Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাবলিছে সোনার ঘড়ি – বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

বলিছে সোনার ঘড়ি – বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

লোকে ডাকে বড়লাট? মোহিনী একগাল হাসে।

কে মোহিনী?

আমাদের মোহিনী, মোহিনীমোহন। নিচের পাটিতে দাঁতের সংখ্যা কয়েকটা কমে গেছে। আগে দাড়ি রাখত না, এখন রাখে। এখন বয়স হয়েছে তিন কুড়ির কিছু বেশি। এ বয়স থেকেই মানুষ তিন-ঠেঙে হতে থাকে, কিন্তু মোহিনী এখনো দিব্যি দু ঠ্যাঙেই হিল্লি দিল্লী করতে পারে। দেখে মন হয়, বেশ মজবুত আছে ভিতরে মাল মশলা। সবাই জানে, মোহিনী জীবন শুরু করেছিল বিশাল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, বিশাল একটা মহীরূহের মতো নিজেকে বিস্তার করে যাওয়ার বাসনা নিয়ে। কিন্তু যৌবনকাল থেকেই দাসত্ব করেছে বাংলা দু নম্বরের।

ফলে যা হয়, খুব মেজাজী লোক বলে খ্যাতি আছে ওর। মোহিনীর নিজের ভাষায়, মানব জনম পেয়েছি তখন আর ছেড়ে কথা কই কেন! বাঁচতে হয়তো লাটের মতই বাঁচব। তাও আবার ছোটলাট নয়, বড়লাট। আর জীবনভর সাধনা করে যাব।

কি সাধনা।

প্রেমের সাধনা, ভালোবাসার সাধনা। বাই তারিফ করে যাবে, হ্যাঁ বড়লাটের মতই একজন মানুষ এই জগৎ সংসারে ভালোবেসে বেঁচেছিল বটে। সাবাস বড়লাট, সাবাস।

ফলে এসব ক্ষেত্রে যা হয়, পাঁচ পা-আলা গরুর পেছনে যেমন মানুষ লাগে, খোঁচায়, উত্যক্ত করে, লেজ ধরে টানে, ঠিক তেমনি মোহিনীকে দেখে ফোড়নকাটা লোকেরও অভাব হয় না। একটু ঝাল নুন মিশিয়ে গা জ্বালা করা কথা শোনাতে পারলে আর রক্ষা নেই, অমনি ঝিক্কর দেয় মোহিনী, এই শালা ফুটো শানকি, বেশি ফাঁচ ফ্যাচ করবি না বলচি। দুধ আর পিটুলি বুঝি এক!

মোহিনী যত রাগে ছেলে ছোঁকরারা তত রাগায়। ছেলে ছোঁকরাদের ভাষ্যি বড় খারাপ। মোহিনী তখন অবস্থা বুঝে কিছুটা বোধ করি থিতিয়ে যায়। দরদ ঢেলে বোঝাবার চেষ্টা করে জীবনের কথা। জীবন কি? জীবন কেমন? বাপ মায়ে তো জন্ম দিয়েই খালাস, কিন্তু বাঁচার মতো বাঁচতে পারে কজন? অথচ যে-জন ভজে, যে-জন সাধনা করে তার বাঁচায় যে সুখ সে সুখের স্বাদ কি করে পাবি তোরা? পাবি না।

বটে। তুমি পেয়েছ বুঝি বড়লাট?

পাইনি এখনো, তবে পেয়ে যাবো। বীজ বপন করলে যদি গাছ হয়, সাধনা করলে কি সিদ্ধি হবে না? আলবাত হবে। তবে কি জানিস? গণ্ডগোলটা হচ্ছে অন্যত্র।

কোথায়, কোথায়? হামলে পড়ে শুধায় সবাই।

মোহিনী বলে, গণ্ডগোলের মূলে হচ্ছে একটা শব্দ। কান পেতে একটু লক্ষ্য কর তোরাও শুনতে পাবি। শুনতে পাচ্ছিস?

কি শুনতে পাচ্ছিস?

শুনতে পাচ্ছিস না, আরে সেই যে একটা শব্দ, ঘড়ির মতো একটা শব্দ।

লো হাওয়া, কিসের ঘড়ি গো আবার?

সোনার ঘড়ি রে, সোনার ঘড়ি। সোনার ঘড়ি কি বলে জানিস না, বলিছে সোনার ঘড়ি টিক টিক টিক। ওই শালাই মনে করিয়ে দিচ্ছে সময় বড় অল্প।

ছেলে ছোঁকরারা অপরিসীম মজা পায়। তুমি শুনতে পাও বুঝি বড়লাট।

আমি একা কেন, স্বাই পায়। তবে শুনেও যদি কেউ না শোনার ভান করে আমি কি করতে পারি। আসলে বুঝলি, সেই বেটা ঘড়িআলাই যত নষ্টের। ডম্বরু বাজিয়ে ধেই ধেই করে নেচে যাচ্ছে। নাচছে, নাচছে আর নাচছে। আর নাচার তালে তালে শব্দ হচ্ছে।

বটে, বটে! তুমি তা হলে শুনতে পাচ্ছ বড়লাট, কিন্তু শুনে কোন আঁটিটা বাঁধছ? হি-হি।

এ্যই, ফের খারাপ কথা। বলেছি না খারাপ কথা মুখে আনবি না। বাঁচতে চাস তো এখনো তোদের সময় আছে সাধনা কর।

কার সাধনা গো, রামায়ণীর?

এবার যেন বুকের মধ্যে দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে : উক্তিটার মধ্যে মুখরোচক কিছু মশলা আছে। চেঁচিয়ে ওঠে মোহিনী, এই শালা ফুটো শানকি, বাপ মা

তোদের বৃথাই জন্ম দিয়েছিল দেখছি। সারাটা জীবন কাদা ঘেঁটে ঘেঁটেই গেল।

এইভাবে একবার ওকে চটাতে পারলে রসালো রসালো খিস্তি শোনা যায়, কিন্তু না চটিয়ে একটু ভ্যানতাড়া করলে পাওয়া যায় ক্ষীরসমুদ্রের সন্ধান।

আসলে যা সত্যি তা হচ্ছে মোহিনীর কোন পিছুটান নেই। পিছনে যে বয়সগুলো চলে গেল, সেগুলো তো আর ফিরে পাওয়ার উপায় নেই, মিছিমিছি কেবল জাবর কাটা। বরং যতক্ষণ তোমার শ্বাস আছে সামনের দিকে তাকাও, চলো চলো আর চলো। চরৈবেতি। তবে ওই যে রামায়ণীর কথা তুলে ওকে একটু টুসকি মারা হল, ওই রামায়ণীর প্রসঙ্গেই মোহিনী বড় দুর্বল। রামায়ণীর ভিতরে যে আগায় সেই আগুনের ছোঁয়া একবার যে পেয়েছে সে কি কখনো দুর্বল না হয়ে পারে!

ফলে প্রতিদিন সন্ধ্যা না হতেই রামায়ণীর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায় মোহিনী। আগে আগে বটতলায় সাত হাটের হাটুরেদের সঙ্গে গলাগলি করে বসে ভবতারিণীর সেবা করত, এখন আর ঢাকঢাক গুড়গুড়ের বালাই নেই। সোজা বোতল মুঠো করে রামায়ণীর দরজায় এসে ডাক পাড়ে, ও আমার সন্ধ্যামণি গো, দুয়ার খোল!

রামায়ণীও অপেক্ষাতেই থাকে। দরজা খুলে একঝক খুশির ঝলক হয়ে সামনে দাঁড়ায়, মোহিনীকে ঘরে এনে মাদুর পেতে বসতে দেয়, বসো। আজ যে বড় সকাল সকাল?

ঘরে একখানা লণ্ঠন জ্বলে। আর দেখা যায় খান কয়েক ছায়া, মানুষের না জন্তুর ঠিক বোঝা যায় না। জানালার ওপারে ঘুটঘুটি আঁধার জমে থাকে। কখনো কখনো মিঠেল মিঠেল হাসনুহানার গন্ধ ভেসে আসে, আবার কখনো আলোর টিপ, ঠাণ্ডা আলোর জোনাকি উড়তে উড়তে রামায়ণীর শাড়ির ভঁজে গা লুকোয়।

মোহিনী আয়েশ করে বসে। রামায়ণী একটা রুপোর পাত-মোড়া গড়গড়া এগিয়ে দে?। মোহিনী জানে ওটা কড়ি মোক্তারের কেনা। কড়ি মোক্তার আর বেঁচে নেই। কিন্তু গড়গড়াটা আছে বলেই মোক্তারের কথা মনে পড়ে। মোক্তার ওকে ভালবেসে আর কি দিয়েছিল কে জানে। রামায়ণী স্বীকার না করলেও মোহিনী জানে, অনেক টাকা ঢেলেছিল কড়ি মোক্তার। রামায়ণীর পিছনে মুঠো মুঠো টাকা খরচ করেছিল। কিন্তু কি এল গেল! শুকনো টাকা কড়কড় করে বসে বাতাসে উড়ে গেল। ডম্বৰু বাজিয়ে সেই শালা ঘড়িআলা তা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলে গেল, তাজ্জব সব ব্যাপার।

রামায়ণীর বয়স কম হয়নি, দু কড়ি পার তিন। এ বয়সে কাম মরে কামনা মরে। কত যে কামনা তা হিস্কে কষতে গেলে মাথা বনবন করে। অথচ কামনা থেকে জন্ম নিচ্ছে যত রাজ্যের অতৃপ্তি। শূন্য কুম্ভ শূন্যে রয়ে গেল চিরকাল।

আচ্ছা বড়লাট, একটা কথা শুধাই!

মোহিনী হাসে, আরক্ত চোখে তাকায়, নিজের কাছেই তো উত্তর আছে বাপু, আমায় কেন?

উত্তর থাকলে কি আর শুধাই। শোন না, এই রোজ সন্ধ্যা না হতেই আমার কাছে এসে হাজির হও, কি চাও?

মোহিনীর গলার নলি বেয়ে তপ্ত ঝলকে ঝলকে নেমে যায়, কি যে চাই, তা কি ছাই স্পষ্ট করে জানি নাকি! তবে হয়তো ভুলে থাকতে চাই। দু দণ্ড শুধু ভুলিয়ে রাখ দেখি আমাকে।

লোকে বড় নিন্দে-মন্দ করে যে?

এই লোকেই আবার পাঁচ মুখে একদিন প্রশংসা গাইবে। লোক মানেই তো নৈবিদ্যি কলা, যেমন সাজাবো তেমনি সাজবে, যেমন বসাবে তেমনি বসবে। হি হি করে হাসে মোহিনী।

কৌতুকে তাকিয়ে থাকে রামায়ণী, মাথাটা তোমার বিগড়ে গেছে বড়লাট।

মোহিনী আবার হাসে। হাসতে হাসতে চোয়াল ঝুলে পড়ে, কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো হাতের আঙুল গিঁট পাকায়। ছায়াগুলো বিকৃত হয়। বুকের ভেতর থেকে খুবলে বেরিয়ে আসে অদ্ভুত এক অনুভূতি। আসলে কি জানো, স্বপ্নে ছাড়া লোকটাকে আমি ধরতেই পারি না। বড় পেছু লেগেছে আজকাল।

কাকে ধরতে পারো না? কৌতুকে তখনও তাকিয়ে থাকে রামায়ণী।

কাকে আবার! সেই যে বেটা ঘড়িআলার কথা বললাম। সারাক্ষণ ঘড়ি হাতে ন কন করে ঘুরছে। চাবি দেয় আর চলে। ধেই ধেই করে কেবল নেচে বেড়ায়। সারাক্ষণ কেবল শব্দ। টিকিস টিকিস শব্দ, বুকের ভেতরে যেন পাড় দেয়।

ধুস, আবার সেই এক কথা। ছাই-ভস্ম ভেবে ভেবে মাথায় তোমার পোকা ধরে গেছে।

তরল আগুন নেমে আসে ঝলকে ঝলকে। কণ্ঠনালী বেয়ে বুকে বুক থেকে আরো নিচে। বোঝ আর বোঝ, সে বেটাই বড় জ্বালায়।

রাত গভীর হলে মোহিনী টলতে টলতে বাড়ি ফেরে। বাড়ির দরজায় তখন কৃষ্ণের জীব পাহারাদার একটা কুকুর। ল্যাজ নেড়ে উঠে দাঁড়ায়, ঘাম চাটে মোহিনীর। মোহিনী ওকে বুকে তুলে ধরে, আদর করে। রামায়ণীর কাছ থেকে সরে এসে রামায়ণীর কথাই বেশি করে মনে পড়ে ওর। কি যেন একটা যাদু মন্ত্র লুকোন আছে ওর ভিতরে, ঠিক মত হদিশ করতে পারে না মোহিনী।

টলতে টলতে কখন যেন ও আছড়ে পড়ে বিছানায়। তারপর নেশার ঝোকে দুলতে শুরু করে। দুলতে শুরু করে মাটি, আকাশ, গাছপালা, ফুল পাখি। দোলে, দোলে আর দেলে।

হঠাৎ। নিঃশব্দে সমস্ত দুলুনি ওর থেমে যায়। কে? কে বাবা কৃষ্ণের জীব। হাত বিছিয়ে দেহটাকে ও স্পর্শ করে। নিটোল একটা দেহ। হাঁ, পাথর খোদাই মসৃণ একটা অবয়ব। ধীরে ধীরে হাতের অনুভত্ব বোঝার চেষ্টা করে মোহিনী, কে রে হতে পারে! রামায়ণী নয়। রামায়ণীর আসার কথা নয় এখানে। তবে কি শৈল? শৈল তার পাখ ছাড়ান পাখির বাচ্চার মতো কাকলাস ছেলেটাকে মাই ধরিয়ে শুয়ে আছে ঘরের আর এক প্রান্তে। শৈলর লোহার গারদের মতো হাড় গিজগিজ করা বুক। অথচ এর বুক কত প্রকাণ্ড, কত ছড়ান। কে হতে পারে! এই কে আবার জ্বালাতে এলে গো মাঝরাতে?

কথা নেই, অন্ধকার ঘরে কেবল শব্দ। সোনার কলকজার একটা শব্দ; কোন সুদূর অনন্তকাল ধরে বয়ে চলে শব্দটা, আশ্চর্য।

ভোর হলেই আবার সব ফাঁকা। আকাশে দোল খাওয়া পাখিদের দিকে তাকিয়ে মাথার চুল ছেড়ে মোহিনী। যাহশালা মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল না তো। রাতে এসে সত্যি সত্যি যদি কেউ শুয়েছিল পাশে তবে চিহ্ন থাকে না কেন! নাকি নেশা, নাকি ঘোর, নাকি–

লোকে ডাকে, বড়লাট। কি গো বড়লাট ভালো?

মোহিনী হাসে, কে জানে বাপু, ভালো না মন্দ ঠিক বুঝতে পারি না।

তোমার ঘড়িআলা কেমন আছে?

মোহিনী গুম মেরে যায়। কথাটার মধ্যে একটু ব্যঙ্গ আছে। পরে গলা বাড়িয়ে পাল্টা নেয়, ফের ঘড়িআলার কথা! খারাপ কিছু বলেছ তো মুখ ছিঁড়ে নেব বলছি।

লে হাওয়া কথা না বলতেই চোটপাট, গাছে না উঠতেই এক কাদি নামিয়ে দিলে যে।

মোহিনী বোধহয় তার ভুল বুঝতে পারে। একটু নরম হয়। আসলে কি জানো বাপু, একটা গণ্ডগোলে পড়ে গেছি। তাই কি বলতে কি বলে ফেলি।

কি গণ্ডগোল গো? ঝামেলা না থাকলে বল না শুনি।

বলব! মোহিনী এপাশ ওপাশ তকায়। তারপর বলেই ফেলে। রাত হলে বাপু, এক শালা পাসে এসে দিব্যি আরামে ঘুমোয়। অথচ বেটাকে হদিশ করতেই পারি না। কে হবে বলো দেখি?

কে আবার, হাত বুলিয়ে দেখলেই তো পার।

তা কি আর বুলাই না। গায়ে হাত দিলেই কেমন যেন মাখম মাখম লাগে—

বটে বটে! খানাখন্দে হাত পড়ে না?

মোহিনী ঠিক ইঙ্গিত বুঝতে পারে না। চোখ গোল গোল করে তাকায়।

মানে ইয়ে আর কি! বুকের দিকটা উঁচু উঁচু?

মোহিনী এবার আরক্ত হয়। চেঁচিয়ে ওঠে, এই শালা ফুটো শানকি! হুড়কো দেখনি বুঝি, না! ভাগ, ভাগ বলছি।

অথচ মিথ্যে নয়, মোহিনীর জ্বালায় মোহিনীই ভুগছে। রামায়ণীকে একদিন কথাটা বলল মোহিনী, যদি ভরসা দাও তো একটা কথা বলি।

বলো।

কদিন ধরে বড্ড ঝামেলায় পড়েছি, সেই বেটা ঘড়িআলা—

আবার ঘড়িআলা! মরণ আমার।

আহা শোনই না। রাতে যখন শয্যা যাই, সেই শালা কৃষ্ণের জীব ঝাঁপটি মেরে পাশে এসে শুয়ে থাকে।

কে শোয়। রামায়ণী যেন আকাশ থেকে পড়ে।

বিশ্বাস করো। সেই শালা ঘড়িআলাই যে আমি বুঝতে পারি।

রামায়ণী কিছুক্ষণ চুপ মেরে লক্ষ্য করে ওকে। বুঝেছি, হয়ে এসেছে তোমার। বলি, একটা কথা শুনবে?

কি কথা?

এবার বরং ভালো দেখে একটা ওঝা ধরো। ওঝায় বিশ্বাস না কর, হেকিম আছে, কোবরেজ আছে, একটা কিছু বিহিত কর।

মোহিনী জানত, এই ধরনেরই উপদেশ দেবে লোকে। হো হো করে হাসে। তাই যদি করব, তা হলে আর তোমায় শোনাতে আসব কেন?

রামায়ণী বলে, ওই ঘড়িআলা কেবল তোমার ঘাড়েই চাপেনি, রক্তের মধ্যেও সেধিয়ে বসেছে। রাতে যখন দেহটা তোমার আলগা হয় ও বেটা তখন বেরোয়। আর দশজনের তো এমন হয় না।

আর দশজনের সঙ্গে তুলনা করছ! আবার হাসে মোহিনী। তুলনা ঠিক না, তবে–আচ্ছা, শৈল শোয় না তো পাশে?

মোহিনী বলে, শৈল শোয় তার ছেলে কোলে, ঘরের আর এক প্রান্তে। আমার শোয়া নাকি খারাপ, আমি নাকি হাত পা ছুড়ে মানুষ খুন করি।

তালে এক কাজ কর না, সন্দেহ রেখে আর লাভ কি! এবার যেদিন পাশে এসে শোবে দড়িগাছা দিয়ে পাশমোড়া করে বেঁধে ফেল। দশজনকে ডেকেঢুকে দেখাও।

মোহিনী বলে, তাই দেখাতে হবে দেখছি।

তক্কে তক্কে থাকে মোহিনী। সোনার ঘড়িটা শব্দ করে টিক টিক টিক…ঠিক ব্রহ্মতালুতে, শিরদাঁড়ায়, মনে হয় ঠিক বুকের এই কোমল জায়গায়, কিংবা রক্তের ভিজ্ঞ, কোষে কোষে মজ্জায় মাংসে হাড়ে, সোনার ঘড়িটা শব্দ করে, ঠিক কোন

জায়গা থেকে যে শব্দটা ভেসে আসে বুঝতে পারেনা মোহিনী।

কত বয়স হলো গো বড়লাট?

তা আজ্ঞে তিন কুড়ির কিছু বেশি?

তোমার সাধনা? কতদূর এগোলে হে শিল্পী?

তা আজ্ঞে…না, আর কোন জবাব পায় না মোহিনী। তা আজ্ঞে, বীজ বপন তো করেছি, ফলের আশায় দিন কাটাই।

আর কত কাল কাটাবে। সেই যে লোকটা পেছু লেগেছে চেননি তাকে? পারবে তাকে ঠেকিয়ে রাখতে?

নাহ্, এ সব কথা ভাবলেই শালা মাথাটা কেমন গরম হয়, চাদিটা কেমন ফটফাট করে। হাতে, পায়ে, কপালে, ঘাড়ে গিট পাকায়। কাঁকড়ার মতো হামলে পড়ে কাদা খোঁচাতে ইচ্ছে করে। বেশ খানিকক্ষণ ছটফট করে বেলাবেলিই আজ রামায়ণীর দরজায় এসে দাঁড়ায় মোহিনী।

ওমা গো! কি কপাল আমার! আজ যে বড় সূয্যি না ডুবতে?

চলে এলুম।

শৈলর সঙ্গে কষে ঝগড়া করেছ বুঝি?

শৈলের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে?

ওমা গো সে কি রকম! কি নিয়ে হলো?

ঝগড়া করার ইচ্ছে হল, করলাম। ছুতোর অভাব হয় নাকি?

রামায়ণী ওকে বসতে দেয়? এগিয়ে দেয় সেই গড়গড়া। কড়ি মোক্তারের কথা সারাদিনের পর আর একবার মনে পড়ে ওদের। জব্বর গড়গড়াটা কিন্তু।

লোকটাও ছিল জব্বর। অমন অকালে যে চলে যাবে জানতুম নাকি!

মোহিনী আবার গুম মেরে যায়। আসলে বুঝেছ, ওই ঘড়িআলাই যত নষ্টের গোড়া।

আবার ঘড়ি!

তরল আগুন গলা দিয়ে নামিয়ে দেয় মোহিনী। সত্যি কথায় বুঝি ভয়। তা বাপু সাধ করে কি আর বলি, বলায়।

বলায়, বেশ তবে বলল। রামায়ণী লণ্ঠন জ্বালে। ঘরের ভিতর কুড়িয়ে আনে ছায়া। বাইরেটায় আবার আঁধার জমে। হাসনুহানার গন্ধ। জোনাক জ্বলে ঠাণ্ডা আলোয়। মোহিনী বলে তার সাধনার কথা, ভজনের কথা। রামায়ণী কেবল হাঁ হাঁ করে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কেবল দেখে, বড় পাগল ভোলা। অথচ মুখে বলে না। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছায়া দেখে। ঘরের বেড়ায় ছায়া, মানুষের না জন্তুর ঠিক বোঝা যায় না। দুঃখ পায়, আহা, এমন পাগল ভোলা না হলে কি ঠাই পেতে এখনে।

রাত গভীর হয় বুক জ্বলতে থাকে মোহিনীর। বুকের আগুন গড়াতে গড়াতে উপচে পড়ে চোখ বেয়ে। গায়ের চামড়ায় রাম নামের অক্ষর হয় প্রকট। চোখ ঘুরিয়ে নেয় মোহিনী।

ঘড়িআলা যেন ঘরের বাইরে ওই অন্ধকারে কোথাও ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কলকজা নড়ে, শব্দ হয়, টিটি টিকটি…

মোহিনী উঠে দাঁড়ায়। ঢেউ শুরু হয়েছে দেহের ভিতরে। কাশি থেকে কাঞ্চি, কৌশল থেকে দ্বারকা; মাটি দুলছে, গাছ-পালা, পাখি, ফুল, প্রজাপতি, দুলছে, দুলছে আর দুলছে। ওর পাশে পাশে কে যেন হাঁটতে শুরু করে। কে? চমকে ওঠে মোহিনী।

আমি!

আমি কে?

আমি সেই ঘড়িআলা।

থমকে দাঁড়ায় মোহিনী। পাথর খোদাই একটা দেহ, মসৃণ। কাজল টানা চোখ, প্রশান্ত। মোহিনী বলে দাঁড়াও তো একটু দেখি।

সামনেই রয়েছে সাপের মতো রাস্তা। মাথার উপরে আকাশ, কালপুরুষ অসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে। বুনো বাতাসের গন্ধ এসে নাকে লাগে ওর। একটু দাঁড়াও না।

চৌমাথায় চলো। সোনার কলকজা নড়ে ওঠে, শব্দ হয় টিটি টিকটিক…

ঘড়িআলা সাপুড়ের মতো নাচে, নাচতে নাচতে এগোয়।

মোহিনী এগোয় পাশে পাশে; আহা দড়িগাছা যদি সঙ্গে থাকত তোমাকে বেঁধে রাখতাম, বেঁধে।

বেঁধে!

সবাইকে আমি দেখিয়ে দিতাম তোমাকে আমি বেঁধেছি। সবাইকে আমি দেখিয়ে দিতাম সাধনায় কি না হয়!

সোনার ঘড়ি শব্দ করে! হাতুড়ির মতো ঘা পড়ে ওর বুকে।

চৌমাথায় এসে দাঁড়ায় মোহিনী।

ঘড়িআলা?

বলো। তোমাকে যদি মনের মতো করে একবার হাতের কাছে পেতাম।

হয় মনে কর না, পেয়েছে। কি চাও?

দিনগুলিকে ফিরে পেতে চাই ঘড়িআলা, গোড়া থেকে আবার শুরু করতে চাই।

চাঁদের আলোয় ঝলমল করে বুক। কি বিশাল এখন চেহারা হয়েছে ঘড়িআলার। মোহিনী দেখে, ঘাড়ে পিঠ টান করে আলাদিনের দৈত্যর মাতো একটা মানুষ। মাথা ছুঁয়ে যাচ্ছে আকাশ, এলোমেলো এক মাথা চুল মেঘের মতো ভাসছে। কি বিশাল ছড়িয়ে আছে দুই বাহু। পায়ের কাছে নগণ্য মোহিনী, কত কত সামান্য, কত ছোট।

সোনার ঘড়ি শব্দ করে। হাতুড়ির ঘা বাজে ওর মাথায়।

ঘড়িআলা?

বলো।

কত বিরাট তুমি। কত উঁচুতে তোমার চোখ।

সোনার কলকজা নড়ে শব্দ হয়, টিকটিক্ টিকটিক্…

বল না কি কি দেখছ? আমি ঘাসের ডগা ছাড়া কিছুই দেখি না। কত ছোট আমি। অথচ লোকে ডাকে আমাকে বড়লাট।

ঘড়িআলা নাচের ভঙ্গিতে দোলে। আমার দেখার দাম নেই গো বড়লাট। এত উঁচুতে আমার চোখ, সব কিছু কেমন সমতল। কেমন যেন ধূসর।

ঘড়িআলা ডম্বৰু তুলে নেয় হাতে। নাচে, নাচে আর দোলে। বিরাট একটা পা, একপেয়ে হয়ে যায় ঘড়িআলা। যেন সেই পেতলের কাজ করা নটরাজের মূর্তি। ভয়ে কেমন শিটিয়ে গিয়ে ঘাসের ভেতর মুখ লুকায় মোহিনী।

তুমি বরং তোমার কথা বল। তিন কুড়ি পার হতে হতে কি দেখলে। তোমার সাধনার কথা শোনাও বড়লাট।

মোহিনী আরো গুটিয়ে যায়। সামান্য একটা পোকার মতো ছোট হতে হতে ঘাসের ভেতর নিজেকে যেন লুকিয়ে ফেলতে চায় মোহিনী।

সোনার কলকজা শব্দ করে। কি ভীষণ শব্দ। যেন হাড়গোড় গুঁড়িয়ে দেবে ওর। কী ভীষণ উদ্দাম নৃত্য করে চলেছে ঘড়িআলা। কি সর্বনেশে নাচ।

হঠাৎ এক সময় ককিয়ে উঠে মোহিনী। শীতল এক চাপ আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে। অর্থহীন কতগুলো শব্দ নিয়ে মিছিমিছি কিছুক্ষণ উঠে দাঁড়াতে চায়। অথচ পারে না। হিম শীতল বাতসের ঘায়ে সব সাধনা ওর জুড়িয়ে যায়।

সোনারঘড়ি শব্দ করে, টিটিক টিক্‌টিক…

ভোর হলে মাঠঘাট ভেঙে তোক ছুটে আসে চৌমাথায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বড়লাট? দেহটা যেন বরফ। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা রয়েছে এক কুচি ঘাস। শুকনো বাতাসে উড়তে উড়তে কয়েকটা গাছের পাতা বুকে এসে ঠেকে রয়েছে। চোলাই মদের গন্ধে বোধ হয় মিষ্টি একটা আমেজে লাল পিঁপড়ে কানের পাশ দিয়ে বেয়ে বেয়ে ঠোঁটের কাছে এসে ভিড় জমিয়েছে।

অথচ কেউই বুঝতে পারল না সেই ঘড়িআলারই কাণ্ড এটা। সোনার কলকজা নিয়ে কি সর্বনেশে খেলা খেলে চলেছে লোকটা। কেউ শুনতে পায় না সেই শব্দ, সেই বুক ফাটানো শব্দ টিক্‌টিক্‌ টিক্‌টিক্‌।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel