Tuesday, March 31, 2026
Homeবাণী ও কথাবনজ্যোৎস্না - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

বনজ্যোৎস্না – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

বনজ্যোৎস্না – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

জঙ্গলের মধ্যে জ্যোৎস্না পড়েছে।

দু-পাশে নিবিড় শালের বন। কিন্তু নিবিড় হলেও পত্ৰাচ্ছাদন লতা-গুল্মে জটিল নয়, পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিয়েছে পূর্ণিমার চাঁদ। আলো-আঁধারির মায়ায় অপরূপ হয়ে আছে অরণ্য।

সরু পায়ে-চলার পথ দিয়ে শিউকুমারী এগিয়ে চলেছিল। কাঁখের কলসি দেহের ললিত ছন্দে দোল খাচ্ছে, শুকনো শালের পাতা পায়ের নীচে যেন আনন্দে গান গেয়ে উঠছে। এই সন্ধ্যায় একা জঙ্গলের পথ নিরাপদ নয়। বাঘ আছে, ভালুক আছে, হাতি আছে, নীলগাই আছে, বরা আছে—কী নেই এই বিশাল অরণ্যে? তবু শিউকুমারীর ভয় করে না। তা ছাড়া ডুয়ার্সের বাঘ নিতান্তই বৈষ্ণব, পারতপক্ষে তারা মানুষের গায়ে থাবা তোলে না, এমনই একটা জনশ্রুতিতেও এদেশের লোক প্রগাঢ়ভাবে আস্থাবান।

বনের মধ্য দিয়ে একা চলেছে শিউকুমারী। গায়ের রুপোর গয়নায় জ্যোৎস্নার ঝিলিক। জঙ্গলের বুকে একটা গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো বিসর্পিত রেখায় ঝোরার জল যেখানে বয়ে গেছে সেখানকার ঘনবিন্যস্ত ঝোপের ভেতর থেকে উঠছে বুনো ফুলের গন্ধ। জ্যোৎস্নায় মাতাল হয়ে ডেকে চলেছে হরিয়াল। পূর্ণিমা রাত্রির মায়ায় তারও চোখ থেকে ঘুম দূর হয়ে গেছে। শুধু থেকে থেকে কোথায় তীব্রস্বরে চিৎকার করছে একটা ময়ূর-পাখা ঝটপট করছে, হয়তো বেকায়দায় পেয়ে কোথাও আক্রমণ করেছে শিশু একটা পাইথনকে। অকৃপণ পূর্ণিমা আর অনাবরণ সৌন্দর্যের মধ্যেও আরণ্যক আদিম হিংসা নিজেকে ভুলতে পারেনি। হরিয়ালের সুরে আর ময়ুরের ডাকে রুদ্র-মধুর ঐকতান বেজে চলেছে।

জঙ্গল শেষ হতেই খরখরে বালি। পলিমাটির নরম কোমলতা নয়, মুক্তাচূর্ণের মতো মিহি মখমল মসৃণ বালিও নয়, চূর্ণ পাথরের টুকরো এখানে কাঁকরের মতো ধারালো। ভরা বর্ষায় জলঢাকা যে-সমস্ত পাথরের চাঙড় হিমালয়ের বুক থেকে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল, অতিকায় কতকগুলো কচ্ছপের মতো তারা সেই বিশাল বালিবিস্তারের উপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে।

ওপারে ভুটানের কালো পাহাড়। আর তলা দিয়ে ছেদহীন অনন্ত অরণ্য ডুয়ার্স থেকে টেরাই। দুর্গমতার ওপারে প্রতিরোধের তর্জনী। দেবতাত্মা নাগাধিরাজের অলঙ্ঘ্য প্রাকার। আলোয়-ধোয়া আকাশের নীচে পৃথিবীর বুক-ঠেলে-ওঠা কালো বিদ্রোহ আর সামনে পাহাড়ি নদী জলঢাকা।

কতটুকু নদী, কতটুকুই-বা জল— বুক পর্যন্তও ডুববে কি না সন্দেহ। দেখে মনে হয় পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। কিন্তু ওই মনে হওয়া পর্যন্তই—শুধু হেঁটে কেন, নৌকাতেও পার হওয়া চলে না। ঘণ্টায় ত্রিশ মাইল বেগে দুর্দান্ত স্রোতে জল নেমে চলেছে—পাহাড় থেকে সমতলে, সমতল থেকে সমুদ্রে। স্বপ্ন থেকে হঠাৎ জাগা নিঝরের বজ্রগর্জন। জলের তলায় তলায় ঠেলে নিয়ে চলেছে বেলেপাথর আর গ্র্যানাইটের জগদ্দল স্থূপ। নীচে পাথরে পাথরে সংঘর্ষ, ওপরে খরখরে বালি ভেঙে জলের হুংকার। এতটুকু নদীর কলরোল এক মাইল দূর থেকেও কানে আসে।

জ্যোৎস্নায় ঝলসে যাচ্ছে জলঢাকা। শান্ত ঘুমন্ত আলোর বাঁকা তলোয়ার নয়—পাহাড়িরা যাকে সোনালি অজগর বলে এ যেন ঠিক তাই। ক্ষুধার্ত সোনালি অজগরের মতো গর্জন করে এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে—যেন মুখ থেকে ছিটকে পালিয়ে-যাওয়া শিকারের সন্ধানে তার অভিযান।

কাঁখে কলসি নিয়ে শিউকুমারী স্থির হয়ে দাঁড়াল খানিকক্ষণ। পিছনে অরণ্য, ওপারে অরণ্য আর পাহাড়, মাঝখানে নদী, আকাশে চাঁদ।

ভারি খুশি লাগছে মনটা। আনন্দে গান গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে। এমনই জ্যোৎস্না রাতেই তো পিতমের আসবার কথা। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে নেমেছে উতরাইয়ের পথ। দু-ধারে শালের বন হাওয়ায় কাঁপছে। পাহাড়ি ঝাউয়ের একটানা সোঁ সোঁ শব্দ। জংলি কলার পাতাগুলো কাঁপছে—কাঁপছে জ্যোৎস্নার রং মেখে। আর সেই পথ বেয়ে নামছে ঘোড়া, নেমে আসছে ঘোড়সওয়ার। খট খট খটাখট। বুকের রক্তে মাতলামির দোলা লেগেছে, সমস্ত শিরা-স্নায়ু চকিত হয়ে উঠেছে অধীর এবং উদগ্রীব প্রতীক্ষায়। পিতম আসছে অভিসারে।

একটা গানের কলি গুনগুন করে দু-পা এগিয়ে আসতে-না-আসতেই আবার শিউকুমারীকে থেমে পড়তে হল। আকাশের চাঁদে আর মায়াময় পৃথিবীতে মিলে বনজ্যোৎস্নার যে অপূর্ব সুর বাজছিল—হঠাৎ সে-সুর কেটে গেছে। ভয়ে আর আশঙ্কায় সমস্ত শরীর ছমছম করে উঠল।

জলের ধারে সাদামতো ওটা কী পড়ে আছে! পাথর? না, পাথর নয়। বিকালেও শিউকুমারী ওখানে গা ধুয়ে গেছে, তখন তো ওটা ছিল না। আর এতটুকু সময়ের মধ্যে অত বড়ো একখানা পাথর তো আর হাওয়ার মুখে উড়ে আসেনি। তাহলে?

নিশ্চয় মানুষ। কিন্তু মানুষ এল কী করে? কেউ খুন করেছে নাকি? জানোয়ারে মেরে দিয়েছে? দুটোই সম্ভব। ননরেগুলেটেড এরিয়া—আইনের বন্ধন এখানে শিথিল। অরণ্যরাজ্যে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে আরণ্যক মানুষেরাই, সেজন্যে তাদের সদর আদালতে ছুটে যেতে হয় না। আর সন্ধ্যা বেলায় দু-চারটে জানোয়ারের জলের কাছে আনাগোনাও খুবই সম্ভব। বিশেষ করে ভালুকের আমদানিটা এ তল্লাটে এমনিতেই একটু বেশি।

কয়েক মুহূর্ত শিউকুমারী দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে? এগিয়ে যাবে ওখানে? কে জানে কোনো অনিশ্চিত বিপদ ওখানে প্রতীক্ষা করে আছে কি না। এই জঙ্গল আর জনহীন নদীর ধারে—এখানে বিপদ-আপদ এলে সে কী করতে পারে।

কিন্তু ইতস্তত করে লাভ নেই, দেখাই যাক-না। ভুটানি মেয়ের নির্ভীক নিঃসংশয় মন আত্মস্ত হয়ে উঠল ক্রমশ। ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল সে।

মানুষই বটে, কিন্তু বিদেশি—বাঙালি। জলের ধারে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। ভালুকে খায়নি, তাহলে চোখ-নাক নিশ্চয় আস্ত থাকত না। গায়ে কোথাও রক্তের দাগ নেই, ক্ষতচিহ্ন নেই কোনোখানে। কাপড়টা গোছানোই আছে, সাদা জামাটার সোনার বোতামগুলো আলোতে ঝিকিয়ে উঠছে। আর, আর কী আশ্চর্য—মানুষটা মরেনি! সমস্ত শরীরে ঢেউয়ের মতো দোলা দিয়ে বড়ো বড়ো নিশ্বাস উঠছে তার, নিশ্বাস পড়ছে। কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। নিশ্চয়।

তারপরে আর ভাবতে হল না শিউকুমারীকে। কলসি ভরে সে জলঢাকার জ্যোৎস্নায়-গলা তুহিন-শীতল জল নিয়ে এল, সস্নেহে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লোকটার পাশে। মুখে-চোখে জল ছিটিয়ে একটুখানি উড়ানির হাওয়া দিতেই অজ্ঞান মানুষের দীর্ঘায়ত ক্লান্ত নিশ্বাস ক্রমশ সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। আরও খানিক পরে চোখ মেলল মহীতোষ। বিহব্বল অর্থহীন দৃষ্টি। সমস্ত চিন্তা যেন মস্তিষ্কের মধ্যে অস্পষ্ট নীহারিকার মতো দ্রুত লয়ে আবর্তিত হয়ে চলেছে। খন্ড খন্ড, ছিন্ন ছিন্ন। রূপ নেই, আকার নেই, অর্থসঙ্গতি নেই।

আরও জোরে জোরে হাওয়া দিতে লাগল শিউকুমারী। আরও বেশি করে ছিটিয়ে দিলে জল। জলঢাকার বরফগলা স্পর্শে মরামানুষ চমকে উঠতে পারে, আর মহীতোষ তো অজ্ঞান হয়ে পড়েছে মাত্র। আস্তে আস্তে মহীতোষ উঠে বসল।

সামনে তরুণী নারী। উদবিগ্ন ব্যাকুল দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কালো চোখে জ্যোৎস্না, সুন্দর মুখোনাতে জ্যোৎস্না, কর্ণাভরণে জ্যোৎস্না। পাশ দিয়ে তীব্র কলরোলে বয়ে যাচ্ছে জলঢাকা। পুলিশ নয়, পিছনে ছুটে-আসা শত্রুও নয়। গতিশীল, ভয়ত্ৰস্ত উদ্ৰান্ত জীবনের সমস্ত চঞ্চলতা যেন এখানে এসে স্থির আর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আকাশ থেকে স্বপ্নের পাখায় ভর দিয়ে কি পরি এসে নেমেছে তার পাশে? অপরিসীম ক্লান্তি আর অবসাদে কি শেষপর্যন্ত মরে গেছে মহীতোষ! আর মৃত্যুর পরে পৌঁছে গেছে একটা আশ্চর্য জগতে!

মর্মরশুভ্রা বিদেশিনি তরুণী। মূর্তির মতো অপলক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে তার দিকে। বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা একসঙ্গেই সে-দৃষ্টির মধ্যে কথা কয়ে উঠেছে। কিন্তু মর্মরমূর্তি নয়, পরি নয়, মানুষই বটে।

মহীতোষ বললে, আমি কোথায়?

হিন্দি-মেশানো বাংলায় জবাব দিলে মেয়েটি, নদীর ধারে।

নদীর ধারে! মহীতোষের মনে পড়ে গেল— পালিয়ে আসছিল সে আর অরবিন্দ। শালবনের মধ্যে অরবিন্দ কোথায় হারিয়ে গেল, তার আর সন্ধান মিলল না। কিন্তু দাঁড়াবার সময় নেই, প্রতীক্ষা করবার উপায় নেই। পালাও, পালাও, আরও জোরে পালিয়ে চলো। আগের দিন কিছু খাওয়া হয়নি, সারা রাতের মধ্যে চোখ বুজবার উপায় ছিল না একটি বারও। খিদে-তেষ্টায় সমস্ত শরীরটা অসাড় আর শিথিল হয়ে গেছে। তারপর ছুটতে ছুটতে সামনে পড়ল জল। পিপাসার্ত পশুর মতো সেদিকে ছুটে এল মহীতোষ। তার পরে আর কিছু মনে পড়ে না।

মেয়েটি আবার বললে, কী করে এলে এখানে?

জবাব দিলে না মহীতোষ। কী জবাব দেবে, কেমন করে জবাব দেবে। অবসাদে ভারী আচ্ছন্ন চোখ দুটো উদাসভাবে মেলে দিয়ে সে তাকিয়ে রইল ওপারের ঘনান্ধকার অরণ্য আর কালো পাহাড়ের অতিকায় দিগবিস্তারের দিকে।

শিউকুমারী বললে, উঠতে পারবে? তাহলে চলো আমাদের ঘরে।

মহীতোষ তবুও ভাবছে। কোথায় যাবে সে, কোনখানে তাকে নিয়ে যাবে এই অপরিচিতা রসহ্যময়ী মেয়েটি! কোন অজ্ঞাত পৃথিবীর আমন্ত্রণ তার দৃষ্টিতে?

মহীতোষ শেষপর্যন্ত উঠেই দাঁড়াল। ক্লান্তিতে সর্বশরীর কাঁপছে, মাথাটা ঘুরে পড়তে চাইছে মাটিতে। এক কাঁখে কলসি ধরে আরেকখানা হাত অসংকোচে শিউকুমারী এগিয়ে দিলে মহীতোষের দিকে, নাও, আমার হাত ধরে চলো।

অন্য সময় হলে দ্বিধা করত মহীতোষ। সহজাত শিক্ষা আর সংস্কারে একটি অজানা অচেনা তরুণী মেয়ের শুভ্র হাতখানিকে আশ্রয় করবার কল্পনাতেও রক্তে দোলা লেগে যেত। কিন্তু চেতনা তখনও সম্পূর্ণ বিকশিত হয়ে ওঠেনি। যেন অর্ধতন্দ্রায় অথবা পরিপূর্ণ স্বপ্নের মধ্যেই সে খেয়াল দেখছে। চাঁদের আলোয়, বালিতে, জলকল্লোলে আর বনের মর্মরে সমস্ত পৃথিবীটাই তো অবাস্তব হয়ে গেছে। মন এখানে প্রশ্ন করে না, দ্বিধা করে না। এমন একটা আশ্চর্য পটভূমিতে সবই সম্ভব, সবই স্বাভাবিক।

শিউকুমারীর ভিজে ঠাণ্ডা হাতটা আঁকড়ে ধরলে মহীতোষ। সুগঠিত সুঠাম দেহের ওপর সমস্ত শরীরের ভারটাই এলিয়ে দিয়ে বালির উপরে পা টেনে টেনে এগিয়ে চলল সে। একটা সুগন্ধ নাসারন্ধ্র বয়ে যেন তার স্নায়ুর মধ্যে প্রবেশ করে তাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। কিন্তু সে গন্ধ মেয়েটির দেহ থেকে, অরণ্য থেকে, না আকাশের চাঁদ থেকে—মহীতোষ ঠিক বুঝতে পারল না।

বালির রেখা ছাড়িয়ে জঙ্গল। শালবনের ভেতর দিয়ে মানুষ, হরিণ আর ভালুকের চলার পথ। ঝরা শালপাতায় পদধ্বনির মর্মরিত প্রতিধ্বনি। ময়ূর ডাকছে না, কিন্তু হরিয়ালের মাদক সুর ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। হিংস্র জানোয়ারের হুংকার শোনা যাচ্ছে না কোথাও। চকিতের জন্যে কানে এল হরিণের মিষ্টি আহ্বান। এমন অপূর্ব বনজ্যোৎস্নায় সে হয়তো হরিণীকেই সন্ধান করে ফিরছে। কঁক-কঁক-কোঁ। ঝোপের মধ্য থেকে অস্পষ্ট গদগদ-ধ্বনি। বনমোরগ দম্পতি হয়তো মিলনমায়ায় বিহ্বল হয়ে উঠেছে কোথাও।

বনজ্যোৎস্না। শিউকুমারীর মনে পড়ে এমনই রাত্রে আসবে পিতম। জংলি কলার পাতার ছায়া কাঁপছে পাহাড়ি পথে। ঝাউয়ের বনে উদাস বিরহাতুর দীর্ঘশ্বাস। আর পাথরবাঁধা পথ দিয়ে সাদা ঘোড়ায় খট খট সওয়ারি হয়ে আসছে দূরবাসী প্রিয়তম—শালের কুঞ্জে বাসর যাপন।

শিউকুমারী কি গুনগুন করে গান গাইছে? মহীতোষ কিছু বুঝতে পারছে না। চেতনা ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছে—এই জ্যোৎস্নায়, বনের এই সংগীতে, এই রহস্যমধুর পথচলার ছন্দে। শিউকুমারীর গায়ের ওপর ভারটা ক্রমশ বেশি হয়ে চেপে পড়ছে। মহীতোষ আবার কি ঘুমিয়ে পড়ল না অজ্ঞান হয়ে গেল একেবারে?

জঙ্গলের এদিকটা অনেকখানি ফাঁকা। ডি-ফরেস্টেশনের প্রভাবে জঙ্গল হালকা হয়ে গেছে। ওদিকে তো একেবারেই নেই। মানুষের কুঠারের ঘা পড়েছে অরণ্যের অপ্রতিহত সাম্রাজ্যে। কাঠ চাই-ইন্ধনের জন্য, আশ্রয়ের জন্য, সভ্যতার সংখ্যাতীত প্রয়োজনের জন্য, এমনকী জঙ্গল সংহার করবার কুঠারের বাঁটের জন্য। ক্ষতবিক্ষত অরণ্য দিনের পর দিন হ্রস্ব হয়ে আসছে, অন্তিম প্রতিবাদে ছোটো-বড়ো গাছ আর একরাশ লতাগুল্ম দলিত করে লুটিয়ে পড়ছে বৃদ্ধ বনস্পতি, মানুষের অবিশ্রান্ত দাবির মুখে পৃথিবীর প্রথম অধিবাসীরা নিঃশব্দে আত্মদান করে চলেছে। শুধু ব্যথাতুর বুকের মধ্যে সঞ্চিত জ্বালা মাঝে মাঝে আত্মপ্রকাশ করে দাবানল হয়ে। সে এক অপরূপ দৃশ্য। শুকনো পাতায় ধু-ধু শিখা জ্বালিয়ে আর লতাগুল্মকে পুড়িয়ে দিয়ে সাঁ সাঁ করে এদিকে-ওদিকে সরীসৃপ-গতিতে আগুনের প্রবাহ চলে জলস্রোতের মতো। এঁকেবেঁকে এগিয়ে যায়, সোজা চলতে চলতে হঠাৎ ডাইনে-বাঁয়ে মোড় ঘোরে। বনানীর বুকের জ্বালা আগুনের সাপ হয়ে ছুটোছুটি করে। একদিন, দু-দিন, তিন দিন—যে পর্যন্ত না শালবনের ডালে ডালে ময়ূরের পেখম ছড়িয়ে দিয়ে হিমালয়ের চুড়ো থেকে আসা নীল মেঘে ধারাবর্ষণ নামে।

জঙ্গল যেখানে হালকা হয়ে এসেছে, সেখানে ভুটানিদের একটা ছোটো বস্তি। দেশটা কিন্তু ভুটান নয়—বাংলা দেশের একেবারে উত্তরাঞ্চল। পাহাড়, ঝরনা, জঙ্গল আর চা-বাগান। চা আর কাঠের প্রয়োজনে একটু দূরেই ঘন বনের মধ্য দিয়ে ছোটো একটি রেললাইন। তার উপর দিয়ে যে-রেলগাড়ি চলে তা আরও ছোটো। বুনো হাতি দেখলে ইঞ্জিন ব্যাক করে, শাল গাছ পড়লে গাড়ির চলাচলতি বন্ধ হয়ে থাকে। ননরেগুলেটেড অঞ্চল, থানা-পুলিশের উপদ্রবটা গৌণবস্তু। একজন সার্কেল অফিসার আছেন, কিন্তু তিনি কোথায় আছেন অথবা কী করেন সেটা নিরাকার ব্রহ্মের মতোই গুরুতর তত্ত্বচিন্তাসাপেক্ষ।

এইখানে চা-বাগান, কাঠের কারবার আর রেললাইনের সীমানা থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে কুলবীরের পচাইয়ের দোকান—চা-বাগান আর কাঠকাটা কুলিদের প্রাণরস সঞ্চয়ের কেন্দ্র। সন্ধ্যায় জঙ্গলের পথঘাট ভালো নয়, আপদ-বিপদের সম্ভাবনাও আছে, তবু কুলিরা এখানে আসে। দিনান্তে উগ্র মাদকতায় এক বারটি গলা ভিজিয়ে না-নিলে তাদের চলে না। কুলবীরের রোজগার যে প্রচুর তা নয়, তবু দিন কাটে, চলে যায় একরকম করে।

রাত বাড়ছে। জঙ্গলের আড়ালে চাঁদ উঠে আসছে মাথার ওপর। কোথা থেকে চিৎকার করছে হায়না। কুলিরা একে একে উঠে পড়ল সবাই, সাঁওতাল কুলিদের মাদলের শব্দ আর জড়িত গানের সুর ক্রমে মিলিয়ে এল দূরে। হঠাৎ কুলবীরের খেয়াল হল মেয়ে শিউকুমারী এখনও ফেরেনি। নদীতে জল আনতে গিয়েছিল, তারপর…

কুলবীরের মনটা চমকে উঠল। জানোয়ারের পাল্লায় পড়েনি তো? ঝকঝকে ভোজালিখানা খাপে পুরে নিয়ে সবে বেরিয়ে পড়তে যাবে এমনসময় এল শিউকুমারী। একা নয়, কাঁধে ভর দিয়ে আসছে মহীতোষ। আর আসছে বললেই কথাটা ঠিক হয় না, শিউকুমারী বয়ে আনছে

কুলবীর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। ছোটো ছোটো মঙ্গোলিয়ান চোখ দুটো বিস্ফারিত করে অস্ফুট গলায় বললে, একী?

ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শিউকুমারী বললে, চুপ। একে কিছু খেতে দিয়ে এখন শোবার ব্যবস্থা করে দাও বাবা। যা শোনবার শুনো সকালে।

কুলবীরের একটা পা কাঠে তৈরি। ১৯১৪ সালের লড়াইফেরত লোক সে। ফ্ল্যাণ্ডার্স, কামানের গর্জন—ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। শেলের টুকরোতে বাঁ-পাখানা হয়তো উড়ে গিয়ে ইংলিশ চ্যানেলেই আশ্রয় নিয়েছে।

যুদ্ধ থামল, কুলবীর ফিরে এল দেশে। ভুটান সরকার কিছু কিছু জমিজমা দিলে রাজভক্তির পুরস্কার। কিন্তু সেই জমি নিয়েই শেষপর্যন্ত বাঁধল নানা গন্ডগোল। বুড়ো কুলবীরের এসব ঝামেলা ভালো লাগল না। একদিন সকালে দুটো টাট্টুঘোড়ার পিঠে সব চাপিয়ে দিয়ে ভুটানের পাহাড় ডিঙিয়ে জলঢাকার হিমশীতল তীক্ষ্ণধারা পার হয়ে সে চলে এল ডুয়ার্সের জঙ্গলে।

তারপর দিন কেটে চলেছে। ভালোেয়-মন্দে, ছোটো-বড়ো সুখ-দুঃখে। সাত বছরের মেয়ে শিউকুমারীর বয়স এখন উনিশ। দিনের পর দিন শক্তিহীন হয়ে পড়ছে কুলবীর, অথর্ব হয়ে পড়ছে। একটা পায়ের অভাবে বুনো ঘোড়ার মতো তেজিয়ান শরীরেও শিথিলতার সঞ্চার হয়েছে খানিকটা। অনেকটা এই কারণেই এতদিন পর্যন্ত বিয়ে হয়নি শিউকুমারীর। বুড়ো বয়সে কুলবীরের অন্ধের যষ্টি।

রাত্রির অন্ধকারে দেখা যায়নি, এখন প্রথম সূর্যের আলোয় দিগন্তে দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি চুড়ো। শালবনকে অত ঘনবিন্যস্ত বলে বোধ হচ্ছে না। পাহাড়ের রেখাটা গাঢ় নীলিমা দিয়ে আঁকা, রাশি রাশি কুঞ্চিত লোমের মতো ঘন জঙ্গল তার সর্বাঙ্গে বিস্তৃত হয়ে আছে।

হুঁকো হাতে নিয়ে দড়ির খাঁটিয়ায় বসে মহীতোষের ইতিহাস সবটা শুনল কুলবীর। চাপা তামাটে মুখোনার ওপর দিয়ে সংশয়ের নিবিড় ছায়া ছড়িয়ে পড়ল।

এখানে কেমন করে তোমাকে থাকতে দেব বাবু? ইংরেজের মুলুক। আমার দেশ ভুটান হলে তো কথা ছিল না, কিন্তু এখানে…

পচাইয়ের একটা হাঁড়ি নিয়ে শিউকুমারী বেরিয়ে এল বাইরে। বনজ্যোৎস্নায় যাকে অপরূপ স্বপ্নময়ী বলে মনে হয়েছিল, দিনের উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল ততটা সুন্দরী সে নয়। খর্ব নাসিকা, ছোটো ছোটো চোখ। পরনের উড়ানিটার রং ময়লা। ফর্সা মুখোনার ওপরে স্বাভাবিক অযত্নের একটা মলিন রেখা পড়েছে, গলার খাঁজে কালো হয়ে জমে আছে ময়লা। অপগতক্লান্তি সুস্থ শিক্ষিত মহীতোষের যেন স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল। নিতান্ত সাধারণ, নিতান্তই পথেঘাটে দেখা পাহাড়ি মেয়ে। বনজ্যোৎস্না আর সোনালি অজগরের মতো খরধারা নদীর পটভূমিতে আলোর পাখায় যে ভর দিয়ে নেমে এসেছিল, সে যেন নিতান্তই অন্য লোক।

মহীতোষ কোনো জবাব দিলে না কুলবীরের কথায়, জবাবটা দিলে শিউকুমারী। বললে, না বাবা, বাঙালিবাবুকে কটা দিন রাখতেই হবে। এখন এখান থেকে বেরোলেই অংরেজ ধরে নেবে ওকে। তুমি তো স্বাধীন ভুটিয়া, স্বাধীন বাঙালিকে আশ্রয় দিতে আপত্তি করছ। কেন?

এবার চমকাবার পালা মহীতোষের। আশ্চর্য! এমন একটা কথা এই নোংরা পাহাড়ি মেয়েটা বলতে পারল কী করে? একি স্বাধীন পাহাড়ি রক্তের থেকে স্বতোৎসারিত অথবা এই আরণ্যক উন্মুক্ত পৃথিবীর প্রভাব? মহীতোষ তাকিয়ে রইল শিউকুমারীর দিকে। সুগঠিত দেহ, লালিত্যের চাইতে দৃঢ়তা বেশি। ছোটো ছোটো চোখ দুটোতে শানিত দৃষ্টি। কানে রুপোর দুটো প্রকান্ড আভরণ-বাঙালি মেয়ের নরম কান হলে ছিঁড়ে নেমে পড়ত। এক লহমায় মনে হল ভুটানের স্বাধীন সৈনিকের জন্ম দেওয়ার অধিকারিণী বীর মাতাই বটে।

কিন্তু কথাটা কুলবীরের মনে ধরেছে। স্বাধীন জাত, প্রতিদিন বিদেশি শৃঙ্খলের অপমান বয়ে বেড়াতে হয় না। তা ছাড়া নিজে লড়াই করেছে কাদামাখা বোমাবিধ্বস্ত ট্রেঞ্চে, ফাটা শেলের ফুলঝুরিতে, রাশি রাশি বুলেটের মধ্যে, বেয়নেটের ধারালো ফলায়। সৈনিকের মর্যাদা সে বোঝে। আর তা ছাড়া মহীতোষও সৈনিক বই কী। স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করে যে, সে-ই তো সৈনিক।

কুলবীর চিন্তিত মুখে হুঁকোয় টান দিয়ে বললে, আচ্ছা, থাকো। এখন কোনো ভয় নেই, এবেলা লোকজনের আমদানি হয় না জঙ্গলে। কিন্তু বিকালে চা-বাগান থেকে সব আসে, তাদের সামনে পড়লে বিপদ হতে পারে।

শিউকুমারী বললে, সে তোমাকে ভাবতে হবে না বাবা, আমি ঠিক করে নেব।

মহীতোষ কৃতজ্ঞ গাঢ়চোখে এক বার তাকালে শিউকুমারীর আনন্দিত উজ্জ্বল মুখের দিকে। অস্পষ্ট গলায় বললে, তোমার দয়া থাপাজি।

না না, দয়া আর কীসের। এসেছ, থাকো দু-দিন। কুলবীর অল্প একটু হাসল, তারপর কাঠের পায়ে খট খট করে ঘরের ভেতরে চলে গেল। আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু সংশয় কাটছে না।

থাকার অনুমতি মিলল, কিন্তু মহীতোষ ভাবতে লাগল, থাকা কি সত্যিই সম্ভব। পাহাড়িদের ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর—ঝোপড়া। দড়ির খাঁটিয়া। পচাইয়ের উগ্র দুর্গন্ধ। চারদিকে নীল জঙ্গল সমস্ত পৃথিবীকে দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে রেখে কারাগারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের প্রকান্ড বিক্ষুব্ধ জগৎটাতে ইতিহাসের দ্রুত আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কী-যে ঘটে চলেছে তা এখান থেকে জানবার বা অনুমান করবারও উপায় নেই। একি আশ্রয়, না আন্দামানে নির্বাসন?

শিউকুমারী এগিয়ে এল। পাহাড়ি মেয়ের সহজ নিঃসংশয়তায় একখানা হাত রাখল মহীতোষের কাঁধের উপর। বললে, বাঙালিবাবু কী ভাবছ?

মহীতোষ অন্যমনস্কভাবে বললে, কই, কিছুই তো ভাবছি না।

না, কিছুই ভাবতে হবে না। কোনো ভয় নেই তোমার, অংরেজ এখানে তোমাকে খুঁজে পাবে না।

মহীতোষ ম্লান হাসল, ঠিক জান তুমি?

জানি বই কী! কিন্তু এখানে থাকতে হলে তো বসে বসে ভাবলে চলবে না, কাজ করতে হবে। চলো, জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনি।

একটা-কিছু করবার সুযোগ পেয়ে যেন হালকা হয়ে গেল অনিশ্চিত অস্বস্তির বোঝাটা। মহীতোষ উঠে দাঁড়াল, বললে, চলো।

শালবনের পথ। নীচের দিকটা দাবানলে জ্বলে গেছে এখানে-ওখানে। শাল-শিশুরা আগুনে পুড়ে গিয়ে কালো কালো কতকগুলো খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে। কিন্তু আগুনে পুড়েছে বলেই ওরা মরবে না। এ হচ্ছে ওদের জীবনীশক্তির প্রথম পরীক্ষা, ভাবীকালে বনস্পতি হওয়ার গৌরব লাভ করবার পথে প্রথম অগ্নি-অভিষেক। তিন-চার বছর দাবানল ওদের ডাল-পাতা পুড়িয়ে নির্জীব করে দেবে, কিন্তু তার পরেই অগ্নি উপাসক ঋত্বিকের মতো নির্দাহন শক্তি লাভ করবে ওরা। দিনের পর দিন বড়ো হয়ে উঠবে, ঋজু হয়ে উঠবে, নিজেদের বিস্তীর্ণ করে দেবে ডুয়ার্স থেকে টেরাই পর্যন্ত।

ডালে ডালে পাখি—চেনা-অচেনা, নানা জাতের, নানা রঙের। ময়ূর আর বনমুরগির ছুটোছুটি। চকিতের জন্যে দেখা দিয়েই বিদ্যুতের মতো মিলিয়ে যায় হরিণের পাল। এখান ওখান দিয়ে ঝোরার জল। দু-পাশে সবুজ ঘনবিন্যস্ত ঝোপ, বড়ো বড়ো ঘাস, অসংখ্য বুনো ফুল। পায়ে পায়ে ভুইচাঁপার বেগুনি মঞ্জুরি।

কাঠ আর শুকনো পাতা কুড়িয়ে চলেছে দুজনে। বেশ লাগছে মহীতোষের। জীবনের রূপটা যে এত বিচিত্র, এমন মনোরম, একথা আগে কি কখনো কল্পনা করতে পারত মহীতোষ? কিন্তু আর নুয়ে নুয়ে খড়ি কুড়োতে পারা যায় না। পিঠটা টনটন করছে।

শিউকুমারী ডাকল, বাঙালিবাবু?

মহীতোষ চোখ তুলে তাকাল, কী বলছ?

হাঁপিয়ে গেছ তুমি। এসব কাজ কি তোমাদের পোষায়? এসো, জিরিয়ে নিই।

একটা শাল গাছের গোড়ায় শুকনো পাতার স্কুপের উপরে বসল দুজনে। নীল ঠাণ্ডা ছায়া। খসখসে শালের পাতায় বাতাসের শিরশিরানি। ঘুঘু ডাকছে। ভুইচাঁপার ওপরে উড়ে বসছে নানা রঙের বুনো প্রজাপতি। গাছের ডালে ডালে বানর লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। শান্ত সুন্দর ঘুমন্ত অরণ্য। হিংস্র রাত্রির অবসানে জানোয়ারেরা হয়তো ঝোপ আর ঘাসবনের ভেতরে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে এখন।

শিউকুমারী আস্তে আস্তে বললে, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাঙালিবাবু?

মহীতোষ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, না, কষ্ট আর কীসের?

কষ্ট নয়? দেশ-গাঁ ছেড়ে কোথায় এসে পড়েছ। এখানে জঙ্গল, আমরা জংলা মানুষ। এ তো তোমার ভালো লাগবার কথা নয়।

মহীতোষ মৃদু হাসল, কিন্তু ইংরেজের জেলের চাইতে অনেক ভালো নিশ্চয়ই।

তা সত্যিই।

শিউকুমারীর মনটা হঠাৎ ভাবাতুর হয়ে উঠল। শুধু এইটুকুই ভালো? ইংরেজের জেলের চাইতে অনেক ভালো? তার চাইতে আরও কিছু ভালো নেই কি এখানে? জঙ্গলের শান্ত স্নিগ্ধ ছায়া। হাওয়ায় ঝরে-পড়া শালের ফুল। রাত্রিতে মাতাল-করা বনজ্যোৎস্না। জলঢাকার কলরোল। কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনার মুকুট। দূরের পাহাড়ে পাথর-কাটা পথের ওপর যখন জংলা কলার পাতা হাওয়ায় কাঁপে, জানোয়ারের পায়ে লেগে গড়িয়ে-পড়া পাথরের শব্দে মনে হয় দূরবাসী পিতম ঘোড়া ছুটিয়ে অভিসারে আসছে, তখন শিউকুমারীর ইচ্ছে করে…।

কিন্তু শিউকুমারীর যে-ইচ্ছে করে সে-ইচ্ছে মহীতোষের নয়। শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষ। ছাব্বিশে জানুয়ারি। কারাপ্রাচীরের অন্তরালে রাত্রির তপস্যা। আগস্ট আন্দোলন—ডু অর ডাই। সেই জগৎ থেকে, সেই আন্দোলিত আবর্তিত বিপুল জীবন থেকে কোথায় ছিটকে পড়ল সে? বিক্ষুব্ধ বোম্বাই, উন্মত্ত কলকাতা। পথে পথে বন্দেমাতরম, লাঠি, বন্দুক, রক্ত, আইন। চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ঘুরে যায় সমস্ত। সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই গর্জিত সমুদ্রের তরঙ্গে আফ্রিকার বনভূমির শিলাসৈকতের মতো জীবনের একটা অজ্ঞাত তটে নিক্ষিপ্ত হয়েই পড়ে থাকবে সে? আকাশে যেখানে ঘূর্ণিত নক্ষত্রমালায় আর জ্বলন্ত নীহারিকায় ভাঙা গড়ার প্রলয় চলছে, সেখান থেকে কক্ষভ্রষ্ট হয়ে মৃত্যুসমুদ্রের মধ্যে তলিয়ে থাকবে নিবে যাওয়া উল্কা?

মহীতোষ বললে, দয়া করে আশ্রয় দিয়েছ তোমরা। ঋণ কী করে শোধ হবে জানি না।

দয়ার ঋণ আমরা শোধ নিই না বাঙালিবাবু। শিউকুমারীর গলার স্বর তীক্ষ্ণহয়ে উঠল, সে আমাদের নিয়ম নয়। কিন্তু চলো, বেলা উঠে গেল।

খোঁচা খেয়ে মহীতোষ আশ্চর্য হয়ে গেল। এ আকস্মিক তীক্ষ্ণতার অর্থ কী? ডুয়ার্সের জঙ্গলের মতোই জংলি মেয়ের চরিত্র বোঝবার চেষ্টা করা বৃথা।

ছোটো কাঠের বোঝাটা মহীতোষ তুলে নিলে নিঃশব্দে।

শালবনের ছায়ামেদুর কবিতায় ছন্দপতন হয়ে গেছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে বুনো হাতির ডাক। জলঢাকার কলগর্জন ছাপিয়ে মেঘমন্দ্রের মতো সে-ডাক ভেসে এল।

কক্ষভ্রষ্ট উল্কা, কিন্তু নিবতে চায় না—বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকে অবিরাম। তবু উপায় নেই, থাকতেই হবে, অন্তত কটা দিনের জন্যে আশ্রয় নিতেই হবে—যে-পর্যন্ত অরবিন্দ ফিরে না-আসে। আর মহীতোষ জানে, মনের দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই জানে, অরবিন্দ ফিরে আসবেই। যেখানে থাক, যেমন করে থাক, তাকে খুঁজে বার করবেই। মৃত্যুর হাত এড়ানো চলে, কিন্তু অরবিন্দের চোখকে এড়াবার উপায় নেই। তার দুটো চোখ যেন লক্ষ লক্ষ হয়ে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস-অরণ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে।

তবু দিন কাটে। খড়ি কুড়োয়, কুলবীরের গাদাবন্দুক নিয়ে বনমুরগি শিকার করে, হরিণের সন্ধান করে। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে মনে হয় এখনই হয়তো কোথা থেকে একটা ছায়ামূর্তির মতো অরবিন্দ সামনে এসে দাঁড়াবে।

কিন্তু অরবিন্দ আসে না। যেখান-সেখান থেকে বনলক্ষীর মতো দেখা দেয় শিউকুমারী। কাঁখে কলসি, ভিজে শাড়ি সুললিত দেহের খাঁজে খাঁজে ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে রয়েছে। মৃদু হেসে চোখের তীব্র চাহনি হেনে বলে, শিকার মিলল?

থমকে দাঁড়িয়ে যায় মহীতোষ। দৃষ্টিটাকে বন্দি করে ফেলে শিউকুমারীর অনিন্দ্য দেহসুষমা। মনে রং লাগে। নিজের অজ্ঞাতেই বেরিয়ে আসে অবচেতনার স্বীকারোক্তি, মিলল বলেই তো মনে হচ্ছে।

শিউকুমারীর দৃষ্টিতে আগুন জ্বলে যায়। সত্যি?

সত্যি। যেন অদৃশ্য শয়তানের শৃঙ্খলে টান লাগে, এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যায় মহীতোষ, অনেক খুঁজে এইবারে পাওয়া গেল বলে ভরসা হচ্ছে।

শিউকুমারী আর দাঁড়ায় না। দেহভঙ্গিমার উন্মত্ত আলোড়ন রক্তের কণায় কণায় জাগিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে অদৃশ্য হয়ে যায় জঙ্গলের মধ্যে। আর পরক্ষণেই যেন দুঃস্বপ্নের ঘোর কেটে যায় মহীতোষের। নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়, মনে হয় একান্তভাবে ব্রতচ্যুত, যোগভ্রষ্ট। শেষপর্যন্ত এই দাঁড়াল! ছাব্বিশে জানুয়ারির সংকল্প ভুলে গিয়ে পাহাড়ি মেয়ের সঙ্গে বনে বনে প্রেম করে বেড়াচ্ছে সে?

দু-হাতে মাথাটা টিপে ধরে মহীতোষ। নাঃ, আর নয়। এ কোন জালে দিনের পর দিন জড়িয়ে পড়ছে সে? স্বাধীনতার সৈনিক, শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষের কান্নায় কন্যাকুমারী থেকে গৌরীশেখরের তুহিন-শৃঙ্গ অবধি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। একী মোহ তার! এইভাবেই কি সে তার কর্তব্য পালন করছে?

বিকাল থেকে রাত নটা পর্যন্ত পচাইলোভী কুলি আর পাহাড়িদের আড্ডা বসে কুলবীরের দোকানে। কাঠের পা নিয়ে কুলবীর একা সব দেখাশোনা করতে পারে না। শিউকুমারী কাজের সহায়তা করে তার। মৃদু হাসির সঙ্গে ক্রেতার দিকে এগিয়ে দেয় পচাইয়ের ভাঁড়। মনে রং লাগে— নেশার রং, শিউকুমারীর চোখের রং। ভুল করে খরিদ্দারেরা বেশি পয়সা দিয়ে ফেলে।

আর সেই সময়ে কুলবীরের একটা ঢোলা হাফ প্যান্ট পড়ে ঘরের পিছনে একটা চৌপাইয়ের উপরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে মহীতোষ। এই সময়টা তাকে অজ্ঞাতবাস করতে হয়। কুলিরা আসে, কুলিদের সর্দার আসে, ফরেস্ট অফিসের দু-চার জন আধাবাবুরও পদপাত ঘটে। ওখানে থেকে হইচই শোনা যায়, হুল্লোড় শোনা যায়, দুর্বোধ্য গানের কলি শোনা যায়। উন্মত্ত হাসিতে কুলবীরের ছোটো ঝোপড়াটা যেন থরথর করে কেঁপে ওঠে। আর সব কিছুর ভিতর দিয়ে একটা তরল তীক্ষ্ণ হাসি বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ে—শিউকুমারী হাসছে।

মোহ কাটাতে চায় মহীতোষ। কিন্তু মোহ কি সত্যিই কাটে? শিউকুমারী হাসছে—পাহাড়ি মেয়ে পচাই বিক্রির খরিদ্দারদের খুশি করবার জন্যে তার অভ্যস্ত হাসি হাসছে। তাতে মহীতোষের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু সত্যিই কি ক্ষতি নেই? তাহলে বুকের মধ্যে জ্বালা কেন, কেন মনে হয় শিউকুমারী তাকে ঠকাচ্ছে?

বনজ্যোত্সা শেষ হয়ে গেছে, এসেছে অমাবস্যা—আরণ্যক তমসা। অন্ধকারের মধ্যে মহীতোষ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে, ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে ঘেঁকে ধরে তাকে। বুকের মধ্যে অসহায় কান্নার রোল ওঠে—অরবিন্দ, অরবিন্দ। এমন সময়ে তাকে ফেলে কোথায় চলে গেল অরবিন্দ?

নিজে চলে যাবে? এখুনি চলে যাবে এই কালো অন্ধকারে-ঘেরা শালবনের ভেতর দিয়ে, বালিমাখা জলঢাকার তীক্ষ্ণধারা পার হয়ে? কিন্তু মন তাতেও উৎসাহ পায় না। কে যেন তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষে কেড়ে নিয়েছে। একা চলে যেতে ভয় করে, ভয় করে আবার কোনো একটা নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে। জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়িদের এই ছোটো ঘরেই কি সে চিরতরে বাঁধা পড়ে গেল, হারিয়ে ফেলল পথ চলার ক্ষমতা? অরবিন্দ, এ সময়ে যদি অরবিন্দ থাকত…

কুলবীরের দোকানে কলরব ক্রমশ কমে আসছে। শিউকুমারীর হাসির আওয়াজ আর শোনা যায় না। শুধু মাঝে মাঝে ঠুন ঠুন করে মিষ্টি শব্দ। কাঠের বাক্সের উপর বাজিয়ে বাজিয়ে পয়সা গুণছে কুলবীর।

হঠাৎ কেরোসিনের টেমির আলো এসে মুখে পড়ে মহীতোষের। প্রদীপ হাতে বনরাজ্যের মালবিকা। চোখে সকৌতুক দৃষ্টি, চলো বাঙালিবাবু, ঘরে চলো। ওরা পালিয়েছে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো মহীতোষ উঠে পড়ে। ঠিক প্রথম দিনটির মতোই হাত বাড়িয়ে দেয় শিউকুমারী, এসো, এসো।

আর কিছু মনেও থাকে না। একটু আগেকার তীব্র হাসির জ্বালাটাও তেমনি করে আর কানের মধ্যে বিধতে থাকে না। এই মেয়েটা কি ওকে সম্মোহিত করে ফেলেছে?

দিন কাটছিল, কিন্তু আর কাটল না। জীবনের অপরিহার্য জটিলতা এসে দেখা দিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে পচাইয়ের দোকানে কাঠের কারবারি বলদেও আবির্ভূত হল। এক মুখ কুটিল হাসি বিস্তার করে বললে, ভালো আছ শিউ?

শিউকুমারীর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল, কুলবীর তাকাল সন্দিগ্ধ ভীত দৃষ্টিতে। সাংঘাতিক লোক বলদেও। পচাইতে তার নেশা নেই, কোনো মতলব না-থাকলে এদিকে পা দিত না সে। কিন্তু কী সে-মতলব?

কুলবীর অনুমান করবার চেষ্টা করতে লাগল।

বলদেও প্রতিপত্তিশালী লোক। যেমন কূটবুদ্ধি তেমনি নির্মম। তাকে ভয় না-করে এমন লোক নেই। তবু শিউকুমারী ভয় করেনি তাকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে তার হাত চেপে ধরে প্রণয় নিবেদন করেছিল বলদেও। বলেছিল, যত টাকা চাস…

কিন্তু কথাটা শেষ হয়নি। প্রকান্ড চড়টার বিভ্রম থেকে আত্মস্থ হয়ে বলদেও যখন মাথা তুলেছিল, তখন জলঢাকার বালিবিস্তারের উপর একটি প্রাণীরও চিহ্ন নেই। শুধু নদীর গর্জন পরিহাসের মতো বাজছে।

টাট্টু ছুটিয়ে বলদেও চলে গিয়েছিল। কিন্তু চড়ের জ্বালাটা যে সে ভোলেনি, সহজে ভুলবেও, একথা শিউকুমারীও জানত।

বিবর্ণ মুখে শিউকুমারী বললে, ভালোই আছি।

হুঁ, খুব ভালো আছ বলেই মনে হচ্ছে? আবার নির্মমভাবে বলদেও হাসল। ছোটো ছোটো চোখ দুটোয় ঝিকিয়ে উঠল পাহাড়ি প্রতিহিংসার সর্পিল চমক।

বলদেও নেশা করে না সহজে। কিন্তু আজ তার কী হয়েছে? ভাঁড়ের পর ভাঁড় নিঃশেষ করে চলল সে। একটা দশ টাকার নোট কুলবীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, চালিয়ে যাও থাগাজি।

রাত বেড়ে চলল। একে একে খরিদ্দারেরা চলে গেল সবাই, কিন্তু বলদেও ওঠে না। অধৈর্য হয়ে টাট্টুঘোড়াটা পা ঠুকছে বারে বারে, লেজের ঘা দিয়ে মশা তাড়াচ্ছে। জঙ্গলের পথে বুনো জানোয়ারকে ভয় করে না বলদেও। অমিত শক্তিমান লোক-ভোজালির ঘায়ে বাঘ মারতে পারে।

কী-একটা কাজে কুলবীর ঘরের মধ্যে ঢুকতেই বলদেও এগিয়ে এল। শিউকুমারীর চোখের ওপর রক্তাক্ত হিংস্র চোখ দুটো স্থির নিবদ্ধ করে বললে, ফেরারি আসামিকে ঘরে জায়গা দিয়েছ?

পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে গেল শিউকুমারীর, কে বলেছে তোমাকে?

আমাকে ফাঁকি দেবে তুমি? মুষ্টিগত শিকারের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে পরিতৃপ্ত জিঘাংসার আনন্দে বলদেও বললে, সাত-সাতটা চোখ আছে আমার। কালই খবর যাবে ফাঁড়িতে। শুধু ওই বাঙালিবাবু নয়, হাতে দড়ি পড়বে তোমার, দড়ি পড়বে থাপাজির।

শিউকুমারী আর্তনাদ করে উঠল।

বলদেও বললে, শোনো শিউ। এ খবর আমি ছাড়া কেউ জানে না। আমি তোমাদের বাঁচাতে পারি, রেয়াত করতে পারি বাঙালিবাবুকেও, কিন্তু দয়া করে নয়। আজ রাতে আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। যদি আস, কোনো ঝামেলা হবে না। যদি না আস, কাল সকলের হাতে দড়ি পড়বে।

শিউকুমারী তাকিয়ে রইল নির্বাক চোখে!

বলদেও খাপ থেকে বার করলে ঝকঝকে ভোজালিখানা, যেন উদ্দেশ্যহীনভাবেই তার ধার পরীক্ষা করলে এক বার। বললে, টাকার জন্যে ভেবো না। আমাকে খুশি করতে পার তো যা চাও তাই দেব। যুদ্ধের বাজারে কাঠের ব্যাবসা করেছি জান বোধ হয়। কিন্তু আজ রাতের কথা যেন মনে থাকে। যদি না যাও, কাল সকালে যা হবে তারজন্যে আমাকে দোষ দিয়ো না।

বলদেও টলতে টলতে উঠে পড়ল ঘোড়ায়। সাত সেলের তীব্র একটা হান্টিং-টর্চের আলোয় অরণ্য উদ্ভাসিত করে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।

কিন্তু এত ব্যাপার জানল না মহীতোষ। দড়ির খাঁটিয়ায় সে তখন অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বাইরে শালের পাতায় মর্মর তুলে বয়ে যাচ্ছে বাতাস, ঝোপড়ির ফাঁকে ফাঁকে স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে তার সর্বাঙ্গে। স্বপ্ন দেখছে সে। কীসের স্বপ্ন? ছাব্বিশে জানুয়ারির নয়, নাইনথ আগস্টেরও নয়। পতাকাবাহী উন্মত্ত জনতার তরঙ্গবেগ কোথায় চাপা পড়ে গেছে। বিস্মৃতির অতলতায়। জলঢাকার খরখরে বালির উপর বনজ্যোৎস্না। চোখে-মুখে জলের ছাট দিয়ে যে উড়ানির বাতাস দিচ্ছে, সে কি কোনো মর্মরমূর্তি? অথবা আকাশ থেকে স্বপ্নের পাখায় ভর দিয়ে নেমে আসা কোনো আলোকপরি?

চমকে ঘুম ভেঙে গেল! বুকের ওপরে কে যেন আছড়ে পড়েছে এসে। বড়ো বড়ো নিশ্বাস মুখের ওপর এসে পড়ছে, অনুভব করা যাচ্ছে তার উত্তেজিত প্ৰসরণশীল হৃৎপিন্ডের উৎক্ষেপ। কেরোসিনের টেমির আলোয় মহীতোষ দেখলে, শিউকুমারী!

চলো, পালাই আমরা। আমাকে নিয়ে চলো তুমি।

আকস্মিক উত্তেজনায় বিভ্রান্ত হয়ে মহীতোষ দু-হাতে পাহাড়ি মেয়েটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলে, কোথায় যাব?

শিউকুমারীর যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, অসহ্য আবেগে থরথর করে গলা কাঁপছে তার, যেখানে তোমার খুশি।

মহীতোষ ক্রমশ আত্মস্থ হয়ে উঠছে, কিন্তু কী করে নিয়ে যাব তোমাকে? এখান থেকে শুধুহাতে তো পালানো চলে না। পদে পদে বিপদ। সেসব এড়াবার জন্যে টাকা দরকার। অনেক দূর দেশে তো যেতে হবে, টাকা নইলে চলবে কী করে?

টাকা! শিউকুমারী উঠে বসল, কত টাকা চাই তোমার?

দুশো-তিনশো। তাহলে তোমাকে নিয়ে সিকিম চলে যেতে পারব, চলে যেতে পারব একেবারে গ্যাংটকে। সেই ভালো, সেখানে গিয়েই ঘর বাঁধব আমরা। যা পিছনে পড়ে আছে, পিছনেই পড়ে থাক। মহীতোষের যেন নেশা লেগেছে, নতুন করে জীবন শুরু করব আমরা।

দুশো-তিনশো! শিউকুমারী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কোথায় পাওয়া যাবে এত টাকা? কুলবীরের বাক্স হাতড়ালে কুড়িটা টাকার বেশি একটি আধলাও পাওয়া যাবে না, একথা তার চাইতে ভালো করে আর কে জানে।

মহীতোষ লোভীর মতো তার দিকে হাত বাড়াল।

কিন্তু সরে দাঁড়াল শিউকুমারী। দুশো-তিনশো টাকা! বলদেও আজ সারারাত প্রতীক্ষা করে থাকবে। চিন্তাগুলো একসঙ্গে আগ্নেয়গিরির গলিত ধাতুপুঞ্জের মতো ফুটতে লাগল। মাত্র এক বার। একটি রাত্রির অশুচিতা। তারপরে যে-জীবন আসবে তার পবিত্র নির্মল স্রোতে ধুয়ে যাবে সমস্ত, মুছে যাবে সমস্ত গ্লানি আর দুঃস্বপ্নের স্মৃতি।

মহীতোষ বললে, বুকে এসো।

টাকার জোগাড় করে আনছি। ঘর থেকে মাতালের মতো বেরিয়ে গেল শিউকুমারী। চিন্তার মধ্যে আগুন জ্বলে যাচ্ছে, যেন একপাত্র চড়া মদ খেয়েছে সে। দুষ্ট ক্ষুধা বলদেওয়ের। এক রাত্রের জন্য তিনশো টাকা খরচ করবে, এমন বেহিসাবি সে নয়। প্রতিশোধ নেবার জন্যে, যতদিন শিউকুমারীর যৌবন থাকবে ততদিন তাকে দলিত মথিত করে লুটে নেবার জন্যেই বলদেওয়ের এই কৌশল। এই ফাঁদে আরও অনেকেই পড়েছে, এটা কোনো নতুন কথা নয়।

কিন্তু শিউকুমারীর পক্ষে মাত্র এক রাত্রি। সমস্ত জীবনের জন্যে একটি রাত্রির চরম গ্লানি, চূড়ান্ত অপমানকে মেনে নেবে সে? তারপর কাল, পরশু? তখন হয়তো তারা ভুটানের পাহাড় পেরিয়ে চলেছে সিকিমের দিকে। সমস্ত শিরায় শিরায় তীব্র জ্বরের জ্বালা নিয়ে ডিলিরিয়ামের রোগী যেমন উঠে বসতে চায়, ছুটে যেতে চায়, তেমনি করেই শিউকুমারী অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আর বিছানার উপরে বিহবল হয়ে বসে রইল মহীতোষ। তার রক্তে রক্তে একী আশ্চর্য দোলা! যেন নিশি পেয়েছে তাকে। তার নিজের অতীত, তার জীবনের সংকল্প, সব মিথ্যা আর মায়া হয়ে গেছে। নতুনের আহ্বান—বহুবিচিত্র, বহু ব্যাপক অনাস্বাদিত জীবনের আহ্বান। এই পুলিশের তাড়া, এই বিব্রত বিড়ম্বিত মুহূর্তগুলো, এদের ছাড়িয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ক্ষতি কী? ক্ষতি কী নিজেকে ভাসিয়ে দিলে আশ্চর্য একটা অ্যাডভেঞ্চারের সমুদ্রে?

চাপা গলায় মহীতোষ ডাকলে, শিউ, শিউ।

কিন্তু শিউ এল না, এল অরবিন্দ। সত্যিই অরবিন্দ। জঙ্গলের মধ্য থেকে উঠে এল অমানুষিক মানুষ। মহীতোষের সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন বরফগলা জলের শিহরণ নেমে গেল।

মহীতোষের মুখের ওপর টর্চের আলো ফেলে বজ্রগর্ভ কঠিন আদেশের গলায় অরবিন্দ বললে, অনেক খুঁজে তোমার সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু এখানে বসে একটা পাহাড়ি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা ছাড়াও ঢের কাজ আছে তোমার। উঠে পড়ো।

বিহবল ভীত গলায় প্রশ্ন এল, কোথায়?

পঁচিশ মাইল দূরে। ভালো শেলটার আছে, দলের লোক আছে। ওখানে থেকে শহরে আণ্ডারগ্রাউণ্ড ওয়ার্ক বেশ করা চলবে। উঠে পড়ো।

এখনি?

হ্যাঁ, এখনি। মুখের মধ্যে চাপা দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল অরবিন্দের। বাঁ-হাতে দেখা দিলে ছোটো একটা কালো রিভলবার। তিন রাত পাহাড়িদের ঘরে কাটিয়েই কি আয়েশি হয়ে গেলে নাকি?

মহীতোষ কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল। রিভলবারের সংকেতটা অত্যন্ত স্পষ্ট।

অরবিন্দ বললে, বাইরে বড়ো ঘোড়া তৈরি আছে। দুজনকেই এক ঘোড়ায় উঠতে হবে। হারি আপ!

টর্চের আলো নিবে গেল। ঝোপড়ির মধ্যে নিঃসঙ্গ অন্ধকারে পচাইয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। দূরে ঝম ঝম করে প্রচন্ড শব্দে ভুটিয়ারা ঝাঁঝি বাজাচ্ছে—অপদেবতাকে তাড়াবার চেষ্টা করছে তারা। ঘোড়ার খুরের শব্দে কি অপদেবতার পদধ্বনিও মিলিয়ে এল?

চরম লাঞ্ছনা আর মর্মান্তিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সংগ্রহ করা তিনশো টাকার নোট। শিউকুমারীর হাতের মধ্যে ঘামে ভিজছে নোটের তাড়াটা। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে সে। কালো অন্ধকার, এক হাত দূরের মানুষ চোখে দেখা যায় না। শালের পাতায় শিরশিরানি, এখানে-ওখানে বন্যজন্তুর আগ্নেয় নয়ন।

মহীতোষ—এই কালো অন্ধকারে কোথায় মহীতোষকে খুঁজে পাবে শিউকুমারী? অরণ্য তাকে গ্রাস করেছে, নিঃশেষে তলিয়ে নিয়েছে নিজের মধ্যে। তবু অন্ধকারে শিউকুমারী খুঁজে ফিরছে। শালের চারায় পা কেটে রক্ত পড়ছে, কাঁটায় ছড়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ। এত অন্ধকার এমন দুচ্ছেদ্য তমসায় একটুখানি আলো যদি পাওয়া যেত!

আলো পাওয়া গেল ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর। পট পট করে পাতা পোড়ার শব্দ, বনমুরগির ভীত কলরব চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।বনজ্যোৎস্না নয়, দাবাগ্নি!

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor