Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাঅনুবাদ গল্পঅ্যাজ ইউ লাইক ইট - উইলিয়াম শেকসপিয়র

অ্যাজ ইউ লাইক ইট – উইলিয়াম শেকসপিয়র

অ্যাজ ইউ লাইক ইট – উইলিয়াম শেকসপিয়র

সেকালের ফ্রান্স বিভক্ত ছিল একাধিক প্রদেশে (যেগুলিকে বলা হত ডিউক-শাসিত রাজ্য)। এমনই এক প্রদেশ শাসন করতেন জনৈক প্রবঞ্চক, যিনি তাঁর দাদা তথা রাজ্যের ন্যায়সঙ্গত শাসককে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে মসনদ দখল করেছিলেন।

স্বরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে উক্ত ডিউক জনাকতক বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আর্ডেনের বনে। সহমর্মী স্বেচ্ছানির্বাসিত এই সব বন্ধুদের নিয়ে সেই বনেই বাস করছিলেন মহান ডিউক। আর তাঁদের জমি ও রাজস্বভাগ ভোগদখল করে ফুলে ফেঁপে উঠছিলেন সেই প্রবঞ্চক। ধীরে ধীরে বনের সরল নিরুদ্বেগ জীবনযাত্রা রাজোচিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানবহুল জীবনযাত্রার তুলনায় প্রিয়তর হয়ে উঠল তাঁদের কাছে। তাঁরা বসবাস করতে লাগলেন সেকালের ইংল্যান্ডের রবিন হুডের মতো। রোজই রাজসভার কোনো না কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আসতেন বনে। নিরুদ্বেগে কাটিয়ে যেতেন কিছুটা সময়। তাঁদের কাছে সেই সময়টুকু মনে হত সুবর্ণযুগ। গ্রীষ্মে প্রকাণ্ড বুনো গাছের শীতল ছায়ায় শুয়ে থাকতেন তাঁরা। খেলা করতেন বুনো হরিণের সঙ্গে। বনের এই অবলা হরিণগুলিকে তাঁরা এত ভালবাসতেন যে, খাদ্যের প্রয়োজনে এগুলিকে হত্যা করতে খুব কষ্ট হত তাঁদের। শীতের হিমেল বাতাস ডিউককে তাঁর দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করিয়ে যেত। তিনি সহ্য করতেন। ধৈর্য ধরতেন। বলতেন, “এই যে হিমেল হাওয়া আমার শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে, এরাই আমার সত্যিকারের সভাসদ। এরা চাটুকথা বলে না। সত্যি কথা বলে প্রতিনিয়ত আমাকে আমার প্রকৃত অবস্থাটা দেখিয়ে দেয়। এরা কামড় বসায় তীক্ষ্ণ দাঁতে। কিন্তু সে দাঁত এদের অকৃতজ্ঞের দাঁত নয়। মানুষ দুর্ভাগ্য চায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য মানুষকে কতই না অমূল্য সম্পদ দিয়ে যায়। অশুভের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে শুভ। যেমন গরল থেকেও পাওয়া যায় জীবনদায়ী ওষুধ, অমৃত।” সবকিছু থেকেই একটা না একটা নীতিবাক্য ঠিক টেনে বার করতেন ডিউক। এই জনহীন বনের সব কিছুই তাঁর চোখে মঙ্গলময় ঠেকত। তাই তিনি গাছের মধ্যে খুঁজে পেতেন ভাষা, বহমান সোঁতার মধ্যে খুঁজে পেতেন পুথি, পাথরের মধ্যে দেখতেন উপদেশমালা আর সব কিছুর মধ্যে পেতেন পরম ভালকে।

নির্বাসিত ডিউকের রোজালিন্ড নামে একটি মেয়ে ছিল। প্রবঞ্চক ডিউক ফ্রেডেরিক তার বাবাকে বিতাড়িত করলেও, রোজালিন্ডকে নিজের মেয়ে সেলিয়ার সঙ্গিনী হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন। দুই বোন একে অপরকে খুব ভালবাসত। তাদের জন্মদাতাদের পারস্পরিক বিবাদ তাদের ভালবাসার বাঁধন আলগা করে দিতে পারেনি। রোজালিন্ডের বাবাকে রাজ্যচ্যূত করে তাঁর প্রতি যে অবিচার করা হয়েছিল, সেই ক্ষত রোজালিন্ডের মন থেকে মুছে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করত সেলিয়া। বাবার নির্বাসন এবং এক মিথ্যা প্রবঞ্চকের দাক্ষিণ্যে জীবনধারণের গ্লানি রোজালিন্ডকে গ্রাস করলেই সেলিয়ে এগিয়ে আসত তাকে সান্ত্বনা দিতে।

একদিন ডিউকের এক দূত এসে জানালো, মল্লযুদ্ধ দেখার ইচ্ছে থাকলে মেয়েরা যেন তক্ষুনি রাজপ্রাসাদ-লাগোয়া রাজসভায় চলে আসে; কারণ, একটি মল্লযুদ্ধের আসর বসতে চলেছে সেখানে। সেলিয়া ভাবল, সেখানে গেলে অন্তত রোজালিন্ড একটু আমোদ পাবে। তাই সে রাজি হয়ে গেল।

আজকাল মল্লযুদ্ধ মানে গেঁয়ো চাষাভুষোদের খেলা। কিন্তু সেকালে এই খেলা ছিল রাজসভার একটি প্রিয় অবসর বিনোদন। রাজকুমারী সহ অন্যান্য অভিজাত রমণীরা এই খেলা দেখতে আসতেন। সেলিয়া ও রোজালিন্ড গেলেন সেই মল্লযুদ্ধের আসরে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলেন, তাতে তাদের বুক ফেটে গেল। আসরের একদিকে এক অভিজ্ঞ মল্লযোদ্ধা, যিনি কিনা তাঁর মতো বহু দক্ষ যোদ্ধাকে প্রতিযোগিতার আসরে নিকেশ করেছেন; আর অন্য দিকে তাঁর বিরুদ্ধে নামা একটি অত্যন্ত অল্পবয়সী যুবক। ছেলেটির বয়স ও অভিজ্ঞতা, দুইই এত অল্প ছিল যে সবাই ধরেই নিয়েছিল, এই আসরেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হতে চলেছে।

মেয়ে সেলিয়া ও ভাইঝি রোজালিন্ডকে দেখে ডিউক বললেন, “এই যে, আমার মায়েরাও গুটিগুটি পায়ে মল্লযুদ্ধ দেখতে এসেছো দেখছি। তবে আজকের খেলা তোমাদের ততটা ভাল লাগবে না। ঠিক সমকক্ষ যোদ্ধাদের মধ্যে তো আর যুদ্ধ হচ্ছে না। ছেলেটাকে দেখে দয়া হচ্ছে আমার। ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসর থেকে সরিয়ে আনতে পারলেই মঙ্গল হয়। তা মায়েরা, তোমরা একবার ওর সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো না, যদি ওকে বোঝাতে পারো।”

কাজটি সৎ। তাই ওদের বেশ মনে ধরল। প্রথমে সেলিয়া এসে তরুণ আগন্তুকটির সঙ্গে কথা বলল। অনুরোধ করল প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে। তারপর রোজালিন্ড এসে মিষ্টি কথায় তাকে বুঝিয়ে বলল এই প্রতিযোগিতা কেন তার পক্ষে বিপজ্জনক। কিন্তু সেই মিষ্টি কথার ফল হল উল্টো। যুবক তার সংকল্প তো ত্যাগ করলই না, বরং সুন্দরীদের সামনে নিজের শৌর্যপ্রদর্শনের একটা অদম্য ইচ্ছে চেপে বসল তার মনে। সে সবিনয়ে সেলিয়া ও রোজালিন্ডের অনুরোধ ফিরিয়ে দিল। মেয়েরা তো মহাশঙ্কিত হয়ে উঠল। শেষে যুবক বলল, “আপনাদের মতো সুন্দরীদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে আমার খুবই খারাপ লাগছে। আপনাদের শুভেচ্ছা দৃষ্টি এই প্রতিযোগিতায় আমার সহায়ক হোক। পরাজিত হলে জানবেন, আমি মহৎ কেউ ছিলাম না। আমার মৃত্যু হলে জানবেন, এক মৃত্যুপিপাসীর মৃত্যু হয়েছে। তাতে কারো কোনো ক্ষতি হবে না। আমার জন্য কাঁদার কেউ নেই। আমার জন্য জগতের কিছুই আটকাবে না। জগতে আমার কিছুই নেই। বরং যে জায়গাটুকু আমি দখল করে আছি, সেটুকু খালি হয়ে গেলে, সেখানে যোগ্যতর কেউ আসতে পারবে।”

এক নির্বান্ধব পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছেলেটি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাইছিল দেখে ছেলেটির প্রতি সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল রোজালিন্ডের। সে দেখল, ছেলেটি তো তারই মতো হতভাগ্য। রোজালিন্ডের দয়া হচ্ছিল ছেলেটির প্রতি। খেলার কঠিন মুহুর্তগুলির প্রতি তার একনিষ্ট মনযোগই বলে দিচ্ছিল, সে সেই মুহুর্তেই ছেলেটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।

দুই সুন্দরী অভিজাত রমণীর দয়া দেখে আগন্তুক যুবকের সাহস ও শক্তি দুইই বেড়ে গিয়েছিল। সে বিস্ময় সাধন করে প্রতিযোগীকে সম্পূর্ণ পরাভূত করল। লোকটার নড়াচড়া করার তো দূরের কথা, কথা বলারও ক্ষমতা রইল না।

ডিউক ফ্রেডেরিক তরুণ আগন্তুকের সাহস ও দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হলেন। ছেলেটিকে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখার মানসে তার নাম ও পিতৃপরিচয় জানতে চাইলেন।

আগন্তুক জানালো যে, সে স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছোটো ছেলে অর্ল্যান্ডো।

অর্ল্যান্ডোর বাবা স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজ বছর কয়েক আগেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকতে তিনি ছিলেন নির্বাসিত ডিউকের এক অনুগত প্রজা ও বিশ্বস্ত বন্ধু। অর্ল্যান্ডো তার নির্বাসিত দাদার বন্ধুপুত্র জানা ফ্রেডেরিকের মন গেল বিষিয়ে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। দাদার বন্ধুদের নামও শুনতে চাইতেন না তিনি। ছেলেটির বীরত্ব তাঁকে মুগ্ধ করেছিল বলে তিনি শুধু এইটুকু বলে গেলেন, অর্ল্যান্ডো অন্য কারোর ছেলে হলে তাঁর ভাল লাগত।

রোজালিন্ড কিন্তু তার বাবার পুরনো বন্ধুর ছেলেকে দেখে খুব খুশি হল। সে সেলিয়াকে বলল, “আমার বাবা স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজকে খুব ভালবাসতেন। যদি আগে জানতাম যে, এই যুবক তাঁর ছেলে, তাহলে চোখের জলে তাঁকে স্বাগত জানাতুম।”

দুই বোন তখন গেল যুবকের কাছে। ডিউকের হঠাৎ-অসন্তোষে ছেলেটি কিঞ্চিৎ হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। দু’বোনে মিলে নরম কথায় তাকে উৎসাহিত করল। চলে আসার সময় আর একবার ফিরে এসে রোজালিন্ড তার বাবার মৃত বন্ধুর ছেলের সঙ্গে দু’টো ভদ্রতার কথা বলল। নিজের গলার হার খুলে সে বলল, “মহাশয়, আমার এই উপহার গ্রহণ করুন। আমার এই হতভাগ্য দশা না হলে, আপনাকে আরও মূল্যবান কিছু উপহার দিতাম।”

অন্তঃপুরে নিভৃত আলাপের সময় রোজালিন্ড ঘুরে ফিরে শুধু অর্ল্যান্ডোর কথাই বলতে লাগল। সেলিয়া বুঝতে পারল, তার বোন সুদর্শন তরুণ মল্লযোদ্ধাটির প্রেমে পড়েছে। সে রোজালিন্ডকে বলল, “এও কী সম্ভব? এত সহজে তুই ওর প্রেমে পড়ে গেলি?” রোজালিন্ড বলল, “ডিউক, মানে আমার বাবা, ওঁর বাবাকে খুব ভালবাসতেন কিনা!” সেলিয়া বলল, “তোর বাবা ওর বাবাকে ভালবাসতেন বলেই তুই ওর প্রেমে পড়ে গেলি। আমার বাবা তো ওর বাবাকে অপছন্দ করতেন। কই, আমার তো ওকে খারাপ লাগেনি!”

এদিকে রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছেলেকে দেখে ফ্রেডেরিক উঠলেন খেপে। তাঁর মনে পড়ে গেল, অভিজাত রাজপুরুষদের মধ্যে অনেকেই নির্বাসিত ডিউকের বন্ধু ছিলেন। ভাইঝির প্রতিও হঠাৎ তাঁর রাগ হতে লাগল। কারণ, সবাই ওর গুণের প্রশংসা করত আর ওর বাবার দুর্ভাগ্যের জন্য ওর প্রতি সহানুভূতি দেখাত। সেলিয়া আর রোজালিন্ড অর্ল্যান্ডোকে নিয়ে কথা বলছে, এমন সময় ফ্রেডেরিক সেই ঘরে এসে হাজির হলেন। দৃষ্টিতে আগুন ছিটিয়ে ফ্রেডেরিক রোজালিন্ডকে প্রাসাদ ছেড়ে নির্বাসিত বাবার কাছে চলে যেতেআদেশ করলেন। সেলিয়া বাবাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে ফ্রেডেরিক বললেন, রোজালিন্ডের মতো মেয়ের সঙ্গে তার থাকা উচিত নয়। সেলিয়া বলল, “তেমন হলে ওকে রেখে দেওয়ার কথা আদৌ তুলতাম না। আগে ছোটো ছিলাম। তাই ও কেমন মেয়ে বুঝতাম না। কিন্তু আজ এত দিন ধরে একসঙ্গে খেয়ে, ঘুমিয়ে, খেলে, লেখাপড়া করে আমি ও আসলে কেমন মেয়ে তা বুঝতে পারি। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।” ফ্রেডেরিক বললেন, “তুই বোকার মতো ওর সালিশি করছিস। ওর রূপ, ওর ওই চুপ করে থাকা, ওর ধৈর্য দেখে লোকেরা ওর প্রতি সহানুভূতি দেখায়। ও চলে গেলে তোকে রূপে গুণে আরও মহীয়সী মনে হবে। তাই ওর হয়ে কথা বলিস না। জেনে রাখিস, আমার আদেশের নড়চড় হবে না।”

রোজালিন্ডকে কাছে রেখে দেওয়ার জন্য বাবার কাছে সেলিয়ার সব আবেদনই নিষ্ফল হয়ে গেল। তখন সে নিজে রোজালিন্ডের পাশে দাঁড়াল। সেই রাতেই বাবার প্রাসাদ থেকে পালিয়ে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আর্ডেনের বনে রোজালিন্ডের বাবাকে খুঁজতে যাওয়ার প্রস্তাব দিল।

যাত্রা শুরুর আগে সেলিয়ার মনে হল, দামি পোষাক পরে দুই অল্পবয়সী মেয়ের রাস্তায় চলা নিরাপদ হবে না। সে গ্রামের মেয়েদের পোষাক পরে বের হওয়ার কথা বলল। রোজালিন্ড বলল, সবচেয়ে ভাল হবে, যদি তাদের একজন পুরুষ সাজে। তাই ঠিক হল। রোজালিন্ড দীর্ঘকায়া। সে গ্রাম্য যুবকের ছদ্মবেশ নিল। সেলিয়া পরল গ্রাম্য মেয়ের পোষাক। দুইজনে সাজল ভাই-বোন। রোজালিন্ড হল গ্যানিমিড আর সেলিয়া হল এলিয়েনা।

অনেক দূরের পথ আর্ডেনের বন। ডিউক-রাজ্যের সীমানার বাইরে। তাই এই দীর্ঘপথের রাহাখরচ হিসেবে কিছু টাকাপয়সা ও ধনরত্নও সঙ্গে নিল তারা। তারপর রওনা হল বনের উদ্দেশ্যে।

পুরুষবেশে লেডি রোজালিন্ড (বা যাঁকে এখন গ্যানিমিড বলাই ভাল) পুরুষালি দৃপ্ত ভঙ্গিমায় চলতে লাগল। সেলিয়া তার সত্যিকারের বন্ধু। বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের প্রতিদানস্বরূপ সিলিয়া তার নতুন ভাইয়ের সঙ্গে এই কষ্টদায়ক যাত্রায় অংশ নিল। তার আচরণে লোকে মনে করল, এই ছেলেটি সত্যিই এলিয়েনা নামে এক সুকুমারী গ্রাম্য বালিকার দাদা কঠোর-হৃদয় গ্রাম্যযুবক গ্যানিমিড।

পথে তারা কয়েকটা আরামদায়ক সরাই আর ভাল থাকার জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু আর্ডেনের বনে পৌঁছে তারা সেরকম কিছুই পেল না। গ্যানিমিড এতক্ষণ মজার মজার কথা বলে বোনের চিত্তবিনোদন করতে করতে আসছিল। এইবার খাবার আর আশ্রয়ের জন্য সেও কাতর হয়ে পড়ল। এলিয়েনার কাছে স্বীকার করল, পুরুষবেশ ফেলে মেয়েদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। এলিয়েনা বলল, ক্লান্তিতে তা পা অবশ হয়ে আসছে। মেয়েরা দুর্বল, তাই তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা আর সান্ত্বনা দেওয়া পুরুষদেরই কাজ – এই কথা ভেবে পুরুষালি ভাব দেখিয়ে গ্যানিমিড বলল, “আয়, এলিয়েনা, বোন আমার। আর একটুখানি। এই তো আমরা আর্ডেনের বনের কাছে এসেই পড়েছি।” কিন্তু কল্পিত পুরুষত্ব আর আরোপিত সাহস আর তার সঙ্গ দিল না। আর্ডেনের বনে তারা এসে পোঁছেছিল বটে। কিন্তু ডিউক এই বনের কোথায় আছেন তা তো আর তাদের জানা ছিল না। তারা ভাবল যে তারা বোধহয় পথ হারিয়েছে। খিদেয়, ক্লান্তিতে, অবসাদে হতোদ্যম ও মৃতপ্রায় হয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। এমন সময় একটি গ্রাম্য লোক সেই খান দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে গ্যানিমিড আর একবার পুরুষের ভাব করে গম্ভীরভাবে বলল, “রাখাল, এই নির্জন স্থানে আমাদের বিশ্রামস্থলের বড়ো প্রয়োজন। আমার এই ছোটো বোনটি যাত্রার ক্লান্তিতে আর ক্ষুধায় অবশ হয়ে আর চলতে পারছে না। আমাদের এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারো, যেখানে আমরা দু’টি খেয়ে বিশ্রাম করতে পারব। তার বদলে যা চাও দেবো।”

লোকটি বলল যে, সে রাখাল নয়, এক রাখালের পরিচারক মাত্র। তার প্রভুর বসতবাড়িখানা খুব শীঘ্রই বিক্রি করে দেওয়া হবে। তাই সেখানে থাকা-খাওয়ার খুব একটা সুরাহা হওয়া সম্ভব নয়। তবে চাইলে তারাই বাড়িটা কিনে নিতে পারে। থাকা-খাওয়ার একটা সুরাহার আশায় তাদের দেহে নতুন বলসঞ্চার হল। তারা লোকটির সঙ্গে চলে গেল। কিনে নিল সেই রাখালের বাড়ি ও তার ভেড়ার পাল। যে লোকটি তাদের রাখালের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তাকে তারা পরিচারক নিযুক্ত করল। এইভাবে ভাগ্যক্রমে তারা একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কুটির পেয়ে গেল। খাওয়ার চিন্তাও আর রইল না। তারা ঠিক করল, যতক্ষণ না বনের মধ্যে কোথায় ডিউক আছেন তা জানতে পারে, ততক্ষণ তারা সেখানেই থাকবে।

দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি দূর হল বিশ্রামে। ধীরে ধীরে তারা তাদের নতুন জীবনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ল। তারা রাখাল-রাখালিনীর ছদ্মবেশ নিলেও, নিজেদের সত্যিকারের রাখাল-রাখালিনীই ভাবতে লাগল। মাঝে মাঝে গ্যানিমিড অবাক হয়ে ভাবত, সে কিনা ছিল বাবার বন্ধুপুত্র বীর অর্ল্যান্ডোর প্রেমে পাগলিনী লেডি রোজালিন্ড। ভাবত, অর্ল্যান্ডো না জানি কত দূরে। আসলে, তারা যত দীর্ঘপথই পেরিয়ে আসুক না কেন, বাস্তবে অর্ল্যান্ডো ছিল তাদের কাছেই, ওই আর্ডেনের বনেই। কিছুদিন পরেই তারা সেকথা জানতে পারে। কিন্তু এমন আশ্চর্য ঘটনা কিভাবে ঘটল, আগে সেটাই শোনো।

মৃত্যুর সময় স্যার রোল্যান্ড শিশু অর্ল্যান্ডোর দেখাশোনার ভার দিয়ে যান তার বড়োদাদা অলিভারকে। ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে তাঁদের প্রাচীন বংশের সুযোগ্য উত্তরসূরি করতে তুলতে বলে যান তিনি অলিভারকে। কিন্তু দাদা হিসেবে অলিভার ছিল নিতান্তই অযোগ্য। সে তার কর্তব্য পালন করেনি। মৃত্যুশয্যায় শায়িত পিতার আদেশকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ভাইকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাড়িতেই চরম অবহেলার মধ্যে রেখে দেয় সে। তা সত্ত্বেও রক্তের সূত্রে প্রাপ্ত সহজাত গুণে অর্ল্যান্ডো অনেকাংশেই তার বাবার মতো হয়ে উঠেছিল। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও তাকে মার্জিত রুচিসম্পন্ন যুবকই মনে হত। শিক্ষাবিহীন এই ভাইটির রুচিবোধ ও মার্জিত আচরণকে ঈর্ষা করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভাইকে শেষ করে দিতে গেলেন। লোক লাগিয়ে ভাইকে পূর্বকথিত সেই বিখ্যাত বহুঘাতী মল্লযোদ্ধাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানানোর জন্য উসকাতে লাগলেন। দাদার এহেন নিষ্ঠুরতাই অর্ল্যান্ডোকে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল।

কিন্তু অলিভারের ষড়যন্ত্রে অর্ল্যান্ডোর কোনো ক্ষতিই হল না, বরং তার খ্যাতি আরও বেড়ে গেল; আর তাই দেখে অলিভারের ঈর্ষার সীমা রইল না। তিনি ঠিক করলেন, অর্ল্যান্ডোর ঘরে আগুন দিয়ে তাকে পুড়িয়েই মারবেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাবার এক বুড়ো বিশ্বস্ত চাকর তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে ফেলল। স্যার রোল্যান্ডের সঙ্গে অর্ল্যান্ডোর অনেক মিল ছিল বলে সে অর্ল্যান্ডোকে খুব ভালবাসত। বুড়ো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। ডিউকের প্রাসাদ থেকে ফেরার পথে অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। তার নতুন মালিকের শয়তানি ফন্দির কথা স্মরণ করতেই সে বিহ্বল হয়ে পড়ল: “ওগো দাদাবাবু, মিষ্টি সোনা দাদাবাবু আমার, স্যার রোল্যান্ডের স্মৃতি তুমি। কেন তুমি এমন গুণের মানুষ? কেন তুমি এত সুন্দর, এত শক্তিশালী, এত সাহসী? কেন ওই মল্লযোদ্ধাকে আহ্বান করে হারাতে গেলে? তোমার খ্যাতির কথা যে তোমার আগেই বাড়ি পোঁছে গেছে।” অর্ল্যান্ডো এসব কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে। বুড়ো তখন বলল, তার শয়তান দাদা লোকমুখে ডিউকের প্রাসাদে তার জয়ের খবর পেয়ে আরও ঈর্ষান্বিত হয়ে রাতে তার ঘরে আগুন লাগিয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। বুড়ো তাকে তক্ষুনি পালিয়ে যেতে বলল। অর্ল্যান্ডোর টাকাপয়সা কিছু নেই জেনে অ্যাডাম (সেই বুড়োর তা-ই নাম ছিল) তাকে নিজের গোপন টাকার থলিটা দিয়ে বলল, “তোমার বাবার কাছে কাজ করার সময় আমি অনেক কষ্টে এই পাঁচশো ক্রাউন সঞ্চয় করেছিলাম যাতে বুড়ো বয়সে যখন অথর্ব হয়ে পড়ব, তখন আমাকে অর্থাভাবে পড়তে না হয়। এটা নাও। বুড়ো বয়সে আমাকে ঈশ্বরই দেখবেন। এতে যা সোনা আছে, তার সবটাই তোমাকে দিচ্ছি। আর আমাকে তোমার চাকর করে নাও। আমি বুড়ো হলেও, দরকারে-অদরকারে তোমার মতো জোয়ান ছেলের সেবা করতে পারব।” অর্ল্যান্ডো বলল, “বুড়োদাদা আমার, এই বয়সেও তুমি কত আমার কথা ভাব! তোমার মতো লোক তো একালে মেলে না। চলো আমরা একসঙ্গে যাই। তোমার এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই, আমাদের দেখভালের একটা সুরাহা করে ফেলতে হবে।”

তারপর বিশ্বাসী অ্যাডাম তার প্রিয় প্রভুপুত্র অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে। তারাও এল আর্ডেনের বনে। সেখানে পৌঁছে গ্যানিমিড ও এলিয়েনার মতোই খাদ্যকষ্টে পড়তে হল তাদেরও। এদিক ওদিক ঘুরে জনবসতির খোঁজ করল। শেষে কিছুই দেখতে না পেয়ে ক্ষুধায় শ্রমে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল মাটিতে। অ্যাডাম বলল, “দাদাবাবু গো, আর যে চলতে পারি নে। খিদেয় মরে যাচ্ছি।” সে ধরেই নিল, তার আয়ু শেষ, এখানেই তার জন্য কবর খুঁড়তে হবে। তাই সে তার প্রভুকে শেষ বিদায় জানিয়ে দিল। অর্ল্যান্ডো তার বুড়ো চাকরের এমন অবস্থা দেখে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে কতগুলি সুন্দর গাছের শীতল ছায়ায় এনে রাখল। বলল, “হতাশ হয়ো না, অ্যাডামদাদা, এখানে বসে একটু বিশ্রাম করো, এখনই মরার চিন্তা করতে হবে না।”

খাবারের খোঁজে বেরলো অর্ল্যান্ডো। হাজির হল ডিউকের আড্ডায়। ডিউক তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে ঘাসের উপর সান্ধ্যভোজে বসেছিলেন। তাঁর মাথার উপর রাজছত্র ছিল না, ছিল মাত্র বিরাট কয়েকটি গাছের ছায়া।

খিদের চোটে মরিয়া হয়ে অর্ল্যান্ডো তরবারির জোরে কেড়ে নিতে চাইল খাবার। বলল, “খবরদার, আর খাবে না। খাবারগুলো দিয়ে দাও আমাকে।” ডিউক তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, অবসাদ তাকে এমন সাহসী করে তুলেছে, নাকি সে ভদ্র ব্যবহার অপছন্দ করে বলে এমন করছে। তার উত্তরে অর্ল্যান্ডো বলল যে, সে খিদেয় মরে যাচ্ছে। তখন ডিউক তাকেও ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। এত ভদ্রভাবে তাঁকে কথা বলতে দেখে অর্ল্যান্ডো তরবারি খাপে রাখল। খাবার চেয়ে তার দুর্ব্যবহারের জন্য লজ্জায় মরে গেল। সে বলল, “অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ভেবেছিলাম, এখানে সবাই বন্য বর্বর। তাই আদেশের সুরে কথাটা বলেছিলাম। এই নেই-রাজ্যে বিষন্ন লতার আচ্ছাদনের তলায় বসে আপনারা যেই হন না কেন, সময় সম্পর্কে কী নির্লিপ্ত। হয়ত আপনাদের সুসময় ছিল কোনোদিন। আপনারা হয়ত সেইখানে ছিলেন, যেখানে গির্জায় ঘণ্টা বাজে, হয়ত কোনো বড়োমানুষের ভোজসভায় গিয়ে বসতেন, কোনোদিন হয়ত চোখের জল মুছেছেন, তাই জানেন দয়াপ্রার্থীকে দয়া করার প্রয়োজনীয়তা। তাই এখন মধুরভাষ্যে আপনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন।” ডিউক উত্তর দিলেন, “ঠিকই বলেছ, আমাদের সুদিন ছিল কোনো এক সময়ে। আমরা এই বনজঙ্গলে থাকতাম না। থাকতাম নগরে-মহানগরে। সেখানে গির্জায় পবিত্র ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত। আমরা বড়োমানুষের ভোজসভায় বসতাম। চোখে আমাদের পবিত্র দয়া সঞ্জাত অশ্রু দেখা যেত, আমরা তাই মুছতাম। তাই এখানে এসে বসো। যা ইচ্ছা খাও। ক্ষুধা নিবৃত্ত করো।” অর্ল্যান্ডো বলল, “আমার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ আছেন। তিনি আমাকে ভালবেসে আমার সঙ্গে অনেক দূর অবধি এসেছেন। কিন্তু আর হাঁটতে পারছেন না। বয়স ও ক্ষুধার ভারে ভারাক্রান্ত তিনি। তাঁর ক্ষুধা নিবৃত্ত না করে আমি এক কণাও দাঁতে কাটতে পারি না।” ডিউক বললেন, “যাও, তাঁকেও এখানে নিয়ে এস। তোমরা না ফেরা অবধি আমরা ভোজন আরম্ভ করব না।” হরিণী যেমন তার শাবকের জন্য ছুটে যায় খাবার আনতে, তেমনি ছুটল অর্ল্যান্ডো। অ্যাডামকে কাঁধে করে নিয়ে এল সেখানে। ডিউক বললেন, “ওহে বৃদ্ধ বোঝা, এসো বসো। তোমাদের দু’জনকেই স্বাগত জানাই।” তারা বৃদ্ধকে খাওয়াল। বৃদ্ধ ভারি খুশি হল। তার শরীর জুড়াল। আবার গায়ে বল ফিরে পেল সে। ডিউক অর্ল্যান্ডোর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। সে স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছেলে জানতে পেরে ডিউক তাকে নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে নিলেন। অর্ল্যান্ডো ও তার বুড়ো চাকর ডিউকের সঙ্গে বনেই বাস করতে লাগল।

গ্যানিমিড আর এলিয়েনার বনে আগমন ও কুটির ক্রয়ের (যে কথার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে) অল্প দিনের মধ্যেই বনে এসেছিল অর্ল্যান্ডো।

একদিন গ্যানিমিড ও এলিয়েনা অবাক হয়ে দেখল, বনের গাছে খোদিত রোজালিন্ডের নাম। সঙ্গে লটকানো রয়েছে রোজালিন্ডকে নিয়ে লেখা কয়েকটি প্রেমের চতুর্দশপদী। দুই বোনে ভাবছে এগুলি কার লেখা, এমন সময় তারা দেখা পেল অর্ল্যান্ডোর। রোজালিন্ড অর্ল্যান্ডোকে যে হারটি দিয়েছিল, সেটি দেখেই তারা ওকে চিনল।

গ্যানিমিডই যে দয়া ও মহত্বে অর্ল্যান্ডোর হৃদয়-বিজয়িনী সুন্দরী রাজকন্যা রোজালিন্ড, সেকথা টেরই পেল না অর্ল্যান্ডো। সে রোজালিন্ডের রূপের প্রশস্তি করে গাছে গাছে সনেট ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছিল। রাখাল যুবকের সঙ্গে গল্প করতে করতে করতে তার মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলি ভারি ভাল লাগে গেল অর্ল্যান্ডোর। গ্যানিমিডের চেহারায় রোজালিন্ডের একটা আভাস ছিল বটে। কিন্তু তার আচরণ রোজালিন্ডের মতো নম্র ছিল না। আসলে গ্যানিমিড বালক-পুরুষদের কথোপকথনের ভঙ্গি নকল করে কথা বলছিল। সে ঠাট্টা করে অর্ল্যান্ডোকে জনৈক প্রেমিকের গল্প শুনিয়ে বলল, “ছেলেটা আমাদের বনে শিকার করে আর রোজালিন্ডের নাম লিখে লিখে ছোটো গাছগুলিকে নষ্ট করে। রোজালিন্ডের প্রশস্তি গেয়ে হথর্নের উপর দীর্ঘ গীতিকবিতা আর ব্র্যাম্বলের উপর শোকগাথা লেখে। এই প্রেমিকটাকে খুঁজে পেলে আমি তার এই প্রেমরোগ সারানোর ওষুধের নাম বাতলে দেবো।”

অর্ল্যান্ডো স্বীকার করে নিল যে, সে-ই হল উক্ত প্রেমিক। গ্যানিমিডের কাছে সে ওষুধের পরামর্শ চাইল। গ্যানিমিড তাকে রোজ তার আর এলিয়েনার কুটিরে আসতে বলল। বলল, “আমি রোজালিন্ড সাজব। তুমি আমাকে প্রেম নিবেদনের ভান করবে, ঠিক যেমন আমি রোজালিন্ড হলে তুমি করতে। আমি তোমার সামনে খেয়ালি মেয়েদের হাবভাব নকল করে দেখাবো। তখন প্রেমে পড়ার জন্য তোমারই লজ্জা হবে আর তোমার রোগও যাবে সেরে।” এহেন চিকিৎসার প্রতি যদিও অর্ল্যান্ডোর খুব একটা আস্থা জন্মালো না, তবু সে গ্যানিমিডের কুটিরে যেতে ও সেই মজার প্রেম নিবেদনের খেলা খেলতে রাজি হল। তারপর থেকে প্রতিদিন অর্ল্যান্ডো গ্যানিমিড ও এলিয়েনার সঙ্গে দেখা করতে গেল। অর্ল্যান্ডো রাখাল গ্যানিমিডকে রোজালিন্ড সম্বোধন করতে লাগল। যেমন করে প্রতিদিন যুবকেরা নতুন নতুন স্তববাক্যে প্রেমিকার হৃদয় জয়ের চেষ্টা করে, তেমনি করে গ্যানিমিডের কাছে প্রেম নিবেদন করল অর্ল্যান্ডো। তবে তার প্রেমরোগ নিরাময়ে গ্যানিমিড খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারল না।

অর্ল্যান্ডোর কাছে এ ছিল খেলা। সে তো আর ভাবেনি যে গ্যানিমিডই আসলে রোজালিন্ড। তবুও মনের সব কথা সে প্রাণ খুলে উজার করে দিল গ্যানিমিডের কাছে। খুশি হল গ্যানিমিড। সে অন্তত জানত যে, কথাগুলি ঠিক লোকের কাছেই যাচ্ছিল।

গ্যানিমিডকে সুখী দেখে এলিয়েনাও তাকে তার মতো থাকতে দিল। বাধা দিল না তার নকল প্রেম নিবেদনের খেলায়। একবারের জন্যও তাকে মনে করিয়ে দিল না যে, রোজালিন্ডের বেশে এখনও তার বাবার কাছে দেখা দেয়নি সে। যদিও অর্ল্যান্ডোর কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছিল যে, ডিউক এই বনেই আছেন। একদিন গ্যানিমিডের সঙ্গে ডিউকের দেখা হল। তাঁদের কিছু কথাও হল। ডিউক গ্যানিমিডের পিতৃপরিচয় জানতে চাইলে সে বলল, সে ডিউকের মতোই ভদ্রঘরের ছেলে। ডিউক হাসলেন। আসলে তিনি ভাবতেও পারেননি যেই তরুণ রাখাল রাজপরিবারের সন্তান হতে পারে। ডিউককে সুখী দেখে গ্যানিমিড ঠিক করল, আরও কিছুদিন সে পরিচয় গোপন রাখবে।

একদিন সকালে গ্যানিমিডের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে অর্ল্যান্ডো, এমন সময় দেখল, একটা লোক মাটিয়ে শুয়ে রয়েছে আর তার গলার কাছে গুটিয়ে রয়েছে একটা বিরাট সবুজ সাপ। সাপটা অর্ল্যান্ডোকে দেখেই ঝোপের মধ্যে পালিয়ে গেল। অর্ল্যান্ডো একটু কাছে আসতেই একটা সিংহীকে দেখতে পেল। সিংহীটা মাটিতে মাথা রেখে গুটি গুটি পায়ে বিড়ালের মতো এগিয়ে আসছিল। ঘুমন্ত লোকটি জেগে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল সে (কারণ, বলা হয়, সিংহ মৃত বা ঘুমন্তকে শিকার করে না)। ঈশ্বরই যেন অর্ল্যান্ডোকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লোকটিকে সাপ ও সিংহীর হাত থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারল, যাকে সে জোড়া বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করতে চলেছে সে আসলে তার নিজের দাদা অলিভার, যে একদিন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল, এমনকি তার ঘরে আগুন দিয়ে তাকে হত্যাও করতে চেয়েছিল। প্রথমে সে ভাবল, দাদাকে ক্ষুধার্ত সিংহীর মুখেই ছেড়ে যাবে। কিন্তু তারপরেই ভ্রাতৃপ্রেম ও স্বভাবগত দয়া তার প্রাথমিক রাগ দূর করে দিল। সে তরবারি বের করে সিংহীটাকে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করল। দাদাকে রক্ষা করলবিষধর সাপ ও হিংস্র সিংহীর হাত থেকে । তবে সিংহীটাকে হত্যা করার আগে, সে তার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে অর্ল্যান্ডোর হাতে দিল আঁচড়ে।

অর্ল্যান্ডো যখন সিংহীর সঙ্গে যুদ্ধ করছিল, তখন অলিভারের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন, যে ভাইয়ের প্রতি তিনি এত নিষ্ঠুরতা করেছিলেন, সে-ই কিনা নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে বন্য জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করল। লজ্জা ও ধিক্কার গ্রাস করল তাঁকে। নিজের পূর্বকৃত ব্যবহারের জন্য অনুতাপ করতে লাগলেন তিনি। সজল চোখে ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন। তাকে অনুতপ্ত হতে দেখে অর্ল্যান্ডোর খুব ভাল লাগল। সে এককথায় দাদাকে ক্ষমা করে দিল। দুই ভাই একে অপরকে আলিঙ্গন করল। অর্ল্যান্ডোকে হত্যা করতে এসে তার সঙ্গে সত্যিকারের ভ্রাতৃপ্রেমে আবদ্ধ হলেন অলিভার।

হাতের ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় অর্ল্যান্ডো দুর্বল বোধ করতে লাগল। সেদিন আর গ্যানিমিডের কাছে যেতে পারল না। বরং দাদাকে দুর্ঘটনার খবরটা গ্যানিমিডের কাছে পৌঁছে দিতে পাঠাল। অর্ল্যান্ডো বলে দিল, “ওকে আমি মজা করে রোজালিন্ড বলি।”

অলিভার গিয়ে গ্যানিমিড ও এলিয়েনাকে গিয়ে বললেন, কেমন করে অর্ল্যান্ডো তার জীবন রক্ষা করেছে। অর্ল্যান্ডের বীরত্বের কাহিনি ও তার ভাগ্যক্রমের বেঁচে যাওয়ার গল্প শেষ করে তিনি অর্ল্যান্ডোর দাদা হিসেবে আত্মপরিচয় দিলেন। জানালেন, আগে তিনি অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও এখন আবার তাঁদের দুই ভাইয়ে মিল হয়ে গেছে।

পূর্বকৃত অপরাধের জন্য অলিভারকে এত অনুতপ্ত দেখে দয়াময়ী এলিয়েনা মুহুর্তে তাঁর প্রেমে পড়ে গেল। তাঁর কষ্টে এলিয়েনাকে সমব্যথী হতে দেখে অলিভারও এলিয়েনার প্রেমে পড়ে গেলেন। এইভাবে দু’জনের মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেল। এদিকে গ্যানিমিড তো অর্ল্যান্ডোর বিপদের কথা শুনে, সে সিংহীর দ্বারা আহত হয়েছে জেনে অজ্ঞানই হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরলে সে এমন ভান করল যেন, রোজালিন্ড নামে কোনো কাল্পনিক চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। অলিভারকে বলল, “আপনার ভাই অর্ল্যান্ডোকে বলবেন, আমি কেমন সুন্দর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।” অলিভার কিন্তু তার দেহের পান্ডুরতা লক্ষ্য করে বুঝলেন যে ওটা অভিনয় ছিল না। যুবকের দুর্বলতা দেখে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। বললে, “তা অভিনয় করতে হলে, পুরুষের অভিনয় করলেই তো পারো।” গ্যানিমিড উত্তরে বলল, “আমি তো তাই করি। তবে আমার নারী হওয়াই উচিত ছিল।”

অলিভার অনেকক্ষণ তাদের কাছে রইলেন। ফিরে এসে ভাইকে অনেক কথাই বললেন তিনি। কেমন করে গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোর আহত হওয়ার কথায় অজ্ঞান হয়ে গেল; কেমন করে তিনি সুন্দরী রাখালিনী এলিয়েনা আগ্রহে মুগ্ধ হয়ে তিনি তার প্রেমে পড়লেন, সে সব খুলে বললেন। এলিয়েনাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন ভাইয়ের কাছে। বললেন, বিয়ে করে তিনি বনে রাখালের বৃত্তিই নেবেন। বাড়ি আর এস্টেটপত্র সব অর্ল্যান্ডোকে লিখে দেবেন।

অর্ল্যান্ডো বলল, “আমি রাজি। কালই বিয়েটা সেরে ফেলো। আমি ডিউক ও তাঁর বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাবো। যাও, রাখালিনীকে রাজি করিয়ে নাও। ও এখন একা আছে। ওই দ্যাখো, ওর দাদা এখানে এসেছে।” গ্যানিমিড তার আহত বন্ধুকে দেখতে এসেছিল। তা দেখে অলিভার এলিয়েনার কাছে গেল।

অলিভার আর এলিয়েনার প্রেম নিয়ে আলোচনা করতে লাগল অর্ল্যান্ডো ও গ্যানিমিড। বলল, দাদাকে সে রাখালিনীর কাছে পাঠিয়েছে পরের দিনই তাকে বিয়ে করার জন্য সম্মতি আদায় করতে। তারপর সে বলে ফেলল, ওই দিনই রোজালিন্ডকে বিয়ে করতে পারলে সে খুব সুখী হত।

গ্যানিমিড নিজেই যখন লেডি রোজালিন্ড তখন পরের দিনই অর্ল্যান্ডোকে বিয়ে করা তার পক্ষে মোটেও শক্ত কাজ নয়। সে বলল, তার কাকা ছিলেন এক বিখ্যাত জাদুকর। কাকার থেকে সেও কিছু জাদু শিখেছিল। সেই জাদুর বলে পরের দিনই সে রোজালিন্ডকে এনে হাজির করতে পারে।

প্রেমোন্মত্ত অর্ল্যান্ডো তার কথা খানিক বিশ্বাস করল, খানিক করল না। একবার ভাবল, গ্যানিমিড বুঝি রসিকতা করছে। গ্যানিমিড বলল, “আমার মাথার দিব্যি, আমি রসিকতা করছি না। আগামীকাল ভাল পোষাক পরে থেকো। আর ডিউক ও তাঁর বন্ধুদের তোমার বিয়েতে নেমন্তন্ন কোরো। কালই যদি রোজালিন্ডকে বিয়ে করতে চাও, তাহলে কালকেই সে এখানে এসে হাজির হবে।”

এদিকে অলিভার এলিয়েনার সম্মতি আদায় করতে পেরেছিলেন। পরদিন তাঁরা এলেন ডিউকের কাছে। সঙ্গে এল অর্ল্যান্ডোও।

ডিউক ও তাঁর বন্ধুরা এসেছিলেন দুটি বিয়েতে আমন্ত্রিত হয়ে। কিন্তু এসে দেখলেন, মাত্র একজন বধূই উপস্থিত। সকলে ভাবলেন, গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে রসিকতাই করেছে।

তাঁর মেয়েকে জাদুবলে হাজির করা হবে শুনে ডিউক অর্ল্যান্ডোকে জিজ্ঞাসা করলেন, ওই রাখাল ছোকরাটিকে সে বিশ্বাস করে কিনা। অর্ল্যান্ডো সে কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। এমন সময় গ্যানিমিড এসে ডিউককে বলল, ডিউক যদি নিজ কন্যার সঙ্গে অর্ল্যান্ডোর বিয়ে দিতে সম্মত হন, তবেই সে ডিউক-কন্যাকে হাজির করবে। ডিউক বললেন, “বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার মতো রাজ্য যদি আমার হাতে থাকত, তাহলে অবশ্যই করতাম।” গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোকে জিজ্ঞাসা করল, “তাকে এখানে আনলে তুমি তাকে বিয়ে করবে তো?” অর্ল্যান্ডো বলল, “যদি অনেক রাজ্যের রাজা হতাম, তাহলে অবশ্যই করতাম।”

তখন গ্যানিমিড ও এলিয়েনা একসঙ্গে বেরিয়ে গেল। গ্যানিমিড তার পুরুষবেশ ত্যাগ করল। পরল নারীর বেশ। জাদুর সাহায্য ছাড়াই চকিতে সে হয়ে গেল রোজালিন্ড। এলিয়েনা তার গ্রাম্য বালিকার বেশ ত্যাগ করে রাজপোষাক পরল। সেও চকিতে হয়ে গেল লেডি সেলিয়া।

ওরা বেরিয়ে যেতেই ডিউক রাখাল গ্যানিমিডের সঙ্গে তাঁর মেয়ের চেহারাগত সাদৃশ্যের কথা বললেন অর্ল্যান্ডোকে। অর্ল্যান্ডো বলল, মিলটা সেও লক্ষ্য করেছে।

শেষকালে সবাইকে অবাক করে রোজালিন্ড ও সেলিয়া নিজ নিজ বেশে প্রবেশ করল। সবাই ভাবল জাদুর বলেই তারা সেখানে হাজির হয়েছে। কিন্তু রোজালিন্ড আর তার বাবার সঙ্গে ছলনা করল না। সে তার বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর আশীর্বাদ চাইল। তারপর সে তার নির্বাসন, বনে রাখালের বেশে বসবাস ও খুড়তুতো বোন সেলিয়াকে নিজের বোন বলে পরিচয় দেওয়ার কথা সব খুলে বলল।

বিবাহের জন্য দেওয়া পূর্ব অনুমতি আইনত অনুমোদন করলেন ডিউক। অর্ল্যান্ডো রোজালিন্ডকে ও অলিভার সেলিয়াকে একই দিনে বিয়ে করলেন। রাজপরিবারের বিয়েতে মহাসমারোহে কুচকাওয়াজ হয়। কিন্তু সেই বনে তেমন কিছুই করা গেল না। তা সত্ত্বেও বিবাহ উৎসবের আনন্দে এতটুকু ঘাটতি হল না। শীতল গাছের ছায়ায় ভোজসভায় তাঁরা হরিণের মাংস খেলেন। দয়ালু ডিউকের ছত্রছায়ায় প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলনে আনন্দের পূর্ণঘট স্থাপিত হল। এমন সময় এক দূত এল অপ্রত্যাশিত এক আনন্দ সংবাদ নিয়ে – ডিউক-রাজ্য ন্যায়সম্মত ডিউককে প্রত্যর্পিত করা হয়েছে।

মেয়ের পলায়নে যারপরনাই রেগে গিয়েছিলেন প্রবঞ্চক। তার উপর প্রতিদিনই বিশিষ্ট রাজপুরুষের আর্ডেনের বনে ন্যায়সঙ্গত ডিউকের আশ্রয়ে যোগ দিচ্ছিলেন। এত অসুবিধার মধ্যেও ন্যায়সম্মত ডিউক কীভাবে লোকের সম্মান আদায় করছিলেন দেখে দাদার প্রতি ঈর্ষা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাঁর। তিনি বিশাল এক বাহিনী গড়ে দাদাকে সপারিষদ বন্দী করার উদ্দেশ্যে বনের পথে রওনা হলেন। কিন্তু পরমেশ্বরের কৃপায় বনে প্রবেশ করার পরই ডিউকের দুষ্ট ভাইয়ের মন পরিবর্তিত হল। এক বৃদ্ধ সন্তের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। অনেকক্ষণ কথাও হয়েছিল দু’জনের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সন্ত তাঁর হৃদয়কে সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত করতে সক্ষম হলেন। তাঁর মনে অনুতাপ জন্মাল। ঠিক করলেন, অন্যায়ভাবে দখল করা রাজ্য তিনি ত্যাগ করবেন। শেষ জীবন কাটিয়ে দেবেন কোনো ধর্মসংঘে গিয়ে। তাই প্রথমেই একজন দূত পাঠিয়ে (যার কথা বলা হল) তিনি দাদাকে তাঁর ডিউকরাজ্য ফিরিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে ফিরিয়ে দিলেন ডিউকের দুঃসময়ের বন্ধুবর্গের জমি ও রাজস্বভাগ।

এই অপ্রত্যাশিত আনন্দ সংবাদে রাজকন্যাদের বিবাহের উৎসবে মিলনের নতুন রং লাগল। রোজালিন্ডের বাবা ডিউকের নবলব্ধ সৌভাগ্যের জন্য সেলিয়া রোজালিন্ডকে অভিনন্দন জানাল ও আন্তরিকভাবে তার সৌভাগ্য কামনা করল। সে নিজে আর ডিউকরাজ্যের উত্তরাধিকারিণী রইল না। রোজালিন্ডের বাবা ডিউকরাজ্য ফিরে পাওয়ায় সে-ই হল রাজ্যের নতুন উত্তরাধিকারিণী। তা সত্ত্বেও দুই বোনের ভালবাসার মধ্যে এতটুকুও ঈর্ষা প্রবেশ করল না।

নির্বাসনের সময় যেসব বন্ধুরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তাদের পুরস্কৃত করলেন ডিউক। এই সব বিশ্বস্ত অনুগামীরা এতদিন ধৈর্য ধরে ডিউকের দুঃসময়ের সঙ্গী হয়েছিলেন। এতদিন পরে ন্যায়সঙ্গত ডিউকের প্রাসাদে শান্তিতে ফিরতে পেরে তাঁরাও খুব খুশি হলেন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi