Friday, April 3, 2026
Homeরম্য গল্পসরস গল্পআমার মেদবিয়োগ - ইন্দ্রাণী গোস্বামী

আমার মেদবিয়োগ – ইন্দ্রাণী গোস্বামী

আমার মেদবিয়োগ – ইন্দ্রাণী গোস্বামী

আমি খুব খেতে ভালোবাসি। সত্যি বলতে কী আমার ধারণা পৃথিবীর নিরানব্বই শতাংশ মানুষই বাসে। তবে কিনা সবাই তো আর ইচ্ছে থাকলেই খেতে পায় না। তাদের কথা ছেড়ে দিতে হবে। আবার অনেকে ইচ্ছে করলেই সুশি থেকে স্কুইডের রকমারি ডিশ – সবই খেতে পারে কিন্তু মোটা হয়ে যাবার ভয়ে খায় না। এদের কথাও বাদ দিতে হবে। আবার কিছু মানুষ এমনই পেটরোগা, খেয়ে হজম করতে পারে না। তারা আর খায় কী করে? বাদবাকি সব মানুষই জিভের দাস – শুধু জোটার অপেক্ষা।

চুপি চুপি বলে রাখি ঈশ্বরের ইচ্ছেয় আমার জোটার অসুবিধা নেই। বাবা-কাকার প্রচুর রোজগার কিন্তু খেয়ে ওড়াবার লোক দুটি – আমি আর আমার খুড়তুতো ভাই ঋক। আমরা দুজনেই আমার ঠাম্মার ভাষায় যাকে বলে খাদুল। যেমন পিৎজা, বার্গার, পাস্তা, রাভিওলি ভালোবাসি, ঠিক তেমনই ভালোবাসি সিঙ্গাড়া, জিলিপি, পাপড়ি-চাট, ফুচকা। এমনকি পান্তাভাতে কাঁচাপেয়াঁজ, কাঁচালঙ্কা আর তার সঙ্গে একটু কাগজি লেবু এটা ভাবলেও আমাদের দু-ভাইবোনের জিভে জল আসে। নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ি। বন্ধুরা সব ঘ্যামা ঘ্যামা বাড়ির ছেলেমেয়ে, আমাদের এইসব ডেলিকেসির নাম শুনলে ভুরুটা হরধনুর মত বাঁকিয়ে ফেলে। একদিন খাবার টেবিলে সেকথা বলাতে আমার খাদ্যরসিক কাকামণি বলল পান্তাভাতকে নাকি আমরা ঠিকমত মার্কেটিং করতে পারিনি। কাকামণি বড় কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার এবং আমাদের মতই খাওয়াপাগল। কীভাবে সেটা করা যেত জানতে চাইলে চিংড়ির মালাইকারির স্বাদ নিতে নিতে বলল, “নামটা … নামটা একটু আধুনিক করতে পারতিস, যেমন স্টেল রাইস-ডি-লা-ওনিয়ন।” হবে হয়ত। সামনের গরমে একবার ট্রাই করে দেখব।

সমস্যা হল আমার ভীষণ ওজন বাড়তে লেগেছে। একদম ছোটবেলায় আমি নাকি প্যাঁকাটির মত ছিলাম। তাতে ঠাম্মার মনে অশান্তির শেষ ছিল না। তাই নিজের হাতে আমার খাওয়া-দাওয়া, যত্ন-আত্তির দায়িত্ব নিয়েছিল। ফলে জ্ঞানবয়স থেকে আমি গাব্দা-গোব্দা আর আহ্লাদী। নার্সারী ক্লাস থেকে বন্ধুমহলে আমার ডাকনাম ‘মোটি’। তা সেই আমি ক্লাস নাইনে ওঠা ইস্তক বেলুন ফোলা ফুলছি। আর ঋকের কপাল দেখো। আমার থেকে বরং একটু বেশিই খায় কিন্তু স্বাস্থ্যবানের বেশি কিছু বলা যাবে না।

আমার মোটা হওয়াকে আমি মোটেই পাত্তা দিই না। এই শহরের কোন দোকানে কী ভালো খাবার পাওয়া যায় তার খুঁটিনাটি খবর আমার জানা। বন্ধুদের নতুন-নতুন খাবারের দোকানের সুলুক-সন্ধান আমিই দিয়ে থাকি। আর আগেই বলেছি পান্তা থেকে পাস্তা কোন কিছুই আমার খারাপ লাগে না। কোন নতুন খাবারের জায়গার কথা শুনলেই সেখানের খাবার চেখে না দেখা পর্য্যন্ত আমার শান্তি নেই। এ কাজে আমার সঙ্গী ঋক, আর আমাদের নিয়ে যাবার ঝক্কিটা নিজে থেকে নেয় আমার কাকামণি। বাড়ির অন্য সদস্যরা ভালো খাবারের সমঝদার বটে কিন্তু আমাদের মত পেটুক নয়। শুধু আমার মা ভাবে এই খাবার নিয়ে পাগলামি আমার একটা রোগ এবং এটা সম্ভবত জেনেটিক। আমাকে ডাক্তার দেখানো দরকার। কী অদ্ভুত ভাবনা! মা বোধহয় জানেই না যে এখন ফুডটেস্টিং বেশ দামি প্রফেশন। বলতে গেলে বকুনি খাব তাই আর বলিনি।

আমি এখন ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী। পড়াশোনা আর টিউশনির চাপ খুব। না না সায়েন্স নিয়ে পড়ি না। কিন্তু অঙ্ক আমার কম্পালসারি সাবজেক্ট। অঙ্ক আমি পারিও আর ভালোওবাসি। সঙ্গে ইকনমিক্স আর স্ট্যাটিস্টিকস। এতসব পড়ার চাপ যাতে আমাকে কাবু করতে না পারে সে বিষয়ে বাড়ির বড়রা বিশেষ খেয়াল রাখেন। আমার মন ভালো রাখার জন্য কাকামণি ছুটির দিনে নানারকম খাবার আমদানি করে। তাতে ঐতিহ্যময় অনাদি কেবিনের কবিরাজি কাটলেট যেমন থাকে তেমনি থাকে অথেন্টিক থাই ফুড। এইভাবে সবার একান্ত সহযোগিতায় আমি হায়ার সেকেন্ডারির দোরগোড়ায়। ঠাম্মা জানে আমি পিঠে-পায়েসের অন্ধ ভক্ত। তাই আমার পরীক্ষার চাপ কমাতে সপ্তাহে সপ্তাহে নিজের হাতে নানারকম পিঠে, পায়েস, মালপোয়া তৈরি করে। এই চুয়াত্তর বছর বয়সেও বুড়ির হাড়ে ভেল্কি খেলে। গতসপ্তাহে চন্দ্রপুলি বানানোর জন্য মনিমাসিকে নারকেল বেটে রাখতে বলেছিল, মাসি বেটেও রেখে ছিল কিন্তু ঠাম্মার মনের মত হয়নি। কোমরে আঁচল গুঁজে শিলনোড়া পেতে সেই বাটাতে ফিনিশিং টাচ দিল, তবে চন্দ্রপুলিটা যা হয়েছিল না – যাকে বলে ফাটাফাটি।

এই করতে করতে আমার টুয়েলভের ফাইনাল এসে গেছে। আমিও নানারকম সুখাদ্য সহযোগে চাপ সামলে যাচ্ছি। তার ফলে বন্ধুরা আর আমাকে মোটি বলে না, বলে ‘গদাই’। তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। একটাই তো জীবন। তাতে যতটা নতুন খাবার চেখে দেখা যায়। কিন্তু আমার এ হেন সুখের জীবনে মূর্তিমতী তালভঙ্গ হলেন আমার মা। আমার এই সবার সাহায্যে চাপ সামলানোটা মা আর সহ্য করতে পারছিল না। যেই না আমার উচ্চমাধ্যমিক শেষ হল খপাত করে ধরে নিয়ে গেল জিমে। জিমটি তিনতলা। নীচের তলা বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ, দোতলায় ছেলেদের আর তিনতলায় মেয়েদের শেখানোর ব্যবস্থা। সিঁড়িগুলো এত খাড়াই যে মনে হবে মেম্বারদের ফ্যাট ঝরানোর কথা ভেবেই বানানো। হাঁপাতে হাঁপাতে যখন তিনতলায় পৌঁছনো গেল তখন আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মহিলা ট্রেনারের তো আমাকে দেখেই চক্ষু চড়কগাছ। আমি লম্বায় পাঁচ ফুট দুই। ওজন বিরানব্বই কেজি।

“এতদিন কী করছিলেন?”

মা লজ্জা লজ্জা মুখ করে আমার ইতিহাস তুলে ধরলেন। মহিলা এবার আমার দিকে মন দিলেন। “তোমাকে কিন্তু খুব খাটতে হবে, আর স্ট্রিক্ট ডায়েট মেনে চলতে হবে। নাহলে আসা-যাওয়াই সার হবে।”

মনের ভিতরের চিড়বিড়ানি রাগ চেপে বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় কাত করলাম। “মিসেস ভৌমিক আমি ডায়েট চার্ট দিয়ে দেব। সেটা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয় সেটা দেখার দায়িত্ব আপনার।”

ফেরার পথে গাড়িতে মা শুধু আমাকে বকেই চলল। “আজকের দিনের মেয়ে হয়ে তুমি কেন এরকম রিমলি? শুনলে তো সব? এবার জিভের স্বাদে লাগাম দাও। কাকামণির কাছে কোন আব্দার আর না। ঋককেও ওস্কাবে না। আমিও কথা বলব তোমার কাকামণির সঙ্গে।” পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র দিন তিনেক – আর আজ কাকামণির গলৌতি কাবাব আনার কথা – এরমধ্যে এইসব কথা অসহ্য। কিন্তু মায়ের হাবভাব বেশ গোলমেলে, ভালো মেয়ের মত ঘাড় কাত করে সায় দিলাম।

পরের দিন থেকে আমার নতুন রুটিন শুরু। সকাল ছ’টায় মা ঠেলে তুলে দিল। জিম যাবার জন্য রেডি হতে হবে। পরীক্ষা শেষ হবার চারদিনের মাথায় কে আবার সকালবেলায় ওঠে? মায়ের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রেডি হয়ে নিলাম। জিমটা বাড়ির থেকে বেশ দূরে। বাপি আমায় পৌঁছতে যাবে। মা মনে করে জলের বোতল আর পয়সার ব্যাগ জিমের কিটব্যাগটায় দিয়ে দিল। একমুঠো ভেজানো ছোলা-বাদাম হাতে দিয়ে বলল, “খেতে খেতে চলে যাও।” বাইকে বাপির পিছনে বসে সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় চোখদুটো জুড়ে আসতে লাগল। তারপর আবার সেই স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। বাপি নামিয়ে দিয়ে গেছে। ফেরাটা নিজে নিজে।

আমি নতুন, তাই ট্রেনার ম্যাডাম আমায় নিয়ে পড়লেন। সবার সঙ্গে নানারকম কসরত করা – আমার এই চেহারায় নীচু হওয়া অসম্ভব। আমি খুব চেষ্টা করেও ওনাকে খুশি করতে পারছি না। উনি খুশি না হলে আমার ঘন্টা, কিন্তু বিছানার আরাম ছেড়ে এই স্বাস্থ্যচর্চা আমার বিভীষিকা মনে হতে লাগল। কোনরকমে ঘন্টাদেড়েক কাটল। ঘেমে আমি স্নান হয়ে গেছি। সেই ভয়ংকর সিঁড়ি বেয়ে মর্ত্যধামে ফিরলাম। ঘড়িতে সোয়া আটটা। গভীর বিরক্তি নিয়ে ৮বি বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে লাগলাম। এমনিতেই বাসে চাপতে আমার কষ্ট হয় আর এখন এই ক্লান্ত শরীরে, বিধ্বস্ত মনে বাসের পাদানিতে চাপার ইচ্ছেটুকুও আমার অবশিষ্ট নেই। আমি ব্যাজার মুখে অটোস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালাম।

হঠাৎই একটা সুগন্ধ আমার স্নায়ুতন্ত্রে সাড়া ফেলল। কোথাও কচুরি ভাজা হচ্ছে। গন্ধের পিছু পিছু দোকানে পৌঁছে চারখানা কচুরি আর দুখানা জিলিপি খেয়ে ফেললাম। আহ্লাদে চোখ ভিজে এল। ঋকের জন্য মনটা খারাপ লাগল। এরপর ধীরেসুস্থে অটো রিজার্ভ করে বাড়ি। ফেরামাত্র জিমে কী করলাম জানার জন্য সবাই হামলে পড়ল। কচুরি-জিলিপির কথাটা বাদ রেখে বাকিটা বললাম। ব্রেকফাস্ট এল – ওটস, দুধ, ফল। বাতাসে আলুপরোটার গন্ধ। মানে জলখাবারে আজ আলুপরোটা ছিল। রাগে সারা গা-হাত-পা চিড়বিড় করে উঠল, কিন্তু মায়ের কঠোর চোখ মুখ খুলতে দিল না।

আমার ভীষণ মনখারাপ। খাওয়া মানে আমার কাছে পেটভরানো ছাড়াও আরো কিছু, প্যাশন যাকে বলে। সেই খাওয়া বন্ধ। লুকিয়ে-চুরিয়ে ঋক বা কাকামণি কিছু দিলেও সেই মেজাজটা পাই না। সেই আনন্দ একদম নেই। মা নিয়ম করে সামনে বসিয়ে আমায় খাওয়ায়। কোনদিন ডাল, ভেজিটেবল স্টু, দু-পিস মাছ, কোনদিন চিকেন স্টু, আবার কোনদিন ওটসের খিচুড়ি। দিনের মধ্যে সেরা সময় সকাল সোয়া আটটা থেকে সাড়ে আটটা। ওইসময় জিভটাকে একটু আরাম দিই। ইতিমধ্যে আমি জিমের কাছেই ‘জলখাবার’ বলে আরেকটা দোকান পেয়েছি। অ-সা-ধারণ রাধাবল্লভী বানায়। জিমের সময়টা আমার বিশ্রী লাগে, উদ্দেশ্যহীনভাবে হাত-পা ছুঁড়ি। সবথেকে খারাপ লাগে ট্রেডমিলে দৌড়তে। কেমন যেন যান্ত্রিক, একঘেয়ে। স্ট্যাটিক সাইকেলও আমার দ্বারা হয় না। এমনিতে আমি কথা বলতে খুব ভালোবাসি, কিন্তু জিম করা বিষয়টা আমার এত অপছন্দ হয়েছে যে এখানে আমি কারোর সঙ্গে কথা বলতেই চাই না। গোমড়ামুখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সময়টা পার করি। তারপরই অটোস্ট্যান্ড, আমার সারাদিনের রসদ। মাসখানেক পর দেখা গেল আমার ওজন একটুও কমেনি। মার কপালে ভাঁজ।

বিশাল বড় মেলার মাঠ। সুন্দর করে সাজানো। একপাশে নানাস্বাদের চপ-কাটলেট, অন্যদিকে কয়েকটা স্টল, সেখানে “গুপী গাইন বাঘা বাইন”-এর তালি মেরে খাবার আনার দৃশ্যের মত করে হরেকরকম মিষ্টি সাজানো। রসগোল্লা-পান্তুয়ারা অন্য অন্য চেহারায় সবার নজর কাড়ছে। রসগোল্লা সবুজ রঙের – নাকি কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে বানানো। কাকামণি বলল যে এতে শুধু কালার আর লঙ্কার ফ্লেভার দেওয়া আছে। আরও রকমারি মিষ্টি — গজা, ছানাপোড়া, পটল সন্দেশ কী নেই? আমরা লোভ সামলে আগে বিরিয়ানি আর কাবাবের স্টলের দিকে এগোচ্ছি। যথারীতি ঋক আর আমি ঠিক করতে পারছি না হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানির সঙ্গে কোনটা বেশি খুলবে, চিকেন চাঁপ না মাটন চাঁপ? চিকেন রেশমিকাবাব আর লাচ্ছা পরোটা খেলেও হয়, কিন্তু আমরা দু-ভাইবোনই বিরিয়ানিপ্রেমী। সবে একচামচ বিরিয়ানি মুখে তুলতে গেছি হঠাৎ ভীষণ জোর ফায়ার-ব্রিগেডের আওয়াজ। নিশ্চয়ই মেলার কোন স্টলে আগুন লেগেছে। আমার হাত থেকে বিরিয়ানিসুদ্ধ চামচ ছিটকে যেতেই আমার চোখ খুলে গেল। মোবাইলের অ্যালার্ম, আমি খাদ্যমেলায় নয় — আমার বিছানায়। স্বপ্নটাকে ছিঁড়ে আমি জিম যাবার জন্য উঠে পড়লাম।

আমার মুখে আর হাসি দেখা যায় না। মনমরা হয়ে থাকি। সেটা আবার আমার বাড়ির লোকেদের, বিশেষ করে ঠাম্মির ভালো লাগে না। আদতে আমি আহ্লাদী। তাই ঠাম্মা মাঝে মাঝে নিয়মভঙ্গ করে মালপোয়া বা মোমো টেস্ট করাতে লাগল। কাকামণি ঋককে দিয়ে দু-চারটে ফ্রাই, কাটলেট চালান করতে লাগল। অবশ্যই মায়ের চোখের আড়ালে। দ্বিতীয় মাসের শেষে আমার ওজন দাঁড়াল চুরানব্বই কেজি। অর্থাৎ দু-কেজি বেড়েছে। মা ফিউরিয়াস, বাকিদের অপরাধী ভাব।

আমার বাপি নির্বিরোধী মানুষ, কিন্তু বিষয়টা বোধহয় আঁচ করতে পারল। হাজার হোক আমার তো বাবা, আর ওখানে খাবারের দোকানগুলো নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে। দু’য়ে দু’য়ে চার করতে সময় লাগেনি। তাছাড়া বাপিরও সকালের ঘুমটা মাঠে মারা যাচ্ছিল। তাই বাপিই এবার হালটা ধরল। “অনু, আমার মনে হয় রিমলি এনজয় করছে না। এভাবে হবে না। এটা বন্ধ করাই ভালো।” মনে মনে আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। যাক বাবা কাল থেকে আর ভোরবেলা উঠতে হবে না।

কিন্তু পরের দিন ভোর ছ’টায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। মাস দুয়েকের অভ্যেস। বাথরুম ঘুরে শুয়ে পড়ব ভাবছি দেখি বাপি। “এই তো রিমলি উঠে গেছিস, চল চল দেরি হচ্ছে।” বলেই হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল। আমি ঘুমঘুম চোখে অবাক হয়ে পেছনে পেছনে গিয়ে দেখলাম বাড়ির পেছনে যে খানিকটা বাড়তি জায়গা পড়েছিল সেখানে বালতি, মগ, খুরপি, কোদাল এইসব রাখা। “বুঝলি রিমলি এখানে আমরা তিনজন মিলে বাগান করব – তুই, আমি আর ঋক। আমি আর ঋক সকালে বেরোই তাই সকালের দায়িত্ব তোর। বিকেলে ঋক করবে, কিন্তু তোর গাইডেন্স লাগবে। শনি-রবি আমি দেখভাল করব, তোদের ছুটি।”

কেন জানি না প্রস্তাবটা আমার মন্দ লাগল না। জিমে তো আর যেতে হচ্ছে না। বাপির সঙ্গে লেগে পড়লাম। কোদাল, ঝুড়ি, খুরপি, বালতি, গোবর সার — বাপি বেশ কোমর বেঁধেই নেমেছে। শনিবারের সারা সকাল ঘেমে নেয়ে বাপির পিছু পিছু জায়গাটা সাফসুতরো করলাম। এমনকি আনাড়ি হাতে মাটিও কোপালাম। বেলা ন’টা নাগাদ ফিরে দেখলাম আমার ব্রেকফাস্টও টেবিলে সবার সঙ্গে। লুচির মনমাতানো গন্ধ নাকে এল। এতেই আমার মনটা আনন্দে নাচতে লাগল। লুচি কিন্তু গুনে আমায় চারটে দেওয়া হল। ঠাম্মি যে ঠাম্মি সেও একবারও সাধল না। আমিও চাইলাম না, পাছে আবার ওটস কিংবা ডিমসেদ্ধ-শসার খপ্পরে পড়তে হয়।

এমনি করেই চলতে লাগল। বাগানে গোলাপ, জবা, বেলী, জুঁই লাগানো হয়েছে। আর একদিকে টমেটো, ধনেপাতা, পালং-এর বীজ। ক’টা বেগুনচারাও এল ঠাম্মার আবদার রাখতে। মা আর কাকিমণির নাকি লেবুফুলের গন্ধ খুব প্রিয়, তাই একটা লেবুগাছও বাদ গেল না। তারপর বীজগুলো থেকে যখন চারা বেরলো আমার আর ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম দরকার হল না। কী যেন একটা টান তৈরি হয়েছে বাগানটার সঙ্গে। ভোরের শিশির কেমন করে গোলাপের পাপড়িগুলোকে সজীব করে, কীভাবে রংবেরঙের প্রজাপতি নরম রোদ গায়ে মেখে উড়ে বেড়ায়, টমেটো কিংবা বেগুন গাছে পোকা লেগেছে কিনা, তাদের কচি পাতা বেরল কিনা এসব দেখা আমাদের দু-ভাইবোনের নেশা হয়ে দাঁড়াল।

ইতিমধ্যে আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি। পাবলিক বাস ধরে কলেজে যাই। কষ্ট হয় না – বাগান করার অভ্যেস আমাকে সহিষ্ণু করেছে। কীভাবে যেন বাগান করাটা আমার প্যাশন হয়ে উঠেছে। কোন বাড়িতে বাগান দেখলেই মন দিয়ে দেখি। কী করলে আমার বাগানটা আরও ভালো হবে নেট ঘেঁটে জানার চেষ্টা করি। কতকিছু যে জানতাম না! লেবুগাছে ফুল না এলে কী করতে হয়, সবজির জন্য কোন কীটনাশক আর গোলাপের জন্য কী দিতে হবে সেগুলো এখন আমার মুখস্থ। এটা এখন আমারই বাগান। বাপি শীতের রোববার ছাড়া আসেই না। ঋকও দিনদিন খেলা পাগল হয়ে উঠেছে। তাই আমি গাছেদের আরও সময় দিই। এরজন্য আমায় খাটতেও হয় অনেক। কিন্তু সেটা আমার ভালোই লাগে। বন্ধুরা কলেজে আমাকে দেখে অবাক। ‘গদাই’ বলে আর নাকি ডাকা যাচ্ছে না। জীবনে এই প্রথম বন্ধুরা আমাকে শ্রেয়সী বলে ডাকল – হ্যাঁ ওটাই আমার ভালোনাম।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • situs togel
  • slot resmi