Tuesday, March 31, 2026
Homeরম্য গল্পমজার গল্পচুম্বক চিকিৎসা - বিমল কর

চুম্বক চিকিৎসা – বিমল কর

মুদির দোকানে যেভাবে ফর্দ মেলায় সুবোধ ডাক্তার সেইভাবে হাতের কাগজগুলো মিলিয়ে নিয়ে গুরুপদ সান্যালকে বললেন, “বাঁচতে চাও, না, মরতে চাও?”

গুরুপদ ভিতু মানুষ। ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “কেন? কী হয়েছে?”

সুবোধ ডাক্তার বললেন, “মানুষের পাঁচটা ইন্দ্রিয়। তোমার পাঁচটাই বরবাদ হতে চলেছে। হবে না? টাকা ছাড়া কিছু চিনলে না। হরিনামের মালার মতন শুধু টাকা টাকা জপ করে গেলে। এবার বোঝো!”

এমনিতেই গুরুপদর ঘাম-ধাত; গলগলিয়ে ঘামেন সারাক্ষণ, তারপর ফাল্গুন মাস পড়তে না পড়তেই গরম শুরু করেছে এবার। গুরুপদ ঘামতে লাগলেন। গলা শুকিয়ে গেল। বললেন, “কী হয়েছে সেটা বলবে তো?”

সুবোধ বললেন, “কী হয়নি। ব্লাড প্রেশার হাই, ব্লাড সুগার অ্যাবনরমালি বেশি, যে কোনোদিন মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখতে পারো। ব্লাড কোলেস্টরাল যাচ্ছেতাই, তার ওপর হার্ট, ওদিকে তোমার পুরনো পাইলস। কোনটা দেখব। যেদিকে দেখছি চোখ ছানাবড়া হয়ে যাচ্ছে। এত্ত সব বাধিয়ে বসেছ যে তোমার কোন চিকিৎসা আমি করব বুঝতে পারছি না।”

গুরুপদর মাথা ঘুরতে লাগল। চোখের সামনে মশার মতন পোকা উড়তে লাগল নেচে নেচে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কোনো রকমে বললেন, “আমি আর বাঁচব না?”

“বাঁচার পথ কি খোলা রেখেছ যে বাঁচবে!”

গুরুপদ শুকনো গলায় বললেন, “তুমি ভাই আমাকে আর ভয় দেখিয়ো না। এমনিতেই আমি মরছি। বন্ধু লোক তুমি, ডাক্তার মানুষ। তুমি কিছু করো।”

সুবোধ বললেন, “আমি যন্ত্র। যন্ত্রী তো তিনি—” বলে ডাক্তার ছাদের দিকে আঙুল দেখালেন। “ওপরঅলাই হিসেবের খাতা ঠিক করে রেখেছেন। তাঁর হিসেবে যা আছে তাই হবে।—যাক গে, কাগজগুলো রেখে যাও। কাল পরশু একটি বার এসো। দেখি কী করা যায়। একটু ভেবে নিই।”

গুরুপদর তর সইছিল না। বললেন, “দেরি করে কী লাভ?”

সুবোধ ধমক মেরে বললেন, “বাহান্নটা বছর দেরি করলে আর এখন দু রাত্তির তোমার কাছে বেশি হল। যাও, মিথ্যে বকিয়ো না। বাড়ি যাও। লেট মি থিংক। পরশু সন্ধেবেলায় চলে এসো।”

“তুমিও তো বাড়িতে আসতে পারো! গিন্নি বড় চিন্তায় থাকবে। তুমি গিয়ে বুঝিয়ে বললে ভাল হয়—!”

সুবোধ ডাক্তার রাজি হয়ে গেলেন। পরশু মানে রবিবার।

রবিবার সন্ধেবেলায় সুবোধ ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ থাকে।

গুরুপদ উঠতে যাচ্ছিলেন, সুবোধ হঠাৎ বললেন, “তোমার গিন্নির চেক আপটাও করিয়ে নিলে পারতে, গুরুপদ! এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়ে লাভ কিসের?”

“কথাটা মন্দ বলোনি হে! গিন্নিরও শরীর ভাল যায় না। তা তুমি যখন বাড়িতে যাবে, বুঝিয়ে বোলো একবার। আজ আসি ভাই।”

“এসো।”

চেম্বারের বাইরে এসে গুরুপদ দেখলেন, তাঁর গাড়ি রাস্তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে। কাছাকাছি একটা সিনেমা হাউস, পাড়াটাও বাজারপাড়া। ফলে রিকশা, অটো, মিনিবাস, বাসে রাস্তার যা অবস্থা তাতে এপার থেকে ওপারে যেতে হলে গাড়ি চাপা পড়ার ষোলো আনা আশঙ্কা।

এই ভরসন্ধেতে গাড়িচাপা পড়ে মরতে রাজি নন তিনি। হাত নেড়ে চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে ডাকতে গিয়ে দেখলেন, ভিড়ভাড়াক্কা হইহল্লার মধ্যে তাঁর গলা দশ পনেরো হাত দূরেও পৌঁছচ্ছে না। গাড়িও বার বার আড়াল পড়ে যাচ্ছে।

গুরুপদ রাস্তার একটি ছেলেকে বললেন, “বাবা, ওই যে নীল গাড়িটা, ওর ড্রাইভারকে একটু বলবে, গাড়ি ঘুরিয়ে এদিকে আনতে।”

ছোকরা গুরুপদকে দেখল। তারপর বলল, “দাদু, এই রাস্তায় এখন গাড়ি ঘুরবে না। জাম্প লেগে যাবে। দশটা টাকা ছাড়ন—দুজনকে ডেকে আনি, আপনাকে ঠেলে দেব। ভিড়ে যাবেন।”

গুরুপদ একেবারে থ। কী ছেলে রে বাবা! বলতে যাচ্ছিলেন, “বাঁদর, জন্তু কোথাকার!” বললেন না। একে বেপাড়া, তায় লক্কা ছোঁড়া। মনে মনে বললেন, “শালা!”

ছোকরা একগাল হেসে চোখ টিপে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, “বুড়ো দোতলা বাস মাইরি।”

গুরুপদ কথাটা কানে শুনলেন। কিছুই বলতে পারলেন না।

বাড়ি এসে গুরুপদ নিজের শোবার ঘরে ঢুকে পাখা খুলে দিলেন। আলো জ্বলছিল ঘরে। পা পা করে দোতলায় উঠেও হাঁফ লাগছিল তাঁর।

এমন সময় শশিতারার উদয় হল। ঘরে ঢুকে স্বামীকে বললেন, “গিয়েছিলে?”

গুরুপদ কোনো জবাব দিলেন না। এমন মুখ করে বসে থাকলেন যেন জগৎ সংসার অসার হয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে।

“হল কী তোমার?”

গুরুপদ বললেন, “শশি, আমি আর বাঁচব না।” বলে বিরাট করে নিঃশ্বাস ফেললেন।

“কী? বাঁচবে না?”

“ডাক্তার বলল, সামনে শমন—”

“শমন?”

“ওই মরণ আর কি!”

“কার, তোমার না তার।” শশিতারার গলা রুক্ষ হয়ে উঠল।

গুরুপদ বললেন, “আমার! ডাক্তার বলল, আমার সব খারাপ হয়ে গিয়েছে। পাঁচটা—কি বলে পাঁচটা ইন্দ্রিয়।”

শশিতারা মাথায় কাপড় দেন না। সে বয়েস আর নেই। দেহের যা বহর তাতে এগারো হাত শাড়িও টেনেটুনে পরতে হয়, মাথায় কাপড় তোলার উপায় থাকে না, দরকারই বা কিসের।

শশিতারা ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন, “চুলোয় যাক ইন্দ্রিয়। কবেই বা ভাল ছিল! …বাজে কথা থাক—। আসল কথা বলো। তোমার ডাক্তার কী বলল?”

“বললাম তো! আমার সব খারাপ হয়ে গিয়েছে। বরবাদ হয়ে গেছে। শরীরে কিছু নেই।” বলতে বলতে ইশারা করে জল চাইলেন গুরুপদ।

শশিতারার ঘরেই জল ছিল। ঠাণ্ডা জল। জল গড়িয়ে এনে স্বামীকে দিলেন।

জল খেয়ে বড় করে নিশ্বাস ফেললেন গুরুপদ। তারপর বললেন, “সুবোধ পরশু বাড়িতে আসবে।”

শশিতারা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আসবে আসুক। আমি জানতে চাইছি—অত যে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন হল—তো সেসব দেখে তোমার বন্ধু বললটা কী? কিসের ব্যারাম?”

গুরুপদ একটু থিতিয়ে গিয়েছিলেন। গায়ের জামাটা খুলতে খুলতে এবার বললেন, “বলল, প্রেশার সুগার হার্ট—সবই খাবি খাচ্ছে। যে কোনো সময়ে ফট হয়ে যেতে পারি!”

শশিতারার ঠোঁট মোটা। মানুষটিও গায়ে গতরে স্বামীর সমান। একশো কেজির ধারে কাছে। গায়ের রঙের অমিল না থাকলে, এবং খানিকটা মুখের ছাঁদের—স্বামীস্ত্রীকে যমজ বলে চালিয়ে দেওয়া যেত।

শশিতারা ঠোঁট উলটে বললেন, “ফট—! তোমার সুবোধ ডাক্তার ফট বললেই ফট? সে ভগবান নাকি! যা মুখে এল বললাম আর তুমিও তার বাক্যি বলে মেনে নিলে! ও আবার ডাক্তার নাকি? কম্পাউন্ডার!

“কম্পাউণ্ডার?”

“তা নয়তো কি! আমি ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি। সাত বার ফেল করে পাস করেছে।”

গুরুপদ একটু যেন খুশি হলেন। সুবোধ তাঁকে বড় দমিয়ে দিয়েছে। শশিতারার কাছ থেকে যেন সাহস পাওয়া গেল সামান্য। কিন্তু বন্ধুকে যেভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন শশিতারা, তাতে আঁতে লাগল গুরুপদর। সাত সাতবার ফেল করা ছেলে সুবোধ নয়। গুরুপদ জানেন। পুরনো বন্ধুত্ব।

গুরুপদ বললেন, “সুবোধ একটা সোনার মেডেল পেয়েছিল!”

শশিতারা নাক বেঁকিয়ে জবাব দিলেন, “এ-ক-টা!—আমার বাবার একমুঠো মেডেল ছিল। সোনা রুপো—!”

“তুমি সুবোধকে ফেলনা ভেবো না, শশি! এত বছর প্র্যাকটিস করছে। জমজমা প্র্যাকটিস। কী ভিড়ও রোগীর! পয়সাও মন্দ করেনি।”

“পাড়ার মদন মুদিও পয়সা করে কদমঘাটায় বাড়ি করেছে। তাতে হয়েছেটা কী!” শশিতারা বললেন, “যাক—তোমার সুবোধকে নিয়ে তুমি থাকো। আমি তার একটা কথাও বিশ্বাস করি না। তোমার অসুখটা কী আমার জানা দরকার। হেঁয়ালি ধোঁয়ালি শুনে লাভ নেই আমার।”

গুরুপদ বললেন, “পরশু ও আসবে। জিজ্ঞেস কোরো।” বলেই তাঁর অন্য কথা মনে পড়ে গেল। আবার বললেন, “সুবোধ বলছিল, তোমারও একবার চেক আপ করানো দরকার।”

শশিতারা হাত উঠিয়ে ঝাপটা মারার ভঙ্গি করলেন, “থাক, আমার আপ-টাপে দরকার নেই। বেশ আছি। তুমি নিজেরটা দেখো। নাও, ওঠো, গা ধুয়ে এসো, ফল শরবত খাও।”

শশিতারা আর দাঁড়ালেন না।

গা-হাত ধুয়ে গুরুপদ ঘরে বসলেন। পরনে সাদা লুঙি, গায়ে বগলকাটা পাতলা ফতুয়া। পায়ে মোটা হাওয়াই চটি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে নিলেন। অল্প চুল। হু হু করে পেকে যাচ্ছে।

নিজের মুখের চেহারাটাও আয়নায় দেখলেন গুরুপদ। শশিতারা যাই বলুক, গুরুপদ নিজেই বুঝতে পারছেন, তাঁর শরীরের অবস্থা ভাল নয়। মুখটা কেমন থমথমে হয়ে রয়েছে। চোখ অল্প লালচে। নেশা ধরলে যেমন দেখায়। প্রেশারের জন্যে নাকি! কিসের যে দুর্বলতা ক্লান্তি—কে জানে! বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। ওজন কমারও কোনো লক্ষণ নেই। রোজ সকালে বাড়ির ছাদে পাক মারছেন, ফুলের টবে জল ঢালছেন—তবু ওজনের কমতি হচ্ছে না। ভুঁড়িরও হ্রাসবৃদ্ধি নেই। সেই একই রকম।

মনের দুশ্চিন্তাই বড় শত্রু। গুরুপদর সময়টা ভাল যাচ্ছে না। বছরখানেক ধরে নানা গণ্ডগোলের মধ্যে রয়েছেন। কারখানায় একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। আজ ষোলো দফা দাবি, কাল হুমকি, পরশু ঘেরাও। পাগলা হয়ে যাবার জোগাড়। আরে বাবা, তোরা তো বোকা কালিদাসকেও হার মানালি। কালিদাস নিজে যে ডালে বসেছিল সেই ডাল কাটছিল। তোরা এমন মুখ্যু—ডালপালা তো তুচ্ছ, গোটা গাছটাই উপড়ে ফেলার জন্যে লেগে পড়েছিলি। তাতে গুরুপদর আর কী হত, কারখানা বন্ধ হয়ে যেত, মাস কয়েক পরে দেখতিস লছমনদাস বাজপুরিয়া কারখানা কিনে নিয়েছে, নিয়ে নতুন নাম দিয়ে কারখানা চালু করেছে। গুরুপদ ঠকত না, ঠকতিস তোরা। বাঙালির এই হল দোষ; চরিত্তির। নিজের মুখের রুটি হাতে নিয়ে খেলা করে; আর চিল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যায়।

গুরুপদ তেমন একবগ্গা মালিক নন। কত রকমভাবে বুঝিয়েছেন, মিষ্টি করে কথা বলেছেন, মাইনেপত্র বাড়িয়েও দিয়েছেন, মায় মাসে পনেরো টাকা করে টিফিন খরচাও ধরে দিয়েছেন রফা করে। তবু মন তুষ্ট করা যায় না। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতন তাঁর কারখানা ছোট—লোক বিস্তর।

শেষে একদিন গুরুপদ বললেন, “নরম মাটি পেয়ে আমায় তোমরা পায়ে চটকাবে? হবে না। আমি আর কারখানায় আসব না; কথাও বলব না। যা খুশি করো তোমরা।”

তেরিয়া না হলে আজকালকার সংসারে কাজ হয় না। গ্রাহ্যি করে না লোকে। গুরুপদর উকিল নীলমণি চাটুজ্যে ঠিকই বলে। বলে, কলকাতা শহরে মানুষ মিনিবাসকে ডরায় কেন গুরুপদবাবু? অ্যাজ বিকজ দে আর অল ডেসপারেটাস। নীলমণি ইংরিজি শব্দের শেষে নাকি ইটালি ভাষা মেশাতে পছন্দ করে।

গুরুপদ কি আর মিনিবাস? মানুষ বলে কথা। আর ব্যবসা তো, আমলা তেল, চালমুগরার সাবান, শাঁখের গুঁড়ো উইথ চন্দন—এ সবের। আর হালে তৈরি করেছিলেন কাপড়কাচা গোল সাবান। দেখতে গেলে কিছুই নয়। তবে ভাল ভাল নাম দিয়েছিলেন জিনিসগুলোর। ‘আদি আমলা শশি কেশ তৈল’ ‘চর্মদশানন চালমুগরা’ ‘মুখশোভা; শঙ্খ চন্দন চূর্ণ’। কাপড়কাচা গোল সাবানের নাম; ‘নব বাংলা সাবান’।

গুরুপদ ব্যবসার মূল কথাটা জানেন; পাবলিকের যা হামেশাই দরকারে লাগে তা নিয়ে ব্যবসা করো, যত তুচ্ছ জিনিসের হোক, লেগে যাবে। পাড়ায় পাড়ায় মুদির দোকান কেন চলে? কেন পানের দোকান ফেল মারে না? তেলেভাজার দোকানে গিয়ে লাইন মারতে হয় কেন?

পঁচিশ বছর আগে গুরুপদ যখন নিতান্তই চাকরি করতেন একটা ফারমাসিউটিক্যাল কম্পানিতে তখন থেকেই মাথায় ব্যবসার পোকা নড়েছিল। বিয়ের পর এক মামা-শ্বশুরের দর্শন পেলেন। গুরুদর্শন। মামাশ্বশুর আলপিন, সেফটিপিন, ক্লিপ তৈরি করে চারতলা বাড়ি হাঁকিয়েছেন। পাতিপুকুরে মামাশ্বশুরমশাই বললেন, খোস-পাঁচড়া-দাদের মলমের কত বিক্রি জানো, বাবাজি। এ দেশ হল গরিবের দেশ; এখানে যত লোক পাউডার মাখে তার পাঁচশ গুণ লোক দাদ চুলকুনি হাজার ওষুধ খুঁজে বেড়ায় বুঝলে? রাইট জিনিস পিক করো, লেগে যাবে।

গুরুপদ পাঁচ রকম ভেবেচিন্তে প্রথমেই ধরলেন, ‘আদি আমলা শশি কেশ তৈল’। বন্ধুরা বলল, ‘আমলার আবার আদি কী রে? গুরুপদ হেসে বললেন, ‘আদির একটা মার্কেট ভ্যালু আছে। আদি কবি বাল্মীকি, ব্রাহ্ম সমাজ, আদি ঢাকেশ্বরী—পুরনো ঘিয়ের গন্ধ ভাই। আর শশি আমার লাক—দেখা যাক বাজারে লাগে কিনা!”

কাগজে পাঁজিতে বিজ্ঞাপন। শিয়ালদা হাওড়া স্টেশনে হ্যান্ডবিল। আমলা তেল বাজারে লেগে গেল। বাজারে মানে বাবুবিবিদের বাজারে নয়, ছাপোষা গরিব-গুর্বোদের ঘরে। মফস্বলে মার্কেট হয়ে গেল। আমলার সাফল্যে খুশি হয়ে গুরুপদ ‘চর্মদশানন চালমুগরায়’ নেমে গেলেন। পাঁজিতে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। বিবিধভারতীতে স্পট। চমর্দশাননও সাকসেস। তারপর মুখশোভা শঙ্খ চন্দন চূর্ণ।

সাত আট বছরের মধ্যে গুরুপদ পায়ের তলায় শক্ত মাটি পেয়ে গেলেন। শোভাবাজারের দিকে একটা ভাঙা পোড়া বাড়ির নীচের তলার একপাশে তাঁর ‘শশিতারা কোং’ চলতে লাগল। চলতে চলতে পুরো নীচের তলাটাই তাঁর কারখানা হয়ে গেল। জনা তিরিশ লোক খাটে কারখানায়।

গুরুপদ টাকার স্বাদ বোঝার পর থেকেই মন প্রাণ ঢেলে দিলেন ব্যবসায়। আজ বিশ বছরে তিনি না করলেন কী! পাইকপাড়ায় তেতলা বাড়ি করেছেন। কারখানার জন্যে একটা ভ্যান রয়েছে। মধ্যমগ্রামের দিকে বাগান কিনে ফেলে রেখেছেন।

ভাগ্য একদিকে গুরুপদকে যথেষ্ট দিয়েছে। অন্যদিকে অবশ্য মেরে রেখেছে। গুরুপদরা সন্তানহীন।

বছর সাত আট অপেক্ষা করার পরও যখন শশিতারার কিছু হল না, ডাক্তার বদ্যি, তাবিজ মাদুলি, পাথর, মায় উত্তরপাড়ার ডাকসাইটে তান্ত্রিক গুরুর যাগযজ্ঞ পর্যন্ত বিফলে গেল—তখন শশিতারা বললেন, দত্তক নেবেন। গুরুপদ আপত্তি করলেন না। করে কী লাভ? স্ত্রী থেকেই তাঁর ভাগ্যে শশির উদয়। স্ত্রীকে ভয়ভক্তি করেন গুরুপদ। ভালও বাসেন।

শশিতারা তাঁর এক সম্পর্কের বিধবা বোনের ছেলেকে হাফ দত্তক নিলেন। মানে লালনপালনের সব দায়দায়িত্ব। কিন্তু আইনগতভাবে নয়। সে বোনও বিগত হল।

গুরুপদর একটা মেয়ে মেয়ে শখ ছিল। বছর কয়েক পরে গুরুপদর ইচ্ছে হল, এক ভাগ্নিকে নিজের কাছে এনে রাখেন। না, দত্তক নয়। গুরুপদর কোষ্ঠীতে নিষেধ বলছে। বিষ্টপুর থেকে ভাগ্নিকে তুলে এনে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলেন গুরুপদ। সেই ভাগ্নির বয়েস এখন কুড়ি। নাম, বেলা।

দত্তকরূপী ছেলের নাম ছিল চাঁদু। নাম পালটে শশিতারা তাকে সুশান্ত করে দিয়েছেন। ডাকেন, শানু বলে।

ছেলে একেবারে তৈরি। বছর বাইশ তেইশ বয়েস বড়জোর। এখনই দোল দুর্গোৎসবে দু এক পাত্র টানতে শুরু করে দিয়েছে। দিনে দু তিন প্যাকেট সিগারেট ওড়ায়।

গুরুপদ কিছু বলতে পারেন না। বললেই শশিতারা খরখর করে ওঠেন। ছেলে আমার বলে তোমার চোখ টানছে। আর নিজের মেয়ের বেলায়? তাঁর তো সাবান শ্যাম্পু চুল ছাঁটা গানের ক্লাস ছাড়া করার কিছু দেখি না। নিজের বেলায় চোখ বুজে থাকো, তাই না?

তা বেলার বেলায় গুরুপদ যতটা স্নেহান্ধ, শানুর বেলায় ততটা নয়। আর শশিতারা শানুর বেলায় যতটা লাগামছাড়া বেলার বেলায় ততটা নয়। তবে, একথা স্বীকার করতেই হবে, ছেলে মেয়ে দুটো এমনিতে খারাপ নয়; বয়েসের টানে খানিকটা তরল, চঞ্চল চপল; টাকাপয়সার সাফল্যে কিছুটা বেহিসেবি, বিলাসী। কী আর করা যাবে? গুরুপদ আর শশিতারার টাকা খাবে কে? ওদের জন্যেই সব।

গুরুপদ বিছানায় গিয়ে বসবেন ভাবছিলেন এমন সময় শশিতারা নিজের হাতে ফল আর শরবত নিয়ে ঘরে এলেন।

জানলার কাছে শ্বেতপাথরিয় চৌকো ছোট টেবিল। ফল-শরবত নামিয়ে রেখে শশিতারা বললেন, “নাও, খেয়ে নাও।”

গুরুপদ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, “খাব?”

“কেন! খাবে না কেন?”

“বুঝতে পারছি না। ব্লাড সুগার যদি আরও চাগিয়ে যায়।”

“নিকুচি করেছে তোমার ব্লাড সুগারের। রোগের কথা ভাবতে ভাবতে যা ছিরি করেছ! আগে তোমার বন্ধু আসুক। বলুক, কী হয়েছে। তারপর দেখা যাবে, কী খাবে কী খাবে না।”

গুরুপদ ফলের প্লেটে হাত দিলেন। শশার কুচি, কলা, কমলালেবু, বিশ পঁচিশটা আঙুর।

খেতে খেতে গুরুপদ বললেন, “শরীরকে আর অবহেলা করা উচিত নয়, শশি। প্রেশার সুগার—দুটোই খুব খারাপ। তার ওপর হার্ট। সুগারে লোকে নাকি অন্ধ হয়ে যায়।”

শশিতারা বললেন, “কে বলেছে তুমি অন্ধ হবে! তোমার ওই সুবোধ?”

“না না, সে বলেনি। আমি শুনেছি।”

“শোনা কথার আবার কী দাম গো?”

একটু চুপ করে থেকে গুরুপদ বললেন, “আজকাল বুকের ভেতরটাও কেমন করে। চাপ চাপ লাগে। ব্রিদিং ট্রাবল…”

“ওসব তোমার বাই। ⋯আমারও তো মনে হয়, বুক না বালির বস্তা। নোয়াতে পারি না।”

গুরুপদ স্ত্রীর বুকের দিকে তাকালেন। ওই বুকের আর নোয়ানোর কিছু নেই। পেট বুক এক। শশিতারাকে এখন দেখলে কে বিশ্বাস করবে, বিয়ের সময় শশির ওজন ছিল মাত্র তিরিশ সের। এক কি দু কলা উদয় ঘটেছিল শশির। চমৎকার ছিপছিপে গড়ন ছিল তার। তবে মাথায় খাটো। গুরুপদ নিজেও মাথায় লম্বা নন। বরং বেঁটেই বলা যায়। বিয়ের সময় জোড় মন্দ মানায়নি। এখন অবশ্য জোড় হিসেবে মানানসই হয়ে আছেন। পাড়ার লোক আড়ালে বলে জোড়া গিরজে।

শশিতারা হঠাৎ বললেন, “রোগের কথা রাখো। তোমায় একটা খবর দি। রসময় এসেছিল আজ বিকেলে। বড় ঝোলাঝুলি করছে।”

গুরুপদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এমন সময় পাশের ঘরে ফোন বেজে উঠল।

শশিতারা উঠে গিয়েছিলেন ফোন ধরতে। ফিরে আসতে সামান্য সময় লাগল।

ফিরে এসে বললেন, “তুমি চশমা ফেলে এসেছ ডাক্তারের ঘরে?”

গুরুপদর খেয়াল হল। কাছের জিনিস দেখতে, কাগজটাগজ পড়তে তাঁর চশমা লাগে। সুবোধের চেম্বারে চশমাটা পকেট থেকে বার করেছিলেন। আসার সময় মনের যা অবস্থা হয়েছিল চশমাটা খাপে ভরতে ভুলে যেতেই পারেন।

গুরুপদ বললেন, “কী জানি! আমার পকেটটা দেখো একবার।’

শশিতারা এগিয়ে গিয়ে স্বামীর ছেড়ে রাখা পাঞ্জাবিটা ঘাঁটলেন। না চশমার খাপ নেই। বললেন, “কাল সকালে দিনুকে পাঠিয়ে দেব। চশমাটা নিয়ে আসবে।’

চশমার জন্যে গুরুপদর ব্যাকুলতা দেখা গেল না। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “সুবোধের সঙ্গে তোমার কথা হল?”

“হল।” শশিতারা ফিরে এসে স্বামীর কাছাকাছি বসলেন।

“কী বলল?”

“ছ্যাচড়ামি করল” শশিতারা যেন খানিকটা বিরক্ত। বললেন, “সামনাসামনি হলে দেখে নিতুম। ফোনে তো অত কথা বলা যায় না।”

“বলল কী?”

“ঠুকে ঠুকে কথা বলল; রসিকর্তা করল। বলল, কর্তাকে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, পোলাও, মাংস, পাকা রুই মাছের পেটি, দুধ, সন্দেশ, রাজভোগ খাইয়ে যাও⋯, বলি চোখ আছে না নেই, তার যে চেহারাখানা তৈরি করেছ, এমন চেহারা অর্ডার দিয়ে কুমোরটুলিতেও গড়ানো যায় না। —বেলুন ফোলাতে ফোলাতে কোথায় নিয়ে গেছ—তোমার চোখেও পড়েনি। পতিভক্তি যা দেখালে—এবার তার ঠেলা বুঝতে হবে।”

“বলল তোমায়?”

“বলল। আরও কত রকম রসিকর্তা।—আমিও ছেড়ে কথা বলার লোক নই।”

“তুমিও বললে?”

“বলব না।—আমিও বললুম, যার পুকুর তার মাছ, অন্য লোকের বুকে বাজ। নিজেরটি তো হারিয়েছ তাই অন্যেরটি দেখে আফসোসে মরো। বেশ করেছি আমি আমার কর্তাকে গাওয়া ঘিয়ের লুচি-মাংস খাইয়েছি। তোমার বউ বেঁচে থাকতে কোনদিকে ঘাটতি ছিল তোমার। তখন নিজে যে কুমারটুলির কার্তিক হয়ে ঘুরে বেড়াতে। আমাকে বাজে বকিয়ো না। তোমার মতন ডাক্তার আমি ট্যাঁকে গুঁজতে পারি।”

গুরুপদ ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “সুবোধকে তুমি এসব বললে?”

“কেন বলব না! আমার পেছনে লাগতে এলে আমি ছেড়ে দেব!”

“না না, তা নয়। তবে কিনা কতকালের পুরনো বন্ধু, ভাল ডাক্তার। তা ছাড়া তোমাদেরও নিজের লোকের মতন ছিল। যদি কিছু মনে করে!”

“করলে করবে। আমায় যখন যা-তা বলে তখন কি তোয়াক্কা করে মুখের।”

গুরুপদ আর ও পথে গেলেন না। শুধু বললেন, “পরশু আসবে তো?”

“আসবে।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর গুরুপদ বললেন, “রসময়ের কথা কী বলছিলে?”

শশিতারার পান-জরদার নেশা। পানের কৌটো আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। আবার উঠলেন। দরজার কাছে গিয়ে হাঁক মারলেন, “পারুলের মা—আমার পানের ডিবেটা দিয়ে যাও।”

পানের ডিবে, জরদার কৌটো আসতে সময় লাগল। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকলেন শশিতারা।

পারুলের মা পানের ডিবে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, শশিতারা বললেন, “দাদা-দিদি ফেরেনি এখনও?”

“এই ফিরল।”

“ঠিক আছে।”

শশিতারা আবার স্বামীর কাছাকাছি এসে বসলেন। পান জরদা মুখে দিয়ে বললেন, “রসময় বলছিল, ও পক্ষ বড় তাড়া দিচ্ছে।”

“কোন পক্ষ?”

“কোন পক্ষ আবার! ছেলেদের তরফে তাড়া দিচ্ছে।”

গুরুপদর খেয়াল বল। বললেন, “আমি তো বলেই দিয়েছি, বেলুর বিয়ে এখন আমি দেব না।”

শশিতারা বললেন, “কেন?”

“কেন আবার কী! উনিশ কুড়ি বছর বয়েসে—এখন বিয়ে?”

শশিতারা স্বামীকে লক্ষ করলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, “উনিশ বছরে মেয়েদের বিয়ে হয় না? আমার কত বছর বয়েসে বিয়ে হয়ে ছিল। উনিশ কুড়ি।”

“সে তখন। এখন কুড়ি একুশ কম করে। চব্বিশ পঁচিশের আগে মেয়েরাও বিয়ে করে না।”

“ও ! তোমার মতলব তা হলে এখনও দু চার বছর তোমার বেলুকে গলায় ঝুলিয়ে রাখা।”

গুরুপদর হাই উঠল। বড় করে হাই তুলে মুখের সামনে তুড়ি মারলেন। পরে বললেন, “এত হইচইয়ের আছে কী। সময়ে বিয়ে হবে।”

“হ্যাঁ, হবে। ততদিন এই ছেলে বসে থাকবে নাকি! নিজের জায়গায় ফিরে যাবে। সাত সুমুদ্র উড়ে তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে আসবে না।”

গুরুপদ নির্বিকার গলায় বললেন, “দরকার নেই আসার।”

শশিতারা চটে গেলেন। গুরুপদ এমনভাবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পাত্র তাড়াচ্ছেন, যেন অমন পাত্র শয়ে শয়ে দেখা যায়। কাক বককে মানুষ এই ভাবে তাড়ায়। রেগে গিয়ে শশিতারা বললেন, “আমেরিকায় থাকে ছেলে, দিদি ভগিনীপতির সঙ্গে। ভাল চাকরি-বাকরি করে দেখতে ভাল। টাকাপয়সার অভাব নেই। মেয়ে তোমার সুখে থাকত। নিজেরা যেচে হাত বাড়িয়েছিল। তুমি হাতের জিনিস পায়ে ঠেলছ।”

গুরুপদ বললেন, “আমেরিকা, লন্ডন আমার দরকার নেই। আমলা তেল আর চালমুগৱো সাবানের ব্যবসা করি আমি। একবারে দেশি ছেলের সঙ্গে বেলুর বিয়ে দেব।”

সেই ছেলে কি তোমার গোকুলে বাড়ছে?”

“কপালে বাড়ছে। কে কার জন্যে বাড়ে তুমি জান? আমি কার জন্যে বেড়েছিলাম।”

শশিতারা বললেন, “ঠিক আছে। থাক তোমার মেয়ে ধিঙি হয়ে ওই তো কাঠবেড়ালি চেহারা। দেখি কোন গোকুল এসে নিয়ে যায়!”

দুই
শানু আর বেলার ঘর পাশাপাশি। দোতলায় বারান্দার দিকের দরজা ছাড়াও দু ঘরের মাঝামাঝি দরজা আছে। খোলাই পড়ে থাকে। সারাদিন। রাত্রে শোবার সময় দরজাটা বন্ধ করে দেয় বেলা। কোনোদিন বা শুধু ভেজিয়ে রাখে। বেলার ছেলেবেলা থেকেই ভূতের ভয়। সে যখন বিষ্ণুপুরে ছিল তখন তাদের বাড়ির পাঁচ সাতটা বাড়ি তফাতে রাধার মাকে ভূতে ধরেছিল। বটগাছের মাথা থেকে নেমে সেই যে ভূতে ধরল মাকে—একটানা পাঁচ ছ মাস বেচারিকে নাস্তানাবুদ করে যখন ছেড়ে দিল তখন বাতাসিমাসি—মানে রাধার মায়ের হাড়চর্মসার চেহারা। বাতাসিমাসি মারাও গেল পরে।।

ছেলেবেলায় স্বচক্ষে বেলা ভূতে ধরার ব্যাপারটা দেখেছে। আহা, বাতাসিমাসি না পারত খেতে, না পারত শুতে। কুয়োতলায় রান্নাঘরে, উঠোনে, কলঘরে দুমদুম করে আছাড় খেত, মুখ দিয়ে গেঁজলা বেরত, আবোতল তাবোল বকত, কখনও কাঁদত, কখনও গালগাল দিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলত। আরও কত কী করত।

বেলার তখন থেকে ভূতের ভয়। ভয় আর কাটল না।।

একা ঘরে শুতে বেলার আপত্তি নেই। তার ঘর। নিজের মতন করে সে সাজিয়ে গুছিয়ে গা হাত ছড়িয়ে মহা আরামে থাকে। ঘরের লাগোয়া বাথরুম। ছিটেফোঁটাও অসুবিধে নেই। তবু—ওই যে—কোনোদিন যদি কোনো কারণে একবার গা শিউরে ওঠে, বেলা হয়ে গেল। শানু আর তার ঘরের মাঝখানের দরজা সে আর বন্ধ করবে না, আলগাভাবে ভেজিয়ে রাখবে শোবার আগে।

শানুও এক একদিন মজা করে। কোথাও কিছু নেই, বেলা হয়তো সন্ধেবেলায় বসে বসে কলেজের পড়া দেখছে, শানু কোথা থেকে একটা গোবদা বই এনে বেলার কাছে ফেলে দিল। “বেলা দারুণ দারুণ ভূতের গল্প আছে বইটায়। পড়ে দেখ। গায়ে কাঁটা দেবে।” কখনও বা “মৃত্যুর পরপারে” “প্রেতসিদ্ধ মহারাজ নকুলেশ্বর” “কলকাতা শহরের ভূতের বাড়ি”—এই ধরনের বই বা লেখা এনে বেলাকে পড়ে পড়ে শোনাবে।

বেলা চেঁচাবে, ঝগড়া করবে, কাঁদবে—কিন্তু ভয়টা মন থেকে তাড়াতে পারবে না।

“আমি তোর পাশের ঘরে থাকব না, তেতলায় চলে যাব” বেলা হয়তো বলল।

“চলে যা! আমার দু-দুটো ঘর হয়ে যাবে।” শানুর জবাব।

“সবই তো তোর। ”

“অফকোর্স। আমি বাড়ির ছেলে, তুই মেয়ে। তোর বিয়ে হলেই কাটিয়ে দেওয়া হবে। তখন তোর কপালে যা আছে। তার শাশুড়ি তোকে কেরাসিন তেল ঢেলে পুড়িয়ে মারতে পারে। শ্বশুর আর তোর বর মিলে তোকে কোপাতে পারে! বেলি, পোড়া মানুষের যা চেহারা হয় দেখেছিস! বীভৎস। আর আগুনে পুড়ে, খুনখারাবি হয়ে মরলে নির্ঘাত ভূত।”

বেলা হাতের সামনে যা পেল ছুঁড়ে মারতে লাগল শানুকে। “তুই আমাকে তাড়াতে পারবি? আমি যাব না। এটা আমার মামার বাড়ি।”

“আমার মাসির বাড়ি। মায়ের বাড়িও বলতে পারিস। আমি একরকম দত্তক, তুই তক্ষক।”

বেলার মুখ অভিমানে অপমানে থমথম করে উঠত। জল আসত চোখে।

শানুকে চেষ্টা করতে হত বেলার রাগ অভিমান ক্ষোভ ধুয়ে মুছে তার মুখে হাসি ফোটাতে।

সম্পর্কটা এই রকমই ছিল। চিমটি কাটার, চটিয়ে দেবার, ভয় পাইয়ে মজা পাবার এই শানু আর বেলা পরস্পরকে হাসি তামাশা অন্তরঙ্গতার অবলম্বন করে নিয়েছিল।

সেদিন দুজনে খাওয়া শেষ করে নিজেদের ঘরে এল গম্ভীর মুখে।

ঘরে এসে বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিয়ে শানু একটা সিগারেট ধরাল।

বেলা নিজের ঘরে।

শানু আবার ডাকল, “বেলি?”

এবার সাড়া দিল বেলা।

শানু ডাকল, “এখানে আয়।”

বেলা মাঝের দরজা দিয়ে শানুর ঘরে এল।

“কী বুঝলি?” শানু বলল।

বেলা কোনো জবাব দিল না।

শানু মুখের ধোঁয়া গিলে ফেলে বলল, “তোর মামার নাকি মহাপ্রস্থানে যাবার অবস্থা হয়েছে। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত রোগে রোগে ভরতি। প্রেশার, সুগার, হার্ট, কিডনি, লিভার—।”

বেলা বাধা দিয়ে বলল, “আমার মামা তোমার মেসো। ধর্ম বাবাও।”

“ম্যাটার লাইজ দেয়ার—। মাসি কেমন বলল শুনলি? শানু সঙ্গে সঙ্গে শশিতারার গলা নকল করে বলতে শুরু করল, “সংসারে একটা মানুষ মাথায় গন্ধমাদন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল দশটায় বেরোয় রাত আটটায় বাড়ি ফেরে। যত্ত ঝক্কি ঝামেলা, টাকাপয়সা ব্যবসার চিন্তা তার। খেটে খেটে ভাবনায় ভাবনায় তার সতেরো রকম রোগ বাঁধল। ডাক্তার বলেছে, এভাবে চললে দু দিনেই ফট। চাট্টিখানি কথা নাকি। মাত্তর পঞ্চাশ বাহান্ন বয়েস হল, এখন তো চুল পাকা দাঁত পড়ার বয়েসও হয়নি। অথচ কী দশা হয়েছে মানুষটার চোখ খুলে দেখা যায় না। শরীর পাত হয়ে গেল।—আর তোমরা বাবুবিবিরা মনের আনন্দে ছররা করে বেড়াচ্ছ। তোমাদের না চোখ আছে, না চোখের পাতা আছে। কার ছায়ার তলায় দাঁড়িয়ে আছ বুঝতে পারছ না। বুঝবে একদিন। ছি ছি—!”

শানু শশিতারার পার্টে প্রক্সি দিয়ে হাতের সিগারেটটা জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল।

বেলা বলল, “ওই কথাটা আমার খুব খারাপ লেগেছে।”

“কোন কথা?”

“ওই যে মামি বলল—যার যায় তার যায়—অন্য লোকের আয় দেয়। ”

শানু খেয়াল করে কথাটা শোনেনি। শুনলেও পরোয়া করেনি। মাসির একটু ছড়াকাটা অভ্যেস আছে। মেয়েলি ছড়ায় কে কান করে?

শানু বলল, “ছেড়ে দে। বাজে কথায় কান করিস কেন?”

বেলা বলল, “বাজে কথা! এটা বাজে কথা হল? মামার শরীর খারাপ হলে আমাদের কোন আয় বাড়বে—তুইই বল।”

শানু বলল, “ধুত, তুই এনিয়ে মাথা ঘামাতে বসলি! মুখে এসেছে বলে ফেলেছে। মাসির ওই টাইপ। মন থেকে কিছু বলে না। ভেবেও বলে না।” বলে শানু একটা চেয়ারে বসে পড়ল। মাথার চুল ঘাঁটল সামান্য। আবার বলল, “তোর কী মনে হয়?”

“কিসের?”

“মেশোর শরীর দেখে কী মনে হয় তোর?”

বেলা কী বলবে বুঝতে পারল না।

“মেসোকে সিক মনে হয়?”

বেলা একটু অন্যমনস্কভাবে বলল, চোখে দেখে কি অসুখ বোঝা যায়। ডাক্তার যখন বলছে”—

“ডাক্তাররা এইট্টি পার্সেন্ট ফালতু কথা বলে। —তোর মনে নেই, আমার হল ম্যালেরিয়া ডাক্তার বলল প্যারাটাইফয়েড। তোর হল টনসিলাইটিস—বলল, ডিপথেরিয়া। মাসির কান পাকল, বলল নাকের মধ্যে ফোঁড়া হয়েছে। যত্ত বোগাস।”

বেলা বলল, “ সে পাড়ার ডাক্তার ঘোষবাবু। সুবোধ মামা বাজে কথা বলার লোক নয়। তোর আমার বেলায় তো সুবোধ মামাই পরে এসে দেখে ঠিকঠাক বলে ওষুধপত্র দিয়ে গেল।”

শানু কথাটা অস্বীকার করতে পারল না। এবাড়িতে তেমন বেগড়বাঁই কিছু হলে সুবোধ মেসোকেই ডাকতে হয়। আসলে সুবোধ মেশোমশাই থাকেন মাঝ কলকাতায়, আর শানুরা থাকে পাইকপাড়ায়। দরকারে পাড়ার ডাক্তারকেই ডাকতে হয় প্রথমে। আর তাদের পাড়ার ঘোষ একটা ছাগল। এ গোট উইথ টু লেগস।

শানু বলল, “তুই বোস না। ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হবার নয়। ভাবতে হবে। ডিপলি ভাবতে হবে। সাপোজ মেশোর দারুণ কিছু হয়েছে —বডির ফাংশন খারাপ হয়ে গিয়েছে, সিস্টেম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—তা হলে আমাদের চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। একটা কিছু করতেই হবে।”

বেলা আর দাঁড়িয়ে থাকল না, শানুর বিছানায় বসল। মনে মনে এখনও সে অখুশি। মামির ওই কথাটা তার প্রাণে ভীষণ বেজেছে। মামাকে সে কম ভালবাসে না, সেই মামার কিছু হলে তার লাভ কিসের! বেলা কি তেমন স্বার্থপর!

শানু বলল, “বেলি, আমার মনে হয় মেসোর রক্তটক্ত আর একবার পরীক্ষা করানো দরকার। ভাল জায়গা থেকে। আর একটা ই সি জি।—তুই জানিস না পাড়ার শেতলা মন্দিরের মতন রাস্তায় ঘাটে যত রক্তমূত্র কফ পরীক্ষার ঝুপড়ি গজিয়ে উঠেছে—তার নাইন্টি পার্সেন্ট হল রদ্দি। টাকা পেঁচার কল। কিস্যু দেখে না, এর পেচ্ছাপ ওর ঘাড়ে চাপায়, রামের ব্লাড শ্যামের বলে চালিয়ে দেয়। স্টুল রিপোর্ট এ টু জেড একই কিসিমের। এরা ডেনজারাস—।”

বেলা বলল “মামা ভাল জায়গা থেকে পরীক্ষা করিয়েছে। ”

“রাখ তোর ভাল জায়গা। নামেই ভাল। রিলায়েবল লোক দরকার। নিজে যে সব কিছু পরীক্ষা করবে, অন্যের হাতে ছেড়ে দেবে না।”

“মামাকে বল।”

“বলব। মাসিকে আগে বলি। আমি বলব, তুই আমার পোঁ ধরবি।”

বেলা বলল, “বল মাসিকে।”

শানু বলল, “তারপর রিপোর্টগুলো নিয়ে কলকাতার তিনজন টপ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তারাই বলবে—কী হয়েছে। শেষে ভেবেচিন্তে একটা উপায় বার করতে হবে।”

বেলা বলল, “তুই সুবোধ মামাকে পাত্তা দিচ্ছিস না?”

“কে বলল দিচ্ছি না! সুবোধ মেসোই টপ ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলবে।”

“যা খুশি কর তুই।”

“আমি মাসিকে ম্যানেজ করব তুই মেসোকে কর।”

বেলা এবার হাই তুলল। হাই তোলার সময় হাত ছড়িয়ে গা ভাঙল।

“তোকে ফ্রাংকলি বলছি বেলি আমার কিন্তু মনে হয়—মেসোর র‍্যাশান কাট করলেই ভদ্রলোক ঠিক হয়ে যাবেন।”

বেলা এ ব্যাপারে আপত্তি করল না। মামি যে মামাকে বেশি খাওয়ায়—এটা সে বরাবরই দেখে আসছে। আগে অত বুঝত না, এখন বোঝে।

“বডি তো বেলুন নয় যে যত্ত খুশি ফুলিয়ে যাও। বেলুনও ফটাস হয়ে যায়,” শানু বলল, “মাসি সকাল থেকে যা শুরু করে। চার বেলা ওই রকম পেটে পড়লে তুই আমি মরে যেতাম! ডিম, ছানা, হরি মোদকের রসগোল্লা, সন্দেশ, তিন চার পিস করে একশো গ্রাম ওজনের মাছের পিস, দুধ, দই, ফল, রাত্রে লুচি ফাউল—হোয়াট নট? খাবার একটা বয়েস থাকে মানুষের। চল্লিশের পর ডায়েটিং-এ চলে যেতে হয়। সেদিন একটা কাগজে পড়ছিলাম চল্লিশের পর সারা দিনে দু টুকরো রুটি, চার চামচে মধু, এক লিটার দুধ, দু পিস মাংস, বা একটা ডিম আর সাফিসিয়ান্ট ওয়াটার খেলে মানুষের আয়ু আশি পর্যন্ত রিচ করতে পারে।”

বেলা বলল, “কিছু না খেলে একশো। ”

শানু বেলাকে দেখল। “ইয়ার্কি মারছিস।—বেলি, কিছু শিখলি না। জীবনে তোর অনেক দুঃখ। শুধু সাজতে, গান গাইতে আর কলেজে গিয়ে আড্ডা মারতে শিখলে কিছু হয় না।”

“তুই কী শিখলি? শেখার মতন তো দেখলাম, কতকগুলো চ্যাংড়া বন্ধুর সঙ্গে নীচের হলে টেবিল টেনিস খেলছিস, না হয় পপ গান শুনছিস। আর বাইরে গিয়ে সিনেমা, খেলার মাঠ, কফি হাউস করে বেড়াচ্ছিস। সিগারেট ফুঁকছিস বিশ পঁচিশটা করে পড়াশোনায় তোরও যা মাথা—!”

শানু একটু হাসল। বলল, “তুই আগাপাশতলা মুখ্যু। তোকে বললেও বুঝবি না ওরে বেলি, আমার ধর্মবাবা—মানে তোর মামা—আমলা, চালমুগরা, শাঁখ চন্দনের ভেজাল প্রোডাক্ট আর ওই বাংলা সাবান, যা রেখে যাবে তাতে আমার দু দুটো লাইফ কেটে যাবে। হোয়াই শুড আই বদার ফর এ থার্ড ক্লাস এম এস সি ডিগ্রি!—আমার চোখ-মুখ দেখ। গৌতম বুদ্ধ। বডি দেখ, চাবুক।—তোর নিজের চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে নে।”

বেলা উঠে দাঁড়াল। বলল, “আমার সঙ্গে তুলনা করতে যাস না। আমি ফিন ফিন করছি। তোর মতন ভোঁদামাকা নয়।”

শানু বলল হাততালি দিয়ে, “ওরে আমার ফিনফিনে ফিঙে। দেখিস ফিন ফিন করতে গিয়ে ফিনিশ না হয়ে যাস।”

বেলা তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। “নিজের চরকায় তেল দে।”

শানু হেসে বলল, “দিয়ে যাচ্ছি, ভাবিস না।— কিন্তু একটা কথা তুই জেনে রাখবি; বেলি। যে গাছে বসে আছিস তার ডাল কাটলে পড়ে মরবি।”

বেলা চোখ পাকিয়ে বলল, “আমি তোর গাছে বসে আছি?”

“এখন পর্যন্ত নয়। তোর মামামামির গাছের ডালে বসে আছিস।”

“তা হলে শাসাচ্ছিস কাকে!”

শানু চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। কাঁধ নাচিয়ে বলল, “এখন যে ডালে বসে বসে দানা খাচ্ছিস তাদের বিপদে তোর কোনো চেতনা নেই।” বলেই নিজের লাগসই ভাষা সংশোধন করে নিল, “আসন্ন বিপদে ক্রাইসিস।”

বেলা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বলল, “আমি ডাক্তার?”

“কে বলেছে! কিন্তু তুই যেভাবে পাল তুলে চলে যাচ্ছিস মনে হচ্ছে—তোর কোনো দুর্ভাবনা নেই।”

বেলা যেন এবার একটু সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল। কপালের চুল সরিয়ে শানুকে দেখতে দেখতে বলল, “আমি কী করব?”

“ভাব। একটা উপায় ভাব।”

“আমার মাথায় আসে না।”

“তা হলেও ভাব। আমিও ভাবছি। মেসোকে এভাবে আপসেট হতে দেওয়া যায় না। মানুষটা ভয়েই আধমরা হয়ে গেছে। আর মাসির অবস্থা দেখলি, এক বেলাতেই তিরিক্ষে। এভাবে দশটা দিন চললে এ বাড়িতে আর তিষ্ঠোতে হবে না।”

বেলারও মনে হল, মামিকে সামলাতে না পারলে বাড়িতে একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে। মামির যা মেজাজ আর মুখ।

বেলা বলল, “বেশ ভাবছি আমি। তুইও ভাব।”

“ও কে।—লেট মি থিংক!”

বেলা তার নিজের ঘরে চলে গেল।

তিন
সুবোধ ডাক্তার যথাদিনে যথাসময়ে এসে হাজির। রবাির সন্ধেবেলায়।

পরনে মিহি দিশি ধুতি, গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে বাহারি ছড়ি, মুখে সিগারেট। দোতলায় উঠতে উঠতে সুবোধ ডাক্তার হাঁক পাড়লেন, “কই হে গুরুপদ শুয়ে আছ নাকি?”

এ- বাড়িতে সুবোধের অবারিত দ্বার। তবু তিনি আসার সময় ষষ্ঠীচরণ ডাক্তারবাবুকে দেখতে পেয়েছিল। আসুন আসুন করে ডেকে এনে দোতলার একপাশে বসার ঘরে বসাল।

বাতি জ্বলছিল ঘরের, পাখাটা চালিয়ে দিল। দিয়ে বাড়ির কর্তাকে খবর দিতে ছুটল।

সুবোধ ডাক্তার বসতে না বসতেই শশিতারা ঘরে এলেন। সদ্য গা ধুয়ে মাড় করকরে সাদা খোলের শাড়ি পরনে। মুখে পান। এসেই বললেন, “তুমি ডাক্তার, না, থানার দারোগা?” বলে সুবোধের সাজগোজ লক্ষ করতে লাগলেন।

সুবোধ হেসে বললেন, “দেখে কি দারোগা মনে হচ্ছে?”

মাথা নেড়ে শশিতারা জবাব দিলেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে বুড়ো কার্তিক।”

হো হো করে হেসে উঠলেন সুবোধ। মাথার চুল দেখিয়ে বললেন, “এখনো চুল পাকেনি, দাঁত পড়েনি। বুড়ো বোলো না, বলল বাবু কার্তিক।”

শশিতারা ঠোঁট ওলটালেন। “বাবুই বটে। গিয়েছিলে কোথায়? সাজগোজের অত ঘটা!”

সুবোধ বললেন, “ঘটার কী দেখলে! রবিবার সন্ধেবেলায় আমি পুরো বাঙালিবাবু। তুমি যেন নতুন দেখছ।”

“না, তা দেখছি না। তবু আজ একেবারে—”

“ও! চোখে পড়েছে তবে! —তবে বলি, ফিরতি পথে একটা বিয়েবাড়ি হয়ে নিজের ডেরায় ফিরব। দেখা করে যাব। —তা উনি কোথায়, তোমার কর্তা?”

“আসছে।” শশিতারা এবার সরে গিয়ে একটা সোফায় বসলেন। “তুমি যে আমার কথার জবাব দিলে না? আমি জানতে চাইছিলাম—তুমি ডাক্তার না দারোগা? ওই ভিতু মানুষটাকে আধমরা করে ছেড়ে দিয়েছ!”

সুবোধ হেসে বললেন, “তুমি যে মানুষটাকে পুরো মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছ! কী করেছ গুরুপদকে—তুমি নিজেই জানো না! তোমার নামে মামলা ঠুকে দেওয়া উচিত।”

শশিতারা হাতের ঝটকা মেরে বললেন, “বাজে বকো না! মামলা আমি তোমার নামে ঠুকব। ডাক্তার হয়ে একটা মানুষকে অকারণ ঘাবড়ে দিয়ে ভয় পাইয়ে মারার চেষ্টা করছ।”

এমন সময় গুরুপদ ঘরে এলেন। তেল ফুরিয়ে যাওয়া বাস-মিনিবাসের মতন গড়িয়ে গড়িয়ে।

সুবোধ বললেন, “এসো।” বলে গুরুপদকে দেখতে লাগলেন।

গুরুপদ সোফার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। স্নানটা সেরে এলাম। বড্ড গরম।”

সুবোধ বললেন, “আছ কেমন?”

সোফায় বসলেন গুরুপদ। বললেন, “আর থাকা! পরশু সারা রাত ঘুম হল না। কাল আর বাড়ির বাইরে বেরোইনি। আজ রবিবার। বসে বসেই কাটছে। বড্ড দুর্বল লাগছে হে। মাথায় থেকে থেকে চরকি মারছে।”

সুবোধ এবার শশিতারার দিকে তাকালেন। “ওকে উপোস করাচ্ছ নাকি?”

“আমি কি করাচ্ছি! নিজেই করছে!”

“কিছুই খাচ্ছে না?”

“ওই একটু শরবত, ফল, মিষ্টি।”

“ভাতটাত খাচ্ছে না? মাছ মাংস, লুচি?”

“কই আর! মুখে তুলছে। খাবে কেমন করে, তুমি ওকে সমন ধরিয়ে দিয়েছ।—মুখে উঠছে না—তবু মুখ কামাই নেই। আমায় দুষছে। “

সুবোধ হেসে বললেন, “পেয়াদার কাজ পেয়াদা করেছে, আমি তো আর কোর্ট নই।—যাক গে, কাজের কথা বলি তুমিও শুনে রাখো, শশি!” বলে সুবোধ পকেটে হাত দিয়ে একটা খাম বার করলেন। তার মধ্যে গুরুপদর রিপোর্টের কাগজগুলো ছিল। খামটা সেন্টার টেবিলের ওপর ফেলে দিলেন সুবোধ। বললেন, “সেদিন তোমায় যা বলেছিলাম আজও বলছি। তোমার অনেক আগে থেকেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। শরীরটাকে বাইরে ফুলিয়েছ, ভেতরে সবই গোলমাল। এখন থেকে যদি স্ট্রিকলি সাবধান না হও—বিপদে পড়বে।”

শশিতারা বললেন, “হয়েছে কী?”

সুবোধ বললেন, “কোনটা হয়নি! ব্লাড প্রেশার, সুগার, কোলেস্টরাল— ভাবাই যায় না । হার্টও ঝিমিয়ে পড়ছে। হার্টের অপরাধটা কী! বোঝা বইতে পারছে না। তাকে ফাংশান করার পথ খোলা রেখেছ?”

গুরুপদ বললেন, “যা হবার হয়েছে—এখন কী করতে হবে বলো?”

সুবোধ এবার পাঞ্জাবির অন্য পকেট থেকে দুটো কাগজ বার করলেন বললেন, “যা করতে হবে আমি লিখে দিয়েছি। ওষুধপত্র যা খাবে তার জন্যে একটা কাগজ। অন্যটা হল তোমার খাওয়াদাওয়ার চার্ট। যেমনটি আছে তেমনটি ফলো করবে। আপাতত পনেরো দিন তারপর একমাস। আমি দেখব, অবস্থাটা কী দাঁড়ায়। পরের ব্যবস্থা পরে। তোমরা যদি আমার ওপর খবরদারি করো, আমি কিন্তু কোনো দায়িত্ব নেব না। অন্য ডাক্তারের কাছে যাবে। অ্যাজ ইউ লাইক।”

গুরুপদ একবার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন, তারপর বন্ধুর। বললেন, “তুমি রাগ করছ কেন? আমি ভাই, তোমার অ্যাডভাইস মতন চলতে চাই। যা যা বলে দেবে করব।” বলে স্ত্রীকে দেখালেন, “খোদকারি যা করার উনি করেন, ওঁকে বলো।—বাট আই সে, আর খোদকারি সহ্য করব না।”

সুবোধ শশিতারার দিকে তাকালেন।

শশিতারা বললেন, “বা! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর।”

সুবোধ বললেন, “শশি, তুমি গুরুপদর বউ হতে পার, ডাক্তার নও। তোমার সব ব্যাপারে নাক গলানো উচিত নয়। আমার কথা মতন না চললে আমি কিন্তু এই পেশেন্ট আর দেখব না!”

গুরুপদ বলেন, “না না, এ তুমি কী বলছ! আমি ভাই, তোমাকে বিশ্বাস করি। হাই হাই ডাক্তার কলকাতায় অনেক আছে। তাতে আমার কী! তুমি আমার ধাত জানো, তোমার দেওয়া ওষুধ খেলাম এতদিন। বাঁচি তোমার হাতেই বাঁচব, মরি তোমার হাতেই মরব।”

মাথা নাড়লেন সুবোধ। না, আমার হাতে মরতে হবে না।”

শশিতারা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। স্বামীর দিকে তাকাচ্ছিলেন একবার, অন্যবার সুবোধকে দেখছিলেন। স্বামী কেমন ঝট করে বন্ধুর দিকে হেলে গেলেন। গোটা দোষটাই যেন শশিতারার। রেগে গেলেন শশিতারা। বললেন, “তোমরা যা বলছ তাতে মনে হচ্ছে আমিই স্যান্ডেলবাবুকে মারছি।”

সুবোধ ঠাট্টা করে বললেন, “নিজেও মরছ।”

“আমি মরছি?”

কথাটা মাঝখানে থেমে গেল। চা এসেছে। মানিক আর ফেলু—ট্রের ওপর চায়ের কাপ সাজিয়ে, জলের গ্লাস মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে এল। এসে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল।

শশিতারা বললেন, “ঠিক আছে। তোরা যা।”

মানিক আর ফেলু চলে গেল। ফেলু একেবারে বছর তেরো-চোদ্দোর বাচ্চা। শানু তার নাম দিয়েছে ‘গুলতি।‘

শশিতারা বললেন, “যা বলছিলাম। আমি মরছি—কে বলল?”।

সুবোধ মিষ্টির প্লেট দেখতে দেখতে বললেন, “তোমাদের মোদকের সন্দেশ। সাইজটা ভালই করে। আমাদের ওখানে এর অর্ধেক—।—তা গুরুপদ এই সন্দেশ তোমার বউ তোমায় কটা করে গেলায় রোজ?”

গুরুপদ বললেন, “চার ছটা।”

“বাঃ বাঃ! আর ওই কালোজাম—?”

“কালোজাম আমি খাই না, ছেলেমেয়েরা খায়। গিন্নি খায়। আমি রসগোল্লা খাই, ছানা থাকে বলে।”

সুবোধ বললেন, “তোমার শরীরের মধ্যে চিনি এখন সাড়ে তিনশোর ওপর। তারই মধ্যে ছটা বিরাট সন্দেশ, আট দশটা রসোগোল্লা চালিয়ে যাচ্চ! আবার বলছ, তোমার চিকিৎসা করতে।— আমি তো পারব না ভাই, তোমার গিন্নিকে বলো। ডাক্তারের মেয়ে।”

শশিতারার মাথা গরম হয়ে গেল। বললেন, “না তো কি উকিলের মেয়ে! আমার বাবা চারশো সুগার নিয়ে মাছ মাংস রাবড়ি সন্দেশ-মিহিদানা সব খেত আর গায়ে প্যাঁক করে ইনসুলিন ফুঁড়ত।” বলে শশিতারা ইনজেকশান নেবার ভঙ্গিটা দেখালেন।

সুবোধ চায়ের কাপ উঠিয়ে নিলেন। “তা হলে তো হয়েই গেল, গুরুপদ। তুমি যেমন চালাচ্ছ চালিয়ে যাও—তোমার গিন্নি রোজ প্যাঁক করে ছুঁড়ে দেবে। এ ফোঁড় ফোঁড়।”

আতকে উঠে গুরুপদ বললেন, “পাগল! শশির নিজেরই শরীর খারাপ। হাত পা কাঁপে, ঘাড় মাথা টনটন করে, তার ওপর বুক ধড়ফড়—”

চায়ের আরাম করে চুমুক দিয়ে সুবোধ বললেন, “ঈশ্বরের ইচ্ছেয় উনি তোমার যথার্থ সহধর্মিণী। দাঁড়িপাল্লায় রাখলে তোমরা সমান।”

“আজকালকার দিনে তাই হতে হয়, শশিতারা গম্ভীরভাবে বললেন। বলে হাতের মোট মোটা চুড়ি ঘোরাতে লাগতেন। আঁট হয়ে বসে গেলে কষ্ট হয়।

গুরুপদ সুবোধকে বললেন, “শশি যা বলছে বলুক। আমি তোমার কথা মতনই চলব। যেমন যেমন লিখে দিয়েছ তেমন তেমন করব। তুমি শুধু বলো, আমার কী হয়েছে?”

হাত বাড়িয়ে সুবোধ একটা সন্দেশ নিলেন। বললেন, ‘অত শুনে তোমার লাভ নেই। সোজা কথা যেমনটি বলেছি সেই ভাবে চলো। গায়ের চর্বি কমাও, ওজন কমাও, খাওয়াদাওয়া হিসেব মেপে করো, হার্টটাকে খানিক সামলাতে দাও। তারপর দেখা যাবে কী করা যায়!”

“আমার হার্ট কি খারাপ হয়ে গেছে?”

“যাচ্ছে।”

“তা হলে?”

“হায় হায় করে লাভ নেই। যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি—সেই রকম আর কি। এত গিন্নির কথায় চোব্য-চোষ্য খেয়েছ—এবার তার ফল ভোগ করছ।”

গুরুপদ হঠাৎ স্ত্রীর দিকে বিরক্তভাবে তাকালেন। বললেন, “আমি আর ওর কথা শুনব না।”

শশিতারা মুখ ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, “পাড়ার পঞ্চার মায়ের কথা শুনো।”

সুবোধ এবার শশিতারার দিকে তাকালেন। বললেন, “কর্তার তো হল। তোমারটাও হোক। একবার চেক আপটা করিয়ে নাও।”

“দরকার নেই”,শশিতারা মাথা নাড়লেন।

“ভাল কথা বলছি। পরে আর চারা থাকবে না।”

“না থাকুক।— তোমার মতন ডাক্তারের খপ্পরে আমি পড়ব না।”

“আমি ডাক্তার খারাপ নই। এম ডি।”

গুরুপদ হঠাৎ বললেন, “শশি তোমাকে কম্পাউন্ডার বলে সুবোধ।”

সুবোধ গলা ছেড়ে বেজায় জোরে হেসে উঠলেন। হাতের চা চলকে গেল। আর একটু হলে গলায় সন্দেশ লেগে বিষম খেতেন।

হাসি থামলে সুবোধ বললেন, “ঠিকই বলে। আমি যখন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তার আগে থেকে শশির বাবা—বলাই মেশোমশাইয়ের দাবাইখানায় মিক্সচার, মলম তৈরি করতাম। মেশোমশাই বলতেন, ওহে সুবোধ, ওটাকে সুই মেরে দাও। দিতাম। “

শশিতারা বললেন, “তাতেও কিছু হল না।”

চোখে মজার হাসি নিয়ে সুবোধ বললেন, “কই হল! মালাটা গুরুপদর গলায় পড়ে গেল। অবশ্য ভালই হল।” বলতে বলতে হেসে উঠলেন।

গুরুপদও হেসে ফেললেন।

শশিতারাও না হেসে পারলেন না। বললেন, “রঙ্গটাই শিখেছ!”

চা খেয়ে সুবোধ উঠে পড়ছিলেন। “আমি চলি। একটা নেমন্তন্ন বাড়িতে একবার মুখ দেখিয়ে যেতে হবে।”

শশিতারা ধমকের গলায় বললেন, “চলি মানে! মিষ্টিগুলো কে খাবে?”

“গুরুপদকে খাওয়াও। নিজে খাও। আমি মিষ্টিটিষ্টি বড় একটা খাই না তোমরা জান! ঘি নয়, মাখন নয়।— তুমি গুরুপদর লেজ কেটো—আমাকে কাটবার চেষ্টা কোরো না।— চলি, গুরুপদ মন খারাপ কোরো না, তাঁর ইচ্ছেয় সব হয়।— পনেরো দিন পরে আমার কাছে যাবে। বুঝলে?”

সুবোধ দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “সে দুটো কোথায়? গলা পেলাম না?”

শশিতারাও উঠে পড়েছিলেন। বললেন, “চরতে বেরিয়েছে। চরা ছাড়া তাঁদের আর কাজ কী!”

চার
দিন পনেরো পরে রাত্রে খেতে বসে শানু বলল, “মাসি একজন ভাল ডাক্তারের খোঁজ পেয়েছি।” বলে আড়চোখে বেলাকে দেখে নিল।

শশিতারা গম্ভীর হয়ে বললেন, “ডাক্তার আমার কী করবে?”

“মেসোর কথা বলছিলাম…।”

“যার কথা তাকে জিজ্ঞেস করো।” বলে শশিতারা গজগজ করতে লাগলেন। “আমি কে? আমড়া গাছতলায় নেতা হয়ে বসে আছি। কে শুনবে আমার কথা। চব্বিশ ঘণ্টা ঘড়ি মিলিয়ে সুবোধ ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছে আর আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার নাকি বলেছে, আরও পনেরো দিন চালিয়ে যাও—তারপর কথা। হাঁড়িতে চাল নেই জল ফুটছে—সেই রকম অবস্থা এখন। খাবার কথা বললে দুর্বাশা মুনি হয়ে যায়। এটা বারণ ওটা বারণ, ভাত দু চামচে, রুটি দেড়খানা, এক হাতা চারাপোনার ঝোল, এক টুকরো মাছ, উনি আবার চিকেন বলতে আধ পো ওজনের ছানা বোঝেন, তার স্টু, এক পিস মাংস। মুড়ি দু মুঠো, দু কুচি শশা। মিষ্টি-মাস্টা একেবারে নয়। তেল না, ঘি নয়।—এইভাবেই যদি থাকতে হয় বনে গিয়ে তপস্যা করলেই পারে। সংসার করা কেন।”

বেলা একবার শানুকে দেখে নিল। তার কাজ পোঁ ধরার ; শানুদার সঙ্গে সেই রকম কথা। বেলা বলল, “মামাকে আজকাল যা শুকনো দেখায়।”

“দেখাবে না।” শশিতারা বললেন, “মদ্দ মানুষ একজন। কাজকর্ম আছে, কারখানা আছে। হোক না গাড়ি। তবু পাঁচ জায়গায় ছোটাছুটি রয়েছে। ধকল কি কম শরীরের ওপর। অথচ খাবার কথা বললে তেড়ে আসে। বলে, সুবোধ ডাক্তারের পারমিশান করিয়ে আনো। নিকুচি করেছে তোর সুবোধ ডাক্তারের। অমন ঢের ডাক্তার আমি টেকে গুজতে পারি। ওরা হল অনাহারী ডাক্তার ; না খাইয়ে খাইয়ে রুগিকে হাড় জিরজিরে করে দেয়। তারপর ফক্কা। ” বলে দু হাত ওপরে তুলে তালি দিয়ে ফক্কা বোঝালেন। “ছিল বেশ। সুখে থাকলে ভূতে কিলোল।— আমি কিছু বলব না। বললে তেরিয়া হয়ে যেন মারতে আসে।”

শানু বলল, “মেসোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মাসি, তুমি শুধু রাগ করে বসে থাকলে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাবে।”

“যাক।”

“আহা—তুমি বুঝছ না, দেহ বলে কথা। দেহ ঠিকমতো ধরে রাখতে না পারলে—বিলীন হয়ে যায়।”

“কী হয়?”

“বিলীন—” শানু মাথার ওপর হাত ঘোরাল ; ঘুরিয়ে ফাঁকা বাতাস বোঝাল।

শশিতারা শানুকে দেখতে লাগলেন।

বেলা সরল গলা করে বলল, “একজন দেখলে আর একজন ডাক্তারকে দেখানো ঠিক নয়। খারাপ লাগে দেখতে। কিন্তু একবার পরামর্শ নিলে কিসের ক্ষতি।”

সঙ্গে সঙ্গে শানু বলল, “অ্যালোপ্যাথির সঙ্গে কত লোক হোমিওপ্যাথি খায়। হোমিওপ্যাথির সঙ্গে কবিরাজি। সুবোধ মেশোর ওষুধবিসুধ যেমন চলছে চলুক না। তার সঙ্গে যদি ধরো ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট চলে, আটকাচ্ছে কোথায়!” বলে শানু মুরগির ঠ্যাং তুলে নিয়ে মুখে পুরল। বেলাকে ইশারা করে দিল চোখ টিপে।

শশিতারা অবাক হয়ে শানুকে দেখতে লাগলেন। কর্তাকে শশিতারা হপ্তায় অন্তত তিনটে দিন মুরগির ঠ্যাং খাওয়াতেন। এখন আর ভদ্রলোক ঠ্যাং খান না। ছোট একটা টুকরো মুখে দেন ; তাও প্যানপ্যানে স্টুয়ের মাংস। মুরগির পনেরো আনা ছেলেমেয়েদের পেটে যায়। শশিতারার এখানে খানিকটা রাগ আছে।

শানুর কথায় রাগ-টাগ ভুলে শশিতারা অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। “কী ট্রিটমেন্ট?”।

“ম্যাগনেট?” — হাড় চিবোতে চিবোতে শানু বলল।

“সেটা কী?”

বেলা তৈরি ছিল। বলল, “ম্যাগনেট থেরাপি। চুম্বক চিকিৎসা।”

শশিতারা মাথায় হাত দিলেন। গরমের দাপটে চুলের খোঁপা আর ঘাড়ে থাকে না, ক্রমশই মাথায় উঠে যাচ্ছে। বললেন, “সে আবার কী। চুম্বক চিকিৎসা। জীবনে শুনিনি।”

শানু বলল, “আমরাও কি আগে শুনেছি! সেদিন বেলি ইংরেজি কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিল। ফক্কুড়ি করছিল। আমায় দেখাল। আমিও দেখলাম। দেখে ওকে বললাম—” শানু বেলাকে দেখাল, “হাসিস না। ভেরি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আজকাল কত রকম নতুন নতুন চিকিৎসা বেরুচ্ছে, মান্ধাতা আমলের ট্রিটমেন্ট বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগ। তুই সাইন্স জানিস না, তাই হাসছিস।”

বেলা কিছু বলল না। গম্ভীর হয়ে থাকল। ভেতরে ভেতরে ভয় করছিল। শানুদা এক করতে আরেক না করে ফেলে।

শশিতারা বললেন, “লেকচার থাক। জিনিসটা কী বল?”

শানু বলল, “তোমাকে কাগজ দেখাব?”

“কাগজ? কিসের কাগজ?”

“ডাক্তার পাকড়াশির কাগজপত্র! প্যাম্ফলেট। লিফলেট।— আমি কাগজের বিজ্ঞাপন পড়ে একদিন ডাক্তার পাকড়াশির কাছে চলে গেলাম। ধর্মতলা স্ট্রিটে, তালতলার মুখেই। দোতলায় পাকড়াশির অফিস চেম্বার। দশ বারো জন রোগী বসে আছে। বুড়ো বুড়ো, মাঝবয়েসি, কমবয়েসি। মাড়োয়ারি, বাঙালি।—আমাকে ওদের অফিস থেকে ছাপানো কাগজপত্র দিল। বলল, কাগজে সব লেখা আছে।”

“এনেছিস কাগজগুলো?”

“এনেছি। মন দিয়ে পড়েছি। বেলিকেও পড়িয়েছি।”

শশিতারা গলার তিন ভরি হারের তলায় আঙুল দিয়ে একবার গলার পাশটা চুলকে নিলেন। “কী দেখলি?”

“দেখলাম প্রায় সব রকম রোগই ম্যাগনেট ট্রিটমেন্টে সারানো যায়। কি বল, বেলি?”

বেলা ঘাড় হেলিয়ে বলল, বাত, ব্লাড প্রেশার, মাথা ধরা, মাইগ্রেন, স্পনডিলাইটিস, আরও কত কী!”।

শশিতারা কেমন সন্দেহের গলায় বললেন, “সত্যি? না মাদুলির মতন?” মাদুলির ওপর শশিতারা হাড়ে হাড়ে চটা। এক সময়, যখন বয়স ছিল, পেটে একটা বাচ্চা আসার জন্যে হরেক রকম মাদুলি পরেছেন। দুটো হাত আর গলা মাদুলিতে ছেয়ে গিয়েছিল। পাথরও পরেছেন অনেক রকম। কিস্য হয়নি। এখন আর বাড়িতে মাদুলি ঢুকতে দেন না। তবে পাথর আসে। শশিতারা নিজে এখন একটা সাত রতি মুক্তোর আংটি ছাড়া কিছু পরেন না। স্বামীর হাতে চারটে আংটি। পলা, গোমেদ, পান্না আর মুক্তো। পুরুষ মানুষ, কাজকর্ম, কারখানা, নানান অশান্তি—পাথর ছাড়া চলে কেমন করে!

শানু খেতে খেতে বলল, “ওদের কাগজপত্র পড়ে আমার মনে হল, ব্যাপারটা পুরোপুরি ফেলনা নয়। ম্যাগনেটের ব্যাপারটাই রহস্যময়, মাসি। কেন আছে, কেমন করে আছে, এর রহস্য কেউ ধরতে পারল না। ঠিক কিনা বল, বেলি?”।

বেলা বিজ্ঞান পড়ে না। কিন্তু শানুর কাছে শুনে রেখেছে। মাথা নেড়ে বলল, “মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতন।”

“একজ্যাক্টলি। ইট ইজ দেয়ার বাট হাউ? ইট ইজ এ মিষ্ট্রি।— জানো মাসি, সেদিন টিভি-তে একটা প্রোগ্রাম দেখাচ্ছিল। বিদেশে এখন রোগ ধরার জন্যে ম্যাগনেটিক ডিটেকটার ব্যবহার করছে। দারুণ দেখাচ্ছিল।”।

শশিতারা বললেন, “অত শুনে আমার দরকার নেই। কী করে চুম্বক নিয়ে তাই বল।”

“কিচ্ছু না। রোগ বুঝে ওজন মতন ম্যাগনেট পিস বডিতে বেঁধে দেয়। নর্থ পোল, সাউথ পোল। ব্যাস ওতেই—। আসলে ট্রিটমেন্টের ব্যাপার তো লিখে দেবে না; এটা তো ডাক্তারদের ব্যাপার!”

“এ রকম চিকিৎসা আর কোথায় হয়?”

“বম্বে ; দিল্লি। —বিদেশে অনেক জায়গায়।”

শশিতারা এবার উঠবেন। ছেলেমেয়েদের খাওয়াও শেষ হয়েছে। বললেন, “বেশ, তোরা বল ওঁকে। আমি বলব না।”

শানু বলল, “বাঃ! তুমি না বললে—”

বেলা বলল, “মামি, আমরা বললে মামা কানেই তুলবে না। তোমারই বলা ভাল। তারপর যা করার শানুদা করবে।”

মাথা নাড়লেন শশিতারা। “আমি কিছু বললেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে। ভাবে, আমি তোর মামার সর্বনাশ করার জন্যে মন্ত্র দিচ্ছি! ওই সুবোধ ডাক্তার যে কী বুঝিয়ে দিয়ে গেল। তোমার মামা-মেশোর ধারণা হল, আমার জন্যেই ওর শরীরের এই অবস্থা! এখন আমি শত্রু।”

বেলা বলল, “আমরা সবাই বলব। তুমি, শানুদা, আমি।”

শশিতারা উঠে পড়লেন। বললেন, “ঠিক আছে, বলে দেখো। এই মানুষ আমায় সারা জীবন জ্বালাচ্ছে, আরও জ্বালাবে। যেমন কপাল আমার।”

শানু আর বেলা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে মুখ টিপে হাসল।

খাওয়ার দাওয়ার পর ঘরে ফিরে এসে শানু বলল, “বেলি কাল তুই তোর মামাকে ক্যাচ কর। তোকে অত ভালবাসে, না করতে পারবে না। জোঁকের মতন লেগে থাকবি—আদিখ্যেতা করবি, কাঁদবি—”

বেলা বলল, “তুই গিয়ে লাগ না!”

“আমার দ্বারা হবে না। তুই মেয়ে। মামার ভাগ্নি। তুই পারবি। তোকে ভদ্রলোক জেনুইন ভালবাসে।— তা ছাড়া কেসটা তোর—তোকে লেগে থাকতে হবে।

বেলা তার সরু বুড়ো আঙুলটা দেখাল! পরে বলল, “তোর কি চোখ নেই! তুই দেখছিস মামিই এখন পাত্তা পাচ্ছে না। মামার কাছে তো আমি—!”

শানু বনেদি চালে একটা সেঁকুর তুলল। তুলে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে খুঁজতে বলল, “কিসের একটা কথা আছে না রে টুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান— আমি দেখছি মানুষের কারবার গল্পকেও হার মানায়।” বলতে বলতে শানু সিগারেট ধরিয়ে বড় করে ঢোঁক গিলল। “যে মাসি মেসোকে মুঠোয় পুরে রেখেছিল সেই মেসোই এখন মাসিকে হাঁকিয়ে দিচ্ছে! ভাবা যায়।—তুইও কম যাস না!”

শানুর কথাটা বোধ হয় মিথ্যে নয়। অন্তত গুরুপদ আর শশিতারাকে দেখে তেমন মনে হতে পারে। যে গুরুপদ একমাত্র ব্যবসা ছাড়া উঠতে বসতে খেতে শুতে স্ত্রীর কথায় চলতেন ফিরতেন—এত বছর চলেছেন—হঠাৎ তিনিই এখন স্ত্রীর ওপর বেজার। মাঝে মাঝে রাগে ফুসেও উঠছেন। গুরুপদর যেন এতকাল পরে চৈতন্যোদয় হল। দেখলেন, শশিতারার আদর আতিশয্য ধমক হুকুম মেনে চলে চলে তাঁর অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছে। গুরুপদর এই ভয়াবহ শারীরিক অবস্থার জন্যে শশিতারাই যেন দায়ী। খাও খাও করেই তাঁর জীবনটা শেষ করে দিলেন শশিতারা। আর নয়। গুরুপদ এখন স্ত্রীর কথা কানেই তুলছেন না, উলটে নিজেই ধমক মারছেন।

বেলা বলল, “তুই ভাবছিস কেন! মামিই রাজি করিয়ে দেবে।”

“দিলে ভাল। না দিলে ওয়ে আউট বার করতে হবে।” বলে শানু গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সিগারেটে টান মারতে মারতে বলল, “বেলি, তুই শুধু মাসির ভরসায় বসে থাকলে পারবি না। নিজে একটু লেগে পড়। ইনসিয়েটিভ নে।”

“মানে?”

“মেসো সিরিয়াসলি ভয় পেয়ে গেছে। ভয় পেয়েছে বলেই মাসির ওপর খাপ্পা হয়ে গেছে। মাসি এখন বিরোধী পক্ষ। তুই তোর মামার পক্ষ নে।”

“রেখে দে।—মামিকে তুই চিনিস না। কদিন সবুর কর—দেখবি।”

“দেখব।— তুই কাল তোর মামাকে মিট করছিস? ছাদে মিট করবি। তোর মামা যখন ফুলের টবে জল দেয় তখন। মনটা সেসময় নরম থাকবে।”

বেলা চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, “সে আমি করব। কিন্তু তারপর?”

“কিসের তারপর?”

“যদি মামা রাজি হয়ে যায়?”

“ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট হবে।”

বেলা নজর করে শানুকে দেখতে লাগল। বলল, “হলে তো মরব।”

শানু অবাক হাঁ করে বেলাকে দেখতে লাগল! বলল, “তুই বকছিস কী! ম্যাগনেটে কেউ মরে! তোকে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। ফাঁসি হতে পারে, মরবি না।”

“আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”

শানু বিছানা থেকে উঠে পড়ল। বলল, “বেলি, তুই ডোবাবি। তোকে এত করে বোঝালাম তিন পা এগিয়ে এক পা পিছিয়ে এসে লাভ হবে না। তোকে এগুতে হবে।”

বেলা বলল, “মামা যদি জিজ্ঞেস করে, ম্যাগনেটে রোগ সারে কেমন করে?”

“বলবি, সারে নিশ্চয়। ম্যাগনেটের একটা এফেক্ট আছে। ডাক্তার ওসব বুঝবে—তুই আমি কী বুঝব! আমরা পেনিসিলিন পর্যন্ত জানি। ম্যাগনেট আরও অ্যাডভান্স। পঞ্চাশ বছর পরে দেখবি—এম ডি উঠে যাবে, তার বদলে ডাক্তাররা হবে ডক্টর অফ ম্যাগনেটিক থেরাপি।”

বেলা হাই তুলতে তুলতে বলল, “ততদিন আমি বেঁচে থাকব না।”

“বলিস কী! তুই সত্তরের আগে মরবি? একেবারেই নয়। তুই ঝুনো বুড়ি হবি, তোর দাঁত পড়বে, মাথার চুল সাদা হয়ে যাবে, লাঠি নিয়ে নিয়ে হাঁটবি, চোখে দেখতে পাবি না, শুকনো আমসি হয়ে মরবি।”

“আর তুই মরবি?”

“আমি।—আমি বোধ হয় ছেঁড়া জুতোর সোল হয়ে।”

বেলা বলল, “না, তুই মরবি পিপড়ে ধরা বাতাসা হয়ে।” বলতে বলতে বেলা হেসে উঠল।

শানুও হেসে ফেলল।

হাই তুলতে তুলতে বেলা উঠে পড়ল এবার। তার ঘুম পাচ্ছে।

চলে যাচ্ছিল বেলা, শানু বলল, “কাল সকালে লেগে পড়বি।”

পরের দিন বেলা দশটা নাগাদ শানুর ডাক পড়ল তেতলায়।

গুরুপদ চেয়ারে বসে আছেন। শশিতারা হাত কয়েক দূরে দাঁড়িয়ে।

শানু মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।

গুরুপদ শানুকে দেখতে দেখতে বললেন, “ডাক্তারের নাম?”

“পাকড়াশি।”

“পুরো নাম?”

“এম পাকড়াশি।”

“ছোকরা?”

“দেখিনি। কাগজপত্র নিয়ে চলে এসেছি।—ছোকরা নয় বোধহয়। অতগুলো ডিগ্রি ডিপ্লোমা।”

“ট্রিটমেন্টটা কী রকম?”

শানুর মনে হল, মেসোর গলা একটু নরম। বলল, “আমি প্যাম্ফলেট পড়ে যা দেখলাম, ম্যাগনেটের টুকরো বেঁধে দেয় শরীরে। অন্য কিছুও থাকতে পারে জানি না।”

“কত বড় টুকরো?”

“অসুখ আর অবস্থা বুঝে।”

“আর কিছু নয়?”

“আবার কী?”

“খাওয়া দাওয়া ওষুধ?”

“জানি না। বোধহয় তেমন কোনো রেস্ট্রিকশন নেই।”

“ফোন নম্বর আছে ডাক্তারের?”

“আছে।”

“একটা কল দিয়ে দাও। বাড়িতে এসে দেখে যাক।”

শানু একবার শশিতারার দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে চলে গেল।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শানু লাফ মেরে মেরে নামছিল।

পাঁচ
এম পাকড়াশির পুরো নাম মহাদেব পাকড়াশি। দেখতে যাত্রাদলের মহাদেবের মতন। তফাতের মধ্যে যাত্রাদলের মহাদেব বাঘছালের বদলে গেরুয়া রঙে ছোপ ছোপ ছাপানো খাটো কাপড় পরে, লুঙির মতন করে, মহাদেশ পাকড়াশি পরেন গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট। নয়তো ভুড়ি থেকে প্যান্ট নেমে যায়।

মহাদেব পাকড়াশি বাড়িতে রোগী দেখতে আসেন না। তাঁর চেম্বারে গিয়ে দেখিয়ে আসতে হয়।

গুরুপদকেও যেতে হল। সঙ্গে শানু।

শশিতারা বায়না ধরলেন, তিনিও যাবেন। শানু ছেলেমানুষ। সব কথা গুছিয়ে বলতে পারবে না। ডাক্তার বলবে এক, শুনবে অন্য আর। গুরুপদ তো ভিতুর বেহদ্দ। একজন শক্ত লোক থাকা দরকার, যে সামলাতে পারবে, কথা বলতে পারবে।

কাঁটায় কাঁটায় সোয়া ছটায় গুরুপদরা হাজির হলেন মহাদেব পাকড়াশির চেম্বারে। গিয়ে দেখেন, জনা তিনেক রোগী বসে আছে। একটা চৌকো ঘরে। ঘরে বাতি জ্বলছে, পাখা চলছে। কতকগুলো পুরনো ম্যাগাজিন ফরফর করে উড়ছে। রোগীদের মধ্যে দুই জেনানা। গায়ে গতরে শশিতারাকে ছাপিয়ে যায়। তৃতীয় জন এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। অম্বুলে চেহারা।

জেনানাদের দেখে শশিতারা নিচু গলায় বললেন, “সার্কাসের হাতি”। গুরুপদ বললেন, “চুপ। শুনতে পাবে। এরা কলকাতার মাড়োয়ারি। বাংলা বোঝে।”

সাড়ে ছটায় ডাক পড়ল গুরুপদর। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল আগেই।

গুরুপদ সদলবলে ডাক্তারের ঘরে ঢুকে পড়লেন।

ঘরে ঢুকে গুরুপদ যাকে দেখলেন তাঁকে ডাক্তার বলে মনে হল না।

গুরুপদ নমস্কার করলেন। শশিতারার দেখাদেখি শানুও হাত তুলল।

“আপনারা সবাই—?”

গুরুপদ বললেন, “আমার স্ত্রী। আর আমার শালীর ছেলে। আমার সঙ্গেই এসেছে।”

“বসুন।”

গুরুপদরা বসলেন।

মহাদেব তাঁর ঝাঁকড়া মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে নিলেন। ঝুলঝাড়া লাঠির আগায় যেমন শনের আঁটি থাকে মহাদেবের মাথার চুল সেই রকম দেখাচ্ছিল। অবশ্য রঙে। ঢঙে নয়। ঢঙে যাত্রাদলের মহাদেবের মতন ফাঁপানো।

মহাদেব বললেন, “আপনি পেশেন্ট?”

“আজ্ঞে হা।”

“কী হয়েছে আপনার?”

“প্রেশার, সুগার, কোলেস্টরাল, হার্ট, পাইলস—।”

“বাবা! এ যে পঞ্চবাণ!”

“আজ্ঞে?”

“না বলছি, পঞ্চবাণে বিধে ফেলেছে যে!”

শশিতারা ফিস ফিস করে শানুকে বললেন, “কাগজগুলো দেখা। পরীক্ষার কাগজগুলো।”

শানুর কাছেই পরীক্ষার কাগজগুলো ছিল। ডাক্তারের সামনে এগিয়ে দিল।

মহাদেব কাগজগুলো দেখলেন না। না দেখে গুরুপদকেই দেখতে লাগলেন।

“কী নাম যেন আপনার?” মহাদেব বললেন।

“গুরুপদ সান্যাল।”

“থাকেন কোথায়?”

“পাইকপাড়ায়।”

“হুঁ!” এবার পাতা উলটে উলটে কাগজগুলো একবার দেখলেন মহাদেব। চোখ বোলালেন। “কত বয়েস হল?”

“তা বছর বাহান্ন!”

মহাদেব কথা বলতে বলতে পট পট করে দু চারগাছা চুল ছিড়লেন নিজের মাথার। এটা তাঁর মুদ্রাদোষ।

“ফিফটি টু। তা হলে দাঁড়াচ্ছে ছাব্বিশ। সিকি দাঁড়াচ্ছে তেরো। দশে এক হলে— দাঁড়াচ্ছে এক কেজি আর তিনে তিনশো গ্রাম মতন—”

গুরুপদ কিছুই বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন।

মহাদেব এক টুকরো কাগজে পেনসিল দিয়ে কিসের হিসেব নিকেশ সারতে সারতে বললেন, “আপনি কী ধরনের ট্রিটমেন্ট চান। শর্ট অর লং?”

গুরুপদ বোকার মতন ডাক্তারকে দেখতে দেখতে বললেন, “বুঝলাম না।”

‘বুঝিয়ে দেব। সবই বুঝিয়ে দেব”, মহাদেব বললেন। বলে টেবিলের ওপর রাখা একটা মোটা মতন ছাপানো কাগজ তুলে নিলেন। “আপনি দেখবেন, না, আমি বলে দেব?”

“আপনিই বলুন।”

“আমাদের এখানে ট্রিটমেন্টের দুটো গ্রুপ আছে। কোর্স বলতে পারেন। শর্ট অ্যান্ড লং। শর্ট হল ছ সপ্তাহ থেকে দশ সপ্তাহের মতন। লং হল—থ্রি টু সিক্স মাস। যে যা পছন্দ করে।”

শশিতারা আর শানুর দিকে তাকালেন গুরুপদ।

শশিতারা বললেন মহাদেবকেই, “উনি কাজের মানুষ। তাড়াতাড়ি যা করা যায় করতে হবে।

মহাদেব বললেন, “তা হলে দাঁড়াচ্ছে ছয় থেকে দশ।” বলে দু-পাশে ঘাড় দোলাতে লাগলেন। “ছয়ে হবে বলে মনে হয় না। অতগুলো রোগ। দশও কম হল। আরও দু এক উইক বেশি লাগতে পারে। যাক, সে পরের কথা।”

শানু এতক্ষণ চুপ করে ছিল এবার ফট করে বলল, “স্যার, শর্ট কোর্স ট্রিটমেন্টের রেজাল্ট কী রকম?”

“খারাপ নয়। ভাল।— তবে শর্টে পেশেন্টকে বেশি স্ট্রেইন নিতে হয়। চাপ বেশি থাকে।” বলে গুরুপদর দিকে তাকালেন মহাদেব। “আপনি শর্টই নিন। পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।”

শানু বলল, “ট্রিটমেন্টটা—! মানে কীভাবে—”।

“বলছি। সবই দেখাচ্ছি।” বলতে বলতে মহাদেব ঘণ্টি টিপলেন। বেয়ারা এল।

মহাদেব বললেন, “জুনিয়ারকে ডাকো। দেখো ঘর ফাঁকা হয়েছে কিনা?”

মহাদেব উঠে পড়লেন। উঠে ডানদিকে এগিয়ে গিয়ে দেওয়ালের কাছে দাঁড়ালেন। জানলার পরদার মতন পরদা ঝুলছিল একপাশে। সরসর করে পরদা সরিয়ে গুটিয়ে ফেললেন।

গুরুপদরা অবাক হয়ে দেখলেন, দেওয়ালের গায়ে একটা বোর্ড। ব্ল্যাক বোর্ডের মতন কালো কুচকুচ করছে। বোর্ডের মধ্যে দুটি মানুষের চেহারা। একপাশে পুরুষ, অন্য পাশে মেয়ে। স্বাস্থ্য বইয়ে নারী পুরুষের ছবি যেভাবে আঁকা হয় সেইভাবে। শুধু আউট লাইন। তবে সাদা খড়ি বা রঙিন পেনসিলে আঁকা নয়, চকচকে কোনো বস্তু বোর্ডের মধ্যে গেঁথে দিয়ে চেহারা দুটি করা হয়েছে।

মহাদেব বাড়তি আলো জ্বেলে দিলেন। দিয়ে আরও একটা সুইচ টিপলেন। বললেন, “নাউ লুক অ্যাট দিস ফিগার। “ বলে পুরুষ চেহারাটা দেখালেন। “আমরা যখন আপনার চিকিৎসা শুরু করব—তখন কতকগুলো পয়েন্ট বেছে নেব। যেমন—এই হল হার্ট—দেখতে পাচ্ছেন। এখানে আমরা দু পিস ম্যাগনেট প্লেস করব। নেক্সট করব, হিয়ার অ্যান্ড হিয়ার দু দিকেই—কোমরের দু পাশে— রাইট অ্যান্ড লেফট সাইডে। তারপর নামব। হাঁটুতে—বোথ সাইডস। আর একটা পিস থাকবে বিটুইন দি শোলডার ব্লেডস। •…তার মানে— আপনার শরীরে অল টোটাল লাগছে দুই আর দুই চার, প্লাস হাঁটুতে দুই—ছয়, আর ঘাড়ে এক—মানে সাত পিস।” বলতে বলতে মহাদেব টেবিলের কাছে এসে হিসেবের কাগজটা দেখলেন। বললেন, “আপনার বডি ওয়েট আর বয়েসের একটা আন্দাজ করে নিয়ে দেখছি—ইউ রিকোয়ার তেরোশো গ্রাম ম্যাগনেট পিস। ওজনটা হচ্ছে লোহার টুকরোগুলোর। ম্যাগনেট স্ট্রেংথ আলাদা। সেটা আপনারা বুঝবেন না। ওটা আমরা নিজেরা করে নিই। চার্জ দিয়ে। ইলেকট্রো ম্যাগনেট।”

এমন সময় ছিপছিপে চেহারার একটি ছেলে এসে দাঁড়াল। দেখতে বেশ। পঁচিশ ছাব্বিশ বয়েস। চোখে ধরার মতন চেহারা। শানু যেন খুঁটিয়ে ছোকরাকে দেখতে লাগল।।

মহাদেব বললেন, “আমার ভাইপো। জুনিয়ার মহাদেব। ওর নাম মুরলী। ও আমার অ্যাসিসটেন্ট। হাতে কলমে যা করার ওই করে।” বলে মহাদেব তাঁর জুনিয়ারকে বললেন, “একটু দেখিয়ে দাও। হার্ট, ওয়েস্ট, নী—আর ঘাড়।”

জুনিয়ার—মানে মুরলী সেই বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল। গিয়ে নিজের অ্যাপ্রনের পকেট থেকে দাবার গুটির মতন গোল লাল গুটি বার করল। পাতলা, ছোট সাইজের। বার করে বোর্ডের ছবির জায়গায় জায়গায় ছুইয়ে দিল। দিতেই গুটিগুলো আটকে গেল।

শানু বলল, “ম্যাগনেট?”

“হ্যাঁ।”

“বাঃ।” বলে শশিতারার দিকে ঘাড় ফেরাল। “মাসি, পুটুসকে আমরা যেই যে ব্যাঙ ঘড়ি কিনে দিয়েছিলাম, জন্মদিনের, আলমারির গায়ে আটকে রাখত—সেই রকম।”

শশিতারা বললেন, “মানুষ তো লোহার আলমারি নয়।”

মহাদেব বললেন, “আটকে রাখার ব্যবস্থা আমাদের আছে।…জুনিয়ার—এঁকে নিয়ে যাও। বুথে বসাও।” বলে গুরুপদর দিকে তাকালেন, “আপনাকে কি নিয়ে গিয়ে ম্যাগনেটগুলো বসিয়ে দেবে?”

গুরুপদ থতমত খেয়ে বললেন, “এক্ষুনি?”

“আপত্তি কী! আজই বসিয়ে দিক।— ভয় পাবার কিছু নেই। আপনি আজ থেকেই শুরু করুন। দিন সাতেক পরে একবার আসবেন। একবার ম্যাগনেটিক ওয়াশ দেব।”

জুনিয়ার গুটিগুলো তুলে নিল। নিয়ে সুইচ বন্ধ করল।

শানু বলল, “পিসগুলো ছোট ছোট হবে?”

“তা কেমন করে হয়।” মহাদেব বললেন, “তেরোশো গ্রাম টোটাল ওয়েট। এ তো চন্দনের ফোঁট্টা নয়।”

গুরুপদ স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

শশিতারা বললেন, “গিয়ে দেখো। অসুবিধা হলে বলতে পারবে। ”

শানু বলল, “জুতোর দোকানে গেলে পায়ের সঙ্গে জুতো ফিট করিয়ে নিতে হয়। সেই রকম আর কি।”

বাধ্য হয়েই গুরুপদ উঠে দাঁড়ালেন।

জুনিয়ার মানে মুরলী বলল, “আসুন।”

গুরুপদকে নিয়ে মুরলী পাশের ঘরে চলে গেল।

মহাদেব নিজের চেয়ারে বসলেন। বললেন, “একটা কাজ করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে পিসগুলো চেঞ্জ করার দরকার হয়। সে-কাজটা না হয় বাড়িতে গিয়েই করে দিয়ে আসবে জুনিয়ার। তবে বার তিনেক ম্যাগনেটিক ওয়াশ, বার দুই ট্রেমার দিতে হবে। ওটা বাড়িতে হবে না। এখানে আসতে হবে।”

শানু বলল, “ইয়ে মানে, উপকারটা কখন থেকে বোঝা যাবে?”

“হপ্তা খানেক পর থেকে একটু একটু বোঝা উচিত। সেকেণ্ড উইকের পর সিওর।”

“ছ সপ্তাহ পর থেকে—”

“ভাল ইমপ্রুভমেন্ট হবে।”

শশিতারা বললেন, “খাওয়াদাওয়া? —আজকাল কিছুই খায় না।

“ “কেন?”

“ভয়ে।”

মহাদেব হাসলেন নিজেকে দেখালেন। বললেন, “আমি সব খাই, আমার বয়েস পঞ্চাশ। হ্যাঁ, বয়েসে একটু রেস্ট্রিকশান দরকার। তার মানে একাদশী করা।—আপনি একটু দেখেশুনে খেতে দেবেন। ব্যাস আর কী!”

শশিতারা যেন খুশি হলেন।

হঠাৎ মহাদেব বললেন, “আচ্ছা, মিস্টার সান্যাল কি কখনো গড়পারের দিকে থাকতেন?”

শশিতারা অবাক। বললেন, “গড়পারেই তো থাকতেন। ওদের বাড়ি ছিল। শরিকি বাড়ি। আপনি কেমন করে জানলেন?”

মহাদেব হেসে বললেন, “ধরেছি ঠিক। আমরা একই স্কুলে পড়তাম। স্কটিশ স্কুলে।”

শশিতারা মাথার কাপড় গোছাতে গোছাতে বললেন, “ওমা! দেখছ!”

মহাদেব বললেন, “আমি ওঁর চেয়ে জুনিয়ার ছিলাম। —চেহারাটা পালটে গিয়েছে। কিন্তু মুখ দেখে কেমন মনে হল—।”

শানু বলল, “একেই বলে কোয়েনসিডেন্স!”

মহাদেব টেবিল চাপড়ে বললেন, “কিছু ভাববেন না বউদি। এই কেস আমি ভাল করে দেব।”

শশিতারার বুক থেকে ভার নেমে গেল। বলবেন, “বড় অশান্তিতে আছি। ভেবে ভেবে মানুষটা শুকিয়ে গেল। মুখে কিছু তুলতেই চায় না। আপনি যা পারেন করুন।”

খানিকটা পরে গুরুপদ এলেন। সঙ্গে জুনিয়ার, মানে মুরলী।

গুরুপদ এমনভাবে এলেন যেন মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন কোথাও। চোট খেয়েছেন। হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছিল।

মহাদেব মুরলীকে বললেন, “সব ঠিক করে দিয়েছ?”

“হ্যাঁ।”

“বসুন।” মহাদেব গুরুপদকে বসতে বললেন, “প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হবে। পরে সয়ে যাবে।”

গুরুপদ বললেন, “লোহার খোঁচা লাগছে।”

“প্রথমটায় লাগে।—তা আপনি তো দেখলেন কীভাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছে টুকরোগুলো। ঠিক এইভাবে সকালে দু ঘন্টা দুপুরে দু ঘণ্টা রাত্রে এক ঘণ্টা। শোবার সময় সব খুলে রাখবেন। শোবেন উত্তর দক্ষিণ মাথা করে। যদি পারেন বিছানায় ম্যাগনেটগুলোকে রেখে দেবেন। প্লাস দাগগুলো মাথার দিকে, মাইনাসগুলো পায়ের দিকে।”

শশিতারা উসখুশ করছিলেন। আর পারলেন না। স্বামীকে বললেন, “ডাক্তারবাবু তোমায় চেনেন। স্কুলের বন্ধু।”

গুরুপদ মহাদেবকে দেখতে লাগলেন।

মহাদেব বললেন, “স্কটিশ স্কুল!”

“হ্যাঁ—তা—”

“আপনি আমার সিনিয়ার ছিলেন। স্কুলে আপনাকে সকলে গুরু বলে ডাকত। আর আমাকে বলত, মানে আমার ডাকনাম ছিল, ঝন্টু।”

গুরুপদ যেন চমক খেয়ে গেলেন। “ঝনু ঝন্টু যে স্কুলের মধ্যে খেপা ষাঁড় ঢুকিয়ে দিয়েছিলে?”

মহাদেব হাসতে হাসতে বললেন, “নাম আমার মহাদেব। ষাঁড় আমার বাহন। “

গুরুপদ হেসে উঠতে গিয়ে বুকে খোঁচা খেলেন। সামলে নিয়ে বললেন “তুমি আমায় অবাক করলে ঝন্টু! শুনেছিলাম তুমি নেভিতে গিয়েছ। তা এ তো অন্য ব্যাপার। তোমার এই ম্যাগনেট ডাক্তারি কবে থেকে?

“অনেক দিন হল। কলকাতায় এসেছি বছর দুই। এখনও জমাতে পারিনি তেমন। দিল্লি চণ্ডিগড়ে ভাল জমিয়েছিলাম।—শেষে আর ভাল লাগল না। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম। ভাইপোটাকে তো মানুষ করে দিয়ে যেতে হবে।”

শশিতারা মুরলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার ভাইপো ছেলেটি বেশ।”

শানু একবার শশিতারাকে দেখে নিল।

ছয়
মাস খানেক পরের কথা। চৈত্রমাসের শেষ। গরমে কলকাতা পুড়ে যাচ্ছে। বৈশাখে বুঝি ঝলসাবে।

গুরুপদ গলদঘর্ম হয়ে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে ডাকলেন।

শশিতারার সারা দিনে বার চারেক স্নান আর গা-ধোওয়া হয়েছে। সবে গা ধুয়ে শাড়ি পাল্টাচ্ছিলেন। সাড়া দিয়ে বললেন, “আসি।”।

শশিতারা ঘরে আসতেই গুরুপদ বললেন, “সুবোধের কাছে গিয়েছিলাম।”

“কী বলল?”

“দেখল। বলল, ভেরি গুড। এই রেটে ঝরে যাও।” গুরুপদ একেবারে নগ্নগাত্র হয়ে গায়ের ঘাম শুকোচ্ছিলেন। “আরও ছ মাস ঝরতে হবে।”

শশিতারা বললেন, “কেন, তুমি কি খেজুর গাছ। কলসি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখলে রস ঝরবে!”

গুরুপদ বললেন, “আমি বললাম, আরও ছ মাস ঝরব। বলো কী! তা ও বলল, শীতের পাতা ঝরা দেখে ভয় পেও না। শীতের পরই বসন্ত। তখন নবপল্লব।”

“যত্ত বাজে কথা! আর ঝরাঝরিতে কাজ নেই। “।

“মাস খানেক বাইরে গিয়ে বেড়িয়ে আসতে বলল। ফাঁকা জায়গায়। বলল, বাইরে গিয়ে মাঠেঘাটে মাইল দু তিন করে হাঁটবে রোজ। “

“বেশ কথা। মাঠে মাঠে গোরু চরে, মানুষ নয়। ”

“আমি বললুম, বৈশাখ মাসে একবার না হয় চেষ্টা করব। পুরী যেতে পারি।”

“সে বরং ভাল। সমুদ্র ভাল।”

“অনেক দিন বাইরে বেরুনো হচ্ছে না। পুরীই ভাল। কার্তিকবাবুর বাড়িটা নিয়ে নিলেই হবে। সবাই মিলে ঘুরে আসব। ”

“হবেখন। পুরীতে বাড়ি পেতে আটকাবে না। আমাদের ছোড়দার বাড়ি আছে।—ওদের লোকজন থাকে। ব্যবস্থা করা রয়েছে।—নাও তুমি সেরে নাও। তোমার মুরলী এসে বসে আছে!”

“ম্যাগনেট মুরলী!” স্ত্রীকে একবার দেখলেন গুরুপদ।

“বেলুর সঙ্গে বসে গল্প করছে।”

“শানু নেই?”

“এখনও ফেরেনি।”

“আমি চানটা সেরে আসছি।”

মুরলীর নাম হয়েছে এ-বাড়িতে ম্যাগনেট মুরলী। শানুই চালু করেছিল। এখন অন্যদের মুখে মুখে ঘুরছে।

শশিতারা বললেন, “চান করে তুমি দোতলায় নামবে? না—?”

“নীচেই নামব।”

“আজ দুটো ডায়াবিটিস সন্দেশ খাও। মুরলী হাতে করে এনেছে।”

“সন্দেশও আনছে নাকি মুরলী আজকাল! বাঃ বাঃ!”

শশিতারা চলে গেলেন।

গুরুপদও আর বসে থাকলেন না বৃথা। স্নান করতে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালেন।

দোতলার বসার ঘরে মুরলী বসে বসে গল্প করছিল। এক পাশে মুরলী, মুখোমুখি সোফায় বসে বেলা।

মুরলী ছেলেটিকে প্রথম দিন যতটা মুখচোরা মনে হয়েছিল, ততটা মুখচোরা সে নয়। তবে খুব যে সপ্রতিভ তাও নয়। হাসি-খুশি মুখ। কথা বলে নরম গলায়।

স্নান সেরে গুরুপদ নীচে নামলেন।

“এই যে জুনিয়ার!” গুরুপদ ঘরে ঢুকে ঠাট্টা করে বললেন, “এসেছ কখন? কাকার খবর কী?”

মুরলী উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, “এসেছি খানিকক্ষণ। কাকা ভালই আছে।”

“বসো বসো।—আমার ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।”

“কী বললেন?”

“ভালই বলল। বলল, আরও ঝরতে হবে। লাইক এ উইনটার ট্রি।” বলতে বলতে গুরুপদ নিজে সোফায় বসলেন। “ব্যাপারটা কী জান, আমি নিজে আজকাল মন্দ বুঝছি না।” বেলা উঠি উঠি ছিল। গুরুপদর সেদিকে নজর পড়তেই হাত তুলে ইশারায় বেলাকে বসতে বললেন।

মুরলী বলল, “খারাপ হবার কথা নয়। ইন ফ্যাক্ট আপনাকে যে কটা পিস ম্যাগনেট দিয়েছিলাম লাস্ট টাইম—তার টোটাল ওয়েট সাতশো থেকে সাড়ে সাতশো গ্রাম। এক কেজি মতন দিলে ঠিক হত। কাকা বলল, খানিকটা কম দিয়েই দেখা যাক।”

গুরুপদ বললেন, “আমি কিন্তু বাবা ডাক্তারের কাছে যাবার সময় গা থেকে খুলে গাড়িতে রেখে গিয়েছিলাম।” বলে একটু হাসলেন।

“ভাল করেছিলেন” মুরলী বলল, ‘কুকুর বেড়ালে মিশ খায় না। যারা ট্রাডিশনাল ডাক্তার তারা আমাদের ব্যাপারটা মানতে চায় না। শুনলে চটে যায়। আপনার বন্ধুর সঙ্গে অনর্থক কেন চটাচটি করবেন!”

এমন সময় শশিতারা নিজেই কর্তার জন্যে ডায়াবেটিস সন্দেশ, আর ঘোলের শরবত নিয়ে হাজির। শরবতে চিনির নামগন্ধও নেই, নুন আছে।

স্বামীর কাছেই একটা টিপয় ছিল। সন্দেশ শরবত নামিয়ে রাখলেন।

মুরলী বলল, “ম্যাগনেটগুলো আবার পরেছেন?”

“না। চানটান সেরে এলাম। পরে পরব।”।

মুরলী বলল, “ওগুলো আর পরবেন না। আমি নতুন সেট এনেছি।” এমনভাবে বলল কথাটা যেন নতুন সেট গয়না এনেছে।

গুরুপদ বললেন, “নতুন সেট?”

“হ্যাঁ,” বলে পাশে রাখা প্লাস্টিকের ছোট বাক্স দেখাল মুরলী।

শশিতারা স্বামীকে তাড়া দিলেন, “তুমি খেয়ে নাও। “

গুরুপদ সন্দেশের দিকে হাত বাড়ালেন।

মুরলী বলল, “ছটা। দুটো হার্টের জন্যে। একশো গ্রাম মতন। ফিফটি ফিফটি গ্রামস। দুটো থাকবে কোমরে। এদের ওয়েট একশো গ্রাম ইচ! এই হল তিনশো। আর লেগ-ম্যাগনেট একশো টোটাল-ওয়েট এবার চারশো। “

বেলা বলল, “অর্ধেক হয়ে গেল যে আগের চেয়ে।”

“জাস্ট ফর এ উইক। পুরনোগুলো আবার ম্যাগনেটাইজ করে পাওয়ার বাড়াতে হবে। বডিতে থাকতে থাকতে উইক হয়ে গিয়েছে।”

গুরুপদ বললেন, “মানে বড়ি কনট্যাক্টে?”

মুরলী বলল, “হ্যাঁ। আমরা রিচার্জ করে স্ট্রেংথটা বাড়িয়ে দি। মাঝে মাঝে স্ট্রেংথ কমবেশি করে দেখি রোগীর পক্ষে কোনটা স্যুটেবল হচ্ছে।” বলে গুরুপদর দিকে তাকাল, বলল, “আমাদের একটা বড় অসুবিধে কি জানেন, ডাক্তারদের মতন আমরা ওষুধের শিশির গায়ে লেখা স্পেসিফিক ডোজ দেখে কাজ করি না। আমাদের হল অবজারভেশান, আন্দাজ, এক্সপেরিমেন্ট।—এই যে আপনাকে নতুন সেটটা যা দেব—তার টোটাল ওয়েট কম। ম্যাগনেটিক স্ট্রেংথও কম। কিন্তু দিয়ে দেখব, কী রেজাল্ট হয়। এটা একটা ব্রেক—!”

গুরুপদ বললেন, “আচ্ছা মুরলী, হরিনামের মালার থলির মতন একটা মশারির থলি করে যদি বুকের কাছের ম্যাগনেটগুলো ঝুলিয়ে রাখি, হয় না? —তুমি যাই বলো, পট্টি দিয়ে ওই লোহার টুকরো বুকে বেঁধে রাখতে কষ্ট হয়। খচখচ করে লাগে।—গরম কাল। একেই তো আমার ঘামের ধাত।”

বেলা হেসে ফেলল। মুরলী মাথা নাড়ল। বলল, “না জেঠু ; বডির সঙ্গে যত বেশি কনট্যাক্ট হবে তত কাজ হবে।”

গুরুপদ কিছু বললেন না। হাঁটুর কাছে চুম্বক দুটো পট্টি দিয়ে বেঁধে নিকাপ পরে চালাচ্ছেন তিনি, কোমরের কাছেও চুম্বক রেখে পট্টি বাঁধছিলেন। অসুবিধে অস্বস্তি দুইই হচ্ছে। তবে বুকের পট্টিটাই সবচেয়ে কষ্ট দিচ্ছিল তাঁকে।

বেলা আড়চোখে চাইল। বলল, “হেড ফোনের মতন একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পারলে ভাল হয় না?”

মুরলী বলল, “ভেবে দেখব। বলে গুরুপদকে বলল, “ম্যাগনেটের পোলগুলোকে ঠিক মতন রাখছেন তো! দাগ তো দেওয়াই আছে। শোবার সময় নর্থ সাউথ হয়ে শোবেন। বসার সময়ও যতক্ষণ পারবেন—”

শশিতারা বললেন, “আমার বাতের জন্যে এক জোড়া দিও তো। আমি কিন্তু বাঁধাবাঁধি করতে পারব না!”

মুরলী যেন কিছু ভাবল। তারপর বলল, “আপনাকে কীভাবে দেওয়া যায় ভেবে দেখব।—তবে আপনি উপকার পাবেন। বাত, স্পণ্ডিলাইটিস—এসব রোগে ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট ভীষণ কাজে দেয়।”

“অ্যাকুপাংচারের চেয়েও বেশি?” গুরুপদ বললেন।

“অনেক বেশি। অ্যাকুর হল নারভাস সিস্টেমের কতকগুলো ভাইট্যাল পয়েন্ট নিয়ে কাজ। ম্যাগনেটের হল পুরো শরীর নিয়ে। এটা কাজ করছে ইউনিভারসাল ম্যাগনেটিক এফেক্ট নিয়ে।”

“ও ! ইউনিভারসাল—!” গুরুপদ প্রথম সন্দেশ শেষ করে দ্বিতীয় সন্দেশ মুখে পুরলেন। “কোথাকার সন্দেশ হে?”

“নিউ সুইটস-এর।—শিয়ালদার কাছে।”

“মন্দ নয়। তবে একটু গন্ধ আছে।”

“আজ্ঞে চিনি থাকলে গন্ধটা লাগত না।—সন্দেশে একটু ফ্লেভার নেই?”

“বুঝতে পারছি না। যাক গে, আগের বারে কী একটা এনেছিলে?”

“চিনি ছাড়া রসগোল্লা!”

“তাই হবে!” বলে শশিতারার দিকে তাকালেন গুরুপদ, “দিনে দিনে কী হচ্ছে দেখছ তো! চিনি ছাড়া সন্দেশ রসগোল্লা, ফল ছাড়া ফলের রস, তা ছাড়া ডিম। আরও কত হবে দিনে দিনে। এই যেমন দেখছি—ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট—।”

মুরলী তার ঘড়িটা দেখে নিল। বলল, “এবার আমি উঠব। পুরনো ম্যাগনেটগুলো নিয়ে যেতাম।”

শশিতারা বেলাকে বললেন, “যা তোর মামার ঘর থেকে ওগুলো নিয়ে আয়।”

বেলা উঠতে যাচ্ছিল, গুরুপদ বললেন, “ওপরে কি পাবে?”

“কোথায় রেখেছ তবে?”

“মনে করতে পারছি না। সুবোধের কাছে যাবার সময় গাড়িতে খুলে রেখেছিলাম।”

“গাড়ি তো গ্যারেজে।”

“দেখতে হবে।”

“বেলি, দেখ কোথায় রেখেছে। গাড়িতে থাকলে দুলালকে বলবি, গ্যারেজ খুলে গাড়িটা দেখতে।”

বেলা চলে গেল।

গুরুপদ মুরলীকে বললেন, “তোমাদের এই ম্যাগনেট ট্রিটমেন্টটা কোথায় শিখেছিলে? দিল্লিতে?”

“আজ্ঞে হ্যা। ডক্টর ভার্গবের কাছে। উনি জার্মানি থেকে ফিরে এসে ব্যাপারটা শুরু করেন। বম্বেতে শুরু করেন ডক্টর দেশপাণ্ডে। অনেক পরে। কাকা ভার্গবের সঙ্গে কাজ করতেন। আমাদের দেখে আপনি ডক্টর ভার্গরে ব্যাপারে কিছু বুঝবেন না।ওঁর ক্লিনিক দেখার মতন জিনিস। কত রকম ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি—! আমরা কিছুই করে উঠতে পারিনি। কাকার ইচ্ছে অনেক ; কিন্তু অত টাকা পয়সা আমাদের নেই।”

ঘোলের শরবতে চুমুক দিতে দিতে গুরুপদ বললেন, “হবে, তোমাদেরও হবে।”

শশিতারা ইশারায় গুরুপদকে দেখালেন ; দেখিয়ে বললেন, “উনি কত ছোট থেকে শুরু করেছিলেন। সকাল রাত দিন দুপুর খেটে খেটে মরেছেন। তবে না আজ—”

গুরুপদ কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, “বাড়ি, গাড়ি, কারখানা—। সবই ওঁর বরাতে হে।—তা মুরলী, তোমার কাকা না হয় ছেলেবেলা থেকে স্কুলে ষাঁড় ঢুকিয়েছে। তুমি বাপু কাকার লাইন ধরলে কেন?”

মুরলী যেন কথাটা বুঝতে পারল না। আমতা আমতা করে বলল, “আজ্ঞে, কাকাই আমার সব। কাকাই আমায় মানুষ করেছে। বাবা নেই, মা নেই। তা ছাড়া আমি ফিজিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছি।”

“ও! —বুদ্ধিমান ছেলে!” গুরুপদ ঘোল শেষ করে সেঁকুর তুললেন। দরজার দিকে তাকালেন একটু। “কই, গেল তো গেলই, আর এল না।”

মুরলী বলল, “আমি তো নীচেই যাচ্ছি। নিয়ে নেব।—নতুন সেটটা রেখে গেলাম।”

প্লাস্টিকের বাক্সটা রেখে দিয়ে উঠে পড়ল মুরলী। “আসি। খবর নিয়ে যাব।”

মুরলী চলে গেল।

গুরুপদ দুটি চোখ বন্ধ করে সামান্য বসে থাকলেন। তারপর নিজের মনেই বললেন, “ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখোনি।”

শশিতারা কিছু বুঝতে পারলেন না। “কী হয়েছে?”

“না; তেমন কিছু নয়।— চলো, ওপরে যাই।”

গুরুপদ সোফা থেকে উঠে পড়লেন। শশিতারা বললেন, “তোমার কি এত ওপর নীচ পোষায়! নামলে যখন তখন দু দণ্ড বসলেই পারতে।”

“একটা ফোন করব।”

“কাকে?”

“চলো, দেখবে।”

শশিতারাকেও উঠতে হল।

দরজার দিকে পা বাড়িয়ে শশিতারার মনে হল চুম্বকের টুকরো রাখা প্লাস্টিকের বাক্সটা পড়ে রয়েছে। তুলে নিতে গেলেন।

গুরুপদ বললেন, “ওটা থাক।”

“কেন? পরবে না?”

“না।— এসো।”

শশিতারা কিছুই বুঝলেন না। অবাক হলেন। হয়েও কিছু বললেন না। পাখা বন্ধ করে দিলেন। দিয়ে স্বামীর পিছু পিছু সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।

তেতলায় এসে গুরুপদ শোবার ঘরে না ঢুকে পাশের ঘরে ঢুকলেন। ডাকলেন স্ত্রীকে।

“একটা ফোন করব।”

“কাকে?”

“মহাদেবকে। বাড়িতেই পাব এখন। দেখি।”

গুরুপদ একটা সরু খাতা হাতড়ে মহাদেবের ফোনের নম্বরটা দেখে নিলেন। নম্বরটা হালে টোকা হয়েছে।

শশিতারা পাখাটা চালিয়ে দিলেন ঘরের।

গুরুপদ বার পাঁচেক চেষ্টা করে মহাদেবকে পেলেন।

“মহাদেব নাকি? আমি গুরুপদ বলছি।” —গুরুপদ ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, “—না না, ভালই আছি।— সুবোধ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।— বলল, বেটার।— বাড়ি ফিরে এসে দেখি, তোমার জুনিয়ার বসে আছে।—হ্যাঁ গো, তোমার ম্যাগনেট মুরলী।— কী।—তা তুমি অমন জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছ কেন? মালটাল খেয়েছ নাকি! —যাক গে শোননা। তুমি তো স্কুলে ষাঁড় ঢোকানো ছেলে! তা আমার পেছনে এবার যে ম্যাগনেটটি ঢুকিয়েছ তার কী হবে! —কী বলছে, বুঝতে পারছ না! মহাদেব—আমাকে তুমি বুদ্ধু ভেবেছ। শোনো, তোমার ওই ভাইপো মুরলী, আর আমার ভাগ্নি বেলা—এই ছোঁড়াছুঁড়ি দুটোর আগে থেকেই চেনাজানা হয়েছে।—আরে বাবা, তুমি আমায় কী শেখাবে! আমি শিখে শিখে বুড়ো হয়ে গেলুম।—দাঁড়াও, দাঁড়াও—আমাকে কথা শেষ করতে দাও—কলকাঠি তুমি নাড়োনি জানি। নেড়েছে আমার ভাগ্নি আর শালীর ছেলে। হারামজাদা কেমন প্যাঁচ কষে আমাকে, আমার গিন্নিকে তোমার কাছে নিয়ে গেছে বুঝতে পারছি। তুমিও বাপু, বেশ ম্যাগনেটটি ঢুকিয়ে দিলে। ”

শশিতারা যতই অবাক হচ্ছিলেন ততই স্বামীর গা ঘেঁসে আসছিলেন। যেন পারলে মহাদেবের কথাগুলোও শুনে নেন।

গুরুপদ বললেন, “—শানু—আমার শালীর ছেলেটি অতি ধুরন্ধর। ভাগ্নিটাকে আমি বোকাই ভাবতাম।—দেখছি, এখনকার ছেলেমেয়েগুলো আমাদের কান কাটতে পারে।—তা যাকগে এখন তোমায় সাফসুফ বলি, তোমার ভাইপোকে আমার জামাই করতে পারছি না। ছোকরাকে বলে দিও!” বলে গুরুপদ ফোন নামিয়ে রাখলেন।

শশিতারা অবাক হয়ে স্বামীকে দেখছিলেন। প্রথমে কথা বলতে পারছিলেন না পরে বললেন, “হল কী তোমার?”

“আমার সঙ্গে ভাঁওতা বাজি।”

“করলটা কে?”

“ওরা!—আমি বলব না করে শেষে সুবোধকে বলেই ফেললাম, ম্যাগনেটিক ট্রিটমেন্টের কথা। সুবোধ তো হাসতে হাসতে বিষম খেয়ে মরে। শেষে বলল, আমার মতন ছাগল আর দেখেনি।”

“তোমায় ছাগল বলল! ও নিজে কী?”

“ও কী তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।—সত্যি বলতে কি, আমি ফেরার সময় গাড়িতে ভাবতে ভাবতে এসেছি।—আমার বরাবরই কেমন ধোঁকা লাগছিল। চার ছটা লোহার টুকরো বেঁধে চিকিৎসা! —তা কলকাতা শহরে হাজার লোক হাজার ফিকির করে খায়! তোরাও খা। নো অবজেকশান। আমিও শালা আদি আমলা তেল, চালমুগরা করে খাই।—কিন্তু তোরা আমার ভাগ্নিকে চিট করবি?”

শশিতারা হঠাৎ বললেন, “মুরলী ছেলেটি কিন্তু ভাল। দেখতে ভাল ব্যবহার ভাল। লেখাপড়া শিখেছে। সভ্য—”।

“সভ্য! —বেটাকে তুমি সভ্য বলছ! —তুমি কিস্যু জানো না।—শোনো, তোমায় বলিনি আজ আমি যখন ওপরে আসছি, কানে এল বসার ঘরে বসে ওই রাস্কেল হি হি করে হেসে হেসে বেলিকে বলছে, বেলা তোমার কাছে এইভাবে বসে থাকলে আমার মনে হয় ময়রার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। জিবে জল আসে।”

শশিতারা হেসে ফেললেন। জোরেই। তাঁর মোটা গলার স্বর সরু হয়ে এল।

গুরুপদ বললেন, “হাসছ।”

শশিতারার হাসি আর থামতে চায় না। শেষে বললেন, “সে তুমি বলতে। তুমি ময়রার দোকান বলতে না, বলতে—”।

গুরুপদর মনে পড়ে গেল, কী বলতেন। নানা রকমই বলতেন, মাঝে মাঝে তামাশা করে বলেছেন, শশিসোনার ভ্যারাইটি স্টোর্স—।

হেসে ফেলে গুরুপদ বললেন, “সে তখনকার কথা। বিয়ের পর। বিয়ের আগে অমি তোমায় দেখেছি, না, কিছু বলেছি?”

শশিতারা বললেন, “দেখোনি বলোনি।—এরা দেখাদেখি করছে তাই বলছে।”

এমন সময় বেলার গলা পাওয়া গেল। ঘরে এল। এসে বলল, “গাড়িতে কিছু নেই। “বেলার হাতে বসার ঘরে ফেলে আসা প্লাস্টিকের বাক্স।

গুরুপদ ভাগ্নিকে দেখতে দেখতে বললেন, “নেই জানতে এতক্ষণ লাগল?”

বেলা চুপ। মুখ নিচু করল।

শশিতারা বললেন, “তোর মামার খেয়াল থাকে না কোথায় ফেলে দিয়েছে।”

বেলা নতুন বাক্সটা এগিয়ে দিচ্ছিল, গুরুপদ বললেন, “আমার দরকার নেই। তুমি নিয়ে যাও।”

বেলা হকচকিয়ে গেল। “আমি?”

শশিতারা ইশারা করে বললেন, “তুই নিয়ে যা। যা—!”

বেলা যেন কেমন থতমত খেয়ে ভয় পেয়ে চলে গেল।

গুরুপদ গোঁফ চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “শশি? কী করব?”

“আর একবার ফোন করো।”

“কাকে?”

“মহাদেবকে?”

“কী বলব?”

“বলো, যা হয়েছে ; তাই হবে।”

“শুধু এই?”

“হ্যাঁ।—তুমি তো খাঁটি দিশি ছেলে খুঁজছিলে। মুরলী তোমায় ম্যাগনেট দেওয়া চুলের তেলও করে দিতে পারে।”

গুরুপদ আবার ফোন করলেন।

“মহাদেব।—আমি গুরুপদ।—শোনো, আমার বউ বলছে—যা হচ্ছিল, তাই হবে।—কী? শুনে খুশি হলে।—আরে—কী বললে ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট! না আমার দরকার নেই। ওটা যাদের দরকার তারাই করুক।—কী? —কী বলছ? —তা বলতে পার। ছাড়লাম।”

গুরুপদ ফোন নামিয়ে রাখলেন।

শশিতারা বললেন, “কী বলল গো মহাদেব?”

“বলল, বউদিই তোমার বেস্ট ম্যাগনেট! —শালা ধড়িবাজ।” বলে গুরুপদ বেশ হাসিখুশি মেজাজে শশিতারার বুকে খোঁচা মারলেন। “ম্যাগনেট! মন্দ বলেনি, কী বলো? তবে এত বিগ সাইজ—!”

শশিতারা বুক সামলে বললেন, “আঙুল না ছাতার বাঁট! আমার লাগে না?”

গুরুপদ হাসতে লাগলেন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor