Thursday, April 2, 2026
Homeথ্রিলার গল্পভৌতিক গল্পছক্কা মিয়ার টমটম - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ছক্কা মিয়ার টমটম – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ছক্কা মিয়ার টমটম – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এমুলুকে রাতবিরেতে বাস ফেল করলে ছক্কামিয়ার টমটম ছাড়া আর উপায় ছিল নো। ঝড়-বৃষ্টি হোক, মহাপ্রলয় হোক, রাতের বেলা ভীমপুর গদাইতলা দশমাইল পিচের সড়কে যদি কষ্ট করে একটু দাঁড়িয়ে থাকা যায়, ছক্কামিয়ার টমটমের দেখা মিলবেই মিলবে। অন্ধকারে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে প্রথমে ঠাহর হবে এক চিলতে টিমটিমে আলো। তারপর আলোটা এগিয়ে আসবে আর মেমের ডাকাডাকি যতই থাক, কানে বাজবে অদ্ভুত এক আওয়াজ টং লং…টং লং…টং লং। বিদ্যুতের আলোয় হঠাৎ চোখে পড়বে কালো এক একৃাগাড়ি–তেরপলের চৌকা একটা টোপর চাপানো। সামনে কালো এক মূর্তি আর নড়বড় করে দৌড়নো এক টাট্টু!

মুখে কিছু বলার দরকার নেই। ছক্কামিয়ার টমটম সওয়ারি দেখামাত্র থেমে যাবে। তখন একলাফে পেছনের তেরপল সরিয়ে চৌকা টোপরে ঢুকলেই নিশ্চিন্ত। আবার টলতে-টলতে চলতে থাকবে ছক্কামিয়ার টমটম–টং…লং…টং লং।

টমটম কথাটা এসেছে ইংরেজি ট্যান্ডেম থেকে যে গাড়ির সামনে কয়েক সার ঘোড়া যেত। কিন্তু ভীমপুরের ছক্কামিয়ার একাগাড়ির ঘোড়া মোটে এক। তবু আদর করে লোকে নাম দিয়েছিল টমটম।

ছক্কামিয়ার চেহারাটি কিন্তু ভারি বদরাগী। ঢ্যাঙা, টিঙটিঙে রোগা, একটু কুঁজো গড়ন। লম্বাটে মুখের বাঁকানো নাকের তলায় পেল্লায় গোঁফ। চামড়ার রং রোদপোড়া তামাটে।

তেমনি তার টাট্টুও। যেমন মনিব, তেমনি ঘোড়া, হাড় জিরজিরে লম্বাটে গড়ন। ঠ্যাং চতুষ্টয় যেন চারখানি কাঠি। মাথাটা দেখে সময়-সময় ঠাহর করা কঠিন, এই প্রাণীটি সিঙ্গি, না প্রকৃত একটি ঘোড়া। হ্রেষাধ্বনি করলেই পিলে চমকে ওঠে। ভীমপুর বাজারের তাবৎ-তাবং নেড়িকুকুর দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায় লেজ গুটিয়ে।

লোকে আজকাল রাস্তা চলতে বাস-রিকশোই পছন্দ করে। ছক্কা মিয়ার টমটম চড়লে হাড়মাংস দলা পাকাতে থাকে বলেও না, কালের রেওয়াজ আসলে।

কিন্তু ওই যে বলেছি, রাতবিরেতে বাস ফেল করলে তখন উপায়? ছক্কামিয়া এটা বোঝে এবং দিনে তার টমটমের বাহনটিকে নিয়ে বনজঙ্গল বা ঝিলে চরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। রাতের বেলা ছোট্ট বাজারের চৌরাস্তায় শিরীষ গাছের তলায় ঘাপটি পেতে বসে থাকে। পাশেই টমটম রেডি।

সেবার পুজোর সময় কলকাতা থেকে ছোটমামার সঙ্গে আসছি। মাঝপথে একখানে ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল তো রইল। আর নড়ার নাম নেই। ব্যাপার কী? না– আগের স্টেশনে মালগাড়ি বেলাইন। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। তারপর যখন ট্রেনের চাকা গড়াল, ছোটমামা বেজারমুখে বললেন,-বরাতে আমার হতচ্ছাড়া ছামিয়ার টমটম আছে। বাপস!

ওই টমটমে কখনও চাপিনি। তাই কথাটা শুনে আমার আনন্দ হয়েছিল। বললুম, খুব মজা হবে, তাই না ছোটমামা?

ছোটমামা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন,–মজা হবে! বুঝবে ঠ্যালাটাখন।

ঠ্যালাটা কীসের বুঝলাম না আগেভাগে। দেখলাম, ছোটমামা ট্রেনের জানলা দিয়ে মুন্ডু বাড়িয়ে বারবার যেন আকাশ দেখছেন। একটু পরে বললেন, খুব ঝড়বৃষ্টি হবে! কার মুখ দেখে যে বেরিয়েছিলাম। বড়দা অত করে বললেন, তবু থামলুম না। ছ্যা-ছ্যাঁ, আমার কী আক্কেল!

ভীমপুর স্টেশনে যখন নামলুম, তখনও কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির পাত্তা নেই। রাত একটা বেজে গেছে। বাজার নিশুতি। চৌমাথায় শিরীষতলায় গিয়ে দেখি, ছক্কামিয়ার টমটম দাঁড়িয়ে আছে। বলা কওয়া নেই, দরদস্তুর নেই, ছোটমামা টমটমের পেছনদিকে তেরপল তুলে ঢুকে ডাকলেন, হাঁ করে দেখছিস কী? উঠে আয়। এখুনি একগাদা লোক এসে ভালো জায়গা দখল করে ফেলবে যে।

ভেতরে খড়ের পুরু গাদার ওপর তেরপল পাতা। কেমন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ। অন্ধকারও বটে। যেন এক গুহায় ঢুকেছি। সামনে সরে গিয়ে ছোটমামা পরদাটা ফাঁক করে রাখলেন। একটু পরে আরও জনাদুই নোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে এক ঠাসাঠাসি অবস্থা।

আর তারপরই আচমকা চিকুর ছেড়ে মেঘ ডাকল এবং শনশন করে এসে গেল একটা জোরালো হাওয়া। ছোটমামা বললেন,–ওই যা বলেছিলুম। হল তো?

ছক্কামিয়া সামনের আসন থেকে ঘোষণা করল,–আরাম করে বসুন বাবু মশাইরা! এবার রওনা দিই। তার ঘোড়াটাও মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চি হি হি ডাক ছেড়ে যখন পা বাড়াল, তখন টের পেলাম কেন ছোটমামা বাপস বলে মুখখানা তুম্বো করেছিলেন।

সত্যি বাপস! হাড়গোড় মড়মড়িয়ে ভেঙে যাওয়ার দাখিল। বাইরে হাওয়ার হইচই মেঘের হাঁকডাক যত বাড়ছে, ছক্কামিয়ার ঘোড়াটাও তত যেন তেজি হয়ে উঠছে। একটু পরেই চড়বড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা টোপরের তেরপলে পড়তে শুরু করল। ছোটমামা ফঁকটুকু বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন অবাক। ছক্কামিয়া বাইরে বসে চাবুক হাঁকাচ্ছে। ওর বৃষ্টির ছাট লাগবে না?

রাস্তাটা ঘুরে রেল লাইন পেরুলে দুধারে বিশাল আদিগন্ত মাঠ। ফাঁকা জায়গায় ঝড়-বৃষ্টিটা মিয়ার টমটমকে বেশ বাগে পেল। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি উল্টে গিয়ে রাস্তার ধারের গভীর খালে নাকানিচোবানি খাবে! আমাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে সেও ভাববার কথা।

কিন্তু আশ্চর্য, টমটম সমান তালে নড়বড়িয়ে টলতে-টলতে চলছে। মাঝে মাঝে ঝড়-বৃষ্টির শব্দের ভেতর শোনা যাচ্ছে অদ্ভুত এক শব্দ–টংলং-টংলংটলং। কখনও ছক্কামিয়ার টাট্টুঘোড়া বিকট চি-হি করে চেঁচিয়ে উঠছে। তারিফ করে আমার পেছন থেকে এক সওয়ারি বলে উঠলেন,–পক্ষীরাজের বাচ্চা!

এতক্ষণে তেরপলের টোপর থেকে ফুটো দিয়ে জল চোয়াতে থাকল। সওয়ারিরা নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সরবে কোথায়? বেহদ্দ ভিজে সপসপে হয়ে যাচ্ছিল জামাকাপড়। একসময় ছোটমামা হঠাৎ বাজখাই চেঁচিয়ে বললেন, আঃ! হচ্ছে কী, হচ্ছে কী মশাই? আমার ওপর পড়ছেন কেন?

–আপনার ওপর আমি পড়লুম, না আপনি আমার ওপর পড়লেন?

–কী বাজে কথা বলছেন? আমায় ঠান্ডা করে দিয়ে আবার তক্ক? আপনি মানুষ, না বরফ?

–আমি বরফ? আপনিই তো বরফ। ইস। কী ঠান্ডা! হাড় অবধি জমে গেল দেখছেন না!

আমার পিছনের সওয়ারি চাপা খিকিখক করে হেসে আমার কানের ওপর বলল, ঝগড়া বেধে গেছে। বরাবর হয়, বুঝলেন তো মশাই? ছক্কামিয়ার টমটমের এই নিয়ম। খিক-খিক-খিক-খিক।

এমন বিদঘুঁটে হাসি কখনও শুনিনি। কিন্তু এর শ্বাস-প্রশ্বাসেও যে বরফের মতো হিম। বললুম, ইস। একটু সরে বসুন না। বড্ড ঠান্ডা করে যে!

লোকটা ভারি অদ্ভুত! সে ওই বিদঘুঁটে খিক খিকখিক হাসতে-হাসতে আরও যেন ঠেসে ধরল আমাকে। চেঁচিয়ে উঠলাম, ছোটমামা! ছোটমামা!

কিন্তু ছোটমামার কোনও সাড়া পেলাম না। টোপরের ভেতরটা ঘন অন্ধকার। ফের ডাকলুম–ছোটমামা! কোথায় তুমি?

লোকটা সেই খিকখিক হাসির মধ্যে বলল, আর ছোটমামা বড়মামা! মামারা এখন রাস্তায় পড়ে কুস্তি করছে।

হতভম্ব হয়ে হাত বাড়িয়ে ছোটমামাকে খুঁজলুম। সুটকেসটা হাতে ঠেকল। কিন্তু সত্যিই ছোটমামা নেই। তারপর পেছনের দিকে চোখ পড়ল। ওদিককার পরদাটা যেন ফর্দার্যাই। বৃষ্টির ছাট এসে ঢুকছে। আমি প্রচণ্ড চেঁচিয়ে বললাম, ছামিয়া। ছক্কামিয়া! গাড়ি থামাও! গাড়ি থামাও।

পেছনের সওয়ারি ফের সেই বিদঘুঁটে হাসি হেসে উঠল। এবার আমি সামনের পরদা ঠেলে সরিয়ে ছক্কা মিয়ার ভেজা জামা খামচে ধরলুম। গাড়ি থামাও গাড়ি থামাও বলছি!

এতক্ষণে যেন ছক্কামিয়া আমার কথা শুনতে পেল। ঘুরে বলল, কী হয়েছে বাবুমশাই?

ছোটমামা পড়ে গেছেন কোথায়।

ছক্কামিয়া বলল, বালাই ষাটা পড়বেন কোথায়? ঠিকই আছেন, খুঁজে দেখুন ।

–নেই। তুমি গাড়ি থামাবে কি না বলো।

সামনে একটা মন্দির আছে। সেখানে থামাব। দুক্কামিয়া চাবুক মেরে ঘোড়াটাকে খুঁচিয়ে দিয়ে বলল,–যেখানে-সেখানে থামলে ঝড়-বৃষ্টিতে কষ্ট পাবেন বাবুমশাই। বুঝলেন না? ওইখানে থামিয়ে আপনার ছোটমামাকে খুঁজবেন বরঞ্চ।

মন্দিরের আটচালার সামনে গাড়ি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি ছক্কামিয়ার পাশ দিয়ে লাফ দিলাম। তারপর আটচালায় ঢুকে পড়লাম। বুদ্ধি করে ছোটমামার সুটকেস আর আমার কিটব্যাগটাও দু হাতে নিয়েছিলাম।

কিন্তু আটচালায় ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলুম, ছক্কামিয়ার টমটম বৃষ্টির মধ্যে আচমকা গড়াতে শুরু করেছে। ঘোড়াটা চি-হি ডাক ডেকে তেমনি নড়বড়ে পায়ে দৌড়তে লেগেছে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। মুখে কথাটি পর্যন্ত আর ফুটল না। ভারি অদ্ভুত লোক তো ছক্কামিয়া।

এখন ঝড়টা প্রায় কমে এসেছে। বৃষ্টি সমানে পড়ছে। নির্জন আটচালায় দাঁড়িয়ে আছি। প্যান্ট-শার্ট ভিজে চপচপ করছে। প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা আর কী!

কিছুক্ষণ পরে বিদ্যুতের আলোয় দেখি, কে যেন আসছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম,–কে-কে?

ছোটমামার সাড়া এল, অন্তু নাকি রে?

আমি কাদ-কাদ গলায় বললুম,–হ্যা! তোমার কী হয়েছিল ছোটমামা? ছোটমামা আটচালায় ঢুকে বললেন, কী হবে আবার। যা হওয়ার, তাই হয়েছিল। তবে ব্যাটাকে এবার যা জব্দ করেছি, আর কক্ষনও ছক্কামিয়ার টমটমে ভুলেও চড়তে আসবে না।

–ছোটমামা আমার কাছে সুটকে দেখে খুশি হয়ে বললেন,–জানতুম, তুই ঠিকই নেমে পড়ে আমার অপেক্ষা করবি কোথাও।

–কিন্তু লোকটা কোথায় রইল?

হাসলেন ছোটমামা,–ওকে তুই লোক বলছিস এখনও? ওটা কি লোক নাকি?

–তবে কে?

–বুঝলিনে? ওর ঘাড়ে একটা চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে দে, তাহলে বুঝবি। থাকগে, এখন রাতবিরেতে ও নিয়ে আলোচনা করতে নেই। ব্যাপারটা কী জানিস অন্তু? রাতবিরেতে অমন দু-একজন সওয়ারি ছক্কামিয়ার টমটমে উড়ে পড়বে। তারপর কী করবে জানিস? অন্ধকারে ঘাড় মটকানোর তাল করবে। যেই টের পেয়েছি আমার পেছনের লোকটার মতলব কী, অমনি ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যাটা পড়বার সময় অ্যায়সা হ্যাঁচকা টান মেরেছে যে আমিও ওর সঙ্গে তেরপলের ফাঁক দিয়ে নিচে পড়েছি।

–তারপর? তারপর ছোটমামা?

তারপর আর কী? ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় কুফু-জুডো যা সব অ্যাদ্দিন কষ্ট করে শিখেছি, চালিয়ে গেলুম। এক প্যাঁচে ওকে এমন করে ছুড়লুম যে একেবারে বিশ ফুট গভীর খাদে গিয়ে পড়ল। এতক্ষণ কোনও বাজ পড়া ন্যাড়া গাছের ডগায় বসে হিপিয়ে-হিপিয়ে কাঁদছে। ছোটমামা হাসতে-হাসতে গায়ের জামা খুলে নিঙড়ে নিলেন। তারপর বললেন,–ঘণ্টা তিন কাটাতে পারলেই ফার্স্ট বাস পেয়ে যাব। জামাটা নিঙড়ে নে। ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে মাথা মুছে ফেল। বাপস!

আমি শুধু ভাবছিলুম, তাহলে আমার পেছনকার সেই সওয়ারিও কি লোক নয়, সেই লোকটিও কি আমার ঘাড় মটকানোর তালে ছিল? অন্য লোকটার মতো?

আমার মুখ দিয়ে ছোটমামার প্রতিধ্বনি বেরিয়ে গেল, বাপস!…

.

ছক্কামিয়ার টমটমে তারপর ভুলেও চাপার কথা ভাবতুম না। কিন্তু বছর দশেক পরে, যখন কিনা আমি পুরোপুরি সাবালক, একরাতে ভীমপুর স্টেশনে নেমে শুনলুম লাস্ট বাস চলে গেছে।

স্টেশনবাজার তখন নিঃঝুম। সময়টা শীতের। আকাশে একটুকরো চাঁদও আছে। কিন্তু কুয়াশার ভেতর তার দশা বেজায় করুণ। একটা চায়ের দোকান খোলা ছিল। শীতের রাত বারোটায় চা-ওলা সবে ঝাঁপ ফেলার জোগাড় করছিল, আমাকে দেখে বুঝি তার দয়া হল। এক কাপ চা খাইয়ে দিল। শেষে বলল, বাবুমশাই তাহলে যাবেন কীসে গদাইতলা?

–কীসে আর যাব? বরং দেখি যদি ওয়েটিংরুমে রাতটা কাটানো যায়।

চা-ওলা মুচকি হেসে বলল,-ছক্কামিয়ার টমটমেও যেতে পারেন।

ছক্কামিয়ার টমটমের কথা ভুলেই গিয়েছিলুম! সেবার ঝড়-বৃষ্টি ছিল কম। ছোটমামাও বড় গল্পের মানুষ ছিলেন।

হনহন করে চৌমাথায় চলে গেলুম। গিয়ে দেখি, শিরীষতলায় আগুন জ্বেলে বসে আছে সেই আদি অকৃত্রিম ছক্কামিয়া। পাশেই তার টমটম তৈরি। ঘোড়াটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। শীত বাঁচাতে তার পিঠে একটুকরো চটের জামা। বললুম,–গদাইতলা যাবে নাকি ছক্কামিয়া?

ছক্কামিয়া ইশারায় টমটমে চড়তে বলল।

আজ আর কোনও সওয়ারি এল না দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল। টমটম তেমনি নড়বড় করে চলতে শুরু করল। ঘোড়াটাও বিকট চি-হি-হিঁ ডাকতে ভুলল না। অবিকল সব আগের মতোই আছে। এমন কী ছামিয়ার পেল্লায় গোঁফটারও ভোল বদলায়নি। আর সেই অদ্ভুত ঘণ্টার শব্দ, টংলং টংলং টংলং!

কনকনে ঠান্ডা হাওয়া তেরপলের ঘেরাটোপের ছ্যাদা দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে উত্যক্ত করছিল। জড়সড় হয়ে কোনা ঘেঁষে রইলুম। সামনেকার মোটা হ্যাঁদা দিয়ে বাইরে কুয়াশামাখানো জ্যোৎস্নায় ঝিমধরা মাঠঘাট চোখে পড়ছিল। গাছগুলো আগাপস্তলা কুয়াশার আলোয়ান চাপিয়েছে; আর মাথায় পড়েছে কুয়াশার টুপি। টুকরো চঁদখানা ঘেঁড়া ঘুড়ির মতো একটা ন্যাড়া তালগাছের ঘাড়ে আটকে গেছে দেখতে পাচ্ছিলুম।

মাইলটাক চলার পর রাস্তার ধার থেকে কে বাজখাই হাঁক ছাড়ল,–রোকো, রোকো! অমনি টমটম থেমে গেল। ঘোড়াটাও স্বভাবমতো সামনে দু-ঠ্যাং তুলে একখানা চিঁ-হিঁ ছাড়ল। তারপর ছামিয়ার গলা শুনলুম, দারোগাবাবু নাকি? সেলাম, সেলাম।

মুখ বাড়িয়ে দেখি, বিশাল এক ওভারকোট পরা মূর্তি। সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোনও এক দারোগাবাবু। বললেন, রোসো। সাইকেলখানা তুলে দিলেন। তারপর যখন টোপরের ভেতরে ঢুকলেন, মনে হল ভূমিকম্প হচ্ছে। ঢুকেই আমাকে টের পেয়ে চমকানো গলায় বলে উঠলেন,–কে? কে?

বললুম,–আমি।

আমি? আমি মানুষের নাম হয় নাকি? বলে দারোগাবাবু টর্চ জ্বেলে সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে আমাকে দেখে নিলেন। নামধাম বলতেই হল। পুলিশের লোক বলে কথা। সব শুনে উনি বললেন, আমি আপনাদের গদাইতলা থানার চার্জে। কিন্তু আপনাকে কখনও দেখিনি।

বেগতিক দেখে বললুম, কলকাতায় আছি বহুকাল। তাই দেখেননি। তা আপনার নামটা জানতে পারি স্যার?

–বংকুবিহারী রায়।

আসামী ধরতে বেরিয়েছিলেন বুঝি? –ওঁকে খুশি করার জন্যই বললুম।

বংকু দারোগা জলগম্ভীর স্বরে বললেন,–হুম! ব্যাটা এক দাগি বেগুনচোর ভীষণ ভোগাচ্ছে। আজ একটা বেগুনক্ষেতে দুজন সেপাই নিয়ে ওত পেতেছিলুম। তাড়া খেয়ে সটান একটা তালগাছের ডগায় উঠে গেল। তাকে আর নামাতে পারলুম না। তখন সেপাই দুজনকে তালগাছের গোড়ায় বসিয়ে রেখে এলুম। আসতে-আসতে হঠাৎ সাইকেলের বেয়াদপি।

দাগি বেগুনচোর এই শীতকালে সারারাত তালগাছের ডগায় বসে আছে। কিন্তু তার জন্য নয়, হতভাগা সেপাই দুজনের কথা ভেবে আমার উদ্বেগ হচ্ছিল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আহা!

আহা মানে? আমাকে ফের টর্চ জ্বেলে সন্দিগ্ধ নজরে দেখে বন্ধু দারোগা বললেন,–হুম! আপনি মশাই এই মড়া-বওয়া গাড়িতে এতরাতে চাপলেন যে! আপনি জানেন, আজকাল সওয়ারি জোটে না বলে ছক্কামিয়া মড়া বয়ে নিয়ে যায় গঙ্গার ঘাটে!

বলেন কী! তাহলে তো ভয়ের কথা। অবাক হয়ে বললুম, সত্যি ভয়ের কথা। আগে জানলে কথা কেড়ে বন্ধু দারোগা বললেন, হয়তো জেনেশুনেই চেপেছেন। কিছু বলা যায় না।

–কেন এ কথা বলছেন?

–বলছি আপনার চেহারা দেখে। এমন শুটকো রোগা চিপসে বাসি মড়ার মতো লোক সচরাচর দেখা যায় না কিনা।

এবার আমার খুব রাগ হল, কী বলতে চান আপনি?

–রাত-বিরেতে আজকাল ছক্কা মিয়ার টমটমে কে জ্যান্ত, কে মড়া বোঝা যায় না। মশাই!

হাত বাড়িয়ে বললুম,–এই আমার হাত! পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, আমি মড়া না জ্যান্ত!

বন্ধু দারোগা আমার হাত সরিয়ে দিলেন জোরে, বাপস! এ তো বেজায় ঠান্ডা?

–ঠান্ডা হবে না? শীতের রাতে এই মাঠের মধ্যে হাত কি গরম থাকবে?

–না মশাই। এমন রাতে বিস্তর সিঁদেল চোরের হাত পাকড়েছি। তারা কেউ এমন ঠান্ডা ছিল না।

–কী? আমায় সিঁদেল চোর বললেন!

বংকু দারোগা গলাটা ভেতরে নিয়ে বললেন,–সিঁদেল চোরের ভূত হতেও পারেন। কিছু বলা যায় না। তখন আহা বলা শুনেই সন্দেহ জেগেছে।

আর সহ্য হল না। খাপ্পা হয়ে চ্যাঁচিলুম,–পুলিশ হোন, আর যাই হোন আপনাকে অমি সাবধান করে দিচ্ছি মশাই।

দাবোগাবাবু ফের মুখের ওপর টর্চ জ্বেলে বললেন,–ওঁ হুঁ হুঁ। বড্ড এগিয়ে এসেছেন। সরে বসুন! সরে বসুন বলছি!

মুখের ওপর টর্চের আলো কারই বা সহ্য হয়! টর্চ নেভান-বলে টর্চটা ঠেলে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলুম। টর্চটা নিভে গেল। এবং কোথায় ছিটকে পড়ল। কিন্তু এটাই বোধহয় ভুল হল। আর বন্ধু দারোগা বিকট গলায় ভূত! ভূত! বলে চিক্কুর ছেড়ে আমাকে এক রামধাক্কা মারলেন। টোপরের একপাশের জরাজীর্ণ তেরপলের ওপর কাত হয়ে পড়লুম। তেরপলটা ফরফর করে ছিঁড়ে গেল। এবং টাল সামলাতে

পেরে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলুম। কানের পাশ দিয়ে চাকা গড়িয়ে গেল প্রচণ্ড বেগে। পলকের জনা দেখলুম কুয়াশা-ভরা নীলচে জ্যোৎস্নায় কালো টমটম দূরে সরে যাচ্ছে। ভেসে আসছে অদ্ভুত এক শব্দ টংলং-টংলং টংলং!

ভাগ্যিস, রোডস দফতরের লোকেরা রাস্তা মেরামতের জন্য কিনারায় বালির গাদা রেখেছিল। আঘাত টের পেলুম না। সামনে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। লোকেরা লণ্ঠন-লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়ে এল। তখন ঘটনাটা তাদের আগাগোড়া বলতে হল।

কিন্তু সব শুনে ওরা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। একজন বলল, কী বলছেন বাবু? ছক্কামিয়ার টমটম পেলেন কোথায়? কাল ভীমপুরের কাছেই একটা ট্রাকের ধাক্কায় ছামিয়া আর তার ঘোড়াটা মারা পড়েছে যে! ভাগ্যিস, টমটমে একটা মড়া ছিল শুধু। সঙ্গের লোকেরা বাসে চেপে গঙ্গার ধারে গিয়েছিল। কিন্তু অবাক কাণ্ড দেখুন, মড়াটা একেবারে আস্ত ছিল। তুলে নিয়ে গিয়ে ভালোেয়-ভালোয় চিতেয় তুলতে পেরেছে।

বন্ধু দারোগার ওপর সব রাগ সঙ্গে সঙ্গে ঘুচে গেল। বরং উনি আমাকে বাঁচিয়েই দিয়েছেন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওঁর নিজের ভাগ্যে কী ঘটল কে জানে! আহা বেচারা!

কী ঘটল, তার পরদিন শুনলাম। বঙ্গুবাবু তখন হাসপাতালে। লোকে বলছে, আসামী ধরতে গিয়ে সাইকেল থেকে পড়ে কোমড়ের হাত ভেঙেছে। সাইকেলও অক্ষত নেই। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তো আমি জানি। তবে যাই হোক, আমার ওপর যেটুকু ফঁড় গেছে, তার জন্য দায়ী স্টেশনবাজারের সেই ধড়িবাজ চা-ওলা। কেমন হেসে বলেছিল দুকালিমার টমটমেও যেতে পারেন। সব জেনে-শুনেও কী অদ্ভুত রসিকতা।

অবশ্য এমনও হতে পারে, সে বলেছিল,–ছামিয়ার টমটমেও যেতে পারতেন! আমিও হয়তো ভুল শুনেছিলুম। ক্রিয়াপদের গোলমাল স্রেফ…

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel