Saturday, February 21, 2026
Homeবাণী ও কথাবুধীর বাড়ি ফেরা - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বুধীর বাড়ি ফেরা – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বুধীর বাড়ি ফেরা – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘোর দুঃস্বপ্ন হইতে বুধী জাগিয়া উঠিল।

সে একটু ঘুমাইয়াছিল কি? হয়তো তার খেয়াল নাই।

এ কোন ভীষণ জায়গায় তাহাকে আনিয়া ফেলা হইয়াছে? চারিদিকে বিশ্রী ইটের দেয়াল ও ময়লা…ময়লা অপরিষ্কার মেঝে। একটু আলো বা হাওয়া আসিবার উপায় নাই। আর কি ভিড়! এত ভিড়, এত ঠাসাঠাসি বুধী জীবনে কখনো দেখে নাই—এত ভিড়ে আর এই গুমট গরমে প্রাণ যে তার বাহির হইয়া গেল! এত ভিড়ে, এই ঠাসাঠাসির মধ্যে কি ঘুম হয়?

নতুন নতুন অপরিচিত মুখ। কাহাকেও সে দেখে নাই…নিষ্ঠুর, লোভাত মুখ, বুধী দেখিলেই বুঝিতে পারে…বুঝিতে পারিয়া বুধীর গা শিহরিয়া উঠে…মনে যে কি দুঃখ আর অস্বস্তিবোধ হয়!

সে বেশ বোঝে এখানে কেহ তাহাকে ভালোবাসে না, যেমন সেই ছোটো খুকি তাহাকে ভালোবাসিত, যত্ন করিয়া খাওয়াইত, গলা ধরিয়া কত আদরের কথা বলিত।…কোথায় গেল ছোটো খুকিটা? কেন তাহাকে এখানে আনা হইয়াছে? কেন আনা হইয়াছে তাহা সে বুঝিতেই পারে না। কেবল সে এইটুকু জানে, কত দিন ধরিয়া দীর্ঘ কঠিন পথ বাহিয়া তাহাকে এখানে আসিতে হইয়াছে—সঙ্গে বহু সঙ্গী ছিল, কিন্তু অপরিচিত, কারো সঙ্গে বুধীর আলাপ হয় নাই তেমন, আলাপ করিবার মতো মনের অবস্থাও তাহার ছিল না।

কেহ যত্ন করিয়া তাহাকে খাওয়ায় নাই। এখানকার খাবার মুখে দিবার উপায় নাই। কেমন যেন ভ্যাপসা গন্ধ, ভালো আস্বাদ তো নাই-ই ভালো গন্ধ পর্যন্ত নাই খাবারের। বুড়ি তাহাকে যত্ন করিয়া খাওয়াইত, এ কথা অস্বীকার করিতে পারিবে না। হয়তো সে ছোটো খুকির মতো ভালোবাসিত না অতটা—কিন্তু সন্ধ্যার সময় পেটপুরিয়া খাইবার ব্যবস্থা করিতে কখনো ত্রুটি করে নাই।

সত্যি, এ যে কোন জায়গায় আসিয়াছে, তাহার আদৌ কোনো ধারণাই নাই। এমন অদ্ভুত ও ভয়ংকর জায়গা তার অভিজ্ঞতার বাহিরে ছিল এত দিন। কী হট্টগোল, নানারকম নতুন নতুন বিকট বিকট শব্দ জায়গাটাতে! তাহার মন আরও পাগল হইয়া উঠিল এ শব্দে ও আওয়াজে। জীবনে কখনো এত অদ্ভুত ধরনের সব আওয়াজ সে শুনে নাই। অথচ তাহার বয়স কম হয় নাই। বুধীর জীবন কাটিয়াছে এই বিশ্রী জায়গা হইতে বহু দূরে। কত দূর তাহার ঠিক ধারণা নাই, কিন্তু মোটের ওপর বহু বহু দূরে অন্য এক স্থানে, যেখানে অবারিত সবুজ মাঠ আছে, অপূর্ব সুঘ্রাণে ভরা কোমল সরস ঘাসে ঢাকা। কী সুন্দর স্বাদ সে ঘাসের! মাঠের ধারে কলস্বনা নদী, নদীর কিনারায় জলের ধার পর্যন্ত নানাজাতীয় ঘাসের ও জলজ শাকের বন—ঠান্ডা, নরম, তাজা—কী অপূর্ব তাদের সুগন্ধ! স্বাদ তো আছেই ভালো কিন্তু সেই নতুন-ওঠা বর্ষা-সতেজ কচি ঘাস ও কলমিলতার তাজা গন্ধের কথা যখনই মনে হয় তখন মনে পড়ে, একহাঁটু দীর্ঘ, ঘনশ্যাম তৃণরাজির মধ্যে মুখ ডুবাইয়া পেট ভরিয়া সে তৃপ্তির ভোজ—হু হু উন্মুক্ত বাতাস ও দূরপ্রসারী প্রান্তরের মধ্যে সে মুক্তির আনন্দ—তখন বুধী সত্যই ক্ষেপিয়া যায়—তাহার জ্ঞান থাকে না। মুক্তির জন্য সে উন্মাদ হইয়া উঠে। জীবনের বহুদিন সেখানে সে কাটাইয়াছে। বহুদিন। কত দিন তাহা সে জানে না, বয়স তো তার কম হয় নাই…প্রথম জীবনের কথা প্রায় কিছুই তাহার মনে নাই—যা একটু-আধটু মনে পড়ে—সব আবছায়া ধোঁয়া—কেবল খুব বড়ো বড়ো সবুজ মাঠ, তলায় ফল বিছিয়ে-থাকা বড়ো বড়ো গাছ, সুপেয় শীতল স্রোতের জল, সাঁজালের ধোঁয়ার মৃদু গন্ধভরা আবাসস্থান, এইসব মনে পড়ে।

আজকাল কিন্তু বেশি করিয়া মনে পড়ে ছোটো খুকির কথা—খুকি তাহাকে সত্যই ভালোবাসিত।

এটা কোন জায়গা? এক-একবার বুধীর মনে হয়, হয়তো-বা এটা পাউন্ডঘর। কিন্তু বুধী জীবনে তো কতবার পাউন্ড ঘরে কত বিনিদ্র রজনী যাপন করিয়াছে— এ ধরনের পাউন্ড ঘর তো দেখে নাই! সেখানে তো বাঁশের বেড়া ঘেরা খোলা জায়গায় তাহাকে থাকিতে হইয়াছে, মাথার ওপর সেখানে নীল আকাশ, সবুজ গাছপালাও চোখে পড়ে, পাখির ডাকও শুনা যায়—এমন বিশ্রী আওয়াজ তো সে সব জায়গায় শুনে নাই! এমন কঠিন ইটের দেয়াল দিয়া ঘেরা নয় সে জায়গা।

পাখির কথায় বুধীর মনে পড়িল অনেকদিন আগেকার এক ঘটনা। কতদিন আগে তাহা সে বলিতে পারিবে না, মাঠের ধারে সে ঘাস খাইতেছিল, একটা কী পাখি বনের ডাল হইতে উড়িয়া আসিয়া তাহার শিং-এর উপর বসিল। শিং-এর উপর পাখি বসা সে পছন্দ করে না— সুতরাং শিং নাড়া দিতেই পাখিটা উড়িয়া বসিল তাহারই সামনেকার উলুঘাসে ভরা বাচড়ার উপর। তখন উলুঘাসের শিষ গজাইয়াছে, শিষের মাথায় সাদা সাদা ফুল অজস্র অজস্র। পাখিটা সেই উলুফুলের মধ্যে বসিয়া পালক ফুলাইয়া পায়চারি করিতে লাগিল। কী সুন্দর গায়ের রং, কী নরম রঙিন পালকের বোঝা তার গায়ে, কেমন রঙিন ঠোঁটখানি!

বুধীর মন সুন্দর পাখিটার প্রতি ভালোবাসায় ভরিয়া গেল। সুতরাং খানিকটা পরেই যখন পাখিটা আবার তার শিং-এর উপর চড়িয়া বসিল, এবার সে শিং নাড়া দিল না। এইরকম করিয়া পাখিটার সঙ্গে তার ভাব জমিয়া গেল। পাখিটার ভাষা ছিল তার শিং-এর উপর চটুল পা দুইখানির নাচুনি—কত নির্জন রৌদ্রভরা দুপুরে বুধী হয়তো মাঠে দাঁড়াইয়া উত্তাপে ও তৃষ্ণায় ঝিমাইতেছে—অমনি ছোট্ট পাখিটা নিকটবর্তী বনভূমি হইতে উড়িয়া তাহার শিংএ আসিয়া বসিত। বুধীর নিঃসঙ্গতা অমনি দূর হইয়া যাইত—তাহাদের কত কথা কত গল্প চলিত সন্ধ্যা পর্যন্ত তারপর নামিত অন্ধকার। বুড়ি আসিয়া খোঁটা উপড়াইয়া তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইত—পাখি যাইত উড়িয়া। একদিন সেই মাঠে ফাঁদ পাতিয়া কাহারা পাখি ধরিতে আসিল। পোষা ডাহুকের ডাক শুনিয়া বন্য পাখিটা খাঁচার নিকটে যাইতেই ফাঁদে পড়িয়া গেল। শিকারিরা তাহাকে খাঁচায় পুরিয়া লইয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময়ে ছোটো পাখিটার কী করুণ আর্তনাদ!

মাঝে মাঝে বুধীর সন্তান হইত। বেশ ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলি ছুটিয়া, লাফাইয়া, নাচিয়া বেড়াইত সারা মাঠ। প্রথম প্রথম তাহাদের বড়ো ভালো লাগিত কিন্তু বড়ো হইয়া গেলে তাহারা কোথায় চলিয়া যাইত—তাহাদের কথা বুধীর আর বড়ো একটা মনে পড়িত না।

…কত কথাই মনে হয়। এই বিকট আওয়াজে ভরা নোংরা, কুশ্রী ইটের দেয়ালে ঘেরা এই জায়গায়—আজ কদিন আসিয়া সে মরিয়া যাইতেছে…আর একটা ব্যাপার…

বুধী রক্তের গন্ধ পায় কেন এখানে! সন্দেহের সহিত সে চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়াছে, কিছু টের পায় নাই, তবে দূর হইতে রক্তের গন্ধ ভাসিয়া আসে তাহা সে বেশ বুঝিতে পারে।

প্রথম প্রথম তাহার মনে হইত—এও একরকমের পাউন্ডঘর—একদিন বুড়ির ছেলে আসিয়া তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইবে। কিন্তু পাউন্ডঘরের অভিজ্ঞতা হইতে বুধী জানে যে, সেখানে একদিন বা বড়োজোর দু-দিন থাকিতে হয়—তার পরেই বুড়ির ছেলে আসিত দড়ি হাতে তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইতে। আর এখানে আসিয়াছে আজ পাঁচ-ছ-দিন কী তারও বেশি—না, পাউন্ডঘর নয়, তার চেয়েও গুরুতর বিপদে এবার সে পড়িয়াছে!

দিনের পর দিন কাটিতে লাগিল। আর একটা জিনিস বুধী লক্ষ করিয়াছে আজ ক-দিন। প্রতিদিন বৈকালে দুজন লোক আসিয়া এই গোরুর ভিড়ের মধ্যে বাছিয়া বাছিয়া কয়েকটি গোরুর গায়ে কী কী ছাপ মারিয়া যায়—পরদিন শেষরাত্রের দিকে সেই গোরুগুলিকে কোথায় যেন লইয়া যায়—তারা আর ফেরে না।

কেন ফেরে না, কোথায় যায় তারা?

আর ওই রক্তের গন্ধটা…তাজা রক্তের গন্ধ! যেদিন বাতাস ওই কোণ হইতে বয়, সেদিন রক্তের গন্ধটা আসে। ভয়ে সন্দেহে বুধীর বুক উড়িয়া যায়। সাথি ছোটো খুকি…কতদিন তোমাদের সাথে দেখা হয় নাই, বন্ধু হিসাবে আসিয়া এ বিপদ হইতে উদ্ধার করো! এমন বিপদে জীবনে কখনো সে পড়ে নাই!

এইসব সাত-পাঁচ ভাবিয়া বুধীর রাত্রে ভালো ঘুম হইল না। এদিকে সকাল বেলা হইতেই চারিধারে বিকট আওয়াজ শুরু হইল। বুধীর সঙ্গেই একটি অল্পবয়স্ক প্রতিবেশী আজ কয়েক দিন ধরিয়া আছে, প্রথম প্রথম বুধী তাকে পছন্দ করিত না। সে যেন একটু বেশি চাল দেখাইতে চায়—বুধী পাড়াগেঁয়ে বলিয়া যেন তাহাকে আমল দিতেই চাহিত না। কিন্তু এ ভয়ংকর নির্বান্ধব স্থানে চাল ক-দিন খাটে? শীঘ্রই তাহার অল্পবয়স্ক প্রতিবেশীটিকে সমস্ত চাল বিসর্জন দিতে হইল।

একদিন বুধী দেখিল সে কাঁদিতেছে।

বুধীর মনে কষ্ট হইল। আহা ছেলেমানুষ! তাহার প্রথম সন্তান এতদিন ওই বয়সের হইয়াছে—বড়ো হইলে বুধী তাহাকে আর দেখে নাই! কে জানে কোথায় গিয়াছে! বাঁচিয়া আছে কিনা তাই-বা কে জানে?

সহানুভূতি প্রকাশ করিবার উপায় নাই। বুধীর ইচ্ছা হইল সঙ্গীটির সে গা চাটে। কিন্তু দুজনের মধ্যে তারের বেড়া। বুধী তবুও তাহাকে যতদূর সম্ভব সান্ত্বনা দিয়াছিল সেদিন। ছেলেমানুষ, বেশ নধর গড়ন, তবুও এই ভয়ানক স্থানে পেটভরিয়া না-খাইতে পাইয়া রোগা হইয়া গিয়াছে।

সেই হইতে দুজনে বেশ ভাব। আজ সকালে উঠিয়া বুধী তাহার দিকে চাহিয়া দেখিল, সে আবার খাইতেছে। ছেলেমানুষ, খাইবার লোভই বেশি।

খাওয়া শেষ করিয়া তাহার তরুণ বন্ধু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিল—হাম্বা আ-আ!

বুধী বলিল—চুপ করো। ছি, মন খারাপ করো না। কিন্তু তাহার নিজের মন দিয়া তো বুঝিতেছে, কী দারুণ অশান্তিতে কাটিতেছে এখানে, তবুও ছেলেমানুষকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়াও ভালো।

বুধী বলিল—খাও খাও। যা পড়ে আছে, ও দুটি খেয়ে ফেলো। এমন সময়ে দুজন যমদূতের মতো লোক তাহাদের কাঠরায় ঢুকিল। বুধীদের কাঠরায় তাহারা প্রায় জন-কুড়ি আছে। এই কুড়িজনের অধিকাংশই প্রৌঢ়বয়স্ক। একজন তো আছে, বৃদ্ধের দলে তাকে অনায়াসেই ফেলা চলে।

এদের মধ্যে বুধীর বন্ধুটি অল্পবয়স্ক এবং বেশ নধর দেখিতে। যমদূতের মতো লোক দুটি তাহার গায়ে কি একটা ছাপ মারিয়া চলিয়া গেল—কাঠরায় আরও দুটি প্রৌঢ় সঙ্গীর গায়েও তাহারা ছাপ দিল। একটু পরে দুজন লোক আসিয়া কাঠরায় ঢুকিল এবং ছাপমারা সঙ্গীগুলিকে দড়ি খুলিয়া কোথায় যেন লইয়া গেল।

সকাল গড়াইয়া দুপুর, দুপুর গড়াইয়া বৈকাল হইয়াছে। বুধীর তরুণ বন্ধু ফিরিল। ছাপ-মারা-সঙ্গীদের কেহই ফিরিল না। বুধীর মনে ভয়ানক সন্দেহ হইল— সেই সঙ্গে কি একটা অজানা ভয়ে ওর গলা পর্যন্ত শুকাইয়া উঠিল। সেই রক্তের গন্ধ…টাটকা তাজা রক্তের গন্ধ…এখানে কোনাকুনি হাওয়া বহিলেই যেটা পাওয়া যায়—সেই গন্ধের কথা হঠাৎ মনে আসিতেই ভয়ে আতঙ্কে বুধীর সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। ভয়ে মরিয়া হইয়া সে গলার দড়িতে এক হেঁচকা টান মারিতেই সেটা গেল ছিঁড়িয়া।

বুধী উন্মাদের দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিল। কাঠরায় ঢুকিবার কাঠের মোটা গরাদে বসানো নীচু ফটকটা বন্ধ। নিকটে কেহ কোথাও নাই। পড়াগাঁয়ে সে ‘মানুষ’, উঁচু উঁচু বাঁশের বেড়া টপকানো তার আজীবন অভ্যাস—এক লাফে ফটকটা ডিঙাইয়া সে কাঠরার বাহিরে আসিল। তারপর বড়ো উঠান পার হইয়া বড়ো ফটকের নিকট পৌঁছিল—সেটাও খোলা। সে ছুটিতে ছুটিতে বড়ো ফটকটাও পার হইয়া গেল।

পরবর্তী পনেরো মিনিটের কথা তাহার ঠিক স্পষ্ট মনে নাই—চওড়া রাস্তা লোকের ভিড়—বড়ো বড়ো ধরনের গাড়ি রাস্তা দিয়া ছুটিতেছে—বড়ো বড়ো বাড়ি,–একটা খাল—একটা পুল—আরও লোকজন—একজোড়া মহিষ—সেই বিকট আওয়াজ সর্বত্র—দিশাহারার মতো ছুটিতে ছুটিতে বুধী রাস্তার পর রাস্তা পার হইতে লাগিল। কত রাস্তা—এদেশে রাস্তার কী শেষ নাই? আবার বাড়িঘর —আবার রাস্তা—দু-দু-বার সে গাড়ি চাপা পড়িতে পড়িতে বাঁচিয়া গেল! আবার বড়ো একটা পুল—দূরে রেলগাড়ি যাইতেছে—রেলগাড়ি সে চেনে—তাহাদের গ্রামে দক্ষিণ মাঠে ট্যাংরার ধানখেতের মধ্যে দিয়া বাঁধা উঁচু সড়ক বাহিয়া রেলগাড়ি যায়।

এখানে উপরে রেলরাস্তা—নীচে দিয়া রাস্তা—ছুটিয়া পুলের তলা দিয়া সে রেলরাস্তাও পার হইল।—আবার দৌড় দৌড়! বৃদ্ধ শরীর, সে হাঁপাইয়া পড়িল। যখন তাহার দিশেহারা ভাবটা কাটিয়া জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছে, তখন সে দেখিল একটা জলার ধারে খুব বড়ো মাঠের মধ্যে সে একা দাঁড়াইয়া। সামনের প্রকাণ্ড জলাটি কচুরিপানায় বোঝাই, সেখান দিয়া পথ বন্ধ। আর ভিড় নাই, রাস্তার গোলকধাঁধা নাই, গাড়ির ঘড়ঘড় আওয়াজ নাই। এখানে অনেক দূর পর্যন্ত আকাশ দেখা যাইতেছে—হু-হু হাওয়া বহিতেছে জলার দিক হইতে…যেন তাহাদের গ্রামের নদীর ধারের মাঠের মতো।

মুক্ত! মুক্ত! সে মুক্ত!

তবু নিজেকে সে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করিতে পারিল না—স্থির হইয়া এক জায়গায় দাঁড়াইতে পারিল না। কী জানি যদি লোকজন আসিয়া আবার তাকে ধরিয়া লইয়া গিয়া পাঁচিল ঘেরা বড়ড়া বাড়িটায় পুরিয়া রাখে!

বহু ঘুরিয়া পরে সে ক্লান্ত হইয়া একটা গাছতলায় রাত্রির জন্য আশ্রয় লইল। সে শুইয়া পড়িল একেবারে কোনোদিকে লোক নাই, তবু সে ভালো ঘুমাইতে পারিল না। যখন ঘুম ভাঙিল, তখন ভোর হইয়াছে। সে চলিতে আরম্ভ করিল। দুপুর পর্যন্ত দিকভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক কতদিক ঘুরিতে ঘুরিতে একটা গাছের তলায় দাঁড়াইয়াছে, হঠাৎ তাহার মনে হইল দূরে যে বড়ো রাস্তা চলিয়া গিয়াছে, যার দু-ধারে বড়ো বড়ো গাছের ছায়া—ওই রাস্তা সে ইতিপূর্বে আর একবার দেখিয়াছে!

সেদিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া থাকিতে থাকিতে তাহার মনে পড়িল—অদ্ভুতভাবে পুরোনো স্মৃতিটা মনে পড়িল হঠাৎ।

ওই রাস্তাটা দিয়াই তাহাদের একটা বড়ো দলের সঙ্গে সে আসিয়াছিল মাসখানেক আগে! সেই রাস্তাটা!

বুধী ছুটিয়া গিয়া বড়ো রাস্তাটায় উঠিল। হাঁ, ঠিক চিনিতে পারিয়াছে, সেই রাস্তাটাই তো! কোনো ভুল নাই। সে অভিভূতের মতো দাঁড়াইয়া রহিল–মুক্তি মিথ্যা, এত প্রচুর নরম কচি ঘাস মিথ্যা, নীল আকাশের তলায় বড়ো বড়ো মাঠের নিরঙ্কুশ, নিরাপদ নির্জনতা আর হু-হু উন্মুক্ত হাওয়া সব মিথ্যা—যদি সে তাহার আজন্ম সুপরিচিত সেই গ্রামটিতে না-ফিরিতে পারে, ছোট্ট খুকির দুটি ছোট্ট স্নেহ হস্তের স্পর্শ পুনরায় সে না-পায়!

জীবনপণ—বুধী যে করিয়াই হউক, তাহার গ্রামে তাহার খুকির কাছে ফিরিয়া যাইবেই।

একটা পথচলতি গোরুরগাড়ি হইতে একটা বিচুলির আঁটি পড়িয়া গেল-বুধী গিয়া সেটা মুখে তুলিয়া লইল। শুধুই একেঘেয়ে সবুজ ঘাস খাইতে কী মুখে লাগে? মাঝে মাঝে এই ধরনের সুখাদ্য খাইয়া মুখ বদলাইয়া লইতে হয় বই-কী! তারপর বুধী সোজা রাস্তা বাহিয়া চলিল—এক দিন, দু-দিন, তিন দিন। খাদ্যের ভাবনা নাই—দু-ধারে মাঠ সবুজ হইয়া উঠিয়াছে, নববর্ষায় সুন্দর নিবিড় সবুজ ঘাসে ও আউশ ধানের জাওলায়। আমন ধান আজও রোয়া হয় নাই। জলেরও নাই অভাব, রাস্তার দু-দিকের খানায় প্রচুর টাটকা বৃষ্টির জল।

যাইতে যাইতে একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটিল। একটা গাছতলায় দুপুরবেলা সে বিশ্রাম করিতেছে—একটা ছেলে আসিয়া গলায় দড়ি বাঁধিয়া তাহাকে লইয়া চলিল হঠাৎ। বুধী তো অবাক!

ছেলেটি তাহাকে একটি গ্রামের মধ্যে একটি খড়ের ঘরে—সেখানে লইয়া গিয়া খুঁটির গায়ে বাঁধিল। বাড়িতে তখন কেহ নাই—ছেলেটিও কোথায় চলিয়া গেল। বুধী লক্ষ করিল একজন বৃদ্ধ স্ত্রীলোক ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আপনমনে কী বকিতেছে আর দুলিতেছে। বাড়ির উঠোনে একটি খেজুর গাছ, একটা পেয়ারা গাছ, বাড়ির পেছনে একটা ডোবা। একটু পরে একটা বউ ডোবা হইতে একরাশ বাসন মাজিয়া আনিয়া দাওয়ার এক কোণে নামাইয়া বৃদ্ধাকে বলিল—তুমি একটু চুপ করবে কিনা সকালবেলা, আমি জিগ্যেস করি! বাড়ির সবাই পাগল, পাগলা গারদের মধ্যে থেকে আমার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেচে, আর পারিনে বাবু, মরণ হলেও বাঁচতাম! ফের তুমি যদি ওরকম বকবে মা, তবে হাঁড়িকুড়ি থাকবে পড়ে, ভাতের পিণ্ডি কে খেতে দেয় দেখব এখন আজগে! এই সময় বুধীর দিকে নজর পড়িতে বউটি বলিল— ছেলেটা বুঝি গোরুটা এনেচে তা হলে! বাবা, কাল থেকে কী কম খোশামোদটা করছি ওকে! গোরুটা হারাল, দেখ কোথাও কেউ পন্টে পাঠালে, কী কেউ বেঁধে রাখলে—তা আমার কথা কি কেউ-গোরুটারও হাল হয়েছে দেখো–

কথা বলিতে বলিতে তাহার সামনে আসিয়া বউটি বলিয়া উঠিল—এ তো আমাদের নয়!…কার আবার পরের গোরু ধরে এনেচে দ্যাখো! নাঃ ছেলেটাকে নিয়ে আর পারিনে— এ যেন মনে হচ্চে ও-পাড়ার ভুবনের মা-র গোরু—মাগি এসে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করবে এখন, যদি টের পায়—

বউটি তার গলার দড়ি খুলিয়া তাহাকে কিছুদূর তাড়াইয়া উঠোনের বাহির করিয়া দিল— সম্ভবত এইজন্য যে, ভুবনের মা এখন হঠাৎ আসিয়া পড়িলে, গোরু যে এখানেই বাঁধা ছিল, ইহার কোনো চিহ্ন না-পায়।

গ্রামের বাহিরে এক জায়গায় প্রকাণ্ড বড়ো একটা গাছ। গাছের তলায় সে একটু দাঁড়াইল। চারিদিকে মাঠ, কচি কচি আউশের জাওলায় মাঠ ঘনসবুজ, বুধীর ভয়ানক লোভ হইল, মাঠে নামিয়া সে ধানগাছ খায়—কিন্তু বিদেশবির্ভুই জায়গা, যদি এখানে পাউন্ডঘরে দেয়—তবে কে আসিয়া পয়সা দিয়া তাহাকে উদ্ধার করিবে? না—সে কোথাও আর আবদ্ধ থাকিতে চায় না। উঃ, বুকের রক্ত হিম হইয়া যায়, এখনও সেই বড়ো বাড়ি, সেই উঁচু পাঁচিল, সেই গরাদওয়ালা কাঠরা, সেই বিশ্রী আওয়াজ—সকলের ওপর, সেই রক্তের গন্ধের কথা মনে উঠিলে…!

মুক্তির আনন্দ আজ নবযৌবনের সঞ্চার করিয়াছে বুধীর দেহে সে ভুলিয়া গিয়াছে তাহার বয়েস আঠোরো-উনিশের কম নয়—সে প্রৌঢ়, সাত-আটটি সন্তানের জননী, তার ওপরে গত পনেরো-কুড়ি দিনের উদবেগে, কষ্টে, উপবাসে শীর্ণদেহা…তার স্নায়ুতন্ত্রীও ছিন্নভিন্ন হইয়া গিয়াছে— তার মনে বল নাই—শরীরে সামর্থ্য নাই…

কিন্তু উদার নীল আকাশে প্রভাতের সূর্য উঠিয়াছে, যেমন উঠিত তাহার জন্মভূমিতে। পাখিরা কলধ্বনি করিতেছে, যেমন করিত তাহাদের নদীর ধারের মাঠের অনেক দিনের সেই পক্ষী বন্ধুটি। বাঁশতলায় প্রথম বর্ষার জলে পুষ্ট হইয়া পিপুললতা বাড়িয়া উঠিয়াছে, অনন্তমূলের চারা বাহির হইয়াছে, গ্রামে গ্রামে ‘বউ কথা-কও’ পাখির সেই সুন্দর আবাল্য পরিচিত ডাক… সম্মুখে অনেক দূরে কোথায় তাহাদের গ্রামখানি, ছোট্ট নদীটা—সুগন্ধি অনন্তমূলের কচি পাতার কী চমৎকার আস্বাদ!…এই তো জীবনকে সে আবার খুঁজিয়া পাইয়াছে—কতকালের পরে মুক্তি আসিয়াছে…এখন মরিলেও তার দুঃখ নাই—শিয়াল-শকুনে তার জীর্ণ দেহটা খাইয়া ফেলিলেও দুঃখ নাই—তবে ছোট্ট খুকিটাকে একবার দেখিয়া সে মরিবে—

আবার সে রাস্তা খুঁজিয়া বাহির করিল—এই মাঠের ধারেই একদিন তাহার দলের সঙ্গীদের সঙ্গে এই গাছতলায় রাত্রে শুইয়াছিল বটে। যাহারা তাহাদের তাড়াইয়া আনিতেছিল, এই গাছতলাতেই তাহারা রাত্রে রাঁধিয়া খাইয়াছিল।

আবার পথ…চলিয়াছে, চলিয়াছে…পথের শেষ নাই—প্রভাত দুপুরে পরিণত হইল— দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইল। ক্ষুধা পাইয়াছিল, এক জায়গায় পথের ধারে ছোটো বিল—বিলের ধারে ভারি চমৎকার সবুজ ঘাস। বুধীর লোভ হইল—সে রাস্তা হইতে নামিয়া বিলের ধারে গেল—নরম কচি ঘাসে মুখ ডুবাইয়া সে গোগ্রাসে গিলিতে লাগিল।

বিলের ধারে আরও কয়েকটি গোরু চরিতেছিল।

একজন বলিল—এ বুড়ি কোত্থেকে এসে জুটল হে! একে তো চিনিনে!

আর একজন বলিল—চেহারা দেখো না—যেন কসাইখানার ফেরতা! হাড় পাঁজরা গুনে নেওয়া যাচ্ছে! মরি মরি, কী যে রূপ! বলি ওগো, তোমার বাড়ি কোথায়?

ইহারা বুধীর সন্তানের বয়সি, ইহাদের ফাজলামি তাহার ভালো লাগিল না। সে কথার কোনো উত্তর না-দিয়া গম্ভীর মুখে আপনমনে ঘাস খাইতে লাগিল। নিজের মান নিজের কাছে। তাহাতেও নিস্তার নাই। বেয়াদব ছোকরা আগাইয়া আসিয়া বলিল—বলি, কথা বলছ না কেন বুড়ি? কসাইখানা থেকে পালিয়ে আসচ নাকি? এমন চেহারা কেন? হঠাৎ বুধীর ভয় হইল। কসাইখানা কী জিনিস? পলাইয়া তো আসিয়াছেই বটে—আর সে সেখানে দাঁড়ানো নিরাপদ মনে করিল না। লোভনীয় কচি ঘাসগুলি ফেলিয়া ছুট দিয়া রাস্তার ওপর আসিয়া উঠিল।

পিছন হইতে একজন বলিয়া উঠিল—আরে বাবা, কোথাকার অসভ্য জানোয়ার! ভদ্রলোকের কথার উত্তর দিতে হয় তাও জানে না!

চলিতে চলিতে একদিন বুধী কী করিয়া বুঝিতে পারিল সে ভুল পথে চলিতেছে। এ রাস্তা বাহিয়া এতদূর সে আসে নাই। মাঠের মধ্যে একটা কাঁচা রাস্তা কোথা দিয়া যেন নামিয়া গিয়াছিল—সেই মেটে রাস্তা দিয়া আসিয়া সেবার তাহাদের দল উঠিয়াছিল বড়ো রাস্তাটায়। বুধী ঠিক ঠাহর করিতে পারে নাই, কোথায় সেই মেটে রাস্তা বড়ো রাস্তা হইতে নামিয়া গিয়াছে।

ঠিক তাহাই ঘটিল। সম্মুখে একটা নদী পড়িল। এ নদী সে দেখে নাই। সে পথ ভুল করিয়াছে।

সে বড়ো রাস্তা হইতে নামিয়া পড়িল—মাঠের মাঝখান বাহিয়া কত সরু সরু রাস্তাই চলিয়াছে—এর একটাও পূর্ব পরিচিত নয়। কতকগুলি গন্ধ ও কতকগুলি বিশেষ ছবি বুধীর মনে আছে সেই আগের রাস্তাটা সম্পর্কে। সে ছবি ও গন্ধের সঙ্গে এ রাস্তা খাপ খাইতেছে না। একটা প্রকাণ্ড মাঠের মধ্যে সে ক্রমে আসিয়া পড়িল। দিশাহারা হইয়া গিয়াছে সে। আর কোনো কিছুরই ঠিক নাই তার। এসব জায়গায় কখনো সে আসে নাই, এসব পথে হাঁটে নাই।

মাঠের মধ্য দিয়া অন্যমনস্কভাবে উদভ্রান্তের মতো চলিতে চলিতে হঠাৎ ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনিয়া চমকিয়া পাশের দিকে চাহিল। একটা মস্ত বড় কালকেউটে ফণা বিস্তার করিয়া দুলিতেছে। ছোবল মারিবার দেরি, চক্ষের পলকমাত্র—বুধী থমকিয়া দাঁড়াইয়া বিদ্যুৎবেগে পিছু হটিয়া আসিল-পরক্ষণেই দৌড় দিল খানা, ডোবা, পগার ভাঙিয়া। কেউটেটা কিছুদূর তাহার পিছু পিছু আসিয়া একটা কাঁটাঝোপে আটকাইয়া থামিয়া গেল।

কাঁটাঝোপের ওপাশেই ছোট্ট ডোবাতে দুটি ছেলে-মেয়ে ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরিতেছে। বুধী হুট-পাট করিয়া তাহাদের সামনে গিয়া পড়িতেই তাহারা ছিপ ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বুধী মানুষ দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল অনেক আগেই। সাপটা দেখা যায় না পিছনে, চকিতে পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল।

মেয়েটি ছেলেটির হাত চাপিয়া ধরিয়া বড়ো বড়ো ভয়ার্ত চোখে বুধীর দিকে চাহিয়া বলিল— ও দাদা, গুঁতিয়ে দেবে—কাদের গোরু!

আহা, তাদের গ্রামের তার সেই খুকিটির মতো। স্নেহে বুধীর মন গলিয়া গেল। বুধী বলিতে চাহিল—গুঁতিয়ে দেব কেন, খুকি—সোনা আমার, মানিক আমার আমি কিছু বলব না—ভয় কী? ধরো, তোমরা মাছ ধরো!

ছেলেটি ছিপ উঁচাইয়া মারিবার ভঙ্গিতে বলিল—যাঃ, বেরো যাঃ—এ আপদ কোথা থেকে এসে জুটল আবার—যাঃ যাঃ–

বুধীর ইচ্ছা ছিল দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ওদের মাছ ধরা দেখে—খুকিটাকে দেখে। কিন্তু খুকির দাদা ছিপ গুটাইয়া দাঁড়াইয়া আছে, মারিবে বোধ হয়। সেখান হইতে সে সরিয়া পড়িল।

নিকটে একটা গ্রাম। কাহাদের বাড়ির উঠোনে প্রকাণ্ড এক বিচালির গাদা। উঠানে বড়ো বড়ো নাদায় কতকগুলি গোরু খোল-মাখা বিচালি ও ভূষির জাব খাইতেছে। প্রকাণ্ড নাদাগুলি হইতে উথিত সুমিষ্ট খোলের গন্ধে বুধীর জিহ্বা জলসিক্ত হইয়া উঠিল। শুধু ঘাস আর জল, জল আর ঘাস…সেখানে সেই বড়ো বাড়িটাতে বন্দিশালায় থাকিবার সময় শুকনো বিচালি খাইয়া মরিয়াছে কতদিন।

খোল-মাখানো জাব কতকাল সে যে খায় নাই! বুধীর বড়ো লোভ হইল—সে দেখিল একটা ছোটো নাদায় দুটি বাছুর জাব খাইতেছে। এই তাহার সুযোগ সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে—উঠোনটাতে লোক নাই—অন্ধকারও বেশ ঘন। বুধী চট করিয়া বাছুরের পাশে আসিয়া নাদাটাতে মুখ ডুবাইয়া খাইতে আরম্ভ করিল। আ:, কত কাল পরে খোল-মাখা জাবের আস্বাদ আবার সে পাইল!…

ছোটো বাছুরটা বিস্মিত ও ভীত হইয়া ডাকিল—মা—আ–আ! কে এসে খাচ্ছে দেখো–

কিছুদূরের নাদাটা হইতে মুখ তুলিয়া তাহার মা বুধীকে দেখিতে পাইয়া বলিল —কে রে? দূর হ—দূর হ আপদ–

কথা শেষ করিয়াই বাছুরের মা শিং নাড়া দিয়া বুধীকে গুঁতাইতে আসিল। বুধী তখন মাত্র কয়েক গ্রাস খাইয়াছে—ভয়ে সে খাওয়া ফেলিয়া দৌড় দিল।

একটা বড়ো গোরু বলিয়া উঠিল—আস্পর্ধা দ্যাখ না ভিখিরিটার! …

বুধী বড়ো অপমান বোধ করিল। জগৎটা যে এত খারাপ তাহা সে আগে জানিত না। এতটুকু সহানুভূতি সে স্বজাতীয়ের কাছে আশা করিতে পারে না? আবার ভিখিরি বলিয়া অপমান করা? গ্রামের বাহিরে আসিয়া সে হাড়ে হাড়ে বুঝিতেছে—জগৎ কী নিষ্ঠুর! তখন অন্ধকার খুব ঘন হইয়াছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি, গাছতলার মধ্যে জোনাকি জ্বলিতেছে। মশায় খাইয়া ফেলিয়া দেয় বলিয়া বুধী এইসব গাছতলায় শুইতে পারে না যেখানে-সেখানে। সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর তাহার ভাঙিয়া পড়িতে চাহিতেছে। বরাবর তাহার সাঁজালের ধোঁয়ায় শোয়ার অভ্যাস। এই সময়ে প্রতিদিন, মনে পড়ে তাহার, আবাল্য পরিচিত নিজস্ব গগাহালঘরটির কথা। তাহার ক্ষুদ্র জগতের কেন্দ্র সেখানে। সেই তাহার গৃহ। আজ তারই অভাবে সে গৃহহীন, ছন্নছাড়া হইয়া পথে পথে বেড়াইতেছে। আর কখানো কী সেখানে ক্লান্ত শরীরকে এলাইয়া দিবার সৌভাগ্য তাহার ঘটিবে।

গ্রামের বাহিরে ফাঁকা মাঠে তবুও মশা অনেক কম। এইখানেই একটু ভালো জায়গা দেখিয়া বুধী শুইয়া পড়িল। খানিকরাত্রে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। মাঠের মধ্যে ফেউ ডাকিতেছে। বাঘ বাহির হইলেই ফেউ ডাকে, বুধীর জানা আছে। ভয়ে তাহার শরীর অবশ হইয়া গেল—সর্বনাশ! যদি বাঘ আসিয়া পড়ে? যদি তাহাকে দেখিতে পায়? সারারাত দূরে দূরে ফেউ ডাকিল। বুধীর ঘুম হইল না। একবার ভাবিল গাঁয়ের মধ্যে কোনো গোয়ালে গিয়া আশ্রয় লওয়া যাক। পরক্ষণেই ভাবিল, পরের টিটকারি সে সহ্য করিতে পারিবে না—বিশেষত স্বজাতীয়দের ঠাট্টা-বিদ্রুপ অসহ্য—তার চেয়ে বাঘের পেটে যাওয়া ভালো।

শেষজীবনে এত দুর্দশাও তাহার কপালে ছিল! কেহ ভালোবাসে না, কেহ এক আঁটি বিচালি দিয়া আদর করে না, আপনারজন বলিতে কেহ নাই—যাহারা ছিল, তাহারা যে কোথায়, কত দূরে, কোনদিকে—কে তাহাকে পথনির্দেশ করিবে?

পথে পথে যে কতদিন কাটিল বুধীর তাহার হিসাব নাই। কত মাঠ, কত গ্রাম, কত বিল-বাঁওড়ের ধারের বাবলা বন, কত কচুরিপানায় ভর্তি মজাগাঙ। কচুরিপানার পাতা খাইলে মুখ চুলকায় সবাই জানে, বুধী কখনো এর আগে খায় নাই—কিন্তু সব জায়গায় ঘাস ভালো নয়—বিশেষত বন্যায় ভোবা পচা ঘাস খাইলে গলা ফুলিয়া মারা পড়িতে হয়, একথা বুধী জানে। বাধ্য হইয়া সুতরাং কচুরিপানার পাতাই এবার খাইতে হইল। এক জায়গায় পথের ধারে একটা কামারের দোকান। চাষালোক লাঙলের ফাল জোড়াইতে আসিয়াছে। বুধীকে দেখিয়া একজন লোক বলিল—গোরুডো কাদের হ্যাঁ?

আর একজন বলিল—ফয়জদ্দি বিশ্বেসের গোরুডোর মতো দেখতি–না মামু? পূর্বের লোকটি বলিল—সে তো ধুঁজি-শিংয়ে গাই—এডার মতো নয়। বুধীকে একজন আসিয়া ধরিয়া ফেলিল। বুধী তখন অত্যন্ত ক্লান্ত, সাধ্য নাই যে পালায়।

সবাই মিলিয়া দেখিয়া বলিল—এডা ভিন গাঁয়ের গোরু, ছাড়ান দাও, কী কত্তি কী হবে, দরকার কী পরের গোরু বেঁধে, শেষকালে কী একটা থানা-পুলিশির হ্যাংগামায় পড়তি যাবা! ছাড়ান দাও। দলের মধ্যে একটা লোক ছিল, সে মানুষের মতো মানুষ, তার হৃদয় আছে। সে বলিল, আহা কাদের গোরুডো? হাড়সার হয়ে গিয়েচে। এডা বোধ করি মামু, চালানের পাল থেকে পালিয়ে আসছে। বাড়ি নিয়ে দুটো সানি খেতে দিইগে—তারপর ছাড়ান দেবানে।

কিন্তু অন্য লোক তাহাকে বাধা দিল। বাড়ি লইয়া যাইতে দিল না। বুধী সেখান হইতে গ্রামের বাইরের রাস্তা ধরিল। তারপর একদিন আসিল ভীষণ বিপদ। বুধীর ভীষণ তৃষ্ণা পাইয়াছে—কোথাও জল পায় না। অবশেষে একটা কি নদী পাওয়া গেল। তৃষ্ণায় তাহার ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে—সে জলের ধারে জল খাইতে গিয়া নরম পাঁকে পুঁতিয়া গেল। এ পা-খানা উঠাইতে যায় তো ওখানা ডুবিয়া যায়। ক্লান্ত বুধী সে গভীর হাবড়া হইতে নিজেকে কিছুতেই উদ্ধার করিতে পারিল না। জলও খাওয়া গেল না—তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে অথচ দু-হাত দূরে টলটলে কালো জল। সে ক্রমশ পাঁকে পুঁতিয়া যাইতে লাগিল—শেষের দিকে বুধীর আর জ্ঞান রহিল না—শকুনিতে তাহার চক্ষু দু-টি টুকরাইয়া বাহির করিয়া ফেলিবে, মুচিরা ছাল ছাড়াইয়া লইয়া যাইবে, হাড়গোড় সাদা হইয়া পড়িয়া থাকিবে জলের ধারে, হাড়-বোঝাই নৌকা একদিন কুড়াইয়া নৌকোয় বোঝাই দিবে—মাংস খাইবে শিয়াল-শকুনিতে—এ নিষ্ঠুর, অনতিদূর ভবিষ্যতের ছবি বুধীর চোখের সামনে কতবার যে কালরাত্রির অন্ধকারে ভাসিয়া উঠিল—কতবার যে মিলাইয়া গেল!

সকাল হইল, বেলা হইল। বুধীর তৃষ্ণার্ত আধ-অচেতন চক্ষু দুটি তখন নদীর কালো জলের দিকে চাহিয়া আছে একদৃষ্টে। একটু জল কেউ যদি দিত!…।

খররৌদ্র চড়িল। উলুর ফুল ফুটিয়া আছে হাবড়ের ওপরকার চরে। দু-একটা গাঙশালিক বুধীর নিকটে আসিয়া বুধীর দিকে কৌতূহলের সঙ্গে চাহিয়া চাহিয়া দেখিল—কিছু বুঝিতে না-পারিয়া চলিয়া গেল।

কিছুক্ষণ বোধ হয় বুধীর ভালো জ্ঞান ছিল না। যখন তার চৈতন্য আবার ফিরিয়া আসিল, তখন সে দেখিল, একখানা ছইওয়ালা নৌকো তাহার সামনে দিয়া চলিয়া যাইতেছে—এতক্ষণ পরে এই মানুষের চিহ্ন! বুধী অতিকষ্টে আর্তসুরে এক আবেদন পাঠাইল—ওগো আমাকে বাঁচাও—কে তোমরা—

নৌকায় ছইয়ের বাহিরে একটি তরুণী বউ বসিয়াছিল—হঠাৎ তাহার চোখ পড়িল বুধীর দিকে। বউটি ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল—ওগো বাইরে এসো— একবার এদিকে এসো—

একটি লোক বাহিরে আসিয়া বলিল—কী—! কী হয়েছে?

–ওগো দেখো, একটা গোরু হাবড়ে পড়েছে। আহা, কতক্ষণ হয়তো পড়ে আছে, উঠতে পারছে না—ওকে উঠিয়ে দিতে হবে।

লোকটি তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল—ওঃ এই! আমি বলি কী না কী। ও কিছু না, যাদের গোরু তারা এসে উঠিয়ে নিয়ে যাবে এখন।

বুধী বউটির চোখে-মুখে দয়া ও মনুষ্যত্ব দেখিতে পাইয়াছিল আগেই—সে মানুষ চেনে। বুধী আকুল নেত্রে আর্ত আবেদনের দৃষ্টিতে বউটির দিকে চাহিল। বউটি বলিল—ওই দেখো না কেমন করে চাইচেনা, ওকে না-তুলে দিয়ে যাওয়া হবে না—এই চরে এখানে মানুষজন কোথায় যে ওকে তুলবে?

নৌকোর মাঝিরাও বলিল—এর নাম চাঁপবেড়ের চর। এ তল্লাটে মনিষ্যি নেই বাবু। মা-ঠাকরুন ঠিকই বলছেন।

লোকটি বিরক্তি প্রকাশ করিল। নানা ওজর-আপত্তি তুলিল, কিন্তু বউটি নাছোড়বান্দা। গোরুটাকে না-তুলিয়া যাওয়া হইতেই পারে না। বলিল—দ্যাখো যাওয়া হচ্ছে একটা মঙ্গলের কাজে—গোড়াতেই একটা অমঙ্গল দিয়ে শুরু করা চলে? এই বুড়ো গোরুটার চোখের চাউনি আমি সারাদিন ভুলতে পারব না—ও মরে যাবে এই হাবড়ে, যদি কেউ না-তোলে।

লোকটি বিরক্তিপূর্ণ সুরে বলিল—তোমায় নিয়ে বেরুলেই একটা-না-একটা হাঙ্গামা পোয়াতেই হবে এই ধরনের—এখন কোথায় লোকজন পাই যে গোরু তুলি! বাঁশ চাই, দড়ি চাই, লোক চাই—ও কী সোজা, পুঁতে গিয়েছে, দেখচ না?

ঘণ্টাখানেক নৌকো সেখানে বাঁধা রহিল। নৌকোর মাঝিরা নামিয়া কোথা হইতে জনকতক লোক ডাকিয়া আনিল—আরও ঘণ্টাখানেক টানাটানির পরে সকলে মিলিয়া বুধীকে টানিয়া তুলিল হাবড়া হইতে।…জল—জল! সে একটু জল খাইবে।

বউটি বলিল—আহা কী তেষ্টাটাই পেয়েছিল, দেখলে? চোঁ চোঁ করে এক গাঙ জল খেয়ে ফেলল—বুড়ো গোরু, দেখো না ওর পা কাঁপচে, দাঁড়াতে পারছে না!

লোকটি খিঁচাইয়া বলিল—মরুক গে! ট্রেনটা ফেল হল তো এখন? কোথাকার এক ছেড়া ল্যাঠা জুটিয়ে দুটি ঘণ্টা দিলে কাটিয়ে! চলো এখন—স্টেশনে বসে থাকো রাত দশটা পর্যন্ত!

নৌকো চলিয়া গেল। বুধী কী বলিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইবে?

…ওগো অপরিচিতা, জীবনের বড্ড শেষের দিকে তুমি এলে। তোমার মতো মানুষের সঙ্গে যদি আগে দেখা হত।…যাও যেখানে যাবে।

গোরুর আশীর্বাদে মানুষের কোনোকাজ হয় কিনা জানি না—শুভ হোক তোমার জীবনের যাত্রাপথ।

তারপর আরও কয়েকদিন কাটিয়া গিয়াছে। একদিন বুধীর সারাদিন ভয়ানক কষ্ট গেল। সেদিন যেমন দারুণ বর্ষা তেমনি ঝড়। তেমনি একটা বড়ো গাছও পাওয়া গেল না যাহার নীচে এই ভীষণ ঝড়বৃষ্টিতে সে আশ্রয় নেয়। একটা বাঁশ ঝাড়ের তলায় আরও কয়েকটি গোরুর সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটাইয়া সেইখানেই ঘুমাইয়া পড়িল।

সকাল হইতেই বুধীর ঘুম ভাঙিল। সারাগায়ে জোঁক লাগিয়া তাহার অর্ধেক রক্ত চুষিয়া খাইয়াছে, এমন ভয়ানক জায়গা। ঝড়বৃষ্টি থামিয়াছে; রৌদ্র উঠিল।

হঠাৎ কিছু দূরে একটা পুকুর ও তার পাশের আমবাগান দেখিয়া তাহার মনে কেমন সন্দেহ হইল।

জায়গাটা যেন পরিচিত মনে হইতেছে।

বুধী আগাইয়া গিয়া দেখিল। এই আমবাগান তো সে ইহার আগেও দেখিয়াছে; যে দলটির সঙ্গে সে সেবার গিয়াছিল—এই আমবাগানে তাহারা একদিন রাত্রি কাটায়; পাশের পথটা ওটাও সে চেনে।

বুধী সেই পথ বাহিয়া আগ্রহের সহিত হাঁটিয়া চলিল—যতই যায় ততই তাহার বেশ মনে পড়িতে লাগিল, এই পথ তাহার পরিচিত। এ পথে সে আগে আসিয়াছে। এমনকী একদিন মনে হইল, তাহাদের গ্রাম আর বেশি দূরে নাই। ওই পথে সে পাউণ্ডঘর হইতে ফিরিয়াছে দু-তিনবার। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে বুধীর মনে হইল তার হৃৎস্পন্দন বুঝি বন্ধ হইয়া যাইবে! ওই তো তাহাদের গ্রাম, তাহাদের গ্রামের সেই বড়ো অশ্বথ গাছটা, ওই তো সেই বেগুনের খেত—খেতের পাশেই তাহাদের নদী; ওই তো গ্রামের ভাগাড়, ভাগাড়ের পাশে ভাঙা ইটখোলা।

বুধী দৌড় দিল; তখন আনন্দে সে প্রায় জ্ঞানশূন্য।

সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। বুধী দূর হইতে বাড়ি দেখিতে পাইল। গাবতলায় যে আনারসের জমি ছিল, বুধী আনন্দে উৎসাহে আনারসের খেতের বেড়া ভাঙিয়া ছুটিতে ছুটিতে বাড়ির উঠানে গিয়া পৌঁছিতেই কোথা হইতে এক তীক্ষ্ণ মিষ্টি ক্ষুদ্র মেয়েলি কণ্ঠের আনন্দ ও বিস্ময় ভরা চিৎকার শোনা গেল—’ওমা, ও ঠাকুরমা, শিগগির, শিগগির এসে দ্যাখো কে এসেছে—শিগগির এসো—’

পরক্ষণে বুধী তার গলায় দুটি নরম কচি হাতের সাগ্রহ নিবিড়ো বেষ্টন অনুভব করিল। খুকির মা বাহিরে আসিয়া বলিলেন, কে এসেছে বলছিস খুকি?…ওমা ও কে, বুধী না?

খুকির ঠাকুরমা আসিয়া বলিলেন—বুধী এল কোত্থেকে! আহা, কী হাড়সার হয়ে গিয়েছে, ওকে যে আর চেনা যায় না।

খুকির মা বলিলেন—ও কী করে পালিয়ে এল আজ দু-মাস পরে! ঠিক দু-মাস হয়েছে। আমি তখন বলেছিলুম চালানে পালে গোরু বেচে না ওরা—শুনেচি নাকি কলকাতায় কসাইখানায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে। সত্যি মিথ্যে জানিনে বাপু এইরকম কিন্তু সবাই বলে। তোমরা তখন শুনলে না—ভাবলে বুড়ো গোরু দুধ তো আর দেবে না—বেচে ফেলে আপদ মিটিয়ে দিই। সংসারের মঙ্গল হত ভাবচ ওই গোরু যদি বেঘোরে মারা যেত! ও কী করে পালিয়ে এল তাই ভাবি! বোধ হয় রাস্তা থেকে পালিয়েছে পাল থেকে, কী হাড়সার হয়ে গিয়েছে, মা গো মা!

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। বুধী গোয়ালে শুইয়া পড়িয়াছে। এই তাহার আপনার গৃহ—এখনও তাহার বিশ্বাস হইতেছে না যে সত্যই বাড়ি ফিরিয়াছে। এই তাহার আবাল্য পরিচিত গোহাল, এই সেই বিচালির গাদা, সেইরকম ঘন সাঁজালের ধোঁয়ায় গোয়াল অন্ধকার—একটাও মশা নাই, বাছুরটা একপাশে সানি খাইতেছে। খুকিদের রান্নাঘরে খুকির মা রাঁধিতেছেন, খুকির উচ্চকণ্ঠ শোনা যাইতেছে। কাল সকালে নদীর ধারে তার প্রিয়, পরিচিত মাঠটিতে সে ঘাস খাইতে

বাইবে, আর একটা সাথি বন্ধু জুটিয়া যাওয়াও বিচিত্র নয়।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • toto
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor/li>
  • slot gacor/li>
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor/li>
  • slot gacor/li>
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor/li>
  • slot hoki/li>
  • situs toto/li>
  • slot gacor/li>