Wednesday, April 1, 2026
Homeবাণী ও কথাস্বপ্নের দাম - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

স্বপ্নের দাম – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অজয়ের হঠাৎ মনে হল শরীরটা তেমন ভালো লাগছে না। ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বরজ্বর লাগছে। হাই উঠছে। মাথাটা ভার ভার। রগের পাশের শিরা দুটো টিপ টিপ করছে। অফিসে তেমন কাজ ছিল না। বসে থেকে সময় কাটানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করার নেই। অজয় ভাবলে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম করা যাক। কাজ করে করে গত তিনমাস শরীরটাকে বড় বেশি খাটানো হয়েছে। বাড়ি গিয়ে এক কাপ গরম চা, একটু গল্পগুজব, রেডিয়ো শোনা, হালকা কোনও বই পড়া, বউয়ের সঙ্গে পারিবারিক কথাবার্তা—এই সবের মধ্যে নিজেকে ফেলতে। পারলে শরীর আপনিই ঠিক হয়ে যাবে। ওষুধের দরকার হবে না। বিশ্রামই হল ওষুধ। একটা মাথা ধরবার বড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল এতক্ষণ। খাবে কি না ভাবছিল। ড্রয়ারে রেখে দিল। বাইরের খোলা বাতাসে মাথাটা ছাড়ে কি না দেখা যাক। শীত না এলেও বেলা ছোট হয়ে এসেছে। তিনটে কি সাড়ে তিনটে হবে। এরই মধ্যে আলো কমে এসেছে। অজয় উঠে পড়ল।

অফিসপাড়ার বিশাল বিশাল বাড়ির আড়ালে বিদায়ী সূর্য তখন হেলে পড়েছে। রাস্তায় ছায়া। নামলেও বড় বড় গাছের মাথায় তখনও রোদ লেগে আছে। বেশ ভালোই লাগছে। উত্তুরে হাওয়া বইছে। বলা যায় না আজ রাতে হয়তো শীত পড়বে। প্রথম শীত তেমন উগ্র নয়, মোলায়েম। পাখাটাখা আজ আর মনে হয় চালাতে হবে না। পাতলা সোয়েটার আর চাদরের কাল এসে গেল। ন্যাপথলিনের গন্ধ আর টারপেনটাইনের শীত শীত গন্ধ।

বাসে-ট্রামে সাংঘাতিক ভিড়। এ শহরে সব সময়েই যেন হুটোপাটি চলছে। সবাই যেন প্রাণের দায়ে শহর ছেড়ে পালাতে চাইছে। মিনিবাসে লাইন পড়েছে। তবে এঁকেবেঁকে এখনও তেমন ময়াল সাপের মতো হয়ে উঠেনি। অজয় লাইনে খাড়া হয়ে গেল। দু-নম্বর মিনিবাসে জানলার। ধারে একটা মনের মতো জায়গাও পেয়ে গেল। অজয় বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। হাত-পা খেলিয়ে আরাম করে। মিনিট পঁয়তাল্লিশের মতো নিশ্ৰুপ শান্তি। রাস্তাঘাটে দোকানপাট দেখতে দেখতে চলো। জানলার ধারে একটা জায়গা পেলে অজয় পৃথিবীর শেষ সীমা পর্যন্ত অনায়াসে চলে যেতে পারে। কুছ পরোয়া নেহি করে।

সামনের আসনে এক ভদ্রমহিলা বসেছেন। সুন্দরীই বলা চলে। সারাদিনের পর অফিস-কাছারি করেও বেশ তাজা আছেন। এইসব দেখলে অজয়ের খুব দুঃখ হয়। যৌবনটা কীভাবেই না চলে যাচ্ছে হু-হু করে। একটা করে দিন যাচ্ছে। একদিন করে বয়েস বেড়ে যাচ্ছে। চুল সাদা হচ্ছে। চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে। অজয়ের দিকে এখন আর কেউ ফিরে তাকাবে না। অথচ তাকালে তো। বেশ ভালো লাগে। মনে হয়, আকর্ষণ এখনও কমেনি। আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। শরীরটাকে যদি সময়ের বাইরে রাখা যেত! মনটাকে হয়তো চেষ্টা করলে রাখা যায়। শরীর কিন্তু সময়ের সীমানা ছেড়ে যেতে পারে না। মার খেতে খেতে মার খেতে খেতে একদিন ফরসা। খেল খতম, পয়সা হজম।

মহিলা খোঁপাটি বেশ কায়দা করে জড়িয়েছেন। একটু তুলে বাঁধা। মিনিবাসের আসনের পেছন। দিকটা অস্বাভাবিক উঁচু না হলে, ঘাড় কাঁধ সবই দেখা যেত। এসব যত দেখব যৌবন তত স্থায়ী হবে। ওই জন্যে শাস্ত্রে আছে বার্ধক্যে যুবতি রমণী টনিকের কাজ করে। কোথায় পাবে সেই। টনিক! এই তো, দুরে বসে থাকা, বসে বসে ভাবা। এর বেশি আর কী হবে! এমন যদি হত, যাকেই ভালো লাগে তার সঙ্গে আলাপ হবে। দিনকতক ঘুরে বেড়ানো যাবে। সে-ও তো মনেরই ব্যাপার। অজয়ের যাকে এই মুহূর্তে মনে ধরেছে তার মনে অজয় হয়তো স্থান নাও পেতে পারে! হয়তো কেন? সেইটাই হয়। আহা! তার যদি সম্মােহন বিদ্যা জানা থাকত বেশ হত।

মহিলা ভাড়া দেওয়ার জন্য ব্যাগ থেকে পয়সা বের করছিলেন। অসাবধানে বেশ বড় মতো একটা কিছু পায়ের কাছে পড়ে গেল। দশ পয়সা পাঁচপয়সা নয়, হয় টাকা, না হয় আধুলি। অজয়ের জানা আছে, খুচরো পয়সার ধর্ম হল, পড়েই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। মনে হচ্ছে পায়ের কাছেই তো পড়ল, পড়লে কী হবে, সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল ফোর্থ ডাইমেনশানে। ফোর্থ ডাইমেনশান শব্দটা আজকাল প্রায়ই শোনা যায়। মানুষবোঝাই জাহাজ, বিমান আজকাল রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। কোথায় গেল? ফোর্থ ডাইমেনশানে। কে না পড়েছে বারমুডা ট্যাঙ্গেলের বিচিত্র কাহিনি। মহিলার পয়সারও সেই এক হাল হল। পায়ের কাছে নেই। পাশে যে ভদ্রলোক আছেন, তাঁর মহা উৎসাহ। কেন হবে না! একে তো মহিলা, তায় সুন্দরী। সামনে ঝুঁকে, পাশেশরীর ঝুলিয়ে হরেকরকম কসরত করে পয়সা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। মহিলা তাঁর খোঁজার ধরনের মাঝে মাঝে বিব্রত হয়ে পড়ছেন। কারণ তিনি অতি উৎসাহে মহিলার পায়ের কাছে শাড়ি তুলে তুলে পয়সা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। আমরা যেমন চাদর তুলে খাটের তলা দেখার চেষ্টা করি। মহিলার পা তো খাটের পায়া নয়। এই হল মুশকিল। তিনি যতই বলেন ছেড়ে দিন, আর খুঁজতে হবে না। ভদ্রলোক ততই তাঁর পায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলেন ছেড়ে দিলেই হল, পড়ল তো এখানে, যাবে কোথায়?

অজয়ের খুব হিংসে হচ্ছিল। সে যদি লাইনের একেবারে ডগায় না থাকত তা হলে জানালার ধারে বসে, সে-ও হয়তো ওই মহিলার পাশে গা ঘেঁষে বসার সুযোগ পেত। তখন সে-ও ওইরকম। ডান পাশে, বাঁ-পাশে কেতরে কেতরে পয়সা খুঁজত। তারপর পেয়ে যেত। তারপর হাসি হাসি মুখে মহিলার হাতের তালুতে ফেলে দিয়ে বলত, এই নিন আপনার পয়সা। পাব না মানে? মহিলা অমনি হেসে বলতেন, ধন্যবাদ।

না, এতে ধন্যবাদ জানাবার কী আছে?

বাঃ, আপনি কষ্ট করে খুঁজে দিলেন।

হে হে এতে আর কষ্ট কী! এর চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট আমি করতে পারি। একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন।

আমি এইটাকেই অনেক কষ্ট, যথেষ্ট কষ্ট বলে মনে করি। নীচু হয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে সিটের তলায় ঢুকে যেভাবে আধুলিটা বের করে আনলেন! কে করত মশাই এত কষ্ট!

আমিই করতুম না আমার জন্যে। যাক গে বলে নেমে যেতুম।

আপনার আঙুলে কত ময়লা লেগে গেছে। নিন, এই রুমালটায় পুঁচুন।

না, এই তো আমার রুমাল আছে। আপনার অমন সুন্দর রুমাল। কেন নষ্ট করব?

নিশ্চয়ই করবেন। আপনার সাদা রুমালে ওই ময়লা পুঁছবেন নাকি? আমার ব্যাগে দ্বিতীয় আর একটা রুমাল আছে। কোনও অসুবিধে হবে না।

তা থাক। যে রুমালে একবার আপনি মুখ পুঁছেছেন, সে রুমালে আমি নোংরা মাখাতে পারব না।

আহা! ঢং। যা বলি শুনুন।

অ্যাঁ, আপনি ঢং বললেন, অহো কী আনন্দ! আর আমি দূরে নেই। একেবারে কাছে। হৃদয়ের পাশে!

হ্যাঁ, তো। আমি লোককে অত পর ভাবতে পারি না। দু-চারটে কথার পরই আপনার হয়ে যায়। কী নাম আপনার?

অজয়।

আমার নাম জয়া।

কী করেন?

চাকরি।

কোথায়?

জি পি ও-তে।

আমি কাজ করি ব্যাঙ্কে। আপনি ম্যারেড?

ম্যারেড। তবে সেরকম ম্যারেড নয়!

তার মানে?

মনের মতো নয় আর কি। তাড়াহুড়ো করে একটা জগাখিচুড়ি। ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। ব্যাচেলারও বলতে পারেন।

আরে আমারও তো ওই একই অবস্থা। আমারও সেই এক খ্যাচাখই বিয়ে। যত গর্জায় তত বর্ষায় না।

মিলবে ভালো, কী বলেন?

তাই তো মনে হচ্ছে। মনের মানুষ কখন যে কীভাবে পাশে এসে বসে! সবই ভগবানের খেলা। কী বলেন?

কোথায় থাকেন?

উত্তরে।

আরে আমিও তো উত্তরেই থাকি। প্রায় কাছাকাছি।

কী ভাগ্য!

এখন তাহলে আমরা কী করব?

আমরা যা খুশি তাই করব, হইহই রইরই।

যাঃ, ওসব আপনি পারবেন না। আপনার বয়েস হয়ে গেছে। কটি ছেলেমেয়ে?

সে তেমন কিছু নয়, হিসেবের মধ্যে না ধরলেও চলে।

তবু শুনি না। লজ্জা কীসের! সব কথা যখন খোলাখুলি হচ্ছে।

ওই এক ছেলে এক মেয়ে।

কে বড়?

ছেলে।

বয়েস কত? এমন কিছু নয়। সবে আর কি

আহা চাপছেন কেন?

এই সাবালক হয়েছে আর কি–

তা হলে?

তা হলে মানে?

আপনি তো বুড়ো। হইহই রইরইয়ের বয়েসই আর নেই। কোমরে বাত, চোখে চালসে, চুলে পাক। রাত জাগতে পারবেন না, প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারবেন না।

ক্যা বলেছে?

আমি বলছি।

বললেই হল! আমি রাত জেগে পড়ি জানেন কি?

জানি। ওইটাই তো বুড়োদের ধর্ম।

যুবকদের ধর্মটা তা হলে কী?

সে-ও আপনি জানেন। যৌবনে তো বিয়ে করেছিলেন।

ও হ্যাঁ হ্যাঁ। বুঝেছি। সে আমি এখনও পারি।

পারলেও আপনি বুড়ো।

তা হলে বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলি, পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

আমরা যদি ধরা পড়ে যাই?

ধরা পড়ব কেন? পড়লেই হল। রোজ বিকেলে তোমার অফিস থেকে তুমি বেরোবে, আমার অফিস থেকে আমি। তারপর গুটি গুটি হেঁটে গিয়ে আমরা ইডেনে একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকব। অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ। যতক্ষণ না মনে হচ্ছে, আঃ খুব হল।

ঝোপের মধ্যে শুধু শুধু বসে থেকে কী হবে?

কী আবার হবে? তুমি আমাকে গল্প শোনাবে, আমি তোমাকে গল্প শোনাব।

কীসের গল্প? ভূতের?

যাঃ, ভুত ছাড়া কি গল্প হয় না?

কিন্তু, ওখানে গিয়ে যদি দেখেন, আপনার ছেলে বসে কাউকে নিয়ে—

তাহলে চিনতে পারব না। সে-ও আমাকে চিনবে না, আমিও তাকে চিনব না।

ধরুন যদি কোনও বদমাইশ এসে সব ছিনতাই করে নিয়ে যায়?

কী আর নেবে? ঘড়িটড়ি সব খুলে রেখে যাব।

যদি পুলিশ ধরে?

বলব আমরা দুজনে বসে আছি তাতে তোমাদের কী অসুবিধা হচ্ছে বাছা?

যদি বলে, তোমরা দুজন কে বাছা?

আমরা দুজন, আমরা দুজন।

তখন কান ধরে থাপ্পড় মেরে ওরা বলবে, বুড়ো খুব রস হয়েছে, কয়েকদিন মামার বাড়ি থাকলেই। রস শুকিয়ে যাবে। আপনার ছেলে বউ যখন জামিনে ছাড়াতে যাবে তখন কেমন লাগবে?

ই হেঃ, সেটা খুব ভালো লাগবে না। তাহলে ইডেনে না বসাই ভালো। পুজোর ছুটিটাকে একটু। বাড়িয়ে আমরা সিমলা চলে যাব। মুসৌরিতেও যেতে পারি। সেখানে আমরা দেওয়াদারের বনে। দুজনে পাশাপাশি বসে থাকব। তুমি গুনগুন করে গান গাইবে। আমি মাঝে মাঝে গলা মেলাব। কোরাস! মাঝে মাঝে পাখি ডেকে যাবে। শীত শীত হাওয়া উঠবে শেষ বেলায়। আমি তখন এমনি করে তোমাকে বুকে টেনে নেব দেহের গরমে!

আরে হেই হেই মশাই। সোজা হয়ে বসুন। নয়তো উঠে দাঁড়ান। তখন থেকে কেতরে পড়ে খুব ঘুম হচ্ছে, ঘুম! আমি কি আপনার বেড রোল? ডান হাত দিয়ে আবার পাশ বালিশের মতো জড়িয়ে ধরা হচ্ছে। অজয় ধড়মড় করে সোজা হয়ে সবল। খুব এক ঘুম লাগিয়েছে যা হোক। শরীরটা ভালো ছিল না। ফুরফুরে বাতাসে চোখ জুড়ে এসেছে কখন! অজয় সামনের আসনের। দিকে তাকাল। কোথায় সেই মহিলা! কোথায় সেই খোঁপার বাহার! পাকা পাকা চুলের এক বুড়ি বসে আছেন, এই এত অল্প বয়সে বুড়ি হয়ে গেলেন! কখন কোথায় সেই সুন্দরী নেমে গেছেন।

কনডাকটার এসে রুক্ষ গলায় জিগ্যেস করলেন, এই যে দাদা, কোথায় নামবেন?

কেন ভাই ষষ্ঠীতলায়।

আরও পঁয়ষট্টি পয়সা ছাড়ুন।

কেন ভাই?

কেন ভাই? ষষ্ঠীতলা পড়ে আছে চার স্টপেজ আগে।

অ্যাাঁ সে কী!

হ্যাঁ সে কী! দিন পঁয়ষট্টি পয়সা।

অজয়ের কী খেয়াল হল, নীচের দিকে তাকাল। পায়ের কাছে ওটা কী? সামনে আর একটু হেঁট হল। একটা আধুলি। সেই মহিলার ব্যাগ থেকে ছিটকে পড়া পয়সা। যাক বাবা, সেই ভদ্রলোক অনেক কারদানি করছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করতে পারেননি। অজয় পঞ্চাশ পয়সা তুলে নিল, নিজের পনেরো যোগ করে বেশি পথ চলে আসার গুনগার দিল।

রাস্তায় নেমে মনে হল তার ঘোর তখনও কাটেনি। বেশ জ্বরজ্বর লাগছে। শীত চেপে আসছে। মনটা কবিতার মতো হুহু করছে। ফিরতি বাসে উঠে টিকিট কাটতে কাটতে তার হাসি পেল। স্বপ্নের দাম পঁয়ষট্টি প্লাস পঁয়ষট্টি এক টাকা তিরিশ বিয়োগ কুড়িয়ে পাওয়া পঞ্চাশ। তার মানে মাত্র আশি পয়সা। খুব একটু বেশি দাম নয়। অনেকটা সেই নিলাম-ওলার লে লে বাবু ছে আনার মতোই।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor