১. কচুপাতার উপরে টলটল করে
কচুপাতার উপরে টলটল করে ভাসছে কয়েকফোঁটা শিশির।
ভোরের কুয়াশার নিবিড়তার মধ্যে বসে একটা মাছরাঙা পাখি। ঝিমুচ্ছে শীতের ঠাণ্ডায় একটা ন্যাংটা ছেলে, বগলে একটা স্লেট। আর মাথায় একটা গোল টুপি। গায়ে চাদর পায়ে চলী ভেজা পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে।
অনেকগুলো পাখি গাছের ডালে বসে নিজেদের ভাষায় অবিরাম কথা বলে চলেছে।
কতগুলো মেয়ে।
ত্রিশ কি চল্লিশ কি পঞ্চাশ হবে।
একটানা কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে না। শুধু বলে যাচ্ছে।
কতগুলো মুখ।
মিছিলের মুখ।
রোদে পোড়া।
ঘামে ভেজা।
শপথের কঠিন উজ্জ্বল দীপ্তির ভাস্বর।
এগিয়ে আসছে সামনে।
জ্বলন্ত সূর্যের প্রখর দীপ্তিকে উপেক্ষা করে।
সহসা কতগুলো মুখ।
শাসনের-শোষণের-ক্ষমতার-বর্বরতার মুখ।
এগিয়ে এলো মুখোমুখি।
বন্দুকের আর রাইফেলের নলগুলো রোদে চিকচিক করে উঠলো।
সহসা আগুন ঠিকরে বেরুলো।
প্রচণ্ড শব্দ হলো চারদিকে।
গুলির শব্দ। কচুপাতার উপর থেকে শিশির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।
মাছরাঙা পাখিটা ছুটে পালিয়ে গেলো ডাল থেকে।
ন্যাংটা ছেলেটার হাত থেকে পড়ে গিয়ে স্লেট ভেঙে গেলো।
পাখিরা নীরব হলো।
মেয়েগুলো সব স্তব্ধ নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো।
একরাশ কৃষ্ণচূড়া ঝরে পড়লো গাছের ডাল থেকে।
সূর্যের প্রখর দীপ্তির নিচে–একটা নয়, দুটো নয়। অসংখ্য কালো পতাকা এখন।
উদ্ধত সাপের ফণার মতো উড়ছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি।
সন উনিশশ বায়ান্ন।
খুব ছোট ছোট স্বপ্ন দেখতো।
চাষার ছেলে গফুর।
এক একটা ছোট্ট ক্ষেত।
একটা ছোট্ট কুঁড়ে।
আর একটা ছোট্ট বউ।
ক্ষেতের মানুষ সে।
লেখাপড়া করেনি।
সারাদিন ক্ষেতের কাজ করতো।
গলা ছেড়ে গান গাইতো।
আর গভীর রাতে পুরো গ্রামটা যখন ঘুমে ঢলে পড়তো তখন ছোট মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে পুঁথি পড়তো সে, বসে বসে।
সুর করে পড়তো ছহি বড় সোনাভানের পুঁথি। ছয়ফল মুলুকের পুঁথি।
আমেনাকে দেখেছিলো একদিন পুকুরঘাটে।
পরনে লাল সবুজ ডুরে শাড়ি।
ঘোমটার আড়ালে ছোট্ট একটি মুখ।
কাঁচা হলুদের মতো রঙ।
ভালো লেগেছিলো।
বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে মেয়ের বাবা রাজি হয়ে গেলো।
ফর্দ হলো।
গফুরের মনে খুশি যেন আর ধরে না।
ক্ষেতভরা পাকাধানের শীষগুলোকে আদরে আলিঙ্গন করলো সে।
রসভরা কলসিটাকে খেজুরের গাছ থেকে নামিয়ে এনে একনিশ্বাসে পুরো কলসিটা শূন্য করে দিলো সে।
জোয়ালে বাঁধা জীর্ণ-শীর্ণ গরু দুটোকে দড়ির বাধন থেকে ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে বললো—যা
আজ তোদের ছুটি।
গফুর শহরে যাবে।
বিয়ের ফর্দ নিয়ে।
এ সবকিছু নিজের হাতে কিনবে সে।
ও শাড়ি, চুড়ি, আলতা, হাঁসুলি।
অনেক কষ্টে সঞ্চয়-করা কতগুলো তেল চিটচিটে টাকার কাগজ রুমালে বেঁধে নিলো সে।
বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে খেয়া পেরিয়ে শহরে আসবে গফুর। বিয়ের বাজার করতে।
গফুরের দু-চোখে ঘরবাধার স্বপ্ন।
বাবা আহমেদ হোসন।
পুলিশের লোক।
অতি সচ্চরিত্র।
তবু প্রমোশন হলো না তার।
কারণ, তসলিম রাজনীতি করে।
ছাত্রদের সভায় বক্তৃতা দেয়।
সরকারের সমালোচনা করে।
ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন বাবা।
মেরেছেনও।
যাঁর ধমকে দাগি চোর, ডাকাতি, খুনি আসামিরা ভয়ে থরথর করে কাঁপতো তাঁর অনেক শাসন, তর্জন-গর্জনেও তসলিমের মন টললো না।
মিছিলের মানুষ সে।
মিছিলেই রয়ে গেলো।
মা কাদলেন। বোঝালেন, দিনের পর দিন।
আত্মীয়-স্বজন সবাই অনুরোধ করলো।
বললো বুড়ো বাপটার দিকে চেয়ে এসব এবার ক্ষান্ত দাও। দেখছো না ভাইবোনগুলো সব বড় হচ্ছে। সংসারের প্রয়োজন দিনদিন বাড়ছে। অথচ প্রমোশনটা বন্ধ হয়ে আছে।
কিন্তু নিষ্ঠুর-হৃদয় তসলিম বাবার প্রমোশন, মায়ের কান্না, আত্মীয়দের অনুরোধ, সংসারের প্রয়োজন সবকিছুকে উপেক্ষা করে মিছিলের মানুষ মিছিলেই রয়ে গেলো।
কিন্তু এই নিষ্ঠুর হৃদয়ে একটা কোমল ক্ষত ছিলো।
সালমাকে ভালোবাসতো সে।
সালমা ওর খালাতো বোন।
একই বাড়িতে থাকতো।
উঠতো বসতো চলতো।
তবু মনে হতো সালমা যেন অনেক-অনেক দূরের মানুষ।
তসলিমের হৃদয়ের সেই কোমল ক্ষতটির কোনো খোঁজ রাখতো না সে।
কিম্বা রাখতে চাইতো না।
বহুবার চেষ্টা করেছে তসলিম।
বলতে বোঝাতে। কিন্তু সালমার আশ্চর্য ঠাণ্ডা চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারেনি সে।
এককালে ভালো কবিতা লিখতেন তিনি।
এখন সরকারের লেজারের টাকার অঙ্ক থরেথরে লিখে রাখা তাঁর কাজ।
কবি আনোয়ার হোসেন।
এখন কেরানি আনোয়ার হোসেন।
তবু কবি-মনটা মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে যায়। যখন তিনি দিনের শেষে রাতে ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করেন।
ঝগড়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
যখন এ দেহ মন জীবন আর পৃথিবীটাকে নোংরা একটা ছেড়া কাঁথার মতো মনে হয়, তখন একান্তে বসে কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে তাঁর।
আনোয়ার হোসেনের জীবনে অনেক অনেক দুঃখ।
ঘরে শান্তি নেই। স্ত্রীর দুঃখ।
বাসায় প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই। থাকার দুঃখ।
সংসার চালানোর মতো অর্থ কিম্বা রোজগার নেই। বাঁচার দুঃখ।
কবিতা লিখতে বসে দেখেন ভাব নেই। আবেগের দুঃখ।
শুধু একটি আনন্দ আছে তার জীবনে। যখন তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে সামনে পানের দোকান থেকে কয়েকটা পান কিনে নিয়ে মুখে পুরে চিবুতে থাকেন। আর পথ চলতে চলতে কবিতা লেখার দিনগুলোর কথা ভাবতে থাকেন। তখন আনন্দে ভরে ওঠে তার সারা দেহ।
কবি আনোয়ার হোসেন, ঘর আর অফিস, অফিস আর ঘর ছাড়া অন্য কোথাও যান না।
যেতে ভালো লাগে না, তাই।
কোনোদিন পথে কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে হয়তো একটা কি দুটো কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করেন। তারপর এড়িয়ে যান।
ভালো লাগে না।
কিছু ভালো লাগে না তাঁর।
অর্থ আর প্রাচুর্যের অফুরন্ত সমাবেশ।
অভাব বলতে কিছু নেই, মকবুল আহমদের জীবনে।
বাড়ি আছে।
গাড়ি আছে।
ব্যাংকে টাকা আছে।
ছেলেমেয়েদের নামে ইনসুরেন্স আছে কয়েকখানা।
ব্যবসা একটা নয়।
অনেক। অনেকগুলো।
পানের ব্যবসা।
তেলের ব্যবসা।
পাটের ব্যবসা।
পারমিটের ব্যবসা।
সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে।
কখনো মন্ত্রীর দফতরে।
কখনো আমলাদের সভা-সমিতিতে।
তাঁর জীবনেও দুঃখ অনেক।
দুটো পাটকল বসাবার বাসনা ছিলো। একটার কাজও এখনো শেষ হলো না। শ্রমের দুঃখ। বড় ছেলেটাকে বাচ্চা বয়সেই বিলেতে পাঠিয়ে ভালো শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু স্ত্রী তার সন্তানকে কাছছাড়া করতে রাজি না। জাগতিক দুঃখ।
তেলের কলের শ্রমিকগুলো শুধু বেতন বাড়াবার জন্য সারাক্ষণ চিল্কার করে, আর হরতালের হুমকি দেয়। দুঃখ। উৎপাদনের দুঃখ।
কিছু ছেলে ছোকরা আর গুণ্ডা জাতীয় লোক পথে-ঘাটে মাঠে-ময়দানে মিছিল বের করে।
সভা বসিয়ে সরকারের সমালোচনা করে। যাদের টাকা আছে তাদের সব টাকা গরিবদের। বিলিয়ে দিতে বলে। দুঃখ। দেশের দুঃখ।
এই অনেক দুঃখের মধ্যেও একটা আনন্দ আছে তাঁর। যখন সারাদিনের ব্যস্ততার শেষে রাতে ক্লাবের এককোণে চুপচাপ বসে বোতলের পর বোতল নিঃশেষ করেন তিনি। তখন অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে ওঠে তার চোখমুখ। স্ত্রী বিলকিস বানুর সঙ্গে তাঁর কদাচিৎ দেখা হয়। একই বাড়িতে থাকেন। এক বিছানায় শোন। কিন্তু কাজের চাপে, টেলিফোনের অহরহ যন্ত্রণায় স্ত্রীর সঙ্গে বসে দু-দণ্ড আলাপ করার সময় পান না তিনি। অথচ স্ত্রীকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন।
তার সুখশান্তির উপর লক্ষ রাখেন।
এবং যখন যা প্রয়োজন মেটাতে বিলম্ব করেন না।
স্বামীর সঙ্গ পান না, সেজন্যে বিলকিস বানুর মনে কোনো ক্ষোভ নেই।
কারণ, সঙ্গ দেয়ার লোকের অভাব নেই তার জীবনে।
সেলিমও স্বপ্ন দেখে।
একটা রিকশা কেনার স্বপ্ন।
বারো বছর ধরে মালিকের রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে।
সারাদিনের পরিশ্রম শেষে তিনটি টাকা রোজগার হলে দুটো টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হয়।
একটা টাকা থাকে ওর।
সেই টাকায় বউ আর বাচ্চাটাকে নিয়ে দিনের খাওয়া হয়।
মাসের বাড়ি ভাড়া!
বিড়ি কেনা।
আর সিনেমা দেখা।
পোষায় না তার।
দেশ কী সে জানে না।
সভা-সমিতি-মিছিলে লোকগুলো কেন এত মাতামাতি করে তার অর্থ সে বোঝে না।
পুলিশেরা যখন ছাত্রদের ধরে ধরে পেটায় তখন সে অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে।
কোনো মন্তব্য করে না।
তার ভাবনা একটাই।
একটা রিকশা কিনতে হবে।
আরো একটা ভাবনা আছে তার। মাঝে মাঝে ভাবে।
ছেলেটা আর একটু বড় হলে তাকেও রিকশা চালানো শেখাতে হবে।
খেয়াঘাট পেরিয়ে শহরে এলো গফুর।
বগলে একটা ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলি।
পুঁটলিতে বাধা একটা বাড়তি লুঙি, জামা আর কিছু পিঠে।
শহরে নেমেই সে অবাক হয়ে দেখলো মানুষগুলো সব কেমন যেন উত্তেজনায় উত্তপ্ত।
এখানে সেখানে জটলা বেঁধে কী যেন আলাপ করছে তারা।
খবরের কাগজের হকাররা অস্থিরভাবে ছুটাছুটি করছে।
কাগজ কেনার ধুম পড়েছে চারদিকে।
সবাই কিনে কিনে পড়ছে।
উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে এদেশের।
না! না!!
চিৎকার করে উঠলেন কবি আনোয়ার হোসেন।
আমি মানি না।
উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলেন তিনি।
মুষ্টিবদ্ধ তার হাত।
স্ত্রী অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে।
স্বামীকে এত জোরে চিৎকার করতে কোনোদিন দেখেনি সে।
কেন কী হয়েছে?
ওরা বলছে বাংলাকে ওরা বাদ দিয়ে দেবে। উর্দু, শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবে ওরা। জানো সালেহা, যে-ভাষায় আমরা কথা বলি, যে-ভাষায় আমি কবিতা লিখি, সে-ভাষাকে বাদ দিয়ে দিতে চায় ওরা।
সে কিগো! আমরা তাহলে কোন ভাষায় কথা বলবো?
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকায় সালেহা।
না। না। আমি অন্যের ভাষায় কথা বলবো না। আমি নিজের ভাষায় কথা বলবো।
কবি আনোয়ার হোসেন চিল্কার করে উঠলেন।
বজ্র থেকে ধ্বনি নিয়ে গর্জন করে উঠলো তসলিম।
এই সিদ্ধান্ত আমি মানি না।
আমরা মানি না।
মানি না!
মানি না!!
মানি না!!!
আমতলায় ছাত্রদের সভাতে অনেকগুলো কণ্ঠ একসুরে বলে উঠলো–আমরা মানি না।
বাচ্চারা কোনো কিছুই সহজে মানতে চায় না।
তাদের মানিয়ে নিতে হয়।
আমলাদের সভায় মেপে মেপে কথাগুলো বললেন মকবুল আহমেদ।
প্রথমে আদর করে দুধকলা খাইয়ে ওদের মানিয়ে নিতে হয়। তবু যদি না মানে চাবুকটাকে তুলে নিতে হবে হাতে। মানবে না কী? মানতে বাধ্য হবে তখন।
কতগুলো মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলে শ্লোগান দিচ্ছে—
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
বাংলা চাই।
আজ পান খাওয়া ভুলে গেলেন কবি আনোয়ার হোসেন। সেদিকে তাকিয়ে চোখজোড়া আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠলো তার।
ভুলে গেলেন-—কখন পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
তিনি দেখছেন মিছিলের মুখগুলো।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
পেছন থেকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো তাকে।
কী সাব! রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কী দেখেন? বেল বাজাই শোনেন না?
রিকশাচালক সেলিম।
তার রিকশাটা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে। ছেলেগুলো চিৎকার করছে। করুক। ওতে তার। কোনো উৎসাহ নেই।
পারবে না। তুমি দেখে নিও। ওরা জোর করে উর্দুকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারবে না।
গদগদ কণ্ঠে স্ত্রীকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন কবি আনোয়ার হোসেন। ছেলেরা খেপেছে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে ওরা ছাড়বে না।
স্ত্রী পান খাচ্ছিলো।
একটুকরো চুন মুখে তুলে বললো–হ্যাঁ গো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে তোমার বেতন কি বেড়ে যাবে? কটাকা বাড়বে বলোতো?
২. কী যে হবে দেশের
কী যে হবে দেশের কিছু জানি না। বিদেশের চর এসে ভরে গেছে পুরো দেশটা।
স্ত্রীর সঙ্গে বহুদিন পরে আজ কথা বলতে বসলেন মকবুল আহমদ।
বাংলা বাংলা করে চিৎকার করছে ওরা। বাংলা কি মুসলমানের ভাষা নাকি? ওটাতো হিন্দুদের ভাষা। হিন্দুরা এ দেশটাকে জাহান্নামে নেবে।
কথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন বিলকিস বানু।
কোথায় উর্দু আর কোথায় বাংলা! উর্দু হচ্ছে খানদানি ভাষা। আমাদের ফ্যামেলিতে বাবা মা সবাই উর্দুতে কথা বলেন।
উর্দু-বাংলা আমি কিছু বুঝি না। আমার সোজা কথা তোমার ছেলেকে সাবধান করে দাও। ও যদি আবার সভা-সমিতি আর আন্দোলন করে তাহলে এদ্দিন প্রমোশন বন্ধ হয়ে ছিলো, এবার আমার চাকরিটাই যাবে। তসলিমের পুলিশ-বাবা উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
মা-ও শিউরে উঠলেন।
অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে গিয়ে চোখে পানি এসে গেলো তার।
তুই কেমন নিষ্ঠুর ছেলেরে!
তসলিমকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন তিনি।
তোর বাবা-মা ভাই-বোনগুলোর কথা ভেবেও কি তুই ওসব ক্ষান্ত দিতে পারিস না?
চাকরিটা চলে গেলে আমরা খাবো কী?
তসলিম নিচুপ।
সালমা বললো—
খালুজান কদিন ধরে আপনার চিন্তায় খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। এসব কাজ না করলেই–তে পারেন। কী হবে এসব করে?
সালমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো তসলিম। এর মধ্যে সালমাকে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো তার। কিন্তু কিছুই বললো না। শুধু বললো–তুমি ওসব বুঝবে না।
সদরঘাটে যেখানে অনেকগুলো খেয়ানৌকা ভিড় করে থাকে তার কাছাকাছি একটা ইট টেনে নিয়ে বসে পড়লো গফুর।
খিদে পেয়েছে। খাবে।
পুঁটলিটা ধীরেধীরে খুললো সে।
শহরের লোকজনদের সে বলতে শুনেছে-কাল নাকি হরতাল।
শহরের সমস্ত দোকান-পাট বন্ধ থাকবে।
গাড়িঘোড়া চলবে না।
হরতাল কী গফুর বোঝে না।
পিঠা খেতে-খেতে সে নানাভাবে হরতালের একটা অবয়ব চিন্তা করতে লাগলো। কিন্তু হরতালের কোনো সঠিক চেহারা নির্ণয় করা তার পক্ষে সম্ভব হলো না।
সে ভাবলো, এটা হয়তো শহরেরই বিশেষ একটা রীতি কিম্বা নীতি। মাঝে মাঝে শহরের। মানুষেরা এ-রকম হরতাল পালন করে থাকে।
উঠে গিয়ে দু-হাতে বুড়িগঙ্গার পানি তুলে নিয়ে পান করলো গফুর। গামছায় মুখ হাত মুছলো। তারপর ট্র্যাক থেকে রুমালটা বের করে টাকাগুলো গুণে গুণে বারকয়েক দেখলো সে।
কাল দোকান-পাট বন্ধ থাকবে।
কেনাকাটা আজকেই শেষ করতে হবে।
মুহূর্তে আমেনীর মুখ মনে পড়লো তার।
কী করছে আমেনা এখন।
হয়তো পুকুরঘাটে পানি নিতে এসেছে।
কি ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে।
অথবা কচুবনে ঘুরে কচুশাক তুলছে।
সাতদিন পর বিয়ে।
ভাবতে বড় ভালো লাগলো গফুরের।
সহসা বিকট একটা আওয়াজ শুনে চমকে তাকালো গফুর।
দেখলো কয়েকটি ছেলে মুখে চোঙা লাগিয়ে চিৎকার করে বলছে—
কাল হরতাল।
আমাদের মুখের ভাষাকে ওরা জোর করে কেড়ে নিতে চায়।
আমাদের প্রাণের ভাষাকে ওরা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আমরা মাথা নোয়াবো না।
আমরা আমাদের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেবো না।
আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
আর সে দাবিতে কাল হরতাল।
সবাই হরতাল পালন করুন।
গফুর অবাক হয়ে শুনলো।
সে ভালো কাউকে জিজ্ঞেস করবে ব্যাপারটা কী! কিন্তু সাহস পেলো না।
অদূরে একটা লোক তাসের খেলা দেখাচ্ছিলো।
নানারকম খেলা।
আজগুবি খেলা।
গফুর ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে খেলা দেখতে লাগলো।
কিসের হরতাল?
আমি হরতাল মানি না।
রিকশার ব্রেকটা খারাপ হয়ে গেছে। সেটা ঠিক করতেকরতে আপনমনে গজগজ করে উঠলো সেলিম।
রিকশা না চালালে আমি রোজগার করবো কোত্থেকে?
আমি খাব কী?
আমার বউ খাবে কী?
আমার ছেলে খাবে কী?
ওসব হরতালের মধ্যে আমি নেই।
ব্রেকটা ঠিক করে সবে রিকশাটা নিয়ে সামনে এগুতে যাবে সে—এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডাকলো—
ভাড়া যাবে?
সেলিম দেখলো একটা ছেলে।
বোধহয় ছাত্র।
হাতে বই।
বগলে একগাদা কাগজ।
কোথায় যাবেন স্যার?
ইউনিভার্সিটি।
ওঠেন।
তসলিম রিকশায় উঠে বসতেই সেলিম প্রশ্ন করলো—
আপনারা কালকে হরতাল করছেন কেন? রিকশা না চালালে আমরা রুজি-রোজগার করবো কেমন করে? হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকবো নাকি?
মুহূর্তে-কয়েক সময় নিলো তসলিম। তারপর ধীরেধীরে বললো—
আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। আর ওরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চায়। উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে বাংলাভাষা এদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। তোমাকে আমাকে আমাদের সবাইকে উর্দুতে কথা বলতে হবে।
উর্দু আমি কিছুকিছু জানি।
সেলিম বিজ্ঞের মতো বললো—
কিন্তু আমার বউ উর্দু একেবারে বোঝে না। ও মুন্সিগঞ্জের মেয়ে কিনা তাই। তবে ছেলেকে আমি উর্দু-বাংলা দুটোই শেখাচ্ছি।
তসলিম বললো—
উর্দুর সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আমরা উর্দু-বাংলা দুটোকেই সমানভাবে চাই।
কিন্তু হরতাল করছেন কেন?
হরতালের মাধ্যমে আমরা বিক্ষোভ জানাতে চাই। আমাদের প্রতিবাদ জানাতে চাই।
অ।
কিছু না বুঝলেও বারকয়েক ঘাড় দোলালো সেলিম।
সরকারের চাকুরি করি বলে কি আমরা আমাদের মতামতটাও বন্ধক দিয়ে দিয়েছি নাকি?
আমরা কি ওদের ক্রীতদাস যে, কথামতো আমাদের চলতে হবে?
চেয়ারে বসে ছটফট করতে লাগলেন কবি আনোয়ার হোসেন।
বড়কর্তার হুকুম এসেছে। কাল সবাইকে সময়মতো অফিসে হাজির হতে হবে। হরতাল করা চলবে না। যে হাজির হবে না তাকে সাসপেন্ড করা হবে। কেন? আমাদের ও ভাষাটাকে তোমরা জোর করে কেড়ে নিয়ে যাবে? আর আমরা চুপ করে বসে থাকবো? কুকুর-বেড়ালেরও নিজস্ব একটা ভাষা আছে। দেখি ওদের মুখ বন্ধ করে দাও তো! ২ তোমাদের ছেড়ে দেবে? কামড়ে-আঁচড়ে গায়ের রক্ত বের করে দেবে না? ওসব হুকুম। আমি মানিনা। যদি চাকরি যায় যাবে। মুটেগিরি করবো। দরকার হলে রাস্তায় খবরের কাগজ বিক্রি করবো। কিন্তু আমাকে তোমরা ক্রীতদাস বানিয়ে দেবে সেটা চলবে না। রাগে গজগজ করতে লাগলেন কবি আনোয়ার হোসেন।
ব্যস কাল হরতাল। আমি অফিসে যাবো মা যা হয় হোক।
হিসেবের খাতাটা বন্ধ করে টেবিলের এককোণে রেখে দিলেন তিনি।
ওসব হরতালের হুমকিতে মাথা নোয়ালে দেশ চলবে না। হরতাল বন্ধ করতে হবে।
সভা-সমিতি ভেঙে দিতে হবে। রাস্তায় মিছিল করা বেআইনি ঘোষণা করতে হবে।
তবে ঠাণ্ডা হবে ওরা।
আমলাদের সামনে লম্বা ভাষণ দিলেন মকবুল আহমদ।
মন্ত্রীরা ছুটোছুটি করছে।
একমুহূর্তের বিশ্রাম নেই।
নেতারা তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠেছেন।
আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলছেন।
যে করেই হোক হরতাল বন্ধ করতে হবে।
রাস্তায় মিছিল বের করা বে-আইনি করতে হবে।
পাড়ার মাতব্বরদের ডাকা হয়েছে।
তাদের সঙ্গে পরামর্শ চলছে।
যত লোক লাগে আমরা দেবো।
যত টাকা লাগে আমরা যোগাবো।
পুলিশের প্রয়োজন হলে পুলিশ দেবো
সব কিছুই পাবেন আপনারা।
হরতলি বন্ধ করতে হবে।
মিছিল বন্ধ করতে হবে।
মাতব্বররা ঘাড় নোয়ালেন।
নামাজের সেজদা দেবার মতো।
কতগুলো উদ্ধত মুখ।
ঋজু।
কঠিন।
একসঙ্গে চিঙ্কার করে উঠলো।
না।
আমরা মানি না।
সরকার একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে আমাদের মুখ বন্ধ করে দেবে। প্রতিবাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে আমাদের। সে অন্যায় আমরা মাথা পেতে নেবো না।
আইন দিয়ে ওরা আমাদের শৃঙ্খলিত করতে চায়। সে শৃংখলি আমরা ভেঙে চুরমার করে দেবো।
আমরা গরু ছাগল ভেড়া নই যে, প্রয়োজনবোধে খোয়াড়ের মধ্যে বন্ধ করে রাখবে।
তর্ক-বিতর্ক চললো অনেক অনেকক্ষণ ধরে।
আলোচনার ঝড় উঠলো।
কেউ বললো–
এ আইন অমান্য করা ঠিক হবে না।
কেউ বললো—
এ আইন শোষণের আইন। এ আইন আমরা মানি না।
বুড়োরাত বাড়তে লাগলো ধীরেধীরে।
কাল কী হবে কেউ জানে না।
রাস্তায় পুলিশ নেমেছে। পুলিশের গাড়ি ইতস্তত ছুটোছুটি করেছে।
পথ-ঘাটগুলো জনশূন্য।
একটা খালি রক পেয়ে তার উপরে গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়লো গফুর।
দুটো শাড়ি কিনেছে সে।
একশিশি আলতা।
কিছু চুড়ি।
একটা নাকফুল।
সেগুলো বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নানা কথা ভাবতে লাগলো সে।
আমেনার কথা।
বিয়ের পর কেমন করে সংসার করবে সে কথা।
আর কোনোদিন যদি ছেলেপুলে হয় তার কথা।
ইচ্ছে করলে সে আজ গ্রামে ফিরে যেতে পারতো। কিন্তু যায়নি। কারণ, সে হরতাল দেখবে।
হয়তো কোনোদিন আর শহরে আসা নাও হতে পারে। তাই হরতাল সে দেখে যাবে।
দু-একটা কেনাকাটাও বাকি রয়ে গেছে।
একটা লাল লুঙি কিনবে ভেবেছিলো সে।
কয়েক দোকানে ঘোরাঘুরিও করেছিলো।
কিন্তু ওরা বড় চড়া দাম চায়।
তাই গফুর ভাবলো, যদি কম দামে পাওয়া যায়। আর যদি দু-একটা দোকান-পাট খোলা থাকে তাহলে সে কিনবে সেটা।
লাল লুঙি আমেনা ভীষণ পছন্দ করে।
শুয়ে শুয়ে গফুর দেখলো দুটো পুলিশের গাড়ি ছুটে চলে গেলো রাস্তা দিয়ে।
গফুর চোখ বন্ধ করলো।
কবি আনোয়ার হোসেন উত্তেজিতভাবে ঘরের ভেতরে পায়চারি করলেন অনেকক্ষণ ধরে।
সালেহা ডাকলো—
কই, শোবে না?
না।
শান্ত গলায় জবাব দিলেন কবি—
জানো সালেহা, আজ বহুদিন পর আমার কী মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে, আমার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেলো। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। কবিতা লিখতাম। কবিতা ছিল আমার স্বপ্ন। আমার সাধনা। ভেবেছিলাম সারাটা জীবন আমি কবিতা লিখেই কাটিয়ে দেবো। কিন্তু আমি—সেই আমি–দেখ আজ লেজার লিখতে লিখতে ক্লান্ত।
সালেহা সহানুভূতির সঙ্গে তাকালো তার দিকে।
লেখো না কেন? মাঝে মাঝে লিখলেই তো পারো। তুমি তো কবিতা লিখেই আমাকে পাগল করেছিলে, মনে নেই!
কথা শুনে সহসা শব্দ করে হেসে উঠলেন কবি আনোয়ার হোসেন।
মনে আছে সালেহা। মনে থাকবে না কেন? শুধু কী জানো! আমার সেই মনটা নেই, যে মন নিয়ে একদিন আমি কবিতা লিখতাম। আমার সেই মনটা না, লেজারের চাপে দুমড়ে গেছে। মরে গেছে।
এসো এখন শুয়ে পড়ো।
সালেহা ডাকলো।
না।
আবার বললেন আনোয়ার হোসেন।
তার সারা মুখে কী এক অস্থিরতা।
স্ত্রীর কাছে এসে বসলেন তিনি—
সালেহা, আমি ঠিক করেছি, আমি আর ও চাকরি করবো না। এসব সরকারি চাকরি মানুষকে ক্রীতদাস করে ফেলে। আমি ছেড়ে দেবো। যেখানে আমার সামান্য স্বাধীনতা নেই, সেখানে কেন আমি কলুর বলদের মতো ঘানি টেনে যাবো? আমি আবার কবিতা লিখবো সালেহা। যে কবিতা পড়ে তোমার একদিন আমাকে ভালো লেগেছিলো—তেমনি কবিতা লিখবো আমি।
সালেহার পুরো চেহারায় কে যেন আলকাতরা লেপে দিলো।
না, না! চাকরি ছাড়া ঠিক হবে না। তাহলে সংসার চলবে কী করে? কবিতা লিখে তো আর টাকা পাবে না তুমি!
টাকা! টাকাটাই কি জীবনের সব কিছু সালেহা? মানুষের মন বলে কি কিছুই নেই?
শোনো। ওসব চিন্তা এখন রাখো।
সালেহা স্বামীর হাত ধরলো।
এসো এখন শুয়ে পড়া যাক। কাল আবার ভোরে-ভোরে উঠতে হবে না!
আমি কিন্তু কাল অফিসে যাবো না।
কেন?
আমি হরতাল করবা। ওরা নিষেধ করেছে। বলেছে চাকরি যাবে, যাক। সেটা পরোয়া করি না। আমার ভাষার চেয়ে কি চাকরি বড়?
৩. কাল কী হবে কে জানে
কাল কী হবে কে জানে। হয়তো মারাত্মক কিছুও ঘটতে পারে।
বসে বসে ভাবলো তসলিম।
জীবনে এই প্রথম অনুভূতির জন্ম নিলো তার মনে।
একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙতেই হবে। নইলে আন্দোলন এখানেই শেষ হয়ে যাবে।
বাংলা ভাষাকে চিরতরে নির্মূল করে দেবে ওরা।
আর একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙতে গেলে হয়তো পুলিশ গুলিও চালাতে পারে।
হয়তো তসলিম মারা যাবে।
নিজের মৃত্যুর কথা ভাবতে গিয়ে সহসা শিউরে উঠলো সে।
মনে হলো যেন নিজের মৃত্যুকে সে এ-মুহূর্তে প্রত্যক্ষ করছে।
ভাত খাবেন না!
সালমার কণ্ঠস্বরে চমকে তাকালো তসলিম।
সালমা বলল–
তরকারি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, চলুন।
বলে চলে যাচ্ছিলো সালমা।
সহসা পেছন থেকে তাকে ডাকলো তসলিম—
সালমা, শোনো! তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
সালমা ফিরে তাকালো।
নীরব দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলো—
কি, বলুন?
সে-চৌখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না তসলিম।
চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরেধীরে বললো—
কথাটা আমার তুমি কিভাবে নেবে জানি না, হয়তো তুমি রাগ করবে–।
বলতে গিয়ে থেমে গেলো সে।
সালমা নীরব।
কয়েকটি নীরব মুহূর্ত।
সহসা তসলিম আবার বললো—
বহুবার ভেবেছি বলবো তোমাকে। বলা হয়নি। হয়তো কোনোদিন বলতাম না। কিন্তু আজ কেন জানিনা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করছে আমার!
আবার নীরব হলো তসলিম।
সালমা মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে আছে।
মনে হলো ও মুখখানা কৃষ্ণচূড়ার রঙে ভরে গেছে।
সালমা বললো—
চলুন, এখন খেয়ে নিন।
না না সালমা, যদি কাল কোনো অঘটন ঘটে? ধরো যদি আমি মারা যাই। তাহলে?
মেয়েটি শিউরে উঠলো।
চোখজোড়া মুহূর্তে ছলছল করে উঠলো তার।
ছিঃ। এসব কী বলছেন আপনি! মরবেন কেন? আপনি অনেক অনেক দিন বাঁচবেন।
আসুন, এখন খেয়ে নিন। চলুন।
কথাটা শুনবে না?
না এখন না। পরে শুনবো।
উত্তরের অপেক্ষা না করেই সামনে থেকে সরে গেল সালমা।
তুমি কি কাল বাইরে বেরুবে, না ঘরে থাকবে?
বিছানায় শোবার আগে মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে স্বামীকে প্রশ্ন করলেন বিলকিস বানু।
হ্যাঁ, বেরুবো বৈ কী। বেরুবো না কেন?
না, বলছিলাম কী–যদি হরতাল হয় তাহলে?
হরতাল মোটেও হবে না। তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো।
বিজ্ঞের মতো জবাব দিলেন মকবুল আহমদ।
হরতালের সব রাস্তা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।
যে হরতাল করবে তার লাইসেন্স আমরা কেড়ে নেবো। কেউ যদি অফিসে না আসে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করবো। আমরা জানিয়ে দিয়েছি। পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছি সবাইকে। তারপরও কি কেউ হরতাল করবে বলে মনে হয় তোমার?
স্লিপিং সুটটা পরে নিয়ে বিছানায় এসে শুলেন মকবুল আহমদ। কিন্তু ছাত্ররা হয়তো একটু-আধটু গোলমাল করতে পারে।
তাও আমরা ভেবে রেখেছি। ক্রিম ঘষা শেষ হলে বিলকিস বানু বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসলেন।
আমার কি মনে হচ্ছে জানো? কাল কোনো একটা কিছু হয়তো হতেও পারে। তুমি যেদিকে খুশি যেয়ে, কিন্তু ওই ছাত্রদের পাড়ায় গাড়ি নিয়ে যেয়ো না। তুমি মিছেমিছি ভাবছে। শুয়ে পড়ো এখন। চোখ বন্ধ করে ঘুমোবার চেষ্টা করলেন মকবুল আহমদ।
ভোর হবার আগেই ঘুম ভেঙে গেলো গফুরের।
চেয়ে দেখলো পৃথ-ঘাটগুলো তখনো জনশূন্য।
দুটো কুকুর রাস্তার মাঝখানে বসে ঝগড়া করছে।
গফুর উঠে বসলো।
পুঁটলিতে রাখা জিনিসপত্রগুলো পরখ করে দেখলো একবার।
পুবের আকাশে সবে ধলপহর দিয়েছে।
দু-পাশের উঁচুউঁচু দালানগুলোকে আকাশের পটভূমিতে ছায়ার মতো মনে হচ্ছে।
দুএকটা কাক গলা ছেড়ে চিৎকার করছে।
মাঝে মাঝে রাস্তায় নেমে এসে খাবার খুঁজছে।
আবার উড়ে গিয়ে বসছে টেলিগ্রামের তারের উপর।
দুটো মেয়ে রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে ঝাড়ু দিচ্ছে।
আবর্জনা পরিষ্কার করছে।
রাস্তার পাশে একটা কল থেকে হাতমুখ ধুলো গফুর।
ততক্ষণে লোকজন পথে চলতে শুরু করেছে।
দু-একটা রিকশার টুংটাং আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
একটা-দুটো করে দোকান-পাট খুলছে।
টাউন সার্ভিসের বাসগুলো মানুষ ভর্তি করে ছুটছে উর্ধ্বশ্বাসে।
হরতাল।
কোথায় হরতাল?
গফুর অবাক হয়ে তাকালো চারপাশে।
সেলিম তার রিকশাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়।
যাবার সময় বৌকে বলে গেলো—
কালুকে আজ রাস্তায় বেরুতে দিস না। গোলমাল হতে পারে।
কালু ওর ছেলের নাম।
মকবুল আহমদও বেরুলেন বাইরে।
স্ত্রী বিলকিস বানুকে সঙ্গে নিয়ে।
ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন রেসকোর্স ঘুরে সেক্রেটারিয়েটের দিকে যাবার জন্য।
পুরোনো শহরেও একবার যাবেন তিনি।
কারখানায় যাবেন।
অফিসপাড়াগুলো ঘুরবেন।
হরতাল ব্যর্থ হয়েছে কি হয়নি তাই তদারক করবেন তিনি।
বিলকিস বানু সহসা শব্দ করে হেসে উঠলেন।
ওই যে দ্যাখো দ্যাখো। একটা বাস আসছে। দুটো রিকশা। একটা ঘোড়ার গাড়ি। ওটা একটা প্রাইভেট কার, না!
দুজনের মুখে হাসি।
চারপাশে সন্ধানী-দৃষ্টি নিয়ে কী যেন খুঁজছেন তারা।
রাস্তায় গাড়ি দেখলে কিম্বা দোকান খুলছে নজরে এলে উল্লাসে ভরে উঠছে তাদের চোখ-মুখ।
তোমাকে বলিনি আমি।
সগর্বে স্ত্রীর দিকে তাকালেন মকবুল আহমদ।
কেউ হরতাল করবে না। দেশের দুশমনদের সাথে কেউ যোগ দেবে না। স্বামীর একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন বিলকিস বানু।
তুমি কি সত্যিসত্যি আজ অফিসে যাবে না?
বাইরে বেরুবার মুহূর্তে প্রশ্ন করলো সালেহা।
একটা কথার আর কবার উত্তর দেবো বলো তো?
কবি আনোয়ার হোসেন রেগে গেলেন—
বলছি তো যাবো না।
তাহলে এখন বেরুচ্ছো কোথায়?
পথ রোধ করে দাঁড়ালো সালেহা।
বাইরে হরতাল কেমন হলো দেখতে যাবো।
তারপর?
তারপর ইউনিভার্সিটিতে যাবো। ছাত্ররা কী করছে।
না। আমি তোমাকে বেরুতে দেবো না।
সালেহা দৃঢ়কণ্ঠে বললো—
শেষে কোথায় গিয়ে কী করবে—পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। তখন আমার কী অবস্থা হবে শুনি?
দ্যাখো, বাজে বকো না। পথ ছাড়ো। পুলিশে ধরবে। আমি তার তোয়াক্কা করি না। আর আমার যদি কিছু হয় তাহলে তুমি বাপের বাড়ি চলে যেয়ো।
উত্তরের আর অপেক্ষা করলেন না আনোয়ার হোসেন।
বাইরে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
ভোররাতে পুলিশের পোশাক পরে কোমরে পিস্তল এঁটে বাইরে বেরিয়ে গেছেন বাবা।
আজ তার বড় ব্যস্ততার দিন।
তসলিমও ব্যস্ত।
তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার পথে সালমার সঙ্গে দেখা হলো তসলিমের।
আজ বাইরে না গেলেই কি নয়?
এই একটি কথা বলার জন্য হয়তো সিঁড়ির গোড়ায় অপেক্ষা করছিলো মেয়েটি।
তসলিম থমকে দাঁড়ালো।
তুমি তো সবই জানো সালমা। জানো, আমি যাবো। তবু কেন বাধা দিচ্ছে।
দৃষ্টি নত করলো সালমা।
খালু বলছিলেন আজ গোলমাল হতে পারে।
বলতে গিয়ে গলার স্বরটা কেপে গেলো তার।
তসলিম সেটা লক্ষ করলো।
এ-মুহূর্তে অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করছিলো তার।
কিছুই বলতে পারলো না। শুধু বললো–
চলি সালমা। আবার দেখা হবে।
বলে সালমার দিকে আর তাকালো না সে। নীরবে বেরিয়ে গেলো।
এরা মানুষ!
মানুষ না সব জানোয়ার।
রাস্তার মধ্যে একরাশ থুথু ছিটালো কবি আনোয়ার হোসেন।
সব শালা বেঈমান। টাকা খেয়ে হরতাল ভেঙে দিয়েছে। বুঝবে। যেদিন ওদের ঘাড়ে ঊর্টুর জোয়াল চাপিয়ে দেয়া হবে, সেদিন বুঝবে শালারা।
রাগে থরথর করে কাঁপছিলো কবি আনোয়ার হোসেন।
যাবেন নাকি সাব।
তাকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা রিকশাওয়ালা শুধালো।
না।
সহসা বিকটভাবে চিৎকার করে উঠলেন কবি আনোয়ার হোসেন।
তার ইচ্ছে হলো এক ঘুসিতে রিকশাওয়ালার নাক, মুখ ভেঙে দিতে!
সব শালা বেঈমান। মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ।
রাস্তায় থুথু ছিটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন তিনি।
তখন দুপুর।
আকাশে একটুকরো মেঘ নেই।
সূর্যটা জ্বলছে।
ছাত্ররা সবাই স্কুল-কলেজ বর্জন করে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে একে-একে এসে জমাতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়।
মধুর রেস্তোরাঁ।
ইউনিয়ন অফিস।
পুকুরপাড়।
গমগম করছে অসংখ্য কণ্ঠস্বরে।
বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনের রাস্তায় ইউক্যালিপ্টাস গাছগুলো নিচে অনেকগুলো পুলিশের গাড়ি সার বেঁধে এসে দাড়িয়েছে।
পুলিশের কর্তারা পায়চারি করেছেন রাস্তায়।
আর কন্সটেবলগুলো হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।
রাইফেলের নলগুলো দুপুরের রোদে চিকচিক করছে।
ইউক্যালিপ্টাসের ডাল থেকে অসংখ্য পাতা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে নিচে।
সহসা অসংখ্য কণ্ঠের চিৎকারে চমকে সেদিকে তাকালেন পুলিশের বড়কর্তারা।
আমতলায় ছাত্রদের সভা শুরু হয়েছে।
আমরা কোনো কথা শুনতে চাই না।
কোনো বক্তৃতার এখন প্রয়োজন নেই।
আমরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবো।
ভাঙবো।
ভাঙবো।
অনেকগুলো কণ্ঠ বজ্রের মতো ধ্বনি তুললো।
নেতারা বলছেন—
না, একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙা যাবে না। আইন অমান্য করা ঠিক হবে না। আমরা স্বাক্ষর সগ্রহ অভিযান চালাবো। স্বাক্ষর সংগ্রহ করেই আমরা আমাদের প্রতিবাদ জানাবো।
না!
না!!
না!!!
আমরা তোমাদের কথা মানবে না।
বিশ্বাসঘাতক!
এরা সব বিশ্বাসঘাতক!!
তোমাদের কথা আমরা শুনতে চাই না।
আমরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবো।
আইনের বেড়ি আমরা ভাঙবো।
ভাঙবো!
ভাঙবো!!
ভাঙবো!!!
অসংখ্য কণ্ঠের চিৎকারে চমকে উঠলেন পুলিশের বড়কর্তারা।
পিস্তলে হাত রাখলেন।
ছোটকর্তারা ছুটে এসে দাঁড়ালেন কন্সটেবলগুলোর পাশে।
সেপাইদের চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই।
হুকুমের ক্রীতদাস ওরা।
কর্তাদের মুখের দিকে নির্লিপ্ত-দৃষ্টিতে চেয়ে।
সূর্য জ্বলছে।
রাইফেলের নলগুলো চিকচিক করছে রোদে।
ইউক্যালিপ্টাসের ডাল থেকে পাতা ঝরছে।
কোনো নেতার কথা আমরা শুনবো না।
টেবিলে উঠে দাঁড়িয়ে সহসা চিৎকার করে উঠলো তসলিম।
আমরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবো, কিন্তু বিশৃঙ্খলভাবে নয়। দশজন দশজন করে আমরা বেরিয়ে যাবো রাস্তায়। মিছিল করে এগিয়ে যাবো এসেম্বলির দিকে। এই আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত। এই আমাদের আজকের শপথ।
৪. রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
অসংখ্য কণ্ঠের গগনবিদারি চিৎকারে দ্রুত গাড়ি থেকে নিচে নেমে এলেন পুলিশের বড় কর্তারা।
তাদের চোখের ভাষা পড়ে নিতে ছোটকর্তাদের একমুহূর্ত বিলম্ব হলো না।
মুহূর্তে তারা ফিরে তাকালেন কন্সটেবলগুলোর দিকে।
হুকুমের দাস সেপাইগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট লক্ষ করে এগিয়ে এলো রাস্তার মাঝখানে।
প্রথম দশজন ছাত্রের দল তখন তৈরি হচ্ছে একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙার জন্যে।
একটি ছেলে তাদের নাম-ঠিকানা কাগজে লিখে নিচ্ছে।
প্রচণ্ড শব্দে লোহার গেটটা খুলে গেলো।
পুলিশের দল আরো দু-পা এগিয়ে এলো সামনে।
শপথের কঠিন দীপ্তিতে উজ্জ্বল দশজন ছাত্র।
দশটি মুখ।
মুষ্ঠিবদ্ধ হাতগুলো আকাশের দিকে তুলে পুলিশের মুখোমুখি রাস্তায় বেরিয়ে এলো।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
সেপাইরা ছুটে এসে চক্রাকারে ঘিরে দাঁড়ালো ওদের।
সবার বুকের সামনে একটা করে রাইফেলের নল চিকচিক করছে।
আমলা।
মধুর রেস্তোরাঁ।
ইউনিয়ন অফিস।
পুকুরপাড়।
চারপাশ থেকে ধ্বনি উঠলো—
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
ততক্ষণে ছাত্রদের দ্বিতীয় দলটা বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়।
তৃতীয় দল এলো।
চতুর্থ দল এলো।
ধরে ধরে সবাইকে দুটো খালি ট্রাকের মধ্যে তুলে নিলো সেপাইরা। পু
লিশের বড়কর্তাদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা।
কত ধরবো?
কত নেবো জেলখানায়?
ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো বাইরে বেরিয়ে আসছে ছাত্ররা।
সহসা চোখ-মুখ জ্বালা করে উঠলো ওদের।
সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।
দরদর করে পানি ঝরছে দুচোখ দিয়ে।
কে যেন চিৎকার দিয়ে উঠলো—
কাঁদুনে গ্যাস ছেড়েছে ওরা।
চোখে পানি দাও।
অনেকগুলো ছাত্র হুমড়ি খেয়ে পড়লো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরটার ভেতরে।
চোখ জ্বলছে।
পানি ঝরছে।
কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে গেছে পুরো এলাকাটা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল টপকে ঝাকোকে ছাত্ররা এগিয়ে গেলো মেডিক্যাল ব্যারাকের দিকে।
কবি আনোয়ার হোসেনের জামাটা একটা লোহার শিকের মধ্যে আটকে ছিঁড়ে গেল।
পেছন ফিরে তাকালেন না তিনি।
চোখমুখ জ্বলছে তার।
জ্বলুক।
ছাত্ররা একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভেঙে দিয়েছে।
আন্দোলন সবে শুরু হলো। কাঁদুনে গ্যাসের ধোঁয়া দিয়ে তাকে আটকানো যাবে না।
ভাইসব!
সহসা চিল্কার করে উঠলো তসলিম।
আপনারা বিশৃঙ্খলভাবে ছুটোছুটি করবেন না। আপনারা এদিকে আসুন। আমরা মেডিক্যাল ব্যারাকে আবার জমায়েত হবো।
পুলিশের গাড়িগুলো ততক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে সরে গিয়ে মেডিক্যাল ব্যারাকের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
বড়কর্তাদের কাছে হুকুম এসেছে, যেমন করে হোক এ আন্দোলনকে এখানে শেষ করতে হবে।
একটু পরে এসেম্বলি বসবে।
এমএলএরা সবাই আসবেন।
তাদের আসার আগে পথ পরিষ্কার করে দিতে হবে।
ছাত্রদের সরিয়ে দিতে হবে পুরো এলাকা থেকে।
বড়কর্তারা আরো সেপাহি চাইলেন।
আরো গাড়ি চাইলেন।
আরো গাড়ি এলো।
আরো সেপাহি এলো।
আরো অস্ত্র এলো।
সঙ্গে সঙ্গে আরো ছাত্র এলো।
আরো কঠিন শপথে হলো দীপ্ত ওদের মুখ।
মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তাটা প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রের অবয়ব নিয়েছে।
বিলকিস বানুর গাড়িটা ঘিরে দাঁড়ালো একদল ছাত্র।
এদিকে কী হচ্ছে—ঘুরে দেখবার বাসনা নিয়ে দেখতে এসেছিলেন বিলকিস বানু।
কিন্তু ছাত্রদের হাতে এভাবে ধরা পড়ে যাবেন ভাবতেও পারেননি।
তার গাড়ির চাকা থেকে বাতাস ছেড়ে দেয়া হলো।
কাচগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো ছাত্ররা।
আপনার সাহস তো কম নয়। লিপস্টিক মেখে গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন! জানেন না আজ হরতাল?
আমি কিছু জানি না। কিছু জানতাম না। বিশ্বাস করুন।
ভয়ে আর আতঙ্কে গলাটা শুকিয়ে গেলো বিলকিস বানুর।
ঝড়ে ভেজা কাকের মতো থরথর করে কাপছেন তিনি।
মেয়েমানুষ, আপনাকে মাপ করে দিলাম। গাড়ি এখানে থাকবে। পায়ে হেঁটে যেখানে যাবার চলে যান।
মুহূর্তে গাড়ির কথা ভুলে গেলেন বিলকিস বানু।
গাড়ির চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
বেঁচে থাকলে অকে অনেক গাড়ি হবে তার।
একটা পুলিশও ছিলো না ওখানে?
রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেলো মকবুল আহমদের।
দুচোখে পানি ঝরছে বিলকিস বানুর।
আমার চুল টেনে দিয়েছে ছাত্ররা।
আমার মুখে থুথু দিয়েছে ছাত্ররা।
আমার গাড়িটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে রিসিভার তুলে নিলেন মকবুল আহমদ।
পুলিশের বড়কর্তাকে ফোনে পেয়ে রীতিমতো গালাগাল দিলেন তিনি।
গুণ্ডা বদমায়েশরা রাস্তাঘাটে মেয়েছেলেদের ধরে-ধরে অপমান করছে। দেখতে পাচ্ছেন না? কী করছেন আপনারা?
কাঁদুনে গ্যাস আর লাঠিতে যদি কাজ না হয়, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে? গুলি করে ওদের খুলি উড়িয়ে দিতে পারছেন না?
মেডিক্যাল ব্যারাকের উপর তখন অজস্র কাঁদুনে-গ্যাসের বর্ষণ চলছ।
স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দ্বিগুণ গতি নিয়েছে।
এসেম্বলির দিকে একটা মাইক্রোফোন লাগিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে তসলিম।
তার দিকে চেয়ে-চেয়ে বিড়বিড় করে বললেন কবি আনোয়ার হোসেন—
আন্দোলন সবে শুরু হয়েছে। কার শক্তি আছে একে স্তব্ধ করে দেয়?
মেডিক্যালের রাস্তায় অংসখ্য ইটের টুকরো ছড়ানো।
পুলিশ আর ছাত্রদের মধ্যে এখন ইটের যুদ্ধ চলছে।
পুঁটলিটা বগলে নিয়ে অবাক চোখে সেদিকে চেয়ে রইলো গফুর।
কী হচ্ছে এসব?
ভাবার চেষ্টা করলো।
কিন্তু নিজের ক্ষুদ্রবুদ্ধি দিয়ে কারণ নির্ণয় করতে পারলো না।
সূর্যটা ঈষৎ ঢলে পড়েছে পশ্চিম।
আকাশে তখনো একটুকরো মেঘ নেই।
পলাশের ডালে সোনালি রোদ লালরঙ মেখে নুয়ে পড়েছে পথের দু-পাশে। কয়েকটা কাক তারস্বরে চিৎকার জুড়েছে মেডিক্যালের কার্নিশে বসে।
এতক্ষণ বাতাস ছিলো।
মুহূর্ত-কয়েক আগে তাও বন্ধু হয়ে গেছে।
সহসা শব্দ হলো।
গুলির শব্দ।
আবার!
আবার!!
মুহূর্তে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল সবাই।
ছাত্র।
জনতা।
মানুষ।
এক ঝলক দমকা বাতাস হঠাৎ কোত্থেকে যেন ছুটে এসে ধাক্কা খেলো ব্যারাকের এক-কোণে দাঁড়ানো আমগাছটিতে।
অনেকগুলো মুকুল ঝরে পড়লো মাটিতে।
কাকগুলো চিঙ্কার থামিয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো।
তারপর একটা কাক ভয়ার্ত ডানা মেলে আকাশে উড়লো।
আকাশে তখনো গনগনে রোদ।
শহরের সমস্ত আকাশ জুড়ে উড়তে লাগলো কাকটা।
কোথাও কোনো শব্দ নেই।
শুধু একটি ভয়ার্ত কাক আশব্দে উড়তে থাকলো আকাশে।
ঈশানকোণ থেকে ভেসে এলো একটুকরো কালো মেঘ।
সহসা সেই মেঘের আড়ালে মুখ লুকালো সূর্য।
খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো পুরো শহরে।
ওরা গুলি করেছে।
ছাত্রদের উপরে গুলি চালিয়েছে ওরা।
কজন মারা গেছে?
হয়তো একজন। কিম্বা দুজন। কিম্বা অনেক। অনেক।
দোকান-পাটগুলো সব ঝড়ের বেগে বন্ধ হতে শুরু হলো।
দোকানিরা নেমে এলো রাস্তায়।
বাসের চাকা বন্ধ।
কল-কারখানা বন্ধ।
বিকট শব্দে হুইসেল বাজিয়ে ইঞ্জিন ছেড়ে নিচে নেমে এলো ট্রেনের ড্রাইভাররা।
আজ চাকা বন্ধ।
রিকশাটা একপাশে ঠেলে রেখে খবরটা যাচাই করার জন্যে সামনের একটা পান-দোকানের দিকে এগিয়ে গেলো সেলিম।
সে-ও আজ রিকশা চালাবে না।
ওরা নাকি ছাত্রদের উপর গুলি করেছে। কতজন মারা গেছে?
হিসাব নেই।
সবাই খোঁজ নিতে এগিয়ে গেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।
মেডিক্যালের দিকে।
এটা অন্যায়।
এই অন্যায় আমরা সহ্য করবো না।
মেডিক্যালের কাছাকাছি এসে জনতা এক বিশাল মিছিলে পরিণত হলো। ক্ষুব্ধ আক্রোশ ফেটে পড়ছে মানুষগুলো।
এ হত্যার বিচার চাই আমরা।
যারা আমাদের ভাইদের খুন করেছে তাদের বিচার চাই আমরা।
ধীরেধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।
ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরো শহরটা!
সেই অন্ধকারকে আশ্রয় করে দুটো এম্বুলেন্স নিয়ে মেডিক্যালের পেছনে মর্গের সামনে এসে দাঁড়ালো কয়েকজন পুলিশ অফিসার।
মৃতদেহগুলো রাতারাতি সরিয়ে ফেলতে হবে।
ভোর হবার আগেই আজিমপুরায় কবর দিয়ে দিতে হবে ওদের।
সারাশরীর ঘামছে।
পকেট থেকে রুমাল বের করে বারকয়েক মুখ মুছলেন আহমেদ হোসেন।
লাশগুলোর নাম ধাম ঠিকানা যদি কিছু থেকে থাকে লিখে নাও।
কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না স্যার।
জবাব দিলেন জনৈক সহকারী।
একজনের কাছে একটা পুঁটলি পাওয়া গেছে। তার মধ্যে দুটো শাড়ি, কিছু চুড়ি, আর একটা আলতার শিশি। এগুলো কী করবো স্যার?
রেখে দাও। কাল অফিসে জমা দিয়ে দিয়ে। লাশগুলো তাড়াতাড়ি তুলে নাও গাড়ির ভেতরে। এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
লাশগুলো একবার দেখবেন কি স্যার?
আরেক সহকারী প্রশ্ন করলেন।
না। প্রয়োজন নেই।
শান্তগলায় জবাব দিলেন আহমেদ হোসেন।
রুমালে আবার মুখ মুছলেন তিনি।
ছেলে তসলিমের মূখতার জন্য এতদিন প্রমোশন বন্ধ হয়েছিলো।
এবার সরকার হয়তো মুখ তুলে তাকাবেন তার দিকে।
মনে মনে ভাবলেন তিনি।
মৃতদেহগুলো গাড়ির মধ্যে ভোলা হচ্ছে।
সহসা একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে চমকে উঠলেন আহমেদ হোসেন।
সমস্ত শরীরটা মুহূর্তে যেন হিম হয় গেলো তার।
শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে অতি ক্ষীণস্বরে তিনি ডাকলেন—
দাঁড়াও।
মুহূর্তে যেন একটা ভূমিকম্প হয়ে গেলো।
মাতালের মতো টলতে টলতে মৃতদেহের দিকে এগিয়ে এলেন তিনি।
টর্চ! টর্চটা দেখি!!
জনৈক সহকারী টর্চটা জ্বেলে মৃতদেহের উপর ধরলেন।
মৃত তসলিমের রক্তাক্ত মুখের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন আহমেদ হোসেন।
চেনেন নাকি স্যার?
একজন সহকারী প্রশ্ন করলেন তাকে।
আহমেদ হোসেন বোবাদৃষ্টিতে একবার তাকালেন শুধু তার দিকে।
কিছু বলতে গিয়ে মনে হলো জিহ্বাটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
কিছুতেই নাড়াতে পারছেন না তিনি।
ডুকরে কেঁদে উঠলেন মা।
এ কী সর্বনাশ হয়ে গেলো আমার! আমি এবার কী নিয়ে বাঁচবো!!
ছোট ভাইবোনগুলো মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে।
জানালার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে সালমা।
বাইরের আকাশটার দিকে তাকালো সে।
বুকে তার এক অব্যক্ত যন্ত্রণা।
আর একটা দিনও কি বেঁচে থাকতে পারতো না তসলিম!
কেন সে এমন করে মরে গেলো?
মেডিক্যালের সবগুলো ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে দেখলো সালেহা।
নেই।
এখানে নেই।
থানায় গেলো।
জেলগেটে বন্দিদের খাতা খুলে নাম পড়লো সবার।
নেই।
এখানেও নেই।
শূন্যঘরে ফিরে এসে সারারাত অপেক্ষা করলো সালেহা। ভোরের কাক ডেকে উঠলো।
কেউ এলো না।
কান্নায় ভেঙে পড়লো সালেহা।
সে বুঝি আর এই পৃথিবীতেই নেই।
কলসি কাঁখে পুকুরঘাটে দাড়িয়ে রইলো আমেনা।
দিন গেলো।
রাত গেলো।
লোকটা যে বিয়ের বাজার করতে সেই-যে শহরে গেলো, কই আর তো এলো না।
নকশি কাঁথার কত ফুল।
কত পাখি! রঙিন সুতো দিয়ে আঁকলো আমেনা।
রাতে কোনো বাড়িতে পুঁথিপড়ার শব্দ শুনলে হঠাৎ চমকে ওঠে আমেনা।
চোখের পাতা পানিতে ভিজে যায়।
সূর্য উঠছে।
সূর্য ডুবছে।
সূর্য উঠছে।
সূর্য ডুবছে।
সুতোর মতো সরু পানির লহরি বালির উপর দিয়ে ঝিরঝির করে বয়ে যাচ্ছে।
ধলপহরের আগে রাস্তায় নেমে এলো একজোড়া খালি পা।
সুতোর মতো সরু পানি ঝরনা হয়ে বয়ে যাচ্ছে এখন।
কয়েকটি খালি পা কংক্রিটের পথ ধরে এগিয়ে আসছে সামনে।
ঝরনা এখন নদী হয়ে ছুটে চলেছে সাগরের দিকে।
সামনে বিশাল সমুদ্র।
এ সমুদ্রের মতো জনতা।
নগ্নপায়ে এগিয়ে চলেছে শহীদ মিনারের দিকে।
অসংখ্য কালো পতাকা।
পতপত করে উড়ছে।
উড়ছে আকাশে।
মানুষগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অসংখ্য ঢেউ তুলে এগিয়ে আসছে সামনে।
ইউক্যালিপ্টাসের পাতা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে নিচে। মাটিতে।
ঝরে।
প্রতি বছর ঝরে।
তবু ফুরোয় না।
(সমাপ্ত)
