ঢিলের বদলে পাটকেল – হাসির গল্প

'ঢিলের বদলে পাটকেল' হাসির গল্প

আগের দিনে গ্রামবাংলার মানুষের হাতে নগদ বা কাঁচা পয়সা তেমন ছিলো না। তাই অনেককেই বেশ টানাটানির মধ্যে সংসার চালাতে হতো। সম্পন্ন গৃহস্থ বা ধনী জোতদার বা সওদাগরদের ঘরের বিয়েশাদীতে আনন্দফুর্তি হতো–খুব ধুমধামও হতো। সাধারণ মানুষ আর্থিক টানাটানির মধ্যেও সাধ্যমতো ফুর্তিফার্তা করতো। হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ আর নারী-শিশুর রংতামাশা-গোলপিলও কম হতো না। আর ছিল ঝগড়াঝাটি, দরকষাকষি আর দাবিদাওয়া নিয়ে নানা ফ্যাসাদ। কখনো কখনো বরপক্ষ কনেপক্ষকে নিয়ে ঠাট্টামস্করা তো করতই-এক পক্ষ আর এক পক্ষকে নানাভাবে নাকাল করারও চেষ্টা চালাত। কত রকম দুষ্টামি বুদ্ধি যে এর জন্য উদ্ভাবিত হতো তার কোন ঠিকঠিকানা ছিল না। কখনো কখনো কোন ইয়ার্কি বা দুষ্টুমি নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে চলে যেত।

যা হোক, এমনি এক বিয়ের অনুষ্ঠান। বরপক্ষ এসে গেছে, কিন্তু তারা যখন কন্যা পক্ষের বাড়িতে ঢুকল, মনে হলো যেন মিছিল ঢুকছে। অর্থাৎ বরযাত্রীর সংখ্যা মেলা। এত লোক আসার কথা ছিল না। কুড়ি-পঁচিশজন আসবে— এমন কথা ছিল। কিন্তু বরযাত্রীর সংখ্যা ষাটসতত্তুরের কম হবে না। কন্যাপক্ষ চিন্তায় পড়ে নিজেদের মধ্যে কথা চালালো।

একজন বলে : শালাদের আক্কেল-পছন্দ নাই।

আর একজন ফোড়ন কাটল : মনে নাই ইজ্জত মাতবরের কথা? তার মেয়ের বিয়েতে বরযাত্রী কতজন আসবে জিজ্ঞাসা করায় বরপক্ষ বলেছিল কুড়ি কি ষাইট’ ইজ্জত আলীর বাপ বলেছিলেন, ‘এতত যে ফাইট’।

এ বিয়েতেও তাই হয়েছে। এখন এই ‘ফাইট’ (ফারাক) এর একটা উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।

এত লোকের খাওয়ানো, বসানোর জায়গা নেই। তাই কন্যাপক্ষের নানা কৌশল চলছে।

কন্যাপক্ষ বলে, আপনেরা এমুন ব্যাক্কইলা কাম করবেন তা তো বুঝি নাই? আইবেন কুড়ি, আইলেন ষাইট ইডা কেমুন কতা?
বরপক্ষ বলে : আইছি কুড়িই, দুই-পাঁচজন আমলা-ফয়লা বা চাকর-বাকর আছে। মাথা গুণে দেখেন, গেদাগুড়া বাদ দিয়া গোনেন।

কন্যাপক্ষ মেহমানদের একে একে ঘরে ঢোকায় আর গরুর নড়ি দিয়ে মাথায় বাড়ি মেরে গণনার ঢংয়ে বলে এক, দুই, তিন। মাথায় নড়ির বাড়ি বিয়ে খাওয়ার সাধ মিটিয়ে দেয়। ইতোমধ্যে মাংসের ঝোলে পাঁচ সের পানি মেশাননা হয়েছে। প্রতিটি মাংসখণ্ডকে তিন টুকরা করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ডাল আর দইয়ের চেহারা চেনা মুশকিল। এভাবে খাওয়া শেষ হলো।

বরযাত্রীরা বলল : শুকুর আলহামদুলিল্লাহ—আল্লা যা খাইলাম, ভালই খাইলাম। বিয়ের শেষে কন্যাপক্ষকে ফিরানীর দাওয়াত দেয়া হলো। কন্যাপক্ষের লোকজনও কম গেল না। যে ঘরে মেহমানদের বসানো হবে তার মূল দরজা বন্ধ। বলা হলো চাবি হারিয়ে গেছে। পাঁঠা ও ছাগল ঢোকানোর একটা তিন ফুট উঁচু দরজা আছে। সেই দরজা দিয়ে মেহমানদের ঢুকতে বলা হলো।

একে তো ছাগল আর পাঁঠার বিকট গন্ধ, আর ঢুকতে হবে হামাগুড়ি দিয়ে এ অবস্থা দেখে কেউ কেউ কেটে পড়তে উদ্যত হলে বাড়ির লোকজন তাদের ধরে বলল : আসা নিজের ইচ্ছায়, যাওয়া কর্তার ইচ্ছায়। ঘরে গিয়ে আরাম করে বসুন, আর আছুদা হয়ে (তৃপ্তি সহকারে) খান।

মেহমানরা নিচু হয়ে ঘরে ঢোকে, আর কনেপক্ষের লোকেরা তাদের পাছায় ‘ভেদা’ মেরে (লাথি) ঘরে ঠেলে দেয়। তারা বিগলিত হয়ে বলে, কিছু মনে কইরেন না যে! এইভাবেই আমরার গণনের নিয়ম—সম্মানী মেহমান গণনের এইডাই দেশাচার।

এরপর কি খাওয়ানো হলো কিভাবে খাওয়ানো হলো বলা নিষ্প্রয়োজন। তবে ছাগল ও পাঠার বোটকা গন্ধ অনেকের বমি হয়ে গেল।
কনেপক্ষ বলল : খাওয়া স্বাদের হলেও এমুন বেবরাদ্দার মতন খাওন লাগে না। খাওয়া বেশি হলে তো বমি হবেই।

গভীর রাতে কন্যাপক্ষ বাড়ি ফিরে আসে। পরদিন সকালের বাজারে ফিরানীর যাত্রীদের অনেকের জিজ্ঞাসার জবাবে বলতে হলো : এমন খাওন জীবনে খাই। নাই। অজিমত (প্রতিশোধ) নিছে।

Facebook Comment

You May Also Like