Thursday, April 2, 2026
Homeবাণী ও কথাআপাত শুভ্র - বুদ্ধদেব গুহ

আপাত শুভ্র – বুদ্ধদেব গুহ

আমার সঙ্গে পতুবাবুর, মানে পতুমেসোর আলাপ, বলতে গেলে আকস্মিকভাবেই।

আমাদের এক বন্ধু সুমিতের মামার বাগানবাড়ি ছিল বারাসত উজিয়ে গিয়ে, বাদুর কাছে। পতুমেসোর বাড়িটি ছিল, বাড়ি না বলে বাসস্থানই বলা ভালো ওই বাগানবাড়িরই প্রায় লাগোয়া।

মাঝে মাঝেই আমার বন্ধুরা দল বেঁধে যেতাম ওই বাগানে পিকনিক করতে। কখনো রাতে থেকেও যেতাম। তাস খেলা হত, গান-বাজনা, কখনো বা অভিনয়ের মহড়াও।

সবে সাতদিন হল চাকরি পেয়েছি স্টেটব্যাঙ্কে। তারই সেলিব্রেশন করতে বন্ধুদের জোরাজুরিতে যাওয়া হয়েছে সেবারে। শনিবার রাতে পৌঁছে খুব হই হই হয়েছে। সেবারই তখন যাওয়া।

সকালে দেরি করে উঠে আমরা শুয়ে-বসে আড্ডা মারছি। ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে। এমন সময়ে চমৎকৃত হয়ে দেখি, তিনটি মেয়ে আম কুড়োচ্ছে আম বাগানে। তাদের সুন্দরী বলতে যা বোঝায়

তা বলা চলে না তবে প্রত্যেকের মুখে একটা আলগাশ্রী ছিল। যেন তিনটি হরিণী।

বাগানে অনেকই আম গাছ ছিল। আম কুড়োবে কী তারা, আমার বন্ধুরা এবং আমিও, আমাদের সবকটি তরুণ হৃদয়, কল্পনার আমেরই সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিশিয়ে দিলাম তাদের পায়ের কাছে।

দেখি, কে কারটা নেয়।

জানালার ধারে আমাদের হুল্লোহুড়ি এবং মুগ্ধতা, যা আদৌ অশোভন ছিল না, কুরুচিকরও নয়, তাদের চোখে পড়েছিল। তারা হেসে, একটি করে আম হাতে নিয়ে ফিরে গেল।

হৃদয় নিল, না আম, তা বুঝতে না দিয়ে।

ভালোলাগার মতো মেয়ে তো কতই দেখা যায়! কিন্তু এই তিন বোনের মধ্যে এমন কোনো ব্যাপার ছিল, তাদের তেল-মাখানো খোঁপা, কোমর ছাপানো চুল, মা-মাসিমাদের মতো করে শাড়ি পরার ধরন এবং তাদের মুখের এক গভীর সৌম্য এবং সম্রান্ত গ্রাম্যতা আমাদের সকলকেই একসঙ্গে মুগ্ধ করে ফেলল।

কলকাতার সুন্দরীদের মধ্যে আজকাল কোনো রকমফেরই চোখে পড়ে না। সকলেই একরকম করে শাড়ি পরে। কেউই চুলে তেল দেয় না। শাড়ির চেয়ে সালোয়ার-কামিজ বেশি পরে। কেউ কেউ-বা আমাদেরই মতো ট্রাউজারস বা জিনস। উপরে পাঞ্জাবি।

যাই হোক, আমরা এইরকম আন-সপিস্টিকেটেড, পিওর, গ্রাম্য সুন্দরী, তার আগে দেখিনি কখনো। তাই সত্যিই শোকাহত হয়ে পড়েছিলাম ওরা চলে যাওয়ায়।

সুমিত বাজার করে ফিরল। সব শুনে বলল, তোদের তো অবস্থা রীতিমতো খারাপ দেখছি! ইডিয়টস। এখনও কেউ প্রেমে পড়ে? এই অলমোস্ট টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরিতেও।

প্রদীপ বলল, বুকে হাত দিয়ে, শুধু প্রেম নয়, মাসস-প্রেম। একটা হিল্লে কর ভাই আমাদের। নইলে তোদের পুকুরেই আমরা তিনজনে মিলে আমাদের মধ্যে চতুর্থজন, সুহৃদ, সুহৃদের বিয়ে হয়েছিল গত শীতে, সুমিতের পিসতুতো বোনের সঙ্গে, রেজিস্ট্রি করে। এক সঙ্গে গলায় কলসি বেঁধে ডুবব আর সুইসাইড নোটে লিখে যাব যে, তুইই এই জন্যে দায়ী। ইয়েস, সুমিত সেন।

সুমিত বলল, ভাবনা কী? আমি মাসিমাকে বলছি। যা ভালো রান্না করেন না মাসিমা। শুঁটকি মাছ, কাউঠঠা, ভেটকি মাছের কাঁটা চচ্চড়ি। তারপরে তোমাদের হিজ-হিজ হুজ-হুজ এলেম।

প্রদীপ বলল, গড় গড় করে বলে তো গেলি কিন্তু ওগুলো কী জিনিসরে? চাইনিজ ডিস নাকি?

ধ্যাৎ। ওগুলো বাঙাল-রান্না। পদ্মাপারের নয়, একেবারে চাঁটগার। বিজাতীয় রান্নাই যদি খেতে হয় তাহলে কিন্তু বাঙালদেরই! বুঝেছিস! কোথায় লাগে থাইল্যান্ডের বা চাইনিজ ডিশ।

সুমিত গিয়ে উজ্জ্বলকে ডেকে নিয়ে এল। মেয়ে তিনটির দাদা। চমৎকার ছেলে। আমাদেরই সমবয়সি। লম্বা-চওড়া-সপ্রতিভ। কথায় একটু চাঁটগাঁইয়া টান আছে শুধু।

বলল, আগামী সোমবার ভিলাইতে যাচ্ছে। ট্রেনিং-এ।

একটু পরেই উজ্জ্বলের বাবা এলেন, সুমিতের পতুমেসো। সেদিন থেকে আমাদেরও পতু-মেসো। ভারি ভোলে-ভালা মানুষ। হাতে মস্ত একটি পেতলের জামবাটি। কুচকুচে কালো টাক নাড়িয়ে, পতুমেসো সুমিতকে বললেন এই যে বাবা! তোমার মাসিমা পাঠিয়ে দিলেন।

কী মেলোমশাই?

সিঙিমাছের চচ্চড়ি, কালো জিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে জম্পেস করে বেঁধেছেন তোমাদেরই জন্যে। শুঁটকি মাছও পাঠিয়ে দিচ্ছি। বম্বে ডাক। মনে হবে, মাংস। এখনও একটু বাকি আছে।

উনি চলে গেলে, সুমিত বলেছিল, ভারি ভালো মানুষ রে! যখনই আসি কত কী করেন। অথচ সম্পূর্ণ বিনা স্বার্থে। এমন মানুষ আজকাল বেশি চোখে পড়ে না।

২.

মনে আছে, উজ্জ্বলের ছোটো তিন বোনের নাম ছিল দীপিতা, ঈশিতা আর ইপ্সিতা।

বলাই বাহুল্য, বছর চারেক কেটে গেছে তার পরে। ওদের একজনকেও আমাদের মধ্যে কেউই বিয়ে করিনি। কারণ, কোনও অবকাশের মেঘলা দুপুরে ঝিরিঝিরি হাওয়া-বওয়া যৌবনের সুখময় রোমান্টিকতায় পৃথিবীর সব যুবতীকেই বিয়ে করতে ইচ্ছে যায় সব যুবকেরই। কিন্তু সেসব মিথিক্যাল ঘটনা পঞ্চাশ বছর আগে ঘটত। এখন মানুষের মন ঘন্টায়-ঘন্টায় পালটায়।

এখনকার দিনের যুবকেরা মেয়ের বাবার অবস্থা, মেয়ের চাকরি, কী পাবে না পাবে, এসব না দেখে আদৌ এগোয় না। খবরের কাগজের সম্পাদকের দপ্তরে জহর ব্রত আর সতীর বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষায় চিঠি লিখেই পাত্রপাত্রী কলাম নিয়ে হামলে পড়েন সব শিক্ষিত ছেলেই এবং তাঁদের শিক্ষিত বাবা-মায়েরা।

না। আমি অথবা প্রদীপ অথবা সুমিত আমরা কেউই বিয়ে করিনি দীপিতা বা ঈশিতা বা ঈপ্সিতাকে।

প্রদীপ ও সুমিত বিয়ে করেছে বড়োলোকের মেয়েদের। দেখতেও মন্দ নয় দু-জনে। দু-জনেই এম এ পাশ। প্রদীপ মারুতি গাড়ি পেয়েছে। সুমিত ব্যবসা।

সুমিত এবং পতুমেসোর বারংবার অনুরোধে উজ্জ্বলের জন্যে আমাকে একটি মেয়ে দেখে দিতে হয়েছিল। দেখছিল অনেকেই, আমারটাই বিধে গেল।

আমাদের পাড়ার ফুচকুদা ভারি কেওকেটা লোক। প্রতি শুক্রবারই তাঁর বাড়িতে পার্টি লেগে থাকে। পুলিশের কর্তা থেকে শহরের কেওকেটা লোকেদের মোচ্ছব লেগে যায়। বছরের মধ্যে। ফুচকুদা তিনবার সপরিবারে বাইরে বেড়াতে যান। ব্যবসাটা ওঁর যে ঠিক কীসের তা কেউ জানে না। উনি বলেন, অর্ডার-সাপ্লাইয়ের। তবে ভালো অর্গানাইজেশান আছে বলে মনে হয়। কারণ। নিজেকে খাটতে হয় না একটুও। বিনা পরিশ্রমে এমন রবরবা এক স্মাগলিং ছাড়া অন্য কিছুতে হতে পারে বলে মনে হয় না।

পাড়ার লোকেরা তাই বলে।

এমনিতে পাড়ার লোকেদের সঙ্গে ব্যবহার ভালো। তাঁর স্ত্রী নমিতাদি খুবই মিশুকে। কথায় কথায় বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে এমন হাসেন যে, ভয় হয় যে-কোনো সময়ে সে দাঁত খুলে পড়ে যাবে।

কেউ হয়তো কখনো বলেছিল তাঁকে যে, দাঁত বার করে হাসলে সুন্দরী দেখায়। তারপর থেকেই

তাঁর এই দেখন-হাসির রোগ। রোগটি বছর চার পাঁচের। এই বয়সেও সুইমিং জগিংযোগ ব্যায়াম করে নিজের মেয়ে শাশার মতোই তরুণী রেখেছেন নিজেকে। কিন্তু কোন বয়সে যে কোন সৌন্দর্য মানানসই এবং এ দেশটা যে এখনও আমেরিকা হয়ে যায়নি এই কথাটি বোধহয় তাঁর স্পোকেন-ইংলিশ শেখা মাথায় ঢোকে না। উজ্জ্বলের বিয়েতে ঘটকালি করাটাই কাল হয়েছিল আমার। ভাবলেই এত খারাপ লাগে!

না, না। ডিভোর্স টিভোর্স নয়।

পতুমেসো মানুষটি এত কষ্ট করেছেন সারাটা জীবন! মেয়েরাও প্রত্যেকেই যদিশ্রীময়ী এবং শিক্ষিতা তবুও টাকা ছাড়া যে আজকাল বিয়ে হওয়া ভারি মুশকিল! তাই উজ্জ্বলই ছিল পতু মেসোর একমাত্র ভরসা। উজ্জ্বল যদি পায়ে ভালো করে দাঁড়ায়, এবং তার স্ত্রী যদি মন্দবুদ্ধির না হয় তবে উজ্জ্বল এক-এক করে নিশ্চয়ই তিন বোনকেই বিয়ে দিতে পারবে ভালো করে। উজ্জ্বল যদি বউ নিয়ে আলাদাও থাকতে চায়, থাকুক না। সেখানেও যদি দীপিতাকে রাখে তাহলেও উজোর কোনো ভালো-বান্ধবই ওকে বিয়ে করবে। টাকাই তো সব নয়। এখনও তো ব্যতিক্রম কিছু আছে।

তাই সকলকেই বলতেন পতুমেসো ছেলের জন্যে ভালো মেয়ে খুঁজতে।

ফুচকুদা আর নমিতা বউদিদের বাড়ি ছেলেবেলায় সরস্বতী আর দুর্গাপুজোর চাঁদা আনতে যেতাম। তখন ওঁদের মেয়ে শাশা আর ছেলে চকোর খুবই ছোটো ছিল। এই হঠাৎ রবরবাও। তখনও হয়নি। এখন দেখি, শাশা বারান্দাতে ম্যাক্সি বা জিনস পরে দাঁড়িয়ে থাকে, হাত নাড়িয়ে। ইংরিজিতে কথা বলে। ইংরিজিই যেন মাতৃভাষা। বাংলা একটা গণ্য করার মতো ভাষাই নয়। ও ভাষায় শুধু কেরানি আর মাছওয়ালারাই কথা বলে। এমন একটা ভাব।

এও আরেক রোগ হয়েছে বত্রিশপাটি বের করে হাসার মতো। কী হল! কথায় কথায় ওহ মাই। মাই! গুড গ্রেসাস, আউচ, ইত্যাদি ছিটকে বেরোয়। ইংরেজদের পদানত যখন ছিলাম আমরা তখন কিছু স্ব-ধর্ম, স্ব-সংস্কৃতি, স্ব-সংগীত, স্ব-ভাষা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, কু-জাত একধরনের বাঙালিদের মধ্যে ড্যাডি! ড্যাডি! ছাপ্পর-পর পিজন বৈঠে বৈঠে সংস্কৃতি গজিয়ে উঠেছিল ইংরেজদের জুতোর তলা চাটার জন্যে। তখন তারও-বা মানে বোঝা যেত। কারণ, তাতে লাভ ছিল কিছু।

ডাউটফুল পেরেন্টজের মানুষেরা চিরদিনই বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ ফায়দা উঠিয়েছে। তাদের সুন্দর ফিগারের স্ত্রীদের ভাঙিয়ে খেতেও তাদের বিবেকে বাধেনি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার চল্লিশ বছর কেটে যাওয়ার পর এই বিলিটেড মেমসাহেবদের ভাঁড়ামো যে কোনো সুরুচির, শিক্ষিত, ইংরেজি-জানা মানুষের চোখেও অত্যন্তই বিরক্তিকর ঠেকে। শিক্ষা ও সপ্রতিভ এক, জিনস আর সপ্রতিভতার র‍্যাপিং–পেপারের নির্মোক সম্পূর্ণই অন্য।

তবু ফুচকুদার টাকা আছে এবং শাশা একই মেয়ে এবং উজ্জ্বলের বাবারও ইচ্ছে ছিল যে উজ্জ্বল একটি শক্ত খুঁটি পাক তার শ্বশুরের মধ্যে।

পতুমেসো সদ্বংশজাত মানুষ। ছেলের বিয়েতে এক পয়সাও নেবেন না এবং মেয়েদের বিয়েতেও দেবেন না এক পয়সাও। এই ধনুকভাঙা পণ। যারা গোরু-ছাগলের মতো ছেলে-মেয়ে বেচাকেনা করে সেগুলোকে পতুমেসো মানুষ বলেই গণ্য করেন না।

কী করে কী হল জানি না। ফুচকুদাকে উজ্জ্বলের কথাটা বলতে উনি বিশেষ গা না করে বললেন, দেখি, আগে ছেলে কেমন? পরিবার কেমন? ঝপ করে কি মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায়?

আমার কাছে পতুমেসোর ঠিকানাটি নেবার পরই একেবারেই চুপ মেরে গেলেন।

খবর পেলাম আবার যখন, তখন বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়ের দিন কুড়ি বাকি। ফুচকুদা তাঁর চাপরাসিকে দিয়ে বিয়ের চিঠি পাঠালেন। এক লাইন খামে লিখে, বুছতেই পাচ্চো, কী। ঝামেলাতে আচি। আসা চাইই।

শাশা এবং উজ্জ্বলের বিয়ের সময়ই ফুচকুদার বাড়িতেই পতুমেসো, দীপিকা, ঈশিতা এবং ইপ্সিতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সুমিতের সঙ্গে তো বটেই!

পতুমেসো ফুচকুদার দু-হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আমার ছেলেকে আপনার হাতে সঁপে। দিলাম। দেখবেন, আমি বড়ো অভাগা, দুর্বল এবং গরিব তো বটেই, আমার ছেলেকে যেন না হারাতে হয়। ওই আমার এবং আমার মেয়ে তিনটির আশা-ভরসা।

ফুচকুদা তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, ন্যাকামি ছাড়ুন তো। আপনার ছেলে কি শিশু নাকি তাকে আমি যাদু করে রেখে দেব? তা ছাড়া তা করবই বা কেন? আমার কি নিজের ছেলে নেই। চকোর?

পতুমেসো কীরকম যেন আহত চোখে আস্তে আস্তে ফুচকুদার হাতটা ছেড়ে দিলেন।

আমার খুব খারাপ লেগেছিল।

আমার মা বলতেন, কক্ষনও বিয়ের ঘটকালিতে আর দাম্পত্য-কলহে থাকবি না। পরে দেখবি মিছিমিছি দু পক্ষেরই কাছে শত্রু হয়ে উঠেছিস।

বউ-ভাতে ফুচকুদা তো বটেই পতুমেসোও আমাকে নেমন্তন্ন করেননি। একটু অবাকই হয়েছিলাম। বলতে গেলে, ঘটক হলাম আমিই! আর…

পরে পতুমেসো একটি চিঠি লিখেছিলেন ইনল্যান্ড-লেটারে।

পরমকল্যাণীয়েষু, বাবা শুভ্র,

অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে জানাইতেছি যে তোমাকে উজ্জ্বলের বউভাতে নিমন্ত্রণ জানাইতে পারিলাম না। অথচ তুমিই এই বিবাহের ঘটক!

কেন পারিলাম না তাহা পরে কখনো সাক্ষাতে জানাইব। এক্ষণে লিখিবার অসুবিধা আছে।

ভালো থাকিও। একদিন আসিও। তোমার মাসিমা তোমার কথা বলিতেছিলেন। প্রায়ই বলেন। নির্ভয়ে আসিও। আমার কোনো কন্যাকেই তোমার স্কন্ধারূঢ় করিব না। আমার কোনো কন্যাই অরক্ষণীয়া হইয়াছে এমনও নহে। তা ছাড়া, তাহারা নিজেরাই নিজেদের দায় লইতে সক্ষম।

–ইতি আং পতুমেসো।

৩.

তারপরে বহুদিন পতুমেসোর বা সুমিতেরও আর কোনো খবর রাখি না। ওদের মামাবাড়ির বাগানেও যাওয়া হয়নি। আমাকে মাঝে ডালটনগঞ্জে বদলি করে দিয়েছিল। সেখানে একটি অ্যাকাউন্ট নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। চাকরি যাওয়ারই উপক্রম হয়েছিল প্রায়। তারপর বম্বেতে ট্রেনিং-এ গেলাম। ফিরে, ব্যাঙ্গালোরে।

কলকাতায় যখন থাকতাম তখন দু-একবার দেখেছিলাম উজ্জ্বল ফুচকুদাদের বাড়িতে আছে। বারান্দাতে দেখতে পেতাম। বেড়াতে এসেছে সম্ভবত। একবার মায়ের কাছে শুনলাম যে উজ্জ্বল পারাদীপ না হলদিয়া না ডিগবয় কোথায় যেন ট্রান্সফার হয়ে গেছে।

আমার এখনও বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। আমার পরের বোন সোমা গোঁ ধরেছে যে পায়ে না। দাঁড়িয়ে বিয়ে করবে না। বিয়ে ওর অবশ্য ঠিকই হয়ে রয়েছে। সৌরীন, ডাক্তার। প্রায়ই আসে আমাদের বাড়ি। সোমার পায়ে দাঁড়াতে এখনও বছর খানেক। মায়ের ইচ্ছা নয় যে, আমি মোর বিয়ে না দিয়ে আগে বিয়ে করি। অবশ্য আমার কাউকে পছন্দও নেই। পছন্দ করার সময়ও নেই। মেয়েরাও বোধহয় সাধারণভাবে আমাকে অপছন্দ করে।

এক রবিবার সুমিতদের বাড়িতে গেছি। সুহৃদ প্রদীপ সকলেই এসেছিল। সুমিত লেট-লতিফ। ছুটির দিন দশটা অবধি ঘুমোয়। সকলে ওর ঘরে বিছানার ওপর বসে গুলতানি মারছি। এমন সময় সুমিত বলল, যাঃ চলে! ভুলেই গেছিলাম শুভ্র। তোর নামে একটা চিঠি এসেছে আমার। কেয়ারে। পতুমেডোর কাছ থেকে।

সুহৃদ সুমিতের বিছানাতে শুয়ে পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে আনন্দবাজারের পাতা ফরফরিয়ে পড়ছিল। একথা শুনে হঠাৎ বলল, আমাকে লক্ষ করে, দ্যাখ। দ্যাখ। এবার তোর ঘাড়টি মটকাল বলে। ঘাড় খালি যে রাখে তারই মরণ। যে ভদ্রলোকের নিজের ঘাড়ে তিন তিনটি অনূঢ়া কন্যা। তিনি তোমার মতো ব্যাচেলরের ঘাড় ভাঙবেন না তো কে ভাঙবেন? বেচারি! আর না ভেঙে করবেনই বা কী?

সকলেই ঝুঁকে পড়ে দেখতে গেল চিঠিটি একসঙ্গে। মধ্যে দিয়ে কাগজটাই ছিঁড়ে গেল।

আমি ওদের দেখালাম, চিঠির উপরে Personal লেখা।

ওরা বলল, সরি!

বাদু
১৫-৮-৮৮
উত্তর চবিবশ পরগনা

পরম কল্যাণীয় শ্রীমান শুভ্র বসু
C/Oপরম কল্যাণীয় শ্রীমান সুমিত চট্টোপাধ্যায়
১, দেশপ্রিয় পার্ক ওয়েস্ট
কলকাতা-৭০০০১৯

বাবা শুভ্র,

উজোর বউভাতে তোমাকে নিমন্ত্রণ করি নাই এবং সে কারণে বউভাতের পরে পরেই তোমাকে একটি পত্র লিখিয়াছিলাম। সেই পত্রে এমৎ কহিয়াছিলাম যে না-করার কারণ তোমাকে পরে জানাইব।

এক্ষণে জানাই যে, উজোর শ্বশুরমহাশয় আমাকে বারণ করিয়াছিলেন। কহিয়াছিলেন যে, পাড়ায় তাঁহার বিশেষ সম্মান আছে। পাড়ার লোক বলিতে হইলে এক হাজার মানুষকে বলিতে হইবে। তেমন সামর্থ্য কি আপনার আছে?

আমি কহিয়াছিলাম, কিন্তু শুভ্রই যে এই বিবাহের মূলে!

কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেন নাই।

যে-কারণে আজ তোমাকে পত্র লিখিতেছি তাহা অতি করুণ। এমনকী তাহা তোমার নিকট বিশ্বাসযোগ্যও না হইতে পারে। কিন্তু আমি তোমা বই আর কাহাকে একথা বলিতেও পারিতেছি না। বাবা, এ যে বড়োই লজ্জার কথা, বাবা হইয়া নিজ পুত্র সম্বন্ধে এইরূপ কথা বলিবই-বা কী করিয়া?

আমার ও আমার স্ত্রীর প্রাণাধিক উজো, তাহার তিন ভগিনীর নয়নের মণি উজোদা, হারাইয়া গিয়াছে।

না, না, অন্যরূপ ভাবিও না। হারাইয়া গিয়াছে অর্থাৎ চুরি হইয়া গিয়াছে।

সে প্রথমে দুর্গাপুরে জয়েন করিয়াছিল। বিবাহের ছয়মাস পর্যন্ত অনিয়মিত ভাবে একা আসিত। তাহার পর রাউরকেল্লাতে বদলি হইয়া চলিয়া যাইবার পর মাঝে মাঝে চিঠিপত্র লিখিত এবং টাকাও পাঠাইত। তাহার পর হইতে তাহার কোনও সংবাদ জানি না। সে যে কোথায় রহিয়াছে, কেমন করিয়া রহিয়াছে, গত দীর্ঘ দুই বৎসরে তাহার কিছুই জানি না।

তাহার দুর্গাপুরস্থ এক বন্ধু চিঠি লিখিয়া জানাইয়া ছিল যে, সে সস্ত্রীক বিদেশে বেড়াইতে গিয়াছে। এবং ফিরিয়াই রাউরকেল্লা হইতে ভিলাই চলিয়া যাইবে। তাহাকে ট্রান্সফার করা হইয়াছে। পদমর্য্যাদাও বৃদ্ধি পাইয়াছে।

আমার পুত্রবধু শাশাও গত আড়াইবৎসর হয় আমাকে, তাহার শ্বশ্রুমাতাকে অথবা তাহার ননদিনিদিগকে একটিও পত্র লেখে নাই। প্রি-পেইড টেলিগ্রাম পর্যন্ত করিয়াছি। উত্তর পাইনাই।

অদ্য হইতে প্রায় দেড় বৎসর পূর্বে আমার বেয়াই মশাইয়ের নিকট নিরুপায় হইয়া একদিন গিয়া তাঁহার পায়ে পড়িয়া আমার পুত্রের বিশদ সংবাদ প্রার্থনা করি। এমন সময় আমি উজোর কণ্ঠস্বরও শুনিতে পাই দোতলাতে। কিন্তু ফুচকুবাবু বলেন, পতুবাবু আপনার ছেলে, মনে করুন, চুরি হইয়া গিয়াছে। শিশুকালেও চুরি যাইতে পারিত। সে শিশুকালে অপহৃত না হইয়া ভরা যৌবনে হইয়াছে। আপনি গাত্রোত্থান করুন। আপনার পুত্রের সঙ্গে দেখা হওয়া সম্ভব নহে। উজ্জ্বল এখন আর আপনার পুত্র নহে, সে আমার জামাতা হইয়াছে। এবং ইহাই থাকিবে। ভবিষ্যতে আর কখনোই তাহার খোঁজ করিবার চেষ্টা করিবেন না এবং যত শীঘ্র সম্ভব আপনি এই স্থান ত্যাগ করিয়া যান।

আমি সংযম হারাইয়াছিলাম। বলিয়াছিলাম, জানোয়ার! তোমাকে আমি গলা টিপিয়া হত্যা করিব।

ফুচকুবাবুর দারোয়ান আর কুকুরে আমাকে প্রায় ছিড়িয়া ফেলিয়াছিল। পেছনের গারাজে আমাকে বলপূর্বক লইয়া গিয়া বন্ধ ভ্যানে চাপাইয়া সাদার্ন অ্যাভিনিউর নির্জন স্থানে ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দেওয়া হয়। আমার চশমাটি ভাঙিয়া বাম চোখের নীচে অনেকখানি কাটিয়া যায়।

তুমি ভাবিতে পার যে, এই সব কষ্টকল্পিত ঘটনা। বিশ্বাস করিও যে ইহার এক বর্ণও মিথ্যানহে। ধাক্কা মারিয়া পথে ফেলিবার পূর্বে আমাকে এই বলিয়া শাসানো হইয়াছিল যে ভবিষ্যতে আবারও

আসিলে মিথ্যা পুলিশে কেস দিয়া আমাকে চোর প্রতিপন্ন করিয়া তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হইবে।

আমিও আর যাই নাই। আমার বেয়াই প্রতাপশালী ব্যক্তি এবং দুষ্টু ব্যক্তি। তাঁহার পক্ষে সব কিছুই করা সম্ভব। ক্ষমতা যদি দুষ্টজনের কুক্ষিগত হয় তখন তাহার রূপ হয় প্রলয়ংকারি।

এতদিন জানিতাম যে কন্যার পিতারাই নিগৃহীত হন। পুত্রের পিতাদের ভাগ্যেও যে ওইরূপ ব্যবহার ঘটে বাবা, তাহা জানিতাম না পূর্বে। তুমি শুঁটকি মাছ খাইতে ভালোবাসো। যেইদিন আসিবে তাহার কয়দিন পূর্বে একটি পোস্টকার্ড ফেলিয়া দিও। তোমার মাসিমা তোমার নিমিত্ত শুঁটকি মাছ রাঁধিয়া রাখিবেন।

অপেক্ষা করিবার সময় আর বেশি নাই। যথাশীঘ্র সম্ভব আসিও।

এই অসহায় সম্বলহীন বৃদ্ধর অপরাধ নিজগুণে মার্জনা করিও।

–ইতি আশীর্বাদক পতঞ্জলি রায়

স্তব্ধ হয়ে আমি চিঠিটি ওদের দিকে এগিয়ে দিলাম। সুমিত জোরে জোরে পড়ল, যাতে সকলে শুনতে পারে।

চিঠি পড়া হলে পর প্রদীপ বলল, কী কেলো বলত।

সুহৃদ বলল, এ তো আজকাল হরদমই হচ্ছে জানিস না? ছেলে বা মেয়ের বাবার মধ্যে যে বেশি ইনফ্লুয়েনসিয়াল, সেই পাবলিক বা প্রাইভেট সেক্টরের বড়ো সাহেবের বলে নিজের জামাইকে বা ছেলেকে বা পুত্রবধুকে যেখানে সেখানে ট্রান্সফার করিয়ে দিচ্ছেন। এমন জায়গায় করছেন যাতে জামাইয়ের বা পুত্রবধুর চুরি হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই।

মেয়েরা হয়তো বনছে না শাশুড়ির সঙ্গে তো দে জামাইকে এর্নাকুলাম-এ ট্রান্সফার করে। যা এবারে সেখানে গাঁটের কড়ি খরচা করে বউ-এর সঙ্গে ঝগড়া করতে! বছরে কতবার পারবে যেতে? আর গেলেও কোমরের ব্যথার চিকিৎসা করাবে আগে? না ঝগড়া করবে? সুমিত বলল, আবার ধর বাড়িতে প্রবলেম, পুত্রবধু বড়ো ত্যান্ডা-ম্যান্ডাই করছে। এদিকে পঙ্গু শ্বশুর। খিটখিটে শাশুড়ি। যেই জানা গেল পুত্রবধূর বাবা জামাইকে ট্রান্সফার করাবার তালে আছেন, তখনই দে আরও বড়ো মুরুবিব ধরে ট্রান্সফারের পথে কাঁটা বসিয়ে। কত লোক টাকা বানিয়ে নিচ্ছে আজকাল এই করে।

বলিস কী রে!

হ্যাঁ রে। যার এলেম আছে সে সমুদ্রের ঢেউ গুনতে দিলেও টাকা বানায়। এলেম কী আর চাট্টিখানি কথা।

প্রদীপ বলল, তা ট্রান্সফার করলেও জানা যাবে না কোথায় ট্রান্সফার করল?

উপর-মহলে জানা থাকলে তবেই না এমন ট্রান্সফার করানো সম্ভব? আর পতুমেসো অতি সাধারণ মানুষ। জনবল অর্থবল কিছুই নেই। তাঁর পক্ষে ছেলের বা জামাই-এর কোনো কলিগ টলিগকেও জানা না থাকলে কোথায় ট্রান্সফার হল তা জানাবেনই বা কী করে? তা ছাড়া বড়োসাহেব অপারেটর, রিসেপশনিস্ট বা এরিয়া ম্যানেজারকে টিপেও তো রাখতে পারেন! তাঁদের ঠেকাচ্ছেটা কে?

তা ঠিক। আমি বললাম।

প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত বন্ধুরা পতুমেসোর এই এস-ও-এসকে বিশেষ গ্রাহ্যর মধ্যেই আনল না। দেখে একটু ব্যথিত হলাম আমি।

ওরা অ্যাকাডেমিক ডিসকাসন করেই নিজের নিজের কর্তব্য শেষ করল।

সুমিতই একমাত্র বলল, তোকে লিখেছে পার্সোনাল চিঠি, তুই দেখে আয়। টাকাপয়সা কিছু দিতে গেলে চাঁদা তুলে দেওয়া যাবেখন।

সুমিত চান করে তৈরি হলে ওরা সকলে গেল টিটুর বাড়ি ভিডিও দেখতে। মোজার্টের জীবন নিয়ে ভিডিও অ্যামেডিয়াস। ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে। টিটুর বৌদি নেমন্তন্ন করেছেন।

চা খেয়ে বললাম, আমি কিন্তু উঠছি। অ্যামেডিয়াস। আমি দেখেছি। বউদিকে বলিস, কিছু মনে না করতে। চমৎকার ছবি। দেখে আনন্দ পাবি।

সুমিতদের বাড়ির বাইরে বেরিয়ে মোটরসাইকেলটা স্টার্ট করতেই তার ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ যেন অ্যামপ্লিফায়ারে শতগুণ বেড়ে উঠে আমার কানের মধ্যে ভটভট করে উঠল। আমি সোজা চললাম বাদুর দিকে।

পতুমেসো প্রায়ান্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে অনেক কথা বলেছিলেন। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। কিছু করতেও পারেন না, করার মতো। শুধুই ভাবতে পারেন।

যে যুগে ভালোমানুষি ও সারল্যের মতো মূর্খামি আর দু-টি হয় না সেই যুগে পতুবাবুর মতো ভালোমানুষ যে কী করে জন্মান তা ভাবাই যায় না।

বাড়ি ছিল চিটাগাঙ্গ-এ। পাহাড়, সমুদ্র, সামুদ্রিক পাখি আর শুঁটকি মাছের দেশ। শিশুকালে একবার কক্সবাজারেও গেছিলেন। সেসব এখন স্মৃতি। পার্টিশনের সময় ওঁর বয়স বারো। আজ পনেরোই আগস্টে ছাপ্পান্ন হল।

নেহরুসাহেব আর জিন্না সাহেব দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের গদিতে আসীন হবার মুহূর্তেই বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো দেশভাগের খড়গ পড়েছিল তাঁদের মাথায়।

প্রথমে উদবাস্তু হয়ে গেছিলেন আসামে। সেখান থেকেও তল্পি গুটিয়ে আসতে হল বাঙালি জাতির শেষ অবলম্বন এবং ক্ষয়িষ্ণু কলকাতাতে। তখন তাঁর বয়স পঁয়তাল্লিশ।

বাঙালির চরিত্র যে কী প্রকার খারাপ তা নিয়ে পতুবাবুর কোনোরকম ক্ষোভ ছিল না। কোনোদিনই। উনি নিজস্ব সমস্যাসমূহ নিয়ে এতই ন্যুজ ছিলেন যে সমাজ, যুগ, দেশ, কাল, কংগ্রেস, সি পি এম, জনমোর্চা, রাজীব গান্ধি অথবা কিমি কাটকার কোনো কিছু সম্বন্ধেই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষেরই মতো ওঁর বিন্দুমাত্রও আগ্রহ ছিল না। আপাতত কোনোক্রমে ওর উজোকে ফিরে পেলেই উনি হাতে চাঁদ পেতে পারেন। বেদেরা বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনো ছেলেপাচারকারী দলও তাকে ধরেনি।

পরম দুর্বিপাকের মধ্যেও খেতে পান আর নাই-ই পান ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনো তিনি ঠিকই চালিয়ে গেছিলেন। মেয়েরাও ভালোই ছিল পড়াশুনোয়। কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট ছিল উজ্জ্বল। ব্যবহারেও। আসামে থাকার সময়ও আসাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে পড়েছিল। কলকাতাতে এসে পতুবাবুর বাদুর কাছাকাছি বস্তির মতো আস্তানাতে থেকে উজো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এবং ফার্স্ট হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায়। অতবড়ো কোম্পানি থেকে ডেকে চাকরি দেয় তাকে। এই বাজারে ক জনের ছেলেকে ডেকে চাকরি দেয় কে?

ছোটো তিন বোনের বড়ো আদরের একমাত্র দাদা, দুখিনী মায়ের বড়ো গর্বের ধন এই উজ্জ্বল। পতুমেসোর উজো।

সুমিতের বড়োমামার বাগানবাড়ির পাশ দিয়েই এলাম আমি, বাইকের গতি কমিয়ে।

অনেক দিন আসিনি এদিকে। বড়োশ্রীহীন হয়ে গেছে পুরো এলাকাটি, গাছপালা তো নেইই, নতুন নতুন নানা রঙের ঢঙের নানা ধাঁচের বাড়ি উঠেছে। আর বেড়েছে মানুষ এবং যানবাহন। পাখির ডাক শোনা যায় না। কর্কশ চিৎকার। আম গাছেরও বেশিরভাগই নেই।

সুমিতের কাছে শুনেছিলাম যে, পতুমেসোর ব্যবসা ফেল করেছে। কোনোদিনও পতু-মেসো। যোগ্য ছিলেন না। তা ছাড়া ওই লাইনে বাঙালি খুব কমই ছিলেন। ওঁর ব্যবসা বড়ো রকম ধাক্কা খাওয়াতে বাঙালি প্রায় নিশ্চিহ্নই হয়ে গেল ওই লাইন থেকে।

এখন কোনো ব্যবসাই হয়তো বাঙালির জন্যে নয়। অথচ ব্যবসা না করলে এই জাতটাভিখিরি আর দালাল আর বেশ্যার জাতই হয়ে যাবে। অন্য কোনো পথও খোলা নেই। একমাত্র ব্যবসাই একে বাঁচাতে পারে। এ বড়ো সঙ্কটময় মুহূর্ত। কিন্তু বাঙালি সমাজের প্রতিভূ, মাথা, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এখন ফুচকুদার আর নমিতা বউদির মতো মানুষেরাই!

পতুমেসোর বাড়িটাও চেনা যায় না। টিনের চালের পাকা দেওয়ালের বাড়ির একদিকের ছাদের টিন ঝড়ে উড়ে গেছে। পেঁপে গাছে দাঁড়কাক ডাকছে খাখা করে। মনে হচ্ছে, সব বুঝি সত্যিই খেয়ে নেবে।

দীপিতা পুকুর থেকে নেয়ে উঠে পুকুরপাড়ের টিউবওয়েল থেকে জল তুলে স্বচ্ছ ভেজা শাড়িতে ভেজা চুলে কোমরে জলের ঘড়া তুলে নিয়ে আসছিল। প্রথমে আমি ওকে চিনতে পারিনি। ও-ও পারেনি আমাকে। কোথায় গেছে সেই ঢলঢলে রূপ।

হতবাক হয়ে আমি ভাবছিলাম, দারিদ্র্য যেখান দিয়ে হাঁটে তার দু-পাশ বড়ো নোংরা করে যায়। শুয়োরেরা যেমন কচুবন উপড়োয়, দারিদ্রও তেমনি শ্রী, সুখ, শান্তি। বাগোনভেলিয়া ফুলগুলিকে পর্যন্ত খেয়ে নিয়েছে দারিদ্র্য।

আমি মুখ নামিয়ে বললাম, পতুমেসো।

দীপিতা বলল, আসছি আমি।

বলেই, ভেতরে গিয়ে জামা পরে, শাড়ি বদলে এল। জামাটাও ছেঁড়া। শাড়িরও তথৈবচ অবস্থা। বলল, বাবা অসুস্থ। আপনার কথা বলেছি। ভিতরে আসুন।

ভিতরে না গেলেই পারতাম।

পাঁচ ইঞ্চি সিমেন্টের দেওয়ালের প্রায় জানলাহীন ঘর। উপরে টিনের ছাদ। তেতে আগুন হয়ে আছে। পতুমেসো একটি তক্তপোষের উপর অতি মলিন বিছানায় শুয়ে আছেন একটি নোংরা তেলচিটে বালিশের উপর মাথা রেখে। চেনাই যাচ্ছে না। দড়ির মতো হয়ে গেছে শরীর।

মাসিমা একটি ভাঙা টিনের চেয়ার পেতে দিলেন বিছানার পাশে।

বললেন, কেমন আছ শুভ্র?

আমার নাম যে শুভ্র একথাটিতে মনে হয় বড়ো লজ্জা হল আমার। এই ঘরে, এই বিছানাতে, এই মানুষের সামনে শুভ্রতার চেয়ে বড়ো ভ্রষ্টতা আর কিছুই হয় না।

আমি ডাকলাম, পতুমেসো! তারপরে বললাম, কী হয়েছে মাসিমা ওঁর? পতুমেসো চোখ খুললেন হঠাৎই ভীষণ উত্তেজিতভাবে। এদিক-ওদিক কাকে যেন খুঁজলেন। যেন কেউ এসে দাঁড়িয়েছে, তাঁর মাথার কাছে। তারপর আমাকে দেখেই হাত চেপে ধরলেন। বুকের উপর ধরে রইলেন হাতটা। অনেকক্ষণ।

ওঃ তুমি!

নিরাশ গলায় বললেন উনি। তারপরই চোখ বুজে ফেললেন।

বললাম, পতুমেসো, এসেছি। আমাকে সব খুলে বলুন।

কী আর বলব? তোমার ফুচকুদা, মানে, উজ্জ্বলের শ্বশুর একটা বাজে, ইতর মানুষ। উনি চক্রান্ত করে, পদে পদে চক্রান্ত করে আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছেন। আর ও ফিরে আসবে না। কোথায় যে রয়েছে এখনও তা জানি না। টাটার চাকরি ছাড়িয়ে দুর্গাপুরে ঢুকিয়েছিলেন। তারপর দেখতে দেখতে ছেলে আমার দূরে সরে যেতে লাগল। শেষে চুরিই হয়ে গেল শুভ্র। ছেলে চুরি। হল।

আমি বললাম, দোষ শুধু আমাদের পাড়ার ফুচকুদাকে দিয়ে কী হবে? আপনার এত ভালো ছেলে উজ্জ্বল কি ইচ্ছে করলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত না? পারত না যে,এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।

না। ও পারে না। সত্যি। বিশ্বাস করো। ওর হাত-পা বাঁধা। ফুচকুর লোক পোস্ট-অফিসে পর্যন্ত আছে। উজ্জ্বলের তার মা ও বোনেদের কাছে লেখা চিঠিগুলি পর্যন্ত সেই দৈত্যর হাতে চলে যায়।

পতুমেসো বললেন, জান শুভ্র, মাঝে মাঝে কী মনে হয় এখন জান? টেররিজম ইজ দ্যা ওনলি ওয়ে আউট। খবরের কাগজ পড়ো না? এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

আপনার কী হয়েছে পতুমেসো?

জিগ্যেস কোরো না। আমার পেটে ও গলায় ক্যানসার। বড়ো যন্ত্রণা শুভ্র। কিন্তু যখনি দীপিতা, ঈশিতা ও আর ইপ্সিতার মুখে চোখ রাখি তখুনি তাদের মনের যন্ত্রণা অন্য সব যন্ত্রণাকে ডুবিয়ে দেয়। বড়ো যন্ত্রণা শুভ্র।

ফুচকুদাকে গিয়ে কি কিছু বলব?

মাথা খারাপ। ভগবানের কাছে তো বটেই, মানুষের কাছেও মাথা নোয়ানো যায়। কিন্তু উনি ওই মানুষটা যে মনুষ্যেতর জীব। তার কাছে যেন মৃত্যুর ক্ষণেও মাথা না-নোয়াতে হয়।

তো কী করব?

তোমার তো অনেক জানাশোনো। যদি ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টে খোঁজ নিতে পার!

নেব। আমি বললাম। উজ্জ্বল কি ওখানেই আছে?

জানি না। চেষ্টা করে দ্যাখো। জানতে পার কিনা।

উজ্জ্বলের চিঠি না হয় আসছে না! উজ্জ্বল নিজেও কি একদিনের জন্যে আসতে পারে না?

আমার মনে হয়, পারে না। তোমার ফুচকুদাকে তুমি চেন না।

কী জানি!

এমন সময় দীপিতা এল। হাতে এককাপ চা নিয়ে।

বলল, চা খান।

ওর সঙ্গে চোখাচোখি হল। আমার মনে হল, আমি শিক্ষিত উপার্জনক্ষম যুবক। আমার শিক্ষা আমাকে কিছু কর্তব্য-দায়িত্ব দিয়েছে। দেওয়াটা উচিত অন্তত। যে কারণে আমার শিক্ষা নিয়ে আমি গর্বিত।

দীপিতা তখনও দাঁড়িয়েছিল।

আমি বললাম পতুমেসো, আমি দীপিতাকে চাইতে এসেছি।

কথাটা বলে ফেলেই ন্যায্য কারণে নিজের সম্বন্ধে আমি গর্বিত হলাম।

পতুমেসোর চোখ দুটো ঘোলাটে দেখাল।

বললেন, ভাড়া নেবে? ক-রাতের জন্যে?

আমি মুখ নামিয়ে নিলাম।

কী হল, বলো?

আমি বললাম, আমি দীপিতাকে বিয়ে করতে চাই।

বিয়ে?

দীপিতা?

আমি দীপিতার মুখে তাকালাম।

তার মুখে না-হাসি, না-কান্না, না-রাগ, না-লজ্জা, না-বিস্ময় ফুটে রইল বে-মওকা কেটে-যাওয়া চাঁদিয়াল ঘুড়ির মুখের ভাবের মতো।

দীপিতা চলে গেল ঘর ছেড়ে।

আমি বললাম ঈশিতা আর ইপ্সিতা কোথায়?

ওরা অফিস করে। অফিসে গেছে।

কী অফিস?

জিজ্ঞেস করি না শুভ্র। শুভ্র, আমি ভয়ে জিগ্যেস করি না। রোজ সকালে ডাল-ভাত আর আলু সেদ্ধ আর কচু সেদ্ধ খেয়ে চলে যায় হাতে দু-খানি একসারসাইজ বুক আর বই নিয়ে। ফিরতে ফিরতে সাতটা-আটটা। কত টাকা পায় জানি না। দৈনিক তাদের মাকে দু-জনে মিলে পঞ্চাশ টাকা করে দেয়।

ওদের সঙ্গে দেখা হবে না তাহলে?

হতে পারে, যেখানে ওরা দেখা দেয়। সে কোথা, আমি তো জানি না শুভ্র।

আমি দীপিতাকে চাই।

সম্মানের সঙ্গে চাও? সদ্বংশজাতা নারীর মতো যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবে তো শুভ্র? বিশ্বাস করো, দোষ ঈশিতা, ঈপ্সিতারও নয়, দোষ আমার। দোষ সেই নেতাদের যারা। আমাকে আমার সম্পূর্ণ বিনাদোষেই রাতারাতি উদবাস্তু করেছিল। দু-দুবার।

আমি বললাম, পারব। পারব মেলোমশাই।

আমার গলা ধরে এসেছিল। উঠে পড়ে, হেড-গিয়ারটা হাতে নিয়ে বললাম, আমি আবার আসব। আমি কিন্তু দীপিতাকে চাই।

আবার যেদিন আসব সেদিন যেন ঈশিতা আর ইপ্সিতা বাড়ি থাকে। পোস্টকার্ড ফেলে আসব।

পতুমেসো চুপ করে থাকলেন। হাতটা তুললেন।

কার উদ্দেশে জানি না।

৪.

পরদিন ভোরে চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ খুলেই দেখি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা-করা দুই যুবতির ছবি।

ঈশিতা আর ইপ্সিতা। দুই বোন।

চা পড়ে গেল খবরের কাগজে। আমি সোজা ফুচকুদার বাড়ি গেলাম। তিনি তখন প্রাতঃকালীন ভ্রমণ সেরে এসে যোগব্যায়াম করছিলেন।

একতলার বসার ঘরে ঘন্টাখানেক বসে থাকার পর চটি ফটফটিয়ে নীচে নামলেন তিনি।

বললেন, পুলিশের কোনো বড়ো সাহেবকে বলতে বলছ তো?

না। আমি আপনার কাছে এর জবাবদিহি চাইতে এসেছি।

জবাবদিহি! আমার কাছে? মুখ সামলে কথা বলো হে বাবুমশায়।

বাবুমশায় কথাটা বোধহয় অবাঙালি ব্যবসাদারদের কাছ থেকে শেখা।

আপনিও মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনি একটি ইতর, জানোয়ার। উজ্জ্বলকে এরকম করে ওর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন কেন? আপনার মনে নেই পতুমেসো অনুনয় করে। আপনাকে কী বলেছিলেন?

হাঃ। তুমি বিয়ে করলে তুমিও বুঝবে। যে পুরুষ যে নারীর স্তনে যখন মুখ রাখে, সে পুরুষ তখন তার।

মানে?

মানে মাতৃস্তনে রাখলে মায়ের, স্ত্রীর স্তনে রাখলে স্ত্রী, রক্ষিতার স্তনে রাখলে তার। উজ্জ্বল এখন শাশার। ব্যাটা ম্যাড়া যদি বাপমায়ের খোঁজ না রাখে সেই দোষ কি আমার?

ফুচকুদা!

দ্যাখো ছোকরা। আমাকে ভয় দেখিও না। তেলাপোকা ছাড়া আর কোনো কিছুকেই আমি ভয় পাইনা।

এই দুটি নিষ্পাপ মেয়েকে হত্যার জন্যে আপনিই দায়ী।

নিষ্পাপ? ফুঃ। তুমি যদি শুতে চাইতে কালই শুইয়ে দিতাম।

এখন আর…

এই ইতরের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। চলে এলাম ওখান থেকে। ভাবলাম মোটর সাইকেল। নিয়ে আমি তখুনি যাই। কিন্তু কী করব গিয়ে? আমি এমন ঘনিষ্ঠ নই যে আমি গেলে ওঁরা শোকে সান্ত্বনা পাবেন। এই শোক এতই গভীর, এতই তীব্র যে, আমি গেলে বিব্রতই হবেন শুধু ওঁরা। তাই আমাদের পাশের বাড়ির ভন্টেকে ডেকে মোটর সাইকেলটা দিলাম। দীপিতার নামে একটা চিঠি দিয়ে, চিঠির মধ্যে এক হাজার টাকা পাঠালাম। ভন্টেকে বললাম, পোস্টমর্টেমের পর কোথায় দাহ হবে তা জেনে যেখান থেকে হোক আমাকে একটা ফোন করে দিতে। আর দাহর বন্দোবস্ত সব করতে। উজ্জ্বল এসেছে কি না তাও জানাতে বললাম।

ভন্টে ফোন করল দুটোর সময়। বললো আজ যে রবিবার। দাহ আজ হবে না। পোস্টমর্টেম হবে কাল। দাহ হতে হতে কাল রাত। কী করব?

চলে আয়। দীপিতা কী বলল?

চিঠিটা পড়ল। টাকাটা ফেরত দিয়েছে। বলল, পরে চিঠি লিখবে তোমাকে শুভ্রদা।

পতুমেসো কী করছেন রে? কেমন আছেন?

শুয়ে শুয়ে গীতাপাঠ করছেন।

মাসিমা?

কাঁদছেন না। দু-চোখে আগুন। ছোটো দুটো বোনকে নাকি প্রতি শনিবার দলের পর দল লোক দেখতে এসেছিল গত দেড় বছরে। রসগোল্লা সিঙাড়া খেয়ে গেছে। গান শুনেছে, চুল দেখেছে, পায়ের নখ দেখেছে। পছন্দও করেছিল সব দলই। শুধু দাড়ির জন্যেই বিয়ে হয়নি কোথাওই। প্রত্যেকেরই ভালো দাড়ি ছিল।

বলিস কি রে? পশ্চিমবঙ্গেও এরকম হয়? এ সব তো উত্তরপ্রদেশ, বিহার, তামিলনাড়ুতে…

সব জায়গাতেই হয় শুভ্রদা। সব জায়গাতেই নোংরা। উপরে শুধু একটি সাদা চাদর পাতা। ডেডবডির উপরে যেমন পাতা থাকে। তোমার নামটা এবার পালটে ফেল। হাই-টাইম। তোমার নামটার মধ্যে কেমন একটা ভণ্ডামি-ভণ্ডামি গন্ধ আছে। এই দেশে ও নাম অচল।

ফোনটা নামিয়ে রেখে দিলাম আমি।

৫.

পরদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ভন্টেকে সঙ্গে নিয়ে বাদুতে গেলাম। ভন্টে জার্নালিজম-এএম এ করে বসে আছে। চাকরি নেই। কোনো বাঙালি ছেলেরই চাকরি নেই।

বাদুতে পৌঁছেই দেখি, উজ্জ্বল।

মাসিমা মেলোমশাইয়ের পায়ের কাছে বসে হাউহাউ করে কাঁদছে।

বলল, অসুস্থ ছিল চারদিন। গতকাল খবরের কাগজটা পর্যন্ত আমার কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছিল। তিন-চারদিন কোনো ফোন ধরতে দেয়নি। কলিগেরা এলে মিথ্যা কথা বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। দুপুরে এক বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন ছিল। শাশা যেতে মানা করেছিল। নিজের শরীর খারাপ

এই অছিলাতে যায়নি। গিয়ে দেখি সকলেই আলোচনা করছে ইশিতা-ঈপ্সিতাকে নিয়ে। কাগজটা চেয়ে একবার দেখেই সোজা নীচে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে এবার বাড়ি পৌঁছে টাকা-পয়সা। চেকবুক নিয়ে ট্রেন ধরে এই আসছি। ফুচকু চৌধুরির মেয়ে, তার নাতি, তার দেওয়া চাকরি কিছুর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখব না। আর আগে আমার বোনেদের সত্ত্বার করে নিই। তারপর ওই লোকটার কী করি তোমরা দেখো।

চাকরি ছাড়বি কেন দাদা?

দীপিতা বলল। আতঙ্কিত গলায়।

চাকরির অভাব কী আমার? বাইরের কত জায়গা থেকে অফার পেয়েছি। শুধু ওই লোকটার। জন্যে। শ্বশুর! আমার শ্বশুর। কী কুক্ষণেই যে শুভ্র! এখানেই চাকরি পাব এক মাসে। ও জন্যে ভাবিস না। বিদেশ যাবার কথা ভাবছিলাম এই নোংরামির জন্যে। বড়ো নোংরা, বড়ো লোভ চারদিকে।

আমার আবার মনে হল আমার নামটা বড়ো লজ্জার।

পোস্টমর্টেম শেষ হবে বিকেলে। তার পর দাহ।

আমি বললাম, আমরা ঘুরে আসছি। সময় মতোই ফিরব।

মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়ে ভন্টে বলল, শালাকে কী করা যায় বল তো! শালার বড়ো বড়ো বেড়েছে।

আমি বললাম, ফুচকুদা কিন্তু ফট করে কাঠমাণ্ডু বা অন্য কোথাও চলে যেতে পারে। কাঠমাণ্ডু ওর ফেভারিট-স্পট। হয়তো স্মাগলিং-এর কানেকশনস আছে।

ভন্টে বলল, প্রাণে মারলে হবে না। সারাজীবন পঙ্গু করে রাখতেই হবে। শালার কত্ত টাকার গরম আর ধুর্তামি বেড়েছে দেখাই যাক। বস্তার মধ্যে ভরে রাবারের রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে তুলো ধুনব ওকে। হাড়গোড় ভেঙে দেব। শারীরিক কষ্ট কাকে বলে, ক্ষিদে কাকে বলে, তা ওকে। জানাতে হবে। মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে কেমন লাগে, তাও। ওর চোখ দুটো খুবলে তুলে নেব। ওকে পনেরোদিন গুম করে রাখতে হবে। কত পুলিশ আর বড়োলোক ওর জানা আছে দেখি।

কোর্ট-কাছারি করলে হত না?

আমি বললাম।

হত। কিন্তু কাঁচকলা দেখাত ও। আইন তো তামাশামাত্র। যার পয়সা আছে, সেই সে তামাশা দেখতে পারে।

আমি ভাবছিলাম, পতুমেসো বোধ হয় ঠিকই বলছিলেন।

টেররিজম। টেররিজম। টেররিজম ইজ দ্যা ওনলি ওয়ে আউট।

ফুচকুদার বাড়ি যখন পৌঁছোলাম তখন বেয়ারা বলল, সাহেব এখনি বেরোবেন।

ঠিক আছে। আমরা তো শুতে আসিনি। একটা কথা বলেই চলে যাব।

ভন্টে বলল।

অত্যন্ত উত্তেজিত মুখ-ভরতি পান-জর্দা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে ফুচকুদা বললেন, কী ব্যাপার। আবার কী?

আপনার মেয়ে শাশা আর নাতির প্রোটেকশনের বন্দোবস্ত করুন। আমরা বাদু থেকে আসছি। সেখানের লোক প্রচণ্ড খেপে গেছে আপনার উপরে। আপনার এখানের বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে পারে। ঠিকানা চাইছিল। আমরা দিইনি।

কী ইয়ার্কি হচ্ছে? আমার মেয়ে কোথায় বলো তো?

কেন? ভিলাইতে। ভন্টে বলল।

আপনি কি ভাবছেন নিজেদের সময় নষ্ট করে আমরা আপনার সঙ্গে আমড়াগাছি করতে এসেছি। আমরা সত্যি বলছি না মিথ্যে টেলিফোন করেই জানতে পারেন।

ওঃ। আই সি!

নাম্বারটা দেব? ভিলাই-এর?

ভন্টে বলল।

না। ঠিক আছে।

ফুচকুদা একটু চমকে উঠে বললেন।

আমি বললাম ফুচকুদা আপনার কিন্তু একবার বাদুতে যাওয়া দরকার। উজ্জ্বল এসেছে।

উজ্জ্বল? কোথায়?

বাদুতে। আসবে না? দুদুটো বোন একসঙ্গে। মর্গে পচছে।

উজ্জ্বল? আর উ্য ম্যাড?

হ্যাঁ। উজ্জ্বল।

ভন্টে বলল, শুভ্রদা যাই বলুক, খবরদার! আপনি কক্ষনো যাবেন না। ওখানকার লোক জ্যান্ত আপনার চামড়া ছাড়িয়ে বেগুনের মতো ঝলসে দেবে। দেখুন ওরা এখানেও আসে কি না। ডেসপারেট ছেলে আছে সব ওখানে। কিছুকে কেয়ার করে না।

ওরা? কেন…আমি তো লাইফে কারোই ক্ষতি করিনি…।

আমার ভীষণ হাসি পেল। একথা শুনে।

বললাম, জীবনে একজনেরও কি ভালো করেছেন ফুচকুদা? একজনেরও ভালো হলে আপনি একটু খুশি হয়েছেন আজ অবধি? কোনোদিনও কি এক মুহূর্তের জন্যে হলেও কারো মঙ্গল কামনা করেছেন?

ফুচকুদা চোখ মিচকে যেন কিছুই বুঝতে পারেননি এমনভাবে বললেন, মানে?

এটা ওঁর আরেক কায়দা। গোলমালে পড়লে, উত্তর দেবার জন্যে সময়ের প্রয়োজন হলেই, ফুচকুদা সমানে মানে? মানে? করে যান। ছেলেবেলা থেকেই দেখছি।

আমি মনে মনে বললাম, আপনার মুখে আপনার চরিত্রের মানসিকতার ছাপ বড়ো গভীরভাবেই পড়ে গেছে। আপনার মুখোশের দাগগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে। আপনার মুখের দিকে চাইলেই পরিষ্কার বোঝা যায় আপনি কী প্রকৃতির মানুষ!

তারপর বললাম, আমরা চলি।

যাওয়া নেই, এসো।

ভন্টে মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল। আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু বললাম ওখানেই ফিরে চল।

হু-হু করে গরম হাওয়া লাগছিল চোখে মুখে। পিচ গলছিল রাস্তার।

ভন্টের পেছনে বসে ঝাঁকতে ঝাঁকতে যেতে আমার মনে হচ্ছিল ফুচকুদার লোমহীন বুকটা কেটে যদি দেখা যায় তা হলে দেখা যাবে, হৃদয় যেখানে থাকার সেখানে হৃদয় নেই, একটা ঘিনঘিনে ব্যাং বসে আছে। আর চোখদু-টির গর্তে করপোরেশনের ম্যানহোলের থিকথিকে নোংরা।

জোরে মোটর সাইকেল ছুটছিল। আমি ভাবছিলাম ফুচকুদার উপরে না হয় প্রতিশোধ নেওয়া গেল, যে মেয়ে-মরা দলে দলে সিঙাড়া রসগোল্লা খেয়ে গত দেড় বছর ধরে প্রতি শনি-রবিবার। ঈশিতা আর ইপ্সিতাকে অপমান করে গেল তাদের শাস্তি দেব কী করে? খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে তার মধ্যে আমার, সুমিতের, সুহৃদের, প্রদীপের এমনকী ভন্টের আত্মীয়-বন্ধুরাও আছেন।

ভন্টে বোধহয় ঠিকই বলেছে। যে সাদা চাদরটা দিয়ে ঢাকা আছে সব কিছু সমস্ত দেশ, সেই চাদরটাকেই সরাতে হবে। সেটাই হবে উৎসে গিয়ে প্রতিকার।

আমার নিজের নামটা সত্যিই বড়ো লজ্জাকর।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel