Sunday, March 29, 2026
Homeরম্য গল্পমজার গল্পভবসিন্ধু - তারাপদ রায়

ভবসিন্ধু – তারাপদ রায়

এবারে আর কোনও প্রাগৈতিহাসিক রেফ্রিজারেটরের লোমহর্ষক এবং অবিশ্বাস্য কাহিনী লিখে সরলমতি পাঠকপাঠিকাদের বিচলিত করব না। এবার আমাদের আলোচ্য বিষয় আমাদের বাড়ির অত্যাশ্চর্য এবং অব্যবহৃত একটি ফ্রিজ।

মহামতি সুকুমার রায়ের অনুসরণে আমাদের বাড়িতে কোনও কোনও প্রধান জিনিসের নামকরণ করা আছে। বেশি উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই; আমাদের দেওয়াল ঘড়িটিকে আমরা বলি চলন্তিকা, টেলিফোনকে হিংটিং এবং এবারের আলোচ্য ফ্রিজটিকে ভবসিন্ধু নাম দেওয়া আছে।

ফ্রিজটির যখন একটা নাম আছে এবং তার যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব আছে তাই আমরা তাকে বারবার ফ্রিজ না বলে ওই ভবসিন্ধু নামেই অভিহিত করব।

ভবসিন্ধুকে আমরা সেকেন্ড হ্যান্ড সংগ্রহ করি সত্তর দশকের গোড়ার দিকে। কলকাতার একটি বিদেশি দূতাবাসের এক মৃত কর্মচারীর পুরনো জিনিসপত্র নিলামে বিক্রি করা হচ্ছিল, এই বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে দেখে আমরা ফ্রিজটা কিনতে যাই। খুব বেশি দাম দিতে হয়নি, মোটামুটি শোভন দেখতে, নগদ টাকা দিয়ে তখনই ওটা আমরা একটা টেম্পোতে তুলে বাড়ি নিয়ে আসি।

অবশ্য এর মধ্যে একটা ব্যাপার আমরা জানতাম না এবং আগে জানলে আমরা হয়তো ওই নিলামে যেতামই না। ব্যাপারটা এই যে, আমরা যে বিদেশি ভদ্রলোকের জিনিসটি কিনেছিলাম, সেই ভদ্রলোকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি, বছর খানেক আগে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

সেই সময়ে এ ব্যাপারটা নিয়ে কাগজপত্রে অনেক হইচই চেঁচামেচি হয়েছিল। ভদ্রলোক জাপানিদের মতো নিজেকে ছোরা মেরে বন্ধ ঘরে আত্মহত্যা করেছিলেন। প্রথম দৃষ্টিতে এটা খুনের ব্যাপার বলে পুলিশ মনে করে।

আমরা ভবসিন্ধুকে কেনবার পরে কে যেন প্রথম আমাদের খেয়াল করিয়ে দেয় এই যন্ত্রটির মালিক ওই আত্মহত্যাকারী দূতাবাস কর্মচারী। কেনবার পর থেকে আমাদের মনে একটা সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছিল, ভবসিন্ধুর নানাবিধ আচরণে; পরে এই সংবাদের সত্যতা যাচাই করে আমরা বাড়ির সবাই রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়লাম।

মিনতি বলল, ‘ফ্রিজটা যখন নিয়ে আসা হয় তখন আমার মনে আছে এটার গায়ে ছিটেছিটে গাঢ় কালো রঙের কী যেন লেগে ছিল।’ আমাদের বুক ধড়াস করে উঠল, পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম, কেউ কিছু বললাম না, সবাই মনের গভীরে বুঝতে পারলাম, ওই কালো ছিটগুলো ছিল শুকনো রক্তের ফোঁটা।

তাতাই তখন অতি ছোট, তবে ভূতের ভয় পাবার বয়েস তার হয়েছে। সে বলল, সে দু’দিন আগে এক দুপুরে ফ্রিজটাকে একা একা খুলে যেতে দেখেছে। দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যাচ্ছে। এ দৃশ্য আমিও একদিন সন্ধ্যাবেলা দেখেছি। বিজন বলল, ফ্রিজটা যখন টেম্পোতে করে আনা হয়, তখন ওটার একটা কোনা লেগে ওর হাঁটুটা ছড়ে যায়, সেই ঘা এখনও শুকোচ্ছে না।

সেই সময় আমাদের বাড়িতে যে কুকুর ছিল, সে এখনকারটির শ্রদ্ধেয় জননী। তার নাম ছিল চিলি, বিখ্যাত লেখক থেকে নগণ্য পথচারী, ডাক্তার, মেসোশ্বশুর, তাতাইয়ের সহপাঠী— জানাশোনার মধ্যে অসংখ্য লোককে সে বিনা কারণে কামড়েছে। সে হঠাৎ উঠে গিয়ে শান্ত চিত্তে একটা জোর কামড় দিয়ে যেন কিছু নয় ব্যাপারটা এই রকম মুখ করে আবার ফিরে এসে নিজের চেয়ারে শুয়ে ঘুমাত।

সেই দুর্দান্ত চিলি ভবসিন্ধুকে নিয়ে আসার পর প্রচণ্ড খুশি হয়। ভবসিন্ধুকে যেখানে রাখা হয় তার চারপাশে লেজ নেড়ে নেড়ে ঘোরে, মাঝে মাঝে ভবসিন্ধুর দরজা, দেয়াল এগুলো শুঁকে শুঁকে আলতো করে জিব দিয়ে চাটে। এ লক্ষণটাও আমাদের খুব সুবিধে মনে হল না।

অনেক রকম আলাপ-আলোচনা করে এবং বহুলোকের পরামর্শ নিয়েও আমরা ভবসিন্ধু সম্পর্কে কোনও রকম মনস্থির করতে পারলাম না। জন্মের মধ্যে কর্ম, একটা ফ্রিজ কেনা হয়েছে অথচ সেটাকে বাসায় রাখতে কেমন যেন একটা খটকা, একটা আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে মনে।

দু’-একজন যুক্তিবাদী বন্ধু আমাদের বললেন, ‘এ সবই আজব চিন্তা, তোমরা যদি না জানতে যে এর মালিক আত্মহত্যা করে মারা গেছে তা হলে তো কোনও চিন্তাই করতে না, এত গোলমাল হত না।’

আমরা ব্যাপারটা মেনে নিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু এর মধ্যে একদিন গভীর রাতে একটা অনৈসর্গিক কারণে আমরা বাড়িসুদ্ধ সবাই জেগে উঠলাম। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে লোডশেডিং ছিল, আলোর সুইচ অফ না করেই ঘুমিয়ে ছিলাম। ফ্রিজটা থাকত আমাদের শোয়ার ঘরে, কখন বিদ্যুৎ এসেছে, ঘরের আলোটা জ্বলেছে এবং ফ্রিজটার ভেতর থেকে কেমন একটা করুণ সানাইয়ের মতো শব্দ বেরচ্ছে। এই বাজনা ক্রমশ স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল। মিনতি বিস্ফারিত চোখে বিছানার উপর উঠে বসল, সানাই বাদন শুনে বিজন এবং তাতাই, সেই সঙ্গে চিলিও পাশের ঘর থেকে আমাদের ঘরে এল।

আমরা কেউ কাউকে কিছু বলছি না, শুধু বিহ্বল আর হতভম্ব হয়ে ওই বাজনা শুনতে লাগলাম। একটু পরে শুধু বাজনা নয়, নাচ শুরু হল। ভবসিন্ধু রীতিমতো দুলেদুলে নাচতে লাগল, ভবসিন্ধুর উপরে দুটো লেবু আর একটা খালি জলের বোতল রাখা ছিল। জলের বোতল সশব্দে মেজেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল, লেবু দুটো গড়িয়ে পড়ে খাটের নীচে চলে গেল। লেবু দুটোকে অনুসরণ করে চিলিও খাটের নীচে প্রবেশ করল। এই দৃশ্যের যবনিকা পতন হল, মিনতির একটি হিমশীতল আর্তনাদে এবং সেই সঙ্গে তাতাইয়ের চিৎকারে।

অত রাতেও আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এল। পাশের বাড়িতে এক অবসরপ্রাপ্ত সৈন্যবাহিনীর মেজর ছিলেন। দুঃসাহসী বলে তাঁর নাম আছে, তিনি হাত দিয়ে ভবসিন্ধুকে নিবৃত্ত করতে গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য ধাক্কায় চিৎপাত হলেন।

চতুর্দিকে আশঙ্কা, উত্তেজনা ও হাহাকার। এরই মধ্যে একটি ঢ্যাঙা মতন ছেলে ভিড় ঠেলে এসে ফ্রিজের সুইচটা অফ করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ভবসিন্ধুর নৃত্যগীত সমাপ্ত হল। ছেলেটি কী একটা বোঝাতে চাইল, এটা অন্য ভোলটেজের মেশিন, তাই ভেতরের মোটরটা একদম ভড়কে গেছে।

আমাদের কিন্তু এসব বৈজ্ঞানিক বা বৈদ্যুতিক ব্যাখ্যা মনে ধরল না। আস্তে আস্তে লোকজন চলে গেল। আমরা গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে শুতে গেলাম।

পরদিন সকালবেলা অফিসে গিয়ে প্রথম কাজ হল গয়ায় আমাদের পরিচিত এক পাণ্ডাকে ওই সাহেবের নাম জানিয়ে একান্ন টাকা মানি অর্ডার করে পাঠানো, লোকটার নামে একটা পিণ্ড দেওয়ার জন্য। সাতদিন পরে পাণ্ডাঠাকুর জানালেন, এখন আর এত কম টাকায় পিণ্ডিদান হয় না, তা ছাড়া বিধর্মীর পিণ্ডদানে খরচা বেশি, আরও দেড়শো টাকা পাঠাতে হবে।

তাই পাঠালাম। এর মধ্যে আমি আর বিজন একদিন ট্যাক্সি করে গিয়ে বাবুঘাট থেকে দু’ কলসি গঙ্গাজল নিয়ে এলাম। ভবসিন্ধুকে বাথরুমে শাওয়ারের নীচে ঠেলে নিয়ে গিয়ে ভালভাবে স্নান করালাম, তারপরে দু’ বালতি গঙ্গাজল দিয়ে ভাল করে মুছলাম।

আধিভৌতিক এ সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মিস্ত্রি ডেকে ভবসিন্ধুর চিকিৎসা করালাম। আগাগোড়া নতুন রং করালাম।

কিন্তু ভবসিন্ধু আর চালু হল না। গয়ায় পিণ্ডিদানের জন্যেই হোক অথবা মেরামতির গলতির জন্যেই হোক সে একদম থেমে গেল। নাচগান তো দূরের কথা, মেশিনটা আর চলে না। তবে সারানোর পরেপরেই একবার হয়েছিল, হঠাৎ চলতে শুরু করেছিল, কিন্তু তার কাজ ছিল বিপরীত। সে খাবারপত্র ঠান্ডা না করে গরম করতে লাগল। ব্যাপারটা ধরার পর মিনতি সেবার শীতে আমাদের মাছ, তরকারি, ভাত ভবসিন্ধুর মধ্যেই রাখত, বেশ গরম থাকত খাবার-দাবার। অবশ্য এই তাপদান খুব বেশিদিন চলেনি। এরপর থেকে ভবসিন্ধু একদম থেমে গুম হয়ে আছে।

ভবসিন্ধুকে আমরা বিদায় করিনি। সে এখনও বাসায় আছে। তাতে শীতের লেপ-কম্বল তুলে রাখা হয়। আর প্রত্যেকবার বসন্তকালে ভবসিন্ধুর দরজাটা খুলে রাখি। পাশের বাড়িতে রূপসী নামে মেনিবেড়াল আছে, সে বছরে দিন পনেরোর জন্যে ব্যবহার করে প্রসূতিসদন হিসেবে ভবসিন্ধুর একটা তাক।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor