব নিয়ে থাকতে পারে। সুজয়া পারে না। তার সময় অনেক বড়। কাজ সে তুলনায় অনেক কম। এ ভাবে একা থাকতে সুজয়ার কষ্ট হয়। বাড়ে বুকের ব্যথা। মনে হয়, কে যেন তার হৃদপিণ্ডের ওপর একটা পাথর বসিয়ে দিয়েছে। নিচে যেতেই সুজয়া দেখতে পায় জন কয়েক ভদ্রমহিলাকে, সম্ভবত আশেপাশেই থাকেন। কাকিমা পরিচয় করালেন।

কৃষ্ণা বৌদির পাশে তখন আটকে গেছে। সে সময়ে পাশের বাড়ির মহিলারা অরিন্দমের ছোটবেলায় টুকরো স্মৃতি নিয়ে আলোচনা করছে। সুজয়ার কাছে এ সব কথা কোনো গুরুত্ব পাচ্ছিল না। ও শুধু নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকে। একজন সুজয়াকে প্রশ্ন করেন অরি এলো না কেন। কাকিমা বললেন : অরির কলেজে এখন পরীক্ষা চলছে তাই বৌদি ওকে এখানে দিয়ে গিয়েছে। অরি এসে নিয়ে যাবে। পাশের বাড়ির রুমকির মা বললেন সুজয়াকে উদ্দেশ্য করে—দেখো বৌমা আমাদের অরিকে নিয়ে তুমি সুখে থাকবে। ওর মত ছেলে হয় না। সুখি হবার কথায় সুজয়ার চমক

ভাঙে কে সুখি হবে?—অরিন্দম? সুজয়া? বুকের ভেতরটা আবার কেমন ভারি হয়ে যায়। মাথাটা ঘুরতে থাকে। কেমন অসুস্থ লাগে। দিন কতক রাতে ঘুম হয় নি। সুজয়া কোনো রকমে সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ওপরে চলে যায়। ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে, দরজা ভেজিয়ে শুয়ে পড়ে।

নিচে অনেকক্ষণ থেকে কৃষ্ণা চেঁচামেচি করছে। সুজয়া আধোঘুমের ভেত্র দু একটা কথা শুনতে পাচ্ছিল। খুব সম্ভবত কেউ এসেছে। একটু পরেই অরিন্দমের গলা পায়। এত রাতে?—সুজয়া ভাবে।

কেমন জানি সুজয়ার লজ্জা। এ ধরনের অনুভূতি এই প্রথম। বিছানায় গিয়ে আবার শুয়ে পড়ে।

নিচে ছোট কাকিমা অরিন্দমকে বলছিলেন বাবা দু দিন বউ ছেড়ে থাকতে পারলি না। যাক্ সুজয়া এসেছে তাই এলি। নয়তো তোর টিকিও দেখা যেত না। সাত বছর ত বাবু এমুখো হয় নি। সেই কৃষ্ণার মুখেভাতে এসেছিলি। অরিন্দম হাত পা ধুয়ে দাওয়ার ওপর বসেছিল। কাকিমা চা দিয়ে যাবার সময় কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে—যা ওপরে আছে। বোধহয় শরীরটা খারাপ। মনখারাপও হতে পারে। বেশি দেরি করিস না। খাবার সময় এসে পড়বি তাড়াতাড়ি।

অরিন্দম একটু মুচকে হাসে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। আজ অরিন্দম প্রস্তুত হয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে। দরজার গোড়ায় গিয়ে দ্যাখে সুজয়া শুয়ে আছে। জানলার দিকে মুখ। অরিন্দম ওর পাশে গিয়ে বসে। একটু ভেবে নিল কি একটা তারপর হাতটা আস্তে আস্তে সুজয়ার মাথার ওপর রাখে, তারপর সঞ্চালন করে। এবারে সুজয়া তাকাল অরিন্দমের দিকে।

–কখন এলে?

–একটু আগে।

–নতুন মা কেমন আছে, ভাল?

–হ্যাঁ, ভালোই।

—তুমি?

—ভালো না।

–কেন?

–মনখারাপ।

—কেন?

–তোমার জন্য। তাই চলে এলাম।

—তুমি আমায় ভালবাস তাই না? আমি তোমায় কষ্ট দি।

—ও কিছু নয়। এখানে কেমন ছিলে?

—ভালোই। তবে….

—তবে কি?

—তোমার কথা মনে হচ্ছিল।

—অরিন্দম মৃদু হাসে। সুজয়া বুঝতে পারে অরিন্দম এই ক’দিনে বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছে। বাইরে বাতাস একটু জোরে বইছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। বোধহয় বৃষ্টি হবে।

সুজয়া আবার বলে–কাল বাড়ি যাবো?

—কোথায়, পাণ্ডুয়া?

–না নতুন মার কাছে, তোমার বাড়িতে। আমার কেমন ভয় করছে। খালি মনে। হচ্ছে তলিয়ে যাচ্ছি।

অরিন্দম সুজয়াকে শান্ত করতে চায়। তারপর একটানে সুজয়াকে টেনে নেয় বুকে। সুজয়া আজ আর কিছু বলতে পারে না। সারা শরীরের স্ব টান শিথিল হয়ে যায়। অরিন্দম আজ সব কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে। সুজয়ার সারা শরীর অবশ হয়ে যায়। সারা গায়ে অনুভূতি, শিহরণ। খুব ঘুম পায়। প্রম তৃপ্তিতে শুধু সুজয়ার মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে আসে অভি। অরিন্দম নিজেকে খুঁজতে থাকে। এদিকে বাতাস বৃষ্টি সারা ঘরময়–কারোর খেয়াল নেই।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel