Friday, April 3, 2026
Homeথ্রিলার গল্পব্যাকরণ রহস্য - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ব্যাকরণ রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

“ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়!” বাঁকা মুখে কথাটি বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার, আমাদের প্রিয় হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিলেন।

হাসি চেপে বললুম, “একটু ভুল হল হালদারমশাই!”

গোয়েন্দা-ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে চার্জ করলেন, “কী ভুল? যতসব পাগল-ছাগলের কারবার!”

“সে-বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি একমত।”

“তা হলে?”

“কথাটা উলটে গেছে। ওটা হবে, পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়।”

গোয়েন্দামশাই এবার তাঁর অনবদ্য ফ্যা’ শব্দটি বের করলেন। অর্থাৎ হাসলেন। “তাই বটে। তবে আমার রাগ হচ্ছিল, বুঝলেন? ভদ্রলোকের মাথার গণ্ডগোল আছে। খামোকা কর্নেল-স্যারের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে তো গেলেনই, উপরন্তু আমারও ক্ষতি করলেন।” বলে নিজের কাঁচা-পাকা চুল খামচে ধরলেন। মুখে আঁকুপাঁকু ভাব।

আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রকাণ্ড একটা বইয়ের পাতা খুলে মনোযোগী ছাত্রের মতো কী সব নোট করছিলেন। দাঁতে কামড়ে-ধরা চুরুট। সেটি নিবে গেছে বলেই আমার ধারণা। তবে ওঁর সাদা সান্তাক্লজ সদৃশ দাড়িতে একটু ছাই আটকে আছে এবং সকালের রোদ্দুরের ছটায় চওড়া টাক ঝকমক করছে। মুখ না তুলেই বললেন, “হালদারমশাই যা বলতে এসেছিলেন, আশা করি সেটা ভুলে গেছেন।”

বিমর্ষ মুখে হালদারমশাই শুধু বললেন, “হঃ।”

“মাথার ভেতর পাগল আর ছাগল যুদ্ধ করছে,– বলে কর্নেল এবার মুখ তুলে মিটিমিটি হাসলেন। “তবে জয়ন্ত যা বলল, ঠিক নয়। হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন, ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়।”

অবাক হয়ে বললুম, “কী বলছেন! কথাটা একটা বাংলা প্রবচন। তাকে উলটে দিচ্ছেন আপনি?”

কর্নেল আমাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, “আসলে হালদারমশাইয়ের বলতে আসা কথাটা এক্ষেত্রে পাগলেই খেয়ে ফেলেছে।”

বই বন্ধ করে রেখে প্রকৃতিবিদ উঠে দাঁড়ালেন। সাদা দাড়ি থেকে ছাইয়ের টুকরোটি খসে পড়ল। আমাদের কাছে এসে বসলেন। তারপর নিবে-যাওয়া চুরুটটি লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিলেন এবং একরাশ ধোঁয়ার ভেতর ফের বললেন, “ছাগলে কী না খায়, এটা একেবারে বাজে কথা। ছাগলের যা খাদ্য, তাই ছাগল খায়। কিন্তু সেই ছাগল যখন মানুষের ভাষায় আবোল-তাবোল বলে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন…”

কর্নেলের কথার ওপর বললুম, “আপনি ভদ্রলোকের কথা বিশ্বাস করেছেন দেখছি।”

“হুঁউ, করেছি।” হতভম্ব হয়ে বললুম, “কী আশ্চর্য! ছাগল শুধু ব্যা করে শুনেছি।”

“ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যাকরণ রহস্যও বলতে পারো।”

“কী বলছেন! ওঁর হাবভাব কথাবার্তা শুনেও ওঁকে বদ্ধ পাগল মনে হল না আপনার?”

কর্নেল হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে চোখ বুজলেন। আপনমনে বলতে থাকলেন, “ছাগলটা কালো। কালো যা কিছু, মানুষের কাছে তাই অশুভ। কারণ কালো রং অন্ধকারের প্রতীক। অন্ধকারে মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে। তা ছাড়া কালোর সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক আছে ধরে নিয়েই যেন কালো শোকবস্ত্র পরার প্রথা..হঁ, বিজ্ঞানীরাও এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত নন। ব্ল্যাক হোল’ কথাটিতে সেটা স্পষ্ট। নক্ষত্রের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এই টার্ম। …যাই হোক, কালো ছাগলটা আবার কিনা একটা পোডড়াবাড়ির ভাঙা দেউড়ির মাথায় চড়ে ঘাস-পাতা খায় এবং অদ্ভুত একটা কথা বলে নিপাত্তা হয়ে যায়!”

হালদারমশাই কান দুটো খাড়া করে ওঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। তাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বললুম, “আপনি ওই ভদ্রলোকের চেয়ে আরও পাগল!”

“উঁহু, পাগল নয় ডার্লিং, ছাগল,– কর্নেল চোখ খুলে বললেন। এবার মুখটা গম্ভীর। “মুরারিবাবু, মুরারিমোহন ধাড়া স্পষ্ট শুনেছেন ছাগলটা তাকে কিছু বলছে। একদিন নয়, তিন দিন,– বলে কর্নেল তিনটে আঙুল দেখালেন।

অমনি হালদারমশাই সশব্দে শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, “মনে পড়েছে! মনে পড়েছে!” জিজ্ঞেস করলুম, “কী হালদারমশাই?” হালদারমশাই ছটফটিয়ে বললেন, “ওই যে কর্নেল-স্যার তিনখান ফিঙার দ্যাখাইলেন, লগে-লগে কথাখান আইয়া পড়ল।”

কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”

প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভীষণ হকচকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমিও একটু অবাক। বললুম, “থট-রিডিং, নাকি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছেন?”

ধুরন্ধর প্রকৃতিবিদ বললেন, “তোমার এই একটা অদ্ভুত স্বভাব জয়ন্ত! তুমি কাগজের খবর লেখো, কিন্তু খবর পড়ো না। ময়রা নাকি সন্দেশ খায় না। যাই হোক, হালদারমশাই, জয়ন্তদের ‘দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকায় আজ যে ভয়ঙ্কর ত্রিশূলের খবর বেরিয়েছে, তার সঙ্গে একটু আগে মুরারিবাবুর আবির্ভাবের সম্পর্ক আছে। না, থট-রিডিং নয়, নিছক অঙ্ক। খবরটার ডেটলাইন হল রূপগঞ্জ। আর মুরারিবাবুর বাড়িও রূপগঞ্জে।”

হালদারমশাই বললেন, “কিন্তু ভদ্রলোক তো ত্রিশূলের ব্যাপারটা বললেন না?”

আমিও বললুম, “শুধু ছাগল-টাগল নিয়েই বকবক করে গেলেন।” কর্নেল একটু হেসে বললেন, “বেশি উত্তেজনা অনেক প্রাসঙ্গিক কথা ভুলিয়ে দেয়। তা ছাড়া ভদ্রলোক পাগল না হলেও একটু ছিটগ্রস্ত, তাতে সন্দেহ নেই। তবে..হ্যাঁ, উনি ফিরে আসছেন। সিঁড়িতে ভীষণ পায়ের শব্দ আর লিন্ডাদের কুকুরটা আবার চেঁচাচ্ছে! যে কারণেই হোক, কুকুরটা ওঁকে পছন্দ করছে না।” বলে হাঁক ছাড়লেন, “ষষ্ঠী, দরজা খুলে দে।”

কলিং বেল বাজল। বাজল বলা ঠিক হচ্ছে না, বাজতে লাগল। বিরক্তিকর! গ্রামগঞ্জের মানুষ বলে নয়, ছিটগ্রস্ততাও বিশ্বাস করি না, বদ্ধ পাগল! কলিং বেল একবার বাজানোই তো যথেষ্ট। যেন কারা তাড়া করেছে কাউকে এবং সে মরিয়া হয়ে কলিং বেলের বোম টিপে চলেছে। ষষ্ঠীচরণ ছোট্ট ওয়েটিং-রুমের ভেতর বাঁকা মুখে বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেলুম। বাইরের লোক এলে ওখানেই বসিয়ে রেখে সে কর্নেল-বাবামশাই’কে খবর দেয়। আমরা যে বিশাল ঘরটাতে বসে আছি, এটা ড্রইংরুম, তবে জাদুঘর বা প্রশালা-পাঠাগার-গবেষণাগার এসবের একটা বিচিত্র জগাখিচুড়ি।

হ্যাঁ, তিনিই বটে। হুড়মুড় করে পরদা ফুঁড়ে ঢুকেই হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন, “আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি।”

কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”

ভদ্রলোক বললেন, “ত্রিশূল।” তারপর অদ্ভুত খাক শব্দে কষ্টকর হাসি হাসলেন। এমন বিদঘুঁটে হাসি মানুষের মুখে কখনও শুনিনি।

হালদারমশাইয়ের ফ্যাচটা হাসিই বটে। এই ‘খ্যাঁক’-টা দাঁত খিঁচুনি।

কর্নেল বললেন, “আপনি বসুন মুরারিবাবু।”

“বসব না। ট্রেন ফেল হয়ে যাবে। তবে আপনি স্যার, সত্যিই অন্তর্যামী! নকুলদার কথা বর্ণে-বর্ণে মিলে গেল এতক্ষণে। নকুলদার চেনাজানা ছিলেন বঙ্কুবাবু…বন্ধুবিহারী ধাড়া স্যার…সম্পর্কে আমার জ্যাঠাকমশাই হন। ব্রিটিশ আমলে অমন ডাকসাইটে দারোগা আর দুটি ছিল না। তার কাছে নকুলদা আপনার সাঙ্ঘাতিক-সাঙ্ঘাতিক গল্প শুনেছিল। …তবে স্যার, কালো ছাগলটারও একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল। ছাগলটার তিনটে শিং। তার, তিরিশ ফুট উঁচু দেউড়ির মাথায় ওঠে কী করে? …আর স্যার…হা, মনে পড়েছে! কাছেই শিবমন্দিরটা। তার মাথায় ত্রিশূল। …সেও তিন, এও তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়নয়ে একাশি…।…কালো ছাগলটা স্পষ্ট বলেছে ‘একাশি, বুঝুন স্যার! এক গ্লাস আশি, একাশি। এক বাদ দিলে রইল আশি। আশির শূন্য বাদ দিন। রইল আট। এবার ওই বাদ দেওয়া এক-কে আটের সঙ্গে যোগ করুন, আবার নয় পাচ্ছেন। তিন তিরিক্কে নয়। ছাগলের তিনটে শিং আর মন্দিরের মাথায় তিনটে শিং। গুণ করলে নয় পাচ্ছেন না কি?…আমি আসি স্যার! ট্রেন ফেল হবে,– বলে মুরারিবাবু ঘুরেই পা বাড়ালেন।

কর্নেল বললেন, “ত্রিশূলটা, মুরারিবাবু!”

“ও, হা! ত্রিশূলটার কথা বলা হল না। মাথার ঠিক নেই স্যার!”মুরারিবাবু নিজের মাথায় গাঁট্টা মেরে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন। “কালো ছাগলটা পরপর তিনদিন আমাকে বলেছে, একাশি। চারদিনের দিন রাত্তিরে দেখি, সেই দেউড়ির নীচে ঘাসের ওপর নকুলদা মরে পড়ে আছে। পিঠে তিনটে ক্ষত। রক্ত শুকিয়ে গেছে। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলুম। তারপর স্যার আশ্চর্য ঘটনা…মন্দিরের ত্রিশূলে রক্ত…কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! পুলিশ এল। কিন্তু কিছুই হল না। …চলি স্যার! ট্রেন ফেল হবে।”

হালদারমশাই সোজা টানটান হয়ে বসে কথা শুনছিলেন। অভ্যাসমতো বলে উঠলেন, “রহস্য! প্রচুর রহস্য!”

কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু! পুলিশকে কালো ছাগলটার কথা বলেছেন কি?”

মুরারিবাবু ততক্ষণে ওয়েটিং-রুমটাতে ঢুকে গেছেন। সেখান থেকেই জবাব দিলেন, “বলেছি। দারোগাবাবু বললেন, মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি হোন।…শুনে বেজায় রাগ হল বলেই আপনার কাছে…নাঃ, ট্রেন ফেল হবে।”

মুরারিবাবু সশব্দে বাইরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। সিঁড়িতে তেমনি জুতোর শব্দ এবং কুকুরের চেঁচানি শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল হাঁকলেন, “ষষ্ঠী, দরজা বন্ধ করে দে।”

হালদারমশাই নড়েচড়ে বসে আবার একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, “তখন শুধু ছাগল ছিল। এবার এল মার্ডার। কাগজে ছাগল-টাগলের কথা লেখেনি। তবে ত্রিশূলে রক্তের দাগ আর ডেডবডির পিঠে তিনটে ক্ষতচিহ্নের কথা লিখেছে। মন্দিরে পুজো বন্ধ ছিল। আবার ঘটা করে ঢাকঢোল পুজোআচ্চা পাঁঠাবলির কথা লিখেছে। রীতিমতো রহস্য।”

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “ব্যাকরণ কিংবা ব্যাকরণ রহস্য।”

আমি অবাক হয়ে বললুম, বারবার এ-কথাটা বলার কারণ কী?”

“তুমি কি ব্যাকরণ পড়োনি ডালিং?”

“স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এখানে ব্যাকরণ আসছে কী সুত্রে?”

“সন্ধি, জয়ন্ত, সন্ধি! এক এবং আশি এই দুটো শব্দ সন্ধি করলে একাশি হয়।”

ষষ্ঠী ট্রে’তে কফি আর স্ন্যাকস্ রেখে গেল। কর্নেল তার উদ্দেশে বললেন, “শিগগির ছাদে যা তো ষষ্ঠী! কাকের ঝগড়া শুনতে পাচ্ছি। ফের কোনো ক্যাকটাসের ভেতর কার ঠোঁট থেকে মরা ইঁদুর পড়ে গেছে হয়তো।”

ষষ্ঠী ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুটল। এই ঘরের কোণা থেকে এঁকেবেঁকে সিঁড়িটা ছাদে কর্নেলের শূন্যোদ্যানে উঠে গেছে। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “রূপগঞ্জের ওদিকে এক জাতের অর্কিড দেখেছিলুম। এনে বাঁচাতে পারিনি। রেনবো অর্কিড’ নাম দিয়েছিলুম। রামধনুর মতো সাতরঙা ফুল ফোটে। মোট তিনটে পাপড়ি। মাই গুডনেস!” কর্নেল নড়ে বসলেন। “আবার সেই তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়-নয়ে একাশি। কালো ছাগলের ব্যাকরণ!”

হেসে ফেললুম, “মুরারিবাবু এ-ঘরে এক খাবলা পাগলামি রেখে গেছেন। আপনার মাথায় সেটা ঢুকে পড়েছে।”

হালদারমশাইকে প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কফির পেয়ালায় পুনঃ পুনঃ ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে দ্রুত গিলে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। বললেন, “ছাগলেরও তিনটে শিং! বোকা বানিয়ে চলে গেল। পাগল না সেয়ানা পাগল। …অরে ফলো করুম। কর্নেল-স্যারের লগে ফাইজলামি?”

কর্নেল বললেন, “তার আগে একটু ব্যাকরণচর্চা করে নিন, হালদারমশাই!”

“ক্যান?” হালদারমশাইয়ের চোখ দুটো গোলাকার দেখাল।

“ছাগল কোন লিঙ্গ জানেন তো?”

আমি ঝটপট বললুম, “স্ত্রীলিঙ্গ। পুংলিঙ্গে পাঁঠা।”

কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমাদের কাগজের লোকেদের নিয়ে এই এক জ্বালা। সুকুমার রায়ের হাঁসজারু! ব্যাকরণ মানেন না। ছাগল পুংলিঙ্গ এবং তার দাড়িও থাকে।” বলে হালদারমশাইয়ের দিকে ঘুরলেন। এবার মুখে অমায়িক ভাব। “হালদারমশাই, কথাটা মনে রাখবেন। ছাগল পুংলিঙ্গ। কাজেই তার দাড়ি থাকে। রূপগঞ্জে শিবমন্দিরে যে চারঠেঙে জীবগুলো বলি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর দাড়ি আছে, এটা ইমপর্ট্যান্ট।”

“হঃ!” কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার রূপগঞ্জের মুরারিমোহন ধাড়ার দ্বিগুণ জোরে বেরিয়ে গেলেন।

চুপচাপ কফি খাওয়ার পর বললুম, “আপনার কথাটাও সুকুমার রায়ের সেই বদ্যিবুডোর পদ্যটার মতো হল, যে নাকি হাত দিয়ে ভাত মেখে খেত এবং খিদে পেত বলেই খেত। আশ্চর্য! দাড়িওলা ছাগলকেই তো লোকে পাঁঠা বলে এবং শুধু পাঁঠাই বলি হয়।”

“অবশ্যই।” কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন। “ছাগলি বলিদান শাস্ত্রমতে চালু নয়।”

“তা হলে কথাটা ইমপর্ট্যান্ট বলার কারণ কী?”

“একাশির হ্যাপা। সন্ধিবিচ্ছেদ করা কতকটা ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হওয়ার মতো। বলিদান হলেই প্রব্লেম!” কর্নেল ঘনঘন দাড়িতে হাত বুলোতে শুরু করলেন। “হুঁ, ফের সুকুমার রায় এসে যাচ্ছেন। গোঁফচুরি’ পদ্যটা।’গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। এক্ষেত্রে দাড়ি দিয়ে চেনার একটা ব্যাপার আছে। সব দাড়ি একরকম নয়, ডার্লিং! আমার মনে হচ্ছে, ছাগলটার দাড়ি তাকে বাঁচাতে পারত–কিন্তু তার তিনটে শিং নিয়েই সমস্যা।”

কর্নেল হঠাৎ উঠে পায়চারি শুরু করলেন এবং রূপগঞ্জের ওই ছিটগ্রস্ত ভদ্রলোকের মতো এলেবেলে কথাবার্তা বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন। “…বলির জন্তুর কোনো খুঁত থাকা শাস্ত্রসিদ্ধ নয়। কিন্তু তিনটে শিং থাকাটা কি খুঁত? ও-তল্লাটে শাস্ত্রজ্ঞ বামুন আছেন অনেক। শিবমন্দিরের ছড়াছড়ি..ধ্বংসস্তূপ…জঙ্গল…ঢিবি…শৈবযুগে এক রাজাও ছিলেন দেখলুম। শিবসিংহ!”

অমনি লেখাপড়ার টেবিলের সেই প্রকাণ্ড বইটার দিকে চোখ গেল। বাদামি চামড়ায় বাঁধানো gehiaCO GHIRT 967 66781 0169, ‘Ancient Kingdoms of Bengal, Vol. I’.

একটু হেসে বললুম, “তাহলে এখানেও শিং এসে যাচ্ছে। একটা পপুলার বাংলা গান শুনেছি, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ/ডিম নেই তবু অশ্বডিম্ব…’ তাতে ‘ভ্যাবাচাকা’ কথাটাও ছিল মনে পড়ছে।”

কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, “রেনবো অর্কিড, ডার্লিং! তুমি তো আকাশে রামধনু দেখেছ। পৃথিবীতে রামধনু… শ’য়ে-শ’য়ে রামধনু দেখতে হলে রূপগঞ্জে চলো। গেঁয়ো যোগী ভিক্ষে পায় না বলে একটা কথা আছে। রূপগঞ্জের লোকেরা রেনবো অর্কিডের কদর বোঝে না। চোখ জ্বলে যায়, জয়ন্ত। কী অসাধারণ সৌন্দর্য এই এপ্রিলে!”

“তার মানে, আপনি যাচ্ছেন এবং আমাকেও তাতাচ্ছেন!”

কর্নেল টেলিফোনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “রূপগঞ্জ নামটা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনি নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যরসিক। শুধু কি রেনবো অর্কিডের ফুল? প্রজাপতিও। আর সেই প্রজাপতির ডানায় রামধনুর সাতরঙা সৌন্দর্য! দুঃখের কথা, ডার্লিং! রেনবো অর্কিড এনে বাঁচাতে পারিনি। তার চেয়ে আরও দুঃখ প্রজাপতিগুলো এত চালাক যে, একটাও নেটে আটকাতে পারিনি।”

ফোনে হাত বাড়াতে গিয়ে ডাইনে দরজার দিকে প্রায় ঝাঁপ দিলেন কর্নেল। কী একটা জিনিস তুলে নিলেন মেঝের কার্পেট থেকে।

একটা ছোট্ট গোল কালচে রঙের খয়াটে চাকতি।

বললুম, “কী ওটা?”

কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতস কাঁচ বের করে দেখতে দেখতে বললেন, “প্রাচীন যুগের মুদ্রা অথবা সিল। পরিষ্কার করলে বোঝা যাবে। মনে হচ্ছে, মুরারিবাবুর হাতেই এটা ছিল। দেখাতে এনেছিলেন। ট্রেন ফেলের ভয়ে তাড়াহুড়োয় হাত থেকে পড়ে গেছে। কার্পেটে পড়ার জন্যই শব্দ হয়নি। তবে…ওই! আবার উনি আসছেন। জয়ন্ত, দরজা খুলে দাও, প্লিজ!”

ফের নীচের দোতলায় কুকুরের চ্যাঁচামেচি, বিচ্ছিরি জুতোর শব্দ। ভদ্রলোক ছিটগ্রস্ত নন, বদ্ধ পাগলই। বাইরের দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলুম, কলিং বেলের দিকে ওঠানো হাত সটান নেমে গেল এবং সেই বিদঘুঁটে এ্যাক হেসে আমাকে ঠেলে ঢুকে পড়লেন। আগের মতো হাঁসফাস করে বললেন, “আবার ভুল! আসলে মাথার ঠিক নেই। ওদিকে ট্রেনের সময় হয়ে গেছে…কোথায় যে জিনিসটা হারিয়ে ফেললুম, কে জানে…হাতেই ছিল…”।

“চাকতি?” কর্নেল জিনিসটা দেখালেন।

মুরারিবাবুর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। “পেয়েছেন? বাঁচলুম তা হলে। যাই, ট্রেন ফেল হবে,– বলে ঘুরে পা বাড়ালেন।

কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু, এটা কোথায় পেয়েছেন?”

মুরারিবাবু না ঘুরে জবাব দিলেন, “নকুলদার হাতের মুঠোয়। পুলিশকে বলিনি। …ট্রেন ফেল হবে।”

তারপর অদৃশ্য হলেন। ফের সিঁড়িতে শব্দ, কুকুরের চাঁচানি। দরজা বন্ধ করে ড্রইংরুমে ফিরে দেখি কর্নেল একটা শিশিতে ছোট্ট বুরুশ চুবিয়ে চাকতিটাতে খুব ঘষাঘষি করছেন। সোফায় বসে ওঁর ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করতে থাকলুম। একটু পরে ষষ্ঠী শূন্যোদ্যান থেকে নেমে একগাল হেসে ঘোষণা করল, “না বাবামশাই! মরা ইঁদুর নয়, খামোকা ঝগড়া। আপনাকে বলি না কাকেরা বড্ড ঝগড়াটে।”

বাবামশাই’কান করছেন না দেখে সে আমার উদ্দেশে বলল, “বুঝলেন দাদাবাবু? যার ওপরটা কালো, তার ভেতরটাও কালো। কালো বেড়াল, কালো কুকুর…আপনারা কালো ছাগলের কথা বলছিলেন, কানে আসছিল। বড্ড গণ্ডগুলে স্বভাব, দাদাবাবু। দোতলার মেমসায়েব একটা কালো কুকুর পুষেছেন। খালি চাঁচায়। ওই সিঙ্গিবাবুদের একটা কালো ময়না আছে। আমাকে দেখলেই ইংরিজিতে গাল দেয়…”।

কর্নেল মুখ তুলে তার দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকাতেই ষষ্ঠী কেটে পড়ল।

দেখলুম, খয়াটে চাকতিটা মোটামুটি সাফ হয়েছে। “সোনা না পিতল?” জিজ্ঞেস করলুম।

কর্নেল চাকতিটাতে চোখ রেখে বললেন, “তুমি সাংবাদিক হলে কী করে জানি না। আজকাল খাঁটি সাংবাদিক হতে হলে জ্যাক অব অল ট্রেড’ হওয়া দরকার। কিন্তু হোপলেস জয়ন্ত। সোনা বা পিতল অন্তত চেনা উচিত। এটা ব্রোঞ্জ! হ্যাঁ, পুরোনো সোনা অনেক সময় একটুখানি তামাটে দেখায়। কিন্তু এত বেশি তামাটে নয়।” বলে উঠে গেলেন। বইয়ের ঝাঁক থেকে আবার একটা বিশাল বই নিয়ে এলেন।

গতিক বুঝে বললুম, “চলি। আজ মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স। একটু তৈরি হয়ে যাওয়া দরকার।”

কর্নেল হাসলেন। “মোটা বই দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই, ডার্লিং! মাথার সাইজ মোটা হলেই যেমন বিদ্যাসাগর হওয়া যায় না, মোটা বই মাত্রই তেমনি বিদ্যার সাগর নয়। মোটা মানুষ হলেই তাকে স্বাস্থ্যবান বলা যাবে? বরং মজার ব্যাপারটা দ্যাখো জয়ন্ত! বোকাদেরই আমরা মাথামোটা বলি। অথচ মোটা যা কিছু, তার প্রতি আমাদের ভয়-ভক্তি প্রচুর…এই বইটার সাইজ মোটা। প্রচুর বাক্য ছাপা আছে। কিন্তু আমার দেখার বিষয় হল এর ফোটোগ্রাফগুলো। এক মিনিট! চাকতিটার সঙ্গে মিলিয়ে নিই।”

বুঝলুম, বইটা প্রাচীন মুদ্রা এবং সিল সম্পর্কে কোনো পণ্ডিতের গবেষণার ফলাফল। ধৈর্য, নিষ্ঠা আর হাতে সময় না থাকলে এমন জিনিস তৈরি করা যায় না। কিন্তু তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, রূপগঞ্জের ব্যাকরণ রহস্য যা ব্যাকরণ রহস্য-কর্নেল যাই বলুন, ভীষণ জট পাকিয়ে গেল যে!

কর্নেল বই বন্ধ করে রেখে চাকতিটাকে আবার আতসকাঁচে পরীক্ষা করতে থাকলেন। তারপর নিভন্ত চুরুটটি জ্বেলে বললেন, “হালদারমশাইয়ের ভাষায় বলতে গেলে প্রচুর রহস্য, প্রচুর।”

“জিনিসটা কী?”

“পুরোনো মুদ্রা। কিন্তু আশ্চর্য, এতে একটা তিন-শিংওয়ালা ছাগলের মূর্তি খোদাই করা আছে!”

“বলেন কী!” বলে কর্নেলের কাছে গিয়ে চাকতিটা দেখলুম। আবছা একটা ছাগল জাতীয় প্রাণীর মূর্তি দেখা যাচ্ছে। মাথায় ত্রিশূলের মতো তিনটে শিং, কী সব দুর্বোধ্য লিপিও খোদাই করা রয়েছে।

কর্নেল বললেন, “এও আশ্চর্য, বিস্তর প্রাণী দেবদেবী হিসেবে বা দেবদেবীর বাহন হিসেবে মানুষের পুজো পেয়েছে। কিন্তু ছাগল? সে তো বলির প্রাণী।”

কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। বললুম, “সে যাই হোক, আমার ভাবনা হচ্ছে হালদারমশাই মুরারিবাবুকে মিস করেছেন। তবে মিস করুন বা নাই করুন, রূপগঞ্জে উনি যাবেনই এবং এও ঠিক, গণ্ডগোলে পড়বেন। ওঁর যা স্বভাব। রহস্যের গন্ধ পেলেই হল। আসলে পুলিশের চাকরি থেকে রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন, কিন্তু মক্কেল জোটে না। কাজেই যেচে মক্কেল জোটাতে ছাড়েন না। পকেট থেকে ট্রেন-ভাড়া দিয়েও যাওয়া চাই।”

“জয়ন্ত, আমরাও ট্রেনে যাব।” কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। “গত এপ্রিলে গাড়ি নিয়ে গিয়ে বড় ঝামেলায় পড়েছিলুম। জায়গায়-জায়গায় রাস্তার অবস্থা শোচনীয়। ট্রেনই ভালো। শুধু একটাই অসুবিধে। পরের ট্রেনে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ইরিগেশন বাংলো। চড়াই রাস্তা বলে সাইকেল-রিকশা মেলে না–সে তুমি যত টাকাই ভাড়া দাও

কেন। একটা ভরসা ঘোড়াগাড়ি। কিন্তু রাতবিরেতে ঘোড়াগাড়ি পাওয়ার চান্স কম। ..হঁ, ডি ই ভদ্রলোককে বললে জিপের ব্যবস্থা হতে পারে। তাঁকে টেলিফোনে পাওয়া সমস্যা। তবে কলকাতা হেডকোয়ার্টার থেকে বাংলো বুক করার অসুবিধে নেই। দেখা যাক।”

উনি টেলিফোনের দিকে উঠে গেলেন। বললুম, “হালদারমশাইয়ের মতো তাড়াহুড়ো না করলেই কি নয়? আগামীকাল সকালের ট্রেনে গেলে ক্ষতি কী?”

কর্নেল মুখটা যথেষ্ট গম্ভীর করে বললেন, “ক্ষতি মুরারিবাবুরই হওয়ার চান্স বেশি। ভদ্রলোক একেবারে ছিটগ্রস্ত। আমার খুব ভয় হচ্ছে জয়ন্ত…” কথা শেষ না করে কর্নেল ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন।

.

দুই

ট্রেন, না ছ্যাকরা গাড়ি! স্টেশনেও থামছে, আবার যেখানে স্টেশন নেই, সেখানেও থামছে। আর যখনই থামছে, নড়তেই চায় না। চাকাগুলোর শব্দে বড় অনিচ্ছা বিরক্তির প্রকাশ। আমাদের দু’জনের জন্য রিজার্ভ-করা কুপে-তে কর্নেল এক উটকো যাত্রী ঢুকিয়েছিলেন। বর্ধমান স্টেশনে সন্ধ্যা নাগাদ এঁর হন্তদন্ত আবির্ভাব। যাবেন রূপগঞ্জে। নাদুসনুদুস বেঁটে গড়নের লোক। এক হাতে ফোলিও ব্যাগ, অন্য হাতে খবরের কাগজে জড়ানো চৌকো বোঁচকা, পরে দেখলুম সেটা একটা বিছানা। ট্রেনে কোথাও নাকি পা রাখবার জায়গা নেই। কাকুতি-মিনতি করে কর্নেলকে গলিয়ে জল করে ফেলেছিলেন প্রায়, আমি প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলুম। তারপর একটি কার্ড আমাকে ধরিয়ে দিলে আমার আপত্তিওঁ গলে জল হল। অর্থাৎ না করতে পারলুম না। কার্ডে ছাপানো আছে, ডঃ টি. সি. সিংহ। তারপর আমার জানা-অজানা দিশি-বিদিশি ডিগ্রির লেজুড়, এই ট্রেনটার মতোই লম্বাটে। কিন্তু আর যা সব লেখা আছে, তাতে বোঝা যায় ইনি মস্ত বিদ্যাবাগীশ পণ্ডিত। প্রত্নবিদ্যা, নৃবিদ্যা, ভাষাবিদ্যা থেকে শুরু করে এমন বিদ্যা নেই, যা এঁর অজানা। তার প্রমাণও পাচ্ছিলুম হাড়ে-হাড়ে। কান ভোর্ভে করছিল। কর্নেল কিন্তু বিরক্ত হওয়া দূরের কথা, মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছেন আর সায় দিচ্ছেন। শুধু সায় দিচ্ছেন বলা ভুল হল, প্রশ্নও করছেন। বার্থে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছিলুম। ওদিকের বার্থে জানালার পাশে হেলান দিয়ে কর্নেল বসে আছেন এবং তার পাশে পণ্ডিতমশাই। কানে এল, কর্নেল জিজ্ঞেস করছেন, “আচ্ছা ডঃ সিংহ, ট্রেনের সঙ্গে স্ট্রেইনের কোনো সম্পর্ক আছে কি, মানে ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক?”

“আছে। বিলক্ষণ আছে। প্রথমে ধরুন ট্রেন শব্দটা। এর আক্ষরিক অর্থ কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া। টে-নে!” ডঃ সিংহ নড়ে বসলেন।”বাংলা টান শব্দটা দেখুন। টেনে নিয়ে যাওয়া। টানাটানি সহজ কাজ নয়, কষ্টকর। স্ট্রেইন শব্দের আক্ষরিক অর্থও কষ্টে টেনে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এ থেকে কী বেরিয়ে এল দেখুন! ইংরেজি ট্রেন আর বাংলা টান একই শব্দের দুটো রূপ। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, আমরা বাঙালিরা এবং ইংরেজরা একই জানো।”

কর্নেল প্রশ্ন করলেন, “শিং-এর সঙ্গে সিংহের সম্পর্ক আছে কি?”

“অ্যাঁ?” পণ্ডিতমশাই হকচকিয়ে গেলেন। তারপর হোহো করে হেসে বললেন, “আপনার রসবোধ আছে। উগান্ডার বুগান্ডা মিউজিয়ামে যখন ডিরেক্টর ছিলুম, ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি প্রায় ঠাট্টা করে বলতেন, সিংহকে আমরা বলি শিম্বা। তোমার পূর্বপুরুষ নিশ্চয় আফ্রিকান ছিলেন। …হ্যাঁ, আপনার প্রশ্নটা ভাববার মতো। শিং এসেছে সংস্কৃত শৃঙ্গ থেকে। যা উঁচুতে থাকে। যেমন পর্বতশৃঙ্গ। পর্বতশৃঙ্গের ছবি দেখবেন, কেমন ছুঁচলো–খোঁচার মতো। আকাশকে যেন তোচ্ছে। তাই না? তবে সিংহ, সিংহের স্থানও জন্তুদের মধ্যে উঁচুতে। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, দুটো শব্দেই উচ্চতা বোঝাচ্ছে, আবার হিংস্রতাও বোঝাচ্ছে। শৃঙ্গী জন্তু গুতো মারে, আর সিংহ মারে থাবা।”

“শিংওয়ালা জন্তুর গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ে, শুনেছি।” কর্নেল বললেন। “রূপগঞ্জে নাকি ছাগলের গুঁতোয় একটা মানুষ মারা পড়েছে। শুনে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।”

ডঃ সিংহ ভুরু কুঁচকে বললেন, “ছা-ছাগল…কথাটা কে বলল বলুন তো? কাগজে তো অন্য খবর পড়েছি। প্রাচীন শিবমন্দিরের ত্রিশূলে…হ্যাঁ, আসল কথাটা তা হলে খুলেই বলি। ওই শিবমন্দিরটা পাথরের, বুঝলেন? গত মাসে একবার গিয়ে দেখে এসেছি। আমার ধারণা, ওটা অন্তত দেড় থেকে দু’হাজার বছরের পুরনো। শৈব রাজাদের রাজধানী ছিল রূপগঞ্জ। নদীর নামটা সেই স্মৃতি বহন করছে–শৈব্যা! জঙ্গলের ভেতর ঢিবি, পাথরের স্তম্ভ। শৈব্যাও অনেক স্মৃতিচিহ্ন গ্রাস করেছে। রাক্ষুসি নদী মশাই, শৈব্যা!”

“ব্যা-করণ!” কর্নেল কথাটা বলেই চুরুট জ্বালতে ব্যস্ত হলেন।

ডঃ সিংহ বললেন, “কী, কী? ব্যাকরণ…”বলেই আবার একচোট হাসলেন। “আপনার রসবোধ আছে! শৈব্যাতে ব্যা আছে বটে।”

“ছাগলও ব্যা করে।” একরাশ চুরুটের ধোঁয়ায় কর্নেলের মুখ আবছা হয়ে গেল।

ডঃ সিংহের মুখে কেমন যেন সন্দিগ্ধ ভাব, ফের ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনার এই ছাগলের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ছাগলের কথা কে বলল আপনাকে, মানে, ছাগলের গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ার কথা?”

কর্নেল বললেন, “হাওড়া স্টেশনে একদল লোক বলাবলি করছিল। আচ্ছা, ডঃ সিংহ, ছাগল এবং পাগলে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে কি?”

ডঃ সিংহ হাসতে গিয়ে হাই তুলে বললেন, “আপনার রসবোধ অতুলনীয়। তো যাদ কাইন্ডলি, অনুমতি দেন, আমি এখানেই একটু গড়িয়ে নিই। এখনও দু’ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে। বিচ্ছিরি ঘুম পাচ্ছে।”

বলে অনুমতির তোয়াক্কা না করে সেই কাগজে-জড়ানো বোঁচকাটি খুললেন এবং কর্নেলকে আরও কোণঠাসা করে শতরঞ্জি-চাদর-বালিশ সাজিয়ে চিত হলেন। বেঁটে হওয়ার দরুন শোয়াটি বেশ পুরোপুরি হল। কর্নেলের চোখে আমার চোখ পড়ল। কর্নেল মিটিমিটি হাসছেন। একটু পরে বললেন, “ডঃ সিংহ কি ঘুমিয়ে পড়লেন?”

“উঃ…হা-না…কী?”

“আপনার পুরো নামটি জানতে ইচ্ছে করছে।”

“তি-তিনকড়িচন্দ্র সিংহ।” বলে পণ্ডিতপ্রবর নাক ডাকাতে শুরু করলেন। আমি তো থ। এরকম ঘুম কখনও কাউকে ঘুমোতে দেখিনি, এক কর্নেল বাদে।

“আবার তিন!” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি।”

নাকডাকা বন্ধ হল। চোখও খুলে গেল। শিবনেত্র হয়ে বললেন, “কী, কী?”

“কিছু না। আপনি ঘুমোন।” কর্নেল বললেন। “আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছি।”

আবার নাক ডাকতে থাকল।

কর্নেল বললেন, “বুঝলে জয়ন্ত, অ্যাস্ট্রোলজি বা জ্যোতিষের মতো সংখ্যাতত্ত্ব বলে একটা শাস্ত্র আছে। না, স্ট্যাটিসটিক্স নয়, নিউমারোলজি। অ্যাস্ট্রোলজির আওতায় পড়ে এটা। সংখ্যারও নাকি শুভাশুভ আছে। নাম, জন্মের সন-মাস-তারিখ, এসব থেকে সংখ্যা বের করে ভূত-ভবিষ্যৎ জানা যায় শুনেছি। তো দ্যাখো, ছাগল আর পাগল, শুধু ব্যঞ্জনবর্ণই ধর্তব্য, তিনটি সংখ্যার শব্দ। এও তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি, সেই ছাগলীয় একাশি। তারপর ইনি বললেন, রূপগঞ্জের নদীটার নাম শৈব্যা, আমি তো শুনেছিলুম ‘শোভানদী’, রূপগঞ্জের পাশে সুন্দর ফিট করে যায়। কিন্তু ইনি পণ্ডিত মানুষ, বিশেষ করে পুরাতাত্ত্বিক। কাজেই নদীটা নিশ্চয় প্রাচীন যুগে ‘শৈব্যা ছিল। শিবসিংহের রাজধানীর পাশে শৈব্যা নদী ফিট করে যায়। যাই হোক, এখানেও একটা ব্যাকরণঘটিত ব্যাপার দেখা যাচ্ছে। ব্যাকরণ রহস্য, ডার্লিং! ছাগলের আদি-অকৃত্রিম ল্যাঙ্গোয়েজ, ব্যা!”

অসহ্য। কাহাতক আর বকবক ভালো লাগে। চোখ বুজেছিলুম। তারপর কখন যেন ঘুমিয়েও পড়েছিলুম। চলমান যানবাহনে মানুষের ঘুম পায় কেন, এ-নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চয় গবেষণা করে থাকবেন।

হঠাৎ কী-সব শব্দ এবং আমার পায়ের ওপরও ভারী কিছু পড়ল। চোখ খুলেই ভীষণ হকচকিয়ে গেলুম। আতঙ্কে মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! মারদাঙ্গার ফিল্মে অবিকল যেমনটি দেখা যায়।

আমার পায়ের ওপর বসে পণ্ডিতপ্রবর কর্নেলের সঙ্গে হাতাহাতি করছেন। হাতাহাতি কী বলছি! পণ্ডিতের হাতে একটা ছোরা, কর্নেল সেই হাতটা নিজের দু’হাতে ধরে মোচড় দিচ্ছেন।

মাত্র এক সেকেন্ডের দৃশ্য। পায়ে বেঁটে গাঁজাগোলা ওজনদার কিছু চাপানো থাকলে ওঠা কঠিন। অগত্যা পা দুটো যথাশক্তি নাড়া দিলুম। একই সঙ্গে ছোরাটাও ঠকাস করে মেঝেয় পড়ে গেল এবং ডঃ তিনকড়িচন্দ্র সিংহ কর্নেলের পেটে ঠিক ছাগলের মতোই ফুঁ মারলেন। কর্নেল তো খেয়ে একটু পিছিয়ে গেছেন, পণ্ডিত হাত বাড়িয়ে নিজের ফোলিও ব্যাগটা নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে নীচে ঝাঁপ মারলেন।

ট্রেনের গতি খুব কম। দাঁড়ানোর মুখে বলে মনে হচ্ছিল। পায়ে ব্যথার দরুন উঠতে একটু সময় লাগল। কর্নেল ততক্ষণে ছোরাটা কুড়িয়ে নিয়েছেন এবং দরজায় উঁকি দিচ্ছেন। বাইরে বিদ্যুতের আলো। তা হলে কোনো স্টেশন আসছে। মালগাড়ি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার মুখে কথা নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। কর্নেল ক্লান্তভাবে একটু হাসলেন, “লোকটা বিছানা ফেলে গেল!” বলে বিছানাটা গুটোতে থাকলেন। “রেডি হও, ডার্লিং! রূপগঞ্জ এসে গেছে।”

ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললুম, “কী সাঙ্ঘাতিক!”

“হ্যাঁ, সাঙ্ঘাতিক।”কর্নেল আস্তে বললেন। “আমি ঘুমের ভান করে নাক ডাকাচ্ছিলুম। চোখের ফঁক দিয়ে দেখি, লোকটা আসলে ঘুমোয়নি। আমার মতোই ঘুমনোর ভান করছিল। হঠাৎ চোখ খুলে আমাকে আর তোমাকে দেখে নিল। তারপর সাবধানে উঠে ছিটকিনিটা সরিয়ে দরজা হাট করে খুলে দিল। আমার ভুল হল, রিভলভারটা বের করিনি সঙ্গে-সঙ্গে। ও কী করে, দেখতে চেয়েছিলুম। বাঙ্ক থেকে আমার কিটব্যাগ নামিয়ে চেন খুলে তন্নতন্ন করে কী খুঁজল। না পেয়ে রেখে দিল। তারপর স্যুটকেসটা নামাতে যাচ্ছে, তখন মনে হল, আর চুপ করে থাকা ঠিক হচ্ছে না। যেই বলেছি, “ডঃ সিংহ কি কিছু খুঁজছেন” অমনি এই ছোরা বের করে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস, ওই সময় ট্রেন লাইন বদল করছিল! খুব নড়ছিল এই কুপেটা। টাল খেয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। আমি সেই সুযোগে ওর ছোরা-ধরা হাতটা দুহাতে চেপে ধরে ঠেলে দিলুম। লোকটা তোমার পায়ের ওপর পড়ল। কিন্তু গায়ে কী প্রচণ্ড জোর! কুস্তিগির পালোয়ান একেবারে।”

উঠে দাঁড়িয়ে দুই ঠ্যাং নাড়া দিয়ে রক্ত-চলাচল ঠিক করে নিয়ে বললুম, “আপনাকে আপত্তি জানিয়েছিলুম, আপনি শুনলেন না। এবার বুঝুন উটকো লোক ঢুকিয়ে কী বিপদ বাধিয়েছিলেন!”

কর্নেল চুরুট বের করে জ্বেলে বললেন, “লোকটা জাল ডঃ টি. সি. সিংহ, জয়ন্ত! ডঃ সিংহকে আমি চিনি। তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান অধ্যাপক। বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত। এই লোকটাকে কুপেতে জায়গা দেওয়ার কারণ ছিল।…চলো, দেখি ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার কামালসায়েব জিপ পাঠিয়েছেন কি না। নইলে বরাতে কিছু দুর্ভোগ আছে।”

ট্রেন রূপগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকছিল। রাত প্রায় একটা বাজে।

প্ল্যাটফর্মে নেমে কর্নেল বললেন, “এক মিনিট। তিনকড়িচন্দ্রের বিছানাটা স্টেশনমাস্টারকে জিম্মা দিয়ে আসি। মাইক্রোফোনে ঘোষণা করতেও বলব।”

“এ-বদান্যতার মানে হয় না!” আপত্তি জানিয়ে বললুম।”বরং রেল-পুলিশের কাছে জমা দিন। আর সাঙ্ঘাতিক ঘটনাটা ওদের জানান।”

কর্নেল আমাকে পাত্তা দিলেন না। এত রাতে যাত্রীর সংখ্যা কম। প্ল্যাটফর্মেও নিঝুম খাঁখাঁ অবস্থা। মাঝারি স্টেশন যেমন হয়। একটু গা-ছমছম করছে। কর্নেল যতক্ষণ না ফিরলেন, এদিকে-ওদিকে মুহুর্মুহু তিনকড়িচন্দ্রকে দেখতে পাচ্ছিলুম। বেঁটে হোঁতকা লোক দেখলেই ঘুসি বাগিয়ে রেডি হচ্ছিলুম। তারপর কর্নেল ফিরে এলেন। মুখে শান্ত হাসি। গেটের কাছে পৌঁছলে একজন গুফো তাগড়াই চেহারার লোক মিলিটারি কায়দায় স্যালুট ঠুকল। কর্নেল সহাস্যে বললেন, “কেমন আছ শের আলি?”

শের আলি বিনীতভাবে বলল, “জি, ভালো আছে বান্দা। বহোত ভালো। তো সাব আসতে পারল না। বোলা, কর্নিলসাবকো বোলো, সুবেমে জরুর মিলেঙ্গে। উনির বেটির বুখার হয়েছে, কর্নিলসাব! কুছু অসুবিস্তা হোবে না। বান্দা হাজির আছে, কর্নিলসাব!”

কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। শের আলি জিপের ড্রাইভার। এক সময় মিলিটারিতে ছিল। তাই কর্নেলসায়েবকে এত খাতির করে। তাকে দেখে এতক্ষণে মনে সাহস ফিরে এল। কর্নেলের কাছে রিভলভার থাকা না-থাকা সমান। গুলি চালিয়ে তিনকড়িচন্দ্রকে খতম করে দেবেন, এটা নিছক দুঃস্বপ্ন। বাইরে জিপের কাছে যেতে-যেতে শুনতে পেলুম, স্টেশনে ঘোষণা করা হচ্ছে, “ডঃ টি. সি. সিন্হা! ডঃ টি. সি. সিন্হা! আপকা বিস্তারা ইহাপর সংরষিত হ্যায়! প্রত্যার্পণকে লিয়ে হমলোগ প্রতীক্ষা কর রহি হ্যায়।” ঘোষিকার কণ্ঠস্বরে আর ভাষায় বিরক্তিকর ভদ্রতা। গা জ্বলে যায়। কিন্তু ভাষাজ্ঞান এসে গেল। যা বিস্তার করা যায়, তাই বিস্তারা। যা বিছানো যায়, তাই বিছানা। বাঃ!

জিপে উঠে কর্নেল বললেন, “রূপগঞ্জ পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু নদীর ওপারে বিহার। এখানে দ্বিভাষী লোক দেখে অবাক হোয়া না। অবশ্য শের আলি ইউ. পি-র লোক।”

এতক্ষণে কৃষ্ণপক্ষের খয়াটে চাঁদটা চোখে পড়ল। বাঁ দিকে বসতি এলাকা, ডাইনে উঁচু-নিচু মাটি। ঝোঁপ-জঙ্গল ঝুপসিকালো হয়ে রাতের হাওয়ায় নড়াচড়া করছে। এই রাস্তায় আলো নেই। খানিকটা এগিয়ে বাঁ দিকে আঙুল তুলে কর্নেল বললেন, “ওইগুলো পুরোনো রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। এবার আমরা নদী পেরোব। তারপর চড়াই। ওই যে সামনে উঁচুতে আলো দেখতে পাচ্ছ, ওটাই সেই বাংলো৷ বিহার মুলুক। খুব চমৎকার জায়গায় বাংলোটা তৈরি করা হয়েছে। নীচে বিশাল জলাধার। পাখিদের অভয়ারণ্য বলা চলে। …হা, রেনবো অর্কিড নদীর এপারে। দেখাব’খন। মাথা খারাপ হয়ে যাবে ডার্লিং!”

একটা টিলামতো উঁচু জায়গায় সেচ-বাংলো। চৌকিদার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। শের আলি জানিয়ে গেল, সকাল আটটার মধ্যে সে কর্নেলসারের সেবায় জিপ নিয়ে আসবে এবং ডি.ই. সাবও আসবেন। কর্নেলসারের জন্য এই জিপগাড়িটি বরাদ্দ করা হয়েছে, এ-কথাও জানিয়ে গেল সে।

খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে তিনকড়িচন্দ্রকে ভুলে গেলুম। চৌকিদার মাধবলালও কর্নেলকে চেনে। কর্নেলকে কে না চেনে? কর্নেলের সবার মন-জয়-করা স্বভাব তো বটেই, উপরন্তু খোলা হাতে বখশিসও একটা কারণ। মাধবলাল খাওয়ার সময় কর্নেলকে প্ররোচিত করতে থাকল ক্রমাগত। …কর্নেলসাব গতবার যে কানে কলম-গোঁজা পাখিটা (সেক্রেটারি-বার্ড) দেখেছিলেন, সেটা ড্যামের অন্য একটা জলটুঙ্গিতে বাসা বেঁধেছে। সামনে এদের ডিম পাড়বার ঋতু। এখন থেকেই তৈরি হচ্ছে। কর্নেলসাব ওদিকের মাঠে যে প্রজাপতি দেখেছিলেন, তারা আছে। মাধবলাল আপনা আঁখসে দেখেছে। সে আঙুল তুলে দেখাল, “তিন রোজ দেখা সাব-এহি ফাঙ্গা!”

কর্নেল মুরগির ঠ্যাং কামড়ে বললেন, “তিন! তিন তিরেকে নয়। নয়ে-নয়ে একাশি।”

মাধবলাল বুঝতে না পেরে বলল, “হুজৌর?”

“শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ দেখে এসেছ মাধবলাল?”

সে অমনি চমকে উঠে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, “আই বাপ! শিউজিকা পূজা বন্ধ থা। তো আদমি বলিদান হো গয়া সাব! উও বাঙ্গালি ঠাকুরমশাইভি আচ্ছা আমি নেহি থা। বহোত ঝামেলাবাজ থা। খালি ইসকা-উসকা সাথ টোক্কর লাগাতা। শিউজি উনহিকো বলিদান লে লিয়া।”

“মুরারিবাবুকে চেনো?” মাধবলাল খিকখিক করে হাসতে হাসতে ঝুঁকে পড়ল। “পাগলা! সির পাগলা!”

কেন পাগলা, জিজ্ঞেস করলে মাধবলাল অনর্গল তার মাতৃভাষায় মুরারিবাবু সম্পর্কে একটা লম্বা বক্তৃতাই দিল। আমাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা একটানা চলল। তার সংক্ষিপ্তসার হল এই :

মুরারিবাবুর ঠাকুর্দার আমলে রূপগঞ্জে ওঁদের খুব দাপট ছিল। অমন বড়লোক এ-তল্লাটে আর কেউ ছিল না। প্রচুর জমিজমা, মহাজনি কারবার, বিশাল দালানবাড়ি, একটা মোটরগাড়ি পর্যন্ত ছিল। তারপর যা হয়! সাত শরিকে মামলা-মকদ্দমা, ঝগড়াঝাটি। একটা ভাঙা দেউড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অবধি আইনের লড়াই তিন পুরুষ ধরে। ততদিনে দেউড়িটার মাত্র আধখানা টিকে আছে। আধখানা দেউড়ির মাথায় জল গজিয়ে গেছে। সাবেকি বাড়ি মুখ থুবড়ে পড়েছে। কড়ি-বরগা, দরজা-জানালা চৌকাঠসুধু যে যখন সুযোগ পেয়েছে, উপড়ে নিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ওই আধখানা দেউড়ি মুরারিবাবুর হাতছাড়া হয়ে গেল, আর সেই থেকে তার মাথাও খারাপ হয়ে গেল। মামলা এমন জিনিস, বেশিদিন চালিয়ে গেলে মানুষের ঘিলু ফেঁসে যায়। ফলে দেউড়িটা নাকি দেখবার মতো জিনিস। এত উঁচু দেউড়ি সচরাচর দেখা যায় না। মাধবলালের ধারণা, পাশের শিবমন্দিরটার চেয়ে দেউড়িটা উঁচু করে তৈরির জন্যই শিবের কোপ পড়েছিল ধাড়াবাবুদের বংশের ওপর। শিবের চেলারা দেউড়ির মাথায় সারা রাত নাচত, দমাদ্দম লাথি মারত, দাপাদাপি করে বেড়াত। কাজেই যত শক্তই হোক, ওটা ধসে পড়ার কারণ ছিল। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, পাথরে কখনও উদ্ভিদ গজায়? শিউজির শাপে পাথর ফেটে তাও গজিয়েছিল। তবে মুরারিবাবুর মাথা খারাপ হওয়ার মূল কারণ সম্পর্কে মাধবলাল নিশ্চিত নয়। তার শোনা কথা, মুরারিবাবু ভাঙা দেউড়ির মাথায় নাকি বিকট চেহারার কোনো শিবের চেলার দর্শন পেয়েই আতঙ্কে পাগলা হয়ে যান।…

কর্নেল এবং আমার জন্য উত্তর-পূর্ব কোণে একটা বড় ডাবল বেডরুম তৈরি রাখা হয়েছে। উত্তরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, “এখান থেকে জলাধার দেখলে তোমারও মাথা খারাপ হয়ে যাবে, ডার্লিং! তবে আতঙ্কে নয়, আনন্দে! কী অপূর্ব! কী অলৌকিক সৌন্দর্য। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নায় এলে তুমি সত্যিই আকাশের পরিদের ঝুঁকে-ঝকে নেমে স্নান করতে দেখতে। কৃষ্ণপক্ষে জ্যোৎস্নাটা তত খোলতাই নয়।”

বললুম, “খোলা জানালা দিয়ে তিনকড়িচন্দ্ৰ ছোরা না ছোঁড়ে!”

তুমি বড় বেরসিক, জয়ন্ত!” কর্নেল হাসলেন। “তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। মাধবলালকে যতই রোগাভোগা দেখাক, ওকে নিরীহ ভেবো না। ও এমন মানুষ, যার ঘুমন্ত অবস্থায় কান দুটো দিব্যি জেগে থাকে।”

দরজার পরদার বাইরে থেকে মাধবলালের সাড়া পাওয়া গেল তখনই। “সব ঠিক হ্যায়, সাব?”

কর্নেল বললেন, “ঠিক হ্যায়। তুম শো যাও।”

বলে দরজা এঁটে দিয়ে এলেন। তারপর জানালার ধারে চেয়ার টেনে বসে চুরুট টানতে থাকলেন। একটু হিমের ছোঁয়া এপ্রিলেও। ফ্যানের হাওয়া এবং পেছনের জলাধারও তার কারণ। চাদর-মুড়ি দিলুম। কর্নেল এয়ারকন্ডিশন্ড রুম একেবারে পছন্দ করেন না। প্রকৃতিবাদীর কারবার! এয়ারকন্ডিশন্ড রুম হলে অন্তত তিনকড়িচন্দ্রের পরোয়া না করে আরামে ঘুমনো যেত।

এপাশ-ওপাশ করছিলুম। মশারি নেই, কারণ মশা নেই। কিন্তু মশারি থাকলে খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, যদিও ছোরার মশারি ছুঁড়ে ঢোকার ক্ষমতা আছে। শুধু একটা সুবিধে আমার বিছানার পশ্চিমে নিরেট দেওয়াল এবং দক্ষিণে বাথরুম। কর্নেলের বিছানার পাশেই পুবের জানালা, মাথার দিকে উত্তরের জানালা, দুটোই ভোলা। ফ্যানটা দুই বিছানার মাঝামাঝি আস্তে ঘুরছে। ছোরা ছুঁড়লে কর্নেলের বিপদের চান্স নিরানব্বই শতাংশ। দৈবাৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছিটকে এলে তবেই আমার বিপদ এবং সেটার চান্স এক শতাংশ মাত্র।

নাঃ, এই হিসেব করেও আতঙ্ক কাটছে না। ঘুমও আসছে না। একটু পরে দেখি, কর্নেল কোনার দিকের টেবিলের কাছে গেলেন। টেবিলবাতি জ্বেলে সেই চাকতিটা বের করলেন। তারপর নোটবইতে কী সব লিখতে শুরু করলেন। ঘড়ির রেডিয়াম-দেওয়া কাটা তিনটের ঘরে, যাকে বলে কাঁটায়-কাঁটায় রাত তিনটে।

বিরক্ত হয়ে ইচ্ছে করেই সশব্দে পাশ ফিরলুম। কর্নেল বললেন, “ঘুমের ওষুধ হিসাবে ভেড়ার পাল কল্পনা করে ভেড়া গোনার ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে তুমি তিন-শিংওয়ালা ছাগলটিকে কল্পনা করো। ঘুম এসে যাবে। কল্পনা করো, ওটা দৌড়চ্ছে, তুমিও তাকে ধরার জন্য দৌড়চ্ছ এবং ধরতে পারলেই বলি দেবে শিবের মন্দিরে। নাও, স্টার্ট!”

রাগ করে বললুম, “আমি কি বাচ্চাছেলে যে…”

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, “কী বললে? কী বললে?”

“আমি বাচ্চা ছেলে নই যে এসব বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঘুম পাড়াবেন!”

“মাই গুডনেস!” কর্নেল ঘুরে বসলেন আমার দিকে। চোখ দুটো উজ্জ্বল। “কী হল?”

কর্নেল চুপ। একটু পরে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি চোখ বুজে ঘুমোতে চেষ্টা করলুম এবং সত্যিই একটি তিন-শিংওয়ালা ছাগল কল্পনা করলুম, যেটা দৌড়চ্ছে। মনে-মনে তার পেছনে দৌড়তে থাকলুম। দৌড়তে দৌড়তে দৌড়তে…

“চায়, ছোটাসাব!” তিন-শিংওয়ালা ছাগলটা বলল। “সাব! চায় পিজিয়ে।”

চোখ খুলে দেখি তিন-শিংওয়ালা ছাগল নয়, মাধবলাল। ঘরে উজ্জ্বল রোদ্দুরের ছটা ঝলমল করছে। সে বিনীতভাবে বলল, “বড়াসাব বোলকে গেয়া, সাড়ে সাত বাজকো ছোটাসাবকো বেড-টি দেনা।”

উঠে বসে চায়ের কাপ-প্লেট নিলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “কর্নেলসাব কখন বেরিয়েছেন?”

“ছয় বাজকে।” মাধবলাল খিকখিক করে হাসল। “ফারাঙ্গা পাকাড়নে গেয়া, মালুম হোতা। কর্নিলসার ইস দফে জরুর কম-সে-কম একঠো তো পাকড়ায়েগা!…তো হামি বলল, জেরাসা বড়া হোনা চাহিয়ে। কর্নিলসাব বলল, হাঁ, বড়া নেট লেকে আয়া।”

‘ফাটরাঙ্গা’ জিনিসটা যে প্রজাপতি, বুঝে গেছি। গরম চা খেয়ে চাঙ্গা হওয়া গেল। তারপর বাথরুম সেরে এসে দেখি, প্রকৃতিবিদ গেটে ঢুকছেন। ঢুকে ফুলে-ফুলে সাজানো সুদৃশ্য লনের ওপর দিয়ে উত্তরের নিচু পাঁচিলের কাছে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করলেন। উত্তরের জানালায় গিয়ে জলাধারটি দেখতে পেলুম। অবিকল চিল্কা হ্রদের মতো। প্রচুর পাখিও দেখা যাচ্ছিল। এদিকে-ওদিকে ছোট্ট দ্বীপের মতো টিলা জঙ্গলে ঢাকা।

ভালো করে দেখার জন্য বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলুম। কর্নেলের পাখি দেখা শেষ হল। ঘুরে বারান্দার দিকে আসতে-আসতে সম্ভাষণ করলেন, “গুড মর্নিং, ডার্লিং! আশা করি, ছাগলটি ধরতে পারোনি?”

হাসতে-হাসতে বললুম, “আশা করি আপনিও ফাটরাঙ্গা ধরতে পারেননি?”

কর্নেল বিমর্ষভাবে বললেন, “নাঃ। বেজায় ধূর্ত।…কী আশ্চর্য!”

হঠাৎ তিনি ছড়ির ডগায় আটকানো গুটিয়ে-থাকা সূক্ষ্ম তন্তুর নেটটি ছাতার মতো বোতাম টিপে খুলে দিলেন। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন। একটা ফুলের ঝোঁপের মাথায় প্রজাপতিটাকে এবার দেখতে পেলুম। রোদ্দুরে ডানা ঝিলমিল করছে। কিন্তু তারপরই ওটা উড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে ডানায় অবিকল সাতটা রঙ রামধনুর মতো স্পষ্ট দেখতে পেলুম। কর্নেল বললেন, “যাঃ! একটুর জন্য…”।

প্রজাপতিটা নিচু পাঁচিল পেরিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বিষণ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর চলে এলেন। বারান্দায় উঠে বললেন, “যাই হোক, নেটে ধরতে না পারলেও ক্যামেরায় ধরেছি। এটাই একটা সান্ত্বনা। তবে ঠিক-ঠিক রংগুলো আসবে কি না কে জানে।”

বললুম, “তিনকড়িচন্দ্রের দেখা পাননি তো?”

কর্নেল হাসলেন। “পেয়েছি। নদীর ব্রিজ থেকে বাইনোকুলারে ওপারের ধ্বংসাবশেষ দেখছিলুম। এক মিনিট ধরে দেখলুম, তিনকড়িবাবু ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক করে বেড়াচ্ছেন। ওদিকেই সূর্য। তাই সরাসরি লেন্সে রোদ্দুর পড়ছিল। বাকিটা দেখতে পেলুম না।”

কর্নেল কথাগুলো এমন নির্বিকার মুখে বললেন, যেন গতরাতে ট্রেনে আসতে-আসতে তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেছে। হিরো-ভিলেন ফাইটটা নেহাত ফিল্মি ঘটনা, অর্থাৎ স্রেফ অভিনয়! স্বভাবত আমার মুখে রাগ ফুটে বেরিয়েছিল। বারান্দার সাদা রং মাখানো বেতের টেবিলে মাধবলাল ট্রে-তে কফির পট, পেয়ালা রেখে গেল। বুঝলুম, সে কর্নেলের রীতি-নীতি এবং পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে বেশ পরিচিত।

আমার মনের ভাব ধুরন্ধর বৃদ্ধের চোখ এড়ায়নি। বললেন, “চলন্ত ট্রেন, তা যত আস্তে চলুক, বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। তা ছাড়া নিয়ম হল, গতিশীল যানবাহন থেকে নিরাপদে নামতে হলে যেদিকে গতি, সেইদিকে ঝাঁপ দিতে হয়। উলটো দিকে ঝাঁপ দিলে হাড়গোড় ভাঙা অনিবার্য। সোজাসুজি ঝাঁপ দিলে তার চান্স সামান্য কমে। আমাদের তিনকড়িবাবু এই প্রাকৃতিক নিয়ম জানেন। তিনি গতির দিকেই ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে বললুম, চলন্ত ট্রেন বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। বেচারা একটু ল্যাংচাচ্ছেন। হাতে ছড়ি নিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, তোমার অবস্থা বিবেচনা করো, জয়ন্ত! তুমি অমন ওজনদার মানুষের ধাক্কা সামলে দিব্যি হাঁটাচলা করতে পারছ। একটুও ল্যাংচাচ্ছ না।”

বলার ভঙ্গিতে রাগ পড়ে গেল। বললুম, “ছোরার ঘা কিন্তু আপনিই খেতেন। যাকে বেচারা বলে সমবেদনা জানাচ্ছেন, তার ছোরাটা এখন একবার চাক্ষুষ করলে আমার মতোই রেগে যাবেন।”

কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর-পকেট থেকে যে-জিনিসটা বের করলেন, সেটা ছোরার বাঁট বলে মনে হল। অবাক হয়ে বললুম, “বাঁট আছে, ফলা নেই! ভেঙে গেল কী করে?”

কর্নেল বাঁটের একটা জায়গায় চাপ দিতেই ছ-সাত ইঞ্চি ঝকঝকে ফলা গোখরো সাপের ফণার মতো বেরিয়ে পড়ল। বললেন, “ম্প্রিংওয়ালা ছোরা। বিদেশি জিনিস। তবে আফ্রিকার নয়, এবং বুগান্ডা মিউজিয়ামের ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি উপহার দেননি, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। একটু ভিজে দেখাচ্ছে, লক্ষ করো। আবছা সবুজে রঙের মলম মনে হচ্ছে না? ওটা সাপের বিষ থেকে তৈরি। তার মানে, একটু খোঁচা খেলেই ঘা বিষিয়ে যাবে। এমনকি, ক্রমশ রক্ত বিষিয়ে মারা পড়তেও পারো।”

ভয়ে বুক ধড়াস করে উঠল। বললুম, “তবু শয়তানটাকে আপনি বেচারা বলছেন!”

কর্নেল আবার স্প্রিংয়ের বোতাম টিপে ফলা ঢুকিয়ে মারাত্মক জিনিসটা পকেটে চালান করে দিলেন। বললেন, “এটা আমার জাদুঘরের জন্য একটা চমৎকার স্যুভেনিরও বটে। বছর-দশেক আগে ঠিক এরকম একটি ছোরার সান্নিধ্যে এসেছিলুম, কোকো আইল্যান্ডে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার পুলিশকর্তা সেটি হাতিয়ে নেন। একই ছোরা, একই কোম্পানির তৈরি এবং একই বিষের মলম। তিনকড়িবাবু আমাকে ভাবিয়ে তুলেছেন, জয়ন্ত!”

আমরা কফি খেতে খেতে শের আলি জিপ নিয়ে এসে স্যালুট ঠুকল। বলল, “আফসোস কা বাত, কর্নিলসাব! ডি. ই. সাব আসতে পারল না। বেটি কি বুখার বহত বাঢ়ল। তো হাথিয়াগড় মিশনারি হসপিট্যালমে চলিয়ে গেলেন। উনি মাফি মাঙ্গা আপসে।”….

.

তিন

মুরারিবাবুকে শের আলি চেনে। উনি এখানে ‘পাগলাবাবু’ নামে সুপরিচিত। কিন্তু ওঁর বাড়ি পর্যন্ত জিপ যাবে না। ঘিঞ্জি গলির পর ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গলে-ঢাকা এলাকা। সেখানে কিছু পুরোনো একতলা বাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার একটাতে মুরারিবাবু থাকেন। শের আলির কাছে জানা গেল, সেও ওঁর নিজের বাড়ি নয়। শিবের ত্রিশূলের আঘাতে যাঁর রহস্যময় মৃত্যু ঘটেছে, সেই নকুলেশ্বর ঠাকুরের বাড়ি। একটা ঘরে মুরারিবাবুকে থাকতে দিয়েছিলেন।

শের আলি বাজারের রাস্তায় জিপ রেখে আমাদের নিয়ে গেল। ডাক শুনে একজন আমার বয়সি যুবক বেরোল। মাথা ন্যাড়া দেখে বুঝলুম, নকুলবাবুর শ্রাদ্ধশান্তি চুকে গেছে। মফস্বলের খবর কলকাতার কাগজের হাতে পৌঁছতে দেরি হয়। সম্প্রতি বলে যে ঘটনা ছাপা হয়, তা হয়তো ঘটে গেছে এক-দু’সপ্তাহ আগে। মুরারিবাবুও এমন অস্পষ্টভাষী মানুষ, ওঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, সদ্য ঘটনাটি ঘটেছে।

যুবকটি অবাক চোখে আমাদের দেখছিল। শের আলি বলল, “কর্নিলসাব, ইয়ে ঠাকুরমেশার ভাই আছে। আপলোগ বাতচিত কিজিয়ে। ম্যায় গাড়িকা পাশ ইন্তেজার করুঙ্গা!”

সে চলে গেলে যুবকটি বলল, “আপনারা কোত্থেকে আসছেন স্যার?”

কর্নেল বললেন, “কলকাতা থেকে। মুরারিবাবুর সঙ্গে একটু দরকার আছে।”

যুবকটি খাপ্পা হয়ে গেল হঠাৎ।”মুরারিদাকে নিয়ে পারা যায় না! ওঁর মাথায় কী করে যে ঢুকে গেছে, সোনার মোহর-ভরা ঘড়া পোঁতা আছে কর্তাবাবার ভিটেয়! স্যার, আপনারা বুঝতে পারেননি মুরারিদার মাথায় ছিট আছে?”

কর্নেল অমায়িক হেসে বললেন, “তোমার নাম কী ভাই?”

“বীরেশ্বর…” বলেই সে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাই মুরারিদা, ওখানে কী করছ? দেখছেন পাগলের কারবার?” সে তেড়ে গেল।

একটু তফাতে একটা ঝাকড়া গাছ। তার উঁচু ডালে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে মুরারিবাবু উলটোদিকে ঘুরে কী যেন দেখছিলেন। মুখ ঘুরিয়েই আমাদের দেখতে পেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বিদঘুঁটে খাক হেসে হনুমানের মতো চমৎকার নেমে এলেন, পরনে পাঞ্জাবি-ধুতি এবং ধুতির কেঁচা পকেটে গোঁজা! গাছটার তলায় জুতো রাখা ছিল। পা গলিয়ে পরে সহাস্যে এগিয়ে এলেন নমস্কার করতে-করতে। “এসে গেছেন! নকুলদা বলেছিল, আমার কিছু হলেই খবর দিবি। ঠিকানাও নিজের হাতে লিখে দিয়েছিল। কিন্তু যাব কী করে? যেতে দিলে তো? সাত দিন স্যার, সাত-সাতটা দিন বন্দী!… এই বিরুটাকে অ্যারেস্ট করা উচিত। আমাকে সাত দিন আটকে রেখেছিল। …এও স্যার তিনের খেলা। তিন সাতে একুশ..দুইয়ের পিঠে এক একুশ… এবার দেখুন, দুই প্লাস এক ইজ ইকোয়াল টু থ্রি-অ্যাই বিরু! অমন করে তাকাবিনে! ইনি কে জানিস?”

বিরু রাগতে গিয়ে একটু হেসে ফেলল। “কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছেন তো আপনারা?”

মুরারিবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “শাট আপ! তুই সেদিনকার হাফপেন্টুল-পরা ছেলে। তুই কী বুঝিস? আসুন স্যার, আমার ডেরায় আসুন।”

বিরু বলল, “মুরারিদার কোনো কথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না স্যার! ওঁর পাল্লায় পড়েই দাদা মার্ডার হয়ে গেল। সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার লোভে না পড়বে, না মার্ডার হবে।”

সদর-দরজা খুলে থান-পরা এক মহিলা উঁকি দিচ্ছিলেন। বললেন, “ঠাকুরপো, জিজ্ঞেস করো তো উনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নাকি?”

চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল টুপি খুলে বিলিতিভাবে মাথা একটু নামিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমিই।”

সেই মুহূর্তে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল, কর্নেল টুপি খুলতেই টাক ঝকমকিয়ে উঠেছিল এবং সেই টাকে একটা ছোট্ট ঢিল এসে পড়ল। কর্নেল টাকে হাত দিয়ে দ্রুত ঘুরলেন। উলটো দিকে একটি একতলা বাড়ির ছাদে বছর দশ-বারো বছরের একটি ছেলে জিভ দেখিয়ে ভো-কাট্টা হয়ে গেল।

বিরু চেঁচিয়ে বলল, “দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি।”

মুরারিবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “বাপের আশকারা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। মারব এক থাপ্পড়!… এসো এবার ‘ঘুড়ি আঁটকে গেছে জ্যাঠাকমশাই, পেঁড়ে দিন’ বলতে।… তিন তিরেক্তে নয়, নয়-নয়ে একাশি দেখিয়ে দেব।”

নেপথ্যে আওয়াজ এল, “ব্যা-ব্যা-অ্যাঁ!”

অমনি কর্নেল ফিক করে হেসে বললেন, “ব্যা-করণ!”

মুরারিবাবু বাড়িটার চারপাশে ছুটোছুটি শুরু করলেন। দুর্বোধ্য কীসব কথাবার্তা। বিরুর বউদি গম্ভীরমুখে বললেন, “ছেড়ে দিন। আপনারা ভেতরে আসুন। ঠাকুরপো, ওঁদের নিয়ে এসো।”

ভেতরে একটুকরো উঠোন। কুয়োতলা। উঁচু বারান্দা। একটা ঘর খুলে দিলেন বিরুর বউদি। বিরু বলল, “বসুন স্যার! দাদার ঘর। বাইরে বসার ঘরটা মুরারিদাকে থাকতে দিয়ে গেছে দাদা।”

ঘরের ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলুম। কর্নেলের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠল। ঘরভর্তি পুরোনো বই-পত্রপত্রিকা, তাক এবং আলমারিতে বিচিত্র গড়নের সব পুতুল, পাথরের টুকরোয় খোদাই-করা আঁকিবুকি। কর্নেল বললেন, “এ তো দেখছি প্রত্নশালা! বিরু, তোমার দাদা কী করতেন?”

বিরু বলল, “দাদার ওই এক বাতিক ছিল স্যার! কোত্থেকে সব কুড়িয়ে এনে জড়ো করতেন। স্কুলে মাস্টারি করতেন। মাস্টারি ছেড়ে বাতিক আরও বেড়ে গিয়েছিল। সারাদিন জঙ্গলে ঢিবিতে ঘুরে বেড়াতেন টোটো করে। আর রাজ্যের যত উদ্ভুট্টে জিনিস কুড়িয়ে আনতেন।”

কর্নেল ঘুরে-ঘুরে সব দেখছিলেন। মুখে বিস্ময় আর তারিফের ছাপ। বিড়বিড় করছিলেন আপনমনে।”..শিলালিপি! …দাঁতের জীবাশ্ম! …বুদ্ধমূর্তি, নাকি শিব… আশ্চর্য! বড় আশ্চর্য! এমন ব্যক্তিগত সংগ্রহ কোথাও দেখিনি! …মাই গুডনেস! এ তো কুষান মুদ্রা! …ব্রোঞ্জের যক্ষিনী…তাম্রশাসন…”।

বাইরে থেকে ডাক এল, “ঠাকুরপো!”

বিরু চলে গেল। কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত! বুঝতে পারছ কিছু?”

বললুম, “হ্যাঁ, আপনার মতোই কুড়ুনে স্বভাবের লোক ছিলেন। তবে আপনি আবার রহস্যভেদীও। আর এই নকুলবাবু রহস্যভেদী ছিলেন না, এই যা।”

“না জয়ন্ত! রহস্যভেদ করতে গিয়েই প্রাণে মারা পড়েছেন ভদ্রলোক।”

“সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার রহস্য।”

“উঁহু। ব্যাকরণ রহস্য।” বলে কর্নেল এতক্ষণে চেয়ারে বসলেন।

এইসময় মুরারিবাবু হন্তদন্ত এসে ঢুকলেন। তক্তাপোশে পাতা বিছানায় ধপাস করে বসে বললেন, “পালিয়ে গেল বাঁদরটা! বিষ্ণুবাবুর ঘরে এই এক অবতার। তিন তিরেক্কে দেখিয়ে ছেড়ে দিতুম।”

কর্নেল একটু হেসে বললেন, “ছেলেটি বেশ।”

“বেশ? বিচ্ছু! বাঁদর!” মুরারিবাবু বললেন। “গাছে-গাছে ঘোরে। দালানের মাথায়-মাথায় ছোটে। দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়, স্যার!…” বলে খ্যাক করলেন। “তবে আমারই ট্রেনিং, বুঝলেন? একদিন ঘুড়ি আটকে গেছে গাছের ডগায়, করুণ মুখে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, জ্যাঠাকমশাই, আপনি তো গাছে চড়তে পারেন, দিন না ঘুড়িটা পেড়ে। ….পেড়ে দিলুম। তারপর ট্রেনিং দিতে শুরু করলুম। …একদিন স্যার নকুলদা বলল, মুরারি, তুমি তো বেশ গাছে চড়তে পারো দেখেছি। বললুম, হুঁ, পারি। বলে কী, তোমাদের দেউড়ির মাথায় চড়তে পারবে? …না স্যার! কড়িদার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে লড়ে হেরে গেছি। কড়িদা এখানে নেই তো কী হয়েছে? চক্ষুলজ্জা বলে কথা। ..নকুলদা স্যার, বড্ড গোঁয়ার। বিষ্ণুবাবুর ছেলে ওই যে দেখলেন, … বিচ্ছু, বাঁদর…”

কর্নেল বললেন, “ছাগলও বলতে পারেন। কেমন ব্যা-অ্যা ডেকে ভেংচি কাটল!”

মুরারিবাবু কান করলেন না। “ওর ডাকনাম আবার বিট্টু…বি-টু-টু…এও তিন! তিন তিরেক্তে নয়, নয়ে-নয়ে একাশি!”

“আপনি কি নিউমারোলজিস্ট, মুরারিবাবু?”

“আজ্ঞে। একটু-আধটু চৰ্চা করি আর কি!” মুরারিবাবুর ট্রেন চলতে থাকল। “নকুলদা বিট্টুকে ঘুড়ির লোভ দেখিয়ে চড়াল। বাস্! দেউড়ির মাথায় চড়াল। …বাপ নিজের মাথায় চড়িয়েছে, নকুলদা এককাঠি সরেস। দেউড়ির মাথায় চড়াল। তারপর থেকে রোজ দেখি দেউড়ির মাথায়… শাসালুম, থাম। কড়িদা আসছে! জিভ দেখায় আর ব্যা করে। ইউ আর রাইট। পূর্বজন্মে ছাগলই ছিল।”

“আপনার এই কড়িদাটি কে?”

“তিনকড়িদা। আমার জ্ঞাতি। মহাভারত কি মিথ্যা, বলুন আপনি? কুরুক্ষেত্র কি মিথ্যা? তবে এখন যুদ্ধ কাগজে-কলমে, উকিলে-ব্যারিস্টারে…জজের সামনে। বেধে গেল লড়াই।”

“তিনকড়িবাবু থাকেন কোথায়?”

“শুনেছি জাহাজে চাকরি করে। কঁহা-হা মুল্লুক ঘোরে। সমুদ্রে মহাসাগরে। বলবেন, তা হলে মামলা কে লড়ল? …মামলা লড়ে ব্যারিস্টার। ওর ভগ্নীপতি ব্যারিস্টার। …হারিয়ে দিলে! সবই তিন তিরেক্কের খেলা সার!” মুরারিবাবু পকেট থেকে নোটবই বের করে একটা পাতা খুলে দেখালেন। “এই দেখুন! হিসেব কষে রেখেছি। আপনিই খুঁজে বের করতে পারবেন নকুলদাকে কে মারল, শিব না মানুষ? নামের ব্যাঞ্জনবর্ণগুলোই লক্ষ করুন স্যার।”

উঁকি মেরে দেখলুম, লেখা আছে :

ক+র+ন+ল+ন+ল+দ+র+স+র+ক+র=১২

১+২=৩

ন+ক+ল+শ+ব+র+ঠ+ক+র=৯

৩x৩=৯

৯/৩ = ৩

কর্নেল নোটবই ফেরত দিয়ে বললেন, “নকুলেশ্বর ঠাকুরকে এলাকায় ঠাকুরমশাই বলত কেন, মুরারিবাবু? নিছক পদবির জন্য?”

“পদবি এল কোত্থেকে?” মুরারিবাবু বললেন, “নকুলদা’র ঠাকুর্দা পর্যন্ত শিবমন্দিরের সেবাইত ছিলেন। আমার ঠাকুর্দা জমিদার আর নকুলদা’র ঠাকুর্দা জমিদারবাড়ির মন্দিরের পুজো-আচ্চা করতেন। সেই থেকেই তো এই সম্পর্ক। ঠাকুরমশাই ডাকতে-ডাকতে ঠাকুর হয়ে গেল। ঠাকু-র…তিন! নাম্বারের খেলা। অঙ্ক! অঙ্কে অঙ্কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলছে। এক থেকে তিন…ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর…তিন থেকে তেত্তিরিশ কোটি। খালি তিনের লীলা!…তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি!…ছাগলটা দেউড়ির মাথায় চড়েছিল, স্যার! বলল, “একাশি!..তিন দিন।” বলে মুরারি তিনটে আঙুল তুললেন।

কান ঝালাপালা! এতক্ষণে বিরুর বউদি ট্রে হাতে ঢুকলেন। কর্নেল বললেন, “এ কি! আমরা সদ্য ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়েছি।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “একটু মিষ্টিমুখ না করলে চলে? কত ভাগ্যে আপনি এসেছেন। উনি প্রায় বলতেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখতে হবে। উনি ছাড়া এর জট…না, না। আপনি অন্তত একটা সন্দেশ খান।” বলে বিরুর বউদি আমার দিকে তাকালেন। “তুমি, বলছি ভাই, কিছু মনে কোরো না। তুমি আমার ঠাকুরপোর বয়সি। খাও! এখানকার মিষ্টি খাঁটি ছানার। তোমাদের কলকাতার মতো সয়াবিনের ছানা নয়।”

মুরারিবাবু উসখুস করছিলেন। বললেন, “আমার এই বউদি, স্যার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! যেমন রূপ, তেমনি গুণ।” বলে কর্নেলের প্লেট থেকে দুটো প্রকাণ্ড সন্দেশ তুলে মুখে পুরলেন।

বিরুর বউদি বললেন, “আহা, ওই তো তোমার প্লেট! তোমাকে নিয়ে পারা যায় না!”

মুরারিবাবু প্লেট গুনলেন। “এক…দুই…তিন!…অ! আমি ভাবলুম…যাকগে! খেয়ে যখন ফেলেইছি…কর্নেলস্যারের যা বয়স, মিষ্টি খাওয়া উচিত না।” উনি নিজের প্লেটটা হাতিয়ে নিলেন এবং খাওয়ার দিকে মন দিলেন।

বিরুর বউদি আস্তে বললেন, “যেদিন রাতে উনি মারা যান, সেদিনই বেশ কয়েকবার আমাকে বলছিলেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লেখা হচ্ছে না। অ্যাড্রেসটা জোগাড় করেছি। নোটবইতে লেখা আছে। যদি আমি কোনো বিপদে পড়ি তো ওঁকে খবর দিও। পরদিন তো যা মনের অবস্থা, চিঠি লিখব কী! পরের দিন লিখে বিট্টুকে দিয়ে ডাকে পাঠালাম। প্রত্যেকদিন ভাবি, আজই আসবেন। এ-এই করে করে…”

মুরারিবাবু শুনছিলেন। বললেন, “আমাকে তোমরা পর ভাবো। নকুলদা ভাগ্যিস আমাকে বলে রেখেছিল। ..হুঁ হুঁ, কী ভাবছ? এই শৰ্মাই গতকাল কলকাতা গিয়ে ওঁকে টেনে এনেছে। …ওই বিরুটা! বিরুটা আমাকে ঘরে তালা আটকে সাতদিন…সাতটা দিন বন্দী করে রাখল। তারপর আর এ-ঘরে ঢুকতে পাইনি যে নকুলদার নোটবই থেকে ঠিকানা নেব। …শেষে পরশুদিন নোটবইটা বিট্টুকে দিয়ে হাতিয়ে…এই দ্যাখো!” বলে পকেট থেকে সেই নোটবইটা বের করলেন।

বিরুর বউদি সেটা ছিনিয়ে নিয়ে কর্নেলকে দিলেন। “দেখছ কাণ্ড? তাই খুঁজে পাচ্ছি না কাল থেকে। বেরোও! বেরোও বলছি ঘর থেকে! পাগলামির একটা সীমা থাকা উচিত।”

মুরারিবাবু বললেন, “উপকার করলে এই হয় সংসারে। ঠিক আছে। তিন কাপ চা দেখছি। অঙ্ক কষলেই এক কাপ আমার। খেয়েই বেরোচ্ছি। আর তোমাদের ত্রিসীমানায় আসব না।”

“হুঁ, গাছে চড়ে বসে থাকোগে!” বিরুর বউদি বললেন, “ওদিকে উনি মার্ডার হয়েছেন, এদিকে একে নিয়ে ঝামেলা। সামলানো কঠিন। শেষে বুদ্ধি করে বিরু আটকে রাখল ঘরে।…ঠাকুরপো! শোনো তো!”

বিরু বারান্দা থেকে বলল, “কী?”

“বিট্টুকে ডেকে নিয়ে এসো তো। ঘুড়ির লোভ দেখিও, আমার নাম করে। তা হলে আসবে।” মুরারিবাবু কেত-কোঁত করে চা গিলে বললেন, “বিরুর কম্ম নয়। আমি যাচ্ছি।”

উনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। বিরুর বউদি বললেন, “ঠাকুরপো, তুমি যাও। মুরারি ঢিল খেয়ে রক্তারক্তি হবে।”

কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “অবশ্য আজকাল ডাকে চিঠি যেতে খুব দেরি হচ্ছে। তাই হয়তো আপনার…তুমিই বলছি বরং… জয়ন্তকে যেভাবে তুমি বলেছ!” কর্নেল প্রায় অট্টহাস্য করলেন।

বিরুর বউদি বললেন, “না, না। আপনি আমার বাবার বয়সি। তুমিই বলুন।”

“তোমার নাম কী মা?”

“রমলা।”

“তোমার স্বামী আমার কথা কবে থেকে বলতে শুরু করেন, মনে আছে?”

রমলা একটু ভেবে বললেন, “আজ ৯ এপ্রিল। উনি মার্ডার হন ২৮ মার্চ।..হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ১৭ মার্চ রাতে, তখন প্রায় দশটা বাজে, বাড়ি ফিরলেন। কেমন যেন চেহারা…খুব ভয় পেলে যেমন দেখায় মানুষকে। …তো এমনিতে খুব কম কথা বলতেন। জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে? বললেন, কিছু না। শরীরটা ভালো না। সেই রাতে হঠাৎ বললেন, একটা ধাঁধায় পড়েছি। কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখব। তারপর আপনার পরিচয় দিলেন। কিন্তু ধাঁধাটা কী, কিছুতেই বললেন না। শুধু বললেন, আমার নোটবইতে টুকে রেখেছি। তুমি বুঝবে না।”

কর্নেল নোটবইটার পাতা ওলটাতে থাকলেন। “হুঁ, ওঁর ডেডবডি কোথায় পাওয়া যায়?”

“ওই অলুক্ষুনে দেউড়ির নীচে।”

“কে দেখেছিল?”

“মুরারি। জ্যোৎস্না ছিল সে-রাতে। রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরছেন না দেখে মুরারি আর বিরুকে পাঠালুম। বিরু গিয়েছিল বাজারের ওদিকে লাইব্রেরিতে। ওখানে রোজই যেতেন।”

“মুরারিবাবু দেউড়ির দিকে গিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। …দেখে এসে…একে আধপাগলা মানুষ, আরও পাগল হয়ে গেলেন। কান্নাকাটি, আবোলতাবোল কথা, ঢিল ছোঁড়াছুড়ি, যাকে সামনে পান মারতে যান, ভাঙচুর…দু’দিকে দুই বিপদ তখন।”

“আচ্ছা রমলা, তোমাকে নকুলবাবু তিন-শিংওয়ালা ছাগলের কথা বলেছিলেন?”

রমলা চমকে উঠলেন। একটু পরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলেছিলেন মনে পড়ছে। সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন, কেউ কখনও তিন-শিঙে পাঁঠা দেখেছে নাকি? এটা উনি মার্ডার হওয়ার ক’দিন আগের কথা। শুধু মুরারি বলল, দেখেছে। ও তো পাগল! ওর কথা! উনি আমল দেননি।”

“তুমি তিনকড়িবাবুকে চেনো?”

“একটু-আধটু চিনি। জাহাজে চাকরি করেন। বার-দুই এসেছিলেন। মুরারির জ্ঞাতি-ভাই। ওর সঙ্গে মামলা লড়ে মুরারির এই অবস্থা। তবে মামলা চলছিল তিন পুরুষ ধরে।”

“একটা দেউড়ি নিয়ে?”

রমলা অনিচ্ছায় হাসলেন। “তাই তো শুনেছি। আসলে জেদের লড়াই।”

“তিনকড়িবাবুর এখানে আর কোনো আত্মীয় আছেন?”

“আছে। করালীবাবু। এখন বাজারের ওখানে বাড়ি করেছে। ব্যাবসা করে খুব পয়সা কামাচ্ছে। তিনকড়িবাবুর কাকার ছেলে।”

“তিনকড়িবাবু কি বেঁটে, মোটাসোটা, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স?”

“বয়স জানি না। বার-দুই বিরুর দাদার কাছে এসেছিলেন। হ্যাঁ, বেঁটে। মোটাসোটা মানুষ। আপনি চেনেন ওঁকে?”

কর্নেল জবাব দিলেন না সে-কথার। বললেন, “নোটবইটাতে মুরারিবাবু খুব হাত লাগিয়েছেন, এটাই সমস্যা। এটা আমি রাখছি, রমলা!”

“রাখুন। আপনি..” রমলা ধরা গলায় বললেন, “একটা নিরীহ সাদাসিধে মানুষকে কে অমন করে মারল, কেন মারল, খুঁজে বের করুন।”

“আপনার ঠাকুরপো কী করে?”

রমলা আস্তে বললেন, “ভাইটাকে মানুষ করতে পারেননি স্কুলটিচার হয়েও। স্কুল ফাইনালে দু’বার ফেল করে এতদিনে একটা চাকরি জুটিয়েছে। ব্যারেজে হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশন আছে। সেখানকার সিকিউরিটি গার্ড। আসলে দাদা-ভাই দুজনেই একটু গোঁয়ার, জানেন? দাদা তো কার সঙ্গে ঝগড়া করে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভাই কবে না একই পথ ধরে। আমার হয়েছে জ্বালা!”

“তা হলে নকুলবাবু রিটায়ার করেননি?”

“না। ভেতরে-ভেতরে খুব রাগী আর জেদি মানুষ ছিলেন। আত্মসম্মানবোধ ছিল ভীষণ। তবে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। খুব ভদ্র আর…”

“নিরীহ বলছিলেন?”

রমলা জোর দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। একটা পোকা মারতে হাত কাঁপত। তবে রাগ হলে মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলে দিতেন। এ জন্যই রূপগঞ্জে ওঁকে কেউ পছন্দ করত না। আর ওই এক স্বভাবতর্ক! পণ্ডিতি তর্ক।”

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, “শুনলুম, লোকে বলছে, শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ ছিল। বডিতে তিনটে ক্ষত ছিল। তোমার কী ধারণা?”

রমলা ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন, “উনি নাস্তিক মানুষ ছিলেন। সেজন্য ওসব রটানো হয়েছে। আর ত্রিশূলে রক্তের দাগ? মিথ্যা। সিঁদুর মাখিয়ে দিয়েছে কেউ।”

“পুলিশ কী বলছে?”

“পুলিশ ত্রিশূলের লাল দাগ তুলোয় মাখিয়ে টেস্ট করতে পাঠিয়েছে। রোজ থানায় গিয়ে খোঁজ নিই। বলে, এখনও কলকাতা থেকে রিপোর্ট আসেনি।”

কর্নেল উঠলেন। “চলি। আমি আছি ইরিগেশন বাংলোয়। দরকার হলে বিরুকে দিয়ে খবর পাঠিও।”

রমলা ব্যস্তভাবে বললেন, “বিট্টুকে খুঁজতে গেল ওরা। চিঠিটা ডাকে দিয়েছিল কি না…”

“থাক। ও-নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই।”….

ঘিঞ্জি গলি দিয়ে বাজারে পৌঁছে দু’জনে থমকে দাঁড়ালুম। শের আলি এবং তার জিপটা নেই। সামনে একটা চায়ের দোকান থেকে একটি ছেলে এসে বলল, “শের আলি বোলা, উও দেখিয়ে সাব! মহিলার সিংকা গ্যারিজ..উহা চলা যাইয়ে। উও দেখিয়ে শের আলি খাড়া হ্যায়!”

বললুম, “হঠাৎ গ্যারেজে কেন?”

কর্নেল কিছু বললেন না। হনহন করে এগিয়ে চললেন। রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। বাঙালি-বিহারি চেনা কঠিন। দুই রাজ্যের সীমানাবর্তী শহরে এই এক জগাখিচুড়ি।

শের আলি দৌড়ে এল। মুখ উত্তেজনায় লাল। “হারামিলোগোকা খাসিয়ত এইসা হো গেয়া, কর্নিলসাব! দো চাক্কা ফাসা দিয়া, ঔর কারবুরেটর জ্যাম কর দিয়া! চাকু চালায় ইঞ্জিনকি অন্দর! তার উরভি কাট দিয়া। কম-সে-কম তিন-চার ঘণ্টে লাগেগি! ম্যায় কা কুঁরু? দেখনে সে তো কলিজা ফাসা দেতা।”

কর্নেল একটু হাসলেন। “ঠিক আছে। তুমি এখানেই অপেক্ষা করো। আমরা আর একটু ঘুরে আসি।”

একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “শিউজিকো পুরানা মন্দির দর্শন করে ভাই! চলো!”

রিকশায় বসে বললুম, “ব্যাপারটা রহস্যময়!”

“হ্যাঁ। ব্যাকরণ রহস্যের অবস্থা জমজমাট হয়ে উঠল।” কর্নেল বললেন। “তবে এখন আমার ভাবনা আর মুরারিবাবুর জন্য হচ্ছে না। হচ্ছে হালদারমশাইয়ের জন্যে!”

সঙ্গে-সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। বললুম, “সত্যিই কি মুরারিবাবুকে উনি ফলো করে এতদূর এসেছেন? বিশ্বাস হয় না।”

কর্নেল পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, “ভোর ছ’টায় মর্নিং ওয়াকে বেরনোর সময় গেটের বাইরে একটা কাটাগাছে এটা আঁটা ছিল, চোখে পড়ার মতো জায়গায়। তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম।”

চিরকুটে লাল ডটপেনে লেখা আছে :

পাতিঘুঘু বলিদান
বুড়োঘুঘু সাবধান

বললুম, “সর্বনাশ! হালদারমশাই তা হলে অলরেডি…”

কর্নেল আমার হাত থেকে চিরকুটটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, “কলকাতা থেকে রূপগঞ্জ থানায় ট্রাঙ্ককলে অলরেডি জানানো হয়েছে। গতকাল এখানে উনি পৌঁছনোর আগেই পুলিশ সতর্ক থাকার কথা। স্বয়ং ডাইরেক্টর জেনারেল অব পুলিশের নির্দেশ। তবু কিছু বলা যায় না।”

শেষ বাক্যটি শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল।

.

চার

জঙ্গলে ঢাকা একটা ঢিবির কাছে এসে সাইকেল-রিকশাওয়ালা বলল, “আর যাবে না সার। হেঁটি-হেঁটি চলে যান। ম্যালাই লোক যেছে বটেক বাবার ঠেঞে।”

ঢিবির জঙ্গল কুঁড়ে টাটকা পায়ে-চলা পথের দাগ চোখে পড়ছিল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে টিবিটি তদন্ত করে দেখলেন যেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, “হেটি-হেঁট চলেক যাই, ডার্লিং!”

সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তাটি করার সময় ঝোঁপঝাড়ও কাটা হয়েছে। কিছুটা এগিয়ে একদঙ্গল লোক যাচ্ছে দেখলুম। একজনের কাঁধে একটা পাঁঠা। তবে দুটো শিং। একটি ঢাকও নিয়ে যাচ্ছে। বললুম, “এ দেশের লোক বড্ড হুজুগে।”

কর্নেল বললেন, “সব দেশের লোকই হুজুগে, জয়ন্ত! তবে তফাতটা হল, এ-দেশে এখনও মানুষের হাতে প্রচুর সময়। সেই সময়কে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা কম। আর যদি কুসংস্কারের কথা বলো, সেও সবখানে মানুষের মগজে ঠাসা। মহা-মহা পণ্ডিতের সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়েছে। পিদিমের তলায় আঁধারের মতো তাদের এক-একজনের এক-একরকম উদ্ভট কুসংস্কার দেখেছি। ..হঁ, নাস্তিকদেরও কুসংস্কার দেখেছি, জয়ন্ত! আসলে সত্যিকার নাস্তিক হতে গেলে মনের জোর থাকা চাই। খাঁটি নাস্তিক হওয়া সহজ নয়। অবিশ্বাস করাটা শক্ত বিশ্বাস করাটা সহজ। কারণ আজন্ম মানুষ বিশ্বাস ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসই মানুষের সমাজটাকে বেঁধে রেখেছে। ওই রিকশাওয়ালার কথাই ধরো। আমরা তাকে ভাড়া দেব বিশ্বাস করেই আমাদের বয়ে আনল! বিশ্বাস, ডার্লিং, বিশ্বাস জিনিসটা না থাকলে মানুষের বাঁচা কঠিন হত। কিন্তু কিছু বেয়াড়া লোক থাকে। তারা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। যে বিশ্বাস চালু, তাকে অবিশ্বাস করে। তারপর? চালু-বিশ্বাস যদি বা ভাঙে, আর এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম হয়।…”

কর্নেলের এই দীর্ঘ দার্শনিক ভাষণের তাৎপর্য বুঝতে পারছিলুম না। ফালি রাস্তার পর ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে সামনে ধ্বংসস্তূপ এবং তার পেছনে একটা মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ল। চূড়ায় কালচে রঙের ত্রিশুল। কর্নেল বাইনোকুলারে ত্রিশূলটি দেখে নিলেন। বললুম, “রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছেন?”

কর্নেল কথায় কান না দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।”

বিরক্ত হয়ে হাঁটতে থাকলুম। উনি সমানে বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন। তারপর ঢাক বেজে উঠল। ধ্বংসস্তূপগুলোর পর একটা ভোলা পাথর-বাঁধানো চত্বর। ফাঁকে-ফোকরে উদ্ভিদ গজিয়েছিল। কেটে সাফ করা হয়েছে। একদল লোক বসে আছে এবং প্রত্যেকের হাতে একটা করে নানা সাইজের পাঁঠা। প্রকাণ্ড মন্দিরের সামনে হাড়িকাঠ এবং রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। ঢাক-কাঁসি বাজছে। ধেইধেই নাচও চলছে। রক্তারক্তি দেখলে আমার গা গুলোয়। মন্দিরটা দেখতে থাকলুম। কালো পাথরে তৈরি খয়াটে এবং ফাটলধরা প্রাচীন স্থাপত্যের কেমন যেন ভয়াল চেহারা। দেখলেই গা-ছমছম করে। এতক্ষণে লোহার ত্রিশূলে কালচে রক্তের দাগ স্পষ্ট চোখে পড়ল।

আমাদের দেখতে পেয়ে কয়েকজন পাণ্ডা ভিড় করল। কারও পরনে গেরুয়া, কারও পট্টবস্ত্র এবং প্রত্যেকের কপালে সম্ভবত রক্তের ফোঁটা। সাজিয়ে শিবের প্রিয় বেলপাতা, জবাফুল। কিছু ধুতরো ফুলও দেখতে পেলুম। কর্নেল প্রত্যেককে একটা করে টাকা বিলোচ্ছেন দেখে অবাক হলুম, কলকাতা থেকে একগুচ্ছের এক টাকার নোট জোগাড় করেই এসেছেন! আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুটি সত্যিই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা।

ঢাকের বাজনার তালে-তালে একজন সন্ন্যাসী চেহারার লোক নেচে-নেচে গাইছে :

নাচে পাগলাভোলা গলায় মালা
হাতে লয়ে শূল
প্রমথ প্রমত্ত নাচে
কানে ধুতুরারই ফুল….

কর্নেল এক টাকার হরির লুঠ দিয়ে লম্বা পায়ে কেটে পড়লেন। মন্দিরের পেছনে গিয়ে ওঁর নাগাল পেলুম। আবার খানিকটা ভোলা জায়গা এবং সামনে একটা প্রকাণ্ড উঁচু আধখানা দেউড়ি দেখা গেল। পাথরের এমন তোরণ দিল্লির মেহরৌলিতে কুতবমিনারের কাছে দেখেছি।

“অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী!” কর্নেল মুগ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে বলে উঠলেন। “এর মালিকানার জন্য একটা কেন একশোটা কুরুক্ষেত্র বাধা স্বাভাবিক। সত্যিই ডার্লিং! রাজা শিবসিংহের এই উত্তঙ্গ কীর্তির ভগ্নাবশেষ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ে ফতুর হতে আমারও ইচ্ছে করছে। দুঃখের বিষয়, সরকার দেশের প্রাচীন কীর্তি সম্পর্কে এত অমনোযোগী কেন, ভেবে পাইনে! ফিরে গিয়ে প্রত্ন-দফতরে কড়া করে চিঠি লিখব।”

বলে কর্নেল ক্যামেরায় নানা দিক থেকে ছবি তুললেন। তারপর কাছে গিয়ে বললেন, “ওপরটা ভেঙে গেলেও অনুমান করছি, তোরণটা অন্তত পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু ছিল। আর এই দ্যাখো, চওড়ায় কী বিশাল! প্রায় দশ ফুট!”

ওদিকে গিয়ে দেখলুম, তোরণ বা দেউড়িটির মাথায় ঘন ঝোঁপ গজিয়ে রয়েছে। আস্ত একটা বেঁটে বটগাছ মাথা তুলেছে এবং সেটার শেকড় সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে গা বেয়ে।

হঠাৎ দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর আওয়াজ হল, “একাশি!”

চমকে উঠলুম। ঝোঁপ কুঁড়ে কালো একটা ছাগলের মুখ দেখা যাচ্ছে এবং রীতিমতো আশ্চর্য ঘটনা, তার তিনটে শিং! উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

কর্নেল বাইনোকুলারে দেখছিলেন। ঝটপট ক্যামেরা তাক করে শাটার টিপলেন। ছাগমুণ্ডটি দাড়ি ও তিন শিং নেড়ে ফের বলে উঠল মানুষের ভাষায়, “একাশি!” তারপর বেমালুম নিপাত্তা হয়ে গেল।

কর্নেল এবং আমি ভাঙা দেউড়িটার চারদিকে ছোটাছুটি করে তাকে আর খুঁজে পেলুম না। কর্নেল ব্যস্তভাবে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে এবং শেকড়বাকড় ধরে ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। তখন বললেন, “তোমার তো মাউন্টেনিয়ারিং-এ ট্রেনিং নেওয়া আছে। দ্যাখো তো চেষ্টা করে। আসলে আমার শরীরটা বেজায় ভারী হয়ে গেছে। নইলে আমিও কিছু পাহাড়ের চূড়োয় উঠেছি একসময়। জয়ন্ত! কুইক!”

একটু দোনামনা করে বললুম, “মাউন্টেনিয়ারিংয়ের জন্য বিশেষ জুতো পরা দরকার। এই জুতো পরে ওঠা সম্ভব নয়।”

“চেষ্টা করো ডার্লিং!”

কর্নেলের তাড়ায় পাথরের খাঁজে পা রেখে বুটের শেকড় আঁকড়ে অনেকটা ওঠা গেল। প্রায় মাঝখানে পৌঁছে হল বিপদ। শেকড়টা এখন বেশ মোটা। খাঁজে গজানো গুল্ম ধরে উঠতে গেলেই উপড়ে যাচ্ছে। নীচে থেকে কর্নেল ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছেন। এইবার একটা মোটা লোহার আংটা চোখে পড়ল মাথার ওপরে। মরচে-ধরা আংটা। টেনে দেখলুম, ওপড়ানোর চান্স নেই।

আংটাটি আঁকড়ে বারের কসরত করে গিরগিটির মতো উঠতেই একটা শক্ত ঝোঁপ বাঁ হাতের নাগালে এসে গেল। এরপর আর ওঠাটা কষ্টকর হল না। ঝোঁপ আঁকড়ে পাথরের খাঁজে পা রেখে-রেখে মাথায় উঠলুম। ফুট-দশেক চওড়া জায়গা জুড়ে ঘন ঝোঁপ। তিন-শিঙে ছাগল যেখানে মুখ বের করেছিল, সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়ালুম। নীচে থেকে কর্নেল বললেন, “গর্ত দেখতে পাচ্ছ কি?”

এমনভাবে বললেন, যেন নিজেও একবার উঠে আবিষ্কার করে গেছেন! হাসতে-হাসতে বললুম, “গর্ত নয়। কুয়ো৷”।

কর্নেল উত্তেজিতভাবে বললেন, “সিঁড়ি আছে দ্যাখো!”

“আছে।”

“নির্ভয়ে নেমে যাও।”

“পাগল!”

“পাগল না ডার্লিং, ছাগল।”

“কী যা-তা বলছেন?”

“ছাগল নেমে গেছে যখন, তখন তুমিও নামতে পারো। কুইক!”

কথাটা মনে ধরল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলুম। একটু পরে ঘুরঘুঁটে আঁধার। সেই আঁধারে আবার ব্যা-ডাক শুনতে পেলুম। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলে দেখলুম সিঁড়ির নীচে সমতল পাথর-বাঁধানো মেঝে। একটা করে দেশলাইকাঠি জ্বালি আর সেই আলোয় ভয়ে-ভয়ে পা ফেলি। তিনকড়িচন্দ্র খুঁড়িয়ে হাঁটছে যখন, তখন এই দুর্গম সুড়ঙ্গপথে তার হামলার আশঙ্কা যে নেই, এটাই আমার দুঃসাহসের কারণ। কিছুটা চলার পর সুড়ঙ্গপথ শেষ হল। বাইরের আলো এসে পড়েছে সামনে। আবার সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে ওপরে। এতক্ষণে অস্বস্তি কেটে গেল।

সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলুম। মাথায় ঘন ঝোঁপ ও লতার বুনোট। সম্ভবত তিনশিঙে ছাগলটির যাতায়াতে সবুজ রঙের বুনোটটি ঘেঁদা হয়ে গেছে। সেই ঘেঁদা দিয়ে বেরিয়ে দেখি, একটা ছাদবিহীন ভাঙা ঘরের ভেতর এসে পড়েছি। দু’দিকে ভাঙা উঁচু পাঁচিল, একদিকে ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকটায় জঙ্গল।

এইমাত্র কেউ বা কিছু জঙ্গল ভেদ করে চলে গেছে, ঝোঁপগুলো তখনও দুলছে। ছাগলটাই হবে। সুড়ঙ্গের মুখের দিকে তাকালে বোঝবার উপায় নেই কিছু। মনে হবে ওটা নেহাত আরও সব জঙ্গলের মতো জঙ্গল।

ছাগলটা যেদিকে গেছে বলে সন্দেহ হল, সেদিকেই পা বাড়ালুম। কিন্তু আর এগোনো কঠিন। গুঁড়ি মেরে অবশ্য ঢোকা যায়, এবং চারঠেঙে জন্তুর পক্ষেই খুদে গড়নের জন্য গলিয়ে যাওয়া সম্ভব। কাজেই সে-চেষ্টা ত্যাগ করে ধ্বংসস্তূপের দিকটায় এগিয়ে গেলুম। তারপর কী কষ্টে যে পাথরের স্ল্যাব, ইট আর ঝোঁপঝাড়লতার ভেতর দিয়ে ভোলা সমতল জায়গায় পৌঁছলুম, বলার নয়।

কিন্তু এবার যেদিকে তাকাই, ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর একই ধ্বংসস্তূপ। শিবমন্দিরের চূড়া বা তোরণটাও দেখা যাচ্ছে না। একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিলুম। ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া এল, “চলে এসো ডার্লিং! ব্র্যাভো!”

দক্ষিণের একটা ভাঙা ঘরের দরজায় প্রাজ্ঞ বন্ধুবর সাদা দাড়ি নেড়ে এবং টুপি খুলে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন। “মার্ভেলাস, জয়ন্ত! কনগ্রাচুলেশন! তবে এতখানি নার্ভাস হয়ে পড়ার কারণ ছিল না। এই স্তূপটায় উঠে বাইনোকুলারে মাটি ভেদ করে তোমার উদ্ভিদরূপী অভ্যুত্থান দেখেছি। আমি জানতুম, এটাই ঘটবে।”

কর্নেল খোলা জায়গায় নেমে এলেন। বললুম, “জানতেন! কী জানতেন?”

“তোমার এভাবেই অভ্যুত্থান ঘটবে।”

“তার মানে, আপনি বলতে চাইছেন ওই সুড়ঙ্গপথটার কথা, আপনি জানতেন?”

কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “অঙ্ক ডার্লিং! স্রেফ অঙ্ক! পিওর ম্যাথস। তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি। তবে ব্যাকরণেও অঙ্কের নিয়ম কার্যকর। এক এবং আশি যোগ করলে যেমন একাশি হয়, তেমনি সন্ধি করলেও একাশি হয়। চলো! এবার থানায় গিয়ে হালদারমশাইয়ের খোঁজখবর নেওয়া যাক।”

ধ্বংসস্তূপগুলোর ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে এতক্ষণে দক্ষিণে সেই শিবমন্দিরের ত্রিশূল চোখে পড়ল। হঠাৎ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, “তিনকড়িবাবু! তিনকড়িবাবু! আপনার বিছানা স্টেশনে… কী আশ্চর্য!”

এক পলকের জন্য দেখলুম, শিবমন্দিরের পেছন দিকে ছড়ি হাতে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে সেই তিনকড়িচন্দ্র উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, “না–ওঁর দোষ নেই। আসলে সেকালের লোকেরা বড্ড ধাঁধা ভালোবাসতেন। একালে যে হঠাৎ কুইজের হুজুগ উঠেছে, সেও সেই পুরোনো স্বভাবের পুনরুত্থান। সভ্যতার এই নিয়ম। পুরোনো বাতিক নতুন করে বারবার যুগে-যুগে ফিরে আসে। কিন্তু সমস্যা হল, কিছু লোক আছে, সভ্যতার ব্যাকরণ বোঝে না। ব্যাকরণ মানে না। তারা হাঁসজারুর পেছনে হন্যে হয়।”

কর্নেলের পুনঃ দীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শেষ হল, মন্দির-চত্বর পেরিয়ে ঢিবির জঙ্গলচেরা সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তার নীচে পিচের সড়কে পৌঁছে। এতক্ষণে পুণ্যার্থীদের ভিড় বেড়েছে। সাইকেলরিকশা তখনই পাওয়া গেল।

কর্নেল বললেন, “থানেমে লে চলল, ভাই! জলদি যানা পড়ে। বখশিস মিলে গা।” সাইকেলরিকশাওয়ালা ফিক করে হেসে বলল, স্যার, চিনতে পারলেক নাই বটেক। আমিই তো তখন সারদের লইয়ে এলাম বটেক।”

কর্নেল বললেন, “তাই বটেক!”

আমি বললুম, “ওহে রিকশাওয়ালা, তোমাদের এই বটেকটা কী বলো তো?”

রিকশাওয়ালা একগাল হেসে বলল, “উটো একটো কথাই বটেক!”

“কথা তো বটেই! কিন্তু…”

“স্যার লিজের মুখেই তো বইললেন বটেক।”

কর্নেল গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন, “বুঝলে না? বটে তো বটেই বটেক!”

থানার সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা গেট দিয়ে ঢুকলুম। দু’ধারে ফুলে-ফুলে ছয়লাপ। বললাম, “রূপগঞ্জের ব্যাপার! খুব রূপসচেতন। খালি ফুল আর ফুল। থানাতেও ফুল! খুনে-বদমাশ চোর-জোচ্চোরদের ধরে এনে ফুল শোঁকানো হয় মনে হচ্ছে।”

থানাঘরে ঢুকতেই একজন পুলিশ-অফিসার কর্নেলকে দেখে চেয়ার ছেড়ে প্রায় লক্ষ্য দিলেন। “হ্যাল্লো কনেলসায়েব, আসুন, আসুন। ও.সি. সায়েব এখনই আপনার কথা বলছিলেন।”

অফিসারটি পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড এবং ফো অফিসার-ইন-চার্জ ভদ্রলোকও অনুরূপ লম্ফ দিয়ে হাত বাড়ালেন। পেল্লায় ধরনের হ্যান্ডশেকের পর বিকট অট্টহাসিতে কানে তালা ধরে গেল। বললেন, “কল্যাণবাবুকে এখনই বলছিলুম, এলে নিশ্চয় ইরিগেশন বাংলোয় উঠবেন। দেখুন তো খোঁজ নিয়ে। কাল ডি. জি-সায়েবের ট্রাকল পেয়েই বুঝে গেছি, সিরিয়াস কে। কাল ট্রেনও দু’ঘণ্টা লেট ছিল। স্টেশনে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক মোতায়েন ছিল।”

বলে বড়বাবু বসলেন। কর্নেল বললেন, “হালদারমশাইয়ের খবর?”

বড়বাবু বেজার মুখে বললেন, “ওরা তেমন সন্দেহজনক কাউকে তো দেখতে পায়নি। পাগলাবাবুকে কেউ ফলো করেনি। হালদারবাবুর চেহারার যে বর্ণনা দিয়েছেন ডি. জি-সায়েব, তেমন কাউকে দেখা যায়নি।”

আমি বললুম, “ছদ্মবেশ ধরার বাতিক আছে ওঁর।”

বড়বাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনিই আশা করি সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী? কর্নেলের মুখে আপনার কথা শুনেছি। ভালো, খুব ভালো। কিন্তু আপনি তো ভাবিয়ে তুললেন দেখছি!”

কর্নেল বললে, “মিঃ হাটি, মন্দিরের ত্রিশূলের রক্তের দাগ সম্পর্কে ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়েছেন কি?”

“আজ সকালে পেয়েছি। মানুষেরই রক্ত। তার চেয়ে সমস্যা, নকুলবাবুর ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে মিলে গেছে।”

শুনেই আঁতকে উঠলাম। বললুম, “তা হলে ওই ত্রিশূলেই নকুলবাবুকে…”

আমার কথায় বাধা দিয়ে বড়বাবু মিঃ হাটি বললেন, “ওই ত্রিশূল ওপড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই। তবে স্বয়ং মহাদেবের থাকতে পারে।” বলে আবার সেই দানবীয় অট্টহাসি হাসলেন। হাসি তো নয়, মেঘের ডাক। তার আওয়াজে যেন ভূমিকম্পও হচ্ছিল। অন্তত তার শরীরে সেই কাঁপুনি দেখে তাই মনে হয়।

কর্নেল বললেন, “মন্দিরটা দেখলুম খুব উঁচু। তা ছাড়া চূড়াটা ছুঁচলো এবং শ্যাওলায় পিছল হয়ে আছে। উঁচু মই ছাড়া ওঠাও অসম্ভব। ত্রিশূলে নকুলবাবুর রক্ত কী করে মাখানো হল?”

মিঃ হাটি গুম হয়ে বললেন, “এটাই আশ্চর্য! আমরা ফায়ারব্রিগেড আনিয়ে ত্রিশূল থেকে রক্তের নমুনা নিয়েছিলুম। ফায়ারব্রিগেডের মই ছাড়া চুড়োয় ওঠা যেত না। কল্যাণবাবুও উঠেছিলেন চূড়োর চারদিক পরীক্ষা করতে। সাধারণ মই দিয়ে উঠলে মইয়ের ডগার দাগ পড়ত।”

কল্যাণবাবু বললেন, “কোনো দাগ দেখতে পাইনি। তবে এক হতে পারে, লম্বা বাঁশের মাথায় রক্তমাখা তুলো বেঁধে ত্রিশূলে ঘষে দিয়েছিল খুনি। কিন্তু ভালোভাবে পরীক্ষা করেছি, ত্রিশূলে তুলোর আঁশ লেগে নেই। এমনকি, ত্রিশূলের গা বেয়েও রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়েনি। চূড়োতেও রক্তের ফোঁটা নেই কোথাও। তন্নতন্ন খুঁজেছি।”

আমি বললুম, “ন্যাকড়ায় রক্ত মাখিয়ে…”

আবার বাধা পড়ল হাটিবাবুর বিকট অট্টহাস্যে। বললেন, “তা হলে তো মশাই রক্তের ফোঁটায় চূড়ো একাকার হয়ে থাকত। তুলো রক্ত শুষে নেয়। ন্যাকড়া অত শুষতে পারে কি? ভেবে বলুন।”

হাবা বনে বসে রইলুম। কর্নেল বললেন, “কিন্তু আমার ভাবনা প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোকের জন্য। এই দেখুন।” বলে কর্নেল পকেট থেকে সচ্ছিদ্র চিরকুটটা বড়বাবুর হাতে দিলেন। “বাংলোর গেটের বাইরে একটা কাঁটাঝোপে এটা লটকানো ছিল।”

ছড়াটা পড়ে পুনঃ বিকটহাস্যের জন্য রেডি হয়েই বড়বাবু মিঃ হাটির মুখ তুম্বো হয়ে গেল। ভুরু বেজায় কুঁচকে গোঁফ চুলকে বললেন, “মন্দিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডি. জি-সায়েবের নির্দেশ দিল সাদা পোশাকের পুলিশ রাখতে, অক্ষরে-অক্ষরে তা পালন করেছি। পাঁঠাগুলোর দিকে লক্ষ রাখতে বলেছিলুম। তিন শিঙে পাঁঠা বলির জোগাড় দেখলেই যেন বমাল আসামি ধরে থানায় পাঠায়। কিন্তু এখনও তেমন কিছু ঘটেনি। নরবলি তো দূরস্থান!”

কর্নেল বললেন, “রাতেও আশা করি পুলিশ ছিল?”

“আলবাত ছিল,” মিঃ হাটি জোর গলায় বললেন, “নরবলি যে হয়নি, সেটার গ্যারান্টি দিতে পারি। কাজেই এটা স্রেফ হুমকি।”

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “অন্য কোনো মন্দিরেও তো… মানে, ওদিকটা অনেক ভাঙাচোরা মন্দির দেখলুম। যদি হালদারমশাইকে…”

বড়বাবুর শেষদফা আটকে-রাখা বিকট হাস্যটির বিস্ফোরণ ঘটল। পরিশেষে প্রকাণ্ড মুণ্ড জোরে নেড়ে বললেন, “এখন পর্যন্ত ওই এরিয়া কেন, কোথাও কোনো ডেডবডির খবর নেই। ডি. জি-র ট্রাঙ্ককল পেয়েই আমরা অ্যালার্ট, রেড সিগন্যাল বোঝেন তো?”

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, “আচ্ছা মিঃ হাটি, তিনকড়িচন্দ্র ধাড়াকে চেনেন?”

মিঃ হাটির ভুরু বেশ পুরু। কুঁচকে তাকালেন কল্যাণবাবুর দিকে।

কল্যাণবাবু বললেন, “কেন? করালীবাবুর আত্মীয়…সেই স্মাগলার স্যার! জাহাজে চাকরি করে। …সরডিহির রাজবাড়ির মন্দির থেকে সোনার ঠাকুর চুরির কেসের মূল আসামি ছিল। আইনের ফাঁকে ছাড়া পেয়ে নিপাত্তা হয়ে গেল। এক মিনিট। কেসের ফাইলটা খুঁজে আনছি।” কল্যাণবাবু সবেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনার একটু সাহায্য এখনই চাই মিঃ হাটি!”

“অবশ্যই পাবেন। বলুন!”

“আমি শিবমন্দিরের ভেতরটা একবার দেখতে চাই। ভক্তদের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগতে পারে। সেজন্যই পুলিশের সাহায্য ছাড়া এ-কাজটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”

বড়বাবু হাঁকলেন, “কল্যাণবাবু, ফাইল পরে হবে। প্লিজ, চলে আসুন!”..বলে কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, “মার্ডার কেস! ধম্মকম্ম নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কর্নেলসায়েব! ভগবান আছেন, মাথায় থাকুন। আর স্বয়ং ভগবানই বলেছেন কি না যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি…’ এটসেট্রা এটসেট্রা!”

পুনঃ ভূমিকম্পসদৃশ বিকট অট্টহাস্য! বাস! পুলিশকে এমন হাসতে কখনও দেখিনি। এই ভদ্রলোক যদি চোর-জোচ্চোরকে বেটনের গুঁতোর বদলে এই সাঙ্ঘাতিক হাসির গুঁতো মারেন, সঙ্গে-সঙ্গে পেটের কথা উগরে দেবে। মারমুখী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের বদলে এঁর লাফিং গ্যাস প্রয়োগ করলে অনেক বেশি কাজ হবে সন্দেহ নেই।

কল্যাণবাবু থানার সেকেন্ড অফিসার। সঙ্গে দু’জন সশস্ত্র সেপাই। গেটে রিকশাওয়ালা অপেক্ষা করছিল। কর্নেল এবং আমার সঙ্গে এবার পুলিশ দেখে আঁতকে উঠে সে কেটে পড়তে যাচ্ছিল। কর্নেল মধুর হেসে তার হাতে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে সম্ভাষণ করলেন, “এই যে ভাই! ভাড়া আর ওয়েটিং চার্চ তো লিবেই বটেক।”

রিকশাওয়ালা ভয়েভয়ে টাকাটা নিয়ে পালিয়ে যেতে এক সেকেন্ড দেরি করল না। একজন সেপাই মুচকি হেসে বলল, “বহত্ কামাতা শিউজিকা কিরপাসে।”

পুলিশের জিপে এবার তিন মিনিটেই পৌঁছে গেলুম। জিপ রাস্তায় রইল। কর্নেল বললেন, “একজন কনস্টেবল জিপের কাছে থাক, কল্যাণবাবু!”

কল্যাণবাবু বললেন, “কোনো দরকার নেই, কর্নেল! এ আপনার কলকাতা শহর নয়। দেহাতি গঞ্জ। এখানে পুলিশ কেন, পুলিশের জুতোকেও ভয় পায় লোকেরা। রাস্তায় ফেলে গেলেও ছোঁবে না। তা ছাড়া চাবি!” বলে রিঙের চাবিটা নাড়া দিলেন।

মন্দিরে বলিদান চলেছে। তেমনি ঢাক বাজছে। এখন ভিড়টা বেশ বেড়েছে। আমাদের দেখে ভিড় থেকে দু’জন তাগড়াই চেহারার লোক বেরিয়ে এল। বুঝলুম, সাদা পোশাকের পুলিশ। কল্যাণবাবু মন্দিরের উঁচু বারান্দায় উঠলেন। পাণ্ডারা এবং তাদের দলপতি গেরুয়াধারী সেই সাধু-সন্ন্যাসী চেহারার লোকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। জুতো খুলে রেখে আমরা ভেতরে ঢুকলুম। মন্দিরের ভেতরটা চওড়া। ভাঙাচোরা শিবলিঙ্গে প্রচুর সিঁদুর মাখানো হয়েছে। কর্নেল পকেট থেকে টর্চ জ্বেলে ছাদে আলো ফেললেন। চোখে বাইনোকুলার স্থাপনও করলেন।

একটু পরে টর্চ নিবিয়ে এবং বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, “হুঁ! বোঝা গেল।”

কল্যাণবাবু বললেন, “কী বোঝা গেল, কর্নেল?”

“মই বাইরে ব্যবহার করা যায়নি। কারণ অত উঁচু মই জোগাড়ের সমস্যা ছিল। কিন্তু মন্দিরের মেঝে উঁচু। একটা বিশ ফুট মই যথেষ্ট। বিশেষ করে এই লিঙ্গের বেদিতে যদি মইয়ের গোড়া রাখা যায়, মাত্র ফুট-পনেরো মই হলেই চলে।” বলে বেদির পেছনে টর্চের আলো ফেললেন। পকেট থেকে এবার একটা আতস কাঁচ বের করে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর সোজা হয়ে ফের বললেন, “হু, বেদিতেই মইয়ের গোড়া দুটো রাখা হয়েছিল। পাথরে গোল দুটো ধুলোর ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে এখনও। জল ঢেলে মন্দিরের ভেতরটা পরিষ্কার করার তর সয়নি। খুনের পরদিনই তাড়াহুড়ো করে পুজো আর বলির আয়োজন করা হয়েছিল। হিসেবি মাথার কাজ, কল্যাণবাবু! স্টার্ট করে দিলেই পুজো আর বলিদানের মেশিন চলবে, জানা কথা। কিন্তু এটাই আশ্চর্য ব্যাপার, অপরাধী নিজের অজ্ঞাতে কিছু সূত্র রেখে যাবেই।”

কল্যাণবাবু হাঁ করে শুনছিলেন। বললেন, “ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো।”

কর্নেল হাসলেন। “আপনিই তো দমকলের মইয়ে চুড়োয় উঠেছিলেন। ত্রিশূলের গোড়ায় গোল লোহার চাকতি আঁটা আছে, কী করে আপনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল?”

কল্যাণবাবু যেন একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “দৃষ্টি এড়াবে কেন? গোল প্রায় সাত-আট ইঞ্চি ব্যাসের লোহার চাকতি আঁটা আছে। তার সেন্টার থেকে ত্রিশূলটা উঠে গেছে।”

কর্নেল কৌণিক ছাদের কেন্দ্রে ফের টর্চের আলো ফেলে বললেন, “দেখুন, তলাতেও অমনি একটা লোহার গোল চাকতি আঁটা। চাকতিটা নতুন। মরচে ধরেনি!”

“মাই গুডনেস!” নড়ে উঠলেন কল্যাণবাবু। “ওপরের চাকতিটাও মরচে-ধরা ছিল না। কিন্তু…”

‘কল্যাণবাবু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, “তাই তো! আসলে আমি রক্তের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলুম।”

“ঠিক তাই। আপনার দৃষ্টি ছিল তঙ্কালীন উত্তেজক বস্তুর একমাত্র লাল রং, অর্থাৎ রক্তের মতো জিনিসটার দিকেই।” কর্নেল টর্চ নিভিয়ে বললেন। “এমন সুপ্রাচীন মন্দিরের ত্রিশূল মরচে ধরে আস্ত থাকার কথা নয়–যদি না সেটা বিখ্যাত জাহানকোশা তোপ বা কুতুবমিনারের প্রাঙ্গণে স্তম্ভটার মতো বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি লোহা হয়। এ-ত্রিশূল সেই লোহার নয়। বাইনোকুলারে ত্রিশূল এবং ওই চাকতিতে টাটকা পেটাইয়ের দাগ স্পষ্ট। ডগা খুব তীক্ষ্ণ। তবে চাকতি বলছি, জিনিসটা চাকতি নয়। ওটা ঘুড়ির লাটিমের গড়ন সচ্ছিদ্র একটুকরো লোহা। ত্রিশূলটা ভ্রুর মতো ওতে পেঁচিয়ে ঢোকানো আছে। প্রাচীন যুগের বহু মন্দিরে এই পদ্ধতিতে ত্রিশূল আটকানো রয়েছে। কেন জানেন? পাখির বিষ্ঠা বা ময়লা লাগলে খুলে সাফ করার জন্য। তা ছাড়া মরচে ধরলে যাতে বদলানো যায়, সেও একটা কারণ।”

কর্নেল বেদির পেছনে মেঝেয় টর্চের আলো ফেললেন। “ওই দেখুন, কত মরচে-ধরা লোহার গুঁড়ো পড়ে আছে। মরচে-ধরা প্রাচীন ত্রিশূল তলা থেকে ভেঙেচুরে টেনে বের করা হয়েছে। তারপর একই পদ্ধতিতে নতুন ত্রিশূল তলা দিয়ে ঢুকিয়ে ওপরকার পাথরের গোলাকার খাঁজে আটকে দেওয়া হয়েছে। যাতে ফোকর গলে পড়ে না যায়, লোহার গোঁজ ঠোকা হয়েছে তলা থেকে। ছাদের ঝুলকালির জন্য গোঁজগুলো সহজে চোখে পড়ে না।”

কল্যাণবাবু ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কে সে? কার পেটে-পেটে এমন সাঙ্ঘাতিক কুচুটে বুদ্ধি?”

কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে বললেন, “এলাকার কামারশালাগুলোতে খোঁজ নিন। তবে আমার মাথায় এখন হালদারমশাইয়ের জন্য ভাবনা। কল্যাণবাবু, এখান থেকে সোজা পশ্চিমে হেঁটে গেলে কি নদীর ধারে পৌঁছব?”

“হ্যাঁ। এই ঢিবির নীচেই হাইওয়ে, তার নীচে নদী। কি দরকার হাঁটবার? চলুন, জিপে পৌঁছে দিই।”

কর্নেল একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, তাই চলুন।”

জিপের কাছে পৌঁছেই কল্যাণবাবু হঠাৎ মুরারিবাবুর মতোই তিড়িংবিড়িং করে জিপটার চারদিকে চক্কর মেরে হুমড়ি খেয়ে সামনের চাকার কাছে বসলেন। বসেই লাফিয়ে উঠলেন। মস্ত একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “কে সে…শয়তান, আমি তাকে দেখে নেব…এত সাহস!”

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “টায়ার ফাঁসিয়েছে। কারবুরেটর জ্যাম করেছে। ইঞ্জিনের ভেতরকার তার কেটেছে। যাকগে, কল্যাণবাবু, আপাতত বিদায়। আবার দেখা হবে।”

কর্নেল আমার হাত ধরে টেনে হনহন করে হাঁটতে থাকলেন। আমি হতবাক। কিছুটা এগিয়ে একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “মহিলার সিংকা গ্যারিজ। তুরন্ত চন্না ভাই।”

এই রিকশাওয়ালা বটেক’-এর বদলে বলল, “জরুর, চলিয়ে না, যাঁহাপর যানা।”

গ্যারেজে গিয়ে দেখি, শের আলির জিপ রেডি। স্যালুট ঠুকে বলল, “সব ঠিক হ্যায় কর্নিলসাব! মালুম হোতা, কই বদমাশ গ্যাংকা কুছ খতরনাক মতলব হ্যায়। উও আপকো হেঁয়া ঘুমনা পসন্দ নেহি করতা।”

অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।

.

পাঁচ

উত্তরের উজানে ব্যারেজ এবং জলাধারের দরুন এখানে নদীটার দশা করুণ। বুকে বড়-বড় পাথর নিয়ে ক্ষতবিক্ষত চেহারায় পড়ে আছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনসূত্রে পাওয়া দয়ার দান সামান্য জলে এত গভীর নদীকে বড্ড গরিব দেখাচ্ছে! হাইওয়ের ধারে একটা বটতলায় জিপ দাঁড় করিয়ে কর্নেল শের আলিকে বললেন, “ফিরতে দেরি হবে। তুমি বরং চলে যাও। বিকেল চারটে নাগাদ বাংলোয় যেও।”

শের আলি স্যালুট ঠুকে জিপ নিয়ে চলে গেল। আমরা ঢিবিতে উঠে গেলুম। খানিকটা খোলামেলা জায়গায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, “দেখো, দেখো! রামধনুর জেল্লা দেখো। ওই গাছগুলোর ডালে ফুলন্ত রেনবো অর্কিডের ঝাঁক দেখতে পাচ্ছ না? সূর্যের আলো তিনটে পাপড়ির ভেতর দিয়ে সাতটা রঙে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। তিনটে পাপড়ি নয়, যেন তিনটে প্রিজম্।”

সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো দৃশ্য। বললুম, “ছবি তুলে নিন। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার কৃষির পাতায় ছাপিয়ে দেব। তবে আমারও লোভ হচ্ছে। একটা অর্কিড স্যুভেনির হিসেবে নিয়ে যেতুম। কিন্তু অত উঁচুতে ওঠা তো অসম্ভব। বিট্টুকে কিংবা মুরারিবাবুকে পেলে ভালো হত।”

কর্নেল একটা প্রকাণ্ড গাছের দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছটার ডালে-ডালে প্রচুর রেনবো অর্কিড। আপন মনে বললেন, “এও সংখ্যাতত্ত্বের লীলা। তিনটে পাপড়ি। ঘুরে-ফিরে সেই তিনের অঙ্ক।”

বললুম, “কিন্তু তিন তিরেক্কে নয় হচ্ছে না। সাতটা রং!”

“উঁহু! ভুল করছ, ডার্লিং!” কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, “তিন সাতে একুশ। দুইয়ের পিঠে এক একুশ। এবার দুই প্লাস এক সমান তিন। অঙ্ক ডার্লিং, অঙ্ক! প্রকৃতি অঙ্কের মাস্টারমশাই।”

কর্নেল গাছটার ওপাশে গিয়ে হঠাৎ বললেন, “কী আশ্চর্য!” তারপর মুখ তুলে গাছের ডালপালা দেখতে থাকলেন। কাছে গিয়ে দেখি একজোড়া ছেঁড়াফাটা প্লিমারা পামশু। কর্নেল বললেন, “লক্ষণ ভালো নয়। জুতো খুলে রেখে মুরারিবাবু এই গাছে চড়েছিলেন। কিন্তু গাছে তো উনি নেই!” বাইনোকুলারে চারদিকে ঘুরে গাছগাছালি তল্লাশ শুরু করলেন। আমি অবাক।

অবাক এবং উদ্বিগ্ন। বিট্টুকে মুরারিবাবু ডাকতে গিয়েছিলেন নকুলবাবুর বাড়ি থেকে। তারপর এতক্ষণে এই গাছের তলায় ওঁর জুতো! অথচ ওঁর পাত্তা নেই। ভারী অদ্ভুত ঘটনা। ডাকলুম, “মুরারিবাবু, মুরারিবাবু!”

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, “চুপ!” তারপর হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। তাকে অনুসরণ করলুম। ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপ, উঁচু-নিচু গাছ, ঝোঁপঝাড়ের ভেতর নানা গড়নের পাথরের স্ল্যাব–এই তা হলে সেই রাজা শিবসিংহের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। দিনের বেলায় এখানে গাঢ় ছায়া। হাওয়ায় ভুতুড়ে গা-ছমছম করা কত রকমের বিদঘুঁটে শব্দ। একখানে একটা বৌদ্ধ স্তূপের গড়নের গোলাকার প্রকাণ্ড পাথর। গর্তের মতো একটা জায়গা। দরজার ভাঙাচোরা ফোকর। মুখে ঝোঁপ গজিয়ে আছে। এতক্ষণে কানে এল ফোঁস-ফোঁস গোঁ-গোঁ অদ্ভুত সব শব্দ। কর্নেল ফোকরের মুখের কাছে গিয়ে ঝোঁপ সরিয়ে টর্চের আলো ফেললেন ভেতরে। তারপর বললেন, “মুরারিবাবু! ওখানে কী করছেন?”

আবার ফোঁস-ফোঁস, যেন নাক ঝাড়ছেন মুরারিবাবু। কিন্তু গোঁ-গোঁ করছেন কেন? কর্নেলের পাশে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, মুরারিবাবু একটা পাথরের চাই নড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। ফিসফিসিয়ে ডাকলেন, “আসুন, আসুন, হাত লাগান!”

কর্নেলের পেছন-পেছন ঢুকে গেলুম। মুরারিবাবু হাঁপাচ্ছেন। ফেস-ফোঁস শব্দ করে বললেন, “তিন তিরেক্তে নয়। নয় নয়ে একাশি।”

কর্নেল পাথরের চাইটার ওপর টর্চের আলো ফেলে বললেন, “আপনি কি গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছেন মুরারিবাবু?”

মুরারিবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, আলো নেভান। হাত লাগান। ঝটপট। ওরা এসে পড়লেই কেলেঙ্কারি।”

বলে আবার হাত লাগিয়ে ফোঁস-ফোঁস, গোঁ-গোঁ শব্দে ঠেলতে শুরু করলেন। কর্নেলের ইশারায় সামিও অগত্যা হাত লাগালুম। উত্তেজনায় প্রায় কম্পমান অবস্থা। তিনজনের ঠেলাঠেলিতে পাথরের চাইটা ওপাশের নিচু জায়গায় গড়িয়ে পড়ল। একটা প্রকাণ্ড গর্ত দেখা গেল। মুরারিবাবু বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার মতো আওড়ালেন, “তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশি। আটের পিঠে এক একাশি। তা হলে আট আর একে ফের পাচ্ছি নয়। নয় বিভক্ত তিন। ভাগফল তিন।”

কর্নেল টর্চের আলো ফেললেন গর্তের ভেতর। ফুট পাঁচ-ছয় নীচে ঊর্ধ্বমুখী একটা মাথা–মানুষেরই মাথা এবং জ্যান্ত মাথা। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আমাদের দেখছে। মুখে টেপ সাঁটা।

ক্রমে চোখে পড়ল পিঠমোড়া করে দুটো হাত বাঁধা। পা দুটো ভোলা। কিন্তু যোগীর আসনে যেন বসে রয়েছে। মুরারিবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “ধ্যাত্তেরি, কিসের বদলে কী! একাশির বদলে এক!”

কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত, নামো। হালদারমশাইকে ওঠাও।”

হালদারমশাই? এতক্ষণে ভ্যাবাচাকা কেটে গেল। বললুম, “কী সর্বনাশ! তা নামবার দরকার কী? হালদারমশাই, উঠে পড়ুন।”

হালদারমশাই জোরে মাথা নাড়লেন। কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, “দেরি কোরো না, জয়ন্ত! নেমে গিয়ে ওঁকে ওঠাও। কী মুশকিল! বুঝতে পারছ না পিঠমোড়া করে হাত-বাঁধা অবস্থায় বসিয়ে রাখলে নিজের থেকে সোজা হয়ে ওঠা যায় না?”

তাই বটে। এক লাফে নেমে গেলুম চওড়া গর্তটাতে। হালদারমশাইকে টেনে দাঁড় করালুম। দড়ির বাঁধন খুলে দিলুম। হালদারমশাই হাত দুটো ঝাঁকুনি দিয়ে এক লাফে গর্তের কিনারা আঁকড়ে ধরে চমৎকার উঠে পড়লেন। আমিও উঠে এলুম। অনেক চেষ্টায় ওঁর মুখের টেপ ছাড়ানো গেল। সেটা পকেটস্থ করার পর কর্নেল বললেন, “পরে কথা হবে। পাথরটা গর্তের মুখে চাপা দিতে হবে। আসুন, হাত লাগান সবাই!”

এবার একটু বেশি পরিশ্রমই হল। ওজনদার পাথরটা নিচু জায়গা থেকে উঁচুতে গড়িয়ে তুলতে ঘেমে একাকার। হালদারমশাইয়ের হাতে ব্যথা। তবু হুম-হুম শব্দে সবিক্রমে হাত লাগিয়েছেন। পাথরটা আগের মতো গর্তের মুখে রেখে আমরা বেরিয়ে গেলুম।

মুরারিবাবু জুতো’ বলে ছিটকে দলছাড়া হয়ে গেলেন। সেই গাছটার তলায় গিয়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হল। তার মুখের ভঙ্গিতে বিরক্তি আর নৈরাশ্য। বললেন, “বিট্টুকে তাড়া করে এসে হারিয়ে ফেলেছিলুম। এই গাছটা বেশ উঁচু। মগডালে চড়ে ছেলেটাকে খুঁজছি, হঠাৎ দেখি ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে হতচ্ছাড়া তিনকড়িদা আসছে। হাতে ছড়ি। কোথায় কার মার খেয়ে ঠ্যাং ভেঙেছে…তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশির কারবার। অঙ্কে ভুল হলেই গেছ!… সঙ্গে দুটো লোকের কাঁধে বস্তা!”

হালদারমশাই দ্রুত বললেন, “বস্তার ভেতর আমি।”

মুরারিবাবু বাঁকা মুখে বললেন, “আমি ভাবলুম সোনার মোহরভর্তি ঘড়া। তাই নিয়ে ভেতরে ঢুকল। একটু পরে খালি বস্তা নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর গাছ থেকে নেমে দৌড়ে চলে গেলুম। গর্তটা দেখেছি। পাথরটাও দেখেছি। গর্ত আর পাথর একসঙ্গে দেখিনি। কাজেই গর্ত এক, পাথর এক, আর খালি বস্তা এক। একুনে হল তিন।”

কর্নেল চুরুট ধরাচ্ছিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আমরাও এখন তিন, মুরারিবাবু!”

মুরারিবাবু চিন্তিতমুখে বললেন, “তা হলে সোনার মোহরভর্তি ঘড়া পাওয়া উচিত। পাচ্ছি না কেন বলুন তো?”

“পাওয়ার চান্স আছে,– কর্নেল বললেন, “যদি প্লিজ অন্তত গোটা-তিন অর্কিড আমাকে পেড়ে দিতে পারেন। ওই দেখুন, ওইগুলো। দেখতে পাচ্ছেন তিনটে করে পাপড়ি? দা নম্বর থ্রি!”

মুরারিবাবু জুতো খুলে তড়াক করে হনুমানের মতো দিব্যি গুঁড়ি আঁকড়ে গাছে উঠে গেলেন। কর্নেল তাকে আঙুল দিয়ে কোনটা পাড়তে হবে দেখাতে থাকলেন।

এবার হালদারমশাইয়ের দিকে মনোযোগ দিলুম। জামা ছিঁড়ে গেছে। প্যান্ট অবশ্য অটুট আছে। কিন্তু ধুলোকাদায় নোংরা। মুখে এতক্ষণে রাগের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে। বললেন, “ব্যাটারা আবার নস্যির কৌটোটা পকেট সার্চ করে খামোখা কেড়ে নিল, এ-দুঃখ আর রাগ জীবনে ঘুচবে না। বলে, কি, নস্যি নিলেই হাঁচবে। হাঁচলে লোকে সাড়া পাবে। ভাববে বস্তার ভেতর হাঁচি কেন?…জানেন? বস্তার ফুটো দিয়ে দেখছি, দিনদুপুরে রাস্তাঘাট, বাজার, মানুষজন–সব। পুলিশ পর্যন্ত! একজন ব্যাপারি গোছের লোক জিজ্ঞেস করল, কী মাল দাদা? ব্যাটারা বলল, কুমড়ো৷ ছিরুবাবুর ছেরাদ্দর ভোজ-কাজ হবে। কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ..উঃ, জয়ন্তবাবু, হেনস্থার একশেষ।”

“আপনাকে কীভাবে ধরল ওরা?”

“আর বলবেন না। আমারই বোকামি।” হালদারমশাই শ্বাস ছাড়লেন। “এই গেছো-ভদ্রলোককে ফলো করে তো এলুম। কী খেয়াল হল, স্টেশনের রিটায়ারিং রুমের দোতলায় একটা সিঙ্গল রুম বুক করলুম। তারপর রেল-ক্যান্টিনে খাওয়াদাওয়া করে সন্ধে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লুম। মুরারিবাবুর বাড়ির খোঁজ করে শুনি, তাঁর আদতে বাড়িই নেই। তখন শিবমন্দিরে গেলুম। হ্যাঁজাক জ্বেলে বলিদান হচ্ছে। ঢাক বাজছে। তদন্ত শুরু করলুম। একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় বাবা মহাদেব ত্রিশূল মেরে মানুষের রক্ত খেয়েছেন যেন? সে বলল, চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি। ওদিকটা অন্ধকার। পা বাড়িয়ে মনে পড়ল, ওই যাঃ! রেলের রেস্টরুমে ব্যাগের ভেতর রিভলভারটা ফেলে এসেছি। তো কী আর করব! খানিকটা গেছি, লোকটা বলে উঠল–একাশি! আর সঙ্গে-সঙ্গে কারা আমাকে ধরে ফেলল। তারপরই মুখে টেপ। পিঠমোড়া করে বেঁধে এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা বাড়িতে ঢোকাল। বাড়িটাতে লোকজন নেই। অন্ধকার। একটা ঘরে ঢুকিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।”

“পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায়?”

হালদারমশাই করুণ হাসলেন। “না। বাঁধন খুলে খাটের বিছানার সঙ্গে মড়াবাঁধা করে বাঁধল। সেই যেমন কাকতাড়ুয়া’ কেসে কাটরার শ্মশানে বেঁধেছিল, ঠিক তেমনি। তারপর সারাটা রাত ওইভাবে…”

হঠাৎ কর্নেল বললেন, “চুপ!” তারপর ইশারায় গাছটার পেছনে ঝোঁপের আড়ালে লুকোতে বললেন। নিজেও এসে ঘাপটি পেতে বসলেন আমাদের সঙ্গে!

দেখলুম, ওদিকে জঙ্গলের ভেতর স্তূপটার দিকে এগিয়ে চলেছে চারজন লোক। একজন সেই তিনকড়িচন্দ্র–হাতে ছড়ি, দু’জন ষণ্ডামার্কা লোক, অপরজন সেই সন্ন্যাসীবেশী লোকটা, সে মন্দির প্রাঙ্গণে নেচে-নেচে গান গাইছিল। কিন্তু এখন তার হাতে একটা চকচকে ধারালো খাঁড়া। হালদারমশাইকে শিউরে উঠে চোখ বুজতে দেখলুম। আমিও আঁতকে উঠে চোখ বুজেছিলুম, আর দেরি করলে কী হত ভেবেই। কর্নেল মিটিমিটি হাসছিলেন।

গাছের ডগা থেকে মুরারিবাবুও ওদের দেখতে পেয়েই চুপ করে গেছেন। ডালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছেন কাঠবেড়ালির মতো।

দীর্ঘ মিনিট-পাঁচেক পরে তিনকড়িচন্দ্রকে আবার দেখা গেল। মুখে রোদ পড়েছে, সেজন্যও নয়, রাগে ও ব্যর্থতায় মুখটা দাউদাউ জ্বলছে। সন্ন্যাসীবেশী লোকটা খাঁড়ার উলটো দিক কাঁধে রেখে দাঁত কিড়মিড় করছে। ষণ্ডামার্কা লোক দুটো হাত-মুখ নেড়ে কী বলছে এতদূর থেকে শোনা যাচ্ছে না।

তারপর তারা খোলামেলা জায়গাটার দিকে এগিয়ে এল। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল, মুরারিবাবুর জুতো দুটো চোখে পড়লে ওরা কী করবে? কিন্তু কিছুটা এগিয়ে আসতেই কর্নেল অদ্ভুত গলায় শব্দ করলেন, “ব্যা-অ্যা-অ্যা!”

অমনি প্রথম খাঁড়াধারী সন্ন্যাসী লোকটা “ওরে বাবা!” বলে আর্তনাদ করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ষণ্ডামার্কা লোক দুটোও আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে দুই দিকে ঝোঁপজঙ্গল ফুঁড়ে উধাও হয়ে গেল। তিনকড়িচন্দ্র হকচকিয়ে গিয়েছিল প্রথমে। কর্নেল আবার “ব্যা-অ্যা” ডাক ডাকতেই সেও ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে পিটটান দিল।

তারপর যা ঘটল, তা আরও তাজ্জব ঘটনা। মুরারিবাবু তরতর করে গাছ থেকে নেমে এসে জুতো দুটো হাতে নিলেন এবং “এ ব্যা তো সে ব্যা নয়”, বলে দৌড়ুলেন। চোখের পলকে তিনিও উধাও হয়ে গেলেন।

কর্নেল বললেন, “হুঁ, ব্যাকরণ রহস্য।”

আমি বললুম, “পাগল, পাগল।”

হালদারমশাই বললেন, “ছাগল, ছাগল!”

কর্নেল উঠে গিয়ে মুরারিবাবুর পেড়ে দেওয়া দুটো অর্কিড কুড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, “নাঃ! ছিঁড়ে ফেলেছেন গোড়াটা। এভাবে অর্কিড বাঁচানো যায় না। যাকগে, পরে দেখা যাবে। চলুন হালদারমশাই, আপাতত এই পর্যন্ত। ফেরা যাক।”

হাইওয়েতে নেমে কর্নেল হালদারমশাইয়ের বৃত্তান্তটি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “এবেলা বরং আমার গেস্ট হোন। রেস্ট নিয়ে তারপর রেস্টরুম থেকে আপনার ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে আসবেন। জিপের ব্যবস্থা করা যাবে।”

হালদারমশাই মাথা নেড়ে মাতৃভাষায় বললেন, “না, কর্নেলস্যার! এখনই রেস্টরুমে যাইয়া ব্যাগটা লইয়া আসি। আমার খাবারটা রেডি রাইখেন বরং। উইপন্ হাতে না লইয়্যা বারাইলে কী হয়, ট্যার পাইছি।”

বলে হনহন করে আমাদের ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, “ভাগ্যিস নকুলবাবুর নোটবইটাতে ওই স্তূপটার উল্লেখ ছিল এবং গর্তটার কথাও লেখা ছিল। নইলে সত্যিই হালদারমশাই বলি হয়ে যেতেন! আসলে আমি ভেবেছিলুম কথামতো ওঁকে অ্যারেস্ট করে থানার লক-আপে সাদরে রাখা হবে, ওঁর নিরাপত্তার জন্যই। কিন্তু থানায় গিয়ে দেখলুম তা করা হয়নি। থানায় আমার যাওয়া অবধি ওঁর বেঁচে থাকার চান্স পুরোপুরি ছিল অবশ্য। কিন্তু আমি মন্দিরে গিয়ে যখন ত্রিশূল রহস্য ফাঁস করছি, তখন লক্ষ করলুম, দরজার কাছে কান পেতে ওই সন্ন্যাসী লোকটি আমার কথা শুনছে। অমনি মনে হল, এবার বন্দী হালদারমশাইয়ের বিপদ আসন্ন। ওরা ধরেই নিয়েছে বা কলকাতা পর্যন্ত মুরারিবাবুকে ফলো করে টের পেয়েছে, আমরা যাচ্ছি এবং হালদারমশাই আমাদেরই লোক।”

বললুম, “তা হলে মন্দির থেকে সোজা স্কুপে এলেন না কেন?”

কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমাকে বরাবর বলেছি ডার্লিং, তুমি সাংবাদিক। কিন্তু ভালো সাংবাদিক হতে গেলে ভালো পর্যবেক্ষক হওয়া দরকার। সন্ন্যাসী লোকটা আমাদের পেছন-পেছন এসেছিল। আমরা রিকশায় চাপলে সেও একটা রিকশায় চেপেছিল। ভাবলুম আমাদের ফলো করছে। কিন্তু ধাড়া ট্রেডিং কোম্পানির দোকানের সামনে সে রিকশা থেকে নামল! তখন বুঝলুম সে তিনকড়িবাবুকে খবর দিতে যাচ্ছে।”

বলে কর্নেল সেই নোটবইটা খুলে দেখালেন। “এই দ্যাখো, এরিয়া-ম্যাপ। এই হাইওয়ের বটতলা থেকে উঠলে স্তূপটা খুঁজে বের করা সোজা। মন্দিরের দিক থেকে এগোলে অনেকগুলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই বিশেষ স্তূপটা খুঁজে বের করা কঠিন হত। যাই হোক, মুরারিবাবু জুতো দুটো আমাকে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করেছিল।”

ব্যারেজের ব্রিজে পৌঁছে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার ব্যা-ডাক শুনে অমন আতঙ্কের কারণ কী বলুন তো?”

কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে জলাধারের পাখি দেখতে দেখতে বললেন, “তিন-তিরেকে নয়, নয় নয়ে একাশি। একাশিতেই ব্যাকরণ রহস্য বা ব্যাকরণ রহস্য যাই বলো, লুকনো আছে।”

“প্লিজ, হেঁয়ালি নয়।”

“তোমাকে তা হলে প্রাচীন ভারতীয় মিথলজি পড়তে হবে। শিবকে পশুপতি বলা হয়। মহেনজো-দরোর একটি সিলে পশুপতিদেবের মূর্তি পাওয়া গেছে। তাঁর শিং আছে। কোননা কোনো পণ্ডিতদের মতে তিনটে শিং ছিল। একটা শিং ক্ষয়ে গেছে। তিনটে শিং নাকি ত্রিশূলের প্রতীক। শৈবযুগে এ-অঞ্চলে তিন-শিংওয়ালা ছাগলরূপী পশুপতিদেবের পুজো হত। সেটা ব্রোঞ্জের চাকতিতে দেখেছ। শিবসিংহের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষে এখনও নাকি কৃষ্ণপক্ষে পশুপতিদেবের সেই অবতার দেখা দেন এবং ব্যা-ডাক ডাকেন। এই ডাক নাকি ভীষণ অলুক্ষুনে। শুনলেই অমঙ্গল। নকুলবাবু তিনশিঙে ছাগল সত্যিই দেখেছিলেন এবং আমরাও আজ স্বচক্ষে দেখেছি।”

এ পর্যন্ত শুনেই কে জানে কেন, আতঙ্কে বুক ধড়াস করে উঠল। এতক্ষণে মনে হল, ভাঙা দেউড়িতে উঠে এবং সুড়ঙ্গপথে নেমে কী সাঙ্ঘাতিক গোঁয়ার্তুমি না করেছি! অমন বিপজ্জনক ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হয়নি। তার চেয়ে ভয়ানক ব্যাপার, আমি সেই প্রাণীরূপী অবতারের অলুক্ষুনে ব্যা-ডাক শুনেছি। দিনদুপুরে বুক ঢিপঢিপ করতে থাকল।

বাংলোয় পৌঁছে আড়াইটে অবধি অপেক্ষা করেও হালদারমশাইয়ের দেখা পাওয়া গেল না। কর্নেল নকুলবাবুর নোটবইটা নিয়ে প্রতিটি পাতা আতস কাঁচ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। নিজের নোটবইতে কী সব টুকলেনও। মুখটা গম্ভীর, এবং মাঝে-মাঝে তিতিবিরক্ত ভাব ফুটে বেরোচ্ছিল। কয়েকবার হালদারমশাইয়ের না আসার কথাটা তুললুম। কানেই নিলেন না।

খাওয়ার পর সবে শুয়েছি, ভাতঘুমের বাঙালি অভ্যাস, কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন, হঠাৎ তড়াক করে উঠে বসলেন। তারপর সেই নোটবইটা খুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “জয়ন্ত, জয়ন্ত, গুপ্তধন গুপ্তধন!”

বিরক্ত হয়ে বললুম, “এখানে গুপ্তধন কোথায়?”

গোয়েন্দাপ্রবর আমাকে টেনে ওঠালেন এবং বারান্দায় নিয়ে গেলেন। বেতের চেয়ারে বসে বললেন, “বোসো ডার্লিং! সত্যিই গুপ্তধনের সঙ্কেত-লেখ আবিষ্কার করেছিলেন নকুলবাবু। মুরারিবাবু ইচ্ছেমতো আঁকিবুকি কেটে গণ্ডগোেল বাধিয়েছেন। তবে আমার সৌভাগ্য, সঙ্কেত-লিপিটা অন্য একটা পাতায় ঠিকই আছে। আতস কাঁচের সাহায্যে অবিকল কপি করেছি। এই দ্যাখো।”

কর্নেল তার নিজের নোটবইয়ের একটা পাতা খুলে দেখালেন। কিছুই বুঝতে পারলুম না। কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং একেই বলে।

বললুম, “মাথামুণ্ডু নেই! এ কী অদ্ভুত লিপি!”

কর্নেল বললেন, “এটা একটা শিলালেখ থেকে অবিকল কপি। খানিকটা অংশ ভেঙে গিয়েছিল। এই শিলালেখটা নকুলবাবুর ঘরে আছে কি না দেখা দরকার। তবে একটা ব্যাপার আশ্চর্য! ব্রোঞ্জের সিল বা মুদ্রাটির লিপির সঙ্গে এর হুবহু মিল। তুমি নিজেই দ্যাখো।”

পরীক্ষা করে দেখে বললুম, “একই লিপি বলে মনে হচ্ছে।”

কর্নেল চিন্তিতমুখে বললেন, “লিপিটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই ঠিক করতে পারছি না।..না, ব্রাহ্মীলিপি নয়। কিন্তু ব্রাহ্মীর সঙ্গে প্রচুর মিল।”

বলে আবার কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন এবং টাকে হাত। তারপর চোখ খুলে বললেন, “জয়ন্ত! এখনই শের আলি জিপ নিয়ে এসে পড়বে। …হঁ, ওই আসছে। তুমি এক কাজ করো। বাংলো ছেড়ে বিশেষ বেরিও না। আমি নকুলবাবুর বাড়ি হয়ে থানায় যাব। তারপর পুলিশের জিপে কলকাতা…”

ছটফটিয়ে বললুম, “না, না। আমিও যাব।”

কর্নেল হাসলেন। “কাল দুপুরের মধ্যে এসে পড়ব, ডার্লিং! প্রাচীন লিপিটার পাঠোদ্ধার খুব জরুরি। তুমি হালদারমশাইয়ের সান্নিধ্যে আশা করি ভালোই কাটাবে। ভেবো না, ওঁর কাছে রিভলভার আছে।”

“কিন্তু ওঁকে পাচ্ছি কোথায়?”

“পাবে।” কর্নেল আশ্বস্ত করলেন। ধারালো খাঁড়া দেখার পর হালদারমশাই আর বেপরোয়া হবেন না। আমার বিশ্বাস!..আরে! শের আলির জিপে মুরারিবাবু এসেছেন দেখছি। ভালোই হল। ততক্ষণ ওঁর সান্নিধ্যে কাটাও।”

কর্নেল ঘরে ঢুকলেন পোশাক বদলাতে। গেট খুলে দিল মাধবলাল। জিপ এসে বারান্দার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। মুরারিবাবু এক লাফে নেমে সহাস্যে বললেন, “তখন একটু গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল।–ইয়ে আপনার নামটা কী যেন…”

“জয়ন্ত চৌধুরী।”

মুরারিবাবু খ্যাক করলেন। “ঘরপোড়া গোরু। সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরায়, বুঝলেন না? কর্নেলসায়েব কই? ঘুমোচ্ছেন বুঝি? থাক, ঘুম ভাঙাব না। আপনার সঙ্গেই গল্পগুজব করা যাক। তিন তিরেক্কে নয়…দাঁড়ান। আপনার নামের নম্বর-ইউনিট বের করি। বগীয় জ…” আঙুল গুনতে শুরু করলেন উনি। হিসেব শেষ হলে বললেন, “সপ্ত ব্যঞ্জন। সাত। সাত তিনে একুশ। দুইয়ের পিঠে এক। তা হলে দুই যুক্ত এক সমান তিন। সেই তিন! যাবেন কোথায় আপনি? আমার নামও দেখুন। মুরারিমোহন ধাড়া। অষ্ট ব্যঞ্জন। আটকে তিন দিয়ে গুণ করুন। চব্বিশ হল। দুইয়ের পিঠে চার চব্বিশ। তা হলে দুই যুক্ত চার, সমান ছয়। ছয়কে আধখানা করুন। সেই তিন। হল তো?”

বলে এবার দু’বার খ্যাক করলেন। বড় বিপদে পড়া গেল দেখছি। এঁকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে কর্নেল কেটে পড়লে আমার অবস্থা হালদারমশাইয়ের চেয়ে করুণ হবে।

কর্নেল বেরিয়ে এলেন কাঁধে কিটব্যাগ, গলায় বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলিয়ে। মাথায় ছাইরঙা টুপি। শের আলি স্যালুট দিল। মুরারিবাবুও উঠে কতকটা একই ভঙ্গিতে কপালে হাত ঠেকালেন। উনি কিছু বলার আগেই কর্নেল বললেন, “জয়ন্তর সঙ্গে গল্প করুন মুরারিবাবু! আমি আসছি।”

তারপর সোজা গিয়ে জিপে উঠলেন এবং শের আলি তাকে নিয়ে গর করে বেরিয়ে গেল। তুম্বো মুখে বসে রইলুম। কোনো মানে হয়?

মুরারিবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “কী কাণ্ড! কিছু বোঝা গেল তো?” বললুম, “বুঝতে হলে ফলো করুন মুরারিবাবু!”

মুরারিবাবু বললেন, “মাথা খারাপ? শের আলির জিপ না, রকেট। ওই দেখুন, কোথায় চলে গেছে। যাঃ! হারিয়ে গেল। শের আলি–চার ব্যঞ্জন। তিন গুণ করুন। বারো হল। বারোর অর্ধেক ছয়। ছয়ের অর্ধেক তিন। সেই তিন! যাবেন কোথায় মশাই? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অণু-পরমাণু চলছে অঙ্কে। তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশি। শিবের জীব বলেছিল, একাশি।”

সমানে বকবক করতে থাকলেন মুরারিবাবু। মাধবলাল দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। পাগলাবাবুকে দেখেই তার হাসি পায় মনে হল।

এই পাগলাবাবুর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করা যাক।”বসুন, আসছি,– বলে উঠে ঘরে গেলুম। তারপর উত্তরের জানালায় গিয়ে বিদঘুঁটে স্বরে ডাকলুম, “ব্যা-অ্যা-অ্যা!”

অমনি মুরারিবাবুর খ্যাক খ্যাক কানে এল। অর্থাৎ ভয় পাননি, হাসছেন। ঘরে ঢুকে সহাস্যে বললেন, “বারেবারে আর ভুল হবে না। তবে খুব আনন্দ হল জয়ন্তবাবু! আপনি রসিক লোক। আমার খুব পছন্দ।” তারপর বসে বকবক শুরু করলেন।

কিছুক্ষণ পরে বাইরে হালদারমশাইয়ের ডাক শোনা গেল, “জয়ন্তবাবু, আইয়া পড়ছি।”

.

ছয়

বেরিয়ে গিয়ে দেখি, গেটের ওধারে একটা এক্কা ঘোড়াগাড়ি থেকে লাফ দিয়ে সবে নেমেছেন হালদারমশাই। মাধবলাল ঘোড়ার গাড়িকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। গাড়িটা চলে গেল। হালদারমশাই বললেন, “কর্নেলস্যারের লগে রাস্তায় দ্যাখা হইল।”

মুরারিবাবু হালদারমশাইকে দেখে অভ্যাসমতো খ্যাক করলেন। বললেন, “তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে…আর কর্নেলসায়েব গাছে চড়ালেন…মশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। আপনাকে কেন তিনকড়িদা গর্তে ঢুকিয়ে বলি দিতে চাইছিল বলুন তো?”

বারান্দায় বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটু চটে গিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে কলকাতায় কর্নেলস্যারের ঘরে দেখেছেন। এখন বলছেন, পরিচয় হয়নি। আপনার জন্যই আমার আজ…”

ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললুম, “সন্ধিবিচ্ছেদ হয়ে যেত ব্যাকরণমতে।”

হালদারমশাই অনিচ্ছায় হাসলেন। “হ্যাঁ, ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হতে বসেছিল।”

জিভ চুকচুক করে দুঃখ দেখিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “আহা রে! তিনকড়িদাটা মহা ধড়িবাজ। তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশির খেলা আর কি!”

“একাশি!” গোয়েন্দাপ্রবর নড়ে বসলেন। বেতের চেয়ার মচমচ করে উঠল। “আমাকে যারা বন্দী করে বলি দিতে যাচ্ছিল, তারাও একাশি বলেছিল। ব্যাপারটা কী?” বলে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন মুরারিবাবুর দিকে।

মুরারিবাবু কিছু বলার আগে তাঁকে ঝটপট হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিলুম। শোনার পর মুরারিবাবু খুব খুশি হয়ে বললেন, “তা হলে আর চিন্তা নেই। ডিটেকটিভ ডিটেকটিভে ছয়লাপ। যাবে কোথায়? নকুলদা, খুনের কিনারা হবে। সোনার মোহরভর্তি ঘড়াও বেরোবে। তিনপুরুষে তিন-তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশির মামলা। সবরকম কোঅপারেশন পাবেন স্যার!”

মাধবলালকে চা করতে বললুম। হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “জয়ন্তবাবুর লগে দুইখান কথা আছে।” তারপর আমার হাত ধরে ঘরে ঢুকে ফিসফিস করলেন, “সঙ্গে রিভলভার আছে। আর ভয় নেই। কর্নেলস্যার নিজের লাইনে চলুন, আমরা বলি নিজের লাইনে। কী কন?”

বললুম, “কর্নেল কলকাতা গেলেন। কাল দুপুরের মধ্যে ফিরবেন।”

“অ্যাঁ!” বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন হালদারমশাই। চোখের পাপড়ি কাঁপতে থাকল।

“হ্যাঁ। আমাকে বলে গেছেন কোথাও যেন না বেরোই।”

“এটা কি একটা কথা হইল? আপনে পোলাপান নাকি? ছাড়েন তো!” কিটব্যাগ টেবিলে রেখে হালদারমশাই ভেতর থেকে রিভলভার আর গুলি বের করলেন। ছ’টা গুলি খোপে ঢুকিয়ে অস্ত্রটা ঢোলা প্যান্টের পকেটে রাখলেন। তারপর নস্যির কৌটো বের করে বললেন, “এই নস্যির জন্য লাঞ্চের নেমন্তন্ন খেতে আসতে পারিনি। যাকগে, এখন তো কর্নেলস্যারের খাটেই তা হলে আমার শোয়ার জায়গা হবে।”

মুরাবিবাবু আপনমনে তিন-তিরেকে করতে করতে নীচের লনে ফুল দেখে বেড়াচ্ছেন আর সম্ভবত ফুলেদের ভূত-ভবিষ্যৎ গণনা করছেন। মাধবলাল নজর রেখেছিল। কিচেন থেকে হাঁক ছাড়ল, “এ বাবুমোশা! ফুলউলসে হাত মাতৃ লাগাইয়ে।”

মুরারিবাবু চটে গিয়ে বললেন, “ক্যা ফুল দেখাতা হ্যায় তুম?…হুঁ! মা-ধ-ব-লা-ল! পঞ্চব্যঞ্জন হ্যায়। স্রিফ পাঁ-চ। সমঝতা? তিনোসে নেহি আতা! তিন ঔর দো–ব্যস! তিন কাটা যায়েগা, দো রহেগা!” বলে বুড়ো আঙুল নেড়ে দিলেন। “অঙ্কের বাইরে পড়ে গেছ, সমঝা?”

হাসি চেপে বললুম, “তা হলে আমাদের ডিটেকটিভদ্রলোকের নামের হিসেবটা করে দিন মুরারিবাবু। সংখ্যাতত্ত্ব অনুসারে…।

বাধা দিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “পুরো নাম?”

হালদারমশাই খুব আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, “নিউমারোলজি? আপনি জানেন? তাই বলুন! আমার নাম কৃতান্তকুমার হালদার।”

চা আসতে-আসতে হিসেব কষে ফেললেন মুরারিবাবু। “একাদশ ব্যঞ্জন। …হুঁ, একটু গণ্ডগুলে নম্বর। সেইজন্যই খাঁড়ার ঘা প্রায় এসে পড়েছিল! …আরে তাই তো! এগারোকে তিনগুণ করলে তে-তিরিশ। দু-দুটো তিন পাশাপাশি। আপনাকে মারে কে? সেই তো! আপনাকে পাঁঠাবাঁধা করে বেঁধে গর্তে ফেলে খাঁড়ায় শান দিতে গিয়ে দেরি হতই। হয়েছে।”

বলে ফুঁ দিয়ে সশব্দে চা টানলেন। মাধবলালকে ডেকে বললুম, “ডরো মাত্ মাধবলাল! হাম হিসাব কার দেতা। তিন পাঁচ পরোহ। এক পাঁচ। এক ঔর পাঁচ ছে। ইসমে দো তিন হ্যায়!”

মুরারিবাবু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চাপা খ্যাক করলেন। মাধবলাল চলে গেলে ফিসফিস করে বললেন, “ভয় দেখাচ্ছিলুম। বুঝলেন না? তিন নেই কোথায়? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তিনের খেলা। তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশি।”

বুঝলুম চা পেয়ে খুশি হয়েছেন খুব। রিয়ে-তারিয়ে চা শেষ করে ফের বললেন, “চলুন ডিটেকটিভমশাই!”

হালদারমশাই উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও টেনে ওঠালেন। সাহস দিয়ে বললেন, “সঙ্গে উইন্ আছে। চলে আসুন! কর্নেলসারেরে দেখাইয়া দিমু…এমন চান্স আর পাইবেন না। কাইল আইয়া দেখবেন…” বলে ভুরু নাচিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, কী ঘটবে।

মুরারিবাবুরও প্রচণ্ড তাড়া। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়েই বেরোলাম বাংলো থেকে। হালদারমশাই মন্দ বলেননি। কর্নেল ফেরার আগেই রহস্যভেদ এবং খুনে-লোকগুলোকে পাকড়াও করিয়ে দিয়ে তাক লাগানোর চান্স ছাড়া ঠিক নয়।…

এবার মুরারিবাবু আমাদের গাইড। হাইওয়ের ওধারে উঁচু জঙ্গুলে ঢিবিতে উঠে হালদারমশাই বললেন, “আগে সেই দেউড়ি!”

মুরারিবাবুর পেছন-পেছন ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাঁটছিলুম। এখনই জায়গাটা আবছা আঁধারে ভরে গেছে। এবেলা বাতাস বন্ধ। গুমোট গরম। নিঝুম বন আর ধ্বংসাবশেষে ঝিঁঝিপোকা আর পাখির ডাককে মনে হচ্ছে স্তব্ধতারই একটা আলাদা স্বাদ। নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠছি। কিছুক্ষণ পরে খোলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। এবার সামনে সেই ভাঙা তোরণ দেখতে পেলুম।

হালদারমশাই বললেন, “কোথায় বডি পড়ে ছিল, দেখিয়ে দিন।”

মুরারিবাবু দেউড়ির ওধারে গিয়ে পাঁচিলের নীচে একটা জায়গা দেখালেন। “এইখানে উপুড় হয়ে পড়েছিল নকুলদা।” একটু তফাতে গিয়ে ওপরে আঙুল তুলে বললেন, “আর ওইখানে তিন-শিঙে ছাগলটা..”।

কথা শেষ না হতেই দেউড়ির ওপরে তিন-শিঙে সেই কালো ছাগলের মুণ্ডু ঝোঁপ ফুড়ে বেরোল এবং অদ্ভুত গলায় বলে উঠল, “এ-কাশি!”

সঙ্গে-সঙ্গে মুরারিবাবু তখনকার মতোই দিশেহারা হয়ে মন্দিরের দিকে ঘুরেছিলেন। কিন্তু তখনই হালদারমশাই “তবে রে” বলে রিভলভার বের করে ঢিসুম আওয়াজে গুলি ছুড়লেন। একঝাক টিয়া চাঁচাতে-চাচাতে পালিয়ে গেল। ছাগলের মুণ্ডুটা ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

হালদারমশাই রিভলভার তাক করে আবার কিম্ভুত প্রাণীটিকে খুঁজছেন, সেই সময় হইহই করে একদঙ্গল লোক আর কল্যাণবাবু দু’জন বন্দুকধারী সেপাইসহ এসে পড়লেন। মুরারিবাবুও তাদের সঙ্গে আছেন। কল্যাণবাবু আমার দিকে না-তাকিয়ে সোজা হালদারমশাইকে চার্জ করলেন, “আর য়ু মিঃ কে. কে. হালদার, দা প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”

হালদারমশাই সগৌরবে এবং সহাস্যে বললেন, “ইয়েস, আই অ্যাম!”

“ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। কাম উইথ মি।”

“হোয়াই?” বলে হালদারমশাই পকেট থেকে তাঁর আইডেনটিটি কার্ড বের করলেন। কিন্তু কল্যাণবাবুর ইশারায় সাদা পোশাকের পুলিশ এবং বন্দুকধারী সেপাইরা তাকে ঘিরে ধরল। কল্যাণবাবু বললেন, “গিভ মি ইওর আর্মস, প্লিজ!”

বোবা হয়ে গেলেন হালদারমশাই। রিভলভারটি কল্যাণবাবুর হাতে সঁপে দিয়ে ফোঁস করে একটি শ্বাস ছাড়লেন।

আমি বললুম, “এ কী হচ্ছে কল্যাণবাবু? কর্নেল তো আর…”

আমাকে থামিয়ে রূপগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার গম্ভীর মুখে বললেন, “আই অ্যাম অন ডিউটি মিঃ চৌধুরী! প্লিজ ডোন্ট ইন্টারভেন।”

হালদারমশাই ব্যহবেষ্টিত হয়ে গোমড়ামুখে চলে গেলেন। ভিড়টা সরে গেলে মুরারিবাবু ফিসফিস করে বললেন, “কিছু বুঝতে পারলুম না! তিন-তিরেক্কে হয়ে গেল কেন বলুন তো? আমি তো শুধু তিন-শিঙে…” বলে বুকে ও কপালে হাত ঠেকালেন। “শিব! শিব! বাবা গো!” বিড়বিড় করে এই মন্ত্র জপতে জপতে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন।

জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“আমার ডেরায়।” ভয়ার্ত মুখে মুরারিবাবু বললেন। “আসলে কী জানেন? ওই ডিটেকটিভদ্রলোকের পাশাপাশি দুটো তিন বড্ড গণ্ডগুলে নম্বর। শেষ পর্যন্ত বেঁচে যাবেন। তবে বেশ ভোগাবে। চলুন, বউদির সঙ্গে গল্প করতে-করতে তেলেভাজা খাব। আর তো কিছু করার নেই।”

শটকার্টে নিয়ে যাচ্ছিলেন মুরারিবাবু। এবার একটা করে একলা পোডোভাঙা বাড়ি আর ঝোঁপঝাড়, কিছু উঁচু গাছ। হানাবাড়ি মনে হচ্ছিল কোনো-কোনো বাড়িকে। হঠাৎ কোত্থেকে ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক ভেসে এল। মুরারিবাবু পালাতে যাচ্ছেন, ওঁকে পেছন থেকে ধরে ফেললুম। মুরারিবাবু হাঁসফাস করে বললেন, “পা চালিয়ে চলুন। এসব বাড়ি হানাবাড়ি। লোকজন নেই।”

বাঁ দিকে তাকাতেই একটা বাড়ির পেছনে সেই ছেলেটি, বিট্টুকে দেখতে পেলুম। বুঝলুম ব্যা-ডাক কে ডেকেছে। কিন্তু সাহস আছে তো বিট্টুর! এই হানাবাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একা।

বললুম, “মুরারিবাবু, ওই দেখুন ব্যাকরণ রহস্য!”

মুরারিবাবু দেখামাত্র চাঁচালেন।”পাজি, বাঁদর, ভূত, সবসময় খালি…এবার এসো ‘জ্যাঠাকমশাই, দিন না ঘুড়িটা পেঁড়ে’ বলে কাঁদতে।”

বিট্টু জিভ দেখিয়ে উধাও হয়ে গেল।

মুরারিবাবু শাসালেন। “বিষ্ণুদাকে বলে তিন-তিরেক্কে করে দিচ্ছি, থামো!”…

বিরুর বউদি মুরারিবাবুর সাড়া পেয়ে সদর দরজা খুললেন। আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বললেন, “এসো জয়ন্ত ঠাকুরপো! কর্নেলসায়েব এসেছিলেন সওয়া চারটে নাগাদ। বলে গেলেন, কলকাতা থেকে কাল ফিরবেন। বিরুকে পাঠিয়ে তোমার খোঁজ নিতে বললেন! এসো, ভেতরে এসো।”

মুরারিবাবু বললেন, “আমার গেস্ট। আমার ঘরে বসাই, বউদি! গরম-গরম তেলেভাজা খাওয়াব বলে নিয়ে এলুম।”

রমলাবউদি চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমার ঘরের যা ছিরি করে রেখেছ! থাক্। এ-ঘরে এসো জয়ন্ত!”

কোনো-কোনো মানুষ থাকেন, মনে হয় কতদিনের চেনা। এক মুহূর্তে আপনার জন হয়ে ওঠেন। আসলে এটা পরকে আপন করে নেওয়ার স্বভাব। রমলাবউদি সেইরকম মানুষ। নকুলবাবুর জাদুঘরে আমাদের বসিয়ে তেলেভাজা করতে গেলেন। বিরুর নাইট ডিউটি। একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। মুরারিবাবু খ্যাক করে হেসে বললেন, “ডিটেকটিভবাবুকে অ্যারেস্ট করল কেন বলুন তো? গুলি ছোঁড়ার জন্য তিন-তিরেক্তে হয়ে গেলেন? তা যাই বলুন, গুলি ছোঁড়াটা উচিত কাজ হয়নি। বাবার সাক্ষাৎ-অবতার। আমার বড় ভয় করছে, জানেন?”

কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ভয় আমারও করছে। সেচ-বাংলোয় ফেরা এবং একা রাত কাটানো–তিনকড়িচন্দ্রের ষণ্ডা লোকদুটো নয়, বারবার সেই খঙ্গধারী সন্ন্যাসী লোকটার চেহারাই মনে ভেসে উঠছিল। শেষে ভাবলুম, থানায় গিয়ে ওসি ভদ্রলোককে বলে পুলিশ-জিপে পৌঁছে দিতে বলব। কল্যাণবাবু খচে আছেন, তার কারণ বোঝা যাচ্ছে। জিপের টায়ার ফঁসানোতে আগুন হয়ে ঘুরছিলেন। মন্দির থেকে নীচের রাস্তা পর্যন্ত নিশ্চয় কাঁদ পাতা ছিল। মাঝখান থেকে রাগটা গিয়ে পড়েছে হালদারমশাইয়ের ওপর।

মুরারিবাবু সমানে তিন-তিরেক্কে কষে চলেছেন। ঘরের ভেতর আঁধার হয়ে আসছে। রমলাবউদি বারান্দার বাতি জ্বালিয়ে একথালা তেলেভাজা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, “এই তিন-তিরেক্কেওয়ালা! আলো জ্বালতে পারোনি?”

সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন নিজেই। মুরারিবাবু নড়ে বসে বললেন, “একাশির ধাক্কা! মাথা ভেভো করছে।” তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তেলেভাজার ওপর। সংখ্যাতত্ত্ববিদ–কাজেই ঝটপট গুনে ফেললেন। “উরেব্বাস! তিন-তিরেক্কে নয়!”

রমলাবউদি ভেংচি কেটে বললেন, “মুখেরটা গুনেছ? তিন-তিরেক্কে নয় তো করছ। খাও ভাই! চা নিয়ে আসছি। তারপর গল্প করব।”

গরম তেলেভাজা মন্দ নয়। কিন্তু মনে দুর্ভাবনা। ওসি ভদ্রলোক যদি বাইরে গিয়ে থাকেন দৈবাৎ? নাঃ, ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। শিগগির কেটে পড়াই ভালো। মাধবলালকে সাহসী লোক বলেই মনে হয়েছে। বরং পাশের এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরটা খুলে দিতে বলব। জানালা বন্ধ করেও আরামে ঘুমনো যাবে।…

রমলাবউদি চা নিয়ে এলেন। বললেন, “কর্নেলসায়েবকে চিঠির ব্যাপারটা বলেছি। তোমাকে বলি। বিট্টু চিঠি ডাকে দিতে গিয়েছিল। পোস্টাফিসে একটা লোক ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে নেয়। বলে, আমি ফেলে দিচ্ছি! পপাস্টবক্সটা দেওয়ালে ফোকরের মতো তৈরি। একটু উঁচুতে মুখটা। চিঠি ফেললে ঘরের ভেতর গিয়ে জমবে। তো বিট্টু চিঠিটা ওর হাতে দিয়েই চলে আসে। অত বুদ্ধি কি ওর আছে?”

বললুম, “বোঝা যাচ্ছে একটা দল এর পেছনে আছে।”

“তিনকড়িবাবুর কীর্তি শুনলুম কর্নেলসায়েবের কাছে। পইপই করে বলে গেছেন, তাকে যেন পাত্তা না দিই। যদি এসে গণ্ডগোল করে পুলিশে খবর দিতেও বলে গেছেন।”

বলে রমলাবউদি জানলার দিকে ঝুঁকে গেলেন। “কে রে? কে ওখানে? দাঁড়া তো, দেখাচ্ছি মজা!”

রমলাবউদি ছুটে বেরিয়ে গেলেন। জানলায় উঁকি মেরে কিছু দেখতে পেলুম না। মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্তে খেলা! ছেড়ে দিন! বউদির দিনদুপুরে ভূত দেখা অভ্যেস আছে। নামেই তিন-ব্যঞ্জন কিনা! র+ম+ল।”

ভদ্রমহিলার সাহস আছে! জানলা দিয়ে দেখলুম, টর্চ আর একটা মস্ত কাটারি হাতে পেছনের পোড়ো জমিটায় চক্কর দিচ্ছেন। আমি এভাবে বসে থাকা উচিত মনে করলুম না। বেরিয়ে গিয়ে উঠোনে নেমেছি উনি ফিরে এলেন। বললেন, “কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল জানলার ওধারে। ঠাকুরপোকে বলব, ছাদের চারদিকে বাল্ব লাগাতে।”

একটু ইতস্তত করে বললুম, “আমাকে বাংলোয় ফিরতে হবে, বউদি! ওদিকে যেতে নাকি সন্ধ্যার পর রিকশা বা ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায় না।”

রমলাবউদি বললেন, “হ্যাঁ, চড়াই রাস্তা। তার ওপর বিরুর দাদা মার্ডার হওয়ার পর ওদিকের রাস্তায় কেউ পারতপক্ষে যেতে চায় না। এ তো ভাই তোমাদের কলকাতা শহর নয়। নামেই টাউন। মানুষজনের মনে রাজ্যের কুসংস্কার।”

একটু হেসে বললুম, “কুসংস্কার কলকাতাতেও কম নেই। তো, চনি বউদি!”

“মুরারিঠাকুরপোর সবসময় পাগলামি করতে লজ্জা হয় না?” রমলাবউদি তেড়ে গেলেন। “তখন তো আমার গেস্ট বলে খুব জাঁক দেখাচ্ছিলে! গেস্টকে পৌঁছে দিতে হবে না?”

তাড়া খেয়ে মুরারিবাবু বেরোলেন। মুখে অনিচ্ছার ভাব। চুপচাপ হাঁটতে থাকলেন। আমরা এবার বাজারের দিকে চলেছি। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “আমি, কিন্তু, বুঝলেন বাংলো অবধি যাচ্ছি না। কেন জানেন? বউদিকে গার্ড দিতে হবে। জানলার পেছনের লোকটা…একাশি! তিন-তিরেক্কে করে দিলেই হল। মেয়েরা একা না বোকা। বুঝলেন না?”

“বুঝলুম।” হাসবার চেষ্টা করে বললুম, “অন্তত একটা এক্কাগাড়ি কোথায় পাব, দেখিয়ে দিন বরং।”

“পেয়ে যাবেন। ওই তো রাস্তা। কত লোক, কত গাড়িঘোড়া। ভয়টা কীসের?” বলে মুরারিবাবু বাঁই করে ঘুরে হনহন করে গলিপথে নিপাত্তা হয়ে গেলেন। সম্ভবত তিন-তিরেক্কে নয়–এই নয়টা ‘না’-অর্থব্যঞ্জক। অর্থাৎ স্রেফ না হয়ে যাওয়া। নঞর্থক হওয়া মানেই সন্ধিবিচ্ছেদ। ধড় এবং মুণ্ডু পৃথক হয়ে যাওয়া। সোজা কথায় খতম। তখন শিবের চেলা হয়ে ঘোরো। প্রেতাত্মা বা ভূত হয়ে যাও। সর্বনাশ!

গলিটা যেখানে বড় রাস্তায় পৌঁছেছে, সেখানে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একাগাড়িই খুঁজছিলুম। কারণ সাইকেল-রিকশা চড়াই ঠেলে ওদিকে যাবে না শুনেছি। ইতিমধ্যে রূপগঞ্জের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কিত মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। আসলে এই জনপদটা কোনো যুগে নদীর তীরে একটা পাহাড়ের মাথা সমতল করে গড়ে উঠেছিল। তাই পশ্চিম ঘরে যে হাইওয়েটা নদীর সমান্তরালে বিহারের দিকে দক্ষিণে এগিয়ে গেছে, সেটা টানা চড়াই। ব্যারেজের মোড়ে পৌঁছলে আর চড়াই ভাঙতে তত হবে না। ব্রিজের ওপরটা স্বভাবত সমতন। তারপর সেচ-বাংলো পর্যন্ত যেটুকু চড়াই, সেটুকু সামান্যই।

“সার ইখানে উড়িয়ে আছে বটেক!”

শুনেই তাকিয়ে দেখি, সেই সাইকেল-রিকশাওয়ালা। রিকশার ব্রেক কষে সদ্য সামনে থেমেছে। মুখে মধুর হাসি। বললুম, “এই যে ভাই, তুমি শের আলিকে চেনো?”

শের আলির কথা ওকে দেখামাত্র মনে পড়েছিল। ও এই রোগা পাকাটি শরীর অমন চড়াই। রাস্তায় রিকশা তুলতে পারবে না, জানা কথা। কাজেই যদি শের আলির কাছে পৌঁছে দেয়, একটা জিপের আশা আছে। রিকশাওয়ালা বলল, “শের আলি? হ্যাঁ সার, চিনি বটেক।”

“ওর বাড়ি নিয়ে চলো তো।” বলে রিকশায় উঠলুম। রিকশাওয়ালা বলল, “সে তো সার দূর বটেক। রেলের লাইন পেরিয়ে পাঁচ-ছ’ মাইল। ইরিগেশং কুয়াটার বটেক…”

“অত দুরে?”

“হাঁ সার, উদিকে ড্যাম আছে বটেক। তার উত্তুর সাইডে বটেক।”

আরও ভাবনায় পড়া গেল দেখছি। অতদূরে গিয়ে যদি শুনি শের আলি নেই? তার স্যারের মেয়ের অসুখ। যদি সেই ভেবে কর্নেল তাকে বলে থাকেন, জিপের দরকার নেই, এবং কলকাতা যাওয়ার মুখে সেটা বলাই স্বাভাবিক, তা হলে তার স্যার অর্থাৎ ডি. ই. কামালসায়েব কোথাকার মিশনারি হাসপাতালে অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যাওয়ার জন্য এবার নিজের জিপই ব্যবহার করবেন। এই অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। ইরিগেশন কোয়ার্টার থেকে ফিরতে মোট দশ-বারো মাইল–তার মানে, আরও রাত হয়ে যাওয়া।

চুপ করে আছি দেখে রিকশাওয়ালা বলল, “ভাড়া লিয়ে ভাবছেন বটেক!” সে খুব হাসতে লাগল। “বুঢ়াসাহেবের লোক বটেক আপনি। ক্যানে উ ভাবনা গো? চলেন, লিয়ে যাই। যা দিবেন, লিব বটেক।”

খুলে বলাই উচিত মনে করলুম।”দ্যাখো ভাই, যাব আমি ইরিগেশন বাংলোয়। চেনো তো?”

“চিনি বটেক। ড্যামের দক্ষিণে।” রিকশাওয়ালা উৎসাহ দেখিয়ে বলল। “তা হলে শের আলির কথা ক্যানে?”

“তুমি যেতে পারবে ইরিগেশন বাংলোয়?” চরম কথাটি বললুম এবার।

“হাঁ-আ। ঠেইলতে…ঠেইলতে…ঠেইলতে পচে দিব বটেক।” রিকশাওয়ালা বলল। “ই মানিককে দেখে সার ভাবছেন কী বটেক? রেকশায় জম্মো, রেকশায় মরণ হবেক–ই মালিক সিটাই জানে বটেক। চহেন, চল্‌হেন!” সে প্যাডেলে পায়ের চাপ দিল। চ-এর সঙ্গে একটি হ-বর্ণ উচ্চারণ তার জোরটা জানিয়ে দিল।

কিছুটা এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিতেই সুনসান নিরিবিলি এলাকা। আলো নেই। তারপর হাইওয়ে এবং ক্রমশ চড়াই। ডান দিকে খাপচা-খাপচা ঝুপসি জঙ্গল। তার ওদিকে অনেকটা দূরে ড্যাম। চড়াইয়ের মাথার দিকটায় যেখানে ব্যারেজ শুরু, সেখানেই আলো জুগজুগ করছে।

মানিক রিকশাওয়ালাকে অবশেষে নামতেই হল। এতক্ষণে বাতাস উঠেছে এবং আমরা এগোচ্ছি দক্ষিণে, ফলে সামনে বাতাসের ধাক্কা। বললুম, “ওহে মানিক, বরং আমি হেঁটে যাই।”

সে খুব অবাক হয়ে গেল। “কী ভাবছেন বটেক? পারবে না মানিক?”

“না, না।” একটু হেসে বললুম, “ব্রিজে গিয়ে চাপব। আসলে কী জানো? একলা এই রাস্তায় যেতে একটু কেমন-কেমন লাগে। একজন সঙ্গী চেয়েছিলুম। তুমি আমার সঙ্গী বটেক।”

এতে খুশি হল না, রিকশাচালকের আঁতে ঘা লাগল। একজন খাঁটি পরিশ্রমী মানুষ সে। বলল, “বুলেছি পঁহুছে দিবেক, তো দিবেক বটেক।”

গোঁ ধরে সে হ্যাঁন্ডেল ধরে টেনে নিয়ে চলল। বিচ্ছিরিরকমের চড়াই। বাঁ দিকে প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, ডান দিকে জঙ্গল। জঙ্গলের আড়ালে কিছুটা দূরে মাঝে-মাঝে ড্যামের

জলে তারার আলোর ঝিকিমিকি, ঝিকিমিকি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ঢেউ উঠেছে জলে।

হঠাৎ দপ করে রিকশার সামনেকার বাতি নিভে গেল। মানিক হাঁসাস করে বলল, “নিভাক! ই মানিকের সার, আলো-আঁধার এক বটেক।”

কিন্তু এটাই আশ্চর্য, এটা হাইওয়ে। অথচ কোনো মোটরগাড়ি এখনও দেখলুম না। ভাবলুম, এটা নেহাত একটা চান্সের ব্যাপার। ঠিক এ সময়টাতে কোনো গাড়ি এখানে এসে পৌঁছচ্ছে না, কিন্তু যে-কোনো সময় দেখা যাবে কোনো ট্রাক বা বাস। হঠাৎ মানিক বলল, “কে বটেক?”

অন্ধকারে দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়েছে ততক্ষণে। রিকশার সামনে কয়েকটা কালো মূর্তি। একজন হুঙ্কার দিয়ে বলল, “একাশি।”

অমনি রিকশা থেকে লাফিয়ে নীচে পড়লুম। পালিয়ে যেতুম, না একহাত লড়তুম, জানি না। রাস্তায় নামতেই আমাকে তারা জাপটে ধরল। ধরেই মুখে টেপ সেঁটে দিল। মানিক চেঁচিয়ে উঠেছিল। তারপরই সে অদ্ভুত নাকিস্বরে গোঁ-গোঁ করতে লাগল। বুঝলুম, তার মুখেও টেপ পড়ে গেছে।

হালদারমশাইয়ের অবস্থাই হল। লোকগুলোর গায়ে সাঙ্ঘাতিক জোর। লড়তে গেলেই আরও বিপদ বাধবে। কী আর করা যাবে? পিঠমোড়া করে বেঁধে কাঁধে তুলল যখন, তখন ঠ্যাং ছুড়লুম না। সন্ধিবিচ্ছেদের জন্য তৈরি হয়ে গেছি। এরা হালদারমশাই বেহাত হয়ে ঠকেছে, অতএব এবার আর দেরি করবে না। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে সেই সন্ন্যাসী লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলুম,

যার হাতে খাঁড়া ছিল। কিন্তু কী যাচ্ছেতাই অন্ধকার। উঁচু ঢিবির ওপর জঙ্গলের ভেতর অন্ধকার একেবারে গাঢ় কালি। অদ্ভুতভাবে মনে একটা কথা ভেসে এল। মুণ্ডু আর ধড় আলাদা হলে রক্ত প্রচুর বেরোবে। কিন্তু রক্তগুলোও লাল দেখাবে না। কালোই দেখাবে।

একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে ওরা থামল। ভারিক্কি গলায় একজন বলল, “কথা আদায় কর! সত্যি কথা না বেরোলে বলিদান।”

অন্য একজন বলল, “কাশী তো হাজতে। বলিদানের খাঁড়াটাও পুলিশের হাতে গচ্চা গেল। বলি, দেবেটা কে?”

“কাশীটা একটা গাধা!” গলাটা সেই তিনকড়িচন্দ্রেরই মনে হল। “যাকগে, টেপ খুলে কথা আদায় কর। বুড়োঘুঘুটার সঙ্গী যখন, তখন সব জানে। কতদূর এগিয়েছে, ঠিকঠাক জানা দরকার।”

একজন আমার মুখের টেপ এক ঝটকায় খুলে দিল। চামড়া, গোঁফসুষ্ঠু উপড়ে গেল যেন। যন্ত্রণায় “উঁহুহু” করে উঠলাম। তারপর পিঠে ছুঁচলো কিছু ঠেকল। একজন বলল, “টু করলেই উলটো দিক থেকে হার্ট ছেদা হয়ে যাবে। সাবধান!”

একজন আমার কাধ ধরে ঠেলে বসিয়ে দিল ঘাসের ওপর। এতক্ষণে কানে আবছা ভেসে এল ঢাকের শব্দ। তা হলে মন্দিরটার কাছাকাছি কোথাও আছি। সামনের লোকটার হাতে ছড়ি দেখতে পেলুম। ঠিকই চিনেছি তা হলে। বললুম, “ডঃ সিংহ নাকি?”

ছড়ির খোঁচা খেলুম পেটে। “শাট আপ! ন্যাকামি হচ্ছে? ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দ্যাখোনি?”

“দেখতে পাচ্ছি তিনকড়িবাবু!”

“মোটকু, কথা আদায় কর।” তিনকড়িচন্দ্র একটু তফাতে বসল। “দেরি করিসনে!”

পিঠে ছুরির ডগার চাপ পড়ল। বললুম, “বলছি, বলছি।”

“বলো!” উদাস গলায় তিনকড়িচন্দ্র বলল। “বলো কদ্দূর এগিয়েছে বুড়োঘুঘু?” বললুম, “অনেকদূর! কলকাতা অবধি।”

“তার মানে?”

“কর্নেল কলকাতা গেছেন। একটা ভাঙা শিলালিপির পাঠোদ্ধার করতে।”

“তার মানে? তার মানে?”

“নকুলবাবুর নোটবইতে ওই শিলালিপির নকল আঁকা আছে। ওতেই নাকি সোনার মোহরভর্তি ঘড়ার কথা আছে।”

“শাট আপ!” তিনকড়িচন্দ্র ধমক দিল। “মোহর-টোহর বোগাস! আমি জানতে চাইছি একাশিদেবের কথা!”

অবাক হয়ে বললুম, “সবসময় একাশি-একাশি শুনেছি! একাশিদেবের কথা তো শুনিনি।”

“সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।” তিনকড়িচন্দ্র শাসাল। “নোলো ব্যাটাচ্ছেলেকে ত্রিশূলে গেঁথেছি। তোমাকে…তোমাকে…”তিনকড়িচন্দ্র আমার জন্য সাঙ্ঘাতিক মৃত্যু খুঁজতে-খুঁজতে বলল, “হু, তোমার গা পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে কাটব। বলো, কোথায় একাশিদেব লুকনো আছে?”

“কী আশ্চর্য! আমি জানলে তো বলে দিতুম। শিলালিপির ভেতর তার খোঁজ আছে হয়তো। কর্নেল সেজন্যই তো কলকাতা গেছেন। পাঠোদ্ধার করে তবে না জানা যাবে।”

আমার কথায় তিনকড়িচন্দ্র একটু ভাবনায় পড়ে গেল হয়তো। বলল, “ওকে। মোটকু, ওকে কাশীর ঘরে…না, কাশীর ঘরে পুলিশ আসার চান্স আছে। স্তূপের ভেতর গর্তটা ভালো জায়গা ছিল। বুড়ো চিনে ফেলেছে। এক কাজ কর।”

পেছনে মোটকু বলল, “বস্তায় ভরে টিকটিকিবাবুর মতো…”

“নাঃ! পুলিশ বস্তা দেখলেই সার্চ করছে দেখে এলুম।” তিনকড়িচন্দ্র উঠল। “একে বরং ডোম্বলবাবুদের পোড়োবাড়িতে নিয়ে চল। ঠ্যাং দুটোও বেঁধে মুখে ফের টেপ সেঁটে ফেলে রাখবি। তালা ভেঙে নতুন তালা এঁটে দিবি ঘরটাতে। বুড়োঘুঘু ফিরলে উড়ো চিঠিতে জানিয়ে দেব, মাল দাও, মাল নাও! গিভ অ্যান্ড টেক। ব্যস!”

.

সাত

ঘুরঘুট্টে অন্ধকার হয়ে গেল ওরা চলে যেতেই। দয়া করে একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়েছে, এই যা। পিঠমোড়া করে দু’হাত বাঁধা, পা-দুটো বাঁধা। কাত হতে গেলে কষ্ট। চিত হতেও কষ্ট। অতএব উপুড় হয়ে আছি। ঘরটায় অদ্ভুত সব শব্দ। মাঝে-মাঝে কী সুড়সুড়ি দিচ্ছে। গায়ে চলাফেরা করছে। শেষে বুঝলুম, আরশোলা আর ইঁদুরের রাজত্ব ঘরের ভেতর। সাপ থাকাও অসম্ভব নয়। ওদের টর্চের আলোয় মেঝেয় প্রচুর গর্ত দেখেছি।

দরজা-জানলা বন্ধ এয়ারকন্ডিশন্ডু ঘর এ-রাতে আশা করেছিলুম। তার বদলে এই সাঙ্ঘাতিক উপহার। আমার নামে কি জোড়া নম্বর থ্রি আছে? পুরো নাম জয়ন্তকুমার চৌধুরী। তা হলে দশ ব্যঞ্জন-মুরারিবাবুর হিসেবে। তিন-তিরেক্তে নয়, হাতে রইল এক।… নাঃ। …তিন দশে তিরিশ, তিনের পাশে জিরো। জিরো নম্বর নয়–মুরারিবাবুর মতে। তা হলে স্রেফ তিন হয়। কিন্তু তিন তো পয়া নম্বর।

মুরারিবাবুর মতোই ঘিলু ফেঁসে যাবে। ঘুমনোর চেষ্টা বৃথা। অনবরত আরশোলার সুড়সুড়ি। ইঁদুরের হপ-স্টেপ-জাম্প রেস। র‍্যাটরেস আর কি! মনে-মনে গত রাতে কর্নেলের উপদেশ স্মরণ করে তিন-শিঙে ছাগলের পাল কল্পনা করে গুনতে শুরু করলুম। হঠাৎ মনে পড়ল, ছাগলটা ‘একাশি’ বলে এবং তিনকড়িচন্দ্র ‘একাশিদেব’ বলল। বড় গোলমেলে ব্যাপার।

তারপর চমকে উঠলুম। কী একটা লম্বা লিকলিকে প্রাণী আমার পিঠের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। সেটা যে সাপ, তাতে সন্দেহ নেই। দম বন্ধ করে কাঠ হয়ে পড়ে রইলুম। সাপটা সম্ভবত ইঁদুরকে তাড়া করেছে। এরপর আর নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। শ্বাসপ্রশ্বাসেও সাবধান হওয়া উচিত। মনে-মনে বাবা একাশিদেবকে ডাকতে থাকলুম।

এতকাল ধরে কর্নেলের সঙ্গে দেশ-বিদেশে কত সব ভয়ঙ্কর অ্যাডভেঞ্চারে গেছি, কিন্তু এমন বিদঘুঁটে ধরনের বিপদে কখনও পড়িনি। এই বিপদটা বেজায় অপমানজনকও বটে। আরশোলার সুড়সুড়ি, ইঁদুরের কাতুকুতু, সাপের বেয়াদপি। বাইরেও সন্দেহজনক কেমন সব শব্দ। শোশো..শনশন…মচমচ…খটখট।

যেন কতকাল ধরে এইরকম নিছক কাঠে পরিণত হয়ে পড়ে আছি। হয়তো গায়ে শ্যাওলা জমেছে। ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে। একসময় অন্ধকার কমে গেছে টের পেলুম। ক্রমশ জানলার ফাঁকে এবং ঘুলঘুলিতে ধূসর আলো, তারপর একটু করে ফিকে লালচে ছটা ফুটে উঠল। এবার ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা গেল। মাদুরে চিবুক ঠেকিয়ে মাথা তুললুম। এবড়োখেবড়ো মেঝে, গর্ত, দেওয়াল ছুঁড়ে শেকড়বাকড়। ফাটল।

আরও কিছু সময় কাটল। তারপর একটা জানলার পাশে ধুপধুপ, খসখস, কিছু টানা-হেঁচড়ার শব্দ শুনতে পেলুম। অমনি যত জোরে পারি দম নাকে টেনে মুখ দিয়ে বের করলুম। টেপটাও সম্ভবত ঘামে নরম হয়েছিল। ফুটুস শব্দে একটুখানি খসে গেল বাঁ দিকে। গলা শুকিয়ে এমন অবস্থা যে যত জোরে কণ্ঠস্বর বের করলুম, ততটা জোরে বেরোল না। “কে আছ ভাই” কথাটা অদ্ভুত “কঁককাছ-ছ-ভাঁ” হয়ে গেল।

কিন্তু সেই যথেষ্ট। সেই জানলাটার ছিটকিনি মরচে ধরে ভেঙে গেছে। খড়াক করে খুলে গেল এবং একটা মুখ দেখতে পেলুম। বিট্টু!

তার হাতে ঘুড়ি-লাটাই। এই ঘরের ছাদে চড়ে হয়তো ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টায় ছিল। আমাকে এ অবস্থায় দেখামাত্র সে বড়-বড় চোখে তাকাল। তারপর ফিক করে হেসে উঠল।

তারপর জিভ দেখাল এবং ব্যা-অ্যা করল। সত্যিই বিচ্ছু ছেলে। ধুপ শব্দে লাফিয়ে পড়ে তখনই উধাও হয়ে গেল। কিছু বলার সুযোগই পেলুম না।

রাগে-ক্ষোভে ছটফট করা ছাড়া উপায় নেই। অদ্ভুত ছেলে তো! একটা লোক এমন অবস্থায় পড়ে আছে দেখেও তার সঙ্গে ফকুড়ি করে কেটে পড়ল!

কিছুক্ষণ পরে বাইরে ধুপধুপ শব্দ আবার। তারপর জানলায় এবার মুরারিবাবুর মুখ এবং আমাকে দেখে অবাক হবেন কী, সেই খ্যাক করলেন।

অতিকষ্টে বললুম, “দরজা প্লি-ই-জ!”

মুরারিবাবু সরে গেলেন। দরজার দিকে তার কথা শোনা গেল, “এই রে! তিন-তিরেক্কে করে রেখেছে। বিট্টু! হাতুড়ি! হাতুড়ি! বউদিকে গিয়ে বল, কয়লাভাঙার হাতুড়ি দাও!”

তারপর কড়া টানাটানির বিকট শব্দ এবং দরজার কপাট কাঁপতে থাকল। সেইসঙ্গে মুরারিবাবুর ফেস-ফোঁস, গোঁ-গোঁ। স্তূপের ভেতর গর্তের মুখে পাথর ঠেলে সরানোর সময় যেমনটি শুনেছিলুম।

কিন্তু ক্রমশ উনি যেন রেগে যাচ্ছিলেন। “তবে রে তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশি! মারে জো-হেঁইয়ো!…জোরসে টানো-হেঁইয়ো!…ঔর থোড়া–হেঁইয়ো!” কড়াক শব্দে কড়া উপড়ে গেল এবং দরজাও প্রচণ্ড জোরে খুলে গেল। এত জোরে যে, দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ল ঝুরঝুর করে।

মুরারিবাবু ঘরে ঢুকে পুনঃ খ্যাক করলেন। কোমরে দু’হাত রেখে আমাকে দেখতে-দেখতে বললেন, “এই! এই তিন-তিরেক্তের ভয়েই কাল সন্ধ্যাবেলা আপনার সঙ্গে যাইনি। বুঝলেন তো

এবার?… আহা রে! কী অবস্থা করেছে দেখছ? একেবারে নয় নয়ে একাশি… ওদিকে আরও এক তিন-তিরেক্কে। মানিক রিকশাওয়ালাকে ডাকাতরা শুনলুম মেরে ফর্দাই করেছে। মুখে টেপ!…সেই তিন-তিরেকের টেপ! ডিটেকটিভবাবুর মতোই অবস্থা। …আরে! আপনার মুখেও তিন-তিরেক্কে?”

বলে একটু ঝুঁকে টেপটা ওপড়ালেন। যন্ত্রণায় উঁহুহু করে উঠলুম। বাঁধন খুলে দিচ্ছেন না। এখনও। কথা বলতে গলায় যন্ত্রণা। “খু-খুলে দি-দিন” বলে চুপ করলুম।

হঠাৎ মুরারিবাবু এক লাফে পিছিয়ে “বাপ রে, সাপ” বলে একেবারে দরজার বাইরে চলে গেলেন।

অতিকষ্টে মাথা ঘুরিয়ে কোথাও সাপটাকে দেখতে পেলুম না। তবে কোণায় গর্তের পাশে একটা সাপের খোলস দেখা যাচ্ছিল। সেইসময় রমলাবউদির গলা ভেসে এল। “কই? কোথায়! কোথায় ঠাকুরপোকে বেঁধে রেখেছে?”

মুরারিবাবু ঘুরে বললেন, “একেবারে তিন-তিরেকে! তার সঙ্গে সাপ।”

রমলাবউদি দরজায় এসে আমাকে দেখেই “ও মা! এ কী!” বলে ঘরে ঢুকলেন। ওঁর হাতে একটা হাতুড়ি। আমার হাতের এবং পায়ের বাঁধন খুলে দু’হাতে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর হাতুড়ি তুলে তেড়ে গেলেন মুরারিবাবুর দিকে। “হাঁ করে এতক্ষণ মজা দেখা হচ্ছিল, ভূত কোথাকার।”

মুরারিবাবু নিমেষে উধাও হয়ে গেলেন। রমলাবউদি এসে আমার কাধ ধরে বললেন, “কী সর্বনেশে কাণ্ড! কাল তুমি গেলে বটে, বড্ড ভয় করছিল। পথে কোনো বিপদ-আপদ যেন না ঘটে। চলো, চলো! ইশ! এক রাত্তিরেই কী অবস্থা হয়ে গেছে তোমার!”

বিট্টু নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ চলে গেল। ছেলেটা আপনভোলা খেয়ালি স্বভাবের। কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য ওকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু, কর্নেলের সেই রামধনু প্রজাপতির মতো এই ছটফটে সুন্দর ছেলেটিকে নাগালে পাওয়া কঠিন।

কাল শেষবিকেলে মুরারিবাবুর সঙ্গে এই হানাবাড়ি এলাকা দিয়ে এসেছিলুম। তখন আমি এক মানুষ, এখন আমি আর-এক মানুষ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেন বেতো-রুগিকে। এ দিকটা নিরিবিলি সুনসান। সকালের রোদ্দুর মিটিমিটি হাসছে আমার দশা দেখে, কাল হালদারমশাইয়ের দশা দেখে আমি যেমন হেসেছিলুম, তেমনি হাসি।

গরম দুধ খাইয়ে রমলাবউদি আমাকে চাঙ্গা করে তুললেন। বিরু নাইট ডিউটি করে এসে ঘুমাচ্ছিল। হাই তুলতে-তুলতে এসে আমাকে একবার দেখে গেল। গম্ভীর মুখে বলেও গেল, “চান করে নিন দাদা! বড্ড বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে আপনাকে।” আয়নায় নিজেকে দেখে শিউরে উঠলুম। আমি না অন্য কেউ? প্যান্ট-শার্টে ঝুলকালি, আরশোলার নাদি। চুলে মাকড়সা পর্যন্ত কখন জাল পেতেছিল। রাতারাতি একেবারে আস্ত ভূতে পরিণত হয়েছি।

রমলাবউদির তাড়ায় স্নান করতে হল। বিরুর পাঞ্জাবি-পাজামা পরে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখলুম, আমি আবার আমাকে ফিরে পেয়েছি। একটু পরে যখন খেতে বসেছি এবং রমলাবউদি সামনে বসে তিনকড়িচন্দ্রের শ্রাদ্ধ করছেন, তখন মুরারিবাবু হন্তদন্ত ফিরলেন। বললেন, “থানায় গিয়েছিলুম। আপনার ব্যাপারটা যে বলব, শুনলে তো? তিন-তিরেকে করতে এল। তবে করালীদাকে শাসিয়ে এসেছি।…অবাক কাণ্ড মশাই! করালীদা বলল, তিনু তো জাহাজে। ওদের জাহাজ এখন প্যাসিফিক ওসেনে ভাসছে। বুঝুন তিন-তিরেক্কের কারবার!”

রমলাবউদি ধমক দিয়ে বললেন, “কবক কোরো না তো! ঠাকুরপোকে খেতে দাও। আর শোনো, ইরিগেশন-বাংলোয় গিয়ে ঠাকুরপোর জিনিসপত্র নিয়ে এসো।”

বললুম, “না বউদি, আমি বাংলোয় ফিরে যাই, কর্নেল এসে আমাকে না দেখে ভাবনায় পড়ে যাবেন।”

রমলাবউদি কড়া মুখে বললেন, “না। সারারাত্তির ঘুমোওনি। খেয়েদেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ো। আর তোমাকে একা বেরোতে দিচ্ছিনে। মুরারি, দেখছ পাগলের কাণ্ড? এই আছে, এই নেই। আস্ত ভূত!”

মুরারিবাবু ততক্ষণে কেটে পড়েছেন। বাংলোয় আমার জিনিসপত্র আনতে যে যাননি, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। গেলেও মাধবলাল ওঁকে তা দেবে না। গেট থেকেই ভাগিয়ে দেবে।

স্নান করে চাঙ্গা হয়েছিলুম। কিন্তু পেটে ভাত পড়ার পর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে এল। আর দেরি না করে নকুলবাবুর জাদুঘরে ঢুকলুম। রমলাবউদি বিছানা গুছিয়ে পেতে দিতেই লম্বা হয়ে পড়লুম এবং ঘুমও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

.

সেই ঘুম ভাঙল যখন, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। চোখ খুলে প্রথমে একটি চকচকে টাক দেখতে পেলুম। জানলা দিয়ে শেষ রোদ্দুরের ছটা এসে সেই টাকে পড়েছে। টেবিলে টুপি। ধুড়মুড় করে উঠে বসলুম। “কর্নেল!” বলে উল্লাসে হাঁক ছাড়লুম।

প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ ঘুরলেন না। টেবিলে একটুকরো ভাঙা কালচে পাথরের ফলক আর নোটবই নিয়ে কী একটা করছেন। একপাশে মুরারিবাবু আর রমলাবউদি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্কের হিসেব। দেখুন, মিলে যাবে।”

ব্যা ক র ণ র হ স্য “মিলেছে।” বলে কর্নেল এতক্ষণে আমার দিকে ঘুরলেন। “কী জয়ন্ত? একাশির পাল্লায় তা হলে তুমিও পড়েছিলে? তোমাকে পইপই করে বলেছিলুম, বাংলো ছেড়ে বেরিও না।”

বললুম, “পড়লেও একাশিদেবের নাম জপে বেঁচে গেছি।”

“একাশিদেব?” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “হুঁ, একাশির পাশে দেব যুক্ত করতে পেরেছ, এটাই লাভ। ..না, মুরারিবাবু! তিন যুক্ত দুই পাঁচ করে আর ঝামেলায় পড়বেন না।”

মুরারিবাবু ঝটপট বললেন, “পাঁচে ঝামেলা নেই কর্নেলসায়েব। তিন পাঁচে পনেরো। একের পিঠে পাঁচ। পাঁচ প্লাস এক–ছয়। দুটো নম্বর থ্রি।…মাধবলালের নামের সংখ্যাতত্ত্ব জয়ন্তবাবুই বের করেছিলেন। ওঁর ক্রেডিট পাওনা। কিন্তু কী মিলেছে বলুন এবার?”

কর্নেল বললেন, “ব্যাকরণ রহস্য ফাঁস করে তবে সব বলব। চলুন, বেরনো যাক। জয়ন্ত, ওঠো। রমলা, ফলকটা যেখানে ছিল, রেখে দাও।”

রমলাবউদি পাথরেরর ভাঙা ফলকটা নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন। একটু পরে বারান্দা থেকে বললেন, “চায়ের জল চাপানো আছে। চা খেয়ে তবে বেরোবেন বাবামশাই!”

কর্নেল কখন তা হলে রমলাবউদিরও বাবামশাই হয়ে গেছেন! ষষ্ঠীর বাবামশাই ক্রমশ দেখছি, বিশ্বসুদ্ধ লোকের বাবামশাই হয়ে উঠছেন।

চা খেয়ে যখন বেরোলুম, তখন প্রায় সাড়ে-পাঁচটা বাজে। কর্নেল হানাবাড়িগুলোর দিকে চলেছেন। মুরারিবাবু কেন কে জানে, ভীষণ গম্ভীর। কর্নেল আমার বন্দী হওয়ার ঘটনাটা জেনে নিলেন হাঁটতে-হাঁটতে। তারপর আপন মনে বললেন, “ঘুরে-ফিরে সেই ব্যাকরণ রহস্য অথবা ব্যাকরণ রহস্য এসে পড়ছে। এক আর আশি একাশি। সন্ধি প্রকরণ। মুরারিবাবু, আপনি জয়ন্তর সঙ্গে ভাঙা দেউড়ির ওখানে যান। আমি একটু ঘুরপথে যাচ্ছি।” বলে আমার দিকে ঘুরে একটু হাসলেন।”ভয় নেই ডার্লিং! তিনকড়িচন্দ্র এখন ওদিকে পা বাড়াতে সাহস পাবে না। পুলিশ ও পেতে আছে। সে তত বোকা নয়।”

মুরারিবাবু এবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। বুঝলুম, তিনকড়িচন্দ্রের ভয়ে এ-তল্লাটে আসতে বড় অনিচ্ছা ছিল। তাই অমন গম্ভীর দেখাচ্ছিল ওঁকে। লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। বললেন, “পুলিশ ওত পেতে আছে। আর তিন-তিরেক্তে করে কে? নয় নয়ে একাশি হয়ে যাবে। কিন্তু একাশিদেব কোন্ দেবতা বলুন তো জয়ন্তবাবু?… শোনা-শোনা মনে হচ্ছে। …কার কাছে যেন শুনেছিলুম নামটা। পেটে আসছেন, মুখে আসতেই তিন-তিরেক্কে হয়ে যাচ্ছে।”

কর্নেল ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দেউড়ির কাছে পৌঁছে গেলুম। এখনও দিনের আলো আছে। তবু চারদিকে ভয়ে-ভয়ে তাকাচ্ছিলুম। মুরারিবাবুও তাকাচ্ছিলেন। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন, “পুলিশ ওৎ পেতে আছে! পুলিশ কীভাবে ওৎ পাতে জানেন? কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে.. এক মিনিট! ওই ঝোঁপটা দেখে আসি। স্বচক্ষে না দেখলে মশাই, বুকটা খালি তিন-তিরেকে তিন-তিরেকে করতেই থাকবে।”

এই বলে যেই পা বাড়িয়েছেন, দেউড়ির মাথা থেকে বিদঘুঁটে আওয়াজ এল, “এ-কা-শি!” সেই তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু। মুরারিবাবু থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরই আচমকা খাপ্পা হয়ে একটুকরো আধলা ইট কুড়িয়ে “নিকুচি করেছে তোর একাশির!” বলে ছুঁড়ে মারলেন। ছাগলের মুণ্ডুটা অদৃশ্য হলে গেল দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর। মুরারিবাবু আবার ইটের টুকরো কুড়িয়ে ছুঁড়লেন। সে একটা দেখার মতো দৃশ্য। ক্রমাগত ঢিল-ছছাড়াছুড়ি করে চলেছেন মুরারিবাবু। ওঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “এ কী করছেন! পুলিশ ওৎ পেতে আছে কোথাও। কারও মাথায় পড়লে কী হবে?”

মুরারিবাবু ক্ষান্ত হলেন সঙ্গে-সঙ্গে। জিভ কেটে বললেন, “সরি, ভেরি সরি!” তারপর চারদিকে করজোড়ে নমস্কার করে অদৃশ্য পুলিশদের উদ্দেশে বললেন, “কিছু মনে করবেন না স্যাররা! একাশির ঠ্যালা। মাথা ঠিক রাখা কঠিন।”

এইসময় দেউড়ির পেছন থেকে কর্নেলের আবির্ভাব ঘটল। মুখে উজ্জ্বল হাসি। কিন্তু হতভম্ব হয়ে দেখলুম, ওঁর হাতে সেই তিন-শিঙে ছাগলটার মুণ্ডু। বললুম, “সর্বনাশ!”

“সর্বনাশ নয়, ডার্লিং! বলিদান-করা মুণ্ডু নয়।” কর্নেল সহাস্যে বললেন। “রক্ত দেখতে পাচ্ছি কি?”

মুরারিবাবু চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর সামনে মুণ্ডুটা কর্নেল তুলে ধরে বললেন, “কী মুরারিবাবু? নকল একাশিদেবকে চিনতে পারছেন কি?”

অমনি মুরারিবাবু খ্যাক করে হাসলেন। তারপর মুণ্ডুটা ছিনিয়ে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, “কী কাণ্ড! এও দেখছি তিন-তিরেক্কের খেলা। মুখোশ!”

“হ্যাঁ, মুখোশ।” কর্নেল বললেন, “সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের আড়ালে ওৎ পেতে ছিলুম। যেই ঝোঁপ ফুঁড়ে উঠেছে, শিং ধরে ফেললুম। মুখোশ উপড়ে এল। আসল প্রাণীটি দুই ঠ্যাঙে দৌড়ে

পালিয়ে গেল।”

“বিট্টু?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “নিশ্চয় বিট্ট এই মুখোশ পরে মুরারিবাবুকে নিয়ে জোক করত!”

মুরারিবাবু মারমুখী হয়ে “তবে রে হতচ্ছাড়া, বিচ্ছু বাঁদর,– বলে ছুটে গেলেন। বিট্টুকে খুঁজে পাবেন কি না সন্দেহ। কর্নেল বললেন, “ওই যাঃ! মুরারিবাবু মুখোশটা নিয়ে চলে গেলেন যে!”

“যাকগে! শিলালিপির পাঠোদ্ধার হয়েছে কি না বলুন।”

“চলো। বাংলোয় ফিরে গিয়ে বলব।”

ঢিবি-এলাকা থেকে হাইওয়েতে নেমে বাংলোর দিকে হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেল বললেন, “এও একটা সন্ধিবিচ্ছেদ বা ধড়-মুণ্ডুবিচ্ছেদ হওয়ার ঘটনা বলা চলে, ডার্লিং! তবে এটা নকল। আসলটা ফাস হবে মধ্যরাতে–বারোটা নাগাদ। ফঁদ পেতে এসেছি। দেখা যাক।”

“খুলে বলুন। হেঁয়ালি আর ভাল্লাগে না!”

কর্নেল আমার কথার জবাবই দিলেন না। চোখে বাইনোকুলার রেখে পাখি দেখতে দেখতে চললেন। বাংলোর গেটে মাধবলাল উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, “ছোটসাবকে লিয়ে হাম বহত শোচতা থা। রাতভর নিদ নেহি! আজ সারে দিনতকভি শোচতে শোচতে…হা রামজি!”

“জলদি কফি বানাও, মাধবলাল।” বলে কর্নেল বারান্দায় উঠে বেতের চেয়ারে বসলেন। একটু পরেই কফি এল। বারান্দার বাতিটা জ্বালিয়ে দিল মাধবলাল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন। সেটা খুলে টেবিলে বিছিয়ে বললেন, “কলকাতা যাব বলে রওনা হয়ে বর্ধমানে পৌঁছে হঠাৎ মনে হল, ডঃ টি সি সিংহের সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়া উচিত। তার কার্ড তিনকড়িচন্দ্র পেল কী করে? তা ছাড়া ডঃ সিংহ একজন পুরাবিদ এবং ভাষাবিজ্ঞানীও। …হঁ, যা ভেবেছিলুম। তিনকড়িচন্দ্র তার কাছে একটা শিলালিপির একটুখানি ভাঙা অংশ নিয়ে গিয়েছিল। উনি সেটা কপি করে রেখে সময় চেয়েছিলেন। লিপিটা দেখে ওঁর অবাক লেগেছিল। তিনকড়িচন্দ্র তার চর মারফত খবর পেয়ে থাকবে, আমি পরের ট্রেনে আসছি। সে বর্ধমান থেকে আমাদের সঙ্গ নিল।”

“কার্ড চুরি করল কী করে?”

“চুরি নয়। চেয়ে নিয়েছিল। নেমকার্ড চাইলে কি দেবেন না” বলে কর্নেল কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। “এই লিপি খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকের কুষান-লিপি। ব্রাহ্মীর রকমফের। কিন্তু মজার ব্যাপার, এর ভেতর বাংলায় কিছু কথা লেখা আছে। সম্ভবত ধাড়াবংশের কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তির কীর্তি।”

বললুম, “কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং!”

কর্নেল হাসলেন। “ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বরবর্ণ সন্ধি করলেই কথাটা বেরিয়ে আসবে। এই দেখো! ত+ও+র+ণ=তোরণ। শ +ই+র+এ=শিরে। গ+উ+প+ত+গ+র+ত=গুপ্ত গর্ত। ম+আ+ঝ+এ=মাঝে। ন+আ+ম+ও=নামো। ব+আ+ম+দ+ই+ক+এ=বাম দিকে। ত+ই+ন+ধ+আ+প=তিন ধাপ।… এরপর শুধু ব’। বাকিটা ভেঙে গেছে এবং সেই ভাঙা অংশটা তিনকড়িচন্দ্র দিয়ে এসেছে ডঃ সিংহকে। তাই মিলিয়ে পুরো গুপ্তবাক্যটি হল :

তোরণশিরে গুপ্তগর্ত মাঝে নামো। বাম দিকে তিন ধাপ। বাম হাতের তর্জনী।

বুঝতে পেরে বললুম, “সত্যিই তিন-তিরেক্কের ব্যাপার। বাস! কিন্তু বাম হাতের তর্জনী মানে?”

“সেখানে দাঁড়ালে হাত বুলিয়ে বাম হাতের তর্জনী যেখানে ঠেকবে, সেখানেই…”

“ঘড়াভর্তি সোনার মোহর?”

“না। একাশিদেব।” বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। তোমার মুখে বাচ্চা ছেলে’ কথার সূত্রে আমার মাথায় আইডিয়াটা আসে। তবে বিট্ট ছেলেটির হাড়ে-হাড়ে বুদ্ধি। নকুলবাবু ওকে তাড়াতেন আর ইতিহাসের গল্প শোনাতেন। শিবের তিন-শিঙে ছাগল-অবতারের গল্প শুনে বিট্টু বাজারের মুখোশ তৈরির দোকানে অর্ডার দিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এ-অঞ্চলে মুখোশ তৈরির প্রচুর দোকান আছে। ছৌ-নাচের মুখোশ এইসব দোকান থেকেই লোকে কেনে। আসলে মুরারিবাবুকে ভয় দেখাতেই বিট্টুর এই দুষ্টুমি। কিন্তু বাচ্চা ছেলে বলে কুটা তুমিই দিয়েছিলে।”

“একাশিদেব ব্যাপারটা কী?”

“আজ রাত বারোটায় দেখবে। ডঃ সিংহকে বলে এসেছি, তিনকড়িচন্দ্রকে শিলালিপিটার বাকি অংশের কপি দেবেন। যেন উনি বর্ধমান মিউজিয়ামে এর খোঁজ পেয়েছেন! ফঁদটা বুঝলে তো?”

“রাত বারোটা কেন?” উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে বললুম। “আরও আগে নয় কেন?”

“ওই সময় অমাবস্যা পড়ছে। মন্দিরে খুব ভিড় হবে আজ রাতে। কাজেই সবার মন পড়ে থাকবে মন্দিরে। এদিকে নির্বিঘ্নে তিনকড়ি একাশিদেবকে উদ্ধার করবে। তিনপুরুষ ধরে ভাঙা দেউড়ি নিয়ে মামলার আসল কারণটা তো এই।”

একটু ভেবে বললুম, “কিন্তু তিনকড়িচন্দ্র বেঁটে? দেউড়ির মাথায় সুড়ঙ্গে তিন ধাপ নেমে বা হাত বুলিয়ে ওর তর্জনী যেখানে ঠেকবে, মুরারিবাবুর সেখানে ঠেকবে না। একজন বেঁটে, একজন লম্বা।”

কর্নেল হাসলেন। “সেজন্যই অনেক পাথরের ইট ওপড়াতে হবে তিনকড়িচন্দ্রকে। শাবল দিয়ে ইট ওপড়াতে শব্দ হবে। রাত বারোটায় অমাবস্যায় আজ পুজোর ধুম। ঢাক বাজবে প্রচুর। ঢাকের শব্দে শাবলের শব্দ চাপা পড়বে।”

রাত সাড়ে এগারোটায় থানা-পুলিশের জিপ আমাদের হাইওয়ের বটতলায় পৌঁছে দিল। সঙ্গে সেই দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড মানুষ অফিসার-ইন-চার্জ মিঃ হাটি। পুলিশের দারোগা না হলে হাতিমশাই বলা যেত। তিনি ভূমিকম্প-হাসি হাসছিলেন না। সম্ভবত ডিউটিতে আছেন বলেই। নয়তো খানতিনেক হাসলেই দেউড়ি ধসে পড়ত। কিন্তু রাত বারোটা বাজতেই চায় না। গুমোট গরম আর স্তব্ধতা। এ-রাতে বাতাস বন্ধ। ঝোঁপের আড়ালে আমরা বসে সময় গুনছি, কখন মন্দিরে বলির ঢাক বেজে উঠবে অমাবস্যার লগ্নে। সামনে আকাশের নক্ষত্রের ওপর একটা কালো ছায়া, ওটাই ভাঙা দেউড়ি।

একসময় মন্দিরের দিকে হঠাৎ তুমুল ঢাক বেজে উঠল। ভক্তদের জয়ধ্বনি শোনা গেল। ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের ফোকর গলিয়ে মাঝেসাঝে আলোর ঝিলিমিলি। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন “মশাল-নৃত্য!”

তারপর চোখে পড়ল কালো তোরণের ওপর কয়েকটা ছায়ামূর্তি নড়াচড়া করছে। মিঃ হাটি ফেস-ফোঁস শব্দে বললেন, “এসে গেছে। কখন আসামি ধরতে হবে, জানিয়ে দেবেন।”

কর্নেল তেমনই চাপা স্বরে বললেন, “মিঃ হাটি, এবার আসুন আমরা সুড়ঙ্গের মুখে গিয়ে অপেক্ষা করি। ওরা কাজে নামুক। বেরনোর সময় মালসুন্ধু আসামি ধরবেন।”

তিনজনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলুম। মিঃ হাটির পায়ের শব্দ নেই, যেন শূন্যে হাঁটছেন। বুঝলুম পুলিশ ট্রেনিং। আমার পা বারবার শুকনো লতাপাতায় পড়ে মচমচ শব্দ উঠছে। • কর্নেলের এ-তল্লাট নখদর্পণে, এমন করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন ঘুরঘুট্টে অন্ধকারে। কিছুক্ষণ পরে যেখানে থামতে হল, সেটা একটা ভাঙা বাড়ি। মনে পড়ল, এর মেঝেতে ঝোঁপের ভেতর সুড়ঙ্গের দরজা রয়েছে। হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, “এই রে, মুরারিবাবু মনে হচ্ছে!”

একটু দূরে টর্চের আলো জ্বলে উঠতে দেখলুম। পায়ের কাছে আলো ফেলতে ফেলতে কেউ এগিয়ে আসছে এদিকে। মিঃ হাটি বললেন, “পাগলাটাকে সামলানো দরকার।”

কর্নেল বললেন, “উনি তিন-শিঙে ছাগলের মুখোশ পরেছেন দেখা যাচ্ছে। এক মিনিট! আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। এই নতুন প্ল্যানে মুরারিবাবুকে কাজে লাগাব।”

বলে উনি গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। তারপর মুরারিবাবুর ওপর আচমকা টর্চের আলো ফেললেন। মুরারিবাবু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পালালেন না। বিচ্ছিরি, ব্যা-অ্যা’ ডেকে উঠলেন। কর্নেল টর্চ নিভিয়ে চাপা স্বরে বললেন, “চুপ!” বোঝা গেল, মুরারিবাবুর ব্যা-ডাক ভয় দেখাতেই। কিন্তু নিজেই ভয় পেলেন। তাঁর টর্চের আলো কর্নেলের ওপর পড়ল। তারপর খাক করে হেসে টর্চ নেভালেন। মহানন্দে বললেন, “বিট্টুর কাছে সুড়ঙ্গের দরজার খোঁজ পেয়েছি। সোনার মোহরের ঘড়া আনতে যাচ্ছি।”

“চুপ, চুপ! আস্তে!” কর্নেল বললেন, “শুনুন! আপনি সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের ভেতর শুধু মুণ্ডটা বের করে বসুন। আপনার তিনকড়িদা দলবল নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকেছেন। ওঁর ফেরার সময়

ব্যা-অ্যা করবেন। খুব শিঙ নাড়বেন কিন্তু!”

মুরারিবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “নাড়ব মানে? তিন-তিরেকে নয়, নয় নয়ে একাশিবার নাড়ব। আমার ঠাকুর্দার সোনার মোহরভর্তি ঘড়া!”

“আস্তে! থানার বড়বাবু আছেন, এই দেখুন। রেগে যাবেন।”

মুরারিবাবু শ্বাসের সঙ্গে বললেন, “ও! আচ্ছা!” তারপর ঝোঁপঝাড় ঠেলে বাড়ির ভাঙা দেওয়ালের পাশের ঝোঁপ ঠেলে ঢুকে পড়লেন। একবার টর্চ জ্বেলে জায়গাটা শনাক্ত করে নিলেন। সম্ভবত সুড়ঙ্গের মুখে চারঠেঙে প্রাণীর মতোই বসলেন।

কতক্ষণ কেটে গেল। তারপর মুরারিবাবু যেখানে ঢুকেছেন, সেখানে কয়েকবার আবছা টর্চের আলো ঝিলিক দিল। একটু পরে মুরারিবাবুর বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক শোনা গেল। অমনি কর্নেল বলে উঠলেন, “মিঃ হাটি, জয়ন্তকে নিয়ে আপনি দেউড়ির ওখানে যান। হুইসল বাজিয়ে আপনার লোকেদের ডাকুন গিয়ে।”

মিঃ হাটি এবার ভূমিকম্পের মতো মাটি কাঁপিয়ে হাঁটতে বা দৌড়তে থাকলেন। সেই সঙ্গে হুইসলও বাজতে থাকল। দেউড়ির দিকে ঝলকে ঝলকে টর্চের আলো, পাল্টা হুইসল, দুদ্দাড়, হুলুস্থুল। ঝড়, ভূমিকম্প হয়ে গেছে এমন তাণ্ডব! দেউড়ির মাথায় টর্চের আলো পড়েছে এদিক-ওদিক থেকে। সেই আলোয় দেখলুম, সেই ষণ্ডামার্কা মোটকু আর তার সঙ্গী ঝাঁপ দেবার তাল করছে। কিন্তু পারছে না। হাড়গোড় ভেঙে তো যাবেই, তার ওপর পুলিশের খপ্পরে পড়বে। মিঃ হাটি গর্জন করলেন, “খুলি ফুটো হয়ে যাবে। যেখানে আছ, তেমনই থাকো। কল্যাণবাবু!”

কল্যাণবাবুর সাড়া পাওয়া গেল। ‘ইয়েস স্যার!”

“ওদিকে যান। সুড়ঙ্গের মুখে পাগলাবাবু ওখানে আছে। তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু দেখে ভয় পাবেন না যেন।” বলে মিঃ হাটি সেই ভূমিকম্প-হাসি হাসলেন।

টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবু একদল সেপাই নিয়ে ছুটে গেলেন। দেউড়ির মাথায় মোটকু এবং তার সঙ্গী এইসময় গর্তের দিকে ঝুঁকল। তারপরই “ও রে বাবা” বলে পিছিয়ে এসে মরিয়া হয়ে ঝাঁপ দিল। ঝাঁপ দিয়েই আর্তনাদ করে উঠল। ক’জন সেপাই গিয়ে ঘিরে ধরল তাদের। তারা আছাড়ের চোটে কাতরাতে থাকল। বেটনের গুতোও খাচ্ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। কিন্তু এদিকে আমি উদ্বিগ্ন। সুড়ঙ্গের ভেতর কর্নেল তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে ট্রেনের কুপেতে যেমন ফিল্মি লড়াই লড়ছিলেন, তেমন কিছু ঘটছে না তো? টর্চের আলো দেউড়ির মাথায় ফেলে ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

কর্নেলের বদলে বেরোলেন ছাগলাবতাররূপী মুরারিবাবু। বললেন, “একাশি।”

মিঃ হাটি আবার ভূমিকম্প-হাসি হাসতে লাগলেন।

চেঁচিয়ে বললুম, “কর্নেল কোথায় মুরারিবাবু?”

মুরারিবাবু মুখোশ খুলে বললেন, “তিনকড়িদাকে তিন-তিরেক্কে করে ফেলেছেন।” বলেই তারপর গর্তে ঢুকে গেলেন। ব্যাপারটা বোঝা গেল না।

দূরে সুড়ঙ্গের মুখের দিক থেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবুরা আসছেন দেখতে পেলুম। সঙ্গে কর্নেলও আছেন। কল্যাণবাবু তিনকড়িচন্দ্রের জামার কলার ধরে আছেন। সে ল্যাংচাচ্ছে। কাছে এসে কর্নেল বললেন, “একাশি! না–একাশীদেব। তালব্য শ-এ দীর্ঘ ঈ হবে। একটু বানানভুল আর কি!”

ওঁর হাতে একটা ছোট্ট পাথরের মূর্তি। মূর্তিটা তিন-শিঙে ছাগলের। বললুম, “এ কি?”

“ডার্লিং, এটা বিদেশে বেচতে পারলে কোটি টাকা পেতেন তিনকড়িবাবু। তোমাকে বলেছিলুম এক এবং আশি সন্ধি করে একাশি। ব্যাকরণ বা ব্যাকরণ রহস্য।” কর্নেল শিঙ তিনটে দেখিয়ে ব্যাখ্যা করলেন।”একে চন্দ্র-নামতা, জয়ন্ত! শিবের মাথায় চন্দ্র থাকে। মাঝখানেরটা আশী অর্থাৎ সাপ। আশীবিষ পুরো সাপ। এটা আসলে সাপের ফণার প্রতীক। শুধু ফণাটুকু, তাই আশী। ওকে শাস্ত্রে বলে কূটাভাস। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রাজা শিবসিংহের আমলে শিবের কূটাভাস তিন-শিঙে ছাগলে পরিণত হয়েছিল। পশুপতিদেব কিনা! মহেনজো-দরোর ঐতিহ্য, জয়ন্ত। শিবের মাথায় চন্দ্রকলা এবং মাঝখানে সাপের ফণা। সন্ধি করলে এক গ্লাস আশি সমান একাশি। ব্যাকরণ রহস্য। তবে ব্যাকরণ রহস্যই বলব। কারণ..”।

মুরারিবাবু হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে বললেন, “কই, সোনার মোহরভর্তি ঘড়া?”

কর্নেল তাকে একাশীদেবের মূর্তিটা দেখিয়ে শুধু বললেন, “একাশী!”

রাগের চোটে মুরারিবাবু বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা’ করে ভেংচি কেটেই বুঝলেন, থানার বড়বাবু-মেজোবাবুদের সামনে বেয়াদপি হয়ে গেছে। টর্চ জ্বালতে জ্বালতে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। ব্যাকরণে আর রহস্য নেই, বুঝতে পেরেছেন মুরারিবাবু।

কর্নেল বললেন, “চলুন। থানায় গিয়ে এবার হালদারমশাইকে উদ্ধার করি।”

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi