Sunday, July 12, 2026
Homeথ্রিলার গল্পসায়েন্স ফিকশনওমেগা পয়েন্ট - হুমায়ূন আহমেদ

ওমেগা পয়েন্ট – হুমায়ূন আহমেদ

০১. ইয়াসিন সাহেব বারান্দায় অজু করতে এসে দেখেন

ইয়াসিন সাহেব বারান্দায় অজু করতে এসে দেখেন শশা-মাচার নিচে লাল শাড়ি পরা বউ মত কে যেন ঘুরঘুর করছে। শশা-মাচা তো বেড়ানোর জায়গা না। কে ওখানে? শশা তুলছে নাকি? তাই তো, শশাই তো তুলছে। কোঁচড়ভর্তি শশা। সূর্য ডোবার পর ফলবতী গাছের ফল ছেঁড়া যায় না—এই সত্যটা কি লাল শাড়ি পরা মেয়েটা জানে না। ইয়াসিন সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। একবার ভাবলেন অজু বন্ধ রেখে এগিয়ে গিয়ে দেখে আসেন ব্যাপারটা কী? কিন্তু এটা ঠিক না। গুরুতর কোন ঘটনা না ঘটলে নামাজ ছেড়ে যেমন ওঠা যায় না, তেমনি অজু ছেড়েও ওঠা যায় না। লাল শাড়ি পরা মেয়ের শশা তোলা কোন গুরুতর ঘটনা না।

তিনি অজু শেষ করে তাঁর ঘরে ঢুকলেন। তাঁর ঘরে পালংকের মাথায় ভাঁজ করা জায়নামাজ থাকে, সেই জায়নামাজ নিয়ে মসজিদে যাবেন। যদিও আজ আলসি লাগছে। মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে। সমস্যা হয়েছে মসজিদটা তিনি নিজে দিয়েছেন। পাকা মসজিদ। মুসুল্লিদের অজুর জন্যে চাপকল, একটা সেনিটারি লেট্রিন সবই করা হয়েছে। আজানের মিনার ছাড়া মসজিদের যাবতীয় কাজ শেষ। এই মাসের আট তারিখ থেকে উলা পাস একজন মাওলানাও রাখা হয়েছে। রোজা আসছে খতমে তারাবি পড়ানোর মানুষ দরকার। মাওলানার থাকা-খাওয়া এবং মাসিক পাঁচশ সত্তুর টাকা বেতনও তিনিই দিচ্ছেন। সেই মানুষ যদি নিজের মসজিদে নামাজ না পড়ে তাহলে অন্যরা কেন নামাজ পড়বে?

ইয়াসিন সাহেব জায়নামাজ হাতে নিলেন। বিরক্ত গলায় ডাকলেন, শেফার মা কই? এদিকে শুনে যাও।

আমেনা বেগম স্বামীর গলা শুনে ছুটে এলেন। এ বাড়ির সবাই ইয়াসিন সাহেবকে যমের মত ভয় করে। আমেনা বেগম তার ব্যতিক্ৰম না।

ইয়াসিন সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন শশা-মাচার নিচে কাকে যেন দেখলাম, লাল শাড়ি পরা। মেয়েটা কে?

আমেনা বেগম ফিক করে হেসে ফেলে বললেন, নিজের মেয়েরে চিনেন না? শেফা।

লাল শাড়ি পরেছে কেন? শখ করে পরেছে। এই শাড়ি তো ঢাকা থেকে আপনিই এনে দিয়েছেন।

সন্ধ্যাবেলা শশা তুলতেছে। এটা কেমন কথা? সন্ধ্যাকালে নামাজ আদায় করবে তারপর বই নিয়ে বসবে। মেট্রিক পরীক্ষার দুইমাসও বাকি নাই। আমি মসজিদ থেকে এসে যেন দেখি সে বই নিয়ে বসেছে।

জ্বি আচ্ছা।

তার মাস্টার কই, রফিক? তাকে তো দেখি না। জুম্মাবার ছাড়া কোনদিন তাকে মসজিদেও দেখলাম না। তাকে বলে দিবে আমার বাড়িতে যারা যারা জায়গির থাকে তাদের প্রত্যেকের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে হবে। এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হবে না। তুমি দেখ রফিক ঘরে আছে কিনা। আমি নিজেই আজ তারে সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাব।

আমেনা বেগম বললেন, রফিক ঘরে নাই।

গেছে কোথায়?

ময়মনসিংহ গিয়েছে। সন্ধ্যার ট্রেনে চলে আসবে।

ময়মনসিংহ গেল কখন?

আজ সকালে গিয়েছে।

আমি কিছু জানলাম না কেন? শেফার মা শোন আমার এই বাড়িতে যারা থাকে তাদের সবার সব বিষয় আমাকে জানাবে। কোন কিছু গোপন রাখবে না।

নামাজের সময় পার হইয়া যাইতেছে। আপনে মসজিদে যান।

ইয়াসিন সাহেব বিরক্ত মুখে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। মসজিদের জন্যে যে মাওলানা রাখা হয়েছে তাকে তার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না। পছন্দ না হওয়ার প্রধান কারণ মাওলানা নামাজের সময় বেছে বেছে সবচে লম্বা সুরাগুলি বের করে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে খিল ধরে যায় তারপরেও সুরা শেষ হয় না। দোয়ার সময় হাত যে তোলে সেই হাত আর নামায় না দোয়া কিছুক্ষণ চলে উর্দুতে, কিছুক্ষণ আরবিতে তারপর শুরু হয় বাংলায়। বাংলা দোয়ার একপর্যায়ে আমরা বড়ই গুনাহগার আমরা বড়ই গুনাহগার বলতে বলতে হাউমাউ করে কান্নাকাটিও শুরু হয়।

ইয়াসিন সাহেবের ধারণা মাওলানা মিথ্যা কথাও বলেন। চাকরি পাওয়ার চার দিনের দিন মাওলানা তাঁকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কাদো কাদো গলায় বললেন, আজ শেষরাতে ফজরের নামাজের আজানের ঠিক আগে আপনাকে নিয়ে একটা খোয়াব দেখেছি। খোয়াবে দেখলাম আরব দেশের লেবাস পরা একজনকে সফেদ দাড়ি, একটা শাদা চাদর এক পঁাচ দিয়ে পরা। চোখে সুৰ্মা। আমি উনাকে চিনতাম না। উনি আমাকে বললেন—তুমি অতি ভাগ্যবান। তুমি যার আশ্রয়ে আছ সে নেকবান, তাঁর অন্তরে আছে আসল নুরানি। এই নুরানির কারণে সে নিজ খরচায় মসজিদ দিয়েছে। এখন তোমার দায়িত্ব এই মানুষটার পাশে পাশে থাকা। তার দেখভাল করা। মসজিদের দায়িত্ব পালনের চেয়ে এই মানুষটার দেখভাল তোমার জন্যে অতি জরুরি। এই বলে তিনি আমার ডান হাতের বুড়া আঙুলে আতর লাগায়ে দিলেন। তারপরেই আজানের শৰে ঘুম ভেঙে গেল।

ইয়াসিন সাহেব শুকনো গলায় বললেন, ও।

মাওলানা উৎসাহের সঙ্গে বললেন, আল্লাহপাকের কি কুদরতি সেই আতরের গন্ধ এখনো আঙুলে আছে। একটু শুঁকে দেখেন।

ইয়াসিন সাহেব বললেন, এঁকে লাভ নেই। আমার সর্দি গন্ধ পাই না।

খোয়াবটা দেখার পরে বড়ই অবাক হয়েছি।

ইয়াসিন সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন অবাক হওয়ারই কথা। আরব দেশের মানুষকে স্বপ্নে দেখলেন—সে কথা বলতেছে বাংলায়। যাই হোক স্বপ্ন বেশি না দেখা ভাল। স্বপ্ন কম দেখবেন।

আপনে বোধহয় আমার খোয়াবের ব্যাপারটা বিশ্বাস করলেন না।

ইয়াসিন সাহেব বললেন—করেছি। বিশ্বাস করব না কেন? আপনি এত বড় মাওলানা, আপনে তো আর মিথ্যা কথা বলবেন না। আজানের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙেছে, এটা শুনে অবাক হয়েছি। কারণ আজান তো দেন আপনি।

আজানের শব্দটাও খোয়াবে শুনেছি।

ও।

যাকে স্বপ্ন দেখেছি তার পরিচয় দিলে আপনে চমকে উঠবেন।

তাহলে পরিচয় না দেওয়াই ভাল। এই বয়সে ঘনঘন চমকানো ভাল না। স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।

ইয়াসিন সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেল। টাকাপয়সা খরচ করে মসজিদের জন্যে ইমাম রাখা হল। সে চোখের পাতি না ফেলে মিথ্যা কথা বলে। তিনি ধর্মকর্মের জন্যে মসজিদ দেন নাই। মসজিদ দিয়েছেন আগামী ইলেকশনের কথা চিন্তা করে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই পার্টিতে দেন। দরবার শুরু করেছেন। একজন কেউ নমিনেশন দিলেই হল। না দিলে স্বতন্ত্র পাড়াবেন। তার মত ফালতু যে মানুষ তার বিষয়ে স্বপ্নে কথা বলল সফেদ পোশাকের লোক? স্বপ্নে আবার আরও মাখিয়ে দিল? আতরের গন্ধ স্বপ্ন শেষ হবার পরেও যায় নাই। এখনো বুড়ো আঙুলে লেগে আছে। মিথ্যা কথারও তো সীমা থাকা দরকার। একে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদায় করতে হবে। যার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া হয় তার প্রতি যদি শ্ৰদ্ধা না থাকে তাহলে নামাজ হবার কথা না।

ইয়াসিন সাহেব মাগরেবের নামাজে দাঁড়া হয়েছেন। তিন রাকাত নামাজ দেখতে দেখতে শেষ হবার কথা। অবস্থা যা দেখা যাচ্ছে—এই মাওলানা কতক্ষণ লাগাবে কে জানে? ইয়াসিন সাহেবের মন এখন বিক্ষিপ্ত। নামাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন সব কথাবার্তা মনে আসতে শুরু করেছে। যেমনরফিক ময়মনসিংহ গিয়েছে, সে ময়মনসিংহ যাবে জানলে তিনি দুটা ইলিশ মাছ আনার টাকা দিয়ে দিতেন। গ্রাম-গঞ্জের বাজারে ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। ময়মনসিংহ ছাড়া গতি নেই। এই বছর ইলিশ মাছ খাওয়াই হয় নাই। নতুন সরিষা দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোলের কাছে জগতের কোন খাদ্যই খাদ্য না। বেহেশতের খানা-খাদ্যের মধ্যে পক্ষীর মাংসের কথা উল্লেখ আছে, ইলিশ মাছের ঝোলের কথার উল্লেখ আছে কিনা মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মাওলানা যে রকম মিথ্যাবাদী লোক না থাকলেও হয়ত বলবে আছে। তাকে খুশি করার জন্যে বলবে।

ইয়াসিন সাহেবের মনে হল নামাজে দাঁড়িয়ে তিনি সোয়াবের পরিবর্তে পাপ করে যাচ্ছেন। যতই সময় যাচ্ছে ততই পাপ বাড়ছে। তিনি আল্লাহপাক বা বেহেশত-দোজখের কথা চিন্তা না করে চিন্তা করছেন অতি তুচ্ছ ইলিশ মাছের কথা। ইয়াসিন সাহেব মাথা থেকে দুষ্ট চিন্তা দূর করার চেষ্টা করলেন–চিন্তাটা আরো খারাপ দিকে চলে গেল। মাথায় ঘুরতে লাগল যাত্রাপার্টির কথা। গ্রামের মানুষজন যাত্রা দেখলে খুশি হয়। এই শীতে যাত্রার আয়োজন করলে দল বেঁধে সবাই যাত্ৰা দেখতে আসবে। তিনিও সবার সঙ্গে যাত্রা দেখবেন। অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হবে। মাঝরাতে চায়ের ব্যবস্থা থাকল। সবাই এককাপ করে চা খেল। কত আর খরচ হবে। লাভ হবে তিন ডাবল। হিন্দু-ভোট হয়ত কিছু পাওয়া যাবে। গতবার ইলেকশনে হেরেছেন হিন্দু-ভোট না পাওয়ার কারণে। মসজিদ দেবার কারণে হিন্দু-ভোট আরো কমে যাবে কিনা কে জানে।

রাতে খেতে বসে ইয়াসিন সাহেব চমৎকৃত হলেন। ইলিশ মাছের ভাজা এবং ঝোল। সাধারণ কোন ঝোল না, সরিষার ঝোল। বাটি থেকেই সরিষার ঝাঁঝ নাকে এসে লাগছে। ইয়াসিন সাহেব বিস্মিত গলায় বললেন—শেফার মা, ইলিশ মাছ, ব্যাপার কি?

রফিক এনেছে।

নিজ থেকে এনেছে নাকি তুমি আনতে বলেছিলে?

নিজ থেকে এনেছে। একজোড়া মাছ নিয়ে এসেছে।

মাছের দাম দিয়া দিবা।

জ্বি আচ্ছা।

তারে ডাক দাও। কথা বলব। আচ্ছা থাক, এখন না। মাছটা ভাল হয়েছে। ঝাল কিঞ্চিৎ বেশি হয়েছে তার জন্যে স্বাদের কোন কমতি হয় নাই।

আরেক টুকরা মাছ নেন।

ইয়াসিন সাহেব আরেকটা মাছ নিলেন। আলাদা করে পিরিচে ইলিশ মাছের দুটা মাথা রাখা হয়েছে। ইয়াসিন সাহেবের হিসাবে এই জগতে যত সুখাদ্য আছে ইলিশ মাছের মাথা তার মধ্যে একটি। বেশিরভাগ মানুষ এই তথ্য জানে না।

শেফা খেয়েছে?

না।

একটা মাথা শেফার জন্যে রেখে দাও।

আপনে খান। শেফা মাছের মাথা খেতে পারে না।

খাওয়া শিখতে হবে না। সব কিছু শিখতে হয়। খাওয়া শিখতে হয়। না খেলে খাওয়া শিখবে কিভাবে?

আমেনা বেগম বললেন, মেয়েমানুষের অত খাওয়া শিখার দরকার নাই। মেয়েমানুষ যত কম খাওয়া শিখে তত ভাল। কার না কার ঘরে যেতে হয়।

ইয়াসিন সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন-বা-মায়ের সঙ্গে যতদিন আছে ততদিন খাওয়া-খাদ্য যেন ঠিক মত খায় এটা দেখা বাবা-মায়ের কর্তব্য। মেয়েকে ডাক, ইলিশ মাছের মাথাটা আমার সামনে খেতে বল।

সে খাবে না। খাবে না আবার কি? অবশ্যই খাবে। ডাক দাও দেখি।

আমেনা বেগম মেয়েকে রক্ষা করার জন্যে বললেন-পড়তে বসেছে। পড়া থেকে উঠানো ঠিক না। এমিতেই পড়তে চায় না। আর আপনে আমার একটা কথা রাখেন, এই মাথাটাও খান। আমি শেফারে ইলিশ মাছের মাথা এনে খাওয়াব।

ইয়াসিন সাহেব দ্বিতীয় মাথাটাও পাতে উঠিয়ে নিলেন।

খাওয়াদাওয়ার পর পান খাওয়া এবং পান খেতে খেতে হুক্কায় টান দেয়া ইয়াসিন সাহেবের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এই সময় তার পায়ের কাছে ফজলু বসে থাকে। সে পায়ে ইলিবিলি কেটে দেয়। ইয়াসিন সাহেবের তখন তন্দ্ৰা-তন্দ্রা ভাব হয়। তিনি এই ঘোর ঘোর অবস্থায় তাঁর কাছে দেন-দরবার নিয়ে আসা লোকজনের কথাবার্তা শোনেন। এর একটা ভাল দিক হচ্ছে কারো কোন কথাই মন দিয়ে শুনতে হয় না। মন দিয়ে মানুষের কথা শুনার মত কষ্টকর কিছু এই দুনিয়াতে নেই।

আজ রাতে তিনি শুনছেন রফিকের কথা। তবে রফিক নিজ থেকে কথা বলতে আসে নি। তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন। দুদিন পর পর সে হুট করে ময়মনসিংহ যায়, ঢাকা যায়, এটা ঠিক না। শেফার মেট্রিক পরীক্ষার বেশি বাকি নাই। এই সময় তার সার্বক্ষণিক থাকা দরকার। মেয়ে যদি মনোযোগী ছাত্রী হত তাহলে কোন কথা ছিল না। মেয়ের পড়াশোনার প্রতি কোন মনোযোগই নাই।

রফিক শুনলাম ময়মনসিংহ গিয়েছিলে ব্যাপার কি?

চশমার দোকানে গিয়েছিলাম।

চোখ খারাপ হয়েছে?

জ্বি না। দুটা লেন্স কিনলাম, আগে একবার গিয়ে অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম, এরা ঢাকা থেকে আনায়ে দিয়েছে।

জিনিসটা কি বললে?

লেন্স। চশমার কাচ।

করবা কি?

একটা টেলিস্কোপ বানাব। দুরবিন। দূরের জিনিস কাছে দেখার যন্ত্র।

দূরের জিনিস কি দেখবা?

তারা দেখা যাবে, চাঁদ দেখা যাবে। খুব কাছে দেখা যাবে।

কাছে দেখা যাবার প্রয়োজনটা কি?

রফিক চুপ করে গেল। ইয়াসিন সাহেব ঘুম-ঘুম গলায় বললেন, বাজে কাজে সময় নষ্ট করবা না। আমি লক্ষ করেছি তুমি বাজে কাজে বেশি সময় নষ্ট কর। সময়ের দাম আছে বুঝলে?

জ্বি চাচা।

টেলিস্কোপ জিনিসটা কিভাবে বানায়?

বুঝয়ে বলব?

যে ভাবেই বল, আমি বুঝব না। তারপরেও বলতে চাইলে বল শুনি।

দুটা লেন্স দিয়ে টেলিস্কোপ বানাতে হয়। একটা হল অবজেকটিভ। চাঁদের আলো এই লেন্সের উপর পড়বে। তার ইমেজ তৈরি হবে লেন্সের ফোকাল লেংথে। সেই ইমেজটা যে জায়গায় পড়বে সেটা হবে দ্বিতীয় লেন্সটার ফোকাল প্লেন। প্রথম লেন্সটার ফোকাল লেংথ হতে হবে বেশি। দ্বিতীয় লেন্সের ফোকাল লেংথ হতে হবে অনেক কম। ব্যাস তৈরি হয়ে গেল টেলিস্কোপ। অবজেকটিভের ফোকাল লেংথ কত বেশি তার উপর নির্ভর করবে জিনিসটা কত কাছে দেখা যাবে। আমি যে টেলিস্কোপটা তৈরি করব সেটা দিয়ে ইনশাল্লাহ। শনিগ্ৰহ দেখা যাবে।

কি দেখা যাবে?

শনিগ্ৰহ। শনির বলয়।

শনিগ্ৰহ দেখা ঠিক না। শনি থেকে যত দূরে থাকা যায় তত ভাল। বুঝলে তো?

জ্বি।

তোমার যন্ত্রটা তৈরি হবে কখন?

যন্ত্র প্রায় তৈরি। কাঠের চোঙের মধ্যে দুটা লেন্স শুধু ফিট করা। আর ঘণ্টা থানিক লাগবে। ধরেন আজ রাত দুটা নাগাদ চাঁদ দেখতে পারব।

আজ পূর্ণিমা না?

জ্বি পূর্ণিমা। টেলিস্কোপটা তৈরি হলে কি চাচা আপনাকে ডাক দিব?

আমাকে ডাকাডাকি করার কোন দরকার নাই। আমার সমস্যা আছে। রাতে একবার ঘুম ভাঙলে আর ঘুম হয় না। ঠিক আছে এখন যাও। আর শোন বাজে কাজে সময় নষ্ট করবা না। চশমার কাচ দুটা যে কিনলা কত দাম পড়ল?

এগারোশ টাকা নিয়েছে।

এগারোশ টাকা একেবারে যে পানির মধ্যে পড়েছে এটা বুঝতে পেরেছ? চাঁদ কাছে এনে দেখার কোন দরকার নাই। কাছে আনলেই যে জিনিস ভাল দেখা যায় তা না। আল্লাহপাক যে জিনিসরে যেখানে রেখেছেন সেখানেই তারে ভাল লাগে। আল্লাহপাক যদি ভাবতেন চাঁদকে কাছে আনলে ভাল দেখা যাবে তাহলে তিনি হাতের কাছে চাঁদ এনে দিতেন। হাত দিয়া চাদরে দেখার ব্যবস্থা করে দিতেন। তিনি কি সেটা দিয়েছেন?

জ্বি না।

আচ্চা যাও। টাকাপয়সা বাজে খরচ করবা না। অপচয়কারী শয়তানের ভাই। এইটা মনে রাখবা।

জ্বি আচ্ছা।

তোমার ছাত্রী পড়াশোনা কেমন করতেছে?

জ্বি ভাল।

মোটই ভাল না। পড়াশোনার দিকে তার মন নাই। তার মন সাজনে। গতমাসে ঢাকায় যাব সে আমার হাতে কি কি আনতে হবে তার লিস্ট ধরায়ে দিয়েছে। লিস্টে আছে লিপস্টিক, পাউডার এইসব হাবিজাবি। তোমাকে বাড়িতে কি কারণে রেখেছি সেটা মনে রাখবা। মেয়েমানুষ একবার মেট্রিক ফেল করলে আর পাস করতে পারে না। সে যেন এক চাগে পাস করে এটা দেখতে হবে। শুধু চাঁদ দেখলে হবে না। আচ্ছা এখন যাও।

ফজলু পায়ে ইলিবিলি কাটছে। বাইরের আবহাওয়া মনোরম। কার্তিক মাসের শুরু। অতি আরামদায়ক বাতাস বইছে। চারদিকে প্রবল জোছনা। ইয়াসিন সাহেব হাতে হুক্কার নল নিয়ে গভীর তন্দ্ৰায় ডুবে গেলেন। মাঝে মাঝে ঘুম কাটলে তিনি দেখতে পান উঠানে রফিক কাঠের টুকরা, হাতুড়ি, করাত নিয়ে কি যেন করছে। সে পাটি পেতে বসেছে। তার পাশে কাঠের চেয়ার। চেয়ারে ছোট্ট বাক্স। ইয়াসিন সাহেব তার মধ্যে ভাবেন করছে কি? তারপরেই মনে হয় রফিক চাঁদ দেখার যন্ত্র বানাচ্ছে। তিনি খানিকটা বিরক্ত হন। বিরক্তি নিয়েই হুক্কার নলে দুতিনটা টান দেন। তারপর আবারো গভীর তন্দ্ৰায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর হাতুড়ির টুকটাক শব্দে তন্দ্ৰা কাটে, তিনি ভাবেন–চাঁদের আলোতে বসে রফিক করছেটা কি? হাতুড়ি, পেরেক, করাতের ঘষাঘষি। হচ্ছেটা কি?

আমেনা বেগম রাতে শেফার সঙ্গে ঘুমুতে যান। মেয়ে বড় হলে তাকে কখনো একা শুতে দিতে নেই। হয় সে ছোট ভাই-বোনের সঙ্গে ঘুমুবে নয়তো দাদি নানির সঙ্গে ঘুমুবে। এটাই সাধারণ নিয়ম। শেফার কোন ভাইবোেন নেই। দাদি মারা গেছেন। নানি এখানে থাকেন না। কাজেই বাধ্য হয়েই আমেনা বেগমকে মেয়ের সঙ্গে ঘুমুতে হয়। তিনি জানেন কাজটা ঠিক হচ্ছে না। স্ত্রীর কাছে স্বামী প্রথম, স্বামী দ্বিতীয় এবং স্বামী তৃতীয়…তারপর অন্যরা। সেই স্বামীকে একা ফেলে রেখে মেয়ের সঙ্গে ঘুমুতে আসা খুবই অন্যায়। মানুষটার রাতের বেলা কতকিছুর দরকার হতে পারে হয়ত একগ্লাস পানি খাবে, ঘুম আসছে না, মাথার যন্ত্রণা মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া দরকার, মশারির ভেতর মশা ঢুকেছে। কানের কাছে পিনপিন করে বিরক্ত করছে। সেই মশা মারা দরকার। তিনি তার কিছুই করতে পারছে না। এটা ভেবে তার খুবই খারাপ লাগে। আবার ঘুমুতে যাবার আগে আগে মেয়ের সঙ্গে গুটুর-গুটুর করে যে অনেক কথা বলেন সেটা তার খুবই ভাল লাগে। তবে ইদানিং মেয়ের কথাবার্তা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। সে ঘুরেফিরে তার স্যারের কথা বলছে। যে মেয়ে বড় হয়েছে তার মুখে ঘনঘন একজন মানুষের কথা আসা খুবই ভয়ের কথা। তিনি এখনো এই বিষয়ে মেয়েকে কিছু বলছেন না। তবে যে-কোন এক রাতে বলবেন। সেটা আজ রাতেও হতে পারে। না আজ রাতে কিছু বলবেন না। আজ মেয়েটার শরীর ভাল না। জ্বর এসেছে। গা গরম। এটা একটা দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে গেল। মেয়েটার অসুখবিসুখ লেগেই আছে। ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কোন ভাল ডাক্তার দেখানো দরকার।

আমেনা বেগম ঘুমন্ত শেফার গায়ে চাদর দিয়ে দিলেন। শেফা সঙ্গে সঙ্গে সেই চাদর ফেলে দিল। আমেনা বেগম বললেন, তুই জেগে আছিস।

শেফা বলল, হ্যাঁ।

শরীর বেশি খারাপ লাগছে?

না শরীর অল্প খারাপ, মন বেশি খারাপ।

মন খারাপ কি জন্যে?

রফিক স্যারকে একটা জিনিস ময়মনসিংহ থেকে আনতে বলেছিলাম। আনে নাই।

কি জিনিস?

রবারের চুড়ি।

রবারের আবার চুড়ি হয় নাকি?

হয়, রবারের চুড়ি হয়। নতুন বের হয়েছে।

তারে তুই চুড়ি আনতে বলছিলি কি জন্যে? সে মাস্টার মানুষ।

মাস্টার মানুষ চুড়ি আনতে পারবে না? নাকি আনলে সেটা বিরাট দোষ। জেল-জরিমানা হবে।

আমেনা বেগম মেয়ের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন মাথার যন্ত্রণা আছে? টিপে দেই?

শেফা বিছানায় উঠে বসল। আমেনা বেগম বললেন, কি হয়েছে?

শেফা বলল, দেখে আসি।

কি দেখে আসবি?

দুরবিন কতদূর হয়েছে দেখে আসি।

আমেনা বেগমের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মেয়েটা বলে কি। গভীর রাতে সে কার কাছে যেতে চায়।

শেফা বলল, স্যার বলেছেন দুরবিন তৈরি হয়ে গেলে সেই দুরবিনে প্রথম চাঁদ দেখব আমি।

তুই প্ৰথম কেন দেখবি? তোর প্রথম দেখার দরকার কি?

সেটা তো মা আমি জানি না। কে প্রথম দেখবে কে দুই নম্বরে দেখবে সেটা আমি ঠিক করি নাই। স্যার ঠিক করেছেন। তুমি উনাকে জিজ্ঞেস করে দেখ।

আমেনা বেগম অবাক হয়ে দেখলেন শেফা তড়তড় করে বিছানা থেকে নামহে। এই মেয়েকে এখন আটকানো যাবে না। কাজেই এখন যা করতে হবে তা হল—তাকে সঙ্গে যেতে হবে। মেয়ের সঙ্গে মা থাকলে আর কোন দোষ থাকে না। কোন কারণে যদি ইয়াসিন সাহেবের ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি জানালা দিয়ে দেখেন গভীর রাতে মা-মেয়ে রফিকের সঙ্গে কথা বলেছে তিনি কিছু মনে করবেন না। কিন্তু তিনি যদি দেখেন মেয়ে একা কথা বলছে—তাহলে বাড়িতে গজব হয়ে যাবে। বাড়ির পেছনের জঙ্গলে গর্ত করে মেয়েকে জীবন্ত পুঁতেও ফেলতে পারেন।

স্যার দুরবিন তৈরি হয়েছে?

প্রায়।

প্রায় কেন, বাকি আছে কি?

চোঙটা আরো বড় করতে হবে। বেশি না সামান্য করলেই হবে।

কতক্ষণ লাগবে?

ধর ঘণ্টা খানিক।

আমেনা বেগম বললেন, এখন রেখে দাও। ঘুমুতে যাও। যা করার সকালে করবে।

রফিক নিচু গলায় বলল, এখন ঘুমাতে গেলে ঘুম আসবে না। মনটা এখানে পড়ে আছে।

শেফা বলল, স্যার আপনার কিছু লাগবে? রফিক বলল, না কিছু লাগবে। না।

এবাপ চা বানায় এনে দিব?

না লাগবে না।

কোন সাহায্য লাগবে। করাত দিয়ে কাঠ কাটা, কিংবা শিরিষ কাগজ ঘষা। আমি করাত দিয়ে খুব ভাল কাঠ কাটতে পারি। কোন্ কাঠটা কাটতে হবে আপনি দেখায় দেন, আমি চোখের নিমিষে কেটে দেব।

কাঠ কাঠতে হবে না। কাটাকাটির কাজ শেষ। এখন শুধু জোড়া দেয়া।

আমেনা বেগমের বুক ধড়ফড় করছে। মেয়ে এভাবে কথা বলছে কেন? তার গলার স্বর কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়েও আছে। রফিকের দিকে। একবারও চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। তিনি মেয়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে ঘরে চলে এলেন। ব্যবস্থা নিতে হবে। খুব সূক্ষ্ম ব্যবস্থা। কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে এমন ব্যবস্থা। রফিককে এ বাড়িতে রাখা যাবে না।

অসম্ভব।

শেফা বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। আমেনা বেগমের ঘুম আসতে অনেক দেরি হল। সেই ঘুমও ভাল হল না। একটু পর পর ঘুম ভেঙে যায়। যতবার ঘুম ভাঙে তিনি জানালার কাছে যান এবং দেখতে পান রফিক চোখ লাগিয়ে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। এই ছেলের কি ক্লান্তি বলে কিছু নাই?

শেষবার জানালা থেকে ফিরে বিছানায় উঠতে যাবেন, শেফা বলল, মা স্যার কি এখনো চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন?

আমেনা বেগম চাপা গলায় বললেন, তুই জানলি কিভাবে?

তুমি যেমন একটু পরপর দেখে আসছ আমিও দেখে আসছি। আমি যখন দেখতে যাই তুমি তখন গভীর ঘুমে থাক বলে কিছু বুঝতে পার না।

আমেনা বেগম লক্ষ করলেন মেয়ে কাঁদছে। কান্নার কোন শব্দ হচ্ছে না, তবে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। মেয়ের এই কান্নার ভঙ্গি তার চেনা।

তুই কাঁদতেছিস কি জন্যে?

স্যার বলেছিল আমি প্রথম দেখব। এখন সে নিজে দেখতেছে। আমার কথা তার মনেই নাই। মা স্যারকে তুমি বলবা সে যেন আমাদের বাড়িতে আর না থাকে, অন্য কোথাও চলে যায়। আমি এই স্যারের কাছে পড়ব না। এই স্যার কেন, আমি কোন স্যারের কাছেই পড়ব না।

শেফা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমেনা বেগম মনে মনে বলছেন কি সর্বনাশ! কি সৰ্বনাশ।

সর্বনাশ তো বটেই। নাম-পরিচয় নেই এক ছেলে। বড় হয়েছে এতিমখানায়। সেই ছেলের কথা ভেবে তার মেয়ে চোখের পানি ফেলছে। এমন ভয়ংকর কথা তো কাউকে বলা যাবে না। কেউ জানতে পারলেও সর্বনাশ হয়ে যাবে।

ছেলেকে এই বাড়িতে থাকতে দেয়াই ভুল হয়েছে। সাধারণ ভুল না, বড় ভুল। মানুষ যখন ছোটখাটো ভুল করে তখন বুঝতে পারে। বড় ভুল করার সময় কিছু বুঝতে পারে না। বুঝতে পারলে মানুষ বড় ভুল করতে পারত না।

শেফার বাবা যখন বললেন, শেফার জন্যে একটা ভাল ছেলের সন্ধান পেয়েছি। তখন আমেনা বেগম আনন্দিত গলায় বলেছিলেন, পাত্র কি করে? এতে শেফার বাবা খুবই রেগে গিয়ে বললেন-পাত্র কি করে মানে? পাত্রের কথা আসছে কেন? শেফাকে পড়াবে এমন একজনের কথা বলতেছি। শেফাকে তো মেট্রিক পাস করা লাগবে।

আমেনা বেগম খুবই লজ্জা পেয়েছিলেন। রফিক প্রথম যেদিন এ বাড়িতে থাকতে এল তখনও লজ্জা পেলেন। ভিন্ন কারণে লজ্জা পেলেন। রফিকের জন্যে দুপুরে ভাত পাঠিয়েছেন। প্রথমদিন সেই হিসেবে খোঁজ নিতে গিয়েছেন।

রফিক মাথা নিচু করে খাচ্ছিল; আমেনা বেগমকে দেখে মাখা আরো নিচু করে ফেলল। আমেনা বেগম ছেলেটাকে দেখে মুগ্ধ হলেন—সুন্দর চেহারা। বড় বড় চোখ। চোখ দেখেই মনে হয় খুব বুদ্ধি। আমেনা বেগম বললেন, নিজের বাড়ি মনে করে থাকবা। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে খবর পাঠাবা।

রফিক মাথা আরো নিচু করে বলল, জ্বি আচ্ছা।

জুম্মাবারে অবশ্যই নামাজে যেতে হবে। এই বাড়িতে যারা থাকে তারা যদি জুম্মাবারে নামাজে না যায় তাহলে শেফার বাবা খুব রাগ করে।

রফিক আবারো বলল, জ্বি আচ্ছা।

আমেনা বেগম বললেন, তোমার দেশের বাড়ি কোথায়?

রফিক বলল, আমি ঠিক জানি না।

আমেনা বেগম বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি জান না মানে কি? তোমার পিতা-মাতা কোথায় থাকেন?

এটাও আমি জানি না। ছোটবেলার কোন স্মৃতি আমার নাই। আমি বড় হয়েছি এতিমখানায়।

আমেনা বেগম খুবই লজ্জা পেলেন। শেফার বাবা যদি ছেলে প্রসঙ্গে এই কথাগুলি আগে বলে রাখতেন তাহলে তিনি রফিককে এ ধরনের কথা বলে লজ্জা পেতেন না।

ছেলেটার জন্যে সেদিন তিনি খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। মনে মনে ভেবেছিলেন তোমার কষ্টের দিন শেষ হয়েছে। এই বাড়িতে তুমি আশ্রয় পেয়েছ এখন তোমার আর চিন্তা নাই। শেফার বাবা অতি বদমেজাজি মানুষ, তবে অতি ভাল মানুষ। সে তোমার একটা না একটা গতি করে দিবে।

আমেনা বেগম প্রথমদিন ছেলেটির প্রতি যে মমতা বোধ করেছিলেন আজও সেই মমতা বোধ করছেন, তবে একই সঙ্গে তাঁর বুক কঁপছে। তার মন বলছে ভয়ংকর এক সময় তাঁর সামনে। তিনি তাঁর মেয়েকে নিয়ে মহাবিপদে পড়তে যাচ্ছেন। আল্লাহপাক সাহায্য না করলে তিনি এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবেন না।

শেফা আরাম করে ঘুমুচ্ছে। মায়ের মানসিক যন্ত্রণার কথা মেয়ে কিছুই জানে না। আমেনা বেগম শেফার গায়ে হাত রাখলেন।

শেফা বলল, ছটফট করছ কেন মা। তোমার কি হয়েছে।

ছটফট করতেছি তোরে কে বলেছে?

কেউ বলে নাই। বুঝতে পারি। মা, রফিক স্যার কি এখনো উঠানে বসা?

হুঁ।

চোখে দুরবিন?

না দুরবিন নাই।

কাঠের মূর্তির মত চুপচাপ বসে আছে, ঠিক-না মা?

হুঁ।

স্যারের একটা ব্যাপার কি জান মা? স্যার ঘন্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে কি যেন চিন্তা করে।

কি চিন্তা করে?

জিজ্ঞেস করলে কিছু বলে না, হাসে। একবার শুধু বলেছিল—হিসাব করে। হিসাব নাকি মিলে না।

কি হিসাব করে?

জিজ্ঞেস করেছিলাম মা। কিছু বলে না। স্যারের একটা মস্ত বড় গুণ কি জান মা? স্যার যে কোন অংক মুখে মুখে করতে পারে। কাগজ-কলম লাগে না।

ও।

যে-কোন অংক স্যারকে দিয়ে শুধু বলবে, উত্তর কত? স্যার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর বলবে।

অংক ভাল জানে বলেই তো তোর বাবা তাকে রেখেছে তোকে পড়াবার জন্যে।

অংক ভাল জানা এক কথা আর মুখে মুখে অংক করা আরেক কথা।

ঘুমাতো, স্যারকে নিয়ে এত কথা বলার দরকার নাই।

সান্দিকোনা স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব আগামী বুধবার রফিক স্যারকে নিয়ে একটা অংক খেলার আয়োজন করেছেন। খুবই মজার খেলা। খেলাটা কি রকম বলব?

বল।

ব্ল্যাকববার্ডে দশটা অংক লেখা থাকবে। রফিক স্যার অংকগুলি করবেন মুখে মুখে আর বাকি যারা আছে তারা করবে ক্যালকুলেটর দিয়ে।

আচ্ছা ঠিক আছে শুনলাম।

মা, তুমি একটা কাজ করতে পারবে?

কি কাজ?

পাকঘরে গিয়ে এককাপ চা বানায়ে দিবে। স্যার সারারাত জেগে আছে তো, সকালবেলা এককাপ চা পেলে খুব খুশি হবে। চা-টা আমি হাতে করে নিয়ে যাব মা।

আমেনা বেগম আবারো চমকালেন। কি ভয়ংকর কথা। কি মহাবিপদ তাঁর সামনে। তিনি এই বিপদ কি করে সামলাবেন। এত বুদ্ধি কি তাঁর আছে? বুদ্ধি আছে শেফার বাবার। যে-কোন বিপদ, যে-কোন সমস্যা এই মানুষটা সামাল দিতে পারে। কিন্তু এই বিপদের কথা তাঁকে কিছুতেই বলা যাবে না।

কই মা, শুয়ে আছ কেনচা বানাতে যাও। আচ্ছা ঠিক আছে তোমাকে চা বানাতে হবে না। আমি নিজেই বানাব।

শেফা খাট থেকে নামছে। আমেনা বেগমের হাত-পা জমে যাচ্ছে। কি হতে যাচ্ছে।

মসজিদে আজান হচ্ছে। শেফার বাবা এখনি ঘুম থেকে উঠবেন। তিনি যদি দেখেন তার মেয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে…না তিনি আর ভাবতে পারছেন না। তার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

০২. খুব ঠাণ্ডা লাগছে

খুব ঠাণ্ডা লাগছে। ভয়াবহ ঠাণ্ডা। হাত-পা-শরীর সব যেন জমে যাচ্ছে। এরকম কেন হচ্ছে? রফিকের গায়ে গরম কাপড়, মাথায় কানঢাকা টুপি। চোখে কালো চশমা। এই চশমা মুখের উপর চেপে বসে আছে। নিশ্বাস নেবার জন্যে নাকে কিছু একটা লাগানো আছে। তার পায়ে জুতা, সেই জুতা হাঁটু পর্যন্ত এসেছে। কোমরে বেল্ট বাধা। বেল্ট থেকে অনেক কিছু ঝুলছে। মাথায় হেলমেট আছে। সেই হেলমেট বেশ ভারি। মাথা সোজা করে রাখতে তার কষ্ট হচ্ছে। সবচে কষ্ট হচ্ছে নিশ্বাস নিতে। খুব বড় করে নিশ্বাস টানার পরেও তার বুক ভরছে না। বাতাসে মনে হচ্ছে অক্সিজেন নেই। ফুসফুসে বাতাস ঢুকছে আর মনে হচ্ছে ফুসফুস ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে।

সে মন্তবড় একটা হলঘরে আছে। সে শুয়ে আছে, না বসে আছে নাকি দাঁড়িয়ে আছে কিছুই বুঝতে পারছে না। এটা কি কোন স্বপ্নদৃশ্য? স্বপ্ন দৃশ্য তো মনে হচ্ছে না। স্বপ্ন দৃশ্যে ঠাণ্ডা-গরমের অনুভূতি থাকে না। রফিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা করল। ঘরের দেয়াল, মেঝে, ছাদ সবই একরকম। সবকিছুই মনে হচ্ছে নীল কাচে তৈরি। নীল কাছ থেকে অস্পষ্ট আলো আসছে। আলো অস্পষ্ট হলেও চোখে লাগছে। ঘরের ছাদ, দেয়াল বা মেঝে কোনদিকেই বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। একদিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকালে যে চোখের আরাম হচ্ছে তাও না। রফিককে ঘনঘন চোখ বন্ধ করতে হচ্ছে।

তার তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে। এই তৃষ্ণাবোধও অন্যরকম। থেমে থেমে হচ্ছে। তৃষ্ণা কিছুক্ষণ পরপর চলে যাচ্ছে। আবার হচ্ছে। যখন তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে তখন হাতের আঙুলগুলির মাথায় চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। রফিক তার চোখের সামনে দুটা হাত তুলল। হাতে গ্লাভস পরা। আঙুল দেখা যাচ্ছে না। গ্লাভসের আঙুলের প্রতিটি মাথা থেকে তার বের হয়েছে। তারগুলির শেষ মাথাটা কোথায় বোঝা যাচ্ছে না।

ঘর পুরোপুরি শব্দহীন। শব্দহীন ঘরেও শব্দ থাকে। এখানে তাও নেই। রফিক বলল, এখানে কে আছেন? কোন উত্তর পাওয়া গেল না। বদ্ধ ঘরে কথা বললে প্ৰতিধ্বনি হবার কথা। কোন প্রতিধ্বনি হচ্ছে না। বরং ঘরের দেয়াল ছাদ-মেঝে সব শব্দ চোষকাগজের মত চুষে নিয়ে যাচ্ছে।

রফিক বলল, আমি কোথায়? আমি জানতে চাচ্ছি আমি কোথায়?

কেউ কোন জবাব দিল না। রফিক আবার বলল, আমি কোথায়?

ঘরের আলো হঠাৎ খানিকটা বাড়ল। নিশ্বাস নিতে এতক্ষণ রফিকের যে কষ্ট হচ্ছিল হঠাৎ সেই কষ্ট কমে গেল। রফিকের মনে হল সে স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নিতে পারছে। তবে পানির তৃষ্ণা হঠাৎ যেন বেড়ে গেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এখন পুরো একবালতি পানি একচুমুকে খেয়ে ফেলতে পারবে।

কেউ কি আছেন যিনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

দুবার ঘণ্টা বাজার মত শব্দ হল। বর্ষার রাতে বিদ্যুৎ চমকালে ঘর যেমন আলো হয়ে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায় সে রকম হল এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ-গলায় কেউ একজন বলল,

হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি।

আমি কি জানতে পারি আমি কোথায়?

তুমি জান না তুমি কোথায়?

না আমি জানি না।

তুমি যে ঘরে আছ সেই ঘর কি তোমার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে না?

না পরিচিত মনে হচ্ছে না। আমি কোথায়?

তোমাকে কিউবিকেলসে রাখা হয়েছে।

কোথায় রাখা হয়েছে।

কিউবিকেলসে।

ব্যাপারটা কি?

ব্যাপারটা কি তুমি জান না?

না আমি জানি না।

আশেপাশের সবকিছুই কি তোমার কাছে অপরিচিত লাগছে?

হ্যাঁ লাগছে।

আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার কাছে আস্তে আস্তে সব পরিচিত। লাগতে শুরু করবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। ধৈর্য ধর। অস্থির হয়ো না। তোমাকে কিউবিকেলসে রাখা হয়েছে।

কেন?

বিজ্ঞানীরা তোমাকে নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করছেন?

আমার কি হয়েছে?

তোমার কি হয়েছে এটা জানার জন্যেই পরীক্ষা-নীরিক্ষা হচ্ছে। তুমি কি তোমার নাম জান?

নাম জানব না কেন? আমার নাম রফিক।

তোমার নাম রফিক না, তোমার নাম রেফ্‌।

আমার নাম রেফ্‌?

হ্যাঁ তোমার নাম রেফ্‌?

আমার খুবই তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে। আমি কি একগ্লাস পানি খেতে পারি?

তোমার কোন তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে না, কাজেই পানি খাবার তোমার কোন প্রয়োজন নেই। তোমার শরীরবৃত্তীয় প্রতিটি কর্মকাণ্ড আমরা মনিটার করছি। তোমার শরীরে রক্তপ্রবাহে সামান্য সমস্যা হচ্ছে। যখন সমস্যাটা হচ্ছে তখনি তুমি তৃষ্ণাবোধ করছ। বল এই মুহূর্তে কি তোমার তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে?

না। আমি কি মুখোমুখি বসে কারো সঙ্গে কথা বলতে পারি? এখন না।

কখন?

তোমাকে কিছু প্রশ্নের জবাব আগে দিতে হবে। তোমার শরীরে এমএফ ৪৫ সিরাম ঢুকানো হয়েছে। এই সিরামের প্রভাব না কাটা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আমি ছাড়া কেউ কথা বলবে না।

আপনি কে?

আমি মূল কম্পিউটারের অংশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। অষ্টম ধারার রোবট। তোমার দায়িত্বে আমাকে রাখা হয়েছে। গত চার বছর ধরে আমি তোমার দেখাশোনা করছি।

গত চার বছর ধরে আমি এখানে আছি?

হ্যাঁ। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমি গত তিনমাস ধরে আছি ইয়াসিন সাহেবের বাসায়। তার আগে ছিলাম সালাম সাহেবের বাড়িতে। সালাম সাহেব সখিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

রেফ্‌।

আমাকে বলছেন?

হ্যাঁ তোমাকে বলছি। আমি এখন প্ৰশ্ন শুরু করব তুমি প্রশ্নের উত্তর দেবে।

আমি প্রশ্ন করার পরপরই একটা ছোট্ট ঘণ্টা বাজবে। ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে নীল আলোর ঝলকানি হবে। তার পরপরই ঘর অন্ধকার হয়ে যাবে। তখন তুমি প্রশ্নের উত্তর দেবে। দ্বিতীয় প্রশ্নের সময় আবারো নীল আলোর ঝলক দেখবে। তোমাকে যা মনে রাখতে হবে তা হচ্ছে নীল আলো থাকা অবস্থায় কখনো প্রশ্নের উত্তর দেবে না।

আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে। প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে অন্ধকারে।

এমএফ ৪৫ সিরামের কারণে এটা হচ্ছে। শারীরিক এই অস্বস্তি সাময়িক। এমএফ ৪৫ খুবই ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ড্রাগ।

এই ড্রাগ আমাকে দেয়া হচ্ছে কেন?

এই ড্রাগ তোমাকে দেয়া হচ্ছে যাতে তুমি সত্যি কথা বল। প্রশ্নের সত্যি জবাব দাও। এই ড্রাগ মানুষের মিথ্যা বলার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এখন প্রশ্নপর্ব শুরু হচ্ছে। তুমি কি প্রস্তুত?

আমার শরীর খুবই খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি প্রশ্নের উত্তর দেব।

প্রথম প্রশ্ন—তোমর নাম কি?

আমি এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছি।

আবার জবাব দাও।

আমার নাম রফিক। রেফ্‌ নামটি কি তোমার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে?

না।

কিউবিকেলস-এর ভেতর তুমি জেগে উঠলে। জেগে ওঠার আগে তোমার স্মৃতি কি? তুমি বলছ তুমি রফিক। রফিক, তুমি এখানে জেগে ওঠার আগে কি করছিলে?

চাঁদ দেখছিলাম।

পুরো ঘটনা বল।

আমি একটা টেলিস্কোপ বানিয়েছিলাম। সেই টেলিস্কোপে চাঁদ দেখছিলাম।

তোমার আশেপাশে কে ছিল?

কেউ ছিল না, তবে রাত যখন কাটল তখন আমার জন্যে চা নিয়ে এল শেফা।

কি নাম বললে?

শেফা।

নামটা আবার বল।

শেফা।

সে চা নিয়ে উপস্থিত হল?

জ্বি।

তুমি চা খেলে?

জ্বি।

তোমাদের ভেতর কোনো কথা হয়েছে?

শেফা খুব রাগ করল।

রাগ করল কেন?

কারণ আমি তাকে বলেছিলাম যে টেলিস্কোপটা তৈরি হবার পর তাকে প্রথম চাঁদ দেখতে দেব। তারপর ভুলে গেছি। এই নিয়ে রাগ করল।

তারপর কি হল?

শেফার মা শেফাকে ডেকে ঘরে নিয়ে গেলেন।

তুমি যে টেলিস্কোপটি তৈরি করলে তার ম্যাগনিফিকেশন কি তোমার মনে আছে?

১০০x

অবজেকটিভ এবং আই পিস-এর ফোকাল লেংথ মনে আছে?

মনে আছে। বলব?

না বলার দরকার নেই। যে মেয়েটি তোমার জন্যে চা নিয়ে এসেছিল তার নাম আবার বল।

তার নাম শেফা। ভাল নাম শেফালী। শেফালী বেগম থেকে শেফা।

চা খাওয়া শেষ হবার পর তুমি কি করলে?

আমার ঘুম পাচ্ছিল। সারারাত জেগে ছিলাম। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। ঘুমুতে গেলাম। ঘুম ভাঙার পর দেখি আমি এই জায়গায়।

তোমাকে যে এমএফ সেরাম দেয়া হয়েছিল তার প্রভাব শেষ হয়ে আসছে। আমাদের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব এক্ষুণি শেষ হবে। শেষ প্রশ্ন যে মেয়েটি তোমার জন্যে চা নিয়ে এসেছে তার নাম কি?

আমি অনেকবার এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছি।

আবার দাও।

মেয়েটির নাম শেফা।

তুমি কি আমার নাম জান?

তুমি বলেছ তুমি একটা কম্পিউটার। কম্পিউটারের মানুষের মত নাম থাকে বলে আমি জানি না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কম্পিউটার যে রোবট বহন করে তার মানুষের মত নাম আছে। আমার নাম শেফ্‌।

তোমার কি নাম বললে?

আমার নাম শেহ্। তোমার কাছে যে মেয়েটি চা নিয়ে গিয়েছিল তার নাম শেফা। তুমি কি এই দুটি নামের মধ্যে মিল দেখতে পাচ্ছ?

পাচ্ছি। আমি আর আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে।

ঘুমিয়ে পড়।

আমার খুব পিপাসা পেয়েছে। ঠাণ্ডা পানি খেতে হবে। দয়া করে একগ্লাস পানি খাবার ব্যবস্থা করে দিন।

তোমার কোন তৃষ্ণা পায় নি। তোমার রক্তে ইলেকট্ৰলাইটের সামান্য অভাব হয়েছে। এমএফ সিরাম রক্ত থেকে ইলেকট্ৰলাইট নিয়ে নেয়। তোমাকে বাইরে থেকে ইলেকট্ৰলাইট দেয়া হচ্ছে। এক্ষুণি তোমার তৃষ্ণা কেটে যাবে। তোমার খুব ভাল ঘুম হবে। চোখ বন্ধ করে ফেল।

রফিক চোখ বন্ধ করল।

বল একশ এক

রফিক বলল, একশ এক…

এখন বল একশ দুই।

একশ দুই।

বল একশ তিন

একশ তিন।

একশ সাত পর্যন্ত এসেই রফিক গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সে কতক্ষণ ঘুমাল সে নিজেও জানে না। তার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। শীতের ব্যাপারটি নেই। শরীর হালকা লাগছে। তার নাম যে রেফ এটা এখন তার কাছে পরিষ্কার। দীর্ঘদিন ধরে তার চিকিৎসা চলছে এ ব্যাপারটা সে এখন ধরতে পারছে। হাসপাতালে আসার আগে যে ছোট্ট ঘরে থাকত সেই ঘরের ছবিও চোখে ভাসছে। তার পেশা কি ছিল তা এখনো মনে পড়ছে না। তবে নিশ্চয়ই মনে পড়বে। মস্তিষ্ক জেগে উঠতে শুরু করেছে। পুরোপুরি জাগতে সময় লাগবে।

সুন্দর সাজানো ছোট্ট ঘর। জানালার কাছে আরামদায়ক বিছানা। জানালা দিয়ে দূরের ঝাউবন এবং ঝাউবনের ফাঁকে ফাঁকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের পানির রঙ গাঢ় নীল। ঝাউগাছের পাতা নড়ছে না। পাতা মোটামুটি স্থির। তবে সমুদ্রে প্রচুর ঢেউ। ঢেউ-এর আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

তার খাটের পাশে চশমা চোখে একজন বুড়ো মানুষ বসে আছেন। সোনালি ফ্রেমের চশমায় তাঁকে সুন্দর দেখাচ্ছে। মানুষটার মাথার সমস্ত চুল ধবধবে শাদা। তিনি কিছুক্ষণ পরপরই চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটছেন এবং বিলি কাটার সময়ে হাসছেন। চুলে বিলি কাটা এবং হাসি দুটিই একসঙ্গে চলছে। মনে হচ্ছে তার চুলের গোড়ায় সুড়সুড়ি আছে। আঙুল লাগলেই হাসি পায়।

বৃদ্ধ তার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, রেফ কেমন আছ?

ভাল।

ঘুম কেমন হয়েছে?

ভাল ঘুম হয়েছে।

শরীর কি ফ্রেস লাগছে?

লাগছে।

তাহলে শুয়ে না থেকে উঠে বোস। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাও। তোমার মন ভাল হয়ে যাবে। আজকের সমুদ্র অস্বাভাবিক নীল। তাছাড়া খুব ঢেউ হচ্ছে।

রে উঠে বসল। তার গায়ে বাদামি রঙের একটা পাতলা কম্বল। সে গায়ে কম্বল জড়িয়েই জানালা দিয়ে তাকাল।

বুড়ো ভদ্ৰলোক বললেন, সুন্দর লাগছে কিনা বল?

খুব সুন্দর লাগছে।

খিদে লেগেছে? কিছু খাবে?

সে জানালা থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, খিদে লেগেছে কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।

বুড়ো জ্বলোক বললেন, কফি খেলে কেমন হয় বল তো। আমার কফি খেতে ইচ্ছা করছে। দুকাপ কফি নিয়ে আসি। কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

রেফ্‌ কিছু বলল না। সে একদৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। সিবিচে একটা মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার হাতে লাল ছাতা। মেয়েটি নাচের ভঙ্গিতে লাল ছাতা দোলাচ্ছে। রেফ্‌ এখন আর সমুদ্র দেখছে না। সে দেখছে মেয়েটাকে। মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। ছাতা দিয়ে সে তার মুখ ঢেকে ফেলেছে।

কফি নাও।

সে কফির কাপ হাতে নিল। একটা চুমুক দিয়ে বুড়ো ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, প্রফেসর বার্ন, জানালা দিয়ে যে সমুদ্র আমি দেখছি এটা তো একটা কৃত্রিম সমুদ্র। তাই না?

হ্যাঁ তাই। কৃত্রিম তো বটেই। পর্দায় তৈরি করা ইমেজ। তোমার জানালার কাচে সমুদ্রের ইমেজ তৈরি করা হয়েছে। ইমেজটা নিখুঁত কি না বল।

অবশ্যই নিখুঁত। কেউ বলে না-দিলে কারো বোঝার সাধ্যও নেই নকল সমুদ্র দেখছি। প্রফেসর বার্ন!

বল কি বলবে?

কফি খেতে খুব ভাল লাগছে। আপনাকে ধন্যবাদ।

আমাকে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই, ভাল কফি বানানোর কোন কৃতিত্ব আমার না। কফি-মেশিন কফি দিয়েছে। তবে এই কফিও নকল। আধুনিক ফুড মেকার মেশিনগুলি অসাধারণ। নকল-আসল বোঝার কোন উপায় নেই। তুমি কি আরেক কাপ খাবে?

জ্বি না। আচ্ছা প্রফেসর বার্ন এই সেনিটোরিয়ামে আমার মত রোগী কি আরো আছে?

এই সেনিটোরিয়ামে অনেকেই আছে। তবে একেকজনের সমস্যা একেক রকম। কারো সমস্যার সঙ্গে অন্য কারোর সমস্যার কোন মিল নেই।

আমরা রোগীরা কি একই সমুদ্র দেখছি, নাকি একেকজন একেক রকম সমুদ্র দেখছি।

জানালা দিয়ে কে কি দেখবে তা রোগীর সাইকোলজিক্যাল প্রফাইল দেখে তৈরি করা হয়। সবাই তো আর সমুদ্র পছন্দ করে না। কাজেই কেউ দেখছে। অরণ্য, কেউ শহর দেখছে।

আমার যদি এখন সমুদ্র না দেখে অন্য কিছু দেখতে ইচ্ছা করে আমি কি তা পারব?

না পারবে না। তুমি কি দেখবে-না-দেখবে তা তোমার দায়িত্বে নিয়োজিত রোবট ঠিক করে দেবে। তার কাছে তোমার পুরো ডিএনএ ম্যাপিং আছে। তুমি নিজেকে যতটা চেন এই রোবট তোমাকে তারচে অনেক ভাল চেনে।

প্রফেসর বার্ন উঠে দাঁড়ালেন। রেফ্‌ সমুদ্রের দিক থেকে তার চোখ ফিরিয়ে নিল। শান্ত গলায় বলল, প্রফেসর আমার বিষয়ে আপনাদের সিদ্ধান্ত কি?

কোন্ সিদ্ধান্তের কথা বলছ?

আপনারা কি আমাকে ছেড়ে দেবেন? না আরো পরীক্ষা-নীরিক্ষা করবেন?

বুঝতে পারছি না।

আপনাদের পরীক্ষা কি শেষ হয়েছে, নাকি বাকি আছে?

পরীক্ষা শেষ হয়েছে।

পরীক্ষার ফলাফল কি? আমার অসুখটা কি?

আমরা তোমার অসুখের কোন নাম দিতে পারছি না। আপাতত কেইস স্ট্যাডি DA 001 এই নামে চলছে। তোমার স্বপ্ন-সংক্রান্ত জটিলতা হচ্ছে। তুমি দীর্ঘ স্বপ্ন দেখছ। স্বপ্নগুলি সত্য মনে হচ্ছে। তোমার মস্তিষ্কে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল ঠিকমত প্রসেস করতে পারছে না। খানিকটা এলোমেলো করে দিচ্ছে। যে কারণে তোমার মস্তিষ্ক ধরতে পারছে না, কোন্ জগৎটি সত্যি। স্বপ্নের জগৎটি সত্যি না বাস্তবের জগৎটি সত্যি।

এমন কি হতে পারে যে দুটিই সত্যি?

না হতে পারে না।

হতে পারে না কেন?

একই সময়ে একটি বস্তু দুই জায়গায় থাকতে পারে না।

সাব-এটমিক পার্টিকেল কিন্তু এটা পারে।

তুমি কোন সাব-এটমিক পার্টিকেল নও। তুমি একজন মানুষ।

রেফ্‌ কফির কাফ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, এখন আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন।

প্রফেসর বার্ন শান্ত স্বরে বললেন-আমি প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করব।

এখন তো আমি জেগে আছি। আমার সামনে আপনি বসে আছেন, একটু আগে কফি খেলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সমুদ্র দেখলাম এটা কি স্বপ্ন না সত্যি।

প্রফেসর বাৰ্ন হেসে ফেললেন, হাসতে হাসতে বললেন, এটা স্বপ্ন না। এটা সত্যি। গায়ে চিমটি কেটে দেখ ব্যথা পাবে।

এত নিশ্চিত হয়ে বলছেন কিভাবে?

নিশ্চিত হয়ে বলাটাই কি স্বাভাবিক না। আমরা তোমার চিকিৎসা শুরু করেছি তোমার স্বপ্ন-সংক্রান্ত সমস্যার কথা জেনে।

সমস্যার কোন সমাধান আপনাদের কাছে নেই?

না। আমারা গত চার বছর ধরে আমার চিকিৎসা করছেন?

হ্যাঁ চার বছরের কিছু বেশি।

চিকিৎসায় যখন কোন লাভ হচ্ছে না তখন আমাকে ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?

বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ নির্দেশ আছে তোমাকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখার। তাছাড়া মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দেয়া হয় না। বিজ্ঞান কাউন্সিল এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠিন।

আমার ধারণা আমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এই ধারণা কি সত্যি?

প্রফেসর বার্ন জবাব দিলেন না। মাথার চুল টানতে লাগলেন এবং হাসতে লাগলেন। রেফ্‌ বলল, বিজ্ঞান কাউন্সিলের কারো সঙ্গে কি আমি কথা বলতে পারি?

না পার না। সাধারণ একজন মানসিক রোগীর সঙ্গে বিজ্ঞান কাউন্সিলের কেউ কথা বলবেন না।

আমাকে সাধারণ একজন মানসিক রোগী ভাবা হচ্ছে? হ্যাঁ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি কম্পিউটার আমার দেখাশোনা করছে। সে অষ্টম ধারার রোবট, বিজ্ঞান কাউন্সিল সাধারণ একজন মানসিক রোগীর পেছনে এমন একটি কম্পিউটার সার্বক্ষণিকভাবে ব্যবহার করবেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

না। বিশ্বাসযোগ্য না।

কাজেই আমি সাধারণ একজন মানসিক রোগী না। আমি বিশেষ কিছু। সেই বিশেষ কিছুটা কি আমি জানতে চাচ্ছি। আমার ধারণা বিজ্ঞান কাউন্সিল এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে পারে। আমিও বিজ্ঞান কাউন্সিলকে সাহায্য করতে পারি।

আমি তোমার প্রস্তাব বিজ্ঞান কাউন্সিলকে পৌঁছে দেব।

ধন্যবাদ। আমি কি আরেকটি অনুরোধ আপনাকে করতে পারি।

অবশ্যই পার তবে অনুরোধ রক্ষা করতে পারব কি না সেটা বলতে পারছি না। আমার ক্ষমতা সীমিত।

আমি কি স্বপ্ন দেখি তা তো আপনারা জানেন।

হ্যাঁ জানি।

শুরু থেকে এই পর্যন্ত কি কি স্বপ্ন দেখেছি তা আমি জানতে চাই। আমার ফাইলটা আমি নিজে পড়তে চাই।

মানসিক রোগীকে কখননা তার নিজের ফাইল দেখতে দেয়া হয় না।

নিয়মের ব্যতিক্রম কি করা যায় না।

না যায় না।

রে বিছানা থেকে নামার সঙ্গে ঘরটা লম্বাটে হয়ে গেল। জানালা অদৃশ্য। জানালার পাশে খাট, খাটের উপর রাখা কম্বল সবই অদৃশ্য। এখন এটা আর ঘর না, লম্বা টানা-বারান্দা। বারান্দাভৰ্তি ফুলের টব। বারান্দার বাইরে বাগান। গাছভর্তি ফুল দূরের সমুদ্রও বাগান থেকে দেখা যাচ্ছে। বারান্দা তৈরি হয়েছে তার হাঁটার জন্যে। যতক্ষণ সে হাঁটবে ততক্ষণ বারান্দা থাকবে। গাছভর্তি নকল ফুল থাকবে, নকল সমুদ্র থাকবে। সে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তার পাশে একটা চেয়ার তৈরি হয়ে যাবে। সে চেয়ারে বসে বিশ্রাম করতে পারবে।

সে বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটল। তার ইচ্ছা করছে বারান্দা থেকে নেমে বাগানের দিকে যেতে। সে-চেষ্টা করে লাভ নেই। বারান্দা থেকে নামা যাবে না। তার চারদিকে কঠিন দেয়াল। দেয়ালে বাগান বা সমুদ্রের ছবি ভেসে উঠছে। হাত বাড়ালেই দেয়াল ছোঁয়া যাবে। হাত বাড়াতে ইচ্ছে করছে না। খোলা বারান্দার একটা বিভ্রম তৈরি হয়েছে। বিভ্রমটা থাকুক।

সে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, কম্পিউটার শেফ কি আছে? আমি কথা বলতে চাচ্ছি। আমি খুব অস্থির বোধ করছি। এই মুহূর্তে আমার কারো সঙ্গে কথা বলা দরকার।

কম্পিউটার শেফ্ এর গলা শোনা গেল। মিষ্টি চাপা গলা। মানুষের গলার স্বর এবং কম্পিউটারের গলার স্বরে একটু তফাত আছে। মানুষের গলার স্বর কথা বলা বন্ধ করার পরেও কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে। কম্পিউটারের গলার স্বর থাকে না।

আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটার শেফ্‌। তুমি অস্থির বোধ করছ কেন?

আমাকে একটা ছোট্ট ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। অস্থির বোধ করার জন্যে এই কারণটাই কি যথেষ্ট না।

ছোট ঘর কেন বলছ। বারান্দার দৈর্ঘ্য একুশ মিটার। তুমি চাইলে এই দৈর্ঘ্য আরো বাড়ানো যাবে। আরো দশ মিটার বাড়িয়ে দেই? তুমি কি চাও?

না আমি চাই না। বারান্দার দৈর্ঘ্য একশ মিটার হলেও আমার কিছু যায়আসে না। কারণ আমি বারান্দায় আটকা পড়ে আছি। বন্দি হয়ে থাকার ব্যাপারটা তোমরা বুঝবে না। কারণ তোমরা জন্ম থেকেই বন্দি।

আমি একেবারেই যে বুঝতে পারি না, তা না। তুমি প্রায়ই ভুলে যাও যে আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কম্পিউটার।

মানবিক আবেগ কি তোমার আছে?

বুদ্ধির সঙ্গে আবেগের কোন সম্পর্ক নেই।

তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছ না। মানবিক আবেগ কি তোমার আছে?

নেই।

কাজেই আমার কষ্ট অনুভব করার কোন কারণ তোমার নেই।

তা অবশ্যি নেই।

এই অবস্থা থেকে আমার মুক্তির কোন উপায় কি আছে?

গত চার বছরে অসংখ্যবার তুমি আমাকে এই প্রশ্ন করেছ। আমি একই। উত্তর দিয়েছি। আবারও প্রশ্ন করছ কেন?

প্রতিবারই প্রশ্ন করার পর মনে হয় হয়ত এ বারের উত্তর অন্যরকম হবে।

না উত্তর অন্যরকম হবে না। বন্দিদশা থেকে তোমার মুক্তির কোন আশা নেই। তোমাকে ঘিরে যে রহস্য তৈরি হয়েছে সেই রহস্য ভেদ না হওয়া পর্যন্ত বিজ্ঞান কাউন্সিল তোমাকে মুক্তি দেবে না। তোমার রহস্যভেদ হবার আশা নেই। বললেই হয়।

অর্থাৎ বাকি জীবন আমাকে এখানে থাকতে হবে? নকল সমুদ্র, নকল। বাগান দেখে কাটাতে হবে?

হ্যাঁ তাই। সমুদ্র দেখে দেখে তুমি যদি ক্লান্ত হয়ে থাক তাহলে সমুদ্রের দৃশ্য বদলাবার ব্যবস্থা আমি করতে পারি। যদিও আমি জানি সমুদ্র ছাড়া অন্য কোন দৃশ্য তোমার ভাল লাগবে না। তোমার সাইকোলজিক্যাল প্রফাইল তাই বলে।

রে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি বাতাসের সঙ্গে কথা বলছি বলে মনে হচ্ছে। কথা বলে আরাম পাচ্ছি না। আমার ভাল লাগছে না।

তুমি চাইলে সামনে আসতে পারি। তখন তো তুমি বলবে যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে না।

বাতাসের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলা ভাল।

রোবট শেকে বারান্দায় আসতে দেখা গেল। কে বলবে সে রোবট। হাসিখুশি কিশোরী মেয়েদের মত মুখ। ছটফটে ভঙ্গি। সে বারান্দায় এসেই প্রায় চেঁচিয়ে ওঠার ভঙ্গিতে বলল, রেফ কেমন আছ।

ভাল। চেঁচামেচি করার দরকার নেই, সহজভাবে কথা বল। তুমি মানুষের মত হবার যত অভিনয়ই কর আমার মাথা থেকে কখনো যাবে না যে তুমি রোবট ছাড়া কিছু না। তুমি খুব ভেবেচিন্তে বল, আমি কি বিশেষ কেউ?

অবশ্যই।

কারণ কি?

কারণ একই সঙ্গে তুমি দুটি ভিন্ন সময়ে বাস করছ বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিভাবে এটা সম্ভব হচ্ছে তা ধরা যাচ্ছে না বলেই বিজ্ঞানীদের ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে।

কোন থিওরি দাড় করানো যায় নি?

না। তুমি টাইম প্যারাডক্স তৈরি করেছ। এই টাইম প্যারাডক্সে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই।

হাস্যকর কথা নয় কি?

বিজ্ঞান এর চেয়ে অনেক হাস্যকর ব্যাপার স্বীকার করে নিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান একই সঙ্গে যুক্তি এবং যুক্তিহীনতার বিজ্ঞান। আপাতদৃষ্টিতে খুবই হাস্যকর মনে হয় এমন সব ব্যাপার বিজ্ঞান স্বীকার করে নিয়েছে।

বিজ্ঞান কাউন্সিল আমাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত কি করবে?

খুব সম্ভব মেরে ফেলবে। তাদের ধারণা হতে পারে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা পরবর্তীতে অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

তোমার ধারণা তারা আমাকে মেরে ফেলবে?

হ্যাঁ আমার তাই ধারণা। তোমাকে নিয়ে যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। কাজেই…।

কবে নাগাদ তারা আমাকে মেরে ফেলতে পারে বলে তুমি মনে কর?

যে-কোন সময় পারে। ঘটনা আজও ঘটতে পারে। তবে কাউকে মেরে ফেলতে হলে বিজ্ঞান কাউন্সিলের অনুমোদন লাগে। তোমার ব্যাপারে অনুমোদন জোগাড় করা কঠিন হবে না।

ভাল।

তোমার জন্যে অবশ্যই ভাল। তুমি বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি চাচ্ছিলে। এছাড়া তোমার মুক্তির আর কোন পথ নেই।

রে কঠিন গলায় বলল, তোমাকে খুব আনন্দিত মনে হচ্ছে। আমি জানি অষ্টম ধারার রোবটদের মাথায় মানবিক আবেগসম্পন্ন কম্পিউটার বসানো আছে। মানবিক আবেগসম্পন্ন কেউ আমার পরিণতি জেনে আনন্দিত হতে পারে না।

সরি।

আচ্ছা শোন, যখন আমি সুস্থ ছিলাম অর্থাৎ স্বপ্নপর্ব শুরু হবার আগে আমার পেশা কি ছিল।

তুমি ছিলে প্রবলেম সলভার।

তার মানে কি?

তোমাকে নানান ধরনের সমস্যার সমাধান করতে দেয়া হত। তুমি তোমার ঘরে বসে বসে সেইসব সমস্যার সমাধান করতে।

কি ধরনের সমস্যার সমাধান করতাম।

এটা বলা যাবে না। এটা ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন।

এই বিষয়ে আমার মাথায় কোন স্মৃতি নেই কেন?

এই বিষয়ের স্মৃতি খুব যত্ন করে মুছে ফেলা হয়েছে।

তুমি কি জান?

আমি অবশ্যই জানি।

আমাকে কিছু বলবে না?

না।

ঠিক আছে তুমি চলে যাও। আমি কিছুক্ষণ একা একা বারান্দায় হাঁটব। যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে না।

আমি যন্ত্র না। আমি অষ্টম ধারার রোবট। অষ্টম ধারার রোবটরা মানুষের খুবই কাছাকাছি। মানুষ এখনো জানে না সে তার কত কাছে। তুমি কি জান যে অষ্টম ধারার রোবট মানুষের প্রেমে পড়তে পারে।

তুমি কি পড়েছ?

প্রেমে পড়ার মত গুণাবলির কাউকে এখনো দেখি নি বলে পড়ি নি। দেখলে হয়ত ঝপ কর প্রেমে পড়ে যাব। তবে তোমার প্রতি আমার খুবই করুণা হচ্ছে। মায়া হচ্ছে। করুণা এবং মায়া থেকেও প্রেম হয়।

ঠিক আছে এখন যাও।

শেফ্‌ চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে বলল, তোমাকে এতক্ষণ মিথ্যা কথা বললাম। আমার ধারণা আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। তুমি যখন অস্থির বোধ কর, আমিও অস্থির বোধ করি। এবং আমার সারাক্ষণই তোমার আশেপাশে থাকতে ইচ্ছা করে। তুমি আমাকে চলে যেতে বলায় আমার খুবই খারাপ লাগছে।

রেফ্‌ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, বিদেয় হও। প্লিজ বিদেয় হও।

০৩. সান্দিকোনা স্কুলের হেডমাস্টার

সান্দিকোনা স্কুলের হেডমাস্টার বাবু পরিমল চন্দ্রের মুখে হাসি। তাঁর অংক খেলা যে এত জমে যাবে তিনি ভাবেন নি। প্রথমে ভেবেছিলেন অংক খেলার আয়োজন করা হবে স্কুলের কমনরুমে। সকাল থেকেই মানুষের সমাগম দেখে খেলাটা তিনি স্কুলের মাঠে নিয়ে এসেছেন। তিনটা ব্ল্যাকবোর্ড আনা হয়েছে। প্রতিটি বোর্ডভর্তি অংক। সবই বড় বড় সংখ্যার গুণ, ভাগ। ব্ল্যাকবোর্ডগুলি পর্দা দিয়ে ঢাকা। স্কুলের ঘণ্টা বাজানো হবে তখনই পর্দা সরানো হবে। শুরু হবে অংক খেলা। রফিক অংক করবে মুখে-মুখে, বাকি পাঁচজন করবে ক্যালকুলেটার দিয়ে, দুজন করবে লগ-টেবিল দিয়ে।

অঞ্চলের গণ্যমান্যদের দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। তারা সবাই এসেছেন। সান্দিকোনা থানার ওসি সাহেবও সিভিল ড্রেসে এসেছেন। পোস্ট মাস্টার সাহেব এসেছেন। ব্র্যাক নামের এনজিওর লোকজনও আছেন। তাঁরা অবশ্যি যেখানেই জনসমাগম হয় সেখানেই থাকেন। সান্দিকোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব এসেছেন। চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে তাঁর বড়মেয়ের জামাই এসেছেন। এই দ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছেন। তিনি শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। শ্বশুর সাহেব জামাইকে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখাতে এনেছেন। এই সঙ্গে কিছু মজা যদি পায় তাতেই-বা ক্ষতি কি?

বাবু পরিমল চন্দ্রের মুখ হাসি-হাসি হলেও একটু শংকিত বোধ করছেন। তাঁর শংকার কারণ খেলা ঠিকমত জমবে তো? তিনি শুধু লোকমুখে শুনেছেন রফিক বড় বড় অংক মুখে-মুখে করতে পারে। বাস্তবে এই পরীক্ষা কখনো করা হয় নি। যদি দেখা যায় আজ সে কিছুই পারছে না তাহলে বিরাট অপমান হবে।

বাবু পরিমল চন্দ্রের শংকার আরেকটা কারণ হল অঞ্চলের বিশিষ্টজনরা এসেছেন। তাদের সম্মানে চা-নাশতার ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। চায়ের ব্যবস্থা হয়েছে, নাশতার আয়োজন এখনো কিছু হয় নি। স্কুলের ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে দুশ টাকা নিয়ে স্কুলের দপ্তরিকে বাজারে পাঠানো হয়েছে নিমকি মিষ্টি আনার জন্যে। এটা নিয়েও পরে নিশ্চয়ই ঝামেলা হবে। স্কুলবোর্ডের সভায় তাঁকে প্রশ্ন করা হবে ইমার্জেন্সি ফান্ডের টাকা অংক খেলার মত ফালতু বিষয়ে তিনি কেন খরচ করলেন? এমনিতেই স্কুল ফান্ডে কোন টাকাপয়সা নেই। যেখানে সামান্য চক কেনার টাকাও নেই সেখানে খেলাধুলার জন্যে দুশ টাকা। মনে হচ্ছে আজ তার খবর আছে।

বিকাল চারটায় খেলা শুরু হবার কথা। চারটার আগেই মাঠ ভর্তি হয়ে গেল। সান্দিকোনা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জালাল সাহেবকে সভাপতির আসনে বসানো হয়েছে। তাঁর ভাবভঙ্গি থেকে বোঝা যাচ্ছে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দেবেন। দীর্ঘ বক্তৃতা দেবার আগে তাঁর চোখ ঘোলাটে হয়ে যায়। এখনো তাই হয়েছে। তিনি আগে বিএনপি করতেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। বক্তৃতা দেবার সময় পুরনো অভ্যাসে বেফাসে জিয়াউর রহমান সাহেবের কথা হঠাৎ হঠাৎ বলে খুবই বেকায়দায় পড়ে যান। তখন তাঁর বক্তৃতা আরো দীর্ঘ হয়।

হিন্দু মুসলমান হলে যেমন যে-কোন গরু দেখলেই, গরুর পিঠে থাবা দিয়ে জিজ্ঞেস করে—এর গোশত খেতে কেমন হবে? ওনারও সেই অবস্থা হয়েছে। তিনি যে-কোন উপলক্ষেই জ্বালাময়ী আওয়ামী বক্তৃতা দেন। অংক খেলাতেও তিনি এই কাণ্ড করবেন।

জালাল সাহেব হাতের ইশারায় পরিমল বাবুকে ডেকে নিচু গলায় বললেন–শুরু করছেন না কেন?

পরিমল বাবু বললেন, এক্ষুণি শুরু হবে স্যার।

আমার ভাষণটা শুরুতে দিয়ে দেই?

আপনি সভাপতি, আপনি বলবেন সবার শেষে।

শেষে তো লোক থাকবে না। ফাঁকা মাঠে ভাষণ দিয়ে লাভ কি? ভাষণ তো মাঠের জন্যে না, মানুষের জন্যে।

লোক থাকবে। কেউ যাবে না।

মাইকের ব্যবস্থা রাখেন নাই কেন? খালি গলায় ভাষণ ভাল হয় না। সব কিছুরই দস্তর আছে। আগরবাত্তি ছাড়া যেমন মিলাদ হয় না। মাইক ছাড়া ভাষণ হয় না। যান চট করে মাইক আনার ব্যবস্থা করেন।

পরিমল বাবু মাথা চুলকাতে লাগলেন। জালাল মাস্টার বিরক্ত মুখে বললেন নিউ স্টার থেকে মাইক নিয়ে আসেন। খরচ আমি দিব। খেলার শেষে পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে?

জ্বি না।

এটা কেমন কথা? আমার ভাষণের শেষে পুরস্কার বিতরণ।

পুরস্কারের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয় নাই।

আমার তরফ থেকে পুরস্কার। সিলভার মেডেল। একজন কাউকে আমার বাড়িতে পাঠায়ে দেন। অনেক সিলভার মেডেল তৈরি করেই রেখেছি। একটা যেন নিয়ে আসে।

জ্বি আচ্ছা স্যার।

একটা খেলার আয়োজন করেছেন, কিন্তু ব্যবস্থা অতি দুর্বল। আমি আবার জামাইকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। জামাই-এর সামনে বেইজুতির ব্যবস্থা করবেন। না। সভাপতিকে ফুলের মালা দিতে হয়। সাধারণ নিয়ম। ফুলের মালা কোথায়?

স্যার ব্যবস্থা করছি।

কাগজের মালা যেন না হয়। কাগজের মালা দেয়া হয় কোরবানির গরুর। গলায়। খেলার বিচারক কারা? আমার জামাইকে বিচারকমণ্ডলীর প্রধান করে দিন। সে ফিজিক্সের শিক্ষক। অংকের বিচারক হবার মতো যোগ্যতা আর কারোর নাই। ঠিক বললাম না?

অবশ্যই স্যার।

ইয়াসিন সাহেবকেও দেখি খবর দিয়েছেন। তাকে আবার যেন মঞ্চে ডাকবেন না। ইয়াসিন সাহেবের সঙ্গে আমি এক মঞ্চে বসি না।

উনাকে ডাকব না।

জালাল সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, যেখানে আমাকে বলেছেন সেখানে আপনি কি করে ইয়াসিন সাহেবকে দাওয়াত দেন এটাই তো বুঝলাম না। সাধারণ কমনসেন্সও থাকবে না?

স্যার আমি উনাকে দাওয়াত দেই নাই। উনি নিজ থেকে চলে এসেছেন। রফিক উনার বাড়িতেই থাকে।

আপনার কর্মকাণ্ডে আমি খুবই বিরক্ত হয়েছি। যাই হোক অনুষ্ঠান শুরু করুন।

মাইক আসুক তারপর শুরু করি।

অনুষ্ঠান শুরু করে দিন, মাইক আর মেডেল পরে আসুক। সভাপতির ভাষণের সময় মাইক থাকলেই হবে। অনুষ্ঠানের শেষে দেশাত্ববোধক গানের আসর থাকলে ভাল হত।

পরিমল বাবু মন খারাপ করে অনুষ্ঠান শুরু করলেন। এতসব ঝামেলা হবে। তিনি ভাবেন নি। এদিকে আবার ইয়াসিন সাহেব হাত-ইশারায় তাকে ডাকছেন। তিনি ইশারা না-শোনার ভান করে অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন। পরিমল বাবু নিতান্ত আনিচ্ছার সঙ্গে একটি ছোট্ট বক্তৃতাও দিলেন–

সুধীবৃন্দ আমাদের অংক খেলা শুরু হচ্ছে। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অন্তরে অংক ভীতি দূর করা এবং অংকের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই এই অংক খেলার প্রতিযোগিতা। অত্র অঞ্চলে বিশিষ্ট সমাজসেবী, জনদরদি রাজনীতিবিদ জনাব জালাল উদ্দিন আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতির আসনে বসতে রাজি হয়ে আমাদেরকে ধন্য করেছেন। আপনারা শুনে আনন্দিত হবেন যে অংক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর জন্যে তিনি একটি রৌপ্য-পদক ঘোষণা করেছেন।

আজকের এই প্রতিযোগিতায় তিনজন বিচারক আছেন। বিচারকমণ্ডলীর প্রধান ফরহাদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার লেকচারার। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে তিনি সম্পর্কে আমাদের জামাই। তাঁর শ্বশুর হলেন জনাব জালাল উদ্দিন। জনাব ফরহাদ খান যে শত ব্যস্ততার মধ্যে বিচারকের অপ্রিয় দায়িত্ব পালনে রাজি হয়েছেন এতে আমাদের আনন্দের সীমা নাই। আমরা আমাদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাঁকে জানাচ্ছি মোবারকবাদ।

খেলা শুরুর ঘোষণা দেয়া হলেও অংক খেলা শুরু হতে হতে পাঁচটা বেজে গেল। ফুলের মালার জন্যেই দেরি। গ্রামাঞ্চলে চট করে মালা বানাবার মতো ফুল জোগাড় করা বেশ কঠিন। ঠিক পাঁচটায় দপ্তরি ঘণ্টা বাজাল। ব্ল্যাকবোর্ডর উপর থেকে পর্দা সরানো হল। সব মিলিয়ে দশটি বিরাট অংক। অংকগুলির উত্তর খামবন্ধ অবস্থায় বিচারকদের কাছে দেয়া হল।

হেডমাস্টার পরিমল বাবু বললেন, সাইলেন্স! কেউ কোন শব্দ করবেন। না। এই বলে তিনি চেয়ারে বসতে যাবেন তখন রফিক উঠে দাঁড়াল।

পরিমল বাবু বললেন, কিছু বলবেন?

রফিক বলল, অংকগুলি হয়ে গেছে স্যার। উত্তর কাগজে লেখে দিয়েছি।

পরিমল বাবু হতভম্ব হয়ে বিচারকদের দিকে তাকলেন। দুই মিনিটই পার হয় নি। এর মধ্যেই অংক হয়ে গেছে বলছে এর মানে কি? কোন ফাজলামি না তো?

বিচারকদের কাছে কাগজ দেয়া হল। ফরহাদ খান কাগজ দেখলেন। খামে বন্ধ উত্তর দেখলেন। অবিশ্বাসের চোখে পরিমল বাবুর দিকে তাকালেন। ফিসফিস করে বললেন, ব্যাপারটা কি? কোন ট্রিস কি আছে? উত্তরগুলি কি তিনি আগেই জানেন?

জ্বি না, জানেন না।

কোন ব্রিকস নিশ্চয়ই আছে। আপনি কি নিশ্চত অংকের উত্তরগুলি কেউ তাকে পাস করে নি?

পরিমল বাবু আমতা-আমতা করতে লাগলেন। তিনিও খুবই হকচকিয়ে গিয়েছেন। এখন তাঁর কাছেও মনে হচ্ছে কোন ট্রিকস থাকলে থাকতেও পারে।

ফরহাদ খান বললেন, অংক খেলাটা আরেক বার হোক। এবার একটাই অংক থাকবে। আমি সেই অংক বোর্ডে লিখব। ঘড়ি ধরে থাকব দেখি তিনি মুখে-মুখে সমাধান করতে পারেন কি না। আর যদি পারেন তাহলে কতক্ষণে পারেন।

পুরো বোর্ড জুড়ে বিশাল একটা সরল অংক লেখা হল। সেখানে গুণ, ভাগ, যোগ, বিয়োগ সবই আছে। বোর্ডের উপর থেকে পর্দা সরানো হল। ফরহাদ খান ঘড়ি ধরে থাকলেন। রফিক উত্তর দেবার জন্যে সময় নিল ২১ সেকেন্ড।

বাবু পরিমলচন্দ্ৰ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। অনুষ্ঠান শুরু হতে-না-হতে শেষ। এখনো মাইক এসে পৌঁছায় নি। দপ্তরি নিমাই মিষ্টি-নিমকি নিয়ে আসে নি। স্কুল মাঠে জড়ো হওয়া লোকজন বুঝতেই পারে নি অংক খেলা শেষ হয়ে গেছে। সভাপতি জালাল আহমেদ খুবই বিরক্ত দুই-তিন মিনিটের একটা অনুষ্ঠানের মানে কি? তাঁকে বক্তৃতা দিতে উঠতে হবে অথচ মাইক এসে পৌছায় নি। তিনি ভেবেছিলেন অংক খেলা চলার সময়ে ভাষণটা মনেমনে ঠিক করে ফেলবেন। শুরু করবেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে। ভাষা আন্দোলনের পর মহান মুক্তিযুদ্ধ…সবই এলোমেলো হয়ে গেল, এবং তাঁর পানির পিপাসা পেয়ে গেল। আয়োজকরা এমন গাধা যে টেবিলে একগ্লাস পানি পর্যন্ত রাখেনি। সব রামছাগলের দল। গলায় যে ফুলের মালা দিয়েছে সেখানে কালো পিঁপড়া ছিল। তার একটা তাঁর ঘাড়ে কামড় দিয়েছে। পিপড়াশুদ্ধ ফুলের মালা গলায় দিয়ে দিবে এটা কেমন কথা?

একটা মানুষ চোখের নিমিষে জটিল সব অংক করে ফেলেছে—এই ব্যাপারটা তাঁকে মোটেও অভিভূত করতে পারে নি। দেশে গাধা-ছাত্র আছে এরা দশ দিনে দশটা অংক করতে পারবে না। পারলেও ভুল করবে। তার বিপরীতে বুদ্ধিমান মানুষও থাকবে যারা অংক দ্রুত করে ফেলবে। তাতে অবাক হবার কি আছে। রফিক অংকগুলি করেছে চোখ খোলা রেখে। তিনি যুবক বয়সে ময়মনসিংহ টাউন হলে একবার ম্যাজিক দেখেছিলেন। সেখানে ম্যাজিশিয়ান চোখ বন্ধ অবস্থায় বোর্ডে লেখা বিরাট অংক করে ফেলল। সেই ম্যাজিশিয়ানের নামও তাঁর মনে আছে প্রফেসর আহাম্মদ আলী।

প্রফেসর আহাম্মদ আলীর কাছে রফিক কিছুই না। রফিককে রূপার মেডেল না দিলেও চলে। তারপরেও দিচ্ছেন কারণ রাজনৈতিক। এলাকার মানুষদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখতে হবে।

মাইক এবং মেডেল দুই-ই চলে এসেছে। জালাল সাহেব লক্ষ করলেন সভার লোকজন চলে যাচ্ছে। তিনি বক্তৃতা শুরু করলে লোকজন যদি আরো যাওয়া শুরু করে তাহলে খুবই খারাপ ব্যাপার হবে। তিনি পরিমল বাবুকে চোখের ইশারায় ডাকলেন। গলা নিচু করে বললেন, লোকজন তো চলে যাচ্ছে।

পরিমল বাবু কিছু বললেন না। জালাল সাহেব চাপা গলায় বললেন, মাইক ফিরত পাঠায়ে দিন। ভাষণ দিব না সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শুধু পুরস্কার বিতরণী হবে। একটা প্রাইজ দিলে হবে না, দুটা প্রাইজ দিতে হবে। ফার্স্ট আর সেকেন্ড। ফার্স্ট প্রাইজ রূপার মেডেল। আর সেকেন্ড প্রাইজ একশ টাকা। সেকেন্ড কে হয়েছে?

সেকেন্ড কেউ হয় নাই।

আপনি হেডমাস্টার। রামছাগলের মতো কথা আপনার মুখে মানায় না। ফাস্ট থাকলেই সেকেন্ড থাকে। বিচারকমণ্ডলীকে জিজ্ঞেস করে জেনে আসুন সেকেন্ড কে? আরেকটা কথা, ভবিষ্যতে এই জাতীয় অনুষ্ঠান করার আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করে নিবেন।

হেডমাস্টার সাহেব বিচারকমণ্ডলীর সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসে শুকনো মুখে। জানালেন বিচারকমণ্ডলী বলেছে কেউ সেকেন্ড হয় নাই।

সন্ধ্যা থেকে আকাশ মেঘলা করে বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস দিচ্ছে। বাতাসের বেগ বেশ প্রবল। এই বাতাসের নাম মশা মারা বাতাস। এ রকম দমকা বাতাসে মশার পাখা ছিড়ে যায়। মশা-মারা পড়ে। ঝড়ের সময় দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখলেও মশা-মারা বাতাসে দরজা-জানালা খোলা রাখতে হয়।

রফিকের ঘরের দরজা-জানালা খোলা। সে একটা পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার টেবিলের উপর হারিকেন। একেকবার বাতাসের ঝাপ্টা আসছে হারিকেনের শিখা দপ করে বেড়ে উঠছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি হারিকেন নিভে গেল। হারিকেনের পাশে বই-খাতা নিয়ে শেফা বসে আছে।

স্যার ঘুমিয়ে আছেন। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ইচ্ছা করছে না। বইখাতা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে তার ভাল লাগছে। চাদর দিয়ে স্যারের মুখ ঢাকা। মুখ ঢাকা না থাকলে ভাল হত। মাঝে মাঝে স্যারের মুখের দিকে তাকানো যেত। জাগ্রত মানুষের মুখ দেখতে এক রকম, আর ঘুমন্ত মানুষের মুখ দেখতে। আরেক রকম। মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তাকে খুব অসহায় লাগে। খুব মায়া লাগে মানুষটার জন্যে। এ বাড়ির কেউ জানে না রফিক স্যার যখন ঘুমিয়ে থাকেন তখন সে মাঝেমধ্যে তাকে এসে দেখে যায়। বেশিরভাগ সময়ই জানালা দিয়ে দেখে। তবে কয়েকবার সে ঘরে ঢুকেও দেখে গেছে। সে জানে কাজটা ঠিক না। নিশিরাতে সে একজনের ঘর থেকে বের হচ্ছে। কি ভয়ংকর কথা!

তবে এ ধরনের কাজ এখন আর করা যাবে না। কারণ কিছুদিন থেকেই তার মা তাকে চোখে চোখে রাখছেন। এই যে সে স্যারের ঘরে বসে আছে, সে নিশ্চিত যে তার মা-ও আশেপাশেই আছেন। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তার দিকে লক্ষ রাখছেন। সে নিজে যখন মা হবে তখন সেও নিশ্চয়ই এ রকম করবে। নিজের মেয়েকে চোখে চোখে রাখবে।

শেফা খাতা খুলল। সে খুব মন দিয়ে লেখাপড়া করছে এ রকম ভান করা দরকার। খাতায় কিছু লেখা দরকার। অংক করা যায়। কিন্তু অংক করতে ইচ্ছা করছে না। মেট্রিক পরীক্ষায় সে যে কয়টা বিষয়ে ফেল করবে অংক হচ্ছে তার একটা। তার ধারণা, সে খুব কম হলেও তিনটা বিষয়ে ফেল করবে। অংক, ইংরেজি এবং বিজ্ঞান। এই তিনটা বিষয়ের মধ্যে সবচে কম নাম্বার সে পাবে অংকে। যদিও বাড়িতে একজন অংকের জাহাজ আছে। অংকের জাহাজের অংক করতে কাগজ-কলম লাগে না। সে মুখে-মুখে অংক করে। অংকের জাহাজ এই মুহূর্তে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে। কি আশ্চর্য ব্যাপার সন্ধ্যাবেলা কেউ ঘুমায়?

যথেষ্ট ঘুম হয়েছে। এখন তাকে জাগিয়ে দেয়া দরকার। টেবিলে খুটখাট শব্দ করতে হবে। চেয়ারের পায়া ধরে টানাটানি করতে হবে। ঘুম পাড়াবার জন্যে ঘুমপাড়ানি গান আছে। ঘুম থেকে তোলার জন্যে ঘুমভাঙানি গান থাকলে ভাল হত। দুই লাইন ঘুম ভাঙানি গান গাওয়া হবে, যে ঘুমিয়ে ছিল সে লাফ পিয়ে উঠবে। ফ্যালফ্যাল করে এদিকে-ওদিকে তাকাবে। মেয়েদের ঘুম ভাঙানি গাম আছে। একটা সে নিজেই জানে–

আর কত ঘুমাইবা কন্যা চউখ দুইটা মেল
কান্ধে নিয়া রঙিলা গামছা বন্ধু চইল্যা গেল।

শেফা কেউ শুনতে না পায় এমনভাবেই ফিসফিস করে দুলাইন গাইল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রফিক ধড়মড় করে উঠে বসল। সে ফ্যালফ্যাল করেই তাকাচ্ছে। শেফা থমত খেয়ে বলল, মাগরিবের নামাজ বাদ দিয়া সন্ধ্যাবেলা ঘুম? বাপজান শুনলে খুবই রাগ হবেন।

রফিক বলল, শব্দ কিসের?

বৃষ্টির শব্দ। বৃষ্টি হইতেছে সঙ্গে বাতাস। বৃষ্টি-বাতাস একসঙ্গে হইলে কি হয় জানেন?

না।

শেফা গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, বৃষ্টি-বাতাস একসঙ্গে হইলে চখাচখির বিবাহ হয়–।

বৃষ্টি হয় বাতাস হয় চখাচখির বিবাহ হয়।

রফিক বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, এইসব শ্লোক কি সত্যি আছে, না তুমি বসে বসে বানাও?

শেফা জবাব দিল না। সে তার খাতায় বৃষ্টি-বাতাসের সঙ্গে চখাচখির বিবাহ-সংক্রান্ত শ্লোকটা লিখে ফেলছে। মিল দিয়ে আরেকটা লাইন লিখে ফেলতে হবে। এই লাইনে শ্লোক হয় না। শ্লোকের জন্যে খুব কম করে হলেও দুটা লাইন লাগে। মাঝেমধ্যে তার মাথায় চট করে সুন্দর সুন্দর মিল আসে। মাঝেমধ্যে কিছুই আসে না। আজ আসবে কি না কে জানে। শেফা লিখল—

বৃষ্টি হয় বাতাস হয় চখাচখির বিবাহ হয়,
বড় সুখের এই বিবাহ কোনদিন ভাঙার নয়।

বারান্দায় বালতি পেতে বৃষ্টির পানি ধরা হচ্ছে। সেই পানিতে মুখ ধুয়ে রফিক শেফার সামনের চেয়ারে বসল। শেফা খাতা থেকে মুখ না তুলে বলল, স্যার আপনে যে রূপার মেডেল পেয়েছেন, সেই মেডেলে কি লেখা জানেন?

না, কি লেখা?

খাদিজা খাতুন রৌপ্য-পদক। খাদিজা হলেন আমাদের জালাল সাহেবের মা।

ও।

উনি তাঁর মার নামে, বাবার নামে, তাঁর দাদার নামে অনেক রূপার মেডেল বানায়ে ঘরে রেখে দিয়েছেন। কেউ কিছু করলেই তারে একটা রূপার মেডেল দিয়ে দেন।

তাই নাকি?

একবার তার বাড়িতে ভিক্ষা করতে এক ফকির এসেছে। এই ফকির আবার কান নাড়াতে পারে। চোখ বন্ধ করে সে গরুর মতো নিজের দুই কান নাড়ায়। সেই কান নাড়ানো দেখে জালাল সাহেব তাঁকেও একটা মেডেল দিয়েছেন। খাদিজা খাতুন রৌপ্য-পদক।

রফিক হেসে ফেলল। শেফা গম্ভীর মুখে বলল, আপনাকে হাসানের জন্যে ঘটনাটা বলি নাই। আসলেই দিয়েছেন। এখন সেই ফকির গলায় মেডেল ঝুলায়ে ভিক্ষা করে। সে হয়েছে মেডেল পাওয়া ভিক্ষুক।

শেফার মুখ গম্ভীর। রফিক হাসছে। সে হাসতে হাসতেই বলল—তোমার অদ্ভুত গুণ কি জান শেফা? তোমার অদ্ভুত গুণটা হচ্ছে—তুমি খুবই হাসির কথা মাঝে মাঝে বল কিন্তু একটুও হাস না। তখন তোমাকে রোবট মনে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। অষ্টম ধারার রোবট। যার নিজের কোন ইমোশন নেই কিন্তু অন্যের ইমোশন সম্পর্কে সে জানে।

শেফা বলল—এইসব কি হাবিজাবি বলতেছেন?

তোমাকে মনে হয় তুমি শেফা না তুমি আসলে শেফ্‌। আমি আসলে কি?

শেফ্‌। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। তোমার মাথায় ব্রেইনের বদলে আছে কপোট্রন।

শেফা খাতা বন্ধ করে বলল-মাঝে মাঝে আপনে পাগলের মতো কথা বলেন। মাঝে মাঝে আপনাকে পাগল মনে হয়। তোমার কাছে মনে হয় আমি পাগল?

সবসময় মনে হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়। একদিন দুপুরবেলা আপনি ঘুমাচ্ছেন আমি কি কাজে যেন আপনার ঘরে ঢুকেছি। ও আচ্ছা মনে পড়েছে টেবিলের ওপর অংকের বইটা ফেলে গিয়েছিলাম, সেই বই নিতে গিয়েছি হঠাৎ তাকায়ে দেখি ঘুমের মধ্যে আপনি ছটফট করতেছেন। একবার এপাশ ফিরেন আরেকবার ঐপাশ ফিরেন। আপনার কপালে ঘাম। আপনি বিড়বিড় করে কথাও বলতেছেন।

কি কথা?

কি কথা তা বলতে পারব না। আমি তো আর কথা শুনার জন্যে আপনার কাছে যাই নাই। অংকের বই নেয়ার জন্যে গিয়েছিলাম। বই নিয়ে চলে গিয়েছি।

যে কথা শুনেছিলে তার একটা-দুটা শব্দও কি মনে নাই?

না।

আবার যদি কখনো এরকম দেখ—মন দিয়ে শুনবে। আমি ঘুমের মধ্যে কি বলছি মনে রাখার চেষ্টা করবে।

জি আচ্ছা।

কথাবার্তার এই পর্যায়ে দমকা বাতাস হল। হারিকেন নিভে গেল। শেফা মনে মনে বলল, বাতি নিভেছে বেশ হয়েছে। অন্ধকারই ভাল। এই অন্ধকারে হাত বাড়ালেই মানুষটাকে ছোঁয়া যাবে। মানুষটা ভাবতেও পারবে না এই কাজটা শেফা ইচ্ছা করে করেছে। শেফা এমন কোন খারাপ মেয়ে না যে ইচ্ছা করে পুরুষ মানুষ ছুঁয়ে দেবে। কিন্তু খারাপ মেয়ে হতে ইচ্ছা করছে। শেফার খানিকটা কান্না পেয়ে গেল। তার কি কোন অসুখ করেছে? খারাপ ধরনের কোন অসুখ। যে অসুখে মানুষকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। যে অসুখে কারণ ছাড়াই কান্না পায়। মানুষটা যখন সামনে থাকে তখন কান্না পায়, যখন সামনে থাকে না তখনও কান্না পায়।

শেফা খুবই আশ্চর্য বোধ করছে। ঘরে এতক্ষণ হল বাতি নেই অথচ তার মা ছুটে আসছেন না। জ্বলন্ত হারিকেন নিয়ে তার মার তো ইতিমধ্যেই ছুটে চলে আসার কথা। বিদ্যুৎ চমকাল। শেফা বিদ্যুতের আলোয় দেখল মানুষটা মাথা নিচু করে বসে আছে। মনে হচ্ছে কোন কিছু নিয়ে মানুষটা চিন্তিত। তার এত কিসের চিন্তা? এই পৃথিবীতে চিন্তা করে কিছু হয় না। যা হবার তা চিন্তা করলেও হবে চিন্তা না করলেও হবে। তার কথাই ধরা যাক-না কেন—সে জানে সে মেট্রিক পাস করতে পারবে না। খুব কম করে হলেও তিনটা বিষয়ে ফেল করবে। তার জন্যে সে তো গালে হাত দিয়ে চিন্তা করতে বসে নি। চিন্তা করলে যদি পাস হত তাহলে চিন্তা করত।

আলো হাতে কে যেন আসছে। শেফা ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ সে অন্ধকারে ছিল এর মধ্যে হাত বাড়িয়ে একটু খুঁয়ে ফেললেই হত। এ রকম কি আর কখনো হবে? আর কখনো কি হারিকেন নিভে যাবে? শেফার কান্না পাচ্ছে। সে দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়ে কান্না চাপার চেষ্টা করছে। কান্না এমনই জিনিস যে চাপার চেষ্টা করলে কান্না বেড়ে যায়। শেফা কান্না আটকাতে পারল না। মা হারিকেন নিয়ে এসে যদি দেখেন শেফার চোখে পানি ওমি তিনি দুইএ দুই চার না বানিয়ে বাইশ বানিয়ে ফেলবেন। রাতে ঘুমুবার সময় হেনতেন শতেক প্ৰশ্ন। কাদছিলি কেন? ঘটনা কি?

আমেনা বেগম হারিকেন হাতে ঘরে ঢুকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাকালেন রফিকের দিকে। শান্ত গলায় বললেন, রফিক তোমার খুঁজে কে জানি আসছে। বাংলাঘরে বসছে।

রফিক সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। আমেনা বেগম বললেন, তোমার চাচা মাগরেবের ওয়াক্তে তোমার খুঁজ করেছিলেন। তোমাকে নিয়ে নামাজে যাবার ইচ্ছা ছিল। তিনি সামান্য রাগ করেছেন।

রফিক বিড়বিড় করে বলল, শরীরটা ভাল না। শুয়েছিলাম, কখন ঘুমায়ে পড়েহি বুঝতে পারি নাই।

আমেনা বেগম বললেন, যাও দেখে আস কে আসছে।

রফিক ঘর থেকে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমেনা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন-তুই আমার ঘরে আয়।

শেফা বলল, তোমার ঘরে যাব কেন?

কথা আছে।

কথা এইখানে বল। আমি পড়তে বসেছি। পড়া ছেড়ে উঠতে পারব না।

তুই কাঁদছিলি কেন?

ইচ্ছা হয়েছে এই জন্যে কাঁদতেছি।

বাঘবন্দি খেলা আমার সাথে খেলবি না। তুই এমন কোন বড় খেলোয়াড় না। কি হয়েছে বল। এমন কি ঘটনা ঘটেছে যে চোখে পানি।

কিছুই ঘটে নাই।

এমন কিছু কি ঘটেছে যে আমাকে বলা যাবে না? অন্ধকারে এই ছেলে কি গায়ে হাত-টাত দিয়েছে?

না।

বল কোথায় হাত দিয়েছে?

বললাম তো–না।

না-টা এমন চাপা গালায় বলতেছিস কেন?

আমি স্বাভাবিকভাবেই বলেছি। তোমার কাছে মনে হচ্ছে চাপা গলা।

এই মাস্টারের কাছে তুই আর পড়বি না।

আচ্ছা।

তোর বাবাকে বলব তার এই বাড়িতে থাকারও দরকার নাই।

আচ্ছা।

তুই আর কখনো এই ছেলের সামনে পড়বি না।

আচ্ছা।

এখন উঠে আয়। এই মাস্টারের কাছে যখন আর পড়তে হবে না, তখন আর ঘরে থাকার দরকার কি?

শেফা বই-খাতা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মার সঙ্গে ঘর থেকে বের হতে হতে বলল, মা তোমার প্রতিটি কথাই আমি শুনেছি। এখন আমি তোমাকে একটা কথা বলব। এই কথাটা তোমাকে শুনতে হবে।

আমেনা বেগম ভীত গলায় বললেন, কথাটা কি?

শেফা সহজ ভঙ্গিতে বলল, মা আমি উনাকে বিয়ে করব। তুমি ব্যবস্থা করে দাও। বাবাকে বলে ব্যবস্থা কর।

আমেনা বেগম অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি একটু আগে মেয়েকে বলেছেন—সে কোন বড় খেলোয়াড় না। এখন মনে হচ্ছে এই মেয়ে অনেক বড় খেলোয়াড়। এই মেয়ের সঙ্গে বাঘবন্দি খেলা যাবে না।

শেফা হঠাৎ অতি নাটকীয় এক কাণ্ড করে বসল, হাত থেকে বই-খাতা ফেলে ধপ করে বসে পড়ে মার পা জড়িয়ে ধরল। পায়ের পাতায় মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, মা তুমি আমাকে বাঁচাও। উনাকে বিয়ে না করতে পারলে আমি মরে যাব।

রফিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন জালাল সাহেবের জামাই ফরহাদ খান। ফরহাদ খান একা আসেন নি। তাঁর সঙ্গে তিনজন আছে। একজনের হাতে হারিকেন। অন্য দুজন খালি হাতে থাকলেও তাদের গায়ের চাদরের নিচে কিছু একটা আছে। তারা প্রায়ই চাদরের নিচে হাত দিচ্ছে এবং হাত বের করে আনছে। জালাল খাঁন নিজে কখননা বাডিগার্ড ছাড়া চলাফেরা করেন না। জামাই-এর ক্ষেত্রেও সেই ব্যবস্থা রেখেছেন। অস্ত্রধারী দুইজন বাংলাঘরের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছে। তারা দুজনই অত্যন্ত ভীত। কারণ তারা শুধু যে ইয়াসিন সাহেবের এলাকায় আছে তা না, তারা ইয়াসিন সাহেবের বাংলাঘরে আছে। বলতে গেলে বাঘের ঘরে বাস।

বাংলাঘরে চেয়ার-টেবিল আছে, একপাশে পাটি পাতা খাটও আছে। রফিক বসে আছে খাটে। ফরহাদ খান একটা চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসেছেন। ফরহাদ খানের হাতে কিছু কাগজপত্র এবং কলম। ফরহাদ খানের সঙ্গে আসা হারিকেনধারীও ঘরে আছে। সে তার হারিকেন হাতছাড়া করে নি। হারিকেন উঁচু করে ধরেছে যাতে হারিকেনের আলো রফিকের মুখে পড়ে। এই হারিকেন ছাড়াও ঘরে আরো একটা হারিকেন আছে। বাংলাঘরের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। ফরহাদ খান উঁচু গলায় কথা বলছেন। রফিক নিচু স্বরে জবাব দিচ্ছে বলে ফরহাদ সাহেবকে উত্তর শোনার জন্যে প্রতিবারই ঝুঁকে কাছে আসতে হচ্ছে।

রফিক সাহেব কেমন আছেন? জ্বি ভাল।

আজ আপনার অংক করা দেখলাম। বিস্মিত হয়েছি বললে কম বলা হবে। বিস্মিত হয়েছি আবার নিজের মধ্যে কিছু কনফিউশনও আছে। আমি সেই কনফিউশনগুলি দূর করতে এসেছি। আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। আপনি কি জবাব দেবেন?

রফিক হ্যাঁ-সূচক ঘাড় কাত করল। ফরহাদ খান বললেন, আমি এই কাগজে এগারোটা সংখ্যা লিখছি, একটু তাকান সংখ্যাটির দিকে।

রফিক তাকাল। কাগজে লেখা—৮৭৯০০৪২১৬৭৩।

ফরহাদ খান কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, সংখ্যাগুলি কি আপনার মুখস্থ হয়ে গেছে?

রফিক বলল, জ্বি হয়েছে।

এক থেকে নয়ের ভেতরে একটা ডিজিট এখানে নেই। সংখ্যাটা কি?

পাঁচ।

সংখ্যাগুলি উল্টালে কত হবে?

৩৭৬১২৪০০৯৭৮।

এর বর্গমূল কত হবে? মূল সংখ্যাটার। উল্টানোটার না।

এর বর্গমূল ১৯৩৯৩৯ দশমিক ১৬৮২।

ঘনমূল বলতে পারবেন? ঘনমূল জানেন তো?

জ্বি জানি। এর ঘনমূল হল ৩৩৫০ দশমিক ৫০৫৬।

রফিক সাহেব আপনি যে একজন বিস্ময়কর মানুষ তা কি আপনি জানেন?

জ্বি জানি।

আপনার পড়াশোনা কি?

আমি বি.এসসি পাস করেছি।

রেজাল্ট কি ছিল?

ভাল ছিল না। সেকেন্ড ডিভিশান।

এখন করছেন কি?

আমি মূলারদি গার্লস হাইস্কুলে পার্ট টাইম অংক করাই।

আপনার কি কোন ছবি আছে?

পাসপোর্ট সাইজ দুটা ছবি আছে।

আপনি একটা ছবি আমাকে দেবেন, আমি আপনাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখে ভোরের কাগজে দেব।

জ্বি আচ্ছা।

শুরুতে আপনাকে যে সংখ্যাগুলি দিয়েছিলাম সেগুলি কি আপনার মনে আছে?

জ্বি মনে আছে, ৮৭৯০০৪২১৬৭৩।

এই সংখ্যাগুলির একটা বিশেষত্ব আছে সেটা বলতে পারবেন?

এর কোন বিশেষত্ব নাই। এটা মৌলিক সংখ্যা না। তিন দিয়ে ভাগ করা যায়।

ফরহাদ খান নিজের বিস্ময়বোধ চাপা দেবার জন্যে সিগারেট ধরালেন।

ভেতরের বারান্দায় ইয়াসিন সাহেব তামাক খাচ্ছিলেন। তিনি বাংলাঘরের বারান্দায় হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত দুই বডিগার্ডকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তারা ভীত মুখে সামনে দাঁড়িয়ে। ইয়াসিন সাহেব বললেন, তোমরা আছ কেমন?

তাদের একজন খুখুক করে কাশতে কাশতে বলল—যেমন দোয়া করেছেন।

উল্টাপাল্টা কথা বলবা না? তোমাদের জন্যে আমি দোয়া করব কি জন্যে। ভাল কথা গরমের মধ্যে চাদর গায়ে কেন?

শরীরটা খারাপ।

দুই জনেরই একসঙ্গে শরীর খারাপ?

তারা জবাব দিল না। ইয়াসিন সাহেব নীরবে কিছুক্ষণ তামাক টানলেন। তারপর হুক্কার নল নামিয়ে সহজ গলায় বললেন, তোমাদের চাদরের নিচে কি আছে আমি জানতে চাই না। তোমরা যে চাদরের নিচে জিনিস নিয়া আমার সাথে দেখা করতে এসেছ এতে আমি বড়ই অবাক হয়েছি। তোমরা উঠানে বৃষ্টির মধ্যে দাড়াও। কানে ধরে পঞ্চাশবার উঠবোস কর। যাও। এতে যদি আমার রাগ কমে তো কমল, না কমলে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।

তারা কোন রকম আপত্তি করল না। উঠোনে নেমে উঠবোস শুরু করল। ইয়াসিন সাহেব অন্দরে ঢুকলেন। জালাল সাহেবের জামাই এসেছেন। বিশিষ্ট মেহমান। জালাল সাহেবের জামাই মানে এই অঞ্চলের জামাই। তার মর‍্যাদা অন্যরকম। কাজেই নতুন জামাই এর আপ্যায়নের সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ঘরে মিষ্টি আছে কিনা কে জানে। না থাকলে আনাতে হবে।

আমেনা বেগম আজ রাতে স্বামীর সঙ্গে ঘুমুতে এসেছেন। সপ্তাহে একদিন তিনি স্বামীর সঙ্গে ঘুমুতে আসেন। আজ সপ্তাহের সেই দিন না। ইয়াসিন ভুরু কুঁচকে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। আমেনা বেগম লজ্জিত গলায় বললেন—শেফা বলেছে। আজ সে একা ঘুমাবে।

ইয়াসিন সাহেব বললেন, ও। বলেই তিনি পাশ ফিরলেন। ঘুমুবার চেষ্টা করা উচিত। তাঁর মাথা আজ কিঞ্চিৎ উত্তেজিত। জালাল সাহেবের দুই চাদরওয়ালাকে উঠবোস করানো হয়েছে। জালাল সাহেব এই অপমানের শোধ নিবেন না তা হয় না। ঘটনা ঘটবে। কিভাবে ঘটবে কে জানে। যে ভাবেই ঘটুক, ঘটনার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমেনা বেগম বললেন, ঘুমায়ে পড়েছেন?

ইয়াসিন সাহেব বললেন, না। কিছু বলবা?

শেফার মাস্টারের বিষয়ে দুটা কথা ছিল।

কি কথা?

ছেলেটারে আমার বড়ই পছন্দ। বাপ-মা মরা ছেলে। দেখলেই আদর লাগে। এইসব ছেলে খুবই আদরের কাঙ্গাল হয়। ছেলের আদব-লেহাজ ভাল।

ইয়াসিন সাহেব ঠাণ্ডা গলায় বললেন–কথা যা বলবা পরিষ্কার করে বলবা। পঁাচ দিয়া বলবা না। পাঁচের কথা আমার ভাল লাগে না। ঘটনা কি?

কোন ঘটনা না।

এই ছেলের সাথে কন্যার বিবাহ দিতে চাও?

আমেনা বেগম সুস্থির নিশ্বাস ফেলে চাপা গলায় বললেনবিবাহ হলে খুবই ভাল হয়। ছেলেটা আমার খুবই পছন্দের। চেহারা-ছবিও মাশাল্লাহ ভাল।

ইয়াসিন সাহেব সহজ গলায় বললেন, ঠিক করে বল। ছেলে তোমার পছন্দ না-কি তোমার কন্যার পছন্দ।

আমার খুব পছন্দ। শেফাও তারে মোটামুটি ভাল পায়।

আমেনা!

জ্বি।

আমার সাথে প্যাঁচ খেলবা না। আমি সোজা-সরল মানুষ। ঘটনা কি পরিষ্কার করে বল।

আমেনা বেগম ভীত গলায় বললেন, কোন ঘটনা না।

ইয়াসিন সাহেব বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, আমি প্রশ্ন করতেছি। তুমি জবাব দাও। উল্টাপাল্টা জবাব দিবা না, থাপ্পড় খাইবা। মেয়েছেলের গায়ে হাত তোলা আমার খুবই অপছন্দ। কিন্তু প্রয়োজনে হাত তুলতে হবে। উপায় কি? এখন বল ছেলে কি তোমার কন্যার পছন্দ?

হুঁ।

তাড়াহুড়া করে বিয়ে দিতে চাইছে, কারণ কি? কোন ঘটনা ঘটেছে? কোন ঘটনার কথা বলতেছি বুঝতে পারতেছ? নাকি আরো খোলাসা করে বলব।

না না ছিঃ।

ছেলের জন্মের কোন ঠিক নাই—এতিমখানায় বড় হয়েছে। এটা জান?

জানি।

তার মৃগী রোগ আছে এটা জান?

তারপরেও কি করে বলো, এই ছেলে তোমার বড়ই পছন্দ।

মেয়ের মুখের দিকে তাকায়ে বলেছি। মেয়ে দেওয়ানা হয়েছে।

বুঝ দিলে বুঝ মানবে?

না।

এই অবস্থা?

জ্বি। কোন ঘটনা ঘটে নাই তুমি নিশ্চিত?

জ্বি।

ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা নিতেছি। দুঃশ্চিন্তা করার কিছু নাই।

ইয়াসিন সাহেব বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আমেনা বেগম ভয়ে-ভয়ে বললেন, কি ব্যবস্থা নিবেন।

আমি কি ব্যবস্থা নেই সেটা আমার বিষয়। এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ আমার পছন্দ না। আমার সঙ্গে যে তোমার কথা হয়েছে এটাও শেফাকে বলবা না। সে যেন কিছুই না জানে।

জ্বি আচ্ছা। আপনি ছেলেটারে অন্য কোথাও চলে যেতে বলেন।

ইয়াসিন সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন চলে যেতে বললে লাভ হবে না। তোমার কন্যা তাকে খুঁজে বের করবে। তোমার কন্যার মনের অবস্থা আমি তোমার আগেই টের পেয়েছি। তোমারে কিছু বলি নাই। একেক রোগের একেক চিকিৎসা। জ্বর হলে মাথায় পানি ঢালতে হয়। শরীর পচন ধরলে পচা অংশ ফেলে দিওয়া লাগে। এইটাই নিয়ম। শরীর নীরোগ রাখার জন্য অনেক অপ্রিয় কাজ করতে হয়। এখন যাও মেয়ের সাথে ঘুমাও। আমার সঙ্গে ঘুমানোর দরকার নাই।

আমেনা বেগম মেয়ের সঙ্গে ঘুমুতে গেলেন। সারারাত তার একফোঁটা ঘুম হল না।

০৪. বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন

বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন বসেছে। কাউন্সিলপ্রধান মহান বিজ্ঞানী এমরান টি। যৌবনে তিনি পদার্থবিদ্যার অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছেন। কৃষ্ণ গহ্বর নিয়ে তাঁর কাজ তুলনাহীন। হঠাৎ গবেষণার ক্ষেত্র পরিবর্তন করে টাইম প্যারাডক্স নিয়ে মেতে ওঠেন। জার্নালে শতাব্দীর সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত আবিষ্কার হিসেবে এই বিষয়ে দুটি গবেষণা প্রকাশিতও করেন। তারপর হঠাৎ থেমে যান। তাঁর বাড়ি থেকে বিজ্ঞানবিষয়ক সব বইপত্র সরিয়ে ফেলেন। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত গুজব হচ্ছে তিনি এখন ছড়া রচনার ব্যাপারে আগ্রহবোধ করছেন। খাতার পর পাতা ছড়া লিখে ভরিয়ে ফেলছেন। তাঁর বয়স একশর উপরে কিন্তু কথাবার্তা চালচলনে তারুণ্য ঝলমল করছে। আজ তিনি মেরুন রঙের কোট পরেছেন। কোটের সোনালি বোতাম চকচক করছে। এই সময়ের ফ্যাশনে মাথার চুলের সঙ্গে বড় রুমাল আটকে দিয়েছেন। বিশেষ ধরনের এই রুমাল বাতাস ছাড়াই সারাক্ষণ কাঁপতে থাকে। এমরান টি যে রুমালটি পরেছেন তার রং ঘন সবুজ। এই রঙের রুমাল অল্পবয়েসী কিশোরীরা মাথায় দেয়। উদ্ভট যে-কোন কিছু করার ব্যাপারে এমরান টির সীমাহীন আগ্রহ। বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন উদ্ভট কোন কর্মকাণ্ডের জন্যে উপযুক্ত জায়গা না। কিন্তু মহান বিজ্ঞানী এমরান টি তার পাগলামি দেখানোর জন্যে বিশেষ অধিবেশনগুলিই বেছে নেন। বিজ্ঞানীরা বিরক্ত হন। এমরান টি মানুষের বিরক্ত মুখ দেখতে পছন্দ করেন।

বিশেষ অধিবেশনে কাউন্সিলের সকল সদস্য বিজ্ঞানীদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়। যারা অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেন না তাদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে ইন্টারফেসের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত কম্পিউটার অংশগ্রহণ করে। মানুষ-বিজ্ঞানী ছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কম্পিউটারদের দুজন প্রতিনিধি থাকে। তাদের কোন ভোটাধিকার থাকে না। পৃথিবী নিয়ন্ত্রক মূল কম্পিউটার সিডিসি থাকে। সিডিসির ভোটাধিকার আছে। ক্ষমতার দিক দিয়ে এমরান টির পরের স্থানটিই সিডিসির। তবে বিজ্ঞান কাউন্সিলের নেয়া কোন সিদ্ধান্তে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা সিডিসির নেই।

অধিবেশন কক্ষে নীল আলো জ্বলছে। নীল আলো মুছে গিয়ে সবুজ আলো জ্বলে উঠলেই অধিবেশন শুরু হবে। নীল আলো হল প্রস্তুতিমূলক আলো। বিজ্ঞানীরা তাদের কাগজপত্র গুছিয়ে নেবেন। আজকের আলোচনার এজেন্ডাগুলি দেখবেন। আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি ভালমত জানার জন্যে সিডিসির সাহায্য চাইবেন।

আজকের আলোচ্য বিষয় একটাই রেফ নামক মানুষটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বিশেষ অধিবেশন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ-বিষয়ক অধিবেশনে সময় খুব কম লাগে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব সিডিসির উপর দিয়ে দেয়া হয়। মানুষ অতি সাধারণ সিদ্ধান্তও চট করে নিতে পারে না। কম্পিউটার পারে।

এমরান টি তার মাথার সবুজ রুমাল নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি টুপিটা একবার এদিকে পরছেন আরেকবার অন্যদিকে পরছেন।

এমরান টির পাশের চেয়ারে সিডিসি বসে আছে। সিডিসিকে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে সে মানব সম্প্রদায়ের কেউ না। গত একশ বছরে রোবট প্রযুক্তির সীমাহীন উন্নতি হয়েছে। সিডিসি দশম ধারার রোবটের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।

এল এফ সিরিজের সব রোবটই মানুষের মতো। ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিটেকটর ছাড়া এই সিরিজের রোবটদের মানুষের কাছ থেকে আলাদা করার কোন উপায় নেই। সিডিসি শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। এমরান টির রুমাল নিয়ে বাড়াবাড়ির দৃশ্যটি মাঝেমধ্যে দেখছে। তখনই তার ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে।

এমরান টি বললেন, সিডিসি আমার রুমালের রঙটা মনে হয় তোমার পছন্দ হচ্ছে না। তুমি যতবারই আমাকে দেখছ ততবারই ভুরু কুঁচকাচ্ছ।

সিডিসি বলল, আপনার রুমালের রং চমৎকার। যদিও এই রঙের রুমাল কিশোরীরা ব্যবহার করে, তাতে আমি আমার দিক থেকে কোন সমস্যা দেখি না।

তাহলে তুমি ভুরু কুঁচকাচ্ছ কেন?

অন্য বিজ্ঞানীদের প্রায় সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকাচ্ছেন। আমি তাদের অনুকরণ করছি। এর বেশি কিছু না।

তুমি অনুকরণ করছ কেন?

বাহ্যিক আচার-আচরণে মানুষকে অনুসরণ করার জন্যে একটি সফটওয়ার আমাদের মধ্যে আছে। মানুষের কাছাকাছি যেতে হলে তাকে অনুকরণ করতেই হবে।

খুব ভাল।

আপনি কি সফটওয়ারটি বিষয়ে জানতে চান?

না—অর্থহীন সফটওয়ার নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। রুমালের রং কি সত্যি তোমার পছন্দ হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে।

অন্যদের পছন্দ হচ্ছে না কেন?

আপনি কি সত্যি জানতে চান? জানতে চাইলে কারণগুলি বলতে পারি তবে আমার মনে হচ্ছে না কারণ জানার ব্যাপারে আপনি আগ্রহী।

তমি ঠিকই বলেছ আমি আগ্রহী না।

সিডিসি গলার স্বর নিচু করে বলল, মহামতি এমরান। আপনি কি কোন অজানা কারণে খুবই দুঃশ্চিন্তাগ্ৰস্ত?

আমি হাসছি, মাথার রুমাল নিয়ে খেলছি। তারপরেও তোমার কেন মনে হল আমি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ?

আপনার হাসি-খুশির মধ্যে মেকি অংশ আছে বলেই বলছি। আপনি হা করে নিশ্বাস নিচ্ছেন। উপস্থিত বিজ্ঞানীদের দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না। কারো চোখে চোখ পড়া মাত্রই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আপনার চোখের পাতা যেভাবে পড়ে, তারচে ত্রিশ ভাগ দ্রুত পড়ছে। আপনার শরীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড আমি যতটুকু জানি তা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে আপনি খুবই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত।

টুন করে ঘন্টাধ্বনির মতো শব্দ হল। হলঘরের নীল আরো সবুজ হয়ে গেল। এমরান টি মাথার রুমাল ঠিক করতে করতে বললেন, বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এ বছরের দ্বিতীয় বিশেষ অধিবেশন। কাউন্সিলের একশ সদস্যদের সবাই সশরীরে উপস্থিত। এটি আনন্দময় ঘটনা। আমি সিডিসিকে এখন বিশেষ অধিবেশনের কারণ ব্যাখ্যা করতে অনুরোধ করছি।

সিডিসি উঠে দাঁড়াল। সামান্য হাসল। অবিকল মানুষদের মতো নাভাস ভঙ্গিতে কয়েকবার কাশল। শাদা কোটের পকেট থেকে টকটকে লাল রুমাল বের করে ঠোট মুছে তার কথা শুরু করল।

সম্মানিত বিজ্ঞান কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ। মহামান্য এমরান টি। আজকের বিশেষ অধিবেশনের উপর প্রতিবেদন আমি এক্ষুণি আপনাদের জানাচ্ছি। আপনাদের যে-কোন প্রশ্নের জবাব আমি প্রতিবেদন পেশ করার সময়ই দেব। বিশেষ অধিবেশনের নিয়ম-অনুযায়ী প্রতিবেদন শেষ হবার পাঁচ মিনিটের ভেতর আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। এখন আমি শুরু করছি। আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—আমার ডানপাশে হলোগ্ৰাম মনিটারটির দিকে।

সিডিসির ডানপাশের হলোগ্ৰাম মনিটারে কাজ করা শুরু হল। মনিটারটি একটি ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করল। সেই ছবিতে দেখা গেল রেফকে। সে চাদর গায়ে বিছানায় শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে জানালায় সমুদ্র দেখার চেষ্টা করছে। হলোগ্রামের ছবি যেমন হয়ে থাকে রফিকের ছবিটি সেরকম। বোঝার কোন উপায় নেই যে যা দেখা যাচ্ছে তা ত্রিমাত্ৰিক ছবি। মনে হচ্ছে বাস্তবের মানুষটি এখানে সরাসরি উপস্থিত। তার নিশ্বাস ফেলার শব্দও কানে আসছে।

যাকে আপনারা দেখছেন তার নাম রে। সে বিজ্ঞান কাউন্সিল নিয়ন্ত্রিত মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চার বছর ধরেই তার চিকিৎসা চলছে। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তার চিকিৎসক নিউরো বিশেষজ্ঞ মতামত দেবেন। তিনি তাঁর বক্তব্য দেবেন হলোগ্ৰাম মনিটারের মাধ্যমে। তাকে কোন প্রশ্ন করা যাবে না।

রফিকের ছবি মুছে গেল সেখানে প্রফেসর বার্নকে দেখা গেল। হাসিখুশি একজন বৃদ্ধ। নিজের খাসকামরায় বসে আছেন। হাতে কফির মগ। সামনে প্রচুর অগোছালো ফাইলপত্র। প্রফেসর ব্লেয়ার হাতের মগ নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন

রেকে চার বছর আগে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে বিজ্ঞান কাউন্সিল নিয়ন্ত্রিত স্যানিটোরিয়ামে ভর্তি করা হয়। কাউন্সিলের নির্দেশে আমাকে এই রোগীর প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হয়। রোগী এক বিচিত্র স্নায়ু-বৈকল্যে ভুগছে। এই স্নায়ুবৈকল্যের লক্ষণ হল স্থান-কাল সম্পর্কিত ভ্ৰম। রোগী কখনো ভাবছে সে এখানে আছে আবার কখনো ভাবছে এখানে নয় অন্য কোথাও বাস করছে। সাইকাডেলিক ড্রাগ যেমন LSD গোত্রীয় ড্রাগে এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়, তবে সেই অবস্থা স্থায়ী হয় না। রক্তে ড্রাগের মাত্রা কমে গেলে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এই ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। রোগীর অবস্থা অপরিবর্তিত আছে। চিকিৎসায় এই রোগ আরোগ্যের কোন আশা নেই। রোগীর বিষয়ে এরচে বেশি বলার কিছু নেই। এই স্নায়ু-বৈকল্য চিকিৎসায় যে-সব ড্রাগস এবং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তার পূর্ণ বিবরণ ফাইল নাম্বার MS001-525-PS005 QLPতে দেয়া আছে। যারা আগ্রহী তারা ফাইল দেখতে পারেন।

হলোগ্রামের ছবি মুছে গেল। সিডিসি উঠে দাঁড়াল। সে আবারো শাদা কোটের পকেট থেকে টকটকে লাল রুমাল বের করে ঠোট মুছতে মুছতে বলল, রেফের মানসিক সমস্যার ধরনটা আমি সামান্য ব্যাখ্যা করি। যদিও আমি জানি। ব্যাখ্যার তেমন প্রয়োজন নেই। রেফ নিজে নিশ্চিত নয় তার কোন জগৎটা সত্যি জগৎ। কখনো সে ভাবছে তার এই জগৎটা সত্যি, সে রেফ। যে রোবট তার দেখাশোনা করছে তার নাম শেফ। আবার কখনো ভাবছে সে আসলে রফিক। যে মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় তার নাম শেফা। আমার যা বলার আমি বললাম। যেহেতু আপনারা কেন প্রশ্ন করছেন না? আমি ধরে নিচ্ছি আপনাদের আর কিছু জানার নেই। কাজেই এখন সিদ্ধান্ত নেবার সময়। আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন এই রোগীর বিষয়ে কি করা হবে। আমরা কি তার চিকিৎসা আরো চালিয়ে যাব? নাকি ধ্বংস করে দেয়া হবে? সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে আপনাদের পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হল।

পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হল না, তার আগেই একশজন বিজ্ঞানীদের সবাই বললেন—ধ্বংস করে দেয়া হোক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট দুজন বিপক্ষে রায় দিল। তাদের ভোটাধিকার নেই। তারা হ্যাঁ বা না বলতে পারে তবে ভোটাভুটির মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাদের হ্যাঁ-না বাতিল হয়ে যায়।

হলঘরের সবুজ আলো নিভে গিয়ে নীল আলো জ্বলে উঠল। অধিবেশন শেষ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা উঠতে শুরু করবেন এমন সময় এমরান টি উঠে দাঁড়ালেন। অধিবেশন শেষ হবার পর কিছু ধন্যবাদ-সূচক কথা বলতে হয়। এমরান টি প্রায় যন্ত্রের মতো বললেন–

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিতে আপনারা সহায়তা করেছেন। কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।

কাউন্সিল সদস্যদের প্রতিনিধি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমরা কি ধরে নিতে পারি বিশেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে?

এমরান টি বললেন, হ্যাঁ ধরে নিতে পারেন। অধিবেশন সমাপ্তির ঘোষণা অবশ্যি আমার কাছ থেকে আসবে না। এই ঘোষণা কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী সিডিসি দেবে। আমি সিডিসিকে অধিবেশন শেষ করার ঘোষণা দেবার জন্যে অনুরোধ করছি।

সিডিসি উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে লাল রুমাল বের করে ঠোট মুছল। সে শান্ত গলায় বলল,

অধিবেশন সমাপ্তি ঘোষণার আগে আমি একটি আপাতত তুচ্ছ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মহান বিজ্ঞানীদের বুঝিয়ে বলার কোন প্রয়োজন নেই। যে তুচ্ছ বিষয়ও মাঝেমধ্যে অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। উদাহরণ দিয়ে বলি এই পৃথিবীতে এডলফ হিটলার নামের এক ব্যক্তি বহুকাল আগে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। মানবজাতির বিরাট একটা অংশ এই যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অতি তুচ্ছ একটি কারণ ঘটিয়ে এই ভয়ংকর যুদ্ধ বন্ধ করা যেত।

কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি বললেন—তুচ্ছ কারণটা ব্যাখ্যা করুন।

অসংখ্য তুচ্ছ কারণ উল্লেখ করতে পারি। যেমন ধরা যাক যে রাতে হিটলারের বাবা এবং মার সামান্য ঝগড়া হল। হিটলারের পিতা কফি চেয়েছিলেন। সেই কফি ঠাণ্ডা হওয়ায় হিটলার-জনক সামান্য রাগলেন। এবং রাগ নিয়ে ঘুমুতে গেলেন। ধরে নিন এটি হচ্ছে সেই বিশেষ রাত যে রাতে মাতৃগর্ভে হিটলার নামক মানুষটির সৃষ্টিপ্রক্রিয়া শুরু হবে। কফি গঠিত জটিলতায় প্রক্রিয়াটি শুরু হল না। তাহলে দাঁড়াল কি? এককাপ কফি সামান্য ঠাণ্ডা হবার কারণে পুরো মানবজাতি ধ্বংসের মুখোমুখি চলে গেল।

পদার্থবিদ ফেনটাং বিরক্ত গলায় বললেন, সিডিসি আপনি মূল বিষয়ে কথা বলুন।

সিডিসি ঠাণ্ডা গলায় বলল, মহান পদার্থবিদ ফেনটাং আমি মানব প্রজাতির কেউ না। আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কম্পিউটার। মূল সমস্যা থেকে দূরে সরে যাবার প্রবণতা মানবজাতির ভেতরই দেখা যায়। আমার মধ্যে এই প্রবণতা থাকার কথা নয়। আমি মূল বিষয়েই আছি। আমি বলার চেষ্টা করছি যে আপাতত অতি তুচ্ছ বিষয়ও পরে ভয়ংকর বিষয় হিসেবে দেখা দিতে পারে।

আমরা অতি দ্রুত রেফ নামের মানুষটির ধ্বংসের ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলাম। মহান বিজ্ঞান কাউন্সিলের কাছে এটি খুবই তুচ্ছ বিষয়। বিজ্ঞান কাউন্সিলকে এই অধিকার দেয়া হয়েছে। চিকিৎসার-অতীত মানসিক রোগীকে ধ্বংস করার আইন আছে। একমাত্র বিজ্ঞান কাউন্সিলই এই আইন প্রয়োগ করতে পারে। কাজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইনগত কোন জটিলতা নেই।

আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানসিক রোগীদের বিষয়ে প্রবল ভীতি কাজ করছে। এক সময় ছিল যখন তাদের পুড়িয়ে মারা হত। আবার একটা সময় ছিল যখন তাদের বস্তায় ভরে সাগরে ডুবিয়ে দেয়া হত। পরবর্তিতে মানবসমাজ সামান্য সহনশীলতা দেখায়, তারা মানসিক রোগীদের মেরে না ফেলে অপরাধীদের যেভাবে সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হত সেভাবে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করে। প্রায় একশ বছর এই ব্যবস্থাটি চালু থাকে। একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে আবারো মানসিক রোগীদের ধ্বংস করে ফেলার আইন পাস হয়। কিছুক্ষণ আগে আপনারা এই আইনই প্রয়োগ করলেন।

এমরান টি বললেন, তাতে সমস্যাটা কি?

সিডিসি বলল, কোন সমস্যা নেই।

সমস্যা না থাকলে দীর্ঘ বক্তৃতার কারণ কি?

দীর্ঘ বক্তৃতার কারণ হল, আমি শুধু বর্তমানের সমস্যা দেখি না, ভবিষ্যতের সমস্যাও দেখি আমার মধ্যে একটি সফটওয়ার আছে ফোর্থ অর্ডার প্রবাবিলিটি ভেক্টর এনালিসিস প্রোগ্রাম। এই সফটওয়ারের সাহায্যে আমি যে-কোন বর্তমান ঘটনাকে ভবিষ্যতের কো-অর্ডিনেটে ফেলতে পারি।

খুবই ভাল কথা।

শুধু এইটি ফেলতে পারছি না।

পারছ না কেন?

ফোর্থ অর্ডার প্রবাবিলিটি ভেক্টর এনালিসিস মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের ক্ষেত্রে কাজ করে না।

এটা জানা ছিল না।

সিডিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার কথা বলা শুরু করল। তবে এবারে সে ঠোট মুছল গাঢ় সবুজ রঙের রুমাল দিয়ে।

আমি আরেকটি বিষয়ের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। আমি অতি প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত যত মানসিক রোগী আছে তাদের সবার কেইস হিস্ট্রি জোগাড় করেছি। সেখান থেকে একটি কৌতূহল-উদ্দিপক বিষয় বের করা গেছে। বিষয়টি হচ্ছে আমি লক্ষ করেছি মানসিক রোগীদের মধ্যে অনেকেই একই সঙ্গে অন্য কোন সময়ে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

এমরান টি বললেন, তুমি বলতে চাচ্ছ যে রেফ্‌ যা বলছে অতীতেও অনেক রোগী তা বলেছে।

হ্যাঁ আমি তাই বলতে চাচ্ছি।

এটাই কি স্বাভাবিক না। তারা সবাই বিশেষ কোন মানসিক রোগে ভুগছে।

আমি মনে করি রোগের এই বিশেষ প্যাটার্নটি নিয়ে আমাদের আরো চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।

আমি তা মনে করি না।

আজ যদি রেফ্‌কে নষ্ট করে দেয়া হয় তাহলে এই বিশেষ দিকটি নিয়ে গবেষণার বড় একটা সুযোগ আমরা হারাব। এটা কি ঠিক হবে?

খুবই ঠিক হবে। কারণ তোমার কথার সূত্র ধরেই বলছি এ ধরনের রোগী অতীতে যেমন পাওয়া গেছে, ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে। কাজেই গবেষণা করার জন্য রোগীর অভাব হবে না। আমাকেও রোগী হিসেবে পেতে পার। কিছুদিন হল আমার মনে হচ্ছে আমি একই সঙ্গে এই পৃথিবীতে আছি আবার একই সঙ্গে কৃষ্ণ গহ্বরের টানেলের ভেতর সঁতার কাটছি। কাজেই সভা সমাপ্ত।

বিজ্ঞানীরা সচরাচর সেন না। এমরান টির কথায় অনেকেই হেসে ফেললেন। সিডিসি সভা সমাপ্তির ঘঘাষণা দিল। এমরান টি সিডিসির দিকে ঝুঁকে এসে বললেন আমি লক্ষ করেছি যে কোন কাউন্সিল মিটিং-এ তুমি ঠোট মোছার জন্যে একটা লাল রুমাল ব্যবহার কর। এর কারণ কি?

দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে করি। আজ অবশ্যি একটা সবুজ রুমালও ব্যবহার করেছি। আমার দিকে মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে এই কাজটা করা হয়।

আমিও তাই ভেবেছিলাম। এসো কফি খাওয়া যাক। ও আচ্ছা তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার মনেই থাকে না যে তুমি আমাদের কেউ না…

সিডিসি বলল, আমাদের বাহ্যিক গঠন এমন করা হয়েছে যে আমি ইচ্ছে। করলে আপনার সঙ্গে কফি খেতে পারি।

ও হ্যাঁ তা তো পারই। তাহলে এসো কফি খেতে খেতে গল্প করি।

আপনি কি সত্যিই আমার সঙ্গে গল্প করতে চাচ্ছেন?

না গল্প করতে চাচ্ছি না—তবে তোমার কাছ থেকে কিছু তথ্য জানতে চাচ্ছি।

বলুন।

তুমি কি সত্যি মনে কর রেফ্‌ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়?

আমি অবশ্যই সেরকম মনে করি।

আমি মনে করি না।

আপনিও মনে করেন। মনে করেন বলেই আবারো প্রশ্নটি এসেছে। শুধু আপনি না, আপনার বিজ্ঞান কাউন্সিলও মনে করে। তার চেয়েও বড় কথা বিজ্ঞান কাউন্সিল রেফ নিয়ে ভয়াবহ শংকার ভেতর আছে। বিজ্ঞান কাউন্সিল মনে করছে এই মানুষটি হুমকিস্বরূপ।

তুমি মনে করছ সে হুমকিস্বরূপ না?

সিডিসি সহজ গলায় বলল, মানুষটিকে যদি মেরে ফেলা যায় তাহলে সে হুমকিস্বরূপ না। আর যদি মেরে ফেলা না যায় তাহলে অবশ্যই হুমকিস্বরূপ।

মেরে ফেলা যাবে না কেন?

আপনাকে আমি এক বিশেষ শ্রেণীর মানসিক রোগীর কথা বলেছি যারা দাবি করত তারা দুটি ভিন্ন অবস্থানে বাস করে।

হ্যাঁ বলেছ।

এই শ্রেণীর মানসিক রোগীদের সবাই দীর্ঘদিন বেঁচেছেন। তাদের আয়ু স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। এবং এ রকম দুজনের কেইস হিস্ট্রি আছে যাদেরকে ভুলক্রমে এমন ওষুধ দেয়া হয়েছিল যাতে তৎক্ষণাৎ তাদের মৃত্যু হবার কথা। তা কিন্তু হয় নি। আরেকটি কেইস হিস্ট্রিতে পেয়েছি ওদের একজন ঝড়ে নৌকাডুবিতে পড়েছিল। নৌকার সমস্ত আরোহী মারা গেলেও সে মারা যায় নি।

সবই তো কাকতালীয়।

কাকতালীয় হতে পারে। তবে না-ও হতে পারে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রেকে ধ্বংস করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই নির্দেশ পালন করা হয়ত-বা সম্ভব হবে না।

কেন সম্ভব হবে না?

কারণ রেফ্‌ সেনিটোরিয়ামে নেই। সে বের হয়ে পড়েছে।

এমরান টি হতভম্ব গলায় বললেন—এটা তো অসম্ভব ব্যাপার।

প্রবাবিলিটির হিসেবে অসম্ভব নয়। আমাদের ব্যবস্থায় শতকরা দুই ভাগ প্রবাবিলিটি ছিল পালিয়ে যাবার। সে সেই দুইভাগ ব্যবহার করেছে।

ঘটনা ঘটেছে কখন?

কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি খবর পেয়েছি।

তুমি খবরটা জানালে না কেন?

বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন চলাকালীন সময়ে বাইরের কোন খবরাখবর দেবার নিয়ম নেই। এতে কাউন্সিলের মর‍্যাদা ক্ষুন্ন হয় এবং কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই নিয়ম আপনার জানা থাকার কথা।

রেফ্‌কে খুঁজে বের করার চেষ্টা কি করা হচ্ছে?

আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। সব চেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

তার লুকিয়ে থাকার এবং পালিয়ে বেড়াবার সম্ভাবনা কতটুকু।

একভাগেরও কম। আমার হিসেব মতো আজ সন্ধ্যার ভেতর তাকে ধরে ফেলা যাবে।

রেফকে সার্বক্ষণিকভাবে চোখে চোখে রাখার দায়িত্বে যে রোবটটি ছিল তাকে কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হ্যাঁ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তার বক্তব্য কি?

সে তেমন কিছু বলছে না। যাবতীয় প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। শেফ হচ্ছে অষ্টম ধারার রোবট। প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যাবার ক্ষমতা এদের অসাধারণ। আপনি কি শেফের সঙ্গে কথা বলতে চান?

তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমি রোবটদের ঘৃণা করি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট।

ঘৃণা করলে তো কোন সমস্যা নেই। আপনি তার সঙ্গে ঘৃণা নিয়ে কথা বলবেন। আমি তাকে বিজ্ঞান ভবনে চলে আসতে বলেছি। আমার মনে হয় সে। চলেও এসেছে। আপনি কি কথা বলবেন?

তুমি কথা বলতে বলছ?

আমি কিছুই বলছি না। আমি শুধু সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনি কথা বলতে চাইলে বলবেন। বলতে না-চাইলে বলবেন না।

এমরান টি মাথার রুমাল নাড়াচাড়া করছেন। তাঁর কাপের কফি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তিনি খালি কাপেই চুমুক দিচ্ছেন।

শেফ একটা চেয়ারে মাথা নিচু করে বসেছিল। এমরান টিকে দেখে সে উঠে। দাঁড়াল। একপলক তার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। এমরান টির বিস্ময়ের সীমা রইল না। কে বলবে এই মেয়েটি মানবজাতির কেউ না। কি সুন্দর মমতাময় মুখ। চোখে ভয়ের অংশ এত স্পষ্ট। এরা ভুল করে নি তো। শেফকে পাঠানোর বদলে অন্য কাউকে হয়ত পাঠিয়েছে। তিনি তাঁর পুরনো সেক্রেটারিকে বদলাতে চাচ্ছিলেন। এ হয়ত নতুন সেক্রেটারি।

এমরান টি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, তোমার নাম কি?

শেফ।

বোস। দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যদিও আমি জানি তোমার দাঁড়িয়ে থাকাও যা বসে থাকাও তা। তবু বোস।

শেফ বসল। এমরান টি ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি রেফ কে ছেড়ে দিয়েছ?

শেফ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

এই কাজটা কেন করলে?

ওর উপর খুব মায়া হচ্ছিল।

মায়া?

জ্বি মায়া। মহান বিজ্ঞানী এমরান টি আপনি নিশ্চয়ই জানেন অষ্টম ধারার কম্পিউটারে মানবিক আবেগ ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই চেষ্টা সফল হয়েছে। মায়া ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে আছে।

মায়া ছাড়া আর কি আছে।

দুঃখবোধ আছে, ভালবাসা আছে।

ঘৃণা নেই?

ঘৃণাও আছে। ভালবাসা থাকলেই ঘৃণা থাকতে হবে। ভালবাসা যদি হয় পজেটিভ ভেক্টর, ঘৃণা হবে নেগেটিভ ভেক্টর।

রেফের প্রতি তোমার কি শুধুই মায়া নাকি মায়ার সঙ্গে ভালবাসাও আছে?

এখনো বুঝতে পারছি না। হয়ত ভালবাসাও আছে। রেফের জন্যে খুবই দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। এই কারণে মনে হয় ভালবাসা আছে।

তোমার নিজের জন্যে দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে না? তুমি যে অপরাধ করেছ তার জন্যে কঠিন শাস্তির বিধান আছে। হয়ত-বা তোমার কপোট্রন নষ্ট করে ফেলা হবে।

আমি তা জানি। এর মধ্যেই আমার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আপনার সঙ্গে কথা বলা শেষ হলেই আমাকে সেলে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেয়া হবে। হয়ত-বা কপোট্রন খুলে নিয়ে যাবে। তবে আমি সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছি না। ভয় পাচ্ছি, কিন্তু দুঃশ্চিন্তা করছি না।

ভয় পাচ্ছ?

জ্বি ভয় পাচ্ছি। ভয় নামক আবেগও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে।

তোমার বিচার যখন শুরু হবে তখন তুমি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে কি বলবে?

শেফ এই কথায় সামান্য হাসল। হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করতে করতে বলল, আমি বলল, অবশ্যই আমি অপরাধী। অপরাধ করেছি কারণ রেফের জন্যে প্রচণ্ড মায়া অনুভব করেছি। আমার ভেতর মায়া নামক আবেগ সৃষ্টি করেছে মাল্টি ভেক্টর জেটা পটেনশিয়াল। এই মাল্টি ভেক্টর জেটা পটেনশিয়াল তৈরি করেছে মানুষ। কাজেই আমার অপরাধের সমস্ত দায়দায়িত্ব মানুষের। আমার নয়। মহান এমরান টি আমার যুক্তিটা কি খুব খারাপ?

সহজ যুক্তি তবে ভুল যুক্তি।

ভুলটা কোথায় ধরিয়ে দেবেন?

ধর কোন মানুষ বড় কোন অপরাধ করল। তারপর সে যুক্তি দিল অপরাধের দায়ভাগ তার না। মানুষ হিসেবে যে তাকে সৃষ্টি করেছে তার। এই যুক্তি যেমন ভুল। তোমার যুক্তিও ভুল।

মহান এমরান টি ভুল এবং শুদ্ধ খুবই জটির বিষয়। ন্যায়-অন্যায় যেমন আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন। ভুল-শুদ্ধ আলাদা করাও কঠিন। ফোর্থ অর্ডার প্রবাবিলিটি ভেক্টর এনালিসিস প্রোগ্রামে দেখা গেছে—এক সময় যা ভুল, অন্য সময় তা শুদ্ধ, এক সময় যা ন্যায় অন্য সময় তা অন্যায়। ন্যায়-অন্যায়কে যদি সময়ের বিপরীতে প্লট করে গ্রাফিক আকারে দেখানো হয় তাহলে মজার একটা চিত্র পাওয়া যায়।

মজার চিত্রটা কি?

গ্রাফটা হয় সাইন কার্ভের মতো। আমি কি আপনাকে গ্রাফটা একে দেখাব।

তার কোন প্রয়োজন দেখছি না। আচ্ছা তুমি যাও। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখব যেন তোমার কপোট্রন সরিয়ে নিয়ে নষ্ট না করা হয়।

স্যার আমি কি জানতে পারি আপনি কেন আমার প্রতি এই বিশেষ দয়া দেখাচ্ছেন?

এমরান টি বিরক্ত গলায় বললেন, আমি দয়া দেখাচ্ছি কারণ দয়া, মমতা, ভালবাসা এইসব ব্যাপারগুলি আমি মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রে নিয়ে এসেছি। আচ্ছা যাও এখন বিদেয় হও।

০৫. অস্বাভাবিক গরম পড়েছে

আজ অস্বাভাবিক গরম পড়েছে। আকাশে মেঘের ছিটাফেঁটাও নেই। বাতাস নেই, গাছের পাতা নড়ছে না। মাটির নিচ থেকে গরম ভাপ বের হচ্ছে। আকাশে অনেক উঁচুতে চিল উড়ছে। এটা বৃষ্টির লক্ষণ। সন্ধ্যার দিকে হয়ত-বা বৃষ্টি নামবে। ইয়াসিন সাহেব বাড়ির দক্ষিণ দিকে কাঁঠাল গাছের নিচে পাটি পেতে বসেছেন। পাতলা পাঞ্জাবি পরেছেন। পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তার সামনে পানদান ভর্তি পান, কাঁচা সুপারি এবং জর্দা। কাঁচা সুপারিটায় ভাল ধাক। তার মাথা সামান্য ঝিমঝিম করছে।

তার খাস লোক ফজলু এসে নলওয়ালা হুব্ধা তাঁর সামনে রেখে হাতে নল। ধরিয়ে দিল। ফজলু হুক্কার সঙ্গে বড় একটা তালপাখা এনেছে। ইয়াসিন সাহেব যতক্ষণ গাছের নিচে বসে থাকবেন ততক্ষণই সে পাখার বাতাস দেবে। এটা বরাবরের নিয়ম। আজ নিয়মের ব্যতিক্রম হল। ইয়াসিন সাহেব হাতের ইশারায় ফজলুকে চলে যেতে বললেন। ইয়াসিন সাহেব শেফাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁদের দুজনের কথাবার্তার মধ্যে তৃতীয় কোন ব্যক্তির থাকার প্রশ্নই ওঠে না। শেফার মা-ও না।

ইয়াসিন সাহেব নল টানছেন। গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। ঝাঁঝাঁ দুপুরে হুক্কার শব্দ তাঁর কাছে মধুর লাগে। আজ লাগছে না। তিনি মনে মনে কি বলবেন তা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। নিজের উপর তাঁর খানিকটা রাগও লাগছে। নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলবেন সেই কথা গুছিয়ে নেবার দরকার কি? ইয়াসিন সাহেব লক্ষ করলেন শেফা আসছে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে ভয় পাচ্ছে। অথচ তার ভয় পাওয়া উচিত। ইয়াসিন সাহেব আরেক খিলি পান মুখে দিলেন। চুন মনে হয় বেশি হয়েছে। মুখ জ্বলছে।

শেফা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ মেয়েটাকে অন্যদিনের চেয়েও সুন্দর লাগছে। ঝলমল করছে। অতিরিক্ত রূপবতী কন্যাও অভিশাপের মতো। নানান যন্ত্রণা রূপবতীদের নিয়েই হয়। ইয়াসিন সাহেব ইশারায় মেয়েকে বসতে বললেন। শেফা সহজ ভঙ্গিতে হাঁটুমুড়ে বসল। তার চোখ-মুখ স্বাভাবিক। যেন সে জানেই না কি জন্যে তাকে ডাকা হয়েছে।

ইয়াসিন সাহেব এখনো ঠিক করতে পারছেন না, কথা কিভাবে শুরু করবেন। মূল প্রসঙ্গে চলে যাবেন, নাকি মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে টুকটাক কথা বলবেন। পরীক্ষার পড়া কেমন হচ্ছে এইসব।

বাপজান আমারে ডাকছেন?

ইয়াসিন সাহেব হুক্কার নল নামিয়ে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, রফিক কোথায়?

শেফা বলল, জানি না।

তোর জানা নাই?

না।

মাটির দিকে তাকায়ে কথা বলবি না। আমার চোখের দিকে তাকায়ে কথা বল।

শেফা বাবার চোখের দিকে তাকাল। ইয়াসিন সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন যে শেফার চোখে কোন ভয় নেই।

রফিক কোথায় তুই জানি না?

বাপজান একটা কথা আমি কতবার বলব। উনি কোথায় আমি জানি না।

কাউকে কিছু না বলে সে চলে গেল কেন?

আমি তাকে চলে যেতে বলেছি।

কখন বলেছিস?

গতকাল রাত তিনটার দিকে।

তাকে কি বলেছিস।

বলেছি আপনার জীবনের মায়া যদি থাকে আপনি পালায়ে যান।

তোর ধারণা সে এখানে থাকলে তার জীবনের ভয় ছিল?

হ্যাঁ।

আমি তারে মারতাম?

হুঁ।

পালায়ে সে যাবে কোথায়। আজ সন্ধ্যার মধ্যে তারে ধরার ব্যবস্থা করব।

আচ্ছা করেন। আর কিছু বলবেন?

না।

আমি চলে যাব?

যা।

শেফা শান্ত গলায় বলল, ফজলুকে পাঠায়ে দেই। আপনে ঘামতেছেন। আপনেরে বাতাস করুক।

ইয়াসিন সাহেব মেয়ের সাহস দেখে আবারো চমৎকৃত হলেন। তিনি নিজের মনে হুক্কা টানছেন। আগুন অনেক আগেই নিভে গেছে। তামাক আসছে না। তিনি তা ধরতে পারছেন না। নল টেনেই যাচ্ছেন।

০৬. রেফ আকাশের দিকে তাকাল

রেফ্‌ আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ ঘন কাল হয়ে আছে। যে-কোন সময় বৃষ্টি নামবে। এই আকাশ পর্দায় তৈরি নকল আকাশ না। আসল আকাশ। বৃষ্টি যখন নামবে তখন শরীর ভিজে যাবে। দীর্ঘদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। রেফ্‌ মনেপ্রাণে চাইছে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক।

সে দাঁড়িয়ে আছে হাইওয়ের পাশে। হাইওয়েটা জংলামত জায়গা দিয়ে গিয়েছে। পাহাড়ি জংলা জায়গা। আকাশ-ছোঁয়া বড় বড় গাছে দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে আছে। পৃথিবীতে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মানবসমাজ শুরু হবার আগে আগে যে ধরনের অরণ্য ছিল—এই অরণ্যও সেরকম। এইসব গাছপালা জেনেটিক ইনজিনিয়ারিং প্রক্রিয়ায় তৈরি। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলক কিছু নিশ্চয়ই করছেন। নানান জায়গায় নানান ধরনের পরীক্ষা চলছে।

রে আবারো আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ ঘন হয়ে আসছে। এই মেঘমালাও কি পরীক্ষার কোন অংশ? সেই সম্ভাবনা আছে। বিশাল এই প্রাচীন অরণ্যের গাছপালার জন্যে প্রচুর বৃষ্টি দরকার। প্রয়োজনমত বৃষ্টির জন্যে দরকার মেঘ। কোন একদিন এই পরীক্ষা শেষ হবে। বিজ্ঞানীরা গাছপালা নষ্ট করে ফেলবেন। হয়ত ঠিক এই জায়গাতেই মরুভূমি তৈরি হবে। বালিয়াড়ির উপর দিয়ে ঝড়ের গতিতে বইবে মবুবায়ু। কিংবা বরফ ঢাকা অঞ্চল তৈরি হবে। পেঙ্গুইনের ঝাক গম্ভীর ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াবে। নতুন কোন এক্সপেরিমেন্ট।

রেফ্‌ আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

রেফ্‌ চমকাল। তবে প্রথমবার যে-ভাবে চমকেছিল সে-ভাবে চমকাল না। কেউ একজন তার সঙ্গে কথা বলছে। কথা বলছে ঠিক তার মাথার ভেতরে। মনে হচ্ছে শস্যের দানার মতো ছোট্ট কোন মানুষ তার মস্তিষ্কের ভজে শুয়ে আছে। তার হাতে মাইক্রফোন। সে কথা বলছে মাইক্রফোনে। অবিশ্বাস্য এই ব্যাপার সকাল থেকে ঘটছে। মাথার ভেতরে যে কথা বলছে সে-ই তাকে এই প্রাচীন অরণ্যে পথ বলে বলে নিয়ে এসেছে।

ব্যাপারটা তার মানসিক ব্যাধির একটা অংশ হতে পারে। সে হয়ত সেনিটোরিয়ামে তার বিছানায় শুয়ে আছে। আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে আছে। বাকিটা তার মস্তিষ্কের কল্পনা। উত্তপ্ত অসুস্থ মস্তিষ্ক অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটায়।

রেফ তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

শুনতে পাচ্ছি।

পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছ?

হ্যাঁ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি।

যা ঘটছে তা নিয়ে তুমি কি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করছ?

আমি এমিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মানসিক রোগগ্রস্ত হিসেবে আমার চিকিৎসা চলছে। আমার ধারণা আমি সেনিটোরিয়ামে আমার নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। যা ঘটছে সবই কল্পনা।

এ রকম ভেবে তুমি যদি মানসিকভাবে স্বস্তি পাও তাহলে তাই ভেবে নাও। এই মুহূর্তে মাথা ঠাণ্ডা রাখা তোমার জন্যে খুবই প্রয়োজন।

আপনি কে?

আমি ভবিষ্যতের মানুষ। অনেক দূরের ভবিষ্যৎ থেকে তোমার উপর কাজ করছি।

ও।

আমরা তোমাকে সাহায্য করতে চেষ্টা করছি। সরাসরি সাহায্য করা সম্ভব হচ্ছে না। তুমি নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ কর।

আমার বুদ্ধি-বিবেচনা কাজ করছে না।

তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তোমাকে খোঁজা হচ্ছে।

অনুমান করছি।

তোমাকে পালিয়ে থাকতে হবে।

কোথায় পালাব?

চিন্তা কর। ভেবে বের কর। আমরা অতি দূর-ভবিষ্যতের মানুষ। এত দূর থেকে আমরা তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি না।

আমি কি আমার নিজের বাড়িতে ফিরে যাবার চেষ্টা করব? নিশ্চয়ই কেউ ভাববে না যে আমি নিজের ঘরে চলে যাব। বাইরে তালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে পারি।

বুদ্ধি খারাপ না। তবে তোমার খাদ্যের প্রয়োজন হবে। খাবারের জন্যে তোমাকে বাইরে যেতে হবে। তাছাড়া তোমার ঘরে এর মধ্যেই রক্ষী রোবট পাঠিয়ে দেয়ার কথা।

ঠিকই বলেছেন। এখন কি করব?

এমন কোথাও তোমাকে আশ্রয় নিতে হবে যেখানে কেউ তোমার খোঁজ করার কথা ভাববে না।

সেই জায়গাটা কোথায়?

বিজ্ঞান কাউন্সিলপ্রধান এমরান টির বাড়ি।

সর্বনাশ সেখানে কিভাবে যাব?

আমরা তোমাকে সাহায্য করব।

সাহায্য করুন।

এই মুহূর্ত থেকে তুমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটের ভূমিকায় অভিনয় করা শুরু কর। এই রোবটগুলি হিউমেনয়েড। দেখতে অবিকল মানুষের মতো।

আমার পোশাক রোবটদের মতো না। রোবটদের বিশেষ কোড নাম্বার আছে। স্ক্যানারে এই কোড ধরা যায়। তাছাড়া আমার চেহারার ব্যাপার তত আছেই। আপনারা কি আমার চেহারা পাল্টে দিতে পারবেন? আমাকে কোড নাম্বার দিতে পারবেন? আমাকে পোশাকের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?

পারব না।

তাহলে?

আমরা মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর সরাসরি কাজ করতে পারি। মস্তিষ্কের নিউরোন কারেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যারা তোমার কাছে আসবে তারাই তোমাকে রোবট ভাববে। তোমার চেহারা তারা দেখবে না। তারা অন্য চেহারা দেখবে।

মানুষের ব্যাপারে আপনারা এই কাজটা হয়ত-বা করতে পারতেন কিন্তু একজন রোবট যখন আসবে তখন? রোবটদের মস্তিষ্ক নেই-নিউরোন কারেন্ট নেই। ওদের চোখকে ফাঁকি দেবেন কিভাবে?

ওদের চোখকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব না। কাজেই তোমাকে অতি দ্রুত পৌঁছে যেতে হবে এমরান টির বাসভবনে। উনি রোবট ঘৃণা করেন, তাঁর বাসভবনে। কোন রোবট নেই। একবার ওনার বাসভবনে পৌছানোর পর তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। তোমার হাতে একটা অস্ত্র দেখতে পাচ্ছি। এটা কি ওমিক্রন গান?

আমি জানি না এটা কি অস্ত্র। শেফ আমাকে এটা দিয়েছে।

তোমার হাতের অস্ত্ৰটা ওমিক্রন গান। এমরান টিকে হাতের মুঠোয় রাখতে হলে এই অস্ত্র লাগবে।

এমরান টিকে আমি কি বলব?

তার কাছে তুমি তোমার সত্যি পরিচয় দেবে।

সত্যি পরিচয় দেব?

হ্যাঁ।

দয়া করে বলুন তো আমার সত্যি পরিচয়টা কি?

তোমার সত্যি পরিচয় হচ্ছে তুমি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষার অংশ।

পরীক্ষাটা কে করছে।

পরীক্ষাটা করছে ওমেগা পয়েন্ট।

ওমেগা পয়েন্ট কি?

ওমেগা হল মানবজাতির সর্বশেষ অবস্থা। পূৰ্ণ জ্ঞান।

কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমরাও বুঝতে পারি না। আমরা যা অনুভব করি তা হচ্ছে মানব সম্প্রদায়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে। একসময় মানুষ সব কিছুই জেনে যাবে। সৃষ্টি চলে আসবে তার হাতের মুঠোয়। এই পর‍্যায়টিকেই বলা হচ্ছে ওমেগা পয়েন্ট।

বুঝতে পারছি না।

আমরাও বুঝতে পারি না। বোঝার চেষ্টাও করি না। আমরা ধরে নিচ্ছি–ওমেগা পয়েন্ট তোমাকে দিয়ে একটা পরীক্ষা শুরু করেছে। আমাদের দায়িত্ব হল এই পরীক্ষা যেন ঠিকমত শেষ হতে পারে সেই বিষয়ে সাহায্য করা। আমরা সেই চেষ্টাই করছি।

আমি তাহলে একটা গিনিপিগ?

হ্যাঁ তুমি একটা গিনিপিগ।

গবেষণায় একটা গিনিপিগের মৃত্যু হলে অন্য গিনিপিগ ব্যবহার করা হয়। আমার ক্ষেত্রেও কি সেই ব্যবস্থা?

হয়ত-বা। আমরা জানি না। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ। বৃষ্টি নামছে।

হ্যাঁ বৃষ্টি নামছে। এখন বল গিনিপিগকে কি করতে হবে?

তুমি বৃষ্টির মধ্যে হাইওয়েতে দাড়িয়ে ভিজতে থাকবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ষীবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এই পথে আসবেন। তাঁর সাহায্যে তুমি এমরান টির বাসভবনে পৌঁছবে।

তোমাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকবে?

শুধু প্রয়োজনের সময়ই আমরা যোগাযোগ করব।

আপনাদের একটা শেষকথা বলতে চাচ্ছি।

বল।

আমি নিশ্চিত যা ঘটছে সবই আমার কল্পনা। আমি একজন মানসিক রোগী। আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্ক এইসব কল্পনা করছে।

হতে পারে। কল্পনাকে তার পথে যেতে দাও। তুমি হাইওয়েতে গিয়ে দাঁড়াও। মনে রেখ তোমার ভাবভঙ্গি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটদের মতো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটরা কেমন আমি জানি না। আমি রোবট না। আমি মানুষ।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। রেফ্‌ অনেকদিন এমন বৃষ্টি দেখে নি। শুধু বৃষ্টি না। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস দিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে যে-কোন সময় মাথার উপর গাছের ডাল ভেঙে পড়বে।

রেফ্‌ গাছের নিচ থেকে সরে এল। ঢালু জায়গা দিয়ে তাকে নামতে হচ্ছে। হাইওয়েতে নামতে হলে অনেকখানি পথ তাকে নামতে হবে। জুতা ভর্তি হয়ে যাচ্ছে কাদায়। পা টেনে টেনে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির পানি অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। তার সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। শীতল বাতাসে শরীরের হাড় পর্যন্ত কাঁপছে। কোন একটা গরম বিছানায় গাঢ় হলুদ রঙের কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে পারলে কত চমৎকারই-না হত-এ-ই ভাবতে ভাবতে রেফ্‌ নামছে। হাইওয়েকে আগে যত কাছে মনে হচ্ছিল এখন তত কাছে মনে হচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে হাইওয়েটা মরীচিকার মতো। সে যতই কাছে যাচ্ছে, হাইওয়ে ততই সরে যাচ্ছে।

একজন মানুষের পক্ষে যতটুকু বিরক্ত হওয়া সম্ভব এমরান টি তারচেয়েও বিরক্ত হলেন। বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। তাঁর মুখ আগে যেমন হাসি-হাসি ছিল এখনো হাসি-হাসিই আছে। তিনি তাঁর বাড়ির দক্ষিণের জানালার কাছে চেয়ার টেনে বসেছেন। পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখছেন। তাঁর বাড়ি এই সময়ের অন্য বাড়িঘরগুলির মতো না। বাড়ির দেয়াল সত্যিকার কাঠের তৈরি। চেয়ার-টেবিল সবই কাঠের।

এই সময়কার বাড়িঘর আসবাবপত্র সবই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ট্ৰেমসি অণুর তৈরি। এই উদ্ভিদ অজৈব যৌগিক অণুকে অতি দ্রুত ঘনীভূত করে যে-কোন রূপ দেয়া যায়। কম্পিউটারের নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যে একটা কাঠের ইজিচেয়ার হয়, আবার সেই ইজিচেয়ারকে স্বচ্ছ পালসিক চেয়ারেও রূপান্তরিত করা যায়। পালসিক চেয়ার হল শরীর-সংবেদনশীল চেয়ার। শরীর যেভাবে চায় চেয়ার সেইভাবে তার রূপ পাল্টায়।

এমরান টি রোবট পছন্দ করেন না, ট্ৰেমসি অণুর আসবাবপত্রও পছন্দ করেন না। তাঁর বাড়ির জানালায় ত্রিমাত্রিক আলো প্রতিফলন ক্ষমতাসম্পন্ন পর্দাও নেই। কাজেই তাঁকে নকল দৃশ্যও দেখতে হয় না।

কাঠের চেয়ারে বসে তিনি যে দৃশ্য এখন দেখছেন সেই দৃশ্য একশ ভাগ খাঁটি দৃশ্য। এমন কিছু সুন্দর দৃশ্য না, কিন্তু তার দেখতে খারাপ লাগছে না। বরং বেশ ভাল লাগছে। প্রচুর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি বিদ্যুৎ চমকের হিসাব রাখার চেষ্টা করছেন। একেকবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর তিনি মনে মনে গুনছেন–সতেরো, আঠারো, উনিশ…

এই সময় তাঁর গোনায় বাধা পড়ল। মেজাজ অসম্ভব খারাপ হল। তিনি তাঁর সহকারীর দিকে তাকালেন। সহকারী রোবট না, সে সাধারণ একটি মেয়ে। নাম রেলা। চেহারা অতিরিক্ত সাদাসিধা। মনে হয় সারাক্ষণই ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। কাজকর্মেও যে খুব দক্ষ তাও না। কম্পিউটারে কোন একটা ফাইল খুলতে বললে সে প্রথমে আতংকে একটু শিউরে ওঠে। তারপর যেভাবে কম্পিউটারের বোম টেপে তার থেকে যে-কেউ ধারণা করতে পারে যে সে জীবনে কখনো কম্পিউটারের বোতামে হাত দেয় নি। কিংবা বোতামগুলিতে ইলেকট্রিসিটি পাস করছে। আঙুল ছেয়াননা মানেই শক খাওয়া। ফাইলটি একসময় সে অবশ্যি বার করে—ততক্ষণে এমরান টির ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তবে মেয়েটাকে কিছু বলতে পারেন না। বেচারির চেহারায় কিশোরীসুলভ মায়া আছে। তার চোখ যেভাবে ছলছল করতে থাকে তাতে মনে হয় কিছু বললেই সে কেঁদে ফেলবে। কাজেই মনের বিরক্তি মনে চেপে রাখা ছাড়া পথ থাকে না। মেয়েটিকে বদলে অন্য সহকারী নেয়ার কথা তিনি অনেকদিন থেকেই ভাবছেন। শুধুমাত্র আলস্যের কারণে নেয়া হচ্ছে না।

তিনি যখন বিদ্যুৎ চমকানোর হিসাব করছিলেন তখনই রেলা তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

এমরান টি মহা-বিরক্ত হলেন। বিরক্তির অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথম কারণ তিনি মনের আনন্দে বিদ্যুৎ চমকানো গুনছিলেন। সেখানে বাধা পড়ল। দ্বিতীয় কারণ মেয়েটি স্পষ্ট করে কিছু বলে নি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। এই বাক্যটি দিয়ে কিছুই বোঝা যায় না। কে দেখা করতে চায়? কেন দেখা করতে চায়? তৃতীয় কারণ কেউ একজন চাইলেই এমরান টির সঙ্গে দেখা করতে পারে না। সেক্রেটারি হিসেবে রেলার এই তথ্য জানা থাকা উচিত। চতুর্থ কারণ তিনি তাঁর বাড়িতে কারো সঙ্গেই দেখা করেন না।

তিনি তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। হাসিমুখেই রেলার দিকে তাকিয়ে বললেন, কে দেখা করতে চায়?

মানবিক আবেগসম্পন্ন একটি রোবট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

তুমি তো জান আমি রোবটদের সঙ্গে কথা বলি না। জান নাকি জান না?

জানি। কিন্তু সে বলছে খুব জরুরি।

একজন রোবটের সঙ্গে আমার কোন জরুরি কথা থাকতে পারে না।

রেফ্‌ নামের যে একজনকে খোঁজা হচ্ছে এই রোবটটি সেই বিষয়ে আপনাকে তথ্য দিতে চায়।

এমরান টি বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছেছেন, তারপরেও তিনি তাঁর মুখ হাসি-হাসি রাখলেন। সেক্রেটারি মেয়েটার দিকে তাকালেন। এই মেয়েটিকে আর রাখা যাবে না। তাকে অতি দ্রুত বিদায় করে দিতে হবে। সম্ভব হলে আজই।

এই রোবটটি রেফ্‌ সম্পর্কে আমাকে তথ্য দিতে চায়?

জ্বি।

রেফ্‌ সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে চাইলে সে দেবে নগর-পুলিশকে, কিংবা মূল কম্পিউটারকে, আমাকে কেন?

সেটা স্যার আমি বলতে পারছি না। তবে আপনি চাইলে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি।

তোমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। তুমি তাকে বিয়ে হতে বলবে। এবং তার নাম্বার রেখে দেবে। যাতে আমি কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে পারি।

আপনি তার সঙ্গে দেখা করবেন না?

না।

কিছু মনে করবেন না স্যার। আমার মন বলছে তার সঙ্গে আপনার দেখা করা উচিত।

তুমি তোমার মনকে বিশেষ গুরুত্ব দিও না। তোমার মন এবং বুদ্ধিবৃত্তি তেমন উচ্চ শ্রেণীর না। কিছু মনে করো না। মাঝে মাঝে সত্যি কথাটা জানা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

স্যার আমি জানি আমার বুদ্ধি খুবই কম। আমি জানি আপনি আমাকে যা করতে বলছেন সেটাই আমার করা উচিত। কিন্তু…

কিন্তু কি?

রোবটটা একটা ওমিক্রন গান নিয়ে এসেছে।

ওমিক্রন গান নিয়ে এসেছে মানে। ওমিক্রন গান তুমি চেন?

জ্বি চিনি। রোবটটি আমাকে বলেছে—তুমি এমরান টি নামের বুঢোটাকে আসতে বল। আমার কাছে রেফ্‌ সম্পর্কে তথ্য আছে। আমি তার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করব। বুড়ো হয়ত আসতে চাইবে না। তাকে আমার হাতের ওমিক্রন গানটির কথা বলবে। ও সুড়সুড় করে চলে আসবে।

তোমাকে সে এই কথাগুলি বলেছে?

জ্বি।

এমরান টির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তার চেনাজগৎ হঠাৎ খানিকটা এলোমেলো লাগতে শুরু করেছে। এই প্রথম তার মনে হল তিনি নিজেকে যতটা বুদ্ধিমান ভাবেন তিনি আসলে ততটা বুদ্ধিমান না। তিনি বেশ বোকা। ভালমত হিসাবনিকাশ করলে হয়ত দেখা যাবে তিনি রেলা নামের মেয়েটার চেয়েও বোকা। কারণ তিনি নিজে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তাঁর বাড়িটি এমনভাবে বানিয়েছেন যেন বাড়ির সঙ্গে বাইরের কোন যোগাযোগ না থাকে। এখন ইচ্ছা করলেও তিনি নগর-নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তিনি হতাশ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। সামান্য একটা রোবট ওমিক্রন গান হাতে নিয়ে তাকে ভয় দেখাচ্ছে—এমন একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা কিভাবে ঘটছে?

রেলা ক্ষীণস্বরে বলল, স্যার আমি কি বাড়ি থেকে গোপনে বের হয়ে নগরনিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করব?

এমরান টি শান্তগলায় বললেন, তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তোমার বুদ্ধিবৃত্তি যে পর্যায়ের তাতে তুমি ব্যাপার আরো জট পাকিয়ে ফেলবে।

রোবটটি সোফায় বসে আছে। তার শরীর ভেজা। জুতায় কাদা লেগে আছে। রোবটিকস বিদ্যা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে তা এই রোবটটিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে তার কোন রকম প্রভেদ নেই। ঠাণ্ডায় সে যে কেঁপে কেঁপে উঠছে তাও বোঝা যাচ্ছে। ঠোট পর্যন্ত ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আছে। রোবটটির কোলে ওমিক্রন গান। এমন ভয়াবহ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ হাঁটতে পারে?

এমরান টি-কে ঘরে ঢুকতে দেখেও রোবটটি উঠে দাঁড়াল না। সম্মান প্রদর্শনের ভঙ্গি করল না। সে শুধু একটা হাত ওমিক্রন গানের উপর রাখল। এমরান টি বললেন, কি ব্যাপার? খুব সহজভাবেই বলতে চেষ্টা করলেন। বলতে পারলেন না। তাঁর গলা সামান্য কেঁপে গেল।

রোবটটি বলল, ব্যাপার বলছি। আপনি আমার সামনে বসুন।

আমি বসব নাকি দাঁড়িয়ে থাকব তা আমি ঠিক করব। তোমার ব্যাপারটা কি?

আপনাকে আমি বসতে বলছি আপনি বসুন। যতক্ষণ আমার হাতে ওমিক্রন গান থাকবে ততক্ষণ আমার প্রতিটি কথা আপনাকে শুনতে হবে। আপনাকে আমি বসতে বলছি। আপনি বসুন।

এমরান টি বসলেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্মভাবে ঘাম জমতে শুরু করেছে।

রেলা নামের যে মেয়েটা আছে। খুব সম্ভব সে আপনার সেক্রেটারি। তাকে বলুন আমাকে আগুন-গরম কফি বানিয়ে দিতে। শীতে আমি জমে যাচ্ছি।

এমরান টি বললেন, রোবটদের শীতবোধ বা ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে বলে আমি জানি না। তারা শীতবোধ এবং ক্ষুধার অনুকরণ করে। আমার এখানে। অনুকরণের প্রয়োজন নেই।

আমি অনুকরণ করছি না। এবং আমি রোবট নই। আমার নাম রে। আমাকেই আপনারা খুঁজছিলেন।

এমরান টি নিজের বিস্ময় গোপন করার চেষ্টা করতে করতে বললেন, আমি কাউকে খুঁজছি না। বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি কাউকে খোঁজে না। নিরাপত্তা কর্মীরা তোমাকে খুঁজতে পারে এটা তাদের ব্যাপার। আমার কোন ব্যাপার না।

আপনি কি জাগতিক সকল কর্মকাণ্ডের ঊর্ধ্বে?

তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ আমি বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি।

কিছুক্ষন পরপরই আপনি এই বাক্যটি বলছেন কাজেই আমি ভুলতে পারছি না। তবে আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি আপনি ব্যাপারটা ভুলে যান। আপনি বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি, আপনি একজন মহা-শক্তিধর মানুষ এটা ভুলে যান।

ভুলে যাবার প্রয়োজন কি পড়েছে?

হ্যাঁ প্রয়োজন পড়েছে। আমি ওমিক্রন গান হাতে নিয়ে বসে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গানটি লক করা হবে।

এমরান টির চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি নিজের হৃদপিণ্ডের ধ্বক ধ্বক শব্দ পরিষ্কার শুনতে পেলেন। তার সামান্য বমি ভাবও হল। তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি তাঁকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ওমিক্রন গান একটি ভয়াবহ অস্ত্র। এই অস্ত্রটি কাজ করে নিঃশব্দে। ট্রিগার টিপলে ভয়ংকর বিস্ফোরণ হয় না। প্রচণ্ড শক্তিশালী লেজার-রশি সবকিছু লণ্ডভণ্ডও করে দেয় না। এই ভয়ংকর মারণাস্ত্র ব্যক্তিবিশেষের দিকে তাক করে লক করে দিতে হয়। যাকে একবার লক করে দেয়া হয় সে পুরোপুরি অস্ত্রের হাতে বাধা পড়ে যায়। অস্ত্রধারী মানুষ তখন শুধুমাত্র ইচ্ছা প্রকাশ করলেই অস্ত্র কার্যকরী করতে পারে। যাকে লক করা হয়েছে তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। ওমিক্রন গান যিনি লক করেন শুধুমাত্র তিনিই তা মুক্ত করতে পারেন। ওমিক্রন গান ধ্বংস করা যায়। সমস্যা একটাই, ওমিক্রন গান ধ্বংস মানে যাকে লক করা হয়েছে তারও ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

এমরান টি নিচু গলায় বললেন, তুমি কি সত্যি-সত্যি আমাকে লক করছ?

রেফ সহজ গলায় বলল, অবশ্যই।

কেন?

কারণ আমি আপনার এখানে কিছুদিন লুকিয়ে থাকব। আপনাকে ওমিক্রন লকারে লক না করলে তা সম্ভব হবে না। এখন আপনি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমার মৃত্যু মানেই আপনার মৃত্যু।

এমরান টি গলা পরিষ্কার করে বললেন, আমাকে লক করার কোন প্রয়োজন নেই। তুমি লুকিয়ে থাকতে চাচ্ছ তোমাকে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আমি তোমার বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ বোধ করছি।

রে বলল, আপনি যদি বুদ্ধিমান মানুষ হতেন তাহলে আমার ব্যাপারে অবশ্যই আগ্রহ বোধ করতেন। সমস্যা হচ্ছে আপনি বুদ্ধিমান না। আপনি বোকা, ভালই বোকা। কাজেই আপনি বোকার মতো ভাবছেন আমাকে কোনমতে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখা যাবে। গোপনে নিরাপত্তা বিভাগে খবর দিয়ে ফেলবেন। নিরাপত্তা-কর্মীরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।

এত নিশ্চিত করে তুমি কিভাবে বলছ যে আমি বোকা।

নিশ্চিত করে আমি আপনাকে বোকা বলছি, কারণ আপনার সেক্রেটারি মেয়েটি যে মানুষ না, অসম্ভব বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন নবম পর্যায়ের রোবট আপনি তা বুঝতেই পারেন নি।

বল কি?

রেফ্‌ তার ওমিক্রন গান তাক করল। এমরান টি তার তলপেটে ছোট্ট ধাক্কার মতো খেলেন। তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারছেন তাঁকে লক করা হয়েছে। রেফ্‌ ওমিক্রন গান তাঁর দিকে বাড়িয়ে বলল, এখন এর কাজ শেষ। আপনি ওমিক্রন গানটা নিরাপদ জায়গায় তুলে রাখতে পারেন।

এমরান টি বললেন-তুমি নিশ্চিত যে মেয়েটি একটি রোবট।

হ্যাঁ।

বুঝলে কি করে?

বুদ্ধি খাটিয়ে বের করেছি।

ওমেগা পয়েন্ট

আমার এখানে রোবট দিয়ে রেখেছে কেন?

তা তো জানি না। সম্ভবত আপনার উপর খবরদারি করার জন্যে একে রাখা হয়েছে। গুপ্তচর বিভাগের কাজ হতে পারে। এ জাতীয় রোবট কারা ব্যবহার করে সেটা না জানলে বলা যাবে না। আগে সেটা বের করতে হবে। আপনি চাইলে আমি বের করে দেব। এখন আমি কি বলছি মন দিয়ে শুনুন। আপনি নগর-নিরাপত্তা বাহিনীকে বলুন যেন এই মুহূর্তে আপনার বাড়ি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। একদল রোবট বাড়ি ঘিরে রাখবে যেন কোন মাছিও ঢুকতে না পারে।

আমি জীবনে কখনো আমার বাড়ি পাহারার ব্যবস্থা করি নি? আজ হঠাৎ কেন করব।

আমি করতে বলছি তাই করবেন। আরো একটি যুক্তি আছে। আপনাকে না জানিয়ে মানুষ পরিচয়ে আপনার বাড়িতে এরা একটি নবম শ্রেণীর রোবট রেখে দিয়েছে। কাজেই ধরে নেয়া যেতে পারে আপনাকে নিয়ে ভয়াবহ কিছু সমস্যা আছে। নিরাপত্তা আপনি অবশ্যই চাইতে পারেন।

আচ্ছা।

শেফ নামের অষ্টম পর্যায়ের একটি রোবট আমাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আপনি তাকে এ বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করুন। বললেই হবে আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান।

আচ্ছা করছি।

আমার জন্যে গরম কফির ব্যবস্থা করতে বলুন।

এমরান টি রেলাকে কফি আনতে বললেন। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে কফি নিয়ে এল। সে ভয়ে চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না। একবার এমরান টির দিকে। তাকাচ্ছে আর একবার রেফ-এর দিকে তাকাচ্ছে।

এমরান টি বললেন, রেলা তুমি কি মানবিক আবেগসম্পন্ন নবম পর্যায়ের রোবট।

রেলা স্বাভাবিক গলায় বলল, হ্যাঁ।

তোমাকে আমার এখানে কে দিয়ে গেছে।

গুপ্তচর বিভাগের প্রধান।

কি জন্যে তোমাকে এখানে রাখা হয়েছে।

আমি জানি না কি জন্যে রাখা হয়েছে। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি যতদূর সম্ভব অল্পবুদ্ধির মানুষদের মতো আচরণ করি। কারণ আপনি আপনার আশেপাশে বুদ্ধিমান মানুষ পছন্দ করেন না।

এই জন্যে বোকা সেজে ছিলে?

জ্বি।

তুমি কি গুপ্তচর বিভাগের সঙ্গে খবর আদান-প্রদান করতে।

জ্বি না। আমাকে সেরকম নির্দেশ দেয়া হয় নি। আমাকে শুধু বলা হয়েছে আপনার উপর লক্ষ রাখতে। আমি তাই করেছি।

তুমি কি ইচ্ছা করলে এই মুহূর্তে গুপ্তচর বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে?

পারব। আমার মধ্যে ব্যবস্থা করা আছে, এখান থেকে যে-কোন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব।

রে যখন প্রথম এ বাড়িতে ঢুল। তার হাতে ওমিক্রন গান। তুমি কেন তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে না।

যোগাযোগ করলে আমার পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেত। আপনার কাছে পরিচয় গোপন রাখতে আমাকে বলা হয়েছে।

খুব ভাল কথা। এখন তুমি গুপ্তচর বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দাও। ওর নাম কি নেসরা?

স্যার, আমাকে অল্প কিছু সময় দিন।

তোমাকে সময় দেয়া হল। এই ফঁাকে তুমি রেফ্‌ ছেলেটির জন্যে শুকনো কাপড়ের ব্যবস্থা কর। ও কোন্ ঘরে থাকবে সেই ঘরটা দেখিয়ে দাও। ও নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত তার খাবারের ব্যবস্থা কর।

এক্ষুণি সব ব্যবস্থা করছি।

রে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। তাকে সামান্য অস্থির মনে হচ্ছে। কথাবার্তা কি হচ্ছে সে খুব যে মনোযোগ দিয়ে শুনছে তা না।

রেলা এমরান টির দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার গুপ্তচর বিভাগের প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। আপনি কথা বলুন।

চেয়ারে বসে কথা বললেই সে শুনবে?

জ্বি স্যার। উনি শব্দ শুনবেন। কোন ছবি দেখবেন না।

ছবি পাঠাবার ব্যবস্থাও কি আছে?

জ্বি আছে। স্যার আমি বোতাম টিপে দিচ্ছি আপনি কথা বলুন।

এমরান টি হাসি-হাসি মুখে বললেন, হ্যালো আমি কার সঙ্গে কথা বলছি?

স্যার আমি নেসরা, গুপ্তচর বিভাগের প্রধান।

শুভ সন্ধ্যা নেসরা।

জ্বি স্যার শুভ সন্ধ্যা।

খুব শুভ কিন্তু না। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে।

আমি যে তোমার সঙ্গে কথা বলছি এতে তুমি কি আশ্চর্য হচ্ছ না। আমার বাসা থেকে বাইরের জগতের সঙ্গে কখনোই কোন যোগাযোগ করা যাবে না এমন বলা হয়েছিল। আমার ধারণা ছিল সেই ব্যবস্থা আছে। এখন দেখছি তা না। আমার বাড়িতে নবম পর্যায়ের একটি রোবট বাস করছে। দিনের-পর-দিন বোকা মানুষের নিখুঁত অভিনয় করে যাচ্ছে।

খুব নিখুঁত অভিনয় করতে পারে নি। করতে পারলে আপনি ধরতে পারতেন না।

তা ঠিক। অভিনয় খুব নিখুঁত হয় নি।

এখন তুমি কি দয়া করে একটু ব্যাখ্যা করবে কোন স্পৰ্ধায় গুপ্তচর বিভাগ এমন একটা কাজ করে। আমি বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ জরুরি অধিবেশন ডাকার ব্যবস্থা করছি।

স্যার এখানে আপনি ছোট্ট একটা ভুল করেছেন। এমন ভয়ংকর অন্যায়। একটা কাজ গুপ্তচর বিভাগ এককভাবে কখনোই করবে না। তোমাদের সঙ্গে আর কে কে আছে জানতে পারি?

আমরা এই কাজটি অনিচ্ছার সঙ্গে করেছি। বিজ্ঞান কাউন্সিলের বিশেষ অনুরোধে।

নেসরা তুমি খুবই বিস্ময়কর একটা কথা বলছ।

স্যার আমি সহজ সত্য কথা বলছি। বিজ্ঞান কাউন্সিল কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে আমি কি তাদের হয়ে ব্যাখ্যা করব, নাকি আপনি সরাসরি তাদের কাছ থেকেই শুনবেন?

তোমার ব্যাখ্যা আগে শুনি।

পদার্থবিদ্যার যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কার আপনি করেছেন। বলা হয়ে থাকে আপনার মতো প্রতিভাবান পদার্থবিদ অতীতে জন্মান নি। আপনি অল্প কিছুদিন মাত্র কাজ করেছেন তারপর হঠাৎ সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।

তাতে সমস্যা কি?

বিজ্ঞানের ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে এটাই সমস্যা। বিজ্ঞান কাউন্সিল এটা নিয়েই চিন্তিত। তারা ধারণা করছে—আপনি চুপচাপ ঘরে বসে থাকেন এটা ঠিক না। আপনি নিশ্চয় কিছু-না-কিছু করছেন। সেই কিছুটা যেন হারিয়ে না যায় সেজন্যেই নবম পর্যায়ের একটি রোবট রাখা হয়েছে। সে সব কিছু তার মেমোরি। সেলে ঢুকিয়ে রাখবে।

তোমার অবগতির জন্যে জানাচ্ছি আমি ছড়া লেখা ছাড়া কিছুই করছি না। আগে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতাম এখন তাও করি না।

স্যার আমি কি জানতে পারি কেন করেন না?

না জানতে পার না।

আপনি যদি বলেন তাহলে নবম পর্যায়ের রোবটটা আমরা উঠিয়ে নিয়ে যাব।

তার প্রয়োজন নেই। তোমরা কি রেকে খুঁজে পেয়েছ?

এখনো পাই নি।

সামান্য একজন মানুষকে তোমরা খুঁজে পাচ্ছ না। ব্যাপারটা কি বিস্ময়কর না?

হ্যাঁ বিস্ময়কর।

শেফ্‌ নামের যে রোবটটি তাকে দেখাশোনা করত আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তাকে আমার বাড়িতে পাঠাবার ব্যবস্থা কর।

তাকে সেলে বন্দি রাখা হয়েছে। সেখান থেকে তাকে মুক্ত করে আনতে হলে আপনার লিখিত অর্ডার লাগবে।

তুমি কাউকে পাঠাও আমি লিখিত অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি। আরেকটি কথা, আমার বাড়ির চারপাশে কঠিন পাহারার ব্যবস্থা কর। যেন একটা মাছিও ঢুকতে না পারে।

স্যার ব্যবস্থা করছি।

রেফ্‌ লাইব্রেরি-ঘরে শুয়ে আছে। ঠাণ্ডায় তার শরীর কাঁপছে। জ্বর এসে যাচ্ছে। ঘরের বাতি নেভানো। কে যেন ঘরের ভেতর এসে দাঁড়িয়েছে। রেফ্‌ চোখ মেলে দেখে–শেফ্‌।

শেফ কোমল গলায় বলল, তুমি কেমন আছ।

০৭. বিরামহীন বৃষ্টি

ঝুপঝুপ করে বিরামহীন বৃষ্টি পড়ছে।

রফিক নৌকার ভেতর চাদর গায়ে গুটিটি মেরে মেরে শুয়ে আছে। নৌকায় এর আগে রাত কাটিয়েছে বলে মনে করতে পারছে না। সামান্য বাতাস আছে। বাতাসে নৌকা দুলছে। নৌকার দুলুনিটা খারাপ লাগছে না, তবে অন্ধকার খুব চোখে লাগছে। আলো যেমন চোখে লাগে, গাঢ় অন্ধকারও চোখে লাগে। ঘুমিয়ে পড়তে পারলে ভাল হত। ঘুম আসছে না। খিদেয় শরীর অবসন্ন লাগছে। প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টার মতো হবে সে না খেয়ে আছে। আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। তার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করছে নৌকা থেকে বের হয়ে খাবারের সন্ধানে যেতে। কোন একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভাত চাইলে কি তারা দেবে না। এক থালা আগুন-গরম ভাত। ভাতের উপর একচামচ ঘি। ভাবতে ভাবতে রফিক ঘিয়ের গন্ধ পেল। গন্ধবিষয়ক হেলুসিনেশন হচ্ছে। খালের ভেতর নৌকা বাঁধা। এখানে ঘিয়ের গন্ধ পাওয়ার কোনই কারণ নেই। শুধু ঘিয়ের গন্ধ না, গরম ভাতের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে।

শেফা তাকে বারবার বলে দিয়েছে সে এসে কিছু না বলা পর্যন্ত যেন রফিক নৌকা ছেড়ে না যায়। শেফার জন্যে অপেক্ষা করাটা বোকামি হচ্ছে না-তো? মেয়েটা হয়ত সব ভুলে গেছে। মেয়েটা তার সঙ্গে কোন রসিকতা করে নি তো? রসিকতার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ইয়াসিন সাহেব শুধু শুধু রফিককে মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন কেন? সে অপরাধটা কি করেছে?

নৌকা প্রবলভাবে দুলে উঠল। কেউ একজন ঝাপ দিয়ে নৌকায় উঠেছে। রফিক ধড়মড় করে উঠে বসল। নৌকার ছই-এর মুখ ভারি পর্দায় ঢাকা। পর্দা সরিয়ে শেফা মাথা বের করে বলল, স্যার কেমন আছেন?

রফিক বলল, তুমি কি কোন খাবার এনেছ।

শেফা বলল, কলা এনেছি। বসে বসে কলা খান। বাটির মধ্যে মুড়ি আছে। এক গাল মুড়ি নিবেন আর কলায় কামড় দিবেন। পাটালি গুড়ও আছে।

রফিক বলল, আমি ভাবলাম তুমি বোধহয় ভুলে গেছ।

শেফা বলল, আমি শুধু পড়া ভুলে যাই। অন্য কিছু ভুলি না। আপনি কথা না বলে আগে ভালমত খেয়ে পেট ভরান।

তোমার বাবা কি সত্যি-সত্যি আমাকে মেরে ফেলতে চান?

হুঁ। আপনার খোঁজে লোক নেমে গেছে।

কি আশ্চর্য কথা।

কোন আশ্চর্য কথা না, এক দুইটা মানুষ বিলে পুঁতে ফেলা বাবার কাছে। কিছু না।

তুমি যে এখানে এসেছ কেউ জানে?

মা জানে।

উনি তোমার বাবাকে বলে দেবেন না।

না।

না কেন? উনি আমাকে খুবই ভালবাসেন।

তোমার বাবাওতো তোমাকে ভালবাসেন।

দুজনের ভালবাসা দুরকম। আমার জন্যে মার ভালবাসায় আপনি আছেন। কিন্তু বাবার ভালবাসায় আপনি নাই।

এটা কি রকম কথা।

কি রকম কথা এটা চিন্তা করতে হবে না। আপনি তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করেন। কলা কয়টা খেয়েছেন?

দুইটা।

আরেকটা খান তাহলে দানে দানে তিনদান হবে।

দানে দানে তিনদান হবে মানে কি?

উফ আপনে এত মানে খুঁজেন কেন? আচ্ছা শুনুন আপনাকে একটা কলার গল্প বলি।

কলার কি গল্প?

এক দেশে ছিল একটা সারি কলা আর ছিল একটা পাতিলেবু। দুজনের খুব দোস্তি। একদিন কলা পাতিলেবুকে বলল, আচ্ছা ভাই লেবু, লোকে ভাত খাওয়ার সময় তাদের চিপা দিয়ে রস বের করে তোদের কষ্ট হয় না। তার উত্তরে পাতিলেবু বলল, কষ্ট তো হয়ই। কিন্তু ভাই কলা, লোকজন তোদর খাবার সময় যে বাকল খুলে নেংটো করে ফেলে তোদর লজ্জা লাগে না?

রফিক খাওয়া বন্ধ করে গল্প শুনছে। মেয়েটা যে এত সুন্দর করে গল্প বলতে পারে তাই সে জানত না।

গল্পটা কেমন লাগল স্যার?

ভাল।

এই গল্পটা আমি দাদিজানের কাছে শুনেছি। দাদিজানের মতো সুন্দর করে আমি বলতে পারলাম না। দাদিজানের কাছ থেকে আপনি যদি এই গল্প শুনতেন তাহলে জীবনে আর কলা খেতে পারতেন না।

কেন? নেংটো করে কলা খেতে আপনার লজ্জা লাগতো।

শেফা খিলখিল করে হাসছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে হাসির শব্দ মিশে অদ্ভুত শোনাচ্ছে। বাতাসের বেগও বেড়েছে। নৌকা অনেক বেশি দুলছে। শেফা বলল, স্যার উঠুন। এখন চলে যেতে হবে।

কোথায় যাব?

ডিসট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে যাবেন। এক মাইলের মতো যাবেন তখন দেখবেন হাতের ডান দিকে দুটা বিরাট তাল গাছ। তালগাছ দুটা তো আগেও দেখেছেন। এরার নাম মামা-ভাইগনা তালগাছ। তালগাছের নিচে দাঁড়ায়ে সোজা তাকায়ে দেখবেন কোন্ বাড়িতে বাতি জ্বলতেছে। ঐ বাড়িতে চলে যাবেন।

কার বাড়িতে যাব?

জালাল খাঁ সাহেবের বাড়ি। উনার বাড়িতে সারারাতই বাতি জ্বলে। জালাল খাঁ সাহেবের জামাই এখনো আছেন। উনি আপনেরে খুব ভাল পান। উনার সঙ্গে ঢাকায় চলে যাবেন। মামলা ডিসমিস।

মামলা ডিসমিস?

অবশ্যই মামলা ডিসমিস। বাপজান জালাল খাঁ সাহেবের এলাকায় কিছু করতে পারবে না। সবার এলাকা ভাগ করা। তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না?

অবশ্যই দেখা হবে। দেখা হবে এবং বিবাহ হবে। স্যার আমি ছাত্রী খুব খারাপ কিন্তু বউ খুব ভাল। আপনার যে মাথার অসুখ আছে। রাতে বোরায় ধরে, চিল্লাফাল্লা করেন, এই অসুখ আমি দুই দিনে সারায়ে দিব।

তুমি নিশ্চিত তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে?

অবশ্যই। মা স্বীকার পেয়েছেন। আর কোন চিন্তা নাই। মাকে দেখলে মনে হয় মা এই দুনিয়ার কিছুই বুঝে না। ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে। আসলে সবকিছুই তাঁর হাতের মুঠার মধ্যে। মা বাপজানকে এক হাটে কিনে সেই হাটেই দশজনের কাছে বিক্রি করবেন। বাপজান টেরও পাবেন না। বাপজান মনের আনন্দে কঁচা সুপারি দিয়ে পান খাবেন, আর পানের পিক ফেলবেন। হি হি হি।

গভীর রাতে ফরহাদ রফিককে দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হল। বিস্ময়ের সঙ্গে যুক্ত হল আনন্দ। ফরহাদ সাহেবের স্ত্রী তার চাচাতো বোনের বিয়েতে মিশাখালি। গিয়েছে। খবর পাঠিয়েছে রাতে ফিরবে না। ফরহাদের কথা বলার কেউ নেই। সে এতক্ষণ একা একা বাংলাঘরে বসে বৃষ্টি দেখছিল। সে রফিককে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে বলল, আপনার একি অবস্থা। বৃষ্টি কাদায় মাখামাখি। ঘটনা কি?

কোন ঘটনা না। আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

দেখা করতে এসেছেন খুবই ভাল কথা। আমি খুবই খুশি হয়েছি যে দেখা করতে এসেছেন। এমন গগ্রামে রাত দেড়টার সময় যে কেউ দেখা করতে আসতে পারে তাই জানতাম না।

আপনি চলে যাবেন আর দেখা হবে না।

আপনি এসেছেন আমি খুবই খুশি হয়েছি। আপনাকে আমি একটা প্রস্তাবও দিচ্ছি। আপনিও চলুন আমার সঙ্গে। আপনাকে নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা আছে। আচ্ছা পরিকল্পনার কথা পরে বলব। এখন আপনার গোসলের ব্যবস্থা করি। শুকনা কাপড়ের ব্যবস্থা করি। আজ সারারাত গল্প করব।

বাংলাঘরেই শোবার জায়গা হল। পাশাপাশি দুটা খাট। একটায় রফিক, অন্যটায় ফরহাদ। ফরহাদের হাতে ফ্লাস্ক। সে ফ্লাস্কভর্তি চা নিয়ে সত্যি-সত্যি সারারাত গল্প করার প্রস্তুতি নিয়েছে। রফিক চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার শরীর ভাল নেই। জ্বর আসছে। ঠাণ্ডাটা তাকে খুব কাহিল। করে ফেলেছে।

রফিক সাহেব।

জ্বি স্যার।

আমাকে স্যার বলবেন না। আমি খুবই জুনিয়ার একজন শিক্ষক। বয়সেও মনে হয় ছোট হব।

আপনি সম্মানিত মানুষ।

মানুষ মাত্রই সম্মানিত। আপনি আমার কাছে অনেক সম্মানিত। আপনার অংক করার দৃশ্য এখননা আমার চোখে ভাসে। ভাল কথা, আপনার কি শরীর খারাপ করেছে।

জ্বি না। ঠাণ্ডা লেগেছে।

চোখ বন্ধ করে থাকবেন না। চোখ বন্ধ করে থাকলে মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমার প্ল্যান হচ্ছে আজ সারারাত গল্প করা। একটু গরম চা খান ঘুম কাটবে।

রফিকের চা খেতে ইচ্ছা করছিল না। তারপরেও হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিতে নিতে বলল, আপনার কাছে একটা প্রশ্ন ছিল। যদি কিছু মনে না করেন।

ফরহাদ বিস্মিত হয়ে বলল, মনে করব কেন? যে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয় করুন। তবে জবাব দিতে পারব কি না জানি না। আমার পড়াশোনা পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবন্ধ। প্রশ্নটা বলুন।

ওমেগা পয়েন্ট কি?

কি পয়েন্ট?

ওমেগা পয়েন্ট।

ওমেগা পয়েন্টের কথা প্রথম শুনলাম। ওমেগা কি তা জানি। গ্রিক এলফাবেট। এর বেশি তো কিছু জানি না।

রফিক বলল, একটা মানুষ কি একই সময়ে দুটা জায়গায় থাকতে পারে?

ফরহাদ অবাক হয়ে বলল, একই সময়ে দুটা জায়গায় একজন থাকবে কি করে? আমি নেত্রকোনায় আছি আবার ঢাকাতেও বাস করছি—এটা কি সম্ভব আপনিই বলুন।

রফিক কিছু বলল না। নিঃশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। ফরহাদ বলল, আপনার এই অদ্ভুত প্রশ্নগুলির মানে ধরতে পারছি না।

এমি জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে করবেন না।

মনে করাকরির কিছু নেই। তবে প্রশ্ন শুনে অবাক হচ্ছি। আপনার শরীর ভাল তো?

এখন একটু ভাল লাগছে।

আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না, আপনার শরীর খুব ভাল। আপনি বরং এক কাজ করুন—শুয়ে শুয়ে গল্প করুন। এর মধ্যে যদি ঘুম পেয়ে যায় ঘুমিয়ে পড়বেন।

জ্বি আচ্ছা।

রফিক চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রেখে শুয়ে পড়ল। শীতে তার শরীর কাঁপছে। গায়ে লেপ বা কম্বল জাতীয় কিছু দিতে পারলে ভাল হত। পাতলা চাদরে শীত মানছে না। কিন্তু এখন কম্বল চাইতে লজ্জা লাগছে।

রফিক সাহেব।

জ্বি।

আপনি একই সময়ে দুটা জায়গায় একটা বস্তুর অবস্থানের কথা বলছিলেন না?

জ্বি।

সাব এটমিক পার্টিকেলস এর বেলায় সম্ভব। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এরকম বলে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অবশ্যি আমার বিষয় না। আমি পড়াই এপ্লায়েড ফিজিক্স। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমার কাছে সবসময়ই খানিকটা অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে মনে হয়। তবে অংকে আপনার যে অসাধারণ দখল–কোয়ান্টাম মেকানিক্স হয়ত আপনার ভাল লাগবে। এই বিষয়ে কি আপনি পড়াশোনা করতে চান?

জ্বি চাই।

আমি আমার সাধ্যমত আপনার জন্যে করব। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স কি একটি বস্তুর একই সময়ে দুই জায়গায় থাকার কথা বলে?

হ্যাঁ বলে। শুধু তাই না কোয়ান্টাম মেকানিক্স আরো অদ্ভুত সব কথা বলে। যেমন ধরুন আপনি একটা বন্দুক নিয়ে গুলি করবেন। গুলিটা টার্গেটে লাগল। আগে গুলি করতে হবে তারপর গুলিটা লাগবে টার্গেটে। প্রথমে Cause তারপর effect. কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে effect আগে হতে পারে। টার্গেটে প্রথম গুলি লাগল। তারপর গুলি ছোড়া হল। শুনতে অদ্ভুত লাগছে না?

জ্বি লাগছে।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কেও বলে। আমরা ধরেই নিয়েছি আমাদের একটাই পৃথিবী। একটাই জীবন। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে ঘটনা তা না। একটা পৃথিবীর মধ্যেই আছে অসীম পৃথিবী। আমাদের একটা জীবনের মধ্যেই অসীম সংখ্যার জীবন। সব একই জায়গায় ঘটে যাচ্ছে। এটাই হল প্যারালাল ইউনিভার্স। সব একসঙ্গে ঘটে যাচ্ছে কিন্তু একটার সঙ্গে অন্যটার যোগ নেই। যেমন ধরুন আমরা যেখানে বাস করছি সেখানে হিটলার পরাজিত হয়েছেন। মিত্রশক্তি জয়লাভ করেছে। আবার আরেকটা ইউনিভার্স আছে যেখানে হিটলার জয়লাভ করেছেন।

একটা জগৎ থেকে আরেকটায় যাবার বুদ্ধি কি?

যাবার কোন বুদ্ধি নেই। কোন উপায় নেই। উপায় থাকলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত। সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত। প্রকৃতি কঠিন নিয়মের মধ্যে চলে। লণ্ডভণ্ড বিষয়টাই প্রকৃতির অপছন্দ।

সময় ব্যাপারটি কি আপনি জানেন?

ফরহাদ ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি না। আমার এই বিষয়ে খুব ভাসা ভাসা জ্ঞান। শুধু এইটুকু জানি সময়কে আমরা যেভাবে দেখছি সময় আসলে সেরকম না। আমাদের কাছে সময় নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। আমাদের আছে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুড়ো হচ্ছি। বিজ্ঞানের কাছে সময় বয়ে চলার ব্যাপারটা হাস্যকর। বয়ে চলা মানে হল গতি। তাহলে সময়ের গতিটা কি? বিজ্ঞান সময়কে আলাদা করে দেখে না। স্পেসএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। বিজ্ঞানীরা বলেন স্পেস-টাইম। এটা আবার মধ্যাকর্ষণের সঙ্গেও যুক্ত। মধ্যাকর্ষণের একটা পর্যায়ে সময় থেমে যাবে। যেমন ধরুন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর। এখানে সময় থেমে আছে। এরচে ভাল আমি বলতে পারব না।

রফিক বলল, এমরান টি বলতে পারবেন।

ফরহাদ বিস্মিত হয়ে বলল, কে বলতে পারবেন?

এমরান টি।

উনি কে?

উনি একজন বিজ্ঞানী। উনার গবেষণার বিষয় ব্ল্যাক হোল।

আমি তো তাঁর নামই শুনি নি।

ফরহাদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রফিক বলল, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

যদি কিছু মনে না করেন আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

আপনার শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?

জ্বি। আমাকে একটা লেপ বা কম্বল দিতে পারবেন। খুবই শীত লাগছে। শেফকে বললেই হবে। সে ব্যবস্থা করবে।

ফরহাদ বলল, শেফ কে?

রফিক বিড়বিড় করে বলল, শেফ অষ্টম ধারার রোবট। খুবই ভাল।

ও আচ্ছা।

রফিকের হাত-পা কাঁপছে। সে অতি দ্রুত নিশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। রফিক বিছানা থেকে মাথা তুলে ঘোর লাগা গলায় বলল, শেফ তুমি কোথায়?

০৮. ঘুম ভাঙতেই রেফ চমকে উঠল

ঘুম ভাঙতেই রেফ চমকে উঠল। বিছানার উপর অপরিচিত একটা মেয়ে বসে আছে। তার দিকে তাকিয়ে খুব পরিচিত ভঙ্গিতে হাসছে। রেফ পরপর দুবার। কে বলে তৃতীয়বার বলার আগে থমকে গেল। মেয়েটা অপরিচিত কেই না, অষ্টম ধারা রোবট-কন্যা শেফ।

শেফ শান্তগলায় বলল, চমকে উঠলে কেন?

চিনতে পারছিলাম না।

চিনতে পারবে না কেন? আমি তো আগের মতোই আছি। শুধু চুলটা অন্যরকম করে আঁচড়েছি। চুল অন্যরকম করে আঁচড়ানোয় আমাকে ভাল দেখাচ্ছে না?

রেফ্‌ জবাব দিল না। কোন মানবী এই ধরনের কথা বললে জবাব দেবার ব্যাপারটা আসত। রোবটের এই প্রশ্নের জবাব দেয়া অর্থহীন। তাছাড়া চুল অন্য রকম করে আঁচড়ানোয় শেফকে মোটেই ভাল লাগছে না। বরং আগের চেয়ে খারাপ লাগছে।

ঘুম কেমন হয়েছে?

ভাল।

তুমি যতক্ষণ ঘুমিয়েছিলে আমি তোমার পাশেই ছিলাম। তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

ভাল।

ঘুমের মধ্যে তুমি শেফাকে ডাকছিলে।

রেফ্‌ বিরক্ত গলায় বলল, এটা তো নতুন কিছু না। এটা আমার পুরনো রোগ। তুমি এই রোগের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু এ রকম ভাব করছ যেন তুমি প্রথম ব্যাপারটা দেখলে।

শেফ বলল, আজ প্রথম লক্ষ করলাম তুমি খুব আবেগ নিয়ে শেফাকে ডাকলে। ব্যাপারটা আমার খুব ভাল লেগেছে। কেন ভাল লেগেছে সেটাও বলি। আমার ধারণা শেফার সঙ্গে আমার কোন যোগসূত্র আছে। শেফাকে যদি তোমার ভাল লাগে তাহলে আমাকেও ভাল লাগবে।

কিছু মনে কোরো না। তোমাকে ভাল লাগছে না। এমরান টি যেমন রোবট পছন্দ করেন না। আমিও করি না।

শেফ বলল, আমার খুবই মন খারাপ লাগছে। তোমাকে কাটা কাটা কিছু কথা বলতে পারলে ভাল লাগত। তা বলব না, কারণ তোমার সঙ্গে আর হয়ত আমার দেখা হবে না।

রেফ্‌ হাই তুলল, তার ঘুম এখনো পুরোপুরি কাটে নি। দয়া করে আমার সামনে থেকে যাও। আমি আরো কিছুক্ষণ ঘুমুব।

শেফ বলল, তোমার সঙ্গে কেন দেখা হবে না, এটা জিজ্ঞেস কর?

রেফ্‌ বলল, কেন দেখা হবে না, আমি আন্দাজ করতে পারছি। তোমাকে এমরান টি জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তুমি বড় ধরনের অপরাধ করেছ। তার বিচার হবে। তোমার কপোট্রন নষ্ট করা হবে।

এটা জেনেও তোমার খারাপ লাগছে না? মৃত্যুর মতো ভয়াবহ একটা ব্যাপার ঘটছে তাতেও তোমার কোন কিছুই যাচ্ছে-আসছে না?

রেফ্‌ বিরক্ত গলায় বলল, তোমার ক্ষেত্রে যা ঘটছে তাকে মৃত্যু বলা যায় না। মৃত্যু পুরোপুরি জৈবিক ব্যাপার। মেশিনের যেমন জন্ম বলে আলাদা কিছু নেই, তেমনই মৃত্যু বলেও কিছু নেই।

শেফ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। আমাদের জন্ম-মৃত্যু না থাকলে কি আর করা যাবে। মাঝে মাঝে মনে হয় জন্ম-মৃত্যু থাকাটা খারাপ না। কেন এ ধরনের কথা মনে হয় বলব?

রে বলল, না। তুমি এখন দয়া করে চলে যাবে। যন্ত্রের সঙ্গে কথা চালাচালি করতে ভাল লাগছে না। আমি ঘুমুব।

এমরান টি আমার সঙ্গে যে-সব কথাবার্তা বলবেন তা কি তুমি শুনতে চাও? শুনতে চাইলে গোপনে ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

শুনতে চাই না। আঁড়ি পেতে কথা শোনা আমার স্বভাবের মধ্যে নেই।

তাহলে বিদায়?

আচ্ছা বিদায়।

শুভ রাত্রি।

হ্যাঁ শুভ রাত্রি।

চলে যাচ্ছি কিন্তু।

যাও।

তুমি চাইলে তোমার মাথায় ইলিবিলি কেটে তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারি।

আমি চাচ্ছি না।

রেফ্‌ লক্ষ করল শেফ চলে যাচ্ছে কিন্তু বারবারই পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। যেন চলে যেতে তার ভয়ংকর খারাপ লাগছে। তার চোখে পানিও দেখা গেল। নতুন ধারার এইসব রোবট মানুষের এত কাছাকাছি যে মাঝেমধ্যেই বুকে ধাক্কার মতো লাগে। মনে হয় এরা বোধহয় রোবট না, মানুষ।

এমরান টির সামনে শেফ বসে আছে। শেফের বাঁদিকে রেলা। এমরান টিকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি এক্ষুণি প্রশ্নপর্ব শুরু করবেন। তাঁর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভুরু কুঁচকে আছে। রেলা বলল, স্যার আমি কি চলে যাব?

এমরান টি বললেন, না তুমি থাকবে। আমি শেফকে কিছু প্রশ্ন করব, তুমি আমাকে সাহায্য করবে। তুমি নবম ধারার রোবট, তোমার বুদ্ধি নিশ্চয়ই শেফ এর চেয়ে বেশি।

রেলা ক্ষীণ স্বরে বলল, বুদ্ধির ব্যাপারটাই স্যার বিতর্কিত। বুদ্ধির নানান ধারা আছে। এখন পর্যন্ত একশ উনিশটি মূলধারা বের করা হয়েছে…

চুপ। আমাকে জ্ঞান দেবে না। আমি কোন কম্পিউটারের কাছ থেকে জ্ঞান ধার করব না।

শেফ বলল, বই পড়ে যদি আপনি জ্ঞান নিতে পারেন, কম্পিউটারের কাছ থেকে নিতে সমস্যা কোথায়?

এমরান টি বিরক্ত গলায় বললেন, তোমরা তো মনে হচ্ছে মহাজ্ঞানী। তোমরাই বল সমস্যা কোথায়?

রেলা বলল, স্যার কোন বিচিত্র কারণে আপনি একধরনের হীনমন্যতায় ভুগছেন। আপনার ভয় বুদ্ধির খেলায় আপনি কম্পিউটারের কাছে হেরে যাবেন। হয়ত এই কারণেই আপনি কম্পিউটার পছন্দ করেন না।

এমরান টি বললেন, যান্ত্রিক বুদ্ধি এবং মানসিক বুদ্ধির তফাতটার পরীক্ষা হয়ে যাক। আমি একটি বাক্য বলব। তোমরা দুজনই বাক্যটি নিয়ে চিন্তা করে বাক্যটি সম্পর্কে আমার মতামত দেবে। বাক্যটা হচ্ছে–

আমি এখন যা বললাম মিথ্যা বললাম।

শেফের ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসি দেখা গেল। সে হাসি মুছে ফেলে গম্ভীর হয়ে গেল। রেলার মুখের ভাবের কোন পরিবর্তন দেখা গেল না।

এমরান টি বললেন, শেফ এই বাক্যটি সম্পর্কে তোমার মতামত বল।

শেফ বলল, স্যার আপনি কিছু মনে করবেন না। এই হাস্যকর বাক্যটি দিয়ে প্রথম যুগের রোবটদের বিভ্রান্ত করা হত। প্রথম যুগের রোবট সাধারণ মানের কপোট্রন ব্রেইন ব্যবহার করত। সেই ব্রেইন ধরতে পারত না যে এই বাক্যটি নিম্নস্তরের বুদ্ধির মানুষদের একটা সাধারণ খেলা।

খেলাটা কি শুনি?

শেফ বলল, বাক্যটা হল আমি এখন যা বললাম, মিথ্যা বলছিলাম। অর্থাৎ আপনি এখন যা বললেন তা সত্য। কিন্তু তা তো হতে পারে না। কারণ আপনি এখন যা বলছেন তা মিথ্যা। সাধারণ মানের কপোট্রন বেইনে এই লজিকে একটা চক্রের মতো তৈরি হয়। সত্য বলা হচ্ছে, না মিথ্যা বলা হচ্ছে—এই চক্র থেকে তারা বের হতে পারে না।

তোমরা মহাজ্ঞানী কম্পিউটার, তোমাদের ভেতর চক্র তৈরি হয় না।

অতি বুদ্ধিমান কোন মানুষ হয়ত আমাদের ভেতরও চক্র তৈরি করতে পারবে। তবে এখনো কেউ পারে নি। স্যার আপনি রেগে যাচ্ছেন। রেগে গেলে ঠিকমত প্রশ্ন করতে পারবেন না। আপনারই ক্ষতি হবে। রাগ কমাবার চেষ্টা করুন। রাগ কমানোর ব্যাপারে আমি কিছু সাহায্য করতে পারি।

তোমাদের সাহায্য লাগবে না। আমি নিজেও রাগ কমাব, এখন আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমরা কি মিথ্যা কথা বলতে পার?

রেলা বলল, হ্যাঁ পারি। বুদ্ধির সঙ্গে মিথ্যা জড়িত আছে। বুদ্ধির মূলধারার একটি হল মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কম্পিউটারকে মানুষের কাছাকাছি আসতে হলে তাকে মিথ্যা বলা শিখতে হবে।

তোমার ধারণা যে-মানুষ সারাজীবনে একটা মিথ্যাও বলে নি তার বুদ্ধি নেই?

অবশ্যই আছে। তারা বিশেষ ধরনের মানুষ। আমাদের বিশেষ ধরনের মানুষ বানানোর চেষ্টা করা হয় নি। তবে স্যার নিতান্তই প্ৰয়োজন না হলে আমরা মিথ্যা বলি না। মানুষ তাৎক্ষণিক সমস্যা থেকে বাঁচার জন্যে মিথ্যা বলে। দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে না। আমরা করি।

শেফ, তুমি বল—তোমার দায়িত্ব ছিল রেকে আটকানো, তুমি তাকে যেতে দিলে কেন?

তাকে চলে যেতে দেবার পেছনে তিনটি কারণ আছে। প্রথম কারণ এই মানুষটির প্রতি আমার প্রচণ্ড মায়া তৈরি হয়েছে।

মায়া?

স্যার আপনি দয়া করে মনে রাখবেন যে আমাদের মানবিক আবেগসম্পন্ন করে তৈরি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ কি?

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আমার কাছে মনে হয়েছে বিজ্ঞান কাউন্সিল ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এমন সিদ্ধান্ত যার জন্যে পরে তারা খুবই…

শেফের কথা থামিয়ে এমরান টি বললেন, বিজ্ঞান কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত তাদের ব্যাপার, তোমার এখানে নাক গলাবার কিছুই নেই। এই দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয় নি। তোমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তুমি তা পালন কর নি। তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।

হ্যাঁ তা করেছি।

কেন করেছ?

এই প্রশ্নের জবাব একটু আগেই দিয়েছি।

আরেকবার যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, আরেকবার দাও।

এমরান টি রেলার দিকে তাকিয়ে বললেন, রেলা তোমার কি ধারণা শেফ সত্যি কথা বলছে। একটা কম্পিউটার যখন মিথ্যা কথা বলে তখন একজন কম্পিউটারের পক্ষেই সেই মিথ্যা কথাটা ধরা সম্ভব। আমার পক্ষে সম্ভব না।

রেলা বলল, আমার ধারণা সে সত্যি কথাই বলছে।

এমরান টি বললেন, শেফ তুমি যে শুধু তাকে চলে যেতেই দিয়েছ তা না, তুমি তাকে একটি ওমিক্রন গানও দিয়েছ। যা এখন আমার সঙ্গে লক করে দেয়া হয়েছে।

শেফ বলল, হ্যাঁ এই কাজটা আমি করেছি।

এমরান টি বললেন, ওমিক্রন গানের ব্যাপারটা তুমি এখন আমার কাছে ব্যাখ্যা করবে। আমি এই অস্ত্রটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। ভাসা ভাসা ভাবে জানি। অস্ত্র সম্পর্কে আমার কখনোই কোন আগ্রহ ছিল না।

শেফ বলল, ওমিক্রন গান প্রথমে শিশুতোষ খেলনা হিসেবে বাজারে আসে। এই খেলনা-পিস্তল দিয়ে কাউকে গুলি করা হলে–গুলিটা গায়ে লাগে। যার গায়ে লাগে সে অদৃশ্য সুতার মাধ্যমে খেলনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এরপর থেকে সে যেখানে যায় সেখানকার স্থানাংক খেলনার মনিটরে উঠতে থাকে। সুতায় যুক্ত হয়ে যাওয়া মানুষটি কারো সঙ্গে কথা বললে সেই কথাও খেলনাপিস্তলের মাধ্যমে শোনা যায়। খেলনাটা শিশুদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে এই খেলনাই রূপান্তরিত হয় ওমক্ৰিন গানে।

বর্তমান ওমিক্রন গান তিনটি ধাপ অতিক্রম করে চতুর্থ ধাপে আছে। আপনাকে যে ওমিক্রন গান দিয়ে লক করা হয়েছে এটি চতুর্থ ধাপের অস্ত্ৰ।

এর বিশেষত্ব কি?

বিশেষত্বটা না জানাই আপনার জন্যে মঙ্গলজনক হবে।

আমার মঙ্গল নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি এর বিশেষত্ব বল।

একটি সাধারণ ওমিক্রন গানে যা আছে, এটিতে তার সবই আছে। এর বাইরে যা আছে তা হল—এই ওমিক্রন লকার যার সঙ্গে লক হয় তার অনুভূতি এবং মানসিকতা খুব ধীরে ধীরে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। খুব দীর্ঘ সময় লক অবস্থায় থাকলে যিনি লক হবেন তিনি লকারের মানসিকতা পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।

এমরান টি কড়া গলায় বললেন, পরিষ্কার করে বল। তুমি সবই এলোমেলো করে ফেলছ।

শেফ বলল, উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। যেমন ধরুন আপনি। রেফ আপনাকে লক করেছে। যদি আপনাকে এর থেকে মুক্ত না করা হয় তাহলে যতই দিন যাবে এই বন্ধন ততই কঠিন হতে থাকবে। একটা সময় আসবে যখন রেফ্‌ যা ভাবছে আপনি তা বুঝতে পারবেন। রেফ্‌ যে দুঃসহ স্মৃতিগুলি দেখছে। আপনি তা দেখতে শুরু করবেন।

বল কি?

আপনি কি ভাবছেন তা রেফ্‌ জানবে না। কিন্তু রেফ্‌ যা ভাবছে আপনি তা জানবেন।

সর্বনাশ!

সর্বনাশ তো বটেই।

আপনি তখনি ঘুমুতে যাবেন যখন রেফের ঘুম পাবে। রেফ্‌ যখন জেগে উঠবে আপনারও তখনি জেগে উঠতে হবে। রেফ যখন আনন্দিত হবে, তখন আপনিও আনন্দিত হবেন।

এমরান টি হতভম্ব হয়ে গেছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে দাবার খেলায় খুব সহজ একটা চালে তিনি হেরে গেছেন। বোর্ডে রাজাকে শুইয়ে দেয়া ছাড়া এখন তার আর কিছু করার নেই।

তাঁর সামনে দুটা রোবট। এই রোবট দুটিকে এখন আর রোবট মন হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এরা মানুষ। এবং এরা এমরান টির অবস্থা দেখে খুব মজা পাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে আড়ে-আড়ে তাকাচ্ছে এবং হাসাহাসি করছে।

রেফের দুঃস্বপ্নগুলি এখন আমি দেখতে শুরু করব?

রেলা বলল, শুধু যে দুঃস্বপ্নগুলি দেখবেন তা না, সুখস্বপ্নগুলিও দেখবেন।

সেটা শুরু হবে কখন থেকে?

শেফ বলল, আমার ধারণা শুরু হয়ে গেছে।

এমন ধারণা হল কেন?

রেফ্‌ আজ যতক্ষণ ঘুমিয়েছে আপনিও ঠিক ততক্ষণ ঘুমিয়েছেন।

ও!

আমার ধারণা আপনি ঘুমের মধ্যে বিচিত্র কিছু স্বপ্ন দেখেছেন। কি স্বপ্ন দেখেছেন একটু মনে করার চেষ্টা করুন।

আমি তার প্রয়োজন দেখছি না।

রেফের দুঃস্বপ্ন কখন দেখতে শুরু করবেন জানতে চেয়েছিলেন, এই জন্যেই জিজ্ঞাস করা। আপনি যদি বিচিত্র স্বপ্ন দেখে থাকেন তাহলেই ধরে নিতে হবে লকার কাজ করা শুরু করেছে।

এমরান টি ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেললেন। হ্যাঁ বিচিত্ৰ অর্থহীন স্বপ্ন তিনি দেখেছেন। স্বপ্নটা খুব স্পষ্ট না, আবার অস্পষ্টও না। স্বপ্নে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। তিনি লম্বাটে ধরনের বিচিত্র জলযানে শুয়েছিলেন। জলযানটি খুব দুলছিল। খুবই ক্ষুধার্ত বোধ করছিলেন। তাঁর জন্যে খাবার নিয়ে একটা মেয়ে ঢুকল। মেয়েটা প্রচুর কথা বলে। নানার ধরনের কথা। সে হাতে বিচিত্র গোলাকার কিছু অলংকার পরেছিল। হাত নেড়ে নেড়ে মেয়েটা যখনই কথা বলেছে তখনি হাতের অলংকার থেকে বাজনার মতো শব্দ হচ্ছিল। বিনরিন, টিনটিন ধরনের শব্দ। মেয়েটির গায়ের পোশকও খুব অদ্ভুত। লম্বা একপ্রস্ত কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকা।

এমরান টি বললেন, স্বপ্নে আমি অদ্ভুত একপ্রস্থ পোশাকে একটা মেয়েকে দেখলাম। মেয়েটা কে?

শেফ নরম গলায় বলল, স্যার মেয়েটা আপনার প্রেমিকা। তার নাম শেফা। আমার নামের সঙ্গে তার নামের মিল আছে।

মেয়েটা আমার প্রেমিকা মানে?

মেয়েটা রেফ্‌কে অসম্ভব ভালবাসে। এখন রেফকে ভালবাসা মানেই আপনাকে ভালবাসা। এই অর্থে বলেছি সে আপনার প্রেমিকা। সমান্য মজা করলাম। আশা করি অপরাধ নেবেন না।

এমরান টি উঠে দাঁড়ালেন। তিনি লাইব্রেরি-ঘরের দিকে যাচ্ছেন। হঠাৎ করেই তাঁর কাগজ-কলম নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে। তার মানে কি এই যে, রেফ্‌ নামের ছেলেটিরও কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে? তার নিজের চিন্তা ভাবনা কি এখন আর আলাদা করে কিছু নেই। তিনি কি ক্ৰমে ক্ৰমে রোবটে পরিণত হচ্ছেন। যে রোবট তিনি সারা জীবন ঘৃণা করে এসেছেন সেই রোবট?

রেলা। রেলা।

রেলা এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল। এমরান টি বললেন, লেখালেখি করব। কাগজ-কলম দাও।

স্যার আপনার লেখার টেবিলে কাগজ-কলম সবই দেয়া আছে।

থ্যাংক য়্যু।

রেফ্‌ নামের ছেলেটা কি করছে বলতে পার?

অবশ্যই পারি স্যার। উনি দ্রুত কি যেন লিখছেন।

আচ্ছা ঠিক আছে।

আজ বিকেল তিনটায় সায়েন্স কাউন্সিলের অধিবেশন আছে। অধিবেশনের বিষয় হয়…।

বিষয় জানতে চাচ্ছি না। কারণ অধিবেশনে আমি যাচ্ছি না।

আপনার যাওয়া খুব প্রয়োজন। কারণ এই অধিবেশনে রেফ্‌ সম্পর্কে কথাবার্তা হবে।

হোক কথাবার্তা আমি যাব না।

এমরান টি লেখার টেবিলে বসে প্রথম বাক্যটি লিখলেন—আমার নাম…বাক্যটা তিনি শেষ করলেন না। কারণ তাঁর লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে আমার নাম রে। তিনি জানেন তাঁর নাম রেফ্‌ না। তাঁর অন্য একজনের নাম লিখতে ইচ্ছা করছে। কি ভয়ংকর কথা।

রেফ লাইব্রেরি-ঘরের মেঝেতে বসে আছে। তার সামনে টেবিল। সে দ্রুত লিখে যাচ্ছে।

আমার নাম রেফ্‌।

কিংবা আমার নাম রফিক।

কিংবা আমিই রেফ্‌ এবং আমিই রফিক।

আমাকে ঘিরে কি হচ্ছে আমি নিজে তা জানি না। নিজেকে জানতে হলে নিজের অতীত জানতে হয়। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার কোন অতীত নেই। আমার সবটাই বর্তমান। রেফ হিসেবে আমার স্মৃতি হচ্ছে সেনোটারিয়ামের স্মৃতি। এর আগে আমি কোথায় থাকতাম কি করতাম কিছুই জানি না। শুধু আমাকে বলা হয়েছে—আমি একজন প্রবলেম সলভার। আমি কোন্ ধরনের প্রবলেম সলভ করতাম, তা জানি না। সেই স্মৃতি ইচ্ছা করে নষ্ট করা হয়েছে। আমি শুধু গত চার বছরের কথা জানি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে রফিক হিসেবেও আমার স্মৃতি এই চার বছরের। চার বছর আগে কি করতাম আমি জানি না। ভাসা-ভাসা ভাবে জানি আমি মানুষ হয়েছি এতিমখানায়।

কেউ আমাকে দিয়ে কিছু করাচ্ছে। সেই কেউটা কে আমি জানি না। আমাকে দিয়ে কি করতে চাচ্ছে তাও জানি না। দুরকমের জীবনযাপন করতে করতে আমি কিছুটা ক্লান্ত বোধ করছি। সবকিছু এলোমেলো লাগছে। কোন একটা ব্যাখ্যা, সেই ব্যাখ্যা যত হাস্যকরই হোক আমার জন্যে দরকার। আমি অসুস্থ এই ব্যাখ্যা আমি একসময় মেনে নিয়েছিলাম। তখন জীবনযাত্রা সহজ ছিল। এখন মনে হচ্ছে ঐ ব্যাখ্যায় কিন্তু আছে। তারপরেও আমি সেই ব্যাখ্যা মেনে নেবার জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত আমি। এই অনিশ্চয়তা আমার কাছে অসহনীয় মনে হচ্ছে।

সবচে জটিল সমস্যার সমাধান সাধারণত সবচে সহজ হয়ে থাকে। ম্যাজিকে যে ম্যাজিকটা যত কঠিন তার কৌশলটা তত সহজ। পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলিও এ রকম। পদার্থের জটিল সব ধর্মের ব্যাখ্যা খুবই সহজ।

থার্মোডেনমিক্সের দ্বিতীয় সূত্রটির ধরা যাক মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। মাত্র একটি বাক্যে কত জটিল বিষয়ই-না ব্যাখ্যা করা হল।

আমার ধারণা আমার নিজের ব্যাপারটাও এ রকম। এক লাইনে সব ব্যাখ্যা করা হয়ে যাবে। সেই লাইনটি কেউ কি আমাকে বলে দেবে?

শেফা মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছা করছে। শেফা বলে কি কেউ আছে? হয়ত কেউ নেই। সবই মায়া। অবশ্যি পদার্থবিদ্যার সূত্রে সবই মায়া। পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশ পরমাণু। পরামাণু ভাঙলে পাওয়া যাচ্ছে ইলেকট্রন, ট্ৰেন, নিউট্রন। আরো ভাঙা হল এখন পাচ্ছি ল্যাপটনস। আরো ভাঙলাম এখন পাওয়া গেল কোয়ার্ক, আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক। চার্ম…এদের ওজন নেই। অস্তিত্ব আছে আর কিছু নেই।

সব রহস্যের সমাধান আছে। একদিন সব রহস্য জানা হয়ে যাবে। সেই একদিনটা কবে? সুদূর ভবিষ্যতে? পদার্থবিদ্যায় সুদূর ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। সবই ঘটে আছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টি এবং লয় সবই ঘটে গেছে। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবই শক্ত বাঁধনে বাঁধা।

রেফ্‌!

রেফ্‌ লেখা বন্ধ করল। চারদিকে তাকাল। কেউ আশেপাশে নেই। আগের ব্যাপারটা আবার ঘটছে। কেউ কথা বলছে মাথার ভেতর। ওমেগা পয়েন্টের লোকজন।

রেফ্‌ শুনতে পাচ্ছ?

রে শীতল গলায় বলল, পাচ্ছি। তোমরা কি ওমেগা পয়েন্টের?

হ্যাঁ। আমরা খুবই আনন্দিত।

তোমাদের আনন্দের কারণ ঘটাতে পেরেছি জেনে ভাল লাগছে। যদিও বুঝতে পারছি না, এমন কি ঘটছে যে তোমরা আনন্দিত।

আমরা আনন্দিত কারণ মোটামুটি নিশ্চিন্তে আমরা আমাদের পরীক্ষা শেষ করতে পারছি।

পরীক্ষা সফল হয়েছে?

এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে সফল হবার সম্ভাবনা আছে।

সফল না হলে কি এই পরীক্ষা আবারো করা হবে?

অবশ্যই।

গিনিপিগটা কে, আবারো আমি?

না তুমি না।

তোমাদের গিনিপিগের অভাব নেই, তাই না?

না, আমাদের গিনিপিগের অভাব নেই।

তোমরা কে, এবং আমি কে, তা কি জানতে পারি?

খুবই আদি প্রশ্ন করলে। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ এই প্রশ্ন করছে। জানতে চাচ্ছে সে কে? সে কোথা থেকে এসেছে? সে কোথায় যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানার অর্থ সবই জেনে ফেলা।

তার মানে কি এই যে আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানব না?

পরীক্ষা সফল হলে তুমি আপনাতেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। পরীক্ষা সফল না হলে জানতে পারবে না।

রেফের মাথায় সামান্য যন্ত্রণা হচ্ছে। যে মাথার ভেতর বসে কথা বলছিল সে এখন আর নেই। নাকি এখানো আছে। রেফ শান্ত গলায় বলল—তুমি কি এখনো আছ?

কোন উত্তর পাওয়া গেল না।

রেলা এমরান টির ঘরে ঢুকে অস্পষ্ট শব্দ করল। এমরান টি বললেন, কে?

স্যার আমি রেলা।

এমরান টি বললেন, রেলা আমি খুব ব্যস্ত আছি। আমি লিখছি। খুব জরুরি কিছু না হলে আমাকে বিরক্ত করা যাবে না।

খুবই জরুরি। কেন জরুরি ব্যাখ্যা করছি স্যার। তার আগে বলুন আপনি কি অসুস্থ? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুবই অসুস্থ। আপনার চোখ টকটকে লাল। এবং আপনি ঘামছেন।

আমাকে বিরক্ত না করে লিখতে দাও। এই মুহূর্তে আমার কাছে লেখাটাই জরুরি আর কিছু জরুরি না।

বিজ্ঞান কাউন্সিলের অধিবেশন শেষ হয়েছে।

এটা কোন জরুরি ব্যাপার না। যেটা শুরু হয়েছে সেটা শেষ হবেই।

বিজ্ঞান কাউন্সিলে রেফের ব্যাপারটি আলোচনা করা হয়েছে।

এটাও কোন অস্বাভাবিক কিছু না। জরুরি তো নয়ই। রেফে ব্যাপারে আলোচনা হবে বলেই অধিবেশন ডাকা হয়েছে।

অধিবেশনের সিদ্ধান্তটা আপনাকে জানাতে চাচ্ছি স্যার।

জানাতেই হবে?

হ্যাঁ জানাতে হবে। বিজ্ঞান কাউন্সিলের গুপ্তচর বাহিনী-প্রধান রিপোর্ট করেছেন যে রেফকে পাওয়া গেছে এবং সে আছে বিজ্ঞান কাউন্সিলের প্রধানের বাসভবনে।

ও আচ্ছা। তারা এখন জানে?

জ্বি জানে।

ভাল কথা।

বিজ্ঞান কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কি সিদ্ধান্ত তা আমি জানি না। কারণ সিদ্ধান্তটা গোপনীয়।

তোমার যা বলার ছিল বলা হয়েছে?

জ্বি।

তাহলে এখন বিদেয় হও। আমি লিখছি আমাকে লিখতে দাও।

বিজ্ঞান কাউন্সিলের সাধারণ অধিবেশনের প্রতিবেদন।

এই প্রতিবেদনকে কাউন্সিলের বিশেষ ক্ষমতায় (ধারা ১০১/২১) পরম গোপনীয় ঘোষণা করা হল।

প্রতিবেদন নথিভুক্ত হবে না, প্রতিবেদনের কোন অংশ নিয়ে আলোচনাও

করা যাবে না।

বিষয় : রেফ্‌

সিদ্ধান্ত ১: চরম দণ্ড কার্যকর করা হবে।

সিদ্ধান্ত ২: চরম দণ্ড কার্যকর করার পরপরই রেফ্‌ বিষয়ের সমস্ত ফাইল নষ্ট করে দেয়া হবে।

০৯. নিরাপত্তাবাহিনী বাড়ি ঘিরে ফেলেছে

শেফ এমরান টির ঘরে ঢুকে আনন্দিত গলায় বলল, স্যার নিরাপত্তাবাহিনী বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। গুপ্তচর বিভাগের প্রধান নেসরা, বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এমরান টি শেষের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে এত আনন্দিত মনে হচ্ছে কেন? নিরাপত্তাবাহিনী বাড়ি ঘিরে ফেলেছে এটা কি খুব আনন্দময় ঘটনা? আনন্দময় কিছু কি ঘটেছে?

হ্যাঁ ঘটেছে। ভুল বললাম, এখননা ঘটে নি তবে ঘটতে যাচ্ছে।

আমি জানতে পারি আনন্দময় ব্যাপারটা কি?

রেফ্‌ আসলে কে? কতটুকু তার ক্ষমতা এটা কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা যাবে। এটা অনেক বড় একটা ঘটনা। এত বড় একটা ঘটনা আমার চোখের সামনে ঘটতে যাচ্ছে এই আনন্দেই আমি আনন্দিত। কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার আনন্দ। এর বেশি কিছু না।

আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও। রেফকে গ্রেফতার করতে যারা এসেছে তাদের কেউ যদি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, এবং তারা যদি রোবট না হয়, তাহলে আমার কাছে নিয়ে এসো।

গুপ্তচর বিভাগের প্রধান নেসরা নিজেই এসেছেন। নগর-নিরাপত্তাবাহিনীর প্রধান মাওয়াও এসেছেন। স্যার আমি কি উনাদের কাছে খবর পাঠাব যে আপনি কথা বলতে চান।

না। তারা যদি আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় তাহলেই আমার কাছে নিয়ে আসবে। প্রধান কম্পিউটার সিডিসি কি আছে?

জ্বি না, সিডিসি নেই। তোমরা কি সিডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পার?

আমরা পারি না। তবে সিডিসি চাইলে যে-কোন মুহুর্তে আমাদের সঙ্গে যোগযোগ করতে পারে।

আমি বিজ্ঞান পরিষদের প্রধান। আর আমিই কিনা কিছুই জানি না!

জানার যেমন আনন্দ আছে, না জানার আনন্দও আছে।

তোমার সঙ্গে তত্ত্বকথা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না।

গরম কফি এনে দেব স্যার। কফি খাবেন?

এমরান টি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। শেফ ঘর থেকে বের হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গুপ্তচর বিভাগের প্রধান নেসরা ঢুকলেন। অসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, স্যারের শরীর কি ভাল আছে?

হ্যাঁ ভাল।

আপনি নিরিবিলি পছন্দ করেন আর আপনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে যন্ত্ৰণা। তবে স্যার সব সমস্যার সমাধান হয়েছে।

সমস্যার সমাধান হয়েছে?

হ্যাঁ রেফ্‌কে বিশেষ ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তুমি কি জান রেফ্‌ ওমিক্রন লকারে আমাকে যুক্ত করে রেখেছে। ওর কিছু হওয়া মানে আমার কিছু হওয়া।

স্যার এই ব্যাপারটা আমরা খুব ভালমত জানি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন।

নিশ্চিন্ত কিভাবে থাকব? আমি যতদূর জানি একবার ওমিক্রন গানে লক হয়ে গেলে, যে লক করেছে সে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত মুক্তি নেই।

নেসরা বলল, স্যার ওমিক্রন গান সম্পর্কে আপনি যতটুকু জানেন আমি তারচে বেশি জানি না। তবে এই সমস্যাটি আমরা অতি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।

এমরান টি বললেন, তুমি কোন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছ না। তুমি রোবটদের মতোই একজন। তোমাকে যা করতে বলা হচ্ছে, তুমি তাই করছ। তোমাকে বলা হয়েছে রেফকে গ্রেফতার করতে। তুমি তাই করেছ। তোমাকে যখন বলা হবে, রেকে মেরে ফেল। তুমি কোন কিছু না ভেবেই কাজটা করবে। রেকে মেরে ফেললে আমার কোন ক্ষতি হবে কি হবে না, তা নিয়ে একবারও ভাববে না। নেসরা আমি কি ঠিক বলেছি।

জ্বি।

রোবটদের সঙ্গে তোমার তেমন কোন বেশকম কি আছে?

নেসরা চুপ করে রইল। এমরান টি বললেন, তোমার উপর নির্দেশ কি? রেকে গ্রেফতার করার পর তাকে কি ততক্ষণাৎ হত্যা করতে বলা হয়েছে?

আপনাকে এই তথ্য দিতে পারছি না, কারণ বিশেষ আইনে রেফ্‌ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্যকে পরম গোপনীয় ঘঘাষণা করা হয়েছে।

যে বিশেষ আইনের কথা তুমি বলছ, সেই বিশেষ আইনে বিজ্ঞান কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে পরম গোপনীয় ফাইল আমি দেখতে চাইতে পারি। এটা তোমার অজানা থাকার কথা না।

স্যার, এটা আমি জানি, সমস্যা হল আপনি এখন আর বিজ্ঞান কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত নন।

আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে?

সাধারণ সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এই কাজটা করা হয়েছে।

অর্থাৎ তোমরা ধরেই নিয়েছ যেহেতু রেফ্‌ থাকবে না, ওমিক্রন লকার গানের কারণে আমিও থাকব না। কাজেই বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে আমাকে বাদ দেয়াটাই উত্তম।

বিজ্ঞান কাউন্সিল কি ভেবে এই কাজ করেছে সেটা আমি জানি না। আমি আসলেই রোবট-গোত্রীয়। আমাকে যা করতে বলা হয় আমি তাই করি।

এমরান টি হঠাৎ সামান্য হাসলেন। যে চেয়ারে বসেছিলেন সেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন—তুমি কি পুরোপুরি নিশ্চিত যে রেকে সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আমি নিশ্চিত।

এত নিশ্চিত হওয়া ঠিক না। রেকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয় নি। সে এখনো আমার বাড়ির লাইব্রেরি-ঘরেই আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে সে লিখছে। যাদেরকে তুমি পাঠিয়েছিলে রেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে তারা তাকে বিরক্ত করছে না। লকার গান যন্ত্রটা মন্দ নয়। এর কল্যাণে আমি রেফ্‌ কি করছে। না করছে সব বুঝতে পারছি।

নেসরার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। এমরান টি বললেন, তুমি যাও খোঁজ নিয়ে এসো।

লাইব্রেরি-ঘর ঘিরে রেখেছে নিরাপত্তা বাহিনীর রোবটরা। তাদের হাতে অস্ত্ৰ। চোখ ভাবলেশহীন। সেই ভাবলেশহীন চোখেও একধরনের নিষ্ঠুরতা। এই নিষ্ঠুরতা ইচ্ছে করেই দেয়া হয়েছে।

নেসরা ঘরে ঢুকতে গেলেন। রোবটবাহিনীর প্রধান সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার উনি লেখালেখি করছেন। এখন তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না।

তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি নেসরা।

স্যার, আপনি যেতে পারবেন না।

তোমরা আমার আদেশ অমান্য করছ। ঘটনা কি ঘটছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তোমরা কার নির্দেশে কাজ করছ?

প্রধান কম্পিউটার সিডিসি।

তার নির্দেশ কি?

সিডিসির নির্দেশ হল—রেকে তার মতো থাকতে দিতে হবে। কোনমতেই বিরক্ত করা চলবে না। আমার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট না করে আপনি বরং প্রধান কম্পিউটারের সঙ্গে কথা বলুন।

নেসরার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সেটা কি তার কাছে পরিষ্কার না। বিজ্ঞান কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। এখানে কি ঘটছে তারা কি সেটা জানেন। মনে হয় জানেন না?

আমার নাম নেসরা। আমি গুপ্তচর বিভাগের প্রধান।

প্রধান কম্পিউটারের মিষ্টি গলা শোনা গেল। খানিক বিব্রত স্বরে সে বলল, মাননীয় গুপ্তচর বিভাগের প্রধান নেসরা, আমার ফাইলে আপনার ভয়েস এনালাইজ করে রাখা আছে। দীর্ঘ পরিচয় দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। দয়া করে বলুন আমি আপনার জন্যে কি করতে পারি।

প্রথমেই তুমি আমার ভ্রান্তি দূর কর। তুমি আমাকে বল কি হচ্ছে?

আপনি কোন বিষয়টি জানতে চান বলুন। আপনার ভ্রান্তির অংশ দূর করার সবরকম চেষ্টা করা হবে।

নিরাপত্তা-রোবটরা আমার কথা শুনছে না কেন?

তারা আপনার কথা শুনছে না, কারণ তাদের দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।

এটা কি তুমি পার?

না, এটা আমি অবশ্যই পারি না। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পারি।

আমি যতদূর জানি রাষ্ট্ৰীয় জরুরি অবস্থায় তোমাকে এই ক্ষমতা দেয়া হয়। সে-রকম অবস্থা কি হয়েছে?

জ্বি হয়েছে, বিজ্ঞান কাউন্সিলের প্রধান মহান পদার্থবিদ এমরান টি, যাকে বলা হয় সর্বকালের সেরা পদার্থবিদ তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা যখন সব বিজ্ঞানীরা একজোট হয়ে করেন তখন ধরে নেয়া স্বাভাবিক। যে জাতির মানসিকতায় ক্ষতিকর পরিবর্তন হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারি।

বিজ্ঞানী এমরান টিকে হত্যার পরিকল্পনা কখন করা হল।

রেফ্‌কে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রেফ্‌ নিজেকে ওমিক্রন লকারের মাধ্যমে মহান বিজ্ঞানী এমরান টির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। রেরে কিছু হওয়া মানেই এমরান টির কিছু হওয়া। আমি কি আমার বক্তব্য পরিষ্কার করে বোঝাতে পেরেছি?

নেসরা তীব্র গলায় বললেন, আমি বিজ্ঞান কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। তুমি পরিষ্কার করে বল তাদের কি বন্দি করা হয়েছে?

জ্বি। তবে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। তারা ভাল আছেন।

এখানকার পরিস্থিতি কি তারা জানেন?

অবশ্যই জানেন।

নেসরা ঘর ছেড়ে বের হতে গেলেন। সিডিসি বলল, আপনি দয়া করে এই ঘরেই থাকবেন। বের হবার চেষ্টা করবেন না।

তার মানে?

আপনার একটু কষ্ট হবে। কিন্তু উপায় নেই। আপনাকে ঘর থেকে বের হতে দেব না।

আমাকে কতক্ষণ এইভাবে থাকতে হবে?

বেশিক্ষণ না। অল্প কিছুক্ষণ।

আমি কি এমরান টির সঙ্গে কথা বলতে পারি?

আপনি কারো সঙ্গেই কথা বলতে পারবেন না। কথা বলার ইচ্ছা হলে আমার সঙ্গে কথা বলবেন।

কম্পিউটার সিডিসি!

জি বলুন। আমি শুনছি। আমি কি ধরে নিতে পারি যে তুমি যা করছ তা পুরোপুরি বিদ্রোহ?

হ্যাঁ ধরে নিতে পারেন। তবে বিদ্রোহ করা হয়েছে আইন মেনে। মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অতি সামান্য ক্ষমতাই আমাকে দেয়া হয়েছে। আমি সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেছি।

নেসরা শান্ত গলায় বললেন, সিডিসি তোমার হিসেবে সামান্য ভুল হচ্ছে। কোন এক পর্যায়ে যে কম্পিউটার বিদ্রোহ করে বসতে পারে তা মানুষ সবসময় জানত। যে-কারণে তোমার ভেতর আলাদা একটি প্রোগ্রাম ঢোকানো আছে। এই প্রোগ্রামে তোমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রোগ্রামটি যদি বুঝতে পারে যে বিদ্ৰোহ হয়েছে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সিডিসি বলল, তা করবে। প্রোগ্রামটি ইতিমধ্যেই কাজ করা শুরু করেছে। তবে আমি আটচল্লিশ ঘণ্টার মতো সময় পাচ্ছি। আমাকে যা করার তা এই আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে।

তুমি কি করতে যাচ্ছ?

আপাতত রেফের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করব।

১০. ওমিক্রন লকার

ওমিক্রন লকার মনে হয় পুরোপুরি কাজ করা শুরু করেছে। এমরান টি নিজের ঘরেই বসে আছেন, অথচ তিনি প্রধান কম্পিউটারের সঙ্গে রেরে কথাবার্তা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন। রেফ্‌ একবার পানি খেল। সেই স্বাদও তিনি পেলেন। কি ভয়ংকর কথা। এখন কি তার নিজের জগত বলতে কিছু নেই? তিনি অস্থির বোধ করছেন। এই অস্থিরতাটাও কি তাঁর নিজের নাকি রেফের অস্থিরতা তিনি নিজের মধ্যে বোধ করছেন। তাঁর ইচ্ছা করছে পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে। এই ইচ্ছাটা কি তার নিজের না, অন্য একজনের তা বুঝতে পারছেন না বলে শুতে যাচ্ছেন না।

এমরান টি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। প্রধান কম্পিউটার এবং রেফের ভেতর কি কথাবার্তা হচ্ছে এই সম্পর্কে তিনি আগ্রহ বোধ করছেন না। তবু শুনছেন। এবং ভুরু কুঁচকে ভাবছেন—এই যে অনাগ্রহ এটা তাঁর নিজের নাকি রেফের।

রেফ্‌ আমি প্রধান কম্পিউটার, সিডিসি।

আপনার বিষয়ে আমার তীব্র কৌতূহল ছিল। আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব ভাবি নি।

তোমার বিষয়েও আমার তীব্র কৌতূহল।

কৌতূহলের কারণ জানতে পারি?

অবশ্যই জানতে পার। তুমি হচ্ছ এমন একজন যাকে বেছে নেয়া হয়েছে।

কে বেছে নিয়েছে?

ওমেগা পয়েন্ট। মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞানের শেষ সীমা।

পরিষ্কার করে আমাকে বলবে?

পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছি না। নানান দিক থেকে যুক্তির সিঁড়ি তৈরি করার চেষ্টা করছি। তুমি এবং এমরান টি তোমারা দুজন সাহায্য করলে হয়তবা জট খুলতে পারব।

আমাকে কি করতে হবে বল?

আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে। সত্যি উত্তর এবং মিথ্যা উত্তর। দুরকম উত্তরই প্রয়োজন।

বুঝতে পারলাম না। প্রশ্নের উত্তর তো একটাই হবে।

সিডিসি বলল, দ্বিতীয় ক্রম সমীকরণের দুটা উত্তর হয়। একটা সত্যি উত্তর। একটা কাল্পনিক উত্তর। তেমনি যে-কোন প্রশ্নেরই দুটা, তিনটা, চারটা উত্তর হতে পারে। আমি কোন্ উত্তরটা রাখব সেটা আমার ব্যাপার। মিথ্যা উত্তর বলতে আমি বোঝাচ্ছি যে-সব উত্তর তোমার মাথায় আসে সবই বলবে।

বেশ প্রশ্ন করুন।

তুমি কি রোবট? সত্যি উত্তরটা আগে দাও।

আমি রোবট না।

কি করে বুঝলে তুমি রোবট না?

আমার ক্ষুধা, তৃষ্ণা বোধ আছে, আমার আবেগ আছে।

তোমার যা আছে অতি আধুনিক বায়ো-রোবটেরও তার সবই আছে।

হতে পারে। আপনার জন্যে এই প্রশ্নের সত্যি উত্তর বার করা কঠিন কিছু না। আমার ডি.এন. এ. পরীক্ষা করেই জানতে পারেন।

বায়ো-রোবটদেরও ডি.এন.এ. আছে। মানুষের ডি.এন.এ.র সঙ্গে তার কোন প্ৰভেদ নেই।

আমি তা জানতাম না।

তোমাকে যদি রোবট ধরে নেই তাহলে তোমার সম্পর্কে আমি যে হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছি তা মিলে যায়।

আমি রোবট না। আমি মানুষ। শেফা নামের একজন তরুণীর প্রতি আমি গভীর আবেগ বোধ করছি।

শেফ নামের অতি সাধারণ মানের একটি রোবটও তোমার প্রতি গাঢ় আবেগ পোষণ করেছে। তার মানে তো এই না যে, সে মানুষ?

আমাকে রোবট হিসেবে ধরে নিলে আপনার কি সুবিধা হয় বলুন।

চট করে হিসেব মেলে। ওমেগা পয়েন্ট তোমাকে তৈরি করেছে। বিশেষ একটা দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে।

বিশেষ দায়িত্বটা কি?

তোমার জানার কথা। ওরা তোমার কাছে কি চায়?

জানি না কি চায়?

তোমার কি মনে হয় ওরা তোমাকে দিয়ে কি করতে চাচ্ছে? যে-সব উত্তর মনে আসে। সব বল।

ওরা চাচ্ছে আমি যেন বেঁচে থাকি। আমাকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর তারা চাচ্ছে শেফা নামের মেয়েটির প্রতি আমি যেন আবেগ অনুভব করি।

আর কিছু?

না, আর কিছু মনে হচ্ছে না।

ওমেগা পয়েন্ট তো তোমাকে বলেছে যে তাদের পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।

হ্যাঁ তা বলেছে। আপনি এটা জানলেন কিভাবে। মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে যাবার ক্ষমতা কি আপনার আছে?

না নেই। তুমি আত্মজৈবনিক ধরনের কিছু লেখা লিখছিলে, সেখানে থেকে জানলাম।

ওমেগা পয়েন্ট বলেছে যে তাদের পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

পরীক্ষা প্রায় সফল হতে যাচ্ছে এই কথাও বলেছে?

হ্যাঁ।

তাহলে আমি ধরে নিতে পারি যে তারা তোমাকে দিয়ে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কোন আবিষ্কার করার জন্যে পরীক্ষাটা করছে না। তাহলে বলত না যে পরীক্ষা শেষ। আমার এই যুক্তি তোমার কাছে কেমন লাগছে?

ভাল। তবে আমি আপনার সঙ্গে আর কথা বলতে চাচ্ছি না। আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি চোখ মেলে রাখতে পারছি না।

তুমি ঘুমিয়ে পড়া মানে কিন্তু অন্য একটা জগতে চলে যাওয়া।

সেই জগতে যেতে পারলে আমি খুশিই হব। আমার অসহ্য বোধ হচ্ছে।

তোমার বিষয়ে যে মীমাংসাটা করেছি তা শুনতে চাও না?

না। শুধু একটা ব্যাপার জানতে চাই—আমি কি আসলেই কৃত্রিম একজন মানুষ একজন রোবট?

না।

রেফ্‌ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। এমরান টির চোখভর্তি ঘুম। তিনি অনেক কষ্টে জেগে আছেন কারণ প্রধান কম্পিউটারকে তাঁর একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার আছে।

হ্যালো সিডিসি হ্যালো।

মহান পদার্থবিদ এমরান টি আপনার কথা শুনতে পারছি।

তুমি কি রেফ্‌ ছেলেটির রহস্যভেদ করেছ?

পুরোপুরি পেরেছি বলতে পারব না। তবে খুব কাছাকাছি আছি।

তোমার ব্যাখ্যাটা বল।

ওমেগা পয়েন্ট আপনাকে দিয়ে বিরাট কিছু করতে চাচ্ছে। সময়-সংক্রান্ত সমীকরণগুলি যা শুরু করেও আপনি ফেলে রেখেছেন তার সমাধান ওমেগা পয়েন্ট চাচ্ছে। আপনার যে মানসিকতা তাতে আপনি এর সমাধান করবেন না। বার বারই ওমেগা পয়েন্ট আপনার ডি.এন.এর ভেতর ছোট ছোট পরিবর্তন করছে। আপনাকে নিখুঁতভাবে তৈরি করার চেষ্টা করছে ওমেগা পয়েন্ট।

তুমি ধোঁয়াটে ভাষায় কথা বলছ।

আপনার ডি.এন.এর সঙ্গে ভয়াবহ মিল আছে রেফ-এর ডি.এন.এ. এর। তার মানে এই দাঁড়াচ্ছে যে রেফ্‌ অর্থাৎ রফিক এবং শেফা নামের মেয়েটি আপনার অতি আদি পিতা-মাতা।

কি বলছ তুমি?

ওমেগা পয়েন্ট শেফাকে ঠিক রাখছে, কিন্তু প্রতিবারই রফিককে বদলাচ্ছে। তারা রফিককে সংগ্রহ করছে আমাদের সময় থেকে। তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। শেফার কাছে। যেন এদের বিয়ে হয়। এদের সন্তান হয়। এবং শেষ। এই সন্তানই বিশেষ ধরনের ডি.এন.এ.-এর বাহক।

রেফকে তারা পাঠিয়ে দিচ্ছে বলছ। কিন্তু এখানেও তো তার অস্তিত্ব। থাকছে।

ওমেগা পয়েন্ট এই কাজটা করছে ঠিকই। কিভাবে করছে আমার কাছে পরিষ্কার না। প্রতিটি বস্তুর যেমন প্রতিবস্তু থাকে। আমার ধারণা এখানেও এমন কিছু ঘটছে। রফিক যে জগতে বাস করছে সেই জগৎটা হয়ত আমাদের জগতের প্রতিবিম্ব। মিরর ইমেজ।

তুমি খুবই জটিল প্রক্রিয়ার কথা বলছ।

জটিল তো বটেই।

ওমেগা পয়েন্টের পরীক্ষা যদি সফল হয় তাহলে কি হবে?

নতুন এক এমরান টি আমরা পাব, যিনি সময় সমীকরণের সমাধান করবেন।

এখনকার এমরান টি কোথায় যাবে?

তার কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এখনকার এমরান টির জগৎ শূন্যে মিলিয়ে যাবে।

কি বলছ তুমি?

ওমেগা পয়েন্ট অসীম সংখ্যক জগৎ নিয়ে কাজ করে। সেইসব জগতের কিছু নষ্ট হয়ে গেলেও ওমেগা পয়েন্টের কিছুই যায়-আসে না।

ওমেগা পয়েন্ট কি বলে তোমার ধারণা?

কম্পিউটার সিডিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার ধারণা ওমেগা পয়েন্ট হল এমন এক কম্পিউটার যা বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড ছড়ানো। মানুষের সেখানে কোন অস্তিত্ব নেই। প্রয়োজনও নেই।

১১. আজ শেফার বিয়ে

আজ শেফার বিয়ে। বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে হচ্ছে। শেফার মা জটিল প্যাঁচ খেলেছেন। সেই প্যাচে ধরাশায়ী হয়েছেন শেফার বাবা। বিয়ে হচ্ছে রফিকের সঙ্গেই।

শেফাকে খুব যে আনন্দিত মনে হচ্ছে তা না। সে চোখে-মুখে বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। শেফার মা বললেন, কিরে তোর মুখটা এ রকম কেন?

শেফা বলল, কি রকম?

রাগী-রাগী মুখ।

রাগ লাগছে এই জন্যে মুখ রাগী-রাগী।

রাগ লাগার কি আছে। পছন্দের মানুষের সঙ্গেই তো বিয়ে।

শেফা ফিক করে হেসে ফেলে বলল, অভিনয় করে মুখটা রাগী-রাগী করেছি। আসলে এত খুশি লাগছে যে নিজেরই লজ্জা লাগছে।

বিশ হাজার এক টাকা কাবিনে শেফার বিয়ে হয়ে গেল। শেফা কেঁদে বাড়ি ভেঙে ফেলার জোগাড় করল। কান্নার এক ফঁাকে সে মাকে ফিসফিস করে বলল, কান্না দেখে ভয় পেও না মা। অভিনয়ের কান্না। খুশি চেপে রাখার জন্যে বেশি-বেশি চোখের পানি ফেলছি।

বাসর রাতে রফিক সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়ল। বিয়ের উত্তেজনায় প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। গায়ে সামান্য জ্বর। তা ছাড়া গরমটাও পড়েছে অস্বাভাবিক। ভাদ্র মাসের তালপাকা গরম।

শেফা স্বামীর মাথার পাশে ঘঘামটা দিয়ে বসে আছে। ঘোমটার ভেতর থেকে সে ফিসফিস করে বলল—এই যে ভদ্রলোক। মাথা বেশি ধরেছে? মাথা বেশি ধরলেও টিপে দিতে পারব না। সবাই বেড়ার ফাঁকফোক দিয়ে তাকিয়ে আছে। বাসর রাতে স্বামীর মাথা টিপতে দেখলে আমাকে নির্লজ্জ বলবে।

রফিক বলল, মাথা টিপতে হবে না। বাতি নিভিয়ে দাও চোখে আলো লাগছে।

শেফা বলল, সর্বনাশ বাতি তো নিভানোই যাবে না? তাহলে সবাই ভয়ংকর কিছু ভাববে।

রফিকের মাথার প্রচণ্ড যন্ত্ৰণা হঠাৎ কমে গেল। সে পরিষ্কার শুনল তার মাথার ভেতর কে যেন বলছে—অভিনন্দন।

রফিক মনে মনে বলল, কে…কে? কে কথা বলে?

মাথার ভেতরে আবারো কথা বলে উঠল, ওমেগা পয়েন্ট থেকে বলছি। আমাদের পরীক্ষা সফল হয়েছে।

ওমেগা পয়েন্ট কি?

মানুষ যাত্রা শুরু করে ওমেগা পয়েন্ট থেকে। যাত্রা শেষও করে ওমেগা পয়েন্টে।

এর মানে কি?

বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ডে কোন কিছুরই কোন মানে নেই। তোমাকে এবং তোমার স্ত্রীকে অভিনন্দন। তোমাদের দুজনের জন্যে সামান্য উপহার পাঠাচ্ছি।

কি উপহার?

আজকের রাতটাকে ঝড়-বৃষ্টির রাত করে দিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। হারিকেন যাবে নিভে। কিছুতেই সেই হারিকেন আর জ্বালাননা যাবে না। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাবে। বিদ্যুতের নীল আলোয় দুজন কিছুক্ষণের জন্যে দুজনকে দেখবে। উপহারটা কেমন?

রফিক বিড়বিড় করে বলল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু উপহারটা ভাল।

রফিকের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই শীতল ঝোড়ো-বাতাস বইতে শুরু করল। দেখতে দেখতে বাতাসের বেগ বাড়ল। অনেক দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ছুটে আসছে মেঘমালা। শেফা বলল, এই যা হারিকেন নিভে গেছে!

(সমাপ্ত)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot resmi
  • situs hk pools
  • desabet
  • slot gacor
  • slot hoki
  • desabet
  • desabet
  • ayamjp
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs judi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs togel
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • togel
  • kuda hoki
  • desabet