Sunday, July 12, 2026
Homeবাণী ও কথালিপি - হুমায়ূন আহমেদ

লিপি – হুমায়ূন আহমেদ

লিপি – হুমায়ূন আহমেদ

জাংক মেইল বলে একটা ব্যাপার আছে যা চরিত্রগত দিক দিয়ে ১০০ ভাগ আমেরিকান। একমাত্র আমেরিকাতেই মেইল বক্স খুললে হাতভর্তি চিঠিপত্র পাওয়া যায়। যার ভেতর একটা বা দুটো কাজের চিঠি, বাকি সবই অকাজের বা আমেরিকান ভাষায়— জাংক মেইল।

জাংক চিঠিগুলি চট করে আলাদা করাও মুশকিল। খাম দেখে মনে হবে খুব জরুরি কিছু চিঠি। চিঠি শেষ পর্যন্ত পড়লে ভুল ভাঙবে। একটা নমুনা দেই—

প্রিয় হুমায়ূন,

তুমি কি জানো তুমি একজন অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি? টেলিফোন ডাইরেক্টরি থেকে এক মিলিয়ন র‍্যানডম নাম্বার নিয়ে একটি সুইপস্টেক করা হয়েছে। যার বিশ জন ফাইন্যালিস্টের মধ্যে তুমি এক জন। প্রথম পুরস্কার এক সপ্তাহ বিশ্বভ্রমণের জন্যে দুটি প্রথম শ্রেণীর বিমানের টিকিট। দ্বিতীয় পুরস্কার চার দিনের জন্যে ফ্লোরিডা প্যাকেজ।

আমাদের নিয়মানুসারে বিশ জন ফাইন্যালিস্টকে আমাদের কোম্পানির একটি করে প্রোডাক্ট কিনতে হবে। আমরা ক্যাটালগ পাঠালাম তুমি কোনটি কিনতে চাও তাতে টিক মার্ক দিয়ে সেই পরিমাণ ডলার আমাদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে।

আশা করি তুমি এই সুযোগ হারাবে না। তোমাকে সুইপস্টেকের ফাইন্যালিস্টদের একজন হবার জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ।

…..

জাংক মেইলগুলি প্রথম লাইন পড়ে ফেলে দেয়াই নিয়ম। আমি তা করি। কেন জানি খুব আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি চিঠি শেষ পর্যন্ত পড়ি। যা বলে তা বিশ্বাসও করি। আমেরিকানরা চিঠি লিখে মিথ্যা কথা বলবে এটা ভাবতেও আমার কাছে খারাপ লাগে। এই গল্পটি জাংক মেইল নিয়ে। প্রস্তাবনা অংশ শেষ হয়েছে, এখন মূল গল্পে আসি।

১৯৮০ সালের জুন-জুলাই মাসের ঘটনা। আমি তখন নর্থডেকোটায়। স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছি। হঠাৎ একদিন মেইল বক্সে একটা চিঠি পেলাম। চিঠিটা এ রকম—

ড. আহমেদ,

আমি জেনেছি তুমি লুপ্ত প্রাচীন ভাষার বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। আমার কাছে লুপ্ত ভাষায় লেখা একটি কাগজ আছে। তুমি যদি ভাষার পাঠোদ্ধারে আমাকে সাহায্য করো আমি খুশি হব। তুমি দয়া করে নিম্নলিখিত পোস্ট বক্স নাম্বারে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো। ভালো কথা, তোমার পরিশ্রমের জন্যে যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে।

বলাই বাহুল্য, এটা একটা জাংক চিঠি। পোস্ট বক্সের ঠিকানায় উত্তর দিলেই ধরা খেতে হবে। প্রাচীন ভাষাবিষয়ক কোলে সোসাইটির সদস্য হতে হবে যার জন্যে মাসিক চাঁদা বিশ ডলার বা এই জাতীয় কিছু। চিঠি আমি ফেলেই দিতাম কিন্তু আমার নামের আগে ড. পদবিটি আমাকে ধাঁধায় ফেলে দিল। তখনও ডক্টর ডিগ্রি পাইনি। পাব পাব ভাব। কিউমিলিটিভ একজাম পাস করেছি। থিসিস লিখছি। এই সময় কেউ যদি ড. লিখে চিঠি পাঠায় মন দুর্বল হতে বাধ্য। কাজেই আমি চিঠির জবাব পাঠালাম। আমি লিখলাম—

জনাব,

আপনার চিঠি পেয়েছি। প্রাচীন লুপ্ত ভাষা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না আমার পড়াশোনার বিষয় পলিমার রসায়ন। আপনাকে সাহায্য করতে পারছি না বলে দুঃখিত। আমি প্রাচীন ভাষা জানি এই তথ্য কোথায় পেলেন জানালে খুশি হব।

বিনীত
হুমায়ূন আহমেদ

পুনশ্চ ১ : আমি এখনো Ph. D. ডিগ্রি পাই নি। আপনার এই তথ্যটিও ভুল।

পুনশ্চ ২ : আপনার চিঠিটি যদি জাংক মেইল জাতীয় হয় তা হলে জবাব দিবেন না।

আমি এই চিঠির জবাব আশা করি নি। কিন্তু সাত দিনের মাথায় জবাব পেলাম। জবাবটা হুবহু তুলে দিলাম—

প্রিয় আহমেদ,

আমার চিঠিটি জাংক মেইল নয়, সে কারণেই জবাব দিচ্ছি। তুমি প্রাচীন লুপ্ত ভাষা নিয়ে গবেষণা করো এই তথ্য তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আমাকে জানিয়েছে।

আমি আমেরিকার প্রায় সব বড় লাইব্রেরিকে একটি আবেদন পাঠিয়েছিলাম। সেখানে জানতে চেয়েছি লাইব্রেরির পাঠকদের মাঝে এমন কেউ কি আছেন যারা প্রাচীন ভাষা নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করেন?

তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি তোমার নাম পাঠিয়েছে এবং তোমার নামের আগে ড. পদবি তারাই দিয়ে দিয়েছে।

তুমি লিখেছ তোমার বিষয় পলিমার রসায়ন। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে পলিমার রসায়ন তোমার বিষয় হলে তুমি লুপ্ত প্রাচীন ভাষা বিষয়ে আগ্রহী। তা না হলে তুমি আমার চিঠি জবাব দিতে না। তুমি কি দয়া করে একটি প্রাচীন ভাষা উদ্ধারে আমাকে সাহায্য করবে? লিপিটির পাঠোদ্ধার করা সামোয় খুবই প্রয়েজন।

বিনীত

এরিখ স্যামসন

সিনোসিটা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি আমার নাম কেন পাঠিয়েছে ভেবে বের করতে গিয়ে মনে পড়ল— গত সামারে লাইব্রেরি থেকে রোসেটা স্টোনের উপর একটি বই আমি ইস্যু করেছিলাম।

প্রাচীন মিশরীয় হিরোলোগ্রাফির পাঠোদ্ধারে রোসেটা স্টোন বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। ঘটনাটা কী জানার জন্যে বইটি পড়া। বইটি পড়ে আরেকটি বই ইস্যু করি অশোকের শিলালিপি। অশোকের শিলালিপি অনেক দিন ধরে পাঠোদ্ধার করা যাচ্ছিল না— এক ইংরেজ সাহেব শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন। এই দুটি বই পড়ার পর আমি মায়াদের ভাষা পাঠোদ্ধারের চেষ্টাবিষয়ক আরেকটি বই ইস্যু করি। এই থেকেই কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের ধারণা হয়েছে আমি প্রাচীন ভাষার একজন গবেষক?

আমি যদি প্রাচীন ভাষার গবেষক হইও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আমার অনুমতি ছাড়া আমার নাম-ঠিকানা কাউকে দিতে পারে না। এসব বিষয়ে আমেরিকায় নিয়মকানুন খুব কঠিন। আমি ঠিক করলাম লাইব্রেরিয়ানকে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করব।

জিজ্ঞেস করা হলো না। কারণ, আমি তখন খুবই ব্যস্ত। মানুষ তার এক জীবনে নানান ধরনের ব্যস্ততায় জড়িয়ে যায়। পিএইচ.ডি. থিসিস প্রস্তুতকালীন ব্যস্ততার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যস্ততার তুলনা চলে বলে আমি মনে করি না। একটা চ্যাপ্টার লিখে প্রফেসরকে দেখাই, তিনি পুরোটা কেটে দেন। আবার লিখে নিয়ে যাই, আবারও কেটে দেন। আমি ল্যাবরেটরি রেজাল্টের যে ব্যাখ্যা দেই সেগুলি তার পছন্দ হয় না। তিনি যেসব ব্যাখ্যা দেন তা আমার পছন্দ হয় না। চলতে থাকে ধারাবাহিক কাটাকুটি খেলা।

মাঝে মাঝে রাগারাগিও হয়। যেমন, একদিন আমার প্রফেসর বললেন, আহমেদ, তোমাকে তো বেশ বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবেই জানতাম। এখন তোমার থিসিস পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে তোমার আই কিউ এবং মিডিয়াম সাইজের কড মাছের আই কিউ কাছাকাছি। মাছেরটা বরং কিছু বেশি হতে পারে।

প্রফেসরের এই ধরনের কথাবার্তায় খুবই মন খারাপ হয়। এ্যাপার্টমেন্টে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করি। ভাত না খেয়ে থালা-বাসন ছুঁড়ে মারি। থিসিস লেখার সময় পিএইচ.ডি, স্টুডেন্টদের এই আচরণ খুবই স্বাভাবিক। আমেরিকার ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের এই বিষয়ে একটি স্টার্টির্সটিকসও আছে। তারা দেখিয়েছে–বিবাহিত ছাত্রদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার পিএইচ. ডি. করার সময়ে সবচেয়ে বেশি— শতকরা ৫৩। এই ৫৩-এর ভেতর ৯৭% বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে যখন ছাত্ররা তাদের থিসিস লেখা শুরু করে।

প্রতিদিন যে হারে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছে তাতে মনে হয় আমি ওই স্টেজে দ্রুত চলে এসেছি। একদিন ঝগড়া চরমে উঠল। আমার কন্যার মাতা আমাকে হতভম্ব করে কন্যার হাত ধরে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলো। সে নাকি নিউইয়র্কের দুটো টিকিট কাটিয়ে রেখেছে। আসছে দু মাস সে নিউইয়র্কে তার মামার কাছে থাকবে। আমার থিসিস লেখা শেষ হবার পর ফিরবে। যদি কোনো কারণে থিসিস লেখা শেষ না হয় তা হলে আর ফিরবে না।

আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, খুবই ভালো কথা। তোমাদের আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল। হু কেয়ারস? গো টু হেল।

গো টু হেল গালিটা তখন নতুন শিখেছি। যখন-তখন ব্যবহার করি এবং অত্যন্ত ভালো লাগে। বাংলা ভাষায় জাহান্নামে যাও–এর চেয়েও লাগসই মনে হয়।

ব্যাচেলর জীবন হচ্ছে সর্বোত্তম। এই জীবনে আছে মুক্তির আনন্দ— এ ধরনের অতি উচ্চ ভাব নিয়ে প্রথম রাতটা কাটল। দ্বিতীয় রাত আর কাটতে চায় না। আমি সময় কাটাবার জন্যে রাত এগারোটায় এরিথ স্যামসনকে টেলিফোন করলাম।

হ্যালো এরিখ।

ইয়েস। মে আই নো, হু ইজ স্পিকিং?

আমি নাম বললাম। আমার মনে হলো অপর প্রান্তে এরিখ আনন্দের আতিশয্যে শূন্যে লাফ দিল। যেন দীর্ঘদিনের অদর্শনের পর হারানো বন্ধুকে ফিরে পেয়েছে। উচ্ছ্বাস বাঁধ মানছে না। আমেরিকানদের এ ধরনের উচ্ছ্বাসের সবটাই সাধারণত মেকি হয়ে থাকে। আমার মতো বোকা বিদেশীরা এতে বিভ্রান্ত হয়। যাই হোক আমাদের কথাবার্তা যা হলো তা মোটামুটি এ রকম—

আহমেদ তুমি কেমন আছ?

খুবই ভালো আছি। তবে এই মুহূর্তে মনটা একটু খারাপ।

কেন জানতে পারি কী? যদি কোনো অসুবিধা না থাকে।

কোনো অসুবিধা নেই। রাগ করে আমার স্ত্রী নিউইয়র্কে চলে গেছে। যাবার আগে জানিয়েছে দু মাসের ভেতর সে ফিরবে না।

তুমি নিশ্চিত থাক দিন তিনেকের ভেতরই তোমার স্ত্রী ফিরে আসবে। মন খারাপের কারণেই তুমি আমাকে টেলিফোন করেছ নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?

তোমার প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধারের কিছু হয়েছে কি না জানার আগ্রহ হচ্ছে।

এখনো কিছু হয় নি।

চেষ্টা নিশ্চয়ই চালিয়ে যাচ্ছ?

সাঙ্কেতিক কোড ভাঙতে পামেন একটা সফটওয়্যারের সন্ধান পেয়েছি। দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে কিনতে পারছি না। তবে মনে হয় কিনে ফেলব। তোমার কি ধারণা কেনা উচিত?

তুমি যদি পুরোপুরি নিশ্চিত হও যে সফটওয়্যার তোমার লিপির পাঠোদ্ধার করবে তা হলে কিনে ফেলো। আর যদি সন্দেহ থাকে তা হলে কেনা ঠিক হবে না। কারণ, এই সফটওয়্যারের তখন আর কোনো উপযোগিতা নেই।

আমিও তা-ই ভাবছি। তোমাকে তোমার মূল্যবান মতামতের জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এই পর্যন্ত কথাবার্তার পর আমি টেলিফোন রেখে ঘুমাতে গেলাম। তার পাঁচ মিনিটের মাথায় এরিখের টেলিফোন পেলাম।

হ্যালো আহমেদ।

হ্যাঁ বলো।

তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি বলে দুঃখিত। কথাটা হচ্ছে আমি সিয়াটলে যাব। ফার্গো সিটি পার হয়ে যেতে হবে। তোমার হাতে যদি অবসর থাকে তা হলে ভাবছি এক রাত থাকব ফার্গো সিটিতে। তোমার সঙ্গে গল্প করা হবে এবং তুমি প্রাচীন লিপিটা ইচ্ছা করলে দেখতেও পারো।

আমি বললাম, প্রাচীন লিপি দেখার জন্যে আমি ছটফট করছি।

কথাটা আমেরিকানদের মতো বললাম। আমেরিকানরা অতিরিক্ত উৎসাহ দেখানোটা ভদ্রতার অংশ বলে মনে করে। কোনো আমেরিকান মা যদি বলে আমার বাচ্চাটা এবারে ভালো গ্রেড পেয়েছে তখন যাকে এই কথাটা বলা হবে তার দায়িত্ব হবে বিকট চিৎকার দিয়ে বলা, ওয়ান্ডারফুল! হোয়াট এ গ্রেট নিউজ।

সত্যি কথাটা হলো প্রাচীন লিপি বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই। আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রাচীন লিপি পাওয়া যায় নি যেখানে রাজাদের যুদ্ধজয়ের কাহিনী এবং পুরোহিতদের মন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু লেখা। রাজা-বাদশা এবং পুরোহিতদের বিষয়ে আগ্রহী হবার কোনো কারণ থাকার কথা না।

এরিখ স্যামসনের সঙ্গে ফার্গো হোটেলে দেখা হলো। তার গলার স্বর শুনে মনে হয়েছিল যুবক মানুষ। এখন দেখি প্রৌঢ়। আমেরিকান প্রৌঢ়দের বয়স বোঝা মুশকিল, ৫০ থেকে ৭০ হতে পারে। বেশিও হতে পারে।

সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমেরিকান কায়দায় অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। গিফট র্যাপে মুড়ে সে আমার জন্যে একটা গিফটও নিয়ে এসেছে। আমি সেই গিফট নিলাম। চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি। আমি সেই গিফট হাতে নিয়ে আমেরিকান কায়দায় অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলাম। এ-রকম একটা ডায়েরি আমি অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। কয়েক বার দোকানে দেখেছি কিন্তু কেন জানি শেষ পর্যন্ত কেনা হয় নি। এ-ধরনের রুটিন কথাবার্তা বললাম।

আমার অতিথি সেই হিসেবে আমি তাকে রাতে আমার এ্যাপার্টমেন্টে খেতে নিয়ে গেলাম। এবং বললাম তুমি খাওয়াদাওয়া করো। তারপর আমরা গল্পগুজব করব। সবচেয়ে ভালো হয় রাতে তুমি যদি হোটেলে ফিরে না যাও। আমার এ্যাপার্টমেন্ট পুরো খালি। তুমি রাতে থেকে যাবে। প্রয়োজনে সারারাত আমরা গল্প করতে পারব।

বাঙালিরা হোটেল পছন্দ করে না–তারা যেখানেই যায় বন্ধুবান্ধব খুঁজে বেড়ায়, বন্ধুবান্ধব না পেলে দেশের মানুষ খোঁজে। হোটেল খোঁজে না। আমেরিকানদের স্বভাব উল্টো, তারা প্রথমেই খোঁজে হোটেল। তার পরেও এরিখ স্যামসন আমার ঘরে থাকতে রাজি হয়ে গেল। আমার রাঁধা অখাদ্য ডাল-ভাত এবং ডিম ভাজা তৃপ্তি করে খেল। ডাল খেয়ে বলল, এত চমৎকার স্যুপ সে অনেকদিন খায় নি। তাকে যেন এই স্যুপের রেসিপি দেয়া হয়।

খাওয়া শেষ করে আমরা গল্প করতে গেলাম। কথক এরিখ স্যামসন, আমি শ্রোতা। আমেরিকানরা গল্প ভালো বলতে পারে না। কিন্তু এরিখ দেখলাম ভালোই গল্প করে। সাউথের উচ্চারণে তার ইংরেজি বুঝতে মাঝে মাঝে সমস্যা হচ্ছে। আমাকে প্রায়ই বলতে হচ্ছে— Please say it again. তারপরেও বলতে বাধ্য হচ্ছি— কোনো আমেরিকানের মধ্যে আমি গল্প বলার এমন স্টাইল দেখি নি।

আহমেদ, তোমাদের পূর্বদেশীয় ভদ্রতার কথা আমি বইপত্রে পড়েছি। বাস্তবে দেখার সুযোগ আগে হয় নি। আজ দেখলাম। তুমি আমার জন্যে রান্নাবান্না করেছ। হোটেল থেকে আমাকে নিয়ে এসেছ এবং তোমার এ্যাপার্টমেন্টে আমাকে রাতে থাকতে বলছ–আমি খুবই আনন্দ পেয়েছি। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এ ধরনের আদরে আমরা আমেরিকানরা অভ্যস্ত না। আমার খানিকটা অস্বস্তি অবিশ্যি লাগছে। কিন্তু ভালো লাগছে অনেক বেশি। যাই হোক আমি প্রাচীন লিপিবিষয়ক গল্পটা এখন তোমাকে বলব। এবং মূল লিপিটা তোমাকে দেখাব। এই লিপি বিষয়ে আমার এত আগ্রহ কেন তা গল্পটা শুনলেই তুমি ধরতে পারবে। এই গল্পের প্রায় সবটা জুড়েই আছে আর স্ত্রী কেরোলিন। কাজেই এখন আমি যা করব তা হলো কেরোলিনের গল্প বলব।

পৃথিবীর সব দেশেই বন্ধুবান্ধবের কাছে স্ত্রীর গল্প বলা অরুচির পর্যায়ে পড়ে। তারপরেও বাধ্য হয়ে আমাকে তার গল্প করতে হচ্ছে।

আমি কেরোলিনকে বিয়ে করি যখন আমার মাত্র তেইশ। আমেরিকান পুরুষরা দুই ভাগে বিভক্ত, এক ভাগ বিয়ে করে খুব অল্প বয়সে আর এক ভাগ বিয়ে করে মধ্যবয়স পার করে আমি প্রথম দলের।

কেরোলিন ইউনিভার্সিটিতে আমার সঙ্গে পড়ত। আমরা ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা তাকে খুব ভয়ের চোখে দেখতাম। কারণ, সে ছিল ভয়াবহ ধরনের ভালো ছাত্রী। শুধু আমরা ছাত্রছাত্রীরা না, শিক্ষকরাও তাকে খুব সমীহের চোখে দেখতেন। অথচ সে ছিল খুবই বিনয়ী। ক্লাসে এসে শেষের সারির চেয়ারের একটিতে মাথা নিচু করে বসে থাকত। শিক্ষকরা কোনো প্রশ্ন করলে সে কখনো জবাব দেবার জন্যে হাত তুলত না। তাকেও শিক্ষকরা কখনো প্রশ্ন করতেন না, কারণ তাঁরা ধরেই নিয়েছেন, এমন কোনো প্রশ্ন তাকে করা যাবে না যার উত্তর তার জানা নেই।

এ-ধরনের মেয়েদের সঙ্গে আগবাড়িয়ে কেউ কথা বলে না। তাদের সঙ্গে ডেট করা তো অকল্পনীয় ব্যাপার। কেরোলিনের প্রসঙ্গে অনেক রসিকতাও আমাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যেমন একবার নাকি বাজি ধরে কোনো এক সিনিয়র ছাত্র কেরোলিনকে ডেট-এ নিয়ে গিয়েছিল। চাইনিজ ডিনার। ডিনার শেষে স্পিলবার্গের ছবি। কেরোলিন নাকি পুরো সময়টায় তার ডেটকে শুধু ফিজিক্সের প্রশ্ন করেছে। ডেট একবার শুধু বলেছে–কেরোলিন তোমার চোখ

তো খুব সুন্দর। কালো চোখ।

তার উত্তরে কেরোলিন বলেছে–চোখের কালোটা হয় টিনডেল এফেক্টের জন্যে। তারপরই টিনডেল এফেক্ট এবং টিনডেল ফেনোমেনার ওপর তিন মিনিট বক্তৃতা দিয়েছে।

ডেটের শেষে ছেলেটা বাড়িতে ফিরেছে জ্বর এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে।

কেরোলিনকে আমরা দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। আমেরিকান সোসাইটি অতি স্মার্ট তরুণী পছন্দ করে না। স্মার্ট শব্দটি আমি মেধা অর্থে ব্যবহার করছি।

যাই হোক, একদিন কী হয়েছে বলি। টার্ম পেপার জমা দিতে হবে— আমি পেপার লেখার জন্যে লাইব্রেরিতে গিয়েছি। হঠাৎ দেখি লাইব্রেরির এক কোনায় কেরোলিন মাথা নিচু করে বসে আছে। তার সামনে বেশ কিছু বই। একটা পেপার কাপে কফি। ন্যাপকিনের ওপর একটা স্যান্ডউইচ রাখা। স্যান্ডউইচের পাশে একটা আপেল। তার দুপুরে খাবার। আমি কী মনে করে যেন তার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, হ্যালো কেরোলিন। সে চমকে উঠে দাঁড়াল। তার হাতের ধাক্কা লেগে কফির কাপ উল্টে গেল। চারদিকে কফি ছড়িয়ে বিশ্রী অবস্থা! আমি বললাম, তোমাকে চমকে দেয়ার জন্যে দুঃখিত। কেরোনি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ইটস ওকে। ইটস ওকে।

আমি বললাম, তুমি বোধহয় আমাকে চিনছে পারছ না। তুমি তো ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কোনোদিকে তাকাও না। আমি যেহেতু ব্ল্যাকবোর্ড না, আমাকে চেনার কথাও না।

কেরোলিন মাথা নিচু করে বলল আমি তোমাকে চিনি। তোমার নাম এরিখ। তুমি গত কাল একটা নীল ব্লেজার পরে ক্লাসে এসেছ। তার আগের দিন ইয়েলো স্ট্রাইপের ফুলহাতা শার্ট পরেছ। তার আগের দিন সাদা জাম্পার…

আমি হতভম্ব হয়ে কেরোলিনের দিকে তাকালাম। নিজের বিস্ময়ের ধাক্কা একটু সামলে নিয়ে বললাম, ক্লাসে কোন ছাত্র কী পরে আসে তা তুমি জানো?

কেরোলিন নরম গলায় বলল, জানি।

পেপার কাপ থেকে কফি গড়িয়ে পড়ে টেবিল নষ্ট করছিল। কেরোলিন টেবিলে রাখা বইপত্র সরাতে গিয়ে সব এলোমেলো করে দিল। তার স্যান্ডউইচ এবং আপেল মেঝেতে পড়ে গেল। আমি বললাম, আমি খুবই দুঃখিত, তোমার লাঞ্চ নষ্ট করে দিয়েছি।

সে আগের মতো বলল, ইটস ওকে। ইটস ওকে।

আমি বললাম, যেহেতু তোমার দুপুরের খাবার আমি নষ্ট করেছি, রাতের ডিনারটা কি আমি কিনে দিতে পারি? Can I ask you for a date?

কেরোলিন চুপ করে রইল। আমি বললাম, তোমার যদি অন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকে তাহলে এস রাতে আমরা একসঙ্গে ডিনার করি।

কেরোলিন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

আমি বললাম, ঠিক সাতটায় তুমি কান্ট্রি কিচেন রেস্তরাঁয় চলে এসো। কান্ট্রি কিচেন চেন তো–সাউথ বুলেভার।

কেরোলিন বিড়বিড় করে বলল, আমি চিনি।

তা হলে সন্ধ্যা সাতটায় তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

আমি লাইব্রেরি থেকে চলে এলাম এবং সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নিজের ওপর খুব রাগ হতে লাগল। কেন হঠাৎ মাথায় ভূত চাপল? কেন মেয়েটাকে ডেট-এ নিতে চাচ্ছি? যে মেয়ে তার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা কে কবে কোন কাপড় পরছে তা হড়হড় করে বলে দিতে পারে তার কাছ থেকে পাঁচ শ হাত দূরে থাকা দরকার। জেনেশুনে আমি এত বড় ভুল কী করে করলাম? এমন তো না যে আমার ডেট পেতে সমস্যা হচ্ছে।

কান্ট্রি কিচেন রেস্তরাঁয় আমি সাতটার সময় উপস্থিত হলাম। কোনো মেয়েকে ডেটে ডেকে যথাসময়ে উপস্থিত না হওয়া বড় ধরনের অন্যায়। সেই অন্যায় আমি করতে পারি না। আমি ভেবেছিলাম পৌঁছেই দেখব কেরোলিন রেস্টুরেন্টের বাইরে জবুথবু হয়ে খানিকটা কুঁজো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে। মেঝের ডিজাইন জ্যামিতির কোনো সূত্রের সঙ্গে ফেলা যায় কি না তা-ই ভাবছে।

ঘটনা সে রকম হলো না।

আমি কেরোলিনকে দেখে হোঁচটের মতো খেলাম। সে খুবই সেজেগুজে এসেছে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। সুন্দর করে চুল বাঁধা। লাল স্কার্ট এবং সবুজ টপসে তাকে লাগছে ইন্দ্রাণীর মতো। এই মেয়ে যে সাজতে পারে এবং এতটা সেজে রেস্তরাঁয় আসতে পারে আমি তা কল্পনাও করি নি। আমি বললাম, কেরোলিন তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।

কেরোলিন লজ্জা পেয়ে হাসল।

আমি বললাম, তোমাকে এই পোশাকটায় চমৎকার লাগছে।

কেরোলিন ফিস করে বলল, থ্যাংক য়্যু।

ডিনার খেতে সৈতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানলাম। যেমন—

১. কেরোলিন বড় হয়েছে হোমে। তার বাবা-মা কে সে জানে না।

২. আজ যে পোশাক সে পরে এসেছে ওটা আজই কেনা হয়েছে। স্কার্ট টপস এবং জুতা কিনতে লেগেছে তিন শ এগারো ডলার।

৩. আজ সে জীবনের প্রথম ডেটে এসেছে। তাকে কখনো কোনো ছেলে ডেটে আসার জন্যে নিমন্ত্রণ করে নি।

৪. পড়াশোনা করতে তার একেবারেই ভালো লাগে না। কিছু করার নেই বলেই সে পড়াশোনা করে। যদি কিছু করার থাকত তা হলে অবশ্যই পড়াশোনা করত না।

৫. তার সঙ্গে আমার মতো Softly কোনো ছেলে এর আগে কথা বলে নি।

আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। ডিনারের মাঝামাঝি এসে আমার মনে হলো, এই মেয়েটি সারাক্ষণ আমার চোখের সামনে না থাকলে আমি বাঁচব না। আমি আমার বাকি জীবন এই মেয়েটির লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারব। আমি পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী মেয়েটি যেন আমার সামনে বসে আছে। যেন তাকে আমি শুধু আজ রাতের ডিনারের সময়টুকুর জন্যে পেয়েছি। ডিনার শেষ হলে সে চলে যাবে। আর তাকে পাব না।

এরিখ দম নেবার জন্যে থামল। আমি বললাম, এ পৃথিবী একবার পায় তাকে, কোনোদিন পায় নাকো আর।

এরিখ বলল, তার মানে?

আমি হাসতে হাসতে বললাম, তোমার অবস্থার কথা ভেবেই হয়তো আমাদের দেশের এক বাঙালি কবি এই লাইনগুলি লিখেছিলেন।

কবির নাম কী?

কবির নাম জীবনানন্দ দাশ।

তুমি অবশ্যই সেই কবিকে আমার এপ্রিসিয়েশন পৌঁছে দেবে।

তিনি জীবিত নেই। কবিতার লাইনগুলি তাঁর জন্যও প্রযোজ্য হয়ে গেছে। যাই হোক তুমি গল্প শেষ করো। আমার ধারণা সেই রাতেই তুমি মেয়েটিকে প্রপোজ কর।

তোমার ধারণা এক শ ভাগ সত্যি। আমেরিকান ছেলেরা মাঝেমধ্যে খুব নাটকীয় কায়দায় প্রপোজ করে। যেমন মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বসে। দু হাত মুঠো কয়ে প্রার্থনার ভঙ্গি করে বলে, আমি তোমাকে আমার জীবনসঙ্গিনী হবার জন্যে প্রার্থনা করছি।

তুমি তা-ই করলে?

হ্যাঁ। ডিনার শেষ করেই তা-ই করলাম। কেরোলিনের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। আমাদের চারদিকে লোক জমে গেল। হাততালি পড়তে লাগল। এবং কান্ট্রি কিচেন রেস্তরাঁর মালিক রবার্ট উঁচুগলায় বলল–এই আনন্দময় ঘটনা স্মরণীয় করে রাখার জন্যে কান্ট্রি কিচেনে উপস্থিত সবাই এক গ্লাস করে ফ্রি রেডওয়াইন পাবে। আনন্দের একটা জোয়ার শুরু হয়ে গেল।

তোমরা পরদিন বিয়ে করলে?

আমেরিকায় হুট করে বিয়ে করা যায় না। বিয়ের লাইসেন্স করতে হয়। সেই লাইসেন্সের জন্যে ডাক্তারি পরীক্ষা লাগে। আমরা ঠিক এক মাস দশ দিনের মাথায় বিয়ে করলাম। বিয়ে মানেই বিরাট ঘটনা। আমার জন্যে তা ছিল অস্তিত্ব ভুলিয়ে দেবার মতো ঘটনা। আমার আনন্দের সীমা রইল না। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করত হ্যান্ডমাইক নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ি, সবাইকে বলি হ্যালো হ্যালো কেরোলিন নামের মেয়েটি আমার। শুধুই আমার। মাঝে মাঝে রাতে ঘড়িতে এ্যালার্ম দিয়ে রাখতাম। ঘুম ভাঙলে কী করতাম জানো? কেরোলিনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তার ঘুম ভাঙাতাম না। শুধুমাত্র তার দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যে জেগে থাকতাম। আমার পাগলামির গল্প কেমন লাগছে?

ভালো লাগছে। কেরোলিনকে দেখতে ইচ্ছা করছে।

আমার কাছে তার ছবি আছে। গল্পটা শেষ হোক তোমাকে দেখাব।

থ্যাংক য়্যু।

আমার পাগলামি দেখে কেরোলিন খুব হাসলেও সে নিজেও কিন্তু কম পাগলামি করে নি। যেমন ধরো সে ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিল। তার মতো ছাত্রী পড়াশোনা ছাড়তে পারে এটা ভাবাই যায় না। তার যুক্তি হচ্ছে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে সে আমার দিকে নজর দিতে পারবে না। এটা তার পক্ষে সম্ভব না। তার কাছে আমি ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুই গুরুত্বহীন। তার বিষয়ে খুব মজার ব্যাপার আছে। সেটা বলছি। প্লিজ হাসতে পারবে না।

তুমি নিশ্চিত থাকো আমি হাসব না।

ও ঘুমাত খুব অদ্ভুত ভঙ্গিতে। সে তার পা দিয়ে আমায় পা পেঁচিয়ে একটা গিট্টুর মতো করে ফেলত। হা-হা-হা।

মজার তো।

আমি তার নাম দিয়েছিলাম Princess Knot.

বাংলা ভাষায় এটা হবে গিট্টু কুমারী। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে— তোমরা আমেরিকার সবচেয়ে সুখী দম্পতি।

শুধু আমেরিকায় বলছ কেন? আমরা ছিলাম এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী স্বামী-স্ত্রী।

ছিলাম মানে? কেরোলিন কোথায়?

বিয়ের দু বছরের মাথায় সে মারা যায়।

আই অ্যাম সরি।

বিয়ের এক বছর আট মাসের দিন তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। খারাপ ধরনের স্নায়ুতন্ত্রের ক্যান্সার। কী কষ্ট যে সে করেছে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না! শেষের দিকে এমন হলো আমি চার্চে গিয়ে বলতে বাধ্য হলাম, হে ঈশ্বর তুমি কেরোলিনের প্রতি করুণা করো। যেখানে থেকে সে এই পৃথিবীতে এসেছে তাকে সেখানে নিয়ে যাও। রোগযন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দাও। রোগটা তার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে গেল। সে কাউকে চিনতে পারত না। আমাকেও না। তার কাছে গিয়ে কেরোলিন কেরোলিন বলে ডাকলে সে শুধু চোখ তুলে তাকাত, সেই দৃষ্টিতে পরিচয়ের আভাস মাত্র থাকত না।

এরিখ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, আহমেদ আমার গল্প শেষ হয়েছে। এখন ভালো করে কফি বানাও। কফি খেয়ে শুয়ে পড়ব। ঘুম পাচ্ছে।

আমি বললাম, লুপ্ত প্রাচীন লিপির ব্যাপারটা কিন্তু এখনো আসে নি।

এরিখ বলল, যে লিপির কথা বলছি ওটা কেরোলিনের লেখা। মৃত্যুর দুদিন আগে ইশারায় জানালো সে কিছু লিখতে চায়। আমি তাকে কাগজ-কলম দিলাম। সে সারা দিন শুয়ে শুয়ে লিখল। সন্ধ্যাবেলা লেখা শেষ হলো। আমাকে লেখা কাগজটা দিয়ে কোথায় চলে গেল। তার দুদিন পর তার মৃত্যু হয়।

সাঙ্কেতিক ভাষায় লেখা কোনো চিঠি?

হ্যাঁ।

সাঙ্কেতিক ভাষায় লেখার দরকার পড়ল কেন?

আহমেদ সে-ই তো আমি বলতে পারব না। ক্যান্সারের আক্রমণে তার মস্তিষ্ক এ্যাফেকটেড হয়েছিল, তার কারণে হতে পারে। কিংবা অন্য কিছুও হতে পারে। লিপির পাঠোদ্ধার করা গেলেই ব্যাপারটা জানা যাবে। কিংবা এমনও হতে পারে যে, এটা আসলে কোনো লিপিটিপি নয়। কাগজে আঁকাবুকি কাটা। কেরোলিন আমাকে দিয়ে গেছে যেন এই লেখার রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে আমার জীবন কেটে যায়। আমি তাকে হারানোর কষ্ট ভুলে থাকতে পারি। কেরোলিন মারা গেছে একুশ বছর আগে। এই একুশ বছর ধরে আমি চিঠিটার রহস্য উদ্ধার করার চেষ্টা করছি। মানুষ ক্লান্ত হয়, আমি ক্লান্ত হই না। কেন ক্লান্ত হই না বলো তো?

বলতে পারছি না।

ক্লান্ত হই না। কারণ, আমার মনে হয় কেরোলিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে লাজুক ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে আমি তার রহস্য ভাঙ্গার চেষ্টা করছি কি না। হাল ছেড়ে দিচ্ছি কি না।

তুমি আর বিয়ে করো নি?

না, বিয়ে করি নি

আমি বললাম, যদি কখনো তুমি এই সাঙ্কেতিক লিপির অর্থ বের করতে পারো তা হলে কি আমাকে জানাবে? কী লেখা আছে আমি জানতে চাচ্ছি না, আমি শুধু জানতে চাই তোমার সাধনা সফল হয়েছে। তুমি সঙ্কেতের অর্থ ধরতে পেরেছ।

এরিখ বলল, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি তুমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো আমি যদি পাঠোদ্ধার করতে পারি তুমি তা জানবে।

পিএইচ. ডি. ডিগ্রি নিয়ে আমি দেশে ফিরি ১৯৮৪ সালে। দশ বছর একনাগাড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করি। লেখালেখির ব্যস্ততা খুব বেড়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করি। ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। ইউনিভার্সিটির ঠিকানায় চিঠিপত্র জমা হয়— আমি আনতে যাই না। গত ফেব্রুয়ারি মাসে পেনশনসংক্রান্ত জটিলতার জন্যে ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছি। দেখি কয়েক বছরের চার-পাঁচ শ চিঠি। বিদেশ থেকে আসা চিঠিগুলি আলাদা করে বাসায় নিয়ে এলাম। একটি চিঠি এসেছে এরিখ স্যামসনের আইনজীবীর কাছ থেকে। আইনজীবী জানাচ্ছেন— তাঁর ক্লায়েন্ট এরিখ স্যামসন নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন। ক্লায়েন্টের নির্দেশমতো আমাকে জানাচ্ছেন যে, এরিখ স্যামসন মৃত্যুশয্যায় লিপির পাঠোদ্ধার করেছেন।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot resmi
  • situs hk pools
  • desabet
  • slot gacor
  • slot hoki
  • desabet
  • desabet
  • ayamjp
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs judi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs togel
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • togel
  • kuda hoki
  • desabet