Wednesday, April 1, 2026
Homeথ্রিলার গল্পভৌতিক গল্পপ্রতিহিংসা - অনীশ দাস অপু

প্রতিহিংসা – অনীশ দাস অপু

লোকটা সূর্য ওঠার পরপর বেরিয়ে পড়েছে, এখন পাহাড়ের নিচের বালুর সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটছে। আবর্জনার কথা বাদ দিলে জায়গাটা হাঁটাহাঁটির জন্য বেশ ভালো। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভাররা ফাস্টফুডের আঠালো ব্যাগগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচের ভাঙা বীচ চেয়ার লক্ষ্য করে। ওদিকে নজর দেয় না লোটা, তবে আজ সকালে দুটো মস্ত বোল্ডারের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাতে তার চোখ আটকে গেল। কৌতূহল বোধ করার কারণ আবর্জনা থেকে আলাদা জিনিসটা। সে হেঁটে গেল ওখানে। হাতে তুলে নিল ওটা। ঘষা খেয়ে চামড়া ছিলে গেছে সামান্য, নিচের দিকটাতে বড়োসড় একটা ফাটল। তবে পাহাড়চূড়া থেকে ফেলে দেওয়া সত্বেও এটা ভেঙে টুকরো হয়ে যায়নি, সেটাই আশ্চর্য। ল্যাচের উপর আঙুল বোলাল সে, শক্ত ভাবে বন্ধ। তা ছাড়া হিমে তার হাতও খানিকটা অসাড়। সমতল একটা পাথরের উপরে বসল সে, ফুঁ দিতে লাগল আঙুলে। হাত গরম হলে আবার চেষ্টা চালাবে সে।

.

মাস তিনেক আগের ঘটনা। পাহাড়ি রাস্তাটা থেকে মাইল কয়েক দূরে ষোড়শী অ্যাবি রজার্স তার পরিবারের সঙ্গে নিজেদের নতুন বাড়িতে যাচ্ছিল। অবশ্য বাড়িটি একেবারেই নতুন নয়। অ্যাবির মা ডিয়ানার মতে, এ বাড়ি ১৮৭০ সালের তৈরি, তবে সংস্কার করা হয়েছে বহুবার।

প্রাগৈতিহাসিক বাড়ির মতো লাগছে, নাক সিঁটকাল লিন্ডসে। অ্যাবির একমাত্র ছোটো বোন সে, বয়স দশ। যে কোনো পুরোনো জিনিসই তার কাছে ডিসগাস্টিং, কোনো কিছু মনঃপূত না হলে এ শব্দটাই সে ব্যবহার করে। আগের বাড়িটাই ভালো ছিল। কী অসাধারণ সুইমিংপুল!

আর ও বাড়ির খরচও ছিল অসাধারণ, বললেন ডিয়ানা। একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স ঠকাশ করে নামিয়ে রাখলেন সামনের ছোটো বারান্দায়, আঙুল দিয়ে চোখের উপরে পড়া চুল ঠেলে সরালেন।

আগের বাড়িতে গাছপালার খুব অভাব ছিল, বলল অ্যাবি। এখানে তা নেই। বাড়ির পেছনের ওই জঙ্গলে তুই গাছ-বাড়ি বানিয়ে নিতে পারবি, লিন্ডসে।

লিন্ডসের চেহারা থেকে বিরক্তির ভাবটা চলে গেল।

গুড আইডিয়া, মন্তব্য করলেন ওদের মা। তালায় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিলেন। খুলে গেল সদর দরজা। জায়গাটা সুন্দর, না? এ বাড়িতে আজ আমাদের প্রথম রাত।

কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে কোনো রকম উৎসাহ নেই অ্যাবির। বাবার সাথে মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বছর চারেক আগে, ও বাড়ির সুদের হার দিন দিন বেড়ে চলছিল। মার পক্ষে প্রতি মাসে অতগুলো টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পুরোনো বাড়িটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ওরা। অবশ্য তাই বলে শহরের বাইরে চলে যায়নি তারা, নিজেকে মনে করিয়ে দিল অ্যাবি। আগের স্কুলেই যাবে ও, সেখানে পুরোনো বন্ধু-বান্ধবরাই থাকছে। এ বছর মার্ক হেলপার্ন হয়তো ওকে প্রেম নিবেদন করে বসতেও পারে।

তবু, পুরোনো পড়শীকে ছেড়ে আসতে খারাপই লাগছিল অ্যাবির। তবে নতুন বাড়িটি দেখার পরে ওটার প্রেমে পড়ে যায় সে। অথচ ওটা শতাব্দী প্রাচীন একটি বাড়ি। উঠোন ভর্তি আগাছা। আর বাড়ির ঢালু ছাদ এবং লম্বা পুরোনো জানালাগুলোর মধ্যে কী যেন একটা আছে। অ্যাবির মনে হয়েছে বাড়িটা ওকে হাত বাড়িয়ে ধরতে আসছে।

তারপরও বাড়িটি কেননা যে ভালো লেগে গেছে অ্যাবি নিজেই জানে না।

প্রথমবার এ বাড়ি দেখার পরে এখানে চলে আসার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছিল সে।

প্রথম রাতে ডিনার শেষে ডিয়ানা একটা কাগজের ব্যাগ হাত দিয়ে চেপে সমান করে তাতে লিস্ট লিখতে বসে গেলেন। লিখলেন জানালাগুলো সারাতে হবে, রঙ করতে হবে প্রতিটি ঘর, রান্নাঘরে পর্দা টাঙানো দরকার, চিলেকোঠার ঘরও পরিষ্কার করতে হবে।

আমি চিলেকোঠার ঘর পরিষ্কার করব, কিছু না ভেবেই বলল অ্যাবি।

সত্যি করবি? কৌতূহল নিয়ে মা তাকালেন মেয়ের দিকে। ওখানে গেলে তো গরমে সেদ্ধ হয়ে যাবি। ও ঘরে জানালা টানালা কিছু নেই। তোর গন্ধঅলা, বন্ধ ঘর একেবারেই সহ্য হয় না?

তবু আমি কাজটা করব, বলল অ্যাবি। মার অবাক হওয়ার সঙ্গত কারণ রয়েছে। ছোটো, আলো-বাতাসহীন ঘর, এলিভেটর, ক্লজিট ইত্যাদি আতঙ্কিত করে তোলে অ্যাবিকে। কিন্তু চিলেকোঠার ঘর এমন টানছে ওকে, দেখার তর সইছে না।

পরদিন সকালে, মা কাজে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে, অ্যাবি ওর ঝলমলে সোনালি চুল বেঁধে ফেলল একটা রুমাল দিয়ে, দোতলার ঘরের মই নিয়ে এল। ধাপ বাইতে শুরু করল। মা প্রচণ্ড গরম লাগবে বলেছিল। কিন্তু অ্যাবি কানে তোলেনি কথাটা। চিলেকোঠা এত গরম কল্পনাও করেনি সে। তাপটা যেন জ্যান্ত, ঘন আর ভারী, যেন একটা হাত চেপে ধরছে ওকে, বন্ধ করে দিচ্ছে দম, মাথা ঘুরতে লাগল। চিমনির ইটের গায়ে হেলান দিল অ্যাবি, চোখ বুজল। মুখ ভরে গেছে ঘামে, ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে শুরু করেছে গাল বেয়ে। হাত দিয়ে কপাল মুছল অ্যাবি, ধীরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করল। বাইরে থেকে ভেসে এল হাতুড়ির অস্পষ্ট ধাতব আওয়াজ লিন্ডসে তার গাছবাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। পাখির কিচিরমিচিরও শোনা যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে হুশ করে চলে যাওয়া দুএকটা গাড়ির শব্দ। কয়েক সেকেন্ড পরে চোখ মেলল অ্যাবি।

ছাদ যেখানে মেঝের সঙ্গে মিশেছে, সূর্যের আলোর ফালি ঢুকছে ওখান থেকে। মাকড়সার জাল নাচছে বাতাসে। ছাদের মাঝখানে ঝুলছে একটা নগ্ন বাল্ব। ওটার লম্বা রশিটা অ্যাবির নাগালের মধ্যে, হাত বাড়ালেই ধরা যায়। রশি ধরে টান দিল অ্যাবি। মৃদু আলো জ্বলে উঠল, যদিও ঘরের দূরবর্তী কোণাগুলোতে ছায়া থেকেই গেল।

তীব্র উত্তাপ, বন্ধ ঘর, মাকড়সার ভয়ের যে কোনো একটি কারণই অ্যাবির এখান থেকে ছুটে পালানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ওর জন্য কিছু একটা অপেক্ষা করছে এখানে। ওটার উপস্থিতি টের পাচ্ছে অ্যাবি, উপলব্ধি করতে পারছে গুমোট ছায়ার মাঝে কিছু আছে।

অদ্ভুত এক ব্যাকুলতায় অ্যাবি এগিয়ে গেল স্কুপ করা ভাঙা কার্ডবোর্ডের বাক্স, কাগজের ব্যাগ আর ভাঁজ করা ছেঁড়াখোঁড়া কম্বলের আবর্জনার দিকে। ওর জন্য কী অপেক্ষা করছে দেখবে। এক ঘণ্টা পাগলের মতো আবর্জনা ঘটল সে। কালি ঝুলিতে কালো হয়ে গেল হাত, জামা-টামা ধুলোয় নোংরা।

অবশেষে যা খুঁজছিল পেয়ে গেল সে।

একটা কাগজের ব্যাগ থেকে ওটাকে বের করে আনল অ্যাবি। ব্যাগটা অনেক পুরোনো। ফরফর করে ছিঁড়ে গেল। ওর হাতে চারকোনা একটা কাঠের বাক্স, ঘন ধুলোর আস্তরণ তাতে। কাগজ দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করল অ্যাবি। বাক্সটা দেখতে বেশ সুন্দর, নরম কাঠ দিয়ে তৈরি, পিতলের ছিটকিনিটা চকচক করছে। অ্যাবির মনে হলো বাক্সটার মোটা কাঠ ভেদ করে একটা শক্তি বেরিয়ে আসতে চাইছে, ঢুকে যাচ্ছে ওর হাতে। কেঁপে উঠল অ্যাবি। দ্রুত ছিটকিনি খুলে ফেলল, তুলল ঢাকনা।

বাক্সের ভিতরে একটা পুতুল।

সাদা স্যাটিনের পোশাকটা অনেক দিন আগের বলে হলুদ রঙ ধরেছে, পুতুলটা একটা বাচ্চার মতো শুয়ে আছে। মাথায় চুড়ো করে বাঁধা কালো চুল, পরনের জামাটা একশো বছর আগের ডিজাইনের। স্কার্ট লম্বা, কোমরের কাছটাতে চেপে বসেছে, উঁচু গলা ও লম্বা স্লিভে লেস বসানো।

চীনা মাটির মুখ, আকাশ নীল চোখজোড়া অ্যাবির মতো, পাপড়ি কালো, চেয়ে আছে।

আকাশ-নীল চোখজোড়া এত জীবন্ত, চাউনির মধ্যে শক্তিশালী ও ভীতিকর একটা ব্যাপার আছে, আঁতকে উঠল অ্যাবি।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো ও চোখ ঠিকরে পড়ছে ঘৃণা। তবে তা এক মুহূর্তের জন্যই। অ্যাবি বাক্স থেকে তুলে নিল পুতুলটাকে। ওটার চোখজোড়া এখন ফাঁকা ও নিষ্প্রাণ। কাঁচের নীল চোখ দম বন্ধ করা চিলেকোঠার নগ্ন বাল্বের স্নান আলোয় ঝিলিক দিল।

চিলেকোঠার ঘরটি অর্ধেক পরিষ্কার করল অ্যাবি। তারপর পুতুলটাকে নিয়ে চলে এল নিজের ঘরে। স্যাটিনের স্কার্ট দিয়ে চেপে মোটামুটি ঠিকঠাক করে শেলফের লম্বা তাকে, স্টাফ করা কতগুলো প্রাণীর সাথে রেখে দিল। এগুলো গত বছর ওর বাবা মেক্সিকো থেকে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে পুতুলও আছে, রয়েছে আর্ট ক্লাসে নিজের হাতে তৈরি একজোড়া মাটির পাত্র এবং সাগর সৈকত থেকে কুড়িয়ে আনা কতগুলো ঝিনুকের খোলস। তাকে পুতুলটা বসে রইল রানির মতো, উদ্ধত এবং শীতল, মুখ ফেরানো অ্যাবির বিছানার দিকে।

এটাকে কেন যে তোমার মনে ধরল বুঝতে পারছি না, সে রাতে লিন্ডসে বলল তার বড়ো বোনকে। পুতুলটা খুবই পুরোনো আর ডিসগাস্টিং।

তোর কাছে ডিসগাস্টিং মনে হলেও আমার কিছু আসে যায় না, বলল অ্যাবি। বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছে পুতুলটার দিকে। পুতুলটা দেখতে খুব সুন্দর। মা বলেছে এটা বোধহয় কোনো দামি অ্যান্টিক।

তাহলে বিক্রি করে দিলেই পারো। আমি হলে করতাম।

আমি জানি তুই তা করতি। বলল অ্যাবি। কিন্তু আমার বিক্রি করার ইচ্ছে নেই। ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা কর, লিন্ডসে আমি ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ও এখন স্বাধীন নারী।

হুহ্, নাক দিয়ে বিদঘুঁটে শব্দ করল লিন্ডসে।

যা। এখন ভাগ। বলল অ্যাবি। আমার ঘুম আসছে। ঘুমাব।

লিন্ডসে তার ঘরে চলে যাওয়ার পরে বেডসাইড বাতিটা সুইচ টিপে নিভিয়ে দিল অ্যাবি। পা টান টান করে শুলো। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো ভেদ করেছে পাতলা, সাদা পর্দা, অ্যাবি দেখতে পেল আঁধারেও জ্বলজ্বল করছে। পুতুলটার চোখ। এ চোখ বোধহয় কখনও বন্ধ হয় না। মা বলেছে পুতুলটাকে সম্ভবত এভাবেই তৈরি করা হয়েছে, সারাক্ষণ খোলা থাকবে চোখ। পুতুলটার মাথাটা খুলে ভিতরের কলকজা দেখা যায়। তবে শরীর এত নরম, ভেঙে যেতে পারে ঘাড়। অ্যাবি অমন ঝুঁকি কখনোই নেবে না। সে চমৎকার একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছে। অযথা ঘাঁটাঘাঁটি করে ওটাকে নষ্ট করবে না। পুতুলটার অদ্ভুত, স্থির চোখের চাউনির সাথে একসময় সে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

.

সপ্তাহখানিক পরে শুরু হলো স্কুল, সেই সাথে অ্যাবির স্বপ্নেরও। ওর জীবনটাকে বদলে দেবে স্কুল, ভেবেছিল অ্যাবি। নতুন বাড়ি, নতুন ঘর, নতুন ক্লাস। কিন্তু অ্যাবি যখন স্বপ্ন দেখার আসল কারণ জানতে পারল ততদিনে দেরি হয়ে গেছে অনেক।

স্বপ্নের কথা ভুলে থাকতে চাইল অ্যাবি, কিন্তু ওগুলো তার মস্তিষ্কে সেঁটে থাকল আঠার মতো, দিনগুলোকে কালো মেঘের ছায়া দিয়ে ঘিরে রাখল, তাকে জাগিয়ে রাখল অনেক রাত অবধি, অ্যাবি পুতুলের পলকহীন চোখে চেয়ে জেগে থাকল।

স্বপ্নগুলো বড় অদ্ভুত, ছোটো ছোটো অর্থহীন দৃশ্যপট নিয়ে তৈরি। তবে তা আতঙ্কিত করে তুলল অ্যাবিকে। ঘুমের মধ্যে সে গোঙায়, মোচড় খেতে থাকে শরীর। তবে ঘুম ভাঙার পরে যা ঘটত তা ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আয়নায় নিজের চেহারা চেনা যায় না। যেন অন্য কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকে। অ্যাবি প্রতি রাতে বিপদের স্বপ্ন দেখে আর তা ঠেকানোর ক্ষমতা তার নেই।

প্রথম শিকার হলো ওর বন্ধু আইরিন গ্রে।

সেদিন শুক্রবার রাত, স্কুলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিন। আইরিনকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল অ্যাবি। তারপর অ্যাবির বাসায় থেকে গেছে আইরিন। ঘুমাবার আগে রাত একটার দিকে, আইরিন অ্যাবিকে বোঝাতে চাইছিল মার্ক হেলপার্নের সঙ্গে অ্যাবির ঠিক খাপ খাবে না।

আমি জানি ও ভদ্র ছেলে, স্লীপিং ব্যাগ থেকে মাথা বের করে বলল আইরিন। তবে কারও সঙ্গে ওর সম্পর্ক টেকে না। প্রতি সপ্তাহে নতুন কোনো মেয়ের সাথে দেখা যায় তাকে।

আমি কিন্তু ওকে বিয়ে করছি না, আইরিন, বলল অ্যাবি। আমি তো ওর সঙ্গে শুধু ডেট করব।

ওহ, অ্যাবি, ব্যাগ খুলে সিধে হলো আইরিন, হেঁটে গেল শেলফের কাছে। তাক থেকে পুতুলটাকে নিয়ে অন্যমনষ্কভাবে হাতের মধ্যে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ও তোমাকে ছেড়ে দিলে কিন্তু অনেক কষ্ট পাবে। পুতুলটাকে এবারে লোফালুফি করছে সে। এটার সমস্যা কী? চোখ বোজে না।

ও একটা পুতুল, এটা নয়। আর কেন চোখ বোজে না জানি না। বলল অ্যাবি, যাক তুমি মার্কের কথা বলছিলে।

আমি চাই না তুমি ছ্যাকা খাও, ঠিক আছে? আইরিন দেরাজের তাকে তুলে রাখল পুতুলটাকে, ঢুকে পড়ল স্লীপিং ব্যাগে। আর তুমি ছ্যাকা খেয়েছ এ কথা শুনতেও চাই না।

হেসে উঠল অ্যাবি, নিভিয়ে দিল বাতি। কিছুক্ষণ পরে আইরিনের নিদ্রাতুর গলা ভেসে এল, অ্যাবি?

উ?

পুতুলটার চোখ দেখলে ভয় লাগে। কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ওটার মুখ আরেক দিকে ঘুরিয়ে দিই?

দাও। অ্যাবি ঘুম ঘুম চোখে দেখল আইরিন হেঁটে গেল ঘরের কোণে, আঁধারে তার লম্বা, সাদা টি শার্ট ঝাপসা লাগছে। আইরিন যখন ফিরে এলো, অ্যাবির ততক্ষণে চোখ লেগে গেছে। এক সেকেণ্ডের জন্য আবার জেগে উঠল সে ঝাঁকি খেয়ে, পিঠে বরফঠাণ্ডা কীসের যেন স্পর্শ পেয়েছে। এতই ঠাণ্ডা, উষ্ণ ঘরের মধ্যেও শিউরে উঠল। পরমুহূর্তে শীতল স্পর্শটা আর রইল না, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল অ্যাবি।

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল সে। একটা হাত। ছোটো, ফ্যাকাসে রঙের হাতটা। হলঘরে। অ্যাবি জানে না, দেখতেও পাচ্ছে না ওটা কী করছে। তবে জানে ওটা তার রুমের বাইরে, হলঘরে রয়েছে। হলঘরটাকে সে চিনতে পারছে কারণ দেয়ালের লতানো প্যাটার্নের ওয়াল পেপার আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে, রঙ করা বেসবোর্ডও সে দেখতে পাচ্ছে। মা বলেছে ওখানে আসল কাঠ লাগিয়ে দেবে।

হাতটা রোগাটে, তবে চমৎকার গঠন। মেয়েলি হাত। ফ্যাকাসে রঙের একটা প্রজাপতির মতো মেঝের উপর ওটা উড়তে লাগল, সিঁড়ির মাথায় ভেসে রইল এক মুহূর্ত, তারপর মিলে গেল আঁধারে।

একটা চিৎকার শুনে জেগে গেল অ্যাবি।

ঘর অন্ধকার তবে হলঘর থেকে এক ফালি রূপোলি আলো ঢুকে পড়েছে। দরজার চৌকাঠ গলে। ওখান থেকে অস্পষ্ট গলা ভেসে আসছে। আইরিন কথা বলছে অ্যাবির মার সঙ্গে। বিছানা থেকে নেমে পড়ল অ্যাবি, পা বাড়াল দরজার দিকে।

আমি একটুর জন্য বেঁচে গেছি, শুনতে পেল আইরিন বলছে।

কী হয়েছে? হলঘরের আলোতে চোখ পিটপিট করল অ্যাবি।

তুমি ঠিক আছ তো? তোমার চিৎকার শুনলাম যেন।

ঘাড় ভাঙার মতো দশা হলে তুমিও চিৎকার দিতে, বলল আইরিন। খুব পিপাসা লেগেছিল আমার। নিচে যাচ্ছিলাম। কীসের সঙ্গে যেন পা বেঁধে যায় আমার। ঝুঁকে হাত দিয়ে হাঁটু ডলল আইরিন। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই।

কীসের সঙ্গে পা বাঁধল তোমার? উপরের সিঁড়িতে চোখ বুলালেন অ্যাবির মা। এখানে তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

জানি না আমি, কপালে ভাঁজ পড়ল আইরিনের। কিন্তু কিছু একটা ছিল ওখানে। পরিষ্কার টের পেয়েছি।

সিঁড়ির মাথায় চোখ বুলাল তিনজন, তারপর পরস্পরের সঙ্গে চোখাচুখি হলো। অ্যাবির স্মৃতির কুঠুরিতে কিছু একটা খোঁচা দিচ্ছিল, কোনো একটা ছবি, কিন্তু মনে করতে পারছে না সে। শেষে যে যার বিছানায় ফিরে গেল ওরা।

খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি, স্লীপিং ব্যাগে ঢুকে বলল আইরিন। ভাগ্যিস ডিগবাজি খাইনি। তোমাদের সিঁড়িগুলো যা খাড়া!

হুঁ, বলল অ্যাবি। তোমার কিছু হয়নি দেখে নিশ্চিন্ত বোধ করছি, বিছানায় শুয়ে চোখ বুজল সে। আইরিন উঠে বসেছে টের পেয়ে চোখ মেলে চাইল। কী করছ তুমি?

পুতুলটার মুখ ঘুরিয়ে রাখছি, জবাব এল।

একবার না ঘুরিয়ে রাখলে!

রেখেছিলাম তো! ওটা বোধহয় আবার ঘুরে গেছে। কেমন প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

পরদিন, আইরিন চলে যাওয়ার পরে স্বপ্নের কথা মনে পড়ল অ্যাবির। ফ্যাকাসে হাতখানা উড়ছিল, প্রায় ভেসে ছিল সিঁড়ির মাথায়, ঠিক যেখান থেকে পড়ে যায় আইরিন। হাতটা কি ওকে ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করছিল যে ওখানে কিছু একটা ঘটবে?

.

দিন সাতেক বাদের ঘটনা। অ্যাবি, আইরিন ও তাদের বান্ধবী হলি রাসেল অ্যাবিদের রান্নাঘরে বসে পড়াশোনা করছে। ওদের পড়ার বিষয় সমাজ বিজ্ঞান। অ্যাবির ঘরে বসে পড়ার চেষ্টা করছিল হলি। তবে আইরিনের মতো তারও পুতুলটার চাউনি ভালো লাগেনি।

ভয়ঙ্কর চোখ, শিউরে উঠেছিল হলি। যেন সারাক্ষণ লক্ষ করছে আমাকে। তারপর বইখাতা নিয়ে চলে এসেছে কিচেনে।

রচনা লেখার পরীক্ষায় আমি কখনোই ভালো করতে পারি না, অনুযোগ হলির কণ্ঠে। প্রশ্নের ধরন কী হবে না জেনে বেহুদা পড়ার কোনো মানে হয়?

ঠিকই বলেছ, সায় দিল আইরিন, ফ্রিজ খুলে সোডার বোতল বের করছে। অ্যাবি তার পাশে কাউন্টারে দাঁড়ানো, বাটিতে পপকর্ন ঢালছে।

হলির কনুই টেবিলে ঠেস দেয়া, চিবুকে হাত। তার ঠিক মাথার ওপর ঝুলছে বৈদ্যুতিক বাতি। আলো পড়ে ঝলমল করছে কালো চুল। অ্যাবি কী যেন বলার জন্য ওর দিকে ঘুরল আর তখন ঘটে গেল ঘটনাটা।

সাবধান করে দেয়ার সময় পাওয়া গেল না। টেবিলের উপরে চেইন দিয়ে ঝুলছিল কাঁচের বাতি, খসে পড়ল হলির মাথার উপরে, কাঁচ ভাঙার শব্দ হলো বিস্ফোরণের মতো।

রক্তে ভেসে গেল হলির মুখ। আইরিন দ্রুত ওর মুখের রক্ত মুছতে লাগল, তারপর ছুটে গেল অ্যাবির মার কাছে। বাতিটা খসে পড়ার মুহূর্তে চিৎকার করে উঠেছিল অ্যাবি, তারপর চুপ হয়ে গেছে। পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো আতঙ্ক নিয়ে দেখল অতটা মারাত্মক নয় ক্ষত। দেখল মা আর আইরিন মিলে হলিকে সিধে হতে সাহায্য করছে, মা বলছেন তিনি হলিকে তার বাসায় পৌঁছে দেবেন। এসব দেখছে অ্যাবি, একই সাথে একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

কাঁচের বাতিটা বনবন করে ঘুরছিল, এত জোরে ঘুরছিল যে রঙিন গ্লাস প্যানেল আলোর অদ্ভুত একটা ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করে ফেলেছিল টেবিলের উপরে। অ্যাবি দেখছিল ঝর্ণাধারাটার পাক খাওয়ার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠছে, ওর চোখ এমন ধাঁধিয়ে যায়, অন্য দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য হয়। তারপর সে শব্দটা শোনে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলেছিল কেউ। শব্দটা বাতির কাছ থেকে শোনা গিয়েছিল। অ্যাবি ঘুরে তাকায়, একটা হাত দেখতে পায় সে। ফ্যাকাসে সাদা, নরম হাত। এগিয়ে যাচ্ছিল বাতির দিকে। আঙুলের মৃদু স্পর্শে বাতির ঘোরা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আরেকটা শব্দ শুনতে পায় অ্যাবি। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। হাতটার মতোই নরম এবং কোমল। তৃপ্তির নিঃশ্বাস।

এ দৃশ্যটা অ্যাবি গত রাতে স্বপ্নে দেখেছিল। এখন মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো, হলির রক্তের ছিটে মাখানো বই-খাতার দিকে তাকিয়ে সে শিউরে উঠল। বুজে ফেলল চোখ। তাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। সাবধান করে দেয়া হয়েছিল স্বপ্নের মাঝে। কিন্তু ঠিক সময়ে স্বপ্নের কথা মনে পড়েনি অ্যাবির, বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি বান্ধবীকে।

মাথায় চারটা সেলাই পড়ল হলির। এছাড়া সে ঠিকই আছে। তবে এ ঘটনা বা স্বপ্নের কথা কোনোটাই মন থেকে মুছে ফেলতে পারল না অ্যাবি।

তারপর থেকে ঘুম হারাম হয়ে গেল অ্যাবির। রাতের বেলা দুচোখ এক করতে ভয় পায় সে। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে না জানি আবার কোন্ দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্নগুলো তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল ওকে।

.

কিন্তু অ্যাবিকে তো ঘুমাতে হবে। আর ঘুমানোর পরে যথারীতি স্বপ্ন দেখল সে। আর সে স্বপ্নের পরিণতি হলো আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর। আসলে স্বপ্ন নয়, বাস্তব। বিভীষিকাময় বাস্তবতা এটাই যে ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যায় যে বাধা দেয়ার সময় থাকে না। একরাতে সে মার চিৎকার শুনে ঘুম থেকে জেগে গেল। মা কর্কশ গলায় চেঁচাচ্ছেন, অ্যাবিকে ডাকছেন সাহায্য করার জন্য।

অ্যাবি অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে কাঁপতে ছুটল। দেখল মা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। নগ্ন পায়ে, এখনো ঘুম কাটেনি চোখ থেকে, মার পিছু পিছু নামতে লাগল সে। খিড়কির দরজা খুলে রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে বেরিয়ে এল।

ঠাসঠুস শব্দটা নরম, আর পেলব। গন্ধটা অ্যাবিকে সামার ক্যাম্পের কথা মনে করিয়ে দিল। তবে কাঠের তক্তায় আগুনের লেলিহান শিখার চুম্বনের দৃশ্যটাতে স্বস্তিদায়ক কিছু নেই। দাঁড়িয়ে পড়ল অ্যাবি, আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখ, পরমুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আগাছা ভরা উঠোন পেরিয়ে মার সঙ্গে ছুটল জ্বলন্ত গাছ বাড়ির দিকে, যেখানে ঘুমিয়ে আছে লিন্ডসে।

লিন্ডসের কাছে অ্যাবির তৃতীয় স্বপ্নের বাস্তবতা ছিল যন্ত্রণাদায়ক, তার কাঁধ, পিঠ এবং হাত পুড়ে যাওয়ার তীব্র বেদনার অনুভূতি। ডিয়ানা কেঁদে ফেললেন শুনে যখন ডাক্তাররা লিন্ডসেকে ভাগ্যবতী বলে ঘোষণা করলেন

ফার্স্ট ডিগ্রী বার্নের মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে খুব একটা ফিরে আসে না। কিন্তু বেঁচে গেছে লিন্ডসে।

আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো জানে না কেউ। রাস্তার ধার ঘেঁষা গাছ বাড়িতে, ধারণা করলেন ডিয়ানা, কোনো গর্দভ নিশ্চয়ই গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় জ্বলন্ত দেশলাই ছুঁড়ে মেরেছিল।

তবে অ্যাবি আরও ভালো জানে, কারণ দৃশ্যটা দেখেছে সে স্বপ্নে। মার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার আগে সে স্বপ্নে দেশলাইটাকে দেখেছে। তবে গাড়ি থেকে কেউ জ্বলন্ত কাঠি ছুঁড়ে মারেনি, একটা নরম, সাদা হাত দেশলাই বাক্স থেকে কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে গাছ বাড়িতে।

হাসপাতালের রুমে লিন্ডসের সঙ্গে শুয়ে আছে অ্যাবি, মা চেয়ারে বসে ঘুমে ঢুলছেন, প্রাণপণে কান্না ঠেকানোর চেষ্টা করল। পারল না। কাধ জোড়া নড়তে লাগল কান্নার দমকে, তবে নিঃশব্দে কাঁদল অ্যাবি। গাল বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে হাতের চেটো দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল ও, হাতজোড়া মুখের সামনে ধরল। বাবার মতো ছোটো, চওড়া হাত তার, নখের ডগা চারকোণা। স্বপ্নের হাতের মতো মোটেই ফ্যাকাসে, নরম এবং ভয়ঙ্কর দেখতে নয়। তাহলে কার হাত দেখেছে সে স্বপ্নে?

.

আরও একটা সপ্তাহ গেল। এই এক সপ্তাহে ভৌতিক হাতটাকে স্বপ্নে দেখেনি অ্যাবি। গত সাতদিনে তাপমাত্রা নেমে গেল আরও, ঝরা পাতার স্তূপ জমে উঠল গাছের নিচে। লিন্ডসের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তবে সে আর উঠোনের ধারে কাছেও গেল না, আরেকটা গাছবাড়ির কথা মুখেও আনল না। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলল না, যদিও সে রাতের ভয়াল স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে লিন্ডসে।

অ্যাবি প্রতি রাতে বিছানায় যায় আতঙ্ক নিয়ে। সারাদিন ভয়ে অস্থির থাকে রাতে কী স্বপ্ন দেখতে হবে তা ভেবে। জানে আবার স্বপ্ন দেখবে সে, কী ঘটবে তা নিয়ে প্রচণ্ড শঙ্কার মধ্যে আছে ও। মার্ক হেলপার্ন সেদিন স্কুল ছুটির পরে ওকে কোক কিনে দিল। কিন্তু তীব্র দুশ্চিন্তায় কাহিল ও বিপর্যস্ত অ্যাবির মাথায় এখন অন্য কিছু নেই। তাই মার্ক যখন ওকে নিয়ে শনিবার রাতে বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব দিল, চমকে গেল অ্যাবি।

সাড়ে সাতটার দিকে তোমাকে তুলে নিয়ে যাব আমি, শেষ বিকেলের রোদ গায়ে মেখে অ্যাবিদের বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ওরা। ঘন সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে অ্যাবির দিকে তাকিয়ে হাসল মার্ক। ছবি দেখব। তারপর কিছু খাব। বেশ হবে, না?

অ্যাবিও জবাবে বেশ হবে বলতে যাচ্ছিল, লিন্ডসেকে দেখে আর বলা হলো না। সদর দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে সে, এক হাতে পুতুলটার একটা ঠ্যাং ধরে আছে। এটা মেঝেতে পড়ে ছিল, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বলল সে।তোমার ঘরে যাচ্ছিলাম। দেখি মেঝের ওপর পড়ে আছে এটা।

ওর হাত থেকে পুতুলটা নিল অ্যাবি, স্যাটিনের স্কার্ট টেনেটুনে ঠিক করল। তুই শেলফে তুলে রাখলেই পারতি।

তোমাদের গলা শুনে ভাবলাম দেখি তো কে এসেছে, বলল লিন্ডসে, তাই আর ওটাকে শেলফে তুলে রাখতে মনে ছিল না। মার্কের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসল সে, ঢুকে গেল ঘরে।

তুমি পুতুল খেলো নাকি? জিজ্ঞেস করল মার্ক।

মৃদু হাসল অ্যাবি। এটাকে চিলেকোঠার ঘরে পেয়েছি। অনেক পুরোনো পুতুল।

মার্ক ওর হাত থেকে পুতুলটা নিল। উল্টেপাল্টে দেখল। সুন্দর, মন্তব্য করল সে। চোখ তুলে চাইল অ্যাবির দিকে। তবে তোমার মতো সুন্দর নয়। মুচকি হাসল মার্ক প্রশংসাটা খুবই গতানুগতিক ঢঙের হয়ে গেছে বুঝতে পেরে। ঝুঁকে এল সে, ঠোঁট ছোঁয়াল অ্যাবির গোলাপি অধরে।

চুম্বনটা অ্যাবির কাছে বেমানান ঠেকল, দুজনের মাঝখানে পুতুলটা প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে আছে বলে। তাছাড়া সে এত বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারল না। অবশ্য তাতে কিছু এল গেল না। মার্ক আবার হাসল অ্যাবির দিকে তাকিয়ে, পুতুলটা ওর হাতে দিয়ে পা বাড়াল নিজের গাড়ির দিকে।

টমেটোর মতো লাল রঙের গাড়িতে উঠে বসল লম্বা পা জোড়া ভাঁজ করে, একবার হর্ন বাজাল, তারপর চলে গেল। অ্যাবি ঘরে ঢোকার আগে পুতুলটাকে বুকে চেপে ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ।

শুক্রবার রাতে আবার স্বপ্ন দেখল সে।

মাঝ রাতে জেগে গেল অ্যাবি, চাদরে মুড়ে আছে পা, কানে ধাক্কা দিচ্ছে। রক্ত স্রোত। বিপদের উপলব্ধি এমন তীব্র, সারারাত আর ঘুমাতে পারল না মেয়েটা। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ভোরের অপেক্ষায় থাকল। একসময় দেখল রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো ঢুকছে।

অ্যাবি আবার সেই হাতজোড়াকে দেখেছে। তবে এবারে শুধু হাত নয়, গোটা শরীর। ছোটোখাটো কাঠামো, শিশুদের মতো। ছায়ার মধ্যে ছিল শরীরটা, পরিষ্কার বোঝা যায়নি চেহারা। শুধু নরম হাত আর বিবর্ণ গালের রেখা দেখতে পেয়েছে অ্যাবি। ওটা নড়াচড়া করছিল, হাঁটছিল। অ্যাবি রাস্তার নুড়ি পাথরের শব্দ শুনেছে, ফিটফাট একটা পোশাক দেখেছে এক ঝলক, চকচকে কালো জুতোর ডগাও চোখে পড়েছে। তারপর একটা শব্দ কানে এসেছে, শ্বাস পড়ার শব্দ, বাচ্চাটা হেঁটে যাচ্ছে, পেছনে নরম ও উত্তেজিত খিকখিক একটা হাসির আওয়াজ হচ্ছিল।

তারপর রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করে শিশুর মতো কাঠামোটা, পায়ের ধাক্কায় ছিটকে যাচ্ছিল নুড়ি পাথর, শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছিল। অ্যাবি টের পেয়েছে তারও শ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল না কী ঘটছে, তবে খারাপ একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে উপলব্ধি করতে পারছিল। তবে খারাপ ব্যাপারটা কতটুকু খারাপ, তা জানা ছিল না তার। অ্যাবি হঠাৎই দেখতে পায় হেডলাইটের চোখ ধাঁধানো একজোড়া আলো, ইঞ্জিনের গুঞ্জন হঠাৎ পরিণত হয় গর্জনে, গাড়িটা ক্রমে কাছিয়ে আসতে থাকে, অ্যাবি দেখে ছোটো, ছায়াময় শরীরটা ইচ্ছে করে গাড়ি আসার রাস্তায় উঠে এসেছে।

তারপর ব্রেক কষার তীক্ষ্ণ ক্রিইইইচ আওয়াজ, সেই সাথে ধাতব আর কাঁচ ভাঙার গা গোলানো শব্দ। এক মুহূর্ত নিরবতা, তারপর জেগে ওঠার আগে শেষ শব্দটা শুনতে পেয়েছে অ্যাবি–নরম, খিকখিক হাসি।

আজ শনিবার। কখন মার্কের সঙ্গে দেখা হবে তার অপেক্ষার প্রহর গুণবে যে মেয়ে সে তা না করে ভয়ঙ্কর স্বপ্নের কথা মনে করে সিঁটিয়ে রইল সারাদিন। স্বপ্নটা তার মস্তিষ্কে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে রইল।

আইরিন ভাগ্যবতী সিঁড়ি দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে ঘাড় ভাঙতে পারত তার। হলিরও ভাগ্য ভালো। ভাঙা কাঁচের টুকরা ওর চোখ কিংবা ঘাড়ে ঢুকে যেতে পারত। অন্ধ হয়ে যেত হলি, মৃত্যুও অস্বাভাবিক ছিল না। আগুনে পুড়ে মরে যেতে পারত লিন্ডসেও, গাছ বাড়ির মতো পুড়ে কয়লা হয়ে যেত সে।

এবারে চতুর্থ স্বপ্ন। কাল খবরের কাগজে কি কোনো দুর্ঘটনার খবর পড়তে হবে অ্যাবিকে? পড়তে হবে সেই খবর যা সে ইতিমধ্যে জানে–গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, কেউ আহত হয়েছে, সম্ভবত কোনো শিশু?

ক্লান্ত ও খিটখিটে মেজাজ নিয়ে সারাদিন এ ঘর ও ঘর করে বেড়াল অ্যাবি, জানালা দিয়ে মা আর লিন্ডসেকে দেখল। ওরা পাতা পরিষ্কার করছে। আজ সকালে কুয়াশা পড়েছে। শীঘ্রি ঘাসের রঙ বিবর্ণ ও ম্লান হয়ে উঠবে। সমস্ত পাতা ঝরে কঙ্কাল হয়ে যাবে গাছগুলো, সাঁঝ নেমে আসবে আরও দ্রুত।

সাতটার সময় গোসল করল অ্যাবি, শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিল চুল। গরম জলের ছোঁয়ায় আড়ষ্ট পেশীগুলোয় ঢিল পড়ল, ভার ভার মাথাটাও অনেকটা হালকা লাগল। মোটা তোয়ালেতে শরীর মুড়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল অ্যাবি।

ক্লজিটের উপরে চোখ ঘুরছে অ্যাবির, শার্ট, স্কার্ট এবং প্যান্ট দেখছে, পছন্দ হচ্ছে না কোনোটাই। এমন সময় শব্দটা শুনতে পেল সে… সেই খিকখিক হাসি। এত পরিষ্কার, এত কাছে, চরকির মতো ঘুরল অ্যাবি, আশা করল পেছনে দেখতে পাবে কাউকে।

কিন্তু ঘর খালি।

মাথা ঝাঁকাল অ্যাবি, যেন দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলছে। ফিরল ক্লজিটের দিকে। গাঢ় কমলা রঙের একটা ব্লাউজ পছন্দ হলো, নরম এবং মখমলের মতো মসৃণ। হাতঘড়ির দিকে নজর গেল ওর। আটটা বাজে। মার্কের আধঘণ্টা দেরি।

এক ঘণ্টা পরে কর্ডলেস ফোনটা নিজের ঘরে নিয়ে এল অ্যাবি, ফোন করল মার্কের বাসায়। বুক ধুকপুক করছে, ডায়াল করার সময় হাত কাঁপল। ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে গেছে, কুডাক ডাকছে মন। মার্কের মা ফোন ধরলেন। অ্যাবি মার্ককে চাইল এবং অপর প্রান্ত থেকে ফোঁপানির আওয়াজ শুনে জমে বরফ হয়ে গেল।

মার্কের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন মারা গেছে তার ছেলে, বিকেলবেলা, হাসপাতালে।

এক বন্ধুর বাসা থেকে ফিরছিল ও, জানালেন মিসেস হেলপার্ন। মার্ক খুব ভালো ড্রাইভার, অত্যন্ত সাবধানে গাড়ি চালাত। কিন্তু নিশ্চয়ই গাড়িটা আচমকা ঘুরিয়ে ফেলতে হয়েছিল ওকে… বিরতি দিলেন তিনি এক মুহূর্তের জন্য, অ্যাবি শুনল ভদ্রমহিলা ফোঁপাচ্ছেন। পঁয়ত্রিশ মাইল গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল ও, ওখানকার স্পীড লিমিট তাই ছিল। কিন্তু পুলিশ বলেছে ওই গতিতে গাড়ি চালালেও যদি গাছে টাছে ধাক্কা লাগে…। আবার থেমে গেলেন তিনি।

অ্যাবির মুখের ভিতরটা শুকিয়ে খটখটে, কথা বলার সময় কর্কশ শোনাল কণ্ঠস্বর। কেন? জিজ্ঞেস করল ও। আপনি বললেন ওকে আচমকা গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে হয়েছিল। কিন্তু কেন?

বাচ্চা মেয়েটার জন্য, জবাব দিলেন মিসেস হেলপার্ন। ওরা ওকে অ্যাম্বুলেন্সে নেয়ার সময় মার্ক বলেছে একটা ছোটো মেয়েকে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখে সে। পরিষ্কার নাকি দেখেছে। পুলিশ মেয়েটাকে অনেক খুঁজেছে। সন্ধান পায়নি।

গলা একেবারে ভেঙে গেল ভদ্রমহিলার, কোনো মতে বিদায় বলে নামিয়ে রাখলেন ফোন।

চোখ বুজল অ্যাবি। মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। দাঁড়িয়ে আছে ও। জানে না বসলে যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে। কিন্তু নড়াচড়ার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই গায়ে, দাঁড়িয়েই রইল। মাথা ঘুরছে, টের পেল শরীরও দুলছে।

ঠিক তখন খিকখিক হাসিটা আবার শুনতে পেল অ্যাবি। শ্বাস চেপে রাখল ও, জানে আবার শুনবে শব্দটা। আবার শুনতে পেল ভৌতিক, ফিসফিসে খিকখিক হাসির শব্দ, ঘরের মধ্যে ভাসতে ভাসতে যেন এগিয়ে গেল ওর কাছে। ধীর গতিতে ঘুরল অ্যাবি, চোখ মেলল, দৃষ্টি স্থির হলো পুতুলটার চকচকে আকাশ-নীল চোখে।

একটি ছোটো মেয়ে।

বেগুনি রঙের পোশাক পরা একটি ছোটো মেয়ে, নরম, বিবর্ণ হাত, পায়ে চকচকে কালো জুতা। অ্যাবি চিলেকোঠার ময়লা ঘেঁটে যে পুতুলটাকে খুঁজে এনেছ অবিকল তার মতো… ওকে কি জ্যান্ত করেছে সে? এমনই জ্যান্ত যে ধাক্কা মেরে অ্যাবির এক বান্ধবীকে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিতে পারে… আরেক বান্ধবীর মাথায় ভাঙতে পারে বাতি, দেশলাই কাঠিতে আগুন ধরিয়ে গাছ বাড়ি ধ্বংস করে মেরে ফেলার চেষ্টা করতে পারে তার বোনকে?

এ পুতুলের এমনই শক্তি যে কি না রাস্তায় গিয়ে ষোলো বছরের এক নিষ্পাপ তরুণকে খুন পর্যন্ত করে ফেলে?

দাঁড়িয়ে আছে অ্যাবি, মহা আতঙ্কে লক্ষ করল পুতুলটার চাউনিতে পরিবর্তন ঘটেছে, সত্যি সত্যি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে চোখজোড়া, সোজা তাকাল অ্যাবির দিকে। দৃষ্টিতে প্রকট বিজয় উল্লাস। মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য ওভাবে তাকিয়ে থাকল পুতুল। কিন্তু ওই সময়টুকুই যথেষ্ট। ওর ভিতরে জীবন আছে, এক ধরনের জীবন, এক ধরনের ভয়ঙ্কর শক্তি যে শক্তি মানুষ হত্যা করে এবং যাকে না থামানো পর্যন্ত আরও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাবে।

অ্যাবি জানে এখন ওর করণীয় কী। গলা দিয়ে ঠেলে আসা চিৎকারটা গিলে ফেলল, লম্বা পা ফেলে দাঁড়াল শেলফের সামনে, এক টানে তাক থেকে নামিয়ে আনল পুতুলটাকে। ওর ভিতরে জীবন থাকলেও আর দেখতে চায় না অ্যাবি। সে ওটাকে সুন্দর কাঠের বাক্সটিতে ঢোকাল। তারপর ঢাকনি ফেলে চকমকে ছিটকিনি আটকে দিল।

এখন এটাকে কফিনের মতো লাগছে।

সাটিনের ঝালর দেয়া পুতুলের জন্য কফিন।

দশ মিনিট পরে মার গাড়িটা নিয়ে পাহাড়ি রাস্তার মাথায় চলে এল অ্যাবি। বাক্সটা ওর পাশের সীটে পড়ে আছে। ওটার দিকে হাত বাড়াল অ্যাবি, একটা শব্দ শুনতে পেল। অস্পষ্ট, টুপটুপ শব্দ, যেন নুড়ি পাথরের গায়ে ঠোকাঠুকি লাগছে। তবে ওটা নুড়ি পাথর নয়।

ছোটো মুঠি দিয়ে ঘুসি মারছে কাঠের গায়ে।

গাড়ি থেকে বের হলো অ্যাবি, শোঁ শোঁ বাতাসে চুল উড়ছে। বাক্সটা হাতে নিয়ে পাহাড়চুডোর কিনারে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাক্সটাকে ছুঁড়ে মারল অ্যাবি। দেখল ওটা ডিগবাজি খেতে খেতে নিচে নেমে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় বারকয়েক ঝিকিয়ে উঠল পিতল, শেষে নিচের অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

পাহাড়চূড়ায় একা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অ্যাবি। হিমেল বাতাসে কাঁপুনি ধরে গেছে শরীরে, কিন্তু ও অপেক্ষা করল। নিশ্চিত হতে চায়। কান খাড়া করে রেখেছে অ্যাবি। অবশেষে ভোঁতা তবে পরিষ্কার শব্দটা শোনা গেল। পাহাড়ের নিচে, ধারাল চাঁইয়ের সাথে বাড়ি খেয়েছে বাক্স। একবার, দুবার, তিনবার। তারপর নেমে এল নিস্তব্ধতা।

ঝামেলা শেষ। পুতুলটা বিদায় হয়েছে, অ্যাবি বাড়ির পথ ধরল। জানে এবার থেকে সে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, ওই বিবর্ণ, ভয়ঙ্কর হাতজোড়া আর স্বপ্নে তাড়া করে ফিরবে না ওকে।

.

লোকটা অবশেষে খুলে ফেলল বাক্সের ছিটকিনি। উঁকি দিল ভেতরে। হাসি ফুটল মুখে। সে অবাক হয়েছে, খুশিও। সে নিশ্চিত এটা সত্যিকারের কোনো অ্যান্টিক, অনেক দামি। হাতজোড়া আর মুখখানা চমৎকার চীনামাটি দিয়ে তৈরি, পোশাকটা অবশ্যই খাঁটি স্যাটিনের। আজকাল এরকম পুতুল কেউ বানায় না।

অ্যান্টিক হোক বা না হোক, সিদ্ধান্ত নিল লোকটা, এটাকে বিক্রি করবে। তার নয় বছরের একটি মেয়ে আছে, পুতুলের জন্য পাগল। মেয়েকে এই চমৎকার জিনিসটি উপহার দেবে সে। পরিতৃপ্তির হাসি ঠোঁটে, বাক্সটা বগলে চেপে বাড়ির পথ ধরল লোকটা।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor