Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাপৃথিবী শস্যশালিনী - শৈবাল মিত্র

পৃথিবী শস্যশালিনী – শৈবাল মিত্র

পৃথিবী শস্যশালিনী – শৈবাল মিত্র

বিয়ের দুবছর পরেও তনিমার ছেলেপুলে না হতে বাড়ির মেয়েমহলে কানাকানি শুরু হল। আড়ালে আবডালে নানা কথা, আলোচনা চলতে থাকল। টুকরো কিছু কথা তনিমার কানেও এল। সন্তান না হবার জন্যে তনিমা জয়ন্তর মধ্যে কে দায়ী, এই হল আলোচনার বিষয়। বিরক্ত হলেও তনিমা মুখে কিছু বলল না। না শোনার ভান করে চুপ করে থাকল। কিন্তু চুপ থাকলেও যে রেহাই পাওয়া যায়, এমন কথা নেই। তনিমাও পেল না। প্রথমে, জয়ন্তর ঠাকুমা, সাতাত্তর বছরের ননীবালার প্রশ্নের মুখোমুখি হল তনিমা। ননীবালা প্রশ্ন করল, হারে দিদি, তোদের বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না কেন? তোর পরে উমার বিয়ে হল, তার কোলে এখন দু-মাসের ছেলে।

দীঘায় যাবার জন্যে তনিমা সুটকেস গোছাচ্ছিল। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছে জয়ন্ত। একটু আগে সে অফিস থেকে ফিরেছে রাত প্রায় আটটা। কাল সকাল সাতটায় দীঘার বাস। হেমন্তকালের সকাল সাতটা, ভোররাতের প্রায় গা ঘেঁসে থাকে। যেমন ফুস করে আসে, সেভাবে চোখের নিমেষে মিলিয়ে যায়। সকালে করার জন্যে কোনও কাজ ফেলে রাখা যায় না। দ্রুত হাতে নিমা তাই গোছগাছ সেরে নিচ্ছে। ননীবালার সঙ্গে সম্পর্কটা অঙ্গ হলেও প্রশ্ন শুনে লাল হল তনিমার মুখ। হতেই পারে। তনিমার বয়স চব্বিশ। কোন্ প্রশ্নে লজ্জা পেতে হয়, সে জানে। তার ছোটো বোন উমা, পরে বিয়ে হলেও যে মা হয়ে গেছে, একথা মিথ্যে নয়। আড়চোখে জয়ন্তকে একবার দেখে, দিদিশাশুড়ির পিঠে ছোট এক কিল মেরে তনিমা বলল, তোমার নাতিকে জিজ্ঞেস করো।

ননীবালা পুরনো আমলের মানুষ। তনিমার জবাবে খুশি হলো না। ননীবালা বলল, ওসব বললে তো চলবে না। সন্তানধারণ করবে তুমি। স্বামীকে দিয়ে কাজটা তোমাকেই হাসিল করে নিতে হবে। করতে না পারলে তোমারই দুর্নাম রটবে। পাঁচজনে ভাববে তুমি বাঁজা।

ননীবালার মন্তব্যে ক্ষুণ্ণ হলেও মুচকি হেসে তনিমা বলল, বংশ বাঁচাতে নাত্রি জন্যে পাত্রী দেখা শুরু করো।

তনিমার চিবুক ধরে ননীবালা ফিসফিস করে বলল, আমার নাতিটা বাঁজা হলে কি করবো?

শব্দ করে তনিমা হেসে উঠতে খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে জয়ন্ত বলল, হাসিঠাট্টার ভাগ কি আমি পেতে পারি?

তনিমা কিছু বলার আগে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ননীবালা বলল, স্বামী-স্ত্রী বেড়াতে যাচ্ছো, খুব ভালো কথা। যাও। বিয়ের পর থেকে গত দুবছরে এই নিয়ে তিন, চার বার হনিমুন হল। সমুদ্রে, পাহাড়ে, ভালো ভালো জায়গায় তোমরা হনিমুন করেছ, অথচ কোনও ফল নেই। পরেরবার যেন তিনজনকে বেড়াতে যেতে দেখি। ছদ্ম রাগে ঘর ছেড়ে গটগট করে ননীবালা বেরিয়ে যেতে লজ্জায় লাল হল তনিমার মুখ। ছোটো ননদ পুতুল কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তনিমা দেখেনি। চোখ তুলতে পুতুলকে নজর করল। মুখ টিপে পুতুল হাসছে। পুতুলের বয়স সতেরো, আঠারো। হাসার অধিকার তার আছে। এক লহমা তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে তনিমা সুটকেস ভরতে থাকল।

আমি কোনও সাহায্য করতে পারি?

পুতুলের প্রশ্নে স্মিত হেসে তনিমা বলল, বসো। দরকার হলেই বলব।

কারুকার্য করা মোজেকের মেঝেতে তনিমার পাশে পুতুল বসল।

এসব তিনদিন আগের ঘটনা। ইতিমধ্যে তনিমা, জয়ন্তর দুরাত দীঘা কেটে গেছে। আরও দুরাত তারা দীঘায় থাকবে। বিয়ের পর জয়ন্তর সঙ্গে তনিমা দ্বিতীয়বার দীঘায় এল। প্রথমবার ছিল দু-দিন। এবারে থাকছে চারদিন। পরশু রাতের বাসে কলকাতায় ফিরবে। কলকাতায় বাস পোঁছোবে পরের দিন ভোরে। দীঘা বেড়াতে চার দিন কম নয়। কিন্তু যে কারণে দীঘা এসেছিল, সেটা ঘটেনি, কারণটা এত গোপন, কাউকে বলা যায় না। বললেও সেটা হাস্যকর শোনাবে। হয়তো খানিকটা অশ্লীলও মনে হতে পারে। বিষয়টা স্বামী, স্ত্রীর একান্ত নিজেদের। তনিমা, জয়ন্তও তা জানে। আসার কারণটা তারা তাই কাউকে বলেনি। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একমাত্র বৃদ্ধা ননীবালা কারণটা ছুঁয়েছিল। ননীবালার কথায় লজ্জায় আরক্তিম হলেও তনিমা চমকে উঠেছিল। সাতাত্তর বছরের দিদিশাশুড়িকে তার মনে হয়েছিল অন্তর্যামী। তার সঙ্গে জয়ন্তর গোপন চুক্তি কিভাবে ননীবালা জানল, হদিশ করতে পারেনি।

ননীবালা আসলে আন্দাজেই কথাটা বলেছিল। জীবনের অন্তিম পর্বে নাতিপুতিতে অপুর সংসারটাকে নিজের চোখে দেখে যাবার আকাঙক্ষা সাতাত্তর বছরের বৃদ্ধার সম্ভবত প্রবল হয়েছিল। ননীবালার আকাঙক্ষার সঙ্গে গোপনে, অজ্ঞাতে তনিমার প্রত্যাশা কীভাবে মিশে গেল, কে বলতে পারে। ননীবালার কথা শুনে অবাক তনিমা স্মৃতিমগ্ন হয়েছিল।

বিয়ের পর বছর ঘুরতেই জয়ন্তর কাছে তনিমা আভাসে মা হবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। জয়ন্ত প্রথমে বুঝতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে তনিমার প্রত্যাশা হৃদয়ঙ্গম করে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল তার মুখ। স্থির চোখে জয়জ্ঞ দিকে তনিমা তাকিয়েছিল। স্বামীর মুখের অভিব্যক্তি দেখে অবাক হয়েছিল। প্রাণবস্তু, স্বাস্থ্যবান মানুষটি হঠাৎ কেন উদাসীন হয়ে গেল, অনুমান করতে চেয়েছিল। জয়ন্ত কী অসুস্থ বোধ করছে? তাকে আহত করার মতো কোনও শব্দ কি সে উচ্চারণ করে ফেলেছে? কিছুটা বিহ্বল হয়ে তনিমা প্রশ্ন করল, কি হল তোমার?

তনিমার প্রশ্নে জয়ন্ত বলেছিল, আরও বছরখানেক যেতে দাও।

তনিমা রাজি হয়েছিল। এমন একটা সাধারণ অনুরোধে রাজি না হবার কারণ ছিল। আনকোরা দাম্পত্যের মৌতাত জয়ন্তর মতো সে-ও উপভোগ করছিল। তার। উপভোগের তীব্রতা, আবেশ স্বামীর চেয়ে বেশি ছিল। তার ধারণা হয়েছিল, তৃতীয় এক অস্তিত্বকে সে সন্তান হলেও, এই মুহূর্তে যুগলজীবনের মাঝখানে জয়ন্ত আনতে চায় না। সাতাশ বছরে স্বামীর অতৃপ্ত বানার ইঙ্গিত বুঝতে তনিমার অসুবিধে হয়নি। আরও এক বছর যুগলে ঝাড়া হাত-পা থাকার জন্যে যা যা করা দরকার তনিমা করেছিল। কিন্তু দ্বতীয় বছর ফুরোবার আগেই তনিমা টের পেল, জয়জ্ঞ নিঃসন্তান থাকার ইচ্ছেটা, সে যা ভেবেছিল, ঠিক তত সহজ নয়। জয়ন্তকে বুঝতে তার ভুল হয়েছে। শুধু দায়হীন দাম্পত্য খ উপভোগ করার জন্যে জয়ন্ত নিঃসন্তান থাকতে চায় না। তার সন্তান না চাওয়ার কারণ আরও গভীর, জটিল। মুখে সেকথা না বললেও টুকরো টুকরো মন্তব্য, মতামতে, জয়ন্ত যা জানিয়েছে। তা হল, ছেলেপুলের দরকার কী? দুজনেই দিব্যি থাকা যায়!

হালকা চালে বলা জয়স্ত কথাগুলোকে তনিমা গোড়ায় গুরুত্ব দেয়নি। রসিকতা ভেবেছিল। স্বামীর কথায় সায় দিয়ে সে বলত, একদিক থেকে কথাটাই ঠিক। বাচ্চাকাচ্চার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে এখন আমরা যেমন মেজাজে আছি, প্রেম আর থাকা যাবে না।

কথাটা সেই মুহূর্তের জন্য সত্যি হলেও অন্যসময়ে তনিমা অনুভব করত, সে যা বলেছে, সঠিক নয়। শব্দহীন, নির্জন কোনও দুপুরে, বর্ষার নিঃশব্দ সন্ধ্যায়, হঠাৎ ভীষণ একা, নিঃসম্বল মনে হত। নিজর অপরিপূর্ণতা টের পেত। খেলো লাগত নিজেকে। জয়জ্ঞ ওর অভিমানে ছটফট করতে। তার অস্থিরতা টের পেয়েও জয়ন্ত কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সন্তানের প্রসঙ্গ উঠলেই ধামা চাপা দোর চেষ্টা করেছে। বিয়ের দ্বিতীয় বছর পেরোতেই ঠারেঠোরে না বলে ইচ্ছেটা তনিমা আবার সরাসরি জানিয়েছিল। মুহূর্তের জন্যে গম্ভীর হয়েছিল জয়ন্ত। থমথম করছিল তার মুখ। নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হেসে বলছিল, চলো দীঘা যাই।

কবে?

সামনে মাসের মাঝামাঝি, বুদ্ধজয়ন্তীর সঙ্গে দুদিন ছুটি আছে। আরও দু-দিন ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে নেব।

তারপর?

পৃথিবী শস্যসালিনী হবে।

আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠেছিল তনিমার মুখ। এক মুহূর্ত একটা হিসেব করে, জয় গলা জড়িয়ে ফিসফিশ করে বলেছিল, খুব ভালো সময়ে আমরা দীঘা যাব।

জয়ন্ত কথা বাড়ায়নি। এক বুক রোমাঞ্চ নিয়ে দীঘা ভ্রমণের দিন গুনেছে তনিমা। নিস্তব্ধ দুপুরে, জানালার বাইরে মেঘে ডাকা বর্ষার আকাশ, বৃষ্টি ভেজা কৃষ্ণচূড়া গাছের চিকন বুজ পাতার দিকে, খাটের ওপর বুকের নিচে বালিশ রেখে তাকিয়ে কতরকম পরিকল্পনা যে করেছে, তার হিসেব নেই। দীঘায় আসার পরে, গত দু-দিনে কিন্তু তার ব পরিকল্পনা ওলোটপালোট হয়ে গেছে। আজ তৃতীয় রাত। সমুদ্রমেখলা হোটেলের বারান্দায় তনিমা একা দাঁড়িয়ে আছে। যে আশা নিয়ে দীঘায় এসেছিল, তা প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছে। সারাদিন হাসি, আনন্দ,বেড়ানো, সমুদ্রমানে মেতে থাকলেও নিভৃত রাতে কলকাতার মতোই বিধিবদ্ধ দাম্পত্যজীবনে জয়ন্ত নিজেকে বেঁধে রেখেছে। প্রথমরাতে তনিমা বুঝতে পারেনি। জয়ন্ত যে প্রতিশ্রুতি ভাঙবে, কল্পনা করেনি। ঘটনাটা সে টের পেল শেষ মুহূর্তে। তখন তার কিছু করার ছিল না। ক্ষোভে, দুঃখে দু-চোখে জল এসে গিয়েছিল। অভিমানে সে মুখ ঘুরিয়ে শুতে জয়ন্ত বলেছিল, এত তাড়া কীসের? আরও তিন রাত তো থাকছি।

জয়ন্তর আচরণে, কথায় কোনও ত্রুটি ছিল না। ক্লান্তিতে বুজে আসছিল তনিমার চোখ। জয়র কণ্ঠস্বরের আন্তরিকতায় খানিকটা স্বাভাবিক হল সে। দেওয়ালের দিকে ফিরেই ভেজা গলায় প্রশ্ন করল, কেন তুমি এরকম করছ?

বাইরে সমুদ্রর অবিরাম গর্জন। খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে ছুটে আসছে নোনা বাতাস। পরের দিন বুদ্ধ পূর্ণিমা প্রাকপূর্ণিমার রাতেও আকাশে প্রায় থালার মতো গোল চাদ। জ্যোৎস্নায় ফিনিক ফুটছে। মিহি হলুদ ধোঁয়ার মতো চাদের আলো বিছানার ওপর লুটিয়ে ছিল। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল জয়ন্তকে। হলদেটে মোমের মূর্ত্তি মতো জয়র মুখ। কয়েক মুহূর্ত জয়জ্ঞ মুখের দিতে তনিমা তাকিয়ে থাকল। প্রশ্নের জবাব না পেয়ে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা করল, তা সাংঘাতিক।

তোমার কী কোন রোগ আছে?

প্রশ্ন শুনে আতশব্দ করে বিছানার প্রান্তে ছিটকে সরে গেল জয়ন্ত। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। বেঁকের মাথায় বোস প্রশ্নটা করেই তনিমা ভুল বুঝতে পেরেছিল। আফশোস হচ্ছিল তার। বিছানায় সে-ও উঠে বসল। জয়র কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, ভুল হয়ে গেছে, রাগ করো না।

চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে জয়ন্ত বলেছিল, খুব একটা ভুল তুমি বলোনি। বোধহয় সত্যিই আমার কোন কঠিন অসুখ করেছে।

কথাটা শুনে ধড়াস করে উঠলো তনিমার বুক। অসুখটা কী?

প্রশ্ন করে জয় দিকে সে তাকিয়ে থাকলো। জয়ন্ত নিস্তব্ধ। ঘরের ভেতরে চাঁদের আলো ঈষৎ ঘন হয়েছে মোমের ঢাকনা সরিয়ে স্পষ্ট হয়েছে জয়ন্দ্র তীক্ষ্ণ নাক, ছুঁচোলো চিবুক, মুখ। লম্বা, ঘন চুল এলোমেলো হয়ে মাথায় ছড়িয়ে আছে, মারাত্মক অসুখটার নাম, ভয়।

কীসের ভয়?

জন্ম দেওয়া, জন্মগ্রহণের ভয়।

কথাটা বুঝতে না পারলেও জয়ন্ত ভঙ্গিতে তনিমার গা ছমছম করছিল। বিছানায় জয়স্তর সামনে সরে বসলো সে। তার কাঁধে হাত রেখে জয়ন্ত প্রশ্ন করল, তোমার মা কেমন আছেন?

প্রশ্ন শুনে তনিমা চমকে গেল। মাঝরাতে সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের নিবিড় আবেষ্টনের মধ্যে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন সে আশা করেনি। তার মা কাবেরী বছর খানেক শয্যাশায়ী। কাবেরী পঞ্চাশ পেরোয়নি। কিছুদিন আগেও অসামান্য সুন্দরী ছিল। বস্ত্র দুই তিনের মধ্যে শরীরটা ভেঙে গেল। মেয়েলি রোগে কোমরের তলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পক্ষাঘাত ধরল। কুকুচে কালো পিঠছাপানো ঘন, লম্বা চুল শরে নুড়ির মতো সাদা হয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর বয়সেই তাকে দেখে সত্তরে বুড়ি মনে হয়। শয্যাশায়ী কাব্বেীর দিকে তাকাতে জয়ন্তর ভয় করে। পারতপক্ষে শাশুড়ির ঘরে সে ঢোকে না। কাবেরীর দিকে তাকালে তার মনে হয় ভবিষ্যরে তনিমাকে দেখছে। তার অজ্ঞাত্মা পর্যন্ত কুঁকড়ে যায়। তবু তনিমার চাপে অসুস্থ কাব্বেীর সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া ভদ্রতাও আছে। কাস্ত্রেীর জন্যে তনিমার মনোকষ্ট জয়ন্ত জানে। মায়ের দিকে তাকালে কষ্টে টনটন করে তার বুক। চোখে জল এসে যায়। ফুলের মতো ফুটফুটে দুবেণী বাঁধা কাবেরীর কুমারী জীবনের কিছু ছবি অ্যালবামে আছে। কাবেরী তখন কলেজের ছাত্রী। কলেজে পড়া মেয়েটি ধীরে ধীরে যুবতী, নারী, স্ত্রী, মা হবার প্রতিটি পর্যায়ে অ্যালবামে আবদ্ধ। আছে। মাত্র ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ বছরে শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল প্রাণোচ্ছল, তাজা একটা জীবন। ভাবলে নৈরাশ্যে তনিমার মাথা ঝিমঝিম করে। জীবনটা অর্থহীন মনে হয়। তবে মনের এই অবস্থা বেশিক্ষণ থাকে না। বিষাদ, দুঃখ, হতাশার চেয়ে বাস্তব জীবনের দাবি বড়ো হয়ে ওঠে। সেখানে শোক, সুখ, হতাশা, উদ্দীপনা পাশপাশি থাকে। শোক, দুঃখ ছিন্ন করে জেগে ওঠে সখ, সাধ, তৃপ্তি। পঙ্গু, অসুস্থ মাকে ছেড়ে তাই স্বামীর সঙ্গ সুখ উপভোগ করতে তনিমার অস্বস্তি হয় না। অনায়াসে সমুদ্রের ধারে প্রমোদভ্রমণে যেতে পারে।

জীবনের সুখী, অপ্রিয়, অন্ধকার দিকটা মাঝরাতে জয়ন্ত কেন স্মরণ করাচ্ছে তনিমা বুঝতে পারলো না, শব্দহীন তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বলল, শুধু তোমার মা কেন, আমার বাবার দিকে তাকিয়েও ভয়ে আমার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মনে মনে তার মৃত্য কামনা করলেও মুখে বলতে পারি না।

কথাটা শুনে শিউরে উঠল তনিমা। অপ্রকৃতিস্থ জীবনলালের মুখটা মনে পড়ল। জয় বাবা জীবনলাল ছিল নামকরা মুষ্টিযোদ্ধা। বউবাজার ক্লাবের পক্ষ থেকে পর দুবছর রাজ্যসেরা মুষ্টিযোদ্ধা হয়েছিল। দশাসই স্বাস্থ্য ছিল। সেতার বাজাত চমৎকার। বছর পাঁচ আগে অফিসের মধ্যে মাথার রক্তক্ষরণে বেহুশ হয়ে গেল। জ্ঞান যখন ফিরল, তখন উন্মাদ। পাগলামি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মাঝে মাঝে জীবনলালকে ঘরে তালা দিয়ে রাখতে হয়। তখন সে পোশাক পর্যন্ত পরে না। সংসারের ওপর অবাঞ্ছিত, গুরুভার পাহাড়ের মতো চেপে থাকা জীবনলালের হাত থেকে বাড়ির প্রায় সবাই মুক্তি পেতে চায়। ননীবালা একমাত্র জীবনলালের মৃত্যু কামনা করে না। নিজে যতোদিন বেঁচে আছে, রুগ্ন, পাগল সন্তানকে আগলে রাখতে চায়। জয়ন্ত জানে, মা-বেঁচে থাকলে স্বামীকে আগলে রাখত। জীবনলাল অসুস্থ হবার বছরখানেক আগেই মারা গিয়েছিল দ্বাণী। জীবনলালের স্ত্রী, জয়ন্ত, পুতুলের মা, দ্বাণীর মরার বয়স হয়নি। মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে তিদিনের জ্বরে পৃথিবী ছেড়ে বাণী চলে গেল। চাপা গলায় জয়ন্ত বলল, আমি জন্মাতে চাইনি। যারা আমাকে পৃথিবীতে এনেছে, তাদের দশা দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছি। আমারও তাই দশা হবে। এত কষ্টের মধ্যে আরও একজনকে কেন টেনে আব্ব? আমার মতো আর একজন হতভাগ্যের জন্মের জন্যে দায়ী হতে চাই না।

জয়ন্তর কথা শুনে তনিমা পাথর হয়ে গেছে। জয়ন্ত বলল, অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ো।

তনিমার ঘুম ছুটে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরে সে তাকাল। ফুটফুটে চাঁদের আলোয় পৃথিবী গলে গলে পড়ছে। সমুদ্র গর্জনের কামাই নেই। নোনা বাতাসে চটচটে, ভারী লাগছে শরীর। ক্লান্তি, অবসাদে তনিমা এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙলো জজয়স্তর ডাকে। চোখ কচলে তাকিয়ে দেখল তখনও সকাল হয়নি। পৃথিবীকে জড়িয়ে আছে আবছা অন্ধকার। জয়ন্ত বলল, চলো, সূর্যোদয় দেখি। দু-চোখে ঘুম লেপ্টে থাকলেও তনিমা উঠে বসলো। পাষাক বদলে দুজনে যখন হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ালো, তখনও দীঘা ঘুমোচ্ছে। রাস্তায় সামান্য কিছু মানুষ। সূর্যোদয় দেখতে তারাও সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তাদের মুখ-চোখে ৱিক্তির ছাপ, সূর্যোদয়। দেখে তাদের বিরক্তি কেটে গেলে সূর্যের সম্মান বাঁচবে। রাস্তা ছেড়ে জয়ন্ত, তনিমা। ঝাউবনের দিকে এগিয়ে গেল। ঝাউবন টপকে সমুদ্রের নির্জন তীর ধরে দক্ষিণ দিকে তারা হেঁটে যাচ্ছে। বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে কয়েকটা জেলে ডিঙি। দুটো ডিঙিতে আলকারা মাখানো হয়েছে। সমুদ্রের গর্জন বাতাসের বেগ ঈষৎ কমতে আঁশটে গন্ধ পেল তনিমা। বালিয়াড়ি ছেড়ে পিচের সরু পথ বাজারের দিকে চলে গেছে। পথের তলায়, সমুদ্র ঘেঁসে পাথরের বড়ো বড়ো বোল্ডার। কুচকুচে কালো রঙ। ঢেউয়ের ধাক্কায় কিছু পাথরের প্রান্ত যেমন ধারালো হয়েছে, তেমনি কিছু চৌকোনা পাথর মৃসণ, সমতল শয্যার মতো পড়ে আছে। মৃদু আলো ফুটলেও মেঘলা আকাশ। পুব আকাশ সামান্য লালচে হয়েছে। লালের আভার পাশেই দলা পাকিয়ে আছে ঘন কালো মেঘ। আকাশ এরকম থাকলে আজ হয়তো ভালো করে সূর্যোদয় দেখা হবে না। কয়েক পা এগোতে পাথরটার ওপরে প্রথমে জয়ন্তর চোখ পড়ল। সিঙ্গল বিছানার সাইজের একটা কালো পাথরের মাঝখানে উবুড় হয়ে আধশোয়া এক তরুণ। ভঁজ করা দু-হাতে মুখ গুঁজে আছে। কুণ্ডলী পাকানো শোয়ার ভঙ্গি। কালো পাথর ঘিরে ভেঙে পড়েছে ঢেউ। পাথরটার কোমর পর্যন্ত জলে, ফেনায় ভিজে যাচ্ছে। জল সরে যাবা পরও সাদা ফেনা জড়িয়ে থাকছে পাথরের কোমর। হালকা নীল প্যান্ট তিন রঙা চেক শার্ট পরা তরুণটির বয়স পঁচিশ, ছাব্বিশের বেশি নয়। দু-এক বছর বেশি হতে পারে। জয়জ্ঞ মনে হল ছেলেটা তার সমবয়সী। কিন্তু এই পাথরের ওর ছেলেটা কেন ঘুমোচ্ছে? এমন বিদঘুঁটে, বিপদজ্জনক খেয়াল কেন হল? ঘুমের মধ্যে পাথর থেকে পড়ে গেলে দিকচিহ্নহীন সমুদ্রে ভেসে যাবে। কাল রাতে এই পাথরের ওপর বসে পূর্ণ চাঁদ জ্যোৎস্নার মায়াতে ছেলেটা হয়তো বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তারপর কখন ঘুমে ডুবে গেছে, খেয়াল নেই। এখনও অসাড়ে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটাকে জাগিয়ে দিতে পাথরটার দিকে এক পা এগিয়ে জয়ন্ত নিজেইপাথর হয়ে গেল। ছেলেটা স্থির, নিস্পন্দ। তারমাথার পাশে একটা কৌটো। কৌটটা ভোলা। কৌটোর ঢাকনা পাশে রয়েছে। ছেলেটা যে বিষ খেয়েছে, মুহূর্তে জয়ন্ত জেনে গেল। কালো পাথরটার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়েছিল তনিমা। ব্যাপারটা সে-ও বুঝতে পেরে জয় হাত চেপে ধরেছিল।

.

সমুদ্র মেঘলা হোটেলের তিন তলায় যে ঘরে জয়ন্ত তনিমা দুরাত কাটিয়েছে, সেটা হোটেলের অন্যতম সেরা ঘর। সমুদ্রমুখী ঘর। সমুদ্রের দিকে সুন্দর ঝুলবারান্দা। আছে। বারান্দা ছোটো, কিন্তু চওড়া। তিনশো সাত নম্বর ঘরে এই বারান্দায় নোনা, গরম বাতাসের মওতায় ব্যতিব্যস্ত হতে হয় না। ঢেউয়ের গর্জনও ছন্দোময় জলস্রোতের মতো লাগে। আধ ঘন্টা হল বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে তনিমা। সিগারেট কিনতে বেরিয়েছে জয়ন্ত। হোটেলের কোনও কর্মীকে পাঠাতে পারত। তা না করে নিজে বেরিয়েছে। তনিমাকে সঙ্গে যাবার জন্যে ডেকেছিল। তনিমা যায়নি। কেন গেল না? কাল ভোরে সমুদ্রের ধারে পাথরের ওপর আত্মঘাতী সেই ছেলেটিকে দেখার পর থেকে জয়ন্ত গুম। হয়ে গেছে। সারাদিন বিশেষ কথা বলেনি। সমুদ্রে স্নান করতে ছেলেমানুষের মতো যার উৎসাহ, সে সমুদ্রে নামেনি। হোটেলের ঘরে দুপুর পর্যন্ত বোবার মতো বসেছিল। সন্ধের পর বেড়াতে বেরিয়েও সমুদ্রের দিকে যায়নি। সাইকেল রিকশা ভাড়া করে তনিমাকে নিয়ে কপালকুণ্ডলার মন্দিরে গিয়েছিল। ঈশ্বর, দেবদেবীতে জয়ন্তর বিশ্বাস নেই। স্ত্রীকে খুশি রাখতে, হয়তো বা সময় কাটাতে, সে মন্দিরে যাচ্ছে, তনিমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি। অল্পবয়সী, সুশ্রী মৃত তরুণটিকে দেখে তনিমাও প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়েছিল। তারও কথা বলার ইচ্ছে মরে গিয়েছিল। রিকশায় বসে জয়ন্ত প্রশ্ন করেছিল, ছেলেটা আত্মহত্যা করল কেন? আমার মতো কোনও অসুখ বোধহয় ওর হয়েছিল।

কী বলছো তুমি?

জন্মগ্রহণ, জন্মদানের ভয়জনিত অসুখ। আবছা অন্ধকার, নির্জন রাস্তায় জয়ন্তর কাঁধে মুখ রেখে তনিমা ডুকরে উঠেছিল, চুপ করো, তুমি চুপ করো। তোমরা কোন অসুখ। নেই। ফাঁকা রাস্তায় তনিমার কান্নাভেজা গলা শুনে রিকশাচালক নিমেষের জন্যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল। জয়ন্ত আর কথা বলেনি। হোটেলে ফিরেও জয়দ্র আচ্ছন্নতা কাটেনি। হয়ত ইচ্ছে করেই আচ্ছন্নতার মধ্যে সে থাকতে চেয়েছিল। আরও একটা রাত নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে, অনুমান করেও তনিমা চুপ করে থেকেছে। আসলে ভেতর থেকে সে-ও কোনও তাগিদ বোধ করছিল না। অন্ধকার ঘরে ধবধবে সাদা চাদর পাতা নরম বিছনায়া পাশাপাশি পুতুলের মতো দু-জন শুয়েছিল। কিছুক্ষণ উসখুস করে তনিমা ঘুমিয়ে পড়েছিল। জয়ন্তর আগেই ঘুমে ডুবে গিয়েছিল সে। জ্যোৎস্নায় তখন অসাড় হয়েছিল বুদ্ধপূর্ণিমার রাত।

জয় দেরিতে উতলা হলেও বারান্দা ছেড়ে তনিমা নড়ল না। গতকালের বিষণ্ণতা, অবসাদ আজ কেটে গেছে। পরমাত্মীয়র বিয়োগে যেখানে শোক সন্তাপের আয়ু সাত, দশদিনের বেশি হয় না, সেখানে অচেনা একাট ছেলের মৃত্যুতে বিশ, বাইশ ঘণ্টা শোকার্ত থাকা কম কথা নয়। তনিমাও কাল গোটা দিন শোকাচ্ছন্ন ছিল আজ সকাল থেকে সে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। অস্থির প্রত্যাশায় ছটফট করছে। দীঘার মাত্র দুরাত অবশিষ্ট আছে। হিসেব মতো এ দুটো রাত নিদারুণ ফলপ্রসু। এই দুরাতের মধ্যে ফয়সালা না করলে মাতৃত্বের জন্যে তার আকাঙক্ষা হয়তো এ জীবনের মতো খারিজ হয়ে যাবে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে সে তাই রাতের জন্যে প্রতীক্ষা করছে। সরাসরি, গোপনে বারবার জয়ন্তকে দেখে তার মনের হদিশ পেতে চেয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টায় জয়ন্তও অনেক স্বাভাবিক হয়েছে। বিবর্ণ মুখে শুরু হয়েছে রক্ত চলাচল। অল্পস্বল্প ঠাট্টাইয়ার্কিও করেছে। সবচেয়ে বড়োকথা দুপুরে দেড়, দু-ঘণ্টা সমুদ্রে থেকেছে। মাতামাতি করে স্নান করেছে।

বারান্দায় রেলিং-এ ভর দিয়ে তনিমা আকাশের দিকে তাকালো। সন্ধের শুরুতেই প্রায় মাঝসমুদ্র থেকে ভেসে উঠেছিল বিশাল উঁদ। চাঁদ এখন আকাশের চুড়োয়। সমুদ্রের জলে, ছোটো বড়ো ঢেউয়ের মাথায় গুঁড়োগুড়ো হয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো। নির্জন বালিয়াড়ি। ঝাউবনে বাতাস বইছে। ঝাউবনের গা ঘেঁসে শহরের রাস্তা। রাস্তার ধারে অনেক নতুন বাড়ি হয়েছে একাধিক হোটেলও আছে। সিগারেটের দোকান দুরে নয়। এতক্ষণে জয়ন্ত্র ফিরে আসা উচিত ছিল। তনিমার অশান্তি হচ্ছে। আরও পাঁচ, সাত মিনিট পরে বাজারের দিক থেকে জয়ন্তকে আসতে দেখল তনিমা। সিগারেট টানতে টানতে দুলকি চালে হেঁটে আসছে। কোনও ব্যস্ততা নেই। হোটেলে আধ ঘণ্টার বেশি তনিমা একা রয়েছে, সে যেন ভুলে গেছে। তনিমা একটু ক্ষুণ্ণ হল। হোটেলে ঢোকার আগে। বারান্দার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ল জয়ন্ত। হাতছানি দিয়ে তাকে আসতে বলল তনিমা।

ডাক্তার পরিতোষ গুপ্তের ছেলে সায়ন্তনের ডাক নাম সানু। বাইশ তেইশ বছর বয়স। সুঠাম শরীর, ফর্সা রঙ, কাটাকাটা তীক্ষ্ণ নাক, চোখ সত্যিকার রূপবান যুবক। পরিতোষ ডাক্তার তনিমাদের প্রতিবেশী। জয়ন্তদের গৃহ-চিকিৎসক। অসুস্থ জীবনলালের চিকিৎসা পরিতোষই করে। পরিতোষের একমাত্র ছেলে সানু। বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ে। তনিমাকে বৌদি বলে ডাকে। রাস্তায় দোকানে বাজারে দেখা হলে খাতির করে। দীঘার সমুদ্রতীরে হোটলের নিভৃত ঘরে এইরাতে হঠাৎ সানুর নাম জয়ন্ত কেন তুলল, তনিমা বুঝতে পারল না। জবাব শুনতে জয়ন্ত তাকিয়ে আছে দেখে তনিমা বলল, সানু খুব ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় ভালো, বিনয়ী। সানুর প্রশংসা করার জন্যে যথাযথ শব্দের জন্যে তনিমাকে হাতড়াতে দেখে জয়ন্ত বলল, সানু স্মাগলার। বিদেশের সঙ্গে চোরাই লেনদেনের কারবারে সে আড়কাঠি। ব্যারাকপুর, চন্দননগর, ডায়মণ্ডহারবারে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে যাবার কথা বাড়িতে বলে প্রায়ই সিঙ্গাপুর, হংকং যায়। দুর্ধর্ষ কিছু ক্রিমিনালের সঙ্গে তার যোগাযোগ।

কী বলছো?

দু-চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তনিমা আঁতকে উঠতে জয়ন্ত বলল, গত বছরে, দর্জিপাড়ায়, অন্তঃসত্ত্বা, অবিবাহিতা এক তরুণীকে খুনের ঘটনায় সানু জড়িত। স্বভাবে সে অপরাধী হয়ে গেছে।

জয়ন্তর কথা তনিমা অবিশ্বাস করতে পারছে না। অবিশ্বাসের কারণও নেই। জয়ন্ত আবার প্রশ্ন করল, মাধববাবুর মেয়ে কিঙ্কিণীকে চেন?

চিনি।

কতটা চেন?

ঠাণ্ডা, শান্ত স্বভাবের মেয়ে। দারুণ সুন্দরী, মহামায়া কলেজে পড়ে। খুব ভালো মেয়ে।

কীরকম?

অসুস্থ মায়ের যে শুশ্রূষা কিঙ্গিণী করে, তার তুলনা নেই।

কিঙ্গিণী যে দুপুরে ভাড়া খাটে, সে খবর কী জানো? মুখে অস্ফুট আওয়াজ করল তনিমা।

আমার বন্ধু ডাক্তার প্রবীর বোস, দুবার তার পেট সাফাই করেছে।

সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের হাঁকডাক তনিমার মগজের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। গলা শুকিয়ে গেছে তার। জয়ন্ত বলল, চারপাশে যত তরুণ, তরুণী দেখছো, সবাই দাগি হয়ে গেছে। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও বিষে দগদগ করছে তাদের শরীর। আঁস্তাকুড়ে, নর্দমায় ঘেয়ো কুকুরের মতো তার চরে বেড়াচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী বিলাস্বাবুর ছেলে ছিনতাই করার সময় ধরা পডে গণধোলাই-এ আধমরা হয়ে গিয়েছিল। এখন জেল খাটছে। মোহনবাবুর উনিশ বছরের মেয়ে, ভোজপুরের শ্রীধর গোয়ালার সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। লজ্জায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেন মোহনবাবুর স্ত্রী।

মুহূর্তের জন্যে থেমে স্থির চোখে তনিমার দিকে জয়ন্ত তাকিয়ে থাকল। পিঠের ওপর জ্যোৎস্না পড়ে তাকে ফঁপিয়ে তুলেছে। চলচ্চিত্রে আঁকা দশাসই পটের মতো দেখাচ্ছে তাকে। জয়ন্ত প্রশ্ন করল, আমাদের ছেলে অথবা মেয়ে হলে, সে কী করবে? কোন্ অন্ধকার, চোরা পথে সে হেঁটে যাবে?

প্রশ্ন শুনে গুড় গুড় করছে তনিমার বুক। কোনওমতে সে বলল, সুস্থ সুন্দর জীবনও সে যাপন করতে পারে।

সম্ভব নয়। সে ভাবে বাঁচার একটা পথও খোলা নেই। জঘন্যতম অপরাধীরা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে। তাদের একজনকে কেন ঘরে আনতে চাও?

আতঙ্কে, কষ্টে ফেটে যাচ্ছে তনিমার বুক। সে নিশ্চপ। জয়ন্ত আবার বলল, একদিকে তোমার মা, আমার বাবার মতো অসুস্থ, পঙ্গু, অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মর্মন্তুদ দিনযাপন, অন্যদিকে বিষধর সাপের বাচ্চার মতো তরুণ প্রজন্ম। আমরা কোনদিকে যাব?

নিস্তব্ধ হোটেল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তনিমা হঠাৎ ডুকরে উঠল, আমার ভয় করছে। ভীষণ ভয়!

ভয় করারই কথা।

তুমি আমার পাশে এস।

তনিমার আর্ত ডাকে বিছানায় তার পাশে গিয়ে জয়ন্ত বসল। তনিমা ঠকঠক করে কাঁপছে। তার পিঠে জয়ন্ত হাত রাখলো। তনিমা প্রশ্ন করল, কেন আমাদের জন্ম, বেঁচে থাকা?

পৃথিবীকে নোংরা, দূষিত, নরক, করার জন্যে আমরা জন্মাই। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ তাই করছে, পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত করে যাবে।

দু-হাতে মুখ ঢেকে তনিমা ফুলে ফুলে কাঁদছে। পাথরে মূর্তির মতো জয়ন্ত বসে আছে। কয়েক মিনিট করে কান্নাভেজা গলায় তনিমা বলল, আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।

আমারও।

কথাটা বলে জয়ন্ত যোগ করল, অনেকদিন আগেই আমার বাঁচার ইচ্ছে শেষ হয়ে গেছে। একমুহূর্ত তনিমার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে জয়ন্ত একটা কৌটা বার করল। তনিমার নাকের কাছে কৌটোটা ধরে প্রশ্ন করল, চিনতে পার? আবছা আলোয় নিমেষহীন চোখে তিন, চার সেকেণ্ড কৌটাটা দেখে তনিমা শিউরে উঠল। কাল ভোরে সমুদ্রের ধারে, জলমগ্ন কালো পাথরের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ছেলেটার মাথার কাছে এই কৌটো সে দেখেছিল। ফিসফিস করে জয়ন্ত বলল, সিগারেট কিনতে গিয়ে পোকামারা বিষের এই কৌটোটাও কিনে ফেললাম। বিষ যা আছে, নির্ভেজাল হলে, আমাদের প্রয়োজন মিটে যাবে।

সাদা চাদর পাতা শ্রম বিছানা ঘিরে ঘন হয়েছে চাঁদের আলা। পরস্পরকে অনেকটা স্পষ্ট তারা দেখতে পাচ্ছে।

খাবে?

জয়ন্তর প্রশ্নে চমকে উঠে তারই শরীর ঘেঁসে নিবিড় হয়ে তনিমা বসল। জয়ন্তর হাতে বিষের কৌটো। সে বলল, অর্ধেক খেয়ে বাকিটা তোমাকে দিচ্ছি।

তার শরীরে সঙ্গে তনিমা লেপ্টে গেল। কৌটোর ঢাকা খুলে জয়ন্ত দেখল দ্বিতীয় একটা আবরণ রয়েছে। ছুরি দিয়ে সেটা কাটতে হবে। ট্রাউজার্সের পকেটে ছুরি আছে। ছুরিটা আনতে যাবার ইচ্ছে থাকলেও উঠতে পারল না। সে টের পেল তার সান্নিধ্যের তাপ তনিমার কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। বিষ খেতে তনিমা রাজি হবে না। বাস্তবিক তাই। জয়ন্তকে আঁকড়ে ধরতেই তনিমার দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। সমুদ্র গর্জনের ভেতরে সে শুনতে পেল, ছোটো বোন উমার দু-মাসের বাচ্চার হাসির আওয়াজ, সাতাত্তর বছরের ননীবালার স্নেহার কণ্ঠস্বর। জয়ন্তর হাত থেকে বিষের কৌটোটো নিয়ে সে বারান্দায় চলে গেল। শরীরের সব শক্তি জড়ো করে অন্ধকার ঝাউবনের দিকে কৌটোটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘরে ফিরে জয়জ্ঞ গলা দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, দীঘায় মাত্র আর দুরাত থাকছি। শস্যশালিনী হবার জন্যে পৃথিবী আর কত প্রতীক্ষা করবে!

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel