‘আত্মা-রহস্য’ আনিসুল হক

'আত্মা-রহস্য' আনিসুল হক

সবাই আগেই নিষেধ করেছিল। বাড়িটা ভালাে না। তােমরা নিয়াে না।

কিন্তু বাবা কারাে কথা শুনলেন না। বললেন, ঢাকা শহরে এত সস্তায় এত সুন্দর বাড়ি। এ আমি ছাড়ছি না। বাসা ভাড়া কী হারে বেড়েছে, একটু খোঁজ নিয়ে দেখাে!

আমরা নতুন বাসায় উঠলাম। আমাদের বাসায় আমরা কেউই ভূত প্রেতে বিশ্বাস করি না। আগের ভাড়াটেদের কে একজন এ বাসায় অপঘাতে মারা গিয়েছিল। তাতে কী হয়েছে। জন্ম-মৃত্যু পৃথিবীর নিয়ম।

আমরা বাসায় যেদিন বাক্সপেটরা নিয়ে উঠছি, সেদিন পাড়ার ছেলেরা এসেছিল। বাবার সঙ্গে দেখা করেছিল। ‘চাচা স্লামালেকুম! এ রকম একটা ভূতের বাড়িতে উঠছেন। সব জেনেশুনে বুঝে উঠছেন তাে! বাবা বললেন, ‘ভূত! ভূত বলে কিছু আছে নাকি?”

ছেলেরা বলল, তা তাে আমরা জানি না। শুধু জানি, এ বাড়িতে একটা আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

আত্মা ঘুরে বেড়ায়! তােমরা আত্মা দেখেছ?” বাবা বললেন। ‘না। দেখিনি-‘ ছেলেরা বলল।

না দেখেই বলে বেড়াচ্ছি আত্মা ঘুরে বেড়ায়?

‘হা চাচা। আপনি কি কোনােদিন বাতাস দেখেছেন? দেখেননি। তাই বলে কি বলবেন বাতাস নেই!

খাসা যুক্তি!

আমি একটুখানি মন খারাপ করলাম। বাবা টের পেয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। বললেন, ‘অন্ত। এদিকে আয়! বল, আমাদের নীতি কয়টা?

‘তিনটা-আমি বললাম।

কী কী?

সদা সত্য কথা বলা। নিজের কাজ? নিজে করা। কোনাে আজগুবি জিনিসে বিশ্বাস না করা।

শুড। এখন আয় নিজের কাজ নিজে নিজেই করি। এই মিটসেফটাকে দোতলা পর্যন্ত তুলে ফেলি। নে ধর।

আমাদের বাসায় সদস্য সংখ্যা সাকুল্যে তিন। বাবা, মা আর আমি। আমি পড়ি ক্লাস ফোরে।

এ ছাড়া আমাদের দরকার একজন কাজের বুয়া। পুরনাে বুয়াকে সঙ্গে আনা যায়নি। তিনি এতদূর আসবেন না। বাবা সকালবেলা অফিসে যান। আমি যাই স্কুলে। মা থাকবেন একা একা- সেটা একটু ভয়েরই কথা। যদিও বাড়িটার নিচতলায় ভাড়াটে থাকে। তাদের সঙ্গে আমাদের এখনাে পরিচয় হয়নি।

বাড়িটা ধানমন্ডিতে। বেশ পুরনাে। বড় রাস্তা থেকে একটা ছােট রাস্তা বেরিয়ে গেছে। সেই ছােট রাস্তার শেষ মাথায় এ বাড়ি। অনেকটা জায়গা নিয়ে। বাড়ির চারদিকে গাছ আর গাছ। গাছের ছায়ায় ঘরদোর একটু অন্ধকার অন্ধকার হয়েই থাকে।

মা বললেন, কুটিকে নিয়ে আসি। ওরও তাে এসএসসি পরীক্ষা শেষ। এখন বসে থেকে কী করবে। আমার সঙ্গে থাকুক।

কুটি হলাে আমার ছােট খালা। খুব ইন্টারেস্টিং মহিলা। তার একটা রােগ আছে। হাসি রােগ। সারাক্ষণ হাসে। হাসে আর হাসায়।

মা নিচতলার ভাড়াটেদের বাসায় গেলেন। পরিচয় পর্বও সারলেন, আর সারলেন একটা টেলিফোন। নানার বাসায় ফোন গেল। কুটি চলে আয়। ভারি মজা হবে।

ওপার থেকে খালা কিছু একটা জিজ্ঞেস করলেন।

মানে হলাে, বাড়িটায় নাকি আত্মা ঘুরঘুর করে! লােকজন ভয় দেখাচ্ছে। তুই চলে আয়! একা একা দিনের বেলা আমি থাকতে পারব না।’ ওপার থেকে খালার কিছু একটা প্রশ্ন।

‘ভালাে আত্মা না মন্দ আত্মা আমি কী করে বলল?’ মা জবাব দিলেন।

আমি মার ফোনের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শুনলাম খালা বলছেন, জানতে হবে বুবু। খারাপ আত্মা হলে ভয়াবহ ব্যাপার। ধরাে আমি বাথরুমে ঢুকেছি গােসল সারতে, এমন সময় আত্মা এসে বলল, নাজু, তুমি খুব সুন্দর। তাে তখন!

‘চড় খাবি কুটি।

খালি খালি চড় খেতে পারব না। একটু লবণ-মরিচের গুঁড়াে মিশিয়ে দিয়াে।

কুটি খালা চলে এলেন। এসেই আমাকে বললেন, ‘অন্ত কী রে, তাের নাকের নিচে গোঁফের রেখা কেন! হি হি হি।

আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম। বললাম, ‘খালা, অসভ্য কথা বােলাে না।’ কেন? মিথ্যা বলেছি নাকি! তােদের বাপ-বেটার না জীবন-দর্শন সদা সত্য কথা বলা।’

সত্য কথা বলতে হবে! কিন্তু বাজে কথা বলা যাবে না।

ও আচ্ছা! আয়! এক কাজ করি। রাতে তাের বাবাকে ভয় দেখাই। না না। বাজে কাজও করা যাবে না।’

বাজে কাজ করতে হলাে না। রাতের বেলা খালা নিজেই ভয় পেয়ে চিকার-চেঁচামেচি করে হুলস্থল বাধিয়ে বসলেন। ব্যাপার কিছুই না। আমার পেনসিলবাক্সে একটা টিকটিকি আছে। ইস্টার্ন প্লাজা থেকে সস্তায় টিকটিকি, গুবরে পােকা ইত্যাদির একটা প্যাকেট কিনেছিলাম। কুটি খালা পেনসিলবাক্সটা খুলেই ও বাবারে বলে এক চিঙ্কার দিয়ে উঠলেন। তাই নিয়ে বাসার সবাই কী একচোট হাসিই না হাসল!

তারপর সবাই গেল ঘুমুতে। বাবা-মা এক ঘরে। আমি আর কুটি খালা আরেক ঘরে।

কিন্তু সকালবেলা উঠে সবাই অবাক। ঘরের জিনিসপত্র অগােছালাে পড়ে ছিল। কে যেন রাতের বেলা সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে।

ড্রয়িংরুমের সােফার ফোমে কভার লাগানাে ছিল না। কিন্তু সকালবেলা দেখা গেল, ফোমগুলােয় কভার লাগানো!

কী ব্যাপার, সােফার কভার কে লাগালাে?’ মা বললেন। কেউ কোনাে জবাব দিতে পারল না।

পরদিন দেখা গেল আরেক সমস্যা। বাবার ড্রয়ারের কাগজপত্র সব ছড়ানাে-ছিটানাে। ব্যাংকের চেকবই বাথরুমের বেসিনে পড়ে আছে।আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম। ঘটনা কী! বাবা বললেন, এ নিশ্চয়ই কুটির কাজ। কুটি দুষ্টুমি করে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে।

কুটি খালা প্রথম রাতের পর খুব হাসছিল। কিন্তু বাবার চেকবই বেসিনে পড়ে থাকতে দেখে সে গম্ভীর হয়ে গেল!

আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেল। বলল, ‘অন্তু একটা সমস্যা হয়েছে। প্রথম রাতে আমিই সােফার কভার লাগিয়েছিলাম! কিন্তু দ্বিতীয় রাতে তাে আমি উঠিনি। তাের বাবা-মার ঘরে আমি যাব কেন?

আমি বললাম, খালা, সত্য কথা বলাে।

আরে গাধা, সত্য কথাই তাে বলছি।

তৃতীয় দিন হয়ে গেল সর্বনাশ। কে যেন বাবার ডায়রিতে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রেখেছে-হাসান জামান সাহেব, এই বাসা ছাড়ুন।

ব্যাপার কী! ঘটনা কে ঘটাচ্ছে, আমি চিন্তিত। বাবাকে বললাম, ‘বাবা, কুটি খালাকে নানুবাড়িতে রেখে আসাে। তারপর যদি দেখি এমন ঘটছে…। তাই করা হলাে। কুটি খালাকে বিদায় দেয়া হলাে।

কুটি খালা খুব রাগ করলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ‘অন্ত রে, অকারণে তােরা আমাকে সন্দেহ করলি। হাসিঠাট্টার এই ফল। দেখিস আর কোনাে দিন আমি হাসব না।

তার পরের রাতে কোনাে দুর্ঘটনা ঘটল না। কিন্তু এক রাত পর

আবার…

ঘরদোর, আসবাবপত্র সব এদিক-ওদিক হয়ে রইল।

মা বললেন, ‘ওগাে চলাে, আমরা এ বাসা ছেড়ে দিই।’

বাবা বললেন, ‘না। আমি আত্মা-টাত্ম‌য় বিশ্বাস করি না। আমি এ বাসা ছাড়ব না। আজ আমি জেগে আছি। আজ রাতে আত্মা-রহস্য ভেদ করবই।

দিনের বেলা অনেকটা ঘুমিয়ে নিয়েছি যাতে রাতে ঘুম না আসে। রাতে একজন সঙ্গী পেলে ভালাে হতাে। কিন্তু তা পাওয়ার উপায় নেই।

মাকে রােজ রাতে ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। তার হৃদরােগ আছে। রাত্রি ১টা কী ২টা হবে! ড্রয়িংরুমে খটখট আওয়াজ হচ্ছে। বিছানা ছাড়লাম। ঘরের বাতি জ্বালালাম।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখতে পেলাম বাবাকে।
বাবা। আমি বললাম।

বাবা আমার কথা যেন শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি সােফার কভারগুলাে সব

খুলছেন।

বাবা…!’ খুব জোরে ডাকলাম।

না, বাবা কোনাে কথাই শুনছেন না।

আমি দৌড়ে গেলাম মার কাছে। মা, মা ওঠো, বাবা যেন কেমন করছেন।

মা উঠলেন। ড্রয়িংরুমে গেলেন। বাবা ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে ডাইনিং গেছেন। এক গ্লাস পানি খেলেন তিনি।

তারপর চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়।

পরদিন বাবাকে ধরলাম মা আর আমি। ‘রাতে তুমি কী করছিলে?

বাবা সবকিছু অস্বীকার করলেন।

আমি বললাম, ‘বাবা, সদা সত্য কথা বলতে হয়।

বাবা বললেন, আমি তাে সত্যই বলছি অন্তু।

বাবার সমস্যাটা বড় মামাকে জানানাে হলাে। তিনি একজন বিখ্যাত মনােবিজ্ঞানী ও মনােরােগ চিকিৎসক। সব শুনে মামা বললেন, এটা হলাে ঘুমের মধ্যে হাঁটা। ঘুমের মধ্যে কাজ করা।

মা বললেন, ভাইজান, ওকে কি আত্মায় ধরেছে?

আরে না। আত্মা-টাত্মা আবার কী! মনে হয় ওর অফিসে কোনাে সমস্যা হয়েছে। পাঠিয়ে দে আমার কাছে।

ভাইজান, অন্তর বাবা ঠিক হবে তাে?

‘হবে। হবে।

মামার চিকিৎসায় বাবা ভালাে হয়ে গেছেন। আর রাতের বেলা হাঁটেন না। এক একা কাজকর্ম করে সব ওলট-পালট করে দেন না। মামা বলেছেন, আসলে আত্মার ভয়, নাজুর সােফার কভার পরানাে—এ সবকিছুই অন্তর বাবার মনে ক্রিয়া করেছে। তার ওপর ওর অফিসেও একটা সমস্যা চলছিল। সব মিলিয়ে ওর মধ্যে স্লিপ ওয়াকারের লক্ষণ দেখা দেয়। তবে চিন্তা নেই। এখন ও পুরােপুরি সুস্থ।

You May Also Like