জালটাকা – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

জালটাকা - ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

বাচ্চু-বিচ্ছুদের পাড়ায় একটি মিষ্টির দোকান আছে। দোকানদারের নাম খাঁদু বলে দোকানটির নামও হয়েছে খাদু ময়রা’র দোকান। রোজ সকালবেলা সেই দোকান থেকে গরম জিলিপি আর শিঙারা কিনতে খন্দেরের বেশ ভিড় হয়। রোজের মতোই সেদিনও সকালে বাচ্চু-বিচ্ছু গেল সেই দোকানে জিলিপি আর শিঙারা কিনতে।

এমন সময় ওরা দেখল দোকানের অদূরে মোড়ের মাথায় একটি ছোটখাটো ভিড় হয়েছে। আর সেই ভিড়ের ভেতরে পাড়ার লোকদের নানারকম জটলা হচ্ছে।

খাদু ময়রা দোকানে বসে হাঁ করে চেয়ে আছে সেই ভিড়ের দিকে। একে তো মোটা বেঢপ চেহারা খাঁদুর। তার ওপর ওই রকম হাঁ করে চেয়ে থাকার জন্যে তাকে বেশ দেখতে লাগছিল।

বাচ্চু ফিসফিস করে বিচ্ছুকে বলল, “আমার ইচ্ছে করছে একটা পানতুয়া গামলা থেকে তুলে নিয়ে খাদু ময়রার মুখের ভেতর ফেলে দিই।”

বিচ্ছু বলল, “যা বলেছিস। মনে হচ্ছে যেন একটা কাতলা মাছ হা করে আছে।”

খাদু সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে এমনই তন্ময় হয়ে ছিল যে বাচ্চু-বিচ্ছুর উপস্থিতিটা টেরও পেল না।

বাচ্চু বলল, “আমাদের জিলিপি, শিঙারাটা দিয়ে দাও না খাদুদা।”

খাদু উত্তরই দিল না। হাঁ করে চেয়েই রইল।

বিচ্ছু বিরক্ত হয়ে বলল, “কী গো দেবে তো? না কি চলে যাব?”

চলে যাওয়ার ব্যাপারে খাদু খুব সজাগ। এবার তৎপর হয়ে বলল, “তোরা এত ব্যস্ত কেন? দিচ্ছি। দাড়া না।” বলে শালপাতার ঠোঙায় জিলিপি তুলতে তুলতে বলল, “কত দেব? দুটাকার?”

বাচ্চুু বলল, “রোজই তো দাও। আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?”

বিচ্ছু বলল, “ওখানে অত ভিড় কেন গো খাদুদা?”

খাদু সে-কথার উত্তরও না দিয়ে ঠোঙা মুড়তে লাগল।

বাচ্চু বলল, “কোথাও চুরি হয়েছে নাকি?”

খাদু ময়রা একটু গম্ভীর গলায় বলল, “সব তাতেই তোদের এত খোজ কেন রে? যা পালা।”

বাচ্চু বলল, “বাঃ রে। কিছু একটা হয়েছে বলেই তো এত ভিড়। পাড়ার ভেতর কী হচ্ছে না হচ্ছে জানব না?”

“না। ছোটদের সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে নেই।”

বাচ্চু-বিচ্ছুর কিন্তু কৌতুহলের নিবৃত্তি হল না খাদু ময়রার কথায়। ওরা দোকান থেকে বেরিয়ে এসে উৎসাহের সঙ্গে ভিড়ের দিকে এগোল। কিন্তু কাকেই বা জিজ্ঞেস করে? সবাই তো যে যার নিজের তালে ব্যস্ত। এমন সময় চৌধুরীবাগানের প্রভাতদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের।

বাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে গো প্রভাতদা?”

“সে কী ! তোমাদের পাড়ার ব্যাপার অথচ তোমরাই জান না ?”

“না। এই তো আসছি আমরা।”

“রায়দার বাড়িতে চুরি হয়ে গেছে।”

“তাই নাকি? কখন?”

“কাল রাত্রে।”

রায়দা অর্থাৎ রায়বাবু। এ পাড়ার বেশ নামকরা লোক। ভাল নাম কালাচাঁদ রায়। রাস্তা দিয়ে যখন যান তখন মনে হয় যেন একটা তেলের পিপের পা গজিয়েছে আর সেটা চলে চলে যাচ্ছে। অত্যন্ত কৃপণ এবং সেয়ানা লোক এই রায়বাবু আজ পর্যন্ত পাড়ার ছেলেরা কেউ সদর দরজা পেরিয়ে যার ঘরে ঢুকতে পারেনি, সেই রায়বাবুর বাড়িতে চুরি! এ যেন ভাবাও যায় না।

ভাবা যাক বা না যাক উকিলবাবুদের রকে পাড়ার নামকরা ক্ষুদে মস্তান রতন দাঁড়িয়েছিল। বাচ্চু-বিচ্ছুকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল সে, “এই তো, চোর পালাতে না পালাতে গোয়েন্দা এসে গেছে।”

বিচ্ছু বলল,“কী হয়েছেরে রতস?”

“শুনিসনি?”

বিচ্ছু বলল, “না। এই তো আসছি ভিড় দেখে।”

রতন বলল, “রায়বাবুর বাড়িতে সেই যে বনমালি নামে কাজের লোকটা ছিল, সে ব্যাটা কাল রায়বাবুর বউয়ের সমস্ত গয়নাগাটি নিয়ে চম্পট দিয়েছে।”

বাচ্চু বলল, “সত্যি?”

রতন বলল, “হ্যাঁ রে। কাল দুপুরবেলা চুরি হয়েছে। ব্যাটাকে অ্যায়সা মার দিয়েছে রায়বাবু যে টের পেয়ে গেছে বাছাধন। কিন্তু জিনিসগুলো পাওয়া যায়নি।”

বিচ্ছু বলল, “তাই নাকি?”

“হ্যাঁ। ব্যাটাকে বেশটি করে পিটিয়ে ঘরে আটক করে থানায় খবর দিতে গেছে রায়বাবু! সেই ফাঁকে পালিয়েছে।”

বাচ্চুু বলল, “ব্যাপারটা খুব গোলমেলে এবং অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে আমার।”

রতন বলল, “তোরা তো সব কিছুতেই গোলমাল দেখিস। আর সবই তোদের কাছে অবিশ্বাস্য।”

বিচ্ছু বলল, “আমি কিন্তু বনমালিকে খুব ভাল ছেলে বলেই জানতাম।”

“ভাল না ছাই! ভালর গুণ তো বেরুল এবার।”

বাচ্চুু বলল, “আচ্ছা জিনিসগুলো যখন পাওয়া গেল না তখন চুরি যে ও-ই করেছে তার কী প্রমাণ?”

“ও ছাড়া কে করবে শুনি? ওদের বাড়ি আর কোনও কাজের লোক আছে?”

“তা না থাকুক। হাতে নাতে না ধরে শুধু সন্দেহ করে কাউকে মারধোর করাটা উচিত নয়। কিন্তু আটক অবস্থায় বনমালি পালাল কী করে?”

“দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল তো। ঘরের কোণে বঁটি ছিল, তাইতে কেটে পালিয়েছে। চুরি না করলে কেউ পালায়?”

“মারের ভয়েও পালায় ৷”

রতন এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “যা যাঃ। বেশি দালালি করিস না। হিম্মত থাকে তো প্রমাণ কর না, আসল চোরকে ধরিয়ে দে।”

বাচ্চু বলল, “কী আশ্চর্য! আমরা কি বলছি যে ও চুরি করেনি? করতে পারে, নাও তো পারে?”

“কাজে বকিস না, যা।”

বাচ্চু-বিচ্ছু আর দাঁড়াল না সেখানে। জিলিপি শিঙারা নিয়ে বাড়ি চলে এল। বনমালির ব্যাপারটা ওদের দু’জনকে ভাবিয়ে তুলল বেশ।

বিকেলবেলা ওরা যখন রোজকার মতো মিত্তিরদের বাগানে খেলতে গেল তখন এক মজার ব্যাপার ঘটল সেখানে। বাবলু, বিলু, ভোম্বল, বাচ্চুু, বিচ্ছু সবাই যখন এক সঙ্গে হয়েছে তেমন সময় বাগানের ভেতরে একটি আম গাছের গোড়া থেকে পঞ্চুর ভৌ ভৌ ডাক শুনতে পেল ওরা।

বাচ্চুু-বিচ্ছু সবে বনমালির প্রসঙ্গটা বাবলুর কাছে বলতে যাবে মনে করছে এমন সময় পঞ্চুর এই ডাক।

বাবলু বলল, “ভোম্বল, একবার গিয়ে দেখে আয় তো কী ব্যাপার!”

বলা মাত্রই ভোম্বল ছুটল সেদিকে। তারপর গাছতলায় গিয়ে গাছের দিকে তাকিয়েই বাবলুকে ডাকল, “বাবলু এদিকে আয়। একটা জিনিস দেখে যা।”

ভোম্বলের ডাকে শুধু বাবলু নয়, বিলু, বাচ্চুু, বিচ্ছু সবাই ছুটল।

ওরা গিয়ে দেখল আমগাছের ডালে চোঙা প্যান্ট আর ডোরাকাটা গেঞ্জি পরা একটি ছিটিয়াল গোছের লোক মনের আনন্দে ডাল ধরে নেচে নেচে আম খাচ্ছে। লোকটাকে দেখলেই মনে হয় মাথায় রীতিমতো ছিট আছে। পঞ্চুু ওকে যত ভৌ ভৌ করে তড়পাচ্ছে, লোকটাও ততই ওটা যেন একটা মজার ব্যাপার এমন ভাব দেখিয়ে ভেংচাচ্ছে।”

পঞ্চু ডাকছে, “ভৌ।”

লোকটা করছে, “ভেঁউ।”

ভোম্বল বলল, “কারবার দেখ।”

বাবলু নীচ থেকে ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই! কে তুমি!”

লোকটি বলল, “আমি চোর।”

বাবলু রেগে বলল, “নেমে এসো বলছি।”

লোকটি বলল, “তোমার কথায় নাকি? এঃ আমার যখন সময় হবে তখন নামব।”

বিলু বলল, “গাছ থেকে পড়ে কি হাত পা ভাঙবে? কাকে বলে গাছে উঠেছ?”

লোকটি বলল, “কাকে আবার বলব? পোড়ো বাগানের গাছ কি কারও একার নাকি?”

বাবলু বলল, “আমরা সব সময় এই বাগানকে নজরে রাখি। কাজেই বাগান পোড়ো হোক, আর যাই হোক, এই বাগানের গাছপালায় উঠলে আমাদের অনুমতি নিতে হবে।”

লোকটি তেমনিই নেচে নেচে বলল, “তাই নাকি? তা হলে এই দেখ।” বলে গাছের ডাল থেকে একটা লাথি দেখাল।

বিলু বলল, “দাঁড়াও ব্যাটা তোমার পাগলামি এখুনি সারিয়ে দিচ্ছি।” বলেই গুলতিটা বার করে যেই না তাগ করতে যাবে লোকটি অমনি গাছের ডাল থেকে উলটোদিকে লাফিয়ে দৌড় দৌড় দৌড়।”

কিন্তু যাবে কোথায় বাছাধন?

পঞ্চুও ছুটল তার পিছু পিছু।

সেই সঙ্গে বাবলুরাও।

খানিকটা ছোটার পর এক জায়গায় গিয়ে দেখল লোকটাকে ধরে ফেলেছে পঞ্চু। লোকটি ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। আর পঞ্চু যা কখনও করেনি তাই করে বসে আছে অর্থাৎ সামনের দুটো পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে লোকটিকে।

বাবলুদের দেখেই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল লোকটি।

লোকটি বলল, “আমার ঘাট হয়েছে ভাই। আর কখনও আমি এ বাগানে ঢুকব না। দয়া করে কুকুরটাকে ছাড়িয়ে নাও।”

“এই নাক-কান মলছি।”

ভোম্বল বলল, “তা হলে দশবার কান ধরে ওঠ বোস করো। করে বিদেয় হও।”

লোকটি অত্যন্ত বাধ্য লোকের মতো বলল, “দশবার? আমি বিশ বার করতে রাজি আছি। কুকুরটাকে সরাও আগে।”

বাবলু বলল, “পঞ্চুু, ছেড়ে দে ওকে।”

বাবলুর আদেশ পেয়ে পঞ্চুু লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে চলে এল।

লোকটি জোকারের মতো এক বিচিত্র ভঙ্গিতে দুহাতে দুটি কান ধরে ওঠা বসা শুরু করল। বার দুই তিন করতেই বাবলু বলল, “থাক হয়েছে। এবার স্বস্থানে প্রস্থান করো।”

ছাড়া পেয়ে খুব খুশি হয়ে লোকটি নাচতে নাচতে চলে গেল। তারপর কিছু দূরে গিয়ে কী ভেবে যেন থমকে দাঁড়িয়ে বাবলুদের ডাকল, “এই ছেলেগুলো শোন।”

বাবলুরা চলে আসছিল। লোকটির ডাকে পিছু ফিরে তাকাল।

লোকটি দূর থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে জিভ দেখাল। তারপর মুখটাকে বিশ্রীরকম ভেংচে কিল চড় দেখিয়ে পা তুলে কয়েকটা লাথি দেখাল। তারপর বলল, আমড়ার আঁটি খা মুখপোড়া ছেলেমেয়ে’ বলে মার টেনে দৌড়।

লোকটির পাগলামি দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল বাবলুরা। তারপর আবার বাগানের ভেতর দিয়ে সেই পোড়ো বাড়ির আস্তানার দিকে চলল ওরা।

যেতে যেতে বাচ্চু বলল, “জান বাবলুদা, আজ একটা কাণ্ড হয়েছে। আমাদের বাড়ির কাছে রায়বাবু নামে এক ভদ্রলোক আছে জান তো?”

“হ্যাঁ জানি। বেশ গোলগাল চেহারা। অনেকে লোকটিকে তেলের পিপেও বলে। রেলে না কোথায় যেন চাকরি করেন ভদ্রলোক।”

“আগে করতেন। এখন ব্যবসা করেন। ক্যানিং স্ট্রিটে দোকান আছে।”

“বুঝলাম।”

“ওই ভদ্রলোকের বাড়িতে বনমালি নামে একটা চাকর ছিল। সে নাকি চুরি করে পালিয়েছে। চুরিটাও অদ্ভুত রকমের। কোনও প্রমাণ নেই। যেহেতু বাড়ির চাকর, সেই হেতু সন্দেহ! দুপুরবেলা বাড়িতে খেতে এসে রায়বাবু বুঝতে পারেন, চুরি হয়েছে। তখন তিনি বনমালিকে ধরেন। কিন্তু সে কিছু বলতে না পারায় তাকে তিনি প্রচণ্ড মারধোর করেন। তারপর তাকে ঘরে বেঁধে রেখে থানায় খবর দিতে যান। এসে দেখেন বাঁধন খুলে পাখি ফুরুত। আজ সকালে তাই নিয়ে জটলা হচ্ছিল পাড়ায়।”

বিলু বলল, “এ একটা মাথামুণ্ডুহীন ব্যাপার।”

বাবলু বলল, “শুধু তাই নয়, মনে হচ্ছে যেন ছেলেভুলনো গল্প। দিন দুপুরে একজন ধৃতচোর বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল অথচ কেউ টের পেল না? তা ছাড়া যাকে বেঁধে রেখে যাবে তাকে তো ঘরে শিকল দিয়েও যাবে। বিশেষ করে পাড়ায় এত লোকজন আছে কেউ কিছুই জানল না অথচ…।”

ভোম্বল বলল, “তা ছাড়া বনমালিকে আমি দেখেছি। ওকে ওরকম চোর-চোট্টা বলে মনে হয় না।”

বাবলু বলল, “এই রহস্যটা একটু উন্মোচন করার চেষ্টা করলে হয়। এতবড় একখানা গাঁজাখুরি খবর যখন প্রচার করার চেষ্টা হচ্ছে তখন নিশ্চয়ই এর ভেতর বিরাট কিছু আছে।”

ভোম্বল বলল, “বনমালিকে খুঁজে বার করার একটা রাস্তা আছে।”

বাবলু বলল, “কীরকম!”

ভোম্বল বলল, “আমি যতদূর জানি কেউ কোথাও নেই ওর। সুতরাং যদি সে পলাতকও হয় তা হলেও দেশের দিকে পালানোর সম্ভবনা খুব একটা নেই।”

“দেশ কোথায় ওর?”

“ওড়িশায়।”

“তা হলে কোথায় যেতে পারে?”

“ওর একমাত্র যাবার জায়গা হল চারাবাগানে ওদের দেশের লোকের বস্তিতে।”

বিলু বলল, “কিন্তু আমার মনে হয় সেখানে ও যাবে না। কেন না আজকের দিনে হঠাৎ পালিয়ে গিয়ে কোথাও আশ্রয় পাওয়াটা বড় সহজ ব্যাপার নয়।”

বাবলু বলল, “ইউ আর রাইট! সে যদি সত্যিই পলাতক হয় তা হলে এইখানে কাছে পিঠেই কোথাও লুকিয়ে থাকবে। একটু কড়া নজর রাখলেই পেয়ে যাব তাকে।”

এমন সময় হঠাৎ ভাঙা বাড়ির ভেতর থেকে পঞ্চুুর ভৌ-ভৌ ডাক ভেসে এল। ওরা তাড়াতাড়ি ছুটল সেদিকে। বাবলু দেখল পঞ্চুু ঘরের ভেতর অনবরত কী যেন শুকে শুকে বেড়াচ্ছে আর রাগে গরগর করছে। বাবলু এক জায়গায় হেঁট হয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখল, সেখানে একটু আলুর দমের কাই পড়ে আছে, আর দুটো পোড়া বিড়ি।

পঞ্চুু এবার মাটি শুকে শুকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল। বাবলুও অনুসরণ করল পঞ্চুুকে। কয়েক ধাপ ওঠার পরই বাবলু হঠাৎ দেখল এককোণে একটা ছেড়া নোটবুক পড়ে আছে। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে কয়েকটা নাম পড়ে ফেলল বাবলু ইউনিস বৈজনাথ সিং’। ‘শিবপুর বি ই কলেজ রোড”। এক পাতার লেখা আছে ক্ষতি চার হাজার টাকা। নোট বইটা পকেটে নিয়ে ওপরে উঠে আরও অনেক কিছু দেখতে পেল বাবলু।

ততক্ষণে বিলু, ভোম্বল, বাচ্চুু, বিচ্ছুরাও এসে গেছে। ওপরে দেখা গেল কয়েকটি শালপাতা পড়ে আছে। কিছু মুড়ি ছড়ানো আছে। এক জায়গায় পড়ে আছে আলুর দমের কাই লাগা একটি ভাড়। আর কিছু বিড়ি ও সিগারেটের অবশেষ।

বাবলু বলল, “বেশ রীতিমতো সাসপেন্সের ব্যাপার তো।”

ভোম্বল বলল, “আবার কি এটা হানাবাড়ি হতে চলল নাকি রে?”

বিলু বলল, “বিচিত্র কিছুই নয়। নিশিকুটুম্বরা এর চেয়ে ভাল এবং নিরাপদ জায়গা আর কোথায় পাবে বল?”

বাচ্চু বলল, “আচ্ছা, বনমালিও তো এখানে আসতে পারে?”

বাবলু বলল, “বিচিত্র কিছুই নয়। তবে বিভিন্ন রকমের বিড়ি-সিগারেটের টুকরো দেখে মনে হয় একাধিক ব্যক্তির আগমন হয়েছে এখানে।”
বিচ্ছু বলল, “তা হলে ?”

“তা হলে অনেক দিনের পর আজ রাত্রিবেলা আবার আমরা পাঁচজনে গোপনে এখানে আসছি।”

বিলু বলল, “হ্যাঁ। আজ রাত্রেই আমাদের আসতে হবে।”

এর পর সকলে গম্ভীর মুখে যে যার বাড়ির দিকে চলে গেল।

রাত্রিবেলা যথাসময়ে সকলে সেই ভাঙা বাড়িতে রহস্য উদ্ধার করতে চলল। চারদিক ঘন অন্ধকারে ঢাকা। সেই অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে পথ দেখে দেখে ওরা বাগানের ভাঙা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখল একটা কালো রঙের অ্যামবাসাডার এক কোণে চালকহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

বাবলু প্রত্যেককে সতর্ক করে আলো না জেলে খুব সন্তৰ্পণে হাত ধরাধরি করে ভাঙা বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছুল। রাতের অন্ধকারে থমথম করছে বাড়িটা। কারও আবির্ভাবের কোনওরকম অস্তিত্বই টের পাওয়া গেল না। তবুও বাবলু, বাচ্চুু-বিচু আর পঞ্চুুকে নীচে রেখে বিলু ভোম্বলকে নিয়ে সন্তৰ্পণে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল ওপর দিকে।

একটু ওঠার পরই ক্ষীণ একটু আলোর রেখা ওদের নজরে পড়ল। বাবলু চাপা গলায় বলল, “খুব সাবধান।” বলে পা টিপে টিপে ওপরে উঠল। বিলু ভোম্বলও উঠে এল। উঠে এসেই অবাক হয়ে গেল ওরা। দেখল পাঁচজন লোক এক জায়গায় বসে বুকে পড়ে ফিসফিস করে কী যেন আলোচনা করছে।

মোমবাতির শিখাটা কাঁপছে। তাই ওদের মুখগুলো ভাল বোঝা যাচ্ছে না। এক পাশে একটি এয়ার ব্যাগ পড়ে আছে। এমন সময় ছাদের ওপর দিকের অর্ধভগ্ন একটি ঘরের ভেতর থেকে একজন দাঁড়িওয়ালা লোক এসে কী যেন বলল ওদের।

বাবলুরা সবই দেখল। দেখেও এক পাশে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে রইল। দাঁড়িওয়ালার ডাকে বসে থাকা লোকগুলোর সবাই এক এক করে উঠে গেল এবং সেই ঘরের ভেতর গিয়ে ঢুকল।

বাবলু তখন সাহস করে উঠে এল ছাদে। তারপর সেই ভাঙা ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে ভেতরের দিকে উকি মারল।

লোকগুলো তখন ঘরের মেঝেয় ঝুঁকে পড়ে এক গাদা নোটের বাণ্ডিল ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বাবলু জানলার কাছ থেকে সরে এল একবার। তারপর ছাদের ওপর পড়ে থাকা সেই এয়ার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বিলু আর ভোম্বলকে ইশারা করে খুবই সন্তৰ্পণে নেমে এল নীচে।

বিলু বলল, “কী আছেরে বাবলু এতে?”

“কী করে জানব? এখানে আর দেখাদেখি নয়। একেবারে ঘরে গিয়ে খুলব। তারপর জমা দেব থানায়।”

বাচ্চু-বিচ্ছু আর পঞ্চু নীচে ছিল। বাবলুদের নামতে দেখে বাচ্চুু বলল, “কী খবর বাবলুদা?”

বাবলু বলল, “এখন স্পিকটি নট।” বলে ভাঙা বাড়ির বাইরে এসে টর্চ জ্বালল। টর্চের আলোয় পথ দেখে সকলেই এগিয়ে চলল অ্যামবাসাডারটার দিকে। রহস্যময় কালো অ্যামবাসাডার। পাঁচজনেই থমকে দাঁড়াল সেখানে গিয়ে।

বাবলু একবার টর্চ ফেলে ভেতরটা দেখে নিল ভালভাবে। ভোম্বল বলল, “কেউ তো নেই দেখছি।”

বিলু বলল, “থাকবে কোথা থেকে। সব ব্যাটা ওপরে গিয়ে জুটেছে।”

বিচ্ছু বলল, “এখন কর্তব্য।”

বাবলু বলল, “এই গাড়িতে করেই একেবারে ওদের ঘাঁটিতে গিয়ে হাজির হব আমরা।”

বিলু বলল, “অসম্ভব। হাতেনাতে ধরা পড়ে যাব তা হলে।”

ভোম্বল বলল, “তা ছাড়া যাবই বা কী করে।”

বাবলু বলল, “গাড়ির পিছনে মাল রাখার যে জায়গাটা আছে তার ভেতরেই ঢুকে বসে থাকব আমরা।”

বিলু বলল, “তা না হয় হল কিন্তু ডালা বন্ধ থাকলে বেরোবি কী করে?”

“ভেতরে ঢুকে ডালটা একটু ফাঁক করে রাখব।”

“সবাইকে ধরবে এতে?”

“না। আমি আর পঞ্চু যাব। তোরা সবাই ঘরে ফিরে যা। কাল সকালের ভেতরে না ফিরলে থানায় খবর দিবি। এয়ার ব্যাগটা বিলুর কাছে থাকবে।”

বিলু বলল, “যা ভাল বুঝিস কর।”

বাবলু আর কথা না বলে হাতল ঘুরিয়ে ডালাটা তুলল। তুলেই অবাক হয়ে গেল বাবলু। দেখল হাত পা বাঁধা কে যেন একজন শুয়ে আছে ভেতরে, “কে? কে ওখানে?”

“আ-আমি। আমাকে বাঁচাও !”

বাবলু সঙ্গে সঙ্গে তার বাঁধন মুক্ত করে বার করে আনল তাকে।

যে বেরিয়ে এল তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল সকলেই। সে আর কেউ নয়। বনমালি।

“এ কী! বনমালি তুই?”

বনমালি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বলছি বলছি। সব বলছি। আগে তোমরা আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলো এখান থেকে৷”

বাবলু বলল, “সেই ভাল। এখন কেটে পড়া যাক। তোকে যে উদ্ধার করতে পারলাম এটাই আমাদের মস্ত গৌরব। ওদের ব্যবস্থা পরে হবে।” এই বলে ডালাটা নামিয়ে এঁটে দিয়ে চলে গেল সকলে।

অপ্রত্যাশিতভাবে বনমালি উদ্ধার হয়ে গেল।

পরদিন বনমালি সব কথা খুলে বলল ওদের।

“মিথ্যে কথা। আমি মোটেই পালাইনি। আমাকে গুম করা হয়েছিল। তোমরাই তো উদ্ধার করলে আমাকে।”

বাবলু বলল, “হু।”

বনমালি বলল, “রায়বাবুকে তোমরা ভাল লোক বলেই জান। কিন্তু আসলে ওর মতো শয়তান আর দুটি নেই। আমিই কী জানতাম। পরে জানতে পারলাম, মাটির তলার ঘরে বসে ওরা জাল নোট তৈরি করে। একদিন বাবুর সঙ্গে দলের লোকেদের এই নিয়ে খুব ঝগড়া হচ্ছিল। আমি সব শুনে ফেলি। ঝগড়া থামলে বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করল আমাদের কথা তুই কী শুনেছিস বল? আমি যা শুনেছি তাই বললাম। বাবু বলল, এসব কথা কাউকে বলবি না বুঝলি? আমি কোনও উত্তর দিলাম না। তারপর বাবু হঠাৎ রাত্রিবেলা দলবল নিয়ে আমার হাত-পা বেঁধে আমাকে মোটরে করে কোথায় নিয়ে গেল।”

বাবলু বলল, “কোথায়? কোন জায়গায়?”

“জায়গাটার নাম ঠিক জানি না, তবে বোটানিকেল গার্ডেনের পিছন দিকে। ওদের ঘাঁটিতে। যেখানে জাল নোট ছাপা হয়।”

বাবলু কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “বেশ, ঠিক আছে আজ থেকে আমাদের এখানে তুই থাকবি। কেমন? ওদের ব্যবস্থা আমরা করছি।”

বনমালি ঘাড় নাড়ল।

পরদিন সকাল হতেই বাবলু সেই এয়ার ব্যাগটা নিয়ে সোজা গিয়ে উপস্থিত হল থানায়।

বাবলুকে দেখেই ও সি বললেন, “বলো, মাস্টার পাণ্ডব দি গ্রেট। কী সমাচার?”

“একটা নতুন খবর আছে স্যার।”

“কী খবর?”

বাবলু সব খুলে বলল।

ও সি সব শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বাবলুর হাত থেকে এয়ার ব্যাগটা নিয়ে খুলে দেখলেন, ভিতরে কিছু মূল্যবান কাগজ পত্তর এবং কয়েক তাড়া বিভিন্ন ধরনের জাল নোট রয়েছে।

“কিছু সুবিধে হবে বলে মনে হয়?”

“সুবিধে হবে মানে? তবে কাল রাত্রেই যদি একবার আসতে, তা হলে আরও সুবিধে হত। যাক, এখুনই ব্যবস্থা করছি সব।” বলেই বেল বাজালেন।

বেয়ারা ঘরে ঢুকল।

“দুকাপ চা। আর শোনো, মি. চন্দ্রকে একবার ডেকে দাও।” বলতে বলতেই মি. চন্দ্র ঘরে ঢুকলেন। ইনি এখানকার এস আই। ও সি বললেন, “মি, চন্দ্র, আপনি এখনই ওয়ারলেস করে দিন চারদিকে। আর বলে দিন, এই মুহুর্তে এই শিল্পাঞ্চলের সমস্ত মোটর, লরি যেন আটক করা হয়। আমি ডি সি ট্রাফিককেও জানিয়ে দিচ্ছি। একটা জাল নোটের ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছি।”

বেয়ারা এসে চা দিল ও সি বাবলুকে এক কাপ চা অফার করলেন। চা খেয়ে বাবলু বলল, “তা হলে আমি চলি? ওদের ঘাটিটা কিন্তু বোটানিকেল গার্ডেনের পিছন দিকে।”

“ঠিক আছে। আমি দেখছি।”

বাবলু চলে গেল।

তারপর ঘরে গিয়ে নিজের সাইকেলটা নিয়ে বিলু, ভোম্বল, বাচ্চু আর বিচ্ছুর সঙ্গে দেখা করল। বিলু ভোম্বলেরও সাইকেল ছিল।

বাবলু বলল, “পুলিশ যাবার আগে আমরাই প্রথমে গন্তব্যস্থলে গিয়ে ঘাঁটিটা খুঁজে বার করবার চেষ্টা করি চল!”

বাবলুর প্রস্তাবে একমত হল সকলেই।

বিলুর সাইকেলে বিচ্ছু বসল। বাবলুর সাইকেলে বাচ্চু। ভোম্বলের সাইকেলের পিছন দিকে খোশমেজাজে পঞ্চু উঠে বসতেই শুরু হল অভিযান।

ঝড়ের বেগে সাইকেল চালিয়ে বোটানিকেল গার্ডেনে পৌছুল ওরা। তারপর গার্ডেনের ভিতর ঢুকতেই হা হা করে তেড়ে এল হিন্দুস্থানি দারোয়ানগুলো, “এ, কিধার যাতা? সাইকল লে কর অন্দর যানা মানা হৈ।”

কিন্তু কে কার কথা শোনে?

দারোয়ানগুলো সাইকেলের পিছু পিছু কিছুদূর ছুটে এল। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে আবার চলে গেল যে যার।

গার্ডেনের শেষ প্রান্তে সেই বিখ্যাত বট গাছের কাছে এসে হাঁফ ছাড়ল বাবলুরা। তারপর গেট পেরিয়ে বাঁদিকে সোজা এগিয়ে চলল। কিছুদূর যাবার পর একটা খালের পোল পেরিয়ে ওপারে যেতেই চাপা গলায় বলে উঠল বিলু, “বাবলু, ওই দেখ।”

বাবলু দেখল কাল রাতের সেই কালো অ্যামবাসাডারটা। কয়েকজন লোক বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তাইতে কী সব যেন তুলছে।

বাবলু বলল, “তোরা ওয়েট কর। আমি এখনই একটা ফোন করে দিয়ে আসছি থানায়। এই বলে বাচ্চুুকে সাইকেল থেকে নামিয়ে দিয়ে যেই না যেতে যাবে বাবলু, অমনি দেখে ওদের পিছনে দুজন সাক্ষাৎ যম পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন লুঙ্গিপরা মস্তান, অপরজন রায়বাবু। রায়বাবু বলল, “তোমরা এখানে কী করছ?”

“আমরা বেড়াতে এসেছি।”

“বেড়াতে এসেছ? তা থানায় ফোন করতে যাচ্ছ কেন?”

বাবলু দেখল আর লুকিয়ে লাভ নেই। ধরা যখন পড়েই গেছে তখন ডাট বজায় রাখাই ভাল। বলল, “আপনাদের পুলিশে ধরাব বলে। আপনারা জাল নোট ছাপান।”

“এ কথা তোমাদের কে বলেছে?”

“বনমালি।”

“ও। তোমরাই তা হলে কাল রাত্রে ওই ভাঙা বাড়িতে হানা দিয়েছিলে? বনমালিকে তোমরাই নিয়ে গেছ?”

“হ্যাঁ”

“যাক। ভালই হয়েছে, তোমরা হাতেনাতে ধরা পড়েছ। তবে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। পুলিশের বাবারও ক্ষমতা নেই যে আর আমাদের ধরে। আমরা আমাদের সমস্ত মালপত্তর পাচার করে দিয়েছি। সামান্য টুকটাক যা কিছু আছে তা এই গাড়িতে করে এখুনি পাচার হয়ে যাবে।”

এমন সময় দ্রুত একটা জিপ এসে থামল সেখানে। জিপের ড্রাইভারের আসন থেকে নেমে এল একজন দানবাকৃতি লোক।

রায়বাবু জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, কালনেমি?”

“খুব খারাপ খবর। আর বোধহয় পালানো যাবে না। চারদিকে গাড়ি আটক করে তল্লাশি করছে পুলিশ। হানা দিচ্ছে সর্বত্র। এখানেও এল বলে।”

বাবলু বলল, “আমরা এখানে আসবার আগে পুলিশকে সব জানিয়ে এসেছিলাম।”

রায়বাবু একটুও অবাক না হয়ে কালনেমিকে বলল, “ঘাবড়াবার কিছু নেই। তুমি আর ইউনিস এদের বেঁধে ফেল। আমার লঞ্চ রেডি আছে। এদের তোমরা লঞ্চে তোল। আমি বৈজুনাথ আর যোগীন্দরকে সাবধান করে দিই। মালপত্তর সামান্য যা আছে পড়ে থাক। এখন পালাই।” বলেই রায়বাবু সেই কালো অ্যামবাসাডারটার দিকে এগিয়ে গেল।

ইউনিস আর কালনেমি পড়ল এদের নিয়ে। বাবলু, ভোম্বল, বাচ্চু আর বিচ্ছুকে কায়দা করতে করতেই এক ফাঁকে সাইকেলটা নিয়ে কেটে পড়ল বিলু। বিলু যখন বেশ খানিকটা তফাতে তখন নজর পড়ল ইউনিসের। দেখা মাত্রই পিস্তল উচিয়ে ধরল সে। কিন্তু কালনেমি বাধা দিল। বলল, “খবরদার। অযথা ঝামেলায় জড়িয়ো না। একটি গুলিও বাজে খরচ করো না। সম্মুখে আমাদের ঘোর বিপদ।”

বিলুও চলে গেল। সেই ফাঁকে পঞ্চুও লুকিয়ে পড়ল একটা ঝোপের ভেতর।

এদিকে সকলকে সতর্ক করে রায়বাবু ফিরে এসেই অবাক হয়ে গেল, “এ কী! আর একজন কোথায় গেল?”

বাবলু বলল, “আর একজন কেটে পড়েছে।”

“হাউ ডেঞ্জারাস!”

তারপর কালনেমি আর ইউনিসকে বলল, “তোমরা দুজনে কি কাঠের পুতুল, দাঁড়িয়ে আছ? যাক, যা হবার হয়েছে। আর দেরি নয়। শিগগির পালিয়ে চলো।”

ওদিকে অন্যান্য লোকজনরাও সব ফেলে রেখে এসে জড়ো হয়েছে। সবাই তখন দুড়দাড় করে ছুটে চলল জেটির দিকে। লঞ্চে পাড়ি দিতে হবে।

পঞ্চু অসহায়ভাবে ওদের অনুসরণ করতে লাগল।

গঙ্গার ঘাটে বাঁধা ছিল একটা দোতলা লঞ্চ। ওরা সকলে তাতেই লাফিয়ে উঠল। তারপর লঞ্চের
অলক্ষ্যে লঞ্চের পিছন দিক দিয়ে পঞ্চুও নিঃশব্দে উঠে পড়ল এক সময়। সে লঞ্চের একেবারে ছাদে উঠে বসল।

গঙ্গার জল তোলপাড় করে ছুটে চলল লঞ্চ।

বাবলুরা লঞ্চের নীচের তলায় থাকলে কী হবে, ওরা বড় যা তা ছেলে নয়। খুব সহজেই ওরা পরস্পরের বাঁধন খুলে ফেলল। বাবলু বলল, “কোনও ভয় নেই। জানাজানি যখন হয়ে গেছে, তখন পুলিশ আমাদের উদ্ধার করবেই। তবে তার আগে আমরা যতটা পারি বিপদে ফেলব ওদের।”

ভোম্বল বলল, “কী করবি?”

“এনি হাউ লঞ্চটাকে ডুবিয়ে দেব!”

বিচ্ছু ভয় পেয়ে বলল, “না না, ও কাজ কোরো না। আমরা ডুবে যাব যে?”

“ভয় নেই। ভোম্বল আমি দুজনেই সাঁতার জানি। তুই ভোম্বলের পিঠে থাকবি। বাচ্চুু আমার পিঠে থাকবে। লঞ্চটাকে ছ্যাদা করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা।”

“কিন্তু ওরা যদি আমাদের দেখতে পেয়ে গুলি করে!”

“না। তা করবে না। এখন নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য একটি গুলিও বাজে খরচা করবে না ওরা।”

এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা গেল। সেই সঙ্গে শোনা গেল পঞ্চুুর ভৌ ভৌ আওয়াজ।

বাচ্চু বলল, “পঞ্চু এখানে কোথেকে এল রে?”

বাবলু বলল, “ও ঠিক শয়তানদের চোখে ধুলো দিয়ে উঠে পড়েছে।”

আবার শোনা গেল গুলির শব্দ। অন্য একটা লঞ্চ থেকে ভেসে এল শব্দটা। অমনই বাবলুদের লঞ্চ থেকেও তার প্রত্যুত্তর গেল।

বাবলু বলল, “লেগেছে। নিশ্চয়ই পুলিশে তাড়া করেছে এদের।”

ভোম্বল বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছে।”

পঞ্চু চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে যে এই লঞ্চেই আছি আমরা।

বাবলু তাড়াতাড়ি নীচের খোল থেকে ওপরে উঠে এল। ভোম্বল হাঁ হাঁ করে উঠল অমনই, “নেমে আয় বাবলু। গুলি লাগলে মরে যাবি।”

আবার শোনা গেল গুলির শব্দ। সেই সঙ্গে একটা আর্তনাদ ! একজন লোক চিৎকার করে রক্তাক্ত কলেবরে গঙ্গার জলে লুটিয়ে পড়ল! বাবলু দেখল, যে পড়ল সে কালনেমি।

ওদিকে তখন প্রায় পাঁচ-সাতটা লঞ্চ ছুটে আসছে, এই লঞ্চটাকে ধরবে বলে। কিন্তু লঞ্চটা এত বেগে ছুটছে যে কোনওরকমেই পুলিশের লঞ্চ ধরতে পারছে না এদের।

বাবলু তখন শুরু করল তার কাজ। এক পাশে একটা শাবল পড়ে ছিল। সেটা দিয়ে খোলের নীচে নেমে ঘা মেরে মেরে তলাকার কাঠ ছ্যাদা করতে শুরু করে দিল। বার কতক ঘা দিতেই ছেড়ে গেল একটা কাঠ। হুড়মুড় করে জল ঢুকতে লাগল ভেতরে। লঞ্চের গতিবেগ তখন আপনা থেকেই কমে এল।

পুলিশের লঞ্চও তখন ঘিরে ফেলল এদের। বাবলুরা নীচের থেকে ওপরে উঠে এল। পুলিশের লঞ্চে বিলু ছিল। বাবলুদের দেখেই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল সে। বাবলু, ভোম্বল, বাচ্চুু, বিচ্ছু, পুলিশের লঞ্চে চলে এল।

শয়তানগুলোও ধরা পড়ল সব। পুলিশের লঞ্চ থেকে বাবলু সাবধান করে দিল সকলকে, “আপনারা কেউ আর ও লঞ্চে থাকবেন না। লঞ্চ এখনই ডুবে যাবে। আমি লঞ্চের তলা ছ্যাদা করে দিয়েছি।”

পুলিশের লোক দু’চারজন যারা ছিল তারা যে যার লঞ্চে চলে গেল। একটু পরেই কাত হয়ে পড়ল লঞ্চটা তারপর এক সময় ধীরে ধীরে ডুবে গেল গঙ্গার জলে। সেদিকে তাকিয়ে পঞ্চু উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভৌ। ভৌ ভৌ।”

Facebook Comment

You May Also Like