মানুষ-ভূতের গল্প – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

মানুষ-ভূতের গল্প - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

আলোরানি হেরিকেনের দম কমিয়ে শুয়ে পড়তেই ঘুমের ফাঁদে আটকে যাচ্ছিল প্রায়, এমন সময়ে বাড়ির পেছনে খিড়কির দিকে কঁপা-কঁপা গলায় সন্দেহজনক ডাকাডাকি,–ঘনশ্যাম, ঘনশ্যাম। ঘনা রে।

এক ঝটকায় ফাঁদ ছিঁড়ে উঠে বসল আলোরানি। বাইরে বারান্দার খানিকটা দরমা ঘেরা কুঠুরি। শাশুড়ি তারাদাসীর ডেরা সেখানে। তার ভয়কাতুরে চাপা ধমক শোনা যাচ্ছিল,–যা। যা। ধুসধুস।

বয়স বাড়লে ঘুম কমে। কানও খর হয়। গাছগাছালি থেকে পাতা খসে পড়লেও শাসায়।

আলোরানি হ্যারিকেনের দম বাড়িয়ে চমকানো গলায় বলল,-বাবার গলা মনে হচ্ছে যেন?

এবার খ্যাখ্যা করে হাসতে লাগল ঘনশ্যাম, ছাড়ো তো। কোন শালা রাতদুপুরে মস্করা করতে এসেছে।

সেই সময় আবার শোনা গেল,–ও ঘনা। ঘনা রে।

ঘনশ্যাম এবার লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। হাড়জ্বালানে মামলাবাজ বলে গাঁয়ে তার বাবার খুব বদনাম ছিল। আড়ালে তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশাও করা হতো। কিন্তু আর তো নোকটা বেঁচে নেই। তা ছাড়া, বাবা খারাপ হতে পারে, ঘনশ্যাম মোটেও খারাপ নয়। কারও সাতে-পাঁচে থাকে না। বাবার রেখে যাওয়া মামলা-মোকদ্দমা নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। অন্যপক্ষ এই এক মাসেই ঝটপট একতরফা ডিক্রি পেয়ে যাচ্ছে। ঘনশ্যাম লাঠিহাতে বেরুল। পেছনে হ্যারিকেন হাতে তার বউ আলোরানি। তারাদাসী দরমা এবং তেরপলের ভেতর থেকে ঝাঝালো গলায় বলে উঠল,–স্বভাব যায় না মলে। সকালে গেনুকে খবর দিস বরং।

গেনু ভূতের বদ্যি। ঘনশ্যাম মায়ের মুখে গেনুর নাম শুনে একটু ভড়কে গেল বটে; কিন্তু ফের করুণস্বরে ঘনা রে শুনে লাঠি বাগিয়ে হাঁক ছাড়ল, কোন শালা রে?

খিড়কির দরজার বাইরে থেকে অবিকল বটকেষ্টর গলা শোনা গেল, আমি যে, আমি। খামোকা শালা সমন্দি না করে দুয়োর খুলবি না কি? শীতে অবস্থা কাহিল একেবারে।

ঘনশ্যাম হকচকিয়ে গিয়েছিল। আলোরানি ঠোঁট কামড়ে ধরে কী ভাবছিল। তার হাতে হ্যারিকেন। হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে খিড়কির দরজা খুলে দিল এবং যে লোকটি বাড়ি ঢুকল, সে অবিকল বটকেষ্ট।

সেই ময়লা ফতুয়া, খাটো ধুতি, কঁচাপাকা গোঁফ, কাঁধে ব্যাগ। চোখে তেমনই জ্বলজ্বলে চাউনি, চালাক-চালাক ঝিলিক।

ঘনশ্যাম প্রচণ্ড আতঙ্কের চোটেই লাঠি তুলেছিল। বটকেষ্ট খপ করে ধরে ফেলে খাপ্পা মেজাজে বলল, হতচ্ছাড়া বাঁদর, বাবার মাথায় লাঠি তুলতে হাত কাঁপল না? তখন থেকে ডেকে-ডেকে গলা ভেঙে গেল, আবার বাড়ি ঢুকতেই লাঠি। মারব গালে এক থাপ্পড়।

ঘনশ্যাম লাঠি ছেড়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। সেই আদি অকৃত্রিম বাবা মনে হচ্ছে, কিন্তু–

সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে উঠল, ধুস শালা। তাহলে ধারদেনা করে কার বডি পুড়িয়ে এলাম?

বটকেষ্ট থমকে দাঁড়িয়ে বলল,–পুড়িয়ে এলি মানে?

ঘনশ্যাম গুম হয়ে বলল,–বেড খালি দেখে খোঁজ করলাম। বলল, মগগে গিয়ে দেখুন।

বটকেষ্ট হতভম্ভ হয়ে বলল,–মগগে গিয়ে আমাকে দেখেছিস?

তাই তো মনে হল। –ঘনশ্যাম মিনমিনে স্বরে বলল, হাসপাতালের লোকেরাও বলল। তাছাড়া বডি ফুলে ঢোল!

বটকেষ্ট এতক্ষণে একটু হাসল, আর বলিসনে। হাসপাতালের যা খাবার। গত জন্মের ভাত উঠে আসে পেট থেকে। কাঁহাতক আর সহ্য হয়। শেষে কেটে পড়লাম।

আলোরানি মুখ টিপে হাসছিল। গৃহবধূর গলায় বলল,-গরম জল করে দিই, হাত-মুখ ধুয়ে নিন। তারপর শ্বশুরের পায়ে ঢিপ করে প্রণামও ঠুকল।

বটকেষ্ট আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, আগে এক কাপ চা। রায়পুরে খগেনের বাড়ি খাট দিয়ে বেরিয়েছি। বলে ছেলের দিকে ঘুরল। মাথা ন্যাড়া করেছিলি দেখছি। তার মানে, বাপের ছেরাদ্দও করেছিস। হাঁদারাম।

তারাদাসী তার ডেরায় চুপচাপ ছিল। হঠাৎ তার ফোঁপানি শোনা গেল। আলোরানি বলল, আঃ। চুপ করুন তো। রাত-দুপুরে কেলেঙ্কারি করবেন না।

বউমার তাড়ায় তারাদাসী থেমে গেল। ঘনশ্যাম গুম হয়ে বলল,–কেলেঙ্কারি হবেই, সকালে গাঁসুদ্ধ হইচই পড়ে যাবে। তুমি মাইরি খালি ঝামেলা বাড়াও-কোনও মানে হয়? হাসপাতালে ভালো লাগল না তো বাড়ি চলে আসবে। তা নয়, এক মাস নিপাত্তা। এদিকে কোন শালার বডির মুখে আগুন দিয়ে ধুস!

বটকেষ্ট আস্তে বলল,-চেপে থাক দিনকতক। কাকপক্ষীটিও যেন টের না পায়। বলে সে বারান্দায় উঠল। বিধবা স্ত্রীর উদ্দেশে ফিক করে হেসে বলল, কী? গোঁসাঘরে খিল দিলে নাকি? যা-যা বলতাম, ঠিক-ঠাক মিলে গেছে তো? বলেছিলাম না ঘনা ঘরে ঢুকবে আর তোমাকে এই পায়রার খোপে ঢোকাবে?

ঘনশ্যাম ফুঁসে উঠল, না জেনে খামোকা যা-তা বোলো না। মা নিজেই বলল, তোরা ঘরে থাক। আমাকে বাইরে দে।

মামলায়-মামলায় প্রায় সর্বস্বান্ত বটকেষ্ট বউমা আর ছেলের জন্য বারান্দায় এই ঘেরাটোপের ব্যবস্থা করেছিল! আশা ছিল, হরেনের সঙ্গে টুকরো জমি নিয়ে মামলায় তার জয় হবে এবং তাই বেচে পাশে একখানা ঘর তুলবে। কিন্তু হাকিমের অভাবে আদালতে নাকি মামলার পাহাড় জমে উঠেছে।

বটকেষ্ট হ্যারিকেনটা তুলে তেরপলের পরদা ফাঁক করে তার বিধবাকে দেখতে গেল। কিন্তু তারাদাসী লেপমুড়ি দিয়েছে। বটকেষ্ট খ্যাখ্যা করে বলল, ঢং। বিধবা হয়েছে তো বিধবা হয়েই থাকো। ছেরাদ্দ হাওয়া লোকের বউ। যাগযজ্ঞ করে গন্ডাকতক বামুন খাইয়ে আবার বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে, জানো তো? বউমা, আমাকে এখানেই বিছানা করে দিও!

ঘনশ্যাম পিতৃভক্তিতে গদগদ হয়ে বলল, না, না। তুমি ঘরে শোবে। আমরা বরং এখানেই শোব। এখনও তত শীত পড়েনি!

.

সকালে শাশুড়ির সাড়াশব্দ না পেয়ে আবোরানি তেরপলের পরদা তুলেছিল। তারাদাসীর বিছানা খালি। বাড়ির আনাচেকানাচে ঘুরেও পাত্তা পেল না। গাঁয়ের একটেরে বাড়ি। পড়শিদের কাছে খোঁজখবর নিয়ে ফিরে এল আলোরানি। কেউ দেখেনি তারাদাসীকে। তখন উদ্বিগ্ন ঘনশ্যাম বেরুল মায়ের খোঁজে।

কিছুক্ষণ পরে ঘুরে এসে সে গম্ভীরমুখে বলল, জগা বলল, ভোরের বাসে মাকে চাপতে দেখেছে। বাবাকে মাইরি কী বলব? খালি ঝামেলা বাড়ানো স্বভাব।

ঘরের ভেতর তক্তপোশে বসে বটকেই চা খাচ্ছিল এবং পুরোনো পোকায় কাটা দলিল-পরচা দেখছিল। ছেলের কথা কানে যেতেই চাপাগলায় ডাকল,–ঘনা। শুনে যা।

ঘনশ্যাম বারান্দায় উঠে বলল, বলো।

তোর মা কেটে পড়েছে তো? বটকেষ্ট বাঁকা হাসল। জগা বলল না কোন বাসে চাপতে দেখেছে?

–সাঁইথের বাসে। কেন?

বটকেষ্ট তারিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আমি ভাবছিলাম হাসপাতালে গিয়ে ঢুকবে নাকি! সাইথে যাওয়া মানে রোঘোর বাড়ি। যত্নআত্যি পাবে। তোর মায়ের কিছু কিছু ব্যাপারে বেশ টনটনে বুদ্ধি। আয়, বোস এখানে।

ঘনশ্যাম অনিচ্ছার ভঙ্গিতে বসল। সিন্দুক থেকে এসব পোকায় কাটা কাগজপত্তর বের করে খুঁটিয়ে দেখা তার মামলাবাজ বাবার বরাবরকার অভ্যাস। মুখ তেতো করে বলল, আবার ওই মড়া ঘাঁটতে বসেছ?

স্বভাব যায় না মলে। বটকেষ্ট ফিক করে হাসল।–তোর মা কাল রাত্তিরে বেশ বলছিল। তোর মায়ের কথাটা মনে ধরার মতো। তুই ছেরাদ্দ করে ন্যাড়া হয়েছিল। তোর মা শাখা ভেঙে সিঁদুর মুছে বিধবা হয়েছে। তার মানে, আমি এখন মরা মানুষই বটে। কাজেই চেপে যা।

চাপবটা কী? –ঘনশ্যাম জানতে চাইল। বটকেষ্ট জ্বলজ্বলে চোখে ঝিলিক তুলে বলল,-কাল রাত্তিরে বললাম কী তোকে? আমি যে বেঁচেবত্তে আছি, একেবারে চেপে যা।

–হুঁ, তারপর?

–তেঁতুলতলার জমিতে একখানা ঝান্ডা পুঁতে দিয়ে আয়।

ঘনশ্যাম জোরে মাথা নেড়ে বলল,–তোমার মাথা খারাপ? হন্নাদা আমার বডি ফেলে দেবে। কলাই বুনে কাটার বেড়া দিয়ে রেখেছে নিজে গিয়ে দেখে এসো গে না।

বটকেষ্ট একটু ভেবে বলল, কাটার বেড়া দিয়েছে নাকি? যাচ্চলে। মামলা এখনও ঝুলে আছে। মগের মুলুক পড়ে গেছে দেখছি। তোর বাধা দেওয়া উচিত ছিল।

ঘনশ্যাম চটে গেল,–তুমি গিয়ে ঝান্ডা পুঁতে দিয়ে দেখো না, কী হয়। হন্নাদা এখন গাঁয়ের মাথা হয়েছে। পঞ্চায়েতের মেম্বার। এসব আমার দ্বারা হবে না।

তুই একটা অকম্মা। বটকেষ্টও চটল।–তোরই ভালোর জন্য চিন্তা ভাবনা করে বাড়ি ফিরে এলাম। নইলে অ্যাদ্দিন গয়া-কাশী-মথুরা করে দিব্যি ঘুরে বেড়াতাম। সংসারে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল, জানিস?

ঘনশ্যাম আঙুল খুঁটতে থাকল।

বটকেষ্ট চাপাগলায় বলল,-বউমা! শোনো তো!

আলোরানি মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে ঢুকল। সে বারান্দা থেকে কান করে সব শুনছিল। বলল, কাকে কী বলছেন? সেদিন তালপুকুরের মাছ ধরে সব্বাই যে যার ভাগ নিয়ে বাড়ি ঢুকল। মাঝখান থেকে আমি চাচামেচি করে গলা ভাঙলাম। আপনার ছেলে উল্টে আমাকে বকাঝকা করে ঠেলতে-ঠেলতে

বাজে কথা বোলো না। –ঘনশ্যাম বাধা দিয়ে বলল,–মেয়েছেলে–অপমান করে বসলে খুব ভালো হতো? চারটে পুঁটিমাছের জন্য ঝামেলার মানে হয় না।

পুঁটি নয় বাবা! আলোরানি শ্বশুরকে হাত তুলে মাছের সাইজ দেখাল। এত-এত বড় পোনা।

বটকেষ্ট গলার ভেতর বলল,–এক আনার শরিক আমি। আচ্ছা দেখছি। ফিরে যখন এসেছি, একটা এসপার-ওসপার না করে ছাড়ছি না।

আলোরানি শশুরের সায় পেয়ে উৎসাহে বলল, জানেন বাবা? হাসপাতালের ব্যাপারটাতেও আমার সন্দেহ হয়েছিল। যত বলি, কাকে দেখতে কাকে দেখেছ, তত বলে, আমাকে বাবা চেনাচ্ছ?

বটকেষ্ট অভিমানী শ্বাস ফেলে বলল, আমাকে যদি চিনবে, তাহলে এ অবস্থা হয়? যাকগে। বউমা তোমাকে একটা কাজের ভার দিতে চাই। ঘনার দ্বারা কি হবে না।

আলোরানি ঝটপট বলল, ঝান্ডা পুঁততে হবে তো? পুঁতে আসব। আমি সব পারি–আপনি কিছু ভাববেন না।

ঘনশ্যাম নড়ে উঠল,–মারা পড়বে বলে দিচ্ছি। মেয়েছেলের এত সাহস ভালো নয়। শালা হন্নাদাটা বড্ড ঢ্যামনা!

খপ করে তার কান ধরে বটকেষ্ট ঝাঁকুনি দিল,–চো-ও-প! কাল রাত্তির থেকে শুনছি আমার মুখের সামনে খালি শালা-টালা মুখখিস্তি। এক মাস আমি ছিলাম না, তাতেই এই? সত্যিসত্যি মলে মুখ থেকে নাদি বেরুবে হতচ্ছাড়ার।

ঘনশ্যামের পিতৃভক্তির মূল কারণ, ছোটবেলা থেকেই তার কাছে বাবা একটা বিপজ্জনক সাংঘাতিক জিনিস। তাছাড়া বটকেষ্টর একসময় গাঁয়ে প্রচণ্ড দাপটও ছিল। বউয়ের সামনে কান ধরায় অপমানের চোটে ঘনশ্যাম শেষপর্যন্ত কী আর করে, খি খি করে হাসতে লাগল।

আলোরানি একটু লজ্জা পেয়েছিল অবশ্য। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘনশ্যাম বলল, খুব হয়েছে। কান ছাড়ো, বেরুব।

কান ছাড়ার সময় শেষ কঁকুনি দিয়ে বটকেষ্ট বলল,–যেখানে যাবি যা। তোর আশা কখনও করিনি, করবও না। কিন্তু সাবধান, আমার কথা চেপে রাখবি। চাউর করলেই কী হবে, জানিস?

উঠে দাঁড়িয়ে ঘনশ্যাম বলল,–বাড়ি থেকে বের করে দেবে তো? দিও।

না,–বটকেষ্ট শক্তমুখে বলল।–তাহলে সত্যি সত্যি মরব।

ঘনশ্যাম একটু অবাক হয়ে বলল,–তার মানে?

মাথার ওপরকার কড়িকাঠ দেখিয়ে বটকেষ্ট বলল,–ওখান থেকে ঝুলব, বুঝতে পারছিস তো? এতহাত জিভ বের করে ঝুলে থাকব।

ঘনশ্যাম ভয় পেয়ে জিভ কেটে বলল, ধুস! খালি, আজেবাজে কথা।…

বটকেষ্টর মরার খবর পেয়ে হরেন নিশ্চিন্ত হয়েছিল। টুকরো জমিটা নিয়ে জ্ঞাতি বটকেষ্টর সঙ্গে তিন বছর মামলা চলছিল। জমিটার তিনদিকে আগাছার জঙ্গল, একদিকে কয়েকটা ঝাকড়া ঝাকড়া প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছ। তার ওধারে একটা পুকুর। ভাদ্রমাসের ধান তুলতে থানাপুলিশ হয়ে গেছে। সেই ফৌজদারি মামলাও ঝুলছে আদালতে। আশ্বিনে হঠাৎ কী অসুখে ভুগে বটকেষ্ট শহরের হাসপাতালে গেল এবং মারাও পড়ল। শ্রাদ্ধে দয়া করে হরেন ঘনশ্যামকে কিছু নগদ টাকাকড়িও দিয়েছে। শর্ত হল, ঘনশ্যাম আদালতে যাবে না। তারপর হরেন জমিটাতে কলাই বুনে দিয়েছে। সারের জোরে দেখতে-দেখতে ঝাপালো সবুজ হয়ে উঠেছে জমিটা। গরুছাগলের বড় উপদ্রব এদিকটাতে। তাই কঁটাঝোঁপের বেড়া দিয়েছে। এবেলা-ওবেলা এসে একবার করে দেখে যায় হরেন। তার কাছে খুব গর্বের জিনিস এই মাটিটুকু।

বিকেলে বাসরাস্তার ধারে গজার দোকানে হরেন চা খাচ্ছিল। সেই সময় তার মেয়ে পাত্তি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিল, বাবা! শিগগির এস। তেঁতুলতলার কলাইয়ের খেতে ঘনকাকার বউ ঝান্ডা পুঁতেছে।

ঝান্ডা পোতার ব্যাপারটা পাড়াগাঁয়ে ইদানীং রীতিমতো ঘটনা! কিন্তু হরেনের বিশ্বাসই হল না। ঘনশ্যাম তার বাবার মতো নয়। কোনও ঝামেলায় থাকে না। তবে তার বউটা একটু তেজি, একথা ঠিকই। তাই বলে তার ঝান্ডা পোঁতার সাহস হবে, এটা অবিশ্বাস্য এবং সেও কিনা হরেনের দখল করা কলাইবোনা জমিতে?

হরেন বলল,–যা!

সত্যি বাবা! –পাত্তি চোখ বড় করে বলল, মা দেখেছে। আমি দেখলাম। মা বলল, শিগগির তোর বাবাকে খবর দে।

হরেন হ্যাঁ-হা করে হেসে বলল,–বাড়ি যা দিকি। কাজ নেই কম্ম নেই, খালি পাড়া-বেড়ানো। ঝান্ডা পুঁতেছে তো কী হয়েছে? বাড়ি যাওয়ার সময় উপড়ে ফেলে দিয়ে যাব।

পাত্তি মনমরা হয়ে চলে গেল। জগা বলল,-পেছনে লোক জুটিয়েছে হরেন! নইলে ঘনার বউয়ের এত সাহস হতো না।

হরেন চটে গিয়ে বলল, তুমিও মাইরি যেন কী! লোক জোটাবে! এত সস্তা? লোক জোটাতে হলে মালকড়ি দরকার। ঘনার হাঁড়ির অবস্থা ঢনঢ়ন। কালই দেখবে মুনিশ খাটতে নেমেছে।

জগা বলল,-তোমার বেপাট্টির লোক হলেই জুটবে। আজকাল তো এরকমই হয়েছে।

গোঁ ধরে হরেন বলল,-বেপাট্টি? এ গাঁয়ে আমার বেপাটি হবে কোন শালা? সবগুলোকে তো দেখলাম। পায়ের তলায় এসে মুন্ডু কাত করেছে। মরা মানুষের নিন্দে করতে নেইবটকেষ্ট সম্পর্কে জ্যাঠাও ছিল বটে, তবে সেও গেছে সব ঠান্ডাও হয়েছে।

জগা কথা বাড়াল না। চায়ের দোকানে এ সময়টা খদ্দেরের ভিড় বেড়ে যায়।

.

চা শেষ করে হরেন উঠল। কিছুক্ষণ দোনামনা করে রাস্তার নয়ানজুলির দিকে ঘুরল। শর্টকাটে যাওয়ার পথে বাধা নয়ানজুলির জল। শেষ বেলায় আলোর গায়ে কুয়াশার ছাপ পড়েছে। এখান থেকে তেঁতুলতলার জমিটা দেখা যায় না। অনেকটা ঘুরে বাঁধের ওপর দিয়ে মাঠে নামল হরেন। গাঁয়ের শেষ দিকটায় ঘন গাছগাছালি। জমিটার কাছাকাছি যেতে দিনের আলো কমে এল আরও।

তেঁতুলতলা পোঁছেই চোখ জ্বলে গেল হরেনের। সত্যিই কলাইয়ের জমির মাঝখানে পোঁতা কঞ্চিতে লটকানো এক ঝান্ডা। খুঁজতে-খুঁজতে একখানে কাটার বেড়া ওপড়ানোও চোখে পড়ল। হরেন হুঙ্কার দিল,–তবে রে হতচ্ছাড়ি। হুঙ্কারের লক্ষ্য ঘনশ্যামের বউ।

তারপর সে মসস করে জমিতে ঢুকে ঝান্ডা ওপড়াল। কঞ্চিটা দুমড়ে-মুচড়ে এবং কাপড়ের ফালিটা ফালাকাটা করে ছুঁড়ে ফেলল জমির বাইরে। আগের মতো কাটার বেড়ার ওপড়ানো অংশটা কোনওরকমে আটকে সে তেঁতুলতলায় উঠে এল। রাগী চোখে তাকিয়ে রইল জমিটার দিকে।

ঠিক এই সময়ে তেঁতুলগাছের ওপর থেকে কেউ ডাকল,–হন্না নাকি রে! ও ন্না!

হরেন ভীষণ চমকে উঠেছিল। মাথার ওপরকার ঘন ডালপালার ভেতর থেকে চেনা–খুবই চেনা গলায় কেউ তাকে ডাকছে। হরেন মুখ তুলতেই আবছা আঁধারে একটা মূর্তিও দেখল, একটু ওপরে মোটা একটা ডালে বসে দুটো ঠ্যাং দোলাচ্ছে। হরেন কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল,–ক্কে-ক্কে?

বটকেষ্ট দুটো ঠ্যাং দোলাতে-দোলাতে বলল, ন্যাকা, চিনেও চিনতে পারছিল–কে-কে করছিস? সোজা ঝাঁপ দিয়ে পড়ব। তারপর ঘাড়টি মটকে দেব। আর কখনও যদি এই জমির তল্লাটে দেখেছি তো–

হরেন বনবাদাড় ভেঙে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

একটু পরে বটকেষ্ট চাপাগলায় ডাকল,–বউমা! মইটা নিয়ে এসো। নামি।

আলোরানি একটু তফাতে হাল্কা একটা মই নিয়ে আড়ালে বসে ছিল। এসে শ্বশুরকে গাছ থেকে নামাল। বটকেষ্ট খি-খি করে হেসে বলল,–খুব জব্দ হয়ে গেছে হন্না। চলো, এখনই এখান থেকে কেটে পড়া ভালো।…

.

একটু রাত করে ঘনশ্যাম ফিরল। মুখটা গম্ভীর। বউকে দেখে বলল, বাবা কী যে ঝামেলা করে মাইরি! সন্ধেবেলা হন্নাদা তেঁতুলগাছে নাকি বাবাকে দেখেছিল। বাড়ি ফিরে অজ্ঞান হয়ে যায়। শেষে একদঙ্গল লোক লাটিসোটা টর্চ হ্যাঁজাক নিয়ে তেঁতুলতলায় খুব খোঁজাখুঁজি করেছে। খবর শুনেই লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। আমি তো ভয়ে সারা। একটা কিছু সন্দ করে আমাদের বাড়ি এলেই কেলেঙ্কারি হতো।

আলোরানি নির্বিকার মুখে বলল, হতো না।

হতো না মানে? –ঘনশ্যাম কুঁসে উঠল, এসেই বাবাকে দেখতে পেত। তারপর–

-বাবা তখনই চলে গেছেন।

ঘনশ্যাম অবাক হয়ে বলল,–সে কী!

-রায়পুরে রাত্তিরে থাকবেন। সকালে ওখান থেকে সাথে চলে যাবেন।

আলোরানি মুখ টিপে হাসছিল। ঘনশ্যাম একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,-মা যদি ছোটমামার বাড়ি গিয়ে থাকে আর বাবা সেখানে হাজির হয়, আবার এক ঝামেলা।

আলোরানি বলল, কীসের ঝামেলা।

ধুস! বোঝো না কিছু। –ঘনশ্যাম বিরক্ত হয়ে বলল, মা তো বিধবা হয়ে আছে এখনও।

আলোরানি হাসতে লাগল,–সে তুমি ভেবো না। তোমার মা সব শাড়ি-গয়না গুছিয়ে নিয়েই গেছেন। কিছু খুঁজে পাইনি ওঁর ঘরে। আর শাঁখা-সিঁদুর? বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।…

Facebook Comment

You May Also Like