Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাবাবা - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাবা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাবা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাইরের ঘরের জানলা দিয়ে সকালবেলা বেশ সুন্দর রোদ্দুর আসে। ওটাই বসবার ঘর, আর ওটাই ছেলেমেয়েদের পড়বার ঘর। সকালবেলা হঠাৎ কোনও অতিথি এসে গেলে মুশকিল হয়, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর মাঝখানেই অতিথিকে বসিয়ে কথা বলতে হয়। নিতু, সিতু, মান্তুরা এই জন্য রাগ করে।

শীতকালে ওই সিল্কের চাদরের মতন রোদটা উপভোগ করবার জন্য জয়দেব নিজেই এসে বসেন ওই জানলার ধারে, খবরের কাগজ নিয়ে অনেকটা সময় কাটান। এটাও নিতু, সিতু, মান্তুদের পছন্দ নয়। মান্তু প্রায়ই বলে, বাবা, তুমি ভেতরে যাও না। তুমি থাকলে আমাদের পড়াশুনোর অসুবিধে হয়।

আজকাল ছেলেমেয়েরা বাবাকে একটুও ভয় পায় না। জয়দেবদের ছেলেবেলায় কাছাকাছি বাবার চটি জুতোর শব্দ শুনলেই ভয়ে বুক কাঁপত। বাবা ও জ্যাঠামশাই মাঝে-মাঝেই হুংকার দিতেন, এই ছেলেমেয়েরা, মুখ বুজে আছিস কেন, কী হচ্ছে ওখানে, চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে পড়! এখন নিতু, সিতু, মান্তুদের ওসব বালাই নেই। চেঁচিয়ে পড়ার কথা বললে ওরা হাসে। ওদের পড়াশুনোর ব্যাপারে বেশি নাক গলাতে গেলে চটে যায়। মান্তু একদিন বলেছিল, বাবা, তুমি তো সায়েন্স পড়েছিলে, তুমি ইকনমিকসের কী জানো? আমি কতটা পড়ছি, না পড়ছি তা তুমি কী করে বুঝবে?

অবশ্য ছেলেমেয়ে তিনটিই পড়াশুনোয় বেশ ভালো। প্রাইভেট টিউটর রাখতে হয় না। টপাটপ পাশ করে যায় শুধু না, ভালো রেজাল্ট করে। মান্তু স্কলারশিপ পেয়েছে।

তবু শীতকালের এই আরামটকু ছাড়তে রাজি নন জয়দেব। একতলার ফ্ল্যাটে আর কোনও ঘরে এরকম আলো হাওয়া ঢোকে না। জানলার ধারে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে তিনি বলেন, তোরা পড়াশুনো কর বা গল্প কর, যা খুশি কর, আমি কিছু শুনছিনা, আমি কাগজ পড়ছি!

বড় ছেলে সদ্য বদলি হয়েছে জামশেদপুরে, সেখানে সে একা থাকে। তার বউ ছেলেমেয়ে এখানে। দুটি যমজ নাতি মাঝে-মাঝে তাঁর ঘাড়ে চড়ে উপদ্রব করতে আসে। ওদের সঙ্গে খুনসুটি করতে-করতে, হাসতে-হাসতে জয়দেবের খেয়াল থাকে না, তখন মান্তু ধমক দিয়ে বলে, আঃ। বাবা, তোমার জন্য আমরা পড়তে পারছি না। কেউ কখনও শুনেছে, বাবার জন্য ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর ক্ষতি হয়?

মান্তুর স্বভাবটা প্রায় তার মায়ের মতন, সব কথার মধ্যেই ধমকের সুর। শুনতে জয়দেবের খারাপ লাগে না, অনেক দিনের অভ্যেস তো!

সাড়ে নটার সময় মান্তুরা একে-একে স্নান করতে যায়। দুপুরবেলা এই ঘরটা ফাঁকা। তখন

অবশ্য রোদ পোহাবার দরকার থাকে না। কলকাতার শীতে দুপুরের রোদ আরামদায়ক নয়। তবু দুপুরবেলা জয়দেব এই ঘরেই অনেকটা সময় কাটান। রিটায়ার করার পর থেকে তাঁর খুব বই পড়ার ঝোঁক হয়েছে। অন্য কোনও বই না পেলে তিনি এক-একদিন ছেলেমেয়েদের বই ঘেঁটে দেখেন পড়ার মতন কিছু আছে কি না।

সদর দরজাটা খোলা, তবু কলিংবেল বাজল। এই জানলা দিয়েই পুরো রাস্তাটা দেখা যায়। জয়দেব মুখ বাড়িয়ে দেখলেন, সদ্য পাট-ভাঙা ধুতি ও পাঞ্জাবি পরা একজন সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। একে আগে কখনও দেখেননি জয়দেব।

তিনি জানলা দিয়ে জিগ্যেস করলেন, এই যে ভাই, এদিকে আসুন। বলুন কাকে খুঁজছেন?

যুবকটি সরে এসে বলল, উজ্জয়িনী আছে?

মান্তুর ভলো নাম উজ্জয়িনী। জয়দেব টেবিলের ওপর টাইমপিসটা দেখলেন। মান্তু স্নান করে খেয়ে বেরিয়ে গেছে কি না তিনি খেয়াল করেননি, তবে এখনও সাড়ে দশটা বাজেনি।

একবার বাইরের দু-তিনটি ছেলেমেয়ে এরকম মান্তুর খোঁজ করতে এসেছিল, জয়দেব দরজার সামনে থেকেই মান্তু, বলে চেঁচিয়ে ডেকেছিলেন বলে মান্তু খুব রাগ করেছিল। বাইরের লোকের সামনে তার ডাকনাম ধরে ডাকা ঠিক হয়নি। তা ছাড়া, ওরকম চেঁচিয়ে ডাকাও নাকি। আজকালকার প্রথাবিরুদ্ধ। কিন্তু মান্তুকে তো তিনি কোনওদিন উজ্জয়িনী বলে ডাকেননি, জিভে কেমন যেন আটকে যায়। মান্তু বলেছিল, যদি আমাকে কখনও উজ্জয়িনী বলে না-ই ডাকবে, তা হলে ওই নামটা রেখেছিলে কেন? শুধু মান্তু নাম রাখলেই পারতে! বাবা-মায়ের দেওয়া নাম বুঝি শুধু অন্যদের জন্য?

জয়দেব যুবকটিকে বললেন, আপনি ভেতরে এসে বসুন, আমি দেখছি।

যুবকটি বললেন, না, না। আমি বসব না, শুধু একটা কথা বলে চলে যাব।

জয়দেব ভেতরে চলে গেলেন। এখনও বেরিয়ে যায়নি মান্তু, খেতে বসেছে।

জয়দেব তার পাশে গিয়ে মুচকি হেসে বললেন, এই যে উজ্জয়িনী দেবী, খুব সুন্দর দেখতে তোমার এক বন্ধু তোমাকে ডাকছেন!

মান্তু এবং তার মা একই সঙ্গে বলে উঠল, কে?

জয়দেব বললেন, নাম তো জানি না। আগে কখনও দেখিনি।

মান্তু ভুরু কুঁচকে দু-এক মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর এঁটো হাতেই সে ছুটে গেল দরজার কাছে। তার পরেই এক অদ্ভুত বিস্ময়ে চিৎকার করে বলল, ওমা, আপনি? আসুন, আসুন, বসবেন। আসুন! না, না, একটু বসতেই হবে। এক মিনিট, প্লিজ, আমি হাতটা ধুয়ে আসছি।

বাকি ভাত-টাত আর খেলেই না মান্তু, ফিরে এসে হাত-মুখ ধুতে-ধুতে বলল, মা, একটু চা হবে?

মেয়ের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় বাবার উপস্থিত থাকার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। জয়দেব শুধু একবার বসবার ঘরে ফিরে এলেন খবরের কাগজটা নেওয়ার জন্য। কুণ্ঠিতভাবে তিনি। আগন্তুকটির দিকে একটু হাসি দিয়ে কাগজটি তুলে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন তাড়াতাড়ি।

একটা ব্যাপারে তাঁর মজা লাগল। যে মান্তু বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে সবসময় বকে-বকে কথা বলে, এখন তার গলা দিয়ে কী মিষ্টি সুর বেরুচ্ছে। ছেলেটিকে দেখে মান্তুর মুখেও খুব গদগদ ভাব।

হিমানী জিগ্যেস করলেন, কে এসেছে? মান্তুর ইউনিভার্সিটি যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে না?

জয়দেব দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন, আমি তোনাম জানি না। তুমি গিয়ে নাম জিগ্যেস করে এসো, কিংবা মাকে বলল যে ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে!

হিমানী একটা রাগের মুখভঙ্গি করলেন। হিমানীরও বাইরের লোকের সামনে মাকে এরকম কথা বলার সাহস নেই!

বাবা কিংবা মা কেউই মান্তুকে শাসন করতে পারে না। ইউনিভার্সিটিতে ওঠার পর থেকে মান্তু যখন খুশি বাড়ি থেকে বেরুতে পারে। এক একদিন রাত সাড়ে-আটটা, ন-টার সময় বাড়িতে ফেরে, মাঝখানে একবার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে শান্তিনিকেতন ঘুরে এল দুদিনের জন্য, সেই বন্ধুদের দলে দু-একটি ছেলেও ছিল। কিন্তু মান্তুর মুখে এমন একটা সারল্যের তেজ আছে যে তাকে বকুনি দেওয়ার উপায় নেই। মান্তুর পক্ষে কোনও অন্যায় কাজ করা যেন সম্ভবই নয়। শান্তিনিকেতনে গিয়ে ওরা থাকার জায়গা পায়নি। পাঁচজন ছেলেমেয়ে মিলে বোলপুরের এক হোটেলে একটা ঘরে রাত কাটিয়েছে। মান্তু নিজেই এই গল্প শুনিয়েছে মজা করে, যেন এ কাহিনি শুনে বাবা মায়ের মনে করার মতন কোনও ব্যাপারই থাকতে পারে না।

আজকের ছেলেটিকে জয়দেবের বেশ পছন্দ হয়েছে। আজকাল ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ইয়াংম্যান তো দেখাই যায় না। শুধু সেজন্য নয়, ওর মুখে বেশ একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে, দেখলেই বোঝা। যায় ভালো পড়াশুনো জানে। জোর করে ধরে বেঁধে, কিংবা নিজেরা সম্বন্ধ করে মান্তুর যে বিয়ে দেওয়া যাবে না, তা জয়দেব আর হিমানী দুজনেই জানেন। সে চেষ্টাও তাঁরা করবেন না। কী একটা প্রসঙ্গে মান্তু একদিন হিমানীকে বলেছিল, আমার যেদিন ইচ্ছে হবে সেদিন যাকে খুশি। বিয়ে করব, তোমরা তার আগে একটি কথাও উচ্চারণ করতে পারবে না।

তবু হিমানী মেয়ের বিয়ের চিন্তা করেন। রাত্তিরে শুয়ে-শুয়ে জয়দেবকে বকুনি দেন। জয়দেবকে তখন বলতে হয়, মান্তু যাকে পছন্দ করবে, সে কক্ষনো খারাপ হতে পারে না।

আজকের এই যুবকটিই যদি মান্তুর সেই পছন্দের পাত্র হয়, তা হলে দুজনকে সুন্দর মানাবে!

সন্ধেবেলা জয়দেব জিগ্যেস করলেন, আজ যে ছেলেটি এসেছিল ওর নাম কী রে?

মান্তু ভুরু তুলে বললেন, ছেলেটি? কোন ছেলেটি? অরুণাভ রায়? বাবা, তুমি কী আশ্চর্য, অত বড় একজন লোক, তাকে তুমি ছেলে বলছ? তোমার চোখে কি সবাই বাচ্চা? তুমি এমন কিছু বুড়ো হওনি!

জয়দেব হাসতে-হাসতে বললেন, তোর বন্ধু তো, সেই জন্যই ছেলে বললুম। রাস্তায় ঘাটে এমনি দেখলে ভদ্রলোক বলতুম!

মান্তু একইরকম বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, আমার বন্ধু? তুমি পাগল হয়েছ? উনি অরুনাভ রায়, কত বড় নামকরা লোক, উনি যে নিজে আমাদের বাড়িতে আসবেন, আমি প্রথমে চোখে দেখেই বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার সঙ্গে একদিন মাত্র আলাপ হয়েছিল।

—খুব নামকরা লোক? সিনেমা করেন বুঝি?

—বাবা, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না! সিনেমার লোকের সঙ্গে আমি আলাপ করতে যাব কেন, তারাই বা কেন আমাদের বাড়িতে আসবে? অরুণাভ রায় খুব বড় একজন কবি, যৌবন পত্রিকার সম্পাদক, তোমরা তো কিছু পড়োনা, তাই নাম জানো না! ওঁকে নিয়ে আমাদের এই গলি থেকে বেরুতেই একটি ছেলে ওঁর কাছে অটোগ্রাফ চাইল!

জয়দেব সত্যিই অরুণাভ রায়ের নাম শোনেননি। যৌবন পত্রিকাও চোখে দেখেননি।

তিনি এবারে মেয়েকে একটু ধমক দিয়ে বললেন, তা ওরকম একজন নামকরা লোক বাড়িতে এসেছিলেন, আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলি না কেন?

—তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে তুমি কী কথা বলতে? তুমি তো ওর একটা লেখাও পড়নি? তুমি ওর নাম শুনে চিনতে পারবে না, উলটো-পালটা কীসব বলে ফেলতে…

হিমানী শ্লেষের সঙ্গে বললেন, কবিদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সবসময় বুঝি কবিতার কথা বলতে হয়, অন্য কোনও বিষয় নিয়ে ওঁরা কথা বলেন না!

জয়দেব বললেন, আমি ঠিক কথা বলতে পারতুম! জানিস, একসময় আমিও কবিতা লিখতুম?

—বাবা? তুমি? কবিতা লিখতে?

মান্তু এবারে হেসে সারা শরীর দোলাতে লাগল। যেন এরকম মজার কথা সে সারা জীবনে শোনেনি। বাবা শ্রেণির লোকেরা কবিতা লিখবে, এরকম অবিশ্বাস্য ব্যাপার যেন হয় না। তার ধারণা, কবিরা চিরযৌবনের প্রতীক, তারা কখনও বাবা বা জ্যাঠামশাই হয় না।

—তুমি সারা জীবন রেলের চাকরি করে এলে, তুমি কবিতা…

–রেলে চাকরি করলে বুঝি কবিতা লেখা যায় না? তোর মাকে জিগ্যেস করে দ্যাখ!

হিমানী এই সময় ব্যস্ততার ভান দেখিয়ে বললেন, যাঃ, যত সব পাগলের কাণ্ড!

বিয়ের পর চাকরি জীবনে প্রথম ট্রান্সফার হয়ে আদ্রা জংশনে থাকার সময় জয়দেব মেঘদূতের যক্ষের স্টাইলে হিমানীকে লম্বা-লম্বা কবিতায় চিঠি লিখতেন। সে চিঠিগুলো হিমানী নষ্ট করেননি। কয়েকদিন আগেও বড় ট্রাঙ্কটা গোছাবার সময় সেই পত্রকাব্য বেরিয়ে পড়েছিল। জয়দেব সেগুলি পড়ছিলেন আর হিমানী বারবার তাড়া দিয়ে বলেছিলেন, এই, কী করছ কী, ওগুলো ভেতরে রেখে দাও, ছেলেমেয়েরা দেখে ফেলবে!

পরদিন দুপুরে, যদিও বসবার ঘরে কেউ নেই, তবু অনেকটা চোরের ভঙ্গিতে জয়দেব মান্তুর খাতাপত্র ঘাঁটতে লাগলেন। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন, মান্তু কবিতা লেখে, তার দু খানা খাতা ভরতি শুধু কবিতা। পাতা উলটে-উলটে সেগুলো তিনি পড়লেন অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু কিছুই প্রায় বুঝতে পারলেন না। এসব আধুনিক কবিতা, ছন্দ নেই, মিল নেই, মাথামুণ্ডু কিছুই। নেই মনে হয়, কারা এসব পড়ে কে জানে! তবু পড়তে পড়তে জয়দেব গভীর বিস্ময় বোধ করতে লাগলেন। এইসব অদ্ভুত, জটিল সব বিষয়, চিন্তা, শব্দ মান্তুরই তো মাথা থেকে বেরিয়েছে। যতই বড়-বড় ভাব করুক, মান্তু তো এখনও ছেলেমানুষই, ভূতের গল্প শুনলে বা পড়লে রাত্তিরবেলা। একা একা বাথরুমে যেতে ভয় পায়, পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবার আগের দিন এখনও কেঁদে কেঁদে চোখ ফোলায়, পাগলের মতন আচার খেতে ভালোবাসে, সেই মান্তুর একটা আলাদা চিন্তার জগৎ আছে, যা বাবা হয়েও জয়দেব কিছুই জানেন না।

কখন লেখে মান্তু এসব কবিতা? এক একদিন মান্তু অনেক রাত জেগে পড়ে, সেই পড়াশুনো করার নামেই সে এসব লিখে-লিখে পাতা ভরায়। মান্তুর কবিতা কি ছাপা হয়েছে কোথাও? নইলে আধুনিক কবি অরুণাভ রায় দেখা করতে এল কেন মান্তুর সঙ্গে?

মান্তুকে এই কথাটা জিগ্যেস করতে হবে অনেক কায়দা করে। জয়দেব লুকিয়ে-লুকিয়ে মান্তুর কবিতার খাতা দেখেছেন, এটা জানতে পারলে মান্তু রেগে আগুন হবে।

দুপুরবেলা হিমানী সিনেমা দেখতে গেলেন তাঁর বোনের সঙ্গে। দুপুরে জয়দেবের আর কাটতে চায় না কিছুতেই। তাঁর দুপুরে ঘুমোনো অভ্যেস নেই, কিন্তু সিনেমা দেখতে গেলেই তাঁর চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে, সেই জন্য হিমানী তাঁর স্বামীকে সিনেমায় নিয়ে যেতে চান না! তা ছাড়া বাড়ি পাহারা দেওয়ারও ব্যাপার আছে!

ফাঁকা বাড়ি, দোতলার বাড়িওয়ালারাও পুরীতে বেড়াতে গেছে, রাস্তায় আজ কোনও ফেরিওয়ালার ডাকও শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। নাতি দুটোও বাড়িতে নেই। জয়দেব যেন কোনওদিন এমন একা বোধ করেননি। একবার তিনি এ ঘরে গিয়ে বসছেন, আবার অন্য ঘরে যাচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল।

বড় ট্রাঙ্কটা খুলে তিনি পুরোনো চিঠিগুলো আবার পড়তে লাগলেন। মোট আটখানা কবিতা। তখন জয়দেবের বয়েস ছিল সাতাশ আর হিমানীর একুশ। পড়তে-পড়তে মৃদু-মৃদু হাসতে লাগলেন জয়দেব। তাঁর মনে পড়ে গেল, এক রাত্তিরেই তিনি হিমানীকে তিনখানা চিঠি লিখেছিলেন।

এই কবিতাগুলো ছাপানো যায় না? হিমানীর নামটা বাদ দিয়ে দিতে হবে অবশ্য। কিন্তু কবিতাগুলো মোটেই খারাপ হয়নি, যা সব লেখা হচ্ছে আজকাল, সেই তুলনায় লোকে এই কবিতা পড়ে মানে বুঝবে, আনন্দ পাবে।

সাদা কাগজ নিয়ে জয়দেব দুটি কবিতা কপি করলেন। তারপর একটা নতুন কবিতা লিখে। ফেললেন। নিজের এই ক্ষমতায় নিজেই অবাক হলেন তিনি। বাঃ, বেশ এসে যাচ্ছে তো লাইনগুলো, প্রায় তিরিশ-বত্রিশ বছর তিনি বাংলায় প্রায় কিছুই লেখেননি। কিন্তু ভুলে যাননি কিছুই। ইস্কুল-কলেজে তিনি বাংলায় ভালো ছাত্র ছিলেন, তাঁর বানান ভুল হয় না।

নতুন কবিতাটি লেখা সবে শেষ করেছেন, এই সময় বেল বেজে উঠল। যমজ নাতি দুটিকে নিয়ে তাঁর পুত্রবধূ দু-দিন আগে বোধহয় বাড়ি গিয়েছিল, তার বাপের বাড়ি পাশের পাড়াতেই, সে বোধহয় ফিরে এসেছে।

জয়দেব দরজা খুলে অবাক হলেন, মান্তু। সে কোনওদিন এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে না। মেয়েটার শরীর খারাপ হয়নি তো?

মান্তু ভালো করে উত্তর দিল না বাবার প্রশ্নের। সে খুব অন্যমনস্ক। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস বন্ধ হয়ে গেছে, তাই সে ফিরে এসেছে।

জয়দেব হেসে জিগ্যেস করলেন, কফি হাউসে আড্ডা দিতে গেলি না?

মান্তু গভীরভাবে বলল, নাঃ।

বেশ কিছুক্ষণ মান্তু বাথরুমে সময় কাটাল, তারপর বেরিয়ে সে দুকাপ চা বানাল। জয়দেব আবার লিখতে বসেছিলেন। চায়ের কাপ নিয়ে তিনি মান্তুকে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি লেখার ওপর একটা বই চাপা দিলেন।

চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে তিনি জিগ্যেস করলেন, হ্যাঁরে, মান্তু, তোর বন্ধু ওই যে অরুণাভ রায় যৌবন বলে পত্রিকা বার করেন, সেই পত্রিকা একটাও আছে তোর কাছে?

মান্তু বলল, হ্যাঁ, অনেক আছে।

—কোথায় রেখেছিস? একটু দিবি আমাকে, পড়ে দেখব!

—ও তোমার ভালো লাগবে না।

—কেন ভালো লাগবে না? বুড়ো হয়েছি বলে কি যৌবনের কথা পড়তে ভালো লাগে না? বুড়ো বয়সের চেয়ে যৌবনের কথা চিন্তা করতেই তো ভালো লাগে।

—সেজন্য নয়। ওসব লেখা অন্যরকম। বাবা, একটু বাদে আমি আবার বেরুব, ফিরতে ফিরতে হয়তো আটটা-নটা বেজে যাবে। তোমরা চিন্তা কোরো না!

—কোথায় যাবি রে?

বাবার দিকে কয়েক পলক চেয়ে রইল মান্তু। মিথ্যে কথা তার মুখে দিয়ে বেরোয় না। আবার এমন অনেক কথা থাকে, যা বাবা-মাকে বলা যায় না বা বলার কোনও মানে হয় না।

–দু-একজন বন্ধুর সঙ্গে হাওড়ায় শালকে-তে যাব।

—শালকে যাবি? কেন, হঠাৎ? ওটা কি একটা বেড়াবার জায়গা হল?

–বেড়াতে নয়, একটা মিটিং আছে।

—মিটিং? কীসের মিটিং? তুই পলিটিকস করছিস নাকি? যাসনি তো আগে কোনওদিন।

সেরকম মিটিংনয়। এটা সভা, মানে সাহিত্যসভা।

—অরুণাভ রায় সেখানে যাবে?

—ইয়ে, হ্যাঁ, উনিও যাবেন, হঠাৎ ওঁর কথা জিগ্যেস করছ?

—ওকে দেখে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। অরুণাভ রায় ওখানে কবিতা পড়বেন বুঝি?

—হ্যাঁ। অরুণাভ রায়ের একটা সম্বর্ধনা হবে। উনি কবিতা পড়বেন, আরও অনেকে পড়বে।

—চল না। আমিও তোর সঙ্গে যাই। একটু দেখে আসি!

এইবার মান্তুর রেগে ওঠার পালা। সবচেয়ে যেটা সে বেশি অপছন্দ করে, তা হল অবিশ্বাস। একটু দেখে আসি মানে? বাবা কি ভেবেছেন সাহিত্যসভার নাম করে সে অন্য কোথাও যাচ্ছে? কিংবা সে একা-একা শালকে যেতে পারে না? সে কি কচি খুকি?

মান্তুর মেজাজের উপক্রম দেখেই ভয়ে পেয়ে জয়দেব বললেন, না, না, আমি তা বলিনি, আমি ভেবেছিলাম, তোর সঙ্গে গিয়ে আমিও কবিতা শুনব, আমার ইচ্ছে করে, তুই বিশ্বাস করলি না, আমিও কবিতা লিখেছি এককালে। এখনও লিখতে পারি। আমার একটা কবিতা পড়ে দেখবি?

মান্ত হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কই দেখি?

জয়দেব বসে আছেন বেতের চেয়ারে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে কবিতাটা পড়তে লাগল মান্তু! বাথরুম থেকে বেরুবার পর তার আলগা করে শাড়ি পরা, চুল সব খোলা, ভুরু দুটো কোঁচকানো।

জয়দেবের বুক ঢিপঢিপ করছে। মান্তু যেন বিচারক, একটু পরেই রায় দেবে। এই মেয়েকে তিনি জন্ম দিয়েছেন যেন বিশ্বাসই করা যায় না। যখন পুঁচকে একরত্তি ছিল, তখন কী কান্নাই কাঁদত। একবার তিনি মান্তুকে কোলে নিয়ে তাঁর শ্যালিকার বিয়েতে গিয়েছিলেন, মান্তু হিসি করে তাঁর জামা-টামা ভিজিয়ে দিল…মনে হয় যেন সেদিনের কথা।

কবিতাটি পড়া শেষ করে কোনও মন্তব্য না করে মান্তু সেটি ফিরিয়ে দিল। জয়দেব ভাঙা গলায় জিগ্যেস করলেন, কেমন হয়েছে রে? ছাপালে লোকে পড়বে না?

মান্তু বলল, তোমাদের আমলে যে-সব পত্রিকা ছিল, প্রবাসী, বসুমতী, ভারতবর্ষ, সেসব পত্রিকা থাকলে বোধহয় ছাপা হত। কিন্তু সেরকম পত্রিকা তো এখন আর নেই। কে ছাপবে?

—কেন, তোদের ওই অরুণাভ রায়ের পত্রিকায় দিলে ছাপাবে না?

—না!

—তুই কী করে জানলি ছাপাবে না? আমি অরুণাভ রায়কে দেখাব? তুই বলতে চাস একেবারেই ভালো হয়নি?

—ভালো হয়নি তা তো বলছি না, বাবা! হ্যাঁ, ভালো হয়েছে। তুমি তো বেশ ছন্দ-টন্দ জানো দেখছি। কিন্তু এখনকার কবিতা অন্যরকম। তোমার কবিতা রাবীন্দ্রিক স্টাইলের, ওসব এখন অচল!

—তুই বললেই হল অচল! রবীন্দ্রনাথ অচল!

–রবীন্দ্রনাথ অচল তা তো বলিনি। কালিদাস কি অচল? তাও না।

–কিন্তু কালিদাস বা রবীন্দ্রনাথের স্টাইলের এখন আর লেখা চলে না।

—আমি যদি তোদের শালকের সভায় আমার কবিতা পড়ে শোনাই, দেখব লোকে কী বলে?

—বাবা, তোমার ওখানে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

—কেন, একটা সভা হচ্ছে সেখানে সবাই যেতে পারে না? কেউ যদি কবিতা পড়তে চায়।

—ঠিক আছে তা হলে তুমি যাও, আমি যাব না!

কয়েক মুহূর্ত থেমে গিয়ে মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন জয়দেব! তাঁর বুক অভিমানে ভরে গেল। মেয়ের মুখের বকুনি তিনি কোনওদিন সিরিয়াসলি নেননি। সবসময় কৌতুকই বোধ। করেছেন, কিন্তু আজ যেন মান্তুর গলায় একটা তিক্ততা ফুটে উঠেছে।

তিনি আস্তে-আস্তে বললেন, ও, আমি সঙ্গে গেলে তোর বুঝি অপমান হবে? ঠিক আছে, আমি যাব না, তুই যা!

মান্তুর চোখ জলে ভরে গেল। ঝোঁকের মাথায় সে বেশি কঠিন সুরে কথা বলে ফেলেছে বাবার সঙ্গে। কিন্তু কী করে সে বাবাকে বোঝাবে? সে, উজ্জয়িনী সেন, শালকিয়ার একটি সাহিত্য সভায় যাবে, স্বয়ং অরুণাভ রায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, সেখানে সে আজ কবিতা পড়বে, সেখানে কি

সে তার বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারে? সবাই হাসাহাসি করবে না? তার ওপর, বাবা যদি সেখানে গিয়ে নিজের ওই অদ্ভুত কবিতা পড়ার বায়না ধরেন…তা হলে তারপর সে আর কারুর কাছে মুখ দেখাতে পারবে?

তার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা, তিনি মান্তুকে কত স্বাধীনতা দেন, কত ভালোবাসেন, কিন্তু তা বলে বাবাকে তো সে কবি হিসেবে মেনে নিতে পারে না! বাবা যদি অরুণাভ রায়কে ওই সব কবিতা। ছাপার জন্য বিরক্ত করেন, তা হলে অরুণাভ রায় ভয়ে আর এদিক মাড়াবেন না, মান্তুকে এড়িয়ে চলবেন, মান্তুর লেখাও ছাপবেন না।

মান্তকে কাঁদতে দেখে জয়দেব এবারে কড়া গলায় বললেন, ঠিক আছে, বলছি তো, আমি যাব না। তুই যা, যখন খুশি ফিরিস, আমি কিছু বলব না!

—বাবা–

—আর ন্যাকামি করিস না, মান্তু! এর মধ্যে কাঁদবার কী আছে? না হয় আমি ভুল করে একবার যাওয়ার কথা বলে ফেলেছি! আমার সঙ্গে যেতে তোর অপমান বোধ হবে, তা তো বুঝিনি। আর কোনওদিন বলব না!

চেয়ার ছেড়ে উঠে চটি ফটফটিয়ে জয়দেব চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। তাঁর আর-এক কাপ চা খেতে হবে, তিনি নিজেই চা বানিয়ে নেবেন।

নিজের ঘরে গিয়ে সাজগোজ শুরু করল মান্তু। সাড়ে চারটের সময় এসপ্লানেডে মিট করতে হবে। অরুণাভ রায়ের সঙ্গে একই গাড়িতে, এত বড় সৌভাগ্য…এখন দেরি হয়ে গেছে, ফিরে এসে সে। বাবাকে সব বুঝিয়ে বলবে। বাবা যদি লিখতেই চান, তাহলে প্রবন্ধ-ট্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করতে পারেন…

সাজ শেষ করে মান্তু বেরিয়ে দেখল, রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন বাবা, হাতে চায়ের কাপ, ধুতির ওপর গেঞ্জি পরা, কণ্ঠার হাড় দুটি স্পষ্ট, মুখে যেন একটা কালো ছাপ পড়েছে। মান্তুর বুকটা ধক করে উঠল। বাবা যে এত রোগা হয়ে গেছেন, এতদিন যেন সে লক্ষই করেনি। কী অসহায় তাঁর দাঁড়াবার ভঙ্গি, যেন এই পৃথিবীতে তাঁর আর কোনও মূল্যই নেই।

মান্তর ইচ্ছে করল তার হাতের খাতাটা ছুড়ে ফেলে দিতে। কোনও দরকার নেই শালকে যাওয়ার, সে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলবে, বাবা তুমি রাগ কোরো না! তোমাকে এরকম ফাঁকা বাড়িতে আমি একা রেখে যেতে পারি? বাবা, তুমি যখন কবিতা লিখতে তখনকার গল্প বলো, তোমার। অন্য কবিতাগুলো পড়ে শোনাও, সবকটা পড়ো। বাবা, তুমি রবীন্দ্রনাথকে চোখে দেখেছ? বাবা, তুমি কি মাকে কখনও কবিতা পড়ে শুনিয়েছ? এইরকম গল্প, অনেক গল্প, হবে বাবার সঙ্গে…

কিন্তু সাড়ে-চারটে বাজতে আর বেশি বাকি নেই, কথা দেওয়া আছে, অরুণাভ রায়রা দাঁড়িয়ে থাকবে, হয়তো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবে মান্তুর জন্য, ওদের দেরি হয়ে যাবে…

বাবা, আমি আসছি, বলেই ছটফটিয়ে বেরিয়ে গেল মান্তু।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi