Tuesday, March 5, 2024
Homeথ্রিলার গল্পভৌতিক গল্পঅলাতচক্র - তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

অলাতচক্র – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

অলাতচক্র - তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
Table of contents

তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বাবার সৃষ্ট তারানাথকে নিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার অমর উপন্যাস অলাতচক্র।

অলাতচক্রে বর্ণনা করা হয়েছে তন্ত্র, মন্ত্রকে; যার মাধ্যমে ডেকে আনা যায় ডাকিনী, যোগিনীকে। এজন্যেই মূল চরিত্র হিসেবে আমরা পাই তারানাথকে, যিনি নেশায় তান্ত্রিক।

০১. উনিশ শো পনেরো সাল

উনিশ শো পনেরো সাল। ইউরোপে প্রথম মহাসমর সবে শুরু হয়েছে। কিছু বছরের ব্যবধানে যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ মানবেতিহাসকে আমূল বদলে সম্পূর্ণ নতুন পথে প্রবাহিত করবে, তার আভাসমাত্রও কেউ তখনো জানে না। যুদ্ধ একটা হচ্ছে বটে, যারা নিজের জনপদের বাইরে কর্মসূত্রে যাতায়াত করে, তারা খবরটা জানে। কিন্তু সে যুদ্ধ হচ্ছে অন্য মহাদেশে, ভারতে তার বিশেষ কোনো ঢেউ এসে লাগেনি। লোকপরম্পরায় শ্রুত কিংবদন্তীর মত তা সামান্য ঔৎসুক্য জাগায় মাত্র, মানুষকে সন্ত্রস্ত বা উদ্বিগ্ন করে না। সবুজ গাছপালায় ঢাকা শ্যামমিন্ধ গ্রামবাংলার জীবন চিরাচরিত ধীরলয়ে বয়ে চলেছে। হুগলী জেলার অন্তঃপাতী এমনই একটি ছোট গ্রামে এই কাহিনীর শুরু।

তারকেশ্বর লাইনের সিঙ্গুর স্টেশনে নেমে আট-দশ মাইল হেঁটে কিম্বা গরুর গাড়িতে গেলে পড়বে রামজয়পুর গ্রাম। গ্রামটি ব্রাহ্মণপ্রধান, কায়স্থ এবং বৈদ্যের বাসও কিছু রয়েছে। গ্রামের প্রত্যন্তসীমায় শ্রমজীবী অন্যজাতির কয়েকটি পরিবার বাস করে। কিন্তু সেই যুগে সমাজে যে জাতপাত-ঘটিত বৈষম্য বিরাজ করত, রামজয়পুরে তার নামগন্ধও ছিল না। ভাগ্যের আশ্চর্য যোগাযোগে এখানে কিছু উদার ও ভদ্র মানুষ একজায়গায় হয়েছিল। তারা হাসিমুখেই বাস করত গ্রামে। প্রতিবেশীর সুখ এবং শান্তি সচরাচর কারো সহ্য হয় না, তাই কাছাকাছি দু-একটি গ্রাম থেকে সমাজপতিদের প্রতিনিধিরা এসে মাঝেমধ্যে বিরোধ তৈরি করার প্রচেষ্টা যে করেনি এমন নয়, কিন্তু রামজয়পুর সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে।

শ্রাবণ মাসের শেষের দিক। দিন তিনেক হল অবিশ্রাম বৃষ্টি হয়ে চলেছে। কখনো সামান্য ধরে আসে, একটু বাদেই আবার ঝমঝমিয়ে নামে। গ্রামের ভেতরে প্রায় সব রাস্তাতেই কমবেশি কাদা। পথে লোক চলাচল নেই। কে আর এমন দুর্যোগে অকারণে ঘর ছেড়ে বেরুবে? চাকরির জন্য কলকাতায় নিত্যযাত্রার প্রচলন তখনো এমন ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র জীবিকার প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়েছিল, তারা সারা সপ্তাহ কলকাতার মেসে থেকে শনিবার বাড়ি আসত, আবার সোমবার সকালে ফিরে যেত। লোকে নিজের ভদ্রাসনেই বাস করত, পারিবারিক জমিজমা আর আমকাঠালের বাগানের উপস্বত্বে সংসার চলে যেত সচ্ছলভাবেই। চাহিদা কম থাকায় জীবনে সুখ ছিল।

আকাশে মেঘ থাকায় সন্ধে নেমেছে একটু তাড়াতাড়ি। সরসী চাটুজ্জের বৈঠকখানায় সান্ধ্য আড্ডা জমে উঠেছে দারুণ। বেশ বড় বাড়ি, তারপরে দুর্গামণ্ডপ আর নাটমন্দির। নাটমন্দির পার হয়ে দুদিকে দেউড়ির ভেতর দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পথ। এরই ডানদিকে বড় বৈঠকখানা। চৌকি বা তক্তাপোশ নয়, মেঝেতে মোটা সতরঞ্চি পাতা, তার ওপর সাদা ফরাস। একসঙ্গে পনেরো-কুড়িজন বসে আড্ডা দিতে পারে। সরসী চাটুজ্জের আড্ডা এ গ্রামে বিখ্যাত। এমন ঢালাও তামাকের ব্যবস্থা আর কারো বাড়ি নেই। তাছাড়া আর মধ্যে অন্তত একবার কাঁসার বাটিতে করে সরষের তেল দিয়ে জবজবে করে মাখা মুড়িহোলাভাজা আসবেই। সরসী চাটুজ্জের উঠোনে বাইশ হাত বেড়ের ধানের গোলা চারটে, ধান ছাড়াও বিভিন্ন রকমের শস্য আর সবজির চাষ আছে বহু বিঘের। আপ্যায়নের বিষয়ে তার কষ্ট হবার কথা নয়। গ্রামবৃদ্ধেরা রোজ ভিড় করেন তাঁর বাড়িতে।

আজ হচ্ছিল গল্পের রাজা-ভূতের গল্প। বাড়ির ভেতর থেকে চালভাজা-ছোলাভাজা এসে গিয়েছে, হুঁকো ঘুরছে হাতে হাতে। ঘরের কড়িকাঠ থেকে লোহার বাঁকানো হুকে ঝুলছে হিঙ্কসের ডবল পলতের বাতি। সজল বাতাসে সেটা সামান্য দুলছে, ফলে আচ্ছাধারীদের ছায়া দুলছে বৈঠকখানার দেয়ালে। আলোছায়ার মায়ায় জমে উঠেছে অপ্রাকৃত গল্পের আসর।

আদিনাথ চক্রবর্তী বললেন—তোমরা বেশির ভাগই শোনা কথা বলছ, নিজেরা কিছুই দেখোনি। ওসব গল্পের মূল্য কী?

নিবারণ ভাদুড়ি হুঁকোটা রাম গাঙ্গুলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন-সরসী, এ ভ্যালসা তামাক কোত্থেকে জোগাড় করলে? গলায় একটু সেঁকও লাগে না ছাই! একটু ভদ্র তামাকের ব্যবস্থা করা, নইলে নিজের তামাক ট্যাকে খুঁজে আড্ডায় আসতে হবে। আর হ্যাঁ, আদিনাথ, তুমি তো বড় বড় কথা বলছ। নিজে কী দেখেছ বল, আমরা একটু শুনি। কেবল বাগাড়ম্বর করে তো বাজার গরম হবে না—

সরসী চাটুজ্জে বললেন–সেই ভাল। চক্কোত্তিমশাই এতক্ষণ চুপ করে শুনে যাচ্ছিলেন, এবার ওঁর গল্পই হোক—

আদিনাথ বললেন—গল্প নয়, সত্য কাহিনী।

–বেশ তো, তাই হোক।

পতিরাম মজুমদার একটু ভালমানুষ ভীতু ধরণের লোক। আড্ডায় অনেকক্ষণ ধরে ভূতের গল্প তার পছন্দ হচ্ছিল না। এবার তিনি একটু সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন–আজ এই পর্যন্ত থাকলেই ভাল। দেখছ তো আকাশের গতিক, বেশি জোরে নামলে আর বাড়ি ফেরা মুশকিল হয়ে পড়বে। শুনছ মেঘের ডাক?

সরসী চাটুজ্জে হেসে বললেন—আরে বোসো। আমার চাকর তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে এখন–

পতিরাম হতোদম হয়ে বসে পড়লেন।

আদিনাথ বললেন–তামরা তো জানো, শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি পেয়ে আজ সতেরো বছর হল আমি এই গ্রামে এসে বাস করছি। আমার ছোটবেলা এবং বিবাহিত জীবনের প্রথম কয়েকবছর কেটেছে পৈতৃক গ্রাম বাহিরগাছিতে। সেখানে আমাদের তিনমহলা বাড়ি, বাপ-জ্যাঠা পিসি-খুড়ি আর একগাদা ছেলেপুলে নিয়ে সে বাড়ি গমগম করত সর্বদা। নিজেদের মধ্যে ভাব-ভালবাসা ছিল। এখানে বাস করতে আসি ঝগড়া করে নয়, কোনো বিরোধের জন্যও নয়। এসেছিলাম বাবার কথায়। তিনি বলেছিলেন—আদিনাথ, আমার কথা শোনো। তুমি রামজয়পুরে গিয়ে বাস করো, অন্তত কিছুদিনের জন্য। বৌমার বাবা গত হয়েছেন, রয়েছেন কেবল বেয়ানঠাকরুণ। তিনিও শয্যাগতা। তাকে দেখাশুনো করা তোমাদের কর্তব্য। তাছাড়া কিছু মনে কোরো না-যতদূর জানি তাদের সম্পত্তির পরিমাণও কম নয়। বৌমাও তাদের একমাত্র সন্তান, সবকিছু তারই প্রাপ্য। এ সময়ে সেখানে উপস্থিত থেকে নিজেদের জিনিস বুঝে নেওয়া ভাল। আর এই বাড়িতেও তো ক্রমেই স্থানাভাব ঘটছে দেখতেই পাচ্ছ। লোকসংখ্যা বাড়ছে, সে তুলনায় থাকার জায়গা বাড়ছে কই? যদি আলাদাও থাক, তাতে প্রীতির ভাব কমবার কারণ নেই। যাওয়া-আসা বজায় রেখো, সেটাই বড় কথা।

বাবার কথা শুনে এখানে আসি। বছরখানেকের মধ্যে শাশুড়ি ঠাকরুণ মারা গেলেন। সম্পত্তি দেখাশুনোর ভার আমারই ওপর এসে পড়ল। তবুও বছরে অন্তত একবার, পূজোর সময়ে, বাহিরগাছি যেতাম। কয়েকবছর পরে বাবাও মারা গেলেন। পৈতৃক গ্রামের সঙ্গে সেভাবে আর কোনো যোগসূত্র বজায় রইল না।

যাই হোক, যে সময়ের কথা বলছি তখন আমার বয়েস বারো-তেরো হবে। শীতকাল। দোলাই গায়ে দিয়ে বাইরের দালানে বাবার কাছে বসে পড়াশুনো করছি। বাবা বসে হিসেবের খাতাপত্র দেখছেন। এমন সময়ে একটা ভবঘুরে চেহারার লোক এসে উঠোনে দাঁড়া ল।

আমি তখন নেহাৎই ঘোট, মানবচরিত্র ঠিকঠাক বোঝবার মত বয়েস হয়নি। কিন্তু লোকটাকে দেখে প্রথমেই যে কারণে আমার অবাক লাগল তা হল এই—আমি লোকটার বয়েস আন্দাজ করতে পারলাম না। এ ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে নাও। কোনো মানুষকে প্রথম দেখলে এবং তার বয়েস সঠিক না জানলে আমরা ত্ৰিশ কী পঁয়ত্রিশ, কিম্বা পঞ্চান্ন কী ষাট—এরকম মনে করি। অর্থাৎ কারো বয়েস একদম ঠিক বলতে না পারলেও আন্দাজটা কাছাকাছি থাকে। এই লোকটাকে দেখে মনে হল এর বয়েস ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ বা ষাট কিম্বা সত্তর যা কিছু হতে পারে। পরণে খাটো আধময়লা ধুতি, গায়ে তৎ আধময়লা ফতুয়া, কাধে ভাজ করা রয়েছে একটা খয়েরি রঙের মোটা চাদর। এই ভয়ানক শীতেও লোকটা সে চাদর গায়ে জড়ায়নি। গালে খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় অবিন্যস্ত ঝাকড়া চুল। সবচেয়ে আশ্চর্য হল তার চোখদুটো। সোজাসুজি সামনে তাকিয়ে আছে, অথচ মনে হচ্ছে সে কিছুই দেখছে না। পাগলের মত, কিন্তু পাগল নয়। তার দৃষ্টিতে চিন্তাসঙ্গতির বাঁধুনি আছে।

বাবা মুখ তুলে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন–কী ব্যাপার, কোথা থেকে আসছ? কে তুমি?

খুব মোলায়েম, মৃদু গলায় সে বলল—আমি একজন পথিক। কোথাও থেকে আসছি, আমার বাড়িঘর নেই। আমি আজ এখানে ভাত খাব।

তার কথাগুলো অসংলগ্ন। হঠাৎ এভাবে কেউ কারো বাড়ি ভাত খেতে চায় নাকি? বাবা বললেন তোমার নাম কী? এখন বাড়ি না থাকতে পারে, কিন্তু একসময় তো ছিল, মানুষ আকাশ থেকে পড়ে না। পরিচয়টা দাও।

সে কেমনভাবে যেন হেসে বলল—আমার নাম অমর। বাবা ছিলেন পণ্ডিত মানুষ, নাম ঈশ্বরচন্দ্র সার্বভৌম। আমি আজ আপনার কাছে ভাত খাব।

-বাবা ‘ছিলেন’ মানে কী? এখন তিনি কোথায়?

অমর ডানহাতের তর্জনী ওপরে তুলে দেখাল।

বাবা লজ্জিত হয়ে বললেন—ও, আচ্ছা, আচ্ছা। মা-ও কি?

–মাও ওইখানে।

—ও। তা, বাড়ি কোথায় ছিল?

অনির্দিষ্ট একটা দিক দেখিয়ে অমর বলল—ওইদিকে।

তারপর একটু থেমে বলল—ভয় নেই, আমি চোর-ডাকাত না।

বাবা লজ্জা পেয়ে বললেন-না, না, আমি তা মনে করিনি। আসলে তোমার কথাবার্তা একটু অদ্ভুত ধরণের কিনা, তাই আরকি—

উঠোনে নিমগাছতলার ইঁদারা থেকে বালতি করে জল তুলে হাতমুখ ধুয়ে অমর এসে বারান্দায় উঠে বসল। বাবার ভয়ে সেদিকে বেশি তাকাতে পারছি না, কিন্তু কান খাড়া করে রয়েছি। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন—এখন কি কিছু খাবে? রাত্তিরে কোথায় ছিলে? সকালে উঠেই হাঁটছ বুঝি?

বাবা কেন এ প্রশ্ন করলেন তা আবছা আবছা বুঝতে পারলাম। মাইল চারেক দুরে চাপাগাড়ি ছাড়া কাছাকাছি অন্য কোন গ্রাম নেই। তার পরের গ্রাম ময়নাচাঁদা অনেক দূর, সকালে উঠে সেখান থেকে হেঁটে আসা সম্ভব নয়। লোকটা কী বলে বাবা দেখতে চাইলেন।

অমর সহজভাবেই বলল-না, আমি এখন কিছু খাব না। একেবারে দুপুরে ভাত খাব। আর যদি থাকতে দেন তাহলে আজ রাত্তিরটাও থেকে যেতে পারি। এই ভিটেতে একটু স্বপ্ন দেখতে হবে কিনা–

এবারে আমি বাবার শাসনের কথা ভুলে অমরের দিকে তাকালাম। চোর-ডাকাত না হতে পারে, কিন্তু পাগল নিশ্চয়। স্বপ্ন দেখতে হবে মানে?

বাবা এবার একটু কড়া গলায় বললেন—পাগলামি কোরো না। আমি যা বলছি তার সোজা উত্তর দিচ্ছ না কেন? তোমার নাম তো অমর?

—আজ্ঞে। অমরজীবন।

–বাবার নাম ঈশ্বর?

—সবারই বাবার নাম ঈশ্বর।

—আবার পাগলামি করে! স্বপ্নের ব্যাপার কী বলছিলে? ওর মানে কী?

অমরের কণ্ঠস্বর ভারি মৃদু, মিষ্টি আর ভদ্র। সে বলল-রাগ করবেন না, আমার কথাবার্তা একটু ওই পাগলাটে মতন, কিন্তু আমি লোকটা খারাপ নই। আপনাদের এই বাড়ির দক্ষিণ দিকের ভিত সামান্য নিচু, তা জানেন? সমস্ত বাড়িটা একটু কাত হয়ে আছে। উত্তরে উঠে, দক্ষিণে ঝুঁকে। আপনাদের বাড়িতে শালিক বসে না, খেয়াল করেছেন কখনন? আপনি তো এ বাড়ির কর্তা, আপনার অনামিকা মধ্যমার চেয়ে বড়। এ বাড়ির প্রত্যেক বড়ছেলের তাই। ঠিক বলছি তো?

আমি অবাক হয়ে গেলাম। সত্যিই তো তাই। আমার মাঝের আঙুলের চেয়ে পরের আঙুলটা বড়। মেজকাকা আর ছোটকাকার বড়ছেলেরও তাই। এই লোেকটার পক্ষে সেকথা এত তাড়াতাড়ি কী করে জানা সম্ভব?

বাবা বললেন—তাতে কী?

অমর বলল—সেজন্য আমি এই বাড়িতে একটা রাত ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই। এটাই আমার কাজ। পথে পথে ঘুরে বেড়াই, মন্দিরের চাতালে, গাছতলায় বা কোনো গেরস্তর বাড়ি আশ্রয় নিই। সব জায়গাতে কিন্তু স্বপ্ন দেখা যায় না। ওর একটা নিয়ম আর লক্ষণ আছে। সে বুঝিয়ে বলা যায় না, কিন্তু আমি ঠিক টের পাই। কাল সকালে আমি আরো অনেক কথা বলতে পারব।

বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন-তুমি তাহলে আজ রাত্তিরে এখানে থাকতে চাইছ?

–বা রে, নইলে স্বপ্ন দেখব কী করে? জেগে কি স্বপ্ন দেখা যায়? বাবা আর কিছু বললেন না, মুখ নামিয়ে আবার হিসেবের খাতায় মন দিলেন। আমিও কাঠাকালি-বিঘাকালি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

অমর দুই হাতে হাঁটু বেড় দিয়ে তার ওপর থুতনি রেখে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে বারান্দা থেকে নেমে নিমগাছের গোড়ায় পড়ে থাকা একটা লম্বা কঞ্চি তুলে সেটা দিয়ে পরো উঠোনটা মেপে ফেলল। তারপর নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করতে লাগল আটত্রিশ। আটত্রিশ কেন? বাকি চার কোথায় গেল? বাকি চার? তা কেমন করে হবে?

আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। বাবার মুখ খাতার দিকে নামানো, কিন্তু চোখ দিয়ে তিনি অমরের কাণ্ড দেখছেন। কীসের আটত্রিশ? আরো চার বেশি হলেই বা তাতে কী হত?

উঠোন মাপা হয়ে গেলে কঞ্চিটা অমর আবার যত্ন করে নিমগাছের তলায় রেখে এল। আমরাও (অর্থাৎ আমি এবং খুড়তুতো ভাইয়েরা) পড়ায় মন দিলাম।

দুপুরে খেতে বসে অমরজীবন ভাত খেল খুব কম। পাড়াগায়ে একটা বাচ্চা ছেলেও তার চেয়ে বেশি খেয়ে থাকে। বাবা খেতে খেতে একবার বললেন—আর ভাত নেবে না? মাছের ল্যাজা দেবে একটা?

-নাঃ, বেশি খেলে স্বপ্ন দেখা যায় না। খালি পেটমোটা হয়—

খাওয়া হয়ে গেলে গুরুজনেরা বিশ্রাম করতে গেলেন। অমর উঠোনে নেমে মনোযোগ দিয়ে নিমপাতা কুড়োতে লাগল। তার কাজ করার ভঙ্গিও খুব সুন্দর। একটি একটি করে হলুদ ঝরা পাতা তুলে ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে সে হাতের মুঠোয় গুছিয়ে রাখছে। অনেক পাতা জড়ো হয়ে গেলে সে বারান্দায় উঠে এসে সেগুলোকে আলপনার মত করে সাজাতে লাগল। আমরা ছেলেপুলেরা তার কাছে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখছি। একটু একটু করে বারান্দার ওপর নিমপাতা দিয়ে তৈরি সুন্দর একটা আলপনা ফুটে উঠল। সে মাথা একদিকে কাত করে নিজের শিল্পকর্ম দেখতে লাগল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—এটা কী হল? সে আমার দিকে তাকাল, বলল—বল তো এটা কী হল?

-এটা তো আলপনা। কিন্তু এ দিয়ে কী হয়? সরাসরি সে কথার উত্তর না দিয়ে অমর বলল—আচ্ছা, এটা দেখে তোমার মনে কী ভাব জাগছে আমাকে বল

বললাম—ভাল লাগছে। দেখতে সুন্দর বলে আনন্দ হচ্ছে।

-বাঃ, তাহলে তো তুমি আসল জিনিসটাই বুঝে গিয়েছ। এটা দিয়ে কিছু হয় না। ভাল লাগে তাই বানালাম।

আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল লোকটিকে। তার কথার অর্থ সবটা বুঝতে না পারলেও যেহেতু আমাদের পরিবারে কিছু কিছু জ্ঞান এবং সংস্কৃতির চর্চা ছিল, সেহেতু তার বক্তব্যের সৌন্দর্য এবং গভীরতা আমাকে স্পর্শ করল।

মাঝে মাঝে বাতাসে দু-একটা পাতা এদিক-ওদিকে সরে গেলে সে হালকা আঙুলের ছোঁয়ায় সেগুলোকে আবার ঠিক করে সাজিয়ে দিচ্ছিল।

রাত্তিরে সে কিছু খেল না। বাড়ির ভেতরে মা অবাক হয়ে বললেন—ওমা! সে

আবার কী কথা! অতিথি মানুষ না খেয়ে থাকবে কী রকম?

বাবাও তাকে বললেন-বাপু, পাগলামি করতে হয় তার জন্য অন্য কত জায়গা ছিল, খামোক আমার বাড়িতে এসে বিব্রত করা কেন?

অমরজীবন রাগও করে না, কিছুই না। কেবল মৃদু হাসে আর ঠাণ্ডা গলায় বলেও আমার অভ্যেস আছে। স্বপ্ন দেখার দিন রাত্তিরে মুখ এঁটো করতে নেই।

আমাদের বাড়িতে অতিথিকে যত্ন করা হত আপনলোকের মত। এমনিতেই সেই যুগে মানুষকে সম্মান করা হত, অতিথিকে মনে করা হত নারায়ণ। বাংলায় অন্নের জন্য হাহাকার ছিল না। সবার হাতে নগদ পয়সা না থাকলেও বাড়িতে ধান ছিল। কারো বাড়িতে আশ্রয় চেয়ে কেউ পায়নি এমন শোনা যেত না। সেই স্বাভাবিক সৌজন্যবশত বাবা অমরজীবনকে বৈঠকখানার ভেতরে মশারি টাঙিয়ে বিছানা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে শুলো উঠোনের পাশে বারান্দায়।

আমি রাত্তিরে শুতাম মায়ের কাছে। ভেতরবাড়ির সেই শোবার ঘরের জানালা দিয়ে নাটমন্দিরের ওপাশে বারান্দার দিকটা কিছুটা দেখা যায়। অনেক রাত্তিরে ঘুম ভেঙে একবার তাকিয়ে দেখি নাটমন্দিরের ওধারটা যেন খুব হালকা নীল একটা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে। আমার চোখে তখন গভীর ঘুম লেগে আছে। খাটের ওদিকে ঘুমন্ত মায়ের গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ঝিমঝিম করছে দুপুর রাত। সেই আবছা চেতনার মধ্যেও অবাক হলাম কীসের আলো ওখানে? ওদিকে তত বারান্দায় সেই অতিথি লোকটা শুয়ে আছে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন আবায় ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।

সকালবেলা নাটমন্দিরে আসর বসল স্বল্পকাহিনী শোনার। মোটা মোটা থামের আড়ালে মা-কাকিমারাও এসে দাঁড়িয়েছেন। পুরুষেরা বসেছেন ঠাকুরদালানের মেঝেতে। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন—স্বপ্ন দেখেছ তাহলে কাল রাত্তিরে?

অমর বলল–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি জানতাম দেখতে পাব।

কী দেখলে?

অমর বলতে শুরু করল। তার বাচনভঙ্গিও পরিশীলিত এবং মার্জিত। আমরা অবাক হয়ে তার কথা শুনে যেতে লাগলাম।

০২. বাবার দিকে তাকিয়ে

বাবার দিকে তাকিয়ে সে বলল—কর্তামশাই, প্রথমে একটা ভাল খবর বলি। আপনার এক ভাই ছোটবেলাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, কেমন কিনা?

আশ্চর্য হয়ে বাবা বললেন—হ্যাঁ, আমার সবচেয়ে ছোট ভাই। চোদ্দ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু তুমি কীভাবে

—স্বপ্নে দেখেছি। শুনুন, আপনার সে ভাই জীবিত আছেন।

–সেকি! কোথায় সে? বেঁচে থাকলে বাড়ি ফিরে আসছে না কেন?

–উনি এখন সন্ন্যাসী। উত্তর ভারতে কোথাও আছেন, জায়গাটা ভাল ধরতে পারলাম না। তবে উনি যে আর গৃহাশ্রমে ফিরবেন না সেটা বুঝতে পারলাম। কেদারনাথ। নাম ছিল, না?

বাবা ক্রমেই আরো অবাক হয়ে যাচ্ছেন। বললেন—ঠিক।

বাড়ির মেয়েরা থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ঠাকুমা এতক্ষণ বাড়ির ভেতরে ছিলেন, তখন তিনি বেশ বৃদ্ধা, তাকেও নিয়ে আসার জন্য একজন কাকিমা চলে গেলেন। আমি অমরের দিকে তাকিয়ে আছি। সত্যিই তো, আমরা যাকে ছোটকাকা বলি, তিনি আসলে বাড়ির ছোটছেলে নন। আমাদের ছোটকাকা কৈশোরেই উদাস প্রকৃতির ছিলেন, পনেরো বছর বয়েস পূর্ণ হতে যখন আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, তখন একবস্ত্রে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তাকে আমরা কখনো দেখিনি, সে সময় বাবা বা অন্য কাকাদের বিয়ে হয়নি। আসলে আমরা সেজকাকাকে বর্তমানে ছোটকাকা বলে ডেকে থাকি। ছোটকাকার গৃহত্যাগের গল্প আমরা শৈশব থেকে শুনে আসছি। সে সময় গ্রামে সারারাতব্যাপী যাত্রার আসর বসত। ঝুলন পূর্ণিমা উপলক্ষে গাঁয়ে নিমাইসন্ন্যাস পালার আয়োজন করা হয়েছে, নবদ্বীপ থেকে খাস নারায়ণ অধিকারীর দল আসবে। লোকের মধ্যে সাজো সাজো রব। শুনেছি এই দলের যে নিমাই সাজত, তার অভিনয় দেখে দর্শকরা উম্মত্তের মত হরিধ্বনি দিয়ে দুহাত তুলে নাচতে শুরু করত। কিছুক্ষণের জন্য যাত্রার আসর সত্যি সত্যিই সংকীর্তনের আসর হয়ে উঠত। ওই অভিনয় দেখে ছোটকাকা পরের দিন সকালে আর বাড়ি ফিরলেন না। কোথায় যে গেলেন কে জানে। সে যুগে যতটা সম্ভব খোঁজাখুঁজি করা হয়েছিল, কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারপর যেমন হয়, যন্ত্রণার ওপর একটু একটু করে সময়ের পলি জমে কষ্টটা কমে এল। কেবল ঘটনাটা একটা পারিবারিক পুরনো গল্প হয়ে রইল।

–রাম! রাম কই? অ রাম!

ঠাকুমাকে ধরে আনছেন মেজকাকিমা। বাবার নাম রামনাথ, তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন কী মা? এই যে, আমি এখানে—তিনি এগিয়ে গিয়ে ঠাকুমার হাত ধরে দাঁড়ালেন।

—মেজবৌমা কী বলছে রাম? ছছাটুকুর খবর নাকি পাওয়া গিয়েছে?

বৃদ্ধার চোখে আগ্রহের ঔজ্জ্বল্য। বাবা একটু আমতা আমতা করে বললেন—এই যে এই লোকটি—ওর নাম অমরজীবন, ও কাল থেকে আমাদের বাড়ি অতিথি—ও নাকি স্বপ্ন দেখেছে ছোটুকু বেঁচে আছে, ভাল আছে। তুমি দাঁড়িয়ে কাপছ কেন? বোসো এইখানে

ঠাকুমা বাবার কথায় হৃক্ষেপ না করে অমরের দিকে তাকিয়ে বললেন—তুমি কে বাবা?

ঠাকুমাকে দেখে অমর দাঁড়িয়ে উঠেছিল, এবার এগিয়ে এসে প্রণাম করে বলল—মা, আমার নাম অমর। আমিও আপনার এক ছেলে–

গতকাল অমর কিন্তু বাবাকে প্রণাম করেনি, সাধারণ ভদ্রতা এবং বিনয় বজায় রেখে কথা বলেছিল বটে, কিন্তু ভক্তিতে গলে পড়ে আদিখ্যেতা করেনি। অথচ বাবা খুব রাশভারী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। লোকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পেত না। ঠাকুমাকে দেখে অমর প্রথমে উঠে দাঁড়াল, তারপর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। কেন যেন তার এই আচরণ আমার খুব সুন্দর বলে মনে হল।

ঠাকুমা বললেন—তুমি জানতে পেরেছ ছোট্‌কু বেঁচে আছে? ভাল আছে?

—হ্যাঁ মা।

–কী করে জানলে? একটু চুপ করে থেকে অমর বলল–মা, আমি ঠক-জোচ্চোর কিম্বা ধর্মের ব্যবসাদার হলে বলতাম—বিশেষ ক্ষমতায় ডাকিনী যোগিনীকে বশ করে, বা নানারকম কঠিন প্রক্রিয়া করে জেনেছি। এবার এত টাকা দিন, তাহলে যাগ-যজ্ঞ করে সে ছেলে ফিরিয়ে আনব। কিন্তু আপনাকে বাজে কথা বলব না মা, ওসব কিছুই আমি জানি না। আমার একটা জন্মগত ক্ষমতা আছে, আমি স্বপ্নে অনেক কিছু দেখতে পাই। কাল রাত্তিরে এ বাড়িতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে জানলাম আপনার ছোটছেলের কথা

ঠাকুমা বললেন—সে ফিরবে না বাবা?

–না মা। আর কেনই বা ফেরাবেন? তিনি ভাল আছেন, সন্ন্যাস গ্রহণ করে ঈশ্বরের আরাধনা করছেন। জানেন মা, হিন্দুধর্মে বলে কোনো বংশের ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে গেলে সেই বংশ পবিত্র হয়ে যায়। আনন্দ করুন মা, ছেলের গৌরবে আনন্দ করুন।

ঠাকুমা অমরের মাথায় হাত দিয়ে বললেন—বাবা, যদি আমার ছোটুকু ভাল থাকে, শান্তি পেয়ে থাকে, তাহলে সে না-ই বা ফিরল। তার সুখেই আমার সুখ। তুমি এটুকু খবর যে দিলে, তার জন্য ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। তুমি আমাকে মা বলে ডাকলে, আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি—

এইসময় অমর হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল। সে বলল—মা, আপনি দেখবেন আপনার ছেলেকে? আমি দেখাতে পারি। কিন্তু কথা দিন, তাকে ফিরে আসবার জন্য আদেশ করবেন না। তাহলে হয়ত সে ফিরে আসবে, তার এতদিনের সাধনা নষ্ট হয়ে যাবে। জগতে মাতৃশক্তি একটা বিরাট শক্তি, কেউ তাকে লঙ্ঘন করতে পারে না। কথা দিন—

বাবা এগিয়ে এসে অমরকে বললেন-দেখ ভাই, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মাকে সরল মানুষ পেয়ে তুমি–

ঠাকুমা বাধা দিয়ে বললেন—তুই থাম। তারপর অমরের দিকে তাকিয়ে। বললেন—আমি কথা দিলাম। আমাকে কী করতে হবে বল–

—কিচ্ছু না। আপনি এইখানে বসুন—

ঠাকুমা তখন নিজে মাটিতে বসতে বা উঠতে পারতেন না। মা আর মেজকাকিমা তাকে ধরে আস্তে করে ঠাকুরদালানের মেঝেতে বসিয়ে দিলেন। সামনে বসল অমর। ঠাকুমার হাত আলতো করে ছুঁয়ে বলল—আমার দিকে তাকান। মন শান্ত করুন, মা। একদম হালকা করে দিন। সোজা আমার চোখের দিকে দেখুন, একদম সোজা

কী বলব ভায়া, তখন ভর সকাল, আমরা অতগুলো লোক দাঁড়িয়ে, আমাদের সামনেই ঠাকুমা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লেন। মাথা হেলে পড়ল না, শরীর কাত হল না, কেবল চোখ দুখানা আস্তে আস্তে বুজে এল। সুন্দর, সমাহিত মুখ—যেন ধ্যান করছেন। অমর একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারও দেহ নিস্পন্দ, সমস্ত শরীরে দৃঢ় একাগ্রতার ভঙ্গি।

কত বছর আগের কথা, তবু এখনো সে দৃশ্য স্পষ্ট মনে আছে। সেই আমাদের চকমিলাননা ঠাকুরদালান, বাবা-কাকা, মা-কাকিমারা আর কর্মচারীর দল ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। উঠোনে শীতসকালের সোনারঙ রোদ্র এসে পড়েছে। সে উঠোনে কীসের যেন দানা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে গোলা পায়রার দল। অতগুলো লোক দাঁড়িয়ে, কেউ কথা বলছে না।

দেখলাম ঠাকুমার মুখে সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠেছে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলে ঠিক অমন করে হাসে। দু-চার মিনিট হাসিটা রইল, তারপর ধীরে মিলিয়ে গেল। ঠাকুমা আবার শান্ত, সমাহিত, বাহ্যিক কোনো আবেগশূন্য।

অমর মৃদুগলায় ডাকল–মা, এবার জাগুন। দেখা হয়েছে তো? এবার তাকান—

আস্তে আস্তে ঠাকুমা চোখ খুললেন। যেন একটু অবাক হয়ে চারদিকে তাকালেন, কোথায় রয়েছে বুঝতে না পারলে মানুষ যেমনভাবে তাকায়। তারপর সামনে অমরকে দেখে তার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অমর বলল—হয়েছে মা?

ঠাকুমা বললেন—হ্যাঁ বাবা, হয়েছে।

বাবা ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—কী দেখলে মা? ছোটুকুকে দেখতে পেলে?

সে কথার উত্তর না দিয়ে ঠাকুমা বললেন—বৌমারা আমাকে ধরে ভোলো, আমি ঘরে যাব। ঘরে দিয়ে এসো–

দু’পা গিয়ে পেছন ফিরে তাকালেন ঠাকুমা। অমরের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন-আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছি তুমি কে। আবার এসো মাঝে মাঝে

অমর বলল–আসব মা, মাঝে মাঝে আসব।

ঠাকুমা চলে গেলে বাবা বললেন—এ কী উৎপাত! কী চাও তুমি? তুমি কে?

অমর এবার মুখ তুলে বেশ ব্যক্তিত্ব মেশানো গলায় বলল—দেখুন, আমি একজন সাধারণ মানুষ। পথেঘাটে ঘুরে বেড়াই। আপনি কী আমাকে অবিশ্বাস করছেন? আমি তো আপনার কাছে কিছু চাইনি—কেবল এক রাত্তিরের আশ্রয় ছাড়া। তাহলে?

মাকে তুমি কী দেখালে? মাও তোমাকে কী বলে গেলেন বুঝলাম না। এর মানে কী?

-কিছুই না। উনি বুড়ো মানুষ, ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় ওঁর মনে দুঃখ রয়েছে, সে দুঃখ মা ছাড়া কেউ বোjhe না। ওঁকে যদি একটু আনন্দ আর স্বস্তি দিতে পেরে থাকি, তাতে কী ক্ষতি হয়েছে বলুন?

-তা নয়, কিন্তু মাকে কেন হঠাৎ-মানে, বলছি যে—

হঠাৎ নয়। কারণ আছে। বললে যদি রাগ না করেন তাহলে বলতে পারি।

বাবা একটু ইতস্তত করে বললেন-বল। রাগ করার মত কথা নিশ্চয় বলবে না।

–আপনার মা আর বেশিদিন বাঁচবেন না।

–সে তো জানা কথাই। উনি বুড়ো হয়েছেন, পঁচাশি বছর বয়েস। এটা আর তুমি নতুন কথা কী বললে? যাই হোক, তাতে কী?

অমর বলল—আজ পৌষ মাসের তিন তারিখ। এই ফাল্গুন মাসের পনেরোই শুক্ল ত্রয়োদশীর দিন সকালে উনি চলে যাবেন। ছেলের খবর জানতে পারলেন না এই কষ্ট নিয়ে যেতেন, তাই ওঁকে একটু আনন্দ দিয়ে গেলাম।

বাবা রেগে উঠে বললেন—তুমি তো অদ্ভুত লোক! আমার বাড়িতে অতিথি হয়ে আমারই মায়ের মৃত্যুর কথা বলছ? জানো, তোমাকে আমি ইচ্ছে করলে অমর হেসে বলল—এই দেখুন, আপনি রাগ করবেন না বলে কথা দিয়েও রাগ করছেন। আপনাদের সবাইকে রেখে ভগবানের নাম করতে করতে মা পুণ্যবতীর মত চলে যাবেন, এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে? দেহধারণ করলে একদিন ছেড়ে যেতে হয়। কেউই চিরজীবী না। আর আমার এ কথা যদি না ফলে, তাহলে তো ভালই। প্রাণভরে আমাকে তখন গালাগাল দেবেন।

বাবা বললেন তুমি আমাকে দেখাতে পারো? আমি যদি ছোটকুকে দেখতে পাই তাহলে বিশ্বাস করি। পারো দেখাতে?

–দেখুন, আপনাকে বিশ্বাস করাবার কোনো দায় আমার নেই। আপনি আমাকে অবিশ্বাস করলে তাতে আমার কিছু এসে যাবে না। অকারণে শক্তির অপব্যয় করতে নেই।

–তার মানে তোমার মধ্যে কোথাও ফাঁকি আছে। তুমি চালাকি করছ।

অমর বলল আপনার মা কিন্তু তা মনে করেন না। আচ্ছা, একটা কাজ করা যাক। আপনার বংশের একটা হারানো জিনিসের সন্ধান আপনাকে দিয়ে যাই। তাহলে হয়ত আমাকে আর পুরোপুরি জোচ্চোর বলে মনে হবে না। কেমন?

বাবা ধরা গলায় বললেন—কী জিনিস?

—তিন-চারপুরুষ আগে আপনাদের বংশে একটা অষ্টধাতুর বিষ্ণুমূর্তি ছিল, জানেন কী?

বিস্মিত হয়ে বাবা বললেন—হ্যাঁ, ঠিক কথা। তিন বা চারপুরুষ কেন, আরো বহু-বহু আগে থেকে সে মূর্তি আমাদের গৃহদেবতা হিসেবে পূজো করা হত। কিন্তু বর্গীর হাঙ্গামার সময় সে মূর্তি আমার পূর্বপুরুষেরা কোথাও লুকিয়ে ফেলেন, অথবা হারিয়ে যায়। আর পাওয়া যায় নি। তুমি তুমি কী বলতে চাও?

—আমি জানতে পেরেছি সে মূর্তি কোথায় আছে। আপনার লোকদের কারুকে বলুন একটা শাবল নিয়ে আমার সঙ্গে আসতে। আপনারাও আসুন।

ঠাকুরদালান থেকে নেমে দেউড়ির ভেতর দিয়ে অমর উঠোনে গিয়ে নামল, তার পেছনে পেছনে বাড়ির সবাই মিছিল করে চললাম। অমর এমনভাবে হাঁটছে যেন সে একেবারে নিশ্চিতভাবে জানে কোথায় যেতে হবে। বাড়ির উত্তর ভিতের কোণায় এসে সে থামল। গদাধর নামে আমাদের একজন কর্মচারীর হাতে ছিল শাবল। অমর তাকে বলল—এইখানে ভিত খোঁড়ো।

গদাধর বাবার দিকে তাকাল। বাবা অমরকে বললেন কতটা খুঁড়তে হবে?

–মাটি নয়, দেয়ালের গা থেকে তিন-চারটে করে ইট খসাও। এই জায়গায়—

বাবা বললেন—সে কী কথা! ভিতের ইট খসালে বাড়ির ক্ষতি হবে না?

—কিচ্ছু হবে না। কয়েকটা ইট মাত্র। কালই রাজমিস্ত্রি ডেকে গাঁথিয়ে নেবেন।

–কিন্তু এখানটাতেই খুঁড়তে হবে কেন?

—কারণ এ বাড়ি উত্তরে উঁচু, আর এখানেই উত্তর ভিতের শেষ। এখানে শ্রীবিষ্ণু রয়েছেন বলেই এদিকটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে যায়নি। জানেন তো, যে জমির ওপর বাড়ি তৈরি, তার রকম অনুযায়ী পঞ্চাশ, একশো কী দেড়শো বছরে ভিত সামান্য। কিছুটা বসে যায়। আপনাদের বাড়িতেও তাই হয়েছে। কেবল বিষ্ণুর অধিষ্ঠানের জন্য উত্তর দিক সামান্য উঁচু। তাছাড়া বেয়াল্লিশ হাত হল না তো, সদর দরজা থেকে আটত্রিশ হাত মাত্র হল। তাই এখানেই নিশ্চয় থাকবে। নইলে আরো চারহাত ওদিকে হত—

বুঝলাম বাবা আর যথেষ্ট রাগ করতেও পারছেন না। ক্লান্ত গলায় তিনি বললেন–তুমি কী যে মাঝে মাঝে বল তার কোন মানে হয় না। কীসের চার হাত কম?

-ও একটা হিসেব, আপনাকে বোঝাতে পারব না। নিন, শুরু করতে বলুন—

ভিতে প্রথম শাবলের ঘা পড়তেই আমরা সবাই ঘন হয়ে ভিড় করে গদাধরকে ঘিরে দাঁড়ালাম। গদাধর আলতো করে গাঁথুনির জোর আগা করছে, আর আমরা রুদ্ধনিশ্বাসে অপেক্ষা করে আছি। তিনসারি ইট খসাতেই ভিতের ভেতরে একটা চতুষ্কোণ গহ্বর বেরিয়ে পড়ল। শাবল রেখে তার মধ্যে হাত গলিয়ে গদাধর বের করে আনল অপূর্ব সুন্দর গঠনের এক দেবমূর্তি। এতদিন অবহেলায় পড়ে থেকেও তার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়নি। প্রায় একহাত লম্বা বিগ্রহ, মাথায় ছত্র, মুখে হাসি। আগেই তো বলেছি, আমি তখন খুব ছোট, শিল্পের রস পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার বয়েস তখনো হয়নি। তবু মূর্তিটা দেখামাত্র মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম মনে আছে।

বাবা গদাধরের হাত থেকে মূর্তিটি নিয়ে দুই হাতে মাথায় ধরে বলতে লাগলেন—জয় শ্রীবিষ্ণু! জয় শ্রীবিষ্ণু! দেবতা ফিরেছেন! কাকারা তার সঙ্গে বলতে লাগলেন—জয়! জয়! কাকিমারা উলু দিয়ে উঠলেন। বাবা বিষ্ণুমূর্তি মাথায় করে বাড়ির মধ্যে নিয়ে চললেন। সেটি তখনকার মত ঠাকুরঘরে রাখবার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হল, মেয়েরাও ভেতরে চলে গেলেন।

অমরের হাত ধরে বাবা বললেন—ভাই, তুমি আমাকে মার্জনা কর। জানি না তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ—জানতেও চাই না। তোমার আশ্চর্য ক্ষমতার কথা আমি স্বীকার করলাম। যদি খারাপ ব্যবহার করে থাকি, তা মনে রেখো না।

সকলের অনুরোধেও অমর সেদিনটা আর থাকতে রাজি হল না। বাবা শেষে বললেন—তাহলে কী এই ধরে নেব যে, তুমি আমাকে মার্জনা করলে না?

—ছিঃ, ও কথা বলবেন না। আমি এইরকমই ভবঘুরে ধরণের, একজায়গায় দুদিন থাকতে ভাল লাগে না। তবে একটা কথা বলে যাই, আপনাদের বংশ খুব পবিত্র এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদপূত বংশ। এক পুরুষ বাদ দিয়ে দিয়ে এই বংশে একজন করে সাধক জন্মগ্রহণ করবেন। আপনার ভাই তো সন্ন্যাসী হয়েই গিয়েছেন, এর পরের পুরুষে নয়, এখন যারা ছোট—এই এরা—এদের কারো সন্তান অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মাবে। সংসারে থেকেও সংসারী হবে না। আপনি তার জন্ম বৃদ্ধবয়সে দেখে যেতে পারবেন

বাবা বললেন কী করে বুঝব সে কে?

–তার জন্মের সময়ে আকাশে এক আশ্চর্য নীল উল্কাপাত হবে। নীল রঙের আলোয় ভরে যাবে চারদিক। এখনো অবশ্য তার দেরি আছে। মনে রাখবেন কথাটা। আচ্ছা, চলি তাহলে–

উঠোন পেরিয়ে, সদর দরজা পেরিয়ে অমর চলে গেল। সঙ্গে সে একটা রহস্যের পরিবেশ নিয়ে এসেছিল। সে চলে যাবার পরও সেটা কিন্তু থেকেই গেল।

পনেরোই ফাল্গুন সকাল থেকে বাড়ির সবাই ঠাকুমার দিকে সতর্ক নজর রেখে বসে রইল। অমরের ভবিষ্যৎবাণী তাকে কেউ জানায় নি। তিনি ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে বাগানে ঘুরে ঘুরে ঠাকুরপূজোর জন্য ফুল তুললেন, তারপর পূজোয় বসলেন। পূজো হয়ে গেলে উপুড় হয়ে গৃহদেবতাকে প্রণাম করলেন।

এবং আর উঠলেন না। প্রণামরত অবস্থাতেই তার মৃত্যু হল।

দাহ সেরে সন্ধেবেলা বাবা-কাকারা বাইরের ঘরে এসে বসেছেন, পাড়ার লোকেরাও একজন দুজন করে আসছেন। এমনসময় মাধব চৌধুরী ঘরে ঢুকে বললেন—আহ্নিক সেরে আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। ওহে রামনাথ, বাইরে কে একজন তোমাকে ডাকছে। আমাকে বললে—গিয়ে বলুন আমি এসেছি। আমার নাম অমর, আসবার কথা ছিল আজ। কে হে লোকটা? এ গ্রামে দেখেছি বলে তো মনে হল না—

বাবা প্রায় লাফিয়ে উঠে বাইরে গেলেন। কেউ নেই। কেউ না। কেবল ঝিমঝিম করছে আসন্ন রাত্রির আবছা অন্ধকার।

০৩. একটানা এতক্ষণ কথা বলে

একটানা এতক্ষণ কথা বলে আদিনাথ চক্রবর্তী একটু থামলেন। বর্ষণমুখর রাত্রির জলভেজা বাতাস ক্রমাগত দুলিয়ে চলেছে ঝুলন্ত লণ্ঠনটা, সেইসঙ্গে দেয়ালে নড়ছে ঘরে বসে থাকা মানুষদের ছায়া। আড্ডায় মাঝে মাঝে একটা সময় আসে যখন হঠাৎ সবাই একসঙ্গে চুপ হয়ে যায়। জমাট গল্পেরও একটা মহিমা আছে। সে গল্প সত্য, মিথ্যা বা অবিশ্বাস্য যাই হোক না কেন, ভাল করে বলতে পারলে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়। আদিনাথ কথক হিসেবে প্রথম শ্রেণীর, নিতান্ত তুচ্ছ বিষয়কেও বলার গুণে মনোমুগ্ধকর করে তুলতে পারেন। আজ রাতের পরিবেশ আর তার গল্প এমন খাপ খেয়ে গেল যে, আচ্ছাধারীরা কেউ কোনো তর্ক তুলল না। কেবল সরসী চাটুজ্জে বললেন-আপনার ঠাকুমার মৃত্যুবিষয়ে ওই ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়াটা অবশ্য আমি খুব আশ্চর্য কিছু বলে মনে করছি না, কারণ এই কথাটা বাড়ির কেউ নিশ্চয় তাঁকে মুখ ফসকে বলে ফেলে থাকবে। ফলে আপনার ঠাকুমা মনের দিক দিয়ে পনেরোই ফায়ুন তারিখের প্রসঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়েস অনেক হয়েছিল, কাজেই ওই বিশেষ তারিখে হয়ত মানসিক উত্তেজনা সামলাতে পারেন নি। তার মনই তাকে নির্দেশ দিয়েছিল দেহরক্ষা করতে। এমন হয়, আমি শুনেছি। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া বিষ্ণুমূর্তি ফিরে পাওয়াটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাছাড়া সবকিছুর যে ব্যাখ্যা থাকতেই হবে তার কী মানে আছে। কিছু কিছু আবছা আড়াল থাক না, তাতে জীবন সরস হয়ে ওঠে।

রাম গাঙ্গুলি বললেন—সব জিনিসের ব্যাখ্যা হয় না। আমার আপন ভায়রাভাই। তার মামাবাড়ির গ্রামে নিজের চোখে আঁতুড়ের ছেলেকে হেঁটে বেড়াতে দেখেছে, জানো? সে অত্যন্ত সাত্ত্বিক প্রকৃতির মানুষ, অকারণে মিথ্যে কথা বলবে না। সদ্যোজাত ছেলে—সবে নাড়ি কাটা হয়েছে—সে হাঁটছে আর খিলখিল করে হাসছে। আচ্ছা। ভায়রাভাইয়ের কথা না হয় বাদই দাও, আমার ছোটবেলায় আমি এমন একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছি যা শুনলে তোমরা বিশ্বাসই করবে না।

পতিরাম মজুমদার আদিনাথের কাহিনী শেষ হলে পরিত্রাণের আশা করেছিলেন, এবং সম্প্রতি বাড়ি ফেরবার উদ্যোগ হিসেবে চাদর কাঁধে ফেলে লাঠির খোঁজ করছিলেন। আর একটা অপ্রাকৃত গল্প শুরু হতে চলেছে দেখে তিনি কাতর স্বরে বললেন—আর নয়, আজ আর নয়! এবার সবাই উঠে পড়া যাক, চল। পথ তো কম নয়, আমায় যেতে হবে সেই পশ্চিমপাড়া। তাছাড়া সরসীভায়ারও তো খাওয়াদাওয়া আছে।

সরসী চাটুজ্জে হেসে বললেন—আমার খাওয়ার এখনো ঢের দেরি। শোনাই যাক না গল্পটা। বাকিদের কী মত?

সকলে বললেন-গল্প হোক! গল্প হোক!

‘ওমাঃ!’ বলে হতাশ ভঙ্গিতে পতিরাম দেয়ালে ভর দিয়ে এলিয়ে বসলেন।

রাম গাঙ্গুলি বললেন—আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা বলছি। তখন আমার বয়েস আর কত হবে, ধর কুড়ি কী বাইশ। সে বয়েসে আমি যে কী ডানপিটে ছিলাম, যারা আমাকে এখন দেখছ তারা ধারণাও করতে পারবে না। পেটের গোলমাল আর হাঁটুর বাত আমাকে অকেজো করে দিয়েছে, নইলে আট-দশ বছর আগেও আমি নিমগাছে উঠে দাঁতন পেড়েছি। যাই হোক ঘটনাটা বলি। আমার কৈশোরের বেশ কয়েকবছর আমাকে মামাবাড়িতে কাটাতে হয়েছিল। দাদামশায় ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ, পণ্ডিত মানুষ। মামারাও সবাই লেখাপড়া জানা। আমার বাবা তখন জরিপ বিভাগে কাজের সূত্রে তরাইয়ের জঙ্গলে কর্মরত। বাড়ির কাছে কোনো ভাল স্কুল নেই, বাবা বছরে দু-একবার ছুটি নিয়ে বাড়ি আসেন। এমন অবস্থায় আমার পড়াশুনো হওয়া কঠিন দেখে মা আমাকে মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দাদুর কাছে আমার লেখাপড়ার শুরু। ইংরিজি জানিনে বটে, কিন্তু ব্যাকরণ আর বেদান্তে আমি অল্পবয়েসেই কিছুটা অধিকার অর্জন করেছিলাম। যে বছর পড়া সাঙ্গ করে বাড়ি ফিরে আসি, সে বছর কালীপূজোর সময় আমার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

মামাবাড়ির গ্রামের উত্তরে ছিল পুঁটি নদী। নদীর খাত চওড়া, কিন্তু পলি পড়ে তার স্রোত ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। দক্ষিণ আর পশ্চিমে বিশাল এক জলাভূমি গ্রামটাকে বাইরের জগৎ থেকে পৃথক করে রেখেছে। প্রায় দ্বীপের মত এই গ্রাম থেকে বাইরে যাবার একমাত্র ভাল রাস্তা পূবদিক দিয়ে। আর একটা পথ জলার ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরেফিরে মহকুমা শহরে যাবার পাকা সড়কে পড়েছে বটে, কিন্তু সে পথ বিশেষ কেউ ব্যবহার করে না। নানান ভৌতিক কাহিনীর গুজব চালু ছিল জলাভূমিটা সম্বন্ধে। নরম কাদা, নলখাগড়ার বন, উলুঘাসের আর হোগলার জঙ্গল আর মাঝে মাঝে এক একটা জায়গায় একটু ঘাসজমি, তাতে একটা-দুটো বড় গাছ, এই নিয়ে সে জলাভূমির বিস্তার। আমি আর আমার প্রাণের বন্ধু তিনকড়ি—সেও ছিল আমারই মত ডানপিটে আর নির্ভীক—এই জলাভূমির মধ্যে বেড়িয়ে বেড়াতাম। সেসব দিনের কথা মনে এলে এখন বুকের মধ্যেটা কেমন করে ওঠে। মাথায় কোনো চিন্তার ভার নেই, কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ নেই, মনে কেবল নির্মল আনন্দ, চোখে অল্পবয়েসের স্বপ্ন। অমন সব দিন আর আসবে না।

সে বছর কালীপূজো পড়েছিল বেশ দেরি করে, কার্তিকের মাঝখান পেরিয়ে। বাতাসে হিমের ছোঁয়া লেগেছে, বিকেলের পড়ন্ত বরাদুরে সোনার রঙ। সন্ধে নামছে সূর্যাস্তের পরেই। এই পরিবেশে আমাদের দুই বন্ধুর জলাভূমির ভেতর ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগত। অনেকসময় দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়ে পড়তাম, ফিরতাম রাতের প্রথম প্রহর পার করে। ছোট ছোট ঘাসজমিগুলোতে সরু আলের মত পথ বেয়ে গিয়ে গাছের তলায় শুয়ে বসে গল্প করতাম। সবগুলোতে যাওয়া যেত না, কোনো কোনোটায় যাবার পথ ছিল। ঠিক পথ বলা যায় না, বুড়ো আঙুলে ভর করে ডিঙি মেরে মেরে চলে যেতাম কোনোভাবে। সমস্ত জলাটা আমাদের নখদর্পণে ছিল। বিশেষ মজা হত চাদনি রাত্তিরে। ওই জলাজমি, নলখাগড়া আর উলুঘাসের বন, হালকা জ্যোৎস্নায় বড় বড় গাছের ছায়া—সব মিলিয়ে রূপকথার রাজ্য তৈরি করত। আর ওই বয়েস—বুঝতেই পারছ, জীবনে তা একবারই আসে। যেন মেঘের ওপর ভেসে বেড়াতাম তখন।

কালীপূজোর ঠিক আগের দিন, সেদিন ভূতচতুর্দশী, তিনকড়ি সকালের দিকে আমাকে এসে বলল—রাম, চল আজ বিকেলে জলার ভেতর বেড়াতে যাই। একেবারে সন্ধের পর একটু রাত্তির করে ফিরব। আজই রাত্তিরে অমাবস্যা লাগবে, এত অন্ধকারে কখনো ওখানে বেড়াই নি। পথঘাট তো সবই আমাদের চেনা। যাবি?

সত্যিই, পুরো জলাভূমিটা আমরা নিজেদের হাতের তালুর মত চিনতাম। সন্ধে হয়ে গেলেও অসুবিধের কোনো কারণ নেই। আমি রাজি হয়ে গেলাম।

একটু পড়ন্ত বেলায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গ্রাম ছাড়িয়ে আরো মাইলখানেক হেঁটে এসে পড়লাম জলাভূমির প্রান্তে। তখন সূর্য অস্ত গিয়েছে, দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে নামছে আবছায়া অন্ধকার। তিনকড়িকে বললাম—হারে ভেতরে ঢুকবি? নাকি এইখানে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে ফিরে যাই চল–

তিনকড়ি হেসে বলল-কেন, ভয় করছে বুঝি?

—যাঃ, ভয় কীসের? আজ অমাবস্যা পড়ছে, একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে কিন্তু–

—তার মানেই তো ভয় পাচ্ছিস। দূর, চল দেখি। অন্ধকারেই তো মজা। আয়—

এরপর না গিয়ে উপায় থাকে না। ঢুকলাম জলার ভেতরে। চারদিকে প্রায় মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে হোগলার ঝোপ। বোধহয় সেইজন্যই সেখানে অন্ধকার নামছে একটু : তাড়াতাড়ি। হালকা ধোঁয়ার মত একটা অস্পষ্ট কুয়াশা ঘনাচ্ছে। হেমন্তকালের শুরু, এই সময়ে সন্ধেবেলা বাতাস বয় না, কিন্তু লম্বা ঝোপগুলোর মধ্যে বাতাস বয়ে যাওয়ার মত একটা শী শী আওয়াজ হচ্ছে। সেটা অবশ্য আমার মনের ভুলও হতে পারে। খুব নির্জন জায়গায় কানের ভেতর রক্ত চলাচলের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়, মনে হয় শব্দটা যেন বাইরে থেকে আসছে।

ভয় ঠিক করছিল না, কিন্তু অন্যদিন জলার ভেতরে ঘুরে বেড়াবার সময় মনে যে সহজ ফুর্তির ভাব থাকে সেটা অনুভব করছিলাম না। পরিবেশে কেমন যেন বিষণ্ণ ভাব, কী একটা যেন ঘটতে চলেছে, সমস্ত জায়গাটা তার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। মনে পড়ল আজ ভূতচতুর্দশী, দুপুরে চোদ্দশাক ভাজা দিয়ে ভাত খেয়েছি। এতক্ষণে বাড়িতে দিদিমা চোদ্দ পিদিম দেবার জন্য প্রদীপ গোছাচ্ছেন, সলতে পাকাচ্ছেন। দিদিমা বলতেন-ভূতচতুর্দশীর দিন সন্ধের পর চোদ্দজন ভূত বাতাসে ভর করে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়, তাদের খপ্পরে পড়লে ভারি মুশকিল। এদিন অন্ধকার নামার পর আর কোথাও যাবিনে, ঘরে থাকবি। ভূতেদের নামও বলতেন—আরমুই, ছারমুই, পোড়ামুই, অন্তাই, দন্তাই, খন্তাই, বরী, ঠরী—আরো কী কী যেন, সবগুলো মনে পড়ছে না। বাড়িতে বসে এসব শুনলে হাসি পায়, এখানে গা ছমছম করে।

কিছুদূর হাঁটবার পর বাঁদিকে একটা সরু পথ ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে ঢুকেছে। দুদিকে জল-কাদা আর নরম ভদ্ভসে জমি, মাঝখানে আট-দশ আঙুল চওড়া একটু পথ জেগে রয়েছে। জলার মধ্যে কয়েকটা ঘাসে হাওয়া জমির টুকরো দ্বীপের মত জেগে আছে তা তো আগেই বলেছি। এই পথটা তেমন একটা দ্বীপে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা সাবধানে পা ফেলে ঘাসজমিটায় গিয়ে হাজির হলাম। তখন দিনের আলো পুরোপুরি নিভে রাত্তির নেমেছে।

দ্বীপটা লম্বায় কুড়ি হাত, চওড়ায় পনেরো হাত মত হবে। মাঝখানে একটা বড় গাছ ঠেলে উঠেছে ওপরদিকে। তার মোটা গুড়িতে হেলান দিয়ে তিনকড়ি বসল, আমি বসলাম মুখোমুখি। অমাবস্যার রাত্তিরেও নক্ষত্রদের থেকে চুইয়ে আসা ক্ষীণ একটু আলোর আভাস থাকে, সে আলো অন্ধকার দূর করে না, পরিবেশকে আরো রহস্যময় করে তোলে।

তিনকড়ি বলল—আয়, নিধুবাবুর একখানা গান ধরা যাক। সেই যে গানটা যে খাতনা যতনে, আমার মনই জানে। গাইবি? নে, শুরু কর

আমার গাইতে ইচ্ছে করছিল না। তিনকড়ি বেশ ভাল গান জানত, সে একাই গান ধরল। হঠাৎ আমার মনে হল তিনকড়ি আসলে ভয় পেয়েছে। প্রথমে সাহস দেখিয়ে এখন সে ভয়টা স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছে। গান গাওয়াটা প্রকৃতপক্ষে তার ভয় কাটানোর চেষ্টা। কিন্তু কেন ভয় পেল তিনকড়ি? পরিবেশের অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর দমচাপা ভাবটা কি সে ধরতে পেরেছে?

দু-একলাইন গাইবার পর তিনকড়ি থেমে গিয়ে আমাকে বলল—গতকাল এই জলার দিকে অনেক রাত্তিরে একরকম আশ্চর্য আলো দেখতে পাওয়া গিয়েছে, জানিস?

—আলো? কী রকম আলো? এতক্ষণ বলিসনি তো

—এমনিই বলিনি। আমাদের গ্রামের অনেকেই দেখেছে। আজ সকালে মধু মিত্তির, হারাধন মজুমদার আর বিশু খুড়ো আলোচনা করছিল পথে দাঁড়িয়ে, তাই শুনছিলাম।

—কী বলছিল? নিজেরা দেখেছে?

—মধু মিত্তির আর বিশু খুড়ো দেখেছে। নীলচে মত আলো, আকাশ থেকে গোলার মত নেমে এসে মাটির কাছে দপ্ করে জ্বলে উঠে অনেকখানি জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। হারাধন মজুমদার বলছিল কাল রাতে এই জলায় ডাইনিদের চাতর বসেছিল

-সে আবার কী?

-চাতর মানে আসর। দূর দূর দেশ থেকে ডাইনিরা গাছ চালিয়ে উড়ে আসে। তারপর সারারাত ধরে তাদের সভা চলে। ওই সভাকেই বলে চাতর। গাছ-চালা কাকে বলে জানিস তো? কোনো বড় গাছের ডালে বসে ডাইনিরা হুকুম করে–অমুক জায়গায় চল। অমনি সে গাছ আকাশে উড়ে সেই জায়গায় গিয়ে হাজির হয়। উড়তে উড়তে গাছ যখন মাটির কাছে নেমে এসে লেগে বসে, তখন ওইরকম দ করে নীল আলো জ্বলে ওঠে। আমি অবশ্য এসব বিশ্বাস করি না-ওরা বলছিল, আমি শুনলাম—এই আর কী। বিশু খুড়ো আবার সন্ধের পর আফিং খায়। বুঝতেই পারছিস–

কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে তিনকড়ি একবার ওপরদিকে তাকাল, কী একটা জিনিস যেন তার মনে পড়ে গিয়েছে। তারপর সোজা হয়ে বসে পেছন ফিরে সে গাছটায় হেলান দিয়ে দিল, তার মোটা গুড়িতে একবার হাত বোলালো। এবার সে ঘুরে আমার দিকে যখন তাকাল, সেই অল্প আলোতেও দেখলাম তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছে, ভয় পেলে মানুষের যেমন হয়।

বললাম—কী রে, কী হল তোর? নিজের গল্পে নিজেই ভয় পেলি নাকি?

ফিসফিস করার মত গলায় তিনকড়ি বলল—রাম, এই গাছটা কোথা থেকে এল? এটা তো আগে কখনো দেখিনি। তাছাড়া কী গাছ এটা?

এবার আমিও অবাক হয়ে গাছটার দিকে তাকালাম। সত্যিই তো, এই জমির টুকরোটায় মোটামুটি বড় গাছ বলতে একটা গাব আর একটা মাঝারি তেঁতুল গাছ বরাবর দেখে এসেছি। সে দুটো তো ওই যথাস্থানে দেখা যাচ্ছে। তাহলে বাড়তি এটা আবার কোথা থেকে এল? গাছটাই বা কী জাতের? আমরা গ্রামের ছেলে, সবরকম গাছই চিনি। বড় বড় শালগাছের মত পাতাওয়ালা এটা কোন গাছ? মাটি থেকে বিরাট মোটা গুঁড়ি সোজা আকাশের দিকে উঠেছে, বিশেষ জটিল ডালপালা নেই। অনেকটা ওপরে কিছু শাখাপ্রশাখা এদিক-ওদিক ছড়িয়েছে, তাতে থালার মত বড় বড় গোল গোল পাতা। দেখলেই মনে হয়—এ বাংলাদেশের গাছ নয়!

তিনকড়ি একইরকম ভয় পাওয়া গলায় বললভেবে দেখ, দিনসাতেক আগেও এখানে বসে আমরা আড্ডা দিয়ে গিয়েছি, এই গাছটা তো দেখিনি। এখানে কেন, গ্রামের ত্রিসীমানায় এমন গাছ দেখেছিস কখনো? এ হল ভিনদেশের গাছ–

তারপর কাপাকাপা গলায় বলল-রাম, বিশু খুড়োরা ঠিকই দেখেছিল। এখানে ডাইনির চাতর হয়েছে কাল। এই গাছ তারাই উড়িয়ে এনেছে। চল, আমরা এখান থেকে চলে যাই—

কী করে যে ফিরে এলাম তা আর তোমাদের কী বলব! চেনা জায়গা, ছোটবেলা থেকে খেলা করে মানুষ হয়েছি ওই জায়গায়, কিন্তু সেদিন যেন কেবলই পথ হারিয়ে ফেলতে লাগলাম। যেদিকেই যাই, দেখি বেরুবার পথ নেই। রাস্তা আবার ঘুরে একই বিন্দুতে এসে হাজির হয়েছে। রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, বুঝলে? অত্যন্ত আবছা তারার আলো, লম্বা ঘাসের জঙ্গল, একটু পা ফেলতে ভুল হলেই কোমর পর্যন্ত কাদায় গেঁথে যাবার সম্ভাবনা, তার সঙ্গে হেমন্তকালের অস্বচ্ছ কুয়াশার পাক খাওয়া—সব মিলিয়ে যেন একটা ভয়ের স্বপ্ন। কোনোরকমে জলাভূমির বাইরে শক্ত জমিতে এসে যখন পা দিলাম তখন। আমরা দুজনেই ঘামছি।

হন্‌হন্ করে হেঁটে প্রায় যখন গ্রামে পৌঁছে গিয়েছি, একবার কেন যেন তিনকড়ি পেছন ফিরে তাকাল। তারপরেই থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে আমাকে বলল দেখ রাম, দেখ! কী কাণ্ড!

তাকিয়ে দেখলাম সেদিকে আকাশটা অদ্ভুত নীল রঙে ভরে গিয়েছে। তীব্র আলো নয়, মৃদু জ্যোৎস্নার মত আভা। আর তার মধ্যে দিয়ে কী একটা জিনিস যেন জলার ভেতর থেকে উঠে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। ভাল করে বুঝতে না বুঝতে জিনিসটা আলোর পরিধির বাইরে চলে গেল। আমরা দুজন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আলোটাও একটু একটু করে ম্লান হয়ে শেষে মিলিয়ে গেল।

গ্রামে ঢুকে দেখলাম বেশ হই চই শুরু হয়ে গিয়েছে, অনেক মানুষ বেরিয়ে এসেছে বাইরে। কে যেন গাড় হাতে মাঠে যাবার সময় দক্ষিণ-পশ্চিম দিগন্তে নীল আলোটা দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে লোজন ডাকে। একেবারে মিলিয়ে যাবার আগে অন্তত সাতআটজন মানুষ দেখেছে আলোটা। যারা পরে বেরিয়েছে, তারা এখন প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে বিবরণ শুনছে। বিশু ভটচাজ বলছেন—পরপর দুদিন! আর নিশ্চয় তোমরা অবিশ্বাস করবে না—এখন তো নিজের চোখে দেখলে? কালকেই তোমরা বলেছিলে আমি আফিঙের ঝেকে খেয়াল দেখেছি। আজ নিশ্চয় আর তা বলবে না? আগামীকাল কালীপূজা, রক্ষেকালীর মন্দিরে ভাল করে পূজো দাও সবাই। এসব ভাল লক্ষণ নয়—

রঘু চৌধুরী বললেন–ঠিকই। আজ হচ্ছে ভূতচতুর্দশী-ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আজ সন্ধের পর থেকে প্রেতের দল বাতাসে মিশে ঘুরে বেড়ায়। তোমরা তো কেউ আজকাল কিছু মানো না, আধুনিক যুগ এসেছে, শহরে শুনছি তেলের বদলে গ্যাসের আলো জ্বলছে রাস্তায়। এখন বুঝে দেখ বুড়োদের কথা সত্যি না মিথ্যে।

এই গোলমালে কেউ খেয়াল করেনি আমরা বাইরে থেকে এসে গ্রামে ঢুকেছি। নইলে বকাঝকা খেয়ে মরতে হত। পরের দিন কালীপূজো, কথা রইল তিনকড়ি আর আমি বিকেল তিনটে নাগাদ রক্ষাকালীর মন্দিরের সামনে দেখা করব।

পরের দিন যথাসময়ে মন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি তিনকড়ি আমার আগেই এসে হাজির হয়েছে। মন্দিরে আজ সারারাত ধরে পূজো হবে, তার প্রস্তুতি চলেছে পুরোদমে। তিনকড়ি আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে গিলে বলল-রাম, চল আমরা জলার দিকটা। আজ একবার ঘুরে আসি। দিনের বেলা তো কোনো ভয় নেই। কাল কী দেখতে কী দেখেছি

—নীল আলোটা তো সত্যি। আমরা ছাড়াও গ্রামের কত লোকে দেখেছে—

একটু ভেবে তিনকড়ি বলল—তবু চল যাই। বেলা থাকতে থাকতে ফিরে আসব।

গতকাল অত ভয় পেয়েছিলাম, আজই আবার সেখানে রওনা হলাম দুজন মিলে। সেই বয়েসে সবই সম্ভব ছিল। তাছাড়া ঝকঝকে সূর্যের আলোয় অপ্রাকৃত ভয় থাকে না। জলার ভেতরে ঢুকে আজ প্রথমেই যেটা অনুভব করলাম তা হ’ল কাল রাত্তিরের সেই দমবন্ধ-করা ভয়ের পরিবেশটা আর নেই। কেবল দিনের আলো রয়েছে বলে নয়, অমঙ্গলের প্রভাবটাই ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। বাঁদিকের সরু পথটা দিয়ে হোগলাবনে ঢুকে ঘাসজমির দ্বীপে পৌঁছে আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

বড় গাছটা সেখানে নেই।

নেই মানে একেবারেই নেই। আমরা এগিয়ে গিয়ে জমি পরীক্ষা করে দেখলাম। বড় একটা গাছ উপড়ে ফেললে তো সেখানে তার চিহ্ন থাকবে, মাটিতে তার গর্ত থাকবে—কিছু নেই। দিব্যি সমান ঘাসে ছাওয়া জমি। গেল কোথায় অত বড় গাছটা? যেভাবে এসেছিল সেভাবেই কি ফিরে গিয়েছে? ওই গাছটাকেই কি কাল রাত্তিরে আমরা আকাশে উঠে যেতে দেখেছিলাম?

বললাম–তিনু, কাল আমরা আলো-আঁধারিতে ভুল দেখিনি তো? হয়ত গাছ-টাছ কিছু ছিল না, সবটাই আমাদের চোখের ভুল। হতে পারে তো, তাই না?

তিনকড়ি দৃঢ় গলায় বললনা, হতে পারে না। কারণ আমি গাছটায় হেলান দিয়ে বসেছিলাম। জিনিসটার বাস্তব ছোঁয়া পেয়েছি। তাছাড়া

শার্টের পকেট থেকে একটা সবুজরঙের ভাজকরা কী জিনিস বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল—তাছাড়া এইটে। এইটে তো আর মিথ্যে নয়, চোখের ভুল নয়—

গতকাল রাত্তিরে দেখা ভূতুড়ে গাছের একখানা পাতা।

তিনকড়ি বলল—কী ভেবে একখানা পাতা পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। নিচেই পড়ে ছিল।

আমরা দুজনে মিলে অনেক খুঁজলাম। নাঃ, আর একটাও পাতা পড়ে নেই। সমস্ত চিহ্ন নিয়ে গাছটা মিলিয়ে গিয়েছে? কেবল তিনকড়ির রেখে দেওয়া পাতাটা ছাড়া। গ্রামে ফিরে এসে অনেককে পাতাটা দেখিয়েছিলাম, কেউ চিনতে পারেনি। বহুবছর বাদে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম ওটা কী গাছের পাতা। কাশী গিয়েছিলাম বিশ্বনাথ দর্শন করতে। একদিন সেখান থেকে দেবী মহাকালীর পূজো দিতে গিয়ে পাহাড়ের কোলে জঙ্গলের মধ্যে ওই গাছ দেখি। যে পাণ্ডা আমাদের সঙ্গে ছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করতে সে বলল—ওই বড় গাছটা? ওর নাম বাবু বুদ্ধ নারিকেল। বিহার আর উত্তরপ্রদেশের জঙ্গলে দেখা যায়–

বললাম-বাংলাদেশে হয় না?

—না বাবু। শুকনো পাথুরে মাটি ছাড়া বুদ্ধ নারিকেল জন্মায় না।

পরে অনেককে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি সত্যিই ওই গাছ বাংলায় হয় না। পাণ্ডার কথা শুনে আমার মনে পড়ে গেল ফেলে আসা প্রথম যৌবনের স্মৃতি। সেই মামাবাড়ির গ্রাম, ভূতচতুর্দশীর নিকষ কালো রাত, বন্ধু তিনকড়ি। সব কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে। মামারা কেউ আর বেঁচে নেই, তাদের ছেলেপুলেরাও একজন ছাড়া সবাই জীবিকার সন্ধানে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়। আর কখনো সে গ্রামে যাইনি। তিনকড়িও এখন কোথায় আছে কে জানে। অনেকদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

রাম গাঙ্গুলির গল্প শেষ হতে সবাই কিছুক্ষণ চুপ, তারপর পতিরাম মজুমদার বললেন–সরসী ভায়া, এবার কিন্তু আমাকে উঠতেই হবে। কিন্তু এরপর তো আর একা যেতে পারব না, গা ছমছম করবে। তুমি বলেছিলে তোমার লোক সঙ্গে যাবে, তাই একজন কাউকে দাও। ঠাট্টা করলে কর ভাই, আমি অপারগ—

সরসী চাটুজ্জে বললেন-কেউ ঠাট্টা করছে না, তোক দিচ্ছি সঙ্গে।

আদিনাথ চক্রবর্তী বললেন—ওঠবার আগে আমার কাহিনীর শেষটা বলি—

পতিরাম বললেন—এখনো শেষটা বাকি।

—ভয় নেই, দুটো কথা মাত্র। অমর বিষ্ণুমূর্তি খুঁজে দিয়ে গিয়েছিল, ঠাকুমার মৃত্যুর পর তার ভবিষ্যৎবাণী যে সত্যি সে কথা জানান দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার তৃতীয় ভবিষ্যৎবাণীটাও যে সত্যি, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম অনেক পরে। সে বলেছিল আমাদের বংশে একজন অদ্ভুত চরিত্রের উদাসীন সাধকের জন্ম হবে। সংসারী হয়েও সে বৈষয়িক হবে না। কবে, কোথায় কার ঘরে তার জন্ম হবে সেটাই কেবল সে বলেনি। শুধু বলেছিল এই শিশুর জন্মের মুহূর্তে আশ্চর্য এক নীল উল্কাপাত হবে আকাশে। তা দেখলে আমরা বুঝতে পারব।

বহুদিন পরে, তখন ছোটবেলার এ কাহিনী প্রায় ভুলেই গিয়েছি, আমার তৃতীয় ছেলের জন্মের সময় আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত এক বিশাল নীল রঙের আলো ছড়ানো উল্কা ছুটে গেল। একজন দাই আঁতুড়ঘর থেকে উঠোন পেরিয়ে গরমজল আনতে যাচ্ছিল ভেতরবাড়িতে, তার চিৎকারে সকলে উঠোনে বেরিয়ে এসে দৃশ্যটা দেখলাম। সচরাচর অতক্ষণ ধরে উল্কা জ্বলতে জ্বলতে অতটা আকাশ পার হয় না। সেই আলো মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ছেলের জন্ম। তার নাম তারানাথ। তারানাথ চক্রবর্তী।

আদিনাথের এক ছেলে ছোটবেলা থেকেই সংসারত্যাগী। মাঝে মাঝে বাড়ি আসে, আবার কোথায় চলে যায়। এটা তার জীবনের গভীর ব্যথার জায়গা। আড্ডাধারীরা সেকথা জানেন বলে চুপ করেই রইলেন। আদিনাথ বললেন—এখন তার বয়েস বাইশ কী তেইশ। কোথায় আছে কে জানে। বছরখানেক আগে একবার সাতদিনের জন্য এসেছিল, তারপর আবার নিরুদ্দেশ। ছেলে আমার খুবই ভাল, চমৎকার সংস্কৃত জানে, পণ্ডিতেরা তার সঙ্গে পেরে ওঠে না। কোথা থেকে শিখল সে এক রহস্য। স্কুল-কলেজে তো কখনো পড়েনি। দোষের মধ্যে ওই এক বাড়িতে মন বসে না। জানি না আবার কবে তার দেখা পাব।

আড্ডাধারীরা তারানাথকে দেখেছেন। আট-দশ বছর আগে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তার আগে অবধি এই গ্রামেই সে মানুষ হয়েছে। সমবেদনাসূচক নীরবতা পালন করা ছাড়া তাদের কিছু করবার নেই।

আদিনাথ বললেন—যাক, আমার ভাগ্য। আপনারা আশীর্বাদ করুন, সেখানেই থাকুক, সে যেন ভাল থাকে।

০৪. এতক্ষণ এ গল্প শুনছিলাম

এতক্ষণ এ গল্প শুনছিলাম তারানাথের মুখে।

মট লেনে তারানাথের বাড়িতে আমাদের চিরাচরিত আড্ডা বসেছে। আজ ছিল জন্মাষ্টমীর ছুটি। দুপুরের পরেই কিশোরী সেন আর আমি গল্পের লোভে হানা দিয়েছি তারানাথের বৈঠকখানায়। চারির বিয়ে হয়ে যাবার পর তারানাথ বোধহয় মনের দিক দিয়ে একটু অসহায় হয়ে পড়েছে। মেয়েরা বাপের যতখানি সেবা করে, ছেলেরা ততটা পারে না। মেয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবার পর তারানাথের মুখচোখে একটা ভরসা-হারা ভাব ফুটে ওঠে মাঝে মাঝে। আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু তা নিয়ে আলোচনা করি না।

কী হবে প্রৌঢ় মানুষের মনে বিষণ্ণতার বোঝা বাড়িয়ে?

আজ তারানাথের বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়তে দরজা খুলে দিল চারি। অবাক হয়ে বললাম—একি রে! কবে এসেছিস তুই? গত হপ্তাতেও তো আমরা এসে গল্প করে। গিয়েছি, তোর বাবা তো বলেন নি তুই আসবি!

হাসিমুখে চারি বলল—না কাকাবাবু, আসার কথা ছিল না, গতকাল হঠাৎ এসে পড়েছি। ব্যবসার কাজে আপনাদের জামাইকে কলকাতা আসতে হ’ল, আমি ধরে পড়লাম—আমিও যাব। তাই

বললাম—জামাই তোর কথা সব খুব মান্য করে, তাই না?

চারি সলজ্জ হেসে মুখ নিচু করল। সে চিরকালই সপ্রতিভ, কিন্তু প্রগভা নয়। ছোটবেলা থেকে তাকে দেখছি, কন্যার মত স্নেহ জন্মে গিয়েছে তার ওপর। আগে আগে তার জন্য লেসের ডিজাইন, ছবিওয়ালা গল্পের বই ইত্যাদি নিয়ে আসতে হত। গতবছর। ভাল ঘরে-বরে বিয়ে হয়েছে চারির। স্বামী মাঝারি ধরনের ব্যবসা করে, বিশাল ধনী নয়, কিন্তু সচ্ছল অবস্থা। ছেলেটিও ভাল, বিনয়ী এবং সচ্চরিত্র। এত ভাল পাত্রে মেয়ের বিয়ে দেবার ক্ষমতা তারানাথের ছিল না, কিন্তু চারি সুন্দরী বলে দেনাপাওনা কোনও বাধা হয়নি।

চারি বলল—আপনারা ভাল আছেন তো কাকাবাবু? আসুন, ভেতরে এসে বসুন।

একটু পরেই তারানাথ বাড়ির ভেতর থেকে বৈঠকখানায় এসে বসল। তার মুখ আজ উজ্জ্বল, গত একবছরের ম্রিয়মাণ ভাবটা কেটে গিয়েছে। সে বলল-এসো হে দুই মূর্তি, আজ ছুটির দিন, আমি জানতাম তোমরা আসবে। তোমাদের বউদিদি ক্ষীরের মালপোয়া করেছেন, খেয়ে যাবে–

কিশোরী বলল—চারি এসেছে, বাড়ির চেহারাই দেখছি বদলে গিয়েছে। সত্যিই, মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে এলে মনে খুব আনন্দ হয়, তাই না?

—ঠিক। তাও এখন তো বুদ্ধি দিয়ে বুঝছ, আমার বয়েসে এলে হৃদয় দিয়ে বুঝবে।

যথাসময়ে চারি চা নিয়ে এল। আজ সব একদম সময়মাফিক ঠিকঠাক চলছে। আমরা আসবার সময় মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনা তারানাথের প্রিয় সিগারেট পাসিং শোএর প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম। এটা না হলে তারানাথের গল্পের মেজাজ আসে না। নানারকম কথা হতে হতে নিজের ছোটবেলার গল্প বলতে আরম্ভ করল তারানাথ। সাধারণত সে নিজের পুরনো জীবন সম্বন্ধে কিছু বলতে চায় না, অন্তত সাধারণ পারিবারিক তথ্যগুলো আলোচনা করে না। বেছে বেছে কেবল অদ্ভুত আর অলৌকিক অভিজ্ঞতার গল্প শোনায়। আজ হঠাৎ কিশোরী জিজ্ঞাসা করল—আপনি তন্ত্রসাধনার উৎসাহ বা প্রেরণা পেলেন কোথা থেকে? আপনার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কি কেউ তন্ত্রসাধক ছিলেন? মানে আমি বলতে চাইছি যে, এর ধারাটা কি পরিবারে আগে থেকে ছিল?

সিগারেটের দগ্ধাবশেষ ছাইদানি হিসেবে ব্যবহৃত নারকেলের মালায় গুঁজে দিতে দিতে তারানাথ বলল—তা বলতে পার। একেবারে রক্তাম্বরধারী তান্ত্রিক কেউ না থাকলেও বাপ-ঠাকুর্দা-প্রপিতামহের ভেতর অনেকেই রীতিমত সাধকশ্রেণীর মানুষ ছিলেন। আমার আপন ছোট ঠাকুর্দা, মানে বাবার ছোটকাকা-তিনি কৈশোরেই গৃহত্যাগী হয়ে চলে গিয়েছিলেন। তাছাড়াও আমাদের পরিবারে নানাসময়ে নানান আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে, যার কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। আর কিছু কিছু তো তোমাদের বলেছি।

বললাম—আপনার ছোট ঠাকুর্দা আর কখনো সংসার জীবনে ফিরে আসেন নি?

–না। তবে একবার তার সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল। সেও এক বলবার মত গল্প—

–বলুন না, আজকের আসর সেইটে দিয়েই শুরু হোক।

তারানাথ বলল-এ কাহিনী আমার বাবার কাছে শোনা। বাবা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে গল্প বলতে পারতেন—এ বিষয়ে তাঁর নাম ছিল। আমাদের গাঁয়ের সরসী চাটুজ্জের বৈঠকখানায় সন্ধেবেলা বোজ জমাট আড্ডা বসত, বাবা ছিলেন সে আড্ডার প্রধান কথক। মেজাজ ভাল থাকলে বাড়ি ফিরে সেদিন কী গল্প হল আমাদের শোনাতেন। তারপর তো আমিও অল্পবয়েসে বাড়ি থেকে উধাও হলাম। মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরে আসি, তবে সে খুব কম। তিন-চার বছরে একবার কী দুবার। ওই ভবঘুরেমির সময়টা আমার যে কী সুন্দর কেটেছে তা আর কী বলব! কোনও পিছুটান নেই, দায়দায়িত্ব নেই, কেবল বিরাট এই পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়ানো। বাইরে থেকে দেখলে এটা হয়ত স্বপ্নদর্শী অলসের জীবনযাত্রা বলে মনে হবে, যে বাস্তব জগতের থেকে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা অত সোজা নয়। আত্মীয়হীন, বন্ধুহীন দুনিয়ায় সম্পূর্ণ সম্বলহীন অবস্থায় ভেসে পড়তে হলে খুব সাহসের দরকার। কে খেতে দেবে ঠিক নেই, কোথায় থাকব তার কিছু ঠিক নেই, মন্দিরের চাতালে, পোড়ড়া বাড়ির বারান্দায় ঝড়ে-বৃষ্টিতে রাত কাটিয়েছি। কত অদ্ভুত চরিত্রের লোক দেখেছি, তাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত সাধক, কেউ নৃশংস কাপালিক, কেউবা জুয়াচোর। কত সময়ে অসুখ করেছে, প্রবল জ্বরে পথের ধারে গাছতলায় পড়ে কষ্ট পেয়েছি, জলতেষ্টায় বুক ফেটে গিয়েছে, কিন্তু জল দেবার কেউ ছিল না। মরেও যেতে পারতাম। সেক্ষেত্রে বাড়িতে কোনও খবরও পৌঁছত না। তবু কখনো ভয় হয়নি। মৃত্যুকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে দেখিনি, দেখেছি ঈশ্বরের তৈরি এই জগতের একটা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে। যে পরিণতিতে ভয়ের কিছু নেই, আছে স্রষ্টার অপার করুণা।

এই পর্বেই বীরভূমের শ্মশানে মাতু পাগলীর সঙ্গে পরিচয়, বরাকর নদীর ধারে নির্জন শালবনে মধুসুন্দরী দেবীর আবির্ভাব দেখতে পাওয়া। ওঃ, সেসব কী উত্তেজনাপূর্ণ দিন গিয়েছে। মনে হয়েছিল বুঝিবা সৃষ্টির সব রহস্য জেনে ফেলব, সাধনার তীব্রতায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়মকানুন ধরা দেবে আমার চেতনায়–

কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থেমে গেল তারানাথ। বললাম—কেন, অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা তো হয়েছে—

—তা হয়েছে। যা পেয়েছি তা একজন সাধকের একটা জীবনের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু আসলে তো কিছুই জানা হল না। এই জগতের মানে কী, কী করে এই চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি হল, না হলেই বা কী এসে যেত, সেই ভেতরের আসল কারণগুলো সব অজানা থেকে গেল। এখন মনে হয়–

আবার থেমে গেল তারানাথ। কী ভাবতে লাগল।

জিজ্ঞাসা করলাম-কী মনে হয়?

—মনে হয় সৃষ্টির গভীরতম কারণটা ঈশ্বর মানুষের কাছ থেকে চিরদিনের জন্য আড়াল করে রেখেছেন। সে রহস্য জানতে পারলে সৃষ্টির আর কোনও সার্থকতা থাকবে না। গোলোকধাম খেলেছ তো? সেই যে কড়ি চেলে, কাগজে ছাপা ছকের ওপর গুটি এগিয়ে খেলা। জন্ম থেকে শুরু হয়ে বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, আদালত, পতিতালয়, শৌণ্ডিকালয়, মন্দির ইত্যাদির খোপে আঁকা ঘর পেরিয়ে খেলুড়েকে একটু একটু করে ওপরে উঠতে হয়। সবচেয়ে ওপরের খোপের নাম হচ্ছে গোলোকধাম। সেখানে পৌঁছলেই খেলা শেষ। তারপর ছক আর গুটি তুলে ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। আমাদের জীবনেও তাই। সবকিছু জেনে ফেললেই খেলা শেষ। সেটা ভগবান চান না। তা একদিক দিয়ে ভালই, খেলা চলছে চলুক না।

দেখলাম তারানাথ গল্প থেকে দর্শনের দিকে সরে যাচ্ছে। বললাম-তারপর যে কথা বলছিলেন, আপনার অল্পবয়েসের গল্প, সেটা বলুন–

তারানাথ বলল—একবার বাঁকুড়ার ইন্দাস অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সারাদিন হাটেমাঠে ঘুরি, রাত্রে যেখানে হোক আশ্রয় নিই। সেদিন বিকেল থেকেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বেশি পথ না হেঁটে আলো থাকতে থাকতে একটা ছোট গ্রামের সীমানায় শিবমন্দিরের চাতালে আশ্রয় নিয়েছি। বেশ বড় চওড়া চাতাল, আট-দশটা থামের ওপর ছাদ রয়েছে। কাজেই ওপরটা ঢাকা, বৃষ্টি হলেও ভিজতে হবে না। গায়ে উড়নি, পায়ে খড়ম এক পৈতেধারী বুড়োমত লোক দেখি মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে কোথায় যাচ্ছে। মনে হল এখানকার পূজারী। এগিয়ে গিয়ে বললাম—আজ্ঞে, এখানে রাত্তিরটা একটু থাকা যাবে?

লোকটি একান্ত নীরস এবং অমিশুক প্রকৃতির। কিছুক্ষণ আপাদমস্তক আমাকে ভাল করে দেখে সে শুকনো গলায় বলল—থাকতে ইচ্ছে হলে থাকো, আমাকে জিজ্ঞাসা করার কী প্রয়োজন?

—না, ভাবলাম আপনিই বোধহয় এ মন্দিরের পূজারী। কাজেই আপনার অনুমতি নেওয়াটা–

—কিছু দরকার নেই। আমি এখানকার পূজারী বটে, কিন্তু নাটমন্দিরে যে কোনও যাত্রী আশ্রয় নিতে পারে। তবে এখানে অতিথিশালা নেই, খাবারদাবার দেবার ব্যবস্থাও নেই। থাকার মধ্যে ওই নাটমন্দির, থাকতে চাইলে থেকে যাও।

–আপনি কোথায় থাকেন?

বৃদ্ধ আমাকে কড়া চোখে তাকিয়ে দেখল, তারপর বলল—কেন বল তো?

—না, তাই জিজ্ঞেস করছি–

—আমি এই গ্রামেরই ভেতরে থাকি। কিন্তু আমাদের বাড়িতে স্থানাভাব, সেখানে আশ্রয় দিতে পারব না।

হেসে বললাম—আপনার আশ্রয়ে থাকার চেয়ে গাছতলায় থাকা ভাল। ভয় নেই, থাকতে চাইব না, কথাটা এমনিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। গাছপালারা অন্তত আশ্রয়গ্রহণকারীকে কটু কথা বলে না–

বৃদ্ধ আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে হুম্ শব্দ করে গ্রামের দিকে চলে গেল।

আমার পথ হাঁটার সম্বল বলতে একটা ঝোলা। তার মধ্যে একখানা ঘটি, গায়ের চাদর, একখানা রুদ্রডামরের পুঁথি, কয়েকটা বাবলাডালের দাঁতনকাঠি, আর একটাকা বারো আনা পয়সা। এর বেশি কিছুর প্রয়োজনও বোধ করিনি কখনো। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসা সেই হিন্দিভাষী সাধু শিক্ষা দিয়েছিলেন আগামীকালের জন্য কোনও সঞ্চয় না করতে। তার উপদেশ মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। পরবর্তীকালেও যে উপার্জন বা সঞ্চয় করেছি, তা করেছি স্ত্রী-পুত্র-কন্যার মঙ্গলের জন্য, নিজের প্রয়োজনে নয়। আজ পর্যন্ত সেই অভ্যাস বজায় রেখেছি।

ক্রমেই আকাশ মেঘে অন্ধকার করে আসছে। ঝোলাসহ নাটমন্দিরের ওপর উঠে একখানা থামের গোড়ায় গুছিয়ে বসলাম। বাঁকুড়া জেলায় গিয়েছ কখনো? বড় সুন্দর জায়গা। বিশাল বিশাল লালমাটির প্রান্তর, ঝুঁটিবাঁধা বৈরাগীর মত তালগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে মাঠের মধ্যে, ধুলোওড়া গ্রামের রাস্তায় একতারা হাতে গান গাইতে গাইতে বাউল হেঁটে যাচ্ছে। জেলাটার মাটিতে শান্তি আছে। থামে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসলাম।

হঠাৎ নাটমন্দিরের চাতালে কিছুদূরে কী একটা নড়ল বলে মনে হল। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে, পরিষ্কার কিছু দেখা যায় না। কিন্তু কোনও কিছু নড়লে আবছা আন্দাজ করা যায়। ভাল করে তাকিয়ে দেখি কেউ একজন শুয়ে রয়েছে সেখানে, শোয়া অবস্থায় পাশ ফেরায়। নড়াচড়াটা চোখে পড়েছে। হেঁকে বললাম—কে? কে ওখানে?

মনুষ্যমূর্তিটি উঠে বসে বলল—আমি।

—আমি কে? পৃথিবীতে সবাই তো আমি। যাত্রী?

লোকটি সামান্য হাসল, বলল—সংসারে সবাই যাত্রী, কোথাও না কোথাও চলেছে।

বাপ রে! এ যে গুরুমশায়ের মত কথা বলে। তবে তার কণ্ঠস্বর মৃদু, ভদ্র ও মার্জিত। পথচলতি লোকের কথা বলার ভঙ্গি সাধারণত এমন মার্জিত হয় না। একটু কৌতূহল হওয়ায় বললাম—এসো, এদিকে এসে বোসো

লোকটি উঠে এল আমার সামনে। আলো নেই, পরিষ্কার তাকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু মনে হ’ল তার বয়েস বছর চল্লিশ কী পঁয়তাল্লিশ হবে। এ বয়েসের কোনও লোককে। ‘তুমি’ বলাটা আমার উচিত হয়নি। বললাম—কিছু মনে করবেন না, অন্ধকারে ভাল দেখতে পাইনি, তুমি’ বলে ফেলেছি।

—তাতে কী হয়েছে? জগতে সকলে সকলের বন্ধু। বন্ধুকে ‘তুমি’ বলা যায়।

লোকটির পরণে খাটো ধুতি আর হাফহাতা শার্ট। সাধারণ দরিদ্র পথিক। কিন্তু তার আচরণে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা সমীহ আদায় করে। বললাম কোথায় যাবেন? আসছেন কোথা থেকে?

এবার বেশ মজার ব্যাপার হ’ল। পথিক মানুষটি আমাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করতে লাগল, কিন্তু তার অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও আমি কিছুতেই তা পারলাম না। সে বলল—কোথাও যাচ্ছি না ভাই, অনেকটা তোমারই মতন। পথে পথে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। যা পাই তাই খাই, যেখানে খুশি থেমে যাই—এই আরকি।

আমার সেই বয়েসের অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি, কিছু লোক আছে যারা হেঁয়ালি করে। কথা বলতে ভালবাসে। ভেতরে শূন্যগর্ভ বলেই বোধহয় তারা বড় বড় দুর্বোধ্য কথা বলে। প্রথমে আমি এই লোকটিকে তাদের দলে ফেলেছিলাম, কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম তা সত্যি নয়। মানুষটার ভেতর গভীরতা আছে।

বললাম—আমারই মতন মানে? আপনি কী করে জানলেন আমি কী রকম?

-–ও জানা যায়। আমি বুঝতে পারি।

বয়েস অল্প হলেও তারই মধ্যে আমি অনেক সাধক এবং অদ্ভুতকর্মা তান্ত্রিকের সঙ্গে মিশেছি। তাদের আশ্চর্য ক্রিয়াকলাপ দেখেছি। এ আর আমাকে নতুন কী ভড়ং দেখাবে?

বললাম—কী করে বোঝেন? কাকচরিত্র বা লক্ষণশাস্ত্র চর্চা করেন নাকি?

—না। বুঝি এইভাবে যে, মন আসলে একটাই—তোমার আমার যদু কিম্বা মধুর, পৃথিবীর সব প্রাণীর। মায়ার আবরণে আলাদা আলাদা দেখায়। পর্দা টাঙিয়ে দিলে ওপারে কী আছে দেখা যায় না, পর্দা সরিয়ে দিলে আবার সব স্পষ্ট দেখা যায়। মায়ার পর্দা সরিয়ে দিলে সবই এক। তখন কারও মনের কথা জানতে অসুবিধে হয় না।

বললাম—আপনি তো বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের কথা বলছেন। এ দর্শন শিক্ষা করেছেন কোথায়? খুব ভাল গুরু ছাড়া অদ্বৈতবাদের পাঠ নেওয়া যায় না। কে আপনার গুরু?

—আমার বাবা।

—ও, আপনি বুঝি শাস্ত্রাধ্যায়ী পণ্ডিতের সন্তান?

সে চুপ করে রইল। ভাবলাম কোনও কারণে সে হয়ত নিজের পরিবারের কথা আলোচনা করতে চায় না। এক্ষেত্রে কথা না বাড়ানোই ভদ্রতাসঙ্গত হবে।

ঠিক এইসময় ঠাণ্ডা হাওয়ার একটা ঝাপটা দিয়ে ঝড় এসে পড়ল। বর্ষাকাল হওয়া সত্ত্বেও সারাদিন প্রখর রোদুর ছিল, গুমোটে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এখন শুকনো পাতা ধুলোবালি আর কুটোকাটা উড়িয়ে ঝোড়ো বাতাস এসে চারদিকে ঠাণ্ডা করে দিল। ঝড়ের মুখে পাক খেতে খেতে দুটো শালিক এসে নাটমন্দিরের কড়িকাঠের ফাঁকে আশ্রয় নিয়ে গুছিয়ে বসল। অথবা ওইটাই ওদের বাসা, ঝড়ের দাপটে কোনওরকম ফিরে এসেছে।

বললাম—আপনার নামটা তো জানা হ’ল না—

লোকটি চুপ করে থেকে বলল—আমার নাম অমর। অমরজীবন।

–বাড়ি কোথায়? এই জেলাতেই বুঝি?

অমরজীবন কোনও উত্তর দিল না। বুঝলাম নিজের কথা বলতে সে আদৌ আগ্রহী নয়। অন্য প্রসঙ্গে যাবার জন্য বললাম—আশ্রয় তো যাহোক পাওয়া গেল, কিন্তু খাওয়াটা বোধহয় জুটবে না

–না না, তা কেন? ঝড়টা থামুক, খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে এখন–

—তা কী করে হবে? কাছাকাছি কোনো দোকানপাট দেখছি না। গ্রামে হয়ত আছে, কিন্তু তারা কি এই ঝড়বাদলে দোকান খুলে রাখবে? মনে হয় না।

অমর বলল-রাত্তিরে কী খাও তুমি? ভাত না রুটি?

বললাম–আমি ঠিক সন্ন্যাসী না হলেও পথে ঘুরছি অনেকদিন। সবই অভ্যেস আছে।

–বেশ, বেশ। ভাল। খাবার এসে যাবে।

অন্ধকারে অমরের মুখচোখ ভাল দেখতে পাচ্ছি না। লোকটা পাগল নয় তো? কোথায় খাবার?

অমর বলল—কালকেও আমি এখানে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আজ তুমি আসবে, তাই একটা দিন বেশি থেকে গেলাম। এমনিতে আমি দু-রাত্তির কোথাও থাকি না–

হ্যাঁ, নিশ্চয় পাগল। গতকাল রাত্তিরে স্বপ্ন দেখেছে আজ আমি আসব! বদ্ধ পাগল ছাড়া কী?

বললাম—আপনি জানতেন আমি এখানে আসব?

-হ্যাঁ।

–স্বপ্নে দেখেছেন?

-হ্যাঁ। স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন হলে আমাকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে সেখানে থাকতে হয়।

বেচারী! এমনিতে বেশ ভাল লোকটা, ভদ্র আর মিষ্টি কথাবার্তা। দোষের মধ্যে পাগল।

এরপরেই অমরজীবন হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি বাড়ি চলে যাও।

আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি সে কী বলছে। বললাম—তার মানে? বাড়ি যাব কেন?

—কিছু না। ভবঘুরে জীবন ত্যাগ করে সংসারে ফিরে যেতে বলছি না। সে যখন সময় হবে যাবে। তোমার নিজের ভালর জন্য বলছি, কয়েকটা দিনের জন্য বাড়ি যাও—

আচ্ছা বিপদ তো! বললাম—কিন্তু কেন?

—মনে করো না আমি তোমার বন্ধু, আমি অনুরোধ করছি তাই যাচ্ছ।

তার কথাগুলো একটু কেমন কেমন। কিন্তু গলার স্বরে একটা ব্যক্তিত্বপূর্ণ দৃঢ়তা আছে। তার কথা মনোমত না হলেও অকস্মাৎ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তখনকার মত তাকে শান্ত করার জন্য বললাম–আচ্ছা, আচ্ছা। সে দেখা যাবে এখন। বিড়ি চলে?

সে হাসল। বলল—সব চলে। আছে? দাও–

তাকে দিয়ে নিজে একটা বিড়ি নিলাম। বাতাসের দাপটে চার-পাঁচটা কাঠি নষ্ট করেও ধরাতে পারছিলাম না। অমর হাত বাড়িতে বলল—আমাকে দাও দেখি–

তারপর দেশলাইটা হাতে নিয়ে অদৃশ্য কার দিকে যেন ধমক লাগাল—আরে একটু থাম্ তো রে বাপু! একটা বিড়ি ধরাতে কি একটা আস্ত দেশলাই খরচ করব নাকি?

কাকতালীয় কিনা জানি না, হাওয়ার ঝাপটা সামান্য কয়েক মুহূর্তের জন্য কমে গেল। ঝড় চলতে চলতে এরকম অবশ্য হয়ই, তবু মনে রেখাপাত করল জিনিসটা। দেশলাই ফেরৎ দিয়ে অমর বলল—সবকিছুর ব্যাখ্যা চাইতে নেই। ব্যাখ্যা হয়ও না। তার চেয়ে সরল বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করা ভাল। আদেশ পেলে পালন করা ভাল।

—আদেশ কে পাঠায়?

বিড়িতে গোটাদুই টান দিয়ে অমর বলল—তা জানলে তো সব সমস্যাই মিটে যেত।

—আপনার কাছে আদেশ পৌঁছয় কেন? আপনি কে?

উত্তরে অমর বলল—বিড়িটা ভাল। খুব নরমও না, খুব কড়াও না। বেশ মিঠেকড়া ধরনের। কোত্থেকে কিনেছ? খাওয়ার পরে আর একটা দিও তো–

ঝড় থেমে গিয়ে নামল বৃষ্টি। চলল বেশ কিছুক্ষণ। দিকদিগন্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মন্দিরের পেছনে কোথা থেকে ব্যাঙ ডাকতে লাগল। বৃষ্টি যখন থামল, তখন পাড়াগাঁর হিসেবে বেশ রাত। দেখি পথে জমা জলে ছপ ছপ করে কে একজন হেঁটে এসে নাটমন্দিরে উঠল। সামনে ঝুঁকে অন্ধকারে ঠাহর করার চেষ্টা করে ডাকল—ঠাকুরমশাই! ও ঠাকুরমশাই–

অমর বলল–এই যে, আমি এখানে। দাও–

কাছে এলে দেখলাম লোকটির হাতে একটা বড় শালপাতার ঠোঙা। সে ঠোঙাটা অমরের হাতে দিতে দিতে বলল—আর এক মূর্তি এয়েচে দেখচি। তা হয়ে যাবে’খন দুজনের। দাঁড়াও, খাবার জল দিয়ে যাই। নতুন লোক, জল আনতে গেলে পুকুরঘাটে আছাড় খাবে।

বোধহয় পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য মন্দিরের চাতালে রাখা একটা মাটির কলসী নিয়ে লোকটি অন্ধকারে কোথায় চলে গেল। অমর বলল—মন্দিরের পেছনেই একটা পুকুর আছে, সেখানে গেল জল আনতে। ভাল, পরিষ্কার জল—

তারপর আমার মুখের দিকে তাকিলে বলল-খাবার ব্যবস্থা হয়ে যাবে বলেছিলাম আর খাবার এসে গেল—এর ভেতর কিন্তু অলৌকিক কিছু নেই। এই লোকটির একটা ময়রার দোকান আছে গ্রামে, গতকালও আমাকে খাবার দিয়ে গিয়েছিল। অতিথিসেবা করতে ভালবাসে। পয়সা দিতে চেয়েছিলাম—নেয়নি। আজকের খাবারও দিতে বলা ছিল। যা খাবার দেয় তা আমি একা খেতে পারি না, আজও দুজনের হয়ে যাবে এখন। দেখি কী দিয়েছে–

উঠে গিয়ে যেখানে সে শুয়েছিল সেখান থেকে একটা কাপড়ের পুঁটুলি নিয়ে এল অমর। তার ভেতর থেকে একটা মোমবাতি বের করে বলল—দেখি, দেশলাইটা আর একবার দাও–

শালপাতার ঠোঙা খুলে দেখা গেল ভেতরে গোটা পনেরো বড় মাপের পুরী, আলুর তরকারী, আর অনেকখানি মোহনভোগ। দেশী ঘি দিয়ে তৈরি, দারুণ গন্ধ বেরুচ্ছে। তখনো গাঁয়ের দিকে খাবারে ভেজাল দেবার কথা কেউ ভাবতে পারত না।

জল ভরে মেটে কলসীটা নিয়ে ফিরে এল ময়রা। আমাদের পাশে নামিয়ে রেখে বলল—এই জল রইল। এ খাবারে হয়ে যাবে তো? নাকি আর কিছু এনে দেব?

খাবারের প্রাচুর্য সম্বন্ধে তাকে আশ্বস্ত করে বিদায় করা হ’ল। অমর বলল—অন্ধকারে গল্প করা যাবে, কিন্তু খাওয়া যাবে না। মোমবাতি বেশি পুড়িয়ে লাভ নেই, এসো খেয়ে নেওয়া যাক–

অমর খুব কম খায়। মাত্র চারখানি পুরী সে খেল, বাকি সবগুলো খেতে হল আমাকে। অবশ্য পথ হেঁটে আমার খিদে পেয়ে গিয়েছিল। কলসী কাত করে কানায় হাত দিয়ে জল খেলাম। তারপর মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে অমর বলল—এসো, এইবারে গল্প করি।

অন্ধকারের ভেতর থেকে তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে লাগল। কত গল্প সে শোনাল সারারাত ধরে। তেমন কথা আমি কারও কাছে কখনও শুনিনি। সাধারণ ডাল-ভাত খাওয়া জীবনের কথা নয়, যেন অচেনা ভাষায় অচেনা সুরে অদ্ভুত গান শোনাচ্ছে কেউ। আকাশ আর নক্ষত্রের গল্প, সমুদ্রের ঢেউয়ের গল্প, আগুন-বাতাস-পাহাড়-মাটির গল্প। সে। আমি তোমাদের ভাষা দিয়ে ঠিক বোঝাতে পারব না। সৃষ্টির আদিম গল্প সে, আমাদের প্রত্যেকদিনের জীবনে তার কোনও প্রতিচ্ছবি হয় না। সেই রাতের কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। কথা বলতে বলতেই অমরজীবন হঠাৎ বলল–তোমার ছোট ঠাকুর্দা গৃহত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন, না? উনি এখনো বেঁচে আছেন।

আশ্চর্য তো! কী করে সে কথা জানলো এই লোকটা? কিন্তু তখন আমার এত ঘুম পেয়েছে যে, যথেষ্ট অবাকও হতে পারলাম না।

তখন রাত বোধহয় তিনটে পেরিয়ে গিয়েছে, অমর বলল—না, আর কথা না। এবার তুমি ঘুমোও। বাড়ি চলে যেও কিন্তু। কালকেই। তোমার ভালর জন্যই বলছি।

আমার চোখে ঘুম জড়িয়ে এসেছে। বললাম—আপনিও চলুন না আমার সঙ্গে। যাবেন?

—না, এবার না। এবার থাক। তবে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে আমার।

আমার কানে যেন কে নিদুলির মন্ত্র পড়ে দিয়েছে। আর তাকাতেই পারছি না। ঘুম-ঘুম।

যখন ঘুম ভাঙল তখন রোদুর উঠে গিয়েছে। গতকাল রাত্তিরের মেঘ-বৃষ্টির চিহ্ন নেই কোথাও, ঝকঝক করছে দিনের আলো।

পাশে অমরজীবন নেই। তার ঝোলাঝুলিসহ কখন সে চলে গিয়েছে কে জানে।

কাল সন্ধেবেলা দেখা সেই পুরোহিত এসে মন্দিরের দরজা খুলে সকালের পুজোর উদ্যোগ করছে। আমার দিকে আড়ে আড়ে তাকাল কবার। জিজ্ঞাসা করলাম—আচ্ছা, এখানে যে আর একজন পরশু থেকে ছিলেন, তিনি চলে গিয়েছেন?

সে বলল—কে ছিলেন?

—একজন যাত্রী। আমার আগে থেকেই তো ছিলেন—

–দেখিনি। খেয়াল করিনি। অমন কত লোক যাচ্ছে আসছে—

লোকটি শুধু নীরস নয়—নিরুৎসুক, নিরুদ্বেগ এবং সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ।

যাই হোক, অমরজীবন লোকটিকে আমার খুবই অদ্ভুত লেগেছিল, তার কথা অমান্য করতে মন চাইল না। সেদিনই রওনা হলাম বাড়ির দিকে। বাড়ি পৌঁছনোর পর প্রতিবারের মতই প্রথমে বাবার বকাঝকা, তারপরে মায়ের কান্নাকাটি, এবং তারও পরে আত্মীয়স্বজনের আবেগের বন্যা সহ্য করতে হ’ল। দুপুরে খেতে বসে বাবা বললেন—গত পরশুদিনই সরসী চাটুজ্জের আড্ডায় তোমার কথা হচ্ছিল। আমার যে একটা এমন বাড়িপালানো হাড়জ্বালানো ছেলে হবে সে কথা অনেক আগেই একজন বলে দিয়েছিল—

বললাম–কে? কোনও জ্যোতিষী?

—না। এমনিই একজন পথিক। আমার ছোটবেলায় একদিনের জন্য আমাদের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিল। তার নাম অমর, অমরজীবন। সেই গল্পই হচ্ছিল সরসী চাটুজ্জের বাড়ি

চমকে উঠে বললাম—অমর! অমরজীবন!

বাবা বললেন—হ্যা! চমকে উঠলে কেন?

—না, কিছু না। গল্পটা বরং বলুন, শুনি—

খেয়ে উঠে গড়গড়ায় তামাক খেতে খেতে বাবা বলতে শুরু করলেন।

নিজের বাবার কাহিনী লেখকের বর্ণনার ভঙ্গিতে বলে গেল তারানাথ। তারপর থেমে একটু দম নিয়ে বলল—এই ব্যাপারটার সবচেয়ে বিচিত্র দিক কোনটা জানো? যে লোককে চল্লিশ বছর আগে বাবা পঁয়তাল্লিশ বছরের দেখেছিলেন, তাকে এতকাল পরে আমিও সেই বয়েসে দেখলাম কী করে?

ছোট ঠাকুর্দার খবরটা বাবাকে জানাবো ভেবেছিলাম, দেখলাম অমরজীবন মারফৎ সেটা তিনি আগেই জানেন।

পরদিন বুঝলাম কেন অমরজীবন বাড়ি চলে আসতে বলেছিল। পরদিন থেকে আমার এল প্রবল জ্বর। প্রায় দেড়মাস ভুগে সেরে উঠলাম। পথে থাকলে প্রাণসংশয় হত সন্দেহ নেই।

০৫. পাসিং শো ধরাবার জন্য

পাসিং শো ধরাবার জন্য তারানাথ থামল।

বাইরে সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। মন্টু লেনের একটু ভেতরদিকে তারানাথের বাড়ি, এখান থেকে বড়রাস্তার কোলাহল আর গাড়িঘোড়ার শব্দ খুব আবছাভাবে শোনা যায়। কলকাতার পুরনো গৃহস্থপাড়ায় দিনাবসানের একটা আলাদা মেজাজ আছে, কলকাতার বনেদি বাসিন্দারা সেটা টের পায়। তারানাথের বাড়িতে বসে এ ব্যাপারটা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারা যায়।

তারানাথ বলল-আর একটু চা বলি, কি বল?

কিশোরী বলল বেশ তো, বলুন। ততক্ষণে আমি বরং গলির মোড় থেকে গরম তেলেভাজা নিয়ে আসি। তেলেভাজা আর চা একসঙ্গে না হলে আবার আড্ডা কী?

–আরে না না, কেন আবার ওসব ঝামেলা—

তারানাথের আপত্তিতে কর্ণপাত না করে কিশোরী বেরিয়ে গেল। একটু বাদেই সে ফিরে এল হাতে বেশ বড় মাপের এক শালপাতার চাঙাড়ি নিয়ে।

-কী হে! এতসব কী এনেছ?

তারানাথের সামনে চাঙাড়ি নামিয়ে কিশোরী বলল—একেবারে সদ্যভাজা বেগুনী, ঝালবড়া আর মোচার চপ। কিছু আমাদের জন্য রেখে বাকি ভেতরে পাঠিয়ে দিন

চারি চা নিয়ে এল। আমরা বেগুনীতে কামড় দিয়ে গল্পের আশায় উৎসুকভাবে তারানাথের দিকে তাকালাম। হাত দেখা বা কোষ্ঠীবিচার জানি না, কাজেই তারানাথ কত বড় জ্যোতিষী বোঝবার ক্ষমতা আমাদের নেই। যে গল্প সে আমাদের শোনায় তার সত্যাসত্য বিচারও দুঃসাধ্য, কিন্তু একটা কথা স্বীকার করতেই হবে—গল্প বলে মানুষকে মুগ্ধ করে রাখার ক্ষমতায় তারানাথ অদ্বিতীয়। বাড়ির বাইরে জ্যোতিষ কার্যালয়ের সাইনবোের্ডটা বিবর্ণ হয়ে ঝুলে পড়েছে, পুরনো কয়েকজন বাঁধা খদ্দের ছাড়া আজকাল ভাগ্যগণনায় আগ্রহী নতুন লোক বড় একটা ভিড় করে না। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে তারানাথের ব্যবসায় ভয়ানক মন্দা চলেছে। তাতে তারানাথের বিশেষ উদ্বিগ্নতা কিছু নেই, আর আমাদের তো ভালই হয়েছে। একদিন তারানাথ নিজেই বলল-বরাকর নদীর ধারে বালির চড়ায় পোড়া শোলমাছের নৈবেদ্য দিয়ে মধুসুন্দরী দেবীকে অর্ঘ্য দিয়েছিলাম, সে গল্প তত তোমাদের বলেছি। সেই রাত্তিরেই নদীর ধারের শালবনে স্নান অপার্থিব জ্যোৎস্নায় দেবী আবির্ভূত হলেন। সেই অলৌকিক সৌন্দর্য মানবীর হয় না, সেই ভালবাসা পৃথিবীর নারীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রায় এক বছর ধরে বরাকর নদীতীরের শালবন আমার তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠল। রোজ রাত্তিরে দেবী দেখা দিতেন। আমি চরিত্রের দিক দিয়ে শুকদেব নই, কামনা-বাসনাহীন ঋষিও নই। কাজেই মহাডামরতন্ত্রে মাতৃরূপে বা কন্যারূপে যে দেবীদের পাওয়া যেতে পারে তাদের জন্য সাধনা করিনি। গুরু বলেছিলেন কন্যারূপে কনকবতী দেবীর আরাধনা করতে। আমার সে পরামর্শ মনঃপূত হয়নি। মধুসুন্দরী দেবীকে প্রেমিকা হিসেবে পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু–

তারানাথ একটু থামল।

জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু কী?

আমরা সাধারণ মানুষ রে ভাই, প্রেমিকা হিসেবে দেবীকে সামলানো কি আমাদের পোষায়? মানুষ-বৌ নিয়েই জেরবার হতে হয়। কিন্তু এটা ঠিক, সাধকের জীবনকে দেবী স্বর্গীয় প্রেমসুধায় পূর্ণ করে দেন—

কিশোরী বলল—স্বর্গীয় বলছেন, এঁরা কি স্বর্গের দেবী?

–না। একেবারেই না। মহাডামরের এক বিভাগ হচ্ছে ভূতডামর। ভূতডামরে এইসব জীবেদের উল্লেখ আছে। এরা মানুষও নয়, আবার সাধারণ অর্থে প্রেতও নয়। দেবতা তো নয়ই। ভূত বলতে লোকে বোঝে পরলোকের অধিবাসী, মানুষ মরে যেখানে যায়। ভূতডামরে যাদের উল্লেখ রয়েছে, তারা মানুষ এবং তথাকথিত ভূতপ্রেতের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত জগতের বাসিন্দা। আজন্মকাল লালিত আমাদের শুভ ও অশুভের বোধ, মঙ্গলের ধারণা, ন্যায়-অন্যায়, পবিত্রতা–কিছুই সেখানে খাটে না। আজ যে দেবীর মহিমা নিয়ে আমাকে সেবা ও প্রেমে ধন্য করছে, মন্ত্র ও সাধনায় সামান্য ত্রুটি হলে পিশাচীর মত সে আমাকে ধ্বংস করবে। এদের প্রেমও চরম, প্রতিহিংসাও চরম।

বললাম—প্রতিহিংসা কীসের? সাধক তো কোনো অন্যায় করেনি–

–করেছে বইকি। তোমাকে যদি কেউ তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে খাটিয়ে নেয় তাহলে কি তোমার খুব ভাল লাগবে? তেমনি বিপুল ক্ষমতাশালী ডামরীদের তুমি মন্ত্রের বাঁধনে আটকে তোমার ইচ্ছেমত কাজ করাচ্ছ, এতে কি তারা খুশি হচ্ছে? তা নয়। কিন্তু অসহায়ের মত তারা তোমার ক্রীতদাস হয়ে আছে। আত্মরক্ষার বর্মে এতটুকু ছিদ্র পেলে তারা তোমাকে নির্মমভাবে হত্যা করবে। আমি নিজে দেখেছি—

তারানাথ যেন একটু শিউরে উঠে থেমে গেল।

কিশোরী জিজ্ঞেস করল-কী দেখেছেন?

—অসাবধানী সাধকের মর্মান্তিক পরিণতি। মাথাটা মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল—

বিষয়টি মুখরোচক নয়। আগ্রহ হলেও আর কোনো প্রশ্ন করলাম না।

তারানাথ বলল-বাড়ির লোক খবর পেয়ে আমাকে গিয়ে ধরে আনে। তখন আমার পাগলের মত দশা। কত মাস চুল-দাড়ি কাটিনি, বড় বড় নখ, শতছিন্ন জামাকাপড়, গায়ে ময়লা। বাড়ি ফিরে আসবার আগের রাত্তিরে শেষবারের মত দেবী আমাকে দেখা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন—কিছু শক্তি তোমাকে দিলাম। যদি বুঝে ব্যবহার করতে পার তাহলে জীবনে অন্তত ভাত-কাপড়ের অভাব হবে না। আমার সঙ্গে আর দেখা না হওয়াই সম্ভব, যদি না–

কীভাবে দেখা হতে পারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। দেবী উত্তর দেননি।

যাই হোক, আমার সাংসারিক অবস্থা তো দেখছ। কিন্তু দেবীর আশীর্বাদে একরকম করে চয়ে যায়। বড়লোক হতে পারিনি, কিন্তু ভিক্ষেও করতে হয়নি।

কিশোরী বলল–আমাদের সঙ্গে আলাপ হওয়ার প্রথমদিকে আপনি বীরভূমের শ্মশানবাসিনী মাতু পাগলীর কাহিনী বলেছিলেন। তার সঙ্গেও পরে আর দেখা হয়নি?

তারানাথ বলল—না। তবে আমার মনে হয় মাতু পাগলী, তন্ত্রে উল্লিখিত ডামরী, মধুসুন্দরী দেবী—এঁরা সব আসলে একই শক্তির বিভিন্ন প্রকাশ। মাতু পাগলী ছেড়া কাপড় পরে গ্রামের শ্মশানে বসে থাকত বটে, কিন্তু সে বিশাল শক্তির অধিকারিণী ছিল। এখন আমার মনে হয় সে মানুষ ছিল না। আমার খুব সৌভাগ্য তাই তার দেখা পেয়েছিলাম।

বললাম—মানুষ ছিল না বলছেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মত হাটে-মাঠে পড়ে থাকত কেন?

–মাতু পাগলী যে পর্যায়ে উঠেছিল, সেখানে পৌঁছলে পার্থিব সুখৈশ্বর্য তুচ্ছ হয়ে যায়। শ্মশানে থাকলেও যা, রাজপ্রাসাদে থাকলেও তাই। সেসময় একটা গুজব শুনেছিলাম লোকের মুখে, তখন বিশ্বাস করিনি। শুনেছিলাম মাতু পাগলী নাকি আহার্য বা পানীয় গ্রহণ করে না। পরে ভেবে দেখেছি, সত্যিই তো, এক একদিন সকাল থেকে গভীর রাত্তির পর্যন্ত তার সঙ্গে কাটিয়েছি, কখনও তার সামান্য জলও খেতে দেখিনি। ছায়াটা অবশ্য খেয়াল করিনি, তখন জানতামও না–

কিশোরী বলল—ছায়া খেয়াল করা কী রকম?

—গ্রামাঞ্চলে প্রবাদ আছে জানো তো, প্রেত-পিশাচের নাকি ছায়া পড়ে না। কথাটা আংশিক সত্য, পুরোটা নয়। তাদেরও ছায়া পড়ে ঠিকই, কিন্তু গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ ছায়া পড়ে না। একটু জলমেশানো ভেজাল ছায়া পড়ে। অভিজ্ঞ সাধক দেখলে বুঝতে পারে।

ভেজাল ছায়া! কতরকম অদ্ভুত কথাই যে শুনলাম তারানাথের কাছে!

তারানাথ অনেকসময় মানুষের মুখ দেখে নির্ভুলভাবে মনের কথা আন্দাজ করে ফেলে। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল—বিশ্বাস করা কঠিন, না? ভাবছ, এ বুড়ো কীসব আবোলতাবোল বকে আসর জমাবার চেষ্টা করে। ব্যাপার অত সোজা নয়। দেবীর দয়ায় আর গুরুর আশীর্বাদে কিছু গুণ লাভ করেছিলাম, এসব তারই প্রকাশ। বলেছি বোধহয় তোমাদের-আমার তন্ত্ৰদীক্ষা হয়েছিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময়ে। গলায় পদ্মবীজের মালা পরে গুরু যখন বিরজা হোমের পূর্ণাহুতি দিলেন, তখন আকাশে গ্রহণগ্রস্ত সূর্য তাম্রাভ চাকার মত বিবর্ণ আর স্নান দেখাচ্ছে। গুরুই বলেছিলেন—খুব শুভযোগে তোমার দীক্ষা হল। অনেক ক্ষমতা লাভ করবে তুমি–

বললাম-বিরজা হোম কী?

—সংসার ত্যাগ করে তবে সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করতে হয়। দীক্ষার পরমুহূর্ত থেকে সাধকের আর কোনও সামাজিক পরিচয় থাকে না। এমন কী, বাবা-মায়ের শ্রাদ্ধ করার অধিকার থেকেও সে বিচ্যুত হয়। দীক্ষার সময় যে বিশেষ যজ্ঞের মাধ্যমে নিজের শ্রাদ্ধ করতে হয়, তারই নাম বিরজা হোম।

বললাম—নিজের শ্রাদ্ধ করার সময় আপনার মন খারাপ হয়নি?

—খুব সামান্য। সাধনার জন্য যত ব্যগ্রই হওয়া যাক না কেন, ওটুকু মানুষী দুর্বলতা থেকেই যায়। সমাজ ও সংসারের প্রতি স্বাভাবিক যে টান। শ্রাদ্ধের চেয়ে বেশি খারাপ লেগেছিল পৈতেটা ত্যাগ করতে। সেই সময়টায় বুঝেছিলাম আজন্মলালিত বিশ্বাস ও সংস্কার কতখানি গভীরে শেকড় গেড়ে থাকে।

—পৈতে কেন ত্যাগ করতে হয়?

—বিরজা হোমের পরে তুমি আর কারও সন্তান নও, তোমার কোনও সামাজিক সম্প্রদায় নেই। তুমি ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় শূদ্র কিছুই নও। তুমি কেবল একজন সাধক। পৈতে থাকলে বর্ণশ্রেষ্ঠ হিসেবে তোমার অহংবোধ জন্মায়। সাধনার ক্ষেত্রে তা অমার্জনীয়।

বললাম—এখন তো আপনি পৈতে ধারণ করে আছেন। কেন?

তারানাথ হেসে বলল—আবার গৃহাশ্রমে ফিরে এসেছি, সেও তো বেশ অনেক বছর হয়ে গেল। মনে মনে গুরুর কাছে ক্ষমা চেয়ে পিছিয়ে এলাম। দেখলাম ভেতরে ভেতরে আমার ভোগবাসনা আর সংসার করার কামনা পুরোপুরি রয়ে গিয়েছে। দুই নৌকোয় পা দিয়ে চলা যায় না। দেখলাম ফিরে আসাই ভাল–

—কবে আবার পৈতে নিলেন?

—সেটা বেশ একটা আশ্চর্য ঘটনা। শুনবে?

বলে কী তারানাথ জ্যোতিষী! গল্প শোনার লোভেই তো ছুটির দিনে তার কাছে এসে বসে থাকি। বললাম—অবশ্যই শুনবো। বলুন—

একটা পাসিং শো ধরিয়ে দেশলাইয়ের কাঠিটা ছাইদানি হিসেবে রাখা নারকেলের মালায় গুঁজে দিতে দিতে তারানাথ বলল—এতসব অদ্ভুত ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে যে, ভাবলে আমার নিজেরই অবাক লাগে। আর তোমরা তো নিশ্চয় ভাবো লোকটা নির্বিকার মুখে মিথ্যে গল্প বানিয়ে বলে। তোমাদের দোষ দেওয়া যায় না, এসব কাণ্ড বিশ্বাস করা প্রকৃতপক্ষেই কঠিন।

তারানাথ খুব একটা বাজে কথা বলে নি। অদ্ভুত গল্পের নেশায় তার কাছে ছুটে আসি, যতক্ষণ সে গল্প বলে ততক্ষণ মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনেও যাই, কোনও বিরুদ্ধ যুক্তি মনে উঁকি দেয় না। কিন্তু তার সান্নিধ্যের প্রবলতা থেকে মুক্তি পেয়ে গল্পের শেষে মন্টু লেনের বাইরে এসে কলকাতার কঠিন ফুটপাথে পা দিলেই বিশ্বাস একটু একটু করে ক্ষইতে শুরু করে। মুগ্ধতা থাকে, বিশ্বাসটা থাকে না। তবু পরের সপ্তাহে আবার যাই। গল্পের এমনই নেশা।

তারানাথ বলল—এ ঘটনা আমার প্রথম জীবনের। আজ থেকে প্রায় তিরিশ কি পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা। দীক্ষা নিয়েছি তা আট-দশ বছর হয়ে গেল, কিন্তু মনের ভেতর কোনও প্রসন্নতা অনুভব করি না। গুরুর প্রদর্শিত পথে সাধনা করবার চেষ্টা করি, আর হাটে-মাঠে ঘুরে বেড়াই।

এমনি ঘুরতে ঘুরতে একদিন দুপুরের কিছু পরে ক্লান্ত হয়ে একটা নদীর ধারে কঁকড়া এক বটগাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলাম। জায়গাটা ভারি শান্তিপূর্ণ, নদী বয়ে যাচ্ছে সামনে, মাথার ওপরে নানা ধরনের পাখির বিচিত্র ডাক। একটু বিশ্রাম করে নদীতে নেমে হাতমুখ ধুয়ে জল খেয়ে ঠাণ্ডা হলাম। এখনও বেশ রোদ, কিছুক্ষণ গাছের ছায়ায় শুয়ে থেকে তারপর পথ হাঁটলেই হবে। নদী থেকে উঠে এসে গাছের একটা শেকড়ে মাথা দিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়লাম। ভবঘুরে জীবনের এই একটা সুন্দর দিক—কোনও দায়দায়িত্ব কিচ্ছু নেই, মুক্ত আনন্দে ঘুরে বেড়াও, ইচ্ছে হলে কোথাও দু-দিন থাকো, ইচ্ছে না হলে আবার বেরিয়ে পড়ো পথে। ভারি আনন্দের জীবন, চমৎকার জীবন–

বললাম—তাহলে আর সংসারের এই বন্ধনের মধ্যে ফিরলেন কেন?

একটু চুপ করে থেকে তারানাথ বলল—আগেই তো বলেছি সত্যিকারের বড়মাপের সাধক হওয়ার যোগ্যতা আমার ছিল না। জগৎব্যাপারে বিশাল মুক্তির মধ্যে চিরতরে নিজেকে যুক্ত করতে গেলে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হয়। নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। তবু বলি, জীবনের ওই কটা বছর বড় আনন্দে, বড় শান্তিতে কাটিয়েছি।

ঠাণ্ডা ছায়ায় শুয়ে ঝিরঝিরে বাতাসে বোধহয় একটু ঘুম এসে গিয়েছিল। চটকা ভেঙে যেতে দেখলাম বেলা গড়িয়ে গিয়েছে, সূর্যাস্ত হতে আর খুব দেরি নেই। পথে শুনেছি আরও মাইল চারেক গেলে পড়বে জয়তলা গ্রাম। সেখানকার মুখুজ্যে জমিদাররা যাত্রীদের জন্য অতিথিশালা করে রেখেছেন। সেখানেই রাত্তিরটা থাকবো। এখনই হাঁটতে শুরু করা দরকার, কারণ চার মাইল যেতে কম সময় লাগবে না।

নদী বাঁদিকে রেখে চলেছি, সন্ধের পরে পরেই জয়তলা পৌঁছে যাব। হঠাৎই কেন যেন বাঁদিকে তাকালাম। তাকানোমাত্র এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল।

সূর্য দিগন্তরেখা প্রায় ছুঁয়েছে, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে ডুবে যাবে। সেই অস্তোন্মুখ রক্তবর্ণ সূর্যের গোলক ঘিরে একটা ঘোর কালো বৃত্ত! গতকালও এখান থেকে বারোতেরো মাইল দূরে একটা গ্রামের বাইরের মাঠে বসে সূর্যাস্ত দেখেছি। কই, এমন কিছু চোখে পড়েনি তো! কালো মেঘ বা বাতাসে হঠাৎ জমে ওঠা কালোরঙের ধুলো বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ একেবারে অন্যরকম। আকাশের গায়ে যেন একটা মোটা, চওড়া কালো অন্ধকারের গণ্ডী। অমঙ্গলের অগ্রদূত।

কিশোরী জিজ্ঞাসা করল-অমঙ্গলের অগ্রদূত বলছেন কেন? জিনিসটার তো প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাও থাকতে পারে–

-না, তা পারে না। আসলে তোমরা ব্যাপারটা দেখ নি, দেখলে বুঝতে পারতে। দেখতে পেতে না অবশ্য, ওটা কেবল আমার কাছেই দৃশ্যমান হয়েছিল। সেটাও একটা বড় প্রমাণ যে, এর স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হয় না–

—আর কেউ দেখতে পায়নি বুঝলেন কী করে?

–ওসব গ্রাম জায়গা, কেউ অমন অদ্ভুত কিছু দেখতে পেলে মুহূর্তে তা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ত। জয়তলা গ্রামের দিকে হাঁটছি, চাষীরা দিনের কাজ সেরে বাড়ির দিকে ফিরছে, রাখাল ছেলেরা গরুর পাল তাড়িয়ে গ্রামে যাচ্ছে। আমি ছাড়া তারা কেউই কিছু দেখতে পাচ্ছে না।

বললাম—আপনি ভয় পেলেন কেন? ওই কালো বৃত্তের মানে কী?

—ওর মানে আমার প্রতি কেউ তন্ত্রোক্ত অভিচার ক্রিয়া প্রয়োগ করেছে। কেউ আমার ভয়ঙ্কর ক্ষতি করতে চায়, পারলে প্রাণহানি করতে চায়। কিন্তু কে? কেন সে আমার ক্ষতি চায়? এসব জানবার জন্য ঠিক করলাম জয়তলা পৌঁছে একটু বেশি রাত্তিরে মনোদর্পণে বসব—

কিশোরী বলল—মনোদর্পণ আবার কী?

—তোমরা তো জান আমি চন্দ্রদর্শনে সিদ্ধ। বুড়ো আঙুল দিয়ে কান ও দুই তর্জনী দিয়ে চোখ টিপে ধরে মনোসংযোগ করে একটি মন্ত্র রোজ এক হাজারবার জপ করতে হয়। যেদিন সিদ্ধিলাভ হবে সেদিন দেখতে পাবে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, আর নিচে একটি গাছের তলায় দুজন পরী দাঁড়িয়ে। তুমি যা প্রশ্ন করবে পরীরা তার উত্তর দিয়ে দেবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তোমার অজানা কিছু থাকবে না। প্রশ্ন করার পরেই পরী, চাঁদ সব মিলিয়ে। গিয়ে সামনেটা বায়োস্কোপের পর্দার মত খালি হয়ে যাবে। তুমি যা জানতে চাও, তা সেই পর্দায় ছবির মত ফুটে উঠবে। একেই বলে মনোদর্পণ।

–বাঃ, এ তো ভাল মজা! এতে তো ইচ্ছে করলে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী আর ধনী মানুষ হওয়া যায়! আগামীকাল রেসের মাঠে কোন ঘোড়া জিতবে, কোন শেয়ারের কত দর থাকবে—এই জানলেই তো রাজা! তাছাড়া নিজের বিপদ-আপদ, মেয়ের বিয়ে—সবই তো পরীরা বলে দেবে। আপনি রোজ বসেন না কেন মনোদর্পণে?

তারানাথ হাসল। বলল—খুব বড় আর মূল্যবান প্রশ্ন করেছ। ঠিকই তো, সপ্তাহে একবার করে আসনে বসলেই আমার আর কোনও অভাব থাকবে না। আমার সাংসারিক অবস্থা তো দেখছই, প্রতিদিনের চিন্তা প্রতিদিন করতে হয়। তাহলে রাজা হবার এমন সহজ উপায় গ্রহণ করছি না কেন? না, তা করা যায় না। এইখানেই সাধকের পরীক্ষা। ক্ষমতা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে সংযম অভ্যেস না করলে ক্ষমতা চলে যায়। প্রথম জীবনে শক্তি পাবার দম্ভে এসব অনেক করেছি, পরে সচেতন হয়ে সাবধান হয়ে যাই। লোভ আর প্রকৃত সাধনা একসঙ্গে হয় না।

সন্ধের কিছু পরে পরেই জয়তলা গ্রামে পৌঁছলাম। মুখুজ্যেরা কোনও একসময়ে বর্ধিষ্ণু জমিদার ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তাদের অবস্থা ভাল নয়। বিশাল বাড়ি মেরামতির অভাবে জীর্ণ হয়ে এসেছে। কোথাও দেয়ালের পলস্তারা খসা, কোথাও কার্নিশে বটগাছের চারা। কিন্তু সব মিলিয়ে মানুষজনের আচরণে বনেদিয়ানার ছাপ। বারবাড়িতে দেউড়ির পাশে লম্বা কাছারিঘর, সন্ধের পর এখন আর সেখানে অন্য কর্মচারী কেউ নেই, কেবল সামনে লণ্ঠন নিয়ে প্রৌঢ় নায়েবমশাই বসে কী হিসেব দেখছেন। আমি গিয়ে দাঁড়াতে খেরো থেকে মুখ তুলে বললেন—কে? কী চাই?

নাম বললাম। রাত্তিরটুকু থাকতে চাই তাও জানালাম।

নায়েবমশাই বললেন—অতিথিশালায় ভাল ঘর দিয়ে দিচ্ছি। একটা সিধে দিচ্ছি, তাতে চাল ডাল আলু ঘি লবণ থাকবে। আর আধসের দুধ। সারারাত জ্বলবার মত তেলভরা লণ্ঠন দেওয়া হবে। রঘু–রঘু!

একজন কর্মচারী এসে দাঁড়াল। নায়েবমশাই বললেন—এই একজন অতিথি এসেছেন। এঁকে অতিথিশালায় নিয়ে যাও। পূবের ভাল ঘরটা দেবে।

রঘু আমাকে নিয়ে গিয়ে ঘর খুলে দিল। মাঝারি ঘর। একটা ন্যাড়া তক্তাপোষ আছে, তাতে বিছানাপত্র কিছু পাতা নেই। সে একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে, অন্যের ব্যবহার করা বিছানায় বা চাদরে আমার শুতে ভারি অস্বস্তি হয়। রঘু বলল-বারান্দায় কাঠের জ্বালের উনুন আছে ঠাকুরমশাই, আর ওইদিকের কোণের ঘরে চ্যালা করা শুকনো জ্বালানি কাঠ আছে, যত দরকার হয় নিয়ে নেবেন—

সিধে এসে গেল। রান্না করতে করতে এই প্রথম উপলব্ধি করলাম যে, বিপদ প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। বড় মাপের বিপদ। বললাম—কী করে বুঝলেন? কোনও অনুভূতি হল?

তারানাথ বলল—আমার লণ্ঠনের আলো ম্লান হয়ে কমে আসতে লাগল। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো বা তেল ভরে দিতে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু লণ্ঠন হাতে তুলে নাড়িয়ে দেখলাম—ভেতরে কলকল করে তেল নড়বার শব্দ হচ্ছে। বনেদি জমিদারবাড়ির কেতাদুরস্ত কর্মচারী, এমন ভুল করবে না। তাহলে?

একটা কেমন ভেজা-ভেজা, সোঁদা গন্ধ আসছে নাকে। চামচিকের নাদি-ভর্তি ঘর বহুদিন বন্ধ থাকার পর খুললে যেমন গন্ধ পাওয়া যায়। ভাল নয়, একেবারেই ভাল নয়। মনে মনে অপদেবতা তাড়াবার মন্ত্র পাঠ করতে লাগলাম—ওঁ বেতালাশ্চ পিশাচাশ্চ রাক্ষসাশ্চ সরীসৃপাঃ, অপসৰ্পন্তু তে সর্বে গৃহাদস্মাচ্ছিবাজ্ঞয়া।

আস্তে আস্তে আলো আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল, গন্ধটাও চলে গেল।

খাওয়া-দাওয়া করে অতিথিশালার বারান্দায় বসে একটা বিড়ি খেলাম। গ্রামাঞ্চলে সাড়ে-আটটা নটার মধ্যেই নিযুতি রাত হয়ে পড়ে। কোথাও মানুষজনের কোনও সাড়া নেই, কেবল দূরে কতগুলো কুকুর ডাকছে। পথ হেঁটে আমিও ক্লান্ত। কিন্তু ঘুমোলে তো চলবে না। এখন দেহবন্ধন করে আসনে বসে মনোদর্পণে দেখতে হবে কে আমার ক্ষতি করতে চায়—এবং কেন?

চন্দ্ৰদৰ্শন আমার এমন আয়ত্তে এসে গিয়েছিল যে, চোখের সামনে পূর্ণচন্দ্র আর দুই পরীদের আনতে দশ মিনিটও লাগল না। মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রশ্ন করতেই সামনে পরী, চাদ সব মুছে গিয়ে সাদা দেয়ালের মত শূন্যতা ফুটে উঠল। চৌকো সেই পর্দা থেকে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে একটা ভয়াবহ হিংস্র মুখ। মাঝখানে সিঁথি করা লম্বা কোঁকড়ানো চুল, কপালে তেল-সিঁদুরের ত্রিপুণ্ড্রক, গলায় রুদ্রাক্ষ আর হাড়ের মালা। খুব নিম্নমার্গের সাধক-মুখে সাধনার জ্যোতি নেই, রয়েছে ক্রোধ আর নিবিড় হিংসা। এদের উপকার করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু অপকার করার ক্ষমতা অসীম।

লোকটাকে খুব চেনা-চেনা মনে হচ্ছে! কোথায় দেখেছি একে?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল! পাঁচ-সাত বছর আগে সেই চড়ইটিপ গ্রাম! আমার বাল্যবন্ধু। বিরাজমোহনের সর্বনাশ করবার জন্য একজন কাপালিক শ্বেতবগলার পূজোর আয়োজন করেছিল। কাকের বাসার কাঠি দিয়ে, ঘোড়ার চর্বি দিয়ে যজ্ঞ করার নিয়ম। বিরাজের নাম লেখা একটা নিমপাতা যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিলেই একমাসের ভেতর উদ্দিষ্টের মৃত্যু। আমার হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা বানচাল হয়ে যায়। বিরাজের নিজের দাদাই সম্পত্তির লোভে ভাইয়ের প্রাণহানির জন্য কাপালিককে নিয়োগ করেছিল। পরে ব্যাপারটা খুব ভালভাবে মিটে যায়, দুই ভাইয়ে আবার মিলন হয়ে যায়। কিন্তু ব্যর্থ-মনস্কাম কাপালিক চলে যাবার সময় আমাকে বলে গিয়েছিল কাজটা ভাল করলে না। একজন সাধক কখনও অন্য সাধকের ক্রিয়ায় বাধা দেয় না। তা নিয়ম নয়। আজ হোক, দশ বছর পরে হোক, এর প্রতিফল তোমাকে পেতেই হবে। তৈরি থেকো—

আমি বলেছিলাম—আপনার সাধনা বা কৌলিক ক্রিয়াকর্মে বাধাদান করার কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না। কিন্তু আপনি তো সজ্ঞানে একজন নিরীহ মানুষের সর্বনাশ করার। জন্য অভিচার ক্রিয়ার আয়োজন করেছিলেন। এরকম প্রচেষ্টার কথা জানতে পারলে সর্বশক্তি দিয়ে তা নিবারণের ব্যবস্থা করতে বলেছেন আমার গুরু।

চোখে আগুন ফুটিয়ে সে বলল—বেশ, আমাকে মনে রেখো।

মনে রাখিনি, ভুলে গিয়েছিলাম। আজ মনোদর্পণে এতদিন পরে তাকে আবার দেখে চিনতে পারলাম।

একটু পরেই কাপালিকের চেহারা মিলিয়ে গেল সামনে থেকে। যাক, কী ব্যাপার জানতে পেরেছি। আগামী পরশু কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী, ওই দিন একটু আসনে বসে পূজা করব। কাপালিক বুঝতে পারবে কার সঙ্গে সে লাগতে এসেছে।

কিশোরী বলল—কেন, কী ক্রিয়া করবেন আপনি? ও বীজমন্ত্র ছাড়া প্রকরণ বলছি, শুনে রাখো। কালো ছাগল, ঘোড়ার খুড়ের কাছের ললাম, কালো মুরগি আর কাকের চারটে করে পালক আগুনে পুড়িয়ে, তিসির তেলে গুলে বাঁহাতের কড়ে আঙুল দিয়ে কপালে তিলক লাগিয়ে পূজার আসনে বসলে যে আমার ক্ষতি করতে চাইছে তার সব কাজ ব্যর্থ হবে। লোকটা মারা পড়বে না ঠিকই, কিন্তু দেহে ও মনে বিরাট ধাক্কা খাবে।

–বীজমন্ত্রটি কী?

তারানাথ কিশোরীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর বলল—গল্প শোনো, গল্প শোনো—

ঘরে এসে তক্তাপোষে শুলাম। মেঝেতে লণ্ঠনটা কমিয়ে রাখা আছে। নরম, মৃদু আলোয় আবছা আবছা সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। পথ হেঁটে ক্লান্ত ছিলাম, একটু বাদেই ঘুম এসে গেল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, হঠাৎ চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখি ঘরের ভেতরে নিকষ অন্ধকার। এটা কেমন হল? লণ্ঠনে যথেষ্ট তেল আছে, সে তো আমি নিজেই দেখে নিয়েছি। যাক, নেমে জ্বালিয়ে নিচ্ছি।

কিন্তু ঘরের মধ্যে এমন দমবন্ধ করা ভ্যাপসা ভাব কেন? সবকটা জানালা কে বন্ধ করে দিল? জানালা তো ভোলাই ছিল! এই ধরনের উপদ্রব দূর করার সহজ উপায় আর মন্ত্রগুলো অকস্মাৎ কিছুই মনে আসছে না। আলো জ্বাললে মনের জোর ফিরে পাব—আন্দাজে আন্দাজে মেঝেতে নেমে লণ্ঠন আর দেশলাই খুঁজতে গেলাম, কোথাও খুঁজে পেলাম না। তক্তাপোষ থেকে হাত তিন-চার দূরে দরজার পাশে লণ্ঠনটা ছিল। দরজাটাই বা কোথায়? দেয়ালে হাত দিয়ে সমস্ত ঘরটা একবার পাক দিলাম। জানালা বা দরজা কিছুই হাতে ঠেকলো না!

এ আবার কী! আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে! এই অন্ধকূপে কীভাবে বন্দী হলাম আমি? এই কি তাহলে শেষ?

মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা বলতেন-দেখ, চক্কোত্তি বামুনের ছেলে। যেখানে যাও, যা করো, পৈতেটা শরীরে রেখো। ভয় পেলে বা বিপদে পড়লে পৈতে আঙুলে জড়িয়ে গায়ত্রী জপ করতে আরম্ভ করবে। অন্ততঃ প্রাণটা রক্ষা পাবে।

অভ্যাসবশত পৈতে খুঁজতে আরম্ভ করে মনে পড়ল—পৈতে তো সেই কবেই বিরজা হোমের কুণ্ডে বিসর্জন দিয়েছি। হায়! এখন কী হবে?

অন্ধকারের ভেতরেই ঘরের ছাদের কাছ থেকে কী যেন একটা নরম, হাল্কা জিনিস আমার মাথায় পড়ে মেঝের দিকে গড়িয়ে গেল।

প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। তারপর মনে হল টিকটিকি বা ওইরকম কিছু হবে। পা দিয়ে সরিয়ে দিতে গিয়ে পায়ে ঠেকলো দেশলাইটা। ভাল মজা! এতক্ষণ কিছুতেই পেলাম না, এখন আপনা-আপনি ফিরে এল। দেশলাই জ্বালতেই দেখলাম ঘরের জানালা-দরজা সব যথাস্থানে আছে। আর–

আর পায়ের কাছে মেঝেতে পড়ে রয়েছে একটি সদ্য তৈরি গ্রন্থি দেওয়া পৈতে!

হয়ত গুরু পাঠিয়েছেন আমার বিপদ দেখে। অথবা বাবার আত্মা বুঝতে পেরেছে সন্তানের প্রাণসংশয়, তাই—

যাই হোক, তৎক্ষণাৎ পৈতেটা ধারণ করে গায়ত্রী জপ করতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম জানালা দুটোই খোলা ছিল, এখন তা দিয়ে মিগ্ধ, শীতল বাতাস আসছে। ঘরের ভ্যাপসা আর দমবন্ধ ভাবটা আর নেই।

জানি না কৌলিক প্রথায় আঘাত করেছি কিনা, কিন্তু সেই থেকে পৈতেটা আর ছাড়িনি। বরাবর ধারণ করে আছি।

০৬. অতিথিশালার পরিচারক রঘু

পরের দিন সকালে অতিথিশালার পরিচারক রঘু এসে ছোট বেতের ধামায় করে চিড়ে আর নারকেল জলখাবার দিয়ে গেল। বাঃ, বেশ নিয়ম তো এদের। অতিথির স্বাচ্ছন্দ্যের। জন্য সর্বদাই ব্যস্ত। বনেদিয়ানা একেই বলে।

জলখাবার খাচ্ছি, এমনসময় রঘু আবার এসে বলল—ঠাকুরমশাই, আপনি কি আজও নিরামিষ খাবেন? কাল রাত্তিরে হঠাৎ কোনও ব্যবস্থা করে ওঠা যায়নি, যদি আমিষ আহারে আপত্তি না থাকে তাহলে তার ব্যবস্থা দেখি—

হেসে বললাম—আপত্তি আর কী, আমি কি বোষ্টম যে মাছ-মাংস খাব না? কিন্তু ওসব করার দরকার নেই, আমি আজ চলে যাব–

অবাক হয়ে রঘু বলল—চলে যাবেন! কেন?

—যেতে তো হবে, তাই না? অতিথি কি চিরদিন থাকে?

মাথা চুলকে রঘু বলল—সে তো ঠিকই, ঠাকুরমশাই। তবে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনি জল খান, আমি নায়েবমশাইকে খবর দিচ্ছি—

একটু বাদেই নায়েবমশাই এসে হাজির হলেন। গোলগাল চেহারার মধ্যমাকৃতি মানুষটি। ভারি সজ্জন। হেসে বললেন—ঠাকুরমশাই নাকি আজ চলে যাওয়া স্থির করেছেন? কিন্তু তা তো হবার নয়–

বললাম—সে কী! আমি অতিথি, না বন্দী?

জিভ কেটে নায়েবমশাই বললেন—না না, অমন বলবেন না। বন্দী হতে যাবেন কেন? আসলে আপনি অতিথি হয়ে আছেন শুনে বড়কর্তা আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চেয়েছেন। কাল তো দেখা হয়নি–

—এ বাড়ির বড়কর্তা? জমিদারমশাই?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। খুব ভাল লোক। থেকেই যান আজকের দিনটা–

থেকে গেলাম। এক এক জায়গায় অতিথি হয়ে থাকতে মন্দ লাগে না। মুখুজ্যেদের বাড়িও তাই। বেশ শান্ত আর স্নিগ্ধ পরিবেশ, ভাঙা কার্নিশে পাখি উড়ে এসে বসছে, বাড়ির ভেতর থেকে উঁচু গলায় কথা বলার কোনও আওয়াজ আসছে না। সবচেয়ে বড় কথা, কর্মচারীরা প্রত্যেকে ভদ্র, কেতাদুরস্ত এবং মিষ্টভাষী। ভৃত্যকে দেখে প্রভুকে চিনতে পারা যায়।

কিছুক্ষণ বাদে রঘু এসে বলল—চলুন ঠাকুরমশাই, বড়কর্তা এসে কাছারির বারান্দায় বসেছেন।

তার সঙ্গে গিয়ে চার-পাঁচ ধাপ টানা লম্বা সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতেই বাড়ির কর্তাকে দেখতে পেলাম। দীর্ঘদেহী, ফর্সা মানুষ। উজ্জ্বল বড় বড় চোখ। কোঁকড়ানো চুলে মাঝখানে সিঁথি করা। পরনে তাঁতের ধুতি আর হাতকাটা বেনিয়ান। বয়েস বছর পঞ্চাশ কী বাহান্ন হবে। যাকে বলে সুপুরুষ। বারবার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। হেলান দেওয়া চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আলবোলায় তামাক খাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে সোজা হয়ে বসে হাতজোড় করে বললেন-নমস্কার, বসুন। কাল একটু অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম, আলাপ করা হয়ে ওঠেনি, তাই নায়েবমশাইকে বললাম—যান, নিয়ে আসুন ওঁকে, একটু গল্প করা যাক। আজ থাকছেন তো?

হেসে বললাম–রাজার হুকুম, মানতেই হবে।

জমিদারবাবুর নাম দেবদর্শন মুখোপাধ্যায়। নামটা কিছু আগে নায়েবমশাইয়ের কাছে জেনেছি। তিনি বললেন—তামাক চলে?

—তা চলে।

–ওরে, কে আছিস! ঠাকুরমশাইকে তামাক দিয়ে যা। চলতি তামাক দিবি না, আমার থেকে দে—

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—একনম্বর গয়ার অম্বুরি, খেয়ে দেখুন দিকি

কেমন লাগে—

যে তামাক এতক্ষণ উনি খাচ্ছিলেন সেটাই যদি একনম্বর গয়ার অম্বুরি হয়, তাহলে জিনিসটা নিঃসন্দেহে ভাল। গন্ধে চারদিক আমোদিত করেছে।

চাকর তামাক দিয়ে গেল। মৌজ করে টানতে শুরু করলাম।

দেবদর্শনবাবু বললেন—রাজার হুকুম শুনলে আজ হাসি পায় বটে, কিন্তু এককালে লোকে আমাদের রাজাই বলত। ভেঙে পড়ছে বটে, তবু বাড়িটা দেখলে হয়ত সেটা কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন। ঠাকুরদার আমল থেকে পতনের শুরু, আর আজ এই যা দেখছেন।

এসব কথার কোনও উত্তর হয় না। চুপ করে তামাক খেতে লাগলাম।

একটু পরে দেবদর্শনবাবু বললেন—প্রায় দেড়শো বছর আগে আমার পঞ্চম ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ জয়দর্শন মুখোপাধ্যায় এই গ্রামের প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামেই গ্রামের নাম। সে সময়ে আমাদের প্রতিপত্তি ভাবতেও পারবেন না ঠাকুরমশাই। জয়দর্শনের পিতা নবাবী আমলে উড়িষ্যায় কী একটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দেওয়ানী করে বিপুল ঐশ্বর্য সংগ্রহ করেছিলেন। নবাবের কাজ থেকে অবসর নিয়ে তিনি এই গ্রাম এবং কাছাকাছি অনেক ভূসম্পত্তি কেনেন। অনেক অর্থসম্পদ উপার্জন করলেও নবাবসরকারে চাকরি করার সময়ে তিনি অন্তরে অন্তরে দাসত্বের গ্লানি ভালই অনুভব করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, ভূসম্পত্তির অধিকারী না হলে সমাজে স্থায়ী মান্যতা লাভ করা যায় না। কিন্তু সম্পত্তি কিনে লোকবসতি গড়ে তোলবার আগেই তার মৃত্যু হয়। সে কাজ দক্ষতার সঙ্গে শেষ করেন জয়দর্শন। সবাই বলত—রাজা জয়দর্শন। প্রজারা তাঁকে ভয়ও যেমন করত, তেমনি ভালও বাসত। শুনেছি তাঁর আমলে জয়তলা এবং আশেপাশে কখনও ডাকাতি হয়নি। হলে ডাকাতদের রেহাই ছিল না। ধূমধাম করে মুখুজ্যেবাড়ির দুর্গোৎসব হত। বোধনের দিন থেকে বিজয়ার রাত্তির পর্যন্ত গ্রামের কারও বাড়িতে উনুনে আঁচ পড়ত না। জমিদারবাড়িতে সবার নেমন্তন্ন।

এইপর্যন্ত বলে মুখুজ্যেমশাই থামলেন। কী একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন-ভাল কথা, আপনার পাঁঠার মাংস চলে তো?

বললাম—খুব চলে। কালই নায়েবমশাইকে বলেছি—আমি মাছ-মাংস সবই খাই। আজ সকালেও রঘু জিজ্ঞেস করছিল

—সাহস করে একটা কথা বলব? কিছু মনে করবেন না তো?

অবাক হয়ে বললাম—ও কী কথা! নিশ্চয় বলবেন—

দেবদর্শনবাবু বললেন—আপনি কি স্বপাক ছাড়া আহার করেন না?

–করি বইকি, কেন করব না? আমার ওসব বাতিক নেই—

–তবে কাল নিজে কষ্ট করে রান্না করতে গেলেন কেন? অবশ্য সে আমাদেরই দোষ, অতিথিশালার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে সিধে দেওয়া হয়েছে। আপনি নিজে তো আর বলবেন না–আমিও কাল ব্যস্ত থাকায় আর-রঘু! এই রঘু!

রঘু এসে দাঁড়াতে মুখুজ্যেমশাই বললেন—শোনন, ঠাকুরমশাইকে আজ থেকে আর সিধে পাঠাবে না, উনি আমার সঙ্গে বাড়ির ভেতরে খাবেন। যাও, বাড়ির ভেতরে বলে এসো—আর হ্যাঁ, তামাক বদলে দাও।

একটু পরে রঘু এসে নতুন সাজা কলকে বসিয়ে দিয়ে গেল। বার দুই আরামের টান দিয়ে দেবদর্শন বললেন—সূক্ষ্ম বিষয়বুদ্ধি না থাকলে কোনও ঐশ্বর্যই চিরস্থায়ী হয় না। জয়দর্শন এবং তাঁর পিতা শ্রম এবং বুদ্ধি দিয়ে যা গড়ে তুলেছিলেন, পরের দু-তিন পুরুষে তা সবই প্রায় গেল। সবচেয়ে বড় কারণ—একতার অভাব। সংসার বড় হতে লাগল, লাগাম কার হাতে থাকবে তা নিয়ে বিরোধ শুরু হল। ফলে অনিবার্যভাবে এতদিনের ঐতিহ্যপূর্ণ পরিবার টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যেতে লাগল। বর্তমানে এই গ্রাম ছাড়াও কত জায়গায় জয়তলার মুখুজ্যেরা ছড়িয়ে আছে। সন্তুষ্ট কেউই নয়, সকলেরই ধারণা সে তার ন্যায্য প্রাপ্যের চেয়ে কম পেয়েছে। আমি ঝগড়াঝাটি করিনি, কিন্তু বাপ-পিতামহের এই ভদ্রাসন দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছি। টাকা না পাই, স্মৃতি থাক।

চিরদিনই আমার গল্প শুনতে ভাল লাগে। আর ভাল লাগে এইরকম পড়ন্ত বনেদি বাড়ির পরিবেশ। এসব বাড়ির প্রতিটি ইঁটে, কার্নিশে বটগাছের চারায়, বারান্দার বাঁকে বাঁকে পুরনো দিনের গল্প মিশে আছে। কাদের যেন সব ফিসফাস কানাকানি, হঠাৎ আবো অন্ধকারে কে যেন কোথায় হেসে উঠল, মিলিয়ে আসা ধূপের গন্ধ পাক খায় আনাচে কানাচে।

দেবদর্শন আবার বলতে শুরু করলেন—আমাদের পরিবার শেষ বড় ধাক্কা খেল। আমার বাবার আমলে। ঠাকুর্দাকে বাবা দেবতার মত শ্রদ্ধা করতেন। ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর বাবা স্থির করলেন একটা অসাধারণ শ্রাদ্ধের আয়োজন করে সবাইকে দেখাবেন নিজের বাবাকে তিনি কতখানি ভালবাসতেন। খুবই ছেলেমানুষি সন্দেহ নেই, কিন্তু বাবা এটা করলেন সত্যি সত্যি ঠাকুর্দাকে ভালবেসে। তখনকার যুগে বড় বড় ধনী পরিবারে অন্নপ্রাশন বিয়ে শ্রাদ্ধ বা দুর্গোৎসব নিয়ে ভয়ানক রেষারেষি ছিল—কে কতটা জাঁকজমক বা খরচ করল সে ব্যাপারে প্রতিযোগিতা। বাবা কিন্তু এসব সামাজিক দলাদলি আর লোকদেখানো ভড়ং একদম পছন্দ করতেন না। আসলে তিনি এইভাবে ঠাকুর্দার স্বর্গস্থ আত্মাকে দেখাতে চাইলেন তার শ্রদ্ধা কতটা বিস্তৃত আর গভীর ছিল। আপনি পণ্ডিত মানুষ, কতরকম শ্রাদ্ধ হয় নিশ্চয় জানেন। সবচেয়ে অনাড়ম্বর হল তিলকাঞ্চন শ্রাদ্ধ, তারপর যোড়শোপচার, তারপর বৃষোৎসর্গ, তারপর দানসাগর। দানসাগরে গিয়েই সবাই থেমে যায়—মানে, ওইপর্যন্ত যারা পৌঁছতে পারে। কিন্তু এর চেয়েও বড়মাপের শ্রাদ্ধ আছে, তা হল—

বললাম—দ্বিজদম্পতি শ্রাদ্ধ।

দেবদর্শন একটু যেন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন—আপনি জানেন? অবশ্য আপনি তো জানবেনই। দ্বিজদম্পতি শ্রাদ্ধে তিলকাঞ্চন থেকে দানসাগর পর্যন্ত সবই করতে হয়। তারপর আমন্ত্রণ করে আনা এক ব্রাহ্মণ যুবক আর এক কুমারী। ব্রাহ্মণ মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়, ওই মণ্ডপেই। তাদের ভূমিদান করতে হয়, মেয়ের গয়না, ছেলের যাবতীয় দাবির জিনিস দিতে হয়। তাদের ঘরবসত করিয়ে ভবিষ্যতের সমস্ত সংস্থান করে দিতে হয়। বুঝতে পারছেন কাণ্ডখানা? সমস্ত ক্রিয়ায় যা ব্যয় হয়, একজন ধনবান মানুষ সারাজীবনে তা উপার্জন করতে পারে না। আমার তখন খুব ছোটবেলা, বছর পাঁচেক বয়েস হবে। আবছা আবছা মনে করতে পারি দূর দূর গ্রাম থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে আসা ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের হাতে দানের জিনিস হিসেবে বাসনপত্র, শালদোশালা আর স্বর্ণ-রৌপ্যখণ্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে। দ্বিজদম্পতি হাসিমুখে বসে আছেন আসরে, উপস্থিত লোকজন তাদের সাক্ষাৎ বিষ্ণু আর লক্ষ্মীজ্ঞানে প্রণাম করছে। এই গ্রামেই তাদের বসত করানো হয়েছিল। তাদের দুজনের কেউই আজ আর জীবিত নেই। তবে তাদের সন্তানেরা আছে। দক্ষিণা হিসেবে পাওয়া সেই ভূসম্পত্তির উপস্বত্ব থেকে তাদের ভালভাবেই চলে। যায়। আমাকে তারা দাদা বলে ডাকে। নিকট

বললাম—আপনি ভাগ্যবান। এ জিনিস নিজের চোখে দেখেছেন।

—ঠিকই। শ্রাদ্ধ শেষ করে ভাটপাড়া থেকে আসা পুরোহিত বাবাকে বলেছিলেন—রামরূপ মিশ্রের ক্রিয়াকাণ্ডবারিধি বলে যে বিখ্যাত বই, তাতে দ্বিজদম্পতি। শ্রাদ্ধের উল্লেখ পেয়েছিলাম। পরে বাবার কাছে কাজটা শিখেছি। কিন্তু সে তো পুঁথিগত বিদ্যা। দেখলাম আর নিজের হাতে করলাম আজ প্রথম। বাংলাদেশে এ জিনিস আর কোথাও হয়েছে বলে শুনিনি।

থেমে গিয়ে দেবদর্শন আবার জোরে ডাকলেন—রঘু! এই রঘু!

রঘু তার প্রভুর কখন কী প্রয়োজন সব বুঝতে পারে এবং সেজন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকে। ডাক শোনামাত্র সে এসে কলকে বদলে দিয়ে গেল।

এবার তারানাথ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল—তোমরা ভাবছ, আবার কী করে পৈতে ধারণ শুরু করলাম, সে গল্প বলতে গিয়ে কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি। তা নয়, জীবনের সব কাহিনীই একটার সঙ্গে আর একটা জোড়া কোনও একটা বলতে শুরু করলে অন্যগুলোয় টান পড়ে। তাছাড়া বকবক করা বয়েস বাড়বার একটা লক্ষণ। আর বকব, না থামব?

সর্বনাশ! তারানাথ বলে কী! এই বকুনির লোভেই তো তার কাছে আসা। বললাম— বলতে থাকুন, বলতে থাকুন-তেমন হলে সারারাত বসে শুনব–

তারানাথ পরিতৃপ্ত মুখে নতুন পাসিং শো ধরাল। যে গল্প বলতে ভালবাসে এবং ভাল গল্প বলে, সে আগ্রহী শ্রোতা পেলে যেমন খুশি হয় তেমন আর কিছুতে নয়। সিগারেটে একটা গভীর টান দিয়ে সে আবার শুরু করল—পৈতে কী করে আবার ধারণ করলাম সে গল্প হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মুখুজ্যেবাড়ি থেকে চলে আসার আগে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল, সেটুকু বলে নিই। তোমরা ভাব তারানাথ গল্প বললেই বোধহয় কেবল কষ্ট, দুঃখ আর ভয়ের গল্প বলে। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। আমি জীবনের গল্প বলি, জীবন যেমন বিচিত্র উপলব্ধির মালা দিয়ে গাঁথা, আমার গল্পও তাই। কখনও মেঘ, কখনও বরাদুর।

গোটা দু-চার টান দিয়ে কলকে ঠিকমত চালু করে দেবদর্শনবাবু আবার বলতে শুরু করলেন—মোটামুটি এই আমাদের পরিবারের গল্প ঠাকুরমশাই। সাধারণ গল্প, বড় পরিবারের পতনের কাহিনী আপনি নিশ্চয় আগেও শুনেছেন। আমারও বিশেষ কোনও দুঃখ নেই, কারণ আমি লোভী মানুষ না। সামান্য যেটুকু আছে তাতে সম্মান বাঁচিয়ে হয়ত বাস করা যায়, কিন্তু তার বেশি কিছু না। অথচ আমার ইচ্ছে ছিল এই বাড়িটা একটু মেরামত করার। সে তো খুব কম পয়সায় হবার নয়, বুঝতেই পারছেন। এই হাতির মত বাড়ি। আমি চোখ বুজলে হয়ত পরিবারের কে কোথায় ছিটকে যাবে, যারা থাকবে তাদের পক্ষেও এতবড় বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে না। তবু এ আমার ভদ্রাসন, শৈশবের স্মৃতি দিয়ে জড়ানো বাড়ি। আমি থাকতে এ বাড়ি ভেঙে পড়ে যাবে?

মানুষটার দুঃখ আমি বুঝতে পারছিলাম। জগতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল পারিবারিক ঐতিহ্য আর পুরনো স্মৃতিকে ত্যাগ করা। বাস্তব দুনিয়ার নির্মম পেষণে সেটাও যখন স্বীকার করতে হয়, তখন সহৃদয়, সজ্জন মানুষের মুখের চেহারা বোধহয় দেবদর্শন মুখুজ্যের মত করুণ-বিধুর হয়ে আসে।

মুখুজ্জেমশাই বললেন—আপনাকে কেন থেকে যেতে বললাম জানেন? আমার ধারণা আপনার কৃপায় বোধহয় আমার সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে।

অবাক হয়ে বললাম—আমি? আমি কী ভাবে—

দেবদর্শন বললেন-আজ থেকে মাসখানেক আগে একজন পাগলামত ভবঘুরে অতিথি দিনদুয়েক অতিথিশালায় এসে ছিল। পাগলামত বলছি বটে, কিন্তু তার চেহারার ভেতর কী যেন একটা ছিল, যাতে তাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভালো বংশের সন্তানের মত হাবভাব, উজ্জ্বল চোখ। দোষের মধ্যে ঐ একটু মাঝেমাঝে অসংলগ্ন কথা বলা। সে বলেছিল আমাদের অতিথিশালায় কিছুদিনের মধ্যেই এমন একজন লোক আসবে যার মাধ্যমে আমাদের পরিবারের বর্তমান আর্থিক সমস্যা অনেকটা লাঘব হয়ে যাবে। আপনি সাধক মানুষ, ভাবলাম আপনিই যদি সেই লোক হন? মা আমার মনের মধ্যে তখন একটা মৃদু ঘণ্টার শব্দ বেজে উঠেছে। নৈঋত কোণে ঝড়ের মেঘের মত দ্রুত সেটা বিরাট অবয়ব নিতে লাগল। বললাম—অসংলগ্ন কথা বলত কী রকম? অসঙ্গত কিছু?

-না না, আদৌ তেমন নয়। আলোচনা করতে করতে হঠাৎ হয়ত এমন একটা কথা বলল যার কোনও মানেই হয় না। একটা ছড়া তো খুব বলত–

বললাম—কী ছড়া?

—সে থাক, সে শুনলে আপনি হাসবেন। পাগলের কাণ্ড–

—বলুন মুখুজ্যেমশাই, এর ওপরেই হয়ত আপনাদের পরিবারের ভাগ্য-পরিবর্তন নির্ভর করছে।

দেবদর্শন চমকে আমার দিকে তাকালেন, বললেন—আপনি তাই মনে করেন?

হতে পারে। বলুন আপনি—

দেবদর্শন বললেন—প্রথম যেদিন শুনি, সেদিন জিনিসটার কোনও গুরুত্ব দিইনি। সকালবেলা কাছারিতে বসে হিসেবপত্র দেখছি, এমনসময় লোকটি হঠাৎ এসে ঘরের। দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল–

দিকে দিকে সাগরেতে ভাই,
চোখে চোখে চাঁদ খুঁজে পাই।

আমি অবাক, নায়েবমশাই অবাক, গোমস্তা-মুহুরীরা অবাক! বলে কী লোকটা? পাগল নিশ্চয়, কিন্তু পাগলে কি গুছিয়ে ছড়া বলে?

যাই হোক, এরপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—এই অতিথিশালায়, এই বাড়িতে একজন আসবে শিগগীরই। সাধক মানুষ। তাকে এই ছড়া শুনিও। সে তোমার উপকার করবে–

এই ঘটনার পর আর একটা দিন সে আমাদের বাড়ি ছিল। ওই একটা দিন সে প্রায়ই ঘুরে ঘুরে আমার কাছে আসত আর বলত—মুখস্থ করে নাও, মুখস্থ করে নাও। খুব কাজে দেবে—

দেবদর্শন থামলেন। বললাম—এ লোকটির নাম কী? নাম বলেছিল?

মুখুজ্যেমশাই বললেন—বলেছিল। ব্রাহ্মণসন্তান। নাম অমরজীবন ভট্টাচার্য।

যতটা চমকানো উচিত ছিল ততটা চমকালাম না। আমি একরকম বুঝতেই পেরেছিলাম উনি এই নাম বলবেন।

কাছারিবাড়ির কার্নিশে বাসাবাঁধা পায়রার দল গলার মধ্যে কুমকুম শব্দ করছে। সুন্দর বেলাটা চড়েছে বাইরে। এ বাড়ির এখন কোনও বিপদ নেই সামনে, বরং এদের মঙ্গল হবে। শান্ত, পবিত্র পরিবেশে সেই আসন্ন মঙ্গলের প্রতিশ্রুতি। স্থানলক্ষণ বোঝবার শক্তি দিয়েছিলেন মধুসুন্দরী দেবী। তা এখনও নষ্ট হয়নি।

দেবদর্শন বললেন—ছড়াটার মানে কিছু বুঝলেন ঠাকুরমশাই?

বললাম—নাঃ, এখনও তো কিছু ধরতে পারছি না। দেখি আর একটু চিন্তা করে। তাছাড়া আমিই যে সেই লোক, যে আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় বলে দেবে, তাই বা জানছেন কী করে?

-না, তা ঠিক নয়, মানে

—আমি সে তোক না হলে আরও দিন-দুই থাকতে পাবো তো?

দেবদর্শন বিস্মিত মুখে বললেন—ওমা, সে কী কথা! নিশ্চয় থাকবেন। অতিথি নারায়ণ, কত সৌভাগ্য থাকলে তবে বাড়িতে অতিথি আসে—

মানুষটি স্বচ্ছ, বুকের ভেতরটা পর্যন্ত দেখা যায়।

জিজ্ঞাসা করলাম—আচ্ছা, এই লোকটি, মানে অমরজীবন—এর বয়েস কত বলে মনে হয়েছিল আপনার? খুব বুড়োমানুষ কি?

—না, একেবারেই নয়। কত আর হবে? এই—পঁয়ত্রিশ কী ছত্রিশ—

একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশই বটে।

পরের দিন সকালে মুখুজ্যেমশাইয়ের সঙ্গে বৈঠকখানায় বসে গল্প করছি, এমন সময় একজন প্রৌঢ় মানুষ ঘরে ঢুকে জীর্ণ ছাতাখানা দরজার কোণে ঠেসিয়ে রেখে বললেন–নমস্কার রাজাবাবু। এ বছর তো আমার খেলা সামনের মাসে। আজ একখানা টিকিট দিয়ে যাই? সোমবার বিলেতের মেলে কাগজপত্র সব পাঠিয়ে দেব। এদিকে তো আর আসা হবে না। আজই দিয়ে যাই?

দেবদর্শন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—বিলেতের ডার্বির টিকিট। পাবো কত সে আমিও জানি, আর এই ভূষণ রায়ও জানে। তবে বছরে একখানা কিনি, অভ্যেস আর কী। দাও হে, একখানাই দাও–

গোছা থেকে একটা টিকিট বের করে ধরেছেন দেবদর্শন।

আমি ঝুঁকে পড়ে বললাম একটু দাঁড়ান। দেখি, না-ওটা নয়, আপনি এটা নিন। গোছা থেকে অন্য একটা টিকিট বেছে দিলাম।

দেবদর্শন যেন কেমন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

০৭. বেশি ভাববার কিছু নেই

আমি হেসে বললাম–বেশি ভাববার কিছু নেই। নিলে এটাই নিন—

ভূষণ রায় স্পষ্টই কিঞ্চিৎ ইতঃস্তত করছেন, একবার আমার দিকে আর একবার মুখুজ্যেমশাইয়ের দিকে তাকাচ্ছেন। পুরনো আমলের জমিদার খদ্দের, আমার কথায় তো কেবল হবে না।

দেবদর্শন দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বললেন—ঠিক আছে, ঠাকুরমশাই যেখানা বলছেন সেখানাই দাও। নিজের পছন্দে তো অনেক দেখলাম, এবার ঠাকুরমশাইয়ের পছন্দের ফলটা দেখি–

ভূষণ রায় বললেন—তাহলে তাই দিই রাজাবাবু?।

–দাও।

গোছা থেকে টিকিটখানা ছিঁড়ে দেবদর্শনকে দিলেন ভূষণ রায়। কী একটা ফর্মে নাম ঠিকানা আর নো-ডি-প্লাম লিখে নিলেন। যে টিকিট কিনছে সে তার পছন্দ আর ইচ্ছেমত একটা সাঙ্কেতিক শব্দ ঠিক করে, সেটাকে বলে নো-ডি-প্লাম। এর ফলে কে পুরস্কারের প্রাপক তা নিয়ে কোনও সংশয় থাকে না। একই নামে একাধিক লোক থাকতে পারে, কিন্তু গোপনে নির্বাচন করা সাঙ্কেতিক শব্দ কখনও এক হবে না।

ভূষণ রায় বললেন—নোম্‌-ডি-প্লাম কী লিখব?

দেবদর্শন বললেন—ওটা লেখোইয়ে, গতবার যেন কী ছিল? মা কালী, না? এবার বরং লেখো—

আমি বললাম-অমরজীবন।

দেবদর্শন শুধু জন্মসূত্রে বনেদি এমন নয়, তার অত্বরিত, সংযত আচরণের মধ্যে দিয়ে একটা সহজ আভিজাত্য প্রকাশ পায়। আমার কথা শুনে তিনি অবাক হলেন ঠিকই, কিন্তু বাইরে তা কিছুই দেখালেন না। বললেন—ঠিক আছে, লেখো অমরজীবন—

ভূষণ রায় সবকিছু লিখে নিয়ে ফর্মখানা কাগজের দপ্তরের মধ্যে যথাস্থানে খুঁজে রাখলেন। বললেন–তাহলে আজ আসি রাজাবাবু? প্রণাম

-নমস্কার। রঘু, এই রঘু! যা, রায়মশাইকে নিয়ে কাছারিঘরে যা। খাজাঞ্চিকে আমার নাম করে বল ওঁর টিকিটের দামটা দিয়ে দিতে। আচ্ছা এসো

ভূষণ রায় চলে গেলে দেবদর্শন কিছুক্ষণ চুপ করে গড়গড়ার নলে টান দিলেন, তারপর বললেন—ঠাকুরমশাই, জানি কিছু প্রশ্ন আছে যা করতে নেই। তবু কিছুতেই কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পারছি না বলে মার্জনা করবেন। টিকিটটা বদলে দিলেন কেন?

বললাম-এর উত্তর দেওয়া মুশকিল। বিশেষ কোনও যে কারণ আছে এমন বলতে পারি না, তবে অমরজীবনের বলা ছড়াটা একটা ছোটখাটো কারণ হলেও হতে পারে

দেবদর্শন সোজা হয়ে বসে তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকালেন।

—আপনি কি ওই কবিতার মানে বুঝতে পেরেছেন?

—জানি না। বিলিতি লটারি খেলার ফল বেরুলে সেটা বোঝা যাবে। মুখুজ্যেমশাই, আপনি প্রবীণ এবং বুদ্ধিমান মানুষ, আপনাকে আগে থেকে মিথ্যা আশা দিয়ে ভোলাতে চাই না। একটা কিছু আন্দাজ করেই নিশ্চয় টিকিটটা বদলেছি। কিন্তু তা বলবার সময় এখনও আসেনি। ক খানিকক্ষণ কী ভেবে দেবদর্শন বললেন—ঠাকুরমশাই, আপনি কিছুদিন আমার কাছে থাকবেন তো? প্রয়োজনে কীভাবে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ হবে নইলে?

—সে নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। প্রয়োজন ঘটলে আমি নিজেই ঠিক যোগাযোগ করে নেব। আমি বেশিদিন কোথাও একজায়গায় থাকি না মুখুজ্যেমশাই, কিছু মনে করবেন না। বাড়িতেও মন বসেনি বলেই বেরিয়েছিলাম—

মুখুজ্যেমশাই সংযত ব্যক্তিত্বের মানুষ, এ নিয়ে বারবার অনুরোধ করে আমাকে বিব্রত করলেন না। আমার অন্য গল্প আরম্ভ করলাম। উনি আমার জীবনের অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনতে চাইলেন। তোমরা তো জানো, সেসব পুরোনো দিনের প্রসঙ্গ একবার উঠলে আর শেষ হতে চায় না। মানুষ আগ্রহ করে শোনে, আমারও বলতে ভাল লাগে। দুপুরে খাওয়ার সময় বাদ দিয়ে সেদিনটা পুরোই গল্পে গল্পে কেটে গেল। বৈষয়িক কাজকর্ম সেদিন আর কিছুই হল না। কাছারি থেকে আমলারা ডেকে ডেকে ফিরে গেল। একসময় দেবদর্শন নায়েবমশাইকে ডেকে বললেন—আজ আর কাছারিতে বসব না। কাল ঠাকুরমশাই চলে যাবেন, আজকের দিনটা ওঁর সঙ্গে একটু গল্প করে নিচ্ছি। আপনি আজ একাই চালিয়ে নিন, আর ওদের বলে দিন বারবার যেন ডেকে বিরক্ত না করে–

তোমরা ভাবছ একই কথা এতবার বলছি কেন, কিন্তু সত্যিই এমন চমৎকার আর হৃদয়বান, উদার অতিথিপরায়ণ মানুষ আমি কমই দেখেছি। বেশিদিন তো নয়, আজ থেকে বড় জোর পঁচিশ কী তিরিশ বছর আগেকার কথা। তবু মনে হয় যেন স্বপ্নের কাহিনী, এই তিরিশ বছরে পৃথিবী ততটাই বদলে গিয়েছে। বাংলার গ্রামে আজকাল আর সেই আতিথেয়তা পাবে না।

কিশোরী বলল—গ্রামের মানুষকে দোষ দিয়ে কী হবে? এই ভয়ানক যুগের কথা ভেবে দেখুন। আপনি যে সময়ের কথা বলছেন তখন সরু পাটনাই বালাম চালের দাম সাড়ে চার কী পাঁচ টাকা, সরষের তেল পাঁচআনা সের, খাঁটি দুধ টাকায় কুড়ি সের, বড় মাপের জোড়া ইলিশ ছ-আনা। এগুলোর দাম এখন কী দাঁড়িয়েছে ভেবে দেখুন। জনসংখ্যা বাড়ছে হু হু করে, মানুষ কি ইচ্ছে করলেও আগেকার দিনের মত অতিথিপরায়ণ হতে পারে?

তারানাথ হেসে বলল—এ যুক্তি আমি অনেক শুনেছি। বাজে যুক্তি—

কিশোরী একটু রেগে বলল—বাজে যুক্তি? কোনটায় ভুল বলেছি দেখান তো–

–উত্তেজিত হচ্ছ কেন? উত্তেজিত হওয়া তর্কে পরাজয়ের লক্ষণ।

—বেশ তো, আমার যুক্তির ফাঁক দেখান

তারানাথ বলল দেখ, দিনকাল খারাপ পড়েছে ঠিকই, দ্রব্যমূল্যও আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে সে কথাও ঠিক। কিন্তু সবচেয়ে যা প্রয়োজনীয় তা হল মানুষের সদিচ্ছা। ভালবাসা আর সদিচ্ছা থাকলে অনেক সমস্যা পার হওয়া সম্ভব। আমাদের শাস্ত্রে গৃহস্থের প্রতি নির্দেশ আছে কেবলমাত্র পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না না করে অন্তত বাড়তি একজনের জন্য আহার্য প্রস্তুত রাখার। নিজে রান্না করে শুধু নিজে খেলে তাকে পামর বলে। ভাব তো, দিনকাল যতই কঠোর হোক, দ্রব্যমূল্য যতই বেড়ে থাকুক, একজনমাত্র মানুষকে খাওয়াতে কি খুব বেশি খরচ পড়ে? চার-পাঁচজনের সংসারে একজন অতিথির জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হয় না, ওর মধ্যেই হয়ে যায়। তা নয়, আসলে আমরা ক্ষুদ্রচেতা হয়ে পড়েছি। এটাকে যুগধর্মও বলতে পারো। কলিযুগে অন্নময় শরীর-কেবল আমি খাব, আমি পরব এই মানসিকতা। মহাভারত ভাল করে পড়েছ? দ্বৈপায়নের তীরে ভীম যখন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করলেন, তখন অন্যায়যুদ্ধ করেছেন বলে ভীমকে হত্যা করবার জন্য বলরাম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে শান্ত করে কৃষ্ণ বললেন—দাদা, আপনি অকারণে ভীমের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করছেন। গ্রহবিপ্রদের ডেকে গণনা করে দেখুন, আজ থেকে দশদিন আগেই দ্বাপর শেষ হয়ে কলি শুরু হয়েছে। কলিতে নিয়ম হচ্ছে—যেমন করে হোক যুদ্ধ জয় করো, যা চাও তা ছিনিয়ে নাও, দয়ামায়া-উদারতা যেন তোমার আকাঙক্ষার বাধা না হয়। সেদিক দিয়ে ভীমসেন যুগধর্ম পালন করেছেন মাত্র, সেজন্য তাঁকে দায়ী করা যায় না। যুগপুরুষ কৃষ্ণের কথাই সত্য, আমিও একালের মানুষকে দায়ী করছি না। কিন্তু একথা ঠিক যে, মানুষ ক্ষুদ্রচেতা হয়ে পড়েছে, তা সে যে কারণেই হোক।

সেদিনটা দেবদর্শনের সঙ্গে গল্প করেই কাটল। ভদ্রলোক কলেজের ছাপমারা ছাত্র নন বটে, কিন্তু সাহিত্য আর ইতিহাসের খবর রাখেন প্রচুর, সেসব শুনতে আরম্ভ করলে আর থামা যায় না।

বোধহয় পরের দিন চলে যাব বলেই দুপুরে দেবদর্শন খাওয়াদাওয়ার বিপুল আয়োজন করেছেন। ওঁর আর আমার একসঙ্গেই আহারের আয়োজন করা হয়েছে ভেতরবাড়িতে রান্নাঘরের বারান্দায়। খেতে বসে আমার চক্ষুস্থির! পূজোর পরাতের মত বিশাল কাসার পদ্মকাটা বগিথালায় চূড়ো করা সাদা ধপধপে তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত। ভাতের চূড়ায় ছোট্ট কাঁসার বাটিতে গাওয়া ঘি, জমবে না—ভাতের গরমে তরল থাকবে। আলাদা রেকাবিতে নুন-লেবু-লঙ্কা। জিরে জিরে করে কাটা আলুভাজা, এঁচোড়ের ডালনা, নারকেলের কুচি দেওয়া ঘন মুগের ডাল, বাঁশসলা ধানের চিড়ে দিয়ে রান্না পাকা রুইমাছের মুড়িঘন্ট, একহাত লম্বা চিতলমাছের পেটির তেলঝাল—সে পেটির লম্বা কাঁটা দিয়ে উলবোনা যায়। তারপর এল তেলকই, এক একখানা কই একবিঘত লম্বা, তেমনটি তোমরা আজকাল আর শহরবাজারে দেখবে না। কারুকে বিশ্বাস করতে বলছি না, কিন্তু এ সমস্ত পদই আমি বেশ ভাল পরিমাণে খেয়ে ফেললাম। ভাত নিলাম দুবার। তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত খেয়েছ কখনও? তাহলে বুঝতে, এখানে রান্না করলে গলির মোড়ের লোক জানতে পারে। এই পর্ব চুকলে এল ঘনদুধের সর, ক্ষীর আর পাকা মর্তমান কলা। তাও খেয়ে ফেললাম অনেক অনেক।

মধ্যাহ্নভোজনের পর বৈঠকখানায় বসে তামাক খেতে খেতে বললাম—লোকে আপনাকে রাজাবাবু বলে সে মিথ্যে কথা নয়। রাজবাড়ি ছাড়া এমন রান্নাবান্না হয় নাকি?

দেবদর্শন বললেন—এবার তো কিছু করতে পারলাম না ঠাকুরমশাই, একটু হঠাৎ হয়ে গেল কিনা। সত্যি যদি আবার আসেন, তখন আমাদের এই অঞ্চলের কিছু ভাল রান্না আপনাকে খাওয়াব। কত রান্না তো আমরা ভুলেই গিয়েছি, বাড়ির মেয়েরা অত ঝামেলা আর করতে চায় না। পদ্মচিনি খেয়েছেন কখনও? গয়নাবড়ি ভাজা? কিম্বা তিলজাউ? সব খাওয়াব, আমার বাড়ির মেয়েরা পারে—

দু-চারবার জোরে জোরে গড়গড়ার নলে টান দিয়ে দেবদর্শন বললেন—যদি পারেন তো পূজোর সময় আসবেন। এখন অবশ্য আর সেই পুরনো দিনের জাঁকজমক কিছুই নেই, তবু নয় নয় করেও মুখুজ্যেবাড়ির দুর্গোৎসব আজ পর্যন্ত এ অঞ্চলে বিখ্যাত। বংশানুক্রমে আজ দুশো বছর ধরে একই কুমোর ঠাকুর তৈরি করে, একই পুরোহিতবংশ পূজো করে, একই ঢাকিরা ঢাক বাজায়। প্রতিমার সামনে অষ্টমীর দিন রাত্তির থেকে কবির গান, যাত্রা—এসব হয়। যদি ভাগ্য ভাল থাকে, তাহলে সন্ধিপূজোর সময় গড়ের তোপও শুনতে পাবেন–

অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—গড়ের তোপ কী জিনিস?

মুখুজ্যেমশাই বললেন—এটা আমাদের পরিবারে প্রচলিত একটা পুরোনো প্রবাদ। এখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে মুকুটশিলা গ্রামে আমার মামাবাড়ি। আমার প্রপিতামহীও ওই গ্রামেরই মেয়ে ছিলেন। তার বাপেরও ছিল বিশাল ভূসম্পত্তি, নদীর ধারে চওড়া উঁচু পাঁচিল দেওয়া এতবড় বাড়ি যে লোকে বলত ‘গড়’। সে বাড়িতে বিখ্যাত দুর্গোৎসব হত, দীয়তাং ভুজ্যতাং চলত পনেরোদিন ধরে। সন্ধিপূজোর সময়ে চারদিক কাঁপিয়ে কামান দাগা হত। লোকে বলত গড়ের তোপ। বিয়ের পর আমার প্রপিতামহী বাপেরবাড়ি যাওয়ার খুব একটা সুযোগ পেতেন না, সেকালে যেমন হত আর কি। একবার সকলকে বলে রাজি করিয়ে পূজোর সময় তিনি মুকুটশিলা যাবেন স্থির হল, কিন্তু পূজোর দশবারোদিন আগে বিষম সান্নিপাতিক জুরে প্রপিতামহী একেবারে শয্যাগত হয়ে পড়লেন। সঙ্কটাপন্ন অবস্থা, এখন যান তখন যান। কিন্তু সেই বিকারের মধ্যেও একটু জ্ঞান ফিরলেই বলতেন—আমার বাপেরবাড়ি যাওয়া হল না, পূজো দেখা হল না।

দীনদয়াল ভট্টাচার্য ছিলেন সে সময় আমাদের কুলগুরু। প্রপিতামহীর আক্ষেপ শুনে তিনি বলেছিলেন—মা, তোমাকে কোথাও যেতে হবে না, এইখান থেকেই তুমি সন্ধিপূজোর দিন মুকুটশিলা গ্রামের গড়ের তোপ শুনতে পাবে। এইখান থেকেই তুমি প্রণাম জানিও।

সবাই ভেবেছিল দীনদয়াল মুমূর্ষ রোগীকে সান্ত্বনা দিলেন মাত্র, কিন্তু প্রপিতামহ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বাস করেছিলেন। সন্ধিপূজোর সময় তিনি বসে রইলেন স্ত্রীর রোগশয্যার পাশে। গভীর রাত্রিতে ঠিক সন্ধিলগ্নে বহুদূর থেকে মাঠ বন খাল বিল পেরিয়ে ভেসে এল গড়ের তোপের শব্দ। গ্রামাঞ্চল তো, তারপর সেকালের ব্যাপার, হুহু করে ঘটনাটা রটে গেল চারদিকে। এখন জিনিসটা কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁচেছে। প্রতি বছরেই নাকি কেউ কেউ শুনতে পায় গড়ের তোপের আওয়াজ–

বললাম—তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? শোনাই তো যেতে পারে–

দেবদর্শন আমার দিকে কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন, তারপর বললেন—না, তা যেতে পারে না। আগে বলিনি বোধহয়, জয়তলা থেকে মুকুটশিলার দূরত্ব চল্লিশ মাইল।

চুপ করে রইলাম। সত্যিই তো, যতই নির্জন আর শান্ত পরিবেশ হোক, চল্লিশ মাইল দূর থেকে কামানের আওয়াজ শুনতে পাওয়া সম্ভব নয়।

জিজ্ঞাসা করলাম–আপনি কখনো শুনেছেন?

মুখুজ্যেমশাই বললেন—বাল্যে দু-একবার শুনতে পেয়েছি বোধহয়, পরিষ্কার স্মৃতি কিছু নেই। বড় হবার পর তেমনভাবে কখনও নয়—

—তেমনভাবে নয় বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

–সেভাবে কানখাড়া করে কখনও বসে থাকিনি তো। বড় হতে আরম্ভ করলে কিছু কিছু বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে যায়। তবে দু-একবার যেমন আমার বিয়ের বছর-হঠাৎই শুনতে পেয়েছিলাম তোপের শব্দ। অন্যমনস্ক ছিলাম, নইলে হয়ত আরও স্পষ্ট শুনতে পেতাম। গ্রামের লোকেদের মধ্যে কিন্তু এ প্রসঙ্গে গভীর বিশ্বাস আছে, তারা অনেকেই শুনেছে গড়ের তোপ। তবে তাদের কথা আমি ধরি না, অতিরিক্ত বিশ্বাসে আর ভক্তিতে মানুষ অনেক কিছু দেখে বা শোনে যার কোনও বাস্তব মূল্য নেই।

দেবদর্শন প্রবীণ জমিদার বটে, কিন্তু সেকেলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ নন, তাঁর মনের মধ্যে বেশ উদার আলোহাওয়া খেলে।

গল্পে গল্পে সেদিনটা ভালই কেটে গেল। পরের দিন আবার বেরিয়ে পড়লাম পথে।

পথটাই আমার ঠিক জায়গা, ঠিকঠাক খাপ খেয়ে যায়। চিন্তাহীন, মুক্ত আনন্দে ভরা দিনগুলো। কখনও ঝড়-বৃষ্টি, কখনও নীল আকাশে ডানা ছড়ানো চিলের ওড়াউড়ি। পড়ন্ত বেলায় রাস্তার ধারের লতাপাতার ঝোপ থেকে মন-কেমন-করা কটু গন্ধ ওঠা। গ্রামের মুদিখানা থেকে মুড়ি আর মুড়কি কিম্বা বাতাসা কিনে খাওয়া, যেখানে-সেখানে রাত্তিরের আশ্রয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। তোমরা যারা সংসারী মানুষ তারা এ জীবনটাকে ঠিক উপলব্ধি করতে পারবে না। তবে আবার বলছি—মনে বল আর সাহস থাকা চাই, দুর্বল পুতুপুতু মনের লোক এ আনন্দ পাবার যোগ্য নয়।

কয়েকমাস ঘুরে বেড়ালাম বহু জায়গায়, অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতাও হল। তার মধ্যে একটা তো জমিয়ে গল্প বলার মত। কিন্তু সেটা আজ বলব না, আজ বরং মুখুজ্যেবাড়ির গল্পটা শেষ করি।

শরৎকাল এসে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই দুর্গাপুজো আসছে। একটা কালীবাড়ির নাটমন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে রাত্তিরে। বেশ পরিচ্ছন্ন জায়গা, মশাটশা বিশেষ নেই, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম ঘুম ভাব ঘনিয়ে এল। সারাদিন পথশ্রমের পর ঘুম আসার অনুভূতি ভারি আরামের।

হঠাৎ সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কানের কাছে কে যেন বলল কাল সকালেই রওনা হও। মুখুজ্যেবাড়ির পূজোয় এবার তোমার থাকা দরকার।

চমকে উঠে বসলাম–কে? কে বলল কথাটা? তারার আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে নাটমন্দির। কই, জনপ্রাণীও তো নেই কোথাও! অথচ আমি পরিষ্কার শুনেছি–

উঠে একবার চারপাশটা ঘুরে দেখে এলাম। না, সত্যিই কেউ কোথাও নেই। তাহলে?

তারপরেই হঠাৎ একটা ধাক্কার মত মনে হল—এই গলার স্বরের অধিকারীকে আমি চিনি! তার নাম অমর। অমরজীবন। আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের পর্বে পর্বে সে জড়িয়ে গিয়েছে। রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা তার পরিচয়, আকাশের নক্ষত্রদের মত সে প্রাচীন। তার নির্দেশ আমাকে মানতেই হবে।

অনেক রাত্তির অবধি নাটমন্দিরের মেঝেতে থু হয়ে বসে রইলাম। গলাটা শুনতে পেয়ে মনে কোনও ভয় বা আশঙ্কা হল না, বরং মৃদু তৃপ্তি আর শান্তিতে মন ভরে গেল। যেন কয়েকবার হারিয়ে যাওয়া কোন বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি। ঠিক করলাম পরের দিনই রওনা দেব জয়তলায়।

ঘুরতে ঘুরতে দেড়খানা জেলা পার হয়ে চলে এসেছিলাম, কাজেই ফিরতে বেশ সময় লাগল। খুব প্রাণপণ হেঁটেও পূজো আরম্ভ হবার আগে মুখুজ্যেবাড়ি পৌঁছতে পারলাম না। সপ্তমীর দিন সন্ধেবেলা পৌঁছলাম দানাবাড়ি নামে একটা গ্রামে, সেখান থেকে জয়তলা বারো মাইল পথ। খুব ভোরে উঠে বেরিয়ে পড়লে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাব।

পরের দিন মহাষ্টমী। অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভেঙে উঠে মুখহাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যে গোয়ালবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে বাড়ির কর্তাও আমাকে এগিয়ে। দেবার জন্য গল্প করতে করতে অনেক দূর এল। শরৎকালের ভোর, বাতাসে সামান্য হিমের স্পর্শ। গ্রামের সীমানায় একটা বাড়ির উঠোনে গাছের তলায় আলো করে ছড়িয়ে। আছে শিউলি ফুল। তার পবিত্র গন্ধ সে জায়গার বাতাসকে আমোদিত করে রেখেছে। এখান থেকেই আমার সঙ্গী উদ্ধব ঘোষ প্রণাম করে বিদায় নিল। আমিও জোরে পা চালালাম।

পথে বারদুই সামান্য বিশ্রাম করে ঠিক বেলা দুপুরে জয়তলা পৌঁছলাম। দূরে মুখুজ্যেবাড়ির পূজোর ঢাক বাজছে। গ্রামের রাস্তাতেও খুব বেশি লোক নেই, দল বেঁধে সবাই জমিদারবাড়ি পূজো দেখতে গিয়েছে। পথের বাঁক ঘুরেই সামনে মুখুজ্যেমশাইয়ের। বাড়ি। কাছারি আর অন্দরমহলের মাঝখানে বিরাট উঠোনে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, তার নিচে অন্তত শ-তিনেক লোক হাতজোড় করে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে বসে। আমি মণ্ডপে ঢুকতেই সমস্ত কোলাহল থেমে গিয়ে অতবড় আসরে স্তব্ধতা নেমে এল। সন্ধিপূজা সমাগত।

আসরের একেবারে অপর প্রান্তে ঠাকুরদালানে প্রতিমার সামনে একশো আটখানা পেতলের প্রদীপ ধকধক করে জ্বলছে। পুরোহিত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন লোহার বেড়ের ওপর বসানো নতুন জলভরা মাটির হাঁড়ির দিকে। তার তলার ফুটো দিয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে। সমস্তটা জল বেরিয়ে গেলে সন্ধিপূজো শুরু হবে। ভাল সময়ে পৌঁছলাম মুখুজ্যেমশাইয়ের বাড়িতে।

ওপাশ দিয়ে ক-খানা বারকোশ হাতে করে রঘু কোথাও যাচ্ছিল, সে আমাকে দেখতে পেয়ে একগাল হাসল, তারপর আসরের সামনে যেখানে দেবদর্শন বসে আছেন সেখানে গিয়ে নিচু হয়ে বাধহয় আমার কথা বলল। দেবদর্শন চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন।

তাঁর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হওয়ামাত্র দূর থেকে ভেসে আসা মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট কামানের গর্জন শুনতে পেলাম। আসরের সব মানুষই নিশ্চয় শুনতে পেয়েছিল, জয়ধ্বনি দিয়ে তারা একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল সামিয়ানার তলায়। গড়ের তোপ! গড়ের তোপ শোনা গিয়েছে!

কেবল পুরোহিতমশায় অবিচল। হাঁড়ির জল শেষ হওয়ামাত্র তিনি হাত তুললেন। মেঘের গর্জনের মত গুড়গুড় করে বেজে উঠল ঢাক।

সন্ধিপূজো শুরু হল।

০৮. শাঁখ আর ঘণ্টা বেজে উঠল

শাঁখ আর ঘণ্টা বেজে উঠল, ঢাক তো বাজছেই। বাড়ির আর সমাগত গ্রামের মেয়েরা উলু দিচ্ছে। কামারের হাতে ঝকঝকে খাড়া উঠছে নামছে, এঁটেল আর বালিমাটি মিশিয়ে তৈরি বেদীর ওপরে পরপর বলি হয়ে যাচ্ছে একশো আটটা চালকুমড়ো, কলা, আখ, সুপুরি। মুখুজ্যেবাড়ির পূজো হয় দেবীপুরাণ অনুযায়ী, পশুবলি এ বাড়িতে নিষেধ। তার। মধ্যে সুপুরি বলি ব্যাপারটা দেখার মত। মাটির বেদীতে রাখা ওইটুকু একটা জিনিসের ওপর অতবড় ভারি খাড়া নির্ভুলভাবে নামিয়ে আনা রীতিমত কঠিন কাজ। সুপুরি শক্ত এবং গোল জিনিস, খাঁড়া যথেষ্ট ধারালো এবং কামার যথেষ্ট কুশলী না হলে ফলটা ফকে পাশে সরে যাবে। তা হলে মহা অকল্যাণ। কিন্তু বলি হয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।

সন্ধিপূজো শেষ হল। মেয়েরা গলবস্ত্র হয়ে ঠাকুরপ্রণাম করছেন, লোকজন সব উত্তেজিত হয়ে গড়ের তোপের প্রসঙ্গ আলোচনা করছে। এতদিনের কিম্বদন্তী, কিন্তু সেভাবে কেউ শোনেনি কামানের শব্দ। গ্রামের সরল বিশ্বাসী মানুষের মনে আলোড়ন তৈরি করবার মত ঘটনা এটা। মুখুজ্যেবাড়ির দুর্গোৎসবের মাহাত্ম্য নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হল।

দেবদর্শন প্রণাম সেরে আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে জল।

–শুনলেন ঠাকুরমশাই?

—শুনলাম। আপনার নিমন্ত্রণ রেখে ভালই করেছি।

—চলুন, আমরা বৈঠকখানায় গিয়ে বসি। রঘু, আমাদের তামাক দে-আর প্রসাদ। নিয়ে আয়।

উৎসব উপলক্ষে বাড়ি সাজানো হয়েছে দেখলাম। বৈঠকখানার দরজায় ঝুলছে আমপাতা আর শোলার কদমফুল। ভেতরে তক্তাপোশে গদির ওপর নতুন ধপধপে ফরাস পাতা, ধারে ধারে কটা মোটা গির্দা। আমরা গিয়ে বসার একটু পরেই রঘু দুজনকে তামাক দিয়ে গেল। পেছনে এল পুরোহিতের তন্ত্রধার, তার হাতে দুখানা কাঠের বারকোশে পূজোর প্রসাদ। দেবদর্শন বললেন—প্রসাদ খেয়ে আপাতত চালান ঠাকুরমশাই। দুপুরে খেতে কিন্তু দেরি হবে। লোকজন সব এতক্ষণ সন্ধিপূজো দেখছিল, এইবার রান্না চাপাবে

বললাম—তা হোক, আমার কোনও তাড়া নেই।

—আমাদের কিন্তু দেবীপুরাণ মতে পূজো, এই কদিন নিরামিষ খাওয়া চলছে, সেই বোধনের দিন থেকে। একেবারে দশমীর দিন বিসর্জন সেরে এসে রাত্তিরে লুচি-মাংস খাওয়া হবে সকলে মিলে। আপনার হয়ত কষ্ট হবে

—কিছু অসুবিধে হবে না। ভালমন্দ জিনিস খেতে খুব ভালবাসি ঠিকই, আবার নুনভাত খেতেও ভালই লাগে। স্বাদ জিনিসটা জিভে নয় মুখুজ্যেমশাই, হৃদয়ে।

দু-একজন করে গ্রামের বৃদ্ধ প্রতিবেশী বৈঠকখানায় এসে বসতে শুরু করলেন। সাধারণ মানুষেরা প্রসাদ খেয়ে সামিয়ানার নিচেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গল্পগুজব করতে লাগল। সবাই দুপুরে খেয়ে বাড়ি যাবে, সন্ধেবেলা এসে আরতি দেখবে, এবং আবার রাত্তিরের খাওয়া সেরে ফিরবে। সমস্ত গ্র