Thursday, April 2, 2026
Homeরম্য গল্পমজার গল্পবনের ধারে - লীলা মজুমদার

বনের ধারে – লীলা মজুমদার

ছোটোবেলায় পাহাড়ে দেশে থাকতাম। চারদিকে ছিল সরল গাছের বন। তাদের ছুঁচের মতো লম্বা পাতা, সারা গায়ে ধুনোর গন্ধ, একটুখানি বাতাস বইলেই শোঁ শোঁ একটা শব্দ উঠত। শুকনো সময় গাছের ডালে ডালে ঘষা লেগে অমনি আগুন লেগে যেত; সরল গাছের ডালপালা ভরা সুগন্ধ তেল, সেও ধু ধু করে জ্বলে উঠত। বাতাসের মুখে সেই আগুন ছুটে চলত, মাইলের পর মাইল পুড়ে ছাই হয়ে যেত। ঘন সবুজ বন মাঝে মাঝে পুড়ে ঝলসে থাকত।

বনের ধারে যারা বাস করত তাদেরই হত মুশকিল। আগুনের দাপাদাপি বন্ধ করবার জন্য পাহাড়ের গোড়া থেকে চুড়ো পর্যন্ত, অনেকখানি জায়গা জুড়ে, গাছপালা কেটে ফেলে, চওড়া একটি ঘাসজমি করে রাখা হত। তার একদিকে আগুন লাগলে, অতখানি খোলা জায়গা পার হয়ে অন্য ধারে আগুন পৌঁছোনো শক্ত হত।

পাহাড়ের বাসিন্দারা ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে আগুনের সঙ্গে লড়াই করত। এক পাহাড়ের মাথা থেকে উঁচু গলায় কু-উই-ই বলে ডাক দিত। পাহাড়-দেশে এক চুড়ো থেকে আরেক চুড়োয় মানুষের পৌঁছতে হলে অনেক খানাখন্দ বন-বাদাড় ভেঙে যেতে হত, কিন্তু শব্দ পৌঁছোত এক নিমিষে। অমনি যত গাঁ খালি করে, সবাই মিলে, পাতাসুদ্ধ গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত পিটিয়ে পিটিয়ে আগুন নেভাতে।

আর বনের যত পশুপাখি, তারা সব দলে দলে বন ছেড়ে পালাতে চেষ্টা করত। বনের জানোয়ার আগুনকে যত ভয় করে, আর কিছুকে ততটা করে না। অন্য জানোয়ারের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা যায়, গাছের ডাল-পাতার রঙের সঙ্গে গায়ের রং মিশিয়ে দিয়ে। অন্য জানোয়ারের সঙ্গে লড়াই করা যায়, নখ দিয়ে, শিং দিয়ে, খুর দিয়ে, দাঁত দিয়ে। কিন্তু আগুনের কাছ থেকে পালানো ছাড়া আর উপায় থাকে না।

অন্য সময় জন্তু-জানোয়ারদের ভারি গর্ব; তাদের হারাতে গিয়ে মানুষকে নাস্তানাবুদ হতে হয়। একটা পাখি ধরবার জন্য কায়দা কত, একটা হরিণ মারবার জন্য কত তোড়জোড়। তাও সামনাসামনি সোজাসুজি নয়, লুকিয়ে জাল পেতে, খাবার দিয়ে ভুলিয়ে তবে-না পাখি ধরে; বন্দুক নিয়ে, শিকারি নিয়ে, বন পিটিয়ে তবে-না জানোয়ার মারে। আর তারা লড়ে খালি হাতে, শুধু তাদের জানোয়ারের বুদ্ধি আর জানোয়ারের শক্তি দিয়ে। কিন্তু আগুনের কাছে তাদের সব গর্ব খাটো হয়ে যায়। হুড়মুড় করে কাচ্চা-বাচ্চা বুকে চেপে, তারা বন থেকে বেরিয়ে পড়ে।

তবে পাহাড়-দেশের লোকেরা আগুন লাগার সময় জানোয়ার মারত না, সবাই মিলে আগুনের সঙ্গে লড়ত।

আমাদের দুধ দিত ডোরাক; শুকনো বুড়ো, মাথায় পশমের পাগড়ি বাঁধা, দু-কানে দুটি পলা পরা। তার বাড়ি ছিল বনের ধারে, ঘাসজমির গা ঘেঁষে। ঘাসজমির ঢালুতে তার গোরু-ছাগল চরত। তাদের গলায় ঘন্টা বাধা থাকত, সারা দিন পাহারা দিতে হত। বনের মধ্যে কত জানোয়ারের বাস কে তার খবর রাখে। তবে বড় জানোয়ার থাকলেও টের পাওয়া যেত না। ডোরাক বলত সহজে ওরা খোলা জায়গায় মানুষের বাসের কাছে আসে না, যদি-না খিদের তাড়নায়, কী তার চেয়েও প্রবল কোনো রাগের বশ হয়ে আর সব ভুলে যায়।

একবার ডোরাক আমাদের ওই বনের মধ্যে নিয়ে গেছিল। চারদিকে শীতের শেষের রোদ ঝিলমিল করছে, কিন্তু বনের মধ্যেটা ঘন ছায়ায় ঢাকা, পায়ের নীচের মাটিটা স্যাঁতসেঁতে, তার ওপর সরল গাছের পাতা পড়ে পুরু গালচের মতো হয়ে রয়েছে। সরল গাছের মিষ্টি ধুনোর গন্ধের সঙ্গে, কেমন একটা জানোয়ারদের উগ্র গন্ধ মিশে রয়েছে, কিন্তু কোথাও কাকেও দেখা যাচ্ছে না।

গাছের গোড়ায় প্রকাণ্ড সব ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে, ডালে ডালে ফিকে সবুজ আগাছা বুড়ো মানুষের দাড়ির মতো ঝুলে রয়েছে; ধরে একটু টানলেই পড় পড় শব্দ করে শেকড়সুদ্ধ উঠে আসে।

সেখানে ফিসফিস ছাড়া কথা কইতে ইচ্ছে করে না। ডোরাকের কানে কানে বললাম, তারা কোথায়?

ডোরাক আমাদের শুকনো পাতা দিয়ে মোড়া গাছের কোটর দেখাল। পাথরের ফাটলে নরম শুকনো শ্যাওলার বিছানা দেখাল। মাথার অনেক ওপরে গাছের ডালে পাতার মধ্যে অন্ধকারের ভেতর জটা মতন দেখাল। তার বেশি কিছু নয়। দূর থেকে অনেক বার যেন চকচকে চোখ দেখেছিলাম, কাছে গেলেই কিছু নয়; বোধ হয় যে যেখানে চোখ বুজে, ডানা মুড়ে বসে থাকে। মানুষকে তারা বড়ো ভয় করে।

বনের মাঝে মৌ গাছ দেখলাম। সে কোনো একরকম গাছই নয়। ঝাউ গাছ, সরল গাছের মাঝখানে একটা মস্ত মরা গাছ, ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, একটাও পাতা নেই। কিন্তু গাছের খাঁজে খাঁজে ফাটলে ফোকরে শত শত মৌচাক। আর চারদিকে মৌমাছিদের সে কী গুঞ্জন, কান যেন ঝালাপালা হয়ে গেল।

ডোরাক ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে আমাদের সাবধান করে দিল। কিছু দূরে নিয়ে গিয়ে বললে, ও গাছের সন্ধান এখনও কেউ পায়নি। জানলেই দলে দলে এসে, গভীর রাতে গাছের গোড়ায় আগুন দিত। মৌমাছিরা অমনি অন্ধের মতো সব চাক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ত, আর মানুষরাও সমস্ত মধু লুটেপুটে নিয়ে যেত। ডোরাক বললে, তোমরাও যেন কারো কাছে মৌ গাছের গল্প কোরো না। তাহলে লাখ লাখ মৌমাছির প্রাণ যাবে, মৌ গাছ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

পাথরের ফাঁকে ডোরাক দেখাল সবুজ সাপ ঘুমুচ্ছে। গায়ের আঁটো চকচকে খোলসটা ঢিলে হয়ে গেছে। ডোরাক বললে, সারা শীতকাল ঘুমুবে সাপটা। বললে, একসময় নাকি পুরোনো খোলসটা ছেড়ে দেবে, নতুন খোলস গজাবে। ক-দিন শরীরটা নরম তুলতুলে হয়ে থাকবে, একটু কিছুতেই ব্যথা লাগবে; তারপর নতুন খোলসটাও আঁটো, শক্ত, মজবুত হয়ে উঠবে। বললে, ভালুকরাও নাকি সারা শীত ঘুমিয়ে কাটায়।

ডোরাক আমাদের ওর বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেছিল, বাইরে দড়িতে শুঁটকিমাছ শুকুতে দিয়েছে দেখেছিলাম। বনের ধারে বাড়ি, উঠোন পেরুলেই ঘাসজমি, তার ওপারে ঘন বন। সেই দিকে চেয়ে চেয়ে আমরা কচি ছোলা মধু দিয়ে খেলাম।

তার আগের বছর ওই বনে আগুন লেগেছিল, তিন দিন ধরে কেউ নেভাতে পারেনি। মাথার ওপর আকাশটা রাঙা হয়েছিল। বাতাসের সঙ্গে ছাই উড়ে এসে ডোরাকের বাড়ির দাওয়াতে পড়ছিল। আগুনের আঁচ পেয়ে ডোরাকের গোরু-ছাগল পাগলের মতো হয়ে উঠেছিল। তাদের আর কিছুতেই বেঁধে রাখা গেল না। প্রথমটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু কাঁপতে থাকল, তারপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, খুঁটি উপড়ে, বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল। ডোরাকের বউ বলছিল, কাছে পিঠে আগুন লাগলে জন্তু-জানোয়ার বেঁধে রাখতে হয় না।

খুব কাছে আসতে পারেনি আগুন। পাড়ার সবাই মিলে অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে আগুন ঠেকিয়েছিল। ডোরাক এত ক্লান্ত হয়ে গেছিল যে, ঘুরে ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। দিক ঠাওর করতে পারছিল না। হঠাৎ দেখে বনের মধ্যে খানিকটা জায়গা ফাঁকা। হয়তো অন্য বছরের আগুনে অনেক গাছ পুড়ে গেছিল সেখানকার, তাদের জায়গায় চারাগাছ কয়েকটা বেরিয়েছিল, তবে চারা তেমন বাড়েনি।

খানিকটা দম নেবার জন্য ডোরাক সেখানে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর একটু বসেছিল। এমনি সময় হুড়মুড় করে বন থেকে অনেকগুলি জানোয়ার বেরিয়ে এল। তার মধ্যে একটা কালো ভালুকও ছিল, তার বুকে একটা ছানা।

খোলা জায়গায় এসে তারা থমকে দাঁড়াল, তারপর হয়তো মানুষ দেখেই যে যেদিকে পারে ছুটে পালাল। দিনের আলো কমে এসেছে, ডোরাক তাদের ভালো করে নজর করতে পারল না। কিন্তু মা ভালুটা সামনে পড়ে গেছিল, সে একেবারে পাথর বনে গেল। ছানাটা অমনি কুঁই কুঁই করে উঠল, ভালুক হঠাৎ চমকে উঠে তাকে ফেলে, নিমেষের মধ্যে কীরকম একটা চিৎকার করে, আবার জ্বলন্ত বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। কোথায় গেল তার নিজের ছানা?

ডোরাক অবাক হয়ে দেখল, এটা ভালুকছানা নয়। নিদারুণ ভয়ে ভালুকটা ভুল করে আর কারো ছানা তুলে নিয়ে এসেছে। কুকুরছানার মতো শুঁকে শুঁকে বাচ্চাটা একেবারে ডোরাকের কোলের কাছে এসে হাজির।

ডোরাক তাকে বুকে করে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। তার বুক, পেট, পায়ের ভেতর দিকটা নরম সাদা রোয়ায় ঢাকা, ওপরটা ফিকে হলুদ, তাতে মিহি একটু কালোর ছোপ ছোপ লেগে রয়েছে, মাথাটা গায়ের তুলনায় যেন একটু বড়ো মনে হল।

চিতা বাঘের ছানা। দু-পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডোরাকের হাঁটু চাটে। দুধ ছাড়া কিছু খায় না। ডোরাকের বউ কোলে নিলে তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বোধ হয় মাকে খোঁজে। বউয়ের মনটা কেমন করে। রাতে ডোরাকের কম্বলের তলায় ঢুকে ছানাটা ঘুমোয়।

তিন মাস ছিল ছানাটা। বেশ বড়ো হয়ে উঠেছিল, সারা গায়ে মোলায়েম কালো চাকা চাকা দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটেছিল। বাড়িময় একটা বাঘ বাঘ গন্ধ লেগে থাকত। বাইরের কুকুররা আর ভেতরে এসে জ্বালাতন করত না।

ছানাটাকে ওরা নিরামিষ খাওয়াত, দুধ, ভাত, ডাল, তরকারি। পাকা কলা খেতে ভারি ভালোবাসত। টক দইয়ের সঙ্গে পাকা কলা মেখে দিলে চেটেপুটে খেয়ে, ল্যাজ নেড়ে-টেড়ে একাকার করত।

বউয়ের বাবার নব্বই বছর বয়স, লাঠি ভর দিয়ে পাহাড়ময় টুকটুক করে ঘুরে বেড়াত। সে বলত, বাঘ পোষা যে সে কম্ম নয়। খবরদার যেন, রক্তের স্বাদ না পায়; শিরার ভেতরকার ঘুমোনো আগুন যেন জ্বলে না ওঠে।

এমনিধারা কথা বলত বুড়ো। আর ছানাটা উনুনের পাশে শুয়ে শুয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত। হলদে চোখের পেছনে মনে হত কে যেন বাতি জ্বেলেছে। কিছু বলত না কাকেও। মুরগিছানাগুলো ওকে একটুও ভয় পেত না, ওর পিঠে চড়ত।

ততদিনে শীত কেটে গেছে। চারদিকের পাহাড়গুলো সবুজ হয়ে উঠেছে। ন্যাড়া গাছে পাতার কুঁড়ি সব খুলে গেছে। রোদ ঝিকমিক করছে। সর্বজয়া গাছে কলি ধরেছে। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস দিচ্ছে। প্রজাপতিরা উড়ছে।

সারা সকাল ছানাটা বনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত। দুপুরে দই-ভাত না খেয়ে, কালো মুরগিটাকে ধরে সকলের চোখের সামনে কড়মড় করে খেয়ে ফেলল। কেউ বাধা দেবার আগেই কম্ম শেষ।

ডোরাকের বউ কেঁদেকেটে সারা; ওর মানতকরা কালো মুরগি, বাড়িতে এবার অকল্যাণ হবে। রাগ করে শেকল দিয়ে ছানাটাকে বেঁধে রাখল। রাতেও তাকে ঘরে তুলল না। শুল না সারাদিন ছানাটা, খালি বনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকল। পরদিন সকালে দোর খুলে বউ দেখে রাতে কখন শেকল ছিঁড়ে সে পালিয়ে গেছে।

ডোরাকের কাছে গিয়ে বউ কেঁদে পড়ল, যেমন করে পার, আবার ধরে আনো, আমি ওকে বেঁধে রাখব, মাংস খেতে দেব।

ডোরাক শুধু মাথা নাড়ল।

বউয়ের বুড়ো বাবা বলল, আমাদের জঙ্গল-দপ্তরের দরজার ওপর লেখা আছে, বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel