Monday, March 30, 2026
Homeবাণী ও কথাহরীতকী - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

হরীতকী – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

হরীতকী – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আজ এই পূর্ণিমা রাতে টিউশনি সেরে ফেরার পথে গিরিজা টের পেলেন, তাঁকে কানাওয়ালা ধরেছে।

বাঘা যতীন পার্কের পাশ দিয়ে গুটিগুটি হেঁটে জ্যোৎস্না দেখতে-দেখতে দিব্যি আসছিলেন। শরৎকালের ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, শীত-শীত লাগছিল। কোনও বাড়ির বাগান থেকে শিউলি ফুলের গন্ধও ভেসে আসে, সেইসঙ্গে একটা ডাল ফোড়নের গন্ধওয়ালা জায়গাও পার হয়ে এলেন। খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। আবুর মা ওবেলা একটা ফুল মার্ক পাওয়া মোচাঘণ্ট বেঁধে রেখেছে, এবেলাও সেটা দেবে, সেইসঙ্গে ঘানির তেল আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ডালসেদ্ধ–ভেবে একটু তাড়াহুড়ো করে হাঁটছেন। বাঘা যতীন পার্ক পেরিয়ে দুনম্বর ডাবগ্রামের রাস্তা পেরিয়ে আদিগন্ত জ্যোৎস্নায় এক নম্বর ডাবগ্রামের রাস্তায় নেমে পড়তেই টের পেলেন, রাস্তা চিনতে পারছেন না। জ্যোৎস্নারাতে মফসসলের রাস্তায় ইলেকট্রিক আলো থাকে না। তা না থাকুক, ফটফটে রাস্তাঘাট সবই দেখা যাচ্ছে। আমগাছ, জামগাছ চেনা যাচ্ছে। কিন্তু কানাওয়ালা ধরলে আর কিছু উপায় থাকে না। দশবার নিজের বাড়ির সদর দিয়ে হেঁটে গেলেও বাড়ি চেনা যায় না।

ছেলেবেলা থেকেই এই কানাওয়ালা ভূতটা প্রায়ই ধরে এসে গিরিজাকে। একা জুতমতো পেলেই সাঁপুটে ধরে, খুব নাকাল করে ছেড়ে দেয়। তার ওপর গিরিজার বয়স এই তিয়াত্তর পেরোল, এ বয়সে অনেক কিছুই ভোঁতা মেরে যায়। মাথার মধ্যে সব সময়ে একটা ধন্ধ ভাব।

ডাবগ্রামের এক মাথায় সরকারি গুদাম। পিপে যদি আড়াআড়ি করে আধখানা মাটিতে পোঁতা যায় তবে যেমন দেখতে হয় গুদামের চেহারা অবিকল সেরকম। লম্বা-লম্বা ঘর, টিনের ছাউনি গোল হয়ে নেমে এসেছে। সারি-সারি চল্লিশ পঞ্চাশটা গুদামঘরের ভিতরে রাস্তাটা ধাঁধা মেরে গেল। কাছেপিঠে লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। রাত্রি বাজে দশটা। চারদিক ঝিম মেরে গেছে। গিরিজা এদিক-সেদিক ঘুরলেন। খুব খিদে পেয়েছে। রাস্তা পাচ্ছেন না। গত পনেরো বছর এইসব রাস্তায় ঘুরলেন। তবু পাচ্ছেন না। ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছেন, কানাওয়ালা এক কানাভূত যাকে ধরে তাকে চেনা রাস্তায় ঘুরপাক খাওয়ায় আর আবড়ালে বসে হিহি করে হাসে। ভূতেদের যা স্বভাব। যৌবনকালে গিরিজা যখন বিজ্ঞান পড়তেন তখন বয়োধর্মে আর ভূত ভগবান মানতেন না। এই বুড়ো বয়সে আবার সেই শিশুবেলার ভয়ভীতি ফিরে এসেছে। এখন ভূতও আছে, ভগবানও আছে। গিরিজাপতি তাই কানাওয়ালাকে তাড়ানোর জন্য ডাকেন–রাম রাম! জয় সচ্চিদানন্দ রঘুপতি রামচন্দ্র। রাম হে, হরি হে–

কোথায় কী? রাস্তা-ঘাট সব গুলিয়ে গেছে। প্রচণ্ড জ্যোৎস্না প্রায় রোদ্দুরের মতো উজ্জ্বল। রাস্তায় নুড়ি–পাথরটার পর্যন্ত ছায়া পড়েছে। গুদামঘরগুলোর টিনের ছাউনিতে খটখটাং করে শব্দ হয় মাঝে-মাঝে। সে ভূতের ঢিল নয়। তিনি জানেন, সারাদিনে তেতে থাকা টিন রাতের ঠান্ডায় একটু-একটু করে সংকুচিত হয়ে আসে, তাই এ শব্দ। জেনেও কিন্তু মন মানে না, চমকে উঠে ভাবেন ভূতের ঢিল নয়তো বাবা। অ্যাঁ!

যে বাড়িতে টিউশনি করেন সে-বাড়ির কর্তা ভবেশ রায় নিজেকে বুড়োমানুষ ভাবেন। বয়স কিছু না, মোটে বাষট্টি। বিরাট অবস্থা। গোটাদুই চা বাগানের মেজর শেয়ার, গোটাছয়েক লরি, বিধান মার্কেটে ফ্যান্সি দোকান। সুখী মানুষ। প্রায়ই এসে মেয়ের পড়ার ঘরে বসে গিরিজার সঙ্গে আচ্ছা দেন। কিন্তু গিরিজার সঙ্গে ভবেশের মতের মিল হয় না। ভবেশ বলেন–বুড়ো বয়সে খাওয়া কমানো উচিত। তাই ভবেশ রায় নিজেও কম খান। একটা মধুপর্কের বাটির মাপের এক বাটি ভাত একবেলা, সকাল-বিকেল এক চিমটি করে ছানা, রাতে গোনা দু-খানা রুটি। এই খেয়েই নাকি খুব শক্ত আছেন ভবেশ। গিরিজার সেটা ভাবতেই কষ্ট হয়। অত কম খেয়ে বাঁচে নাকি লোকে? তাঁর নিজের তো অনন্ত খিদে। একগোছা রুটি আর জলের গেলাস দিয়ে বসিয়ে দিলে এই বয়সে নিদন্ত মুখে টাউটাউ করে শুধু মাড়িতে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেন পলকের মধ্যে।

তবে কি গরিবেরই খিদে পায় বেশি?

আজ রাতে ভাত হবে। শালবাড়ির দিকে বিঘে চারেক জমি আছে, বর্গায় চাষ করে। সেখান থেকে পরশুদিনই আধমণ চাল দিয়ে গেছে ভালোমানুষ বর্গাদার। ক’দিন রাতের খাওয়াটা বেশ হচ্ছে। ফোঁটা ভাতের গন্ধ পাচ্ছেন যেন গিরিজা! কিন্তু কোথায় ভাত। কেবল অকাজের জ্যোৎস্না চারদিকে।

২.

আবুর কাজ বলতে দুটো, কালী সাধনা আর বকবক।

কালী সাধনা অবশ্য তার নিজের খেয়ালখুশি মতোই করে। ঘরের এক জায়গার দেওয়াল নোনায় খেয়েছে। সেই দাগধরা জায়গাটার দিকে চেয়ে সারাদিন একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে সে

রামপ্রসাদী থেকে যাবতীয় শ্যামাসঙ্গীত সম্পূর্ণ বেসুরে গায়। সাধনার শেষ দিকটায় কালী নামটা আর পুরো উচ্চারণও করতে পারে না, কেবল বলে কাঃ, কাকা, কাঃ কা কা–সে স্নান করে না, স্নানের বদলে সে রোজ সকাল-বিকেল আধ কলসি করে জল খায়। সেটা নাকি অন্তস্নান। দেহের সব ময়লা ওই জলের ঠেলায় ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। তখন গামছা দিয়ে গা মুছলেই স্নান হয়ে গেল। মাথার চুল জটা হয়ে পেছন দিকে মৌচাকের মতো ঝুলে থাকে। ওদিকে কপালের ওপর দিকটায় টাক পড়ে যাচ্ছে। উকুনের চুলকনিতেও নখের ডগায় চুল উঠে আসে। তা টাকই পড়ুক, আর জটাই ঝুলুক, আবুকে সুন্দর দেখবার কেউ নেই। বউ তার সঙ্গে থাকে না। বিয়ের পর বারো বছর কষ্টেসৃষ্টে ছিল, তারপর বাপের বাড়ির চলে গেছে। কোথায় একটা চাকরি বাকরি করে। মাস পয়লা আবার আবুর কাছ থেকেও কিছু আদায় করে নিয়ে যায়। আবু পেশকারী করে। সাধুসন্ত মানুষ বলে তার রোজগার বেশি নয়।

ইদানীং তাকে হরীতকীতে পেয়েছে। কেরোসিনওয়ালা রামু বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সাইকেলওয়ালা গাড়িতে কেরোসিন বেচে। রামু বলে তার বয়স নাকি নব্বই। ইয়া স্বাস্থ্য, যুবকদের চেয়েও বেশি শক্তি।

আবুর আবার সকলের সঙ্গেই ভাব। সারাদিন বকবক করতে হলে তোক বাছাবাছি চলে না। প্রতিদিনই সে কিছু না কিছু অপরিচিত লোককে আপন করে ফেলে। রামুর সঙ্গে তার ভাব অবশ্য দীর্ঘকালের।

দিনসাতেক আগে রামু তাকে কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস খেতে দিয়েছিল, কচিকচি হরীতকী, বালিতে ভাজা। ভারী ভালো খেতে। ভাজা হরীতকী খেয়ে আবু মোহিত হয়ে গেল। রামু বলে–হারা খেয়ে এই নব্বই বরিষ উমরে আমার এত তাকত।

কোনও জ্ঞানই ফ্যালনা নয়। সেই থেকে আবু হরীতকীর পিছনে লেগেছে। গত সাতদিন মানুষ হরীতকীর জীবন-যৌবন-দায়িনী ক্ষমতার কথা শুনতে-শুনতে পাগল হয়ে গেল। তবু আবুর। ক্লান্তি নেই। বিধান মার্কেট আর পুরোনো বাজার ঘুরে সে ইতিমধ্যে প্রায় তিন কিলো হরীতকী এনে ফেলেছে। জামার দু-পকেট ভরতি হরীতকী নিয়ে ঘোরে, যাকে তাকে ধরে-ধরে খাওয়ায়। নিজে সবসময় মুখে হরীতকী নিয়ে ঘুরছে।

সন্ধেবেলা সে মানিকরামের ডাক্তারখানায় উঠে বসে পড়ল। ডাক্তারখানায় রুগি–টুগি আসে। মানিকরামের ঢের পৈতৃক পয়সা আছে, আর ব্রিজ খেলার নেশা। পসার নেই। নিতান্ত দায়ে

পড়লে কেউ তাকে ডাকে না, বলে–ও তো তাস খেলতে-খেলতে ডাক্তারি ভুলে গেছে। তবু ডাক্তারখানা আছে নামকোবাস্তে। সন্ধের পর সেখানে ব্রিজের আড্ডা বসে, কিছু উটকো লোক সময় কাটাতে আসে, গল্পগাছা হয়। আবু ডাক্তারখানায় ঢুকতেই কিছু লোক খবরের কাগজের পাতা ভাগ করে ডুব দিল, একজন অন্যধারে উঠে গেল। চোরের দায়ে ধরা পড়ল বেকার কম্পাউন্ডার সাধন। সে টোকা দিয়ে মশা মেরে টেবিলের ওপর জড়ো করছিল। রোজ সেঞ্চুরি করে। আজও তিরাশিটা হয়েছে এ পর্যন্ত। আর সতেরোটা বাকি। টেবিলের ওপর মরা মশার একটা ছোট স্তূপ তৈরি হয়েছে। চুরাশি নম্বর মশাটা পান করে কানের কাছ থেকে উড়ে এসে থুতনিতে ধাক্কা খেয়ে বসি-বসি করছে। সাধন খুব সাবধানে অনড় হয়ে লক্ষ রাখছিল। এমন সময়ে আবু উঠে এসে ঝপ করে বসেই বলতে শুরু করল হুতুকির যা কাণ্ড দেখলাম সাত দিনে, বলার নয়।

মশাটা বসল না। উড়ে অন্যধারে চলে গেল। বিরক্ত হয়ে সাধন বলে–বেশি খেও না আবুদা। আবু অবাক হয়ে বলে–বেশি খাব না?

–না। পরে বিপদে পড়বে।

আবু রেগে গিয়ে বলে–হতুকির তুই জানিসটা কী শুনি! মুনিঋষিরা একটা করে পাকা হকি খেয়ে কতকাল বাঁচত জানিস?

–মুনিঋষির কথা বাদ নাও। তারা না হয় একটা করে খেত, তুমি কিন্তু দশ-বারোটা করে চালাচ্ছ। শেষে বিপদে পড়ে যাবে।

–যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। বিরক্ত হয়ে আবু বলে।

–দাসীর কথা বাসি হলে কাজে লাগবে। সাধন চুরাশি নম্বর মশাটিকে গোঁড়ালির হাড়ের ওপর খতম করে টেবিলের ওপর রাখল। আর যোলোটা। আবুর দিকে চেয়ে বলল –বেশি হকি খেলে শুক্রতারল্য হয়।

হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হেসে ওঠে আবু। মূর্খ বলে কী? তা ছাড়া হরীতকীতে ওরকম কিছু হতে পারে, এ ভাবাই যায় না।

আবু বলে–বুঝলে বাবা, হরীতকী হল অমৃত। এ রেগুলার খেলে একশো-দুশো বছর বেঁচে থাকাটা কোনও কথাই নয়। বাঁচতে-বাঁচতে ঘেন্না ধরে যাবে। তখন মরার জন্য আনচান করে উঠবে, কিন্তু মরা কি সহজ?

ডাক্তারখানা থেকে নেমে রাস্তায় সে মুদি খগেনকে পেয়ে গেল। খগেন তার রাখা মেয়েমানুষের বাড়ি যাচ্ছে। অনেকটা পথ তাকে সঙ্গ পেয়ে ভারী আহ্লাদ আবুর। হরীতকীর যাবতীয় গুণের কথা কি বলে শেষ করা যায়! এত সস্তা, হাতের কাছের জিনিস লোকে তবু গ্রাহ্য করে না। মূর্খ সাধনচন্দ্র কী যেসব বললে, হ্যাঃ! এক হপ্তা খেয়ে আবুর নিজের পুরোনো অম্বলের অসুখ নেই। অম্বলের চাকা পেটময় বেড়াত, গলে তরল হয়ে গেছে। চোখে ছানির ভাব ছিল, কেটে গেছে। বাহান্ন বছর বয়সে এখন হঠাৎ শক্তির জোয়ার এসেছে গতরে।

হঠাৎ আবু খগেনকে বলল –দাঁড়াও।

খগেন দাঁড়ায়। রাস্তার পাশে প্রচুর বড়-বড় চাঁই পাথর পড়ে আছে, রাস্তা মেরামতের কাজে লাগবে। তারই একটা মাঝারি চাঁই তুলে নিয়ে আবু রাস্তার পাশে মাঠটায় যতদূর সম্ভব ছুঁড়ে দিলে, বলল –দেখলে? গত সাতদিনে কতটা ক্ষমতা বেড়েছে!

খগেন শ্বাস ফেলে বলে–দেখছি।

তার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। মাঠের ভিতর দিয়ে শর্টকাট করতে নেমে গেল খগেন। একা-একা কালীর গান করতে-করতে আবু সরকারি গুদামের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে।

৩.

এই বয়সে খিদেটা ম্যালেরিয়া জ্বরের মতো। হুড়মুড় করে উঠে পড়ে কাঁপুনি তুলে দেয়। এ বয়সে সব বেগই বড় তড়িঘড়ি আসে। সামলানো যায় না। মলমূত্র ত্যাগে একটু দেরি করেছ কী সব কাপড়ে–চোপড়ে হয়ে যাবে। খিদেও তাই। উঠল বাই তো কটক যাই।

গিরিজার চোখে জল আসে। পেটটা ডেকে-ডেকে কত কথা বলছে ভিখিরির মতো। সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। কোলকুঁজো হয়ে কোনওক্রমে সেটাকে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না! রাস্তাঘাট সব জ্যোৎস্নায় ডুবিয়ে মায়াবী রং করে রেখেছে। তিনটে রাস্তায় তিনবার যাওয়ার চেষ্টা করে গিরিজা একই জায়গায় ঘুরে এলেন। কানাওয়ালা ধরলে এরকমই হওয়ার কথা। চেনা রাস্তায় দশবার ঘুরলেও দিকভ্রম হবে, নিজের বাসার সদর দিয়ে গেলেও চেনা যাবে না। বয়স তিয়াত্তর, এই বয়সেই ভূতেরা এসে ধরে।

–জয় রাম, জয় রাম। জয় রঘুপতি। গিরিজা বিড়বিড় করতে থাকেন।

ঠঙাৎ করে একটা শব্দ হয়। টিনের চালে কে একটা মস্ত ঢিল মারল। এ টিনের শব্দ বলে ভুল হওয়ার নয়। বাস্তবিক ঢিল। টিনের চাল থেকে ছিটকে সামনের রাস্তায় পড়ে ব্যাঙবাজির খাপড়ার মতো লাফিয়ে গিয়ে ঘাস–জঙ্গলে পড়ল। স্পষ্ট দেখা। চোখে এখনও বেশ দেখেন গিরিজা। ঢিলটা পড়তেই তারস্বরে রাম নাম করতে-করতে একটা গুদামঘরের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েন। বেহায়া ভূত। বুড়ো মানুষকে নিয়ে এ কী কাণ্ড বাবা! সব জায়গাতেই বুড়ো–ধুড়ো দেখলে সকলের রসের ভাঁড়ে তুফান জাগে। রাস্তাঘাটে চ্যাংড়ারা কত পেছুতে লাগে, বাজারের দোকানিরা ‘দাদু দাদু’ বলে রঙ্গ করে, তো ভূতও বাকি থাকে কেন?

এখন হিম পড়ে বলে ছাতাটা নিয়েই বেরোন। রাতের বেলা টিউশনি সেরে ছাতমাথায় ফিরে আসেন তো লোকে পেছুতে লাগে, বৃষ্টি-বাদলা বা রোদ না হলে ছাতার মর্ম ওরা বুঝবে কি! বুড়ো হোক, আগে সব ব্যাটা বুড়ো হোক, তখন বুঝবে। ছাতাটা ফেলে এসেছেন ছাত্রীর বাড়িতে।

আর-একটা ঢিল গদাম করে পড়ল কাছে-পিঠেই, কোনও গুদামের চালে। ঢিল নয়, এখন আধলা কিংবা থান ইট ছুড়ছে। একটা-দুটো চৌকিদার এখানে ঘোরাফেরা করে রোজ। তাদেরও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। জ্যোৎস্না রাতে বোধহয় আহ্লাদ হয়েছে খুব ব্যাটাদের, ছিলিমে দম দিয়ে, নয়তো সিদ্ধি চড়িয়ে কি দিশির চাপান দিয়ে পড়ে আছে। সরকারি গোয়ালে আর কী ধোঁয়া দেবে!

আছেন শুধু রামচন্দ্র। হৃদিস্থিতেন। কিন্তু তবু বুকটা বড় কাঁপছে। খিদেটা পেটের মধ্যে গেঁকি কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ করে ধমকাচ্ছে তাঁকে।

ছাতাটা হাতে থাকলে একটু সাহস পেতেন। ভূতপ্রেত যাই হোক, ছাতা লাঠি কিছু হাতে থাকলে যেন একটু জোর–বল পাওয়া যায়। ওরা অবশ্য ছাতা কাল ফেরত দেবে। তবু

তাঁর ছেলে আবুটা মানুষ নয়। বউ বিপদ বুঝে ছেলেপুলে নিয়ে পিটটান দিয়েছে। সারাদিন মাথামুণ্ডু করে বেড়ায়। যৌবন বয়সে মিলিটারিতে গিয়েছিল মণিপুর ফ্রন্টে। সেখান থেকে ফিরে ওকে কালীতে পেল। ঘুমের মধ্যে ‘বুবি ট্রাপ বুবি ট্রীপ’ বলে চেঁচিয়ে উঠত। তারপর নানা ঘাটের জল খেয়ে এখন পেশকার। ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছেন পেশকারি সোনার চাকরি। পেশকারের মা বেনারসি পরে পায়খানায় যায়, তেল দিয়ে আঁচায়। কোথায় কী? আবু মাস মাইনের অর্ধেক তার খাণ্ডার বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে আসে। সেই বউ মাইনের তারিখে কোর্টের দরজায় মোতায়েন থাকে। উপরিও পায় না কিংবা নেয় না। অপদার্থ ভ্যাগাবন্ড।

ভাববেন, তার জো কি! ভূতটার আজ রস উছলে পড়ছে। দমাদম ঢিল মারছে ইদিক-সিদিক। ছাতাটা থাকলে কতকটা রক্ষে হত। কখন কোনটা মাথায় এসে পড়ে! রাম-রাম। যৌবন বয়সে ভূতকে মানেন কী বলে আজ সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দুটো কান ধরে বললেন–ঘাট হয়েছে বাবা। আর অমন করব না। তোমাদের গড় করি। ভালো করে নিজের কান মললেন, কাঁদলেনও একটু। বলেন রাস্তাটা চিনিয়ে দাও বাবাসকল, জ্যোৎস্না একটু ঘুরিয়ে ফেল, চোখ ধাঁধিয়ে যায় বাবা। খিদের টানে শরীর হজম হয়ে যাচ্ছে। ওই বুঝি চৌকিদারের হুঁশ হল এতক্ষণে!

–কোন হ্যায় রে? বলে অশ্রাব্য খিস্তি দিল একটা। তারপর লাঠি ঠুকবার আওয়াজ। কে যেন চেঁচিয়ে বলল –উও ভাগ রহা। এ রামরিখ ভাই, পাকড়ো–

খুব চেল্লাচেল্লি আর দৌড়োদৌড়ি লেগে গেল। আশপাশেই হচ্ছে। গুদামঘরগুলোর জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু খুব একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠল। ভারী-ভারী জুতোর শব্দ হচ্ছে রাস্তায়। ধুপধাপ মাটি চমকাচ্ছে।

একটু নিশ্চিন্ত হন গিরিজা। লোকজন দেখলে ভূত তফাত যায়।

কিন্তু রাস্তা বেভুল–করা কানাওয়ালা যে এখনও ছাড়েনি। কোন দিকটায় যাবেন ঠিক ঠাহর পাচ্ছেন না। তবু গুটিগুটি রওনা দিলেন। দেখা যাক।

বাপ রে! কালো মতন কি একটা ধেয়ে এল! জ্যোৎস্নার মধ্যে একটা করাল চেহারা। আকাশের দিকে হাত তোলা, চুল উড়ছে, আর হাহা অট্টহাসি।

কেঁদে কঁকিয়ে উঠে বসে পড়েন গিরিজা, অস্ফুট গলায় বলতে থাকেন–রাম রাম রাম রাম—

ভূতটা থমকে দাঁড়ায়। বলে–কে রে, রাম নাম করিস?

গিরিজা সভয়ে বলেন–বুড়োমানুষ বাবা, মাপ করে দাও।

–কালীর নাম কর, কালীর নাম কর। কালীর নামে জগৎ উদ্ধার…আরে বাবা নাকি?

গিরিজা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান। ছাতাটা ফেলে এসেছেন বলে খুব দুঃখ হচ্ছে। হাতে থাকলে দামড়াটাকে ঘাকতক দিতেন।

ভয়ংকর রেগে গিয়ে বললেন–তুই কোত্থেকে–অ্যাঁ?

আবু ঝপ করে বাপের হাতটা চেপে ধরে বলে–দৌড়োও। চৌকিদাররা টের পেয়ে গেছে।

–কী টের পেয়েছে।

–পরে বলছি। দৌড়োতে না পারো জোর কদমে হাঁটো। নাহক এসে হামলা করবে।

–কিছু করেছিস নাকি?

বাপের হাতে ধরে গুদাম ঘরের ছায়ায়-ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে জোর হাঁটে আবু। বাবাকে প্রায় হিচহেড় নিয়ে যায়। হাসতে-হাসতে বলে–আরে না। কয়েকটা ঢিল ছুড়ছিলাম।

গিরিজা অবাক হয়ে বলেন–ঢিল ছুঁড়েছিলি? আজ কি নষ্টচন্দ্র?

–আরে না। বলে খুব হাসে আবু।

–তবে কি শেয়াল?

–আরে না। শালারা হকির গুণ মানতে চায় না। গত সাতদিন ধরে খেয়ে আমি বুঝতে পেরেছি হত্ত্বকির মতো জিনিস হয় না। যৌবন ফিরে আসে। দেখবে? গুদাম পার হয়ে মাঠের মধ্যেকার পথ পেয়ে গেছে তারা। আবু একটা মস্ত ঢেলা কোত্থেকে কুড়িয়ে নিয়ে আচমকা চাঁদের দিকে ছুড়ল। সেটা খানিক উঠেই ধপ করে পড়ল।

–দেখলে? আবু জিগ্যেস করে।

–হুঁ।

–হ্যাঁ-হ্যাঁ। খুব ক্ষমতা বেড়ে যায়। চৌকিদার শালারা ধরতে পারত নাকি আমাকে? এমন দৌড় দিয়েছিলাম না? কী যে দম পাই এখন বাবা, মনে হয় এক নাগাড়ে দশ-বিশ ক্রোশ। দৌড়াতে পারি। হকিতে সব হয়।

গিরিজা নিশ্চিন্তে হাঁটছেন। পাগল হোক, ছাগল হোক, তবু তো ছেলে! ঠিক সময়টায় গিয়ে ওই ভূতুড়ে গোলকধাঁধা থেকে হাত ধরে টেনে এনেছে। ভগবান এখনও আছেন। রাম নামের জোর করে বাবা! ক’বার করতে–না-করতেই বাতাস ফুঁড়ে ছেলে বেরিয়ে এসে কুড়িয়ে নিল। নইলে বেঘোরে মারা পড়তেন নির্ঘাত।

আবু –ঝলে বাবা!

–হুঁ।

–যুদ্ধের সময়ে মণিপুর ফ্রন্টে আমাদের একরকম বড়ি দিত। খেলে খিদে নষ্ট হয়ে যেত, শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে চাঙা হয়ে উঠত। চারদিকে বুবি ট্রাপ, বুবি মানে জানো তো। বুবি মানে বোমা। মাটিতে মাইন, ওপরে বোমা। সে-সময়ে একটু ঝিমুনি এল কি খিদেয় অস্থির হলে তো গেলে। ওই বড়ি খেলে সব কেটে যেত। মাইলের-পর-মাইল জঙ্গল ভেঙে বোঝা টেনে হাঁটতাম। বুঝলে বাবা, বহুকাল বাদে হতুকিতে আবার সেরকম জোর পাচ্ছি। দেখবে? একটু দৌড়ে দেখাব?

–না-না, থাক। গিরিজা ভয় খেয়ে বলেন। কানাওয়ালাটা আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। ছেলে তফাত হলেই ধরবে। তিনি অস্ফুট গলায় বলেন–রাম রাম।

আবু বিরক্ত হয়ে বলে–কালী-কালী বলল । কালী নাম আর হকি। দেড়শো-দুশো বছর হেসে-খেলে।

বাড়ি এখনও দূর আছে। খিদেটা এমন কামড়ে বেড়াচ্ছে পেটের মধ্যে। মোচার ঘণ্ট আর ডালসেদ্ধ নিয়ে এক ভুর ভাত খাবেন আজ গিরিজা। ব্যাটারা বলে বুড়ো বয়েসে কম খেতে হয়। ইঃ! কম খাবে!

আবু হাত বাড়িয়ে একটা হস্তুকি দিয়ে বলে–খাও বাবা। সাংঘাতিক জিনিস।খিদেটা বড় কষ্ট দিচ্ছে। হকিটা আস্ত মুখে ফেলে মাড়ি দিয়ে চিবোতে থাকেন গিরিজা। সাঁৎ–সাঁৎ করে হত্ৰুকিটা পিছলে যাচ্ছে মাড়ি থেকে। রস বেরোচ্ছে না তবু চেষ্টা করতে থাকেন গিরিজা। চেষ্টাই তো জীবন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor