কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের ২৬টি মজার ঘটনা

kazi nazrul islam

কবি কাজী নজরুল ইসলামের রসবোধ সম্পর্কে তার লেখনীর মাধ্যমে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। কবিকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, তারা সকলেই মুগ্ধ হতেন তার ভীষণ আয়েশী আড্ডাবাজ স্বভাব এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে খোশমেজাজে থাকতে পারার দুর্দান্ত ক্ষমতায়। তারই কিছু নমুনা এখানে।

১) কবি নজরুল তখন খুব ব্যস্ত। নিয়মিত গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে আসেন, গান লিখেন, সুর করেন, গান শিখিয়ে দেন। বেশীর ভাগ গান গাইছেন কে মল্লিক। একদিন এই কে মল্লিকের কাছে এক লোক এল। লোকটির নাম প্রফেসর জি দাস। এসে ধরল মল্লিককে, সে গান গাইতে চায়। গান গাইতে হলে তো পরীক্ষা দিতে হবে কোম্পানিতে, পরীক্ষা নেয়া হলো। ফলাফল, একেবারে অচল! গান নেওয়া হবে না শুনে ওখানেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলেন বেচারা প্রফেসর। কে মল্লিক যতই সান্তনা দেন, বেচারা ততই কাঁদেন। আওয়াজ শুনে এলেন কোম্পানির বড়বাবু। তিনি সব শুনে প্রফেসরকে বললেন, ‘আপনার গলা এখনও ঠিক হয়নি। সুর-তাল-লয় ঠিক থাকছেনা, কদিন পর আসুন, দেখা যাক কী হয়।’

প্রফেসর লোকটি তখন বড়বাবুর কাছে কয়েকজনের নামে বিচার দিলেন যারা তাকে ফুঁসলিয়ে মিষ্টি খেয়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে। ওরা নাকি তাকে এও বলেছে যে তোমার গলা ভাল হলেও কে মল্লিক হিংসা করে তোমাকে গান গাইতে দিবে না। বড়বাবু বুঝলেন যে বেচারা খুব সরল মানুষ, তাকে যেভাবে বুঝানো হয়েছে সে বুঝেছে। প্রফেসরের কান্না আর থামছে না।

এমন সময় রুমে ঢুকলেন কাজী নজরুল। কী ব্যাপার? বলে তিনি মনোযোগী হলেন কান্নাকাটির কারণ জানতে। বড়বাবু আর কে মল্লিক তাকে সব খুলে বললেন। কবি তখন বললেন, বেচারা থেকে রেকর্ডের আশ্বাস দিয়ে যখন মিষ্টি খাওয়া হয়েছে, অতএব তার একটা গান রেকর্ড করতেই হবে।

কে মল্লিক বললেন, ‘আরে কাজীদা, কী বলছেন আপনি? দেখছেন না লোকটা একজন পাগল।’

কবি উত্তর দিলেন, ‘আরে মল্লিক, আমারা বাঙালীরাও কিন্তু কম হুজুগে নই, দেশটাও হুজুগে।’ এই বলে কবি প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শোনো, তুমি কাল এসো, তোমাকে শিখিয়ে আমি রেকর্ড করিয়ে নিব।’ কবি নজরুল বলে কথা। মল্লিক আর বড়বাবু তাকে ভাল করেই জানেন। কাজেই সবাই পরবর্তী কান্ড তামাশা দেখার অপেক্ষায় থাকলেন।

কবি গান রেকর্ডের সব ব্যবস্থা করলেন। গান লেখা হলো, কবি প্রফেসরকে বললেন যে এই গানের কথা যেন কেউ জানতে না পারে, যখন গান বাজারে আসবে তখনই শোনা যাবে প্রথম। রেকর্ডের সব ঠিকঠাক করে কবি বললেন, ‘আচ্ছা, এবার গান ধরো–কলা গাড়ি যায় ভষড় ভষড়/ ছ্যাকরা গাড়ী যায় খচাং খচ/ ইচিং বিচিং জামাই চিচিং/ কুলকুচি দেয় করে ফচ…’

অদ্ভুত এমন গান শুনে উপস্থিত বাকি দুজন ওখানেই হাসতে লাগলেন, কবির কান্ড দেখে তারা ততক্ষণে খেই হারিয়ে ফেলছেন। পরের দিন এর আরেক জোড়া লিখে আনলেন কবি, এবার অপর পিঠে রেকর্ড করালেন–‘মরি হায় হায় হায়, কুব্জার কী রুপের বাহার দেখো।/ তারে চিৎ করলে হয় যে ডোঙা/ উপুড় করলে হয় সাঁকো।/ হরি ঘোষের চার নম্বর খুঁটো, মরি হায় হায় হায়…’

এ গানে প্রফেসরকে যে চতুষ্পদ বানানো হচ্ছে, তাও কেউ টের পেল না। খুব উৎসাহে প্রফেসর রিহার্সাল করতে থাকল। রেকর্ডিং ম্যানেজারকেও জানানো হলো না, কী গান কাকে দিয়ে রেকর্ড হচ্ছে। চরম গোপনে গান দুটো রেকর্ড হল, তারপর বাজারে ছাড়া হল।

বাজারে প্রকাশিত হওয়ার দু একদিন পর কবি মল্লিককে ডেকে বললেন, ‘একটু দেখে আসুন তো বাজার থেকে, কেমন বিক্রি হচ্ছে গান দুটো?’

বাজারে খোঁজ নিয়ে এসে মল্লিক হাসতে হাসতে বললেন কবিকে, ‘কাজীদা, খুব বিক্রি হচ্ছে অদ্ভুত গানদুটো। ক্রেতারা কিনছে আর গাইছে, কলা গাড়ী যায় ভষড় ভষড়…’

কোম্পানির ম্যানেজার তো দারুণ খুশী। বড়বাবুকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তো বলেছিলে, লোকটি পাগল। ওর গান তো বেশ সেল হচ্ছে, আরও দু একটা নাও না ওর গলায়…’

মল্লিক সাহেব দৌড়ে গিয়ে কাজীকে কর্তার প্রস্তাব জানালেন। কবি হাসতে হাসতে বললেন, ‘মল্লিক সাহেব, এবার কিন্তু গালাগাল খেতে হবে, হুজুগে দেশে এসব একবারই চলে।’ বলেই আবার জোরে হাসিতে ফেটে পড়লেন কাজী নজরুল ইসলাম।

২) একবার নজরুল গেছেন সিরাজগঞ্জে, আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর বাসায়। খাওয়া দাওয়ার পর সবাইকে দই দেয়া হলো। কিন্তু সে দই আবার বেজায় টক হয়ে গিয়েছিল। তা খেয়ে নজরুল আসাদউদ্দৌলার দিকে তাকিয়ে চোখে-মুখে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন, ‘তুমি কি এই দই তেতুঁল গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে এলে নাকি?’

৩) কবির এক বন্ধু ছিল, শৈলেন নাম। কবি তার কাছ থেকে কেবল চা খেতেন। আর প্রতিদিন শৈলেনের কাছ থেকে চা খাওয়ার জন্য নিত্যনতুন ফন্দি আঁটতেন। একদিন আর কোনো ফন্দি-ফিকির না পেয়ে তিনি শৈলেনের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তুমি তো অনেক টাকা পাবে আমার কাছে, হিসেব করে রেখো, আপাতত দু পেয়ালা চা দাও।’ শৈলেন তো অবাক! এ আবার কেমন কথা! অনেক টাকা পাওয়ার সঙ্গে দু পেয়ালা, মানে দুই কাপ চায়ের কী সম্পর্ক? তিনি চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দু পেয়ালা কেন?’

কবি বললেন, ‘আরে, লাখ পেয়ালা চা না খেলে টাকা হয় না। লাখ পেয়ালা হতে আমার এখনও দু পেয়ালা বাকি আছে।’

৪) অসামান্য প্রতিভাবান কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন ইসলামি হামদ, নাত, গজল রচনা শুরু করলেন, তখনকার একটি ঘটনা । শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন অনেক খোঁজাখুজি করে নজরুলকে না পেয়ে সকালে তার বাসায় চলে গেলেন। বাসায় গিয়ে দেখলেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছেন । নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন । আব্বাসউদ্দিন অনেকক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে তিনি উসখুস করতে লাগলেন ।

নজরুল বললেন ‘কী, তাড়া আছে, যেতে হবে?’

আব্বাসউদ্দিন বললেন ‘ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আর এসেছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য। গজল না নিয়ে আজ যাওয়া হচ্ছে না।’ (নজরুলকে যেহেতু বাউন্ডুলে স্বভাবের কারণে পাওয়া যেত না, তাই সবাই এইভাবে লেখা আদায় করত!)

নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিষ্কার চাদর তার ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন। এরপর আব্বাসউদ্দিন যথারীতি জোহরের নামাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নজরুল তাঁর হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘এই নাও তোমার গজল’। এই গজলটিই হলো–‘হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ/ দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ…’

৫) পাড়ায় নতুন জামাই এসেছে। নজরুল বন্ধুদের নিয়ে ফন্দি আঁটলেন জামাইয়ের কাছ থেকে টাকা খসাতে হবে। তিনি জামাইকে গিয়ে বললেন, ‘নতুন জামাইদের দরমা পীরের দরগায় যেতে হয়। চলুন। নইলে অকল্যাণ হবে।’

নজরুলের বুদ্ধিতে একটা পোড়ো বাড়ির মধ্যে ‘দরমা ঘর’ আগে থেকেই লাল কাপড়ে ঢেকে রাখা হলো। জামাই সেখানে গিয়ে সালাম করে নগদ সালামি দিলেন। অথচ ‘দরমা’ মানে হলো হাঁস-মুরগির ঘর। যাই হোক, এবার বন্ধুরা মিছিল করে জামাইয়ের শ্বশুরবাড়ি এসে উপস্থিত হলো। গেটে দাঁড়িয়ে নজরুল ছড়া কাটতে শুরু করলেন :

মাসি গো মাসি

তোমার জামাইয়ের দেখ হাসি

দরমা পীরে সালাম দেওয়ালাম

খাওয়াও মোদের খাসি।

৬) কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় আরেকটি কোম্পানি ছিল, বাহাদুর কোম্পানি। এটিও বাদ্যযন্ত্র হারমোনিয়ামের ব্যবসা করত। পত্রিকায় নজরুলের লেখা ডোয়াকিন কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে তারাও ছুটে এল কবি নজরুলের কাছে। তাদেরও দাবি, আমাদের জন্যও লিখে দিন এমন একটি বিজ্ঞাপন। কী আর করা? কবি আবারও লিখে ফেললেন–

‘মিষ্টি বাহা বাহা সুর,

চান তো কিনুন ‘বাহাদুর’।

দুদিন পর বলবেনা কেউ-‘দূর দূর’,

যতই বাজান ততই মধুর মধুর সুর!!

করতে চান কি মনের প্রাণের আহা দূর?

একটি বার ভাই দেখুন তবে ‘বাহাদুর’,

যেমন মোহন দেখতে তেমনি শিরীন ভরাট,

বাহা সুর, চিনুন, কিনুন বাহাদুর।

এরপর কয়েক মাস ধরে একই পত্রিকায় এ দুটো বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল এক সাথে। কোম্পানিও ব্যবসা করেছিল দেদারসে।

৭) ছোটদের জন্য পাঠ্যবই লিখতেন আলী আকবর সাহেব। একদিন নজরুল ইসলামকে একটি পান্ডুলিপি দেখিয়ে মতামত চাইলেন। পুরো পান্ডুলিপিটি পড়ে নজরুল বললেন, ‘আপনার পান্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। যদি বলেন তো আমি একটা ছড়া লিখে দিতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন নজরুলকে একটি ছড়া লিখে দেয়ার জন্য। নজরুলও দু’খিলি পান মুখে পুরে লিখলেন সেই বিখ্যাত ‘লিচু চোর’–‘বাবুদের তালপুকুরে/ হাবুদের ডালকুকুরে/ সেকি ব্যস করলো তাড়া/ বলি, থাম-একটু দাঁড়া…’

৮) পুতুলের মতো ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে অঞ্জলি। একদিন নজরুল বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ তার চোখ পড়লো অঞ্জলির ওপর। নজরুল দেখলেন, একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ-ঠোঁট উল্টিয়ে, হাত-পা নেড়ে অঞ্জলি যেন কার সঙ্গে কথা বলছে। সেই কথা আর শেষই হতে চায় না। নজরুল ভাবলেন, নিশ্চয়ই কেউ পেয়ারা গাছে উঠেছে। তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে অঞ্জলি পেয়ারা চাইছে, কিন্তু গাছের ওপর যে, সে পেয়ারা দিচ্ছে না। নজরুল তো ছোটদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি ভাবলেন, অঞ্জলির হয়ে পেয়ারা চাইবেন। ছেলেটা দেয় তো ভালো, না দিলে নিজেই পেয়ারা পেড়ে দেবেন। মজার ব্যাপার হলো, অঞ্জলির সামনে গিয়ে কবি নজরুল গাছের ওপর কাউকেই দেখতে পেলেন না। তবে অঞ্জলি কথা বলছিলো কার সঙ্গে? নজরুল তখন অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কার সাথে কথা বলছিলে?’ অঞ্জলি বলল, ‘কাকাবাবু! ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালী। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও দেয় না।’ কাঠবেড়ালীর সঙ্গে অঞ্জলির এই মান অভিমানের ঘটনাটি নজরুলকে এতোটাই চমৎকৃত করলো যে, এ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য লিখলেন ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’ নামের সেই কবিতা–‘কাঠবেড়ালী! কাঠবেড়ালী! পেয়ারা তুমি খাও?/ গুড়-মুড়ি খাও! দুধ-ভাত খাও? বাতাবি লেবু? লাউ?…’

৯) সওগাত পত্রিকা অফিসের সান্ধ্য আড্ডায় নজরুল ছিলেন মধ্যমণি। তাই তার জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে রাখা হতো। কে না জানে নজরুল চা-পান একটু বেশিই খেতেন। তাই চা এলেই তিনি চিত্কার করে বলে উঠতেন, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে।’ এটা ছিল নজরুলের একটা কমিক গানের শিরোনাম। তত্কালীন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে কটাক্ষ করে তিনি এ হাসির গান লিখেছিলেন। আনন্দ প্রকাশের জন্য নজরুল এভাবে প্রায়ই বলে উঠতেন, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে!’

১০) নজরুল একবার মফস্বলের কোনো এক গ্রাম ঘুরে এসে সওগাত পত্রিকার মজলিসে বসে জোরে হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, ‘আল্লারে, বিল্লা এক্করে হাল্ দিয়া উত্কা মাইরা বাইরে পইড়্যা গেছে। আমি জমাইছি মেকুরডা চাইয়া দেহি বিল্লিডা।’ ঘরশুদ্ধ লোক হেসে অস্থির। পরে জানা গেল গ্রামে গিয়ে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন সেখানে নাকি রাতে এক কাণ্ড ঘটেছিল। জানালা দিয়ে একটি বিড়াল অন্য একটি বিড়ালকে তাড়া করে লাফ দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়েছিল। কী হলো ভেবে বাড়ির একটা লোক গ্রাম্য ভাষায় এই কথাগুলো বলছিল। আর নজরুল তার হুবহ বয়ান করলেন।

১১) ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় এক কালে লিখতেন নজরুল। সেকালে পত্রিকাটির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। কলকাতার এক বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী কবি নজরুলের কাছে এসে বায়না ধরলো, একটি বিজ্ঞাপন লিখে দিতে। কোম্পানিটির নাম ডোয়াকিন এন্ড সন্স। তাদের নির্মিত হারমোনিয়ামের জন্য কবি নজরুল তখনই কাগজ কলম নিয়ে বসে লিখে ফেললেন এই বিজ্ঞাপনটি–

‘কি চান? ভাল হারমোনী??

কাজ কি গিয়ে-জার্মানী?

আসুন দেখুন এই খানে,

যেই সুর যেই গানে,

গান না কেন, দিব্যি তাই,

মিলবে আসুন এই হেথাই,

কিননি কিন, ডোয়ার কিন..

১২) নজরুলের গান রচনার আর রেকর্ডের আঁতুড়ঘর ছিল কলকাতার বিষ্ণু ভবন। সেখানে রিহার্সেল রুমে চা সাপ্লাই করতেন সুধীর নামে এক ব্যক্তি। তার প্রতি হুকুম ছিল প্রতি আধ ঘণ্টা পর পর কবির সামনে ‘হাফ কাপ চা’ রেখে যেতে। এই চায়ের রূপ দুধের স্বল্পতার কারণে কালচে-লাল রং ছিল, তাই কবি এর নাম দিয়েছিলেন ‘সুধীর বাবুর বদরক্ত!’

১৩) একজন অ-বাঙালি ভদ্রলোক কবির খুব ভক্ত ছিলেন। কবিকে তিনি অনেক সময় অনেকভাবে সাহায্য করতেন। কোনো একদিন কলকাতায় কবির বাড়িতে কয়েকজন অভ্যাগতর সঙ্গে কবি গল্পগুজব করছেন। সেই অ-বাঙালি ভদ্রলোকও ছিলেন। একসময় তার সঙ্গে কবির হিন্দি বনাম বাংলা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হচ্ছিল। ভদ্রলোকটি হিন্দি ভাষার জন্য ওকালতি করছিলেন। কবি হাসতে হাসতে বললেন, ‘যাও! যাও! তোমাদের হিন্দি ভাষা তো কুকুর বেড়ালের ভাষা!’ শুনে ভদ্রলোকটি একটু ক্ষুণ্ন হয়ে বলে উঠলেন, ‘কেঁও?’ অমনি কবি বলে উঠলেন, ‘ওই দেখ কুকুরের ডাক ডাকলে!’ ভদ্রলোকটি কবির কথায় রাগ না করে হেসে বললেন, ‘হুয়া হুয়া!’ কবি বললেন, ‘ওই দেখ শিয়ালের ডাক ডাকলে, আমি ঠিক বলিনি?’ উপস্থিত সকলেই এই রসালাপে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন।

১৪) লোকের নাম নিয়েও ব্যঙ্গ করতেন নজরুল। তখনকার নূর লাইব্রেরির মঈনুদ্দীন হোসেনকে তিনি বলতেন, ‘রয়টার’। কারণ, হোসেন সাহেব যেকোনো খবর সবার আগে কলকাতার সব পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসতেন। নজরুলের বন্ধু ‘মোসলেম ভারত’-এর আফজাল-উল-হককে তিনি ডাকতেন ‘ডাবজল’ বলে। ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাসকে তিনি বলতেন, ‘সজনে ঘণ্ট খাস’। মোহাম্মদী ও সওগাতের দ্বন্দ্ব যখন চরমে, নজরুলকে মোহাম্মদী যখন ‘আজাজিল’ আখ্যা দেয়, তখন নজরুল আকরম খাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘বাগরম খাঁ’। মোহম্মদ ওয়াজেদ আলীকে তিনি ডাকতেন ‘বুড়ো’ বলেন। কারণ তিনি যুবক হয়েও বুড়োদের মতো যুক্তি-তর্ক ছাড়া কথা বলতেন না। বিজলী ধর নামে কবির এক ভক্ত অটোগ্রাফ নিতে এলে তিনি লিখে দিলেন ‘বি-জলি’। মানে Be jolly, অর্থাৎ হাসিখুশির মধ্যে থাকো!

১৫) একবার গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ডে গান দিতে এলেন এক লোক। লোকটিকে নজরুলের কাছে পাঠানো হলো তার গানের দৌড় পরীক্ষা করার জন্য। লোকটি হারমোনিয়াম নিয়ে কবির সামনে বসলেন এবং গান শুরু না করে কথা শুরু করলেন। কার কাছে গান শিখেছেন, কবে তার গান শুনে কে প্রশংসা করেছে, তিনি কতখানি পাণ্ডিত্যের অধিকারী ইত্যাদি। মাঝে একবার কবিকে জিজ্ঞাসা করেই বসলেন, ‘আপনি কি ধানশ্রী ভৈরবী রাগের গান শুনেছেন? শোনেন নি বোধহয়। খুব রেয়ার। কেবল আমার কাছেই আছে।’ এইভাবে লোকটি গান না গেয়ে বকবক করেই যাচ্ছিল। নজরুল তখন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি তো দেখছি একটি জানোয়ার লোক।’ ‘কী বললেন?’ ভদ্রলোকটি নজরুলের কথায় বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল। নজরুল বললেন, ‘না না অন্য কিছু মনে করবেন না, দেখলাম আপনি অনেক কিছু জানেন, তাই আপনার সম্বন্ধে ‘জানোয়ার’ শব্দটি প্রয়োগ করেছি!’ লোকটি হাঁ করে বসে রইল।

১৬) একবার নজরুলকে তাঁর বন্ধুরা খুঁজছেন। এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজা হচ্ছে। হঠাৎ দূর কোনো বাড়ি থেকে অট্টহাসির শব্দ কানে আসতেই নজরুলের খোঁজ মিলল। এমনই ছিল নজরুলের হাসির সুনাম।

নিজের হাস্যরসপূর্ণ চরিত্রকে নজরুল নিজেই তুলে ধরেছেন একটি হাসির গানে,

‘আমি দেখব হাসি

আমায় দেখলে পরে হাসতে হাসতে পেয়ে যাবে কাশি।

আমি হাসির হাঁসলী ফেরি করি এলে আমার হাসির দেশে

বুড়োরা সব ছোঁড়া হয়, আর ছোঁড়ারা যায় টেঁসে

আমার হাস-খালিতে বাড়ি, আমি হাসু-হানার মাসি।’

১৭) সুফিয়া কামাল কাজী নজরুল ইসলামকে ডাকতেন দাদু বলে। কবি আবার প্রায়ই সুফিয়া কামালের বাড়ি যেতেন। সেখানে গানের আসর বসত। সে আসরে সাহিত্য অনুরাগী অনেকেই থাকতেন। এ সময় নজরুলের পেছনে গোয়েন্দা লাগে। সাহিত্য অনুরাগীদের সঙ্গে মিশে কয়েকজন গোয়েন্দাও আসতেন। একদিন এক ভদ্রলোকের মুখের ওপর নজরুল কবিতা আওড়ালেন, ‘তুমি টিকটিকি জানি ঠিকঠিকই।’

কবিতার ধরন শুনে লোকটি মুখ লাল করে উঠে যেতেই কিশোরী সুফিয়া কামাল অবাক হয়ে বললেন, ‘দাদু। তুমি একে চিনলে কী করে?’

‘গায়ের গন্ধে। বড়কুটুম যে।’ নজরুলের উত্তর।

১৮) কাজী নজরুল ইসলাম একবার ট্রেনে যাচ্ছিলেন। পাশে সমবয়সী এক ভদ্রলোক হঠাৎ তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘এই শালা, তোর কাছে দেশলাই আছে?’

অপরিচিত এক লোকের এমন সম্ভাষণে কবি প্রথমে চমকে উঠলেন, তারপর বিরক্ত। কিন্তু পরক্ষণেই পরিস্থিতি সামলে নিয়ে হেসে পকেট থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটা তার মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘লে বে শালা।’

ইটের বদলে পাটকেল খেয়ে অপরিচিত ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘পরিচয়ের একটু পরেই আমরা এই সম্ভাষণেই পৌঁছাতাম। তাই অনেক ভেবে ওখান থেকেই শুরু করেছি। কী, ঠিক করিনি?’

১৯) কাজী নজরুল তখন গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। একদিন তিনি ওখানে দোতলায় বসে আছেন। এমন সময় এক কমর্চারী এসে বললেন, ‘কাজীদা, ইন্দুদি (সংগীতশিল্পী ইন্দুবালা) আপনাকে নিচে ডাকছেন।’

এ কথা শুনে কবি সকৌতুকে বললেন, ‘আর কত নিচে নামব, ভাই?’

২০) যমুনাপারের শহর সিরাজগঞ্জে নিখিলবঙ্গ মুসলিম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম সম্মেলনের সভাপতি। কবিকে উপলক্ষ করে দুপুরে বাংলোতে খাবারদাবারের ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। অতিথিরা সবাই খেতে বসেছেন। খাবার পরিবেশনকারী ছেলেটি কবিকে প্রথমে এক টুকরো ইলিশ দিলেন। প্রথম টুকরো শেষ হতেই দ্বিতীয় টুকরো তুলে দেওয়া হলো কবির পাতে। পদ্মার ইলিশ কবি খেতে লাগলেন পরম তৃপ্তিতে। এবার তৃতীয় টুকরো দেওয়ার জন্য ছেলেটি কাছে আসতেই কবি তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, ‘আরে, করছ কী? এত মাছ খেলে শেষকালে আমাকে বিড়ালে কামড়াবে যে!’

২১) প্রতিবেশীর মেয়ের আকিকা। বিশাল আয়োজন। বাড়িভর্তি লোকজনের আনাগোনা, আনন্দ-ফুর্তি। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি দেখে তিনি অদ্ভুত এক কাণ্ড করলেন। প্রতিবেশীর বাড়িতে উপস্থিত হলেন রোগা-পটকা এক ঘোড়ার পিঠে বিদঘুটে চেহারার এক লোককে বসিয়ে। লোকটি দেখতেই শুধু বিদঘুটে নয়, তার পোশাকও অদ্ভুত—শতেক ছেঁড়া, ধুলাবালু মাখা। মুখভর্তি গোঁফদাড়ির জঙ্গল।

নজরুল বাড়ির গিন্নিকে ডেকে বললেন, ‘মাইজি, তোমার মেয়ের জন্য বর এনেছি। পছন্দ হয়নি?’

বাড়ির গিন্নি নজরুলের এমন রসিকতার কারণ বুঝতে পেরে বললেন, ‘আমি তো বাপু ভেবে রেখেছি তোমার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দেব।’

বাড়িভর্তি মানুষের সামনে হঠাৎ উল্টো প্রস্তাব পেয়ে কিশোর নজরুলের চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ঘোড়াসহ ওই বিদঘুটে লোকটিকে রেখেই দ্রুত চম্পট দিলেন সেখান থেকে।

২২) সাহিত্যরসিক গজেন ঘোষের বাড়িতে প্রায়ই তুমুল আড্ডা হতো। সে আড্ডায় কাজী নজরুল ইসলামও শরিক হতেন। একদিন হঠাৎ করে বলা-কওয়া নেই, কবি টেবিলের ওপর থেকে বই, অপ্রয়োজনীয় পুরোনো ময়লা কাগজপত্র সরাতে লাগলেন। তাতে ধুলো উড়তে লাগল। কবির কাণ্ড দেখে ঘোষমশাই বিচলিত হলেন, ‘আরে, করছ কী?’

নজরুল গম্ভীরভাবে বললেন, ‘অহল্যা উদ্ধার করছি।’

‘অহল্যা উদ্ধার?’

‘হ্যাঁ, এর কোমল হৃদয় পাষাণ হয়ে গেছে,’ নজরুল বললেন, ‘এর রিডগুলো পর্যন্ত টিপলে নামে না। এই পাষাণীর মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করতেই হবে।’

আসলে টেবিলটি ছিল একটি অর্গ্যান।

২৩) নজরুলের গানের জলসায় পান থাকবে না, তা হয় না। পান আর গান—এ যেন একে অপরের পরিপূরক। একদিন আসরে বসে গানের ফাঁকে চা-মুড়ি পর্ব সেরে নজরুল পান মুখে দিতে যাবেন, এমন সময় এক ছোট্ট মেয়ে এসে মিষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি এত পান খাও কেন?’

নজরুল তার কথায় হো হো করে হেসে উঠে ততোধিক মিষ্টি স্বরে বললেন, ‘গান গাই যে!’

২৪) নজরুলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল কিছু হিউমার ছিল। তিনি Aristocrate-এর বাংলা করেছিলেন, ‘আড়ষ্টকাক!’ যারা বক্তৃতা দিতে ভালোবাসতেন তাদের বলতেন, ‘বখতিয়ার খিলজী’, কোনো কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে তিনি বলতেন, ‘জানে দেও কন্ডাক্টর’। কবি নজরুল fun এবং পান-এ সমান অভ্যস্ত ছিলেন। তার একটি বিখ্যাত পানপাত্র ছিল (যেটাকে তিনি নিজেই ‘পানের সিন্দুক’ আখ্যা দিয়েছিলেন)। এই পানপাত্রে একশত পান থাকত। লিখতে লিখতে মাঝে মাঝে একসাথে তিন-চারটা পান মুখে পুরতেন আর পিকদানিতে পানের পিক ফেলতেন। এই পান নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে। একবার এক ভদ্রমহিলা নজরুলের পান খাওয়া দেখে তাকে খুব স্মার্টলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আপনি কি পানাসক্ত?’ নজরুল বললেন, ‘জ্বি না, আমি বেশ্যাসক্ত!’ নজরুলের এমন উত্তর শুনে ভদ্রমহিলার মুখ কালো হয়ে গেল। পরে নজরুল ব্যাখ্যা করলেন, ‘পান একটু বেশি খাই তাই বেশ্যাসক্ত, অর্থাৎ বেশি+আসক্ত=বেশ্যাসক্ত!’

২৫) পান জর্দা মুখে দিয়ে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন কবি নজরুল। এমন সময় এক লোক এল কবিকে সালাম করতে। দরজায় দাড়িঁয়ে সে বেশ জোরে আসসালামু আলাইকুম বলল। কবি তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘আরে, দুর্গা দাসবাবুর মুখে আসসালামু আলাইকুম যে!’

উপস্থিত সবাই কবির এমন আজব কথা শুনে আগন্তুকের চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখে, লোকটি সত্যিই বাংলা নাট্যমঞ্চের বিখ্যাত নট দুর্গা দাসের মতো সুদর্শন। আগত লোকটি বিনীতভাবে বললেন, আমি বন্দোপধ্যায় নই, সৈয়দ। এই তো রায়পুরায় আমার বাড়ি।

একজন অচেনা মানুষকে এমন ভড়কে দিতে কবির আকস্মিক মন্তব্যে আবার হো হো করে হেসে গড়াল ঘরশুদ্ধ সব মানুষ।

২৬) গোপীনাথ নামে একজন ধুমকেতুর অফিসে এসে নানারকম আজব কান্ড দেখে কবিকে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আপনাদের মনে এত আনন্দ আসে কোত্থেকে?’

এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে কবি আবারও বলে উঠেন, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে, শোন, আনন্দ কোত্থেকে জাগে, তার উত্তর নেই, কিন্তু নিরানন্দ কেন হবে, তার উত্তর শুনতে চাই তোমার কাছে।’

গোপীনাথ জবাব দেয়, ‘দেশ পরাধীন, সাহেবদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সবাই। এমন জ্বালার মধ্যে আনন্দ জাগে কীভাবে? প্রতিটি ইংরেজ আমাদের শত্রু, তারা বুক ফুলিয়ে হাঁটবে আর আমরা হাসব, গাইব?’

ভরাট গলায় নজরুল তাকে বুঝালেন, ‘এ শত্রুদের ভাসিয়ে দিতে হলে চাই প্রাণবন্যা, এরই আবাদ করছি আমরা এখানে।’ গোপীনাথ চুপ হয়ে শুনে ভাবুক হয়ে যায় কবির জবাব শুনে।

Facebook Comment

You May Also Like