Thursday, April 2, 2026
Homeরম্য গল্পসরস গল্পপ্রবাস বন্ধু - সৈয়দ মুজতবা আলী

প্রবাস বন্ধু – সৈয়দ মুজতবা আলী

প্রবাস বন্ধু – সৈয়দ মুজতবা আলী

বাসা পেলুম কাবুল থেকে আড়াই মাইল দূরে খাজামােল্লা গ্রামে। বাসার সঙ্গে সঙ্গে চাকরও পেলুম। অধ্যক্ষ জিরার জাতে ফরাসি। কাজেই কায়দামাফিক আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, এর নাম আবদুর রহমান। আপনার সব কাজ করে দেবে- জুতাে বুরুশ থেকে খুনখারাবি।’ অর্থাৎ ইনি ‘হরফন-মৌলা’ বা ‘সকল কাজের কাজি।

জিরার সায়েব কাজের লােক, অর্থাৎ সমস্ত দিন কোনাে-না-কোনাে মন্ত্রীর দপ্তরে ঝগড়া-বচসা করে কাটান। কাবুলে এরই নাম কাজ। ওরভােয়া, বিকেলে দেখা হবে বলে চলে গেলেন।

কাবুল শহরে আমি দুটি নরদানব দেখেছি। তার একটি আবদুর রহমান।

পরে ফিতে দিয়ে মেপে দেখেছিলুম ছ ফুট চার ইঞ্চি। উপস্থিত লক্ষ্য করলুম লম্বাই মিলিয়ে চওড়াই। দুখানা হাত হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে আঙুলগুলাে দু কাঁদি মর্তমান কলা হয়ে ঝুলছে। পা দুখানা ডিঙি নৌকার সাইজ। কাঁধ দেখে মনে হলাে, আমার বাবুর্চি আবদুর রহমান না হয়ে সে যদি আমীর আবদুর রহমান হত তবে অনায়াসে গােটা আফগানিস্থানের ভার বইতে পারত। এ কান ও কান জোড়া মুখ- হ্যা করলে চওড়াওড়ি কলা গিলতে পারে। এবড়াে-থেবড়াে নাক-কপাল নেই। পাগড়ি থাকায় মাথার আকার-প্রকার ঠাহর হলাে না, তবে আন্দাজ করলুম বেবি সাইজের হ্যাটও কান অবধি পৌছবে।

রঙ ফর্সা, তবে শীতে গ্রীষ্মে চামড়া চিরে ফেঁড়ে গিয়ে আফগানিস্থানের রিলিফ ম্যাপের চেহারা ধরেছে। দুই গাল কে যেন থাবড় মেরে লাল করে দিয়েছে- কিন্তু কার এমন বুকেট পাটা? রুজও তাে মাখবার কথা নয়।

পরনে শিলওয়ার, কুর্তা আর ওয়াসকিট। ঠোট দুটি দেখতে পেলুম না। সেই যে প্রথম দিন ঘরে ঢুকে কার্পেটের দিকে নজর রেখে দাঁড়িয়েছিল, শেষ দিন পর্যন্ত ঐ কার্পেটের অপরূপ রূপ থেকে তাকে বড় একটা চোখ ফেরাতে দেখিনি। ও গুরুজনদের দিকে তাকাতে নেই, আফগানিস্থানেও নাকি এই ধরনের একটা সংস্কার আছে।

তবে তার নয়নের ভাবের খেলা গােপনে দেখেছি। দুটো চিনেমাটির ডাবরে যেন দুটো পান্তুয়া ভেসে উঠেছে।

জরিপ করে ভরসা পেলুম, ভয়ও হলাে।

এ লােকটা ভীমসেনের মত রান্না তাে করবেই, বিপদে আপদে ভীমসেনেরই মত আমার মুশকিল-আসান হয়ে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন, এ যদি কোনােদিন বিগড়ে যায়? তবে? কোনাে একটা হদিসের সন্ধানে মগজ আঁতিপাতি করে খুঁজতে আরম্ভ করলুম। রহমানকে জিজ্ঞেস করলুম,

‘পূর্বে কোথায় কাজ করেছ?
উত্তর দিল, কোথাও না, পল্টনে ছিলুম, মেসের চার্জে। এক মাস হলাে খালাস পেয়েছি।
রাইফেল চালাতে পার?
একগাল হাসল।
‘কি কি রাঁধতে জানাে?
‘পােলাও, কুর্মা, কাবাব, ফালুদা-।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, ফালুদা বানাতে বরফ লাগে।
এখানে বরফ তৈরি করার কল আছে? ‘কিসের কল?
আমি বললুম, তাহলে বরফ আসে কোত্থেকে?

বলল, “কেন, ঐ পাগমানের পাহাড় থেকে। বলে জানলা দিয়ে পাহাড়ের বরফ দেখিয়ে দিল। তাকিয়ে দেখলুম, যদিও গ্রীষ্মকাল, তবু সবচেয়ে উঁচু নীল পাহাড়ের গায়ে সাদা সাদা বরফ দেখা যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে বললুম, বরফ আনতে ঐ উঁচুতে চড়তে হয়?

বলল, না সায়েব, এর অনেক নিচে বড় বড় গর্তে শীতকালে বরফ ভর্তি করে রাখা হয়। এখন তাই খুঁড়ে তুলে গাধা বােঝাই করে নিয়ে আসা হয়।’ বুঝলুম, খবরটবরও রাখে। বললুম, তা আমার হাঁড়িকুড়ি, বাসনকোসন তাে কিছু নেই। বাজার থেকে সব কিছু কিনে নিয়ে এসাে। রাত্তিরের রান্না আজ আর বােধ হয় হয়ে উঠবে না। কাল দুপুরে রান্না কোরাে। সকালবেলা চা দিয়াে।

টাকা নিয়ে চলে গেল।

বেলা থাকতেই কাবুল রওনা দিলুম। আড়াই মাইল রাস্তা- মৃদুমধুর ঠাণ্ডায় গড়িয়ে গড়িয়ে পৌছব । পথে দেখি এক পবর্তপ্রমাণ বােঝা নিয়ে আবদুর রহমান ফিরে আসছে। জিজ্ঞেস করলুম, এত বােঝা বইবার কি দরকার ছিল- একটা মুটে ভাড়া করলেই তাে হত।

যা বলল, তার অর্থ এই, সে যে-মােট বইতে পারে না, সে-মােট কাবুলে বইতে যাবে কে?
আমি বললুম, দুজনে ভাগাভাগি করে নিয়ে আসতে।
ভাব দেখে বুঝলুম, অতটা তার মাথায় খেলেনি, অথবা ভাববার প্রয়ােজনবােধ করেনি।

বােঝাটা নিয়ে আসছিল জালের প্রকাণ্ড থলেতে করে। তার ভিতর তেল-নুন-লকড়ি সবই দেখতে পেলুম। আমি ফের চলতে আরম্ভ করলে বলল, ‘সায়েব রাত্রে বাড়িতেই খাবেন। খুব বেশি দূর যেতে হলাে না। লব-ই-দরিয়া অর্থাৎ কাবুল নদীর পারে পৌছতে না পৌছতেই দেখি মসিয়ে জিরার টাঙা হাঁকিয়ে টগবগবগ করে বাড়ি ফিরছেন।

কলেজের বড়কর্তা বা বস্ হিসাবে আমাকে তিনি বেশ দু-এক প্রস্থ ধমক দিয়ে বললেন, কাবুল শহরে নিশাচর হতে হলে যে তাগদ ও হাতিয়ারের প্রয়ােজন, সে দুটোর একটাও তােমার নেই।

বসকে খুশী করবার জন্য যার ঘটে ফন্দি-ফিকিরের অভাব, তার পক্ষে কোম্পানির কাজ হচ্ছে তর্ক না করা। বিশেষ করে যখন বসের উত্তমার্ধ তারই পাশে বসে ‘উই, সার্তেনম, এভিদার্মা, অর্থাৎ অতি অবশ্য, সার্টেনলি, এভিডেন্টলি”, বলে তাঁর কথায় সায় দেন। ইংলন্ডে মাত্র একবার ভিক্টোরিয়া আলবার্ট আঁতাৎ হয়েছিল; শুনতে পাই ফ্রান্সে নাকি নিত্যি-নিত্যি, ঘরে ঘরে।

বাড়ি ফিরে এসে বসবার ঘরে ঢুকতেই আবদুর রহমান একটা দর্শন দিয়ে গেল এবং আমি যে তার তষীতেই ফিরে এসেছি, সে সম্বন্ধে আশ্বস্ত হয়ে হুট করে বেরিয়ে গেল।

তখন রােজার মাস নয়, তবু আন্দাজ করলুম সেহরির সময় অর্থাৎ রাত দুটোয় খাবার জুটলে জুটতেও পারে।

তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল। শব্দ শুনে ঘুম ভাঙল। দেখি আবদুর রহমান মােগল তসবিরের গাডু-বদনার সমন্বয় আফতাবে বা ধারাযন্ত্র নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। মুখ ধুতে গিয়ে বুঝলুম, যদিও গ্রীষ্মকাল, তবু কাবুল নদীর বরফ-গলা জলে কিছুদিন ধরে আমার মুখও আফগানিস্থানের রিলিফ ম্যাপের উঁচুনিচুর টক্করের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারবে।

খানা টেবিলের সামনে গিয়ে যা দেখলুম, তাতে আমার মনে আর কোনাে সন্দেহ রইল না যে, আমার ভৃত্য আগা আবদুর রহমান এককালে মেসের চার্জে ছিলেন।

ডাবর নয়, ছােটখাটো একটা গামলাভর্তি মাংসের কোরমা বা পেঁয়াজ-ঘিয়ের ঘন ক্বাথে সেরখানেক দুম্বার মাংস- তার মাঝে মাঝে কিছু বাদাম কিসমিস লুকোচুরি খেলছে, এক কোণে একটি আলু অপাংক্তেয় হওয়ার দুঃখে ডুবে মরার চেষ্টা করছে। আরেক প্লেটে গােটা আষ্টেক ফুল বােম্বাই সাইজের শামী-কাবাব। বারকোশ থালায় এক ঝুড়ি কোফতা-পােলাও আর তার ওপরে বসে আছে একটি আস্ত মুর্গি-রােস্ট।

আমাকে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবদুর রহমান তাড়াতাড়ি এগিয়ে অভয়বাণী দিল- রান্নাঘরে আরাে আছে।

একজনের রান্না না করে কেউ যদি তিনজনের রান্না করে, তবে তাকে ধমক দেওয়া যায়, কিন্তু সে যদি ছ’জনের রান্না পরিবেশন করে বলে রান্নাঘরে আরাে আছে তখন আর কি করার থাকে? অল্প শােকে কাতর, অধিক শােকে পাথর।

রান্না ভালাে, আমার ক্ষুধাও ছিল, কাজেই গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে কিছু কম খাইনি। তার ওপর অদ্য। রজনী প্রথম রজনী এবং আবদুর রহমানও ডাক্তারি কলেজের ছাত্র যে রকম তন্ময় হয়ে মড়া কাটা দেখে, এ সেই রকম আমার খাওয়ার রকম-বহর দুই-ই-তার ডাবর-চোখ ভরে দেখে নিচ্ছিল।

আমি বললুম, ব্যস! উৎকৃষ্ট বেঁধেছ আবদুর রহমান।

আবদুর রহমান অন্তর্ধান। ফিরে এল হাতে এক থালা ফালুদা নিয়ে। আমি সবিনয় জানালুম যে, আমি মিষ্টি পছন্দ করি না।

আবদুর রহমান পুনরপি অন্তর্ধান। আবার ফিরে এল এক ডাবর নিয়ে পেঁজা বরফের গুঁড়ােয় ভর্তি। আমি বােকা বনে জিজ্ঞাসা করলুম, এ আবার কি?

আবদুর রহমান উপরের বরফ সরিয়ে দেখাল নিচে আঙুর। মুখে বলল, বাগেবালার বরফি আঙুর তামাম আফগানিস্থানে মশহুর।বলেই একখানা সসারে কিছু বরফ আর গােটা কয়েক আঙুর নিয়ে বসল। আমি আঙুর খাচ্ছি, ও ততক্ষণ এক-একটা করে হাতে নিয়ে সেই বরফের টুকরােয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অতি সন্তর্পণে ঘষে-মেয়েরা যে রকম আচারের জন্য কাগজি নেবু পাথরের শিলে ঘষেন। বুঝলুম, বরফ চাকা থাকা সত্ত্বেও আঙুর যথেষ্ট হিম হয়নি বলে এই মােলয়েম কায়দা। ওদিকে তালু আর জিবের মাঝখানে একটা আঙুরে চাপ দিতেই আমার ব্রহ্মর পর্যন্ত ঝিনঝিন করে উঠছে। কিন্তু পাছে আবদুর রহমান ভাবে তার মনিব নিতান্ত জংলি ভাই খাইবারপাসের হিম্মৎ বুকে সঞ্চয় করে গােটা আষ্টেক গিললুম। কিন্তু বেশিক্ষণ চালাতে পারলুম না; ক্ষান্ত দিয়ে বললুম, যথেষ্ট হয়েছে আবদুর রহমান, এবারে তুমি গিয়ে ভালাে করে খাও।

কার গােয়াল, কে দেয় ধুয়াে। এবারে আবদুর রহমান এলেন চায়ের সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে। কাবুলি সবুজ চা। পেয়ালায় ঢাললে অতি ফিকে হলদে রঙ দেখা যায়। সে চায়ে দুধ দেওয়া হয় না। প্রথম পেয়ালায় চিনি দেওয়া হয়, দ্বিতীয় পেয়ালায় তাও না। তারপর ঐ রকম, তৃতীয়, চতুর্থ কাবুলিরা পেয়ালা ছয়েক খায়, অবশ্যি পেয়ালা সাইজে খুব ছােট, কফির পাত্রের মত।

চা খাওয়া শেষ হলে আবদুর রহমান দশ মিনিটের জন্য বেরিয়ে গেল। ভাবলুম এই বেলা দরজা বন্ধ করে দি, না হলে আবার হয়ত কিছু একটা নিয়ে আসবে। আস্ত উটের রােস্টটা হয়ত দিতে ভুলে গিয়েছে।

ততক্ষণে আবদুর রহমান পুনরায় হাজির। এবার এক হাতে থলে-ভর্তি বাদাম আর আখরােট, অন্য হাতে হাতুড়ি। ধীরে সুস্থে ঘরের এককোণে মুড়ে বসে বাদাম আখরােটের খােসা ছাড়াতে লাগল। এক মুঠো আমার কাছে নিয়ে এসে দাঁড়াল।
মাথা নিচু করে বলল,
আমার রান্না হুজুরের পছন্দ হয়নি।
‘কে বলল, পছন্দ হয়নি?

তবে ভালাে করে খেলেন না কেন? আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, কী আশ্চর্য, তােমার পুটার সঙ্গে আমার তনুটা মিলিয়ে দেখে দিকিনি তার থেকে আন্দাজ করতে পারাে না, আমার পক্ষে কি পরিমাণ খাওয়া সম্ভবপর? ও আবদুর রহমান তর্কাতর্কি না করে ফের সেই কোণে গিয়ে আখরােট বাদামের খােসা ছাড়াতে লাগল।

তারপর আপন মনে বলল, কাবুলের আবহাওয়া বড়ই খারাপ। পানি তাে পানি নয়, সে যেন গালানাে পাথর। পেটে গিয়ে এক কোণে যদি বসল তবে ভরসা হয় না আর কোনাে দিন বেরুবে। কাবুলের হাওয়া তাে হাওয়া নয়- আতসবাজির হল্কা। মানুষের ক্ষিদে হবেই বা কি করে।

আমার দিকে না তাকিয়েই তারপর জিজ্ঞেস করল, হুজুর কখনাে পানশির গিয়েছেন?
‘সে আবার কোথায় ?
‘উত্তর-আফগানিস্থান। আমার দেশ- সে কী জায়গা। একটা আস্ত দুম্বা খেয়ে এক ঢােক পানি খান, আবার ক্ষিদে পাবে। আকাশের দিকে মুখ করে একটা লম্বা দম নিন, মনে হবে তাজি ঘােড়ার সঙ্গে বাজি রেখে ছুটতে পারি। পানশিরের মানুষ তাে পায়ে হেঁটে চলে না, বাতাসের উপর ভর করে যেন উড়ে চলে যায়।

শীতকালে সে কী বরফ পড়ে! মাঠ পথ পাহাড় নদী গাছপালা সব ঢাকা পড়ে যায়, ক্ষেত খামারের কাজ বন্ধ, বরফের তলায় রাস্তা চাপা পড়ে গেছে। কোনাে কাজ নেই, কর্ম নেই, বাড়ি থেকে বেরনাের কথাই ওঠে না। আহা সে কি আরাম। লােহার বারকোশে আঙার জ্বালিয়ে তার উপর ছাই ঢাকা দিয়ে কম্বলের তলায় চাপা দিয়ে বসবেন গিয়ে জানালার ধারে। বাইরে দেখবেন বরফ পড়ছে, বরফ পড়ছে পড়ছে, পড়ছে- দু দিন, তিন দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন ধরে। আপনি বসেই আছেন, আর দেখছেন চে তৌর বর্ষ বরদ- কি রকম বরফ পড়ে।

আমি বললুম, ‘সাত দিন ধরে জানালার কাছে বসে থাকব ?

আবদুর রহমান আমার দিকে এমন করুণভাবে তাকালাে যে, মনে হলাে এ রকম বেরসিকের পাল্লায় সে জীবনে আর কখনাে এতটা অপদস্থ হয়নি। ম্লান হেসে বলল, ‘একবার আসুন, জানালার পাশে বসুন, দেখুন। পছন্দ না হয়, আবদুর রহমানের গর্দান তাে রয়েছে।

খেই তুলে নিয়ে বলল, “সে কত রকমের বরফ পড়ে। কখনাে সােজা, ভেঁড়া হেঁড়া পেঁজা তুলাের মতাে, তারি ফাকে ফাকে আসমান জমিন কিছু কিছু দেখা যায়। কখনাে ঘুরঘট্টি ঘন,- চাদরের মতাে নেবে এসে চোখের সামনে পর্দা টেনে দেয়। কখনাে বয় জোর বাতাস, প্রচণ্ড ঝড়। বরফের পাঁজে যেন সে-বাতাস ডাল গলাবার চর্কি চালিয়ে দিয়েছে। বরফের গুড়াে ডাইনে বায়ে উপর নিচে এলােপাথাড়ি ছুটোছুটি লাগায়- হু হু করে কখনাে একমুখে হয়ে তাজি ঘােড়াকে হার মানিয়ে ছুটে চলে। কখনাে সব ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু শুনতে পাবেন সে-ও-ওঁ- তার সঙ্গে আবার মাঝে মাঝে যেন দারুল আমানের ইঞ্জিনের শিটির শব্দ। সেই ঝড়ে ধরা পড়লে রক্ষে নেই, কোথা থেকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে, না হয় বেহুশ হয়ে পড়ে যাবেন বরফের বিছানায়, তারই উপর জমে উঠবে ছ হাত উচু বরফের কম্বল– গাদা গাদা, পাজা পাঁজা। কিন্তু তখন সে বরফের পাজা সত্যিকার কম্বলের মতাে ওম দেয়। তার তলায় মানুষকে দু দিন পরেও জ্যান্ত পাওয়া গিয়েছে।

একদিন সকালে ঘুম ভাঙলে দেখবেন বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সূর্য উঠেছে- সাদা বরফের উপর সে রােশনির দিকে চোখ মেলে তাকানাে যায় না। কাবুলের বাজারে কালাে চশমা পাওয়া যায়, তাই পরে তখন বেড়াতে বেরােবেন। যে হাওয়া দম নিয়ে বুকে ভরবেন তাতে একরত্তি ধুলাে নেই, বালু নেই, ময়লা নেই ছুরির মতাে ধারালাে ঠাণ্ডা হাওয়া নাক মগজ গলা বুক চিরে ঢুকবে, আবার বেরিয়ে আসবে ভিতরকার সব ময়লা ঝেটিয়ে নিয়ে। দম নেবেন, ছাতি এক বিঘৎ ফুলে উঠবে দম ফেলবেন এক বিঘৎ নেমে যাবে। এক এক দম নেওয়াতে এক এক বছর আয়ু বাড়বে- এক একবার দম ফেলাতে একশটা বেমারি বেরিয়ে যাবে।

‘তখন ফিরে এসে, হুজুর একটা আস্ত দুম্বা যদি না খেতে পারেন, তবে আমি আমার গোঁফ কামিয়ে ফেলব। আজ যা রান্না করেছিলুম তার ডবল দিলেও আপনি ক্ষিদের চোটে আমায় কতল করবেন। আমি বললুম, হ্যা আবদুর রহমান তােমার কথাই সই। শীতকালটা আমি পানশিরেই কাটাব।

আবদুর রহমান গদগদ হয়ে বলল,
“সে বড় খুশি বাৎ হবে হুজুর।
আমি বললুম,
“তােমার খুশির জন্য নয়, আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য।’
আবদুর রহমান ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকালাে।
আমি বুঝিয়ে বললুম,
তুমি যদি সমস্ত শীতকালটা জানালার পাশে বসে কাটাও তবে আমার রান্না করবে কে?’

শব্দার্থ ও টীকা : ও রভােয়া — ফরাসি ভাষার বাক্যবন্ধ। অর্থ : আবার দেখা হবে। নরদান — মানুষের মতাে দেখতে ভয়ঙ্কর জন্তু। এখানে বিশালদেহী মানুষ বােঝানাে হয়েছে। আদরার্থে। মতমান কলা – মায়ানমারের মার্তাবান দ্বীপে উৎপন্ন কলার জাত। অঞ্জ – গাল রাঙানাের প্রসাধনী। পান্তুয়া – চিনির রসে ভেজানাে ঘিয়ে ভাজা রসগােল্লা জাতীয় মিষ্টি। তাগদ – শক্তি। তন্বী – তিরস্কার। বারকোশ – কাঠের তৈরি কানা উঁচু বড় থালা। পুনরপি – পুনরায়। ব্ৰহ্মর – তালুর কেন্দ্রবর্তী ছিদ্র। বন্ধু – বড় দেহ। তনু – ক্ষীণ দেহ।

পাঠ-পরিচিতি : ‘প্রবাস বন্ধু’ সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থের পঞ্চদশ অংশ। প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের ভূমি, পরিবেশ; সেখানকার মানুষ ও তাদের সহজ-সরল জীবনাচরণ, বিচিত্র খাদ্য ইত্যাদি হাস্যরসাত্মকভাবে এই রচনায় ফুটিয়ে তােলা হয়েছে। লেখকের আফগানিস্তান ভ্রমণের আংশিক অভিজ্ঞতার পরিচয় আছে এখানে। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের সন্নিকটে খাজামমাল্লা নামক গ্রামে বাসের সময় আবদুর রহমান নামের একজন তার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। আফগান আবদুর রহমান চরিত্রের মধ্যে সরলতা, স্বদেশপ্রেম, অতিথিপরায়ণতা ফুটে উঠেছে। আবদুর রহমানের রান্না ও পরিবেশন করা খাবারের মধ্যে আফগানিস্তানের বিচিত্র ও সুস্বাদু খাদ্যবস্তুর পরিচয় পাওয়া যায়। আফগানিস্তানের প্রস্তরভূমি এবং একই সঙ্গে নিকট-প্রতিবেশী এই জনপদের বরফ শীতল জলবায়ু আকর্ষণীয়। আবদুর রহমানের সরল আতিথেয়তায় কখনাে লেখকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেও শেষ অবধি সৈয়দ মুজতবা আলী একে গ্রহণ করেছেন শ্রদ্ধার সঙ্গে।

লেখক পরিচিতি : সৈয়দ মুজতবা আলী ১৩ই সেপ্টেম্বর ১৯০৪ সালে আসামের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সিকান্দর আলী। সৈয়দ মুজতবা আলীর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজারে। তিনি সিলেট গভর্মেন্ট হাইস্কুল ও শান্তিনিকেতনে পড়াশােনা করেন। পরে ১৯২৬ সালে বিশ্বভারতী থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। আফগানিস্তানে কাবুলের কৃষি বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৩২ সালে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি মিশরের আল আজাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মহীশূরের বরােদা কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যােগদান করেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখার অভিযােগে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়। ১৯৬১ সালে তিনি বিশ্বভারতীর রিডার নিযুক্ত হন। সৈয়দ মুজতবা আলী নিজস্ব এক গদ্যশৈলীর নির্মাতা। বিভিন্ন ভাষায় ব্যুৎপত্তি ও অসাধারণ পাণ্ডিত্যের সংমিশ্রণে তিনি যে গদ্য রচনা করেছেন, তা খুবই রসগ্রাহী হয়ে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযােগ্য রচনাগুলাে হলাে : দেশে-বিদেশে, পঞ্চতন্ত্র, চাচা কাহিনী, ময়ূরকণ্ঠী, শবনম ইত্যাদি। তিনি ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel