Saturday, April 20, 2024
Homeরম্য গল্পসরস গল্পহুমায়ূন আহমেদের জীবনের ৩২টি মজার ঘটনা

হুমায়ূন আহমেদের জীবনের ৩২টি মজার ঘটনা

হুমায়ূন আহমেদ যে ছিলেন একজন চূড়ান্ত ধরণের রসিক মানুষ, তা নিশ্চয়ই কাউকে নতুন করে বলে দিতে হবে না। রসবোধ বা হিউমার আমাদের নতুন করে শিখিয়েছেন তিনি। জীবনের স্বাভাবিক এবং সাধারণ সব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রসবোধটা তিনি বের করে আনতে পারতেন। পুরোদস্তুর মজার মানুষ যাকে বলে, সেই রকম একজন হুমায়ূন আহমেদের জীবনে মজার ঘটনা থাকার কথা অগণিত! আছেও তাই! সেখান থেকে নির্বাচিত কিছু মজার ঘটনা সংগ্রহ করে আমাদের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

১। আমার প্রথম স্কুলে যাওয়া উপলক্ষে একটা নতুন খাকি প্যান্ট কিনে দেয়া হল। সেই প্যান্টের কোন জিপার নেই, সারাক্ষণ হাঁ হয়ে থাকে। অবশ্যি তা নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না। নতুন প্যান্ট পরছি, এই আনন্দেই আমি আত্মহারা। মেজো চাচা আমাকে কিশোরীমোহন পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন এবং হেডমাস্টার সাহেবকে বললেন, চোখে চোখে রাখতে হবে। বড়ই দুষ্ট। আমি অতি সুবোধ বালকের মত ক্লাসে গিয়ে বসলাম। মেঝেতে পাটি পাতা। সেই পাটির উপর বসে পড়াশোনা। মেয়েরা বসে প্রথম দিকে, পেছনে ছেলেরা। আমি খানিকক্ষণ বিচার বিবেচনা করে সবচেয়ে রূপবতী বালিকার পাশে ঠেলেঠুলে জায়গা করে বসে পড়লাম। রূপবতী বালিকা অত্যন্ত হৃদয়হীন ভঙ্গিতে সিলেটি ভাষায় বলল, এই তোর প্যান্টের ভেতরের সবকিছু দেখা যায়। ক্লাসের সব ক’টা ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হেসে উঠল। সবচেয়ে উচ্চস্বরে যে ছেলেটি হেসেছে, তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। হাতের কনুইয়ের প্রবল আঘাতে রক্তারক্তি ঘটে গেল। দেখা গেল ছেলেটির সামনের একটি দাঁত ভেঙ্গে গেছে। হেডমাস্টার সাহেব আমাকে কান ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দিলেন, এ মহাগুণ্ডা, তোমরা সাবধানে থাকবে। খুব সাবধান। পুলিশের ছেলে গুণ্ডা হওয়াই স্বাভাবিক। ক্লাস ওয়ান বারোটার মধ্যে ছুটি হয়ে যায়। এ দুই ঘণ্টা আমি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সময়টা যে খুব খারাপ কাটল তা নয়। স্কুলের পাশেই আনসার ট্রেনিং ক্যাম্প। তাদের ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। লেফট রাইট। লেফট রাইট। দেখতে বড়ই ভাল লাগছে। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম বড় হয়ে আনসার হবো।

২। ক্লাস টুতে উঠে আমি আরেকটি অপকর্ম করি। যে রূপবতী বালিকা আমার হৃদয় হরণ করেছিল, তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি। প্রকৃতির কোন এক অদ্ভুত নিয়মে রূপবতীরা শুধু যে হৃদয়হীন হয় তাই না, খানিকটা হিংস্র স্বভাবেরও হয়। সে আমার প্রস্তাবে খুশী হবার বদলে বাঘিনীর মত আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খামচি দিয়ে হাতের দুতিন জায়গার চামড়া তুলে ফেলে। সে-ই স্যারের কাছে নালিশ করে। শাস্তি হিসেবে দুই হাতে দুটি ইট নিয়ে আমাকে দু’ঘণ্টা নিলডাউন হয়ে বসে থাকতে হয়।

৩। থ্রি থেকে ফোরে উঠব। বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। বাড়িতে বাড়িতে পড়াশোনার ধুম। আমি নির্বিকার। বই নিয়ে বসতে ভাল লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেই বসাটা পুরোপুরি ভান। সবাই দেখল আমি বই নিয়ে বসে আছি এই পর্যন্তই। এমন এক সুখের সময়ে ক্লাসের বন্ধু ‘মাথা মোটা’ শংকর খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে জানাল, তার মা তাকে বলেছেন সে যদি ক্লাস থ্রি থেকে পাশ করে ফোর-এ উঠতে পারে তাহলে তাকে ফুটবল কিনে দেবেন। সে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্যে। কি করে এক ধাক্কায় পরের ক্লাশে ওঠা যায়। একটা চামড়ার ফুটবলের আমাদের খুবই শখ। সেই দিনই পরম উৎসাহে শংকরকে পড়াতে বসলাম। যে করেই হোক তাকে পাশ করাতে হবে। দু’জন একই ক্লাসে পড়ি। এখন সে ছাত্র, আমি শিক্ষক। ওকে পড়ানোর জন্যে নিজেকে প্রথম পড়তে হয়, বুঝতে হয়। যা পড়াই কিছুই শংকরের মাথায় ঢোকে না। যাই হোক প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হল। দু’জন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সমস্ত শিক্ষকদের স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম।

৪। বাবা বদলি হলেন দিনাজপুরের পঁচাগড়ে (পঞ্চগড়)। আমাদের তিন ভাইবোনকে স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেলেন বড় মামা। তিনজনই কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছি। বড় মামা আমাদের চোখের জল অগ্রাহ্য করে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। শুধু তা-ই নয়, হেডমাস্টার সাহেবকে বললেন, ‘আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে আমি বিনা বেতনে আপনাদের স্কুলে পড়াব। আপাতত আমার হাতে প্রচুর অবসর।’ হেডমাস্টার রাজি হলেন। আমি খানিকটা আশার আলো দেখতে পেলাম। যা হোক, একজন স্যার হলেন আমাদের নিজেদের লোক এবং অতি প্রিয় মানুষ। স্কুলের দিনগুলো হয়তো খারাপ যাবে না। দ্বিতীয় দিনেই বড় মামা আমাদের ক্লাসে অঙ্ক করাতে এলেন। আমি হাসিমুখে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘বড় মামা।’ মামার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। হুংকার দিয়ে বললেন, ‘মামা? মামা মানে? চড় দিয়ে সব দাঁত খুলে ফেলব। স্কুলে আমি তোমাকে চিনি না। তুমিও আমাকে চেনো না। বলো, ৬-এর ঘরের নামতা বলো। পাঁচ ছয় কত?’ আমি হতভম্ব। একি বিপদ! ছয়ের ঘরের নামতা যে জানি না এটা বড় মামা খুব ভালো করেই জানেন। কারণ তিনি আমাদের পড়ান। তিনি দুনিয়া-কাঁপানো হুংকার দিলেন, ‘কী, পারবে না!’

-না।
-না আবার কী? বলো, জি না।
-জি না।
-বলো, জি না স্যার।
-জি না স্যার।
-না পারার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা হবে। আত্মীয় বলে আমার কাছ থেকে পার পাওয়া যাবে না। আমার চোখে সব সমান। সবাই ছাত্র। ক্লাস-ক্যাপ্টেন কোথায়? যাও, বেত নিয়ে আসো। বেত আনা হলো। এবং সত্যি সত্যি বড় মামা ছয়টা বেতের বাড়ি দিলেন, যেহেতু ছয়ের ঘরের নামতা। স্কুলে মোটামুটি আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে গেল। ছাত্রমহলে রটে গেল, ভয়ংকর রাগী একজন স্যার এসেছেন। অতি কড়া, তাঁর ক্লাসে নিঃশ্বাস ফেলা যায় না। বড় মামার চাকরি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। স্থানীয় এসডিও সাহেবের ছোট ভাইকে কানে ধরে উঠবোস করানোর কারণে তাঁর চাকরি চলে গেল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

৫। পঁচাগড় থেকে বাবা বদলি হলেন রাঙামাটিতে। রাঙামাটিতে আমরা ছিলাম পাঁচ মাসের মতো। বাবা আবার বদলি হলেন বান্দরবান। বান্দরবানের সবই ভালো, শুধু মন্দ দিকটা হলো এখানে একটা স্কুল আছে। স্কুলে আমার একমাত্র আনন্দের ব্যাপার হলো মুরং রাজার এক মেয়ে পড়ে আমাদের সঙ্গে। গায়ের রং শঙ্খের মতো সাদা। চুল হাঁটু ছাড়িয়েও অনেক দূর নেমে গেছে। আমরা ক্লাস সিক্সে পড়ি, কিন্তু তাকে দেখায় তরুণীর মতো। তার চোখ দুটি ছোট ছোট, গালের হনু খানিকটা উঁচু। আমার মনে হলো চোখ দুটি আরেকটু বড় হলে তাকে মানাত না। গালের হনু উঁচু হওয়ায় যেন তার রূপ আরো খুলেছে। ক্লাসে আমি স্যারদের দিকেও তাকাই না। বোর্ডে কী লেখা হচ্ছে তাও পড়তে চেষ্টা করি না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি রাজকন্যার দিকে। সত্যিকার রাজকন্যা। আমার এই অস্বাভাবিক আচরণ রাজকন্যার চোখে পড়ল কি না জানি না, তবে একজন স্যারের চোখে পড়ল। তিনি আমাকে বিষদৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। প্রতিটি ক্লাসেই তিনি আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করেন, কিন্তু আটকাতে পারেন না; কারণ ইতিমধ্যে আমি একটা জিনিস বুঝে ফেলেছি, আমার স্মৃতিশক্তি অসম্ভব ভালো। যেকোনো পড়া একবার পড়লেই মনে থাকে। সব পড়াই একবার অন্তত পড়ে আসি। স্যার ঠিকই একদিন আমাকে আটকে ফেললেন। সমকোণ কাকে বলে জিজ্ঞেস করলেন, আমি বলতে পারলাম না। শাস্তির ব্যবস্থা হলো। বিচিত্র শাস্তি। বড় একটা কাগজে লেখা ‘আমি পড়া পারি নাই। আমি গাধা’ সেই কাগজ গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। স্যার একজন দপ্তরিকে ডেকে আনলেন এবং কঠিন গলায় বললেন, ‘এই ছেলেকে সব কটা ক্লাসে নিয়ে যাও। ছাত্ররা দেখুক।’ আমি অপমানে নীল হয়ে গেলাম। টান দিয়ে গলার কাগজ ছিঁড়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বললাম, ‘আপনি গাধা।’ তারপর এক দৌড় দিয়ে স্কুল থেকে বের হয়ে গেলাম। সন্ধ্যাবেলা লোক পাঠিয়ে শঙ্খ নদীর তীর থেকে বাবা আমাকে ধরিয়ে আনলেন। আমি আতঙ্কে কাঁপছি। না জানি কী শাস্তি অপেক্ষা করছে আমার জন্য। বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘স্যাররা তোমাকে পড়ান। শাস্তি দেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। তুমি আমার সঙ্গে চলো। স্যারের কাছে ক্ষমা চাইবে।’

বাবার সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে রওনা হলাম। স্যারের কাছে ক্ষমা চাইলাম। এর পর বাবা বললেন, ‘মাস্টার সাহেব, আমার এই ছেলেটা খুব অভিমানী। সে বড় ধরনের কষ্ট পেয়েছে। অপমানিত বোধ করেছে। তাকে আমি কোনো দিন এই স্কুলে পাঠাব না। সে বাসায় থাকবে।’

বাবা আমাকে কোলে নিয়ে বাসায় ফিরলেন। পরদিনই স্কুলের সব শিক্ষক বাসায় উপস্থিত। তাঁরা বাবাকে রাজি করাতে এসেছেন, যাতে আমি আবার স্কুলে যাই। বাবা রাজি হলেন না।

৬। তখন পড়ি ক্লাস এইটে। চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল। বাংলা স্যার বললেন, রচনা লিখে আন। প্রিয় ঋতু। চার-পাঁচটা কোটেশন যেন থাকে। প্রতিটা বানান ভুলের জন্য পাঁচবার কানে ধরে উঠবোস। ডিকশনারি সামনে নিয়ে রচনা লিখবি। আমরা রচনা লিখলাম। স্যার আমার রচনা পড়ে রাগী গলায় বললেন, কী লিখেছিস ছাগলের মতো! বর্ষা প্রিয় ঋতু? লিখবি ঋতুরাজ বসন্ত। তাহলে না নাম্বার পাবি। ফুলের সৌরভ, পাখির কূজন। বর্ষায় ফুল ফোটে না। পাখিও ডাকে না। আমি বললাম, স্যার, বর্ষাই আমার প্রিয়। আপনার প্রিয় আপনার মধ্যে থাক। নাম্বার বেশি পেতে হবে না।

৭। হুমায়ূন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। হঠাৎ এক ছাত্র প্রশ্ন করলো, ‘স্যার, আপনি নাকি গরুর কথাও বুঝতে পারেন?’ হুমায়ুন আহমেদের ‘ছেলেবেলা’ বইটি পড়ে হয়তো এমন ধারণা হয়েছিলো ছাত্রটির। ক্লাসের মাঝখানে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় চলে আসায় হুমায়ুন আহমেদ বিরক্ত হলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, পারি। নইলে তোমাদের ক্লাস নিচ্ছি কীভাবে?’

৮। এক সাংবাদিক টেলিফোনে হুমায়ূন আহমেদের কাছে তার অবসর সময় কীভাবে কাটে জানতে চাইলেন। উত্তরে হুমায়ুন আহমেদ বললেন, ‘অবসর সময়ে আমি একটা কাঁচি নিয়ে বসি। কাঁচি দিয়ে কেটে সময় কাটাই!’

৯। ক্রিকেট নিয়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের খেলার সময় হুমায়ূন আহমেদের প্রবল উৎসাহ দেখে এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ ক্রিকেট বিষয়ে বিজ্ঞ নন দেখে সাংবাদিক হতাশ হয়ে বললেন, ‘আপনি যে ক্রিকেট বোঝেন না, এটা কি লিখতে পারি?’

-অবশ্যই লিখতে পারো।
-কিছু না বুঝেও ক্রিকেট কেন পছন্দ করেন-একটু ব্যাখ্যা করবেন?
-কারণ আমি গল্পকার।
-স্যার, একটু বুঝিয়ে বলুন।
-ক্রিকেটে এক ওভারে ছয়টি বল করা হয়। বল করা মাত্র গল্প শুরু হয়। নানান সম্ভাবনার গল্প। ব্যাটসম্যানকে আউট করার সম্ভাবনা, ছক্কা মারার সম্ভাবনা ইত্যাদি। ছয়টা বল হলো সম্ভাবনা-গল্পের সংকলন। এবার বুঝেছো?

১০। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। স্কুল-ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য ছাত্রদের কাছ থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি আহ্বান করা হয়। আমি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এমনকি ভ্রমণকাহিনী সবই জমা দিলাম। সংকলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রতিটি রচনাই পড়েছেন। বললেন কী লিখেছিস? সবই তো অখাদ্য। যাই হোক, তোর যখন এত আগ্রহ, তুই বরং ইংরেজিতে যা ইচ্ছে লিখে নিয়ে আয়, ছেপে দেব। ইংরেজি সেকশনে কোনো লেখা জমা পড়েনি। আমি লিখে ফেললাম একখানা কবিতা। ঈশ্বরবিষয়ক অতি উচ্চশ্রেণীর ভাব বিষয়ক ইংরেজি কবিতা। পরে সেটি ছাপা হয়। আমাদের ক্লাসের ইংরেজির শিক্ষক একদিন ক্লাসে এসে আমার কবিতাটি পড়ে শোনালেন। তিনি খুব মুগ্ধ আমার কাব্য প্রতিভায়। স্যার বললেন, ‘হুমায়ূন, তুই ইংরেজি কবিতা লেখার চর্চাটা ছাড়বি না।’ (সাক্ষাৎকার থেকে)

১১। আমেরিকার আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভ রাইটিং ফ্যাকাল্টির ক্লাস। হ‌ুমায়ূন আহমেদ সেখানে তিন মাসের একটি কোর্স করছেন। একদিন ক্লাসে শিক্ষক আইডিয়া বিষয়ে কথা বলছিলেন। এক ঘণ্টার ক্লাস। হুমায়ূন আহমেদ লেকচার শুনে বেশ বিরক্ত। বিষয়টি ওই শিক্ষকের নজরে পড়তেই বললেন, ‘ডক্টর আহমেদ, আইডিয়া বিষয়ে তোমার কিছু বলার আছে?’

হুমায়ূন আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন এবং পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘শিল্পীর শিরে কিলবিল করে আইডিয়া/উইপোকা বলে, চল ভাই, তারে খাই গিয়া।’

১২। গভীর রাতে হুমায়ূন আহমেদকে এক বিখ্যাত অভিনেতা ফোন করল। এত রাতে ফোন পেয়ে তিনি কিছুটা বিরক্ত।

অভিনেতা ফোন দিয়ে বললেন, হুমায়ূন ভাই আমার অবস্থা খুব খারাপ।

হুমায়ন আহমেদ বললেন, কেন কী হয়েছে?

অভিনেতা বললেন, পেটে প্রচুর গ্যাস হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, পেটে গ্যাস হয়েছে তো আমাকে কেন? তিতাস গ্যাসকে ফোন দেন।

১৩। হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ হার্ট অ্যাটাক করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি। একদিন হুমায়ূন আহমেদ দেখতে এলেন। সঙ্গে ডাক্তার-নার্সরাও রয়েছে। মাকে দেখে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘আম্মা এবার সিগারেটটা ছাড়েন।’

সবাই হেসে উঠলো। একজন নার্স হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবীবকে বললেন, ‘আপনার মা সিগারেট খান?’

আহসান হাবীব হেসে উত্তর দেন, ‘না। সিগারেট খেলে হার্ট অ্যাটাক হয় এমন ধারণা আছে আমাদের। তাই রসিকতা করেছে।’

১৪। হুমায়ূন আহমেদ প্লেনে করে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। ওনার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কে তো কম বেশি সবারই জানা আছে। প্লেনের মধ্যে হঠাৎ তাঁর সিগারেট খাওয়ার নেশা চেপে বসলো।

হুমায়ূন আহমেদ এয়ার হোস্টেসকে ডেকে বললেন, ‘সিগারেট খাওয়া যাবে?’

এয়ার হোস্টেজ উত্তরে বললেন, ‘না। প্লেনের ভিতর ধুমপান করলে দুইশত ডলার ফাইন।’

হুমায়ূন আহমেদ চারশো ডলার দিয়ে বললেন, ‘আমি এখন দুইটা সিগারেট খাব।’

এয়ার হোস্টেস ছুটে গেল পাইলটের কাছে। পরে পাইলট হুমায়ূন আহমেদকে ডেকে পাঠালেন ককপিটে। তারপর বললেন, ‘ডলার দিতে হবে না। তুমি এখানে বসে সিগারেট খাও।’

১৫। আশির দশকের মাঝামাঝি তখন। হুমায়ূন আহমেদ শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। নিয়ম মতো হল-প্রভোস্টের সঙ্গে আবেদনকারীর একটি সাক্ষাৎকার দিতে হয়। হুমায়ূন আহমেদ সেখানে গেলেন। সঙ্গে ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। কোথায় কী করতে হবে এ সব ব্যাপারে তাকে তখন হুমায়ুন আজাদই সাহায্য করছিলেন।

প্রভোস্ট হুমায়ূন আহমেদকে অনেক প্রশ্ন করেছেন। অনেক কিছু বলেছেন। হুমায়ূন আহমেদ কিছু বলেননি। শেষে প্রভোস্ট তার বক্তব্য শুনতে চাইলে হুমায়ূন আহমেদ অম্লান বদনে বলে দিলেন, ‘আপনাকে আমার এখন পেটাতে ইচ্ছা করছে।’ প্রভোস্টের অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন।

এত কিছুর পরও কিন্তু হাউস টিউটরের চাকরিটা হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছিলেন।

১৬। হুমায়ূন আহমেদ একটা গাড়ি কিনেছেন। এরপর একদিন শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে বললেন, ‘আপনাদের মতো লেখকদের নিয়ে তো আর পারা যায় না।’ তারপর তিনি এক বৃষ্টিদিনের বিবরণ দিলেন সিরাজুল ইসলামের কাছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের গাড়িটা তখন শহীদুল্লাহ হলের মাঠে। বৃষ্টিতে ভিজছে। অর্ধেক প্রায় ডুবে গেছে। ছাত্ররা খবর দেওয়ার পর প্রভোস্ট হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেলেন হুমায়ূন আহমেদের রুমে। হুমায়ূন আহমেদকে বিষয়টা বলতেই তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তো এটা আমার রুম থেকেই দেখতে পাচ্ছি। সুন্দর একটা দৃশ্য। আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে গাড়িটা। একসময় পুরোটা ডুবে যাবে।’

১৭। হুমায়ূন আহমেদের ৫২তম জন্মদিনের কথা। শাহবাগ থেকে তাজা দেখে ৫২টা গোলাপ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি গেলেন একজন। গিয়ে দেখলেন বগুড়া থেকে এক লোক এসেছেন। উনি হুমায়ূন আহমেদকে বলছেন, ‘স্যার, আপনি চাইলে আমি আমার জান দিয়ে দিবো! আপনি আপনার নাটকে আমাকে একটা চান্স দেন।’ হুমায়ূন আহমেদ তার সহকারীকে ডেকে বললেন, ‘তুমি এর নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার লিখে রাখো তো। এ আমার জন্য জীবন দিতেও রাজি।’ সহকারী সব টুকে নিলে চলে গেল। এরপর হুমায়ূন আহমেদ ওই লোককে বললেন, ‘তুমি বাড়ি ফিরে যাও। যদি কখনো কিডনি লাগে তো তোমাকে ফোন দিবো। চলে এসো।’

১৮। তখন হুমায়ূন আহমেদ তার দেশের বাড়িতে। একদিন রাতের বেলা হুমায়ূন আহমেদ তার মাকে ঘুম থেকে ডেকে বললেন, ‘আম্মা, আমি গরুর কথা শুনছি এবং বুঝতে পারছি।’ তার মা তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘ঘুমা। গরুর কথা আবার মানুষে শোনে কীভাবে?’ কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার কথায় অটল। তিনি গরুর কথা বুঝতে পারছেন। তারপর তার মা তাকে কোলে করে গরুর ঘরে নিয়ে বলেন, ‘ঐ দ্যাখ, গরুর ঘরে মানুষ ঘুমায়।’ হুমায়ূন আহমেদ অবশ্য বড় হয়েও বলতেন যে, তিনিই সঠিক ছিলেন। গরুই কথা বলছিলো।’

১৯। হুমায়ূন আহমেদ পিএইচডি করে আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের চাকরিতে ঢুকেছেন। হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব। তিনি খুবই সিরিয়াস টাইপের মানুষ। ইংরেজি সাহিত্যের এক সেমিনারে নিয়ে গেছেন হুমায়ূন আহমেদকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য ইংরেজির অধ্যাপক বক্তৃতা দিচ্ছেন। হুমায়ূন আহমেদ ভদ্রলোককে চেনেন এবং তাঁর সম্পর্কে জানেন সবই। তবু তাঁর বক্তৃতা শুনে একটু মজা করতে চাইলেন। ভদ্রলোক বক্তৃতা শেষ করে স্টেজ থেকে নেমে আসার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে বললেন, ‘স্যার, আপনার চিবিয়ে চিবিয়ে বলা ইংরেজি আমার ভালো লেগেছে।’ সেই ভদ্রলোক ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে এতই পশ, জীবনে এ ধরণের কথা বোধহয় শোনেনই নি। হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি একটা কাজ করুন, আমার বক্তৃতার দু-একটি বাক্য না চিবিয়ে উচ্চারণ করুন তো।’ হুমায়ুন আজাদ গিয়েছিলেন ওয়াশরুমে। সেখান থেকে এসে পরিস্থিতি সামাল দিলেন। ইংরেজির অধ্যাপককে বললেন, ‘স্যার, ও তো আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।’ ভদ্রলোক হুমায়ূন আহমেদকে চিনতে পারেননি। নাম শুনে রাগ-বিরক্তি ভুলে গেলেন। হাসিমুখে বললেন, ‘আরে, আমি তো আপনার লেখার ভক্ত।’

২০। হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র বানাবেন। আগুনের পরশমণির প্রধান চরিত্র বদিউল আলমকে খুঁজছেন। একদিন শিল্পী ধ্রুব এষকে দেখে তিনি সেই চরিত্রের জন্য পছন্দ করে ফেললেন। কারণ, বদিউল আলমের নির্লিপ্ত ভঙ্গি ধ্রুব এষের মধ্যে পুরোপুরিই আছে। প্রস্তাব শুনে ধ্রুব এষ বললেন, ‘অসম্ভব! আমি জীবনে অভিনয় করিনি’। হুমায়ূন আহমেদ মুচকি হেসে বললেন, ‘তাতে কী? আমিও তো জীবনে সিনেমা বানাই নি!’

২১। হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকের দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা। তখন বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা হলে বাংলাবাজার এলাকার কোনো গলির ভেতর একটা রুম ভাড়া নিয়ে ‘কম্পোজ সেকশন’ করা যেত। সিসা দিয়ে তৈরি টাইপ সাজানো থাকে এক ধরনের কাঠের ছোট ছোট খোপওয়ালা পাত্রে। সামনে টুল নিয়ে বসে একটা একটা করে টাইপ তুলে পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী লাইনগুলো তৈরি করে কম্পোজিটর, পৃষ্ঠা তৈরি করে। একেক খোপে একেক অক্ষরের টাইপ। ১৬ পৃষ্ঠা তৈরি হলে এক ফর্মা। ভারী একটা তক্তার ওপর ওই টাইপের দুটো করে পৃষ্ঠা। মোট আটটি ওরকম কাঠের তক্তা চলে যায় মেশিনে। অর্থাৎ একটা ফর্মা।

এভাবে ছাপা হয় বই। যারা বই ছাপার কাজ করে, ওরকম প্রেসগুলোরও অনেকেরই থাকে ‘কম্পোজ সেকশন’। ওসব ক্ষেত্রে ইনভেস্টমেন্টটা বেশি। আর মেশিন ছাড়া শুধু ‘কম্পোজ সেকশন’ ছোটখাটোভাবে করেও অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করে কেউ কেউ। ওরকম কম্পোজ সেকশনের একটা সমস্যা হলো, কম্পোজিটররা অনেকেই সিসায় তৈরি টাইপ চুরি করে নিয়ে সের দরে বিক্রি করে ফেলে। পার্টনারশিপে যারা ‘কম্পোজ সেকশন’ করে তারা নিজেরাও এক পার্টনার আরেক পার্টনারের অজান্তে টাইপ চুরি করে। বিক্রি করলেই তো ক্যাশ টাকা।

একদিন রিকশায় বসে ইমদাদুল হক মিলন হুমায়ূন আহমেদকে বললেন, ‘হুমায়ূন ভাই, চলেন আমরা দুজন একটা বিজনেস করি।’

হুমায়ূন আহমেদ সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘কী বিজনেস?’

‘একটা কম্পোজ সেকশন করি।’

‘হ্যাঁ, করা যায়। ভালো আইডিয়া। কত টাকা লাগবে?’

‘একেকজনে দশ-পনেরো হাজার করে দিলে হয়ে যাবে।’

‘সেটা দেওয়া যাবে।’

‘তাহলে চলেন শুরু করি।’

‘তোমার টাকা রেডি আছে?

‘আরে না। দশ টাকাও নেই।’

‘তাহলে?’

‘ধার করতে হবে।’

‘সেটা না হয় করলে, তবে আমার একটা শর্ত আছে।’

‘কী শর্ত?’

হুমায়ূন আহমেদ ইমদাদুল হক মিলনের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন ‘চুরি করে টাইপ বিক্রির অধিকার সমান থাকতে হবে।’

এরপর দুজনই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন।

২২। ভীষণ গান ভালবাসতেন হুমায়ূন আহমেদ। বিভিন্ন সময় চমৎকার কিছু গান লিখেছেন। এর মধ্যে ‘যদি মন কাঁদে’ গানটি নিয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। নিউইয়র্কে একবার এই গানটি গেয়েছিলেন শাওন। সেখানে কয়েকজন দর্শক-শ্রোতা মন্তব্য করলেন ‘এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটা তো আগে শুনিনি। এটা তো চমৎকার।’

এরপর হুমায়ূন আহমেদ মঞ্চে বক্তব্যের সময় বললেন, ‘যাক, এবার তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতও লিখলাম।’

২৩। অভিনেতা জাহিদ হাসান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এই ঘটনাটি-

হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে একেক সময়ে একেক রকম সম্পর্ক ছিল। কখনো পিতা-পুত্রের মতো, কখনো বন্ধুর মতো আবার কখনো বা বড় ভাই, ছোট ভাইয়ের মতো। ১৯৯৭-৯৮ সালের কথা। তখন আমরা সবুজছায়া নাটকটির শুটিং করছি গাজীপুরের হোতাপাড়ায়। রাতে সাপের প্রচণ্ড ভয়। হুমায়ূন ভাই বুদ্ধি দিলেন পায়ে লাইফবয় সাবান মেখে ঘুমাতে। পায়ে সাবান কেন? হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘সাবানে কার্বলিক অ্যাসিড থাকে। পায়ে সাবান মাখলে সাপ আর ধারেকাছে ঘেঁষবে না।’ যে-ই বুদ্ধি সে-ই কাজ। এবং বুদ্ধিটা বেশ কাজেও দিল। এক রাতে, রাত ১২টার দিকে হুমায়ূন ভাই জানতে চাইলেন, ‘এখন কী খেতে চাও?’ আমি বললাম, ‘আম।’ হুমায়ূন ভাই তাঁর এক সহকারীকে পাঠালেন গাজীপুরে। রাত পৌনে একটার দিকে তিনি আম নিয়ে এলেন। হুমায়ূন ভাই খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘আসো, আম খাই।’

২৪। অভিনেতা এজাজুল ইসলাম বলেছিলেন এই গল্পটি-

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে শুটিং করতে গিয়েছিলাম বনুর গল্প নাটকের। এক বাসে আমরা সবাই। স্যার সামনের দিকে বসা, আমি পেছনে। কিছুক্ষণ পর স্যার আমাকে ডাকলেন, তাঁর পাশের সিটে বসতে বললেন। বসলাম। স্যার বললেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা একটা সুন্দর বাগানবাড়ির। তোমাকে দায়িত্ব দিলাম, তুমি সব করবে।’ শুরু করলাম জায়গা খোঁজা। নির্ভেজাল জায়গা পাওয়া খুব কঠিন কাজ। অবশেষে বাড়ির জায়গা পেয়ে গেলাম। স্যারকে জানালাম। স্যার দেখতে এলেন। এত মুগ্ধ হতে স্যারকে আমি কখনো দেখিনি। পুরো জায়গা দেখার পর স্যার আমাকে কাছে ডাকলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার জীবনের একটা বড় স্বপ্ন পূরণ করে দিলে।’ আমার চোখে তখন পানি।

নুহাশপল্লী হওয়ার পরে প্রথম ঘর বানানো হলো; বনের মাঝে কাঠের বাংলো। গভীর রাত পর্যন্ত সবাই জ্যোৎস্না দেখলাম। তারপর স্যার ঘুমাতে গেলেন। ঘরে যাওয়ার আগে আমাকে ডেকে বললেন, ‘ডাক্তার, ঘর তো একটা, তোমরা থাকবে কোথায়?’ আমি বললাম, ‘কোনো অসুবিধা হবে না, স্যার। আমরা থাকব এক জায়গায়।’ আকাশের নিচে, খোলা মাঠে শুয়ে পড়লাম আমরা। জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি, স্যার ঘরের বারান্দায় বসা। মহাবিরক্ত তিনি! কেন আমরা সারা রাত খোলা আকাশের নিচে থাকলাম।

২৫। অভিনেতা ফারুক আহমেদ বলেছিলেন এই গল্পটি-

হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে অনেক দিন ধরে কাজ করি। একদিন হঠাৎ মনে হলো—হুমায়ূন ভাই আমাকে কোনো বই উৎসর্গ করেননি। এই চিন্তাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। এমন যখন ভাবছি, তখন ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ একদিন স্বাধীন খসরু ফোন করলেন, ‘ফারুক ভাই, হুমায়ূন স্যার আপনাকে একটা চমৎকার বই উৎসর্গ করেছেন।’ কথাটা শুনেই আমি তুমুল রোমাঞ্চিত। খোঁজ নিয়ে দেখলাম হুমায়ূন ভাই আমাকে তাঁর লিলুয়া বাতাস বইটি উৎসর্গ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলাম, হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব। তখন তিনি দখিন হাওয়া বাসায় ছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্য কী নিয়ে যাই! হুমায়ূন ভাইয়ের ডায়াবেটিস, মিষ্টি খাওয়া নিষেধ। তাই ফুল নিয়ে বিপুল উৎসাহে গেলাম দখিন হাওয়ায়। দোরঘণ্টি বাজালাম। হুমায়ূন ভাই দরজা খুললেন। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘ও, বই উৎসর্গ করেছি বলে ফুল নিয়ে এসেছ! জীবনে তো একটা ফুলের পাপড়িও দিলে না!’ আমি খুব বিব্রত। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। হুমায়ূন ভাই শেষে বাসার ভেতরে ঢোকালেন আমাকে। হঠাৎ জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘তোমাকে আগেই একটা বই দেওয়া উচিত ছিল। যাক, এত দিন পরে খুব পছন্দের একটা বই দিতে পারলাম।’

২৬। গায়ক এস আই টুটুল বলেছিলেন এই গল্পটি-

আমার ভাই একদিন ফোন করে জানালেন, আমাদের কুষ্টিয়ায় দুজন লোকের সন্ধান পেয়েছেন। দুজনের সঙ্গেই নাকি জিন আছে। এবং জিনওয়ালা দুজন মানুষের হাত দেখে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারেন। বিনিময়ে কিছুই নেন না, শুধু পাঁচ কেজি গরুর মাংস রান্না করে খাওয়ালেই হয়। আমি এই ‘আবিষ্কারের’ কথা জানালাম হুমায়ূন আহমেদকে। স্যার বললেন, ‘ওদের আমার কাছে নিয়ে আসো।’ তথাস্তু, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দুই গণককে নুহাশপল্লীতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। নুহাশপল্লীতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ! প্রায় ৫০ জনের মতো অতিথি এসে বসে আছেন স্যারের নিমন্ত্রণে। তাঁরা সবাই গণকদ্বয়ের কেরামতি দেখতে উদগ্রীব! কে নেই সেখানে! হুমায়ূন স্যারের আম্মা থেকে নায়ক রিয়াজ, নুহাশও এসেছে দেখলাম। আর আমাদের পরিচিতজনেরা তো ছিলেনই। স্যার এরই মধ্যে পাঁচ কেজি গরুর মাংস রাঁধিয়ে বসে আছেন। গণক দুজন আরাম করে খেল। খাওয়ার পরে সবাই বসেছি। গণকেরা বললেন, ‘ঘরের বাত্তি নেভান।’ বাতি নেভানো হলো। স্যার বললেন, ‘প্রথমে কে হাত দেখাবে?’ নায়ক রিয়াজ বললেন, ‘আমি।’ প্রথমজন রিয়াজের হাত পর্যবেক্ষণ শেষে দ্বিতীয়জন কী কী মন্ত্র আওড়ালেন। তারপর বললেন, ‘আপনি তো বিশাল বড় অফিসে কাজ করেন। আপনার আব্বা আজকে সকালে ৭০০ টাকা দিয়ে একটা বিরাট ইলিশ মাছ কিনেছেন। আপনার আম্মা তো বছর দুয়েক আগে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী।’ সবার চোখে-মুখে বিস্ময়। রিয়াজের মা যে পাশেই বসা! এবং আগের কথাগুলোও পুরোপুরি ভুল। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুম!’ আমার এদিকে কালো ঘাম ছুটে যাচ্ছে! আমার মান-ইজ্জত আর রাখল না!

রিয়াজের পরে নুহাশের পালা। তার বেলায় তো আরেক কাঠি সরেস! নুহাশ নাকি ২৩ বছর বয়সে ডিগ্রি ‘পাস দিয়েছে’! খুব শিগগির ‘বিবাহ’ করতে যাচ্ছে। আমি তখন পালানোর রাস্তা খুঁজছি। স্যার ততক্ষণে খেপে টং! চিৎকার করে ধমক দিলেন দুই গণককে, ‘ভণ্ডামি করার জায়গা পাও না! পাঁচ কেজি মাংস খেতে চাও, খাও। তাই বলে এত বড় বাটপারি!’ গণকদ্বয়ের অবস্থা একেবারে নাজেহাল। ফাঁক বুঝে চম্পট দিল গুণধর গণকদ্বয়! অনেক কষ্টে তাদের খুঁজে বের করে দিলাম আচ্ছা বকুনি, ‘আমার মান-ইজ্জত কিছুই তো রাখলেন না!’ গণকদ্বয়ের উত্তর, ‘আমাদের কী দোষ! স্যারের কাছে একটা শক্তিশালী জিন আছে। ওই জিনের কারণে আমাদের জিনটা ঘরেই ঢুকতে পারে নাই, কেরামতি দেখাব কেমনে!’

২৭। একবার এক ব্যক্তি হ‌ুমায়ূন আহমেদকে বললেন, অমুক তো আপনাকে একেবারে ধুয়ে দিয়েছে। আপনার লেখায় নাকি শিক্ষামূলক কিছু নাই। শুনে হ‌ুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘ঠিকই তো বলেছে, আমি তো পাঠ্যবই লেখি না!’

২৮। সিনেমা তৈরির প্রয়োজনে হ‌ুমায়ূন আহমেদ একবার সেনাবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর অফিসে গেছেন। কথা শেষ করে চলে আসার সময় হ‌ুমায়ূন আহমেদ হঠাৎ জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের কোনো পুরোনো ট্যাংক আছে?’

: কেন বলুন তো?

: আমার একটা কেনার ইচ্ছা।

: ট্যাংক দিয়ে কী করবেন?

: ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে হয়। ট্যাংকে করে গেলে অনেক সুবিধা, তাই…।

২৯। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের কথা। সিলেট থাকাকালীন যে পাড়ায় থাকতেন, সেখানে এক বিহারি পরিবার বাস করত। সেই পরিবারে পরির মতো ফুটফুটে তিন মেয়ে ছিল। হ‌ুমায়ূন আহমেদ সুযোগ বুঝে আলাদাভাবে ছোট দুই মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ঘটনা মায়ের কানে যেতে দেরি হলো না। তিনি এক ছুটির দিনে বাবার কাছে অভিযোগ দিয়ে ছেলেকে শাসন করতে বললেন। শুনে বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘ছেলে বিয়ে করতে চায়, বিয়ে দাও। তোমার ছেলের পছন্দের কোনো মেয়ে আছে?’

হুমায়ূন আহমেদ পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন। মা উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি চিকন গলায় বললেন, ‘আছে।’

৩০। হ‌ুমায়ূন আহমেদ সিনেমা বানাবেন, টাকা প্রয়োজন। হঠাৎ মনে হলো, সরকার যদি সাহায্য করে, তাহলেই তো হয়ে যায়। তিনি তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। মন্ত্রী সব শুনে বললেন, ‘আপনি লেখক মানুষ। ছবি বানানোর আপনি কী জানেন?’

: আমি কিছুই জানি না। তবে আমি শিখব।

: শিখে ছবি বানাবেন?

: জি।

: নিজের ওপর আপনার এত বিশ্বাসের কারণ কী?

হুমায়ূন আহমেদ এবার দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘অন্যের ওপর বিশ্বাস করার চেয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস করাটা ভালো না?

৩১। হঠাৎ এক সকালে বাসায় ভক্ত এসে উপস্থিত। তিনি প্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা না করে কিছুতেই যাবেন না। বাধ্য হয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদকে ভক্তের সামনে এসে দাঁড়াতে হলো। ভক্ত এবং হ‌ুমায়ূন আহমেদের কথোপকথন নিম্নরূপ—

: স্যার, আমি আপনার জন্য একটা উপহার নিয়ে এসেছি। নিতেই হবে। ‘না’ করতে পারবেন না।

: কী উপহার?

: আমার একটা কিডনি আপনাকে দিতে চাই।

: কিন্তু আমার তো দুটো কিডনিই সচল আছে।

: যদি প্রয়োজন হয়, তাই আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম। যখন প্রয়োজন হবে খবর দেবেন। চলে আসব। নো ডিলে।

৩২। এই ঘটনাটি লিখেছিলেন সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ-

হুমায়ূন আহমেদ সদলবলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন। তাঁর ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে বসলেও পাঁচজনের বেশি বসা যায় না বলে তিনি একটা মাইক্রোবাস কিনে ফেললেন। আর কিনেই পুরো পরিবার নিয়ে ঢাকার বাইরে যাত্রা হলো শুরু। ১৯৯২ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ, ‘সময় প্রকাশন’-এর একটি উপন্যাস লেখা প্রায় শেষ পর্যায়ে। লেখা শেষ হওয়ার পরপরই বই দেখার জন্য অস্থির হয়ে যেতেন তিনি। আমরা যারা তখন হুমায়ূন আহমেদের নিয়মিত প্রকাশক ছিলাম, তারা এটা মাথায় রেখেই বইয়ের কাজ করতাম। যখন যতটুকু লেখা শেষ হতো, ততটুকুই মেকআপ দিয়ে ফর্মা মিল করে প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হতো ছাপার জন্য। বইয়ের প্রচ্ছদও অগ্রিম ছাপিয়ে রাখা হতো। অক্টোবরের শেষ দিন হুমায়ূন ভাই আমার হাতে জলপদ্ম বইয়ের শেষ অংশ এবং উৎসর্গ দিয়ে বললেন, ‘আমি যশোর যাচ্ছি। তুমি বই নিয়ে কাল আসো।’ যশোরে একটি বইমেলা শুরু হয়েছে ঢাকার প্রকাশকদের অংশগ্রহণে।

এক দিনের মধ্যে বইয়ের কাজ শেষ করে খুব ভোরে ১০০ বইয়ের বান্ডিল নিয়ে যশোরগামী বাসে উঠে বসলাম। দুপুরে যশোর পৌঁছে বইমেলায় চলে গেলাম। সেখানে বইয়ের বান্ডিল রেখে দুটি বই হাতে নিয়ে সার্কিট হাউসের দিকে রওনা হলাম। হুমায়ূন আহমেদের কক্ষে ঢুকে দেখি, স্বভাবসুলভভাবে তিনি খালি গায়ে একটা চেয়ারে বসে আছেন। ঘরের মেঝেতে এক ফুটফুটে শিশু খালি গায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। রুমে একটা কিছু কাজে ব্যস্ত হুমায়ূন গিন্নি গুলতেকিন আহমেদ। আমি হুমায়ূন আহমেদের দিকে বই দুটি বাড়িয়ে দিলাম, বই দুটি হাতে নিয়ে হুমায়ূন ভাই আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। প্রতিবার নতুন বই হাতে নিয়ে এ রকম একটি অনুভূতি প্রকাশ করতেন তিনি।

যশোর থেকে ঢাকায় ফেরার পরদিন বিকেলে শহীদুল্লাহ হলের বাসায় গেলাম হুমায়ূন ভাইয়ের নতুন বইয়ের রয়্যালটি দিতে। তিনি আমাকে বললেন, ‘ফরিদ, ১৩ নভেম্বর আমার জন্মদিন। অনেক বছর পর আমার ছোট ভাই জাফর ইকবাল পরিবার নিয়ে দেশে আসছে। এ উপলক্ষে একটি বই বের করতে চাই। এক সপ্তাহ সময় আছে, তুমি পারবে তো? রয়্যালটি এখন দিতে হবে না। এই টাকা দিয়ে তুমি কাল কাগজ কিনো আর আজ রাতেই সমর মজুমদারের সঙ্গে দেখা করো। এই নাও বইয়ের নাম, একটা কভার বানাতে বলো খুব তাড়াতাড়ি; না, একটা না, দু-তিনটা ডিজাইন করতে বোলো। না থাক, তোমাকে একা যেতে হবে না। আমিও যাব।’

সন্ধ্যার পর আমার বাইকের পেছনে চেপে বসলেন হুমায়ূন ভাই। আমার বাইকে চড়ে হুমায়ূন ভাই সম্ভবত খুব মজা পেতেন। আমরা শিল্পী সমর মজুমদারের বাসায় এলাম। শিল্পীর কাছে তার তৈরি করা কী কী ডিজাইন আছে, সেগুলো দেখতে চাইলেন হুমায়ূন ভাই। সমরদা একের পর এক ডিজাইন দেখিয়ে চলেছেন আর হুমায়ূন ভাই ঘাড় নাড়ছেন। পরে সিদ্ধান্ত হলো সমরদা নতুন ডিজাইন বানাবেন। অনেকক্ষণ বসলাম আমরা, চা-সিগারেট পান করা হলো। ‘এখন উঠতে হয়।’ ওঠার সময় সমরদা বললেন, ‘হুমায়ূন ভাই, একটা ডিজাইন আপনাকে দেখাতে চাই। এটা আপনার বইয়ের জন্য নয়। আমি একটা ভিন্ন ধরনের ডিজাইন করেছি, তা-ই আপনাকে দেখাব।’ ডিজাইনটা হুমায়ূন ভাই হাতে নিলেন, একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমার হাতে ডিজাইনটা দিয়ে বললেন, ‘এটাই আমার পছন্দ। তুমি কাল প্রসেস করতে দিয়ে দাও। আর কাল বিকেলে কপি নিতে আসো।’

পরদিন বিকেল থেকে শুরু হলো নতুন বইয়ের কাজ। সকালে শহীদুল্লাহ হলের বাসায় গিয়ে কপি নিয়ে আসি আর রাতে সেই কপির প্রুফ দিয়ে আসি। বই প্রায় শেষ পর্যায়ে। একদিন সকালে বাসায় গেলাম। গুলতেকিন ভাবি দরজা খুলে আমার হাতে কয়েকটি কপি দিয়ে বললেন, ‘এগুলো কম্পোজে দিয়ে আপনাকে জামালপুর চলে যেতে বলেছে ও।’ আমি রওনা দিলাম জামালপুরের উদ্দেশে।

নানা ঘটনায় নির্দিষ্ট দিনে বইটি আর বের করা গেল না। আমার মন বেশ খারাপ। ১৩ নভেম্বর, ১৯৯২, বিকেলে হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় গেলাম কেক নিয়ে। একান্ত পারিবারিকভাবে হুমায়ূন ভাই জাফর ইকবালসহ সবাইকে নিয়ে জন্মদিন পালন করলেন। হুমায়ূন ভাই আমাকে পরদিন সকালে আসতে বললেন।

১৪ নভেম্বর খুব সকাল, হুমায়ূন ভাই আমার হাতে কিছু কপি দিয়ে বললেন, ‘তুমি কাজ শুরু করো, আমি ইউনিভার্সিটির ক্লাসটা নিয়ে আসছি। আজই বই শেষ করে দেব।’ আজিমপুর সুপার মার্কেটের ‘নূশা কম্পিউটার’-এ বইয়ের শেষ অংশের কাজ চলছে। তখন সকাল নয়টার দিকে আমার এক আত্মীয় সেখানে এল ভয়াবহ এক দুঃসংবাদ নিয়ে। কাল রাতে আমার আম্মা মারা গেছেন। আমার চোখ বুজে এল, সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমি বাড়ি চলে এলাম। পরবর্তী চার দিন আমার আর কোনো কিছু মনে ছিল না। কুলখানি শেষে আবার রওনা দিলাম ঢাকার পথে। বাসে বসে মনে হলো, একটি বইয়ের কাজ করছিলাম আমি, বইটির কী হলো? হুমায়ূন ভাই নতুন বইয়ের মুখ দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। তিনি কি জানেন আমি কোথায়? তাঁকে তো কোনো খবর দিতে পারিনি। নিশ্চয় লেখক রাগ করেছেন।

ঢাকা পৌঁছেই লেখকের বাসায় গেলাম। সন্ধ্যারাত, শহীদুল্লাহ হলের দ্বিতলের বাসার দরজা খুলল লেখকের বড় কন্যা নোভা। সে আমাকে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল, একটু পর ফিরে এসে আমার সামনের টেবিলে একটা বই রেখে বলল, ‘বইটা দেখেন, ড্যাডি ক্লাবে গেছে, চলে আসবে, আপনি বসেন আঙ্কেল, আপনাকে চা দিতে বলি।’ আমার সামনে সমর মজুমদারের করা প্রচ্ছদে মোড়া হুমায়ূন আহমেদের আয়নাঘর বইটি দেখে আমি চমকে উঠলাম। এ কী? এই বই তো আমার প্রকাশ করার কথা! তবে কী…

পূর্বাপর ঘটনা: সেদিন ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষে বাসায় এসে আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন হুমায়ূন ভাই। পরে আমার খোঁজে আসেন নূশা কম্পিউটারে। সেখানে অপারেটরের কাছ থেকে শোনেন আমার দুঃসংবাদ। এরপর তিনি নিজেই কম্পিউটারের সামনে বসে অসমাপ্ত প্রুফ সংশোধন করে, বইয়ের ট্রেসিং অর্ডার দেন। যে প্রেসে কাগজ দেওয়া ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বইটি ছাপার ও বাঁধাইয়ের ব্যবস্থা করেন। এভাবেই সময় প্রকাশন থেকে লেখক নিজে বের করেন হুমায়ূন আহমেদের ‘আয়নাঘর’।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments