Sunday, July 12, 2026
Homeবাণী ও কথাতৃতীয় পক্ষ : সন্দেহের শুঁড় - সৌমেন দেবনাথ

তৃতীয় পক্ষ : সন্দেহের শুঁড় – সৌমেন দেবনাথ

তৃতীয় পক্ষ : সন্দেহের শুঁড়

যে বাড়িতে জন্ম সে বাড়িতেই অতিথি- মেয়েদের জীবন। অনেকদিন পর শ্রেয়সী বাড়ি যাচ্ছে। পাশে থাকার মানুষ দূরে চলে যাচ্ছে, যেন হৃদয়টা ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ বাসে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য আমি যাচ্ছি। আমি তার পাশে সে আমার পাশে, কিন্তু হৃদয় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কত সময় থেকেছে আমার সাথে, কিন্তু আমার তাতে গুরুত্ব ছিলো না। এখন চলে যাচ্ছে, আর তাই এখন প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্ববহ। মন কান্না করছে, কিন্তু পুরুষ বলে চোখে জল আসতে ভয় পাচ্ছে। শখের মানুষ কাছ থেকে চলে গেলে স্বাচ্ছন্দ্য থাকে না। চলে যাচ্ছে আসবে বলেই- কিন্তু মানতে পারছি না। যাদের হৃদয়ের মানুষটি একেবারেই চলে যায়, তাদের হৃদয় বাঁচে কী করে?

চলমান গাড়ি যত সামনে যাচ্ছে, আমার ভাড়াগৃহ তত পেছনে পড়ে যাচ্ছে, আমার শূন্যতা উপভোগের সময় তত এগিয়ে আসছে। একদিন সে ছিলো না, ছিলো না সময় কাটানোর সংশয়, ছিলো সময় কাটানোর নানা বিকল্প। এখন সে চলে যাচ্ছে, শুধু ভাবছি সময় কাটবে কী করে, থাকবো কী করে! তাকে ঘিরেই আমার যত ভাবনা, অথচ সে যেন আনন্দে আছে! কোথাও ঘুরতে গেলে যে আমার হাত ছাড়ে না, সে আজ আমার হাতও ধরছে না। মুখে হাসি না থাকলেও হাসি হাসি ভাব। বাড়ি ফেরার আনন্দ, মাকে দেখার আনন্দ তাকে পেয়ে বসেছে। ভাবছি, আমার সাথে থাকে সে, অথচ তার ভাবনা পড়ে থাকে মাকে ঘিরে, বাবাকে ঘিরে, ভাইকে ঘিরে। তাদেরকে না দেখতে পাওয়ার যাতনা থেকে সে আজ মুক্তি পেতে যাচ্ছে, ভীষণ আনন্দের ছটা তার চোখে-মুখে। বাড়ি ফেরার এই আনন্দ আমারও প্রথম প্রথম ছিলো, এখন এ আনন্দ নেই। আনন্দরা যেন দ্রুতই মরে যায়। বাইরে থাকলে নিষ্ঠুর হৃদয়ের হয়ে উঠতে হয় যেন! আমি তো আমার মাকে-বাবাকে অত অনুভব করি না আর! কাঁদে না তো হৃদয় নদী!

আর কিছুটা ক্ষণ পর, কিছুটা পথ পর যাত্রাবাড়ি বাসস্ট্যান্ড। আর কিছুটা ক্ষণ থাকবে সে আমার সাথে, আর কিছুটা ক্ষণ থাকবে সে আমার পাশে। আর কিছুটা ক্ষণ তার ছোঁয়া পাবো, আর কিছুটা ক্ষণ পর আর দেখবো না তাকে। আর কিছুটা ক্ষণ পর হৃদয় আমার উঠবে বাসে, যাবে চলে হৃদয় নিয়ে। হৃদয়বতীর হৃদয়ে আজ অন্য উচ্ছ্বাস, অন্য আনন্দ। আমার হৃদয়ভার দেখার সময় যেন নেই-ই তার। না থাক, যাক সে দূরে। প্রিয় মানুষের আনন্দে আনন্দিত, প্রিয় মানুষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যার সাথে একটু কথা বললে, যার সান্নিধ্য একটু পেলেই মন ভালো হয়ে যায়, তার জন্য কোনো অভিযোগ নেই।

জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে সে, হাজার লোকের ভিড়ে যার নজর আমার দিকে। সে আছে আমার পানে চেয়ে, আমাতে চেয়ে নিষ্পলকে। যাক দূরে, বুঝবে তবে আমায়! সাথে থাকতে থাকতে সাথের মানুষের গুরুত্ব ভুলে যাই আমরা। সাথে সারাক্ষণ থাকলে সম্পর্কের মধ্যেও গন্ধ ঢোকে। মোজা যদি সব সময় পায়ে থাকে, তবে গন্ধ ছড়ায়। যাক দূরে, হৃদয় টান তাতে বাড়বে। না শুকালে নদী তার গুরুত্ব বোঝে না মানুষ। না গেলে দূরে কে আপন বোধে আসে না সহজে। বন্ধুবৃত্তের কেউ-ই নিত্যক্ষণের সান্ত্বনা হয় না। কিছু মানুষ কিছুটা সময় সাথে থাকে, তাতে আপাতত আনন্দ লাগে। কিন্তু যে মানুষ সারাটাক্ষণ সাথে থাকে তার প্রতি বিতৃষ্ণা জাগে। কিন্তু সাথের মানুষটির মতো নির্ভেজাল কেউ নেই ধরণীতে।

এবার দেখি তার চোখে জল। কেঁদেছে সে আমার বুকে আহ্লাদ পেলেই। কেঁদেছে সে আমার চোখে চেয়ে দেরি করে বাসায় ফিরলে। কিন্তু সে কান্নাতে আমার হৃদয় গলতো না। আজ তার চোখে জল দেখে অস্থির হয়ে গেলাম। কেউ চায় না তার প্রিয় মানুষের চোখে জল আসুক। চোখের জলের অনেক দাম- তাকে কান্না করতে দিই না তাই। কত আদরে তার চোখের জল মুছে দিই; আজ পারছি না, কত মানুষ তার আশেপাশে।

কিছু দূর যেতেই সে ফোন দিলো। আমি কিছু দূর যাইনি, আমি সেখানেই বসে আছি থ হয়ে। তার কণ্ঠ তখনও কান্নাভার। কারও জন্য রক্তের সম্পর্ক ছাড়া যে মানুষটা কান্না করে তাকে আপন করে নিতে হয়। হাজার সুন্দর মানুষের ভিড়েও নিজের মানুষটিকে সেরা ভাবতে হয়। সব কিছু সব সময় কাছে থাকলে কদর থাকে না; তাই কাছের মানুষকে দূরে যেতে সুযোগ দিতে হয়। দূরে গেলে সম্পর্কের মাঝে সৌন্দর্য আসে, সম্পর্কের বুনট শক্ত হয়। এমনিতেই দূর থেকে সব জিনিসই সুন্দর। মনের মানুষটি দূরে গেলে তাকে আরও সুন্দর লাগে, প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। কান্নাকান্নাকণ্ঠে কত কথা বললো। যার হৃদয় জুড়ে সর্বক্ষণ থাকি, তাকে হৃদয়ের ভেতর রাখলে ঠকতে হয় না। যে প্রার্থনাতে রাখে তাকে অবহেলাতে রাখতে নেই। সে যত দূরে চলে যাচ্ছে, সে তত আমার জন্য আকুল হচ্ছে। প্রথম প্রথম তার প্রতি ক্ষোভ ছিলো, ছিলো অভিমান। অথচ সেই ক্ষোভ আর অভিমান আমার জলে ভেসে যাচ্ছে।

বাসায় ফিরছি আর তাকেই ভাবছি। যেদিন থেকে তাকে গ্রহণ করেছি, সেদিন থেকেই আমার ভাবনাজুড়ে সে। ভাবনার প্রতি পাতাতে তার প্রতিচ্ছবি। সেই ভাবনাতে থাকতো তাকে প্রাপ্তির আনন্দ। আজকের ভাবনাতে শুধুই তার কান্নাজড়িত চোখ। জলচোখের দৃশ্য আমাকে বিগলিত করছে। আজ বড়ো মন খারাপ, মন ভালো করার মানুষটা চলে গিয়েছে। আসবে ফিরে খুব সত্ত্বর, তবুও কেন মনে এত মন্বন্তর!

বাসায় ফিরে এ ঘর ও ঘর গেলাম। ঘরময় শূন্যতা। ঘরময় নিস্তব্ধতা। এত একা থেকেছি, তবুও এত একাকিত্ব লাগেনি নিজেকে কখনো। চোখ জলে ছলছল করে উঠলো। কখনো কেঁদেছি কিনা আমি নিজেও জানি না। ভালোবাসলে শক্ত হৃদয়ও কী কোমল হয়ে যায়! প্রেয়সীর জন্য পাল্টানো ভালো, স্বার্থের জন্য পাল্টানো ভালো না।

চিরুনিতে তার মাথার চুল লেগে আছে। চিরুনিতে চুল থাকলে কতই না বকেছি। বকলে হাসতো, আদর দিলে কান্না করতো, কী অদ্ভুত সে। কাছে থাকলে বকতাম, আর এখন ভাবছি কেন বকেছি তাকে! শখের মানুষকে তো কেউ কখনো বকে না। যে চুল দেখে বকার উদ্রেক হতো, সেই চুলে আজ আমি চুমু খাই। বিস্ময়ে চেয়ে থাকি। সে শুধু পাশে নেই, আর তাতেই আমি কত বদলে গিয়েছি।

বেড পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি তার কপালের একটি টিপ পড়ে আছে। একটু অগোছালো বলে বেডের উপর অনেক কিছুই পড়ে থাকতো, পরিষ্কার করতো না। অথচ আজকের এই অগোছালো বেডে পড়ে থাকা তার কপালের টিপটা দেখে ভারাক্রান্ত হয়ে গেলাম। তার কপালের স্মৃতিচিহ্ন, যে কপালে আমার কত কত উষ্ণ স্পর্শ। তার স্মৃতিচিহ্ন সব ঘরে সবখানে, দেখি আর আমি চুপ হয়ে যাই। তার কিছু কাঁচা কথা শুনলেই রাগ হতো, এখন শুধুই ভাবছি রাগ করেছি কেন? সেই সব কথা মনে পড়লেই যতই হাসি-খুশি থাকি না কেন নিশ্চুপ হয়ে পড়ি। তখন সে আমার কথায় কষ্ট পেয়েছিলো, তাই ভেবে তারচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছি এখন আমি, সে হয়তো জানবেও না। সে ছায়া দিতো, মায়া দিতো, আর আমি উত্যক্ত হতাম। সে আমার খুশির কারণ হতে চাইতো, অথচ আমি তার খুশির কারণ হতে দ্বিধান্বিত ছিলাম।

শুধু এ ঘর ও ঘর ঘুরি আর তাকে নিয়ে ভাবী। মনে শান্তি না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না। অবহেলায় তাকে ঘরে একা রেখে চায়ের দোকানে সময় কাটিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি সময়টা তাকেই দেওয়া উচিত যে সময়ের মূল্য বোঝে ও মূল্য দেয়, এবং যার কাছে আমার সময়ের অনেক মূল্য। ভাবতাম একা থাকলে ভালো থাকবো। আর এখন একা, কই আমি ভালো! জীবন সুন্দর, কিন্তু আমাদের ব্যর্থতায় উপভোগ করতে ব্যর্থ। সে দূরে, আর এখন বুঝতে পারছি তার থাকার গুরুত্ব। সময়ে দিই না গুরুত্ব, করি অবহেলা; শোনায় কথা। প্রিয় মানুষকে আপন করে পাওয়ার নানান কারণ খুঁজতে হয়। প্রিয় মানুষে বিরক্ত হয়ে দূরে রাখার বাহানা শুভ ফল দেয় না। যে প্রিয়, তার সাথে করতে হয় না ছল। যে মনময়, তার সাথে করতে নেই অভিনয়। ভালোবাসার মানুষের হাত শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। পেয়ে যাওয়ার পর কিন্তু মানুষ প্রিয় মানুষের কদর করতে ভুলে যায়।

বাসায় পৌঁছেই জানালো সে ঠিকঠাক পৌঁছে গিয়েছে। পৌঁছে গিয়েছে শুনতেই ভালো লাগা কাজ করলো। প্রিয়কে পথে ছেড়ে কেউ প্রশান্তি পায় না। আমি আছি কত কষ্টে তাকে বুঝতে দিলাম না। তাকে হীনা আমার সময় দেখি না ঐশ্বর্যের মতো উপভোগ করা যায় কিনা। তাকে হীনা থাকতে আমার কত ছিলো শখ, দেখি না তাকে হীনা থাকা কতটা সহজ ও মিষ্টি! সে বললো, তোমার খুব খারাপ লাগছে?

উত্তরে বলেছি, না। খারাপ কি আমার লাগছে না? শক্ত হৃদয়ের বলে কি এতই শক্ত হৃদয়ের যে খারাপটুকু লাগবে না? চোখে না হয় জলটুকু আসছে না, তাই বলে খারাপ লাগবে না? কত খারাপ লাগছে তা কি আমি তাকে বোঝাতে পারবো? একা মানুষ একা থাকতে পারে, কিন্তু একা হওয়া মানুষগুলো একা থাকবে কী করে?

পরের প্রশ্নে সে বললো, তোমার মতো পাথর মানুষ আমি আর দেখিনি!

উত্তর আমি কী দেবো, নিশ্চল পাথরের মতো থ হয়ে থাকলাম। তার জন্য কী ছটফট করি আমি, আর সে আমায় বলে পাথর মানুষ। আমার বিগলিত হৃদয় সে বুঝলো না। বুঝলো আমি নিষ্ঠুর। তাকে হীনা না জানি আমি কত আনন্দে আছি এই তার বিশ্বাস। নিজেকে বুঝাতে পারি না বলে আমাকে বোঝেও না সে। বোঝে, কিন্তু ভুল। বলি না বলে সে বোঝেও না, প্রকাশ করি না বলে উপলব্ধিও করে না। যে থাকে হৃদয় জুড়ে তাকে ছেড়ে থাকি কি করে! পরক্ষণেই আবার বলে সে, মনে কি পড়ছে না তোমাকে দেওয়া আমার অনুষঙ্গগুলো?

উত্তর না দিলে ভেবে নেবে মনে হয় নেই সে আমার ভাবনা জুড়ে। তাই বললাম, তোমার অনুষঙ্গগুলো ভুলি কী করে?

হয়তো আমার উত্তরে তার দ্বিধা কাটেনি। তাই বললো, এতটুকুও কি পোড়ে না তোমার হৃদয়?

একটু থেমে থাকি তার প্রশ্ন শুনে। এসব প্রশ্ন কখনো সে করেনি আমায়, এসব প্রশ্ন কেনইবা করছে সে? ভালোবাসি বলি না বলে ভালো কি বাসি না? সার্বক্ষণিক স্মরণে রাখি না বলে কি স্মরণে সে আমার বিরাজ করে না? তার জন্য হৃদয় আমার পুড়বে না এমন বিশ্বাস মনে সে গাঁথে কী করে? তাই বললাম, তোমার কথাতে কেন এত আক্ষেপ? তোমার জীবনে কি আমি আক্ষেপ হয়ে এসেছি?

নিশ্চুপ হয়ে গেলো সে। আর কোনো কথা আসে না তার থেকে। আমার প্রশ্নে হয়তো উত্তর পেয়েছে, সন্তুষ্ট হয়েছে; নতুবা আক্ষেপের প্রশ্ন করেই যেত। আমি তাকে কতটা চাই সে জানে না, সে আমাকে কতটা চায় হয়তো আমি জানি না। আর তাই দুইজন শুধুই দুইজনকে দোষ দিয়ে যাই। আর কষ্ট পাই। বলি, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে কিন্তু!

বলে সে, তুমি ওখানে একা হয়ে গেলে, কী খাবে না খাবে। আমি এখানে কী করে খাই বলো! আত্মীয়-স্বজনের সাথে যতই থাকি মন কি ভালো থাকে? মনের খোরাক তো তুমি।

তার কথা শুনে মন ভালো হয়ে গেলো। এক সময় মন ভালো থাকতো না, কারণ মন ভালো করার মতো কেউ ছিলো না। এখন মন ভালো থাকে, কারণ মন ভালো করার মানুষ আছে। মন ভালো করার আর মন ভালো রাখার মানুষটা দূরে। সে মানুষটার মন ভালো নেই আমার কারণে, আমিও যে কারও মন ভালো রাখার কারণ ভাবতেই ভালো লাগছে। বললাম, কিছুদিন থাকো, আমি গিয়ে নিয়ে আসবো!

যে মা-বাবাকে দেখবে বলে ছটফট করেছে, সেই মা-বাবার কাছে পৌঁছেই আমার জন্য ছটফট করছে। দুই কূলের মায়া তাকে ব্যাকুল করে দেয়। কোনোদিকে গিয়ে শান্তি পায় না। পুরাতন মায়া আর নতুন মায়া জর্জর করে দেয় তাকে। আহা, কত অপরিচিত মানুষ আমি, আর আজ আমিই হয়ে উঠেছি তার মায়ার এক অন্য অধ্যায়।

আমাকে না বলেই সে তার মামার বাসায় বেড়াতে গেলো। বেড়িয়ে এসে আমাকে জানালো আর বললো, তোমাকে বললে যদি না যেতে দিতে…

মামার বাড়ি যদি যেতে চায়, যাবে। আমি বাধা দেবো এই ভয় তার ভেতর। আমি কত সহজ, অথচ আমাকে সে বুঝলো না। আমি রাগ করবো এই দ্বিধা তার ভেতর। তবে তো সে মনে মনে গেঁথেই নিয়েছে আমি তার স্বাধীন চলার পথে অন্তরায়। সে জানলোই না আমি তার স্বাধীনতায়, স্বাধীন চলায় কত বিশ্বাসী। সে কতই ভাগ্যবতী, অথচ সে নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবলোই না। বললাম, তুমি একটু আনন্দ পাও, আমি কি চাই না? তোমায় বাধা দিয়ে কি আমি আনন্দ পেতাম? তুমি তোমাকে রাঙাও, কিন্তু আমাকে জানাও না। তোমার জীবনের দুটি গল্পের একটি আমাকে জানাও, অন্যটি জানাও না।

দেখলাম আর ও কথা বলছে না। তর্ক না করে চুপ হয়ে আছে। এই তো লক্ষ্মী নারীর লক্ষণ। আর তাই তাকে ভুল না বুঝে বলি, কোথাও গেলে বলে যেও। সাথে তোমার মা থাকলে আমি নিশ্চিন্ত থাকবো।

সে বললো, সব তোমাকে বলতে হবে কেন? প্রতি কদমের হিসাব কি আসলেই দেওয়া সম্ভব? আমার নিজস্বতায় তো অত অধিকার দেখানো ঠিক না। আমি কি আর আমি থাকবো? আমি তো আমিই, না?

ওর এমন জবাব শুনে থমকে গেলাম। রেগে গিয়ে চুপ ছিলো বুঝতে পারিনি। অতিরিক্ত ভালোবাসা পেয়েছি বলে বুঝতে পারিনি, অতিরিক্ত ভালোবাসার মানুষের রাগও অতিরিক্ত হয়। যার উপর সর্বক্ষণ অনুরক্ত ছিলাম, হঠাৎ রাগে তার উপর বিরক্ত হওয়া ঠিক হবে না। তাকে শান্ত করার আগেই সে বললো, প্রিয় জিনিস, প্রিয় মানুষ বেশিদিন প্রিয় থাকে না। নিজেকে যেদিন বদলে নেবো, সেদিন বুঝবে আমার গুরুত্ব।

বলেই সে ফোন রেখে দিলো। আর ফোন ধরে না। তার ছোটো ভাইকে ফোন করলাম। তার পড়াশোনার খোঁজ নিলাম। তার দিদির খোঁজ নিলাম। বুঝতে দিলাম না তার দিদি আমার উপর রেগে আছে। এক পর্যায়ে তার ছোটো ভাই বললো, দিদি ফটিক দাদার সাথে কথা বলছে। দিদিকে ডেকে দেবো?

আমি না উত্তর দিয়ে ফোন কেটে দিলাম। ফটিকের গল্প শ্রেয়সী আমার সাথে অনেক করেছে। ফটিক তাকে বিরক্ত করতো। যে বিরক্ত করতো তার সাথে শ্রেয়সী গল্প করছে, শুনেই খারাপ লাগা কাজ করছে। মনে অনেক কষ্ট লাগলো। এভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবো ভাবিনি। প্রিয় মানুষ আঘাত দিলে আঘাতের চেয়ে অবাক লাগে বেশি। যাকে ঘৃণা করে তাকে সময় দেয়, যাকে ভালোবাসে তাকে হেলা করে। যার কথায় বিরক্ত হয় তার সাথে হেসে কথা বলে, যাকে ভালোবাসে তার সাথে কথা না বলে ফোন রেখে দেয়। ভেতরের সৌন্দর্য আর কদর্য দিন গেলেই উন্মুক্ত হয়। খুব অস্থির লাগে নিজেকে। জীবনে শ্রেয়সীকে পেয়ে ভেবেছিলাম পূর্ণতা পাবো। পূর্ণতা তো পেলামই না, মনে এলো জীর্ণতা। জীবনে পূর্ণতার চেয়ে অপূর্ণতার গল্পই বেশি জমে গেলো। কিছুক্ষণ পরেই সে ফোন দিলো, রাগ না হয় করেছি আমি, রাগ ভাঙাবে কে?

বললাম, তোমার রাগ ভাঙানোর মানুষ আছে।

সে বললো, রাগ ভাঙানোর মানুষটা তো রাগ ভাঙালো না। রাগ ভাঙানোর গুণ কি তোমার আছে?

বিরক্ত হয়ে বললাম, কোনো গুণ আমার নেই। যাকে তাকে আপন করার গুণ আমার নেই। আমার ভালো লাগা হঠাৎ পরিবর্তন হয় না।

এই বলে ফোন রেখে দিই। পরক্ষণে কেন কথা বলছি না আফসোস করি। তার কথায় মনে পড়ে যার সাথে কথা না বলে থাকি। প্রিয় মানুষের সাথে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া। খুব করে যাকে চাওয়া একান্তই তাকে পাওয়া হয় না। এত মনে পড়ে তাকে, কিন্তু তাকে সময় দিতে ইচ্ছা হয় না। সে ফটিকের সাথে কথা বলবে কেন?

একটু পরে আবার ফোন দিলো সে। ফোন ধরলাম, কিন্তু কিচ্ছু বললাম না। সে বললো, ঝগড়ার পর, অভিমানের পর, রাগের পর যে মানুষটা আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারে না সেই মানুষটা আমার হোক।

আমি তার কথার উত্তর করি না। আঘাত পেলে মানুষ শুধু হাসতেই না, কাঁদতেও ভুলে যায়; কথা বলতেও ভুলে যায়। আবার বলে, তুমি আমার সাথে আর কথায় বলছো না। আচ্ছা, আর কখনো রাগ করবো না। তুমি এমন চুপ কেন? কত উচ্ছ্বসিত থাকতে তুমি?

বললাম, আনন্দ জীবনে আর আসবে না।

সে বললো, একা আছো বলে মন খারাপ?

বললাম, একা থাকলে বোকা লাগবে, কিন্তু ঠকবো না।

সে বললো, আমার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করতে। যার সাথে কত শত কথা বলতে তার সাথে এখন কথায় বলতে ইচ্ছা হয় না, কেন?

বললাম, দুঃখ যে দেয়, আঘাত যে দেয় সে তো সব নিজের লোক।

সে বললো, কে তোমাকে দুঃখ দিলো, আঘাত দিলো? যারা কষ্ট দেয়, তাদের ভুলে যাও। ভালো থাকবে। হিসাব কষে চলো, কে আপন কে পর!

বললাম, হিসাব কষে ব্যবসায় হয়, ভালোবাসা হয় না।

সে বললো, আমি তোমার পাশে, তোমার খারাপ থাকার কোনো কারণ নেই। একটু হাসো না! তোমাকে গাম্ভীর্যতায় মানায় না। কত সহজ ছিলে, সরল ছিলে।

বললাম, স্বপ্ন ভাঙলে মানুষ বদলে যায়।

ও বললো, স্বপ্ন ভেঙেছে মানে? কী হয়েছে তোমার?

বললাম, মানুষের যতই কাছে যাই না কেন মানুষ চেনা হয় না। মানুষকে যতই কাছের করার চেষ্টা করি না কেন মানুষ কাছে আসতে চায় না। আপনকে ভুলে মানুষ পরকে টানে। পরের জন্য হৃদয় টানে, পরের সাথে কথা বলে হেসে।

ও বললো, কেউ ভুল বুঝলে তাকে ভুলে যাওয়া ভালো।

কথা বলতে ইচ্ছা করছে না বলে ফোন রেখে দিলাম। মন শুধু ভাবে ওদের মধ্যে কী কথা হতে পারে? যে কথায় হোক আমার খারাপ লাগছে কেন? আমার অস্বস্তি লাগছে কেন? ছোটো ভাইকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম, ফটিক দাদা কবে বেড়াতে এসেছেন?

ছোটো ভাই জানালো, গতকালই।

গতকালই তো শ্রেয়সী বাসায় গিয়েছে। ওদের মধ্যে কি তবে সব সময় কথা হয়? ভীষণ খারাপ লাগা শুরু হলো। যাকে এত বিশ্বাসে রাখি, তাকে আর বিশ্বাসেই রাখতে পারছি না।

এরপর শ্রেয়সীর ফোন আর ধরি না। শাশুড়ি মা ফোন দিলেন। ধরলাম। বললেন, ফোন ধরছো না কেন, বাবা? শ্রেয়সী তো কান্নাকাটি করছে।

মায়ের সাথে কথা শেষ করে ভাবছি, সে কান্না করছে কেন? যে মানুষটা কান্না করতে জানে না, সে মানুষটা ভালো পার্টনার হয় না। আমার সাথে যে কথা না বলতে পেরে কান্না করতে পারে, সে আমাকেই চায়। যে আমার জন্য কান্না করে, সে আমাকেই ভালোবাসে।

তৎক্ষণাৎ ওকে ফোন দিলাম। কথা শুনে বোঝায় যাচ্ছে একটু আগে কান্না শেষ করেছে। বললো, কী হয়েছে তোমার! কেমন আছো?

বললাম, যাকে ছাড়া বাসায় একটি টি-শার্ট খুঁজে পাই না, তাকে ছাড়া কেমন আছি তুমিই বলো।

বললো, ভালোবাসো যারে ভুল বোঝো কেন তারে? তোমার কথা ভাবী, তুমি তো মূল্যই দাও না। আমাকে আর ভালো লাগে না, ভালো লাগা তো চিরস্থায়ী না। অকারণে কেন কষ্ট দাও?

বললাম, ভুল বুঝো না। মন ভালো ছিলো না, তাই ফোন দিচ্ছিলাম না।

সে বললো, নিজের ভালো থাকা, ভালো লাগা অন্যের উপর ছেড়ে দিতে নেই। তাহলে শুধু কষ্ট পেতে হয়। বেশি ভালোবাসি তো প্রয়োজন বোঝো না।

বললাম, বিশ্বাস করো আমি তেমনই আছি যেমন ছিলাম।

সে বললো, অতিরিক্ত বিশ্বাস আর আস্থা মানুষকে একা করে দেয়। অবিশ্বাসী সঙ্গী থাকার চেয়ে নিঃসঙ্গ থাকা ভালো।

কঠিন কঠিন কথা বলে ফোন রেখে দিলো। পেয়ে যাওয়ার পরও এই যে না পাওয়া খুব কষ্টকর। হয় সে রাগ করে, না হয় আমি। হয় সে অবিশ্বাস করে, না হয় আমি। মেসেজ দিলাম, তুমি আমার সেই শূন্যতা, পুরো পৃথিবী দিলেও পূরণ হবে না।

রিপ্লে মেসেজ এলো, কাউকে অবহেলা করে কিছুদিন ভালো থাকা যায়, সারাজীবন না।

আবার মেসেজ দিলাম, আমার উপর রাগ করে, অভিমান করে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? অন্যের উপর অভিমান করে নিজেকে কষ্ট দেওয়া বোকামি।

সে মেসেজ দিলো, বোকা বলেই তো বোকামি করি, চালাক বলেই তো চাতুরি করো। নিষ্ঠুর। কিছু মানুষকে সব দিয়েও আগলে রাখা যায় না।

এমন মেসেজ পেলে রিপ্লে দেওয়ার রুচি থাকে না। সন্দেহ করেই বিপাকে পড়ে গেলাম। কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলে অনর্থক সন্দেহ করতে নেই। যে স্বপ্নে ভাসায়, সে জলে ডোবায় না। কখনো কাউকে খামাখা জীবনে জড়াতে নেই, জীবনে যাকে জড়াতে হয় তাকে সন্দেহের থেকে দূরে রাখতে হয়। না পেরে আমিই ফোন দিলাম। ধরেছে। কথা বলছে না। বললাম, কথা বলো, কী ভাবছো?

বললো, বোকার মতো তাকেই স্মরণ করি যে আমার কথা ভুলেও ভাবে না।

বললাম, ইদানীং পরস্পর পরস্পরকে দোষ দিচ্ছি। আর পরস্পরই কষ্ট পাচ্ছি। আমাদের সুখকে আমরাই বিতাড়িত করছি। আমার ভেতর ত্রুটি আছে। শোনো, বেমানানের সাথে মানিয়ে চলায় জীবন।

বললো, আমি তো ভালো না, নতুবা আমাকে কষ্ট দেবে কেন?

বললাম, তোমাকে কারও সাথে কখনো তুলনা করি না, কারণ আমি তোমাকেই চাই। যাকে পেয়ে খুশি আমি, তাকে কারও সাথে তুলনা করি না। যে তার প্রিয়কে অন্যের সাথে তুলনা করে, সে তার প্রিয়কে না, অন্যকে চায়। বিশ্বাস করো তোমার পর আর কাউকেই ভালো লাগেনি। সৌন্দর্য দিয়ে বিচার করিনি, তারপরও তোমাকে দেখার পর আর কাউকেই সুন্দর লাগেনি। তোমার দিকে তাকিয়ে আমি তোমাকেই দেখি, অন্য কাউকে না। কখনোই না।

এভাবে মিষ্টি কথা বলেও তার মান ভাঙাতে পারলাম না। সে বললো, কারোর সাথে আমাকে তুলনা করো না, খুব ভালো। কিন্তু আমি তোমাকে অন্যের সাথে তুলনা করি। তুলনা না করলে ভালো-মন্দ বোঝা যায় না। চরম অপছন্দের ফটিকের সাথে তুলনা করলেও তুমি হেরে যাও। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ফটিক এখনো আমাকেই চাই, অথচ চরম অপছন্দ করি তাকে জেনেও তার সাথে কথা বলার কথা শুনলেও আমাকে সন্দেহ করো। ফটিক ভালো, কারণ সে ভালোবাসার জন্য নিবেদিত।

ফটিকের কথা শুনতেই শ্রেয়সীর প্রতি চরম বিতৃষ্ণা জাগ্রত হলো। একজন অজপাড়াগাঁয়ের আনাড়ি ছেলের সাথে আমাকে তুলনা করে, আর নিকৃষ্ট বানায়। কত ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করে নিজেকে একটা অবস্থানে এনেছি, আর আমাকে আজ ফটিকের মতো ছন্নচ্ছাড়ার কাছে মানদণ্ডে হারতে হয়।

যার মনে আমি নেই তাকে ভেবে লাভ নেই। যার কাছে আমি গুরুত্বহীন, তাকে গুরুত্ব দিয়ে লাভ নেই। ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসলো না। যে আমার মনে তাকে ভেবে তো অস্থির হবোই। যাকে গুরুত্ব দিয়ে চেয়েছি তার কারণেই তো নির্বিকার হয়ে পড়বো। যাকে সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো তার খোঁজ নিচ্ছি না, আর তাই ছটফট করছি। হৃদয়ে যে একবার বসত গড়ে সন্দেহের কারণে ভুল বুঝলেও ভুলে থাকা যায় না।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments

প্রদীপ কুমার বিশ্বাস on পরীক্ষা – হুমায়ূন আহমেদ
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • desabet
  • desabet
  • rejekibetapk77.online -hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • bandar togel
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot 5k
  • slot depo 5k
  • toto slot
  • slot gacor
  • toto
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • hongkong pools
  • depo 5k
  • situs toto
  • situs toto
  • situs togel
  • situs togel
  • hk pools
  • situs toto
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot gacor
  • bandar togel
  • desabet
  • toto togel
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4d
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto slot
  • toto slot
  • slot gacor
  • judi bola
  • toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel 4D
  • kudamania
  • rejekibet
  • situs togel
  • slot gacor
  • toto togel
  • Slot Gacor Hari Ini
  • toto togel
  • kudamania
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot dana
  • situs toto
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • situs toto
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot hoki
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot88
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • slot hoki
  • slot hoki
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desamania
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • judi bola
  • judi bola
  • situs hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • toto slot
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • situs togel
  • situs togel
  • situs togel
  • bandar togel
  • slot resmi
  • slot gacor
  • slot hoki
  • slot gacor
  • slot resmi
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto slot
  • slot gacor
  • situs toto
  • slot gacor
  • slot dana
  • hk pools
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • situs togel
  • slot gacor
  • situs toto
  • situs togel
  • slot gacor
  • desa bet
  • desabet
  • Kudahoki
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • situs togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot maxwin
  • toto togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot gacor
  • slot resmi
  • situs hk pools
  • desabet
  • slot gacor
  • slot hoki
  • desabet
  • desabet
  • ayamjp
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • slot gacor
  • togel
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs judi
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • togel
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • situs togel
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desa bet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • kudahoki
  • desabet
  • slot gacor
  • slot gacor
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • desabet
  • togel
  • kuda hoki
  • desabet