Thursday, April 2, 2026
Homeথ্রিলার গল্পসায়েন্স ফিকশনতারা তিন জন - হুমায়ূন আহমেদ

তারা তিন জন – হুমায়ূন আহমেদ

০১. লী আকাশের দিকে তাকাল

লী আকাশের দিকে তাকাল।

লী যা করে, অন্য দুজনও তাই করে। তারাও আকাশের দিকে তাকাল। আকাশের রঙ ঘন হলুদ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলেই হলুদ রঙ ক্ৰমে ক্ৰমে ঘঘালাটে সবুজ বর্ণ ধারণ করছে।

লী হঠাৎ বলল, আকাশের বাইরে কী আছে?

এই প্রশ্ন আগেও অনেক বার করা হয়েছে, তবু প্রতিবারই মনে হয় এই যেন প্রথম বারের মতো করা হল। অয়ু মৃদু স্বরে বলল, আকাশের বাইরে আছে আকাশ।

তার বাইরে? তার বাইরে আছে আরেকটি আকাশ।

লী আর প্রশ্ন করল না। আজকাল অয়ু কেমন যেন যুক্তিহীন কথা বলে। আকাশের বাইরে আবার আকা কি? লী বলল, তোমার শরীর ভালো আছে অয়ু?

ভালো।

তোমার পা কেমন?

অয়ু উত্তর দিল না। অর্থাৎ অয়ুর পা ভালো নেই। অথচ একটু আগেই বলেছে শরীর ভালো। কোনো মানে হয় না। যুক্তিহীন কথা।

ঠাণ্ডা বাতাস দিতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে বাতাসের বেগ বাড়বে। সেই সঙ্গে দ্রুত কমতে থাকবে তাপ। মধ্যরাতে চারদিক হবে হিমশীতল। লী বলল, চল এবার যাওয়া যাক।

তারা দুজন কথা বলল না। দুজনেই তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। লী আবার বলল, চল আমরা নেমে পড়ি।

কোথায়? আমরা কোথায় যাব?

উত্তর দিয়েছে নীম। লী লক্ষ করল নীমের কথাবার্তার ধরন হতাশাগ্ৰস্তের মতন। এটি ভালো লক্ষণ নয়। তাদের সঙ্গে আরো একজন ছিল। সেও এরকম কতাবার্তা বলতে শুরু করেছিল। এ সব খুব খারাপ লক্ষণ। লী কঠিন স্বরে বলল, নীম, তুমি একটু আগে বলেছ, আমরা কোথায় যাব?

হ্যাঁ বলেছি।

তুমি কি যেতে চাও না কোথাও?

না।

কেন না?

কোথায় যাব বল?

তা ঠিক। খুবই ঠিক। যাওয়ার জায়গা কোথায়? যেখানেই যাওয়া যাক, সেই একই দৃশ্য। প্রকাণ্ড সব দৈত্যকৃতি হিমশীতল পাথর। ঘন কৃষ্ণবর্ণ বালুকারাশি। যে দিকে যত দূর যাওয়া যায়—একই ছবি। তারা তিন জন প্রতিটি পাথরের অবস্থান নিখুঁতভাবে জানে। তারা জানে, ঠিক কোথায় বালির ঘন কালো রঙ হালকা গেরুয়া হয়েছে।

লী বলল, চল আমরা আরেকবার সেই ঘরটি দেখে আসি। অয়ু এবং নীম উত্তর দিল না। লী বলল, এখন রওনা হলে সকালের মধ্যে আমরা পৌছে যাব।

সেই ঘরটি আমরা ছয় লক্ষ নয় শ এগারো বার দেখেছি।

আরেক বার দেখব। ছয় লক্ষ নয় শ বারো বার হবে।

অয়ু বলল, আমি যেতে চাই না। আমার পা টিতে কোনো অনুভূতি নেই। আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমরা যাও।

তুমি কী করবে?

আমি বসে থাকব এখানে। তোমরা আমাকে একটি সমস্যা দিয়ে যাও। আমি সেই সমস্যা নিয়ে চিন্তা করব। বেশ একটি জটিল সমস্যা দিয়ে যাও।

তোমাকে একা ফেলে যাব?

হ্যাঁ, এটি ভালোই হবে। আমি আশা করে থাকব, তোমরা হয়ত নতুন কোনো খবর নিয়ে আসবে। আশায় আশায় সময় ভালো কাটবে।

নীম বলল, তোমার পায়ের ব্যথা কি অনেক বেড়েছে?

অয়ু জবাব দিল না।

লী এবং নীম ঠাণ্ডা পাথরের গা বেয়ে নিচে নেমে এল। তারা অয়ুকে একটি সমস্যা দিয়ে এসেছে। সমস্যাটি হচ্ছে–আমাদের সঙ্গে সেই ঘরটির সম্পর্ক কী?

অয়ু ভাবতে শুরু করল। তার পায়ের ব্যথা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যথা ভুলতে হলে সমস্যাটি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করতে হবে। অয়ু আরাম করে বসতে চেষ্টা করল। সে তার এগারোটি পা লম্বালম্বি করে চারদিকে ছড়িয়ে দিল। মাথার দুপাশের চারটি খ ঢুকিয়ে নিল শরীরের ভেতর। এখন লুখগুলির আর প্রয়োজন নেই। অয়ু কোনো শব্দ শুনতে চায় না। চারদিকে থাকুক সীমাহীন নিস্তব্ধতা। শব্দে চিন্তার ব্যাঘাত হবে। অয়ু ভাবতে শুরু করল।

ঘর সব মিলিয়ে ছটি। ছটি ঘরই প্ৰকাণ্ড, প্রায় আকাশছোয়া। এই ছয়ের সঙ্গে কি আমাদের কোনো যোগ আছে? আমাদের পা এগারোটি। প্রতিটি পায়ে তিনটি করে আঙুল, মোট সংখ্যা তেত্রিশ। তিনটি কর্মী-পায়ে আছে একটি করে বাড়তি আঙুল–সর্বমোট ছত্রিশ। তার বর্গমূল হচ্ছে ছয়। না, এই মিলটি চেষ্টাকৃত। এদিকে না ভাবাই উচিত। তাহলে ভাবা যাক, এই ঘরগুলি কি আমাদের জন্যে তৈরি হয়েছে? উত্তর হচ্ছে না। এত প্রকাণ্ড ঘর আমাদের জন্য হতে পারে না। কারণ এই ঘরগুলির ভেতর দীর্ঘ সময় থাকা যায় না। অন্ধকার ঘর। অন্ধকারে আমরা থাকতে পারি না। আমাদের বেঁচে থাকার জন্যে আলো দরকার। তার উপর ঘরের মেঝেগুলি অসম্ভব মসৃণ। মসৃণ মেঝেতে আমরা চলাফেরা করতে পারি না। এই ঘর আমাদের জন্যে তৈরি হলে মেঝে হত খসখসে।

অয়ু হঠাৎ অন্য একটি জিনিস ভাবতে বসল। সে দেখেছে, কোনো একটি জটিল সমস্যা নিয়ে ভাববার সময় হঠাৎ করে অন্য কিছু ভাবলে ফল খুব ভালো হয়। আবার সমস্যাটিতে ফিরে গেলে অনেক নতুন যুক্তি আসে মাথায়। অয়ু ভাবতে লাগল, আকাশের কোনো সীমা আছে কি? প্রতিটি জিনিসের সীমা আছে। পাথরগুলির সীমা আছে। ঘরগুলির সীমা আছে। ধূলিকণার সীমা আছে। কাজেই আকাশের একটি সীমা থাকা উচিত। এই যুক্তির ভেতর দুর্বলতা কী কী আছে? প্রথম দুর্বলতা, যেসব জিনিসের সীমা আছে, তাদের স্পর্শ করা যায়। কিন্তু আকাশ স্পর্শ করা যায় না। তাহলে যেসব জিনিস স্পর্শ করা যায় না, সেসব কি সীমাহীন? একটি জটিল সমস্যা। তিন জন এক সঙ্গে বসে ভাবতে হবে। অয়ু আবার ফিরে গেল ঘরের সমস্যায়। ঘরগুলির সঙ্গে তাদের সত্যি কি কোনো সম্পর্ক আছে।

ঘরগুলি তৈরি হয়েছে এমন সব বস্তু দিয়ে, যা এখানে পাওয়া যায় না। এই ব্যাপারটিতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই একটি জিনিস তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করেছে। ঘরের কম্পনমাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি অত্যন্ত রহস্যময়। যে জিনিসগুলি এখানে আছে, তাদের কম্পনমাত্রা এখানকার মতোই হওয়া উচিত। কিন্তু ঘরগুলি অন্য রকম। রহস্য! বিরাট রহস্য! অয়ু নিজের পায়ের যন্ত্রণার কথা ভুলে গেল। তাপমাত্রা যে অসম্ভব নিচে নেমে গেছে, তাও ঠিক বুঝতে পারল না। কোনো একটি রহস্যময় সমস্যা নিয়ে ভাবার মতো আনন্দ আর কিসে হতে পারে?

কিন্তু আয়ু বেশিক্ষণ ভাবতে পারল না। আচমকা সে সমস্ত শরীরে একটি তীব্র কম্পন অনুভব করল। যেন একটি শক্তিশালী আলো হঠাৎ তার শরীরে এসে পড়ছে। অয়ু চোখ মেলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। ঘরগুলির মতোই প্ৰকাণ্ড কোনো একটি জিনিস আকাশ থেকে নেমে আসছে। অয়ু দ্রুত ভাবতে চেষ্টা করল। দ্রুত ভাবতে হবে অত্যন্ত দ্রুত। অয়ুর মাথার দুপাশের চারটি খ বেরিয়ে মাথার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জিনিসটির কম্পনমাত্রা জানতে হবে। অয়ু দিশাহারা হয়ে গেল। জিনিসটির কম্পন নেই। একটা হতে পারে না। এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার। সব জিনিসের কম্পন আছে। তার কম্পনও থাকতে হবে।

দ্রুত ভাবতে হবে। দ্রুত। জিনিসটির মধ্যে আছে অকল্পনীয় শক্তি। কারণ তার উপস্থিতির জন্যে যে পাথরটির উপর অয়ু বসে আছে, তার কম্পনমাত্রা বেড়ে গেছে। এ রকম অবিশ্বাস্য ব্যাপার কী করে হয়! অয়ু বলল, কে, তুমি কে?

উত্তর নেই। অয়ু আবার বলল, আমার নাম অয়ু। আমরা তিন জন এখানে থাকি। তুমি কে?

জিনিসটি আকাশের গায়ে স্থির হয়ে আছে।

কম্পনহীন শক্তির আধার। তুমি আমার কথার জবাব দাও।

জবাব নেই। কোনো জবাব নেই। অয়ু লক্ষ করল, জিনিসটি থেকে দুটি তীব্ৰ আলোকবিন্দু এসে পড়েছে নিচে। আলোকবিন্দু দুটি নড়াচড়া করছে।

দয়া করে আমার কথার জবাব দাও। প্রতিদানে আমি তোমাদের সমস্যার জন্যে ভাবতে বসব।

জবাব পাওয়া গেল না। অয়ু দেখল, প্ৰকাণ্ড সেই জিনিসটি থেকে একটি ছোট্ট কিছু দ্রুত নিচে নেমে আসছে।

যে জিনিসটি আসছে তার কম্পন আছে। অয়ু ভালো করে দেখবার জন্যে পাথরের গা বেয়ে নেমে এল। জিনিসটির কম্পনমাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার সঙ্গে মিল নেই। ঘরগুলির সঙ্গে মিল নেই।

মহাশূন্যযান থেকে যে স্কাউটশিপ গ্রহটিতে নেমে এল তার আরোহী দুজন অবাক হয়ে মন্তব্য করল এটা কেমন জায়গা? কী কুৎসিত! এই সব জায়গায় স্কাউটশিপ পাঠানো অর্থহীন। শক্তি ও সম্পদের নিদারুণ অপচয়।

০২. স্কাউটশিপের এনথ্রোমিটারের কাঁটাটি

স্কাউটশিপের এনথ্রোমিটারের কাঁটাটি লাল ঘরে। যার অর্থ এ গ্রহে মানুষের পক্ষে জীবন ধারণ করা সম্ভব নয়। শুধু মানুষ নয়, অক্সিজেন নির্ভর কোনো প্রাণীর পক্ষেই সম্ভব নয়। এখানে বাতাসে আছে মিথেন এবং হাইড্রোজেন। খুব অল্প মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড। কোথাও কোনো পানির চিহ্ন নেই। বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বেরিলিয়াম কণা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটিও বিচিত্র।

গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে তথ্যাবলি মহাকাশযানের ভূতত্ত্ব বিভাগের কম্পিউটারে আসতে শুরু করেছে। কম্পিউটার রিপোর্ট পাওয়ার পরই স্কাউটশিপটি মাটিতে নামবে। রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ঠিক করা হবে স্কাউটশিপটির অবতরণের জায়গা। ঠিক করা হবে শিপটর চারপাশে শক্তিবলয় থাকবে কি না। স্কাউটশিপে শক্তিবলয় তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাপার। পারতপক্ষে তা করা হয় না।

স্কাউটশিপটি ভূমি স্পর্শ করবার আগে আগে কম্পিউটার থেকে বলা হল শক্তিবলয় তৈরি করতে। জনি বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল, হঠাৎ করে শক্তিবলয় তৈরি করতে হবে কেন? কম্পিউটার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, তোমরা যে জায়গায় নেমেছ, সেখানে অত্যন্ত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির রেডিয়েশন হচ্ছে। এর কারণ আমার এই মুহূর্তে জানা নেই। সে জন্যেই এই সাবধানতা।

মহাকাশযানের এই কম্পিউটারটি পুরুষকণ্ঠে কথা বলে। গলার স্বর কর্কশ। সাধারণত কম্পিউটারগুলি কথা বলে মেয়েদের গলায় মিষ্টি স্বরে। কিন্তু গ্যালাকটিক মহাকাশযানগুলির জন্যে ভিন্ন ব্যবস্থা। সেখানে কম্পিউটারগুলি কথা বলে গম্ভীর সুরে–যেন ৫০ বছর বয়সী অঙ্কের প্রফেসর কথা বলছেন। কারণ সম্পূৰ্ণ মনস্তাত্ত্বিক। গ্যালাকটিক মহাকাশযানগুলি দীর্ঘ সময় মহাশূন্যে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য বার কম্পিউটারকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা ক্রু মেম্বারদের মতের সঙ্গে মেলে না। কম্পিউটারের ভারী আওয়াজ তখন প্রভাব ফেলে। মেয়েলি গলার মিষ্টি কথা যত সহজে অগ্রাহ্য করা যায়, একটি বৃদ্ধের গম্ভীর গলার আওয়াজ তত সহজে করা যায় না।

জনি বলল, কম্পিউটার সিডিসি। বায়ুর চাপ কেমন?

১.৫ এাটমোসফিয়ার খুব বেশি নয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ০.৮৭G, তোমাদের কোনো বিশেষ ধরনের স্পেস স্যুট পরতে হবে না। স্কাউটশিপে যা আছে তাতেই চলবে।

কোনো প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে।

এটি একটি মৃত জগৎ। কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই।

তুমি কি নিশ্চিত?

জীববিদ্যা বিভাগ আমাকে যেসব তথ্য দিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে বলতে পারি যে, কার্বন বা সিলিকনভিত্তিক কোনো প্রাণের সৃষ্টি হয় নি।

উদ্ভিদ?

উদ্ভিদ নেই। বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড নেই, যা খানিকটা নিশ্চিতভাবেই বলে, উদ্ভিদ বা প্রাথমিক স্তরের কোনো জীব এখানে নেই।

তাহলে আমরা এখানে যাচ্ছি কী জন্যে?

বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।

বৈজ্ঞানিক কৌতূহল তো আমরা মহাকাশযানে বসে থেকেই মেটাতে পারতাম। এখানে আমার নামার প্রয়োজন কি?

তোমার কি এখানে নামতে ভয় করছে?

জনি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, না। কোনো একটি বিচিত্র কারণে তার সত্যি সত্যি ভয় করছিল। স্কাউটশিপটি অবতরণের জায়গা থেকে প্রায় সাত শ ফুট উপরে স্থির হয়ে আছে। শক্তিবলয় তৈরি হতে সময় লাগবে। ততক্ষণ জনির চুপচাপ অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। সে ডায়াল ঘুরিয়ে মহাকাশযানের অধিনায়ক কিম দুয়েন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করল।

হ্যালো কিম দুয়েন।

হ্যালো জনি।

কতক্ষণ লাগবে শক্তিবলয় তৈরি হতে?

নির্ভর করে কী ধরনের শক্তিবলয়, তার উপর।

প্রায় দুঘণ্টা ধরে বসে আছি আমি। এত দেরি হচ্ছে কেন?

3M শক্তির বলয় তৈরি হচ্ছে, এতে সময় লাগে জনি। তুমি কি আর কিছু বলবে?

হ্যাঁ বলব। আমার সঙ্গে আরো এক জন কারোর থাকা দরকার।

কি ব্যাপার, জনি, একা-একা ভয় লাগছে?

ভয়ের প্রশ্ন নয়। প্রথম অবতরণ কখনো একা না করার নির্দেশ আছে।

তুমি একা নামছ না। তোমার সঙ্গে আছে L2F12.

কিম দুয়েন, এটি তো একটা রোবট।

রোবট হলেও এতে একটি সিডিসি কম্পিউটারের মস্তিষ্ক আছে। নয় কি?

হ্যাঁ, তা আছে।

তাহলে ভয় পাচ্ছ কেন?

ভয় পাচ্ছি, এমন কথা তো বলি নি।

বলার অপেক্ষা রাখে না জানি। আমাদের এখানে আমরা তোমার হার্টবিট এবং ব্লাডপ্রেসার মাপতে পারছি।

কিম দুয়েন ফুর্তিবাজের ভঙ্গির্তে হেসে উঠল। জনি চুপ করে রইল।

হ্যালো জনি, ঠিক এই মুহূর্তে তোমার ব্লাডপ্রেসার কত জানতে চাও?

জনি ডায়াল—সুইচ অফ করে দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। তার ভয় করছে ঠিকই, কিন্তু তার পেছনে কারণ আছে। মুশকিল হচ্ছে, কারণটি কাউকে বলা যাচ্ছে না। বলামাত্রই একটি মেডিকেল টিম বসবে। এক জন সাইকিয়াট্রিস্টকে বলা হবে জনি কুলম্যান, জু নাম্বার তিনশ; ভূতত্ত্ববিদ ও স্কাউট অভিযাত্রীর উপর একটি পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্ট লিখতে। এসব হতে দেয়া যায় না।

জনি।

জনি কুলম্যান দেখল, সিডিসি রোবটটির মস্তিষ্ক চালু করা হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে শক্তিবলয় তৈরি শেষ হয়েছে, স্কাউটশিপ এখন নিচে নেমে যাবে। জনি কুলম্যান রোবটটির দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,

হ্যালো সিডিসি।

তুমি কি ভয় পাচ্ছ জনি? তোমার হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে।

জনি শান্ত স্বরে বলল, আমি ভয় পাচ্ছি।

কারণটি কি আমি জানতে পারি?

জানতে পার। যেহেতু তুমি যাচ্ছ আমার সঙ্গে, সেহেতু তোমাকে আমার বলা উচিত।

বল। আমি শুনছি।

স্কাউটশিপে নিচে নামার সময় আমার মনে হল, এক জন কেউ যেন আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

হুঁ। সেটির একটি ছবিও যেন আমার মনে এল।

ছবিটি কি রকম?

কুৎসিত। জিনিসটির অনেকগুলি পা আছে।

তুমি দেখতে পেলে জিনিসটিকে।

না। ছবিটি আমার মনে হল।

আর কি জান জিনিসটি সম্পর্কে?

ওর নাম জানি।

নামটিও তোমার মনে হল?

হ্যাঁ।

কী নাম।

অয়ু।

স্কাউটশিপটি ভূমি স্পর্শ করা মাত্র সিডিসি বলল, তুমি মহাকাশযানে ফিরে যাবার পর অবশ্যই এক জন সাইকিয়াট্রিক্টের সঙ্গে দেখা করবে। জনি কথা বলল না। সিডিসি বলল, তুমি রাগ করলে না তো আবার। তোমরা মানুষরা অকারণেই রাগ কর। জনি চুপ করে রইল।

মহাকাশযান সময় ১৪টা ৩০ মিনিটে তারা দুজন স্কাউটশিপ থেকে বের হয়ে এল। প্ৰকাণ্ড সব পাথরে ঢাকা ঘন কৃষ্ণবর্ণের ধূলিকণা চারদিকে। একটি মৃত পৃথিবী, কঠিন এবং কিছু পরিমাণে ভয়ঙ্কর।

জনি স্কাউটশিপকে পেছনে ফেলে পঁচিশ গজের মতো এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। একটি সবুজাভ পাথরের আড়াল থেকে এটি কী বের হয়ে আসছে? স্পেস-স্যুটের আরামদায়ক শীতলতার মধ্যেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল।

জিনিসটি কুৎসিত। এগারোটি পা মাকড়শার মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। শরীরের তুলনায় প্রকাণ্ড একটি মাথা। মাথার দুপাশে গাছের ঘন শিকড়ের মতো কী যেন বের হয়ে আছে, যেগুলি সারাক্ষণই এদিক-ওদিক নড়ছে। জিনিসটির কোনো চোখ নেই, মুখ নেই। গায়ের বর্ণ ধূসর নীল। জনি কুলম্যান জরুরি সুইচ টিপল। হ্যালো। হ্যালো। হ্যালো মহাকাশযান গ্যালাক্সি-ওয়ান। হ্যালো। সিডিসি, সিডিসি। হ্যালো সিডিসি।

জনি তার ডান হাতের আণবিক রাস্ট থ্রোয়ার কার্যকর করে জিনিসটির দিকে তাকাল, যেটি প্রায় এক শ গজ দূরে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মাথার দুপাশের শিকড়ের মতো জিনিসগুলি ঘূর্ণায়মান গতিতে অতি দ্রুত ঘুরছে। জনি কুলম্যান কুল-কুল করে ঘামতে লাগল।

০৩. এ রকম অসম্ভব ঘটনাও ঘটে

এ রকম অসম্ভব ঘটনাও ঘটে।

অয়ু সমগ্র ব্যাপারটি চোখের সামনে ঘটতে দেখল। প্ৰকাণ্ড বড় জিনিস থেকে ছোট্ট জিনিসটি নেমে এল মাটিতে। তার মধ্যে দুটি কী যেন বসে আছে। তারা কে? দু জনের কম্পনাঙ্ক রকম। এক জনের মধ্যে আরে এ কি! অয়ুর মনে হল একজনের সমস্ত চিন্তাভাবনা সে বুঝতে পারছে।

এতে অবাক হবার কিছু নেই, অয়ু লী বা নীম দুজনের মনের কথাই বুঝতে পারে। কিন্তু যে জিনিসটির কথা সে বুঝতে পারছে, সে জিনিসটি অয়ু বা লীর মতো নয়। ওর একটি নাম আছে, জনি, কুলম্যান–অদ্ভুত নাম। জনি কুলম্যান অসম্ভব ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে কেন? ছোট্ট ঘর থেকে ভয়ে ভয়ে নামছে। তার সঙ্গে যে আছে, তার মনের কথা অয়ু কিছুই বুঝতে পারছে না। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, ঐটির মধ্যে আবার অসংখ্য তরঙ্গ। তরঙ্গগুলির দৈর্ঘ্য একেকটি একেক রকম। ওর নাম কি অয়ু বুঝতে পারছে না। তবে বুঝতে পারছে, তার সঙ্গে আকাশের মহাকাশযানটির সম্পর্ক আছে। অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে সম্পর্কটি রাখা হচ্ছে সর্বক্ষণ। অন্য লোকটি, যার নাম জনি কুলম্যান, সেও মাঝে মাঝে মহাকাশযানটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। তবে তা রাখা হচ্ছে অনেক বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ দিয়ে। অর্থাৎ সে কথা বলছে। কথা বুঝতে পারা যাচ্ছে না। তবে অয়ু যদি বেশ কিছু সময় এই সমস্যাটি নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে বুঝতে পারবে। ইস, লী আর নীম যদি থাকত, তাহলে নিমিষের মধ্যে সমস্যাটির সমাধান হত।

অয়ু মন দিল জনি কুলম্যানের দিকে–এত ভয় পাচ্ছে কেন? কী যেন বলল অন্যটিকে। হাঁটছে সামনের দিকে। হাতে এটি কী? অয়ু ভাবতে লাগল। পরিষ্কার কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কেমন যেন অস্পষ্ট। অয়ু তার খগুলি ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল। যে খ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বুঝতে পারে, সেটিকে বিভিন্ন তরঙ্গমাত্রায় দোলাতে শুরু করল। হ্যাঁ, এইবার বুঝতে পারা যাচ্ছে। জনি কুলম্যান এক জন ভূতত্ত্ববিদ। মাটি সম্পর্কে জানে। মাটি কী? জনি কুলম্যান পাথরগুলি সম্পর্কে ভাবছে। পাথরগুলি সিলিকা ও এলুমিনিয়ামের, তার মধ্যে আছে অক্সাইড। সিলিকা কী, এলুমিনিয়াম কি, আবার কপার অক্সাইডই-বা কী? কপার অক্সাইড দেখে জনি কুলম্যান অবাক। কারণ এখানে অক্সিজেন নেই। অক্সিজেন না থাকলে কপার অক্সাইড থাকবে না কেন? এই দুটির মধ্যে সম্পর্ক কী? আহ, এই জনি কুলম্যান কত সুখী! কত রকম সমস্যা আছে তার মাথায়। নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে ভাবছে। তাদের মতো না, একই সমস্যা নিয়ে তাদের মতো ভাবতে হয় না। আচ্ছা, ঐ জনি কুলম্যান কি বলতে পারবে আকাশের বাইরে কী আছে? নিশ্চয়ই পারবে, কারণ তারা এসেছে আকাশের বাইরে থেকে।

অয়ু হঠাৎ পাথরের আড়াল থেকে বের হয়ে এল। তার প্রকাণ্ড শরীরটিকে অতি দ্রুত নিয়ে এল জনিকুলম্যানের সামনে। তারপর স্থির হয়ে দাঁড়াল সেখানে।

জনি কুলম্যান, আমাদের তিন বন্ধুর তরফ থেকে তোমাকে জানাচ্ছি। অভিনন্দন।

জনি প্রথম খানিকক্ষণ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। এসব কি সত্যি, না স্বপ্ন! জনির মাথা ঝিমঝিম করছে। বুক-মুখ শুকিয়ে কাঠ। সিডিসির গলা শোনা গেল,

জনি, ভয় পেও না, আমার হাতে আণবিক ব্লাস্টার আছে। ব্লাস্টার চালু করেছি।

সিডিসি, ওটি কী?

একটি প্রাণী নিঃসন্দেহে। প্রাণীটি লক্ষ করছে আমাদের। তুমি নড়াচড়া করবে না, যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেখানে দাড়িয়ে থাক।

সিডিসি, অপেক্ষা করছ কেন? আণবিক ব্লাস্টারের সুইচ টিপে দাও।

তুমি নার্ভাস হবে না। তোমার দিকে এগোলেই আমি ব্যবস্থা করব। আমি প্রাণীটির ছবি তুলব প্রথম। মহাকাশযান থেকে আরেকটি টিম আসছে। ওরা প্রাণীটিকে ধরার চেষ্টা করবে।

জনি খানিকটা সম্বিত ফিরে পেল। খুব সাবধানে–যাতে প্রাণীটির দৃষ্টি আকর্ষিত না হয়–যোগাযোগ-সুইচ টিপল। ক্যাপ্টেনের গলা ভেসে এল সঙ্গে সঙ্গে।

হ্যালো জনি, আমরা সব কিছু লক্ষ করছি। জীববিজ্ঞানীদের টিম নেমে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে।

কি করব আমি, মেরে ফেলব প্রাণীটিকে?

কী বলছ পাগলের মতো, জীবন্ত ধরতে হবে প্রাণীটিকে। এ রকম অদ্ভুত প্রাণী এর আগে কখনো পাওয়া যায় নি। জীববিজ্ঞানীরা খুবই অবাক।

জনি কুলম্যান দেখল, প্রাণীটি আরো খানিকটা এগিয়ে এসেছে। তার মনে হল, প্রাণীটি বলছে—আমাকে ভয় করার কিছুই নেই।

রোবট সিডিসি এক হাতে আণবিক রাস্টার ধরে রেখেই অন্য হাতে বেশ কয়েকটি কাজ করল। প্রাণীদের ছবি মহাকাশযানে রিলে করার ব্যবস্থা করল। একটি সার্ভেয়ার সিস্টেম চালু করল, যাতে অন্য যে কোনো দিক থেকে এই জাতীয় কোনো প্রাণী পাঁচ শ গজের ভেতরে এলে আগে থেকেই টের পাওয়া যায়। দ্বিতীয় স্কাউটশিপটি কোথায় নামবে, তাও তাকেই বের করতে হচ্ছে। সবচে ভালো হতো যদি প্রাণীটির পেছনে নামতে পারত। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। জায়গাটি প্রকাণ্ড সব পাথরে ভর্তি। নামতে হবে প্রথম স্কাউটশিপটির কাছেই র্ব্যাপারটি বিপজ্জনক। প্রাণীটি দ্বিতীয় স্কাউটশিপ দেখে ভয় পেয়ে জনিকে আক্রমণ করে বসতে পারে।

আক্রমণের ধারা কী হবে কে জানে। জন্তুটি মনে হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক। স্বভাবতই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এতটা দূর থেকে তা সম্ভব হবে না। তাকে আরো কাছে এগিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেকটা সময় পাওয়া যাবে। হাতে। আক্রমণের অন্য ধারায় এ হয়ত দূর থেকেই বিষ জাতীয় কিছু ছুড়ে ফেলবে। তা হলে ভয়ের কিছু নেই, জনির স্পেস-স্যুট আছে।

দ্বিতীয় স্কাউটশিপে ছিল টাইটেনিয়াম ইরিডিয়ামের তৈরি একটি প্রকাণ্ড খচা। খাচাটি আনা হচ্ছে প্রাণীটাকে বন্দি করার জন্যে। ডঃ জন ফেন্ডার (প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রধান) এবং মহাকাশযানের সিকিউরিটি বিভাগের এক জন অফিসার খাচাটাকে নিয়ে আসছে।

ডঃ জন ফেল্ডারের মুখ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ, এই অদ্ভুত প্রাণীটির এখানে থাকার কথা নয়। তবু সে আছে। তার মানে সে একা নয়, আরো অনেকেই নিশ্চয় আছে। কিন্তু এরা খায় কি? এই ঊষর গ্রহে এদের জন্যে কোনো খাদ্য থাকার কথা নয়।

ডঃ জন ফেভার অন্য আরেকটি কারণেও যথেষ্ট ব্ৰিত। তার মনে হচ্ছে প্রাণীটি বুদ্ধিমান। এ রকম মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রথমত, এই অবস্থাতে যে কোনো প্রাণীই পালিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করত, এটি তা করছে না, নিজ থেকে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু আক্রমণ করছে না, বরং দূরে দাঁড়িয়ে গভীর আগ্রহের সঙ্গে সব কিছু লক্ষ করছে। ডঃ ফেভার লক্ষ করেছে, প্রাণীটির সমস্ত মনোযোগ জনির দিকে। মাঝে মাঝে সে অবশ্যি তাকাচ্ছে রোবটটির দিকে। তাও খুব অল্প সময়ের জন্যে। তাহলে সে কি বুঝতে পারছে, রোবটটি একটি যান্ত্ৰিক মানুষ।

ডঃ জন ফেভারের উদ্বেগ আরো বাড়ল, যখন সেন্ট্রাল কম্পিউটার থেকে হঠাৎ বলা হল–প্রাণীটির গা থেকে বিটা রেডিয়েশন হচ্ছে। জন ফেন্ডার অবাক হয়ে বলল, তা কী করে হচ্ছে।

কী করে হচ্ছে, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না, তবে হচ্ছে।

আরো কিছু আছে?

আছে, তবে তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।

ঠিক না হলেও বলে ফেল।

প্রাণীটির শরীরে একটি চৌম্বক শক্তি থাকার সম্ভাবনা আছে।

নিশ্চতভাবে কখন জানা যাবে?

যখন প্রাণীটি এগিয়ে আসবে।

জন ফেন্ডার শুকনো মুখে বলল, চৌম্বক শক্তিটি কি শক্তিশালী?

যথেষ্ট শক্তিশালী।

জন ফেডার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমার কি মনে হয় প্রাণীটি বুদ্ধিমান?

সিডিসি সঙ্গে সঙ্গে বলল, প্রাণীটি বুদ্ধিমান হবার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তবে যেসব তথ্য আমার কাছে আছে, তা থেকে এই মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না।

মহাকাশযান সময় ১৫/৩৫ মিনিটে দ্বিতীয় স্কাউটশিপটি নামল। জন্তুটি লফিয়ে উঠল না, বা ভয় পেয়ে পালিয়েও গেল না। স্কাউটশিপ থেকে পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে জন ফেভারের মনে হল–প্রাণীটির নাম অয়ু, প্রাণীটির আরো দুটি বন্ধু আছে। একজনের নাম লী, অন্যজনের নাম নীম। এরা তিন জন ছাড়া এই গ্রহে অন্য কোনো প্রাণী নেই।

এই রকম মনে হওয়ার পেছনে কোনো কারণ নেই। তবু জন ফেডারের মনে হল, এ সব তথ্যের প্রতিটিই সত্য। জন ফেভার কাঁপা গলায় বলল, হ্যালো জনি, ঐ জটির নাম অয়ু নাকি?

হ্যাঁ, ওর নাম অয়ু।

জন ফেভার গম্ভীর হয়ে বলল, কী করে জানলে ওর নাম অয়ু? কথা বলেছ নাকি ওর সঙ্গে?

না, কথা বলি নি।

কথা না বলেই বুঝতে পারলে?

জনি থেমে থেমে বলল, তা পারলাম এবং আমার মনে হয় তুমি বুঝতে পেরেছ।

জন ফেভার গম্ভীর হয়ে বলল, ব্যাপার কি জানি।

ব্যাপার তো তোমারই জানার কথা। তুমি জীববিজ্ঞানের লোক।

তা ঠিক। তা ঠিক।

জন ফেন্ডারম্যান স্কাউটশিপ থেকে অনেকখানি এগিয়ে গেল প্ৰাণীটির দিকে, তারপর স্পষ্ট স্বরে বলল,

হ্যালো আয়ু।

০৪. লী ও নীম নিঃশব্দে হাঁটছিল

লী ও নীম নিঃশব্দে হাঁটছিল।

হাঁটবার সময় এরা সচরাচর কথা বলে না। লুখগুলি শরীরের ভেতর লুকানো থাকে। নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া বের করে না।

সকালবেলার দিকে তারা ঘরগুলির সামনে এসে দাঁড়াল। ঝড় নেই। শান্ত ভাব চারদিকে। লী বলল,

আজ কোন ঘরটির ভেতর প্রথম ঢুকবে?

নীম জবাব না দিয়ে প্রথম ঘরটির ভেতর ঢুকে পড়ল। এই ঘরটি সবচে উঁচু। প্রায় আকাশছোয়া। লী বেশ অবাক হল। তারা কখনও একাএকা কোথাও যায় না। আজ নীম এরকম করল কেন? লী ডাকল, নীম, নীম।

নীম সাড়াশব্দ করল না। লী খানিকক্ষণ ইতস্তত করে প্রথম ঘরটির ভেতরে ঢুকল। আশ্চর্য, এই প্ৰকাণ্ড হল ঘরের কোথাও নীম নেই। তাহলে সে কি দ্বিতীয় ঘরে চলে গেছে। দ্বিতীয় ঘরেও তাকে পাওয়া গেল না। শুধু তাই নয়, ছটি ঘরের কোনটিতেই নীম নেই।

লী অবশ্য অনায়াসে তাকে খুঁজে বের করতে পারে। লুখগুলি বের করে রাখলেই জানা যাবে কোথায় লুকিয়ে আছে নীম। কিন্তু লীর ইচ্ছা করছে। না। নীম এ রকম করল কেন?

লী ঘরের বাইরে এসে পা ছড়িয়ে বসে থাকল। তার কিছুই ভালো লাগছে না। ক্লান্তি লাগছে। এ রকম কলল কেন নীম? কত দীর্ঘকাল তারা একসঙ্গে আছে। সেই কবেকার কথা, অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে। মা ছিলেন বেঁচে। মায়ের চারপাশে তারা ঘুরঘুর করত। মা বলতেন,

আমার লক্ষ্মী সোনারা, তোমরা সবাই একসাথে থাকবে। একা-একা যাবে না কোথাও।

নীম চোখ ঘুরিয়ে বলত, একা-একা গেলে কী হয়?

একা-একা থাকলে অনেক ঝামেলা হতে পারে। যদি একসঙ্গে থাক, তাহলে তোমাদের তিন জনের সুখ একসঙ্গে থাকবে। যদি তারা এক মাত্রায় কাঁপে, তাহলে তোমরা অনেক কিছু করতে পারবে। আমাদের লুখ মহাশক্তিশালী।

কী করে কাঁপবে এক সঙ্গে?

তোমাদের নিজেদেরই তা শিখতে হবে। আমার লুখ নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তোমাদের কিছু শেখাতে পারব না।

শুধু লুখ নয়, অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর। মা চোখে দেখতেন না, হাঁটতে পারতেন না। তবু যে কত দিন বেঁচে ছিলেন, তাদের কত কিছুই না শেখাতেন। প্রথম শেখাৰ্পেন কী করে সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হয়।

প্রথমে লুখগুলি শরীরের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলবে, তারপর কোনো একটি জায়গায়, যেখানে প্রচুর আলো আছে, সেখানে পা ছড়িয়ে ভাবতে বসবে। একজন কি ভাবছে অন্য জন তা বুঝতে চেষ্টা করবে না।

বুঝতে চেষ্টা করলে কী হয়?

ঠিকমতো ভাবা যায় না।

তাদের প্রথম সমস্যা দিলেন মা। সমস্যাটি অদ্ভুত—আমরা কে? কোত্থেকে এসেছি? দিনের পর দিন এই সমস্যা নিয়ে ভাবতে লাগল। তারা। প্রথম মুখ খুলল আয়ু। সে বলল,

আমরা বুদ্ধিমান একটি প্রাণী।

মা বললেন, প্রাণী কি?

যারা ভাবতে পারে তারাই প্রাণী।

আমরা কোত্থেকে এসেছি?

আমরা কোনো জায়গা থেকে আসি নি। এখানেই ছিলাম।

মা দুঃখিত হয়ে বললেন, তোমরা এখনো ভাবতে শেখ নি। ভাবনাতে যুক্তি নেই তোমাদের।

ক্ৰমে ক্ৰমে তারা ভাবতে শিখল। কত অদ্ভুত অদ্ভুত সমস্যাই না মা দিতেন–(১) আলো আমাদের কাছে এত প্রিয় কেন? কেন আমরা আলো ছাড়া ভাবতে পারি না? (২) কেন ঘরগুলির কাছে আমাদের যেতে মানা?

তখনো তারা ঘরগুলি দেখে নি, শুধু মায়ের কাছে শুনেছে। দুটি ঘর আছে আকাশছোয়। সে ঘরের কাছে যেতে মানা। কেন মানা? মা তা বলবেন না। ভেবে বের করতে হবে।

যেদিন মায়ের শরীর একটু ভালো থাকত, সেদিনই নতুন কিছু বলতেন। একদিন তারা গুনতে শিখল। শেখামাত্রই মা একটি সমস্যা দিয়ে দিলেন পাঁচ সংখ্যার এমন দুটি রাশি বল, যাকে অন্য কোনো রাশি দিয়ে ভাগ দেয়া যায় না।নীম সঙ্গে সঙ্গে বলল,

যে কোনো রাশিকেই এক কিংবা সেই রাশি দিয়ে ভাগ দেয়া যায়।

তা যায়। ঐ দুটি রাশি ছাড়া অন্য কোনো রাশি দিয়ে ভাগ দেয়া যাবে না।

মা মারা যাবার আগে আগে অনেক কিছুই ওরা শিখে ফেলল। আবার অনেক কিছু শিখতে পারল না। মা বলতেন, বেশির ভাগ জিনিসই শিখতে হয় নিজের চেষ্টায়। তোমরা দীর্ঘজীবী! অনেক সময় পাবে শেখার। মৃত্যুর আগে আগে বলে গেলেন,

একটি কথা সব সময় মনে রাখবে, তোমরা থাকবে একসঙ্গে। তোমাদের তিন জনের মিলিত শক্তি হচ্ছে অকল্পনীয় শক্তি। আরেকটি কথা, ঘরগুলির রহস্য বের করতে চেষ্টা করবে।

তাঁর মৃত্যু দেখে ওদের যাতে কষ্ট না হয়, সে জন্যে মা মৃত্যুর ঠিক আগে আগে ওদের একটি সমস্যা নিয়ে ভাবতে বললেন, মৃত্যু কী? তারা সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকল, বুঝতেই পারল না কখন মা মারা গেলেন।

নীম বেরিয়ে আসতে দেরি করল। অনেকখানি দেরি করল। সূর্য তখন প্রায় মাথার উপর। লী কিছুই বলল না। নীম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, চল ফিরে যাই।

তোমার যা দেখার দেখা হয়েছে?

হয়েছে।

কী দেখলে?

আজকে প্রথম বারের মতো একটা জিনিস লক্ষ করলাম।

বল শুনি।

এই ঘরগুলি আকাশছোঁয়া।

আমার তো মনে হয় এ তথ্যটি আমরা প্রথম থেকেই জানি।

এই ঘরগুলির দেয়াল অসম্ভব মসৃণ।

এইটিও আমরা প্রথম থেকেই জানি।

আমার মনে হয় এ রকম করা হয়েছে, যাতে আমরা দেয়াল বেয়ে উঠতে না পারি।

লী চুপ করে রইল। নীম বলল, আমি ভেতরে গিয়ে আজকে কী করেছি জান?

না। জানতে চেষ্টা করি নি।

এই ঘরের যে কম্পনাঙ্ক, সেই কম্পনাঙ্ক আমি আমার সুখ কাঁপিয়েছি।

লী স্তম্ভিত হয়ে গেল। যদি সত্যি তাই হয়, তাহলে ঘরটির ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ার কথা।

নীম বলল, ঘর ভাঙাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। যাতে তুমি আঘাত না পাও, সেজন্যই তোমাকে নিয়ে ঢুকি নি। কিন্তু ঘর ভাঙে নি। কেন ভাঙে নি জান?

না।

ভাঙে নি, কারণ ছটি ঘর আলাদা আলাদা করে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সামগ্রিক কম্পনাঙ্ক অনেক নিচে নেমে গেছে। আমরা এত নিচে নামতে পারি না। তুমি কি কিছু বুঝতে পারছ, লী?

পারছি। যারা এই ঘরগুলি তৈরি করেছে, তারা আমাদের হাত থেকে এদের রক্ষা করবার জন্যেই এরকম করেছে, এই বলতে চাও তুমি?

হ্যাঁ।

তারা তাহলে কোথায়?

সেই সমস্যা নিয়ে আমাদের তিন জনকে একসঙ্গে ভাবতে বসতে হবে।

লী এবং নীম নিঃশব্দে ফিরে চলল। লী ভেবে রেখেছিল নীমকে খুব একচোট গালমন্দ করবে। কিন্তু কিছুই করল না, অত্যন্ত দ্রুতপায়ে ফিরে চলল অয়ুর কাছে। তিন জন মিলে আবার ফিরে আসা দরকার। ঘরগুলির মাথার উপর গিয়ে দেখা দরকার কী আছে সেখানে। অনেক সমস্যা জমে গেছে। ভাবতে বসা প্রয়োজন।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, জন্তুটি নিঃশব্দে খাঁচায় ঢুকে পড়ল। জন ফেন্ডার এবং জনি কুলম্যান বড়ই অবাক হল। কোনো জন্তুকে খাঁচায় ঢোকানো অত্যন্ত পরিশ্রমের ব্যাপার। প্রচুর যান্ত্রিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রথমে একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক চক্র তৈরি করা হয়, সেই চক্ৰ ক্ৰমাগত ছোট করে

চার মুখের সামনে আনা হয়। জন্তুটি যত বুদ্ধিমান, তাকে খাঁচায় ঢাকানো ততই মুশকিল। এ ক্ষেত্রে কোনো কিছুরই প্রয়োজন হল না। খাচার মুখ খোলামাত্র জন্তুটি খাচায় ঢুকে পড়ল। বৈদ্যুতিক চক্র তৈরি করার প্রয়োজনও হল না। জনি কুলম্যান চেঁচিয়ে বলল, চার দরজা বন্ধ করে দাও।

কম্পিউটার সিডিসি বলল, যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে। খাচার দরজা বন্ধ হচ্ছে না।

কি জাতীয় গোলোযোগ?

সেকেন্ডারি মেগনেটিক ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না।

এরকম হবে কেন?

মনে হচ্ছে কারেন্ট ফ্লো করছে না। ভেরিয়াক দুটি অকেজো। পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আমরা এখন কী করব?

অপেক্ষা করবে। আমরা ক্রটি সারাতে না পারলে অন্য আরেকটি খাঁচা পাঠাবে।

জনি কুলম্যানের বিরক্তির সীমা রইল না। কতক্ষণ এরকম অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। জন্তুটি মনে হচ্ছে দিব্যি সুখে ঘুমিয়ে পড়েছে। গাছের ডালের মতো যেসব বিচিত্র জিনিস তার মাথার দুপাশ দিয়ে বের হয়েছিল, সেগুলি আর দেখা যাচ্ছে না। শরীরের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেছে। নাকি? জন ফেন্ডার বলল, প্রাণীটি বুদ্ধিমান নয়।

কী দেখে বলছ?

প্রাণীটি ঘুমিয়ে পড়েছে। এ রকম অস্বাভাবিক অবস্থায় কোনো প্রাণী ঘুমিয়ে পড়তে পারে না।

ঘুমুচ্ছে, বুঝলে কী করে?

চোখ বন্ধ। মাথার শুঁড়গুলিও নেই। নড়াচড়া করছে না।

তুমি কি নিঃসন্দেহ যে প্রাণীটি ঘুমুচ্ছে?

না। তা ছাড়া অসংখ্য প্ৰাণী আছে যারা কখনো ঘুমায় না। স্নায়ুবিক বিশ্রামের তাদের প্রয়োজন নেই।

১৮টা পঁচিশ মিনিটে গ্যালাক্সি-ওয়ান থেকে জানানো হল যে চাটির দরজা ঠিক করা সম্ভব হয় নি। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অন্য একটি খাঁচা পাঠানো হচ্ছে। জন্তুটিকে নতুন খাঁচায় ঢোকানোর জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হোক।

প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা নেয়ার আগেই দেখা গেল ঠিক একই রকম দেখতে আরো দুটি প্রাণী এসে উপস্থিত হয়েছে এবং কিছুমাত্র দ্বিধা না করে ঢুকে পড়েছে খাচায়। ঢোকামাত্রই খাচার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জনি বলল, এসব কী হচ্ছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই দুটি আবার কোত্থেকে এল?

জন ফেন্ডার বলল, তুমি নিশ্চয়ই আশা কর নি, একটিমাত্র এরকম প্রাণী এই গ্রহে?

লক্ষ লক্ষ এ রকম কুৎসিত প্রাণী এখানে, তাও আশা করি নি। আর ভাব দেখে মনে হচ্ছে সবাই খাচায় ঢুকে পড়বে।

মোটেই অস্বাভাবিক নয়। নিম্নশ্রেণীর প্রাণীরা প্রায়ই দলপতিকে অনুসরণ করে।

জনি গম্ভীর হয়ে বলল,

প্রাণীগুলি মোটেই নিম্নশ্রেণীর নয়। আমার মনে হয় প্রথম প্রাণীটি ইচ্ছা করে দরজা খোলা রেখেছিল, যাতে অন্য দুটি এসে উঠতে পারে এবং সুযোগ বুঝে আমাদের সর্বনাশ করতে পারে।

তুমি শুধু শুধু ভয় পাঞ্ছ জনি। এরা নিরীহ প্রাণী। হিংস্র নয়। হিংস্র হলে আমাদের আক্রমণ করে বসত।

আক্রমণ করে নি, কারণ এরা বুদ্ধিমান। এরা সুযোগের জন্যে অপেক্ষা করবে।

জন ফেন্ডার হেসে উঠল। জনি বলল, তিনটি প্রাণীকে এক সঙ্গে মহাকাশযানে নিয়ে আমরা হয়তো বোকামি করছি।

জান, সে দায়িত্ব তোমার নয়। কেন শুধু শুধু ভাবছ?

জীববিদ্যা গবেষণাগারের একপ্রান্তে প্রাণী তিনটিকে রাখা হল। ঘরটি সিলঝিন সংকরের তৈরি। বায়ুর চাপ ০.৯৫ এটমসফিয়ার। বায়ুমণ্ডলীয় গঠন এমন রাখা হয়েছে যাতে প্রাণীগুলির কিছুমাত্র অস্বস্তি না হয়। খাদ্য এবং পুষ্টি বিভাগের উপর ভার পড়েছে, কী ধরনের খাদ্য প্রাণীটি গ্রহণ করে তা বের করা। সাইকিয়াট্রি বিভাগকে বলা হয়েছে প্রাণীটির বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট দিতে। রিপোর্টে যদি প্রাণীটিকে বুদ্ধিমান বলা হয়, তবেই তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হবে।

গ্রহটিতে একটি নিরীক্ষা পরীক্ষাগার খোলা হয়েছে। পরীক্ষাগারের দায়িত্ব হচ্ছে, মাকড়সা জাতীয় এই প্রাণীগুলি ছাড়া অন্য কোনো প্রাণের বিকাশ হয়েছে কি না, সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা। গ্রহটি ১২ টাইপ। এই জাতীয় গ্রহে প্রাণের উদ্ভব হয় না। কিন্তু যেহেতু এক শ্রেণীর প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেহেতু এই নিরীক্ষা পরীক্ষাগার।

মাকড়সা জাতীয় প্রাণীগুলিকে মহাকাশযানে নিয়ে যাবার পরপরই তাদের ঘুমন্ত ভাব কেটে যায়। তারা মাথার দুপাশের বিচিত্র শিকড়ের মতো জিনিসগুলি বের করে অস্থিরভাবে ছুটোছুটি করতে থাকে। কিন্তু অবস্থাটি সাময়িক। খানিকক্ষণ পর এরা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। চুপচাপ নিঝুম। কিন্তু আবার জেগে উঠে আগের মতো ছুটোছুটি করতে থাকে। আবার নিঝ্‌ঝুম।

তাদের এ পর্যন্ত ছ রকমের খাবার দেয়া হয়েছে। প্রোটিন, ফ্যাট এবং সেলুলোজ জাতীয় খাবার। প্রতি বারই তারা গভীর আগ্রহে খাবারের চারপাশে ভিড় করেছে। কিন্তু খাবার স্পর্শও করে নি। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আবার সেই আগের মতো ঘুমন্ত অবস্থা।

সাইকিয়াট্রি বিভাগ থেকে বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার জন্যে প্রথম পরীক্ষাটির ব্যবস্থা করা হল। এটি একটি সহজ পরীক্ষা (হলড্রেন ক্রিয়েটিভি টেস্টটাইট হইসি)। যার বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করা হবে, তাকে চৌষট্টিটি স্কয়ার দেয়া হয় এবং অন্য এক জন প্রাণীটির সামনে ঠিক একই ধরনের চৌষট্টিটি স্কয়ার নিয়ে বসে। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সেগুলি নিয়ে একটি ত্রিভুজ, একটি আয়তক্ষেত্র এবং একটি সিলিন্ডার তৈরি করা হয়। এরপর এগুলিকে সমানুপাতিকভাবে বিভিন্ন ভাগ করে প্রাণীটিকে দেখানো হয়। সাধারণত নিম্নশ্রেণীর বুদ্ধিবিশিষ্ট প্রাণীরা বেশ কিছু দূর পর্যন্ত অনুসরণ করতে পারে। মধ্যম শ্রেণীর বুদ্ধিবিশিষ্ট প্রাণীরা সমানুপাতিক ভাগ পর্যন্ত করতে পারে। শেষ দুটি পর্যায় শুধু বুদ্ধিমান প্রাণীরাই করতে পারে।

মাকড়সা শ্রেণীর প্রাণী তিনটি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে স্কয়ারগুলি নাড়াচাড়া করতে লাগল। কিন্তু তার পরপরই স্কয়ারগুলি এক পাশে সরিয়ে রেখে দিব্যি ঘুমুতে গেল।

হলডেনের দ্বিতীয় টেস্টেও একই ব্যাপার হল। গোলাকার বল পাঁচটিকে নিয়ে তারা খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে এক পাশে রেখে ঘুমুতে গেল।

সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হল–প্রাণীগুলির প্রাথমিক পর্যায়ের বুদ্ধিও নেই বলেই মনে হচ্ছে। সাইমেন্সের টেস্টগুলি না করা পর্যন্ত সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

লীর একটি মাত্র চিন্তা–এসব কি?

বলাই বাহুল্য, এই লম্বাটে দুটিমাত্র পা-বিশিষ্ট প্রাণীগুলি অনেক জানে। যারা এমন একটি অদ্ভুত জিনিসে করে হঠাৎ এসে হাজির হতে পারে, তারা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও এরা সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছে না। এদের ভাবভঙ্গি এরকম, যেন কোথাও কোনো সমস্যা নেই। এদের কথার অর্থ বুঝতে পারলে ভালো হত। নীমকে বলা হয়েছে কথার অর্থ বের করতে। সে এখন শুধু একটিমাত্র সমস্যা নিয়েই ভাবছে। এরা প্রতিটি জিনিসকে একটি নাম দিয়ে ডাকে মহাকাশযান, রবট সিডিসি, সাইকিয়াট্রি বিভাগ। একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক কী করে, সেটিই এখন জানতে হবে। ব্যাপারটি জটিল নয়, সময়সাপেক্ষ। নীম এখানকার প্রতিটি জীবের (যাদের এরা মানুষ বলে ভাবছে) কথাবার্তা মন দিয়ে শুনছে এবং বিশ্লেষণ করছে।

এরা চৌষট্টিটি বস্তু দিয়েছে। উদ্দেশ্য কী, তা বোঝা যাচ্ছে না। এক জন অনেক কিছু বানিয়ে বানিয়ে দেখাল। এরা কি চায় তারাও সেরকম কিছু বানিয়ে বানিয়ে দেখাবে? তা কেন চাইবে নাকি তারা চায় এই সব বস্তুর কম্পনাঙ্ক কত তা বের করতে? নীম প্রতিটির কম্পনাঙ্ক কত তা বের করল। তারপর তিন জন মিলে ভাবতে বসল এই কম্পনাঙ্কগুলির অন্য কোনো অর্থ আছে কিনা। সমস্যাটি জটিল। সময় লাগল ভাবতে। কিন্তু উত্তর বের করার আগেই ওরা পাঁচটি গোলাকার বস্তু ঢুকিয়ে দিল। এদের ওজন এক নয়, কিন্তু কম্পনাঙ্ক এক। এটিও কি কোনো সমস্যা? ওরা আবার ভাবতে বসল।

অয়ুর উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, ওরা কে কী ভাবছে তা বের করার। এর জন্যে ভাষা জানবার প্রয়োজন হয় না। লুখ দুটিকে সম্পূর্ণ সক্রিয় করতে হয়। অয়ু নিবিষ্ট মনে তাই করে যাচ্ছে। প্রতিটি মানুষের কথা জানবার পরই সে সমস্যা নিয়ে ভাবতে বসবে। কিন্তু ইতিমধ্যে সে একটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছে, মানুষরা একে অন্যের মনের কথা বুঝতে পারছে না। ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। জনি নামের মানুষটি জন ফেন্ডারের খুব কাছে পঁড়িয়ে মনে মনে ভাবছে জন ফেভার একটি মহামূৰ্খ–কিন্তু জন ফেন্ডার তা বুঝতে পারছে না।

তাদের সামনে এখন অনেক সমস্যা। সমস্যা মানেই হচ্ছে আনন্দ। কত কিছু ভাববার আছে এখন। আহ্ কি আনন্দ। অয়ুর পায়ে অসম্ভব যন্ত্রণা, কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না।

কিম দুয়েন নিজের ব্যক্তিগত ঘরে একা-একা বসে ছিল। আজ সরাসরি প্রচুর ঝামেলা গিয়েছে। এখন খানিকটা বিশ্রাম করা যেতে পারে। তার ঘরের বাইরে দুটি ছোট ছোট লাল বাতি জ্বলছে, যার মানে হচ্ছে বিশেষ কোনো জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তাকে বিরক্ত করা যাবে না।

কিম দুয়েন একটি সিগারেট ধরিয়ে কম্পিউটার সিডিসির সবুজ বোতাম টিপে দিল। ঘুমুবার আগে সে সাধারণত সমস্ত দিনের ঘটনা নিয়ে কম্পিউটার সিডিসির সঙ্গে কথাবার্তা বলে। হালকা ধরনের কথাবার্তা–জটিল হিসাব-নিকাশ নয়। কোনো কোনো দিন দু-এক দানা দাবা খেলা হয়। প্রায় সময়ই কিম দুয়েনের মনে থাকে না যে, সে কথাবার্তা বলছে একটি কম্পিউটারের সঙ্গে যার মস্তিষ্ক ল্যাববারেটরিতে সিনক্ৰিয়ন কপোট্রন দিয়ে তৈরি। যার লজিক আছে, কিন্তু অনুভূতি নেই। আজ নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল।

হ্যালো সিডিসি।

হ্যালো ক্যাপ্টেন। দাবা খেলবে নাকি এক দান?

না। আজ খুবই ক্লান্ত।

বুঝতে পারছি। ক্লান্ত হবারই কথা এবং খুব চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে।

কিম দুয়েন ঈষৎ সচকিত হয়ে বলল, চিন্তিত হওয়ার কারণ কী?

যে কোনো অজানা বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারের মধ্যে চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে। আলফা সেঞ্চুরির সুসভ্য প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের প্রথম সাক্ষাৎকারের কথা মনে আছে তো?

কিম দুয়েন গম্ভীর হয়ে বলল, মনে আছে। কিন্তু সিডিসি, তুমি একটি জিনিস ভুল করছে, এরা বুদ্ধিমান প্রাণী নয়। নীচুস্তরের জীব। খাদ্য যোগাড় করতে গিয়েই এদের সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তি ব্যয় হয়।

এখানে তুমি একটি ভুল করছ কিম দুয়েন। প্রাণীগুলি যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং খাদ্যের জন্যে এরা কিছুই করে না।

তার মানে?

এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তুমি জান, আমি অনুমান করে কিছু কখনো বলি না।

সাইকিয়াট্রি বিভাগ কিন্তু আমাকে লিখিত নোট দিয়েছে যে, ওরা হলডেন টেস্ট পাশ করতে পারে নি।

হলডেন টেস্ট বুদ্ধিমত্তা মাপার জন্যে একটি চমৎকার ব্যবস্থা, কিন্তু তোমার মনে থাকা উচিত, হলডেন নিজেই বলেছেন। কোনো প্রাণী যদি অসম্ভব বুদ্ধিমান হয়, তা হলে হলডেন টেস্ট তার কাছে অর্থহীন মনে হবে।

প্রাণীগুলি অসম্ভব বুদ্ধিমান, এ রকম কোনো প্রমাণ কি পেয়েছ?

না, এখননী পাই নি।

এমন কোনো কারণ কি ঘটেছে, যার জন্যে তোমার মনে হয় প্রাণীগুলি বিপজ্জনক হতে পারে?

না ঘটে নি। প্রাণীগুলি শান্ত প্রকৃতির, তবে–

তবে কি?

তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাদের চার দরজা আটকে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্যে।

মনে আছে।

তুমি নিশ্চয়ই জান, আজ এক সেকেন্ডের বারো ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্যে আমাদের কেন্দ্রীয় ইলেকট্রিসিটি ছিল না।

আমি জানি।

এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার নয় কি?

হ্যাঁ, খুবই অস্বাভাবিক।

তুমি হয়তো এখনো খবর পাও নি, আমাদের প্রকৌশলী বিভাগের কাছেও একটা সমস্যা আছে। তারা তা নিয়ে বর্তমানে চিন্তাভাবনা করছে।

কি সমস্যা?

আমাদের পাওয়ার লাইনের ইলেকট্রিসিটিতে এ পর্যন্ত পনের বার সাইকেল বদল হয়েছে। যেন কেউ সাইকেল বদলে কিছু একটা পরীক্ষা করছে।

তুমি বলতে চাও, ঐ প্রাণীগুলি এসব করছে?

আমি কিছু বলতে চাই না। প্রমাণ ছাড়া আমি কখনো কিছু বলি না। আমি শুধু তোমাকে একটি সম্ভাবনার কথা বলছি।

কিম দুয়েন সিডিসির সুইচ অফ করে প্রকৌশলী বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

কিম বলছি, সাইকেল বদলাবার একটি খবর শুনলাম।

তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় স্যার। সেজন্যেই আপনাকে জানানো হয় নি। জোসেফসান জাংশনের ত্রুটির জন্যে এরকম হতে পারে।

জোসেফসান জাংশানের কোনো ত্ৰুটি কি ধরা পড়েছে?

না স্যার, তা ধরা যায় নি।

তবে?

কিম দুয়েন খানিকক্ষণ উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করল। তারপর গম্ভীব মুখে যোগাযোগ করল সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে।

হ্যালো, সিকিউরিটি?

বলুন স্যার।

যে প্রাণীগুলিকে আমরা পরীক্ষার জন্যে ল্যাবরেটরিতে এনেছি, সেগুলিকে মেরে ফেলার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছি।

স্যার, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

বুঝতে না পারার কোনো কারণ তো দেখছি না। আণবিক ব্লাসটার দিয়ে ওদের মেরে ফেলুন।

এই জাতীয় নির্দেশ আপনি একা-একা দিতে পারেন না, স্যার। বিজ্ঞান একাডেমির অনুমোদন লাগবে।

মহাকাশযান যদি কোনো বিপদের মুখে পড়ে, তাহলে সর্বাধিনায়ক হিসাবে একাডেমির অনুমোদন ছাড়াই আয়ি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি আইনের এই ধারাটি মনে আছে?

জি স্যার, আছে?

বেশ। এখন যা বলেছি করুন। দায়িত্ব শেষ করবার পর আপনি নিজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন।

ঠিক আছে, স্যার।

আরেকটি কথা, আপনার কাছ থেকে আমি একটি লিখিত জবাবদিহি চাই।

স্যার, আমি বুঝতে পারছি না আপনি কী চাচ্ছেন।

আমি জানতে চাই, ঠিক কী কারণে আমার নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও আপনি তা মানতে দ্বিধাবোধ করলেন, বিজ্ঞান একাডেমির প্রশ্ন তুললেন।

স্যার, আমি ভাবলাম এগুলি দুর্লভ প্রাণী হতে পারে। মেরে ফেলাটা হয়তো ঠিক হবে না।

এগুলি দুর্লভ প্রাণী নয়। আমরা মাত্র দু ঘণ্টার মধ্যে তিনটি প্রাণী ধরেছি।

আমরা ধরি নি স্যার। ওরা নিজ থেকে ধরা দিয়েছে।

হুঁ। আপনার নাম কি?

আমার নাম সুগিহারা স্যার। আমার ক্রমিক নম্বর ফ-২৩৭।

সুগিহারা, প্রাণীগুলিকে কি দেখেছেন?

দেখেছি স্যার।

এ জাতীয় কুৎসিত প্রাণীর জন্যে আপনার এত মমতার কারণ কি?

প্রাণীগুলি দেখতে কেমন, সেটা বড় কথা নয়। আলফা সেঞ্চুরির সুসভ্য প্রাণীরা অত্যন্ত সুদর্শন ছিল।

সুগিহারা।

জি, স্যার।

আপনি প্রাণীগুলিকে মেরে ফেলুন। আর আপনাকে যে কৈফিয়ত দিতে বলেছিলাম, তা দেবার প্রয়োজন নেই।

ঠিক আছে, স্যার।

হঠাৎ প্রচণ্ড শক্তিশালী ওমিক্রন রশির দুটি ধারা প্রাণীদের উপর ফেলা হল। সিলঝিন নির্মিত খাঁচাটি অসহনীয় উত্তাপে দেখতে দেখতে মোমর মতো গলে গেল।

সুগিহারা নিজে গিয়ে কিম দুয়েনের কাছে খবর দিল, আণবিক ব্লাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। সুগিহারার মুখ স্নান চোখ বিষন্ন। ক্যাপ্টেন সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল। সহজ সুরে বলল, মানুষকে প্রায়ই অনেক হৃদয়হীন কাজ করতে হয়। সুগিহারা কিছু বলল না। কিম দুয়েন খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কিছু বলতে চান আমাকে।

জ্বি স্যার, চাই।

বলুন। প্রাণীগুলি মারা যায় নি। ওমিক্রন রশ্মি ব্যবহারের পরেও বেঁচে আছে।

মহাকাশযান গ্যালাক্সি-ওয়ানের বিপদ সংকেতসূচক ঘন্টা বাজতে শুরু করল।

০৫. গ্যালাক্সি-ওয়ানের নিয়ন্ত্রণকক্ষ

গ্যালাক্সি-ওয়ানের নিয়ন্ত্রণকক্ষে জরুরি মীটিং বসেছে। একটি জরুরি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। তিনটি প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বাধীনতাবে। এখন পর্যন্ত তারা কারোর কোনো ক্ষতি করে নি। তাই বলে যে ভবিষ্যতেও করবে না, তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, অত্যন্ত শক্তিশালী রেডিয়েশনও এদের কিছুমাত্র কাবু করে নি। ছোটাছুটি করছে উৎসাহের সঙ্গে।

ক্যাপ্টেন কীম গম্ভীর মুখে বললেন, বর্তমান পরিস্থিতির উপর একটি রিপোর্ট দেয়ার জন্যে আমি কম্পিউটার সিডিসিকে বলেছি। আলোচনা শুরু করার আগে আমি সিডিসির রিপোর্টটি শুনতে চাই। আপনারাও মন দিয়ে শুনুন।

আমি সিডিসি বলছি। বর্তমান সমস্যাটি একটি জটিল এবং ভয়াবহ সমস্যা। তিনটি অসাধারণ বুদ্ধিমান প্রাণী গ্যালাক্সি-ওয়ানে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করছেন, আমি বুদ্ধিমান শব্দটির আগে অসাধারণ বিশেষণটি ব্যবহার করেছি। আপনাদের কারো কারো আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এমন সব প্ৰমাণ আছে, যা সন্দেহাতীতভাবে বলবে প্রাণীগুলি বুদ্ধিমান।

প্রথম প্রমাণ : প্রাণীগুলি দ্রুত বুঝতে চেষ্টা করছে গ্যালাক্সি–ওয়ান কী করে কাজ করে। কোনো একটি অদ্ভুত উপায়ে এরা ইলেকট্রনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেই ক্ষমতাবলে এরা গ্যালাক্সি-ওয়ানের প্রতিটি যন্ত্রপাতির ইলেকট্রন-প্রবাহ প্রভাবিত করেছে। অবশ্য খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু করেছে।

দ্বিতীয় প্রমাণ : তারা একটি ট্রেসারেক্ট তৈরি করেছে। কোনো ত্রিমাত্রিক বস্তু দিয়ে ট্রেসারেক্ট তৈরি করা যায় না, কিন্তু এরা করেছে। তিন নম্বর কক্ষে হলডেন কিউব দিয়ে তৈরি ট্রেসারেক্টটি এখনো আছে। আপনারা কি আর কোনো প্রমাণ চান?

না। ক্যাপ্টেন, আপনি আমাদের ট্রেসারেক্টটি দেখাবার ব্যবস্থা করুন।

ক্যাপ্টেন সুইচ টেপামাত্র তিন নম্বর কক্ষটির ছবি ত্রিমাত্রিক পর্দায় ভেসে উঠল। জিনিসটি যে ট্রেসারেক্ট এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হলডেন কিউবগুলি (যেগুলি ট্রেসারেক্টের ষােলোটি কোণে বসে আছে) ঠিক কী উপায়ে ঘুরছে। কম্পিউটার সিডিসি আবার কথা বলা শুরু করল, আমি এখন আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি অন্য একটি দিকে। এই প্রাণীগুলি কোনো খাদ্য গ্রহণ করে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এরা শক্তি কোথায় পায়? প্রশ্নটির উত্তরের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

সিডিসি কিছুক্ষণের জন্যে চুপ করে থাকল। সম্ভবত শুনতে চাইল কারোর কোনো বক্তব্য আছে কি-না। কেউ কথা বলল না।

প্রাণীগুলি বুদ্ধিমান হলেও, এরা এই প্রথম কোনো একটি বুদ্ধিমান প্রাণীর সংস্পর্শে এসেছে বলে আমার ধারণা।

এই ধারণার পেছনে কী কী যুক্তি আছে তোমার?

আমার কাছে এই মুহূর্তে তিনটি প্রথম শ্রেণীর যুক্তি আছে। যুক্তিগুলি বলবার আগে আপনাদের একটি দুঃসংবাদ দিচ্ছি আমাদের যে অনুসন্ধানী দলকে এই গ্রহে নামান হয়েছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আমার ধারণা প্রাণীগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেছে।

নিয়ন্ত্রণকক্ষের জরুরি মিটিং আধা ঘণ্টার জন্যে স্থগিত রাখা হল।

অনুসন্ধানী দলের প্রধান ডঃ জুরাইন অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করছিলেন। ডঃ জুরাইন গ্যালাক্সি-ওয়ানের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রধান। তিনি অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে আসতে চান নি। তিনটি অদ্ভুত প্রাণীকে কাছ থেকে পরীক্ষা করার সুযোগ ছেড়ে কে আসতে চায় অনুসন্ধানী দলের সঙ্গেতবু তাঁকে আসতে হয়েছে, কারণ এই গ্রহে আরো প্রাণী থাকার সম্ভাবনা। নানান ধরনের প্রাণী। শুধু এক শ্রেণীর প্রাণের বিকাশ হবে তা ভাবার কোনোই কারণ নেই। কাজেই ডঃ জুরাইনকে আসতে হয়েছে। এই গ্রহে প্রাণের বিকাশ কোন পথে হয়েছে, সেটা পরীক্ষা করার দায়িত্ব পড়েছে তার উপর। কিন্তু তিনি এখন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রাণীর দেখা পান নি।

গত বারো ঘণ্টা ধরে অনুসন্ধানী হেলিকপ্টার উড়ছে। খানাখন্দ এবং প্রকাণ্ড সব পাথর ছাড়া এখন পর্যন্ত কিছু চোখে পড়ে নি। না পড়ারই কথা। প্রাণের বিকাশ হবার জন্যে যা যা প্রয়োজন, তার কিছুই এ গ্রহে নেই। তাহলে প্রশ্ন হয়, ঐ প্রাণী তিনটি এল কোত্থেকে, আকাশ থেকে পড়ে নি নিশ্চয়ই।

ডঃ জুরাইন, আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি?

পার।

আমার সন্দেহ হচ্ছে, যে প্রাণী তিনটি দেখছি, সেগুলি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এখানে এসেছে। এরা এ গ্রহের প্রাণী নয়।

এ রকম মনে হওয়ার কোনো কারণ আছে কি?

জ্বি স্যার, আছ। প্রাণীগুলির চলাফেরার জন্যে এই গ্রহ উপযোগী নয়। সমস্ত গ্রহটি প্রকাণ্ড সব পাথরে ঢাকা। পাথরগুলি মসৃণ। প্রাণীটি মসৃণ জিনিসের উপর দিয়ে চলাফেরা করতে পারে না। লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই, গ্যালাক্সি-ওয়ানের মেঝেতে এরা বারবার পিছলে পড়ে যাচ্ছিল।

তুমি বলতে চাচ্ছ, প্রাণীটি এই গ্রহের অধিবাসী হলে মসৃণ জাগয়ায় চলাফেরার ক্ষমতা তার মধ্যে থাকত। জীবনের বিকাশ হত সেই দিকে?

জ্বি স্যার।

ভালো বলেছ নিমায়ের। চমৎকার যুক্তি।

ধন্যবাদ স্যার।

নিমায়ের কল্পনাও করে নি, ডঃ জুরাইন এত সহজে তার যুক্তি মেনে নেবেন। ডঃ জুরাইন একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। এরা বিশেষজ্ঞ ছাড়া অন্য কারোর কথায় কান দেয় না। নিমায়ের এক জন সামান্য সিকিউরিটি গার্ড, কিন্তু ডঃ জুরাইন তার যুক্তি প্রশংসা করলেন।

অনুসন্ধানকারী দলের সঙ্গে একটি প্রথম শ্রেণীর রোবট সব সময়ই থাকে, কিন্তু এ দলটির সঙ্গে ছিল না। এদের সঙ্গে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর রোবট আছে। এই জাতীয় রোবট রুটিন কাজ করবার ব্যাপারে সুদক্ষ, কিন্তু এরা যুক্তির মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে না। এরা নিজ থেকে কখনো কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করে না। প্রশ্ন করলেই শুধু উত্তর দিয়ে থাকে। এই বার খানিকটা ব্যতিক্রম হল। রোবটটি হঠাৎ কথা বলে উঠল, ৬ জুরাইন। আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ডঃ জুরাইন অবাক হয়ে তাকালে।

কি ব্যাপার?

আমি একটি সুরেলা ধ্বনি পাচ্ছি। ধ্বনিটি ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে।

ডঃ জুরাইনের বিস্ময়ের সীমা রইল না।

কই, আমি তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না। নিমায়ের, তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ?

না স্যার।

রোবটটি শান্তস্বরে বলল, আপনাদের শ্রবণশক্তি আমার মতো তীক্ষ্ণ নয়। আপনারাও শুনবেন। আমরা সেই সুরেলা ধ্বনির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সত্যি সত্যি সুরধ্বনি শোনা গেল। ডঃ জুরাইনের মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করল। সুরটি খুবই চেনা। নিমায়ের উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ডঃ জুরাইন, আপনি কি সুরটি চিনতে পারছেন?

হ্যাঁ।

কী ব্যাপার ডঃ জুরাইন?

বুঝতে পারছি না।

সুরটি যে নিওলিথী সুর, সে সম্পর্কে আপনার কি কোনো সন্দেহ আছে?

না।

আপনার কি মনে হয়, আমরা নিওলিথি সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাব?

হ্যাঁ–কোথাও না কোথাও দেখবে ছটি অদ্ভুতদৰ্শন আকাশছোঁয়া ঘর। বাতাস এসে সেই ঘরগুলিকে ধাক্কা দিচ্ছে আর তৈরি হচ্ছে এই অপার্থিব নিওলিথি সুর।

স্পেস-স্যুটের শীতলতায়ও ডঃ জুরাইন ঘামতে থাকলেন।

স্যার, আমাদের উচিত গ্যালাক্সিওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

কথার উত্তর দিল রোবটটি। সে তার যান্ত্রিক শীতল স্বরে বলল, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ওদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই।

কখন থেকে যোগাযোগ নেই।

এক ঘণ্টা বার মিনিট তেইশ সেকেন্ড।

এতক্ষণ বল নি কেন?

আপনারা জানতে চান নি, তাই।

ডঃ জুরাইন বহু কষ্টে রাগ সামলালে। নিময়ের চেঁচিয়ে উঠল, স্যার, দেখুন দেখুন।

নিওলিথি ঘর ছটি দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত সবুজ রঙ বেরুচ্ছে তার দেয়াল থেকে। মনে হচ্ছে সেই সবুজ রঙ সমস্ত অঞ্চলটিকেই যেন আলোকিত করে তুলেছে।

আহ, কী অদ্ভুত!

স্যার, নিওলিথি সভ্যতার সমস্ত ঘর-বাড়ি কি সবুজ পাওয়া গেছে?

হ্যাঁ। তবে রঙের গাঢ়ত্বের তারতম্য আছে। কোনো কোনো জায়গায় রঙ হালকা সবুজ। কোথাও পাওয়া গেছে গাঢ় রঙ।

স্যার আপনি কি স্বচক্ষে এর আগে নিওলিথি ঘর দেখেছেন?

না, গ্যালাক্সি-ওয়ানের কেউ দেখে নি। মনের মধ্যে একটি অন্য রকম ভাব হয়।

তা ঠিক। খুবই ঠিক।

ঘরগুলি শুধু যে অদ্ভুত তাই নয়, এদের বিশালত্বও কল্পনাতীত। অপার্থিব সুরে ধ্বনি বেজে যাচ্ছে। যেন একটি বুভাঙা হাহাকার। নিমায়ের চোখে গভীর আবেগে জল এসে গেল।

তারা তিন জন তিন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এত কিছু দেখার আছে এখানে, এত কিছু আছে শেখার। ভাষাটা শিখে ফেললে অনেক সহজ হত। কিন্তু এটি শিখতে সময় লাগছে। কারণ মানুষগুলি প্রায় সময়ই চিন্তা করে এক রকম, কিন্তু বলে অন্য রকম। যেমন ক্যাপ্টেন কীম একবার সিকিউরিটির একজনকে জিজ্ঞেস করল, এই সম্পর্কে তোমার কি মত?

লোকটি হাসিমুখে বলল, স্যার, এটি খুব ভালো ব্যবস্থা।

অথচ লোকটি মনে মনে ভাবছে-ব্যবস্থাটি একটুও কাজ করবে না। এর চেয়ে মন্দ আর কিছু হতে পারে না। কোনটি ঠিক এর মধ্যে ব্যবস্থাটি কি আসলেই মন্দ না ভালো? তাহলে মন্দের অর্থ কী, আবার ভালোর অর্থইবা কী?

এ ছাড়াও এই মানুষগুলি কথা বলতে প্রচুর সময় নেয়। তারা যেমন একটি শব্দকেই অসংখ্য কম্পনের মধ্যে উচ্চারণ করে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ করে, মানুষ তা পারে না। সামান্য মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যেও এর অনেকগুলি শব্দ পাশাপাশি ব্যবহার করে। এবং একেক বার করে একেক রকম ভাবে, তাতে অর্থের কী তারতম্য হয় কে জানে? যেমন সামান্য খাওয়ার কথাই ধরা যাক। একবার বলছে, চল খাই। আবার বলছে খাই চল। এর মানে কি? এদের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আরেকটি মজার জিনিস হচ্ছে, এরা অকারণে কথা বলে। কোনো সমস্যা ছাড়াই কয়েক জন মিলে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। এদের ধরনধারণ এ রকম, যেন চিন্তা করার মতো কোনো সমস্যা নেই। এই সব নিয়ে এদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে ইচ্ছা হয়।

অয়ু এখন পর্যন্ত যা শিখেছে, তার সাহায্যে মানুষদের সঙ্গে সে কথা বলতে পারে, কিন্তু এখনই সে বলতে চায় না। ভাষাটি ভালোমতো জানা দরকার। তারও আগে জানা দরকার, ওরা তাদের এত ভয় করছে কেন। ভয় করার কী আছে?

অয়ু মনে মনে বলল, আমরা তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করছি না। তোমাদের কাছ থেকে আমরা শিখতে চাই এবং তার বদলে আমরা তোমাদের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করব।

আমরা তোমাদের জন্যে যে জিনিসটি তৈরি করেছি যা দেখে তোমরা অবাক হচ্ছ এবং বলছ ট্রেসারেক্ট-এর চেয়ে অনেক অনেক অদ্ভুত জিনিস আমরা তোমাদের জন্যে তৈরি করে দেব। এত দিন আমরা এ সব তৈরি করি নি, আমরা জানতাম না এ সবের কোনো মূল্য আছে। এখন বুঝতে পারছি আছে।

অযু কথাবার্তা গুছিয়ে ভেবে রাখতে চেষ্টা করে। একদিন এসব কথা বলতে হবে। ওরা কি শুনবে তাদের কথা?

ওদের মনের ভাব ভালো নয়। সবাই চাহে কুৎসিত প্রাণীগুলি যেন শেষ হয়ে যায়। কেন এ রকম করছে ওরা? এত ভয় পাচ্ছে কেন? ভয়ের তো কিছুই নেই। ভয় কিসের?

এই মহাকাশযানের তিনটি স্তর আছে। অয়ুরা আছে সবচেয়ে নিচের স্তরে। মানুষরা ভয় পেয়ে নিচের স্তরটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, যেন ওরা দ্বিতীয় বা প্রথম স্তরে যেতে না পারে। ব্যাপারটি অয়ুর কাছে হাস্যর মনে হয়েছে। এদের সমস্ত দরজা চৌম্বক শক্তিতে লাগান। অয়ু, নীম বা লী–এদের যে কেউ যে কোনো চৌম্বক শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইচ্ছা করলেই এর দ্বিতীয় বা প্রথম স্তরে যেতে পারে। তা যাচ্ছে না, তার একমাত্র কারণ, তারা মানুষদের আর ভয় পাইয়ে দিতে চায় না।

তা ছাড়া নিজেদের স্তরেও অনেক কিছু দেখায় এবং শেখার আছে। বেশ কিছু মানুষও আটকা পড়েছে এই স্তরে। মানুষগুলি ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। এক জনকে অবশ্যি পাওয়া গেছে যার ভয়টয় বিশেষ নেই। মোটাসোট। ফুর্তিবাজ লোক। অয়ু তার ঘরে ভুল করে ঢুকে পড়েছিল। এই লোকটি অন্যদের মতো লাফিয়ে ওঠে বা চিৎকারও শুরু করে নি। হাসিমুখে বলেছে, আমার মাকড়সান্ধুটির খবর কি? আমাকে ভক্ষণ করবার হেতু আগমন নাকি?

অয়ু ভক্ষণ শব্দটির অর্থ ধরতে পারে নি। লোকটি বলেহে, এসেছেন যখন, তখন বসুন।

এর অর্থ বেশ বোঝা গেল। অয়ু লোকটি যে রকম আসনে বসে আছে, সে রকম একটি আসনে উঠে বসল। লোকটি গম্ভীর হয়ে বলল, আপনি কি আমার কথা বুঝতে পেরে বসলেন, না ঐটি একটি কাকতালীয় ব্যাপার।

অয়ু কাকতালীয় শব্দটিও বুঝতে পারল না। এদের ভাষা যথেষ্ট জটিল। এই শব্দটি সে আগে একবারও শশানে নি।

কিছু পান করবেন? কমলালেবুর সবত দিতে পারি, কিন্তু আসল নয় নকল। সবই সিনথেটিক।

অয়ুর খুব ইচ্ছা করছিল লোকটিকে অবিকল মানুষের ভাষায় জবাব দেয়, বলে, আপনাকে ধন্যবাদ। খাদ্য গ্রহণ করার মতো শারীরিক ব্যবস্থা আমাদের নেই। আমরা সরাসরি শক্তি সগ্রহ করে থাকি। আপনাদের সঙ্গে আমাদের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে।

কিন্তু আয়ু কিছু বলল না। লী বলে দিয়েছে, যেন তা করা না হয়। তার ধারণা মানুষরা যখন টের পাবে তারা ওদের ভাষায় কথা বলতে পারে, তখন আরো ভয় পেয়ে যাবে। ওদের সঙ্গে যোগাযোগের আগে ওদের মনের বৈরী ভাব প্ৰথমে দূর করতে হবে। নীম লীর কথা মেনে নিতে পারে নি। নীম বলেছে, ওদের মনের ভয় দূর করার সবচেয়ে ভালো পথ হচ্ছে ওদের সঙ্গে কথা বলা।

লী শান্ত স্বরে বলেছে, না, মানুষদের মনে ভয় ঢুকে গেছে। তারা ভাবছে আমরা হয়তো ওদের চেয়েও বুদ্ধিমান। এটি তারা মেনে নিতে পারছে না।

আমরা ওদের ভাষায় কথা বলামাত্র ওদের ধারণা বদ্ধমূল হবে–যার ফল হবে অশুভ।

মানুষদের এই ধারণাটিকেও অয়ুর অদ্ভুত লাগে। মানুষদের কাণ্ডকারখানা দেখে তারা তিন জনই মুগ্ধ হয়েছে। এমন একটি মহাকাশযান তৈরি করতে সীমাহীন বুদ্ধির প্রয়োজন। লীর মতে মানুষের জ্ঞান সীমাহীন। নীম তা স্বীকার করে না। তার ধারণা, কম্পন সম্পর্কে মানুষরা জানে খুব কম। নীমের ধারণা ভুল নয়। এ বিষয়ে তারা সত্যি সত্যি কম জানে। কিন্তু তবু মানুষদের জ্ঞানের পরিমাণও কম নয়। নানান তথ্য জমা করে রাখার জন্যে তারা যে কম্পিউটার তৈরি করেছে, তা একটি আশ্চর্য জিনিস। কম্পিউটারটি যে শুধু তথ্যাদি জমা করে তা এখনো পরিষ্কার হয় নি। তবে হন্তে শিগগিরই। লী এবং নীম দুজনেই এই সমস্যাটি নিয়ে চিন্তা করছে। অর বর্তমানে চিন্তা করবার মতো কোনো সমস্যা নেই। তাকে আবার সেই পুরনো সমস্যাটি দেয়া হয়েছে–ছটি আকাশছোঁয়া ঘরের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?

অনুসন্ধানকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ কেন বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তা বের করা গেল না। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, অদ্ভুত প্রাণীগুলি হয়তো কিছু একটা করেছে। সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। গ্যালাক্সি-ওয়ানের সমস্ত যন্ত্রপাতি নিখুঁতভাবে কাজ করছে।

অনুসন্ধানকারী স্কাউটশিপটিতে কোনো ঝামেলা হয়েছে, সে রকম ভাবা ঠিক নয়। কারণ যোগাযোগের বেশ কয়েকটি বিকল্প ব্যবস্থা আছে। মাইক্রোওয়েভ ও লেসার ছাড়াও অত্যন্ত জরুরি অবস্থার জন্যে আছে ওমিক্রন রশ্মির ব্যবহার। এর একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সম্পর্ক নেই। মাইক্রোওয়েভ ও লেসার কাজ না করলেও ওমিক্রন রশ্মি কাজ করবে।

কম্পিউটার সিডিসি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হবার দুটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করে জরুরি মন্ত্রণালয় তার রিপোর্ট পেশ করল।

প্রথম সম্ভাব্য কারণ : অনুসন্ধানী স্কাউটশিপটি অদ্ভুত প্রাণীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং তারা যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। সে সম্ভাবনা অবশ্যি খুবই কম। প্রথমত স্কাউটশিপটি অনেক উঁচু দিয়ে উড়ছে। অদ্ভুত প্রাণীগুলি বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারলেও এদের কোনো প্রযুক্তিবিদ্যা নেই। এরা উড়ে-যাওয়া একটি স্কাউটিশিপের ক্ষতি হয়তোবা করতে পারবে না।

দ্বিতীয় কারণটি সিডিসি যথেষ্ট কুণ্ঠার সঙ্গে ব্যাখ্যা করল। সিডিসি বলল, আমি পুরান তথ্যাদির উপর নির্ভর করে দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করছি। ইন্টার গ্যালাকটিকা আর্কাইভে বলা হয়েছে, যে ধ্বংসপ্রাপ্ত নিওলিথি সভ্যতার পঞ্চাশ হাজার গজের কাছাকাছি যখন কোনো স্কাউটশিপ বা মহাকাশযান যায় তখন তার যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, এই গ্রহে নিওলিথি সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আছে?

আমি সম্ভাবনার কথা বলছি।

জন ফেন্ডার বলল, আমরা সহজেই তোমার সম্ভাবনা প্রমাণ করতে পারি। আমাদের কাছে নিওলিথি সুরের বেশ কিছু রেকর্ড আছে। রেকর্ডগুলি বাজানো হলে যে তিনটি প্রাণী আমাদের কাছে আছে; ওরা সেই সুর চিনতে পারবে।

তা ঠিক।

কম্পিউটার সিডিসি বলল, আমি জানতাম, আপনারা এই সিদ্ধান্তে আসবেন। এই মুহূর্তে তৃতীয় স্তরে নিওলিথি সুর বাজানো হচ্ছে। ত্রিমাত্রিক পর্দা চালু করলে আপনার প্রাণী তিনটির উপর নিওলিথি সুরের প্রভাব লক্ষ করতে পারবেন।

স্রুরা তার ঘরের দরজা খোলা রেখেছে।

তার ধারণা হয়েছে প্রাণীগুলি ভয়াবহ নয়। এরা দেখতে কুৎসিত, শক্তিশালী রেডিয়েশনেও এদের কিছু হয় না, তবু খুব সম্ভব নিরীহ। এখন পর্যন্ত ওরা কারোর কোনো ক্ষতি করে নি। ওদের মধ্যে এক জনের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়েছে। সেটির পায়ে কোনো আঘাত লেগেছে বা কিছু হয়েছে। একটি পা সব সময় সাবধানে গুটিয়ে রেখে চলাফেরা করে। সে প্রায়ই তার ঘরে এসে চুপচাপ বসে থাকে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে তাকায়।

আজও সে এসেছে। এবং অন্যদিনের মধ্যে উঠে বসেছে চেয়ারে। স্রুরা হাসিমুখে বলল, কি বন্ধু, আবার এসেছ। হুঁ। আজকে কী নিয়ে আলাপ করি? তুমি তো আবার আলাপে অংশ নিতে পার না।

প্রাণীটি মনে হল মাথা নাড়াল। যেন কথাবার্তা সব বুঝতে পারছে। স্রুরা বলল, ই, তোমার পা একটি মনে হচ্ছে জখম হয়েছে। আমি অবশ্য এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমি ডাক্তার নই, আমি একজন হাইপারডাইভ ইঞ্জিনিয়ার। হাইপারডাইভ কী, জানতে চাও?

প্রাণীটি মাথা নাড়ল। যেন সে সত্যি সত্যি জানতে চায়।

হাইপারডাইভ একটি অদ্ভুত জিনিস। আমরা এসেছি মি১৫ওয়ে গ্যালাক্সি থেকে। সেটি তোমাদের এই এড্রেমিডা নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে পাঁচ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। হাইপারডাইভ ছাড়া এত দূর মানুষের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। বুঝতে পারছ কিছু।

না, বুঝতে পারছি না, অসুবিধা হচ্ছে।

স্রুরা মনে করল, সে ভুল শুনছে। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল প্রাণীটির দিকে।

কে কথা বলছে? আমি, আমি বলছি। আমার নাম অয়ু।

স্রুরা কপালের ঘাম মুছলুকনো গলায় বলল, তোমরা আমাদের কথা বুঝতে পার?

কিছু কিছু পারি।

তোমরা কে?

তোমার প্রশ্ন বুঝতে পারছি না স্রুরা।

এই গ্রহে তোমাদের মতো কি আরো প্রাণী আছে?

না, এই গ্রহে অন্য কোনো প্রাণী নেই।

তোমরা আমাদের ভাষা শিখলে কি করে? শুনে শুনে শিখেছি।

শুনে শুনেই শিখে ফেললে?

হ্যাঁ। তুমি কিন্তু হাইপারডাইভ সংক্রান্ত বিষয়টি এখনো ব্যাখ্যা কর নি।

ঠিক এই মুহুর্তে তোমাকে বোঝাতে পারব কিনা জানি না।

চেষ্টা করে দেখ। আমরা যে কোনো যুক্তিপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারি।

হুঁ, তা পার। আমাকে মানতেই হবে তোমরা তা পার। তবে হাইপারডাইভ জানতে হলে তোমাকে চতুর্মাত্রিক সময় সমীকরণ জানতে হবে। তা কি তুমি জান?

না। তুমি আমাকে বুঝিয়ে দাও।

এখন নয়, এ ঘন নয়। আমার মাথা ঘুরছে। আমাকে কিছুক্ষণ ভাবতে দাও।

ঠিক আছে।

আমার এখনো মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি।

স্বল্প কী?

পরে বলব, পরে বলব।

স্রুরা দেখল অযু নামের প্রাণীটি নেমে যাচ্ছে। এই কদাকার কুৎসিত প্রাণীটির সঙ্গে সত্যি সত্যি এতক্ষণ কথা হল। স্রুরা কপালের ঘাম মুছল। সুইচ টিপে গ্যালাক্সি-ওয়ানের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। কিন্তু স্রুরার ইচ্ছা করছিল না।

অয়ু ঘর থেকে বেরিয়েই লীকে খুঁজে বের করল। মানুষদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, এটি তাকে জানান প্রয়োজন তৃতীয় স্তরে লম্ব করিডোরে কাউকে দেখা গেল না। অয়ু ধীর পায়ে ঐগাতে লাগল। শেষ প্রান্তে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের দুজনের হাতেই দুটি অস্ত্র। কী জাতীয় অস্ত্র তা জানতে লুখগুলি বের করতে ইয়। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না। করিডোরের এ-প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত তীব্র আগুনের হকা বয়ে গেল। ব্যাপারটি পূর্ব পরিকল্পিত, এজন্যেই করিডোরে আজ একটি মানুষও নেই।

অয়ু তার পাগুলি গুটিয়ে ফেলল শরীরের ভেতর। উত্তাপের ফলে শরীরের অণুগুলির কম্পন দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে হবে চার দিকে। লুখগুলি শরীরের ভেতরে থাকায় বেশ অসুবিধা হচ্ছে। তার কষ্ট হতে থাকল। বাচার একমাত্র উপায় ঐ মানুষ দুটিকে মেরে ফেলা। কোনোই কঠিন কাজ নয়, অনায়াসে করা যেতে পারে।

কিন্তু তা করা যাবে না। চিন্তাটাই লজ্জাজনক। অয়ু প্রাণপণে শরীরের কোষগুলির কারণ বদলাতে লাগল। ঠাণ্ডা মাথায় তা করা দরকার। একটু ভুল হলেই রক্ষা নেই। কিন্তু নীম এবং লী–এরা কোথায়? ওরা থাকলে অসুবিধা হত না। তিন জন কাছাকাছি থাকলে যে কোনো ধরণের কম্পনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এ জন্যেই কি মা সব সময় বলতেন, তিন জন একসঙ্গে থাকবে, কাছাকাছি থাকবে?

অয়ু লক্ষ করল তার ভুল হতে শুরু করেছে। অসুস্থ পায়ের অনেকগুলি কোষ নষ্ট হয়ে গেছে। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। ভুল হবার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যাবে। মানুষ দুটিকে মেরে নিজে বাঁচার চেষ্টা করাটাই কি এখন উচিত। এটি একটি সমস্যা। কাজেই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এর উত্তর বের করতে হবে।

উত্তাপের তীব্রতা হঠাৎ করে কমে গেল। আহ্ কী শান্তি! অয়ু মাথা ঘুরিয়ে দেখল, করিডোরের অন্য প্রান্তে লী এবং নীম। ওদের সব কটি লুখ বের করা। উত্তাপ এখন ওরাই সামলাচ্ছে। আর ভয় নেই।

লী উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, তুমি ঠিক আছ, অয়ু?

হ্যাঁ, ঠিক আছি।

ভালো। আমার মনে হয়, এখন থেকে আমাদের উচিত, সব সময় একসঙ্গে থাকা।

হ্যাঁ।

আর ওদের সঙ্গে কথা বলাও উচিত। ওদের জানান উচিত আমরা ওদের কোনো ক্ষতি করতে চাই না। এ

হুঁ, ওদের বলা উচিত। আমরা ওদের সঙ্গে থেকে ওদের কাছ থেকে শিখতে চাই।

হুঁ, তা চাই।

অয়ু, তোমার পা সম্ভবত নষ্ট হয়ে গেছে।

হ্যাঁ। অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে লী।

তোমাকে আমি একটি সমস্যা দিচ্ছি। তুমি সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে থাক, যন্ত্ৰণা ভুলে যাবে।

দাও, সমস্যা দাও।

লী খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সমস্যাটি বলল, সমস্যাটি আমি মানুষদের কাছ থেকে পেয়েছি। এদের কম্পিউটারে যে সমস্ত তথ্যাদি আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে আলোর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। এরা এসেছে পাঁচ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে। এরা যদি আলোর গতিবেগে আসে তাহলেও এদের লাগবে পাঁচ লক্ষ বছর। কিন্তু ওদের তথ্যানুযায়ী কোনো বস্তুর গতিবেগ আলোর গতিবেগের বেশি হতে পারে না। তুমি শুনছ মন দিয়ে?

আমি শুনছি।

এখন তুমি ভেবে বের কর, এই দীর্ঘ পথ ওরা কী করে এত অল্প সময়ে পার হল। সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। এটি নিয়ে ভাবতে বসলে তোমার পায়ের যন্ত্রণা আর টের পাওয়া যাবে না।

সমস্যাটি ভাবতে হলে আমাকে অনেক কিছু জানতে হবে।

তুমি ভাবতে শুরু কর। যখন কিছু জানার দরকার হবে, আমাদের জিজ্ঞেস করবে, আমরা জেনে দেব।

অয়ু সমস্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করল। আর ঠিক তখনি তৃতীয় স্তরের সবকটি ধাপে অপূর্ব নিওলিথি সুর বেজে উঠল। লী এবং নীম উৎকর্ণ হয়ে কয়েক মুহূর্ত শুনল। অয়ু বলল, ঘরের শব্দ আসছে। এই মানুষেরা আমাদের ঘরের শব্দ জানে।

নীম বলল, কে জানে, আমাদের এই ঘর হয়তো এইসব মানুষরাই বানিয়েছে।

নতুন এই সমস্যা নিয়ে আমাদের ভাবতে বসা উচিত।

যে লোক দুটি লেসার রশ্মি দিয়ে অয়ুকে আঘাত করেছে, ওরা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারা দুজনেই সিকিউরিটির। প্রাণী তিনটিকে শেষ করে দেয়ার মূল পরিকল্পনা তাদেরই নিয়ন্ত্রণ পরিষদ এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। শুধু নিয়ন্ত্রণ পরিষদ নয়, তৃতীয় স্তরের ক্রু মেম্বাররাও কেউ কিছু জানে না। তাদেরকে বলা হয়েছে নিরাপত্তার খাতিরে কেউ যেন কোনো অবস্থাতেই করিডোরে না আসে।

আক্রমণ ফলপ্রসূ হয় নি, কিন্তু একটি জিনিস পরিষ্কার হয়েছে যখন প্রাণীটি একা ছিল, তখন সে উত্তাপ সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু আর দুটি প্রাণী এসে যোগ দেয়া মাত্র সব অন্য রকম হয়ে গেছে। লেসার রশ্মির কল্পনাতীত শক্তিও নিমিষের মধ্যে দুর্বল হয়ে গেল। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এবং ক্যাপ্টেনকে জানানো প্রয়োজন। এই পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে।

সিকিউরিটি গার্ড দুটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। প্রাণী তিনটির মধ্যে কি যেন কথাবার্তা হচ্ছে। মাথার উপরে খুঁড়ের মতো জিনিসগুলি খুব দুলছে। এক জন তার শুড় গুটিয়ে ফেলছে। একটি, এটি খুব সম্ভবত পালের গোদা, ঝিঝি পোকার মতো শব্দ করছে। একি, হঠাৎ করে নিওলিথি সুর বাজছে কেন? সব কটি চ্যানেলে বাজানো হচ্ছে। গার্ড দুজন অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করল, প্রাণী তিনটি নিওলিথি সুর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এদের ভাবভঙ্গি এ রকম, যেন এ সুর তাদের চেনা, পালের গোদাটি থপথপ শব্দে এগিয়ে আসছে। গার্ড দুজনের শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। লেসার গান দুটি শক্ত করে ধরা আছে, তবু গানগুলি কাঁপছে। প্রাণীটি কি প্রতিশোধ নেবার জন্যে এগিয়ে আসছে।

লী এগিয়ে গেল অনেকখানি। গার্ডদের প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে থমকে দাঁড়াল এবং পরিষ্কার স্বরে বলল,

আমরা তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তোমরা যে সুর বাজাচ্ছ, সেই সুর সম্পর্কে জানতে চাই।

গার্ড দুজন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

ডঃ জুরাইন অবাক বিস্ময়ে নিওলিথি সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। একে ধ্বংসস্তৃপ বলা হয় কেন? কোনো কিছুই ধ্বংস হয় নি। আকাশছোঁয়া ঘরগুলি এখনো অমলিন অবিকৃত। ঠিক কী উদ্দেশ্যে এই সব তৈরি হয়েছিল। জানবার আজ আর কোনো উপায় নেই। নিওলিথি সভ্যতার জনকদের সন্ধান এখনো পাওয়া যায় নি, পাওয়া যাবে এমন আশা এখন আর কেউ করে না। নিমায়ের বলল,

ডঃ জুরাইন।

বল।

ঠিক কত দিন আগে এই সরু তৈরি হয়েছিল?

সঠিক বলা যায় না। রেডিও একটিভ ডেটিং করে দেখা গেছে, প্রায় সত্তর থেকে আশি লক্ষ বছর পুরান। আমার ভুলও হতে পারে। আমি ঠিক জানি না।

কোথায় জানা যাবে?

গ্যালাক্সি-ওয়ানের কম্পিউটার মেমরি সেলে নিওলিথি সভ্যতাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি আছে।

তাহলে আমাদের রোবটটিও তো জানবে। সিডিসি মেমরি সেলের অনেক কিছুই তো অনুসন্ধানী রোবটগুলির মেমরি সেলে থাকে।

ঠিক বলেছ।

ডঃ জুরাইন তার বাঁ পাশে দাঁড়ানো রোবটটির দিকে তাকাতেই রোবটটি বলল, হ্যাঁ, আমি জানি। আমিও নিওলিথি সভ্যতা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি।

জানলে চুপ করে আছ কেন?

আমাকে তো কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি।

নিওলিথি সভ্যতা কত পুরান?

বিষয়টি আপেক্ষিক। চতুর্মাত্রিক সময় সমীকরণ হিসেবে কোনো বস্তুর স্থায়িত্বকাল হচ্ছে একটি ত্রৈরাশিক গুণিতক। যার প্রথম রাশিটি একটি আপেক্ষিক রাশি, যাকে–

ঠিক আছে, তুমি থাম।

তবে গ্রহগুলিতে নিওলিথি সভ্যতার প্রাচীনত্ব বের করা যায়। গ্রহগুলিতে ত্রৈরাশিক গুণিতকের নাম আপেক্ষিক নয়।

যথেষ্ট হয়েছে, তুমি থাম। এখন থেকে যা জিজ্ঞেস করব, শুধু তার উত্তর দেবে এবং খুব কম সংখ্যক বাক্য ব্যবহার করবে।

ঠিক আছে।

এখন বল, এ পর্যন্ত কটি নিওলিথি সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেছে।

সর্বমোট নটি। প্রথমটি পাওয়া গেছে মি১িওয়ে গ্যালাক্সিতে। নবুখ সলের চতুর্থ গ্রহটিতে। সেটির বর্ণ হালকা সবুজ।

ঘর ছটি ছিল?

যে নটি নিওলিথি সভ্যতা পাওয়া গেছে। তার প্রতিটিতে ঘরের সংখ্যা হয়। প্রতিটি থেকেই অপূর্ব সুরধ্বনি হয় এবং প্রতিটির রঙ হচ্ছে সবুজ। এই কারণেই ইণ্টার গ্যালাকটিকা এনসাইক্লোপিডিয়াতে নিওলিথি সভ্যতাকে বলা হয়েছে সবুজ সুরময় সভ্যতা

আকাশছোঁয়া এই ঘর বাড়ি ছাড়া আর কী নিদর্শন আছে নিওলিথি সভ্যতার?

আর কোনোই নিদর্শন নেই। এটি একটি মহারহস্যময় ব্যাপার। আকাশছোঁয়া এই সব প্রাসাদ কী করে তৈরি করা হয়েছে, তা এখনো জানা যায় নি। নিওলিথী সভ্যতার জনকরা কোনো কিছুই লিখে রেখে যায় নি। কোনো বই নেই, যন্ত্রপাতি নেই, কিছুই নেই।

হুঁ, রহস্যময় তো বটেই।

আরো রহস্যময় হচ্ছে তাদের স্থান নির্বাচন। প্রতিটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে জনমানবহীন গ্রহে। গ্রহগুলিতে গাছপালা পর্যন্ত নেই।

এই গ্রহটির ক্ষেত্রে সেটি সত্য নয়। এখানে আমরা তিনটি প্রাণী পেয়েছি।

তা ঠিক। তবে এ রকম দু-একটি প্রাণের সন্ধান অন্যান্য নিওলিথি সভ্যতার ধ্বংসাবশেষেও পাওয়া গেছে।

ডঃ জুরাইন খুব আশ্চর্য হলেন। এটি একটি নতুন তথ্য।

কী ধরনের প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে।

প্রথম অভিযাত্রী দল যে নিওলিথি সভ্যতার সন্ধান পায়, সেখানে দুটি প্রাণী পাওয়া গিয়েছিল। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, প্ৰাণী দুটি অসম্ভব বুদ্ধিমান।

সেগুলি দেখতে কেমন ছিল?

সরীসৃপ জাতীয় লম্বা।

এটাই কি একমাত্র উদাহরণ?

না, আরো আছে। এড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জের রিবাত সলের সপ্তম গ্রহের যে নিওলিথি সভ্যতা পাওয়া গেছে, সেখানেও চারটি প্রাণী পাওয়া গিয়েছিল।

সেগুলি দেখতে কেমন?

দ্বিপদ প্ৰাণী, অত্যন্ত খর্বাকৃতি। প্রাথমিক রিপোর্টে এদেরও প্রথম শ্ৰেণীর বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে বলা হয়েছে।

এই সব প্রাণী সম্পর্কে তুমি আর কী জান?

এদের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না, কারণ কোনো এক বিচিত্র কারণে দুটি মহাকাশযান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। ধ্বংসের সময় প্রাণীগুলি মহাকাশযানে ছিল।

ডঃ জুরাইন নির্মায়েরকে বললন, তুমি কি ঘরগুলির ভেতর ঢুকে দেখতে চাও?

হা চাই। আপনি চান না? চাই, আমিও চাই। কিন্তু দুজনে এক সঙ্গে যাওয়া কি ঠিক হবে?

ডঃ জুরাইন, আমার মনে হয় দুজনের এক সঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে না।

ডঃ জুরাইন অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ঘরগুলির ভেতর যারা যায়, পরবর্তীকালে তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়—এই জাতীয় কথাবার্তা শুনেছি।

রোবটটি বলল, কথাটি আংশিক সত্য। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে, সবাই হারায় নি।

মানসিক ভারসাম্য হারাবার কারণ কি?

নানান ধরনের মতবাদ আছে। কেউ কেউ বলেন জিনিসটির বিশালত্ব, নির্জনতা এবং সুরধ্বনি স্নায়ুকে প্রভাবিত করে। আবার দ্বিতীয় এক দলের ধারণা, ঘরগুলির ভেতর দাঁড়ালে বহুমাত্রিক জগৎ সম্পর্কে ধারণা হয়।

ডঃ জুরাইন ঘরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াবেন বলে মনস্থির করলেন। এ কম সুযোগ জীবনে আর আসবে না। নিওলিথি সভ্যতার খবর গ্যালাকটিক ম্পায়ারে পৌছানোমাত্র এগুলি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর ভেতর ওয়ার আর কোনো উপায় থাকবে না। নিওলিথি সভ্যতার পঞ্চাশ হাজার জের ভেতর যাওয়া গ্যালাকটিক আইন অনুযায়ী একটি প্রথম শ্রেণীর অপরাধ।

ডঃ জুরাইন নিমায়েরের হাত ধরে প্রথম ঘরটির ভেতর ঢুকলেন।

০৬. নিয়ন্ত্রণকক্ষে সবাই গম্ভীর

নিয়ন্ত্রণকক্ষে সবাই গম্ভীর মুখে বসে আছে।

অতি অল্প সময়ে বেশ কিছু বড় বড় ঘটনা ঘটে গেল। জানা গেল, প্রাণীগুলি নিওলিথি সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত। প্রাণীগুলি অসাধারণ বুদ্ধিমান এবং তারা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে। ক্যাপ্টেন আবেগশূন্য স্বরে বললেন, প্রথম শ্রেণীর জরুরি অবস্তু তুলে নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর সতর্কতামূলক অবস্থা ঘোষণা করা হল।

তৃতীয় স্তর খুলে দেয়া হল। এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হল প্রাণীগুলির সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হবে। কথাবার্তা হবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে। পরিচালকমণ্ডলীর সব কজন সদস্য ছাড়াও এতে থাকবে মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিদ্যা বিভাগের সদস্যরা। কম্পিউটার সিডিসিকেও আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে বলা হয়েছে। আর বলা হয়েছে স্রুরাকে। স্রুরাকে নেয়া হয়েছে তার ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্যে। স্রুরা হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি যার সঙ্গে অযু নামধারী প্রাণীটি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যোগাযোগ করেছে। এই একটি মাত্র কারণে স্রুরার আগ্রহের মূল্য দেয়া হয়েছে।

আলোচনা শুরু হল গ্যালাক্সি-ওয়ানের সময়সূচি অনুযায়ী ১২ টা ৩৬ মিনিটে। তিনটি প্রাণীর মধ্যে এসেছে মাত্র দুটি। তারা গোলাকৃতি ডায়াসের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তাদের মাথার উপর গাছের শিকড়ের মতো বিচিত্র জিনিসগুলি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কাঁপছে। প্রথম কথা বললেন ক্যাপ্টেন।

আমি আপনাদের তিন জনকেই আসতে বলেছিলাম। এক জন দেখছি আসেন নি।

সে অসুস্থ, কাজেই সে সমস্যা নিয়ে ভাবছে।

আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

সে অসুস্থ, কাজেই সে ব্যথা ভুলে থাকবার জন্যে সমস্যা নিয়ে ভাবছে।

কিছু মনে করবেন না। আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না।

শারীরিক ব্যথাবোধ ভুলে থাকবার জন্যে আমরা সমস্যা নিয়ে চিন্তা করি।

কী ধরনের সমস্যা নিয়ে সে চিন্তা করছে?

যাকে আপনারা হাইপারডাইভ বলছেন, তাই নিয়ে।

নিয়ন্ত্রণকক্ষে একটি মৃদু গুঞ্জন উঠল।

ক্যাপ্টেন বললেন, আপনারা নিঃসন্দেহে প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিমান প্রাণী। আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমরা সবাই বিশেষ গর্বিত ও আনন্দিত।

প্রাণীটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার মনে হচ্ছে আপনি ঠিক বলছেন না। আপনি মোটেই আনন্দিত নন। ঠিক এই মুহুর্তে আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন এবং ভাবছেন, কী করে আমাদের তিন জনকে সবচেয়ে কম পরিশ্রমে মেরে ফেলা যায়।

নিয়ন্ত্রণকক্ষে বড় রকমের একটি গুঞ্জ উঠল। সেই গুঞ্জনের মধ্যেই প্রাণীটি থেমে থেমে বলল, আমাদের একটি ক্ষমতা হচ্ছে, আমরা আপনাদের মনের কথা বুঝতে পারি।

ক্যাপ্টেন অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। দীর্ঘ নীরবতার পর প্রথম কথা বলল স্রুরা, আমি তোমাদের ঘৃণা করি না। তোমাদের অসাধারণ বুদ্ধি দেখে আমি সত্যি সত্যি মুগ্ধ।

আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। আপনার মতো আরো আট জন মানুষ এখানে আছেন, যাদের মনে আমাদের সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারণা নেই।

এবার কথা বললেন মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রধান হেরম্যান, আমাদের সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি?

প্রযুক্তিবিদ্যায় আপনাদের দক্ষতা সীমাহীন।

এ ছাড়া আর কী বলার আছে আপনার?

আপনারা অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ।

হেরম্যান বললেন, কেন আমরা সন্দেহপ্রবণ বলতে পারেন? অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, কী কারণে আমাদের এই সন্দেহপ্রবনতা?

আত্মবিশ্বাসের অভাব এর একমাত্র কারণ। আপনাদের সভ্যতা যন্ত্রনির্ভর। যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার জন্যেই আপনাদের নিজের উপর বিশ্বাস কম।

যন্ত্র কিন্তু আমাদেরই তৈরি?

আপনাদের তৈরি হলেও যন্ত্রের সঙ্গে আপনাদের যোগ প্রতিষ্ঠিত হয় নি। আপনাদের তৈরি কম্পিউটারকে আপনারা সন্দেহের চোখে দেখেন।

কম্পিউটার সিডিসি বলল, আমি এ ক্ষেত্রে আপনাদের যুক্তি সমর্থন করছি।

হেরম্যান বললেন, আপনাদের সভ্যতা কি যন্ত্রনির্ভর নয়?

আমরা আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে কিছু জানি না।

বলতে চান আপনাদের কোনো সভ্যতা নেই।

জ্ঞানের বিকাশকে যদি সভ্যতা বলেন, তাহলে আমাদের সভ্যতা আপনাদের ভাষায় প্রথম শ্রেণীর। আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারি।

যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারেন?

হ্যাঁ, পারি।

আপনি একাই শুধু আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন, আপনার সঙ্গী চুপ করে আছেন কেন?

আমরা তিন জন একসঙ্গে কথা বলছি। আমার অসুস্থ সঙ্গী, যে আসে নি, সেও আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে।

আপনি কিন্তু বলেছেন, আপনার অসুস্থ সঙ্গী সমস্যা নিয়ে ভাবছেন।

সমস্যা নিয়ে ভাবার সময়ও আমরা ইচ্ছা করলে কিছু বাহ্যিক যোগাযোগ রাখতে পারি।

জীববিজ্ঞান পরিষদ থেকে পরবর্তী প্রশ্নগুলি হল :

মোট কত ধরনের প্রাণের বিকাশ এখানে হয়েছে?

এখানে কোনো প্রাণের বিকাশ হয় নি। আমরা তিন জন ছাড়া এখানে অন্য কোনো প্রাণী নেই।

আপনি কি এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত?

আমরা নিশ্চিত। আমরা দীর্ঘদিন এই গ্রহে আছি।

কত দিন ধরে আছেন?

আপনাদের হিসেবে তিন শত বছর।

জীবন ধারণের জন্যে আপনাদের খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজন হয় না।

না।

আপনাদের শারীরবৃত্তির কার্যাবলি পরীক্ষার জন্য আমরা কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করতে চাই। এ ব্যাপারে আপনাদের আপত্তি আছে?

না, আপত্তি নেই।

আপনারা এই গ্রহের বাসিন্দা?

আমরা সঠিক বলতে পারছি না।

আপনারা সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন বলে বলেছেন। এ সমস্যাটির সমাধান করতে পারেন নি?

না, পারি নি। তবে চেষ্টা চলছে। কিছু সমস্যা আছে, যার সমাধান নেই। এটিও এ ধরনের সমস্যা কিনা বলতে পারছি না।

সমাধান নেই, এ ধরনের একটা সমস্যার কথা আমাদের বলুন।

যেমন ধরুন আকাশের বাইরে কী আছে?

আকাশ বলতে আপনি কি মহাশূন্য বোঝাচ্ছেন?

আমি বোঝাচ্ছি আমার চারপাশে যা আছে, তা।

আপনাদের ধারণা, আকাশের বাইরে কী আছে—সে সমস্যার সমাধান নেই?

হ্যাঁ, আমাদের ধারণা সেরকম। আমরা মনে করি আকাশের বাইরে আছে আরেকটি আকাশ, তার বাইরে আরেকটি আকাশ। তার বাইরে–

আপনাদের যুক্তি বুঝতে পারছি। হ্যাঁ, অসীম সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব নয়।

সমাধান নেই, এই জাতীয় অনেক সমস্যা কি আপনাদের কাছে আছে?

হ্যাঁ আছে।

আমরা সেই সব সমস্যা জানতে আগ্রহী।

জাহাজের ক্যাপ্টেন বল, আজকের মতো আলোচনা মুলতবি থাকবে। আমরা কাল নিওলিথি সভ্যতা প্রসঙ্গে কথা বলব।

লী নীমকে মৃদুস্বরে বলল, এরা কিন্তু একবারও বলল না, ঠিক কী কারণে এরা আমাদের মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে কি না।

০৭. ঘরগুলির ভেতরে আবছা অন্ধকার

ঘরগুলির ভেতরে আবছা অন্ধকার, প্রথম কিছুক্ষণ ডঃ জুরাইন কিছুই দেখতে পেলেন না। অন্ধকার চোখে সয়ে আসতে বেশ সময় নিল, তবু পরিষ্কার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিমায়ের অবাক হয়ে বলল, ভেতরে কিন্তু কোনো সুরধ্বনি নেই, লক্ষ করেছেন ডঃ জুরাইন?

কথা খুবই ঠিক। ভেতরটা ছমছমান নীরবতা। ডঃ জুরাইন বললেন, শুধু যে সুরধ্বনি নেই তা নয়, আমাদের কথাবার্তার কোনো প্রতিধ্বনিও হচ্ছে না। এ রকম প্রকাণ্ড বন্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি হওয়া উচিত।

স্যার, আরেকটি জিনিস লক্ষ করেছেন, আমাদের পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে? মনে হচ্ছে আমাদের ওজন অনেক বেশি।

হুঁ, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রায় 2G-এর কাছাকাছি।

স্যার, মানসিক ভারসাম্য হারাবার মতো আমি তো কিছুই দেখছি না। ভেতরটায় তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। তবে একটু ভয় ভয় করছে।

কী রকম ভয়। কিছু কুৎসিত প্রাণী হঠাৎ বেরিয়ে এসে আক্রমণ করবে, এই জাতীয়?

না স্যার, অন্য রকম ভয়।

দুজনে ঘরটির ঠিক মাঝামাঝি এসে দাঁড়াল। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্যে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তার উপর মেঝেটি অসম্ভব পিচ্ছিল। ঘরের মাঝামাঝি একটি বৃত্তাকার দাগ দেখা গেল। দাগটি গাঢ় সবুজ রঙের এবং চাপা এক ধরনের আলো বের হচ্ছে।

বৃত্তের ভেতর এসে দাঁড়াতেই ডঃ জুরাইন প্ৰচণ্ড অস্থিরতা অনুভব করলেন। তাঁর মনে হল, আবছা অন্ধকার ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। ঘরময় হালকা নীলাভ আলো। সেই আলো বেড়ে যাচ্ছে। তিনি এক ধরনের কোলাহল শুনতে পেলেন। যে কোলাহল সমুদ্রগর্জনের মতো গম্ভীর ও বিলম্বিত। নিমায়ের উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, স্যার, আপনার কী হয়েছে, এরকম করছেন কেন?

ডঃ জুরাইনের সম্বিত ফিরে এল। তিনি দেখলেন, সব আগের মতোই আছে। কিছুই বদলায় নি। তিনি বললেন, শরীর ভালো লাগছে না। খুব সম্ভব আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে।

আমার মনে হয় আপনার স্পেস-স্যুটের অক্সিজেন ভাব কাজ করছে না। অক্সিজেনের হঠাৎ অভাব হলে এ রকম হয়।

হতে পারে, হওয়া খুবই সম্ভব।

কথা শেষ হবার আগেই আবার তার আগের মতো হল। এবার মনে হল, আলোর তীব্রতা অসম্ভব বেশি। সমুদ্রগর্জনের মতো সেই শব্দও স্পষ্ট হল। ঝনঝন করে কানে বাজতে লাগল। নিমায়ের ডাকল, ডঃ জুরাইন, ডঃ জুরাইন। তিনি তার ডাক শুনতে পেলেন না। হঠাৎ তার মনে হল, তিনি অনেক কিছুই বুঝতে পারছেন। সৃষ্টিতত্ত্বের মূল রহস্য ক্রমে ক্রমেই তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে আসছে। এত দিন যা তিনি জেনে এসেছেন, তা মূ সত্যের আংশিক ছায়ামাত্রা। নিমায়ের তাঁকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে ডাকল, ডঃ জুরাইন, ডঃ জুরাইন।

কেউ সাড়া দিল না।

০৮. ক্যাপ্টেনের ঘর অন্ধকার

ক্যাপ্টেনের ঘর অন্ধকার।

তাঁর ঘরের বাইরে তারকাকৃতির দুটি লালবাতি জ্বলছে। যার মানে হচ্ছে, দ্বিতীয় শ্রেণীর জরুরি অবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ডাকা যাবে না। ক্যাপ্টেন বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর ঘুম আসছে না। স্নায়ু উত্তেজিত হয়েছে। ঘুম আসবার কথা নয়। অনেকগুলি বড় বড় ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। কোনোটিরই কিনারা হচ্ছে না।

সন্ধানী স্কাউটশিপ থেকে এখনো কোনো খবর পাওয়া যায় নি। নিওলিথি ধ্বংসস্তূপের কাছাকাছি থাকলে খবর পাওয়া যাবে না তা ঠিক, কিন্তু এত দীর্ঘ সময় সেখানে তারা থাকবে কেন? দ্বিতীয় অনুসন্ধানী জাহাজ পাঠানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এদিকে প্রাণী তিনটিকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। না পারার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। প্রাণীগুলি অসাধারণ বুদ্ধিমান। স্পষ্টতই বোঝ যাচ্ছে এই নির্জন মৃত গ্রহে তারা যে কোনোভাবেই হোক আটকা পড়েছিল। গ্যালাক্সি-ওয়ান হচ্ছে তাদের একমাত্র মুক্তির পথ। একটি বুদ্ধিমান প্রাণী নিজের মুক্তির জন্যে যতদূর সম্ভব নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করবে। প্রাণীর ধর্মই তাই। যে শ্ৰেষ্ঠ সে-ই টিকে থাকবে। এই সুবিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ দুর্বলের জন্যে নয়। প্রাণীগুলি মানুষের তুলনায় উন্নত, এটি তিনি মানতে রাজি নন। তাদের মানসিক বুদ্ধিবৃত্তি উন্নত হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানুষের সঙ্গে এদের তুলনা করা ঠিক হবে না। কিন্তু যদি ওরা সত্যিই মানুষের চেয়ে উন্নত হয়, তাহলে? সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

ক্যাপ্টেন চিন্তিত মুখে সুইচ টিপে সিডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

হ্যালো ক্যাপ্টেন।

হ্যালো।

ঘুম আসছে না?

না।

এক হাত খেলবেন?

তা খেলা যেতে পারে। ত্রিমাত্রিক পর্দায় দাবার গুটি ভেসে উঠল। ক্যাপ্টেন ক্লান্ত স্বরে বললেন, আমি আমার পুরান খেলা খেলব। পন কুইন ফোর।

কম্পিউটার সিডিসি বলল, নতুন পরিস্থিতে নতুন খেলা খেলতে হয় ক্যাপ্টেন।

তার মানে?

যখন পারিপার্শ্বিকতা বদলায়, তখন নিজেকেও বদলাতে হয়। আসুন, আজ আমরা নতুন খেলা খেলি।

সিডিসি, তুমি হেঁয়ালিতে কথা বলছ।

স্যার, আমি একটি যন্ত্রবিশেষ। যন্ত্রের মধ্যে আছে যুক্তি, হেঁয়ালি নয়। হেঁয়ালি আপনাদেরই একচেটিয়া।

ক্যাপ্টেন সুইচ টিপে সিডিসির সঙ্গে কাসেকশন কেটে দিলেন। তাঁর আর দাবা খেলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। মাথা ধরেছে। ঘুমানো দরকার।

কিন্তু ঘুম এল না। দীর্ঘ সময় কাটল এপাশ-ওপাশ করে।

কিছুক্ষণ কেবিনের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত পায়চারি করলেন। কেবিনের তাপমাত্রা নামিয়ে দিলেন দুডিগ্রি। তবু ঘুমের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তিনি সুইচ টিপে আবার ডাকলেন সিডিসিকে, হ্যালো সিডিসি।

হ্যালো ক্যাপ্টেন। খেলাটা তাহলে শুরু করবেন?

না, আমি তোমাকে ডেকেছি ভিন্ন কারণে।

বলুন।

তুমি যদি গ্যালাক্সি-ওয়ানের ক্যাপ্টেন হতে, তাহলে কী করতে?

আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম।

ক্যাপ্টেনের ভ্রূ কুঞ্চিত হল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, প্রাণীগুলিকে নিয়ে কী করতে?

ওদেরকে এই গ্রহে নামিয়ে দিয়ে ফিরে যেতাম।

কেন? নামিয়ে দিতে কেন?

যে সব প্রাণীদের ওমিক্রন রশি দিয়েও কাবু করা যায় না, তারা গ্যালাক্সি-ওয়ানের নিরাপত্তার এক বিরাট হুমকি।

কিন্তু এরা বুদ্ধিমান প্রাণী।

বুদ্ধিমান প্রাণী বলেই এরা বিপজ্জনক।

এদেরকে এই গ্রহে নামিয়ে দিতে চাইলে ওরা রাজি হবে?

না, এরা রাজি হবে না। এই প্রান্তহীন গ্রহে এদের কিছু করার নেই। আমাদের সঙ্গে এসে এরা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে বলা চলে।

প্রাণীগুলিকে তোমার কেমন লাগছে সিডিসি?

চমৎকার! এদের দাবা খেলা শিখিয়ে আমি একবার বুদ্ধির শক্তি পরীক্ষা করিয়ে দেখতে চাই।

সিডিসি।

বলুন স্যার।

তুমি এ জাহাজের ক্যাপ্টেন হলে কী করতে?

আমি এদের মেরে ফেলতে চেষ্টা করতাম।

এদের মেরে ফেলবার পেছনে তোমার কী কী যুক্তি আছে?

আমার তিনটি যুক্তি আছে। কিন্তু আপনাকে একটি শুধু বলব।

বল।

স্যার, আপনি জানেন না যে আরো দুজায়গায় মানুষের সঙ্গে কল্পনাতীত বুদ্ধিমান প্রাণীর দেখা হয়েছে। সেখানেও নিওলিথি সভ্যতা ছিল। দুজায়গাতেই মহাকাশযানের নাবিকরা বুদ্ধিমান প্রাণীগুলিকে জাহাজে তুলে নিয়ে আসছিল। এবং দুটি ক্ষেত্রেই হাইপারডাইভের আগে আগে মহাকাশযান দুটি বিনষ্ট হয়েছে। আমাদের সঙ্গে ওদের মিল লক্ষ করেছেন?

ঐ ক্ষেত্রেও প্রাণীগুলি মাকড়সা জাতীয় ছিল?

না, তা ছিল না।

নিওলিথি সভ্যতার সঙ্গে প্রাণীগুলির কী সম্পর্ক?

আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো যথেষ্ট তথ্য আমার জানা নেই।

সিডিসি।

বলুন স্যার। নিওলিথি সভ্যতা সম্পর্কে আরো জানতে চাই।

আমাদের লাইব্রেরিতে একটি মাইক্রোফিল্ম করা বই আছে–অজানা সভ্যতা—সেটি পড়ে দেখতে পারেন। তাছাড়া যা যা জানতে চান, আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

ক্যাপ্টেন সুইচ টিপে সিডিসির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন। বেরিয়ে এলেন হলঘরেলাইব্রেরি থেকে বইটি নিতে। লাইব্রেরি তৃতীয় স্তরে। অনেকখানি হাঁটতে হবে।

তৃতীয় স্তরে ঢাকবার মুখেই তাঁর দেখা হল লীর সঙ্গে। তিনি সহজ স্বরে বললেন, হ্যালো।

ক্যাপ্টেন।

কিছু বলবেন?

আপনি মনে হচ্ছে একটি বইয়ের খোঁজে যাচ্ছেন?

ক্যাপ্টেন ইতস্তত করে বললেন, কোত্থেকে জানলেন।

আপনার মস্তিষ্কের কম্পন থেকে। আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি, আমরা আপনাদের চিন্তার ধারা বেশ খানিকটা বুঝতে পারি।

হ্যাঁ, তা অবশ্যি বলেছেন।

আপনি যে বিষয় সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন, আমিও সে বিষয়ে জানতে চাই।

আপনি নিশ্চয়ই মাইক্রোফি পড়তে জানেন না। নাকি জানেন?

না, জানি না। তবে আপনি যখন পড়বেন, তখন আমি যদি আশেপাশে থাকি, তাহলেই সব বুঝতে পারব।

নিওলিথি সভ্যতা সম্পর্কে আপনার আগ্রহের কারণ কি?

আমরা কোত্থেকে এসেছি তা জানতে চাই। ক্যাপ্টেন, আমরা এই গ্রহের অধিবাসী নই। আমাদের অন্য কোনো জায়গা থেকে এনে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। আমাদের গরণা, নিওলিথি সভ্যতার সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে।

আপনি কি ঘরগুলির ভেতর কখনো গিয়েছেন?

না, তবে নীম একবার গিয়েছিল।

যান নি কেন?

আমাদের উপর নিষেধ ছিল। আমাদের মা নিষেধ করেছিলেন, যেন কখনো তার আশপাশে না যাই।

আপনার মায়ের কথা তো কখনো বলেন নি।

বলবার সুযোগ হয় নি।

ক্যাপ্টেন খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, আসুন আমার সঙ্গে। আমি লাইব্রেরিতে বসেই পড়ব। আপনি থাকুন আমার পাশে।

ক্যাপ্টেন, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এ বইটি ছাড়াও অন্য কোনো বই যদি আপনার পড়তে ইচ্ছা হয়, আপনি বলবেন, আমি ব্যবস্থা করব।

অসংখ্য ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন। আপনার জন্যে আমি কি কিছু করতে পারি?

ক্যাপ্টেন খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, আছে, আমার একটি সমস্যা আছে। আমি যথাসময়ে আপনাকে সমাধান করতে দেব।

আমরা তিন জন মিলে সে সমস্যার সমাধান করব। নিশ্চয়ই আমরা করব।

০৯. অয়ুর পায়ের যন্ত্ৰণা

অয়ুর পায়ের যন্ত্ৰণা অসম্ভব বেড়ে গেছে। সে কিছুক্ষণের জন্যে জেগেছিল, ব্যথার তীব্রতায় অস্থির হয়ে সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করল। নীম পরীক্ষা করে দেখল পা-টি-নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেটা তেমন ভয়াবহ নয়, কিন্তু ভয়াবহ হচ্ছে শরীরের অন্যান্য কোষগুলিও নষ্ট হতে শুরু করেছে। তার মায়েরও এ রকম হয়েছিল। এমন কিছু কি নেই, যা দিয়ে তীব্র ব্যাথার উপশম হয়? নীম অস্থির হয়ে উঠল। কিছু একটা করা প্রয়োজন, কিন্তু কিছু কি সত্যি করা যায়?

তারা এখানে একা। অসাধারণ চিন্তাশক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা কিছুই করতে পারে নি। দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী তারা একটি প্রাণহীন গ্রহে ঘুরে বেড়িয়েছে। শুধু ঘুরে বেড়ানো। উফ, শক্তি ও ক্ষমতার কী নিদারুণ অপচয়।

এর কি শরীর খুব খারাপ?

নীম দেখল, স্রুরা। এই লোকটির সঙ্গে অয়ুর ভালো চেনাজানা হয়েছে।

নীম বলল, ও মারা যাচ্ছে।

সে কি!

আমাদের মা নিজেও এভাবেই মারা গিয়েছিলেন।

নিশ্চয়ই এর চিকিৎসা আছে।

থাকলেও আমাদের জানা নেই।

আমি আমাদের মেডিকেল টিমকে বলছি, এসে দেখতে।

আমার মনে হয় না, এতে কোন লাভ হবে। আমাদের শরীরের সঙ্গে তোমাদের কোনো মিল নেই।

না থাকুক, আমি ওদের আনছি।

নিওলিথি সভ্যতার উপর লেখা বইটি আয়তনে ছোট। বৈজ্ঞানিক তথ্য বলতে বিশেষ কিছু নেই। কোনটি কবে আবিষ্কার হয়েছে, কোনটির কী রঙ, যে গ্রহগুলিতে সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে, তাদের আবহাওয়া, মাটির গঠনপ্রকৃতি–এই সব বিশদ করে লেখা। কোনোটিতেই লেখা নেই ঘরগুলির ভেতরটা কেমন, যে আলো ঘর থেকে আসছে তার উৎস কী? তরঙ্গদৈর্ঘ্যইবা কী? বইটি লেখা হয়েছে সুখপাঠ্য উপন্যাসের কায়দায়, যেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগের প্রাধান্য বেশি। তবে দুটি জিনিস জানা গেছে। (১) নিওলিথি সভ্যতা যেসব গ্রহে পাওয়া গেছে, সেসব গ্রহের প্রতিটিতে দুটি করে সূর্য আছে। (২) যে সৌরমণ্ডলে নিওলিথি সভ্যতা আছে, সেই সৌরমণ্ডলের কাছাকাছি আছে একটি ব্ল্যাক হোল।

বই পড়া শেষ হওয়ামাত্র ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন লাগল বইটি?

লী বলল, বইটি ভালো। আমি এখন জানতে চাই ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে। ব্ল্যাক হোল জিনিসটি কি?

ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি অন্ধকার নক্ষত্র যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সীমাহীন। যে মাধ্যাকৰ্ষণ শক্তি অতিক্রম করে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না, আটকা পড়ে থাকে।

লী খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, যদি তাই হয়, তাহলে যেখানে ব্ল্যাক হোল থাকবে, সেখানে অনেক অদ্ভুত কাণ্ড হবে।

ক্যাপ্টেন কৌতূহলী হয়ে বললেন, কী ধরনের অদ্ভুত কাণ্ড।

ব্ল্যাক হোল হবে একটি টানেল। যার দুমাথায় সময় হবে দুরকম। তাই না?

ক্যাপ্টেন অবাক হয়ে তাকালেন। এত অল্প তথ্যের উপর নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা অসম্ভব ব্যাপার। তাঁর একটু ঈর্ষা বোধ হল।

মেডিকেল বোর্ডের প্রধান জীববিদ্যা বিভাগের দেয়া কার্ডটি বেশ কয়েক বার পড়লেন–

বহুপদ প্রাণী

সভ্যতা শ্ৰেণী : অজানা।

সমাজ শ্ৰেণী : অজানা।

বুদ্ধিমত্তা : হলডেন টেস্ট না-বাচক

অবস্থান : নক্ষত্র FOv, বর্ণালি লাল ও নীল, আর = ৯.৭১৭, থিটা = ০০.০৭১, ফাই = ২১০,২০৩৭, গ্রহ = ছয়, বয়স = ১১৪×১০১৭ সেকেন্ড।

বায়োলজী : Si, S. Se. Cl. Ge. He. Cu. নিউট্রন স্ফটিক আচ্ছাদন ধাতু ও সিলিকন সংকর চৌম্বকীয় আধান।

এ প্রাণীটির চিকিৎসা করার পথ কোথায়? ব্যথা কমাবার জন্য স্নায়ুকে অবশ করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু স্নায়ুর গঠন-প্রকৃতি জানা নেই। জানতে হলে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে তার ব্যবস্থাও গ্যালাক্সি ওয়ানে নেই।

স্রুরা গম্ভীর হয়ে বলল, সি কিছুই করবার নেই।

না, কিছুই করবার নেই।

পা কেটে বাদ দেওয়া যায় না?

না সম্ভব নয়। এদের শরীর সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।

খুবই দুঃখের ব্যাপার, ডাক্তার।

হ্যাঁ, দুঃখের।

ক্যাপ্টেন ডেকে পাঠিয়েছেন স্রুরাকে।

তাঁর ঘরের সামনে একটি লাল তারা। প্রথম শ্রেণীর জরুরী অবস্থা ছাড়া তাকে বিরক্ত করা যাবে না। নিশ্চয়ই কোনো জটিল বিষয় নিয়ে তিনি ব্যস্ত। দরজায় নক করতেই ক্যাপ্টেন বললেন, ভেতরে এস স্রুরা। স্রুরা অবাক হয়ে দেখল, ক্যাপ্টেনের চোখে-মুখে ব্যস্ততার কোনো চিহ্ন নেই। শান্ত মুখভঙ্গি।

স্যার, আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন?

হ্যাঁ, এসো।

কি ব্যাপার স্যার?

তোমার বন্ধুটি শুনলাম অসুস্থ।

জ্বি স্যার।

আমাদের মেডিকেল বোর্ড কিছু করতে পারছে না।

জ্বি না স্যার।

তোমার সঙ্গে এই প্রাণীগুলির বেশ ভালো সম্পর্ক আছে, ঠিক না?

অঙ্কুর সঙ্গে আমার প্রায়ই কথাবার্তা হয়।

তোমাকে ওরা বন্ধু হিসেবে নিয়েছে মনে হয়।

স্যার, তা তো বলতে পারব না।

ক্যাপ্টেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, প্রাণীগুলি যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না।

স্যার, আমি বুঝতে পারছি।

স্রুরা!

জ্বি স্যার।

ওরা যদি নিচে ফিরে যেতে হয়, সে ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। ডঃ জুরাইনকে খোজার জন্যে আমাজের দ্বিতীয় একটি দল নামবে। ওদের সঙ্গে যেতে পারে।

ওরা নিচে যেতে চায় না।

কি করে বুঝলে?

আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার। ওরা গ্রহে ফিরে যেতে চায় না। সেখানে ওদের কিছুই করার নেই, ওরা আমাদের সঙ্গে থাকতে চায়। আমাদের সঙ্গে থেকে ওরা নিজেদের সম্পর্কে জানতে চায়। ওদের ধারণা, ওরা অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে।

আমার নিজেরও সে রকম ধারণা।

আমি কি স্যার যেতে পারি?

হ্যাঁ যাও।

স্রুরা চলে যেতেই কম্পিউটার সিডিসি বলল, আপনি যা করছেন, তা কিন্তু নিজ দায়িত্বে করছেন।

একটি প্রথম শ্রেণীর মহাকাশযানের পরিচালককে অনেক কিছুই নিজ দায়িত্বে করতে হয়।

স্যার, আপনি কি সত্যি সত্যি প্রাণীগুলিকে মেরে ফেলতে চান?

হ্যাঁ।

এবং আপনার ধারণা, আপনার এ পরিকল্পনার কথা প্রাণীগুলি টের পাবে না?

না, পাবে না। মনের কথা বুঝতে হলে প্রাণীগুলিকে অনেক কাছাকাছি রাখতে হয়। আমি যখন বই পড়ছিলাম, তখন লী নামের প্রাণীটি আমার গা ঘেঁষে ছিল।

আপনি যা করতে যাচ্ছেন, তা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। এদের সাহায্যে আমরা নিওলিথি সভ্যতার রহস্য বের করতে পারতাম।

তুমি একটি সম্ভাবনার কথা বলছ, আমি ভাবছি একটি মহাকাশযানের নিরাপত্তার কথা। এর আগেও দুটি প্রথম শ্রেণীর মহাকাশযান নষ্ট হয়েছে। তুমি জান কি জন্যে হয়েছে, ঠিক না?

সিডিসি চুপ করে রইল। কিম দুয়েন ক্লান্ত স্বরে বললেন, ওদের ক্ষমতা অসম্ভব বেশি। তুমি কি জান, ওরা সিলঝিনের ন ফুট পুরু একটি খণ্ড ফুটো করে ফেলেছে।

জানি, ধাতুবিদ্যা বিভাগ থেকে ওদের সিঝিন খণ্ডটি দেয়া হয়েছিল।

হ্যাঁ। আর তুমি নিশ্চয়ই জান—আমাদের গ্যালাক্সি-ওয়ানের বাইরের আবরণটি দু ফুট পুরু সিলঝিনের তৈরি।

ওর বাইরে অবশ্যি শক্তিবলয় আছে।

তা থাকুক। ওরা ইলেকট্রিসিঁটি নিয়েও নাড়াচাড়া করেছে, করে নি?

করেছে।

তাহলে আমি যদি নিরাপত্তার অভাব বোধ করি, তুমি আমাকে দোষ দেবে?

সিডিসি উত্তর দিল না। ক্যাপ্টেন বললেন, বল, আমাকে তুমি দোষ দেবে?

১০. স্রুরা অবজারভেশন টাওয়ারে গিয়েছিল

স্রুরা অবজারভেশন টাওয়ারে গিয়েছিল মন ভালো করবার জন্যে। কোনো একটি বিচিত্র কারণে তার মন ভালো নেই। কেন জানি অস্বস্তি লাগছে। এ রকম যখন হয়, তখন অবজারভেশন টাওয়ারে গিয়ে বসলে ভালো লাগে। বাইরের অদ্ভুত দৃশ্য মনকে অভিভূত করে দেয়।

এ গ্রহের চাঁদ তিনটি। তিনটি চাঁদের জ্যোৎস্না এমন অদ্ভুত লাগে দেখতে। কেমন একটি গোলাপি আলো প্রাণহীন গ্রহটিকে রাঙিয়ে তোলে।

স্রুরা একটি চেয়ার টেনে অবজারভেশন টাওয়ারের স্বচ্ছ কাচের পর্দার কাছে বসল।

স্রুরা!

স্রুরা চমকে দেখে নীম। সে কখন যে চুপি চুপি এসেছে, বুঝতেই পারা যায় নি। নীম বলল, বুঝতে পারছি, কোনো একটি কারণে তোমার মন ভালো নেই।

তা ঠিক।

কোনো একটা সমস্যা নিয়ে ভাবতে বসে যাও। দেখবে ভালো লাগছে।

নীম, মন খারাপ হলে আমরা সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারি না।

তোমাদের যতই দেখছি, ততই অবাক হচ্ছি। মন খারাপ হলে কী কর তোমরা?

আমি কিছুই করি না। অনেকে গান-টান শোনে, কবিতা পড়ে।

কবিতা কী?

ছন্দ মিলিয়ে লেখা এক ধরনের ভবিপূর্ণ বিষয়।

উদাহরণ দিতে পার?

স্রুরা খানিক ভেবে বলল,

হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি
বিদায়।
আজ রাতে তোমাকে বিদায়।

নীম অবাক হয়ে বলল, এ তো নিতান্তই যুক্তিহীন কথা। রাতে বা দিনে। কখনোই নক্ষত্রবীথিকে বিদায় দেয়া যাবে না। তারা থাকবেই।

স্রুরা কিছু বলল না। নীম বলল, তোমার যুক্তি এবং অযুক্তি–এ দুয়ের অদ্ভুত মিশ্রণ।

আমাদের তোমার ভালো লাগছে না, নীম?

নীম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, লাগছে। তোমাদের ভালো লাগছে। তোমরা অনেক কিছুই জান, আবার অনেক কিছুই জান না। তোমাদের পাশে পাশে থেকে আমরা অনেক কিছুই শিখব। হয়তোবা নিওলিথি রহস্যও ভেদ করে ফেলব।

স্রুরা বলল, তুমি কি কখনো ঐ ঘরগুলির ভেতর গিয়েছিলে?

নীম সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, আমি তোমাদের কবিতা শিখতে চাই। তুমি কি দয়া করে নক্ষত্রবীথির কবিতাটি আবার বলবে?

১১. মহাকাশযানের প্রধান

মহাকাশযানের প্রধান তাদের আলাদা আলাদা সেলে থাকতে বলেছেন কেন, লী ঠিক বুঝতে পারল না। এখনো কি মানুষরা তাদের ভয় করছে? তাদের গা থেকে মৃদু বিটা রেডিয়েশন হয় এ কথা ঠিক, কিন্তু মেডিকেল বোর্ড তো স্পষ্টই বলছে, এতে মানুষের ক্ষতির কোন সম্ভাবনা নেই। ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করে সঠিক কারণ জেনে নিলে হত, কিন্তু ক্যাপ্টেনকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে দারুণ ব্যস্ত। তাদের একটি অনুসন্ধানী দল নিখোঁজ হয়েছে। সে দলে এক জন প্রতিভাবান জীববিজ্ঞানী আছেন, যাকে বিজ্ঞান কাউন্সিল সর্বোচ্চ পদক দিয়েছে ছ বছর আগে।

অবশ্য সেলে গিয়ে বসে থাকতে লীর কোনো আপত্তি নেই। ক্যাপ্টেন তাকে মাইক্রোফিক্স লাইব্রেরি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন এবং একটি রোবট দিয়েছেন, যে বইগুলি তাকে পড়ে শোনাবে। লোকটিকে শুরুতে যতটা খারাপ মনে হয়েছিল এখন আর ততটা খারাপ মনে হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা তিনি তাকে একটি সমস্যাও দিয়েছেন–

নিওলিথি সভ্যতা গড়ে উঠেছে দ্বৈত সূর্যের গ্রহে এবং কাছাকাছি আছে। একটি ব্ল্যাক হোল। এদের সঙ্গে নিওলিথি সভ্যতার কি কোনো সম্পর্ক আছে, না ব্যাপারটি কাকতালীয়?

ভালো সমস্যা। তবে সমাধানের জন্যে অনেক কিছু জানতে হবে। দ্বৈত সূর্য কখন হয়? কেন হয়? ব্ল্যাক হোল ব্যাপারটি কী? ভাসা ভাসা জ্ঞান চলবে না। নীম এবং অয়ুর সাহায্য পেলে অনেক সহজ হত। কিন্তু তা সম্ভব নয়। অয়ু অসুস্থ আর নীম নতুন একটি জিনিস নিয়ে মেতেছে। কম্পিউটার সিডিসি তাকে দাবা খেলা শিখিয়েছে এবং পরপর ছ বার তাকে হারিয়ে দিয়েছে। তার ধারণা, কোনো একটি জিনিস ইচ্ছা করে তাকে শেখানো হয় নি, যার জন্যে সে হেরে যাচ্ছে। সিডিসি তাকে বলেছে—

নিয়মকানুন সবই তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছি, আর কিছুই শেখাবার নেই।

তাহলে জিততে পারছি না কেন?

পারছ না, কারণ আমি সম্ভাব্য সমস্ত বিকল্প চাল চিন্তা করি। তুমি তা কর না।

এটিও নীম মানতে রাজি নয়। সিডিসি তাকে অনেক বার বলেছে, আমার সঙ্গে তুমি হারলে কিছুই যায় আসে না। আমার সঙ্গে কায়োর জেতার কথা নয়। প্রতি বারই তুমি অন্য বারের চেয়ে ভালো খেলছ, কিন্তু তাতে লাভ নেই কিছু।

নীম মাথা দুলিয়ে বলেছে, তোমাকে হারতেই হবে।

প্রাণী তিনটিকে সেলে রাখার ব্যাপারে ক্যাপ্টেনের মোটেই বেগ পেতে হল না।

নীম খানিকটা আপত্তি করছিল। লী বলল, ছোট জায়গায় আবদ্ধ হয়ে থাকাই আমাদের জন্যে ভালো। চুপচাপ এক জায়গায় থাকতে হলে বাধ্য হয়েই ভাবতে হবে। তোমার জন্যে সেটা খুব প্রয়োজন। তুমি ইদানীং সমস্যা নিয়ে ভাবতে চাও না।

লী বুঝতে পারে নীমের মধ্যে বড় রকমের পরিবর্তন হয়েছে। সেদিন দেখা গেল, মানুষদের লেখা কবিতার বই পড়ছে। নিছক আনন্দের জন্যেই নাকি পড়ছে। আশ্চর্য, নিছক আন্লের জন্যেই কেউ কিছু করে? সমস্যা নিয়ে ভাবার মধ্যেই তো আনন্দ সিডিসি যখন লীকে দাবা খেলা শেখাতে চাইল, তখনো লী অবাক হয়ে বলেছিল,

ব্যাপারটিতে সমস্যা আছে, কিন্তু তাতে লাভ কি?

সিডিসি বলেছে, আনন্দটাই লাভ। জেতার আনন্দ।

কিন্তু কী শিখব আমরা? জ্ঞানের বিকাশ হবে কিভাবে?

তা বলা মুশকিল।

জবাব শুনে লী অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিল। কিন্তু নীম লাফিয়ে উঠেছে, সিডিসি আমাকে শেখাও। আমি শিখব, আমি শিখব।

লীর মনে হল, কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে নীমের মধ্যে। কখন হয়েছে লী ভেবে বের করতে চেষ্টা করে। কখন হয়েছে পরিবর্তনটি? ঘরগুলির ভেতর নীম একা-একা গিয়েছিল। পরিবর্তন কি তখন হয়েছে, না তারও আগে? কী দেখেছে ঘরের মধ্যে সে?

লী কখনো জিজ্ঞেস করে নি। সব সময় ভেবেছে একদিন নীম বলবে নিজ থেকে। কিন্তু নীম বলে নি। আজ প্রথম বারের মতো লী জিজ্ঞেস করল, ঘরের ভেতর তুমি কী দেখেছিলে নীম?

নীম চোখ মিটমিট করে বলল, আজ হঠাৎ জিজ্ঞেস করছ কেন?

জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।

এখন আমি কিছু বলছি না। যখন সময় আসবে, তখন জানবে।

সময় কখন আসবে?

খুব শিগগিরই আসবে। লী, ঘরের রহস্য আমি বের করে ফেলব।

তুমি কি এই সব নিয়ে ভাব?

হ্যাঁ ভাবি। সব সময়ই ভাবি।

নতুন যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলি কি তুমি জান?

দ্বৈত সূর্য এবং ব্ল্যাক হোল? আমি জানি।

লী চুপ করে গেল। নীম মৃদু স্বরে বলল, আমি রহস্যের খুব কাছাকাছি আছি।

কি রকম কাছাকাছি?

যেমন ধর, এখন আমি নিশ্চিত জানি, আমরা ভিন্ন গ্রহের জীব–আমাদের এখানে এনে রাখা হয়েছে। এমন একটি গ্রহে এনে রাখা হয়েছে, যেখানে বসে বসে চিন্তা করা ছাড়া আর আমাদের কিছুই করার নেই।

তা ঠিক। আমিও তাই মনে করি।

নীম হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলল, লী।

বল।

তোমাকে আরেকটি ব্যাপার বলি–মন দিয়ে শোন। যদি কখনো আমাদের কাছে মনে হয় নিওলিথি সভ্যতা আমাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি, তাহলে অবাক হয়ো না।

কী বলছ পাগলের মতো!

ঠাট্টা করছিলাম।

ঠাট্টা আবার কি?

মানুষদের কাছে শিখেছি। কোনো অবাস্তব ব্যাপার বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলার নাম হচ্ছে ঠাট্টা। নিছক আনন্দের জন্যে করা হয়।

নীম মহানন্দে তার লুখ নাচাতে লাগল।

১২. একটি লাল তারা

ক্যাপ্টেনের ঘরের সামনে একটি লাল তারা এবং দুটি সবুজ তারা জ্বলজ্বল করছে। যার মানে, অবস্থা যত জরুরিই হোক, তাকে বিরক্ত করা চলবে না। তবু স্রুরা তাঁর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সুইচ টিপল।

কে।

আমি স্রুরা।

লাল তারা এবং সবুজ তারা দুটি কি তোমার চোখে পড়ছে না?

পড়ছে। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।

গ্যালাক্সি-ওয়ানের নিয়ম ভঙ্গ করছ তুমি। ধারা ৩০১ উপাধারা ছয় অনুযায়ী কী শাস্তি তুবি পাবে তা জান?

জানি।

তবু তুমি যাবে না।

না। আপনি বলুন ঐ প্রাণী তিনটিকে আলাদা আলাদা সেলে কেন আটকিয়েছেন?

আমি আটকাই নি, ওরা আপনি গিয়েছে।

আপনার উদ্দেশ্য কী?

আমার একটি মাত্র উদ্দেশ্য মহাকাশযানটির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

কিম দুয়েন।

বল।

আপনি আমাকে ভেতরে আসতে দেবেন না?

না। তোমার স্নায়ু উত্তেজিত, তোমাকে ভেতরে আসতে দেয়া ঠিক হবে না। এবং আমার মনে হচ্ছে, তুমি তোমার এটমিক ব্লাস্টারটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ। শোন স্রুরা, তুমি একটি প্রথম শ্রেণীর অপরাধ করেছ। তোমার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তুমি চলে যাও এখান থেকে। আমি সমস্ত ব্যাপারটি ভুলে যাব।

স্রুরা ভাঙা গলায় বলল, স্যার, আপনি আমাকে দিয়ে এই কাজটি কেন করালেন? ক্যাপ্টেন শান্ত স্বরে বললেন, আমি ওদের সেলে যাওয়ার কথা বলতে পারতাম না। এরা মনের কথা বুঝতে পারে। তোমাকে পাঠানো হয়েছে সে জন্যেই। তোমার মধ্যে ওদের জন্য ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই নেই।

খেলা খুব জমে উঠেছে। নীম তার হাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সিডিসি বলল, সাবধান হয়ে খেল, তুমি ফাঁদে পা দিচ্ছ নীম।

তোমার ফাঁদ আমি কেয়ার করি না।

নীম তার হাতির ঠিক পিছনের ঘরে নৌকা টেনে আনল। সিডিসি বলল, এতে ভালো হবে না। আমি আমার ঘোড়া নিয়ে আসছি। নৌকা নিয়ে আক্রমণের সুযোগ পাবে না তুমি।

নীম চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল। সত্যি সত্যি সে আটকা পড়ে গেছে। এখন একমাত্র পথ, কালো হাতিটি নিচে নামিয়ে নেয়া। তাতে কী লাভ হবে। নীম কালো হাতিটি সরাল।

আর ঠিক তখন সুতীব্র ওমিক্রন রশ্মি ঝলসে উঠল। থার্মাল এক্সিলেটর কাঁপতে শুরু করল। নীম স্তম্ভিত হয়ে বলল, কী হচ্ছে এসব।

সিডিসি ধাতব স্বরে বলল, আমি চাল দিয়েছি। তুমি তোমার গজ সরাও নীম।

নীম অবাক হয়ে বলল, মানুষরা কি আমাদের মেরে ফেলতে চাচ্ছে?

সিডিসি বলল, তুমি দেরি করছ নীম।

আমার কথার জবাব দাও। তোমরা কি আমাদের মেরে ফেলতে চাচ্ছি?

হ্যাঁ।

নীম ব্যাকুল হয়ে ডাকল, লী! অয়ু!! কোথায় তোমরা? কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। আহ, কী অসহনীয় উত্তাপ।

সিডিসি বলল, দাও কী চাল দেবে?

নীম তার একটি ঘোড়া এগিয়ে আনল। সিডিসি উফুল স্বরে বলল, তুমি জিতে যাচ্ছ, বাহ্ চমৎকার! তুমি এই খেলাটিতে জিতে যাচ্ছ।

নীম ক্লান্ত স্বরে বলল, তুমি ইচ্ছা করে ভুল চাল দিয়ে আমাকে জিতিয়ে দিচ্ছ। তার প্রয়োজন নেই। আমি এভাবে জিততে চাই না।

বেশ, তাহলে আমি চালটি ফিরিয়ে নিই।

সিডিসি, আমি পারছি না। আমাকে এখন কোনো সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে। ব্যথা ভুলে থাকার অন্য পথ কিছু নেই।

নীমের শরীরের সিলিকন কোষ গলে যেতে শুরু করেছে। একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করা দরকার। কিন্তু কোনো সমস্যা মাথায় আসছে না। শুধু সুখ-কল্পনা আসছে। নীম যেন দেখতে পাচ্ছে, বহুকাল আগের তার হারানো মা ফিরে এসেছেন। কোমল কণ্ঠে বলছেন, এস আমার বাবারা, এস আমার সোনারা। কোথায় আমার দুঃখী লী, কোথায় আমার মানিক অয়ু? কোথায় আমার পাগলা নীম–?

নীম ফিসফিস করে বলল, মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী এত হৃদয়হীন হয় কী করে? কম্পিউটার সিডিসি।

বল শুনছি।

আমি তোমাদের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমি নিওলিথি সভ্যতার রহস্য ভেদ করেছি। মরবার আগে মানুষের তা জানিয়ে যেতে চাই।

ওমিক্রন রশ্মি তীব্রতর হল। নিওলিথি রহস্যের কথা আর নীমের বলা হল না।

কম্পিউটার সিডিসি গ্যালাক্সি-ওয়ানের প্রতিটি কক্ষে নিওলিথি সভ্যতার অপূর্ব বিষাদমাখা সুর বাজাতে শুরু করেছে। ক্যাপ্টেন একাকী তাঁর ঘরে বসে ছিলেন। সুরের জন্যেই হোক বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল।

মাকড়সা জাতীয় এই তিনটি প্রাণী ছিল অসামান্য বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। ছায়াপথ এবং এড্রেমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে এদের চেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী নেই বলে ধারণা করা হয়। এ জাতীয় প্রাণীর জন্ম এবং বিবর্তন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা নেই।

গ্যালাকটিভ আৰ্কাইভ
মাইক্রোফিল্ম কোড ২০৩৫-ক; ৭০ ল/২৩০

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel