মধ্যরাতের খাবার – অনীশ দাস অপু

মধ্যরাতের খাবার - অনীশ দাস অপু

ক্রি রি রিং। টেলিফোনের শব্দে চমকে উঠল নিতু। একা বাড়িতে ও। একটা ভূতের গল্প পড়ছিল। বাবা মা সিনেমা দেখতে গেছেন। রাত বারোটার আগে ফিরবেন না। ফোন বেজেই চলেছে। ধরছে না নিতু। জানে বাবা মার ফোন নয়। প্রয়োজন হলে নিতুর মোবাইলে তার ফোন করতেন। আজেবাজে কারও ফোন নয়তো? ইদানীং একটা ছেলে খুব জ্বালাচ্ছে পঞ্চদশী নিতুকে। যখন তখন মোবাইলে ফোন করে বলে বেশিরভাগ সময় সেল ফোন বন্ধ রাখে নিতু। তারপক্ষে নিতুদের বাড়ির নাম্বার জোগাড় করা কঠিন কিছু নয়। ধরবে না ধরবে না করেও রিসিভার তুলে নিল ও। ঝুন ঝুন শব্দটা চাপ সৃষ্টি করছে নার্ভে।

হ্যালো?

এক মহিলা কণ্ঠ। চিনতে পারল না নিতু। খুব দ্রুত কথা বলছেন। বললেন এ মুহূর্তে তার একজন বেবী-সিটার খুব দরকার। খুব জরূরী প্রয়োজনে এখুনি বাইরে যেতে হচ্ছে তাকে। নিতু যদি ঘণ্টা তিনেকের জন্য তার সাত মাসের বাচ্চাটাকে একটু দেখে রাখে খুবই কৃতজ্ঞবোধ করবেন তিনি।

জবাব দিতে ইতস্তত করল নিতু। স্কুলে গরমের ছুটিতে এবারই প্রথম ও বাইরে যায়নি। সময় কাটাতে প্রতিবেশী এক আন্টির ডে কেয়ার সেন্টারে বেবী সিটিং করছে। সন্দেহ নেই মহিলা ওখান থেকে জোগাড় করেছে নিতুর নাম্বার। কিন্তু সে তো দিনের বেলা কয়েক ঘণ্টার জন্য বেবী সিটিং করে। এখন বাজে রাত সাড়ে আটটা। এত রাতে যাওয়া কি ঠিক হবে?

নিতুর কণ্ঠে দ্বিধা লক্ষ করে মহিলা চট করে এমন একটা পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দিলেন, যে কেয়ার সেন্টারের প্রায় আধা মাসের বেতনের সমান। এবার আর দ্বিধা করল না নিতু। তাছাড়া রাতে কখনও বেবী সিটিং করেনি ও। এর মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধও আছে। মহিলা নিতু রাজি হয়েছে জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন পনেরো মিনিটের মধ্যে নিতুদের বাসায় আসছেন ওকে তুলে নিতে। বাড়ির ঠিকানা তার জানাই আছে। ডে কেয়ার সেন্টারে নিতুর ফোন নাম্বারের সঙ্গে বাড়ির ঠিকানাও লেখা ছিল।

বাবাকে ফোন করল নিতু। মোবাইল অফ। মনে পড়ল সিনেমা হল-এ ছবি চলাকালীন মোবাইল বন্ধ রাখতে হয়। বাবা মা মেট্রো সিনেমা হল-এ হরর ছবি ভ্যান হেলসিং দেখতে গেছেন। ছবিটি নাকি রমরমা চলছে। সিনেমা দেখতে ভাল লাগে না নিতুর। সে কার্টুন ছবি দেখে আর বই পড়ে। বইয়ের মধ্যে নিজের একটা জগৎ সৃষ্টি করে নিয়েছে নিতু। বেবী সিটারের কাজটাও উপভোগ করে সে। নাদুসনুদুস গুটু গুটু বাচ্চাগুলোর সঙ্গে খেলা করে ভালোই কেটে যায় সময়।

কাঁটায় কাঁটায় পোনে নটায় নিতুদের বাড়িতে হাজির হয়ে গেলেন মহিলা। নিজের পরিচয় দিলেন মিসেস বারলফ বলে। কৈনসিংটন স্ট্রীটে থাকেন। হড়বড় করে বললেন হঠাৎ একটি জরুরী বিজনেস ডিনারে যেতে হচ্ছে তাকে। তার স্বামী আগেই চলে গেছেন ওখানে। ফোন করে মিসেস বারলফকে এখুনি যেতে বলেছেন। না গেলেই নয়। এতটুকু বাচ্চাকে ডিনারে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাই উপায় না দেখে নিতুকে ফোন করেছেন। নিতুর নাম শুনেছেন মিসেস ক্রিস্টির কাছে। নিতুর মনে পড়ল একটি সুপার মার্কেটে কর্মরত মিসেস ক্রিস্টি তার দুবছরের মেয়েটিকে সকালবেলা নিতুদের ডে কেয়ার সেন্টারে দিয়ে যান। কাজ শেষে নিয়ে যান।

কালো একটা গাড়িতে চড়ে এসেছেন মিসেস বারলফ। গাড়ি চলতে শুরু করার পর নিতুর মনে পড়ল মহিলার তড়বড়ানির চোটে সে মহিলার ফোন নাম্বার কিংবা বাড়ির ঠিকানা কোনও কিছুই বাসায় রেখে আসেনি। এমনকী তাড়াহুড়োয় মোবাইল ফোনটাও আনা হয়নি। মিসেস বারলফ আশ্বস্ত করলেন তাকে। বললের নিতুর বাবা মা বাসায় ফেরার আগেই তাকে নিজে বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। ডিনার শেষ হওয়া মাত্র নিজের বাসায় চলে আসবেন মিসেস বারলফ।

অ্যাডভেঞ্চারের লোভে বেবী সিটিংয়ের প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়ে গেলেও এখন কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে নিতুর। বারবার মনে হচ্ছে কাজটা বোধহয় ঠিক করেনিও।

বৃষ্টি পড়ছে। শীতল হাওয়া আসছে খোলা জানালা দিয়ে। ঘুম ঘুম ভাব এসে গেল নিতুর। চটকা ভেঙে গেল মহিলার খসখসে কণ্ঠস্বরে।

আমার বাচ্চাটাকে তোমার ভালোই লাগবে, বললেন মিসেস বারলফ। মাত্র সাত মাস বয়স ওর। কিন্তু এখনই মাথায় ক্ষুরধার বুদ্ধি।

কী নাম ওর? জিজ্ঞেস করল নিতু। আপনার বাচ্চা কি জেগে আছে এখনও।?

না। না। নিকোলাস ঘুমিয়ে পড়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। হাসলেন মিসেস বারলফ। মহিলার ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক। ভ্যাম্পায়ারের মত লাগছে।

নিতু জানল মহিলার বাচ্চা রাত বারোটায় ঘুম থেকে জেগে ওঠে। তখন তাকে দুধ খাওয়াতে হয়।

আপনার ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বাজবে নাকি? শঙ্কিত হলো নিতু।

আমি বারোটার আগেই ফিরে আসার চেষ্টা করব।, বললেন মিসেস বারলফ। পার্টির ব্যাপার। বোঝোই তো। তবে ভয় নেই। আমি নিজে পৌঁছে দিয়ে আসব তোমাকে বাসায়।

অন্ধকার রাত। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় নোক চলাচল নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে একটা দুটো গাড়ি স্যাঁৎ করে ওদের গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে মুখে হেডলাইটের জোরালো আলো ফেলে।

কনসিংটন স্ট্রীটে ঢুকল কালো গাড়ি। মহিলা ভালোই ড্রাইভ করেন। মেইন রোড ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে বামে মোড় নিলেন তিনি। ঢুকে পড়লেন লম্বা, আঁকাবাকা একটা গলিতে। নিতু জায়গাটা চেনার চেষ্টা করল। ইলেকট্রিসিটি নেই। অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না কিছু। হঠাৎ আরেকটা মোড় ঘুরলেন মিসেস বারলফ। প্রকাণ্ড, পুরানো একটা বাড়ির সামনে ব্রেক কষলেন। প্রকৃতি ফর্সা করে ঝিলিক দিল বিদ্যুৎ। সোনালি আলোতে বাড়িটির পেছনে একটা মাঠ দেখতে পেল নিতু। তার পরে জঙ্গল। জঙ্গল! নিউইয়র্ক শহরে জঙ্গল!! এ কোথায় এসেছে নিতু। ওর গা ছমছম করে উঠল। আশপাশে কোথাও বাতি না জ্বললেও দোতলা বিশাল বাড়িটিতে আলো দেখতে পেল। নিশ্চয় জেনারেটর চলছে। বাড়ির সামনে পুরানো আমলের দুটো গ্যাস ল্যাম্প জ্বলছে। মাটিতে অদ্ভুত ছায়া ফেলছে।

বাড়িটি ধূসর রঙ করা। জানালায় হলুদ রঙ। ছাদটা ঢালু। পুরো বাড়িটিতে কেমন ভীতিকর একটা ব্যাপার আছে। নিতুর পেটের ভেতরটা শিরশির করছে। আবারও মনে হলো ভুল করে ফেলেছে ও। এখানে আসা উচিত হয়নি।

নিতুর দিকের দরজা খুলে গেল। মিসেস বারলফ দাঁড়িয়ে আছেন পাশে, চেহারায় অধৈর্য ভাব।

নেমে এসো, বললেন তিনি। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার স্বামী রাগ করবেন।

মহিলার কণ্ঠে কর্তৃত্বের সুর স্পষ্ট। আমি নামতে চাই না, কথাটা বলার সাহস হলো না নিতুর। দরজা খুলে নেমে পড়ল ও। মহিলার পেছনে পেছনে এগোল সদর দরজার দিকে। ভারী সেগুন কাঠের দরজা। বড়, কালো একটা চাবি বের করলেন তিনি, তালায় ঢুকিয়ে মোচর দিলেন। ক্লিক শব্দে খুলে গেল তালা।

একটা সরু হলঘরে ঢুকল নিতু। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে মিটমিট করে জ্বলছে মোম। কালো, আর লাল ব্রোকেড পেপারে মোড়া দেয়ালে ভৌতিক ছায়া ফেলেছে। মাথায় উপর একটা ঝাড়বাতি জ্বেলে দিলেন মিসেস বারলফ। নিতুর শুকনো চেহারা লক্ষ করলেন।

তোমাকে কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে, হাসলেন তিনি। এখানে ভয়ের কিছু নেই। নিকোলাসের ঘর দোতলায়। রান্নাঘরটা বাড়ির পিছন দিকে। লাইব্রেরি আছে। সময় কাটাতে বই পড়তে পারো। তুমি বসো। আমি নিকোলাসকে একটু দেখে আসি।

মহিলা দোতলায় উঠে গেলেন। একটু পরে নেমে এলেন। নিকোলাস ঘুমাচ্ছে। জানালেন তিনি। আমার ফিরতে যদি দেরি হয়ে যায় ওকে কিন্তু খেতে দিতে ভুল কোরো না। আর হ্যাঁ, একটা কথা ভুলেও কিন্তু ওর ঘরের জানালার পর্দা খুলবে না।

তড়িঘড়ি চলে গেলেন মিসেস বারলফ, নিতুকে গুড় বাই বলারও সুযোগ দিলেন না। মোটর স্টার্ট নেয়ার শব্দ শুনল নিতু। গর্জন তুলে চলে গেল কালো গাড়ি। নিতু হঠাৎ উপলব্ধি করল এই অদ্ভুত বাড়িতে সে একা। সামনের দরজায় দ্রুত গেল ও। লাগিয়ে দিল ছিটকিনি।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল নিতু। বাচ্চার ঘরে যাবে। সিঁড়ি বেয়ে উঠছে, ধুকপুক শুরু হয়ে গেল বুকে। সামনের হলঘরটা ছায়াময়, অন্ধকার। পুরো বাড়িটাকেই ওর হরর সিনেমার ভৌতিক বাড়ির মত মনে হচ্ছে।

হলঘরের শেষ মাথায় চলে এল নিতু। একটা দরজা দেখতে পেল। ভেজানো। ধাক্কা মেরে খুলে ফেলল। উঁকি দিল।

লাল ডিম বাতি জ্বলছে ঘরে। লম্বা, কাঠের একটা দোলনা দেখতে পেল নিতু। নিঃশব্দে ওদিকে হেঁটে গেল ও। ঝুঁকল। ভারি সুন্দর একটি বাচ্চা শুয়ে আছে। দোলনায়। মুখখানা নিতুর দিকে ফেরানো। একমাথা ঘন কালো চুল। নিতুর আগমনে টের পেয়েই কিনা কে জানে, চোখ মেলে চাইল নিকোলাস। ঝাড়া এক মিনিট তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সম্মোহিতের মত বাচ্চাটার দিকে চেয়ে রইল নিতু। চোখ বুজল নিকোলাস। ঘুমিয়ে পড়ল আবার। মিষ্টি, নিষ্পাপ মুখে স্মিত হাসি। মিসেস বারলফের শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটি নিতুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিলেও বাচ্চাটাকে তার খুবই ভালো লেগেছে।

লাইব্রেরি ঘরটা কোন দিকে দেখিয়ে দিয়েছেন মিসেস বারলফ। ওই ঘরে ঢুকল নিতু। ঘরটা কালো কাঠের প্যানেলিং দিয়ে তৈরি। বড় বড় পিঠ উঁচু চেয়ার আর একজোড়া কালো চামড়ার কাউচ চোখে পড়ল নিতুর। চেয়ারের পাশে একটা বাতি। বাতি জ্বালিয়ে চেয়ারে বসল নিতু। বাতির আলোয় ঘরের অন্ধকার দূর হলো সামান্যই। তবে বই পড়া যাবে।

লাইব্রেরি ঘরে কয়েকটা কালো কাঠের আলমারি। তাতে প্রায় সবই ঢাউস সাইজের ইংরেজি বই। বাতির আলোয় দুএকটা বইয়ের নাম পড়তে পারল নিতু। ব্ল্যাক ম্যাজিক আর উইচক্রাফটের উপর লেখা। সঙ্গে একটা হরর বই তো আছেই। তাই ওদিকে আর নজর দিল না নীতু। নিজের আনা ভৌতিক গল্প সংকলনে মনোনিবেশ করল।

কড়-কড়-কড়াৎ! শব্দে বাজ পড়ল কোথাও। বুকের রক্ত ছলকে উঠল নিতুর। পরমুহূর্তে বিদ্যুতের আলো ঝলসে দিল ঘর। চেয়ার ছেড়ে উঠল ও। হেঁটে গেল লাল পর্দা ফেলা জানালার ধারে। ভারী পর্দা টেনে সরাল। মাঠের ধারের জঙ্গলে বাহু ছড়িয়ে নাচছে গাছের ডাল। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে আরও। হঠাৎ কারও সঙ্গে কথা বলার খুব ইচ্ছে জাগল নিতুর-বাবা, মা, বন্ধু, কিংবা অন্য কেউ। লাইব্রেরি ঘরে টেলিফোন খুঁজল নিতু। নেই। হলঘরেও পেল না।

অকস্মাৎ আতংক ভর করল নিতুর মনে। কুডাক ডাকছে মন। এক ছুটে বসার ঘরে ঢুকল। অন্ধকার। দেয়াল হাতড়াল বাতির সুইচের জন্য। হঠাৎ কীসের সঙ্গে যেন ধাক্কা খেল ও। নরম কী একটা ছুটে পালিয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল নিতু। দৌড়ে চলে এল লাইব্রেরি ঘরে। লাল চেয়ারটাতে বসে পড়ল। পা মুড়ে নিল। হাত দিয়ে ঢাকল মুখ। তারপর ফোঁপাতে শুরু করল।

.

তীব্র কান্নার আওয়াজে জেগে গৈল নিতু। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। ভীত চোখে চাইল চারপাশে। এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না কোথায় আছে। তারপর মনে পড়ে গেল সব। দোতলা থেকে ভেসে আসছে টা টা চিৎকার। লাইব্রেরি ঘরের গ্রাণ্ডফাদার কুক গম্ভীর ঢং ঢং সুরে জানান দিল বারোটা বাজে। এখন মাঝ রাত। খিদে পেয়েছে নিকোলাসের।

নিতুর অবাক লাগল ভেবে ঠিক বারোটার সময়ই কি খিদে পেয়ে যায় বাচ্চার? আর এভাবে তারস্বরে কাঁদতে থাকে? মিসেস বারলফ তো বললেন বারোটার আগেই ফিরবেন। কই এলেন না তো এখনও!

বাচ্চার কান্না তীব্রতর হলো। কানে বাড়ি খাচ্ছে দ্রিম দ্রিম। লাফ মেরে উঠে পড়ল নিতু, এক ছুটে চলে এল রান্নাঘরে। বাচ্চার কান্না প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সারা বাড়িতে।

সুইচ টিপে বাতি জ্বালল নিতু। ওর সাড়া পেয়ে একটা ইঁদুর ফ্রিজের নিচে লুকিয়ে পড়ল। মাগো, কত্তবড় ইঁদুর! গায়ে কাঁটা দিল নিতুর। একটানে ফ্রিজের দরজা খুলল। ওপরের শেলফে একটা বোতল বোঝাই কালো রঙের জুস। দুধের বোতল খুলল নিতু। নেই। শেষে জুসের বোতল নিয়েই ছুটল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ি বাইছে নিতু, কলজে যেন গলায় এসে ঠেকেছে।

নিকোলাসের ঘরে ঢুকল নিতু। দোলনা ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চা। মুখ হাঁ করে কাঁদছে। নিতুকে দেখে থেমে গেল কান্না। হাত বাড়াল বোতলের দিকে। বোতলটা ওর হাতে দিল নিতু। দেখল বোতল মুখে পুরে চুক চুক করে জুস খাচ্ছে নিকোলাস। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল নিতু। যাক, বাচ্চা ঠিকই আছে। স্রেফ খিদেয় কান্নাকাটি করছিল। ঘরে জিরো ওয়াটের লাল রঙের ডিম বাতি ছাড়া কিছুই জ্বলছে না। নিতু সুইচ খুঁজল অন্য বাতিগুলো জ্বেলে দেয়ার জন্য। আশ্চর্য! ডিম বাতি আর এয়ার কুলারের সুইচ ছাড়া আর কোনও সুইচ নেই ঘরে। এয়ারকুলার বন্ধ। তাই ভাপসা গরম লাগছে। এসি ছাড়ল নিতু। চলল না এয়ার কুলার। নষ্ট নাকি? নিতু জানালার দিকে এগিয়ে গেল। মনে পড়ে গেল মিসেস বারলফের সতর্কবাণী। তিনি জানালা খুলতে নিষেধ করেছেন। হয়তো বিদ্যুতের আলোয় ভয় পেয়ে জেগে যেতে পারে নিকোলাস, এ আশঙ্কায়। এখন তো জেগেই আছে বাচ্চা। জানালার পর্দা টেনে সরাল নিতু।

থেমে গেছে বৃষ্টি। আকাশের কালো মেঘ কেটে ভেসে উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ। রূপোলি আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দিল নিকোলাসের দোলনা। সে মুখে বোতল রেখে চোখ বড়বড় করে তাকাল চাঁদের দিকে।

জানালা খুলতে যাচ্ছে নিতু, থমকে গেল অদ্ভুত একটা শব্দ শুনে। বাচ্চার মাথার পেছনের জানালায় থ্যাচ করে একটা শব্দ হয়েছে। এগিয়ে গেল নিতু। কাঁচের গায়ে সেঁটে আছে একটা বাদুড়, তাকিয়ে রয়েছে বাচ্চার দিকে। ঘেন্নায় মুখ বাঁকাল নিতু, পিছিয়ে গেল এক কদম। আরেকটা বাদুড় এসে নামল জানালায়। নিকোলাস হাঁ করে তাকিয়ে আছে বিকট প্রাণীগুলোর দিকে। হঠাৎ হাত থেকে বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সে মেঝেতে। ঝুঁকে গেল জানালার দিকে। মেঝে থেকে বোতলটা তুলে নিল নিতু। ঘন কয়েক ফোঁটা রস পড়েছে মেঝেতে। কালচে রক্তের মত দেখাচ্ছে। গা টা কেমন রি রি করে উঠল।

ঠিক তখন নিতুর দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল নিকোলাস, লম্বা, একটানা সুরে কাঁদতে লাগল। ঊ্যা আত্ম-টা আ আ! হাত বাড়িয়ে দিল। কোলে নিতে বলছে। নিকোলাসের কান্নাটা ঠিক যেন মানুষের বাচ্চার মত নয়, প্রলম্বিত ভৌতিক একটা সুর। গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল নিতুর। ওকে কোলে নেবে কি নেবে না দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, চিৎকারের মাত্রা বেড়েই চলল বাচ্চার। শেষে বাধ্য হয়েই ওকে কোলে নিল নিতু। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল কান্না। নিতুর ঘাড় জড়িয়ে ধরল নিকোলাস।

নিতুর পেছনে আবার থ্যাচ করে শব্দ হলো। বুঝতে পারল আরেকটা বাদুড় এসে বসেছে জানালায়। ওদের দিকে তাকিয়ে আছে নিকোলাস, চাঁদের আলোয় চকচকে করছে চোখ। ওকে কাঁধে তুলে নিল নিতু। আদর করে চাপড় দিতে লাগল পিঠে। ওর মাথাটা ঘাড়ের পাশে এলিয়ে দিল। ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করছে। নিতু টের পেল নিকোলাসের শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠেছে। অদ্ভুত হিস শব্দ বেরিয়ে এল মুখ থেকে। যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল নিতু, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেক। চারটে ছোট দাঁত কামড়ে ধরল নিতুর ঘাড়, এক টানে ছিঁড়ে ফেলল জুগুলার ভেইন।

Facebook Comment

You May Also Like