Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাঅনুবাদ গল্পআদম ও ইভ-এর দিনপঞ্জী - মার্ক টোয়েন

আদম ও ইভ-এর দিনপঞ্জী – মার্ক টোয়েন

অংশ ১-আদম-এর দিনপঞ্জী থেকে উদ্ধৃতি

সোমবার। লম্বা চুলওয়ালা এই নতুন জীবটি পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বদা আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে, আমি যেখানে যাই সেখানেই যাচ্ছে। এটা আমি পছন্দ করি না; কারও সঙ্গে থেকে আমি অভ্যস্ত নই। অন্য প্রাণীদের সঙ্গে থাকলেই তো পারে।…দিনটা মেঘলা, পূবের বাতাস বইছে; মনে হচ্ছে, আমরা বৃষ্টি পাব…আমরা? এ শব্দটা কোথায় পেলাম?-এখন মনে পড়ছে-নতুন জীবটি কথাটা ব্যবহার করে।

মঙ্গলবার। বড় জলপ্রপাতটা ভাল করে দেখেছি। মনে হয়, দেশের সব চাইতে সুন্দর বস্তু। নতুন জীবটি ওটাকে বলে নায়াগারা জলপ্রপাত-কেন বলে আমি জানি না। বলে ওটাকে দেখতে নায়াগারা জলপ্রপাতের মত। এটা কোন কারণই নয়, এটা একগুঁয়েমি ও নির্বুদ্ধিতামাত্র। কোন কিছুর নামকরণের সুযোগই আমি পাই না কোন কিছু চোখে পড়ামাত্রই আমি আপত্তি জানাবার আগেই নতুন জীবটি সব কিছুর একটা নাম বলে দেয়। আর সব সময় সেই একই ওজুহাত দিয়ে বলে-জিনিসটা সেই রকমই দেখতে। যেমন ডোডো-র কথাই ধরা যাক। এক নজর দেখেই বলে ওঠে ওটা ডোডো-র মত দেখতে। আর সেই নামটাই থেকে যায়। এ নিয়ে তর্ক করতে আমার ভাল লাগে না, আর তর্ক করে কোন লাভও নেই। ডোডো! আমাকে যেমন ডোড়ের মত দেখতে নয়, তেমনই ওটাও

বুধবার বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচবার জন্য একটা আশ্রয় তৈরি করেছি, কিন্তু সেখানেও শান্তিতে থাকতে পারি না। নতুন জীবটি এসে ঢুকে পড়ে। তাকে বের করে দিতে চেষ্টা করলে তার মুখে সব কিছু দেখার যে গর্ত দুটো আছে তা দিয়ে জল ঝরতে থাকে; থাবার পিছন । দিকটা দিয়ে সে জল মুছে সে এমন শব্দ করতে থাকে যা অন্য প্রাণীরা দুঃখে পড়লে করে। সে যদি কথা না বলত তাহলেই ভাল হত। সব সময় বক্‌-ব করে। কথাটা শুনতে বেচারির প্রতি একটু কটুক্তির মত শোনায়, কিন্তু সে ভাবে আমি কথাটা বলি নি। আগে তো কখনও মানুষের গলা শুনি নি, তাই এখানকার এই স্বপ্নভরা নির্জনতার গল্পীর নৈঃশব্দের মধ্যে কোন নতুন বিচিত্র শব্দ হলেই সেটা আমার কানে লাগে এবং বেসুরো মনে হয়। আর এই নতুন শব্দটা হয় আমার এত কাছে, একেবারে ঘাড়ের উপরে, প্রথম এদিকে, তার পরে ওদিকে; অথচ সাধারণত আমি তো দূর থেকে আগত শব্দ শুনতেই অভ্যস্ত।

শুক্রবার। নামকরণের কাজটা বেপরোয়াভাবে এগিয়ে চলেছে; আমার যেন কিছুই করার নেই। জায়গাটার একটা খুব ভাল নাম আমি দিয়েছিলাম, নামটা যেমন সুরেলা তেমনই সুন্দর-ইডে ন উ দ্যান (Garden of Eden)। এখনও গোপনে আমি ঐ নামেই ডাকি, কিন্তু প্রকাশ্যে নয়। নতুন জীবটি বলে যে জায়গাটা তো জঙ্গল, পর্বত আর দৃশ্যাবলীতে ভরা। কাজেই উদ্যানের সঙ্গে এর কোন মিলই নেই। সে বলে এটাকে দেখতে একটা পার্কের মত, পার্ক ছাড়া আর কোন কিছুর মতই এটাকে দেখায় না। ফলে আমার সঙ্গে পরামর্শ না করেই এটার নতুন নাম রাখা হয়েছে-নায়াগারা জলপ্রপাত পার্ক। আমার মনে হয়, কাজটা খুবই গর্হিত হয়েছে। আর এর মধ্যেই একটা নির্দেশিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে:

ঘাস থেকে দূরে থাকুন

আমার জীবনে আর আগের মত সুখ নেই।

শনিবার। নতুন জীবটি বড় বেশী ফল খায়। মনে হচ্ছে আমরা শীঘ্রই ফলের অভাব বোধ করব। আবার আমরা–কথাটা তার; তবে বারবার শুনতে শুনতে এখন আমার সয়ে গেছে। সকালে খুব কুয়াশা পড়েছে। কুয়াসায় আমি বাইরে যাই না। নতুন জীবটি যায়। সে সব ঋতুতেই বের হয়, আর কাদা-মাখা পা নিয়ে ফিরে আসে। আর কথা বলে। জায়গাটা আগে মনোরম ও শান্ত ছিল।

রবিবার। সময় কাটছে। দিনকাল ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছে। গত নভেম্বরে এই দিনটিকেই বিশ্রামের দিন হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। আগে সপ্তাহে ছদিনই আমার বিশ্রাম ছিল। আজ সকালে দেখলাম নতুন জীবটি সেই নিষিদ্ধ গাছ থেকে আপেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

সোমবার। নতুন জীবটি বলে, এটার নাম ইভ। বেশ তো, আমার কোন আপত্তি নেই। বলে, এটাকে যখন কাছে ডাকব তখন যেন ঐ নামেই ডাকি। আমি বললাম, এর কোন দরকার ছিল না। তবে এটা ভাল, শব্দটা বারবার উচ্চারণ করা যায়। সে বলে, এটা (lt) নয়, বলতে হবে সে (She)। এ কথা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে আমার কাছে দুইই সমান; সেই হোক আর যাই হোক, তাতে আমার কিছু আসে-যায় না, শুধু সে একা একা থাকলেই হল, কথা না বললেই হল।

মঙ্গলবার। জঘন্য নাম আর আপত্তিজনক নির্দেশিকা দিয়ে সে সমস্ত জায়গাটাকে ভরে দিয়েছে:

এই পথে জলাবর্ত
এই পথে অজ দ্বীপ
বায়ুগুহায় যাবার এই পথ

সে বলে, প্রথাটা প্রচলিত হলে এই পার্কটা একটা সুন্দর গ্রীষ্মবাস হয়ে উঠবে। গ্রীষ্মবাস-তার আর একটা আবিস্কার-শুধুই কথা, কোন অর্থ নেই, গ্রীষ্মবাস আবার কি? কিন্তু তাকে জিজ্ঞাসা না করাই ভাল, সব কিছুরই একটা ব্যাখ্যা সে দিতে পারে।

শুক্রবার। আমি যাতে প্রপাতে না যাই সে জন্য আমাকে সে মিনতি করতে শুরু করেছে। তাতে ক্ষতিটা কি? বলে, ওকথা ভাবলেই তার গায়ে কাঁটা দেয়। আমি তো অবাক। আমি তো সব সময়ই এ কাজ করে এসেছি-ওখানে ডুব দিয়েছি, ঠাণ্ডা হয়েছি। আমার তো ধারণা প্রপাতগুলো এই জন্যই হয়েছে। আমি তো তাদের আর কোন উপকারিতা দেখি না, কিন্তু কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে তো তাদের বানানো হয়েছিল। সে বলে, ওগুলো বানানো হয়েছে শুধু দেখার জন্য-গণ্ডার ও মাস্টোডেনদের মত।

একটা পিপে নিয়ে প্রপাতে গিয়েছিলাম-সেটা তার পছন্দ নয়। গামলা নিয়ে গিয়েছিলাম-তাও পছন্দ নয়। ডুমুরের পাতার পোশাকে জলাবর্তে ও তীব্র স্রোতে সাঁতার কেটে ছিলাম। তাতে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তাই আমার বাড়াবাড়ি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এখানে। অনেক বাধা দেখা দিয়েছে। আমাকে জায়গা বদলাতে হবে।

শনিবার। গত মঙ্গলবার রাতে পালিয়ে এসেছি। দুই দিন একটানা হেঁটে এখানে এসেছি। নির্জন জায়গা দেখে নতুন আশ্রয় তৈরি করেছি। যতদূর সম্ভব আমার পায়ের দাগ মুছে দিয়ে এসেছি, কিন্তু একটা পশুর সাহায্যে সে আমাকে খুঁজে বের করেছে; পশু টা তার পোষা; সে নেকড়ে বলে ডাকে। এখানে এসেই আবার সেই করুণ শব্দ করতে শুরু করেছে, আর দেখার দুটো গর্তের ভিতর থেকে থেকে জল ঝরাতে শুরু করেছে। তার সঙ্গে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার পালাব। অনেক বাজে কাজ নিয়ে সে মাথা ঘামায়। যেমন, সে জানতে চায়, সিংহ এবং ব্যাঘ নামক প্রাণীদের যে রকম দাঁতের গড়ন তাতে তাদের উচিত ছিল পরষ্পরকে খাওয়া, কিন্তু তার বদলে কেন তারা ঘাস-পাতা-ফুল খেয়ে বাঁচে এটা সে জানতে চায়। কি বোকার মত কথা। আরে, তাহলে তো একে অপরকে হত্যা করবে, আর তার অর্থই হল যাকে বলে মৃত্যু-কে আমদানি করা। কিন্তু আমি তো শুনেছি, মৃত এখনও পার্ক-এ প্রবেশাধিকার পায় নি। এটা তো খুবই দুঃখের কথা।

রবিবার। দিন কাটছে।

সোমবার। মনে হচ্ছে সপ্তাহের উদ্দেশ্যটা আমি বুঝতে পারছিঃ রবিবারের ক্লান্তির পরে ওটাই বিশ্রামের সময়। ধারণাটা বেশ ভাল বলেই মনে হয়।…সে আবার ঐ গাছে উঠেছে। ঢিল ছুঁড়ে তবে নামিয়ে এনেছি। সে বলল, কেউ তাকে দেখতে পায় নি। সে কোন বিপদের ঝুঁকি নেবার পক্ষে সেটাকেই সে বড় যুক্তি বলে মনে করে। সে কথা তাকে বলেছি। যুক্তি কথাটার সে প্রশংসা করছে-আবার ঈর্ষাও করেছে বলে মনে হয়। কথাটা বেশ ভাল।

মঙ্গলবার। সে আমাকে বলল, আমার শরীরের একটা পাঁজর নিয়েই নাকি তাকে তৈরি করা হয়েছে। কথাটা সন্দেহজনক তো বটেই, তবে তার চাইতে বেশী কিছু নয়। আমার কোন পাঁজর তো খোয়া যায় নি।…বাজ পাখিটাকে নিয়ে সে খুব মুস্কিলে পড়েছে; বলছে, সেটার ঘাস খেতে ভাল লাগছে না; তার ভয় হচ্ছে, সেটা হয় তো বাঁচবে না; তার ধারণা, তার বাঁচার কথা পচা মাংস খেয়ে। যা খেতে দেওয়া হবে তাই খেয়েই বাজ পাখিটার যথেষ্ট সুস্থ থাকা উচিত। বাজ পাখির সুবিধার জন্য তো আমরা সব বিধি-ব্যবস্থা পাল্টাতে পারি না।

শনিবার। গতকাল পুকুরের জলে নিজেকে দেখতে গিয়ে সে জলে পড়ে গিয়েছিল। এ কাজ সে সব সময়ই করে। তার প্রায় দম আট কে । আসছিল; বলছে, তার খুব অস্বস্তি লেগেছিল। তাই জলের মধ্যে যে জীবরা থাকে তাদের জন্য তার খুব দুঃখ হয়েছে; তাদের সে ডাকে মাছ বলে; যে কোন জিনিসের একটা নাম দেবার অভ্যাস তার এখনও আছে; তাদের নামের কোন দরকারই নেই, নাম ধরে ডাকলে তারা আসেও না; সে এত বোকা যে তাতেও তার কিছু আসে যায় না। কাল রাতে অনেকগুলো মাছ ধরে এনে গরম রাখবার জন্য। আমার বিছানায় ছেড়ে দিয়েছে; সারাটা দিনই আমি তাদের উপর নজর রেখেছি; তারা যে আগের চাইতে কিছু সুখে আছে তা তো মনে হয় না, বরং কিছুটা চুপচাপ আছে বলা যায়। রাত হলেই সেগুলোকে বাইরে ফেলে দেব, কারণ দেখতে পাচ্ছি গায়ে কিছু না থাকলে তাদের সঙ্গে একত্র শুয়ে থাকা খুবই অস্বস্তিকর।

রবিবার। দিন কাটছে।

মঙ্গলবার। এবার একটা সাপ নিয়ে পড়েছে। অন্য জীবজন্তুরা এতে খুসি হয়েছে, কারণ সে সব সময়ই তাদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের নানা ভাবে উৎপাৎ করছে; আর আমি খুসি হয়েছি কারণ সাপটা কথা বলে, আর তার ফলে আমি বেশ কিছুটা বিশ্রাম পাই।

শুক্রবার। সে বলছে, সাপটা তাকে ঐ গাছের ফল খাবার পরামর্শ দিয়েছে; বলেছে, তার ফলে একটা উদার সুমহান শিক্ষা লাভ হবে। আমি তাকে বলেছি, আরও একটা ফলও হবে-তার ফলে পৃথিবীতে মৃতার আবির্ভাব ঘটবে। বলাটা ভুল হয়েছে-কথাটা নিজের মনে রাখলেই ভাল ছিল; এতেই ধারণাটা তার মাথায় গজিয়েছে-তাহলে তো সে রুগ্ন বাজ পাখিটাকে বাঁচাতে পারে; হতাশ সিংহ ও বাঘদেরও তাজা মাংস খাওয়াতে পারে। আমি তাকে গাছটা থেকে দূরে থাকবার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু সে তা শুনবে না। বিপদের আভাষ পাচ্ছি। চলে যাব।

বুধবার। বিচি এভাবে সময় কাটছে। গতরাতে পালিয়েছি; সারা রাত ঘোড়া ছুটিয়েছি; মনের আশা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পার্ক ছেড়ে চলে যাব, বিপদ শুরু হবার আগেই অন্য কোন দেশে লুকিয়ে পড়ব; কিন্তু তা হবার নয়। সূর্য উঠবার ঘণ্টাখানেক পরে একটা ফুলে ঢাকা প্রান্তরের ভিতর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছি; হাজার হাজার জীবজন্তু ঘাস খাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে, যার যেমন খুসি পরষ্পরের সঙ্গে খেলা করছে; হঠাৎ তাদের উপর দিয়ে আর্ত চীৎকারের ঝড় বয়ে গেল; মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত প্রান্তরটা উন্মত্ত উত্তেজনায় ভরে গেল; প্রতিটি জন্তু তার প্রতিবেশীকে সংহার করতে লাগল। এর অর্থ আমি জানতাম-ইভ সেই ফল খেয়েছে, আর মৃত্যু নেমে এসেছে। পৃথিবীতে। আমার নির্দেশ না মেনে বাঘ আমার ঘোড়াটাকে খেয়ে ফেলল; কাছে থাকলে আমাকেও খেত-কিন্তু আমি সেখানে থাকি নি, অতি দ্রুত সরে পড়েছি।…পার্কের বাইরে এই জায়গাটা পেলাম, কয়েক দিন আরামে কাট ল, কিন্তু সে আমাকে আবার খুঁজে পেয়েছে। আমাকে পাবার পরে জায়গাটার নাম দিয়েছে টোনাওয়াণ্ডা-বলছে এটা দেখতে সেই রকম। আসলে সে আসায় আমি দুঃখিত হই নি, কারণ এখানে খাবার জিনিস খুব কম, আর সে ঐ আপেল কিছু নিয়ে এসেছে। এত ক্ষিধে পেয়েছিল যে আমি বাধ্য হয়ে সে আপেল গুলি খেয়েছি। এ কাজটা আমার নীতিবিরুদ্ধ, কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি যে পেট ভরা না থাকলে নীতির কোন সত্যিকারের জোর থাকে না। …সে এবার এসেছিল গাছের ডাল ও পাতার গুচ্ছে নিজের দেহকে ডেকে; যখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এ সব আজেবাজে কাজের অর্থ কি এবং ডালপালাগুলো কেড়ে নিয়ে ফেলে দিলাম, তখন সে লজ্জা পেয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগল। এর আগে কখনও কাউকে লজ্জা পেতে বা মুখ টিপে হাসতে দেখি নি; আমরা মনে হল, ও কাজটা যেমন অশোভন তেমনই বোকা-বোকা। সে বলল, ও রকম অবস্থা আমিও শিগগিরই টের পাব। কথাটা ঠিক। খুব ক্ষুধার্ত হলেও আধ-খাওয়া আপেলটা আমি রেখে দিলাম-মরশুমের শেষে এ রকম ভাল আপেল বড় একটা দেখা যায় না-এবং ঐ ফেলে দেওয়া ডালপালায় নিজেকে ঢেকে নিলাম। তারপর কঠোর গলায় তাকে হুকুম করলাম,এখনই গিয়ে আরও কিছু আপেল যেন সে নিয়ে আসে এবং এবার যেন ওরকম সং সেজে না আসে। সে তাই করল। তারপর যেখানটায় বন্যপশু দের লড়াই হয়েছিল আমরা দুজন হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে গেলাম, কিছু চামড়া সংগ্রহ করলাম এবং তা দিয়ে উৎসবের উপযোগী দুটো পোশাক বানিয়ে নিলাম। একথা ঠিক যে সেগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু বেশ কেতাদুরন্ত, আর পোশাকের সেটাই তো আসল কথা।…এখন দেখছি সাতী হিসাবে সে ভালই। মনে হচ্ছে, তাকে ছাড়া আমার খুব নিঃসঙ্গ ও মন-মরা লাগবে। আর একটা কথা; সে বলছে, এখন থেকে আমাদের খাবার আমরা নিজেরাই তৈরি করব। এটাই বিধি। সে কাজ করবে। আমি তদারক করব।

দশ দিন পরে। আমাদের দুর্বিপাকের কারণ হিসাবে সে আমাকেই দায়ী করেছে। সে বলছে, আপাতদৃষ্টিতে আন্তরিকতা ও সতোর সঙ্গেই বলেছে, নিষিদ্ধ ফল যে আপেল নয়, সেটা বাদাম-সে কথা সাপ তাকে নিশ্চিত করেই বলেছে। আমি বললাম, তাহলে তো আমি নির্দোষ, কারণ কোন রকম বাদাম আমি খাই নি। সে জানাল, সাপ তাকে জানিয়েছে যে বাদাম একটি আলংকারিক শব্দ; তার অর্থ একটি সেকেলে ছাতা-পরা ঠাট্টা। আমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কারণ সময় কাটাবার জন্য ও ধরনের ঠাট্টা। আমি অনেক করেছি, অবশ্য ঠাট্টা করবার সময় আমার ধারণা ছিল যে ওগুলো সবই নতুন। সে জানতে চাইল, ঠিক দুর্বিপাকের সময় কোন ঠাট্টা আমি করেছিলাম কিনা। আমি বাধ্য হয়ে স্বীকার করেছি যে মনে মনে একটা ঠাট্টা আমি করেছিলাম, যদিও সেটা মুখে উচচারণ করি নি। সেটা এই। প্রপাতের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের মনে বলেছিলাম, সেই প্রচণ্ড জলধারা সেখানে যেভাবে আছড়ে নীচে পড়ছে দেখতে অবাক লাগে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা চিন্তা আমার মাথার মধ্যে ঝলসে উঠল; আমি বললাম, সেটা যদি সেখানে উথলে উপরে ওঠে তাহলে সেটা আরও অবাক ব্যাপার হবে!-সে কথা ভাবতে গিয়ে হাসতে হাসতে আমার প্রায় খুন হবার যোগাড় এমন সময় গোটা প্রকৃতি জুড়েই যুদ্ধ ও মৃত্যুর উন্মাদ নৃত্য শুরু হয়ে গেল, আর আমি প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেলাম। সে বিজয় গৌরবে বলে উঠল, ঐ তো, এটাই ব্যাপার; এই ঠাট্টাটা উল্লেখ করেই সাপ এটাকে বলেছে প্রথম বাদাম আর এটা সৃষ্টির গোড়া থেকেই আছে। হায়রে, সত্যি আমারই তো দোষ। অতটা চতুর যদি আমি না হতাম; আহা, ঐ উজ্জ্বল চিন্তাটা যদি আমার মনে না আসত!

পরের বছর। আমরা তার নাম রেখেছি কেইন। এরি-র উত্তর তীরে আমি যখন জাল ফেলে বেড়াচ্ছিলাম তখন সে ওকে ধরেছে। আমাদের গর্তের আশ্রয় থেকে মাইল দুই দূরে-চার মাইলও হতে পারে কি না সে সঠিক জানে না-একটা গাছ থেকে সে তাকে ধরেছে। সেটা দেখতে অনেকটা আমাদের মত; আমাদের কোন আত্মীয়ও হতে পারে। তার তাই ধারণা, কিন্তু আমার মতে এটা ভুল। আকারের পার্থক্য থেকেই প্রমাণ হয় যে সেটা একটা নতুন ধরনের জীব-হয় তো মাছ, যদিও ব্যাপারটা বুঝবার জন্য আমি যখন সেটাকে জলে ফেলে দিলাম তখন সেটা ডুবে গেল, আর কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগেই সে জলে ডুব দিয়ে সেটাকে উপরে তুলে নিয়ে এল। আমি এখনও মনে করি সেটা মাছ, কিন্তু তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই; সেটা যাই হোক না কেন, তাকে নিয়ে কোন রকম পরীক্ষা চালাতে সে আমাকে দেবে না। আমি এটা বুঝতে পারি না। এই জীবটির আসার ফলে তার স্বভাবের বেশ পরিবর্তন হয়েছে; পরীক্ষা করার ব্যাপারে কোন যুক্তিই সে মানে না। অন্য কোন জীবের চাইতে সেটার সম্পর্কে সে অনেক বেশী ভাবনা-চিন্তা করে; কেন করে তা বোঝাতে পারে না। তার মনটাই এলোমেলো হয়ে গেছে-সব কিছু থেকেই তা বোঝা যায়। মাছটা যখন খুঁতখুঁত করে আর জলে যেতে চায় তখন অর্ধেক রাত সে তাকে কোলে নিয়ে কাটায়। সে সময় মুখের সে জায়গা দিয়ে সে দেখে সেখান থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, মাছটার পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয় মুখে অস্পষ্ট শব্দ করে তাকে শান্ত করে এবং আরও শতেক রকমে দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে। অন্য কোন মাছকে নিয়ে তাকে কখনও এ রকম করতে দেখি নি। তাই আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। আমাদের সম্পত্তি হারাবার আগে সে এই ভাবে বাঘের বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াত, তাদের সঙ্গে খেলা করত; কিন্তু সে তো ছিল খেলামাত্র; তারা যখন খেতে চাইত না তখন তো সে তাদের নিয়ে এ রকম করত না।

রবিবার। রবিবারে সে কোন কাজ করে না; ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে, আর মাছটা তার বুকের উপর খেলা করতে থাকে; সেটাকে খুসি। করবার জন্য নানা রকম অর্থহীন শব্দ করে, কখনও থাবাটা কামড়ে দেবার ভান করে, আর সেটা হেসে ওঠে। হাসতে পারে এ রকম কোন মাছ আমি আগে দেখি নি। তাই আমার সন্দেহ হয়..আমি নিজেও বুঝি রবিবারকে ভালবাসতে শিখেছি। সারা সপ্তাহ তদারকির কাজ করে এত শ্রান্ত হয়ে পড়ি। আরও রবিবার থাকা উচিত। আগেকার দিনে রবিবারগুলো ছিল কঠোর। কিন্তু এখন তারা আরামের হয়ে উঠেছে।

বুধবার। এটা মাছ নয়। এটা যে কি তাও বুঝতে পারি না। ক্ষেপে গেলেই এটা অদ্ভুত সব শয়তানী শব্দ করতে থাকে, আর খুসি থাকলে — করে। এটা আমাদের কেউ নয়, কারণ এ হাঁটে না; এটা পাখি নয়, কারণ ওড়ে না; এটা ব্যাঙ নয়, কারণ লাফায় না; এটা সাপ নয়, কারণ বুকে হাঁটে না; আমি নিশ্চিত জানি যে এটা মাছও নয়, যদিও এটা সাঁতার কাটতে পারে কি না সে পরীক্ষা করার সুযোগ এখনও পাই নি। এটা শুধু শুয়ে থাকে, অধিকাংশ সময়ই চিৎ হয়ে পা নাচায়। আগে কখনও কোন জীবকে এ রকম করতে দেখি নি। আমার বিশ্বাস, এটা একটা প্রহেলিকা। সে কিন্তু অর্থ না বুঝেই কথাটার খুব প্রশংসা করল। আমার মতে এটা প্ৰহেলিকাও নয়, ছারপোকাও নয়। এটা যখন মারা যাবে, তখন এটাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখব এর মধ্যে কি আছে। আর কোন কিছুই আমাকে এতটা হতবুদ্ধি করতে পারে নি।

তিন মাস পরে। হতবুদ্ধিকর ভাবটা কমার বদলে বেড়েই চলেছে। সামান্যই ঘুম হয়। এটা এখন শুয়ে না থেকে চার পায়ে ঘুরে বেড়ায়। অথচ অন্য সব চার-পেয়ে জন্তুর থেকে এটা আলাদা, কারণ এর সামনের পা দুটো অস্বাভাবিক রকমের ছোট; ফলে এর শরীরের বেশীর ভাগ অংশটাই অস্বস্তিকরভাবে উঁচু হয়ে থাকে, আর সেটা দেখতে মোটেই ভাল লাগে না। এর দেহ-গঠন অনেকটা আমাদের মতই, কিন্তু চলাফেরার ধরন দেখে মনে হয় এটা আমাদের সন্তান নয়। সামনের ছোট পা আর পিছনের লম্বা পা দেখে মনে হয় এটা ক্যাঙারু জাতের প্রাণী, কিন্তু এটা ক্যাঙারু নয়, একটা আলাদা শ্রেণী, কারণ সত্যিকারের ক্যাঙারু লাফিয়ে চলে, আর এটা কখনও লাফায় না। তবু এটা একটা বিচিত্র আকর্ষণীয় জীবশ্রেণী; এখনও এদের শ্রেণীবিভাগ করা হয় নি। যেহেতু আমি একে আবিষ্মর। করেছি, তাই এর সঙ্গে আমার নামটা জুড়ে দিয়ে সেই আবিস্কারের কৃতিত্ব অর্জন করবার অধিকার অবশ্যই আমার কাছে, আর সেই জন্যই এটার নাম দিয়েছি ক্যাঙারুরাম আদমিয়েসিস্ …যখন এসেছিল তখন নিশ্চয় খুব ছোট ছিল, কারণ তারপর থেকে এটা অনেকটা বেড়ে গেছে। আকারে তখনকার তুলনায় পাঁচ গুণ বড় হয়ে গেছে, আর রাগলে যা শব্দ করতে পারে সেটা আগের তুলনায় বাইশ থেকে আট ত্রিশ গুণ বেশী। জোর করলে এটার গলা থামে না, বরং উল্টো ফল হয়। সে কারণে আমি জোর করা ছেড়ে। দিয়েছি। সে কিন্তু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এটাকে শান্ত করে, এমন সব জিনিস দিয়ে এটাকে ভোলায় যা সে কাউকে দেবে না বলে আগে আমাকে বলত। আগেই বলেছি, এটা যখন প্রথম আসে তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না; সে আমাকে বলেছিল, জঙ্গলের মধ্যে এটাকে পেয়েছি। এটাও আশ্চর্য যে এ রকম প্রাণী শুধু একটাই আছে; অথচ আসলে তাই, কারণ আমার সংগ্রহে এ রকম আর একটি প্রাণী যোগ করতে, এবং এটার জন্য একটি খেলার সাথীর ব্যবস্থা করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে এ রকম আর একটি প্রাণী খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান হয়ে গেছি। এ রকম আর একটি খেলার সঙ্গী পেলে এটা অনেক শান্ত থাকত, এবং এটাকে পোষ মানানোও অনেক সহজ হত। কিন্তু কোথাও পাই নি, কোন চিহ্ন পর্যন্ত মেলে নি; আর সব চাইতে আশ্চর্য, একটা পায়ের ছাপ পর্যন্ত চোখে পড়ে নি। একে তো মাটির উপরেই থাকতে হয়, তাহলে পায়ের ছাপ রেখে চলাফেরা করে কেমন করে? এক ডজন ফাঁদ পেতেছি। কোন ফল হয় নি। ঐ রকমটি ছাড়া আর সব রকম ছোট প্রাণী ধরেছি। সাধারণত ফাঁদের ভিতরকার দুধের লোভেই সে সব জীব ফাঁদে ঢোকে। কিন্তু এরা কখনও দুধ খায় না।

তিন মাস পরে। ক্যাঙারু ক্রমেই বড় হচ্ছে; সেটাই আরও আশ্চর্য ও হতবুদ্ধিকর। এত দীর্ঘদিন ধরে বড় হতে তো কোন প্রাণীকে দেখি না। এখন এটার মাথায় লোম গজিয়েছে; ক্যাঙারুর মত লোম নয়, অনেকটা আমাদের চুলের মত, তবে আরও পাতলা ও নরম, এবং কালোর বদলে লাল। জীব জগতের এই বিচিত্র খেয়ালী সৃষ্টিটির খামখেয়ালী ও হতবুদ্ধিকর কাণ্ড-কারখানা দেখে আর মাথা খারাপ হবার যোগাড়। যদি আর একটাকে পেতাম-কিন্তু সে আশাও নেই; এটা একটা নতুন জীবশ্রেণী: একমাত্র নিদর্শন; সেটা পরিষ্কার। যাই হোক, একটা সত্যিকারের ক্যাঙারু ধরে নিয়ে এলাম। ভাবলাম, এটা তো একেবারেই সঙ্গীহীন অবস্থায় আছে, তাই হয় তো একটা সঙ্গী পেলে তবু কিছুটা স্বস্তি পাবে। কিন্তু আমারই ভুল হয়েছিল-ক্যাঙারুটাকে দেখেই এটা এমন ক্ষেপে গেল যে বুঝতে পারলাম আগে এ কখনও ক্যাঙারু দেখেই নি। বেচারির জন্য আমার করুণা হয়, কিন্তু কিছুতেই তো এটাকে সুখী করতে পারছি না। যদি পোষ মানাতে পারতাম-কিন্তু সে প্রশ্নই ওঠে না; সে চেষ্টা যত করেছি অবস্থা ততই বেশী শোচনীয় হয়েছে। বেচারি যখন দুঃখে ও ক্ষোভে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তখন আমিও দুঃখ পাই। আমি এটাকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে তো তা শুনবে না।

পাঁচ মাস পারে। এটা ক্যাঙারু নয়। না, কারণ তার আঙুল ধরে এটা এখন দাঁড়াতে পারে; পিছনের পায়ে ভর রেখে কয়েক পা এগিয়েই পড়ে যায়। সম্ভবত এটা এক ধরনের ভালুক; কিন্তু এর তো লেজ নেই, আর মাথার উপরে ছাড়া আর কোথাও লোমই নেই। এটা এখনও বেড়েই চলেছে-সেটাই আরও আশ্চর্য, কারণ ভালুকদের বাড় আরও আগেই থেমে যায়। ভালুকরা বড়ই বিপজ্জনক; সেটা যে সব সময় আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াবে সেটা আমি চাই না। তাকে বললাম, এটাকে ছেড়ে দিলে তাকে একটা ক্যাঙারু এনে দেব; কিন্তু তাতেও কোন ফল হল না-আমাদের সব রকম অকারণ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে সে যেন বদ্ধপরিকর। মাথা খারাপ হবার আগে সে এ রকম ছিল না।

পক্ষকাল পরে। এটার মুখ পরীক্ষা করে দেখেছি। এখনও ভয়ের কিছু নেই: মাত্র একটা দাঁত গজিয়েছে। এখনও কোন লেজ নেই। এখন আগের চাইতে অনেক বেশী হট্টগোল করে-বিশেষ করে রাতে। আমি বেরিয়ে এসেছি, সকালে যখন প্রাতরাশ খাব তখন আর একবার দেখব আরও দাঁত উঠেছে কি না। মুখ ভর্তি দাঁত উঠলেই এটাকে তাড়াব,লেজ হোক আর নাই হোক, কারণ বিপজ্জনক হবার জন্য ভালুকের কোন লেজের দরকার হয় না।

চার মাস পরে। এক মাস হল এমন একটা অঞ্চলে শিকার করতে ও মাছ ধরতে এসেছি যাকে সে মহিষ বলে; কেন বলে তা জানি না, তবে এ অঞ্চলে কোন মোষ নেই সেটা কারণ হলেও হতে পারে। ইতিমধ্যে ভালুকটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে একা একাই হাঁটতে পারে এবং প ও মা বলে। অবশ্যই এটা একটা নতুন ধরনের জীব। এই কথার মিল সম্পূর্ণ আকস্মিকও হতে পারে, হয়। তো এর কোন উদ্দেশ্য বা অর্থও নেই, কিন্তু তবু এটা খুবই অসাধারণ এবং আর কোন ভালুকই এ রকমটা করতে পারে না। এই কথা নকল করবার ক্ষমতা, লোম ও লেজ না থাকা-সব মিলিয়ে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে এটা একটা নতুন ধরনের ভালুক। একে নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা খুবই আকর্ষণীয় হবে। ইতিমধ্যে আমি উত্তরের অরণ্যে বহু দূরে অভিযানে বের হব এবং ব্যাপক অনুসন্ধান চালাব। কোথাও না কোথাও এটার একজন সাথী অবশ্য আছে, আর তাকে পেলেই এর বিপজ্জনক ভাব অনেকটা কেটে যাবে। আমি সোজা চলে যাব; কিন্তু তার আগে এটার মুখে লাগাম পরিয়ে দেব।

তিন মাস পরে। অনেক খুঁজেছি, খুঁজে হয়রান হয়েছি, কিন্তু কোন ফল হয় নি। ইতিমধ্যে বাড়ি থেকে না বেরিয়েই সে আর একটাকে ধরেছে! এমন ভাল কপাল আমি আর দেখি নি। আমি তো একশ বছর ধরে বনে বনে ঘুরলেও আর একটার দেখা পেতাম না।

পরদিন। পুরনোটার সঙ্গে নতুনটাকে মিলিয়ে দেখেছি; এটা খুবই পরিষ্কার যে তারা একই বংশের সন্তান। আমার সংগ্রহশালার জন্য দুটোর একটাকে খড় ভর্তি করে রেখে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যে কারণেই হোক সে তার ঘোর বিরোধী। কাজেই সে চিন্তা ছেড়ে দিয়েছি, যদিও আমি মনে করি যে এটা ভুল হয়েছে। তারা পালিয়ে গেলে বিজ্ঞানের পক্ষে একটা অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বড়টা আগের চাইতে অনেক শান্ত হয়েছে; এখন হাসতে পারে, তোতা পাখির মত কথা বলতে পারে; অবশ্য তোতা পাখিটার সঙ্গে এত বেশী সময় থাকার জন্য এবং নকল। করবার অত্যধিক ক্ষমতার ফলেই সেটা এ সব শিখতে পেরেছে। এটা একটা নতুন ধরনের কাকাতুয়া হয়ে ওঠে তাহলে খুবই অবাক হব; অথচ অবাক হওয়া উচিত নয়, কারণ সেই প্রথম দিকে এটা যখন মাছ ছিল তারপর থেকে সেটা তো অনেক কিছুই হয়েছে। বড়টা গোড়ায় যে রকম কুৎসিত ছিল নতুনটাও এখন ঠিক সেই রকম দেখতে; সেই একই গন্ধক ও কাঁচা মাংস মেশানো রং, সেই একই লোমহীন মাথা। সে এটার নাম রেখেছে আবেল। দশ বছর পর। দুটি ই ছেলে; অনেকদিন আগেই সেটা বুঝে ছি। খুব ছোট, অপরিণত আকার নিয়ে এসেছিল বলেই আমরা বুঝতে পারি নি; এ রকমটা দেখতে তো আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। আবেল ভাল ছেলে। কেইন যদি ভালুকই থাকত তাহলে এটা তাকে ভাল করে তুলত। এত বছর পরে বুঝতে পারছি যে গোড়ায় ইভ সম্পর্কে আমারই ভুল হয়েছিল; তাকে ছাড়া উদ্যানের ভিতরে থাকার চাইতে তাকে নিয়ে উদ্যানের বাইরে থাকাই ভাল। প্রথমে ভেবেছিলাম সে বড় বেশী কথা বলে; কিন্তু আজ যদি সে কঠ স্বর নীরব হয়ে যায় । আমার জীবন থেকে বিদায় নেয় তাহলে আমি বড় দুঃখ পাব। যে বাদাম আমাদের দুজনকে কাছে এনেছিল এবং তার অন্তরের সততা ও আত্মর মধুরতা জানবার শিক্ষা আমাকে দিয়েছিল,তার জয় হোক!

.

অংশ ২-ইভ-এর দিনপঞ্জী

(মূল থেকে ভাষান্তরিত)

শনিবার। আমার বয়স এখন প্রায় পুরো একদিন। আমি কাল এসেছি। আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে। আর আসলেও তাই, কারণ গত-পরশু বলে কিছু যদি থাকেও তখন আমি ছিলাম না; থাকলে আমার মনে থাকত। অবশ্য এও হতে পারে যে ব্যপারটা ঘটেছিল, কিন্তু আমি খেয়াল করি নি। খুব ভাল কথা;এখন থেকে আমি সতর্ক থাকব; যদি কোন গত-পরশু দেখা দেয়, আমি সেটা টুকে রাখব। শুরুটা সঠিক হওয়াই ভাল; কোন প্রামাণ্য দলিল গোলমেলে হওয়া ঠিক নয়; আমার মন বলছে, এই সব বিবরণ একদিন ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে। আমার নিজেকেও একটা পরীক্ষা বলে মনে হচ্ছে; মনে হচ্ছে আমাকে নিয়েই একটা পরীক্ষা চলেছে। ক্রমেই আমার দৃঢ় ধারণা জন্মেছে যে আসলে এটাই আমার অস্তিত্ব-আমি একটা পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নই।

আমি যদি একটা পরীক্ষা হই, সে ক্ষেত্রেও আমিই কি সে পরীক্ষার সব? না তা মনে করি না; আমার ধারণা, বাকিটাও তারই অংশ। আমি প্রধান অংশ হলেও, বাকিদেরও এতে অংশ আছে বলে মনে করি। আমার এই প্রাধান্য কি নিশ্চিত, না কি সেজন্য আমাকে সতর্ক থাকতে হবে, যত্নবান হতে হবে? হয় তো পরেরটাই ঠিক। আমার মন বলছে, চিরন্তন প্রহরা দিয়েই প্রাধান্যের মূল্য দিতে হয়। [কথাট বড় ভাল বলে আমার মনে হয়।]

গতকালের তুলনায় আজ সব কিছুই ভাল মনে হচ্ছে। গতকাল তাড়াহুড়া করে শেষ করতে গিয়ে পাহাড়গুলোকে এবড়ো-খেবড়ো অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছিল, আর প্রান্তর গু লোকে আজেবাজে জিনিস দিয়ে এতই ভর্তি করে রাখা হয়েছিল যে দৃশ্য গুলো খুবই পীড়াদায়ক লাগছিল। মহৎ ও সুন্দর শিল্পসৃষ্টির বেলায় কখনও তাড়াহুড়া করতে নেই; আর এই বিরাট নতুন জগৎটা নিশচয়ই একটা মহৎ ও শিল্পকর্ম। সময়ের স্বল্পতা সত্ত্বেও এ সৃষ্টি বিস্ময়করভাবে সম্পূর্ণতার প্রায় দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। কোথাও তারাদের সংখ্যা অত্যন্ত বেশী হয়ে গেছে, আবার কোথাও বা কম হয়েছে। তবে এ ক্রটি কে তো অচিরেই সংশোধন করা যাবে। গত রাতে চাঁদটা খসে পড়ে পুরো পরিকল্পনাটার বাইরে চলে গিয়েছিল-সেটা খুবই বড় রকমের ক্ষতি; সে কথা ভাবলেও আমার বুক ভেঙে যায়।অলংকরণ ও সাজসজ্জার দিক থেকে এমন আর কিছু নেই যাকে সৌন্দর্য ও নৈপুণ্যের বিচারে এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। চাঁদটাকে আরও ভাল করে এঁটে দেওয়া উচিত ছিল। আবার যদি তাকে ফিরে পেতাম

কিন্তু সে চাঁদ যে এখন কোথায় আছে তা কেউ বলতে পারে না। তাছাড়া, যেই ওটাকে পাবে সেই তো লুকিয়ে ফলবে। আমি জানি, কারণ আমিও তাই করতাম। আমার বিশ্বাস, অন্য সব ব্যাপারে আমি সৎ হতে পারি, কিন্তু এর মধ্যেই আমি উপলব্ধি করছি যে সুন্দরের প্রতি ভালবাসাই আমার অন্তরের প্রকৃত স্বরূপ; আর চাঁদ যদি অপরের সম্পত্তি হয় এবং সেই অপর লোক যদি না জানে যে চঁদটা আমার কাছে আছে, তাহলে সে চাঁদের ব্যাপারে আমাকে বিশ্বাস করাটা মোটেই নিরাপদ নয়। দিনের বেলায় চাঁদকে পেলে। আমি হয় তো দিয়ে দিতে পারতাম, কারণ সে ক্ষেত্রে আমার ভয় থাকত যে কেউ হয়তো দেখে ফেলেছে; কিন্তু অন্ধকারে পেলে কোন না কোন অজুহাতে নিশ্চয় কাউকে কিছু বলতামই না। কারণ চাঁদদের আমি ভালবাসি, তারা এত সুন্দর,এত রোমান্টিক। পাঁচ ছটা চাঁদ থাকলে কত ভাল হত; শুতেই যেতাম না; শেওলা-ধরা নদী-তীরে শুয়ে তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে কখনও শ্রান্ত বোধ করতাম না।

তারারাও ভাল। তাদের কয়েকটি কে যদি আমার চুলে গুঁজে রাখতে পারতাম। কিন্তু তা বোধ হয় কোন দিনই পারব না। তারা যে কত দুরে থাকে তা জানলে আপনারা অবাক হয়ে যাবেন, কারণ তাদের দেখে সেটা বোঝা যায় না। গত রাতে প্রথম যখন তাদের দেখলাম, তখন একটা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে কয়েকটাকে পাড়তে চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু-লাঠি টা অত দূর গেল না দেখে আমার অবাক লাগল; তারপর ঢিল ছুঁড়তে চেষ্টা করলাম। ক্রমে শ্রান্ত হয়ে পড়লাম, কিন্তু একটি। তারাও পেলাম না। তার কারণ আমি ন্যাটা, তাই ভাল ছুঁড়তে পারি না তাতে আমার কান্না পেল; আমার বয়সের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে একটা ঝুড়ি হাতে সেই জায়গাটার উদ্দেশে যাত্রা করলাম যেখানে আকাশের বৃত্তটা মাটির সঙ্গে মিশেছে এবং তারাগুলি মাটি র এত কাছাকাছি এসেছে যে হাত বাড়িয়েই তাদের তুলে নিতে পারব। আসলে সেই ব্যবস্থাই তো ভাল, কারণ এতে তারা গুলোকে না ভেঙে ই আস্ত তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু জায়গাটা যত কাছে ভেবেছিলাম তা নয়; তাই সে চেষ্টাও ছেড়ে দিলাম। এত ক্লান্ত হয়ে পড়লাম যে পা আর চলতে চায় না; তাছাড়া, পায়ে বেশ ঘাও হয়ে গিয়েছিল।

বাড়িতেও ফিরতে পারলাম না। অনেকটা পথ, আর বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল; কতকগুলো বাঘের সঙ্গে দেখা হওয়াতে তাদের কাছেই আশ্রয় নিলাম। বেশ আরামেই কাট ল; তাদের নিঃশ্বাস বেশ মিষ্টি ও সুখকর, কারণ তারা স্ট্রবেরি ফল খেয়ে বেঁচে থাকে। আগে কখনও বাঘ দেখি নি, কিন্তু গায়ের ডোরাকাটা দাগ দেখে এক মিনিটে ই চিনে ফেললাম। তাদের একটা চামড়া যদি পেতাম তাহলে চমৎকার একটা গাউন হত।

আজ দূরত্ব সম্পর্কে আমার ধারণা অনেক বেড়েছে। কোন ভাল জিনিস দেখলেই সেটা নিতে ইচ্ছা করছে; অনেক সময় জিনিসটা অনেক দূরে, আবার অনেক সময় মাত্র ছ ইঞ্চি দূরে হলেও মনে হয় যেন এক ফুট দূরে। যাহোক সেটাকে ধরতে গিয়েই দেখি কাটা বিধছে। একটা শিক্ষা হল; নিজের মাথা থেকে একটা সত্যও আবিষ্কার করলাম-এই আমার প্রথম সত্য: কাটাকে পরিহার করে চল। আমার মত অল্প বয়সীর পক্ষে এটা জানা খুব ভাল।

আরও একটা পরীক্ষার বস্তুকে দেখলাম। গতকাল অপরাহ্নে দূর থেকে দেখলাম। প্রথম বুঝতে পারলাম না। মনে হল একটা মানুষ। আগে কখনও মানুষ দেখি নি, কিন্তু এটা দেখতে মানুষেরই মত; সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। মনে হল, অন্য সব সরীসৃপের চাইতে এটার প্রতি আমার কৌতূহল বেশী। আমার ধারণা এটাও সরীসৃপ, কারণ এরও চুল নোংরা, আর চোখ নীল; দৃষ্টিও সাপের মত। এর উরু নেই; গাজরের মত উঠে গেছে; যখন দাঁড়ায় তখন ভারোত্তলক যন্ত্রের মত ছড়িয়ে পড়ে; তাই আমি মনে করি এটা সরীসৃপ, যদিও কোন স্থাপত্যও হতে পারে।

প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম, যতবার এটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল ততবারই দৌড়তে শুরু করেছিলাম, কারণ মনে হয়েছিল যে এটা আমাকে তাড়া করবে; কিন্তু ক্রমে বুঝতে পারলাম, এটাই পালাবার চেষ্টা করছে; কাজেই আমার ভয় ভেঙে গেল; গজ বিশেক দূরে থেকে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে এটার পিছু নিলাম; শেষ পর্যন্ত খুব চিন্তিত হয়ে এটা একটা গাছে চড়ে বসল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি বাড়ি ফিরে গেলাম।

আজ আবার সেই একই ঘটনা। আবার এটা গাছে চড়ে বসল।

রবিবার। এটা এখনও গাছেই রয়েছে। নিশ্চয় বিশ্রাম করছে। কিন্তু ওটা চালাকি: রবিবার তো বিশ্রামের দিন নয়; সেজন্য রয়েছে শনিবার। মনে হচ্ছে, এ জীবটি সব চাইতে বেশী ভালবাসে বিশ্রাম করতে। এত বিশ্রাম নিলে তো আমি ক্লান্ত বোধ করতাম। বসে বসে গাছটাকে পাহারা দিতেই তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কেন যে ওখানে বসে আছি জানি না; কিছুই তো করতে দেখি না।

গতকাল তারা চাঁদটাকে ফিরিয়ে দিয়েছে আমার যে কী ভালই লাগছে! তারা খুব সৎ লোক। চাঁদটা আবার ঝুলে খসে পড়ল; কিন্তু এবার আমার দুঃখ হল না; এত ভাল প্রতিবেশী থাকলে দুঃখের কোন কারণ নেই; তারা আবার ওটা এনে দেবে। কোন রকমে এই কাজের জন্য তাদের যদি ধন্যবাদ জানাতে পারতাম। তাদের জন্য কিছু তারা পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছা করে, কারণ আমাদের তো দরকারের চাইতেও বেশী তারা আছে। আমাদের নয়, আমি বলতে চেয়েছি আমার, কারণ ঐ সরীসৃপটি এ সব নিয়ে মাথাই ঘামায় না।

এটার রুচি খুব নীচু, আর মোটে ই দয়ালু নয়। কাল গোধূলি বেলায় সেখানে গিয়ে দেখি, নীচে নেমে এসে জলাশয়ের চিত্র-বিচিত্র ছোট মাছগুলোকে ধরবার চেষ্টা করছে; ঢিল ছুঁড়ে এটাকে আবার গাছে চড়তে বাধ্য করে তবে মাছগুলিকে বাঁচালাম। কী আশ্চর্য, এটার কি এই কাজ নাকি? এটার কি হৃদয় বলে কিছু নেই? ঐ ছোট প্রাণীগুলির প্রতি ওর কি মমতা নেই? এ রকম অভদ্র কাজের। জন্যই কি ওকে সৃষ্টি করা হয়েছে? দেখে তো তাই মনে হল। একটা ঢিল পিঠে লাগতেই এটা কথা বলেছিল। শুনে আমার খুব ভাল লেগেছিল, কারণ নিজের কথা ছাড়া এই প্রথম আমি করাও কথা শুনলাম। কথাগুলোর অর্থ আমি বুঝি নি, কিন্তু মনে হল সেগুলো অর্থপূর্ণ।

যখন দেখলাম এটা কথা বলতে পারে তখনই ওর প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। কারণ আমি কথা বলতে ভালবাসি; সারাদিন কথা। বলি, ঘুমের মধ্যেও কথা বলি; কথা বলতে আমার ভাল লাগে, কিন্তু কথা বলার একজন সঙ্গী পেলে আরও দ্বিগুণ ভাল লাগত; তাহলে কেউ চাইলে আমি কথা থামাবই না।

এই সরীসৃপটা যদি মানুষ হয়, তাহলে তো আর এটা বলা চলে না। সেটা ব্যাকরণ সম্মত হবে না, হবে কি? মনে হয়, হওয়া উচিত-সে। আমি তো তাই মনে করি। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদে শব্দটা এই রকম হবে: কর্তৃকারকে-সে; কর্মকারকে-তাকে; সম্বন্বপদে-তার। যাই হোক, যতদিন অন্য পরিচয় প্রকাশ না পাচ্ছে ততদিন আমি ওকে মানুষ বলেই মনে করব। নানান অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার চাইতে এটাই সুবিধাজনক।

পরের সপ্তাহ রবিবার। সারাটা সপ্তাহ তার পিছনে ঘুরে পরিচয় করতে চেষ্টা করলাম। যা কিছু কথা আমাকেই বলতে হল, কারণ সে বড়ই লাজুক। তাতে আমি কিছু মনে করি নি। আমাকে পেয়ে তাকে খুসিই মনে হল। আমিও বারবার আমরা কথাটাই ব্যবহার করলাম, আর তাকে এ ভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত করায় সে একটু আহ্লাদিত হল বলেই মনে হল।

বুধবার। আমাদের দিন খুব ভালই কাট ছে; পরিচয় ক্রমেই ঘনিষ্ঠ তর হচ্ছে। সে আর আমাকে এড়িয়ে চলতে চায় না। এটা খুব ভাল লক্ষণ; এতেই বোঝা যায়, সে চায় যে আমি তার সঙ্গে থাকি। তাতে আমিও খুশি; সব রকমেই আমি তার কাজে লাগতে চাই, যাতে আমার প্রতি তার অনুরাগ বৃদ্ধি পায়। গত দুএকদিন যাবৎ জিনিসপত্রের নামকরণের কাজটা তার হাত থেকে নিয়ে নিয়েছি; এ ব্যাপারে তার কোনরকম দক্ষতা না থাকায় সেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছে এবং অবশ্যই আমার প্রতি কৃতজ্ঞ ও হয়েছে। যখনই কোন নতুন জীব দেখতে পাই, আমিই আগ বাড়িয়ে তার নামকরণ করে ফেলি, যাতে তার অর্থহীন নীরবতাটা ধরা পড়ে না যায়। এই ভাবে অনেক অসুবিধার হাত থেকে তাকে আমি রক্ষা করেছি। তার মত ক্রটি আমার নেই। যে কোন জন্তুর উপর চোখ পড়লেই আমি বুঝতে পারি সেটা কি। মুহূর্তও ভাবতে হয় না; যেন অন্তর্নিহিত কোন প্রেরণা থেকেই সঠিক নামটা জিতে এসে যায়। সত্যি তাই, কারণ আধ মিনিট আগেও আমি ওই নামটা জানতাম না। তার আকৃতি ও কাজের ধরন দেখেই আমি বুঝতে পারি সেটা কোন জন্তু।

যখন ডোডোকে দেখলাম, তখন সে ভেবেছিল ওটা বনবিড়াল-তার চোখ দেখেই আমি তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমি তাকে বাঁচিয়ে দিলাম। কিন্তু পাছে তার গর্বে আঘাত লাগে সেদিকেও আমার খেয়াল ছিল। স্বাভাবিক বিস্ময়ের সঙ্গেই আমি বলে উঠলাম, আরে, আমি বলছি, এটা ডোডো না হয়েই যায় না। কেমন করে ওটাকে ডোডো বলে চিনলাম সে কথা বুঝিয়ে বললাম, যদিও এমন ভাব দেখালাম যে আমি কিছুই বুঝিয়ে বলছি না। যদিও আমার মনে হল যে এতে তার অভিমানে একটু আঘাত লেগেছে, তবু সে আমার প্রশংসাই করল। তার এই আচরণ আমার খুব ভাল লাগল: ঘুমোবার আগে অনেকবার খুশি মনে কথাটা ভাবলাম! যত সামান্যই হোক, অর্জিত কোন সুখ আমাদের কত খুসিই না করে!

বৃহস্পতিবার। আমার প্রথম দুঃখ। গতকাল সে আমাকে এড়িয়ে গেল; মনে হল আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না। এটা আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না; মানে হল কোথাও একটা ভুল হয়েছে। আমি তার সঙ্গে থাকতে ভালবাসি, তার কথা শুনতে ভালবাসি, তাহলে আমি কিছু না করা সত্ত্বেও সে আমার প্রতি এমন নিষ্ঠুর হবে কেন? কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্য বলে মনে হল। সেখান থেকে সরে গিয়ে আমি একা একা সেইখানটায় গিয়ে বসলাম যেখানে একদা সকালে তাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম। সেদিনই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল; আমি তাকে চিনতাম না, তাকে নিয়ে আমার কোন আগ্রহও ছিল না। কিন্তু আজ সেটা বড়ই দুঃখের জায়গা; সব কিছুতেই তার স্মৃতি জড়ানো; আমার বুক ব্যথায় ভরে গেল। কেন এমন হল জানি না। কারণ এ এক সম্পূর্ণ নতুন অনুভূতি; আগে কখনও এ অভিজ্ঞতা আমার হয় নি; সবই কেমন রহস্যময় কিছুই বুঝতে পারছি না।

যখন রাত নেমে এল, এ নির্জনতা আমি সহ্য করতে পারলাম না। তার নতুন তৈরি আশ্রয়ে চলে গেলাম; তার কাছে জানতে চাইলাম। আমি কি দোষ করেছি, কি করলে তার প্রতিকার হবে এবং তার দয়া আমি আবার ফিরে পাব। কিন্তু সে বৃষ্টির মধ্যে আমাকে বের করে দিল। এই আমার প্রথম দুঃখ।

রবিবার। আবার ভাল লাগছে; এখন আমি সুখী। কিন্তু সে দিন গুলি ছিল দুঃখে ভারাক্রান্ত: পারলে সে দিনের কথা আমি ভাবিও না।

কিছু আপেল তাকে দিতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সরাসরি ছুঁড়তে তো আমি শিখি নি, তাই পারলাম না; কিন্তু আমার শুভেচ্ছা তাকে খুসি করেছে। ফলগু লি নিষিদ্ধ; সে বলেছে, এতে আমার ক্ষতি হবে। কিন্তু তাকে খুসি করতে গিয়ে যদি আমার ক্ষতি হয়, সে ক্ষতিকে আমি ভয় করব কেন?

সোমবার। আজ সকালে তাকে আমার নাম বললাম; আশা করেছিলাম, এতে তার আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু কিছুই হল না। আশ্চর্য! সে যদি আমাকে তার নাম বলত, আমার ভাল লাগত। আমি তো মনে করি, সে নাম আমার কানে বড় মধুর হয়ে বাজত।

সে খুব কম কথা বলে। হয় তো এর কারণ তার বুদ্ধি প্রখর নয়; আর সে সেটা জানে বলেই লুকিয়ে রাখতে চায়। তার এ মনোভাবের জন্য আমার বড় দুঃখ হয়; কারণ বুদ্ধির প্রখরতাটা কিছু নয়, আসল যা মূল্যবান তার বাসা তো অন্তরে। তাকে বুঝিয়ে দিতে বড় ইচ্ছা করে যে, একটি সৎ প্রেমময় অন্তরই প্রকৃত ঐশ্বর্য, সেই ঐশ্বর্যই যথেষ্ট; আর সে ঐশ্চর্য বিনা বুদ্ধিই তো দারিদ্র্য।

কথা কম বললেও তার শব্দ-ভাণ্ডার কিন্তু বেশ বড়। আজ সকালে সে একটা অদ্ভুত ভাল শব্দ ব্যবহার করেছে। শব্দটা যে ভাল সে। নিজেও বুঝতে পেরেছিল, কারণ কথা প্রসঙ্গে পরে আরও দুবার সে শব্দটা ব্যবহার করেছে। এটা আকস্মিক কোন শিল্পসৃষ্টি নয়, তবে এতে বোঝা যায় যে তার দেখবার মত চোখ আছে। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে অনুশীলনের দ্বারা এই বীজকে অংকুরিত করা যায়।

শব্দটা সে পেল কোথায়? আমি কখনও ব্যবহার করেছি বলে তো মনে পড়ে না।

না, আমার নাম নিয়ে সে কোন আগ্রহ দেখায় নি। আমার হতাশাকে ঢাকবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারি নি বোধ হয়। সেখান থেকে চলে গিয়ে নদী তীরের শেওলার উপর বসে জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। মনে যখনই সঙ্গীর কামনা জাগে, যখনই দেখার মত কাউ কে চাই, কথা বলার মত কাউকে চাই, তখনই আমি সেখানে গিয়ে বসি। জলাশয়ের মধ্যে যে মনোরম রং-এর সাদা মূর্তিটা রয়েছে সেটা হয় তো যথেষ্ট নয়, কিন্তু কিছু তো বটে, আর পরিপূর্ণ নির্জনতার চাইতে কিছু একটাও তো ভাল। আমি কথা বললেই সেও কথা বলে; আমি দুঃখিত হলে সেও দুঃখিত হয়; সহানুভূতির সঙ্গে আমাকে সন্ত্বনা দেয়; বলে, বেচারি বন্ধুহীনা মেয়েটি, হতাশ হয়ো না; আমি তোমার বন্ধু হব। সেই তো আমার ভাল বন্ধু আমার একমাত্র বন্ধু আমার বোন।

প্রথম সে যখন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল! আঃ, সে কথা আমি কোনদিন ভুলব না-কখনও না। আমার বুকের ভিতরটা যেন শিসের মত ভারী হয়ে গিয়েছিল! হতাশ হয়ে বলেছিলাম আমার যা কিছু ছিল সবই তো তারও ছিল। আমার বুকটা ভেঙে ফেল; এ জীবন আর সহ্য করতে পারছি না! দুই হাতে আমি মুখ ঢেকেছিলাম; আমার কোন সান্ত্বনা ছিল না। একটু পরে হাত সরিয়ে নিতেই দেখি, সে আবার এসেছে-সাদা, উজ্জ্বল, সুন্দর; তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম!

পরিপূর্ণ সুখ: সুখের স্বাদ আগেও পেয়েছি, কিন্তু এমনটি কখনও পাই নি; এ যেন এক উন্মাদনা। সেই আর কখনও তাকে সন্দেহ করি। নি। কখনও সে চলে গেছে-হয় তো এক ঘণ্টা, হয় তো প্রায় সারাটা দিন, কিন্তু আমি অপেক্ষা করেছি, সন্দেহ করি নি। বলেছি, সে খুব ব্যস্ত, অথবা কোথাও বেড়াতে গেছে, কিন্তু আবার আসবে। সত্যি তাই, সে সর্বদাই ফিরে এসেছে। অন্ধকার রাতে সে আসে না, কারণ সে খুব ভীতু; কিন্তু চাঁদ থাকলেও সে আসে। আমি অন্ধকারকে ভয় করি না, কিন্তু সে তো আমার চাইতে ছোট; আমার পরে সে। জন্মেছে। অনেক অনেকবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে; জীবন যখন আমার কাছে দুঃসহ হয়ে উঠেছে তখন সেই আমার সান্ত্বনা, আমার আশ্রয়।

মঙ্গলবার। সারাটা সকাল ঘরদোর পরিস্কার করলাম। ইচ্ছা করেই তার কাছ থেকে দূরে সরে থাকলাম; মনে আশা, নিঃসঙ্গ বোধ করলেই সে আসবে। কিন্তু এল না।

দুপুরে কাজ বন্ধ করে অবসর বিনোদনের জন্য মৌমাছি ও প্রজাপতিদের সঙ্গে ছুটোছুটি করে বেড়ালাম, আর ফুলদের মধ্যে কাটিয়ে দিলাম; এই সব সুন্দর প্রাণীরা আকাশ থেকে ঈশ্বরের হাসি ধরে এনে লুকিয়ে রাখে। তাদের কুড়িয়ে এনে মালা বানালাম; তাই দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে লাঞ্চ খেলাম-আবশ্য আপেলই খেলাম। তারপর ছায়ায় বসে তার জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। কিন্তু সে এল না।

নাই বা এল। এলেও কিছু হত না, কারণ সে ফুল ভালবাসে না। বলে, যত সব বাজে; এমন কি ফুফু লদের আলাদা করে চিনতেও পারে না। সে মনে করে, এই না পারাটাই নাকি ভাল। সে আমাকে চায় না, ফুলদের চায় না, সায়ংকালের বিচিত্র রঙের আকাশকে চায়। না-বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য খুপড়ি তৈরি করা, শব্দ করে তরমুজ ভাঙা আর আপেল সাজানো ছাড়া আর কোন কিছু সে চায় কি?

একটা শুকনো লাঠিকে মাটিতে ফেলে একটা কিছু বানাবার উদ্দেশ্যে আর একটা লাঠি দিয়ে তার মধ্যে একটা গর্ত করতে চেষ্টা করলাম। একটু পরেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। গর্তের ভিতর থেকে একটা সূক্ষ্ম, স্বচ্ছ, নীল ধোঁয়া বেরুতে লাগল, আর আমিও সব ফেলে দে ছুট! ভাবলাম, নিশ্চয় একটা ভূত, আর কী ভয় যে পেলাম! ফিরে তাকিয়ে দেখি কেউ তাড়া করছে না; কাজেই একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলাম; ধীরে ধীরে হাত-পায়ের কাপুনি থেমে গেল; তখন সাবধানে পা টিপে টিপে চারদিকে ভাল করে দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম। খুব কাছে গিয়ে একটা গোলাপ-ঝাড়ের ডালগুলো সরিয়ে উঁকি দিলাম, কিন্তু ভূতটা তখন চলে গেছে। কাছে গেলাম; লাঠির গর্তটার মধ্যে এক চিমটে গোলাপী গুঁড়ো। তার ভিতরে আঙুলটা ঢুকিয়ে দিতেই উঃ! বলে চেঁচিয়ে উঠে আঙুলটা টেনে নিলাম। তীব্র যন্ত্রণা। আঙুলটাকে মুখের মধ্যে পুরে দিলাম, আর তারপরে একবার এ-পায়ে একবার ও-পায়ে দাঁড়িয়ে হা-হুতাশ করতে করতে একসময় কষ্টটা কমে গেল। কিন্তু খুব কৌতূহল হল; ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখতে লাগলাম।

এই গোলাপী গুঁড়োটা কি জানবার খুব কৌতূহল হল। হঠাৎ এর নামটা মনে পড়ে গেল, যদিও আগে কখনও তা শুনি নি। এই তো অগ্নি! এ বিষয়ে আমি এত নিশ্চিত যে পৃথিবীতে আর কোন জিনিস সম্পর্কে কেউ এতটা নিশ্চিত হতে পারে না। কাজেই নির্দ্বিধায় আমি এটার নাম দিলাম-অগ্নি।

এমন একটা কিছু আমি সৃষ্টি করেছি যা আগে ছিল না। পৃথিবীর ব্যাখ্যাতীত সম্পদের তালিকায় আমি একটা নতুন জিনিস যোগ করেছি; সেটা উপলব্ধি করে নিজের কাছে নিজেই গর্ব বোধ করলাম; ইচ্ছা হল দৌড়ে গিয়ে তাকে খুঁজে বের করে এ কথা বলি, তার চোখে নিজেকে বড় করে তুলি,–কিন্তু কি ভেবে তা করলাম না। এ সব নিয়ে তার কোন আগ্রহ নেই। সে হয় তো জিজ্ঞাসা করবে, এটা কি কাজে লাগবে, তখন আমি কি জবাব দেব? কারণ এটা তো কোন কাজের জিনিস নয়, এট শুধু সুন্দর-শুধুই সুন্দর

সুতরাং আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, কিন্তু পেলাম না। এটা তো কোন কাজে লাগবে না; খুপড়ি বানাতে পারবে না, তরমুজ গুলো ভাল করতে পারবে না, তাড়াতাড়ি ফসল পাকাতে পারবে না; এটা বেকার, বোকামি আর অহংকারের বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়; সে এটাকে ঘৃণার জিনিস নয়। আমি বললাম, হে অগ্নি, হে সূক্ষ্ম গোলাপী প্রাণী, আমি তোমাকে ভালবাসি, কারণ তুমি সুন্দর-আর সেই তো। যথেষ্ট! সেটাকে বুকে তুলে নিতে যাচ্ছিলাম; কিন্তু নিলাম না। তখনই আমার মাথায় আর একটা সত্য ঝলসে উঠল। এটা আগের সত্যটার এত কাছাকাছি যে আমার ভয় হল বুঝি বা ভাবের ঘরে চুরি করছি; সত্যটা হল আগুনে যে পোড়ে সে আগুনকে এড়িয়ে চলে।

কাজটা আবার করলাম; এবং অনেকটা আগুনের গুঁড়ো তৈরি করবার পরে সেগুলোকে এক মুঠো শুকনো ঘাসের মধ্যে ঢেলে নিলাম; মনের বাসনা, সেগুলোকে বাড়ি নিয়ে যাব এবং খেলা করবার জন্য নিজের কাছে রেখে দেব। কিন্তু বাতাস ছুটে এসে সেগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে আমার মুখেই ছুঁড়ে দিল; আর আমিও সব ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। পিছন ফিরে দেখলাম, নীল ভূতটা উপরে উঠে যাচ্ছে-মেঘের মত ছড়িয়ে ছড়িয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ওটার নাম মনে পড়ে গেল-ধোঁয়া!-যদিও, সত্যি বলছি, আগে কোন দিন আমি ধোঁয়ার কথা শুনি নি।

দেখতে দেখতে সেই ধোঁয়ার ভিতর থেকে হলুদ ও লাল কাঁপা-কাঁপা আলো বেরুতে লাগল, আর মুহূর্তের মধ্যে আমি সেগুলোর নাম দিলাম-অগ্নিশিখা-আর আমার নামটা সত্যি ঠিক হয়েছে, যদিও পৃথিবীতে এগুলোই প্রথম অগ্নিশিখা। তারা গাছের উপর উঠল, ক্রমবর্ধমান প্রচণ্ড ধোঁয়ার কুণ্ডুলির ভিতর থেকে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আনন্দের আতিশয্যে আমি হাততালি দিলাম, হাসতে লাগলাম, নাচতে লাগলাম; জিনিসটা এতই নতুন ও বিচিত্র, এতই আশ্চর্য, এতই সুন্দর!

কোথা থেকে সে ছুটে এল; দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল; অনেকক্ষণ একটি কথাও বলল না। তারপর জানতে চাইল এটা কি। আঃ, এ রকম সরাসরি প্রশ্ন করাটা কি তার সাজে। অবশ্য জবাব আমাকে দিতেই হল; দিলাম। বললাম, এটা অগ্নি। আমি জানি অথচ সে জানে না, এতে যদি তার বিরক্তি বোধ হয় তো সে দোষ আমার নয়; তাকে বিরক্ত করতে তো আমি চাই নি। একটু থেমে সে জিজ্ঞাসা করল:

এটা কেমন করে এল?

আবার সেই সরাসরি প্রশ্ন; জবাবটাও সরাসরিই হল।

আমি তৈরি করেছি।

আগুনটা দূর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। পোড়া জায়গাটার পাশে গিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে সে বলল:

এগুলো কি?

অগ্নি-অঙ্গার।

ভাল করে দেখবার জন্য একটা তুলে নিল, কিন্তু মনের ইচ্ছাটা বদলে আবার রেখে দিল। তারপর চলে গেল। কোন কিছুতেই তার আগ্রহ নেই।

কিন্তু আমার আগ্রহের অন্ত নেই। ধূসর, নরম, সূক্ষ্ম, সুন্দর ছাইগুলো পড়ে আছে-এক নজরেই তাদের আমি চিনতে পারলাম। জ্বলন্ত অঙ্গারও আমি চিনি। আমার আপেল গুলো পেয়ে গেলাম; সেগুলোকে আচড়ে বের করলাম; খুসি হলাম; আমার বয়স অল্প, ক্ষুধাও প্রখর। কিন্তু আমি হতাশ হলাম; আপেল গুলো সব পুড়ে, ফেটে, নষ্ট হয়ে গেছে। দেখে মনে হল নষ্ট হয়েছে, কিন্তু নষ্ট হয় নি; কঁচা অবস্থার চাইতে অনেক ভাল হয়েছে। অগ্নি সুন্দর; মনে হল, একদিন সে অনেক কাজে লাগবে।

শুক্রবার। গত সোমবার রাতের বেলা এক মুহূর্তের জন্য তাকে আবার দেখেছিলাম; কিন্তু শুধুই এক মুহূর্তের জন্য। আশা করেছিলাম, বাড়িঘর পরিষ্কার করেছি বলে সে আমাকে প্রশংসা করবে; সত্যি ভাল মন নিয়েই আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু সে সন্তুষ্ট হল না; মুখ ঘুরিয়ে আমাকে ফেলে চলে গেল। সে এতটা অসন্তুষ্ট হয়েছিল অন্য কারণে: আবার তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম সে যেন। প্রপাতের জলে না নামে। কারণ অগ্নি আমার কাছে একটা নতুন অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে-সম্পূর্ণ নতুন, ভালবাসা, দুঃখ এবং অন্য যে সব অনুভূতির কথা আমি আগেই জেনেছি তার থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র-ভয়। সে কি নৃশংস!-এটা আবিস্কার না করাই ছিল ভাল। ভয় জীবনকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়, সুখকে নষ্ট করে, সারা শরীরকে থর থর করে কাঁপয়ে তোলে। কিন্তু তাকে বোঝাতে পারলাম না, কারণ ভয় কাকে বলে তা তো সে জানে না, আর জানে না বলেই আমাকে সে বুঝতে পারল না।

আদমের দিনপঞ্জী থেকে উদ্ধৃতি

হয় তো আমার মনে রাখা উচিত যে তার বয়স অল্প, নেহাৎই বালিকা, আর সেই মতই তার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। সে অত্যন্ত আগ্রহশীল, কৌতূহলী ও তৎপর; জগৎটা তার কাছে একটা কুহক, একটা বিস্ময়, রহস্য, আনন্দ; একটা নতুন ফুল দেখলে আনন্দে সে বাক্যহারা হয়ে যায়; সে ফলটাকে আদর করে, যত্ন করে, ঘ্রাণ শোঁকে, তার সঙ্গে কথা বলে, একটা প্রিয় নাম ধরে ডাকে। আর রং দেখলেই সে পাগল হয়ে যায়: বাদামী পাহাড়, হলুদ বালি, ধূসর শেওলা, সবুজ গাছপালা, নীল আকাশ; ভোরের মুক্তো, পাহাড়ের মাথায় রক্তিম আভা, সূর্যাস্তের সময় রক্তিম সমুদ্রের বুকে ভাসমান সোনালি দ্বীপ, মেঘের বুকে পাল তুলে দেওয়া পাণ্ডুর চাঁদ, মহাশূন্যে। ঝিকিমিকি তারাদের মণিমানিক্য-আমি তো এসবের কোন বাস্তবের উপকারিতা দেখি না, কিন্তু তাদের মধ্যে যে রং ও বিরাট ত্ব আছে তাই তার কাছে যথেষ্ট; তাদের নিয়েই সে সব ভুলে থাকে। সে যদি এক সঙ্গে কয়েক মিনিট শান্ত হয়ে চুপচাপ থাকে তাহলে সেটা একটা দৃশ্য বটে! সে অবস্থায় তাকে দেখলে সত্যি আমি খুশি হতাম; সত্যি হতাম, কারণ এখন আমি বুঝতে পারছি যে সত্যি সে। সুন্দরী-ক্ষিপ্রগতি, ক্ষীণতনু, ফিট ফাট, সুগঠনা, চপলা, মনোরমা; একদা যখন সে তার মর্মরশু ভ্র রৌদ্রস্নাত দেহ নিয়ে একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, মাথাটা ঈষৎ পিছনে হেলিয়ে দুটি হাত সূর্যকে আড়াল করে আকাশে উড়ে যাওয়া একটা পাখিকে দেখছিল, তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে সুন্দরী।

সোমবার মধ্যাহ্ন। এই গ্রহে যদি এমন কিছু থেকে থাকে যাতে তার আগ্রহ নেই তাহলে সে বস্তুর নাম আমার তালিকায় নেই। অনেক জন্তু আছে যাদের ব্যাপারে আমি উদাসীন, কিন্তু সে নয়। তার কাছে কোন ভেদাভেদ নেই, সকলেই তার প্রিয়; সে ভাবে যেসব কিছুই সম্পদ; যা কিছু নতুন তাই স্বাগত।

প্রকাণ্ড ব্রন্টোসরাসটা যখন পা ফেলে ফেলে তাঁবুতে ঢুকল, সে তো ভাবল একটা পেয়ে গেলাম, আর আমি ভাবলাম, এ কী বিপদ। আমাদের সৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যের এটা একটা ভাল উদাহরণ। সে চাইল ওটাকে পোষ মানাতে, আর আমি চাইলাম বাসাটা ওকে দিয়ে নিজেই কোথাও চলে যাই। তার বিশ্বাস, ভাল ব্যবহারের দ্বারা পোষ মানিয়ে ওকে পোষা প্রাণীতে পরিণত করা যাবে; আমি বললাম, একুশ ফুট লম্বা একটা প্রাণীকে বাড়িতে রাখা কোন কাজের কথা নয়, কারণ ওটার মন যতই ভাল হোক, যতই আমাদের ক্ষতি করবার ইচ্ছা ওর না থাকুক, তবু ও তো আমাদের বাড়িটার উপর বসতে গিয়েই সেটাকে ভেঙে ফেলতে পারে; চোখ দেখলেই তো বোঝা যায় ওটা বড়ই অন্যমনস্ক।

তবু ঐ দৈত্যটাকে সে রাখবেই, কিছুতেই ওটাকে ছাড়বে না। সে ভাবল, ওকে নিয়ে আমরা একটা দুগ্ধ-কেন্দ্র খুলতে পারি, আর আমাকেই দুধ দুইতে বলল: কিন্তু আমি তাতে রাজী নই; কাজটা খুবই বিপজ্জনক হতেও পারে। তাছাড়া, ওটা স্ত্রী-জাতীয় প্রাণী নয়, আর আমাদেরও কোন মই-টই নেই। তখন তার ইচ্ছা হল, ওটাতে চড়বে, চড়ে নানান দৃশ্য দেখবে। ত্রিশ বা চল্লিশ ফুট লেজট। মাটিতে পড়ে ছিল একটা ভূপাতিত গাছে মত; সে ভাবল ওটা বেয়েই সে জন্তুটার পিঠে চড়বে, কিন্তু সে ভুল করেছিল; খাড়া জায়গাটায় উঠতেই সে পা হড়কে নীচে পড়ে গেল; আমি না থাকলে বেশ আঘাত পেত।

সে কি এখন সন্তুষ্ট? না। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সে তুষ্ট থাকতে পারে না। পরীক্ষা না করে সে কোন কিছু গ্রহণ করে না। আমি মানি যে এটাই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী; এটা আমাকে আকৃষ্ট করে; তার প্রভাব আমার উপরেও পড়েছে; মনে হয়, আর কিছু দিন তার সঙ্গে থাকলে আমিও ঐ পথ ধরব। আরে, এই বিরাট কায় প্রাণীটিকে নিয়ে তার আরও একটা পরিকল্পনা আছে: সে ভাবছে, ওটাকে যদি পোষ মানাতে পারি, বশে আনতে পারি, তাহলে ওটাকে নদীর মাঝ খানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সেতু হিসাবে ব্যবহার করতে পারি। দেখা। গেল, ইতিমধ্যেই সেটা অনেকটা বশে এসেছে,–অন্তর তার বেলায়-এবং তার পরিকল্পনা মত কাজ করতে চেষ্টাও সে করল, কিন্তু ফল হল নাঃ যতবার তাকে নদীর মাঝ খানে জায়গা মত রেখে সে ফিরে আসে, ততবারই সেটা একটা পোষা পর্বতের মত তার পিছন পিছন চলে আসতে লাগল। অন্য সব পোষা প্রাণীরাও তো এই রকমই করে থাকে।

শুক্রবার। মঙ্গলবার-বুধবার-বৃহস্পতিবার-এবং আজ; তার দেখা পাই নি। একা একা থাকার পক্ষে সময়টা বড়ই দীর্ঘ; তবু, অবাঞ্ছিত হয়ে তার কাছে যাওয়ার চাইতে একা থাকাই ভাল।

আমারও তো সঙ্গী চাই-সঙ্গী সকলেই চায় বলে আমি মনে করি-তাই আমি অন্য জন্তুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম। তারা খুবই ভাল; মেজাজ ভাল, চাল-চলন বিন; কখনও বিরূপ হয় না, কখনও মনে করে না যে আমি অনধিকার প্রবেশ করছি, তারা হেসে লেজ নাড়ে, অবশ্য যদি লেজ থাকে, আর যখনই বলা যায় তখনই কোথাও বেড়াতে বা অভিযানে সঙ্গী হতে রাজী হয়। আমার মনে হয়, তারা খুবই ভদ্র। এতটা কাল আমরা তো ভালভাবেই দিন গুজরান করেছি, কখনও তো নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় নি। নিঃসঙ্গ! না, কখনও ছিলাম না। সব সময়ই তারা দল বেঁধে চারদিকে ঘুরত-কখনও চার পাঁচ একর জুড়ে-সংখ্যায় অগুনতি; একটা পাহাড়ের উপর উঠে চারদিক তাকালেই দেখা যাবে সূর্যের আলোয় চকচক্ করছে, ঝিকমিক করছে কত রং আর কত ডোরাকাটা দাগ; মনে হবে বুঝি একটা হৃদ;কিন্তু আসলে তা নয়। তারপর আসে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, আর তাদের চ ঞ্চ ল পাখার শোঁ-শোঁ শব্দ; তাদের বিচিত্র বর্ণের পালকের উপর যখন সূর্যের আলো এসে ঠিকরে পড়ে, তখন সে কী রংয়ের বাহার! চোখ যেন আপনি বুজে আসে।

আমরা অনেক দেশ ঘুরেছি; পৃথিবীর অনেক কিছু আমি দেখেছি; প্রায় সবটাই দেখেছি বলা যায়। কাজেই আমিই প্রথম পর্যটক, আর একমাত্র পর্যটক। আমরা দুজন যখন চলতে থাকি, সে এক আশ্চর্য দৃশ্য-সে রকমটি আর কোথাও নেই। আরামের জন্য আমি হয়। বাঘের পিঠে, নয় তো চি তার পিঠে চড়ে বসি, কারণ তাদের পিঠটা নরম আর গোল, বসে বেশ আরাম হয়; তাছাড়া জন্তুগুলো বেস পোষা; কিন্তু অনেক দূরের পথ যেতে, বা দৃশ্যাবলী দেখতে আমি চড়ি হাতির পিঠে। হাতি আমাকে শুড় দিয়ে তুলে নেয়; যখন তাঁবু খাটাবার সময় হয়, সে বসে পড়ে আর আমি পিছন দিক দিয়ে নেমে পড়ি।

পাখি আর জন্তুরা খুব বন্ধু তাদের মধ্যে কোন ঝগড়া-ঝাটি নেই। তারা সকলেই কথা বলে, আমার সঙ্গেও কথা বলে, তাদের ভাষা। বিদেশী, আমি তার এক বিন্দুও বুঝতে পারি না; কিন্তু আমি যখন কথা বলি তখন তারা কিন্তু বুঝতে পারে, বিশেষ করে কুকুর ও হাতি। আমার ভারি লজ্জা করে। এতেই বোঝা যায়, তারা আমার চাইতে বুদ্ধিমান, সুতরাং আমার চাইতে উঁচু শ্রেণীর জীব। এতে আমি বিরক্তি বোধ করি, কারণ আমি নিজেই প্রধান পরীক্ষার বিষয়বস্তু হতে চাই।

আমি অনেক কিছু শিখেছি; এখন শিক্ষিত হয়েছি, যদিও প্রথম ছিলাম না। প্রথম ছিলাম অশিক্ষিত। …পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়ে আমি জেনেছি যে কাঠ, শুকনো পাতা ও পালক এবং আরও অনেক জিনিস জলে ভাসে; সুতরাং সে সব কিছুকে মিলিয়ে এটাই প্রমাণ হয় যে একদিন পাহাড়ও জলে ভাসবে; কিন্তু আজ শুধু সে কথা জেনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, কারণ এখনও পর্যন্ত সেটাকে প্রমাণ করবার উপায় নেই। কিন্তু উপায় একটা বার করবই-সেদিন এই উত্তেজনাটা চলে যাবে। এতে আমার খুব মন খারাপ হয়; কারণ একে একে আমি যখন সব জেনে ফেলব তখন আর কোন উত্তেজনা থাকবে না; কিন্তু আমি যে উত্তেজনাই ভালবাসি! এ কথা ভাবতে গিয়ে সেদিন রাতে আমার ঘুমই হল না।

কেন আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা আমি প্রথমে বুঝতে পারতাম না; কিন্তু এখন আমার মনে হয়, এই আশ্চর্য জগতের গোপন। রহস্যকে খুঁজে বের করা এবং মনের আনন্দে এ সব কিছুর স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্যই আমার সৃষ্টি হয়েছে। আমি মনে করি, এখনও অনেক কিছু জানবার আছে, আর তাড়াহুড়া না করে ধীরেসুস্থে কাজ করলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যাবে। একটা পালককে উড়িয়ে দাও, বাতাসে ভাসতে ভাসতে সেটা অদৃশ্য হয়ে যাবে, কিন্তু একটা ডে লাকে ছুঁড়ে দাও, সেটা উড়ে যাবে না। প্রতিবারই সেটা নেমে আসবে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, সব সময়ই তাই হয়। অবাক হয়ে ভাবি, কেন এ রকম হয়? আসলে সেটা নেমে আসে না নিশ্চয়ই, কিন্তু সে রকম দেখায়ই বা কেন? মনে হয়, এটা এক ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম। মানে দুটোর একটা। ঠিক কোটা আমি জানি না। পালকটাও হতে পারে, আবার ঢে লাটাও হতে পারে; কোনটাই আমি প্রমাণ করতে পারি না; যে কোন একটাকে ফাঁকি বলে ধরে নিতেই হবে।

লক্ষ্য করে দেখেছি, তারারা বেশী দিন টেকে না। অনেক ভাল ভাল তারাকে গলে গিয়ে আকাশ থেকে পড়ে যেতে দেখেছি। একটা যখন গলতে পারে, তখন সবগুলোও গলতে পারে; আবার সবগুলো যখন গলতে পারে, তখন সবগুলো একই রাতেও গলতে পারে। সে দুঃখের দিন আসেই-আমি জানি। তাই তো প্রতিরাতে যতক্ষণ জেগে থাকতে পারি আমি বসে বসে তারাদের দিকেই চেয়ে থাকি। ঐ ঝিকিমিকি আকাশকে আমি আমার মনের উপর এঁকে রাখব, যাতে একদিন তারা যখন থাকবে না তখন কল্পনায় ঐ অগণিত তারাদের কালো আকাশের বুকে ফিরিয়ে আনতে পারি, আবার তাদের ঝিকমিক করাতে পারি, এবং আমার চোখের জলে অল্পষ্ট করে তাদের দ্বিগুণ করে তুলতে পারি।

পতনের পরে

যখন পিছন ফিরে তাকাই, তখন উদ্যানটাকে স্বপ্ন বলে মনে হয়। উদ্যানটা ছিল সুন্দর, অতুলনীয়ভাবে সুন্দর, আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর; কিন্তু আজ সে হারিয়ে গেছে; আর কোন দিন তাকে দেখতে পাব না।

উদ্যান হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমি তাকে ফিরে পেয়েছি, আর তাতেই আমি সন্তুষ্ট। সে আমাকে সাধ্যমত ভালবাসে; আমার। অনুভূতিপ্রবণ সত্তা দিয়ে আমিও তাকে ভালবাসি; আমি মনে করি, আমার যৌবন, আর আমার স্ত্রী-প্রকৃতির পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। যদি নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, কেন তাকে ভালবাসি, কোন জবাব দিতে পারি না, আর জবাব দেবার কোন দায়ও বোধ করি না; কাজেই আমার মনে হয়, অন্য সরীসৃপ ও জন্তুদের মত এ ভালবাসা যুক্তি ও সংখ্যাতত্ত্বের ফসল নয়। আমি তো মনে করি, তাই হওয়া উচিত। কতক পাখিকে ভালবাসি তাদের গানের জন্য, কিন্তু আদমকে তার গানের জন্য ভালবাসি না-না, মোটেই তা নয়; সে যত গান গায়, তত আমার কাছে সেটা অসহ্য ঠেকে। তবু আমি তাকে গান গাইতে বলি, কারণ তার সব কিছু মিলিয়েই আমি তাকে ভালবাসতে চাই। আমি জানি সে চাওয়া সফল হবে, কারণ আগে তার গান আমি সইতে পারতাম না, কিন্তু এখন পারি। এতে দুধ ট কে যায়, কিন্তু তা হোক; সে রকম দুধও আমার সয়ে যাবে।

তার উজ্জ্বল বুদ্ধির জন্যও আমি তাকে ভালবাসি না-না, মোটেই তা নয়। উজ্জ্বল বুদ্ধির জন্য তো তাকে দোষী করা যায় না; ঈশ্বর তাকে যে রকম সৃষ্টি করেছেন সে তাই হয়েছে। আমি জানি, তারও একটা সৎ উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল। যথাসময়ে সেটা আরও বাড়বে, যদিও হঠাৎই বাড়বে না; তাছাড়া, তাড়াহুড়ার বা কি আছে, সে আজ যা আছে সেটাই তো যথেষ্ট ভাল।

তার উদার বিবেচনাশীল ও সূক্ষ্ম আচরণের জন্যই যে তাকে ভালবাসি তাও নয়। এ সব ব্যাপারে তার ত্রুটি আছে; কিন্তু তৎসত্ত্বেও সে বেশ ভাল, আর ক্রমেই উন্নতি করছে।

তার পরিশ্রমী স্বভাবের জন্যও তাকে ভালবাসি না,–না, তাও নয়। আমি জানি, সে শক্তি তার মধ্যে আছে; কেন যে সেটা সে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে আমি জানি না। সেটাই তো আমার একমাত্র দুঃখ। অন্যথায় এখন সে আমার কাছে বেশ খোলামেলা। এই একটি মাত্র বস্তু ছাড়া আর কিছুই সে লুকিয়ে রাখে না। আমার কাছেও গোপন করবার মত তার কিছু থাকতে পারে এ চিন্তাই আমাকে কষ্ট দেয়। অনেক সময় আমার ঘুম নষ্ট করে। এ চিন্তাকে আমি মন থেকে সরিয়ে দেব; যে সুখ আমার মনের দুই কূল ছাপিয়ে চলেছে। তাকে বিঘ্নিত হতে দেব না।

তার শিক্ষার জন্যও তাকে ভালবাসি না-না, মোটেই তা নয়। সে স্বযং-শিক্ষিত, এবং সত্যি অনেক কিছু জানে, কিন্তু সেটা কোন কারণই নয়।

তার শৌর্যের জন্যও যে তাকে ভালবাসি তাও নয়-না, মোটেই নয়। সে আমার প্রতি বিরূপ হয়েছিল, কিন্তু সে জন্য তাকে দোষ দেই না; এটাকে পুরুষ জাতির বেশিষ্ট্য বলেই মনে করি, আর সে তো নিজেকে নিজে পুরুষ বানায় নি। অবশ্য আমি তার প্রতি বিরূপ হতাম না, তার আগে আমার মৃত্যু হত; কিন্তু এটাও আমার স্ত্রী জাতির বৈশিষ্ট্য, এতে আমার কোন কৃতিত্ব নেই, কারণ আমি তো আমাকে স্ত্রী বানাই নি।

তাহলে আমি তাকে ভালবাসি কেন? আমি মনে করি, তার একমাত্র কারণ সে পুরুষ।

আসলে সে খুব ভাল মানুষ, আর সেজন্য তাকে আমি ভালবাসি, কিন্তু তা না হলেও তাকে আমি ভালবাসতাম। সে যদি আমাকে মারধোর করে, গালাগালি করে, তাহলেও তাকে আমি ভালবাসব। আমি ঠিক জানি। আমি মনে করি, এটা নারী-পুরুষের ব্যাপার।

সে শক্তিমান ও সুদর্শন। সেজন্য তাকে ভালবাসি, তার প্রশংসা করি, তার জন্য গর্ববোধ করি, কিন্তু এ সব গুণ না থাকলেও আমি তাকে ভালবাসতাম। সে যদি সাদাসিধে হত, তাকে ভালবাসতাম; সে যদি ভগ্নস্বাস্থ্য হত, তাকে ভালবাসতাম; আমি তার কাজ করে দিতাম, তার উপর সর্দারী করতাম, তার হয়ে প্রার্থনা করতাম, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তার শয্যার পাশে বসে তাকে দেখতাম।

হ্যাঁ, আমি মনে করি, আমি যে তাকে ভালবাসি তার একমাত্র কারণ সে আমার এবং সে পুরুষ। আর কোন কারণ আছে বলে তো মনে হয় না। কাজেই প্রথম যা বলেছিলাম আবার সেই কথাই বলি: এ ধরনের ভালবাসা যুক্তি ও সংখ্যাতত্ত্বের ফসল নয়। এটা জন্মে-কোথা থেকে তা কেউ জানে না-আর এর কোন ব্যাখ্যাও হয় না। তার কোন প্রয়োজনও নেই।

চল্লিশ বছর পরে

এ জীবন থেকে আমরা যেন একসঙ্গে বিদায় নিতে পারি, এটাই আমার প্রার্থনা, আমার কামনা-এ কামনা কোন দিন পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে না, শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি প্রেমময়ী পত্নীর বুকে বেঁচে থাকবে; আর আমার নামেই হবে এর নামকরণ।

কিন্তু যদি একজনকে আগে যেতেই হয় তাহলে সে যেন আমি হই, এটাই আমার প্রার্থনা; কারণ সে বলবান, আমি দুর্বল, আমার কাছে সে যতটা প্রয়োজনীয়, তার কাছে আমি ততটা প্রয়োজনীয় নই-তাকে ছেড়ে আমার জীবন জীবনই নয়; সে জীবন আমি কেমন করে সহ্য করব? এ প্রার্থনাও শাশ্বত; নারী জাতি যতদিন থাকবে, ততদিন এ প্রার্থনার বিলোপ ঘটবে না। আমিই প্রথম স্ত্রী; আর শেষ স্ত্রীর কণ্ঠে ও আমার এই কথাই ধ্বনিত হবে।

ইভ-এর সমাধিতে

আদম: যেখানে যেখানে সে ছিল, সেখানেই ছিল ইডেন।

[১৮৯৩, ১৯০৫]

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel