Sunday, March 29, 2026
Homeবাণী ও কথামণিমালা - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

মণিমালা – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

তপোময়ের লেখালিখি মাথায় উঠেছে। কিছুই লিখতে পারছেন না। কিছুটা হতাশাও। বয়স হয়ে গেলে এমনই বুঝি হয়। গত তিন-চার মাসে তিনি একটা লাইনও লেখেননি। লেখার কোনো প্রেরণা পাচ্ছেন না— প্রেক্ষিতবিহীন এক শূন্যতার মধ্যে তিনি ডুবে যাচ্ছেন। তিনি চুপচাপ বসে থাকেন জানালায়। স্ত্রী মণিমালা সব টের পায়। আবার সেই অর্থহীন দৃষ্টি। মানুষটা তার জানালায় চুপচাপ কী দেখছে। সেই এক শূন্যতার শিকার তপোময়। মণিমালার ভয় হয়।

কোথাও থেকে ঘুরে এস না!

কোথায় সেটা।

কোনো পাহাড়ে, কিংবা নদীর ধারে।

ঘুরে কী হবে! লিখতে বসলে যে শব্দই খুঁজে পায় না, শব্দরা কেমন হারিয়ে যাচ্ছে। গদ্যের প্রয়োজনে যথার্থ শব্দটি কুয়াশায় কেমন ঢেকে যায, তুমি ঠিক বুঝবে না মণি— এই ব্যর্থতা যে কী নিঃসঙ্গতা সৃষ্টি করে! বড়ো কষ্ট হয়।

বাজে কথা রাখো তো। আসলে দিন দিন কুড়ে হয়ে যাচ্ছ। যশ প্রতিপত্তি সবই অর্থহীন মনে হলে এটা হয়।

মণি, লেখার চাপ বাড়লে আমার মাথা ঠিক থাকে না।

না লিখলেই পারো। কিছুদিন বিশ্রাম নাও। অনেক তো লিখলে, লেখার চাপে মাথা খারাপ করে বসে থাকলে শরীরের ক্ষতি, বোঝ না।

তপোময়ের মুখে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা—এই চারপাশ, এই মানুষজন, এবং এই জীবনের কুহেলিকা তাকে কত কিছু লিখিয়েছে। নাম যশও কম হয়নি। আর কেন যে এ সময়ই এক ভীতি গ্রাস করছে তাঁকে, লেখা যদি নিম্নমানের হয়ে যায় তার গদ্যের ভাঙচুরে যে আশ্চর্য মোহ আছে যদি তার প্রকাশ আর ঠিকঠাক না হয়! এই শব্দসমূহ যদি চরিত্রের প্রাণ সৃষ্টি করতে না পারে! তাজা এবং জীবনের ঐশ্বর্য যদি চরিত্রে ধরা না যায় তাঁর জীবনপ্রণালী থেকে জন্মানো শব্দকণার যাবতীয় সৌন্দর্যকে তিনি যদি দক্ষ স্বর্ণকারের মতো গেঁথে দিতে না পারেন যাতে চরিত্রটি জীবন্ত এবং শ্রীহীনতায় শ্রীময় হয়ে উঠতে পারে কোনো এক সমালোচক যে তাঁর গল্প সম্পর্কে আরও লিখেছেন—তিনি গল্পের ছাঁচ মানেন না, ক্রাফটের ব্যাকরণেরও ধার ধারেন না— এক আশ্চর্য রোমান্টিক বোহেমিয়ানিজম কাজ করে যায় তাঁর বিবৃতিতে, মাঝে মাঝে বিবৃতির ছলনায় উড়িয়ে দেন জীবনের সব নির্ধারিত সত্যকে। বোধ হয় আঙ্গিক হিসাবে ছোটো গল্পের নিজের দেহেই রয়েছে এক অপরিমেয়তা। কোনো সংজ্ঞায়ই একে ঠিকমতো সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এর ব্যাপ্তি বিপুল, সম্ভাবন অসীম, বৈচিত্র্যে অনন্ত। অথবা নক্ষত্রের মতো দূরাতীত রহস্যে ঘেরা এই সব গল্প সেই অনন্তকে স্পর্শ করতে চায়।

আসলে এটাই তাঁর আতঙ্ক যদি গল্পের চরিত্র সেই অনন্তকে স্পর্শ করতে না পারে। শব্দের এত আকাল, সে যে কী করে!

এই সময় সহসা একটা মুখ জানালায় ভেসে উঠল। একজন খোঁড়া মানুষ লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ যেন খুবই চেনা। ঠিক চিনতে পারেছেন, গোপাল মামা। স্মৃতিতে গোপাল মামা হাজির হলে তার সব মনে পড়ে। তখন তো তিনি আই. এ. পাস করেছেন সবে। কলকাতায় ভেসে বেড়াচ্ছেন। আত্মীয়স্বজনের বাসায় কখনো দু-বেলা আহার জুটে যেত। চিনি কাকা, টুক্তি পিসি, ভালো কাকা, নেপাল মামা এই সব ছিল তার ঠিকানা। আত্মীয় ঠিক, তবে তাদেরও কিছুটা দারিদ্র্য আছে। একবেলা দু-বেলা থাকার পর তারই সঙ্কোচ হত। বেকার যুবকের যা হয়ে থাকে। গোপাল মামা, নেপাল মামা তার মায়ের দুই ছোটো ভাই। বরানগরের রতনবাবু রোডে, দু-জনই আলাদা থাকে–মামিরা দেখতে খুবই সুন্দরী। নেপাল মামার শিফট ডিউটি। গোপাল মামার নাইট ডিউটি, কাশীপুর গানশেলের ঝালাই-এর কাজ করে। সপ্তাহে মাইনে। ফুরনে কাজ। পঁচিশ-ত্রিশ টাকা হপ্তায়। প্রবল নেশাভাঙের অভ্যাসও আছে। কোনো সন্তান নেই।

দেশ থেকে চিনিকাকার ঠিকানায় বাবার চিঠি এল।

খোকা, তোমার গোপাল মামার চিঠি এসেছে। তুমি কোথায় থাক কলতাতায়, কী করছ, কোথাও চাকরি জোটাতে পারলে কি না, আই. এ. পাস করে বসে থাকা অন্যায়, তোমার বাবাও যে বেকার, এই সব কারণে গোপাল খুবই চিন্তিত। দিদি যে ভালো নেই, অভাবে অনটনে দুবেলা ভাত জোটানো দায়, তার আই. এ. পাস ছেলে কলকাতায় বেকার, সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। আই. এ. পাস সোজা কথা! ফ্যাক্টরির বাবুরা আই. এ. পাস তো দুরের কথা, কেউ কেউ কোনও পাসই না। তাদের কী রোয়াব। শেষে তোমার গোপাল মামা লিখেছেন, তপাকে আমার বাসায় আসতে বলবে। আমার সঙ্গে যেন দেখা করে। আমি ফ্যাক্টরিতে চলে গেলে চানু একা থাকে। পাশের বাড়ির রতন বুড়ি অবশ্য রাতে শোয়। এখানে এলে চেষ্টা চরিত্র করে গানশেলে ঠিক ঢুকিয়ে দিতে পারব। বাবুদের বললে তারা ঠিকই একটা ব্যবস্থা করবে।

ধীরে ধীরে কলকাতায় তাঁর আত্মীয় পরিজনের সংখ্যা বাড়ছে। এই করে গোপাল মামা নেপাল মামারও খোঁজ পাওয়া গেল। এক সকালে পিসিই তাঁকে ঠেলে পাঠালেন, যা একবার তোর মামার বাসায়। তোর পিসেমশাই সুরজমল নাগরমল অফিসে চেষ্টা তো করছে। কথাও দিচ্ছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কী করা। দ্যাখ তোর মামারা যদি কিছু করতে পারে।

ঠেলা না খেলে সে পিসির বাসা ছাড়ছে না এমন ভেবেই হয়তো সকালবেলায় ঠেলে প্রায় বাসা থেকে বের করে দিলেন পিসি।

চিনিকাকা আর ভালোকাকা ছাড়া তার আত্মীয় স্বজনরা সবাই যে বস্তিবাসী সে জানে এবং ভেবেছিল গোপাল মামা কিছুটা সচ্ছল, তাঁর বাসাবাড়িতে দালান কোঠা থাকতে পারে।

সেই জোড়ামন্দিরের নস্করবাড়ির বস্তি থেকে রওনা হওয়া গেল। পয়সার তখন খুব দাম। এক আনা দু-আনা হলে অনেকটা রাস্তা যাওয়া যায়। কিন্তু হাঁটার অভ্যাস থাকলে এক আনা দু-আনাও খরচ করতে খারাপ লাগে তার। বলতে গেলে কপদ শূন্য সে জোড়ামন্দির থেকে রতনবাবু রোড হেঁটেই মেরে দেবে ভাবল।

যে কটা আনি, দু-আনি পকেটে আছে থাক। কত যত্ন, আনি, দু-আনি না আবার হারায়। জোড়ামন্দির থেকে বরানগর পর্যন্ত রাস্তাটা তার চেনা। শিয়ালদহ, শ্যামবাজার হয়ে– এতটা হেঁটে ক্লান্ত লাগছিল খুব। খিদেও পেয়েছে। বাজারের পেছনের দিকের রাস্তাটা খোঁজা দরকার। বাজার পার হয়ে বাঁদিকে কাচা সরু গলিতে ঢুকে সে হতবাক। বাড়ির কোনো নম্বর নেই। নালা নর্দমা আর দুর্গন্ধ চারপাশে। মাটির দেয়াল, টালি না হয় খাপড়ার চাল। মশা-মাছিতে ভন ভন করছে। পথ চলতি মানুষজনের বিশেষ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই দুপুরের রোদে বস্তির মধ্যে কোনো আই. এ. পাস যুবা ঢুকে গেলে অস্বস্তিরই কথা। কী না কি মতলবে ঘুরছে।

কাকে চাই?

গোপাল চক্রবর্তী।

গাঁজালু গোপাল, না নাড়গোপাল।

আজ্ঞে ল্যাংড়া গোপাল।

গোপাল কে হয় তোমার? এখন আর সে শুধু ল্যাংড়া না। গাঁজা ভাঙও খায়। হাফ সাধু।

আজ্ঞে মাতুল।

কেমন মাতুল।

মায়ের সহোদর ভাই।

সোজা চলে যাও। সামনে গঙ্গা পাবে। শ্মশান পাবে। তার পরেই স্যাঁতলা ধরা বেওয়ারিশ মন্দির। গোপাল ওটা জবরদখল করে আছে। আর গ্যাঁজা যুক্ত আলু হয়ে আছে। গ্যাঁজালো গোপাল বলেই লোকে তাকে চেনে।

শ্মশান!

শ্মশান সংলগ্ন মন্দির।

সে খুবই ঘাবড়ে গেল। গ্যাঁজা যুক্ত আলু বিষয়টা যে কী তাও বুঝল না। তার পর কি না শ্মশান সংলগ্ন মন্দির। যত দূর চোখ যায় সার সার বস্তি তার পর আমবাগান, তার পর নদীর জল, তার পর মানুষপোড়া গন্ধ। খালি পেটে তার কেমন ওক উঠে আসছিল।

২.

নদীর পাড়ে বাড়ি।

শ্মশান লংলগ্ন বাড়ি তো নয়ই, বরং আমবাগানের এক কোনায় মন্দির এবং বাড়ি।

ঠিক বাড়িও বলা যায় না, কারণ বাড়িটার একাংশে মন্দিরের ত্রিশূল পোঁতা আছে।

চার পাশে পাঁচিল। কিছু জবাফুলের গাছ। পাঁচিলের পাশ দিয়ে নদীর পাড়ে পাড়ে রাস্তা। রাস্তাটা ধরে হেঁটে গেলে আলমবাজার জুট মিল।

সবে দেশ ভাগ হয়েছে। রিফিউজি বলে খালি জমিতে বসে পড়লেই হল। তবে গোপাল মামা দেশ ভাগের আগেই এ দেশে চলে আসে। দাদুর জমিজমা মেলা। পুত্রের প্রতি বিরাগভাজনের হেতু মাঝে মাঝেই দাদুর সিন্দুক থেকে টাকা চুরি করে উধাও হয়ে যেত। নাবালিকা স্ত্রীকে ফেলে শহরে গঞ্জে ঘুরে বেড়াবার স্বভাব ছিল মামার। সাধুসঙ্গ থেকে জুয়ার ঠেক এবং সব বিষয়ে কেমন বিপরীত ধর্ম।

কলকাতায় চানু মামিকে নিয়ে আসবে বলে একবার দেশে যায়। এবং মামিকে শেষে কোথায় নিয়ে তুলবে এই আতঙ্কে দাদু এবং আত্মীয়স্বজনেরা বাধা সৃষ্টি করলে–গোপাল তার সহধর্মিণীকে নিয়ে রাতে পালায়। চার ক্রোশ রাস্তা হেঁটে বারদির স্টিমারঘাট, তার পর নারাণগ’, তার পর গোয়ালন্দ-সারা রাস্তায় চানুকে এই বলে ভজিয়েছে—তোর ভাবনা কী। ডাইক্লিনিং খুলেছি। সে বাপের টাকা নষ্ট করেনি, বরং চানুর কথা ভেবেই রাতে তার ঘুম হয় না, দশ টাকা ভাড়ার এক কামরা ঘরও ঠিক হয়ে আছে, সুতরাং অতঙ্গের কোনো কারণ থাকতে পারে না।

কলকাতায় এসে মামার থিতু হতে যে দু-চার বছর কেটেছে, সে খবরও তপার কানে উঠেছে। কারণ তপা বাড়ি গেলেই মা কপালে করাঘাত করে মামার সব কুকর্মের কথা সহজেই বলত।

সব আত্মীয়স্বজনের কাছেই মামার জন্য দাদু যে খাটো হয়ে আছে, আরে চক্রবর্তী দাদা, আপনার বড়ো পুত্র নাকি বউ নিয়ে রাতে পালিয়ে গেছে।

তা গেছে, গেলে কী করব!

মা বলত, তোর দাদুর মুখে চুনকালি। কড়া পাহারা, তুমি যাও ঠিক আছে, চানু যাবে না। কোথায় নিয়ে কোন ঘাটে ফেলবে কে জানে। নিজেরই ঠাঁই নেই তার আবার কলকাতায় বউ নিয়ে থাকার বাসনা। এবং মামা সব রকমের অপকর্মে ওস্তাদ লোক।

পুত্রবধূর কপালে শেষে কী লেখা আছে কে জানে।

দাদু বিষয়ী লোক, তার বড়ো পুত্র শেষে এতটা উচ্ছন্নে যাবে, অভাব তো ছিল, জমিজমা, কালীবাড়ির বিষয়-আশয় দাদর পক্ষে একা সামলানোও কঠিন। নিত্যপূজা, শনিবার, মঙ্গলবার মানতের শেষ ছিল না—পাঁঠাবলি, কিংবা কেউ কালীবাড়ির মাঠে পাঁঠাও ছেড়ে দিয়ে যেত, এত সব থাকতেও পুত্রটির দুর্মতিতে কাহিল দাদু, দেশভাগ হয়ে গেলেও এত বিষয়-আশয় ফেলে এ দেশে তার পক্ষে আসা সম্ভব নয়, ছোট পুত্র নেপালও এক সকালে জানিয়ে দিল দাদা চিঠি দিয়েছে, উইমকো ফ্যাক্টরিতে তার কাজ ঠিক হয়েছে। সে চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়। থাকার এক কামরার বাসায় এসে উঠলে দু-ভাই আর চানু মিলে ঠিক সংসার চালিয়ে নিতে পারবে, গাঁয়ে পড়ে থাকলে পচে মরতে হবে–কে চায় গাঁয়ে থেকে পচে মরতে।

অবশ্য এই সময়ের মধ্যে ডাইক্লিনিং লাটে উঠেছে। বরানগরের বাজারে তরকারি বিক্রির কারবারে লেগে গিয়েও সুরাহা করতে না পারায়, চানুমামিই সাহস জুগিয়ে গেছে।

গানশেলে লোক নিচ্ছে।

কে বলল?

সমর কাকা।

বীরেনবাবু।

উনি তো গানশেলের মনিব। উনি বললেই হয়ে যাবে।

আরে ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে বলেছে-বউদি গোপালকে পাঠিয়ে দেবেন। দাদাকে রহমান সাহেব চেনেন।

কী সূত্রে।

দেশের কালীবাড়ির সুত্রে!

রহমান সাবের বাড়ি কোথায়?

দুপতারায় বলল।

হাজি সাহেবের বাড়ির লোক।

অত সব জানি না। বড়দি, মেজদি, সেজদি-র কথাও বলল। সবাইকে চেনে। দেশের মানুষ ছ্যাঁচড়। কাজ করে বেড়াবে। রহমান সাহেবের নিজেরই যেন অপমান।

তার ক্ষমতা কত।

আরে তিনি ওয়েলফেয়ার অফিসার।

বীরেনবাবু তারও চেনা। আলু, পটল, কুমড়ো যখন যা দরকার বীরেনবাবু তার দোকান থেকেই নিতেন। তাজা সবজির সুনামও ছিল—ধার বাকিতে যে যা চেয়েছে দিয়েছেন, ব্যাবসা না বাড়ালে চলে না—যত বেশি বিক্রি তত বেশি লাভ। লাভের গুড়ি পিঁপড়েয় খায়, ধার দেনায় শেষে মাথা খারাপ—উপারে জোর কম, বাঁ পা সরু লিকলিকে, তার পর খাটো, হাঁটতে গেলে পা সোজা পড়ে না, ঘুরিয়ে পড়ে। তবে গোপাল ল্যাংড়া হলে কী হবে, তার বউ চানু খুবই সুন্দরী, বড়ো কষ্টে থাকে, কী আর করা, চানুর চোখের দিকে তাকালে বড়ো মায়া হয়। দুপতারায় যে গোপালের বাড়ি—ঢাকা জেলার লোক রহমান সাহেব, শ্বশুরের সম্পত্তি, পার্ক স্ট্রিটে বাড়ি, খুবই মেহমান আদমি, সেই সুবাদে বীরেনবাবু রহমান সাবকে বলেছিল, আপনার দেশের লোক তো নেশাভাঙ করে রাস্তায় পড়ে থাকে। আর লম্বাচওড়া বাত ঝাড়ে, আরে আমরা কি ভিখারির জাত, পড়ে আছি না মরে আছি বুঝি না, দুপতারার কালীবাড়ি চেনে না এমন কোন মানিষ্যি আছে। চাকরিটা শেষে হয়ে গেল দুপতারার সূত্রে।

প্রতিবন্ধী বলেও হতে পারে।

সে যাই হোক সরকারি চাকরি। সপ্তায় সপ্তায় মাইনে—মনাঠাকুর কেদার বদরি তীর্থ করতে যাবেন। দশ টাকার ভাড়াটে চানু আছে, গোপাল আছে, ত্রিনাথের মেলা আছে, মন্দিরের পূজা-অর্চনা অসুবিধে হবে না। মনাঠাকুর একা মানুষ। শিবলিঙ্গ পূজা করে নদীর পাড়ে সাধনায় মত্ত, চিনকে দেখলে তার মাথা ঠিক থাকে না—মেয়েটি বড়োই মিষ্টভাষী, সে তার জপতপে সাহায্যও করে। গোপাল গাঁজাভাঙ খায়, ভাল খোল বাজায়, ত্রিনাথের সেবার কাজে লাগবে। কী দিনকাল পড়ে গেল গাঁজাভাঙ খায় এমন লোকই ধরা যায় না। ঘাটের লোকজন এ দিকটায় বিশেষ মাড়ায় না, মনা মনে মনে স্যাঙাত খুঁজছিল। গোপাল সেন্ট পারসেন্ট ঠিক লোক। চানুকে রাতে পাহারা দেয়ার জন্য রতনবুড়িকে নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিল। কারণ মতিভ্রম বড়োই মারাত্মক ব্যাধি। গোপাল রাতে ডিউটি করে। চানুর পক্ষে জটাজুটধারী মনাঠাকুরের সঙ্গে রাতে একা থাকলে কেলেঙ্কারি হতে কতক্ষণ। সাধন ভজনে বিঘ্ন ঘটে এমন কাজ না কখনো করে না।

সেই যাই হোক, বিশ্বযুদ্ধ শেষ। গানশেলে আর বন্দুক কামান তৈরীর ঝামেলা নেই–অর্ডার না এলে কর্তৃপক্ষেরও দায় নেই। তবু বসে থাকলে চলে না। প্রডাকশান চাই–বালতি, মগ, বন্দুকের নল, জোড়াতাপ্পির কাজ আর কি। হাজিরা দিলেই কর্তৃপক্ষ খুশি। সুপারভাইজার মদন সাহেব হা হুতাশ করেন—দেশের কী হাল হল রে। দেশটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে বাবরা সব তালপাতার পাখায় হাওয়া খাচ্ছে। মিনি মাগনায় স্বাধীনতাযুদ্ধ নেই, বীরত্ব নেই। গান্ধী মহারাজকে খুন করে বীরত্ব ফলানো হচ্ছে। এ দেশের কখনো উন্নতি হয়!

গোপাল তখন মৌতাতে একেবারে ভিজে আছে। ছিলিম বানাচ্ছে। সেও খাবে সাহেবও টানবে।

তার বড়ো দুঃখ।

দীর্ঘশ্বাসও ওঠে।

বুঝলে সাহেব। সব কপাল। দেশ ভাগ না হলে শনি মঙ্গলবারে পাঁঠার মাথা খাওয়াতাম তোমাকে। নেশা করলে ভালোমন্দ খেতে হয়। দুধ, মাংস না খেলে শরীর ঠিক থাকে না। তার পর বড়ো লেদ মেশিনের আড়ালে দুজনে বসে ঝিম মেরে থাকে—কী গোপাল কী বুঝছ। চানুর জন্য চিন্তা হচ্ছে!

এই হল মুশকিল গোপালের। পেটে কথা রাখতে পারে না। চানুর সব কথাই মদন সাহেব জানে। চানুকে নিয়ে সংশয়ও কম না গোপালের।

আর চিন্তা। কী কয় জানেন, তার কোমলাঙ্গে হাত দিতেই দেয় না। বলে কি না আমার কোর হয়েছে। কোরণ্ড রোগটা কী সাব?

বীচিতে জল জমেছে। তুমি টের পাও না গোপাল।

খুব কঠিন অসুখ সাহেব?

না না। কবিরাজি দেখাও। সেরে যাবে।

সব তো বুঝি সাহেব। এ দিকে যে মনাঠাকুর ফিরছে না আর। চিঠিপত্রও নাই। কত দিন হয়ে গেল। সব ত্রিনাথের নামে জিম্মা দিয়ে গেছে। শনি, মঙ্গলবারে ত্রিনাথের কীর্তন, খিচুড়ি প্রসাদ, হেমার মাকে রেখে দিয়েছি। চানু একা করে উঠতে পারছে না। এ দিকে ভাগ্না হাজির। আই. এ. পাস। তবে চানু খুব খুশি। শত হলেও সমবয়সি তো। সাহেব এই আপনার পায়ে ধরে বলছি, চানুর জন্য শুধু প্রাণপাত করছি। চানু না থাকলে, আমি যে মরা লোক। তার পরই গোপাল কাঁদতে থাকল—ভাগ্নাটাকে নিয়ে বড় চিন্তায় আছি। কোথাও জুড়ে দিতে পারলে চানুর কাছে আমার মুখ থাকবে না। আপনি পারেন সাব, জুড়ে দিতে পারলে চানু বলেছে, তার কোমলাঙ্গে আর হাত দিতে দেবে না।

কথা শেষ হয় না—আমার মেলা পাপ সাহেব। পাপের ফলে কোর অসুখ। কী করেছি। দেশে হারান পালের বউ আমার জন্য কী করেছে। রাতে বিরাতের শয্যাসঙ্গিনী। মাগির বড়ো খাক ছিল—বাপ আমার সেবাইত, মন্দিরের টাকা-পয়সা লুট করে ময়নাকে দিতাম।

ময়নাটা কে আবার।

সাহেব, তোমাকে ভক্তি করি, তুমি দুর্গাস্তোত্র পাঠ করো। দুর্গাস্তোত্র পাঠ করলে অমৃত লাভ হয়। সেই শয্যাসঙ্গিনীর নাম ময়না।

সাহেব চোখ বুজে আছে। গোপাল অজস্র কথা বলে যাচ্ছে। গাঁজাভাঙ খেলে এক একজনের এক একরকম প্রতিক্রিয়া হয়। কেউ চুপ করে থাকে। কেউ কথা বলে। কেউ পায়ের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে।

সাহেব হঠাৎ উঠে বসল, বলল, তালে দ্যাশ থেকে ময়নাকে নিয়ে এলেই হয়। যত মেয়েছেলে, তত তীর্থের মাহাত্ম। চুল্লি জ্বলছে কাঠ তো লাগবেই। তুমি না। পারলে আর কেউ সাপ্লাই দেবে।

৩.

সেই থেকে গোপালের মাথায় ক্যাড়া উঠে গেছে। ভৈরবীদের আখড়া বানালে গাঁজা, ভাঙ, মদ, কীর্তনের দল, বলতে গেলে এক বিশাল গ্যানজাম, তার পর পাপীতকী দ্বাদশী ব্রত, বীরাষ্টমী ব্রত, শিবরাত্রি ব্রত, এবং শিবলিঙ্গে আকন্দ ফুল ধুতুরা ফুল এবং বিল্বপত্র দিতে পারলে জমে যাবে জায়গাটা। আর শ্মশানঘাট যখন অনতিদূরে অবস্থিত।

কিন্তু চানুকে কিছুই বলতে সাহস পাচ্ছে না। হেতু চাই। তপাকে দিলে বলালে হয়। তপা নবীন যুবক, মাথার কোঁকড়ানো কেশ ঘাড়ের কাছে নেবে এলেই গৌরাঙ্গ প্রভু হয়ে যেতে পারে। সুশ্রী যুবককে যদি ভজিয়ে এই ত্রিনাথের মেলায় ভিড়িয়ে দেওয়া যায়। তপার দিকে তাকালেই গোপাল ভাবে, যদি মগ্নভাবে শিবস্তোত্র পাঠ করে তপা, তবে আর দেখতে হবে না। রমণীরা তার মগ্ন স্বভাবে ভগ্ন না হয়ে পারে না।

চানু সকালে উঠেই গঙ্গাস্নান সেরে আসে, তার পর করবীফুল ধুতুরা ফুল এবং অন্য সব ফুল সংগ্রহের আগে গাছে গাছে জল দেয়। কখনো পাও সকালে গঙ্গাস্নানে যায়, তপা চানুর ন্যাওটা হয়ে গেছে। লম্বা উঁচু হারমাদ চেহারা নারী মাত্রেই পছন্দ করে। চাকরি দেবার নামে তুলে এনেছে। তপা রোজই আশা করে, ঠিক একদিন মামা তার শুভ সংবাদটি নিয়ে আসবে, কে এক পাগলা সাহেব, বলেছেন, আরে তোমার ভাগ্না রত্নবিশেষ। তার কখনো চাকরির অভাব হয়!

মামা, তোমার পাগলা সাহেব আর কিছু বলল! পাগলা সাহেব নারে, মদন সাহেব। খুব পরিষ্কার মাথা, তোকে নিয়ে আমি এক জায়গায় যাব।

কোথায়?

চল, গেলেই দেখতে পারবি।

তপা যে কী করে। এবং সে না যাওয়ায় পাগলা সাহেব নিজেই হাজির। তার পর তিনি কেন যে বললেন, বিবাহযোগ্য চরিত্রবান পাত্র পাওয়া দুষ্কর।

তপা বুঝল না, কাকে কথাটা তিনি বলছেন।

চানুমামি একটি গৈরিক রঙের শাড়ি পরে বারন্দায় হাজির। মেদবহুল মানুষটি ভাঙা চেয়ারে বসে আছে। গোপাল মামা ফাঁক বুঝে ছিলিম বানাচ্ছে–মামার এই সব অপকর্মের কথা তপা আগেই জানে। এই পরিবেশে ধাতস্থ হতে তার সময় লাগেনি। কাজেই মামা যখন জানালেন, সাহেবের কন্যেটি তোকে দেখতে আসবে, মদন সাহেব নিজেই নিয়ে আসবেন। আরে তুই তো রাজা রে তপা। সাহেবের একমাত্র কন্যে। কথা বলতে লজ্জা করবি না। বিবাহটাও একটা কাজ। মেয়ের দৌলতে তোর ভাগ্য ফিরে যেতে পারে। তোর মামিকে যে রাজি করাতে পারছি না। তা এলে পরে কি আর তাড়িয়ে দিতে পারবে!

সে কোনো উত্তর দিল না।

কীরে কথা বলছিস না কেন?

তপা শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। পাখিদের ওড়াউড়ি দেখছে। আমবাগানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থানের মাহাত্ম্য বোঝার চেষ্টা করছে। নদীতে কত জল, মাঝে মাঝে দখিনা বাতাসে মানুষ পোড়ার গন্ধ আসছে। মানুষ মরে গেলে তাকে পুড়িয়ে দেওয়া একটি পুণ্য কাজ। এসবই মামার বচন। জন্মালেই মরিতে হয়, অমর কে কোথা হয়। ভয়ের কোনো কারণই থাকতে পারে না। যৌবন জ্বালায় নারীপুরুষের সংসার। সেও এক অগ্নিকুণ্ড। তোর মামি তার জ্যান্ত উদাহরণ। রাতে কাজে যেতে হয়—তোর মামি তখন স্বাধীন। সুদাম খুবই বেইমান জানিস। আমি বাড়ি নেই জানতে পারলেই থানের সিঁড়িতে এসে বসে থাকে। কাহাতক সহ্য হয়। নেশার ঘোরে মামার কোনো কথা বলতে আটকায় না। মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে মামির বিরুদ্ধে কুৎসিত গালিগালাজও শুরু করে দেয়।

চানুমামি খেপে যায়।

অনেক ঢ্যামনা দেখেছি বাপু, তোর মামার মতো ঢ্যামনা কোথাও একটা খুঁজে পাবি না, একদণ্ড দেখতে না পেলেই মাথা খারাপ। ঢ্যামনামি আর কত সহ্য করা যায়।

তপা শুধু শোনে। সে কোনো মন্তব্য করে না। কারণ সুদাম মামার গাঁজার আচ্ছায় না এলে তাকেই পাঠায় খোঁজ করতে। এই সব নেশাভাঙের আসরে সুদামের যথেষ্ট কদর আছে। সে যথেষ্ট উচ্চস্তরের ছিলিম প্রস্তুতকারক। সেই সুদামের সঙ্গে আবার মামিকে নিয়ে তার সংশয়বাতিক–তপা কেমন বিব্রত বোধ করে। সে কখনো থান ছেড়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটা দেয়। কখনো কোনো নৌকায় গিয়ে বসে থাকে। বাবা-মা-ভাই-বোনেরা যে সবাই অপেক্ষা করে আছে।

মামা একটা লুঙ্গি পরে ফের মন্দিরের চাতালে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে নেমে আসছে। কারণ মামার কথায় সে কোনো জবাব দেয়নি।

মদন সাহেবের একমাত্র কন্যে। গাড়িবাড়ি সব তোরই হবে। মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গী। কমলাক্ষী মেয়ে। খুবই সুন্দরী। খুব ধীর স্থির। দেখতে দোষ কী! প্রকৃতই সে মনোরমা।

তপা উচ্চাকাঙক্ষা। কত স্বপ্ন তার, একটা কাজ হয়ে গেলে, সে রাতের কলেজে ভর্তি হবে। আরও নানা স্বপ্ন। একজন বেকার যুবকের সঙ্গে মনোরমার বিবাহকে সে মামার একটা ফাঁদ ছাড়া কিছুই ভাবে না। সাহেব খুশি হয়ে তাকে একটা প্রমোশনও দিতে পারে। নাইট ডিউটি থেকে রেহাইও দিতে পারে।

তপা না বলে পারল না, মনোরমা-টনোরমা ছাড় তো। বাড়াবাড়ি করলে চলে যাব। নিজেরই কোনো সংস্থান নেই… কোথাও পেট ভরে খেতে পাই না বলে পড়ে আছি।

-রাগ করিস না। রাগ করলে ঘিলু গরম হয়। আখেরে লাভ হয় না। সেই জন্যই তো তোর হিল্লে করতে চাইছি। সাহেবের ক্ষমতা কত জানিস। বিয়ে করলেই চাকরির পাকা বন্দোবস্ত। সাহেবের খুব পছন্দ তোকে। দ্যাখ তপা, হাতের মোয়া রাস্তায় ফেলে যেতে নেই। চাকরি পেলে দিদি-জামাইবাবুকে কলকাতায় এনে রাখতে পারবি।

চাকরি হবে!

কেন হবে না।

তিনি কি তোমাকে মামা কথা দিয়েছেন!

দিয়েছেন বলেই তো প্রস্তাবে রাজি হয়েছি। তোর মামাকে তো জানিস। তোর চানুমামির মতো দজ্জাল মেয়েছেলেকে সামলায়।

তপা বোঝে, চানুমামি আছে বলেই মামার সব দোষ খণ্ডন করে নিতে পারে। শনিবারের হপ্তা পেলে রেসের মাঠে না গেলেই যে মামার চলে না। এক রাতেই ফতুর। সকালে ফিরতেন টলতে টলতে। কখনো খোঁড়া পা নেশার বোধহয় অবশ হয়ে থাকত। কোনো রকমে পা টেনে, বারান্দায় উঠেই চানুমামির পা জড়িয়ে ধরত। এই নাক মলছি, কান মলছি, আর যাচ্ছি না। তুই চানু ক্ষমা করে দে।

ধুস! চানুমামি পা সরিয়ে নেয়।

চানু, মানুষের কপাল ঠিক একবার না একবার ফেরে। এবং এই করে রেসের ঘোড়ায় চড়ে দু-চারদিন বুদও হয়ে থাকত—যদি কপাল ফেরে তবে গেঞ্জির কারখানা, মামি ম্যানেজার। সব যুবতী মেয়েরা মামির আণ্ডারে কাজ করবে, পায়ের ওপর পা তুলে তার দিন চলে যাবে। এবং ইত্যাকার দিবাস্বপ্নে পুঁদ হয়ে থাকা মামা ইদানীং শিবমন্দির সংলগ্ন ভৈরবীদের আখড়া এবং এমন সব বিদঘুটে পরিকল্পনায় মেতে থাকার পর সহসা তার মাথায় মনোরমা বোধহয় হাজির।

মামিও তাকে বলল, বসেই তো আছিস। বিয়ের কাজটা সেরে রাখলে ক্ষতি কি। মনোরমাকে বিয়ে করলে যদি সাহেব তোকে গানশেলে ঢুকিয়ে দেয় মন্দটা কি আমি বুঝি না। পাল্টি ঘর। আই. এ. পাস, মদন সাহেব ঠিক ভালো পোস্টিং দিয়ে দেবে। আত্মীয়ের বাড়ি দু-মুঠো ভাতের জন্য আর ঘুরে মরতে হবে না। মনোরমাকে দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে। সুকেশী, গায়ের রং দুধে আলতায়।

গ্যাঁজালু গোপাল অবশ্য অনেক রাত পর্যন্ত চানুর সঙ্গে পরামর্শ করল।

তপা সকালে উঠেই দেখল মামির গঙ্গাস্নান সারা। মামাও আজ মামির সঙ্গে গঙ্গাস্নান সেরে এসেছে। মামা-মামি দু-জনেই গাছে গাছে জল দিচ্ছে। রতন বুড়ি চাতাল ধুয়ে দিচ্ছে। আর প্যান প্যান করছে, হাড়মিনসে আমাকে ফেলে কোথায় যে পালাল!

সকাল থেকেই নানারকম সিধা আসে মন্দিরে। মনাঠাকুর যা পারেনি, গ্যাঁজালু গোপাল, শনি-মঙ্গলবার অহোরাত্র ত্রিনাথের কীর্তন এবং গরিব-দুঃখীদের খিচুড়ি প্রসাদ এবং এই সব সাধুকাজ নিমিত্ত গ্যাঁজালু গোপালের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ে যাচ্ছে।

তপাকে ডেকে বলল, ওঠ, আর কত বেলা ঘুমাবি। চানটান করে মন্দিরে বোস। মানুষজন তো এমনি আসে না। তোর মুখে সাধুভাব আছে। লম্বা কোঁকড়ানো চুল আর গালের স্বল্প দাড়ি বুঝিস না নবীন সন্ন্যাসী তুই। আর মনোরমা যদি এখানে উঠে আসে তবে সোনায় সোহাগা। বিকেলে গোধুলি লগ্নে আমরা পাত্রী দেখতে যাচ্ছি। তোর যা স্বভাব, কোথাও আবার না পালাস। যদি জীবনে ভালো চাস, এ সুযোগ হেলায় হারাস না।

তপা ভাবল, তার তো হারাবার কিছু নেই। পাত্রী না হয় দেখে এসে ঠিক করবে বিয়েতে তার মত আছে কি নেই। তার বিয়ে হবে, বাবা-মা জানবে না। অরাজি হলে মামা যে তাকে এখান থেকে লাথি মেরে তাড়াবে। যাবেটা কোথায়, উঠবেই বা কোথায়, একবেলা, দুবেলা—বেশি হলে এক দু-রাত থাকতে দেবে। সুতরাং পাত্রী দেখতে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

আর গোধুলি লগ্নে পাত্রী দেখে সে হতবাক। শুধু সুকেশী নয়, সহাসিনীও। সুকুমারীও বলা যায়। মদন সাহেব এবং তাদের আত্মীয়স্বজনরা একবাক্যে স্বীকার করল, একেবারে রাজযোটক। বিশাল হল ঘরে অবশ্য স্তিমিত আলো জ্বালা। ঘরের মেঝে জুড়ে নীল মোটা কার্পেট, একেবারে রাজসিক ব্যাপারস্যাপার। ঘরে আশ্চর্য সুঘ্রাণ। মনোরমা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনোরমার আঁখি পল্পবে মধুর গুনে তার চোখ ছানাবড়া।

কী, তোর পছন্দ!

তপা গাড় কাত করে দিল। অর্থাৎ সে রাজি।

মনোরমা দাঁড়িয়ে বলল, আপনি তপোময়, আপনার কোনো অপছন্দের কাজ আমি করব না, কথা দিতে পারি। তবে চোখে দেখি না। আপনার মুখ স্পর্শ করে টের পেতে চাই আপনি দেখতে কেমন। স্পর্শ গন্ধ এ-সবই আমার সম্বল। বলে তার সামনে এসে দাঁড়াল, কোনো জড়তা নেই। তপোময়ের নাক মুখ স্পর্শ করে বলল, তপোময় আপনি আমার স্বপ্নের মানুষ। আমার অপেক্ষা সার্থক।

তপোময় বিস্মিত। যথেষ্ট ক্রোধেরও সৃষ্টি হল। মামা-মামি ষড়যন্ত্র করে একজন অন্ধ মেয়েকে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল।

অথচ হাঁটাচলায় মনোরমা একেবারে স্বাভাবিক। কোনো জড়তা নেই। দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির হাঁটাচলা এত সহজসাধ্য হয় কী করে! মনোরমা কী তঞ্চকতা করছে তার সঙ্গে, কিংবা পরীক্ষা। কিন্তু মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আশ্চর্য সুখানুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্যে। ঘরে খুবই সুগম্ভীর পরিবেশ— কারণ সমবেত আত্মীয়স্বজন, এমনকী মদন সাহেবও আশা করতে পারেননি মনোরমা তার দৃষ্টিহীনতার কথা অকপটে স্বীকার করবে। উভয় পক্ষই মনোরমার দৃষ্টিহীনতা গোপন করে যেতে চেয়েছিল। কারণ তারা জানে মনোরমা খুবই অনুভূতিশীল–শব্দ, ঘ্রাণ এবং স্পর্শের সাহায্যে তার চলাফেরা নিজ পরিসরে অনায়াস সহজসাধ্য হয়ে যায়। তপার মতো বেল্লিক, পাত্রীটি যে অন্ধ টেরই করতে পারবে না—

তপোময়ের পাশে তখনও মণিমালা দাঁড়িয়ে আছে, আর এখন লিখতে হবে না। কী দেখছ?

গোপাল মামার কথা মনে আছে মণিমামা?

আছে। তিনি না থাকলে তোমাকে পেতাম কোথায়!

আমিও তাই ভাবি। কেউ তা জানে না— তুমি মনোরমা ছিলে। এখন মণিমালা। কেউ তো জানে না, তুমি জন্মান্ধ। চোখে কম দেখতে পাও এমন তারা জানে। বিধাতা তোমার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি তার রূপ, রস, গন্ধ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে তোমাকে। এক আশ্চর্য অনুভূতিশীল জগতের তুমি বাসিন্দা।

ঠিক আছে, ওঠ, চানে যাও। বেলা কম হয়নি। আর এ বয়সে আমাকে নিয়ে এত না ভাবলেও চলবে। ঋতবানের চিঠি এসেছে, বউমার বাচ্চা হবে। তুমি দাদু হতে যাচ্ছ।

চিঠিতে কি তুমি জন্মেরও ঘ্রাণ পাও!

জানি না। বলে ঋতবানের পত্রটি তপোময়ের হাতে দিয়ে বলল, বংশে বাতি দিতে আসছে, তিনিই তো কত শব্দ নিয়ে আসছেন। গোপাল মামারও দেখা পেলে। শব্দ খুঁজে পাও না, শব্দের আকাল, বলে মিষ্টি হাসল মণিমালা। তার উদ্ভাসিত চোখেমুখে সেই কোমলাক্ষী যেন ফের জেগে উঠছে। তপোময় বলল, তোমাকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

ধুস, কী যে করে না, কে দেখে ফেলবে! বলে বালিকার মতো প্রায় ছুটে পালাতে চাইছিল, হাত ধরে তপোময় বলল, আস্তে। পড়ে গেলে আর এক কেলেঙ্কারি।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor