মূল্যবোধ – ফয়সল সৈয়দ

মূল্যবোধ - ফয়সল সৈয়দ

উত্তপ্ত রৌদ্রে হাঁটছেন মিনহাজ মাস্টার। ছাতা মাথায় ও লবণাক্ত জল উপচে পড়ছে। স্যাঁতস্যাঁতে শরীরে চোখে মুখে বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। দুটো বিশ টাকার নোট ছাড়া পকেটে তেমন কিছু নেই। হাজার খানিক টাকা না হলে বাকী দিনগুলো যে আর চলবে না ।

চৈত্র মাস। এমনিতে ভাল কাটে না। টানাটানির সংসারটা এমাসে মুখ দুমড়ে পড়ে। মিলাতে পারে না আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ। ছাত্র-ছাত্রীরা তেমন একটা পড়তে আসে না। যে কয়জন আসে তারাও অনিয়মিত। কয়জন অভিভাবক-ই বা বুঝে গণিত বিষয়টি সারা বছর চর্চা করতে হয়।

গণিত ছাত্র-ছাত্রীদের বৃদ্ধি বাড়ায়। যে ছেলে গণিতে ভাল সে ধীরে ধীরে অন্যান্য বিষয়েও ভাল ছাত্র হয়ে উঠে। মাঝে মধ্যে ভাবেন, ইস ! গণিত স্যার না হয়ে যদি ইংরেজি স্যার হতেন।
তাহলে বোধহয় সংসারে থাকত না এত অভাব-অনটন।
দ্রুত পায়ে হাঁটছেন মিনহাজ মাস্টার।

যেভাবে হউক টাকা তাকে জোগাড় করতে হবে। কিন্ত কিভাবে যোগাড় করবেন ? কার কাছে যাবেন ? পরিচিত যে কয়জন থেকে টাকা ধার নেওয়া যায়,সবার কাছে মুখ বেচা হয়ে গেছে তার।গতমাসে এমনি সময় একদিন চিন্তা করলেন স্কুলের পিয়ন কাসেমের কাছ থেকে চাইবেন। নিশ্চয় সে না করবে না। তাকে খুব পছন্দ করে সে। পিয়ন হলেও কি হবে এই চট্টগ্রামে তার নামে কয়েক বিঘা জমি আছে। মানে পিয়ন কাসেম রীতিমত একজন জমিদারও বটে।
—কাসেম।
—জ্বী,স্যার।
—তুই বেতন কত পাস ?
—ক্যান ? স্যার।
মিনহাজ মাস্টার জানে তার বেতন কত। তবু তার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে করছে খুব। —আ-রে বল না।
—স্যার, পাঁচ হাজার, পাঁচ হাজার পাঁচশ।
কাসেমের চেয়ে তিনি তিনগুণ বেতন বেশী পান। তবু সংসারে অভাব লেগে আছে। মাত্র পাঁচ হাজার পাঁচশ দিয়ে বেটা চলে কিভাবে ? ভয়ে শিউরে উঠেন। —সংসার
চলে তোর !
—জ্বী-স্যার। বউ, দু’ ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালা-ই তো আছি।পাহাড়তলীর জায়গাটিতে সেমিপাকা কয়েকটি ঘর তুলে ভাড়া নিচ্ছি। সব মিল্যা ভালাই আছি। ক্যান
স্যার ?
—না। এমনি জিজ্ঞেস করলাম। ধর পঞ্চাশ টাকা দিয়ে চা-বিস্কুট খাইস।
কাঁচুমাচু করে পঞ্চাশ টাকার নোটটি হাতে নিয়ে লম্বা একটা সালাম দিয়ে সরে পড়ল কাসেম।

মিনহাজ মাস্টার অনেকক্ষণ ভাবলেশহীনভাবে বসে রইলেন অফিস রুমে। মাঝে মধ্যে তিনি নিজের উপর নিজে-ই বিরক্ত হন। কি দরকার ছিল কাসেমকে যেচে
গিয়ে কথা বলার। আর কথা বল্লেনিই যখন, তখন শুধু শুধু টাকা কেন দিলেন। যখন চাইতে পারেননি, দেওয়ার তো দরকার ছিল না।

তার কাছে পঞ্চাশ টাকাও এখন বিশাল অঙ্ক। স্ত্রীর সকালের কথাগুলো এখনো কানে আছাড় খাচ্ছে। পুরুষ মানুষ টাকা ছাড়া অর্থহীন। নপুংসক। পুরুষ সব সহ্য করতে পারে নিজের টেস্টোস্ট্রেন নিয়ে টিটকারী সহ্য করতে পারেনা। কিন্ত নিজে অস্বচ্ছলতায় জন্য মিনহাজ সেই অপবাদও হজম করে ফেলছেন ইদানিং।

ঠিক-ই তো। টাকা ছাড়া পুরুষ মানুষ মেরুদন্তহীন। এই টাকার জন্য স্ত্রীর কত ইচ্ছে যে পূরণ করতে পারেননি। তাই তার দু’ কথায় মিনহাজ মাস্টার চুপ বনে যান। কটুকথা শুনতে শুনতে তার দু’ কান থেঁতলে গেছে, ভোতা হয়ে গেছে। অভাবে সংসারের স্ত্রীরা একটু আধটু চিৎকার চেঁচামেচি করবে স্বাভাবিক। এরা স্বভাবত;রগচটা, ঠোঁটকাটা স্বভাবের হয়ে থাকে।

চশমা চোখে মিনহাজ মাস্টার ভরদুপুরেও ঝাপসা দ্যাখছেন। শীতের সকালের মত পরিবেশটা যেন গুমোট হয়ে আছে। বয়সের ভারে চশমার পাওয়ারটা এখন তেমন কাজ করে না। একমাত্র মেয়ে নাজলীর কথা চিন্তা করতেই মাথাটা চিনচিন করে উঠে। মেয়েটি মার মত হয়নি। বিপদে উল্টা আশার বানী শুনায়—বাবা, দ্যাখো মাত্র তো কয়টা দিন মাস্টার্স শেষ হলেই চাকুরী। তোমাকে আর এত চিন্তা করতে হবে না।

মিনহাজ মাস্টারের চোখের কোণায় বিন্দু বিন্দু জল ঝলমল করতে থাকে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন— না-রে মা তোকে চাকুরী করতে হবে না। একটি ভাল পাত্রের হাতে তুলে দিতে পারলেই স্বস্তি, স্বার্থকতা।

—আ্যই বাবা, তোমাদের সব বাবাদের সে-ই এক দোষ। মেয়ে একটু বড় হলেই তাকে পর করে দেওয়ার চিন্তা। ছেলে হলে কি বলতে তোর জন্য একটি ভাল পাত্রী
… বাচ্চা মেয়ের মত খিল খিল করে হেসে উঠে বলে ; না বাবা বলতে না।
—বুঝবি রে মা। বুঝবি ; সংসার কর। দায়িত্ব নে। তারপর বুঝবি।
জানালার ফাঁক দিয়ে বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে মিনহাজ মাস্টার রাশভারী কণ্ঠে বলেন —পৃথিবীর অনেক কিছু-ই মানুষকে শিখতে হয় না। সময়-ই মানুষকে হাতে কলমে শিখিয়ে দেয়।
—বাবা,বাবা তোমার কথাবার্তা শুনে মাঝে মধ্যে মনে হয় তুমি শিক্ষক না হয়ে কবি কিংবা লেখক হলে ভাল করতে।
—থাক, মা থাক। এমনিতে সংসার চালাতে বারোটা বেজে যাচ্ছে। কবি, লেখক হলে তো… কথাই নেই।
—সে কি বল ! হুমায়ুন আহমেদ শিক্ষকতা ছেড়ে লেখালেখি করছে না।
—কয়জন-ই বা হুমায়ুন আহমেদ হতে পারে।
—কয়জন দরকার নেই। একজন থেকে একজন তো হতে পারে।
—হুমায়ুন আহমেদের লেখা তুই পড়িস ?
—আগে পড়তাম।
—এখন ?

—এখনও পড়ি তবে কম। ন্যাকামি লাগে। ওর লেখাগুলো পড়তে ভাল লাগে। কিন্ত শেষে লেখার মাথামুণ্ডু কিছু-ই খুঁজে পাই না।
মিনহাজ মাস্টার মেয়ের কথায় হাসতে হাসতে কুঁজো হয়ে যান। —এবার বল, মেয়ে হয়ে বাবার লেখা না পড়লে। বাবা হয়ে আমার কেমন লাগবে ?
—আচ্ছা, বাদ দাও। হুমায়ূন আহমেদ না হয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শাহেদ আলী, শওকত ওসমান তো হতে পারতে।
—ওদের জীবনী পড়েছিস ? জীবনান্দ দাশ সর্ম্পকে তুই কতটুকু বা জানিস।যাকে আমার মাথা তুলে নাচছি এখন। তিনি কিন্ত খুব অর্থে কষ্টে মধ্য দিয়ে তার জীবন পার করেছেন। তার উপর শনিবারের চিঠিতে সমালোচকদের উৎপাত। রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো তো উনি লিখে তোষকের নীচে রেখে দিয়েছেন। এই ভয়ে কেউ আবার বলে না বসে তিনি জসিম উদ্দিনের স্টাইলে কবিতা লিখছেন।
—হুম,জানি বাবা জানি।উনার মৃত্যুর পরে বইটি প্রকাশিত হয়। নাজলীর গলায় আগের মত সে-ই প্রত্যয় নেই।
—আসলে মা আল্লাহ যদি আমাকে লেখা-লেখির শক্তি বা মেধা দিয়ে পাঠাত। তোকে বলতে হত না। আমি লেখক-ই হতাম। শিক্ষক না। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের কথায় আর মানুষ বেঁচে থাকে লেখায়।কে না চায় বেঁচে থাকতে।
—না, বাবা তোমার কিছু-ই হতে হবে না। তুমি আমার বাবা এটা-ই আমার শক্তি। ডান হাতের কনুই ভেঙ্গে উঁচু করে তোলে।
—মা, বাবাকে নিয়ে গর্ব করিস। মনে মনে ভাবলেন, মেয়েকে জিজ্ঞেস করবেন। পরক্ষণে ভাবেন না, তাকে নিয়ে গর্ব করার মত কিছুতে করেনি তিনি এ পৃথিবীতে। নিজের অজান্তে গুনগুনিয়ে আবুল হাসানের কবিতা কয়েকটি লাইনগুলো আবৃত্তি করেন।

আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা/সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ালেন মিনহাজ মাস্টার। পায়ের কাছে কি যেন এসে ঠেকেছে। অবনত চোখে বলেন—কে ? কে ?
স্যার আমি। ততক্ষণে সব রকম যুদ্ধে যাওয়ার মত উপযুক্ত বয়সী এক তরুণ তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তিনি লক্ষ্য করলেন ছেলেটি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রৌদ্রের উত্তাপটা নিস্তেজ হয়ে গেছে। অজানা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলেন— কে ? কে বাবা।

—স্যার, আমি আপনার ছাত্র আশেক, মোহাম্মদ আশেক আলী স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না।
—ও আশেক আলী, কত বড় হয়ে গেছ। তা বাবা কেমন আছ ?
—ভাল স্যার। আপনি অনেক শুকিয়ে গেছেন।
—আর কতদিন। তা বাবা তুমি এখন কোথায় আছ ?
—স্যার আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে আছি এখন। গত মাসে স্কলার শীপ নিয়ে আমেরিকা থেকে এসেছি।
অর্থহীন পৃথিবীতে মিনহাজ মাস্টার হঠাৎ যেন অর্থ খুঁজে পেলেন।
—স্যার, নাজলী কেমন আছে ?
—ভাল। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে সমাজ বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ছে।
এ-ই সুযোগ ছেলেটার কাছ থেকে কিছু টাকা চাওয়ার। সদ্য প্রবাসী, পকেটে নিশ্চয় কড়কড়ে ডলার নিয়ে ঘুরছে। আর তিনি তো একবারের জন্য নিবেন না। মাত্র তো কয়েকদিনের জন্য ধার নিবেন।
—বাবা। ইতস্তত হয়ে কেঁপে উঠলেন মিনহাজ মাস্টার। যেন কটমট করে বুকের পাজরটা ভেঙ্গে গেল।
—জ্বী স্যার কিছু বলবেন ?
—না, মানে আশেক আলী আমার একটি জরুরী কাজ আছে। আমাকে যেতে হবে অনেক দূর। এখন চলি। হাঁটতে শুরু করলেন তিনি।
গন্তব্যহীন হাঁটা।

মূল্যবোধের অর্চনায় টইটম্বুর বিবেকের কাছে পরাজিত হয়ে দ্রুত হাঁটছেন। দু’ চোখের কোনায় লবণাক্ত জল।
সামান্য কয়টা টাকার জন্য মিনহাজ মাস্টার তার মূল্যবোধকে বিকিয়ে দিতে নারাজ।

Facebook Comment

You May Also Like