Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথানারী - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

নারী – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুজাতার সেই হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিটা আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। সেদিন সারাদুপুর প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল, আমি ভেবেছিলুম, সন্ধের আগে থামবে না, বাড়ি ফেরার ব্যাপারে খুব সমস্যা হবে। কিন্তু বিকেল চারটের মধ্যেই হঠাৎ সেই বৃষ্টি যেন উড়ে চলে গেল অন্য দেশে, দিব্যি ঝিকিমিকি রোদ উঠে গেল। জানলা দিয়ে দেখলুম, কলেজ স্ট্রিটে এক হাঁটু জল জমে গেছে।

রোদ্দুরের একটি শিখা এসে পড়েছে সুজাতার মুখে। আমি তাকে বললুম, তোমার চেয়ারটা একটু এদিকে সরিয়ে আনন।

চেয়ার না সরিয়ে সুজাতা উঠে দাঁড়াল। তারপর ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলল, আমি এবার বাড়ি যাব।

আমি রীতিমতন অবাক হয়ে বললুম, এখন বাড়ি যাবে কী করে? বসো, আমি তোমায় পৌঁছে দেব।

সুজাতা মৃদু গলায় বলল, না, আমি একাই যেতে পারব!

কোনও মানুষ যদি হঠাৎ কখনও তার স্বভাবের সম্পূর্ণ উলটো ধরনের ব্যবহার করে, তা হলে তাকে বলার মতন কোনও কথা চট করে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সুজাতার পরিচ্ছন্নতার বাতিক। একদিন তার চটিতে কুকুরের অ্যা লেগে গিয়েছিল বলে সে। চটিটাই ফেলে দিয়েছিল, সেই চটি আবার ধুয়ে ব্যবহার করার কথা যেন সে চিন্তাই করতে পারে না। সে এরকম নোংরা জল কাদার মধ্য দিয়ে হাঁটবে? গত বছর এইরকম একটি দিনে সে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল, জল কমে যাওয়ার জন্য।

তা ছাড়া হঠাৎ তার কী হল, সে একা চলে-চলে যেতে চাইছে কেন?

সুজাতা নামতে লাগল কফি হাউসের সিঁড়ি দিয়ে। আমি তার পেছন-পেছন এসে বললুম, এই, তোমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল নাকি?

সুজাতা কোনও উত্তর দিল না।

জলের মধ্যে অবলীলাক্রমে পা দিয়ে সে এগিয়ে গেল ট্রাম লাইনের দিকে। আমি তখনও কিছুই বুঝতে পারছি না। সুজাতার সঙ্গে আমার রাগারাগি হয়নি। একটাও কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয়নি। শুধু শেষ পাঁচমিনিট আমরা দুজনেই চুপ করেছিলুম। এমন তো প্রায়ই হয়, কথা থেমে যায়, কিন্তু চিন্তার তরঙ্গ পরস্পরকে ছোঁয়।

আমি সুজাতার হাত ধরে বললুম, কী পাগলামি করছ? তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে আনছি!

সুজাতা হাতটা ছাড়িয়ে নিল, শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, আমি একলা যাব, তুমি আমার সঙ্গে এসোনা!

সুজাতার রাগ আমি চিনি। অভিমানও চিনি। আমি আবার সুজাতার হাত ধরতে যেতেই সে মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে স্থিরভাবে তাকাল। সেই মুখ আমার সম্পূর্ণ অচেনা। এই সুজাতা আমার সঙ্গে যাবে না। আমার সঙ্গে সে কথা কাটাকাটিও করবে না, সে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

ট্রাম বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে হাঁটতে লাগল সুজাতা। একটা চাঁপাফুল রঙের। শাড়ি পরা, মাথার খোঁপাটা একটুখানি ভেঙে গেছে। কাপড় বাঁচাবার একটু চেষ্টা করছে না সে। পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে জল ছিটিয়ে, সেদিকেও তার একটুও হৃক্ষেপ নেই। সুজাতার সেই কথার মধ্যে একটা তীব্র আঘাত ছিল। কোনওদিন সে আমার সঙ্গে ওই সুরে কথা বলেনি। তা ছাড়া কেনই বা সে হঠাৎ এমনভাবে আমাকে প্রত্যাখ্যান করবে? আমি কী ভুল বলেছি, কী দোষ করেছি?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম।

বৃষ্টি থামার পর অনেক লোকই একসঙ্গে রাস্তায় নেমে এসেছে। চতুর্দিকে নানা রকম গাড়ির হর্ন। কিন্তু আমি যেন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছে, সমস্ত রাস্তাটা শূন্য। সেখানে শুধু রয়েছে একমাত্র সুজাতা। কোনওদিন সে রাস্তার জলকাদায় নামেনি, আজ সে হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি ভিজিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সে একবারও তাকাচ্ছে না পেছন ফিরে। যেন আমার আর কোনও অস্তিত্বই নেই তার কাছে।

মোড়ের মাথায় পৌঁছবার আগেই একটা সাদা রঙের গাড়ি থামল তার পাশে। দরজাটা খুলে গেল, কে যেন ডাকল তাকে। সামান্য একটু দ্বিধা করে সুজাতা উঠে পড়ল সেই গাড়িতে, এবারেও সে তাকাল না আমার দিকে। আমার মনে হল, ওই গাড়িটা যেন সুজাতাকে গ্রাস করে নিরুদ্দেশে নিয়ে চলে গেল!

দুই

সুজাতাকে আমি অল্প বয়েসে দেখেছি। কিন্তু তাকে আমি অল্প বয়েস থেকে চিনি না। তখন আমার বয়েস ছিল চোদ্দো কি পনেরো হবে, বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে গিয়েছিলুম আগ্রায়। টুন্ডলা জংশনে আমার মেজোমামা স্টেশন মাস্টার ছিলেন, তিনি আমাদের নেমন্তন্ন করেছিলেন।

তখন আমার সদ্য গলা ভাঙছে, হাফপ্যান্ট পরলে পা দুটো বড্ড লম্বা-লম্বা মনে হয়। গালে সবসময় দুটো-তিনটে ব্রণ থাকে বলে লজ্জা-লজ্জা করে। সেই বয়েসেই বাবা-মায়েদের সঙ্গে বেড়াতে যেতে আমার খারাপ লাগতে শুরু করেছিল। মুখখানা সবসময় গোঁজ হয়ে থাকত।

তাজমহল দেখতে গিয়ে একগাদা বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। অক্টোবর-নভেম্বরে বাঙালিরা দলে-দলে ভারত অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। তাজমহল দেখেনি এরকম মধ্যবিত্ত বাঙালি বিরল, এবং অনেক বাঙালিই সেখানে গিয়ে গদগদভাবে, একথা জানিতে তুমি ভারত ঈশ্বর। শাজাহান…আবৃত্তি করতে শুরু করে। আমরা একবার দিনেরবেলা তাজমহল দেখতে যাই, একবার রাত্তিরে। এরকমই নিয়ম। প্রত্যেকবারই নাকি তাজমহলকে নতুন মনে হয়। আমার অবশ্য তাজমহল দেখে নতুন কিছু আহামরি লাগেনি, সেই বয়েসটাই বোধহয় ওইসব দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথাও নয়।

অন্য বাঙালিদের মধ্যে আমার মায়ের এক বান্ধবীকে হঠাৎ আবিষ্কার করা গেল। সেই ভদ্রমহিলা আবার তাঁদের পাড়ার তিন-চারটি পরিবারের সঙ্গে একটা দল মিলে এসেছেন। বিরাট এক দঙ্গল। সেই দঙ্গলের মধ্যে ছিল সুজাতা। তার তখন ঠিক বারো বছর বয়েস! সেই বয়েসের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাবা-মায়েরা আলাপ করিয়ে দেয় না, তারা নিজেরাই ভাব করে নেয়।

সুজাতার সঙ্গে আমি দু-একটা কথা বলেছিলাম বোধহয়। আমার ঠিক মনে নেই। তখনও মেয়েদের সম্পর্কে আমার তেমন কোনও আগ্রহ জাগেনি। পূর্ণবয়স্কা মহিলা, বিশেষত যাদের স্বাস্থ্যও ভালো, যাদের বলা যায় সম্পূর্ণ নারী, তাদের শরীর ও মুখের লাবণ্যের দিকে ভীরু-ভীরু চোখে তাকাতে ইচ্ছে করত বটে, কিন্তু নিজের চেয়ে কমবয়েসি মেয়েদের সম্পর্কে একটা অবজ্ঞার ভাবই ছিল।

সে রাতটা ছিল পূর্ণিমা রাত। প্রায় সবাই সঙ্গে করে নানা রকম খাবার নিয়ে গিয়েছিল। তাজমহল দেখার নামে আসলে সামনের বাগানে চাঁদের আলোয় পিকনিক।

সব পরিবারের খাবার-দাবারগুলো মিশিয়ে নানা রকম খাওয়া-দাওয়া হচ্ছিল, হঠাৎ একটা রব উঠল, একটি মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ধরে সেই মেয়েটিকে কেউ দেখেনি।

সেই মেয়েটিই সুজাতা।

পুরুষরা সবাই খুঁজতে গেল। তাতে আমারও উৎসাহ ছিল, তাতে নিজেকেও পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তা ছাড়া, এ যেন চোর-চোর খেলার মজা।

শেষপর্যন্ত সুজাতাকে খুঁজে পাওয়ার কৃতিত্ব কিন্তু আমার নয়। হয়তো তেমন মন দিয়ে খুঁজিনি, কারণ, মেয়েটিকে তো আমি চিনতামই না ভালো করে। তবে ছুটোছুটি করেছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।

মেয়েদের স্মৃতিশক্তি কি বেশি? সুজাতা কিন্তু ঠিক মনে রেখেছিল। সেদিন সেই বাঙালিদের দলটায় নানা বয়েসের ছেলে ও পুরুষ ছিল, তাদের মধ্য থেকে বেছে-বেছে শুধু আমাকেই কি মনে রেখেছিল সুজাতা? না, সকলকেই তার মনে আছে? আমি তো সেদিন কোনও বিশেষ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিইনি!

এর বেশ কয়েক বছর পর, সুজাতার সঙ্গে একদিন গঙ্গার ধার দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে, আকাশে একটা কমলালেবু রঙের চাঁদ দেখে সুজাতা বলেছিল, তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল তাজমহলের সামনে!

আমাকে অবাক চোখে তাকাতে দেখে সুজাতা আবার বলেছিল, হাফপ্যান্ট-পরা বয়েসে তুমি একবার আগ্রায় যাওনি? সেবারে আমরাও ছিলুম ওখানে।

সুজাতা যতই মনে করাবার চেষ্টা করে, আমার কিছুতেই মনে পড়ে না। একটি মেমসাহেবকে প্রায় তার বাপের বয়েসি একজন সাহেব একটা গম্বুজের আড়ালে দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছিল, আমি দেখে ফেলেছিলুম, তাজমহল সম্পর্কে সেটাই আমার প্রধান স্মৃতি। আর দ্বিতীয় স্মৃতি সন্ধ্যায় আজানের মধুর সুর!

সুজাতা বলল, একটা মেয়ে সেবার হারিয়ে গিয়েছিল, তোমার তাও মনে নেই?

হ্যাঁ, সেই ঘটনাটা মনে আছে বটে, কিন্তু কিশোরী মেয়েটির মুখ তো মনে করতে পারি না।

সুজাতা বলল, তুমি কেন আমাকে খুঁজতে যাওনি?

তুমি কি সেই জন্যই হারিয়ে গিয়েছিলে নাকি? আমি তোমায় খুঁজে বার করব বলে?

মোটেই না। তাজমহলের সামনে সবাই এত-এত খাবার খাচ্ছিল, আর চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে কথা বলছিল, সেটা আমার মোটেই ভালো লাগছিল না। তাই আমি ছুট্টে চলে গিয়েছিলুম, তাজমহলের পেছন দিকে, নদী খুঁজতে।

পেয়েছিলে সেই নদী?

হ্যাঁ। জলের ধারে একা-একা বসে থাকতে খুব ভালো লাগছিল। মনে-মনে ভাবছিলুম, আমাকে যেন আর কেউ কখনও ডাকতে না আসে। আমি ওইখানেই থাকব।

আমার তুলনায় সেই বয়েসেই সুজাতা অনেক বেশি পরিণত ছিল। আমি তাজমহলের দৃশ্য উপভোগ করিনি, নদীর কথা আমার মনেও পড়েনি। আর সুজাতা একা-একা গিয়ে বসেছিল যমুনার তীরে।

তিন

কেন সুজাতা রাস্তার জল ভেঙে একা-একা চলে গেল?

তার ঠিক দুদিন আগেই আমার এম এ পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। হাতে অফুরন্ত অবসর। কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করেছিল উটি যাবে, টানাটানি করছিল আমাকে নিয়েও। কিন্তু সুজাতা সেটা চায়নি। সে চেয়েছিল, আমার সঙ্গে পুরীতে যেতে।

হ্যাঁ, আর কেউ থাকবে না, শুধু আমার সঙ্গে সে পুরীতে যাবে, এক হোটেলে থাকবে। এসব কথা সুজাতানিঃসঙ্কোচভাবে বলে। সে বাড়ির অভিভাবকদের ভয় পায় না।

প্রথমে একটু চমকে উঠেছিলুম ঠিকই। চাকরি-টাকরি পাওয়ার আগে বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের বাড়ির অবস্থা ভালো না, টানাটানির সংসার। বিয়ের আগেই বান্ধবীকে নিয়ে সমুদ্রের। ধারে একটা হোটেলে থাকা, ইংরেজি উপন্যাসেই এরকম হয়। যদিও আমরা ইংরেজি উপন্যাসের জগতেই অনেকটা বাস করি, তবু মধ্যবিত্ত বাঙালি সংস্কার একেবারে যায় না, কোথাও একটু ভয়-ভয় করে। যদি চেনাশুনো কারুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়?

আমাকে একটু ইতস্তত করতে দেখে সুজাতা খানিকটা বিদ্রুপের সুরে জিগ্যেস করল, আমার সঙ্গে যেতে তুমি ভয় পাচ্ছ? বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়াটাই তোমার বেশি পছন্দ? তাহলে আমিও তোমাদের সঙ্গে উটিতে যাব।

আমি অমনি কৃত্রিম উৎসাহ দেখিয়ে, চোখে একটা হাসির ঝিলিক দিয়ে বললুম, পাগল! বন্ধুদের সঙ্গে কে যাবে! শুধু তুমি আর আমি, পুরীর হোটেলে সারাদিন বিছানায় শুয়ে-শুয়ে সমুদ্র দেখব, আর…দারুণ, দারুণ, কবে যাবে বলো!

বন্ধুদের সঙ্গে উটি যাওয়ার বদলে সুজাতার সঙ্গে পুরী যেতে আমার আপত্তি থাকবে কেন? আমি তো সুজাতার প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে রাজি। শুধু টাকাপয়সার চিন্তাটা মনের মধ্যে একটু খচখচ করছিল। আজেবাজে হোটেলে তো থাকতে পারবে না সুজাতা। আমার নিজস্ব কোনও জমানো টাকা ছিল না, বাবা-মায়ের কাছে দু-তিনশো টাকার বেশি চাওয়া যায় না। তবু হাজারখানেক টাকা কোনও-না-কোনও উপায়ে জোগাড় হয়ে যেতই! আমার ওই অর্থচিন্তা কি মুখে ফুটে উঠেছিল?

সে কি ভেবেছিল, আসলে তাকে নিয়ে পুরীতে বেড়াতে যাওয়ার সাহস আমার নেই? আমার কিছুক্ষণ নীরবতার সে ভুল অর্থ করেছিল?

এত সামান্য কারণে সুজাতা রাগ করে চলে যাবে? আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলল, তুমি আমার সঙ্গে এসো না!

চার

সুজাতাদের বাড়ি এলগিন রোডে। কলকাতার অধিকাংশ বাঙালি বড়লোকদের মতন ওদের পরিবারেরও তখন পড়ন্ত দশা। অত বড় বাড়িটা অনেকদিন সারানো হয়নি। কিছুটা অংশ ভাড়াটে বসে গেছে। ওদের উঠোনটায় হয়েছে গাড়ি সারাবার গ্যারাজ। মাড়োয়ারি ও গুজরাতি ব্যবসায়ীরা বাড়িটা কিনে নেওয়ার জন্য ঘোরাঘুরি শুরু করে দিয়েছে।

তবু সুজাতার বাবা-কাকাদের মুখে একটা অহংকারী ভাব। লোকের সঙ্গে কথা বলে ভুরু তুলে। সুজাতার বড়দা সিনেমা কোম্পানি খুলে প্রচুর টাকা খোয়াল। কিন্তু তা নিয়ে বিন্দুমাত্র হা-হুতাশ করেনি। এমন ভাব দেখায় যেন দু-পাঁচ লাখ টাকা কিছুই না।

সুজাতার ছোড়দার নাম মন্তাদা, ক্রিকেট খেলা নিয়ে পাগল। একবার রঞ্জি ট্রফিতে চান্স পেয়েছিল, দু-ইনিংসে মোট রান এগারো। তবু মুখে কী গর্বিত ভাব! আমার দিকে এমন ভাবে তাকায়, যেন আমি একটা কানা-খোঁড়া-পঙ্গু। কিংবা বামন। তার কারণ আমার জামাকাপড়ের

চাকচিক্য ছিল না, আমার কোনও উঁচু বংশ পরিচয় ছিল না। আমি কথায়-কথায় বলতে পারি না যে বার্ড কোম্পানির ম্যানেজার আমার মামা কিংবা অমুক নাম করা ব্যারিস্টার আমার মেসোমশাই! সুজাতার মতন মেয়ে যে আমাকে বাড়িতে ডাকে, সেটা যেন তার দয়া!

কিছুদিন আগে সুজাতার মা মারা গেছেন, সুজাতা বলত, এই পৃথিবীতে মাকে ছাড়া আর কারুকে সে কখনও গ্রাহ্য করেনি। সুজাতার বাবা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছিলেন, মেয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার তাঁর সময় নেই। সুজাতা একদিন ওদের বাড়িতে আমাকে খেতে নেমন্তন্ন করেছিল। আশ্চর্য ব্যাপার, ওদের বাড়ির আর কারুর সঙ্গে সেদিন একটা কথাও হল না আমার। আমি গিয়ে বসলুম তেতলায় সুজাতার নিজস্ব ঘরে, কিছুক্ষণ গল্প করার পর সুজাতা সেই ঘরেই খাবার নিয়ে এল, আমাদের বাড়িতে এই রকমটা চিন্তাও করা যায় না। বন্ধু-বান্ধবদের খেতে বললে মা নিজে খাবার পরিবেশন করেন। সুজাতার মা বেঁচে নেই বলে আর কেউ এ-বাড়িতে ক্ষেপই করল না যে, তিনতলার ঘরে ওই যুবতীটি কার সঙ্গে অত গল্প করছে।

অন্য কেউ যদি বিরক্ত করতে না-ই আসে, তাহলে সুজাতাকে চুমু না খাওয়ারও কোনও মানে হয় না! আমি সুজাতাকে একবার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর মুখটা ফেরাতেই সুজাতা আমার। ঠোঁটে একটা হাত চাপা দিয়ে বলল, এখনও সময় হয়নি।

আমি হকচকিয়ে গিয়ে বলেছিলুম, তার মানে?

সুজাতা পাতলাভাবে হেসে বলেছিল, তার মানে সময় হয়নি!

সুজাতার মতন মেয়েকে জোর করে চুমু খাওয়া যায় না।

শরীরের ব্যাপারে সুজাতার সেরকম কিছু শুচিবাই ছিল না। ও হঠাৎ-হঠাৎ আমার মুখে হাত বুলিয়ে আদর করত। আমি কখনও ওকে জড়িয়ে ধরলে ও আপত্তি জানাত না। আমরা কোলাঘাট কিংবা ব্যারাকপুর গেছি ট্রেনে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে। কিন্তু চুমু পর্যন্ত পৌঁছনো হয়নি।

সুজাতা আমার ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, এখনও সময় আসেনি। তার মানে, সময় আসবে, তখন ও নিজেই জানাবে। সেইজন্যই কি ও আমার সঙ্গে পুরীতে যাওয়ার কথা তুলেছিল। দুজনে হোটেলের এক বিছানায়…।

আমি ছাড়াও সুজাতার আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। অনন্য, গৌতম, অনির্বাণ। ওদের সঙ্গেও সাবলীলভাবে মিশত সুজাতা। প্রেসিডেন্সি কলেজের একজন বাংলার অধ্যাপক নাকি সুজাতার প্রেমে পাগল হয়ে উঠেছিল, সেই অধ্যাপকটিকে নিয়ে আবার হাসাহাসি করতুম আমরা সবাই। সেই ভদ্দরলোক সুজাতাকে নিয়ে চার-পাঁচটা কবিতাও লিখে ফেলেছিলেন। তার মধ্যে একটা কবিতা এখন আবৃত্তিকারদের মুখে-মুখে ফেরে।

সুজাতার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আমার তফাত ছিল এই যে, সুজাতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আমাকে কখনও বিশেষ উদ্যোগ নিতে হয়নি। একদিন দেখা হলেই ঠিক হয়ে যেত, পরে আবার কখন কোথায় দেখা হবে। একবার হঠাৎ খুব কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসায় আমি সুজাতার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি, রাত সাড়ে আটটায় সুজাতা আমার হস্টেলে চলে এসেছিল। একদল ছেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ও জিগ্যেস করেছিল, অনীশ কোথায়?

অনীশের কী হয়েছে?

আমি ঠিক জানতুম, সুজাতা আসবে।

কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারি না সেই বৃষ্টির দিনে সুজাতা কেন অমনভাবে চলে গেল। পরের বার কোথায় দেখা হবে তা কিছুই বলল না।

সুজাতার বাড়িতে গিয়ে এর পর আমারই কি খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল যে সুজাতা কেন রাগ। করেছে? রাগের তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। দু-দিন পরেই সুজাতার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল অবশ্য। সুজাতার সঙ্গে আরও দুটি মেয়ে ছিল। তাদেরও আমি চিনি। সুজাতা আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়নি। আগের দিনের ব্যবহারের কোনও কৈফিয়ৎ ও দেয়নি। স্বাভাবিক হাসিমুখে বলেছিল, অনীশ, তোমার দুটো বই আছে আমার কাছে। আর তোমার একটা কলমও আমি একদিন ভুল করে নিয়ে গিয়েছিলুম, দীপার হাত দিয়ে ফেরত দিয়ে দেব, তা হলেই তুমি পেয়ে যাবে তো?

সুজাতা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন আমি অনীশ নয়, অনন্য, গৌতম, অনির্বাণ কিংবা অন্য যে-কেউ।

এরপর পোষা কুকুর ছাড়া আর কারুর কি ওই মেয়েকে অনুসরণ করা উচিত?

সুজাতার ওই অদ্ভুত ব্যবহারে আমার অভিমান কিংবা দুঃখ হয়নি, সর্বাঙ্গ জ্বলে গিয়েছিল অসম্ভব রাগে। যেসব রাগী ছেলেরা অহংকারী প্রেমিকার মুখে অ্যাসিড বালব ছুড়ে মারে, তাদের মনস্তত্ব যেন বুঝতে পারছিলুম অনেকটা। কিন্তু আমি তো অত নীচে নামতে পারি না! আমি শুধু মনে-মনে সুজাতাকে বলেছিলুম, বিদায়!

তবু আমার আশা ছিল, সুজাতা দু-চারদিনের মধ্যেই নিজের ভুল বুঝতে পারবে, ও নিজেই আমার কাছে আসবে কিংবা চিঠি লিখবে।

পরে একদিন দেখা হল, সুজাতা আর আমার সঙ্গে ভদ্রতা করেও কোনও কথা বলল না। যেন সব কথা শেষ হয়ে গেছে!

অনন্য, গৌতম, অনির্বাণদের চেয়েও সুজাতা যে আমাকে কেন বেশি পছন্দ করত, তার কারণটা বোঝাও শক্ত। ওদের সঙ্গেই সুজাতাদের পারিবারিক মিল বেশি। তবু সুজাতা বেছে নিয়েছিল আমাকে, সুজাতার সারল্য ও পবিত্রতার সংস্পর্শে আমি ধন্য হয়ে গিয়েছিলুম, আমি নিজেকে। সুজাতার যোগ্য করে তুলতে চেষ্টা করছিলুম। সুজাতার তুলনায় অন্য সব চেনা মেয়েদেরই মনে হত তুচ্ছ।

যে-সুজাতা প্রায়ই নিজে থেকে আমার হাতটা নিয়ে খেলা করত, সেই সুজাতা অকারণে আমার হাত জোর করে ছাড়িয়ে চলে গেল হঠাৎ?

সেই বৃষ্টির দিনে সুজাতার মুখোমুখি টেবিলে বসে আমি চুপ করে ছিলুম মিনিটপাঁচেক। সেইটাই কি আমার দোষ হয়েছিল!

পাঁচ

দুর্গাপুরে চাকরি পাওয়ার দু-বছর বাদে আমি বিয়ে করি পারমিতাকে।

তারপর সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই আমাদের একটি ছেলে ও মেয়ে জন্মাল। ব্যস, আর দরকার নেই। ছিমছাম, সুপরিকল্পিত পরিবার। পারমিতা একটা ছোট্ট অপারেশন করিয়ে নিল। সংসার চালাবার ব্যাপারে পারমিতার দক্ষতা অসাধারণ। তার সবচেয়ে বড় গুণ এই যে নিছক গৃহিণী সে নয়। ছেলেমেয়ে মানুষ করার নামে অনেক মেয়ে এমন ভাব দেখায় যেন বিরাট একটা স্বার্থত্যাগ করছে। তাদের জীবনে আর কোনও আনন্দ-উপভোগ থাকে না, শুধু সন্তানই ধ্যান-জ্ঞান।

পারমিতা কিন্তু ছেলেমেয়েদের যেটুকু-যত্ন করবার তা ঠিকই করে, তার পরেও সে প্রত্যেকটি গান-বাজনার আসরে যায়।

পারমিতার সঙ্গীতের নেশা। আধুনিক ফিলম বা সাহিত্যের সে মোটামুটি খবর রাখে।

পারমিতার গানের গলাটাও বেশ সুরেলা।

পারমিতার সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্কে কোনও খাদ ছিল না। যদিও আমার প্রায়ই মনে হত, বিয়ে না করে পারমিতা গানের জগতে লেগে থাকলে নাম করতে পারত। বিয়ে করে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বাঙালি মেয়েরা আর ঠিক শিল্পী হতে পারে না। বড়-বড় কয়েকজন গায়কের নাম

উচ্চারিত হলেই পারমিতা এমন উচ্ছাস দেখায়, যেন ওই গায়কেরা তার প্রেমিক। পারমিতা একদিন বলেও ফেলেছিল, ওস্তাদ মইজুদ্দিন খাঁ চাইলে ও সবকিছু দিয়ে দিতে পারে। আমি অবশ্য এই নিয়ে পারমিতার সঙ্গে মজা করি।

সুজাতাকে আমি মন থেকে একেবারে বিসর্জন দিয়েছি, একথা বললে মিথ্যে বলা হবে। মনে পড়ে মাঝে-মাঝে। হঠাৎ-হঠাৎ!

সুজাতার খবরও কিছু কিছু কানে আসে।

কলেজ ছাড়ার পর সুজাতা বিলেতে চলে গেছে পড়াশুনো করতে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা? এই জন্যই কি। সুজাতা আমার সঙ্গে সব সম্পর্ক কাটাকাটি করেছিল? সে ভেবেছিল, আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, আমি কোনওদিন ওইসব দেশে যেতে পারব না?

ইকোনমিকসে আমার রেজাল্ট নেহাত খারাপ হয়নি। বিলেত আমেরিকায় একটা কিছু স্কলারশিপ জোগাড় করা আমার পক্ষে খুব একটা শক্ত হত না। আমার বন্ধুদের মধ্যে চার-পাঁচজন চলে গেছে, তার মধ্যে দুজনের রেজাল্ট আমার চেয়েও নীচে ছিল। কিন্তু সুজাতা গেছে শুনেই বিলেত অ্যামেরিকার ওপর আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল।

অফিস থেকে আমাকে এর মধ্যে দু-বার লন্ডন ঘুরিয়ে এনেছে। সুজাতা শেফিল্ডে থাকে জেনেও আমি তার কোনও খোঁজও করিনি।

ছয়

সল্টলেকের জমিটা আজ রেজিস্ট্রি হয়ে গেল। বাড়ির প্ল্যানও রেডি। সামনের মাসেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। পারমিতার ইচ্ছে অন্তত ছখানা ঘরওয়ালা দোতলা বাড়ি করা, আমি আপাতত একতলার বেশি চাই না। বেশি বড় বাড়ি করা ভালো দেখায় না। পেছনে ভিজিলেন্স লেগে যেতে পারে।

ঠিকঠাক ট্যাক্স দিয়ে বাঁধা মাইনের চাকরিতে কোনও ভদ্দরলোকের পক্ষে বাড়ি বানানো অসম্ভব। অনেক লোক রিটায়ার করার পর প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটির সব টাকা দিয়ে একখানা বাড়ি বানায় এবং সেটা ভোগ করার আগেই দু-চার বছরের মধ্যে টুক করে মরে যায়। আমি ওসব বাজে ব্যাপারে নেই। যা কিছু ভোগ করার, তা যৌবন বয়েসেই চাই। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনেছি আগেই। মাসে এখন প্রায় দশ-বারো হাজার টাকা উপরি রোজগার হয়। নেহাত এখনও চক্ষুলজ্জা আছে তাই, নইলে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা তো কিছুই না। আমার হাত দিতে প্রায় এক কোটি টাকার বিল পাশ হয়, এর মাত্র এক পার্সেন্ট তো যে-কোনও পার্টিই হেসে খেলে দিতে রাজি।

চাকরি পাওয়ার পর প্রথম চার বছর একটা আস্ত গাড়লের মতন একটা পয়সাও নিইনি কারুর কাছ থেকে। তখনও একটা ফাঁপা আদর্শবাদ মাথা জুড়ে ছিল যে! মনে আছে, প্রথম যে লোকটি আমাকে ঘুষ দেওয়ার সামান্য ইঙ্গিত করেছিল, তার ওপর এমন রেগে গিয়েছিলুম যে, টংটং করে বেল বাজিয়ে বেয়ারা ডেকে লোকটিকে বলেছিলুম আমার চেম্বার থেকে দূর করে দিতে। জেনারাল ম্যানেজারের কাছে গিয়ে নালিশ করেছিলুম, যেন ওই ফার্মকে ব্ল্যাক লিস্টেড করা হয়। জেনারাল ম্যানেজার আমার প্রশংসা করেছিলেন, সহকর্মীরা আমার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল, তবু কোনও এক অলৌকিক উপায়ে সেই ফার্মটি ঠিকই অর্ডার পেয়ে গেল!

সে বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে সহকর্মীরা এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে, কেউ-কেউ কাঁধ ঝাঁকায়। জেনারাল ম্যানেজার সেবারই আমাকে একটা ট্রেইনিং-এর জন্য বিলেত পাঠালেন।

আমারই সমান পোস্টের এক ডি পি ও, অর্থাৎ ডেপুটি পারচেজ অফিসার তার বাচ্চা মেয়ের জন্মদিনে সাড়ে চারশো লোককে নেমন্তন্ন করে খাওয়াল। একটা ঘরে উপহারের পাহাড় জমে গিয়েছিল। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে পারমিতা জিগ্যেস করেছিল, ওই উৎপল ব্যানার্জি আর তোমার টেবিল সমান মাপের?

আমাদের দুই ছেলে মেয়ের জন্মদিনে কাছাকাছি কোয়ার্টারের দু-চারটি বাচ্চা ছাড়া আর কারুকেই নেমন্তন্ন করা হয় না। সাড়ে চারশো লোক খাওয়ান মানে চোদ্দ-পনেরো হাজার টাকার ধাক্কা। অবশ্য উৎপল ব্যানার্জির মেয়ে সোনা-রূপোর গয়না উপহার পেয়েছে অনেক।

উৎপল ব্যানার্জির স্ত্রী ছবির গলা দিয়ে একবার রক্ত পড়তেই তাকে নিয়ে যাওয়া হল কলকাতায় এক নামকরা নার্সিংহোমে।

আমাদের দুর্গাপুরে ভালো হাসপাতাল আছে! কিন্তু উৎপল কোনও চান্সই নেয়নি। ছবির অবশ্য সাধারণ ব্রঙ্কাইটিস হয়েছিল, সেই নার্সিংহোমে পনেরো দিন থেকে, সবরকম চেক-আপ করিয়ে

সে সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে। ওদের বাড়িতে কিছুদিন পরেই আবার একটা বড় পার্টি হল।

পারমিতার সহজে কোনও অসুখ-বিসুখ হয় না। ভালো স্বাস্থ্য। কিন্তু একবার কলকাতায় ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স শুনে ফিরে আসার ঠিক পরদিনই সে অবিকল উৎপলের স্ত্রী ছবির মতন রক্ত বমি করল।

দুর্গাপুরে বড় কনকনে শীত পড়ে। গোটা শীতকালটা সাবধানে না থাকলে অনেকেরই ব্রঙ্কাইটিস হয়ে যায়। ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসার জন্য নার্সিংহোমে যাওয়া তো দূরের কথা, হাসপাতালেও যাওয়ার দরকার হয় না, ডাক্তার বাড়িতে এসে ইঞ্জেকশান দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু উৎপলের স্ত্রী ছবি যদি যেতে পারে, তা হলে, আমার স্ত্রী পারমিতা কেন কলকাতায় চিকিৎসা করতে যাবে না? অযাচিতভাবে পারমিতাকে দেখতে এসে কয়েকজন জিগ্যেস করলে, কোন। নার্সিংহোমে ভরতি হচ্ছ? একবার থরো চেকআপ করিয়ে নেওয়া ভালো।

টাটা-বিড়লারা এখন নার্সিংহোমের ব্যবসাও করে। সেখানে কোনও সরকারি অফিসারের স্ত্রীর কি চিকিৎসা করানোর সাধ্য থাকতে পারে? তবু অনেকেই যায়।

সেবারই আমি এখানে স্ত্রীর নামে একটা এজেন্সি খুললাম। এটাই আইনসম্মত প্রথা। আমাদের পাঁচ লাখ টাকার স্পেয়ার পার্টস কিনতে হবে, যে-কোম্পানি সেগুলো সাপ্লাই করার জন্য মমোনীত হল, আমার স্ত্রী তার একজন শ্লিপিং পার্টনার। দুর্গাপুর ক্লাবে মিঃ বাজোরিয়া আমাকে সাড়ে সাত হাজার টাকার নোটসমেত একটা খাম দিল গোপনে। পারমিতার চিকিৎসার খরচ।

খামটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে মনে হল একটু দূরে দরজার কাছে একজন মহিলা এসে। দাঁড়িয়েছে। চাঁপাফুল রঙের শাড়ি পরা আধখোলা খোঁপা, সরল, গভীর দুটি চোখ। সুজাতা!

আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সুজাতা নীরবে বলল, ছিঃ অনীশ, তোমার কাছ থেকে এ রকম আশা করিনি!

বলাই বাহুল্য, সেই মহিলা সুজাতা নয়। অন্য একজন, অনেকটা সুজাতার মতনই শরীরের গড়ন, তবে সুজাতার মতো এর সৌন্দর্যের জ্যোতি নেই।

আমিও মনে-মনে বললুম, সুজাতা, তুমি কেন আমায় ছেড়ে চলে গেলে? যদি তুমি অকারণে আমায় আঘাত না দিতে, তা হলে আমিও এরকম বদলে যেতুম না!

সাত

পারমিতার বাপের বাড়ি টালিগঞ্জ। বাচ্চারা সমেত পারমিতাকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে ট্যাক্সি করে আমি ফিরছি, আমাকে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে, হঠাৎ কী খেয়াল হল ট্যাক্সিটা ঘোরাতে বললুম এলগিন রোডে। কিছুদূরে গিয়ে তাকে দাম মিটিয়ে ছেড়ে দিলুম। সুজাতাদের বাড়িটা আরও জরাজীর্ণ হয়েছে, কিন্তু এখনও বিক্রি হয়নি, আশে পাশে অনেক নতুন ঝকঝকে বাড়ি উঠেছে, তবু সেই বাড়িটা পুরোনো আভিজাত্যের গর্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনে সুজাতার দাদা এক পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। অবিকল সেই আগেকার মতন ভুরু তোলা ভঙ্গি।

রাস্তার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে আমি বাড়িটার দিকে চেয়ে রইলুম। সুজাতা এখানে নেই, সে বিলেতেই রয়ে গেছে। তাহলে এই বাড়িটা হঠাৎ দেখতে আসার কী মানে হয়? ওই বাড়িটার সঙ্গে মিশে আছে আমার প্রথম যৌবনের তীব্র ব্যর্থতা!

এই বাড়ির তিনতলার সেই ঘরটায় এখন কি অন্য কেউ থাকে?

এ-ঘরে সুজাতাকে আমি প্রথম চুম্বন করতে গিয়েছিলাম, সুজাতা আমার ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, এখনও সময় হয়নি! সারাজীবনেও আর সে সময় আসবে না!

আট

ওস্তাদ মজিদ খাঁ একটা অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন দুর্গাপুরে। তাঁর এখন দারুণ নাম। এক সন্ধেবেলা গান গাইবার জন্য কুড়ি হাজার টাকা নেন—গায়কদের এত রোজগার! আমি ক্লাসিক্যাল গান-বাজনা তেমন বুঝি না। তবু স্বীকার করতেই হবে সে মানুষটির কণ্ঠস্বরে জাদু আছে।

ওস্তাদজির বয়েস বছরপঞ্চাশেক হবে, সুন্দর স্বাস্থ্য, চোখ দুটি মায়াময়। তিনটি দিন তিনি। আমাদের বাড়িতে থেকে গেলেন, তা নিয়ে পারমিতার কী গর্ব। আমাদের সোশ্যাল স্টেটাস অনেক উঁচুতে উঠে গেল। অন্যদের আরও অনেক বেশি টাকা থাকতে পারে, কিন্তু অত বড় একজন ভারত বিখ্যাত গায়ক তো আমাদের বাড়িতেই উঠেছেন।

সেই তিনটি দিন পারমিতা কী মাতামাতিই না করল! বেচারি গান বাজনা এত ভালোবাসে, সে তার স্বপ্নের গায়ককে এত কাছাকাছি পেয়েছে সব রকম যত্নআত্তি, একসঙ্গে গলা সাধা, ওস্তাদজির রেওয়াজের টেপ করা, এইসব নিয়ে মেতে রইল পারমিতা। ছেলেমেয়েদের দিকে নজর দেওয়ারও সময় নেই।

আমাকে অবশ্য তিনদিনই অফিস করতে হয়েছে, তা ছাড়া গুরু-শিষ্যার অন্তরঙ্গতার মধ্যে আমি মাথা গলাতে চাইনি। পারমিতার আনন্দ উদ্ভাসিত মুখখানা দেখে আমার খুব ভালো লাগছিল। পারমিতাকে বোধহয় আমিও কখনও এতটা আনন্দ দিতে পারিনি। গুরুর কাছে আত্মনিবেদন করতে গিয়ে পারমিতা কি তার সবকিছু দিয়েছিল? অসম্ভব নয় মোটেই। ওস্তাদজির সেই মায়াময় চোখে মাঝে-মাঝে নারী-লোলুপতার ঝিলিক আমি লক্ষ করেছি। ওস্তাদজির তিনটি স্ত্রী এবং সারা ভারতে তাঁর অনেক প্রেমিকা, কাগজেই এসব খবর বেরিয়েছিল একসময়। গুণী শিল্পীদের জীবন তো এ রকমই হয়!

ওস্তাদজি যদি কখনও পারমিতার কাছ থেকে সবকিছু দাবি করে থাকেন, তাতে পারমিতা আপত্তিও জানাতে পারবে না, সে এমনই ঘোরের মধ্যে ছিল। ওস্তাদজির বিদায় নেওয়ার সময় পারমিতার চোখ ছলছল করছিল, ওস্তাদজি তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেছিলেন।

এতে দোষেরই বা কী আছে! পারমিতার আর বাচ্চাকাচ্চা হবে না, সে যদি একবার তার স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে শোয়, তাতে তার শরীরটা তো আর ক্ষয়ে যাচ্ছে না! এটাকে ঠিক ভালোবাসাও। বলে না। এক ধরনের মোহ, এর জন্য পারমিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কের চিড় খাওয়ার কোনও কারণ নেই!

আমি নিজের চোখে ওদের সেই ধরনের ঘনিষ্ঠতা দেখিনি, আমি সন্দেহপ্রবণ মানুষও নই। তবু ঠাট্টার ছলেও ওই কথাটা পারমিতাকে জিগ্যেস করতে পারি না।

সপ্তাহখানেক বাদে এক রাত্রে পারমিতা নিজে থেকেই আমাকে আদর করতে এল, আমার বুকে মাথা রাখল।

সেই রাতে আমি বেশ খানিকটা হুইস্কি পান করেছিলুম, ওস্তাদজির জন্য আমার দুটো বোতল স্কচ খরচ হয়ে গিয়েছিল, বাড়িতে আর স্টক ছিল না, সুতরাং বাধ্য হয়ে খেতে হয়েছিল ইন্ডিয়ান। শরীর বেশ উত্তপ্ত। পারমিতাকে জড়িয়ে ধরতেই অন্ধকারের মধ্যে ফট করে ভেসে উঠল সুজাতার মুখ।

পারমিতাকে চুম্বন করে তেমন স্বাদ পেলুম না। মনে হল, জীবনে একটা পরম চুম্বন পাওয়াই বাকি রয়ে গেছে।

সুজাতা লন্ডন থেকে ফিরে এসেছে বছরতিনেক আগে। চাকরি করছে বম্বেতে। বিয়ে করেনি। এসব খবর অনন্যর মুখে শুনতে পাই।

অফিসের কাজে আমাকেও বছরে অন্তত পাঁচ-ছবার বম্বে যেতে হয়। সুজাতার খোঁজ করার কথা মনেও আসেনি।

কিন্তু এটা আমার কী হল? পরপর তিন-চারবারই পারমিতার শরীরটা আমার কাছে নিরামিষ মনে হচ্ছে! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রথম দিককার সেই উন্মাদনা খানিকটা মিইয়ে যায় ঠিকই। কিন্তু পারমিতার সঙ্গে শুয়ে বারবার সুজাতার কথা মনে আসছে কেন? সুজাতার শরীর আমি কখনও পরিপূর্ণভাবে দেখিনি, কিন্তু আজকাল প্রায়ই আমি তাকে মনে-মনে নগ্ন করি!

নয়

একটা এক্সপেরিমেন্ট করা দরকার।

এলাহাবাদে তিনদিনের একটা কনফারেন্স ছিল। টুক করে করে সেখান থেকে একদিন পালিয়ে চলে এলুম কাশীতে।

ছাত্রজীবনে কাশীতে এসে একবার এক মধ্যবয়স্ক দাদার পাল্লায় পড়ে একটা বাঈজির বাড়িতে যেতে হয়েছিল। বেশ ভয়-ভয় করেছিল সেবার, মনের মধ্যে খানিকটা পাপবোধও ছিল। একটি মেয়েকে ভালোবেসে অন্য কোনও নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করাটা অন্যায় মনে হত। এখন ওসব বিবেকের দায় চুকে গেছে। পকেটে পয়সার জোর থাকলে এইসব পাড়ায় আসতে ভয়ও করে না।

ডালপট্টিতে একজন দালালকে ধরে এলুম সুর্মা বাঈজির ঘরে। ছদ্ম নামটা এই মেয়েটিকে বেশ মানিয়েছে। হয়তো বছর পঁয়তিরিশেকের মতন বয়েস, দেখায় পঁচিশ বছরের মতন, চোখ দুটি বেশদীঘল কালো। মাথায় অনেক চুল, ঠোঁটে লাস্য আছে।

প্রথমেই পাঁচশো টাকা দিয়ে বললুম ড্রিংকস আনতে। বুঝিয়ে দেওয়া হল যে টাকাপয়সার ব্যাপারে আমি কোনও কার্পণ্য করব না, তার বদলে আমি যা-চাই, তাই-ই আমাকে দিতে হবে। সুজাতা নাচ জানত না, তেমন কিছু গানের গলাও ছিল না। এই বাঈজির সঙ্গে সুজাতার চেহারারও কোনও মিল নেই।

তবু সুজাতার মুখখানা যেন বাতাসে ভাসছে। তার চোখে তীব্র ভৎসনা। আমাকে এই ভূমিকায় সে একটুও পছন্দ করছে না। সে আমাকে পছন্দ-অপছন্দ করার কে? আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় সেই মুখখানা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আজকাল প্রায়ই এমন হয়। চুপচাপ একলা বসে থাকলেই সুজাতা আমার কাছে চলে আসে। সঙ্গে-সঙ্গে আমার শরীরে একটা রোমাঞ্চ হয়। আমার ঠোঁটের থেকে যেন হাত সরিয়ে নিয়েছে সুজাতা, আমি তার ছায়ামূর্তিকে চুম্বন করেছি, সেরকম চুম্বনের স্বাদ পৃথিবীর আর কোনও নারীর কাছ থেকে পাওয়া যাবে না!

সুর্মা বাঈ পরপর দুটো গান শেষ করল। আমার মন লাগছে না। ঝোঁকের মাথায় নেশা করে ফেললুম অনেকটা। নেশা না করলে কি এক ঘণ্টার পরিচয়ে কোনও নারীকে স্পর্শ করা যায়?

তাতেও কিছু লাভ হল না। সুর্মা বাঈকে জড়িয়ে ধরে আমি সর্বক্ষণ আসলে সুজাতাকেই আদর করতে লাগলুম।

দশ

সল্টলেকের বাড়ির আজ ছাদ ঢালাই হচ্ছে। আমি একটা রঙিন ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায়। হঠাৎ একসময় আমার মনে হল, আমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি? কী হবে এই বাড়ি তৈরি করে? আমার বুকটা অসম্ভব কষ্টে মুচড়ে-মুচড়ে উঠছে। আমি সুজাতাকে পাইনি, এই জীবনে যেন আর কোনও কিছু পাওয়ারই মূল্য নেই!

প্রথম তিন-চার বছর এমন হয়নি, সুজাতাকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলুম। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই সুজাতা আমার কাছে ফিরে আসে। সে আমাকে চরমভাবে হারিয়ে দিয়ে যেন আনন্দ পায়।

পাশেই আর-একটা বেশ বাড়ি তৈরি হচ্ছে। ইচ্ছে করলে আমিও ওইরকম বাড়ি তৈরি করতে পারতুম। সুজাতাদের এলগিন রোডের বাড়িটাও কিনে নেওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য নয়। টাকা আমি কম রোজগার করিনি। এবং তার অনেকখানিই আইনমাফিক টাকা। পারমিতার নামে। সত্যি-সত্যি আলাদা একটা ব্যাবসা চালিয়ে ভালো প্রফিট হচ্ছে। অফিসেও আমার সুনাম আছে। অনেকে বলে অনীশ রায় কাজ পাগল মানুষ। হ্যাঁ, অফিসের কাজে, আমার কোনও খুঁত নেই। সর্বক্ষণ আমি কাজে ডুবে থাকতে চাই! আমার ছেলেমেয়ে দুটি ভালো স্কুলে পড়ছে, ব্যবহারও চমৎকার। পারমিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কে কোনও ফাটল ধরেনি। ওস্তাদ মজিদ খাঁ আর। দুর্গাপুরে আসেননি, পারমিতার কাছে সেই তিনটি দিন শুধু এখন মধুর স্মৃতি। আর কোনও একটা কনফারেন্সে ওস্তাদজি পারমিতাকে দেখে স্টেজ থেকে হাত নেড়েছিলেন, ব্যস ওই পর্যন্ত। অত্যন্ত ভিড়ের চাপে পরে পারমিতা আর তাঁর কাছে যেতে পারেনি, বিশেষ চেষ্টাও করেনি। দুর্গাপুরের দু-একটা ফাংশনে অন্যান্য অফিসারদের স্ত্রীর সঙ্গে পারমিতাও গান করে। সে বেশ আনন্দেই আছে।

পারমিতাকে আমি ভালোবাসি। পারমিতা আমাকে সুন্দর সাহচর্য দেয়। তার শরীরেও বেশ উত্তাপ আছে।

আমি সুজাতার খোঁজ করি না। এর মধ্যে একবারও তার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করিনি। সে বম্বেতে থাকে, তার ঠিকানা জোগাড় করা কিছুই শক্ত নয়। কিন্তু একবার আমি তাকে বিদায় জানিয়েছি। কেন আবার তার পায়ে লুটোতে যাব!

আমি সুজাতাকে বিদায় জানিয়েছি, তবু সে কেন ফিরে-ফিরে আসে? বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে মৃত্যুশোক থেকে একটা প্রেতিনীর মতন?

আমাদের সমস্যাহীন সংসার। টাকাপয়সার অভাব নেই। সব দিক থেকেই তো আমরা সুখী! তবু ওই হারামজাদিটা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে! কোনও কিছুতেই আমার তৃপ্তি নেই! শুধু সে সুর্মা বাঈ নয়, তার পরেও আরও দুটি মহিলার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।

আজকাল প্রত্যেক পার্টিতেই একজন-দুজন তরুণী থাকে, তারা কীরকম যেন ছলছলে চোখে তাকায়। একটু প্রশ্রয় দিলেই তাদের সঙ্গে আলাদা দেখা করা যায়। আগে আমার এসব জানা ছিল না।

কিন্তু সেই দুই তরুণীও সুজাতার বিকল্প হতে পারেনি। প্রত্যেকবার আমি হেরে গেছি। সুজাতা এসে পাশেদাঁড়িয়েছে।

বাথরুমে স্নান করার সময় এক-একদিন আমি অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। নিজেরই। বাহুতে একটা চুম্বন দিয়ে ভাবি যেন সুজাতাকেই আদর করছি। সঙ্গে-সঙ্গে আমার শরীর উষ্ণ হয়ে যায়। শুধু কল্পনাতেই আমি সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে যত রোমাঞ্চ বোধ করি, কোনও বাস্তব নারী আমাকে তা দিতে পারে না!

হারামজাদি! সে শুধু আমাকে তার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেনি, আমার জীবনের সব রকম সার্থকতা, আমার বাকি জীবনের নারীসঙ্গসুখও সে কেড়ে নিয়েছে!

সুজাতা আমার সঙ্গে পুরী যেতে চেয়েছিল। আমাকে সেদিন টাকার চিন্তায় চুপ করে থাকতে হয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর জীবনে কত টাকা রোজগার করেছি। কী লাভ হল? এক-একসময় সব ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে হয়।

এগারো

কলকাতায় এলে অনন্যর সঙ্গে দেখা হয় মাঝে-মাঝে। অনন্য প্রায়ই বম্বে যায়, সুজাতার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। অনন্য এমন ভাব দেখায় যেন সুজাতার সঙ্গে তার প্রেম। আন্ধেরি

ওয়েস্টে সুজাতার ফ্ল্যাট, সেখানে সে একলা থাকে, একবার হোটেলে জায়গা না পেয়ে অনন্য সুজাতার কাছে ছিল এক রাত।

সেই বৃষ্টির দিনে সুজাতা আমার হাত ছাড়িয়ে চলে যাওয়ার পর জল-জমা কলেজ স্ট্রিটে একটা সাদা রঙের গাড়ি সুজাতাকে তুলে নিয়েছিল। গাড়ির রংটাও আমি ভুলিনি।

সেটা ছিল অনন্যর বাবার গাড়ি, অনন্যও মাঝে-মাঝে চালাত। তবু অনন্যর সঙ্গে সুজাতা কথা বলত উপহাসের ভঙ্গিতে। অনন্যর চেহারাটাও বেশ সুন্দরই বলা যায়। রং ফরসা, সিনেমায়। নামলে ন্যাকা প্রেমিকের রোলে মানিয়ে যেত।

অনন্যদের সেই গাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। অনন্য বিলেত যায়নি! আমার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর। সুজাতা অনন্যর সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা করেনি, সেটুকু আমি জানি। এখন নতুন করে বন্ধুত্ব হয়েছে ওদের?

অনন্যর কথা ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। জীবনে সেরকম কিছু করতে পারেনি অনন্য। আমাকে হিংসে করে, তা বুঝতে পারি। সুজাতার কথা তুলে আমাকে খোঁচা মারতে চায়।

কলকাতায় একটা বেশ বড় টেন্ডারের স্পেশিমেন ইন্সপেকশানের জন্য দু-তিন দিন থাকতে হল। শ্বশুরবাড়িতে না উঠে গভর্নমেন্টের টাকায় গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে রইলাম। সেখানে অর্জুন চৌধুরী নামে একজন লোক কার্ড পাঠিয়ে দু-তিনবার দেখা করতে চেয়েছে, আমি পাত্তা দিইনি। পার্টির কোনও লোকের সঙ্গে এই সময় দেখা করা নিয়ম নয়।

দুর্গাপুরে ফেরার পর সেই অর্জুন চৌধুরী একদিন অফিসে এসে হাজির হল। বেশদীর্ঘকায়, সুপুরুষ, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। নাম দেখে বুঝতে পারিনি, দেখেই চিনেছি। সুজাতার ছোড়দা, এঁকে আমরা বলতুম মন্তাদা, বেশ ভালো ক্রিকেট খেলতেন। সেই ভুরু তুলে কথা বলার ভঙ্গি। একটা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে আমি বললুম, বসুন মিঃ চৌধুরী, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর। ইউ?

মুখে একটা জ্বলন্ত পাইপ। আর কোনও কোম্পানির লোক আমার ঘরে পাইপ মুখে দিয়ে কথা বলার সাহস পায় না। অন্যদের মুখে একটা তেলতেলে হাসি লেগে থাকে, মন্তাদা এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন তিনি আমাকেই দয়া করতে এসেছেন।

আমার কাছে উনি কিছু সুযোগ সুবিধে চাইতে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু প্রথমেই সেকথা তুললেন না। পুরোনো বনেদিয়ানা, ভাঙবে তবু মচকাবে না। মিনিটদশেক ধরে আমার সঙ্গে কাজের কথা বলে গেলেন।

আমার পুরোপুরি সরকারি ব্যবহার দেখে মন্তাদা এক সময় বললেন, এক্সকিউজ মি, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি, আপনি অনীশ রায়, মানে, তুমি কি সুজাতার বন্ধু সেই অনীশ?

হ্যাঁ কিংবা না কিছুই না বলে আমি শুধু একটু হাসলুম।

মন্তাদা বললেন, তোমাকে আমাদের বাড়িতে কয়েকবার দেখেছি। একবার আমাকে ক্যারাম খেলে হারিয়ে দিয়েছিলে! মনে আছে। আমি সুজাতার ছোড়দা।

অর্থাৎ মন্তাদার ভাবখানা এমন, আমি সুজাতার ছোড়দা, এবার তুমি বুঝে নাও আমাকে কতখানি সাহায্য করবে! সব দায়িত্ব তোমার।

আমি তবুও কোনও মন্তব্য করলুম না।

মন্তাদা আবার বললেন, সুজাতা এখন বম্বেতে আছে জানো তো? শিগগিরই একবার কলকাতায় আসবে। ও তো আবার বিয়ে করল!

আমার ভুরু দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। আবার মানে? অনন্য বলেছিল সুজাতা বিয়েই করেনি। অনন্যটা এক নম্বরের মিথ্যেবাদী!

মন্তাদা চলে যাওয়ার পরই আমি উৎপল ব্যানার্জিকে ডেকে পাঠালুম। মাঝখানে উৎপলের নামে একটি পার্টি মামলা করেছিল বলে ওর প্রোমোশন আটকে গেছে। এখন উৎপল আমার সাবর্ডিনেট, সুতরাং আমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। অথচ হাসিমুখে কথা বলে।

যে-ফাইলটায় মন্তাদার স্বার্থ আছে, সেটা উৎপল ব্যানার্জির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললুম, এই কেসটা পুরোপুরি আপনিই ডিল করবেন। আপনার সিদ্ধান্তই ফাইনাল। আমার মতামত নেওয়ারও কোনও দরকার নেই।

ফাইলটা নিয়ে উৎপল ব্যানার্জি দরজার কাছে যেতেই আমি আবার মত বদলে ফেলে বললুম, আচ্ছা দাঁড়ান, ফাইলটা বরং ছমাস পেন্ডিং রাখুন। ওই আইটেমটা তেমন জরুরি নয়। পার্টিরা খোঁজ নিতে এলে বলবেন, আমরা একসঙ্গে আরও বেশি মালের অর্ডার দেব, অন্তত লাখ। পঞ্চাশেক হবেই, তবে এখন না, ছমাস বাদে। টেন্ডারের ওপেনিং-এর তারিখ পিছিয়ে দিন।

মন্তাদাকে হতাশকিংবা খুশি কোনওটাই করতে চাই না। তার চেয়ে ঝুলিয়ে রাখা অনেক ভালো। দেখা যাক, তাতে তার ভুরু নীচু হয় কি না!

আমার অনুমান মিথ্যে নয়। এক মাস বাদেই মন্তাদা আমার বাড়িতে একটা মস্ত বড় কেক আর দু-বোতল স্কচ পাঠিয়ে দিল। আমি কোন ব্র্যান্ডটা পছন্দ করি, তা পর্যন্ত গোপনে খবর নিয়েছে! এই তো নামতে আরম্ভ করেছে একটু-একটু করে। সুজাতার সঙ্গে যত দিন আমার ভাব ছিল, সেই। সময় আমি এক ফোঁটাও মদ্যপান করতুম না। পারমিতা ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা জন্মদিনের নেমন্তন্ন খেতে গেছে। এখানে জন্মদিন লেগেই থাকে। বাড়ি ফাঁকা। অনেকক্ষণ ধরে সুজাতা। আমার ঘরে এসে বসে আছে। আমি তার শরীরের পারফিউমের গন্ধও পাচ্ছি।

সুজাতার মুখে, বুকে চুমু খেতে কোনও বাধা নেই। সমস্ত শরীরে আমার শিহরন হচ্ছে। ঠিক যেন আমার সেই বাইশ বছর বয়েসে ফিরে গেছি!

বারো

সুজাতার সঙ্গে শেষপর্যন্ত সত্যিই দেখা হল। ঠিক বারো বছর পর।

কলকাতা শহরে ঘোরাঘুরি করলে চেনাশুনো কারুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়াটা আশ্চর্য কিছু না।

অফিসের কাজেই তিনটে মিটিং সেরে বিকেলের দিকে বেশ ক্লান্ত হয়ে এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে গিয়ে বসলুম পার্ক স্ট্রিটের এক রেস্তোরাঁয়। খানিকক্ষণ সময় কাটাবার জন্য। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল। রীতিমতন আকাশ ভাঙা বৃষ্টি। রাস্তায় এখনও জল জমেনি অবশ্য, কিন্তু এত বৃষ্টিতে বেরুনো যায় না। দ্বিতীয়বার বিয়ার নিতে হল।

সেই সময় ঢুকল সুজাতা। সঙ্গে আরও দুজন পুরুষ। কিছু একটা কথা বলতে-বলতে ওরা ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছিল। আমি ঠিক দরজার সামনের টেবিলেই বসেছি বলে সুজাতার সঙ্গী একজন পুরুষের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল। নাম মনে নেই, তবে লোকটিকে আমি দু বার দেখেছি কোথাও। সামান্য মুখ চেনা। কিছু একটা ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত।

সেই লোকটা হঠাৎ প্রবল উৎসাহের সঙ্গে বলল, এই যে অনীশবাবু, আপনি কলকাতায়? কবে দুর্গাপুর ফিরছেন? আমি আগামী সপ্তাহে একবার যাব ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে।

আমি বললুম, হ্যাঁ, আসবেন। তার মধ্যে ফিরে যাব।

সুজাতাকেও দাঁড়াতে হয়েছে। সে আমাকে এড়াবার কোনও চেষ্টা না করে মুখে অনেকখানি হাসি ফুটিয়ে বলল, অনীশ! কত দিন পরে দেখা। কেমন আছ?

আমিও হেসে বললুম, ভালো! তোমার খবর কী, সুজাতা?

সুজাতা বলল, আমার খবর ভালোই। ছোড়দার মুখে শুনছিলুম, তুমি দুর্গাপুরেই থাকো।

এরপর আরও দু-চারটি সামান্য টুকিটাকি কথাবার্তা। তারপর সুজাতা ও তার সঙ্গীরা চলে গেল একটা ভেতরের টেবিলে।

মানুষ কত মিথ্যে কথাই বলে! সুজাতার জন্য আমি সর্বক্ষণ জ্বলছি, আজ সকালেও অনেকক্ষণ চিন্তা করেছি তার কথা, অথচ তাকে স্বচক্ষে দেখবার পর মামুলিভাবে বললুম, ভালো! এক বৃষ্টির দিনে সুজাতা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, আর-এক বৃষ্টির দিনে তার সঙ্গে আবার দেখা। আমি আর অপেক্ষা না করে সেই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়লুম।

সুজাতা অন্য এক টেবিলে অন্য লোকদের সঙ্গে বসে আছে, এটা আমার সহ্য হচ্ছেনা। আমি সামান্য ইচ্ছে প্রকাশ করলেই সেই টেবিলের লোকেরা আমাকে খাতির করে ডেকে নিয়ে যেত। কিন্তু সুজাতার সঙ্গে কথা বলার কোনও আগ্রহও তো আমার নেই। আমি যখন একা থাকি,

তখনই সুজাতাকে খুব নিবিড় করে পাই। অন্য সময় আমি পারমিতার স্বামী। আমি একজন ব্যস্ত মানুষ, অনেকের চোখে আমার বেশ গুরুত্ব আছে!

সুজাতা কলকাতায় এল কেন? এক শহরে আমার আর সুজাতার একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। আজই দুর্গাপুরে ফিরে যেতে হবে।

সুজাতা আমার কেউ না!

তেরো

অনন্যর সঙ্গে দেখা হতেই সে প্রায় বিনা ভূমিকায় দশ হাজার টাকা ধার চাইল।

আমি চোখের একটাও পাতা না কাঁপিয়ে ব্রিফ কেস খুলে ক্যাশ পাঁচ হাজার টাকার নোট তুলে দিলুম ওর হাতে। কেন সে চাইছে, সে সম্পর্কে আমার কোনও আগ্রহ নেই। দশ হাজারই দিতে পারতুম, সঙ্গেই ছিল, কিন্তু ওইটুকু অপমান না করলে চলে না। জানি অনন্য ও-টাকা কোনওদিন ফেরত দেবে না, আমিও আশা করি না। তা ছাড়া, যারা ধার চায়, তারা একটু বাড়িয়েই চায়। আমাদের কলেজ জীবনে অনন্য ওর বাবার গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াত। টাকা ওড়াত দু-হাতে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে বলে আমার প্রতি ওর একটা অবজ্ঞার ভাব ছিল। অনন্যকে টাকা ধার দিয়ে আমার মেজাজটা বেশ প্রসন্নই হল। অনন্যর কাঁধ চাপড়ে বললুম, চল, গ্র্যান্ড হোটেলে আজ ডিনার খাই। অনেক দিন আড্ডা মারা হয়নি।

যারা একসময় আমাকে গরিব বলে জানত, তাদের সামনে বড়লোকি দেখাতে না পারলে আর টাকা রোজগার করে লাভ কী?

অনন্য যে সুজাতার ব্যাপারে আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিল, সেজন্য আমি কিছু মনে করিনি। ও তো কোনও-না-কোনও দিক থেকে জিতবার চেষ্টা করবেই।

খানিকটা মদ পেটে পড়তেই অনন্যর মুখ থেকে আসল গল্পটা বেরিয়ে এল। লন্ডনে সুজাতা একজন ইংরেজকে বিয়ে করেছিল। এক বছরের মধ্যে সেপারেশান হয়ে যায়। তারপর বম্বেতে সুজাতাকে বিয়ে করবার জন্য তিনজন লোক খুব খেপে উঠেছিল। তাদের মধ্যে একজন খুবই। বিদগ্ধ মারাঠি। শেষপর্যন্ত অবশ্য সুজাতা একজন বাঙালিকেই বিয়ে করেছে দু-বছর আগে, কিন্তু সেই বিয়েটাও খুব সার্থক হয়নি। অনন্যর ধারণা, ও যদি আগেই একটা বাজে বিয়ে না করে ফেলত, তাহলে নির্ঘাত সুজাতা ওরই ঘরণী হত।

বিবাহিত জীবনে সুখ পায়নি সুজাতা, তা জেনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সুজাতার মতন মেয়ের একটা সুন্দর জীবন প্রাপ্য ছিল। আমার সঙ্গে যদি দৈবাৎ বিয়ে হত সুজাতার, তা হলেও কি সে সুখী হত? সুজাতা আমার স্ত্রী হলে ঘুষ নিতাম না, বড়লোক হতুম না, আমি একজন আদর্শবাদী, মধ্যবিত্ত, কিছুটা তিক্ত মানুষ হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতুম। সে জীবন কি সুজাতারও কাম্য হত?

সুজাতার দ্বিতীয় স্বামী ওর ছোড়দা মন্তাদার সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যাবসা করে বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করছে। আঃ ওদের আমারই কাছে আসতে হবে কেন? এটা আমার মোটেই পছন্দ নয়। ওদের কোনও ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাতে চাই না, আমি প্রতিশোধ নিতে চাই না। আবার আমি ইচ্ছে করলেই একটা বড় অর্ডার পাইয়ে ওদের ব্যাবসাটা দাঁড় করিয়ে দিতে পারি।

সুজাতা যেন তার স্বামী কিংবা ছোড়দার হয়ে আমার কাছে কোনওদিন অনুরোধ করতে না আসে! সুজাতার ততখানি অধঃপতন কিছুতেই আমি সহ্য করতে পারব না!

চোদ্দো

এক বছর আগেও মনে হয়েছিল, রক্ত-মাংসের সুজাতার সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হবে না। পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় সুজাতার সঙ্গে দেখা হওয়ার দিন দশেক বাদে আমার সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল।

বিনা কারণে দুর্গাপুরে অফিস করতে-করতে হঠাৎ বেরিয়ে এসে, পারমিতাকে লোক মারফৎ খবর পাঠিয়ে, আমি চলে এলাম স্টেশনে। কলকাতায় পৌঁছেই ট্যাক্সি নিয়ে সোজা এলগিন রোডে সুজাতাদের বাড়ি।

মন্তাদা যে আমাকে আকস্মিকভাবে দেখেও দারুণ খুশির ভাব দেখাবেন, তা আমি জানতুম।

রীতিমতো হইচই করতে লাগলেন। সুজাতাকে ডাকলেন, বড়দাকে ডাকলেন। আমি এ-বাড়িতে গণ্যমান্য অতিথি। একসময় আমি এ-বাড়িতে যখন আসতুম, একমাত্র সুজাতা ছাড়া অন্য কেউ বিশেষ পাত্তাই দিত না। আমার চেয়ে অনন্য, গৌতমদের বেশি খাতির ছিল, কারণ ওদের বাবারা ছিলেন কলকাতায় কেষ্ট-বিষ্ণু ধরনের। এখন আমার বেয়াদপি করারও অধিকার আছে। আমাকে একতলার ঘরে বসিয়ে চা-টা খাওয়ানো হচ্ছিল, হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সুজাতার দিকে তাকিয়ে বললুম, চল, তোমার ঘরে যাই! তোমার সঙ্গে আমার বিশেষ কথা আছে!

অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে আজে-বাজে কথা বলতে আমার ইচ্ছে করছে না। আমার পকেটে কলম। একখানা সইতেই মন্তাদা আর সুজাতার স্বামীর ব্যাবসা দাঁড়িয়ে যেতে পারে। আমি এ-বাড়িতে নিজে থেকে এসেছি, তাতেই ওরা ধরে নিয়েছে যে অনেকখানি কাজ হয়ে গেছে!

সুজাতার বরটি কোথায়? তাকে তো দেখছি না। তাকে দেখবার আগ্রহও আমার নেই।

সুজাতা কিছু বলার আগেই আমি ওপরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালুম।

মন্তাদা, আর বড়দারা সামান্য আপত্তিও জানাল না। হাসি-হাসি মুখে চেয়ে রইল। ওদের সামনে দিয়ে আমি কাঠের সিঁড়িতে ধপধপ শব্দ করতে-করতে উঠে গেলুম ওপরে।

ঘরখানা ঠিক আগের মতনই আছে। জানলার ধারে খাট পাতা। দরজার পাশটায় টেবিল ও চেয়ার। দু-দিকের দেওয়াল জোড়া রংকে প্রচুর বই। খুঁজলে ওর মধ্যে আমারও কিছু বই পাওয়া যাবে হয়তো, সুজাতার কাছ থেকে শেষপর্যন্ত বইগুলো ফেরত নেওয়া হয়নি।

দরজাটা বন্ধ করে দিলেই বা ক্ষতি কী?

একটা পাল্লা শুধু ভেজানো রইল। আমরা দুজনেই চুপ করে রইলুম বেশকিছুক্ষণ। ঠিক কোনও কথা তা ভেবেও আসিনি। শুধু সুজাতাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করেছিল।

সুজাতার চেহারা অনেকটাই আগের মতন আছে। দুটি বিবাহের ছাপ পড়েনি। মেদহীন, উন্নত শরীর। চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার। জীবনের কাছ থেকে এই নারীর অনেক কিছু প্রাপ্য ছিল।

একটু পরে সুজাতা জিগ্যেস করল, তুমি কি অনেক বদলে গেছ, অনীশ?

আমি জোর দিয়ে বললুম নিশ্চয়ই! আগে আমি একটা বোকা, ইডিয়েট ছিলুম!

মুচকি হেসে সুজাতা বলল, এখন বুঝি অনেক বুদ্ধিমান হয়েছ? অবশ্য তোমার মুখ দেখলে মনে হয়, বেশ প্রাকটিক্যাল হয়েছ ঠিকই।

সুজাতা, তোমার মনে আছে, ঠিক ওইখানে দাঁড়িয়ে, এক যুগ আগে তুমি আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিলে, এখন নয়। এখনও সময় হয়নি!

অনীশ, সেই সামান্য কথা তোমার এত দিনেও মনে আছে?

মনে থাকবে না? সেটা সামান্য কথা! সেই থেকে তুমি আমাকে বন্দি করে রেখেছ!

তার মানে?

আমি সুজাতার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম। সুজাতা আমার এত কাছে? এখনও যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না! আমি টের পাচ্ছি, আমার বুক ধকধক করছে, মুখের চামড়া টানটান, নিশ্বাস পড়ছে দ্রুত।

লোকে যাকে সার্থকতা বলে, তার সবই তো এসেছে আমার জীবনে। তবু সবসময় মনে হয়,

জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেল। বারোটা বছর এই মেয়েটা আমাকে একটা গভীর অতৃপ্তির মধ্যে রেখে দিয়েছিল। আবার কি আমরা সেই বারো বছর আগে ফিরে যেতে পারি?

সুজাতা বলল, বসো, অনীশ। কত কথা জমে আছে। তোমার সব খবর বলো। তোমার বাড়ির কথা বলো।

আমি অস্থিরভাবে বললুম, আমার আর কিছুই বলার নেই। এই ঘরে এসে শুধু একটাই কথা মনে পড়ছে, তুমি আমার মুখে হাত দিয়ে বলেছিলে, এখনও সময় হয়নি! তুমি সময়ের কাছে আমাকে সত্যিই বন্দি করে রেখেছ!

সুজাতা বলল, যাঃ, তা কখনও হয়! মানুষের জীবনে ওরকম কত ছোটখাটো ঘটনাই তো ঘটে!

পৃথিবীর কোনও মেয়েকে আমি আর চুমু খেতে পারিনি। যাঃ, এটা তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে বলো? তুমিই তো বললে, তুমি আর বোকা নেই। তুমি সেন্টিমেন্টালও নও, প্র্যাকটিকাল। বন্দি-টন্দি আবার কী?

মিথ্যে বলিনি, সুজাতা। অন্য দু-একটি মেয়েকে চুমু খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু তুমি যেটাতে বাধা দিয়েছিলে, বলেছিলে সময় হয়নি, সেটা পাইনি বলে আর কোনও চুম্বনেই স্বাদ নেই। এরকম সত্যিই আমার মনে হয়।

ওটা ছিল একটা কথার কথা। অল্প বয়েসের লজ্জা। তার কি কোনও গুরুত্ব আছে? তুমি আমাকে কত অপমান করেছিলে অনীশ, আমি তো সেটা মনে রাখিনি!

আমি তোমায় অপমান করেছি? কক্ষনো না! তুমিই বরং, অদ্ভুতভাবে একদিন চলে গেলে। সেই বৃষ্টির দিন, আমি তোমার হাত ধরতে গেলে তুমি ঘৃণার সঙ্গে বলেছিলে, তুমি আমার সঙ্গে এসো না! মনে নেই?

মনে থাকবে না? কিন্তু কেন ওরকম ব্যবহার করেছিলাম?

সেটা তুমিই জানো! আজও আমি সেই উত্তরটা খুঁজছি!

থাক, ওসব কথা আর তুলে লাভ কী? দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বসো, অনীশ!

না, বলো, কেন সেদিন অমন ব্যবহার করেছিলে? এখন বললে ঠিক বোঝা যাবে না। এখন মনে হবে, সবটাই ছেলেমানুষি! কিন্তু তখন সাংঘাতিক রাগ হয়েছিল। তুমি আমাকে পুরী নিয়ে যেতে চেয়েছিলে, এক হোটেলে। তুমিই যেতে চেয়েছিলে। আমি উটি যাওয়া ঠিক করে ফেলেছিলুম বন্ধুদের সঙ্গে, তুমিই বললে পুরীতে।

হ্যাঁ, বলেছিলুম। তখন আমার কী-ই বা বয়েস। যদি ঝোঁকের মাথায় বলেই থাকি, তুমি অমনি রাজি হবে? তুমি নিশ্চয়ই আমাকে খারাপ মেয়ে ভাবতে!

এর মধ্যে খারাপের কী আছে? তুমি নিজে আমার সঙ্গে পুরী বেড়াতে যেতে চাইলে।

এখন হয়তো কিছুই খারাপ মনে হবে না। সময় বদলে গেছে। এখন অনেক ছেলেমেয়েরা যায়। কিন্তু বারো বছর আগে, আমাদের মতন রক্ষণশীল বাড়ি, তবু তুমি ভেবেছিলে, বিয়ের আগেই আমার মতন মেয়েকে কোনও হোটেলে নিয়ে গিয়ে ফুর্তি করা যায়। আমার এমন অপমান। লেগেছিল।

সেই তুচ্ছ একটা পুরী যাওয়ার কথা নিয়ে তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে? আমি

তোমাকে খারাপ মেয়ে ভাবব কেন? আমার মনে হয়েছিল, তুমি আমার চেয়েও সাহসী…

আমি অন্যদের সঙ্গেও খোলামেলাভাবে মিশতুম, কিন্তু তুমি ছিলে আমার কাছে সবচেয়ে আপন, অনীশ। কিন্তু তুমি যদি আমাকে সহজলভ্যা মনে করো, সেটা আমার কাছে অপমান নয়?

সুজাতা, আমি তোমাকে পুরী নিয়ে যাওয়ার কথা একবারও মুখ ফুটে বলিনি। আমার টাকা পয়সা ছিল না। তোমার শখ হয়েছিল বলেই আমি…

তুমি কেন আমাকে বারণ করোনি, অনীশ? তুমি তো তারপর একবারও আমার কাছে আসনি? এত তোমার অহংকার?

তুমি বিলেতে চলে গেলে, আমাকে একবার জানালেও না!

তুমি বারণ করলে আমি কিছুতেই বিলেত যেতুম না। থাক, থাক, উত্তেজিত হোয়োনা, অনীশ। বসো আমরা গল্প করি। অন্য কথা বলি। আমাদের জীবন দু-দিকে ঘুরে গেছে, অনেক আলাদা হয়ে গেছে।

সুজাতা, আমার জীবনটা যেদিকে গেছে, সেদিকটা আমি মোটেই চাইনি। তুমিই সেদিকে ঠেলে দিয়েছ আমাকে। ঠিক যেন তুমি আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলে। তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনতে পারো না?

অনীশ, এখন কি আর তা হয়! আর কিছুই মিলবে না। আমরা এখন অন্যরকম।

আমি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সুজাতার একটা হাত চেপে ধরে বললুম, আমি অন্য কিছু জানি না; আমি তোমাকে চাই।

সুজাতা ফ্যাকাশেভাবে হেসে বলল, আমি একটা সামান্য মেয়ে!

আমি প্রায় বাঘের মতো গর্জন করে বললুম, আমার জীবনটা তুমি পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে? আমি তোমাকে চাই!

কোনওদিন জোর করিনি সুজাতার ওপর, আজও সেটা সম্ভব নয়। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলুম ওর চোখের দিকে।

সুজাতা আস্তে-আস্তে বলল, আমার কী ভুল হয়েছিল, আমি জানি না। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে গেল। আমার জীবনটা আর আমার নয়!

আমার নিশ্বাসে আগুনের হলকা বেরুচ্ছে, আমার শরীরটা কাঁপছে, আমি যেন এক অল্প বয়েসি প্রেমিক, আর অপেক্ষা করতে পারছি না। কাতর গলায় বললুম, তোমাকে একবার অন্তত নিজের করে পুরোপুরি না পেলে কিছুই পাওয়া হবে না আমার জীবনে। আর সবকিছু আমার কাছে বিস্বাদ লাগে।

সুজাতা বলল, শুধু শরীরটা পাওয়া মানেই কি পাওয়া?

আমি জোর দিয়ে বললুম, হ্যাঁ, শরীর! শরীর! তোমার ওই শরীরের মধ্যেই আমার মুক্তি! সুজাতা এগিয়ে এসে আগেকার মতন আমার গালে হাত দিয়ে আদর করল।

তারপর জানলাটা ভেজিয়ে দিয়ে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিল। বুক থেকে আঁচলটা খসে পড়ল ওর। সুজাতা আবার বলল, আমি একটা সামান্য মেয়ে।

এত সহজ? বারো বছরের যন্ত্রণাটা কি তাহলে কিছুই না? এক্ষুনি সুজাতাকে আমি পেতে পারি? সুজাতার ভেজা-ভেজা ঠোঁটে ঝিলিক দিচ্ছে, স্পষ্ট আহ্বান। লাল রঙের ব্লাউজের ফাঁকে উপছে। উঠেছে স্বর্ণ রঙের বুক। এখন আর কল্পনায় নয়, ওই ঠোঁটে, ওই বুকে আমি মুখ রাখতে পারি সত্যি-সত্যি। একেবারে বাস্তব!

কিন্তু এত সহজ! মাঝখানের বারোটা বছর তাহলে কোথায় গেল? এ কি আমার সেই সুজাতা, না অন্য কেউ?

সুজাতার বুকের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আমি চোখ বুজলাম। ইস, কী সাংঘাতিক। ভুলই না আমি করতে যাচ্ছিলুম?

ঘুরে দাঁড়িয়ে আমি খুলে দিলুম দরজার ছিটকিনি।

সুজাতা বলল, এখন এখানে কেউ আসবে না।

আমি অট্টহাসি করে বললুম, পাগল নাকি! সন্ধে সাতটার সময় দরজা বন্ধ করে এইসব, যাঃ তা কি হয়! আমি ইয়ার্কি করছিলুম তোমার সঙ্গে। চলো, নীচে যাই, সবার সঙ্গে গল্প করি।

সুজাতাকে আর কোনও কথা বলতে না দিয়ে আমি তরতর করে নেমে আসতে লাগলুম সিঁড়ি দিয়ে।

আসলে আমি পালাচ্ছি আমার ভুল থেকে। এত দিন তবু আমার কল্পনায় একজন নারী ছিল, যার চুম্বন সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যার কথা চিন্তা করলেই আমার রোমাঞ্চ হয়। সুজাতার শরীরটা

সত্যিকারের পেয়ে যদি আমার সেরকম না লাগে? যদি মনে হয়, সে-ও অন্য মেয়েদেরই মতন। তাহলে আমি আমার সেই কল্পনার নারীকেও চিরকালের মতন হারিয়ে ফেলব যে! সুজাতা। এখনও তিনতলার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু বুঝতে পারছে না। না বোঝাই ভালো। আজ পর্যন্ত বোধহয় আর কোনও পুরুষ এত কাছাকাছি এসেও ওকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সুজাতার বিস্ময়টা আমি উপভোগ করছি। ও নিজের হাতে দরজার ছিটকিনি দিয়েছিল, আমি সেটা খুলে দিয়েছি।

এরপর অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে যখন সুজাতা ঘনিষ্ঠ হবে, তখন কি মনে পড়বে আমার কথা? একটা অতৃপ্তি ওকে কুরে কুরে খাবে? যদি তা-ই হয়, তবে সেটাই আমার জয়।

আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি, খুব জোরে, সুজাতার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে, যেন আর দেখা না হয়, আর সিঁড়িগুলো ফুরোচ্ছে না কেন?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel