Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাজোয়ার ভাটা - সমরেশ বসু

জোয়ার ভাটা – সমরেশ বসু

কটা লাও আসবে বাবু? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল কৈলাস।

দশটা। জবাব এল আড়তের চালা ঘর থেকে।

সবুজ শাড়ি পরা কামিনটি চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী কী?

আবার জবাব এল বিরক্তি ভরে, বললাম তো, সাত নৌকো বালি আর তিন নৌকো টালি।

অমনি সবুজ আর লাল শাড়ি পরা দুটি কামিন একসঙ্গে গলায় গলা মিলিয়ে সরু গলায় গেয়ে উঠল,

ওই আসে গো ওই আসে লায়ে ভরা টালি
ঘরে আমার ছাঁ ঘুমায়
মিনসে পড়ে শুঁড়িখানায়
বেলা না যেতে আমি লাও করব খালি ॥

মেয়ে ছিল জনা পাঁচেক, পুরুষ ছিল পনেরো জন। পুরুষদের ভেতর থেকে কয়েকজন হাততালি দিয়ে উঠল বাহবা বাহবা বলে। মেয়েরা হেসে উঠল সব খিলখিল করে।

হঠাৎ প্রৌঢ় ভোলা দাঁড়িয়ে উঠে, এক হাত কোমরে আর এক হাত কানে দিয়ে জোর গলায় উঠল গেয়ে,

মিছে কথা কসনি লো বউ, মিছে কথা কসনি।
কাল সনঝেয় এ পোড়া চোখে শুঁড়িখানা দেখিনি ॥
দিনে খেটে, ছাঁ লিয়ে তুই মোর পাশে রাত কাটালি!
কুড়ে বউ ও কুড়ে বউ, কাজ দেখে তুই মিছে দোষে দুষলি ॥

মেয়ে পুরুষের মিলিত গলার একটা হাসি ও হুল্লোড়ের ঢেউ বয়ে যায়। মুহূর্তে যেন চমকে ওঠে সকালবেলার গঙ্গার ধার।

সূর্য উঠেছে খানিকক্ষণ আগে। ভাটা পড়া গঙ্গার লাল জলে লেগেছে বৈশাখী রোদের ধার। ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথা চকচক করে রোদে। ভাটায় জল নেমে পলি পড়েছে ধারে ধারে। কাঁকড়ার বাচ্চা কুড়োচ্ছে খাবার জন্য কতকগুলো হা-ভাতে ছেলে।

ও-পারে চটকল দেখা যায় একটা। এ-পারেও চটকল উত্তরে দক্ষিণে। মাঝখানে আড়ত অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে। বালি ও টালির ভাঙা টুকরো ছড়ানো উঁচু পাড়। দু তিনটে ছোট বড় ন্যাড়া ন্যাড়া গাছ। গাছের গায় ও অবশিষ্ট পাতাগুলো ধুলোয় ভরা। জায়গাটা উঁচু, নিচু, তাই লরি দুটো খানিকটা দূরে পেছনের মাঠের উপর দাঁড়িয়ে আছে। লরি দুটো এসেছে মাল তুলে নিয়ে যেতে।

আর নৌকা থেকে মাল খালাস করার জন্য এসেছে এই মানুষগুলো। এরা দিনমজুর কিন্তু অনিশ্চিত এদের দিনের দিন মজুরি পাওয়া। কেন না, এ-সব আড়তে কখনও একসঙ্গে দুতিন দিনের কাজ থাকে না। মাল আনা আর দেওয়ার একটি কেন্দ্র মাত্র। তাই এরা ফেরে রোজ কাজের সন্ধানে, আড়তে, ইট পোড়ানো কলে, বাড়িঘর তৈরির কন্ট্রাক্টরের ফার্মে, কাঠ সুরকির গোলায়। কাছে কখনও, কখনও দুরে! ওদের রোজ মজুরের নির্দিষ্ট মহল্লায় কোনও কোনও সময় আপনা থেকে ডাক আসে।

কিন্তু যেদিনটা ওরা কাজ পায় না, সেদিনটা ওদের অভিশপ্ত। এ ছন্নছাড়া আয়ের মতো জীবনও ছন্নছাড়া। কম হোক, বেশি হোক, কোনও বাঁধা আয় নেই অথচ বাঁধা আছে পেট। তবে এ জীবনে পেটটাকে গোঁজামিল দিতে শিখেছে ওরা। ঘরও নেই, বারও নেই, জীবনের রঙ্গ অঙ্গ সবটাই এখানে। এখানটায় ফাঁক গেলে সব আঁধার। আধারের কত সব কুরূপ না ওত পেতে আছে ওদের চারধারে। তাই হাতে যেদিন কাজ থাকে, সেদিন ওরা মূর্তিমান আনন্দ। বন্ধনহীন মন, তোলপাড় হৃদয়। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ নয়, যতক্ষণ কাজ, ততক্ষণ আশ।

হৈ হৈ হৈ, ঐ আসে গো ঐ।
কী কী কী? গোরা সায়েবের ঝি।

    আগের গানের প্রসঙ্গ পালটে জোয়ান মদন গেয়ে উঠল চেঁচিয়ে কানে আঙুল দিয়ে,

গোরার বেটির মেজাজ চড়া, কাজের হদিস বড় কড়া ..
বউলো বউ, কাজে হাত লাগা

সুরের শেষ টান দিয়ে সে একটু বিরক্তিভরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল মেয়েদের দিকে। এর পরে মেয়েদের সুর ধরার কথা।

কিন্তু দেখা গেল মেয়েরা নারাজ। টিপে টিপে হেসে তারা মাথা নাড়ল। মুখ ফিরিয়ে বসল কেউ নিরুৎসাহে গা এলিয়ে। পথে আসতে কুড়িয়ে পাওয়া, খোঁপায় গোঁজা কৃষ্ণচূড়া ঢেকে দিল ঘোমটা তুলে। যেন গানের তালে ফাঁক দিতে গিয়ে সুর থেমে গেছে। সেই ফাঁকে ভাটা ঠেলে জোয়ার এসে পড়ল গঙ্গার বুকে। এল নিঃশব্দে চোরাবানের তলে তলে। শুধু হাওয়া আসে যেন কোত্থেকে ধেয়ে। আসে চটকলের জেটির গায়ে ধাক্কা খেয়ে, ক্রেইনের মাথায় লাল ন্যাকড়ার ফালি উড়িয়ে, এ-পারে ও-পারে আগুনের মতো কৃষ্ণচূড়ার মাথা দুলিয়ে।

হা-ভাতে ছেলেগুলো মহা উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ল জোয়ারের জলে। স্টিম লঞ্চ একটা টেনে নিয়ে চলেছে বিরাট গাদাবোট দক্ষিণ থেকে উত্তরে।

লরির ড্রাইভার কানাই এসে দাঁড়াল দলটার সামনে। সে এদের পরিচিত গুণীবন্ধু। অতবড় একটা গাড়িকে যে খুটখাট মেশিন নেড়ে বোঁ বোঁ করে চালিয়ে নিয়ে যায়, গায়ে পরে সাহেবি কুর্তা, ফোঁকে সিগারেট, তাকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে তারা গৌরবান্বিত।

বুড়ো গোবর তার ঝুলে পড়া গোঁফের ফাঁকে হেসে বলল, বোসে পড়ো ওস্তাদ।

মেয়েদের দিকে একবার চোরাচোখে কটাক্ষ করে কানাই বলল, গানই থেমে গেল তো, আর বসব কী সর্দার।

গোবর সর্দার নয়, কিন্তু সম্মানে প্রায় তাই। অনেক বয়স ও বহু ঝড়ে ঝাপটায় তার ভাঙাচোরা মুখটায় মোটা গোঁফের মধ্যে লুকনো তিক্ত অথচ উদার হাসির ধারে একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের ছাপ ফুটে আছে। বয়সের চেয়েও শক্ত মোটা গলায় বলল সে, ওস্তাদ, দুনিয়াতে কিছু থেমে থাকবার জো নেই।

জো নেই তো থামলে কেন? কানাই আবার কটাক্ষ করল মেয়েদের দিকে।

মুখে থেমেছে, মনে থামেনি। শুধোও ওদের। বলে সে নিজেই জিজ্ঞেস করল, কিরে শ্যামা, গান থেমে গেছে?

সবুজ শাড়ি পরা শ্যামা তেমনি মুখ টিপে ঘাড় নাড়ল। অর্থাৎ, না।

কিন্তু মদন তা মানবে কেন। সে নিজের পাছায় চাপড় মেরে বলল, আমি বলছি থেমে গেছে। নইলে গলা কেন দিচ্ছে না।

আরে জানলে তো। ভোলা বলল মুখ বাঁকিয়ে, মাগীরা আবার গাইতে জানে কবে?

আর একজন বলল, আয় শালা আমরাই গাই, ওদের বাদ দে।

গাইয়ে মরদের দলটা বসল একজোট হয়ে।

অমনি কামিনী বুড়ি দাঁড়িয়ে উঠে খেঁকিয়ে উঠল, মাগীরা গাইতে জানে না, জানিস্ তোরা মরদরা। য্যাতো মদ গাঁজাখেকো হেঁড়ে গলায়, আহা কী বাহার। বলে কোমরে হাত দিয়ে মাজা দুলিয়ে ভেংচে উঠল,

হৈ হৈ হৈ তোদের মরণ আসে ঐ।

একটা রোল পড়ে গেল দমফাটা হাসির। মেয়েদের ঢলে পড়া হাসি যেন বুক জ্বালিয়ে দিল গাইয়েদের। মনে হয়, আধা ল্যাংটো খালি গা মানুষগুলো যেন এক মহাখুশির মজলিশ বসিয়েছে গঙ্গার ধারে।

আড়তের বাবু গঙ্গামুখো হয়ে গদিতে বসে হরিনামের মালা জপছিলেন। জপের মাঝে গণ্ডগোল হওয়ায়, দাঁতহীন মাড়ি খিঁচিয়ে উঠলেন, জানোয়ারের দল।…

আড়তের বাঁধা কুলিটা বসেছিল দরজার কাছে, বেগড়ানো মুখে। সে কুলি বটে, কিন্তু বাঁধা কাজের মানুষ। সেই আভিজাত্য বোধেই দিনমজুরগুলোর কাছ থেকে গা বাঁচিয়ে বসেছে। বাবুর গালাগালটা শুনে সেও ঠোঁট উলটে বলল, শালা লুচ্চা লাফাঙ্গার দল।

কামিনী তখনও বসেনি। সে গাইয়ের দিকে ঝুঁকে বলল, এত জানিস তো, আগের গীতটা ছেড়ে কেন দিলিরে?

ও! তাও তো বটে। আগের গানটা যে থেমে গেছে মেয়েদের জবাবের মুখে এসে! আসলে ভোলা বা মদন আগের গানটার সব জানে না।

গোবর চেঁচিয়ে উঠল, তবে সেইটেই শুরু করে দেও, আসর নেতিয়ে গেল।

মুহূর্তে শ্যামার গলার সঙ্গে লালশাড়ির গলা মিশে সুরের ঢেউ তুলল,

মিছে কথা কয়োনি, কাজের ভয় করিনি,
তেমন বাপের ঝি আমি লই হে
চোখে বালি, মাথায় টালি, সারাদিনে হাড় কালি
তুমি যে নেশায় ভোম, গাছতলায় শুয়ে হে।

হঠাৎ একমুহূর্তের বিরতিতে সবাই স্থির হয়ে গেল, থেমে গেল তালে তালে মাথা ঝাঁকানো ও হাততালি।

শ্যামা একটা বিলম্বিত লয়ে দীর্ঘশ্বাসের ভঙ্গিতে বলতে লাগল, হায় হায়!…আর লালশাড়ি সরু গলায় টেনে টেনে যেন বহু দূর থেকে গেয়ে উঠল,

খেটে খুটে শরীর অবশ, তবু তোমায় তুলি ঘাড়ে,
বলগো সব জনে জনে, একলা মেয়ে, কেমনে যাই ঘরে।

বিবাদ ভুলে গেছে গাইয়ে-দল। মনে হয় এখানে সকলের বুকই বুঝি দীর্ঘশ্বাসে ভরে উঠেছে অভাগী কামিন বউয়ের বিলাপে।

কার গোঙানো গলার স্বর ভেসে এল, আমরা বেইমান!

এবার উঠল সেরা গাইয়ে কৈলাস। তাকে সবাই বলে সাধু। আসলে সে বাউল-বৈরাগী। তার নেই ঘরে বউ ছেলে, তার ডেরা ঘরে ঘরে। দিন-মজুরের জীবনের আড়ালে তার মনের অনেকখানিই গেরুয়া রঙে ছোপানো।

আর এ গেরুয়া রঙেরই ছোপ খানিক খানিক দাগ ধরিয়ে দিয়েছে ওই চোখ ধাঁধানো লাল শাড়িতে ঢাকা মনের মধ্যে। লাল শাড়ির ঘর খালি, ভরা বয়সে এ জীবনের ভারের ভয়ে পলাতক তার সোয়ামী। আছে শুধু শাশুড়ি ওই কামিনী বুড়ি। কিন্তু তার শাশুড়ি, সবার বেলায় সড়ো গড়ো, বউয়ের বেলায় বড় দড়ো। তাই বজ্র আঁটুনির ফস্কা গেরোর মতো গেরুয়ার ছোপ তার মনের অতলে। কী যেন খোঁজে তার বিবাগী মন। কৈলাসকে দাঁড়াতে দেখে হাসির ঝিলিক ফোটে তার কাজল চোখে, হাজার কথা ঠোঁটের কোণে। এটুকুই কামিনী বুড়ি টের পেলে আর রক্ষে নেই। তবু কৈলাস এক অপূর্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখিয়ে গেয়ে উঠল,

মোরে ধিক ধিক ধিক, মন যে আমার বশ মানে না,
আমার ভাঙা ঘর, খালি পেট, তবু যে যাই শুঁড়িখানা।
আমার ছাঁয়ের শুকনো মুখ, বউয়ের আমার শুকনো বুক
আমি দেশ হতে দেশান্তরে, আড়ত গোলায় খুঁজি সুখ,
আর যাবনি, মোরে দে বাঁধা কাজের ঠিকেনা।

কৈলাসের গানের রেশ শেষ হবার আগেই, ফুঁপিয়ে কান্নার ভঙ্গিতে দ্রুত তালে আবার গেয়ে উঠল, শ্যামা ও লাল শাড়ি,

বাবুসাহেব গো, পেট ভরেনি,
কাজ করিয়ে পসা দেও, ক্ষুধা মরেনি।
দেখ আমার শুকনো বুক, ছাঁয়ের তেষ মেটেনি,
বয়স কালের শরীলে মোর রং লাগেনি।

বৈশাখের খর হাওয়ায় সে গানের সুর ভেসে যায় মাঠ ভেঙে শহরে গাঁয়ে, গঙ্গার ছলছল তালে ঢেউয়ে ঢেউয়ে এপারে ও-পারে। এ গানেরই সুরে তালে দোলে আড়তের ন্যাড়া আর দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছ, দোলৈ মাথা আকাশের।

     গাইয়ে দলের আর আফসোস নেই। নেংটি পরা খালি গা রঙ বেরঙের মানুষগুলো শুন্যদৃষ্টিতে বসে থাকে চুপচাপ। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন পাকার করা রয়েছে কতকগুলো বেটপ মাল। গানের গুঞ্জন এখন তাদের হৃদয়ের ধিকি ধিকি তালে। এ তো শুধু গান নয়, বাইরে তাদের মাথা কোটার কাহিনী।

কামিনী বুড়ি কী যেন বিড়বিড় করে গঙ্গার দূর বুকে তাকিয়ে। বুঝি দীর্ঘদিনের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি তোলপাড় করে মনে। তার সদা সতর্ক চোখ দেখতে ভুলে যায়, কেমন করে তার বউ ঘাম মোছর আড়ে এক নজরে তাকিয়ে থাকে কৈলাসের দিকে।

কৈলাসও তাকিয়ে থাকে, কিন্তু সে চোখে নেই প্রেমের বিহুলতা, আছে কীসের অনুসন্ধিৎসা। কেন না, সে যে বলে, ভিত নেই তার ঘরে, নোনা ইটে আবার পলেস্তারা। ধুর শালা! অমন ঘর চায় না কৈলেস, যত ঘঁাচড়া জীবনের পাপ। ওটা ভেঙে ফেল। বুঝি সেই ফেলারই হদিস খোঁজে সে লাল শাড়ির চোখে। খেদ কেমন করে কাটবে শরীলে রং না লাগার।

গোবরের ভাঙাচোরা মুখটা কালো, মাটির ড্যালার মতো থসখসে হয়ে ওঠে। বলে কানাই ড্রাইভারকে, ওস্তাদ, এখন যেন জীবনটা হয়েছে পোকাখেগো ছিটে বেড়া। জীবনভর পরের হাতের চাকার মতো আমরা গড়িয়ে চলি, যেন তোমার হাতের মেশিন। চালালে চলি, তেল না দিলে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করি।

কানাই তার নিজের অভিজ্ঞতায় চ্যাপ্টা মুখে হেসে বলে, বিগড়ে যাও।

বিগড়ে যাব?

হ্যাঁ। দেখোনা, মেশিন বেগড়ালে তার পায়ের তলায় শুয়ে তেল মাখি। তেমনি বিগড়ে যাও।

এক মুহূর্ত কানাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ফিসফিস করে ওঠে গোবর, ঠিক শালা, বিগড়ে যাব, আমরা বিগড়ে যাব। ..

আড়তের বাবু জপের মালাটি কপালে চুঁইয়ে ভরে রাখেন ক্যাশ বাক্সে। বলেন, হারামজাদাদের চেঁচানিতে একটু ঠাকুরের নাম করার জো নেই।

বাঁধা কুলিটা বলে আত্মসন্তুষ্ট গলায়, শালারা ঈশ্বরের জঞ্জাল।

ইতিমধ্যে আবার কে গান শুরু করতে যাচ্ছিল, কিন্তু করল না। তালে যেন ভাঙন ধরে গেছে। এর মধ্যেই সূর্য কখন লাটিমের মতো পাক খেয়ে উঠে এসেছে মাথার উপর। তেতে উঠেছে ছড়ানো বালি আর টালি ভাঙা টুকরো।

সকলেই তারা ভ্রূ কুঁচকে তাকায় গঙ্গার উত্তর বাঁকে। না, এখনও দেখা দেয়নি দশ মাল্লাই নৌকোর চ্যাটালো গলুই, কানে আসেনি দশ বৈঠার ছপছপ শব্দ, দেহাতি মাঝির দাঁড় টানার গান।

সকলেই তারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। কখন আসবে, কখন? এখানে তারা কেউই একক নয়। সকলের একই ভাবনা, একই দুশ্চিন্তা, একই কথা।

সে যেন তাদের মন পবনের নাও। না এলে যে সব ফাঁকি। পেট ফাঁকি, গান ফাঁকি, ফাঁকি এ দিনটাই তাদের জীবনের গুতিতে।

কখন বেজে গেছে চটকলগুলোর দুপুরের ভোঁ! এখন আর কোথাও পাওয়া যাবে না রোজের সন্ধান। আর আড়তের নৌকো না এলে, মাল খালাস না করলে কেউ তাদের হাতে তুলে দেবে না একটি পয়সা।

কৈলাস হাঁকে, হেই বাবু, মাল আসবে কখন?

জবাব আসে, খিঁচনো সুরে, আমি কি মালের সঙ্গে আছি?

বাঁধা কুলিটা বলে গম্ভীর গলায়, যখন আসবে, তখন দেখতেই পাবে।

শ্যামা বলে তিক্ত হেসে মাইরি?

কুলিটা খ্যাঁক করে উঠতে গিয়ে চুপ মেরে যায়। আর সবাই হেসে ওঠে, কিন্তু খাপছাড়া হাসি। আর হাসি আসে না। কাজ নেই, হাত খালি, শুধু মাথা গুঁজে বসে থাকা। এ জীবনেরই একটা মস্ত বিরোধ, যেন আগুনকে চাপা দিয়ে রাখা।

কিন্তু দিন মজুরির এই দস্তুর। কাজ নেই তো, নেই পয়সা। না মুখ চেয়ে বসে থাকো তো, ভাগো। কোথায় যাবে? সবখানেই তো কেবলি ভাগো ভাগে ভাগগা!

আড়তের বাবু মুড়ির বস্তা খুলে কিছু মুড়ি ঢেলে দেন বাঁধা কুলিটার কোঁচড়ে। এ সময়ে বসে থাকা মানুষগুলোরও মুড়ি খাওয়ার কথা, দেওয়ার কথা দু আনা হিসেবে। পয়সাটা কাটান যাবে ওদের মজুরি থেকে। কিন্তু কাজ নেই, মজুরিও নেই, উশুল হবে কোত্থেকে?

মুড়ির বস্তা বন্ধ করে, চালা ঘরে তালা মেরে আড়তদার পথ ধরেন ঘরের।

কুলিটা আড়চোখে এদের দিকে দেখে আর মুড়ি চিবোয়।

এ মানুষগুলো চুপচাপ দেখে, আর তোক গেলে। সকলেই পরস্পরকে ফাঁকি দিয়ে ওই মুড়ি খাওয়ার দিকেই দেখতে চায়।

কৈলাসের চোখ পড়ে লালশাড়ির চোখে। চট করে মুখ ফিরিয়ে নেয় উভয়ে। কামিনী বকবক করে শ্যামার সঙ্গে, তিশ বছর আগে এট্টা বাঁধা কাজ পেয়েছিলুম জানলি। মিসে তাখন বেঁচে। সোহাগ করে বললে, যানি। পুরুষ মানুষের সোহাগ।

হারিয়ে যায় কামিনীর গলা জোয়ারের কলকল শব্দে।

হঠাৎ দেখা যায়, তারা সকলেই এ জীবনটার উপর বিরাগে নিজেদের মধ্যে গুলতানি শুরু করে দিয়েছে।

কেউ বলে, একবার আমি এট্টা কাজ পেওয়ছেলম, একনাগাড়ি তিনমাসের।

কেউ বলে, আমার এক বছরও হয়েছে। কলকেতায় এট্টা বিড়লি বানিয়েছে।

আর একজন বলে, আরে আমাকে তো শালা এখনও ওপরেশবাবু এট্টা বাঁধা কাজের জন্য ডাকে।

আর তুই খালি যাস্ না। অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় বলে কৈলাস।

কেউ কেউ নীরবে হাসে।

কিন্তু ভেঙে যাচ্ছে সুর, কেটে যাচ্ছে তাল। কথাও আর ভাল লাগে না।

বুড়ো গোবর তার মোটা গলায় বলে আফসোসের সুরে, ওস্তাদ, তোমার মতো কাজ জানলে..বলতে বলতে হঠাৎ তার গলা হারিয়ে যায়। গোঁফ ধরে টানে আর ভাবে! আবার বলে, অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ফুরসত পেলাম না, এখনও না।

কানাই বলে, জানলেই বা কী হত? লাইসেনটা পকেটে ফেলে মোটরওয়ালাদের দোরে দোরে ঘুরতে। কাজ কোথায়, কাজ নেই।

কাজ নেই! যেন বাঘাকুত্তার মতো গড়গড় করে ওঠে গোবর, অস্থির হয়ে ওঠে ওস্তাদ। ওস্তাদ, এ পেটে উপোসের মেলা দাগ আছে, কিন্তু হাতে একদিনেরও একটা আরামের দাগ পাবে না। কাজ থাকলেই মানুষ পাগল হয়ে যায়।

কাজ নেই। বাতাস তার পালে ঢিলে দেয়। বৈশাখী সুর্য জ্বলে গনগন করে মাথার উপর। আগুন গলে গলে পড়ে গায়, মুখে। গা জ্বলে, ঘাম ঝরে ঝলসে যাওয়া রসানির মতো।

আশে পাশে ছায়া নেই কোথাও। মানুষগুলো গণ্ডুষভরে পান করে জোয়ারের ঘোলা জল, ছিটা দেয় চোখে মুখে। কিন্তু প্রাণ ঠাণ্ডা হয় না। কেউ কেউ মাথার গামছা মুখে চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ে।

ন্যাড়া গাছগুলো যেন মরাকাঠের খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে আছে। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে চাওয়া যায় না। যেন ঝলসানো আগুন। ঘোমটা খসা খোঁপায় কৃষ্ণচূড়া শুকিয়ে বিবর্ণ। যেন কামিনদের মুখ।

টাবুটুবু গঙ্গার তীব্র জোয়ারের স্রোত নিঃশব্দ ভরাট। উত্তরের বাঁকে যেন ঝিলিমিলি করে মরীচিকা। বাঁকের পাক খাওয়া জলে উজান ঠেলে আসে না কোনও নৌকো।

লালশাড়ি রোদে জ্বলে দপদপ, জ্বলে পেট। বুঝি প্রাণটাও।

মনে মনে বলে কৈলাস, চাসনি.এদিকে চাসনি। তারপর হঠাৎ হেসে ওঠে ঠোঁট বেঁকিয়ে। —ভিত নেই…ভিত নেই।

মদন বলে, কী বকছ?

বলছি, সারাদিন বসে গেলম, তো, পসা কেন দেবে না?

তাই দস্তুর।

কেন দস্তুর?

মদন আবার বলে, ওটা আইন।

হঠাৎ কেমন খেপে উঠতে থাকে কৈলাস। শালার আইনের আমি ইয়ে করি।

যতই করো, হবে না কিছু।

করালেই হয়।

মদনও কেমন খচে যায়। বলে, আইনটা তোর বাপের কি না?

বাপ তুললি তো বলি, তবে বাপেরই আইন হবে। তোরাই তো

ফের? মেলা ফ্যাচ ফ্যাচ করবি তো–প্রায় ঘুষি পাকায় মদন।

ঠিক এ-সময়েই আড়তদারের ছোট ভাই অর্থাৎ ছোটবাবু আসেন রিকশা থেকে নেমে ছাতা মাথায় দিয়ে। এসে বলেন, তিন মাইল দূরে বাঁকাতলায় মালের নৌকো আটকে রয়েছে, জোয়ার কিনা, তাই আসতে পারছে না।

যাক, তা হলে আসছে!..সবাই অমনি আবার উঠে বসে।

কয়েকজন বলে, তবে আমরাই কেন না গুন্ টেনে লাও লিয়ে আসি।

ছোটবাবু বলেন, সে তোদের ইচ্ছে। অর্থাৎ বিনা মজুরিতে আপত্তি কি।

অমনি তারা সবাই ছোটে মেয়েরা বাদে।

মাইল খানেক গিয়ে দেখা গেল আড়তদারবাবু আসছেন রিকশায় করে। জিজ্ঞেস করেন, যাচ্ছিস কোথা সব?

বাঁকাতলায় নাকি মাল লিয়ে লাও ভেঁড়িয়ে আছে? বললে ছোটবাবু?

বাবু মাড়ি বের করে ফোঁস করে হেসে উঠলেন।-আরে ধুস, ভায়া বুঝি তাই বলল? আমি ওকে বললুম যে, বাঁকাতলার আড়তে কোনও খবর আসেনি। সে কখন আসবে তার ঠিক কী…

মুহূর্তে মুখগুলি যেন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আবার তারা বোদ মাথায় করে ফিরে আসে গঙ্গার ধারে।

এসে বসে তপ্ত বালুর উপর। হাঁপায়। এখন আর মানুষগুলো রঙ বেরঙ নয়, গঙ্গার পাড়ে যেন কতকগুলো কালো কালো শকুন বসে আছে।

কাজ নেই!..গরমজলের কেটলির ঢাকার মতো যেন ফুটতে থাকে কথাটা সবার মাথার মধ্যে। কাজ নেই!…তাদের জীবনের দিন গুতিতে একটা বিরাট শূন্য, ফাঁকা।

সুর্য ঢলে গেছে, ছুটির ভোঁ বেজে গেছে চটকলগুলোতে। কলরব করে ফিরে চলেছে খেয়া নৌকোয়, ছুটি পাওয়া মানুষেরা। ফিরে চলেছে স্টিম লঞ্চ গাদাবোটকে খালাস দিয়ে। লঞ্চের ছাদে, পশ্চিম মুখে বসে নামাজ পড়ে সারেঙ্গ-সাহেব।

ভাটা পড়ছে, জল নেমেছে, আবার পড়েছে পলি।

হেই বাবু, লাও আসবেনি? বারবার জিজ্ঞেস করে সবাই।

জানিনে। একই জবাব।

সন্ধ্যা নামে প্রায়।

হঠাৎ মদন খেঁকিয়ে ওঠে। এই কৈলেস শালার জন্যেই তো এতখানি ছোটা?

কৈলাসও চেঁচিয়ে ওঠে, আমার বাবার জন্যে।

ওদিকে চেঁচিয়ে ওঠে কামিনী বুড়ি, হঠাৎ গালাগাল পাড়তে আরম্ভ করে বউকে। গলা শোনা যায় লালশাড়িরও। শ্যামার ঝগড়া লেগেছে তার মরদ গণেশের সঙ্গে।

আস্তে আস্তে দেখা গেল, মানুষগুলো পরস্পর বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মহল্লায় দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি ব্যাপারকে কেন্দ্র করেই তা বেড়ে উঠতে থাকে।

কোথায় তাদের সেই সকাল, সেই গান ও গল্প।

বুড়ো গোবর অ্যাসিডের গন্ধ পাওয়া সাপের মতো সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। সে চিৎকার করে ওঠে, এই গোঁয়ারগুলান, চুপো চুপো তাড়াতাড়ি।

কে চুপ করে। চকিতে দেখা গেল, মানুষগুলো পরস্পর মারামারি শুরু করে দিয়েছে। কে কাকে মারছে, তার ঠিক নেই। সবগুলোতে মিলে একটা দলা পাকিয়ে গিয়েছে মানুষের। শোনা যাচ্ছে একটা ক্রুদ্ধ গর্জন, চিৎকার, কান্না।

একটা প্রচণ্ড শক্তি যেন আচমকা মাটি খুঁড়ে ধ্বসিয়ে ফেলেছে দুনিয়াটাকে। মাটি কাঁপছে থরথর করে। ক্রুদ্ধ হুঙ্কার যেন ফেঁড়ে ফেলবে আকাশটাকে। কেউ উলঙ্গ হয়ে গেছে, কয়েকজনের পায়ের তলায় পড়ে গেছে কেউ। ..কেন এই মারামারি, তারা নিজেরাই যেন জানে না।

আড়তদার বাবুরা দুই ভাই কাঁপতে কাঁপতে তাড়াতাড়ি ক্যাশবাক্সে চাবি বন্ধ করে প্রায় কান্নাভরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, রামদাস, লাঠি পাকড়ো।

রামদাস অর্থাৎ সেই বাঁধা কুলি। সে তখন ঘরের পেছন দিয়ে নেমে গেছে গঙ্গার নাবিতে, কালো আঁধারে, আর মনে মনে বলছে, আরে বাপরে শালারা আমার জান নিকেশ করে দিতে পারে।

হঠাৎ সমস্ত গোলমালকে ছাপিয়ে তীব্র মোটা গলায় গোবর হাঁক দিল, লাও আসছে, লাও। জোয়ান, তৈয়ার হো!

মুহূর্তে যেন জাদুমন্ত্রে থেমে গেল সমস্ত গোলমাল, মারামারি, হাতাহাতি। সকলে ফিরে তাকাল উত্তরের বাঁকের দিকে, নিঃশব্দে।

পুবে উঠেছে আধখানা চাঁদ, ভাটার জলে তার ঝিলিমিলিতে দেখা যায় অদুরেই কতকগুলো বিরাট বড় বড় নৌকো গঙ্গার বুকে ছায়া ফেলে এগিয়ে আসছে। মোটা মাস্তুল উঠেছে আকাশে। …

সেই নৌকো থেকে ভেসে এল একটা স্বর, হো-ই-ই..

এখান থেকে হাঁকল গোবর, হা-ই-ই!…

আসছে আসছে তাদের মন পবনের নাও। সাঁঝবেলায় এসেছে সকাল। কারও দাঁত ভাঙা, ঠোঁট কাটা, চোখ ফোলা, নখে ক্ষত। কারও হাতে কার ছিঁড়ে নেওয়া এক মুঠো চুল কিম্বা পরিধেয় কাপড়ের টুকরো।

অকস্মাৎ ভাটার ছলছল তালে তালে তাল দিয়ে কে গেয়ে উঠল সরু গলায়,

ওই আসে গো, ওই আসে লায়ে ভরা টালি,
মাঝি এস তাড়াতাড়ি,
আর যে ভাই রইতে নারি
আঁধার নামে গাঁয়ে ঘরে, লাও করব খালি।

গান গাইছে লালশাড়ি। সুর তুলেছে আবার, তাল লেগেছে আবার, শরীরের পেশিতে পেশিতে।

এগিয়ে আসে গোবর, কামিনী বুড়ি, তুই এখন চোখে দেখতে পাবিনে, ঘরে যা। শ্যামা তুই পালা, ঘরে তোর ছেলে রয়েছে। ভোলা তুই যা, তোর চোট বেশি।

তারা বলল, আমরা খাব কী?

তোদের মজুরিটা আমরা খেটে তুলে দেব।

সবাই বলে উঠল, রাজি আছি।

যেন এ মানুষগুলো কিছুক্ষণ আগের সেই হিংস্ৰপ্রাণীগুলো নয়।

কামিনী বুড়ি বলে গেল, বউ, হুঁশিয়ার!…

তারপর এক অদ্ভুত সাড়া পড়ে যায় কাজের। নৌকো লাগে পাড়ে। শুরু হয় মাল তোলা। গানে, কাজের উন্মাদনায়, হাঁকে ডাকে মুখরিত গঙ্গার ধার। পাঁচ নৌকো খালাস হলেই একদিনের রোজ পাবে কুড়িজন।

কোনখান দিয়ে সময় কেটে যায়, কেউ টেরও পায় না। জুড়ি বেছে নিয়ে সব মাল তুলে দেয় লরিতে। একটা যায়, আর একটা আসে।

ঝুড়ি কোদাল জমা দিয়ে, রোজের পয়সা নেওগা হলে লালশাড়ি সকলের চোখের আড়ালে আড়ালে কৈলাসের হাত ধরে টেনে নেমে গেল গঙ্গার ঢালু পাড়ের নীচে। বলে রুদ্ধগলায়, সারা মুখে রক্তারক্তি। এসো, ধুয়ে দি।

কৈলাস বলে অদ্ভুত হেসে, রক্ত তো তোর মুখেও, ধুয়ে আর কত তা তুলবি।..

কিন্তু, কেন—কেন? ফুঁপিয়ে উঠল লালশাড়ি।

আবার জোয়ার আসায় দক্ষিণ হাওয়ার ঝাপটায় ভেসে গেল তার গলা।

তখন অনেকেই নেমে এসেছে গঙ্গার কিনারে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel