Thursday, May 28, 2026
Homeবাণী ও কথাআমি একটা মানুষ নই – আশাপূর্ণা দেবী

আমি একটা মানুষ নই – আশাপূর্ণা দেবী

আমি একটা মানুষ নই – আশাপূর্ণা দেবী

একটা মাঝারি সাইজের সুটকেসের মধ্যে নেহাৎ দরকারি, বলতে গেলে অপরিহার্যই কয়েকটা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল স্বাতী। একটু যেন বিপদেই পড়ে যাচ্ছে। অপরিহার্যর সংখ্যাও যে এত তা তো আগে খেয়াল হয়নি।

কিন্তু কী নেবে, কী নেবে না?

অরিন্দমের দেওয়া নয়, অথবা অরিন্দমের পয়সায় কেনা নয়, এমন জিনিস কটা আছে স্বাতীর? কোথায় আছে? মাঝে মাঝে মা বাবার উপহার কিছু দামী দামী শাড়ি। আর কী?

হঠাৎ মনটাকে ঝেড়ে ফেলে। ঠিক আছে, এতদিন ওর সংসারে আমি যে সার্ভিস দিয়েছি, তার জন্যে আমার কিছু পারিশ্রমিকও প্রাপ্য নেই কি?

মনে এই জোর নিয়ে আরো দুচারটি জিনিস টেনে বার করল আলমারি খুলে। এই সময় অরিন্দম এসে ঘরে ঢুকল। হৃত চেহারা, মুখের রংটায় যেন কালির পোঁচ।।

টাইটা খুলে মাটিতে ফেলে দিয়ে বিছানার ধারে বসে পড়ে ভাবশূন্য গলায় যেন প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলল, তবু এতদিন আমরা প্রেস্টিজের ওপরই ছিলাম। এবার সকলের সামনে উলঙ্গ হয়ে গেলাম।

স্বাতী আলমারির পাল্লাটা দুম করে বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, হ্যাঁ, কুষ্ঠগ্রস্ত শরীরটাকে শাটিনের পোশাকে ঢেকে রাখা হচ্ছিল। সেটা আর কতদিন চলতে পারে?

কুষ্ঠগ্রস্ত! কী অনায়াসে উচ্চারণ করল স্বাতী!

অরিন্দম উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।

রাস্তায় আলোর সমারোহ। আশেপাশে সামনে পিছনে কাছেদূরে অজস্র বাড়ি, অজস্র ফ্ল্যাট। সব জানলা দিয়েই আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে।

অরিন্দম মনে মনে বলল, ওরা সবাই সুখী। ওদের কারো শরীর কুষ্ঠগ্রস্ত নয়। আবার হঠাৎ হাসি পেল। আমারও সব ঘরের জনলায় জনলায় তো আলোর জোয়ার। ওরা কি বুঝতে পারছে এখানে কী গভীর অন্ধকার নেমে এসেছে।

অরিন্দম আবার জানলা থেকে সরে এসে খাটের ওপর বসে পড়ে। আস্তে বলে, আচ্ছা, স্বাতী!

স্বাতী কোনো উত্তর দেয় না। অরিন্দম একটু হাসির মতো গলায় বলে, ভাবছিলাম, হঠাৎ মনের জোর করে ভাবতে পারা যায় না, আমরা ঠিক আছি। আমাদের কোথাও কোনো ব্যাধির ছাপ পড়েনি।

স্বাতী মুখটা বাঁকায়। তেতো গলায় বলে, অনেক কাল সে মনের জোর দেখাবার চেষ্টা করেছিল। এখন সেই ঠাট অসহ্য হয়ে উঠেছে। ওসব তো অনেক হয়ে গেছে। সবেরই একটা সীমা আছে।

অরিন্দম স্বাতীর কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়।

বলে, বলার আমার মুখ নেই স্বাতী। তবু খুব বেহায়া বলেই বলছি, আর একটি বারের জন্যে কি আমায় একটু চান্স দিতে পারা যায় না?

দোহাই তোমার।

স্বাতী তীব্র তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, আর এইসব নাটক করতে এসো না। রেহাই দাও আমায়। মনে রেখো আমি একটা রক্তমাংসের মানুষ!

অরিন্দম চুপ করে গেল।

স্নানের ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। আর ঢুকেই একটা অদ্ভুত কাজ করে বসল। ঠাস ঠাস করে নিজের গালে গোটাকতক চড় মেরে চাপা আর্তনাদের গলায় বলে চলল, কেন? কেন? ইডিয়ট রাস্কেল, হতভাগা বাঁদর, কেন? কেন?

অরিন্দম স্নানের ঘর থেকে ফিরে এসে দেখল সুটকেসের ডালাটা ভোলা। স্বাতী জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাতীও হয়তো অন্য সবাইয়ের আলোয় ভাসা জানলাগুলো দেখছে।

অরিন্দমের ফিরে আসাটা অনুভব করে স্বাতী ফিরে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গের গলায় বলল, ইচ্ছে হলে সুটকেসটা সার্চ করতে পারো। খোলা আছে।

স্বাতী! ছিঃ!

এর মধ্যে ছিঃ-র কিছু নেই। ভাবতে পারো বেশ কিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছি। ব্যাঙ্কের পাশবইটই সব যেখানে থাকবার রইল। আর–

থাক স্বাতী। এসব কথা থাক এখন।

ক্লান্ত ক্লিষ্ট গলায় বলল অরিন্দম, ঝিলিক কোথায়?

এসময় কোথায় থাকে? মাস্টারমশাইয়ের এখনো যাবার টাইম হয়নি।

ওঃ। টাইম?

তারপর স্বগোতোক্তির মতো বলল অরিন্দম, কাল থেকে?

স্বাতী নিষ্ঠুর গলায় বললল, সে নিয়ে না ভাবলেও চলবে তোমার।

স্বাতী কি এই নিষ্ঠুরতার জোরে নিজেকে শক্ত রাখতে চায়? নাকি নিজের দিকের পাল্লাটা হঠাৎ হালকা হয়ে যাবার ভয়ে বাড়তি বাটখারা চাপাতে চায়? তা নইলে অরিন্দম যখন বলে ফেলে, ওর সম্পর্কেও কিছু ভাববার অধিকার নেই আর আমার?

তখন স্বাতী মুখটা এত বিকৃত করে বলে ওঠে কেন, না, নেই। একটা বেহেড মাতাল লুজ ক্যারেক্টার জুয়াড়ি বাপের সে অধিকার থাকে না।

অরিন্দম আর কিছু বলে না। ঘর থেকে বেরিয়ে সরু ব্যালকনিটায় গিয়ে দাঁড়ায়। অনেক নিচে রাস্তা। এ ফ্ল্যাটটা পাঁচতলায়।

একদিন মাঝরাত্তিরে স্বাতী এখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেষ্টা করেছিল। অনেক চেষ্টায় নিবৃত্ত করা গিয়েছিল সেদিন।

অরিন্দম যেন নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হচ্ছে। আমি কি একটা জানোয়ার? বকলস বাঁধা কুকুর একটা? তাই ‘অজন্তা’ নামের সেই মোহিনী নারীর সামনে গেলেই অনায়াসে সে বকলসটায় শেকল পরিয়ে আমায় যথেচ্ছ চালিয়ে নিয়ে বেড়াতে পারে?

হঠাৎ সীতেশের ওপর অসম্ভব একটা রাগে থরথরিয়ে উঠল অরিন্দম। সীতেশকে ও খুন করবে। সীতেশকে ও-হা, সবটাই সীতেশের বদমাইশি। বৌকে দিয়ে ফাঁদ পাতিয়ে জুয়ার আড্ডা বসিয়ে বন্ধুদের সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে।

উঃ। স্বাতী যদি আর একবারের জন্যে অরিন্দমকে চান্স দিত।

দেবে না। স্বাতী এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।

তবু চেষ্টা করা যায় না?

স্বাতী।

স্বাতী কি বলতো কে জানে? আদৌ কিছু বলতো কিনা! হঠাৎ এই সময় প্রায় আছাড় খেতে খেতে ছুটে এল ঝিলিক মা-মণি।! মা-মণি! বিন্দুমাসি না কী অসভ্য জানো? বলছে, আমরা আর কক্ষণো এখানে আসব না। মামার বাড়িই থাকব। এখানে। বাপী শুধু একা থাকবে।

অরিন্দম তার এই রুষ্ট ক্ষুব্ধ উত্তেজিত বছর পাঁচেকের মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে প্রবল শক্তিতে গলার কাছে ঠেলে ওঠা হাহাকারটাকে গলার মধ্যে আটকে রেখে বলল, তোমার বিন্দুমাসি একটা বোকা।

হি হি হি। ঠিক বলেছ বাপী। বোকার ঢিপি একেবারে। বলে কিনা, দেখিস আমার কথা সত্যি হয় কিনা?

আশ্চর্য! এই যখন তখন বেহেড হয়ে যাওয়া মাতাল আর শিথিল চরিত্র জুয়াড়ি বাপের প্রতি লেশমাত্রও ঘৃণা অবজ্ঞা বিতৃষ্ণা দেখা যায় না ঝিলিকের। বাপের গালে গালটা নিবিড় করে চেপে ধরে আদুরে গলায় বলে, থাকলেই হলো! আমার যেন

ও অঙ্ক পরীক্ষা নয়। আমরা তো শুধু দিদিভাইয়ের অসুখ দেখে কালই চলে আঘ, তাই না মামণি?

হ্যাঁ, মেয়ের কাছে এই কথাটাই বলা হয়েছিল। বাড়ির কাজ করা লোকেদের কাছেও। স্বাতীই বলেছিল। শাটিনের যে জামাটা ফেঁসেই গিয়েছে, সেটাকেই কোনোমতে ব্যাধিগ্রস্ত দেহটায় ঢাকা চাপা দিয়ে এখানের মঞ্চে যবনিকা টেনে বিদায় নিতে চাইছিল।

কিন্তু দেখা গেল, স্বাতীর সে চেষ্টা সফল হয়নি। বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল স্বাতী। যে ব্যাপারটাকে সে ঘুণাক্ষরেও ওদের কাছে প্রকাশ করেনি, যার জন্যে আজ পর্যন্ত সংসার মঞ্চের সমস্ত খুঁটিনাটি অনিয়টিও নির্ভুল ভাবে করেছে; শঙ্কুকে বলে রেখেছে মাছের খানিকটা যেন আগামীকালের জন্য ফ্রীজে ঢুকিয়ে রাখে, রান্না করা কড়াটা যেন তুলে না রেখে মাজতে দেয়। বিন্দুকে বলেছে, চায়ের বাসনগুলো আর একটু সাফ করে ধুয়ো বিন্দু। দেখ কী রকম দাগ ধরে রয়েছে। এমন কি বেরোতে দেরি হবে বুঝেও ঝিলিকের মাস্টারমশাইকে আসতে বারণ করে দেয়নি।

হ্যাঁ, রাতের দিকেই চলে যেতে চায় স্বাতী। সেখানে গিয়েই যাতে শুয়ে পড়তে পারে। সদ্য সদ্য কারো সঙ্গে কথা বলতে না হয়। আর এখান থেকেও শত চক্ষুর সামনে দিয়ে–। যদিও মেয়ে নিয়ে আর মাঝারি একটা সুটকেস নিয়ে বেরিয়ে পড়ার। মধ্যে কারো কোনো সন্দেহ উদ্রেকের কারণ থাকার নয়। তবু চোরের মন ভাঙা বেড়ায়।

কিন্তু এত সতর্কতা সত্ত্বেও ওই বিন্দু কোম্পানী রহস্যভেদ করে বসে আছে। রাগে মাথা জ্বলে গেল স্বাতীর।

আর কী দরকার ছেঁড়া পোশাক টেনেটুনে গা ঢাকার চেষ্টায়?

তাই স্বাতী রূঢ় গলায় বলে ওঠে, না! চলে আসব না। আমরা ওখানেই থাকব। ওখান থেকেই পরীক্ষা দেবো। এখানে আর আসব না।

আঁ আঁ অ্যাঁ। কক্ষণো না। ও বাপী। দেখো না—

বাপীর শরণ নিলেও, তার কোল থেকে সড়াৎ করে নেমে পড়ে ঝিলিক। ঘরের মধ্যে দাপাদাপি করে বেড়ায়, মায়ের শাড়ি ধরে টান মারে। নিজের ক্লিপ-আঁটা পরিপাটি আঁচড়ানো চুলগুলোকে দুহাতে টেনে খামচে ক্লিপ খুলে ফেলে নুড়ো নুড়ো করে বলতে থাকে, কেন আমরা ওখানেই থাকব? ওটা তো টিনাদি আর বাপ্পাদার বাড়ি। আমরা কেন সবদিন থাকব? আমাদের বুঝি নিজেদের বাড়ি নেই?

না, নেই।

নিষ্ঠুরতার হিংস্র খেলায় মেতে উঠতেই বুঝি স্বাতীর গলা থেকে একটা অমোঘ স্বর বেরিয়ে আসে, মেয়েদের নিজেদের কোনো বাড়ি থাকে না। চিরকাল তাদের পরের বাড়িই থাকতে হয়।

ছোট্ট মেয়েটার ওপর এই রূঢ় আঘাত হয়তো স্বাতীর এই ছেড়ে চলে যাওয়া বাড়িটার মালিকের প্রতি একটা কুদ্ধ ঈর্ষা থেকে জমে ওঠা।।

ওর সব ঠিকঠাক রইল। এই সাজানো ঘরবাড়ি জানলায় জানলায় রঙিন পর্দা, দেওয়াল ধারে রঙিন টিভি, দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি, টেবিলে ফুলদানী, ওয়ার্ডরোবের মাথায় তিব্বতী বুদ্ধমূর্তি, কাশ্মীরী আখরোট কাঠের আঙুরগুচ্ছ, ঝকঝকে স্টীলের ফ্রেমে আটকানো ঝিলিক-এর প্রথম স্কুলে যাওয়ার স্কুল-ড্রেস-পরা ছবিটি।..খাবার টেবিলে নুন মরিচের শৌখিন কৌটো, ফ্রীজে মাছ, কী নয়?

সব, সব। যেখানে যা কিছু সাজিয়েছিল স্বাতী এই আটটা বছর ধরে, তার একচুল এদিক ওদিক হবে না। শুধু স্বাতীই এখান থেকে পিছনে সরে গিয়ে আবার সেখানে গিয়ে পড়বে, যেখানে স্বাতীর জন্যে এখন আর কোনো জায়গা নেই। অনধিকারিণীর ভূমিকা নিয়ে কয়েকটা বোদা মুখের সামনে ঘুরে ফিরে বেড়াতে হবে। আর বাইরে ছুটোছুটি করে বেড়াতে হবে পায়ের তলার জন্যে একটু মাটি খুঁজে বেড়াবার জন্যে। যে বাড়িতে সেই তার জন্মাগারে মাটির প্রশ্ন নেই স্বাতীর। তার বাবা দুহাতে রোজগার করেছেন দুহাতে খরচ করে গেছে, চিরকাল ভাড়া বাড়িতেই কাটিয়ে গেছে। আজো সেটাই ঝিলিকের মামার বাড়ি।

সে বাড়িতে একদা স্বাতীর নিজস্ব একখানা ঘর ছিল। পড়ার টেবিল পাতা ছিল। এখন সেটা টিনা আর বাপ্পার পড়ার ঘর।

স্বাতী জানে এসব। স্বাতীর চোখে ভেসে ভেসে উঠছে তার মায়ের ঘরের অর্ধাংশটুকু। লু স্বাতীর চলে যাওয়া ছাড়া পথ নেই। আগুন থেকে তো ছুটে পালাতে হবে। তারপর জলে তলিয়ে যাবে, না চোরাবালিতে পা ফেলে ধসে বসে যাবে, কে জানে!

তবে কেন স্বাতী রূঢ় থেকে রূঢ়তর হবে না, ওই ছোট্ট মেয়েটার ওপর? এটাই তো অরিন্দমকে ঘায়েল করবার একটা প্রকৃষ্ট হাতিয়ার।

অসভ্যতা কোরো না বলছি ঝিলিক। চলো খেয়ে নেবে চলো।

যদিও ও বাড়িতে বেশি রাতেই চলে যেতে চেয়েছিল। আগে বলেছিল, মার কাছে গিয়েই খেয়ে নেব। তবু অরিন্দম বলেছিল, শেষ সন্ধ্যেটা আমায় দাও স্বাতী? খাবার টেবিলে ঝিলিককে নিয়ে আমরা দুজন–

হ্যাঁ, এই পরম সৌভাগ্যসুখটুকু ভিক্ষা চেয়েছিল অরিন্দম। যেটা নাকি সে দিনের পর দিন মাসের পর মাস অবহেলায় পরিত্যাগ করে এসেছে।

অরিন্দম রাতে যখন ফেরে, ঝিলিকের তো তখন অর্ধেক রাত। ‘বাপীর সঙ্গে’ খাব বলে জেগে বসে থেকে থেকে মায়ের তাড়নায় খেয়ে নিয়ে হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

আজ অরিন্দম কাতর প্রার্থনা জানিয়েছে ঝিলিককে সঙ্গে নিয়ে খাবার টেবিলে বসবে।

কিন্তু এখন সেই পরম মুহূর্তে—

স্বাতী যখন বলে উঠল, অসভ্যতা কোরো না ঝিলিকি। খেয়ে নেবে চলো।

আর অরিন্দম ‘আয়’ বলে আবার তাকে কোলে তুলে নিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল তখন ঝিলিক অসভ্যতার চূড়ান্ত করে বাপকে ঠেলে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, যাব না। খাব না তোমাদের সঙ্গে। থাকব না তোমাদের বাড়ি। আমি রাস্তায় চলে যাব। ‘রাস্তার মেয়ে’ হয়ে যাব। ফুটপাথে ঘুমোব, খাবারের দোকান থেকে বাসি খাবার চেয়ে চেয়ে খাব-ছেঁড়া জামা পরে—গায়ো ধুলো মেখে–

ঝিলিক!

স্বাতী প্রায় বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বলে, বড় বাড় বাড়িয়েছ দেখছি। এসব অসভ্য কথা শিখছ কোথা থেকে, অ্যাঁ! যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছ। মানেটা কী? কোথা থেকে শিখছ এসব বিচ্ছিরি কথা?

অরিন্দম একটু ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলে, আশা করি ও ব্যাপারে আমায় সন্দেহ করছ না!

থামো। তোমার প্রশ্রয়েই এরকম হয়েছে। সন্তান সম্পর্কে দায়িত্ববোধ নেই, কর্তব্যের বালাই নেই, আছে শুধু আদিখ্যেতা দেওয়া আদর। …ঝিলিক! ও কী! ওটা কী হচ্ছে?

কী হচ্ছে। দেখে চীৎকার করে ওঠবারই কথা।

ঝিলিক তার গায়ে পরে থাকা হালকা সুন্দর রেশমি ফ্রকটার ঝালর তুলে দাঁত দিয়ে টেনে টেনে ছিড়ছে।

ধৈর্য রাখা সত্যিই সম্ভব নয়।

নিজের জীবনের সমস্ত ছন্দ, সমস্ত স্বাচ্ছন্দ্য সম্পদ আরাম আয়েস জৌলুস ব ভেঙেচুরে ছিঁড়ে তছনছ করে চলে যেতে হচ্ছে। এই ভয়ঙ্কর মানসিক যন্ত্রণার সময় ওই ক্ষুদে মেয়েটা এইভাবে শত্রুতা করতে বসল।

জামা ছিঁড়ছিস যে?

ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল স্বাতী ছোট্ট মেয়েটার ফুলের মতো গালে।

কিন্তু মেয়েও আজ নির্ভীক, অনমনীয়।

ছিঁড়বই তো জামা। কাদা মাখাব। এই এমনি চুল করব—

বলে দুহাতে চুলগুলো নুড়ো নুড়ো করে মুখ চোখে ছড়িয়ে দেয়।

হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, রাস্তার মেয়েছেলেরা বুঝি ভাল জামা পরে? ভাল করে চুল আঁচড়ায়?

অরিন্দম তাকিয়ে দেখে। মেয়েটার গালে ‘ঠাস’-এর চিহ্নটা দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে। ওর কাছে গিয়ে কোলে নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন আর ঝিলিক বাবারও নয়।

হাত পা ছুঁড়ে কোলে ভোলা আটকে বলে, না! কোলে নেবে না। রাস্তার ছেলে-মেয়েদের বাবা থাকে না, মা থাকে না, কেউ থাকে না। তারা কারুর কোলে চাপে না।

এই শোন লক্ষ্মী মেয়ে। হঠাৎ রাস্তার ছেলেমেয়ের মতন হতে যাবার খেয়াল চাপল কেন?

ঝিলিক সতেজে বলে, চাপবেই তো। কেন চাপবে না? যাদের বাড়ি-টাড়ি কিছু থাকে না, তারা তো রাস্তারই।

ঝিলিক! এবার আরো একটা চড় খেতে চাও? হঠাৎ এত সাহস এল কোথা থেকে? অ্যাঁ। কেন, মামার বাড়িতে যাও না কখনো? থাকো না সেখানে?

ঝিলিক একমনে চুলের পাট ভেঙে নুড়ো নুড়ো করতে করতে বলে, সে তো বেড়াতে! রোজ রোজ থাকতে যাই?

অরিন্দম একবার স্বাতীর দিকে তাকায়। স্বাতীর চোখ অন্যদিকে। অরিন্দম গাঢ়গম্ভীর গলায় বলে, রোজ রোজ থাকতে যাচ্ছিস এ কথা তোকে কে বলেছে রে? তুই তো এমনিই যাচ্ছিস! আবার কাল পরশু মিথ্যে কথা। সব মিথ্যে কথা।

ঝিলিক দাঁড়িয়ে উঠে জামাটা ফালি ফালি করে ছিঁড়ে গা থেকে খোসা ছাড়ানোর মতো ছাড়াতে ছাড়াতে ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বলে, আমি যেন কিছু বুঝতে পারি না। নিজেরা কেবল ঝগড়া করবে, মা ঝগড়া করে এ বাড়ি থেকে চলে গিয়ে দিদাদের বাড়ি থাকতে যাবে আর আমায় সেইখানে নিয়ে গিয়ে আর আসতে দেবে না! ভারী মজা পেয়েছে। নিজেরা ঝগড়া করবে আর আমায় যত ইচ্ছে কষ্ট দেবে! আমি যেন একটা মানুষ নই? নিজেরাই শুধু মানুষ। নিজেদের যা খুশি তাই চালাবে। না?… ঠিক আছে। যেও তুমি দিদার বাড়ি। আমি তো রাস্তার লোক হয়ে যাব। রাস্তায় পড়ে পড়ে মরে যাব। বেশ হবে। ঠিক হবে। তখন ভ্যা ভ্যা করে কেঁদো।

বলেই এতক্ষণের সমস্ত তেজ গৌরব ধূলিসাৎ করে নিজেই ভ্যা করে কেঁদে ফেলে উপুড় হয়ে পড়ে মাটিতে মুখ ঘষতে থাকে।

আর দু’জোড়া পাথরের চোখ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই দিকে।

কিন্তু ওই পাথরে চোখ দুটো কি একটা শিশুর এই দুরন্ত যন্ত্রণা দেখে মমতায় কোমল হয়ে আসবে? সেই কোমলতায় ওই যন্ত্রণার কাছে নিজেদের অসহিষ্ণুতার যন্ত্রণা খাটো করে দেখবে?

হুঁ। অত সোজা নয়।

যেই একজোড়া চোখ কোমল হয়ে মিনতি দৃষ্টিতে অপর জোড়ার দিকে তাকাবে, সেই অপর জোড়ায় জ্বলে উঠবে আগুনের ফুলকি। বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে ওই শিশুটার ওপর। হিঁচড়ে টেনে তুলে নিয়ে মারতে মারতে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওঠাবে।

দাঁতে দাঁত পিষে বলবে, বদমাশ মেয়ে, তোমার থিয়েটার করা বার করছি। আদর পেয়ে পেয়ে বাঁদর হয়ে উঠেছ। দেখবে চলো এবার কী করে শায়েস্তা করতে হয় দেখাচ্ছি। আমায় এখনো চেনো না তুমি।

আসলে হয়তো কথাগুলোর লক্ষ্য অন্যজন। এই শিশুটা উপলক্ষমাত্র। তবে কিছুতেই ভাববে না সত্যি এটা একটা মানুষ। একটা অসহায় শিশুর যন্ত্রণা বেদনা কাতরতা মস্ত একটা সমস্যার সমাধান করে ফেলবে, পৃথিবীটা এত সহজ জায়গা নয়।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot resmi
  • situs hk pools
  • desabet
  • slot gacor
  • slot hoki
  • desabet
  • desabet
  • ayamjp
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor