Thursday, April 18, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রঅগ্নিপুরুষ ২ (মাসুদ রানা) – কাজী আনোয়ার হোসেন

অগ্নিপুরুষ ২ (মাসুদ রানা) – কাজী আনোয়ার হোসেন

অগ্নিপুরুষ (মাসুদ রানা) - কাজী আনোয়ার হোসেন

পায়ের কাছে স্যুটকেস, ফেরি বোটের টপ ডেকে দাঁড়িয়ে আছে মাসুদ রানা। নামের সাথে চেহারার কোন মিল নেই, বোটটা দেখতে বরং অনেকটা কাছিমের মত–মাল্টা আর গোজোর মাঝখানে সাগর মাত্র দুমাইল, শুধু এই পানি পথেই লোকজন আর যানবাহন নিয়ে চলাচল করে ডলফিন।

খুদে দ্বীপ কোমিনোকে পাশ কাটিয়ে এল বোট, পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন ওয়াচটাওয়ার। পানি এখানে স্বচ্ছ নীল, তলার বালি পরিষ্কার দেখা যায়– লেগুন। বেশ কবছর আগে, অথচ রানার মনে হল এই তো সেদিন রেমারিক আর জেসমিনের সঙ্গে এখানে সাঁতার কেটেছে ও।

সামনে, গোজোর দিকে তাকাল রানা। সাগর থেকে হঠাৎ প্রায় খাড়াভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সবুজ দ্বীপটা। পাহাড়গুলোর মাথায় মাথায় মুকুটের মত সাজানো গ্রাম। পাহাড়ের গা থেকে মাটি কেটে বিশাল আকারের ধাপ তৈরি করা হয়েছে, প্রতিটি ধাপ এক একটা খেত, নিচের খেতটা সাগরের কিনারা ছুঁয়েছে।

প্রথমবার গোজোয় এসে দ্বীপটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল রানা। গোজোর। সমাজে ছোট-বড় ভেদ নেই, সবাই সমান। ভূমিহীন কষক বা একেবারে গরীব জেলে লোকটাও জানে তার অধিকার আর স্বাধীনতা গোজোর সবচেয়ে ধনী লোকটার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সারাদিন খেটে যা সে রোজগার করে তা দিয়ে সংসারের ভরণ-পোষণ ছাড়াও হাতে কিছু থাকে, ইচ্ছে করলে অনেকের মত। সে-ও রুচিতাস-এ বসে সন্ধে থেকে মাঝরাত পর্যন্ত আকণ্ঠ মদ খেতে পারে। অন্যদের চেয়ে নিজেকে কারও বড় মনে করার প্রবণতা থাকলে গাজোকে তার। এড়িয়ে চলা উচিত। গোজোর লোকেরা হাসিখুশি আর ফুর্তিবাজ, তোমাকে ওদের পছন্দ হলেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে।

ফেরি জেটিতে ভিড়তেই পেঁয়ো লোকগুলো শোরগোল তুলে নামতে শুরু করল।

পাহাড়ের খানিকটা ওপরে উঠে দ্বীপের একমাত্র বার রুচিতাস-এর সামনে এসে দাঁড়াল রানা। মান্ধাতা আমলের বিল্ডিং, সাগরের দিকে মুখ করা একটা স্কুল বারান্দা আছে। রেমারিক বলে দিয়েছে, জেসমিনের বাবাকে ফোন করতে হবে এখান থেকে। বারের ভেতরটা ঠাণ্ডা, সিলিং থেকে ঝাড়বাতি ঝুলছে, দেয়ালে আঁকা পাহাড় আর নদীর ছবি। দরজার কাছে সুটকেস রেখে কাউন্টারের দিকে এগোল রানা, মগভর্তি বিয়ার- দেখে অনুভব করল গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। গোলগাল চেহারার বারটেণ্ডার জিজ্ঞেস করল, এক পাইন্ট, নাকি অর্ধেক?

এক পাইন্ট, ধন্যবাদ। উঁচু টুলে বসে কাউন্টারের ওপর এক পাউণ্ডের একটা নোট রাখল রানা। খুব ঠাণ্ডা বিয়ার, প্রাণ জুড়িয়ে গেল। বাকি টাকা কাউন্টারে রাখল বারটেণ্ডার, রানা জিজ্ঞেস করল, পাজেরো তাজার ফোন নাম্বার দরকার আমার, দিতে পারবে?

বারটেণ্ডার শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল।

পাজেরো তাজা, আবার বলল রানা। নাদুরের কাছে তার একটা ফার্ম আছে।

কাঁধ ঝাঁকাল বারটেণ্ডার। তাজা একটা কমন নাম, আর গোজোয় তো অনেকেরই ফার্ম আছে, বলে অন্য এক লোককে বিয়ার দেয়ার জন্যে সরে গেল

বিরক্ত না হয়ে লোকটার আচরণ মনে মনে অনুমোদন করল রানা। গোজো ছোট্ট একটা দ্বীপ, লোকটা পাজেরো তাজাকে না চিনেই পারে না। কিন্তু এই দ্বীপবাসীদের বৈশিষ্ট্যই হল নিজেদের সমস্ত ব্যাপার বাইরের লোকদের কাছে গোপন করে রাখা। অচেনা আগন্তুকের পরিচয় আর উদ্দেশ্য না জেনে মুখ খুলবে না।

খানিক পর আরও এক পাইন্ট বিয়ার চাইল রানা। বারটেণ্ডারকে বলল, ভিটেলা রেমারিক পাঠিয়েছে আমাকে। পাজেরো তাজার বাড়িতে কিছুদিন থাকব। বলে এসেছি।

বারটেণ্ডারের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আচ্ছা, তুমি তাহলে ওই পাজেরো তাজার কথা বলছ! কৃষক–নাদুরের কাছে? মাথা ঝাঁকাল রানা। কয়েক সেকেণ্ড। ওকে খুঁটিয়ে দেখার পর হাসল লোকটা, হাত বাড়িয়ে দিল। আমি সাকো। টেবিলে বসা এক যুবককে ইঙ্গিতে দেখাল সে। আমার ভাই, টাগলিয়া। তারপর দেখাল রোগা-পাতলা চেহারার এক লোককে, মুখের নিচের অংশ ঢাকা পড়ে আছে। লম্বা-চওড়া কালো গোঁফে। টাফি। আরও দুজন যুবককে দেখাল সে, বলল, মিলানো আর আলফানসো–ওরাই ফেরি চালায়।

মিলানো আর আলফানসোকে চিনতে পারল রানা, ফেরিতে দেখেছে। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বারটেণ্ডার বুঝিয়ে দিল, গোজোয় এখন আর ও আগন্তুক নয়। ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করল সাকো, মাল্টিজি ভাষায় দুচারটে কথা, বলল। রিসিভার রেখে দিয়ে রানার দিকে ফিরল সে। নিড়ো তোমাকে নিতে আসছে।

রানার সামনে মগভর্তি বিয়ার রাখল টাগলিয়া, ইঙ্গিতে গোঁফওয়ালা টাফিকে দেখাল। গোজোবাসীদের এই রীতিটা মনে পড়ে গেল রানার। একবার যদি পরস্পরকে বিয়ার কিনে খাওয়াতে শুরু করে ওরা, পালা করে সবাই সবাইকে খাওয়াতে কখনও কখনও দেড়-দুদিন লেগে যায়। পরিবেশটা শান্ত আর স্বস্তিকর লাগল, সহজেই এদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়া যাবে। বেয়াড়া কোন প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না ওকে, কারও সাথে ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষ বাধবে না।

গোজোবাসীদের বন্ধুত্বে কোন কৃত্রিমতা নেই। গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে না এলে সবাই তোমাকে আপনজন বলে মেনে নেবে। শুধু তোমার যখন পালা, কিপটেমি কোরো না। আর ডাঁট দেখিয়ো না–গর্ব করা গোজোয় সবচেয়ে বড় পাপ। লম্পট, খুনী, ডাকাত বা পকেটমারকেও হয়ত সহ্য করা হবে, তারা যদি নিজের পাপ স্বীকার করে ক্ষমা চায়, কিন্তু সে যদি কোন ব্যাপারে ডাঁট দেখায়, এ দ্বীপে তার ঠাঁই হবে না।

মগ খালি করে সাকোর দিকে তাকাল রানা। এগিয়ে এসে মগটা আবার ভর্তি করে দিয়ে রানার সামনে থেকে টাকা নিল সাকো। রানা জিজ্ঞেস করল, তুমি?

গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল সাকো। এত সকালে আমার চলে না।

দশ মিনিট পর সাকোর মুখে হাসিটা ফিরে এল, রানার সামনে থেকে গুনে গুনে দশ সেন্ট তুলল সে। ক্ষতি কি! বলে নিজের জন্যে মগভর্তি করে বিয়ার ঢালল।

রানার জানা নেই, এটাই সাকোর অভ্যেস। কেউ অফার করলে প্রথমে সাকো সেটা প্রত্যাখ্যান করবে, তারপর দশ মিনিট থেকে আধ ঘন্টা পর সহাস্যে এগিয়ে এসে বলবে, ক্ষতি কি!

গোজোয় প্রত্যেকেরই একটা করে ডাকনাম আছে, বলাই বাহুল্য, সাকোকে ক্ষতি কি বলে ডাকা হয়। সেই রকম টাফিকে বলা হয় গুফো, আর সাকোর ভাই টাগলিয়াকে কিন্তু। টাগলিয়াকে কিন্তু বলার কারণ শব্দটা অতিমাত্রায় ব্যবহার করে সে। মিলানোর ডাকনাম হাজির আর আলফানসোর অক্লান্ত। মিলানো ফেরি থেকে নেমে সোজা রুচিতাস-এ চলে আসে, এসেই ঘোষণা দেয়, আমি হাজির। আর আলফানসোর বিয়ার খেতে কোন ক্লান্তি নেই, যত দেবে তত খাবে, আজ পর্যন্ত কেউ তার রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। কিন্তু, ক্ষতি কি, গুফো, অক্লান্ত, বিদ্রোহী, হাজির–এদের মধ্যে এই মুহূর্তে বিদ্রোহী অর্থাৎ কার্লো ছাড়া আর সবাই রয়েছে বারে। এরা গোজোর ছয় ব্রত, দ্বীপটাকে আনন্দ-মেলা বানিয়ে রেখেছে।

বাইরে তোবড়ানো একটা ল্যাণ্ড-রোভার এসে থামল। লাফ দিয়ে নামল উনিশ-বিশ বছরের এক যুবক, মাথায় কোকড়া কালো চুল। বারে ঢুকে রানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। হাই, আমি নিডো। ওয়েলকাম, হাসান ভাই।

জেসমিনের ভাইকে অস্পষ্টভাবে চিনতে পারল রানা, প্রায় আট বছর আগে দেখেছে। করমর্দন করার সময় অনুভব করল নিডোর হাত লোহার মত শক্ত। কোন তাড়া নেই তো? হাসিমুখে রানাকে জিজ্ঞেস করল সে। মৃদু হেসে মাথা নাড়ল রানা। ইতিমধ্যে নিডোর সামনে বিয়ার রেখে গেছে সাকো। এক চুমুকে মগের অর্ধেকটা খালি করে ফেলল নিডো। সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে বস্তায় জলপাই ভরেছি, তেষ্টায় একেবারে ফেটে যাচ্ছে ছাতি।

ছোটখাট একটা উৎসব জমে উঠল, একের পর এক বিয়ারের ক্যান খুলল সাকো। গোজোর দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি, আরবী আর ইটালিয়ানও কমবেশি জানে সবাই। ওদের কথাবার্তা বুঝতে বা হাসি-তামাশা উপভোগ করতে রানার কোন অসুবিধে হল না। একটু পর জেলেরা বারে ঢুকতে শুরু করল, মাথার ওপর সূর্য নিয়ে সারাদিন ভোলা লোটে কাজ করে সবাই খুব তৃষ্ণার্ত। মিলানো আর আলফানসো উঠল, আজকের মত শেষবার ফেরি নিয়ে মাল্টা থেকে ঘুরে আসলো ওরা। বেশিরভাগ লোক লাগার বিয়ার থেকে কড়া মদের দিকে ঝুঁকছে, এই সময় হাতঘড়ির দিকে তাকাল নিডো কি সর্বনাশ, এরই মধ্যে ছটা! রানার দিকে তাকাল সে। চল, চল–দেরি করায় মা আজ আমার কান ছিঁড়ে নেবে!

ল্যাণ্ড-রোভার নিয়ে পাহাড়ে চড়ল ওরা, খুদে গ্রাম কালার ভেতর দিয়ে উল্টো দিকে চলে এল, তারপর নিচে নেমে এসে বাঁক নিয়ে নাদুরের পথ ধরল।

ঘেরা উঠনের মাঝখানে পাথরের তৈরি ফার্মহাউস। বাড়ির একটা অংশ নতুন। বাইরে থেকে আলাদা সিঁড়ি উঠে গেছে সেখানে। কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো মোটাসোটা, তেল চকচকে এক প্রৌঢ়া। একই মানুষ, কিন্তু অন্য চেহারা, রানাকে চিনতে না পারলেও ভূত দেখার মত চমকে উঠল না, শুধু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল রানা। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রৌঢ়া অনোরিয়ার পেশীতে ঢিল পড়ল, উজ্জ্বল হল তার চোখ জোড়া, সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল হাসি। এগিয়ে এসে রানাকে আলিঙ্গন করলো সে, চুমো খেল গালে। ওয়েলকাম, রানা। অনেকদিন পর এলে। ছেলের দিকে কটমট করে তাকাল সে। এতক্ষণ রানার পিছনে গা ঢাকা দিয়ে ছিল নিডো।

মাসুদ ভাইয়ের তেষ্টা পেয়েছিল, মা, আমি কি করব! রানার উদ্দেশে এক চোখ টিপল নিডো।

মাসুদের সুটকেস দোতলায় রেখে আয়, হুকুম করল অনোরিয়া। চপ্পল জোড়া নিয়ে আসবি। রানার একটা হাত ধরে কিচেনে ঢুকল সে।

বড়সড় একটা ঘর। রানার মনে পড়ল, খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে পারিবারিক আড্ডা সব এখানেই চলে। ডাইনিংরূম আর লাউঞ্জ ব্যবহার করা হয় শুধু কোন মেহমান এলে।

জুতো খুলে বস, বাবা, অনোরিয়া বলল। রানার সামনে পট ভর্তি কফি আর কাপ-পিরিচ রাখল সে। তিনটে স্টোভে রান্না হচ্ছে, মাংস আর মশলার গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল অনোরিয়া, কিন্তু মুখ বন্ধ নেই।

রেমারিক কেমন আছে? রানা কি জানে, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ভায়োলার? ডাইভোর্সের জন্যে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু সেটা মঞ্জুর হতে কত বছর লাগবে কেউ বলতে পারে না। ইটালিতে বিবাহবিচ্ছেদ অত্যন্ত জটিল আর ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে ভায়োলা, টেলিফোন করে জানিয়েছে তার নাকি খুব শখ মাসুদ ভাইকে চিংড়ি মাছের কোপ্তা বেঁধে খাওয়াবে।

পরিবেশটা ঘরোয়া, অনোরিয়া রানার ব্যক্তিগত কোন প্রসঙ্গ না ভোলায় ওর পেশীতে ঢিল পড়ল। খানিক পর খেত থেকে ফিরল পাজেরা তাজা। হাসি খুশি একহারার শক্ত-সমর্থ পুরুষ, কথা বলে কম। রানাকে দেখে মাথা আঁকাল সে, জিজ্ঞেস করল, সব ঠিক?

মাল্টায় সবার মুখে এই শব্দ দুটো শুনতে পাওয়া যাবে। এ শুধু কুশল জানতে চাওয়া নয়-দরদভরা সহানুভূতি প্রকাশের সাথে সাথে সাহায্য করার প্রস্তাবও। বিদায়, শুভেচ্ছা আর অভ্যর্থনা জানাবার জন্যেও শব্দ দুটো ব্যবহার করা হয়। সব এক, জবাব দিল রানা। ওর সামনে একটা চেয়ারে বসে অনোরিয়ার হাত থেকে এক কাপ কফি নিল তাজা। হাতে বানানো সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে টান দিল।

সবাই ওকে এমনভাবে অভ্যর্থনা জানাল যেন আট বছর নয়, শুধু এক রাত বাইরে কাটিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে।

সামনে লম্বা পাচিলের মত দাঁড়িয়ে আছে নিচু পাহাড়, একটানা দৌড়ে এসে দম নেয়ার জন্যে মাথায় উঠে থামল রানা। এখানে দাঁড়ালে অনেক দূর পর্যন্ত উপসাগর দেখতে পাওয়া যায়। ঘামে ভিজে ওর ট্র্যাক স্যুটের রঙ গাঢ় হয়ে গেছে। সুর্য তখনও দিগন্তরেখার কাছাকাছি, উপসাগরে পাহাড়ের ছায়া। নিচু পাচিলের ওপর বসে হাঁপাতে লাগল রানা। সারা শরীরে ব্যথা, প্রতিটি পেশী আড়ষ্ট। বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না, জানে ও। একটা শিরায় টান পড়লে কয়েক দিন বা কয়েক হপ্তা পিছিয়ে যাবে ওর প্রোগ্রাম।

ভোর হবার অনেক আগে ঘুম থেকে উঠেছে রানা। টেরেসে বেরিয়ে এসে এক ঘন্টা ব্যায়াম করেছে। প্রথম দিকে শুধু হালকা ব্যায়ামগুলো, ইনস্ট্রমেন্ট ব্যবহার করবে আরও পরে। এরপর ঠাণ্ডা পানিতে শাওয়ার সেরে নিচে নেমে আসে। এত সকালে কিচেনে অনোরিয়াকে দেখে অবাক হয় ও।

ওর প্রশ্ন শুনে মৃদু, ম্লান হেসে প্রৌঢ়া বলল, পাপ করার বেলায় সবাই আছে, কিন্তু প্রার্থনার বেলায় কেউ নেই, তাই আমাকেই যেতে হয় চার্চে।

মিটি মিটি হেসে রানা বলল, তাহলে আমার জন্যেও একটু প্রার্থনা কর, মা।

সে কি তোমাকে বলে দিতে হবে, বাবা! রানাকে মগভর্তি কালো কফি বানিয়ে দিল অনোরিয়া। কাপে চুমুক দিচ্ছে রানা, এই সময় কাজে যাবার কাপড় পরে কিচেনে ঢুকল তাজা আর নিডো।

রানা গোজোয় পৌঁছবার আগে শ্বশুরের সঙ্গে বারকয়েক টেলিফোনে কথা বলছে রেমারিক। রানার শারীরিক অবস্থা এবং মিলানে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা সম্পর্কে সব কথাই তাকে জানিয়েছে সে। তবে রানার ভবিষ্যৎ প্ল্যান সম্পর্কে কিছু বলেনি।

জেসমিনকে বিয়ে করার পর থেকে প্রতি মাসে শ্বশুরবাড়িতে কিছু কিছু টাকা পাঠায় রেমারিক, জেসমিন মারা যাবার পরও টাকা পাঠানো বন্ধ করেনি। প্রথম দিকে বাড়ির সবাই প্রতিবাদ জানিয়েছিল, কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ নয়। কিন্তু রেমারিককে থামানো যায়নি, এখানে টাকা পাঠালে তার নাকি ইনকাম ট্যাক্সের বোঝা কমে। সেই টাকা দিয়েই বাড়ির সঙ্গে একটা দোতলা তৈরি করা হয়েছে, রেমারিক বেড়াতে এলে আরাম করে নিরিবিলিতে থাকতে পারবে। সেই খুদে দোতলার সবটুকু ছেড়ে দেয়া হয়েছে রানাকে।

কাল রাতে ডিনারে বসে কথা হয়েছে, রানার দৈনন্দিন প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানে তাজা। রানাকে সে বলল, দৌড় আর সাঁতার শেষ করে পাহাড়ে চলে এস।

রাখ তোমার পাহাড়, স্বামীকে বাধা দিয়ে বলল অনোরিয়া। রানার দিকে ফিরল সে, বলল, সাঁতার শেষ করে সোজা বাড়ি ফিরে আসবে তুমি। নাস্তা করে বিশ্রাম নেবে, তারপর যেখানে খুশি যেয়ো।

, নতুন একটা পাহাড় কিনেছে ওরা, পাথর কেটে মাটি বের করা হয়েছে। প্রথমে পাহাড়ের দুপাশে পাথরের পাঁচিল দেয়া হবে, তারপর মাটি কেটে তৈরি করা হবে বিশাল সব ধাপ, সেই ধাপে চাষাবাদ হবে।

ওরা তিনজন একসাথে বাইরে বেরুল। সাগরের দিকে একটা পাহাড় দেখিয়ে তাজা বলল, সাঁতার কাটতে হলে ওদিকে যেয়ো। ছোট্ট একটা ইনলেট আছে ওখানে, পাহাড় থেকে সরাসরি নামা যায়। পানি খুব গভীর, আর একেবারে নির্জনবোটে করে, আর নাহয় আমার জমির ওপর দিয়ে যাওয়া যায়।

দম ফিরে পেতেই প্রচণ্ড খিদে অনুভব করল রানা। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগে সাঁতার কাটতে হবে। পাঁচিল থেকে নেমে ঘোড়ার মত দুলকি চালে ছুটল ও।

তিন দিক ঘেরা সাগরের খুদে একটা অংশ, প্রাণের কোন চিহ্ন নেই কোথাও গভীর তলদেশ, কাঁচের মত স্বচ্ছ পানি। পাহাড়ের গা থেকে সমল একটা কার্নিস সাগরের ওপর ঝুলে আছে। কাপড় খুলে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। একশ মিটারের মত সাঁতরে উত্তর কোমিনো চ্যানেলে চলে এল ও, খুদে দ্বীপটা এত কাছে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আসলে কিন্তু দ্বীপের সবচেয়ে কাছের প্রান্তটা এক মাইলের কম দূরে নয়। কদিন অভ্যেস হোক, তারপর ওখানে যাবে রানা। তারও কদিন পর বিরতি না নিয়ে ফিরে আসবে। আগের শক্তি ফিরে এলে একটানা চার পাঁচ বার আসা-যাওয়া করতে পারবে ও।

ব্রেকফাস্টের বিশাল আয়োজন করেছে অনোরিয়া। মুরগির সুপ, সেদ্ধ ডিম, ভুনা গরুর মাংস, তন্দুরে সেঁকা গরম রুটি আর স্বচ্ছ মধু। প্লেটের ওপর রুটির পাহাড়, অনোরিয়ার কঠোর নির্দেশে সবগুলো গিলতে হল। সবশেষে এক মগ ধূমায়িত কফি।

রানার খাওয়া দেখছে, আর আট বছর আগের কথা ভাবছে অনোরিয়া। তখনও এই রকম চুপচাপ থাকত রানা। টেলিফোনে রেমারিক যদি ওঁর ছদ্মবেশের, কথা না জানাত, রানাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠত ওরা। মাত্র আট বছরে তরতাজা, প্রাণচঞ্চল একটা যুবক আধবুড়ো হতে পারে না। শুধু যে ছদ্মবেশ নিয়ে আছে তাই নয়, মৃত্যুর দরজা থেকে একটুর জন্যে ফিরে এসেছে রানা, স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে।

মেয়ে মারা গেলেও, জামাই রেমারিককে এখনও ছেলের মত ভালবাসে অনোরিয়া। বিয়ের আগের দিন ওদের সাথে কথা বলতে এসেছিল রেমারিক। নিজের অতীত সম্পর্কে বিস্তারিত বলে সে, ভবিষ্যতে ভাল-মন্দ কি ঘটতে পারে না। পারে সে-সম্পর্কে একটা আভাসও দেয়। সবশেষে রেমারিক ওদের বলে, তার যদি কোন বিপদ ঘটে, জেসমিনের যদি কোন সাহায্য দরকার হয়, তারা যেন রানাকে খবর দেয়। রানার কয়েকটা ঠিকানাও ওদেরকে দিয়েছিল রেমারিক।

জেসমিন মারা যেতে অনোরিয়াই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল ঢাকায়। রেমারিকের বন্ধু, কাজেই রানাকেও নিজের ছেলের মত দেখে অনোরিয়া। ছেলেটা যাতে তার স্বাস্থ্য ফিরে পায় তার জন্যে সম্ভাব্য সব কিছু করবে সে। ব্যায়াম আর কঠিন পরিশ্রম, এ-দুটোই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে, তার কাজ প্রচুর তাজা খাবার যোগান দেয়া।

নাস্তার পর পাহাড়ে চলে এল রানা। গায়ের শার্ট খুলে তাজার পাশে দাঁড়িয়ে। কাজ শুরু করল। শুকনো, আলগা পাঁচিল তৈরি করতে অভিজ্ঞতা লাগে। মাপমত সঠিক পাথর বাছাটাই আসল, পাথরের ওপর ঠিকমত পাথর বসানও কম গুরুত্বপূর্ণ। নয়। প্রৌঢ় তাজ অবাক হয়ে দেখল, আনাড়ি ভাবটা দ্রুত কাটিয়ে উঠছে রানা। এক ঘন্টাও পেরোয়নি, অথচ প্রথমবারেই সঠিক পাথরটা বেছে নিতে পারছে ও।

বার বার ঝুঁকে কোমরে ব্যথা ধরে গেল রানার, পাথরের ঘষা খেয়ে ছড়ে গেল। তালুর চামড়া। বেলা দুটোর দিকে রানার অবস্থা দেখে মায়া হল তাজার, থামতে বলল সে। খুদে ইনলেটে এসে সাগরের লোনা পানিতে হাত ধুল রানা।

ভেজিটেবল সুপ দিয়ে শুরু হল দুপুরের খাওয়া। মাছ দিয়ে রান্না ভাত, তন্দুরে। সেঁকা রুটি, মুরগি আর গরুর মাংস, সালাদ, সবশেষে ফল। খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে দিনের সবচেয়ে গরম সময়টা সবাই ছোট্ট একটা করে ঘুম দিয়ে নিল। পাথরের চওড়া দেয়াল, উঁচু সিলিং, ঘরের ভেতরটা তাই ঠাণ্ডা। শরীরে ব্যথা থাকলেও- ভাল ঘুম হল রানার। চারটের দিকে জাগল ও, শরীর আড়ষ্ট, হাতের, ক্ষতগুলো ব্যথা করছে। শুয়ে-বসে থাকতে ভাল লাগবে এখন, ঝোঁকও চাপল, কিন্তু নিষ্পাপ এক কিশোরীর মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল, পাহাড়ে এসে আবার দাঁড়াল তাজার পাশে।

এক ঘন্টা কাজ করার পর থামতে হল ওদের, বালতি করে বরফ আর বিয়ার নিয়ে এসেছে অনোরিয়া। রানার হাতের অবস্থা দেখে শিউরে উঠল প্রৌঢ়া, রাগের। সাথে ফিরল স্বামীর দিকে, তোমার আক্কেল বলি, এই হাত দিয়ে কেউ ওকে কাজ করতে দেয়?

কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাজা বলল, এবার নাহয় তুমিই বারণ করে দেখ!

রানার হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করল অনোরিয়া।

এ কিছু না, বলল রানা। সন্ধের দিকে সাঁতার কাটবলোনা পানি ওষুধের কাজ করবে।

পরের তিন দিন খুব ভুগল রানা, রোজ রাতে বিছানায় এল যেন আহত একটা

তবে ছক বাঁধা একটা রুটিন দাঁড়িয়ে গেল। ভোর অন্ধকারে ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম, তারপর দৌড়, দৌড় শেষে সাঁতার, প্রতিবার আগের দিনের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে, এরপর পাহাড়ে গিয়ে মাটি কেটে ধাপ তৈরি করার কঠিন কাজ, সন্ধ্যার দিকে আরও একবার সাঁতার, তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে ঘুম। শোবার আগেও কিছুক্ষণ যোগ ব্যায়াম করে ও।

এই রুটিন মেনে চলতে প্রথম দিকে খুব কষ্ট হল, আড়ষ্ট শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু এই আড়ষ্ট ভাব আর ব্যথা সারাক্ষণ ওকে লুবনার কথা মনে করিয়ে দিল, মনে করিয়ে দিল ওকে নিয়ে জানোয়ারগুলো কি করেছে। প্রচণ্ড ঘৃণা আর প্রতিশোধ নেয়ার উগ্র বাসনা ভুলিয়ে দিল.সমস্ত ব্যথা আর যন্ত্রণা।

রানার এই ঘৃণা হঠাৎ একদিন চাক্ষুষ করে ঘাবড়ে গেল তাজা। ডিনারের পর বাইরে খোলা উঠনে বসেছিল ওরা তিনজন, ব্র্যাণ্ডি মেশানো কফি খাচ্ছিল। কালো সাগরের ওপর কোমিনোর ঢাউস আকৃতি, আরও দূরে আলো ঝলমলে মাল্টা দেখা যাচ্ছিল। মাল্টার এই আলো নেপলসে আসার কথা মনে করিয়ে দিল রানাকে। ভাবল, অনেকগুলো মাস পেরিয়ে গেছে। লুবনার কথা মনে পড়ল।

আকাশে অনেক তারা জ্বলছে, তার মধ্যে সবচেয় উজ্জ্বল তারাটা দৃষ্টি কেড়ে, নিল রানার। কান পাতলে কোকিলের ডাকও হয়ত শুনতে পাবে। বাগান থেকে ভেসে এল মিষ্টি ফুলের গন্ধ। ফুরফুরে বাতাস এলোমেলো করে দিল ওর চুল। কিন্তু। তবু অন্তরে সেই গানটা বেজে উঠল না।

ভিটো আভান্তির বাড়ি থেকে রানার ব্যক্তিগত জিনিস-পত্র নিয়ে এসেছিল রেমারিক, সেগুলোর মধ্যে লুবনার প্রেজেন্ট করা গানের ক্যাসেটটাও ছিল। নেপলস থেকে একটা রেকর্ড-প্লেয়ার কিনেছে রানা। কিন্তু লুবনার ক্যাসেটটা ও আর বাজায় না।

উজ্জ্বল তারাটার দিকে তাকিয়ে হাসপাতালের কথা ভাবছে রানা। রেমারিক এসে ওকে বলল, লুবনা নেই।

কি যেন বলার জন্যে রানার দিকে ফিরল তাজা, রানার চেহারা দেখে গায়ের। পশম খাড়া হয়ে গেল তার, মুখ থেকে আওয়াজ বের হল না। দেখল, মানুষটার। সমগ্র অস্তিত্ব থেকে উথলে উঠছে ঘৃণা, ঠাণ্ডা সাগর থেকে কুয়াশা ওঠার মত।

হঠাৎ উঠে দাঁড়াল রানা, ওদেরকে শুভরাত্রি জানিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

বাবার দিকে ফিরল নিডো। তাজার হাসিখুশি চেহারায় গাম্ভীর্য আর উদ্বেগ। নিডো বলল; মাসুদ ভাই মাঝে মাঝে কেমন যেন হয়ে যায়।

মাথা ঝাঁকাল তাজা। ওর ভেতর একটা আগুন জ্বলছে, বলল সে। ওই আগুনে কেউ না কেউ পুড়ে মরবে।

খুক করে কেশে একটু হাসল নিডো, পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করল। উঠে দাঁড়াল সে, হাতঘড়ি দেখল, তারপর বলল, আমার ভেতরেও একটা আগুন। জ্বলছে, তবে ঐ আগুন সে আগুন নয়। আমি বারবেরালায় যাচ্ছি। শুক্রবারের রাত, টুরিস্ট মেয়েগুলো আমাকে না পেলে হোটেল থেকে বেরুতেই চাইবে না।

মৃদু হেসে ছেলেকে উৎসাহ দিল তাজা। কিন্তু সাবধান করে দিয়ে বলল, বেশি রাত কোরো না, খেতে কাল অনেক কাজ। আর, খবরদার, বেশি গিলবে না–তোমার মা তাহলে আস্ত রাখবে না।

মাকে গোপন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল নিডো, বেরুবার সময় সামনে পড়ে গেলে বিদেশী মেয়েদের চরিত্র সম্পর্কে লেকচার শুনতে হবে। সুজুকিতে চেপে স্টার্ট দিল সে।

.

শনিবার বাড়ি এল ভায়োলা।

কিচেন টেবিলে বসে আছে মেয়েটা, ওরা তিনজন লাঞ্চের জন্যে ভেতরে ঢুকল। মেয়েকে দেখিয়ে অনোরিয়া জিজ্ঞেস করল, মাসুদ, ভায়োলাকে চিনতে পার?

একটু একটু, জবাব দিল রানা। ভায়োলাকে বলল, তখন তুমি বেণী বাঁধতে।

আড়ষ্ট একটু হাসি দেখা গেল ভায়োলার মুখে। বড় বোন জেসমিনের বিয়ের সময় তার বয়স ছিল চোদ্দ, আট বছর পর রানাকে দেখে চিনতে পারল না সে। মার মুখ থেকে ওর সব কথা শুনেছে, জানে চেহারা আর বয়স দুটোই নকল।

ভায়োলাই ওদেরকে পরিবেশন করল। কাল অনেক রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিল নিডো, সকালে ঠেলা ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম ভাঙানো হয়েছে। কোন মেয়ের খপ্পরে পড়েছিস বুঝি?ঠাট্টা করে জানতে চাইল ভায়োলা। কিন্তু মা নিডোকে বকাঝকা শুরু করতে ভাইয়ের পক্ষ নিল সে।

রানাকে ভায়োলা জিজ্ঞেস করল, রেমারিক কেমন আছে? এ-বছর কবে আসবে কিছু বলেছে? তার কণ্ঠস্বর সুরেলা, মিষ্টি।

ভাল আছে। না, মাস তিন-চারের আগে আসতে পারবে বলে মনে হয় না।

একহারা, লম্বা, সুন্দরীই বলা যায় ভায়োলাকে। রানা ভাবল, রেমারিকের সঙ্গে ভায়োলার কোন ব্যাপার আছে কিনা। বোধ হয় নেই, থাকলে রেমারিক তাকে বলত। মেয়েটা সম্পর্কে অনোরিয়ার কাছে অনেক কথা শুনেছে রানা, সব জেনে দুঃখবোধ করেছে। তিন বছর আগে সুদর্শন এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয় ভায়োলার, বিয়ের দুমাস পরই ভায়োলা জানতে পারে তার স্বামীর একাধিক ভাগীদার আছে। তারা যদি মেয়ে হত, তাদের খপ্পর থেকে স্বামীকে বের করে আনার চেষ্টা করত সে, কিন্তু তাগড়া চেহারার কয়েকজন পুরুষের সাথে কিভাবে সে প্রতিযোগিতা করে!

বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন কবে মঞ্জুর, হবে কেউ বলতে পারে না। ভ্যাটিকানের ধর্মযাজকরা বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘোর বিরোধী, কারণ বিয়ে অত্যন্ত। পবিত্র এক বন্ধন, ছিড়লে পাপ হয়। দশ-পনেরো বছর পার হয়ে গেছে অথচ বিচ্ছেদের আবেদন বিবেচনা করা হয়নি, এমন ঘটনা ভুরি ভুরি।

বাড়ির সবাই জানে, ভায়োলার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। বিবাহ-বিচ্ছেদের। আবেদন মঞ্জুর হলেও, গোজো এমন একটা সমাজ, কোন মা তার ছেলের জন্যে ভায়োলার মত একটা মেয়েকে বউ হিসেবে মেনে নেবে না। তাছাড়া, দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কোন ইচ্ছে ভায়োলারও নেই। মাল্টার একটা হোটেলে রিসেপশনিস্টের চাকরি করে সে, বছরে দুবার লম্বা ছুটি নিয়ে বাড়ি আসে। বাড়ির সবাই তার দুঃখে দুঃখী, তার কোন কাজে কেউ কখনও বাধা দেয় না।

শেষ বিকেলের দিকে সুইমস্যুট নিয়ে খুদে ইনলেটের পথ ধরল ভায়োলা। সমতল পাথরে কাপড় দেখল সে, সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল সাঁতার। কাটছে রানা।

চারশো মিটারের মত সাঁতার দিয়ে ফিরে এল রানা।

আমি ভাবলাম তুমি বোধহয় কোমিনা পর্যন্ত যাবে, রানাকে পানি থেকে উঠতে দেখে বলল ভায়োলা।

আগামী হপ্তায়। ভায়োলার পাশে বসে দম নিচ্ছে রানা।

রানার উদোম শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে ভায়োলা, চোখ ফেরাতে পারছে, না। রানা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে লজ্জা পেল সে।

নামবে নাকি? জিজ্ঞেস করল রানা।

হ্যাঁ। তুমি পেছন ফের, কাপড় বদলাই।

এক মিনিট পর ওয়ান-পিস সুইমস্যুট পরে পানিতে লাফিয়ে পড়ল ভায়োলা। এক ডুবে অনেকটা দূরে চলে গেল সে, মাথা তুলে রানার দিকে তাকাল, হাসছে। একটা হাত তুলে ডাকল সে। এক সেকেণ্ড ইতস্তত করে ডাইভ দিল রানা।

ইনলেট থেকে চ্যানেলে বেরিয়ে এল ওরা। ভায়োলা ভাবল, কোমিনো পর্যন্ত যাওয়া রানার উচিত হবে কিনা। চ্যানেলের মাঝখানে প্রচণ্ড স্রোত, গোজোর দক্ষ সাতারুরাও অনেকে কোমিনো পর্যন্ত যেতে সাহস পায় না। তীরের কাছাকাছি রয়েছে ওরা, অথচ স্রোতের টান বেশ ভালভাবেই অনুভব করছে। রানাকে সাবধান। করে দেয়া উচিত ভেবে মুখ খুলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সামলে নিল নিজেকে। একটা মেয়ের উপদেশ ওর হয়ত পছন্দ হবে না।

পানি থেকে উঠে পাথরের ওপর পাশাপাশি শুয়ে থাকল ওরা, শেষ বিকেলের নিস্তেজ রোদে চকচক করছে ভেজা গা। রেমারিক আর ফুরেলার কথা জানতে চাইল ভায়োলা, কিডন্যাপ আর গোলাগুলি প্রসঙ্গের ধার দিয়েও গেল না। ইটালির খবরের কাগজে ঘটনাটা সম্পর্কে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু আরও অনেক কিছু। জানতে চায় ভায়োলা–তবে এখুনি নয়।

.

তোবড়ানো ল্যাণ্ড রোভার নিয়ে শেষ ফেরিতে চড়ল রানা। সেন্ট এলমো থেকে গোজোয় ফিরছে ও। পিওতর মেনিনোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে ওর।

দুদিন আগে এক সন্ধ্যায় কাগজে একটা খবর পড়ছিল তাজা, ধারণাটা তখনই মাথায় আসে রানার পশ্চিম জার্মানীতে একটা প্লেন হাইজ্যাকের চেষ্টা করা। হয়, কিন্তু স্পেশাল অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড় হাইজ্যাকারদের কোণঠাসা করে ফেলে। তাজা বলল, মাল্টায়ও এ-ধরনের একটা স্কোয়াড আছে। তার ভাইপো, পিওতর মেনিনো, পুলিসের একজন ইন্সপেক্টর, ওই স্কোয়াডের কমাণ্ডার। কথা প্রসঙ্গে রানা বলল, সুযোগ পেলে পুরানো ট্রেনিংটা ঝালাই করে নিলে ভাল হত। পরদিনই ভাইপোকে টেলিফোন করে তাজা, রানাকে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে রাজি হয় মেনিনো।

ব্রিটিশ আর্মির ফেলে যাওয়া অস্ত্র পাতি ব্যবহার করছে ওরা। স্টার্লিং সাবমেশিন গান আর বিভিন্ন ধরনের হ্যাণ্ডগান। রানার সাথে মেনিনোর কথা হল পুরানো দুর্গে বসে, এ্যাণ্ড হারবারের প্রবেশ পথটা পাহারা দিচ্ছে এই দুর্গ। দুর্গের ভেতরই চমৎকার একটা রেঞ্জ আছে ওদের, অনেক দিন পর অস্ত্রশস্ত্রের ছোঁয়া উপভোগ করেছে রানা। ফায়ারিং রেঞ্জে, ঘন্টাখানেক ছিল ও; বুঝেছে, লক্ষ্যভেদে আগের মত দক্ষতা ফিরে পেতে কয়েক হপ্তা সময় লাগবে। এরপর স্কোয়াডের পনেরো জনের সঙ্গে জিমনেশিয়ামে যায় ও, ওখানে আনআমড কমব্যাট এ্যাকটিস। করে। স্কোয়াডটা মাত্র গঠন করা হয়েছে, এখনও সরাই অনভিজ্ঞ, কিন্তু শেখার আগ্রহ কারও চেয়ে কারও কম নয়। পিওতর মেনিনো লম্বা চওড়া, হাসি-খুশি পুলিস অফিসার, রানাকে আন্তরিকতার সঙ্গে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। কিন্তু খানিক পরই ভুরু কুঁচকে ওঠে তার, চিন্তিত দেখায় তাকে। রানার অস্ত্রপাতি নাড়াচাড়ার। ভঙ্গি দেখে বুঝে নিয়েছে সে, এ লোক সাধারণ কেউ নয়।

বিদায় নিয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে পড়ল রানা, অমনি চাচাকে ফোন করল মেনিনো। চাচা, তুমি জান কি ধরনের লোককে মেহমান হিসেবে রেখেছ, বাড়িতে?

কেন, বাবা? উদ্বিগ্ন হল ভাজা। রেমারিকের বন্ধু ও–কোন অসুবিধে করেছে, নাকি?

না না, তা নয়। কিন্তু চাচা, হাসান প্রফেশনাল একজন সত্যিকার এক্সপার্ট। মাল্টায় ও ঠিক কি করছে বল তো?

লুবনার কিডন্যাপ আর রানার আহত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করল তাজা, বলল, আমাদের এখানে এসেছে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্যে।

মেনিনো হাসল, বলল, যাক, তুমি তাহলে সামরিক অভ্যুত্থানের কোন প্ল্যান করছ না!

তাজাও হাসল। মনে হচ্ছে কু্য করার জন্যে একজন লোক আমি পেয়েছি। ও কি সত্যি অতটা ভাল?

এক মুহূর্ত পর জবাব দিল মেনিনো, ইংল্যাণ্ড আর ইটালিতে ট্রেনিং নিয়েছি। আমি, ওর মত দক্ষ লোক আর দেখিনি। এমনভাবে আর্মস নাড়াচাড়া করছিল যেন। মায়ের পেট থেকে প্র্যাকটিস করে এসেছে। আরও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর সে প্রস্তাব দিল, চাচা, আমাকে তুমি ডিনারের দাওয়াত দাও। হাসান সম্পর্কে সব কথা জানতে চাই আমি। আমাদের এখানে ইনস্ট্রাকটরের অভাব রয়েছে, কথা। বলে দেখব ওকে কোন কাজে লাগানো যায় কিনা। অবশ্যই আনঅফিশিয়ালি।

ভাইপোকে শনিবারে ডিনারের দাওয়াত দিয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখল তাজা।

ফেরি থেকে সবার শেষে নামল রানা, ল্যাণ্ড রোভারে ওর পাশের সিটে উঠে বসল মিলানো। রুচিতা’স-এর দরজায় পৌঁছেই মিলানো ঘোষণা করল, আমি হাজির!

বড়সড় বার, লোকজনে প্রায় ভরে গেছে। প্রকাণ্ডদেহী বিদ্রোহীকেও দেখল রানা, চেয়ারটা সম্পূর্ণ ঢেকে দরজার দিকে মুখ করে বসে আছে। চোখাচোখি হতে হাসল গরিলা। ওর সঙ্গে আগেই পরিচয় হয়েছে রানার। বিশাল আকৃতি, এমনিতে গোবেচারা আর সরল, কিন্তু কোথাও কাউকে অন্যায় করতে দেখলে স্থান-কাল পাত্র জ্ঞান থাকে না, তীব্র প্রতিবাদ করে বসে। তার প্রতিবাদ জানাবার ধরনটা অদ্ভুত। সম্ভব-অসম্ভব নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক লোক ভোটে জিতল একবার, কিন্তু ছমাস পেরিয়ে যাবার পরও সে তার একটা প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করল না। ইতিমধ্যে বার দুয়েক তাকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে বিদ্রোহী, কোন কাজ হয়নি। একদিন রাজনীতিকের অফিসে গিয়ে উঠল সে, কাজ শুরু করল সামনের ঘরটা ধরে। এক এক করে প্রতিটি টেবিল, চেয়ার মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভাঙল। সে। বাধা দিতে এসে আহত হল ছয়জন কর্মচারী। খবর পেয়ে পিছনের জানালা গলে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল রাজনীতিক। সেদিন তার অফিসের প্রতিটি ফার্নিচার গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছিল সে। পরদিনই তাকে গ্রেফতার করে পুলিস। ভাগ্য ভাল। বলতে হবে মাননীয় বিচারক রাজনীতিকদের পছন্দ করতেন না, মাত্র তিন মাসের জেল খেটে রেহাই পায় বিদ্রোহী। এই রকম ঘটনা তার জীবনে আরও অনেক আছে।

গুঁফোর পালা চলছিল, সবাইকে বিয়ার খাওয়াচ্ছিল সে। রানা আর মিলানোর সামনেও বিয়ার ভর্তি দুটো মগ রাখল। কামরায় এক কোণ থেকে রানার উদ্দেশে। হাত নাড়ল নিডো। ভায়োলাকেও দেখল রানা, আলফানসোর বউয়ের সঙ্গে একটা টেবিলে বসে আছে। কাছাকাছি হল না ওরা, দূর থেকে নিঃশব্দে হাসল দুজনেই।

প্রায় রোজই ওরা দুজন একসঙ্গে সাঁতার কাটে। ব্যক্তিগত কোন প্রসঙ্গ তুলে রানাকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে না ভায়োলা, নিজের দুঃখের কথা বলে সহানুভূতি। আদায়ের চেষ্টাও তার মধ্যে নেই। রানাকে সঙ্গ দিতে পেরেই খুশি সে। তার যেন ধারণা, ওর সঙ্গ রানার দরকার আছে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে রানা, ওর কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে মেয়েটা। কখন কি দরকার হয় রানার। অনোরিয়ারও এতে সমর্থন আছে। রানার কি লাগবে না লাগবে জানার জন্যে মেয়েকেই পাঠায় সে।

টাগলিয়া রানার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি কিন্তু আগেই বলে রাখছি, বারোটার আগে কেউ আজ ফিরতে পারবে না। ওর মুখেই রানা শুনল, সর্বশেষ মামলায় রায় দেয়া হয়েছে বিদ্রোহী নিরপরাধ। রাত দশটার পর বিদ্রোহীর তরফ থেকে সবাইকে বিয়ার খাওয়ানো শুরু হবে।

কাউন্টারে টাকা রেখে অপেক্ষা করছে রানা। ইতিমধ্যে অফার দেয়া হয়েছে। সাকোকে, কিন্তু বরাবরের মত প্রত্যাখ্যান করেছে সে। মিনিট পনেরো পর ফিরে এসে কাউন্টার থেকে গুনে গুনে দশ সেন্ট তুলল সাকো, সহাস্যে বলল, ক্ষতি কি!

.

ডিনারের পর বাইরের উঠনে বসে আছে রানা আর পিওতর মেনিনো। ওদেরকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে নিডোকে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেছে তাজা। ভায়োলা ওদেরকে কনিয়্যাক মেশানো কফি দিয়ে কিচেনে ফিরে গেল। কালো রঙের ঢাউস একটা পাইপ ধরাল মেনিনো, চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, আপনি জানেন। দ্বীপগুলোর সিকিউরিটি আমার দায়িত্ব?

মৃদু হেসে পাল্টা প্রশ্ন করল রানা, আসলে আপনি জানতে চাইছেন আমি একটা সিকিউরিটি রিস্ক কিনা, তাই তো?

মাথা নাড়ল মেনিনো। না। আপনি এখানে কি করছেন চাচা আমাকে বলেছে। তাছাড়া, আপনার সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য ইতিমধ্যে যোগাড় করেছি আমি। আড়ষ্ট একটু হাসি দেখা গেল তার মুখে। কাল সকালে প্যারিসে একটা টেলেক্স পাঠিয়েছিলাম, আজ সকালে তার উত্তরও পেয়ে গেছি।

আর প্যারিসে?

হ্যাঁ–ইন্টারপোলে। সমস্ত মার্সেনারি সম্পর্কে তথ্য রাখে ওরা। আমার ইনকোয়ারি ছিল সি গ্রেডের, তাই খরচ কম পড়েছে। এ গ্রেডের ইনকোয়ারি হলে আপনার সম্পর্কে ওদের জানা সমস্ত তথ্য পেয়ে যেতাম আমি, কিন্তু অত সব জানার আমার দরকার ছিল না।

কৌতুক বোধ করল রানা। জিজ্ঞেস করল, তা কি জানতে পারলেন?

জেনেছি আপনি একজন দুর্ধর্ষ মার্সেনারি, একজন মেজর, ইন্টারপোল জানে বর্তমানে আপনি কোথায় আছেন।

প্রতিক্রিয়া?

না, আপনার অনুরোধ আমরা প্রত্যাখ্যান করছি না, বলল মেনিনো। স্কোয়াডের ফ্যাসিলিটি আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। অবশ্যই আনঅফিশিয়ালি। কেন আপনি লুকিয়ে আছেন, জানতে চাইব না।

আমি কৃতজ্ঞ।

মুচকি একটু হাসি দেখা গেল মেনিনোর ঠোঁটে। কিন্তু একটা শর্ত আছে– তেমন কঠিন কিছু না। আপনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ লোক, আমরা আপনার ওই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই।

কিভাবে?

পাইপ নিভে গেছে, সেটা আবার ধরিয়ে কথা বলতে শুরু করল মেনিনো।

হাইজ্যাকার আর টেরোরিস্টদের মোকাবেলা করার জন্যে গঠন করা হয়েছে। এই স্কোয়াড আজকাল প্রায় সব দেশেই এ-ধরনের একটা করে স্কোয়াড আছে। কিন্তু ওদের এই স্কোয়াডে যারা রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতা বলতে গেলে একেবারেই নেই। আমড ফোর্সেস অব মাল্টায় এমন অফিসারের সংখ্যা খুব কম যারা। কমাণ্ডোদের ট্রেনিং দিতে পারে। যা-ও দুএকজন আছে, তারা আরও জরুরি দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। ফলে ছক বাধা নিয়ম ধরে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে, প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা ছাড়া যার কোন দামই নেই। আসল কথা ইনস্ট্রাকটরের অভাব। ইচ্ছে করলে রানা এই অভাব অনায়াসে পূরণ করতে পারে।

চেষ্টা করে দেখব কতটুকু কি করতে পারি, রাজি হল রানা। অস্ত্রপাতি যা দেখলাম, ওগুলো ছাড়া আর কি কি আছে আপনাদের?

ট্রেনিঙের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে মাঝরাত পর্যন্ত আলোচনা করল। ওরা। রানার ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করেছে মেনিনোকে, আর ট্রেনিংটা ঝালাই করে নেয়ার সুযোগ পেয়ে রানা খুশি।

*

খুদে ইনলেট থেকে কোমিনোয় এল রানা, কোন বিরতি ছাড়াই তিনবার আসা যাওয়া করল ও। পাহাড়ের ওপর বাড়ি, নিজের শোবার ঘরের জানালা থেকে চোখে বিনকিউলার লাগিয়ে রানাকে দেখছে ভায়োলা। খুদে বে-তে পৌঁছুল রানা, হোটেল জেটির দিকে সাঁতার কাটছে। নিচ তলায় নেমে এসে নিড়োকে ফোন। করল ভায়োলা। গত তিন দিন থেকেই রোজ সকালে কোমিনোর হোটেলে। নিডোকে পাঠায় সে, প্রচণ্ড স্রোতের মধ্যে পড়ে রানার কোন বিপদ হলে বোট আর জেলেদের নিয়ে নিভো যাতে তাকে সাহায্য করতে যেতে পারে। আর কোন কাজ নেই তোর, নিডো, ছুটি, বলে কানেকশন কেটে দিল ভায়োলা, তারপর ফোন করল তার এক বান্ধবীকে। মেয়েটা হোটেল কোমিনোর রিসেপশনিস্ট।

খালি পা আর ভেজা গা নিয়ে হোটেলের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছে রানা, ধাপ কটা টপকে রাস্তায় নেমে এল মেয়েটা। তার এক হাতে একটা পাস্টিকের ব্যাগ, আরেক হাতে বরফ দেয়া শরবত। রানাকে সে বলল, কমপ্লিমেন্টস অভ। ভায়োলা।

হেসে উঠল রানা, সাগরের ওপর দিয়ে ভায়োলাদের বাড়ির দিকে তাকাল। রোদ লেগে ঝিক করে উঠল বিনকিউলারের লেন্স। গ্রাস ধরা হাতটা মাথার ওপর তুলে নাড়ল রানা।

ব্যাগের ভেতর থেকে বেরুল একটা জিনস প্যান্ট, একটা সাদা টি-শার্ট, এক জোড়া রাবার স্যাণ্ডেল–সব নতুন। একটা তোয়ালেও আছে, তাতে পিন দিয়ে। আটকানো একটা চিরকুট।

মনে রাখতে হবে এই দেশটা ক্যাথলিকদের, পড়ল রানা। আধ-ন্যাংটো হয়ে চলাফেরা করা উচিত নয়।

মেয়েটা হাত তুলে দেখাল। ওই ওদিকে একটা আড়াল আছে, ব্লু লেগুনে যাবার পথেই পড়বে। হাতঘড়ি দেখল সে। চল্লিশ মিনিট পর ছাড়বে ফেরি।

ধন্যবাদ জানিয়ে খালি গ্লাসটা ফিরিয়ে দিল রানা।

জিনস আর টি-শার্ট মাপমতই হল। ওর সব কিছু খুঁটিয়ে লক্ষ করে ভায়োলা, ভাবল ও। কিন্তু দিনে দিনে যেভাবে ওর দিকে ঝুঁকে পড়ছে মেয়েটা, একটা জটিলতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র কিছু না। রেমারিককে ব্যাপারটা জানাবে? না, তারচেয়ে নিজেরই আরও সাবধান হওয়া উচিত।

সে-রাতে ডিনারে বসেছে ওরা, নেপলস থেকে ফোন এল রেমারিকের। আমি আগে কথা বলে নিই, বলে কিচেন থেকে লাউঞ্জে বেরিয়ে এল ভায়োলা। রেমারিকের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টার সম্পর্ক তার, কিন্তু আজ সে সিরিয়াস। এক এক করে। রানা সম্পর্কে অনেকগুলো প্রশ্ন করে গেল ভায়োলা। লোকটার ভবিষ্যৎ কি? এখান। থেকে কোথায় যাবে ও-কেন?

কি ঘটতে যাচ্ছে, মুহূর্তে বুঝে নিল রেমারিক। ভায়োলাকে সে বলল, তোমার এ-সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার ধারণা ব্যাপারটা একতরফা, ঠিক কিনা?

এ-প্রান্তে চুপ করে থাকল ভায়োলা। খানিক পর রেমারিকই আবার বলল, শুধু শুধু সময় নষ্ট, ভায়োলা। ওর হাতে একটা কঠিন কাজ রয়েছে। তাছাড়া, এমনিতেও ওকে তুমি বাঁধতে পারবে না।

বাঁধতে যে পারব না তা আমিও কিভাবে যেন বুঝেছি, বলল ভায়োলা। বাঁধতে চাই, তাই বা তোমাকে বলল কে?

তাহলে এত কথা জানতে চাওয়া কেন?

যদি বলি, বাঁধতে চাই না, কিছু পেতেও চাই না, শুধু কিছু দিতে চাই? আমাকে নির্লজ্জ ভাববে?

এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল রেমারিক, তারপর বলল, না। ভাবব তুমি সাক্ষাৎ দেবী। কিন্তু আমি যদি বলি যাকে দিতে চাও তাকে ভুল করে দিতে চাও?

মানে?

ওকে তুমি চিনতে পারনি, ভাই, বলল রেমারিক।

কিন্তু আমার তো কোন প্রত্যাশা নেই!

ওরও তো নেই, কাজেই তুমি দিলেই বা ও নেবে কেন?

তুমি ওর এমন একটা ছবি দিচ্ছ আমাকে, ও যেন দেবতা, ব্যঙ্গ করে বলল ভায়োলা। যেন কোন মেয়ের পক্ষে ওকে টলানো সম্ভব নয়।

কথা না বলে সশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমারিক।

এরপর রানাকে ডেকে দিল ভায়োলা। রানা আর রেমারিকের মধ্যে আভাসে ইঙ্গিতে কথা হল। রানা বুঝল, মার্সেলেসে যোগাযোগ করা হয়েছে গগলের সাথে, সাহায্য করার জন্যে তৈরি হয়ে আছে সে। অন্যান্য প্রস্তুতি কাজও সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে চলেছে। রানা আভাস দিল, তিন-চার হস্তার ভেতর রওনা হবে ও। রেমারিককে বলল, ওদিকের কাজ শেষ হলে সে যেন একটা চিঠি লিখে জানায় ওকে।

.

০২.
লোকটা মোটাসোটা, লম্বা, আঁটসাট ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম পরে আছে। কোমরের বেল্ট থেকে ঝুলছে ট্রানসিভার আর গ্রেনেড, হাতে স্টার্লিং সাবমেশিনগান। পাথুরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দম নিচ্ছে, খোলা উঠনের ওপর দিয়ে ছুটে এসে হাঁপিয়ে, গেছে।

দোতলা একটা বাড়ি, ওপর তলায় উঠতে হবে তাকে। করিডর ধরে একটু একটু করে বাঁকের দিকে এগোল সে। জানে, বাকের পর আবার লম্বা একটা করিডর, শেষ মাথায় সিঁড়ি। কোণে এসে দাঁড়াল সে, তারপর নিচু হয়ে লাফ দিল। সামনে, স্টার্লিঙের ট্রিগার টেনে ধরেছে আঙুল।

গুলির একনাগাড় আওয়াজে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল।

সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে লোকটাকে আসতে দেখল রানা, তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিনাটি সবকিছু লক্ষ করছে। সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছে আবার দেয়ালে হেলান দিল লোকটা। খালি একটা ম্যাগাজিন পড়ল মেঝেতে, ক্লিক করে জায়গামত বসল। নতুন আরেকটা। মুখের কাছেট্র্যানসিভার তুলে বলল সে, ওপরে যাচ্ছে। রানার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ধাপ বেয়ে উঠতে শুরু করল। তাকে অনুসরণ করল। রানা। বাড়ির চারদিক থেকে ব্রাশ ফায়ারের আরও আওয়াজ আসছে, মাঝে মধ্যে গ্রেনেড় ফাটছে দুএকটা।

.

এক এক করে পনেরোজনই বাগানে বেরিয়ে এল ওরা, পরনে এখনও সবার ক্যামোফ্লেজ গিয়ার, কথা বলছে উত্তেজিতভাবে। সবার পিছু পিছু এল পিওতর মেনিনো। নিচু একটা পাঁচিল দেখিয়ে সবাইকে বসতে বলল সে।

পাঁচ মিনিটের এক্সারসাইজ, কিন্তু ভিব্রিফিঙে সময় লাগল এক ঘন্টা। হামলার প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ে কথা বলল মেনিনো, কারও সমালোচনা করল, কারও প্রশংসা। পনেরোজনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে, পাশে রানা। স্কোয়াডের সবাই উৎসাহে ভরপুর, এটাই তাদের প্রথম ফুল-স্কেল এক্সারসাইজ, বিস্ফোরণের আওয়াজ আর ছুটোছুটি ওদেরকে অনুপ্রাণিত করে তুলেছে। কথা শেষ করে রানার দিকে ফিরল। মেনিনো। এনি কমেন্ট?

সামনে এগোল রানা, স্কোয়াডের সবাই কিছু শুনতে পাবার আশায় স্থির হয়ে গেল।

সব মিলিয়ে ভাল, বলল রানা। খুশি হয়ে হেসে উঠল সবাই।

কিন্তু সত্যিকার যুদ্ধে, আট থেকে দশ জন মারা যেতে তোমরা, না হয় আহত হতে। মুছে গেল মুখের হাসি।

লম্বা মোটাসোটা যুবকের দিকে হাত তুলল রানা। মারাঞ্জানো, করিডর ধরে। আসার সময় দেয়াল ঘেষে ছিলে তুমি–ভুলে গিয়েছিলে ওটা একটা পাথরের। দেয়াল। শক্ত দেয়ালে বুলেট ঢোকে না, পিছলে যায়–সেজন্যেই বারবার, করিডরের মাঝখানে থাকতে বলা হয়েছে সবাইকে। মাঝখানে থাকলে তোমার মনে হবে শত্রু তোমাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তবু মাঝখানে থাকাই। নিরাপদ। বাকটা ঘোরার সময় নিচু হয়ে ছিলে তুমি, কিন্তু তারপরই সিধে হয়ে গেলে। আরেকটা কথা, কোমর-সমান উঁচুতে লক্ষ্যস্থির করছিলে তুমি। শত্রু মেঝেতে শুয়ে থাকতে পারে, বাতাসে ওড়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, কাজেই সব সময় নিচের দিকে গুলি করতে হবে।

মাথা ঝাঁকাল মারাঞ্জানো, হতভম্ব দেখাল তাকে। কিন্তু রানা তাকে এখনও রেহাই দেয়নি।

আমি টেরোরিস্ট হলে, এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেতে। ম্যাগাজিন বদলাতে অনেক বেশি সময় নিয়েছ। ওটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়, তোমার সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্ত। সবাইকে বলছি, আরও প্র্যাকটিস কর। বাঁচতে চাইলে এর কোন বিকল্প নেই।

মাঝারি আকৃতির এক যুবকের দিকে ফিরল রানা। ডেগা, জোনাথনের পিছু পিছু দুনাম্বার কামরায় ঢুকলে তুমি। অথচ উচিত ছিল করিডর থেকে তিন আর চার নাম্বার কামরার দরজা কাভার দেয়া। কি আশা করেছিলে, দুনাম্বার কামরায় তোমার জন্যে কোন মেয়ে অপেক্ষা করছে?

হাসির হররা বয়ে গেল। সবাই জানে, ডেগা একজন রোমিও, মেয়ে দেখলে। পিছু ছাড়ে না।

স্কোয়াডের প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলল রানা। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকল মেনিনো, দোষ-ক্রটি আবিষ্কার আর সম্ভাবনার নতুন নতুন দিক উন্মোচনে রানার কৃতিত্ব দেখে বিস্মিত। তার লোকেরা সবাই ওর কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কারণ একজন অভিজ্ঞ লোক কর্তৃত্বের সাথে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় গলদ। ওরা সবাই রানাকে স্টার্লিঙের ম্যাগাজিন পাল্টাতে দেখল বিদ্যুৎ খেলে গেল হাতে, একটানা গুলিবর্ষণে বিরতি পড়ল কি পড়ল না। রানাকে হ্যাণ্ডগান, এস-এম জি আর কারবাইন চালাতেও দেখল ওরা–দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, দ্রুত। এর আগে তারা আন-আর্মড কমব্যাট প্র্যাকটিস করতে দেখেছে ওকে, ওর গতি আর রিফ্লেক্স দেখে মুগ্ধ হয়েছে। পনেরো জনের কারও বয়সই পঁচিশের বেশি। নয়, সবাই শক্ত-সমর্থ, কিন্তু জানে রানার সঙ্গে কেউ ওরা পারবে না। কাজেই ওর কথা মন দিয়ে শুনল সবাই।

সবশেষে মেনিনো, ধন্যবাদ জানাল রানাকে। বলল, বিল্ডিংটা আরও এক মাস আমাদের দখলে থাকবে, আমি চাই আরও দুটো এক্সারসাইজে আপনি থাকুন। এয়ার মাল্টার সাথে কথা হয়ে গেছে, দুঘন্টার জন্যে ওরা আমাদের একটা বোয়িং ধার দেবে। হাইজ্যাক অ্যাসল্টের মহড়া আপনি পরিচালনা করবেন।

রাজি হল রানা।

ওর আগের স্বাস্থ্য আর শক্তি ফিরে এসেছে, ফিরে পেয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের দক্ষতাও। নিয়মিত প্র্যাকটিস করে এখন শুধু ওগুলো ধরে রাখা।

.

একটা রুটিন করে নিয়েছে ভায়োলা।

ভোর অন্ধকার থাকতে ঘুম ভাঙে তার, দোতলায় উঠে রানার দরজায় টোকা। দেয়। রানার সাড়া পেলে নিচে নেমে কফি তৈরি করে সে। আবার দোতলায় উঠে।

আসে, দেখে, ব্যায়াম শুরু করেছে রানা। বিছানায় বসে রানাকে ঘেমেনেয়ে উঠতে দেখে সে। তারপর চেয়ারে বসে কফি খায় রানা। তখনও. সূর্য ওঠে না, গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ। চুপচাপ থাকে ওরা, দুএকটা কথা হয় কি হয় না। কফি শেষ করে, দৌড়াতে যায় রানা–এখন একটানা দশ মাইল দৌড়ায় ও। দৌড় শেষ করে খুদে ইনলেটে চলে আসে, এসে দেখে ভায়োলা সেখানে আগেই হাজির হয়েছে, ওর জন্যে কিছু একটা ঠাণ্ডা পানীয় আর তোয়ালে নিয়ে অপেক্ষা করছে। ডাইভ দিয়ে। পানিতে নামে রানা, তিন বার কোমিনো হয়ে ফিরে আসে। তারপর সমতল পাথরে আধ ঘন্টা শুয়ে থাকে, ওর পাশে বসে বা শুয়ে থাকে ভায়োলা।

ব্রেকফাস্ট সেরে পাহাড়ে চলে যায় রানা, তাজা আর নিডোর সঙ্গে মাটি কাটার কাজ করে।

সন্ধের সময় আবার রানার সঙ্গে দেখা হয় ভায়োলার, খুদে ইনলেটে সাঁতার। কাটে দুজন। তখন ওদের মধ্যে কিছু কিছু কথাবার্তা হয়। ব্যক্তিগত কোন প্রসঙ্গ কেউ তোলে না, অতীত আর ভবিষ্যতের কথা দুজনেই সচেতনভাবে এড়িয়ে। যায়। আভাসে জানিয়ে দিয়েছে ভায়োলা, তার কোন প্রত্যাশা নেই, কিন্তু ভাল লাগা আছে, আছে সমর্থন আর সহানুভূতি। সেবা, শুশ্রূষা আর সঙ্গ দিয়ে নিজেই তৃপ্তি পেতে চায় সে; অনুরোধ–নারীসুলভ তার এই আচরণকে যেন অন্য চোখে দেখা না হয়।

মাঝে মধ্যে রানাকে হাসতে দেখে ভায়োলা, অদ্ভুত একটা তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। তার অন্তর। রেমারিকের কাছে শুনেছে সে, অসহনীয় একটা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে। আছে এই লোকের মন। রেমারিকের সাথে আরও কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। তার, রানার ভবিষ্যৎ প্ল্যান সম্পর্কে এক-আধটু আভাস পেয়েছে সে।

প্রথম দিকে একটু ধাঁধা লাগলেও, এখন রানা ভায়োলাকে বুঝতে পারে। অসাধারণ, বুদ্ধিমতী সে, মনটা ফুলের মত কোমল। কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, সত্যিকার পৌরুষ আছে এই রকম পুরুষ মানুষের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ বোধ করে, সে। হতে পারে স্বামীর সঙ্গে যে-কারণে ঘর করতে পারেনি, এ তারই প্রতিক্রিয়া।

সময় বয়ে চলল, কিন্তু ওদের সম্পর্ক আগের মতই থাকল। ভায়োলা সব সময় রানার কাছাকাছি আছে, কিন্তু আরও ঘনিষ্ঠ হবার কোন চেষ্টা নেই তার। নাগালের মধ্যে রয়েছে ভায়োলা, কিন্তু কখনও হাত বাড়াবার কোন প্রবণতা রানার মধ্যে দেখা যায় না।

রানা একদিন মৃদু কণ্ঠে বলল, আর দিন দশেক পর রওনা হব আমি। মার্সেলেসে যেতে হবে আমাকে। দেখি আজ যদি পারি জাহাজের শিডিউল চেক করে আসব।

সে তো আমিই পারি, বলল ভায়োলা। ভ্যালেটায় একটা ট্রাভেল এজেন্সি আছে, আমার এক বান্ধবী কাজ করে। যতদূর মনে পড়ছে, হপ্তায় একটা করে জাহাজ যায়–বন পুয়ারো।

পরদিন রেমারিকের চিঠি পৌঁছুল।

স্পষ্ট, খুদে হস্তাক্ষরে চার পৃষ্ঠা চিঠি লিখেছে রেমারিক। প্রথম পৃষ্ঠায় একটা টিকেটের অর্ধেক পিন দিয়ে আটকানো। মার্সেলেন্স রেলওয়ে স্টেশনের। ব্যাগেজরূমের টিকেট ওটা।

সে-রাতে দুটো চিঠি লিখল রানা। প্রথমটা ঢাকায়, মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) রাহাত খানের কাছে। চিঠিতে সি. আই. এ-র মতিগতি কি রকম জানতে চাইল সে। লিখল, শুধু ভাল কোন খবর থাকলে বি. সি. আই রেমারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। আর, একটা ইকুইপমেন্টের জন্যে অনুরোধ করল রানা, মার্সেলেসে, পোস্ট রেসতাত-এ পাঠাতে হবে।

দ্বিতীয় চিঠিটা লিখল ফেঞ্চ আর্মির একজন জেনারেলকে। এই ফ্রেঞ্চ জেনারেল কিছু ব্যাপারে রানার প্রতি দুর্বল। লেবাননে পাঠানো জাতিসংঘের শান্তি বাহিনীতে ছিলেন তিনি, খ্রিস্টান ফ্যালাঞ্জিস্টদের গুলি খেয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। রানা তাকে কাঁধে তুলে নেয়, তিন ঘন্টা হেঁটে, পৌঁছে দেয় হাসপাতালে। এই জেনারেলকেও একটা পার্সেলের জন্যে লিখল রানা।

.

কাল সকালে গোজো ছেড়ে চলে যাবে রানা।

স্কোয়াডের শেষ মহড়াটাও পরিচালনা করল ও। সবারই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, মেনিনো আর রানার সামনে আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াল ব্রা, নিন্দার চেয়ে প্রশংসাই বেশি জুটল কপালে।

রানার এটা শেষ সেশন, তাই ফেয়ারওয়েল ড্রিঙ্কের জন্যে জেদ ধরল ওরা। ফেরি ধরতে পারবে না বলেও এড়াতে পারল না রানা, ওর জন্যে আগেই মাল্টা। নেভির একটা পেট্রল বোট তৈরি রাখা হয়েছে, গোজোয় পৌঁছে দেবে ওকে। মেনিনো বলল, নিডোকে ফোন করেছিলাম, তাকে না পেয়ে ভায়োলার সাথে কথা। হয়েছে আমার। আপনাকে ফেয়ারওয়েল জানাবার জন্যে রুচিতাস-এ অপেক্ষা করবে সবাই।

স্কোয়াডের অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত আটটা বেজে গেল। এক সময় রানাকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে মেনিনো বলল, মাল্টায়, বিশেষ করে গোজোতে আপনার অনেক বন্ধু রয়েছে, মি. হাসান। আপনি যে কাজে যাচ্ছেন, তার ফলাফল যাই হোক, কথাটা কিন্তু ভুলবেন না।

ভুলব না,বলল রানা। অসংখ্য ধন্যবাদ।

গোজোয় পৌঁছে রানা দেখল আলফানসো আর মিলানো ওর জন্যে জেটিতে অপেক্ষা করছে, ওকে রুচিতাস-এ নিয়ে যাবে। বারের কাছাকাছি পৌঁছে হতবাক হয়ে গেল রানা। বারের ভেতর একশো জনের ওপর লোক ধরে, অথচ জায়গা না পেয়ে বহু লোক বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ওকে দেখেই উমো এসেছে, উমো এসেছে বলে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল ভিড়ের ভেতর থেকে।

উমো এসেছে মানে? জিজ্ঞেস করল রানা।

তোমার ডাক নাম, বলল আলফানসো।

মানেটা জিজ্ঞেস করতে হল না, জানে রানা ইটালিয়ান ভাষায় উমো মানে, পুরুষ। সেই সঙ্গে মনে পড়ল, বহিরাগত কাউকে ডাকনাম দেয়া হয় না।

রানার সাথে যাদের বন্ধুত্ব হয়েছে তারা তো আছেই, গোজোর কৃষক আর জেলেরাও দলবেধে ফেয়ারওয়েলু জানাতে এসেছে রানাকে। কোথায় যাচ্ছে ও, কেন যাচ্ছে, কি করতে যাচ্ছে, কিছুই কাউকে বলেনি রানা, অথচ সবাই যেন সব কিছু জানে। প্রসঙ্গটা কেউ তুলল না বটে, কিন্তু হাবভাব দেখে বোঝা গেল, রানার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থনও আছে।

দরজার কাছে একটা টেবিলে বসেছে নিডোভায়োলা, অনোরিয়া আর তাজা। বারটেণ্ডার সাকো মগভর্তি বিয়ার ধরিয়ে দিল রানার হাতে, বলল, আমার তরফ থেকে।

রানা জিজ্ঞেস করল, তুমি?

ক্ষতি কি!

হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। চেয়ার ছেড়ে উঠল ভায়োলা, তার কাঁধে একটা। ব্যাগ। রানার হাতে একটা টেলিগ্রাম ধরিয়ে দিল সে। প্যারিস থেকে জেনারেল। পাঠিয়েছেন। রানার অনুরোধ রক্ষা করেছেন তিনি।

খানিক পর বিদ্রোহী এসে ওর কাঁধে হাত রাখল, বলল, একটু বাইরে। আসবে? তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।

বার থেকে বেরিয়ে নির্জন একটা জায়গার খোঁজে বেশ কয়েক পা হেঁটে আসতে হল ওদেরকে। কি ব্যাপার, কালো?জানতে চাইল রানা।

রানার সামনে ছোটখাট একটা পাহাড়ের মত লাগল বিদ্রোহীকে। উমো, ভারি গলায় বলল সে, কখনও যদি তোমার সাহায্য দরকার হয়, আর প্রথমে যদি। আমাকে না ডাক, আমি কিন্তু ভীষণ রাগ করব, হ্যাঁ।

রানা হাসল। তোমাকেই প্রথমে ডাকব, কথা দিলাম।

মাথা ঝাঁকাল বিদ্রোহী। স্রেফ রুচিতা’স-এ একটা তার পাঠিয়ে দেবে, সাকো জানে কোথায় আমাকে পাওয়া যাবে।

আবার বারে ফিরে এল ওরা। এরপর একে একে কিন্তু, ক্ষতি কি, গুঁফো, অক্লান্ত আর হাজির একইভাবে আড়ালে ডেকে নিয়ে একই কথা বলল রানাকে। সবাই ওরা সাহায্য করতে চায় রানাকে।

শেষবার বারে ফিরে এসে পাজেরো তাজাকে একপাশে ডেকে নিল রানা, বলল, তুমি আমার কাছে টাকা পাও, তাজা।

প্রৌঢ় অবাক হয়ে তাকাল, কিসের টাকা?

তোমার বাড়িতে এতদিন থাকলাম, খেলাম–এ-সবে টাকা লাগে।

একগাল হাসল তাজা। তা ঠিক। বেশ, হপ্তায় পনেরো পাউণ্ড চার্জ করলাম। আমি–এদিকে ফার্ম লেবাররা ওই পনেরো পাউণ্ডই মজুরি পায়, তারমানে কাটাকাটি হয়ে গেল। কথা শেষ করে বার কাউন্টারের দিকে চলে গেল সে। অসহায়ভাবে কাধ ঝাঁকাল রানা।

রাত বারোটার আগেই নিডো আর অনোরিয়াকে নিয়ে চলে গেল তাজা। ল্যাণ্ড রোভারটা ভায়োলা আর রানার জন্যে থাকল। বিদায় সম্বর্ধনা শেষ হতে দুটো বাজল। সবার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিল রানা, আবার একবার করে সবাইকে কথা দিতে হল, সাহায্য দরকার হলে প্রথমে গোজোর বন্ধু-বান্ধবদের স্মরণ করবে ও। সবশেষে ভায়োলা ওর হাত ধরল, টেনে বের করে আনল বার। থেকে। পিছন দিক থেকে কে যেন বলল, জোড়া কিন্তু দারুণ মানিয়েছে, তাই না?

পাহাড়ী পথ ধরে ধীরে ধীরে উঠছে ল্যাণ্ড রোভার, ভায়োলাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে রানা। প্রচুর বিয়ার খেয়েছে ও, কিন্তু নেশা হয়নি। ভায়োলা খুব বেশি খায়নি, কিন্তু বারে থাকতেই তার চোখে ঢুলু ঢুলু একটা ভাব লক্ষ করেছে ও। গভীর রাত, চারদিকে নির্জন বন-জঙ্গল, আর নিস্তব্ধ পাহাড়। শুধু কৌতূহল নয়, সেই সাথে পুলক অনুভব করল রানা। ভাবল, কি ব্যাপার, এভাবে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন ভায়োলা?

আর ভায়োলা ভাবছে, দিন তো বেশ কটা কাটল, এখনও আমার মন বুঝতে পারেনি ও? অনেক বছর পর একজন পুরুষ আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু সে কি সত্যি নির্লোভ দেবতা? নাকি ভালবাসতে জানে না, শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে? এত কাছাকাছি থাকি, কিন্তু স্পর্শটুকুও পাই না–একি ওর ভদ্রতা, নাকি অনীহা? কিন্তু আমি তো অসুন্দরী নই! আমাকে পাবার জন্যে কত লোকই তো পাগল। তবে কি অহঙ্কারী ও? আশা করছে, প্রথম নিবেদন আমার তরফ থেকে আসুক?

পাহাড়ের মাথায় উঠে এল ল্যাণ্ড রোভার। ভায়োলার দৃষ্টি এখনও অনুভব করছে রানা। ভাবছে, ও কিছু বলে না কেন? কি করে বুঝব আমি ওকে কাছে টানলে ফোঁস করে উঠে ফণা তুলবে না? ওদের পরিবারের সবাই খুব সরল, আমার সাথে ওর এই ঘনিষ্ঠতা হয়ত সেই সরলতারই প্রকাশ, এর মধ্যে হয়ত আর কিছু নেই। হাত বাড়াতে দেখলে যদি চরিত্রহীন বলে গাল দিয়ে বসে?

পাহাড়ের মাথা থেকে নিচে নেমে এল ল্যাণ্ড রোভার। ডান পাশে সাগর, খানিকটা দূরে, পাথরে ঢেউ আছড়ে পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। দুজনই ওরা আড়ষ্ট, ঘামছে একটু একটু, ঢোক গিলছে।

এভাবেই হয়ত বাড়ি ফিরত ওরা, বুকভরা বঞ্চনা আর অতৃপ্তি নিয়ে। কিন্তু ওদেরকে সাহায্য করল একটা জানোয়ার।

রাস্তা পেরোতে গিয়ে গাড়ির সামনে পড়ে গেল একটা শিয়াল। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করল রানা। মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়াল শিয়ালটা, তারপর ঘুরে যেদিক। থেকে এসেছিল সেদিকেই ছুটে পালাল। ঝাঁকি খেয়ে রানার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভায়োলা। গিয়ার পাল্টে আবার গাড়ি ছাড়তে গিয়ে অনুভব করল ও, ভায়োলার দুই হাত ওকে ছেড়ে না দিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে। হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইল থেকে নামিয়ে নিল রানা।

এঞ্জিন বন্ধ হল। খুলে গেল মনের দুয়ার।

রানার কাঁধের ওপর মাথা রাখল ভায়োলা, ভায়োলার পিঠের ওপর ভাঁজ করা কনুই আর কাঁধের ওপর হাত রাখল রানা। কিছুক্ষণ কেউ নড়ল না। তারপর কাঁধে। রানার হাতের চাপ অনুভব করল ভায়োলা। রানার কাঁধ থেকে মুখ তুলল সে, ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে আছে। তাকে বুকে টেনে নিল রানা, দুই জোড়া ব্যাকুল ঠোঁট এক হল।

প্রথমে দীর্ঘ একটা চুমো–প্রচণ্ড তৃষ্ণায় এক ফোঁটা বৃষ্টির মত। তারপর মুষলধারে শুরু হল, উন্মত্ত আবেগে দুজনেই দিশেহারা।

তারপর এক সময় থামল ওরা। একবার যখন জ্বলেছে, এ আগুন নেভাতেও হবে।

শুনতে পাচ্ছ? ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করল ভায়োলা।

কিসের কথা বলছে ভায়োলা বুঝতে না পারলেও, আন্দাজ করতে পারল রানা, অস্ফুটে বলল, হ্যাঁ। সাগর আমাদের ডাকছে। কিন্তু সাথে যে সুইমস্যুট নেই?

দরকার কি। বলেই রানার বুকে মুখ লুকাল ভায়োলা।

কেউ দেখলে চোখ কপালে উঠত তার, জড়াজড়ি করে গাড়ি থেকে নামার সময় কিম্ভূত আকৃতির দুমুখো একটা প্রাণী মনে হল ওদেরকে, যেন প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল একটা।

খুদে ইনলেটে চলে এল ওরা। পানির ওপর ঝুলে থাকা পাথরে দাঁড়িয়ে থাকল, দুটো শরীর পরস্পরের সাথে সেঁটে আছে। ডাইভ দিল না, ঢালু পাথরের ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে দুজন একসাথে ঝুপ করে পড়ল সাগরে।

পাহাড়ের এক কোণ থেকে সবই দেখল চাঁদ মামা। কানের পাশে ফিস ফিস করে সায় দিল ফুরফুরে বাতাস। গম্ভীর, ভরাট আওয়াজ তুলে একের পর এক ছুটে এল ঢেউগুলো, পিঠে তুলে নিল প্রকৃতির দুই নগ্ন সন্তানকে।

সাগর থেকে উঠে পাথরের ওপর পাশাপাশি শুয়ে থাকল ওরা। দম ফিরে। পেতে একটু সময় নিল দুজনেই। সাগর থেকে উঠে সমতল পাথরের ওপর শুয়ে থাকল ওরা। দম ফিরে পেয়ে প্রথমে কথা বলল ভায়োলা।

অনেক কথা বলতে চাই, কিন্তু কিভাবে বলতে হয় জানি না।

আমি তোমাকে ভালবাসি, এভাবে শুরু করতে পার, মুচকি হেসে উৎসাহ দিল রানা।

কিন্তু হাসল না ভায়োলা, তবে সিরিয়াস দেখাল। একবার ঠকেছি, আর নয়–নিজেকে কারও সাথে বাধব না, কাউকে বিয়ে করব না, এভাবে যদি শুরু করি?

তাহলে জিজ্ঞেস করব, কাছে এলে কেন, কেন টানলে?

ভাল লেগেছে, তাই, ভায়োলার সরল জবাব। যতদিন তোমাকে ভাল লাগবে, আমি তোমার। কাছে গেলে যদি বুকে টেনে নাও, খুশি হব, কৃতজ্ঞবোধ করব। যদি ফিরিয়ে দাও, আহত হব, কিন্তু অভিশাপ দেব না ভালবাসার দাবি নিয়ে তোমাকে দখল করতে চাই না।

কিন্তু জীবন? ভবিষ্যৎ?

সে তো তোমাকে দেখার আগেই একটা ছকে ফেলে সাজিয়ে রেখেছি, বলল ভায়োলা। বিয়ে নয়, বাঁধন নয়, মুক্ত-স্বাধীন জীবন। আর ভবিষ্যৎ? হ্যাঁ, ভবিষ্যৎও ঠিক করা আছে, তবে তোমাকে দেখার পর একটু বদলাবে। আগের প্যানে কারও জন্যে অপেক্ষা ছিল না, এখন থাকবে। জানি, চলে যাবে তুমি। আর হয়ত কোন দিন দেখা হবে না। কিন্তু তবু আমি অপেক্ষা করব। যদি কখনও ফের, নিজেকে নিবেদন করে ধন্য হব। আর যদি না ফের, চলতে থাকবে অপেক্ষার পালা, শেষ হবে. সেই যেদিন মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে যাবে আমাকে।

কাছের ঝোপটা হঠাৎ নড়ে উঠতে দুজনেই ওরা চমকে উঠে তাকাল। সেই। ধাড়ী শিয়ালটা ঝোঁপের আড়াল থেকে মুখ বের করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

দেখছ, কি রকম বিরক্ত হয়েছে ব্যাটা?

কেন, বিরক্ত হবে কেন? চোখ বড় বড় করল ভায়োলা।

ওদের মধ্যে বোধহয় এত দেরি করার রীতি নেই, হাসি চেপে বলল রানা। আমরা শুধু কথা বলে সময় নষ্ট করছি, আসল কাজের নামও নিচ্ছি না, বিরক্ত হবে না তো কি!

হাত মুঠো করে কিল তুলল ভায়োলা, ঝট করে ভায়োলারই বুকের ভেতর মুখ লুকাল রানা। কিলটা পড়ল রানার চওড়া, ভিজে পিঠে। ভায়োলার বুকের ভেতর আরও একটু সেঁধিয়ে গেল রানার নাক-মুখ।

হুক্কা-হুয়া করে একটা ডাক ছাড়ল শিয়ালটা, তারপর ঝোপ টপকে ছুটল। বোধহয় সঙ্গিনীর খোঁজে।

রানা আর ভায়োলা তখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত।

.

কি যেন জিজ্ঞেস করল ভায়োলা, অন্যমনস্ক ছিল বলে শুনতে পায়নি রানা। চাঁদের আলোয় ওদের নগ্ন শরীর ঘামে চকচক করছে। রানার পাশেই ভাঁজ করা হাঁটুর উপর চিবুক ঠেকিয়ে বসে আছে ভায়োলা। শান্ত, মৃদু কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল রানা।

বলল কোথায় যাচ্ছে ও, কেন যাচ্ছে। নেপলসে যখন এল তখন ওর মানসিক আর শারীরিক অবস্থা কি ছিল। রেমারিক আর রিসো কিভাবে ওকে যোগাড় করে দিল কাজটা। প্রথম দিকে লুবনার সঙ্গে কি রকম কঠোর ব্যবহার করেছিল ও, কিন্তু। ছোট্ট মেয়েটা কিভাবে ধীরে ধীরে তার মন জয় করে নেয়।

এসব কথা ভায়োলাকে কেন বলছে রানা, ও নিজেও বোধহয় ভাল করে জানে না। কারণ হয়ত ভায়োলার নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন, কিংবা হয়ত রাতের নির্জন। পরিবেশটাই এমন যে বিদায় লগ্নে মনের সমস্ত ভার লাঘব করার একটা অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে।

লুবনাকে নিয়ে পিকনিকে যাবার ঘটনাটাও বলল রানা। সেদিন লুবনা ওকে ছোট্ট একটা কোরান শরিফ উপহার দিয়েছিল। ওর নির্বাচিত শব্দগুলো জ্যান্ত করে, তুলল লুবনাকে, চোখের সামনে মেয়েটাকে পরিষ্কার যেন দেখতে পেল ভায়োলা। চঞ্চল, কৌতূহলী, কথায় কথায় ঠোঁট ফোলায়, আবার অকারণ আনন্দে খিল খিল করে হেসে ওঠে।

তারপর, শেষ দিনটা। কিডন্যাপাররা লুবনার পথরোধ করে দাঁড়াল। গুলি খেয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে রানা, চিৎকার করে ওর নাম ধরে ডাকল লুবনা সেই হাহাকার ধ্বনি আজও পরিষ্কার শুনতে পায় রানা। জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে, জানে না বাচবে কিনা, কিন্তু বাঁচার প্রচণ্ড একটা আকুতি রয়েছে। এরপর রেমারিক এসে জানাল, লুবনা নেই। জানাল, কিভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে।

আর বলল সেই গানের কথা; যে গান ওকে ঘুমাতে দেয় না।

ভাঁজ করা হাঁটুতে কপাল ঠেকিয়ে বসে আছে ভায়োলা, তার লম্বা কালো চুলে। ঢাকা পড়ে আছে মুখ। অনেকক্ষণ হল চুপ করে গেছে রানা। পাথরের গায়ে বাড়ি খাওয়া বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ছোট ছোট ঢেউ ভেঙে পড়ার আওয়াজ, মনে হল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে প্রকৃতি। মুখ তুলল ভায়োলা, চাঁদের ম্লান আলোয় তার চোখে পানি চিকচিক করতে দেখল রানা। দাতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলাবার। চেষ্টা করল ভায়োলা, রুদ্ধস্বরে বলল, মার, রানা! ওদের তুমি খুন কর! এমন, প্রতিশোধ নাও, মানুষ যেন শিউরে ওঠে!

ভাঁজ করা হাঁটুতে আবার মুখ ঢাকল ভায়োলা, তার পিঠ ফুলে ফুলে উঠল। লুবনার জন্যে কাঁদছে সে। উঠে বসেছে রানা, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাগরের দিকে, নির্বাক।

এক সময় শান্ত হল ভায়োলা। চোখ মুছে জিজ্ঞেস করল, যে-কাজে তুমি যাচ্ছ, ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু?

জানি না, অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল রানা। খুব কম, নেই বললেই চলে।

কিন্তু ফিরে তোমাকে আসতেই হবে…।

ভায়োলার বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল রানা। দেখল, ভায়োলার ঠোঁটের কোণে একটু ক্ষীণ হাসি লেগে রয়েছে।

ফিরে আসতে হবে, তোমার কাছে?

হ্যাঁ, হাসিটা আরও একটু বড় হল ভায়োলার মুখে। আমার কাছে। আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব।

হেসে ফেলল রানা। চেষ্টার কোন ক্রটি করব না, কথা দিলাম।

যতদিন তুমি না ফের, রোজ সকালে চার্চে যাব আমি, অস্ফুটে বলল ভায়োলা। তোমার জন্যে প্রার্থনা করব।

.

০৩.
ভিনসেন্ট গগলের অফিস কামরায় একা দাঁড়িয়ে রয়েছে রানা, দেয়ালে সাঁটা অস্ত্রশস্ত্রের ছবি দেখছে। রিসেপশনে দুজন ক্রেতার সঙ্গে আলাপ করছে গগল, ওদেরকে বিদায় করে কথা বলবে রানার সাথে। অস্ত্র চোরাচালানের ব্যবসা আগের মতই চালু রেখেছে গগল, তবে আর্মস ডিলারের লাইসেন্স যোগাড় করে এখন সে ব্যবসাটাকে একটা বৈধ আবরণ পরিয়ে নিয়েছে।

কি চাই? ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল গগল। তীক্ষ্ণ চোখে রানার আপাদমস্তক লক্ষ করল সে। রানাকে চিনতে পারেনি। দেখল, ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা লোকটা, আত্মবিশ্বাস, শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে শক্তি আর সাহস।

আমি মাসুদ রানা।

সামনে সাপ দেখলেও বোধহয় এতটা আঁতকে উঠত না গগল।

যা যা চেয়েছি সব যোগাড় হয়েছে? সরাসরি কাজের কথা পাড়ল রানা, বিস্ময় প্রকাশের কোন সময়ই দিল না গগলকে।

ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িতে হাত বুলিয়ে মাথা ঝাঁকাল গগল। হ্যাঁ। ঢালাও অর্ডার। দিয়েছিলে, কিছু কিছু আইটেমের বিকল্প যোগাড় করে রেখেছি, পছন্দমত বেছে নিতে পারবে। হাতঘড়ি দেখল সে। আগে লাঞ্চ সেরে নিই, তারপর ওয়্যারহাউসে যাব। ইতিমধ্যে ফোন করে দিলে আমার লোকেরা তোমার দেখার জন্যে সব বের করে রাখবে।

ঠিক আছে, বলল রানা।

অপেক্ষা করছে গগল, তার মনে হল আরও কি যেন বলবে রানা।

জাল কিছু কাগজ-পত্র লাগবে আমার, বলল রানা। ভাবছি…

পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, এই সব?

হ্যাঁ।

কঠিন কিছু না। কোন দেশের?

ফ্রেঞ্চ, কানাডিয়ান বা আমেরিকান, বলল রানা। ফ্রেঞ্চ আর ইংরেজি জানি, কাজেই তিন দেশের যে-কোন একটা হলে চলবে। সমস্যা অন্যখানে, ওগুলো। আমার খুব তাড়াতাড়ি দরকার–চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে।

আঙুলের গিঁট গুনতে শুরু করল গগল, অন্যমনস্ক। ফ্রেঞ্চ কাগজ হলে যদি চলে, এই সময়ের মধ্যে সম্ভব।

গুড।

ফটো?

জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে একটা এনভেলাপ বের করল রানা। বারোটা ফটো আছে এতে। সাধারণ একজন ফরাসী বিদেশে যেতে চাইলে যে-সব। কাগজ-পত্র লাগে, সব আমার দরকার হবে।

রানার হাত থেকে এনভেলাপটা নিয়ে একটা দেরাজে রাখল গগল। পাবে। অস্ত্রশস্ত্র বা কাগজ-পত্র কেন দরকার রানার জানতে চায়নি সে, চাইবেও না। রানাকে সে চেনে, কোথাকার পানি কোথায় গড়াবে অর্ডার দেখে আন্দাজ করে। নিয়েছে।

এ সবের জন্যে প্রচুর খরচ হবে তোমার, বুলল রানা। চেক বা…

ভেব না এসব তোমাকে আমি দান করছি, রানার একটা হাত ধরে দরজার দিকে এগোল গগল। সময় হলে ঠিকই আমি কিছু চাইব, বিনিময়ে। চল, লাঞ্চটা সেরে আসি।

কথা বাড়িয়ে কোন লাভ নেই, জানে রানা। অস্ত্র আর কাগজ-পত্রের জন্যে কোন পয়সা নেবে না গগল। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে এই ঋণ শোধ করতে হবে ওকে।

.

পরও রাতে বন পোয়ারোয় চড়ে মার্সেলেসে পৌচেছে রানা।

ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রেলওয়ে স্টেশনে চলে এসেছে, ব্যাগেজ রূম থেকে কালো রঙের লেদার ব্রিফকেসটা সংগ্রহ করেছে। রেস্তোরাঁয় ঢুকে নির্জন এক কোণে বসে, কফির অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে বের করেছে রেমারিকের চিঠিটা।

নাম্বার মিলিয়ে কমবিনেশন লক খুলেছে রানা। ভেতরে একটা বড়সড় ম্যানিলা এনভেলাপ, তাতে এক গোছা চাবি, একটা রোডম্যাপ আর দুইসেট কাগজ-পত্র। এক সেট কাগজ বিনো গারবান্ডির নামে–তার পাসপোর্ট, পরিচয় পত্র ইত্যাদি। লোকটা আমালফিতে বাস করে, তরি-তরকারি আমদানির ব্যবসা। আছে। দ্বিতীয় সেট কাগজ টয়োটা ভ্যানের জন্যে। রোড ম্যাপটা খুলল রানা। ম্যাপের গায়ে এখানে-সেখানে কালো কালি দিয়ে বৃত্ত রচনা করা হয়েছে, মার্জিনে লেখা রয়েছে বেশ কিছু নির্দেশ। দেখা শেষ করে আবার সব ব্রিফকেসে ভরে তালা লাগিয়ে দিল ও।

কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে রানা, কাঁচের পার্টিশন ভেদ করে প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে ওর দৃষ্টি, কিন্তু ভাবছে রেমারিকের কথা। ওর সাহায্য ছাড়া এতসব আয়োজন করা কঠিন হত। ও জানে, বিনো গারবান্ডি বাস্তবেও একজন ব্যবসায়ী। হবে, ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তার নাম আর পরিচয় ধার করা হয়েছে। পাসপোর্ট এবং অন্যান্য কাগজও নেপলসের সেরা জালিয়াতকে দিয়ে জাল করানো হয়েছে, কারও সাধ্য নেই খুঁত বের করে। রানা জানে, নেপলসে পৌঁছে সে দেখবে সব একেবারে তৈরি অবস্থায় আছে। এক হপ্তা পর শুরু হবে আগুন নিয়ে খেলা।

ভ্যানটা সম্ভবত ফুরেলা চালিয়ে নিয়ে এসেছে মার্সেলেসে, আন্দাজ করল রানা। ফুরেলার নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে রেমারিকের সঙ্গে আলাপ করতে হবে, নিজেকে মনে করিয়ে দিল ও।

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে পোস্ট অফিসে এল রানা, ঢাকা আর প্যারিস থেকে আসা পার্সেল দুটো সংগ্রহ করল। বিনো গারবান্ডির নাম ভাড়িয়ে একটা হোটেলে উঠল ও।

পাথরের মেঝে, অনেক ওপরে ইস্পাতের সিলিং, ওদের পায়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে আসছে। চারদিকে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে আছে কাঠের বাক্স, সার সার বাক্সের মাঝখানে গোলকধাঁধা তৈরি করেছে অসংখ্য প্যাসেজ। নাকে পরিচিত একটা গন্ধ ঢুকল–মেটালের সাথে গ্রিজের মাখামাখি হলে এই তামাটে গন্ধ পাওয়া যায়। ইস্পাতের ভারি একটা দেয়াল ওয়্যারহাউসটাকে দুভাগে ভাগ করে রেখেছে, দেয়ালের মাঝখানে পাঁচ সের ওজনের বড় একটা তালা। তালা খুলে একটা বোতামে চাপ দিল গগল। মাথার ওপর এক সঙ্গে জ্বলে উঠল ডজনখানেক নিয়ন টিউব। দুটো স্টীল টেবিল দেখা গেল; একটা খালি, অপরটা নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্র আর ইকুইপমেন্টে ঢাকা পড়ে আছে।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকল গগল, তাকে পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয় টেবিলের সামনে চলে এল রানা। আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর ওপর প্রথমে একবার চোখ বুলিয়ে নিল ও, তারপর এক এক করে পরীক্ষা করল। প্রথম সেট, পিস্তল। ওর পাশে এসে দাঁড়াল গগল।

ছোট, হালকা আর ফরটি-ফাইভ ক্যালিবার চেয়েছিলে তুমি, বলল সে। বেছে নাও।

বিভিন্ন দেশের তৈরি বারোটা পিস্তল রয়েছে টেবিলে, সাইলেন্সর রয়েছে। কয়েক ধরনের। একটা কোল্ট, উনিশশো এগারো, আর একটা ব্রিটিশ ওয়েবলি, পয়েন্ট থ্রি-টু, হাতে নিল রানা। দ্বিতীয়টা ওকে হাতে নিতে দেখে একটু যেন বিস্মিত হল গগল।

জানি, বলল রানা। সেকেলে। কিন্তু এটার ওপর নির্ভর করা যায়। পিছনের খালি টেবিলে পিস্তল দুটো রাখল ও। এরপর এক জোড়া সাইলেন্সর বাছল, সে দুটোও রাখল পিস্তলের সঙ্গে। প্রতিটার জন্যে পঞ্চাশ রাউণ্ড করে গুলি লাগবে।

ছোট্ট একটা প্যাড আর বল-পয়েন্ট পেন বের করে লিখতে শুরু করল গগল। রানা ওদিকে সাবমেশিনগান পরীক্ষা করছে। চার ধরনের সাবমেশিনগান রয়েছে ইসরায়েলি উজি, ব্রিটিশ স্টার্লিং, ডেনিশ ম্যাডসেন, ইনগ্রাম মডেল টেন। দ্রুত হাতে শেষেরটা তুলে নিল রানা। মেটাল বাট ভাজ করা অবস্থায় রয়েছে, গোটা অস্ত্রটা মাত্র সাড়ে দশ ইঞ্চি লম্বা। সাবমেশিনগান, কিন্তু দেখতে বড় একটা। পিস্তলের মত, ফায়ারিং রেট প্রতি মিনিটে এগারোশো।

আগে ব্যবহার করেছ? জানতে চাইল গগল।

মাথা ঝাঁকাল রানা। এর সবচেয়ে বড় সুবিধে, ছোট। এর জন্যে সাপ্রেসর লাগবে, আছে?

দিন দুয়েকের মধ্যে যোগাড় হয়ে যাবে।

এরপর স্নাইপার রাইফেল। গগলের কালেকশনে রয়েছে এম ফোরটিন এর উন্নত সংস্করণ, সাথে উইভার সাইট। আর রয়েছে ব্রিটিশ এল-ফোর-এ-ওয়ান, সাথে স্ট্যাণ্ডার্ড থারটি টু সাইট। এম ফোরটিন বেছে নিল রানা। বলল, কারট্রিজের স্ট্যাণ্ডার্ড একটা বাক্স আর দুটো স্পেয়ার ম্যাগাজিন।

রকেট লঞ্চারের দিকে সরে এল ওরা। রানা বলল, আর. পি. জি. সেভেন দরকার আমার।

নিঃশব্দে হাসল গগল, বেঁটে আর মোটাসোটা একটা টিউব তুলে নিল হাতে। যোগাড় করতে পারলে লাখ দশেক বিক্রি করতে পারতাম। টিউবের দুই প্রান্ত। ধরে মোচড় দিল সে, মাঝখানে খুলে গেল সেটা। সন্তুষ্ট হয়ে মাথা আঁকাল রানা। চমৎকার, স্ট্রোক ডি। মিসাইলের স্ট্যাণ্ডার্ড প্যাকিং কি রকম?

দুরকম বাক্স, আটটা আর বারোটা ধরে, বলল গগল। লঞ্চারটাকে জোড়া। লাগিয়ে ইনগ্রামের পাশে শুইয়ে রাখল সে।

তাহলে আটটার একটা বাক্স দাও। গ্রেনেডের সামনে এসে দাঁড়াল রানা। ব্রিটিশ ফ্র্যাগমেন্টেশন থারটি সিক্স আর ফসফরাস এইটি সেভেন বেছে নিল ও। গ্রেনেডের প্যাকিং স্ট্যাণ্ডার্ডের চেয়ে ছোট হলে ভাল হয়, এক-একটা বাক্সে গোটা পনেরো ধরলেই চলবে। মোট ত্রিশটা।

ঠিক আছে।

এরপর রানা একটা ডাবল ব্যারেল শটগান তুলল, ব্যারেল আর স্টক ছোট করা হয়েছে। ব্রিচ খুলে আলোর সামনে ধরল ও, পরীক্ষা শেষে বন্ধ করে রেখে। দিল গ্রেনেডগুলোর পাশে। একজোড়া এস. এস. জি.-র বাক্স। প্যাডে লিখে নিল, গগল।

নেড়েচেড়ে দেখে একটা ট্রাইলাক্স নাইট সাইট, খাপে ভরা একটা কমান্ডো নাইফ আর কয়েক ধরনের ওয়েবিং নির্বাচন করল রানা। সবশেষে, টেবিলের শেষ। মাথায় পৌঁছে, গভীর একটা মেটাল ট্রে-র তলা থেকে খুদে আকৃতির কয়েকটা জিনিস তুলে মনোযোগের সাথে পরখ করল।

ওগুলো একেবারে লেটেস্ট, রানার কাঁধের কাছ থেকে বলল গগল। এর আগে বোধহয় দেখনি?

রানার হাতে হোট একটা সার্কুলার টিউব। টিউবের এক প্রান্ত থেকে, সরু একটা সূঁচ আধ ইঞ্চি বেরিয়ে আছে।

এ-ধরনের ডিটোনেটর ব্যবহার করেছি, বলল রানা। কিন্তু টাইমারটা এই প্রথম দেখছি।

আরেকটা মেটাল টিউব তুলে নিল গগল। এটার এক জোড়া কাঁটা রয়েছে, ইলেকট্রিক প্লাগের মত। স্কু খুলে রানাকে ক্যাডমিয়াম সেল ব্যাটারি, আর দুটো ডায়াল দেখাল. সে। তরপের ডিটোনেটরে টাইমারের প্রাগ ঢুকিয়ে দিল। জোড়া লাগানো জিনিসটা মাত্র দুইঞ্চি লম্বা, আর ডায়ামিটারে পৌনে এক ইঞ্চি। ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে বলল সে, ইলেকট্রনিক্সের বদৌলতে এ-সব একেবারে পানির মত সহজ হয়ে গেছে। রেমারিক এক কিলো প্লাস্টিক-এর কথা বলেছিল। যোগাড় হয়েছে, কিন্তু রেখেছি আরেক জায়গায়।

গুড, বলল রানা। ঘাড় ফিরিয়ে দ্বিতীয় টেবিলের দিকে তাকাল ও। আর দরকার নেই আমার।

টেবিলের দিকে গগলও তাকাল। বন্ধুর চাহিদা মেটাতে পেরে সে তৃপ্ত।

ওয়েবলির জন্যে হালকা একটা শোল্ডার-হোলস্টার দিতে পারবে? জিজ্ঞেস করল রানা। আর কোল্টের জন্যে একটা বেল্ট হোলস্টার?

পারব, বলল গগল। কোল্টের জন্যে স্ট্যাণ্ডার্ড ইস্যু ক্যানভাস।

চলবে। একটা টেপ মেজার আর নোট বুক বের করল রানা। স্কেল আছে?

আছে, বলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল গগল। টেপ মেজার নিয়ে কাজ শুরু করল রানা।

.

রোড ম্যাপে চোখ রেখে ড্রাইভারকে বলল রানা, রুসেন্ট অনুরির মোড়ে নামবে ও। হোটেলে গিয়ে কাপড় বদলে এসেছে, পরনে এখন ডেনিম জিনস আর শার্ট। শহরের মাঝখান দিয়ে পুব দিকে যাচ্ছে ট্যাক্সি। মার্সেলেসকে একটা কারণে ওর। পছন্দ, রাস্তাঘাট লোকে লোকারণ্য-যে-কোন লোক পরিচয় গোপন করে এই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। এই শহরের লোকেরা নিজেদের চরকায় তেল। দিতে পছন্দ করে, কারও সাতে-পাচে নেই। আর্মস আর ড্রাগস স্মাগলারদের জন্যে এটা একটা আদর্শ শহর।

পেভমেন্টের পাশে থামল ট্যাক্সি, ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নামল রানা। বাঁক নিয়ে দশ মিনিট হাঁটল ও, পৌঁছে গেল রু কাটিনাট-এর মোড়ে। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রাস্তাটা ভাল করে দেখে নিল ও।

শহরের বাইরে, শ্রমিকদের আবাসিক এলাকা। রাস্তার দুপাশে পাঁচ-সাত তলা। বিল্ডিং, নিচে ছোটখাট ওয়র্কশপ, কারখানা আর গ্যারেজ। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল রানা। দশ মিনিট পর তালা দেয়া একটা গ্যারেজের সামনে থামল ও, দুপাশে আরও কয়েকটা করে গ্যারেজ রয়েছে, সবগুলো বন্ধ। গ্যারেজের দরজায় লেখা নাম্বারটা দেখল-দশ। কোন দিকে না তাকিয়ে চাবি বের করল ও, তালা। খুলে ভেতরে ঢুকল। আলো না জ্বেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, কিন্তু কোন শব্দ পেল না।

আলো জ্বালার পর দেখল, গ্যারেজের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে এক টয়োটা ভ্যান। গাঢ় খয়েরি রঙ করা, এক পাশে বড় বড় অক্ষরে লেখাটা ঝাপসা হয়ে গেছে বিনো গারবান্ডি, ভেজিটেবল ডিলার।

পুরানো আর তোবড়ানো হলেও রানা জানে, ভ্যানের এঞ্জিন আর, সাসপেনশনে কোন খুঁত নেই। পিছনের দরজা খুলল ও। সামনেই ভ্যানের। মেঝেতে রয়েছে ইলেকট্রিক্যাল কর্ডের একটা কয়েল, প্রাগ সহ। আপন মনে একটু হাসল ও, বুদ্ধি করে আলোর ব্যবস্থাও করে রেখেছে রেমারিক। ভ্যানে চড়ল রানা, প্রাগটা তুলে নিয়ে দেয়ালের গায়ে ফিট করা সকেটে ঢোকাল। বাবটা জ্বলে উঠে আলোকিত করে তুলল বাকি সব জিনিস। লম্বা সাইজের কিছু কাঠ, তুলো ভরা। কয়েকটা বস্তা, ফেল্টের লম্বা একটা রোল, কাঠের একটা বেঞ্চ আর একটা টুলবক্স।

এক এক করে ভ্যান থেকে সব নামাল রানা। তারপর কমপার্টমেন্টের সামনে। এসে প্যানেলিংটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল, এই প্যানেলিং-ই ড্রাইভারের সিটের পিঠ হিসেবে কাজ করছে। টুলবক্স থেকে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে এল ও, প্যানেলের রঙ নাচটিয়ে গর্তে লুকিয়ে থাকা বারোটা ভ্রু খুলল। আস্তে করে খসে পড়ল ফলস। প্যানেল, সামনে দেখা গেল এক ফুট গভীর আর লম্বা-চওড়ায় কমপার্টমেন্টের। সমান একটা ফাঁকা জায়গা। গুড, বিড়বিড় করে বলল রানা, প্যানেলটা ভ্যান। থেকে নামিয়ে গ্যারেজের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখল। এরপর টেপ মেজার আর নোটবুক বের করে চোরা-কুঠরির নিখুঁত মাপ নিল ও।

আগে নোট করা মাপজোখের সঙ্গে চোরা কুঠরির মাপ মিলিয়ে দ্রুত হাতে একটা নক্সা আঁকল রানা, গ্যারেজের দরজায় সেঁটে দিল সেটা। পরবর্তী দুঘন্টা কোন বিরতি ছাড়াই কাজ করে গেল ও। টেপ মেজার দিয়ে মাপ নিল, তারপর ছোট একটা পাওয়ার স দিয়ে কাটল কাঠগুলো।

কাজটা উপভোগই করছিল রানা, কিন্তু বন্ধ গ্যারেজের ভেতর গুমোট হয়ে উঠল পরিবেশ। বাইরে ইতিমধ্যেই অন্ধকার নেমেছে, খোলা বাতাসে দশ মিনিট হেঁটে ছোট একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকল ডিনার খাবে বলে।

পরদিন সকাল আটটায় গ্যারেজে ফিরে এল ও, কাজ করল দুপুর পর্যন্ত। সেই ছোট রেস্তোরাঁতেই লাঞ্চ সারল, ওর মত একই ধরনের নোংরা কাপড় পরে আরও অনেকে খেতে এসেছে।

বিকেল নাগাদ কাজটা শেষ করল রানা। কাঠের একটা ভারি ফ্রেম তৈরি করেছে ও, চোরা কুঠরিতে সেটা ঢুকিয়ে দেয়া হল। ফ্রেমের গায়ে অনেকগুলো ঘর। রয়েছে, আলগা কাঠের টুকরোগুলো বসে গেল খাপে খাপে। পিছিয়ে এসে হাতের কাজটা খুঁটিয়ে দেখল ও। বাচ্চাদের খেলনা, অসমাপ্ত একটা গোলকধাঁধার মত দেখাল কমপার্টমেন্টটাকে। খোপগুলো বৃহস্পতিবারে ভরবে ও।

.

বৃহস্পতিবার।

একজন গার্ডকে সাথে নিয়ে অপেক্ষা করছে গগল। রাস্তায় আর কেউ নেই। রাত দশটা পাঁচে গাঢ় নীল রঙের একটা ভ্যান বাঁক নিয়ে এগিয়ে এল, থামল একশো মিটার দূরে। হেডলাইটের আলো দুবার জ্বলে উঠে নিভে গেল, আর জ্বলল না।

ওই মোড়ে গিয়ে অপেক্ষা কর, গার্ডকে বলল গগল। ভ্যান চলে গেলে তবে ফিরবে। অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল গার্ড, এবার ভ্যানটা এগিয়ে আসতে শুরু করল।

সব ঠিক? ক্যাব থেকে লাফ দিয়ে নামল রানা।

ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকিয়ে ওয়্যারহাউসের তালা খুলল গগল। দরজার কাছেই। একটা ফর্ক লিফটের ওপর তিনটে কাঠের প্যাকিং কেস রয়েছে–এ. বি. আর. সি. লেখা। এক এক করে তিনটের দিকেই আঙুল তাক করল গগল। অ্যামুনিশন, উইপনস, আদার ইকুইপমেন্টস। দুমিনিটের মধ্যে বাক্সগুলো ভ্যানে তোলা হল, রানাও উঠে বসল ক্যাবে।

মুখ তুলে রানার দিকে তাকাল গগল। কাল বিকেলে আমার অফিসে এসে কাগজ-পত্রগুলো নিয়ে যেয়ো।

ঠিক আছে, বলে ভ্যান ছেড়ে দিল রানা।

শহরের ভেতর চল্লিশ মিনিট ভ্যান নিয়ে ঘুরল ও বারবার স্পীড কমাল আর বাড়াল, অপ্রত্যাশিতভাবে বাঁক নিল কয়েকবার। না, কেউ ওর পিছু নেয়নি। রু কাটিনাটে পৌঁছে গ্যারেজটাকে পাশ কাটাল রানা, আরও পঞ্চাশ মিটার এগিয়ে। তারপর থামল। এঞ্জিন বন্ধ করল ও, আলো নেভাল, চুপচাপ আধ ঘন্টা বসে থাকল ড্রাইভিং সিটে–তীক্ষ্ণচোখে চারদিকটা দেখছে, কান দুটো সজাগ। এরপর স্টার্ট। দিয়ে পিছিয়ে আনল ভ্যান, দাঁড় করাল গ্যারেজের দরজার সামনে। বাক্সগুলো। গ্যারেজে রেখে তালা দিল দরজায়, ভ্যান নিয়ে রওনা হল হোটেলের দিকে। ধীর। গতিতে ভ্যান চালাল ও, একটা চোখ থাকল রিয়ার ভিউ মিররে।

সকালে ভাড়া করা ভ্যানটা ফেরত দিয়ে গ্যারেজে চলে এল রানা। বাক্স তিনটে খুলল ও। এক এক করে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ আর গ্রেনেড বের করে। যার যার বরাদ্দ করা জায়গায় খাপে খাপে বসিয়ে দিল। ফ্রেম আর ইকুইপমেন্টের মাঝখানে যেখানে যত ফাঁক-ফোকর দেখল, সব তুলো দিয়ে ভরল ও। এরপর গোটা ফ্রেমের সামনে ফেল্টের একটা পর্দা ঝুলিয়ে দিল। ফলস্ প্যানেলটা ভ্যানে। তুলল ও, জায়গামত বসিয়ে এক এক করে এটে দিল বারোটা স্কু। কাজ সেরে প্যানেলের গায়ে কয়েক বার ঘুসি মারল ও। ফাপা নয়, নিরেট আওয়াজ হল। সন্তুষ্ট এবার রানা। ওর অস্ত্রের বাহন এখন তৈরি।

.

রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দোল খাচ্ছিল গুগল, ভেতরে ঢুকল রানা। ওকে দেখে সিধে হয়ে বসল গগল, চোখ-ইশারায় সামনের একটা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল। কফি?

না।

গগল আর দ্বিতীয়বার সাধল না। ডেস্ক থেকে একটা এনভেলাপ তুলে বাড়িয়ে দিল রানার দিকে। কাগজগুলো অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করল রানা। তারপর মুখ তুলে বলল, খুবই ভাল হাতের কাজ।

গগলের ঠোঁটে ক্ষীণ একটু তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। খানিক ইতস্তত করে জানতে চাইল সে, তোমার আর কি কাজে লাগতে পারি আমি?

মাথা নাড়ল রানা। আর কিছুর দরকার নেই আমার। ভাল কথা, এই পাসপোর্ট আর কাগজগুলোর ব্যাপারে রেমারিকও যেন কিছু না জানে।

এবার সরাসরি প্রশ্ন করল গগল, মস্ত বড় একটা ঝুঁকি নিতে যাচ্ছ তুমি, কিন্তু কারও সাহায্য চাইছ না কেন?

চাইছি না মানে? রেমারিক আর তুমি সাহায্য করছ না?

আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছ তুমি, বলল গগল। এসব যোগান দেয়ার মধ্যে কোন বিপদ নেই। আমি বলতে চাইছি।

চেয়ার ছেড়ে উঠল রানা। এ আমার একার যুদ্ধ, গগল।

দুই বন্ধু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মাথা ঝাঁকাল গগল। রানা কি বলতে চায় উপলব্ধি করেছে সে।

বিদায়ের মুহূর্তে করমর্দনের জন্যে হাত বাড়াল গগল, রানাও তাকে ধন্যবাদ জানাল না। উপকার, উপকারের বিনিময়ে উপকার, এরই ওপর ভিত্তি করে ওদের বন্ধুত্ব। পরস্পরকে ওরা শ্রদ্ধা করে, কেউ কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলায় না। অদ্ভুত একটা সম্পর্ক, কিন্তু এমনই মজবুত যে ভেঙে যাবার নয়।

.

০৪.
চোখে বিনকিউলার নিয়ে বোর্ডিং হাউসের টেরেসে দাঁড়িয়ে আছে রেমারিক। নীল আর সাদা রঙের ফেরি ডকে ভিড়ল। জাল কাগজ-পত্রের ওপর আস্থা আছে। রেমারিকের, কিন্তু মার্সেলেস থেকে আসা গাড়িগুলো প্রায়ই তন্ন তন্ন করে সার্চ করা। হয়।

তিনটে লাইন ধরে ফেরি থেকে নামতে শুরু করল গাড়ি। একটা লাইনে কয়েকটা ট্রাক আর একটা কন্টেইনার-ট্রেলর দেখা গেল। তারপর খয়েরি রঙের ভ্যানটা। ক্যাব থেকে রানাকে নামতে দেখল, রেমারিক। ভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল রানা, চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব। ওর পরনে ডেনিম ওভারঅল, হাতে একটা বড় ম্যানিলা এনভেলাপ। অলস ভঙ্গিতে পায়ে বাড়ি মারছে এনভেলাপটা দিয়ে।

বিশ মিনিট পর রানার সামনে একজন কাস্টমস অফিসার এসে দাঁড়াল। ইতিমধ্যে টেরেসে রেমারিকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ফুরেলা।

উনি পৌচেছেন? জানতে চাইল সে।

হ্যাঁ, ডকের দিক থেকে চোখ না সরিয়ে জবাব দিল রেমারিক।

রানার কাগজ-পত্র খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল অফিসার, তারপর ভ্যানের পিছন দিকে হেঁটে এল। ভ্যানের দরজা খুলে দিল রানা, ওর হাতে এনভেলাপটা ফিরিয়ে দিয়ে ভ্যানে চড়ল অফিসার।

রেমারিকের মনে হল অনন্তকাল ধরে ভ্যানের ভেতর রয়েছে অফিসার। তারপর এক সময় বেরিয়ে এল সে, দুহাত দিয়ে কি যেন একটা বুকের কাছে ধরে রয়েছে। শিউরে উঠল রেমারিক, ভাল করে দেখার জন্যে কাঁপা হাতে বিনকিউলারটা অ্যাডজাস্ট করল। এবার অফিসারের হাতে ধরা জিনিসটা চিনতে পারল। সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলল সে।

কি ওটা? জানতে চাইল ফুরেলা।

তরমুজ-বেজন্মা শালা একটা তরমুজ চায়!

হেসে ফেলল ফুরেলা।

খয়েরি ভ্যান সিকিউরিটি গেটের দিকে এগোল। গেটে মুহূর্ত কয়েকের জন্যে থামল মাত্র, তারপরই রাস্তায় উঠে এল রানা। চোখ থেকে বিনকিউলার নামিয়ে হাতঘড়ি দেখল রেমারিক। এক ঘন্টার মধ্যে ফোন করবে ও। লাঞ্চ খেতে বেরিয়ে যাব আমি–এদিকটা তুমি সামলাতে পারবে তো?

পারব, বলল ফুরেলা। ওঁকে আপনি আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।

.

হাতে একটা ক্যানভাস ব্যাগ নিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকল রেমারিক। ভেতরে ঢুকেই দাঁড়িয়ে পড়ল ও, রোদ থেকে এসে অল্প আলোয় ভাল দেখতে পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে প্রসারিত হল দৃষ্টিসীমা, খদ্দের বলতে একমাত্র রানাকেই এক কোণে একটা। টেবিলে বসে থাকতে দেখল সে। বারোটাই বাজেনি এখনও, নেপলসের লোকেরা। এত তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খায় না।

দুই বন্ধু পরস্পরকে আলিঙ্গন করল। রানাকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল রেমারিক, ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, গোজো তোমার বয়স কমিয়ে দিয়েছে দশ বছর।

মৃদু হাসল রানা। ওরা সবাই তোমাকে ভালবাসা জানিয়েছে।

বসল ওরা। ওয়েটারকে ডেকে হালকা লাঞ্চের অর্ডার দিল রানা।

ওয়েটার সরে যেতে রেমারিক জিজ্ঞেস করল, মার্সেলেসে কোন অসুবিধে হয়নি তো?

না।

ভায়োলা কেমন আছে?

মৃদু হাসল রানা। ভাল। বলেছে, কাজ শেষ করে ফিরতে হবে ওর কাছে।

মুচকি একটু হেসে অন্য প্রসঙ্গে চলে এল রেমারিক। ফুরেলাকে আমি মার্সেলেসে পাঠিয়েছিলাম। বেশিরভাগ লেগওঅর্ক ওকে দিয়েই করিয়েছি, রোম। আর মিলানোও গিয়েছিল ও।

ও খুব কাজের ছেলে, মন্তব্য করল রানা।

ওয়েটার লাঞ্চ দিয়ে গেল।

খেতে শুরু করে রানা বলল, ফুরেলার বিপদ হতে পারে।

জানি, বলল রেমারিক। তুমি শুরু করলেই ওকে আমি গোজোয় পাঠিয়ে দেব। গোটা ব্যাপারটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকবে ও।

গুড, বলল রানা। ওকে ছাড়া ম্যানেজ করতে পারবে তো?

প্রেজো ফিসো বন্ধ করে দিচ্ছি,বলল রেমারিক। শুধু যারা রেগুলার, তাদের জন্যে লাঞ্চ আর ডিনারের ব্যবস্থা থাকবে। ক্যানভাস ব্যাগ খুলে পাঁচ গোছ চাবি বের করল সে, সাথে একটা রোড ম্যাপ, আর একটা ফোল্ডার। চাবির গোছাগুলো রানার দিকে বাড়িয়ে দিল, প্রতিটির সঙ্গে একটা করে ট্যাগ আছে। বলল, মিলানের অ্যাপার্টমেন্ট, ভাইজেনটিনোয় কটেজ, একটা আলফেটা জি. টি., রোমে অ্যাপার্টমেন্ট, আর রোমে একটা রেনল্ট টোয়েন্টি।

চাবি নিয়ে হাসল রানা। আমার দেখছি প্রচুর সম্পত্তি!

ভাড়া করা, জবাব দিল রেমারিক। এগুলো সবই তিন মাসের জন্যে ভাড়া নেয়া হয়েছে, মাস শুরু হয়েছে দশ দিন আগে।

খোঁজাখুঁজি শুরু হলে তোমার নাম বেরিয়ে আসবে না তো?

মাথা নাড়ল রেমারিক। অসম্ভব। অ্যাপার্টমেন্ট দুটো আর কটেজটা ব্রাসেলসের একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাড়া করেছে। আর গাড়ি দুটো ভাড়া নিয়েছে বিনো গারবান্ডি।

আচ্ছা, বিনো কি…?

প্রেমিকাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বেড়াতে গেছে সে, ফিরতে মাস কয়েক দেরি হবে। রোড ম্যাপ খুলে কালো কালি দিয়ে আঁকা দুটো বৃত্ত দেখাল রেমারিক। মিলানের অ্যাপার্টমেন্ট, আর এটা এখানে বাংলোটা। এরপর এক এক করে। গ্যারেজ, রোমের অ্যাপার্টমেন্ট, আরেকটা গ্যারেজ, সব দেখিয়ে দিল রানাকে। অ্যাপার্টমেন্ট আর বাংলোয় টিনের খাবার পাবে। ফোল্ডারে টোকা দিল সে। এতে সবগুলোর ঠিকানা আছে।

ভেরি গুড, সন্তুষ্ট হয়ে বলল রানা। চার্জার?

মুচকি একটু হেসে ব্যাগের ভেতর থেকে চকচকে দুটো সিলিণ্ডার বের করল রেমারিক। একটা হাতে নিয়ে সাবধানে পরীক্ষা করল রানা।

জিনিসটা অ্যানোডাইজড অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। সাড়ে তিন ইঞ্চির মত লম্বা, ডায়ামিটারে পৌনে এক ইঞ্চি, প্রান্ত দুটো ঢালু। দুদিক ধরে ঘোরাতেই মাঝখানে। খুলে গেল সিলিণ্ডারটা। গর্ত দুটো দেখল রানা, বাইরের মত ভেতরের দিকও মসৃণ।

এগুলো আমি লোকাল মেশিনশপে তৈরি করিয়েছি, বলল রেমারিক। সিলিণ্ডার দুটো ব্যাগে ভরল সে। এগুলো সাধারণত আরেকটু বড় হয়–নিশ্চয়ই। কষ্টকর, আমার ধারণা।

ক্ষীণ একটু হাসি দেখা গেল রানার ঠোঁটে যত খুশি আপত্তি জানাতে পারে ব্যাটা, আমিও সহানুভূতি জানাব।

ফোল্ডার ছাড়া বাকি সব ব্যাগে ভরে রাখল রেমারিক। আমার রেস্তোরাঁয় এক লোক খেতে আসে, নাম ডেরিক। সিসিলিতে ডন বাকালার হয়ে কাজ করেছে এককালে। সারাক্ষণ বক বক করে লোকটা, দুনিয়ার সব ব্যাপারে তার অভিযোগ। সিসিলির গল্প করতে ভালবাসে।

আমার সম্পর্কে কিছু জানে?

মাথা নাড়ল রেমারিক। কিছুই জানে না। আসল কথা, ডন বাকালার ওপর ভারি চটা সে, ডন নাকি তার ওপর অন্যায় করেছে। ভিলা কোলাসি আর, ওখানের। সেট আপ সম্পর্কে কোন প্রশ্ন না করেই তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পেরেছি, লিখে এই ফোল্ডারে ভরে রেখেছি–তোমার কাজে লাগবে।

ফোল্ডার খুলে দেখল রানা। ভিলার একটা স্কেচ ম্যাপ রয়েছে, আর কয়েক পাতা নোট। মুখ তুলল ও, বলল, চমৎকার, আমার অনেক খাটনি কমিয়ে দিলে।

ওয়েটারকে ডেকে কফি দিতে বলল রেমারিক। ওয়েটার চলে যেতে বলল, ভিলা কোলাসিতে ঢোকা খুব কঠিন হবে তোমার জন্যে। গড ফাদার ডিলা থেকে বেরোয় না বললেই চলে।

রানা হাসল। যখন জানবে সে-ও টার্গেট, একেবারেই বেরুবে না।

কিভাবে ঢুকবে, কোন বুদ্ধি পেয়েছ?

কয়েকটা উপায়ের কথা ভেবে রেখেছি, বলল রানা। কোনটা বেছে নেব। সেটা নির্ভর করে আর কি তথ্য পাই তার ওপর। আসলে ভিলা কোলাসিতে কিভাবে ঢুকবে রানা, ঠিক করা হয়ে গেছে। তিন মাস আগে পালার্মোয় গিয়েছিল ও, তখনই বুদ্ধিটা আসে মাথায়। ব্যাপারটা নিয়ে রেমারিকের সঙ্গে আলোচনা না করার একটা কারণ আছে।

কফি এল, কাপে চুমুক দিয়ে প্রসঙ্গে ফিরে এল রানা। রোমে আতুনি। বেরলিংগারের পর, আমি সম্পূর্ণ একা মুভ করব। কারও সঙ্গে কোন যোগাযোগ বা নির্দিষ্ট কোন ঘাঁটি থাকবে না। ততদিনে গাড়ি দুটো আর ভ্যানটা আমার কাছে থাকবে না–কেন বুঝতে পারছ তো?

মাথা ঝাঁকাল রেমারিক। কারণ ততদিনে পুলিস আর ডন বাকালা হিসেব। কষে বের করে ফেলবে কাজগুলো কার। তোমাকে চিনলে আমাকেও চিনতে সময়। লাগবে না। ওরা আমাকে জেরা করতে আসবে, কিন্তু আমি যা জানি না তা। ওদেরকে বলব কিভাবে?

রানা গম্ভীর হল। তুমি না জানলে, ওরাও বুঝতে পারবে তুমি জান না। কাজেই এদিক থেকে তুমি নিরাপদে থাকছ। ইতিমধ্যে আমি যদি যোগাযোগ। করতে চাই, কিভাবে করব? ফোন ব্যবহার করতে চাই না।

ফোল্ডারটা দেখাল রেমারিক। সামনের পৃষ্ঠায়। নেপলস পোস্ট অফিসের একটা নাম্বার আছে–ফোন নাম্বার আর সময় জানিয়ে একটা তার পাঠিয়ে দিয়ো, বাইরে কোথাও থেকে ডায়াল করব আমি।

ফোল্ডার খুলে পোস্ট বক্স নাম্বারটা পড়ল রানা। ঠিক আছে। সব যদি ভালভাবে এগোয়, কোন যোগাযোগই আমি করব না–পুরো কাজ শেষ না হওয়া। পর্যন্ত।

এরপর অনেকক্ষণ ওরা কেউ কথা বলল না।

রেমারিক এক সময় জিজ্ঞেস করল, কবে শুরু করছ?

সামনের দিকে ঝুঁকল রানা। নিচু গলায় জানাল।

আজই মিলানে যাবে রানা। কাল খুব সকালে বাংলোয় পৌঁছুবে ও। অগাস্টিন আর এলি প্রথম শিকার, কিন্তু ওদের শুধু একজনের সঙ্গে কথা বলার দরকার হবে। রানার–সম্ভবত অগাস্টিনের সঙ্গে। দেখে তো মনে হয় পেশীসর্বস্ব একটা মূর্খ, এলির চেয়ে ওকেই সহজে ভাঙা যাবে। দুএকদিন নজর রাখবে রানা, তারপর একদিন তুলে নিয়ে আসবে।

ফোল্ডারটা টেবিল থেকে তুলে ব্যাগে ভরল রেমারিক। বলল, তুমি আগে বেরিয়ে যাও।

দাঁড়াল রানা। ফুরেলাকে আমার ধন্যবাদ দিয়ো।

দেব, বলল রেমারিক। ও তোমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।

দাঁড়াল রেমারিক। ওর কাঁধে হাত রাখল রানা, চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ব্যাগটা নিয়ে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গেল।

.

০৫.
কাজের মধ্যে রয়েছে গিয়াকোমো অগাস্টিন। কাজটা মোটেও কষ্টকর কিছু না। গত দুঘন্টা ধরে এক এক করে পুব মিলানের অনেকগুলো বারে ঢুকেছে সে, বেরিয়ে এসেছে দুএক মিনিট পর, প্রতিবার আরও ভারি হয়েছে হাতের লেদার ব্যাগটা। আজ বৃহস্পতিবার, আর বৃহস্পতিবার মানেই তার বসের টাকা জমা নেয়ার দিন।

ষাড় আকৃতির শরীরে ঘোড়া আকৃতির মুখ, স্বভাবটা গোঁয়ার-গোবিন্দ গণ্ডারের মত। একটু রাগ হলেই হাত চালিয়ে দেয়, লোকজনকে পিটিয়ে আনন্দ পায় সে। এই কাজের জন্যে উপযুক্ত লোক সে, কাজটা করেও নিখুঁতভাবে। তবে, একটু ধীরগতি; আর সব সময় একই রুটিন ধরে করে কাজটা।

মাঝরাতের দিকে বারগুলো থেকে টাকা আদায় শেষ করল অগাস্টিন। এবার ক্লাবগুলো ধরতে হবে। ঢিলে একটা জ্যাকেট পরে আছে সে, ফলে প্রকাণ্ড ধড় আরও বড় দেখাচ্ছে। জ্যাকেটের ভেতর, বগলের নিচে, শোল্ডার হোলস্টারে একটা বেরেটা পিস্তল রয়েছে। লেদার ব্যাগটা লম্বা, চেইন টেনে বন্ধ করা, এরই মধ্যে ভরে গেছে অর্ধেক।

পিসমেকার নাইটক্লাবের সামনে, নো, পার্কিং জোনে ল্যানসিয়া থামাল অগাস্টিন। নড়েচড়ে ওঠায় দুলতে শুরু করল গাড়ি, নেমে পেভমেন্টে দাঁড়াল সে। এই গাড়ি নিয়ে তার ভারি গর্ব। রঙটা মেটালিক সিলভার, স্টিরিও আছে, আছে মিউজিক্যাল হর্ন। ব্যাক-সিটের পিছনে, কার্নিসে বসে আছে একটা খেলনা পুতুল, গাড়ি আঁকি খেলে পুতুলের মাথা ওঠা-নামা করে, মনে হয় ঘন ঘন উঁকি দিয়ে পিছনের রাস্তা দেখছে। প্রিয় বান্ধবীর দেয়া উপহার।

এত দামি একটা গাড়ি, গাড়িটার ওপর তার এত দুর্বলতা, তবু দরজায় তালা দেয়ার বা ইগনিশন থেকে চাবি সরাবার গরজ নেই অগাস্টিনের। মিলানের প্রতিটি চোর-ছ্যাচড় জানে কে এই গাড়ির মালিক, জানে কেউ ছুঁলে তার আর রক্ষে নেই।

শিস দেয়া বন্ধ করে ক্লাবে ঢুকল অগাস্টিন, গলাটা সত্যি শুকিয়ে গেছে। কাজে বেরিয়ে সব সময় এই ক্লাবেই প্রথমবার গলা ভেজায় সে। ক্লাবের মালিক তাকে দেখেই বারটেণ্ডারের উদ্দেশে দ্রুত মাথা ঝাঁকাল। অগাস্টিন বারের সামনে পৌঁছুবার আগেই বারটেণ্ডার তার জন্যে কাউন্টারে আধ গ্লাস স্কচ হুইস্কি রাখল। গ্লাসে আয়েশ করে চুমুক দিল অগাস্টিন, ঠাণ্ডা চোখে এদিকে ওদিক তাকাল।

পিয়ানোর মৃদু শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কয়েক জোড়া নারী-পুরুষ ধীর লয়ে নাচছে। পুরুষরা প্রায় সবাই মধ্য-বয়স্ক, ব্যবসায়ী; মেয়েগুলো হয় তাদের সেক্রেটারি, নয়ত গোপন প্রেমিকা–কারুরই বয়স পঁচিশের বেশি নয়। অত্যন্ত দামি ক্লাব এটা, শুধু ধনীলোকদের জন্যে। সুন্দরী কলগার্লরাও খদ্দের ধরার জন্যে আসে এখানে।

পাউডার রূম থেকে একটা মেয়েকে বেরিয়ে আসতে দেখল অগাস্টিন। বেশ লম্বা, মাথায় সোনালি চুল, খালি একটা টেবিলে বসে শ্যাম্পেনের গ্লাসে ছোট্ট করে। চুমুক দিল। ছোট করে কাটা ব্লাউজ, ব্রা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে স্তন। মেয়েটাকে আগে কখনও দেখেনি অগাস্টিন। ঠিক করল, কাল বিকেলে ওর সঙ্গে শোবে সে।

গ্লাসে শেষ চুমুক দিল অগাস্টিন, এক তাড়া নোট নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল ক্লাব-মালিক। তাড়াটা নিয়ে নোটগুলো গুনল অগাস্টিন, ব্যাগ খুলে টাকা রাখল ভেতরে, চেইন টেনে বন্ধ করে দিল ব্যাগ। মুখ তুলে টেবিলে বসা সুন্দরী। মেয়েটার দিকে চিবুক তাক করল সে, তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ক্লাব-মালিকও মেয়েটার দিকে তাকাল।

খাসা জিনিস! নতুন, না?

হ্যা..মানে…জ্বী!

আমার ওখানে পাঠিয়ে দিয়ো। কাল বিকেল তিনটের সময়। মনে থাকবে?

বিনয়ে বিগলিত হয়ে গেল ক্লাব মালিক। সিনর!

পেভমেন্টে বেরিয়ে এসে তাজা বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিল অগাস্টিন, ল্যানসিয়ার দিকে এগোল। আরও একটু বেশি আলো থাকলে, কিংবা আরও যদি একটু সতর্ক থাকত সে, দেখতে পেত পুতুলের মাথাটা একটু একটু দুলছে।

গাড়িতে উঠে বসল অগাস্টিন, হাত বাড়াল ইগনিশনের দিকে। হঠাৎ ঘাড়ে শীতল ধাতব স্পর্শ পেয়ে স্থির হয়ে গেল হাতটা। ঠাণ্ডা একটা কণ্ঠস্বর শুনল সে, নোভড়া না!

ভয় নয়, রাগও নয়, কৌতুক মেশানো বিস্ময় বোধ করল গিয়াকোমো অগাস্টিন। তুমি জান আমি কে?

গিয়াকোমো অগাস্টিন। আর যদি একটাও কথা বল, ওটাই তোমার শেষ কথা হবে।

একটা হাত পিছন থেকে এগিয়ে এসে তার বা বগলের তলায় সেঁধিয়ে গেল, হোলস্টার থেকে বের করে নিল পিস্তলটা। একেবারে পাথর হয়ে গেছে অগাস্টিন, এতক্ষণে, ভয় পেয়েছে। পিছনের লোকটা তার পরিচয় জানে, টাকা ভরা ব্যাগটা সে নিতে আসেনি। উদ্দেশ্য ডাকাতি নয়। হয়ত গামবেরি গ্রুপের সঙ্গে গোলমাল। বেধেছে।

ভাবনা-চিন্তায় বাধা পড়ল। শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর শোনা গেল আবার, এঞ্জিন স্টার্ট দাও, আস্তে আস্তে গাড়ি চালাবে। কারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা কোরো। কখন কোন দিকে যেতে হবে আমি বলব। কোন রকম চালাকি করতে গেলে সাথে সাথে মারা যাবে।

খুব সাবধানে গাড়ি চালাল অগাস্টিন। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করে দিয়েছে, এ লোক মিথ্যে হুমকি দিচ্ছে না। নির্দেশ পেয়ে দক্ষিণ দিকে গাড়ি চালাল সে, শহর ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে চলে এল। ধাক্কাটা সামলে নিয়েছে সে, দ্রুত চিন্তা ভাবনা চলছে মাথায়। এলাকার দখল নিয়ে যুদ্ধ বেধে থাকলে এতক্ষণে মারা যেত। সে, হয় ক্লাবের ঠিক বাইরে, নাহয় এইমাত্র পেরিয়ে আসা নির্জন শহরতলির কোথাও। গলার আওয়াজটা তাকে বিমূঢ় করে তুলেছে। ক্ষীণ একটু নিয়াপলিটান সুর আছে, আরও কি যেন আছে অথচ ধরতে পারছে না সে। আন্দাজ করল, লোকটা ইটালিয়ান নয়। তার চিন্তা নতুন খাতে বইতে শুরু করল। মাস কয়েক আগে তার বস, হিনো ফনটেলার সঙ্গে ইউনিয়ন কর্স-এর একটা গ্রুপের বিবাদ। বেধেছিল। মার্সেলেসের ওই গ্রুপের অভিযোগ ছিল, ড্রাগ শিপমেন্টে ফনটেলা নাকি কারচুপি করেছে। ওদের অভিযোগ কানে তোলেনি ফনটেলা, হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। ওরা হয়ত হুমকি গ্রাহ্য করার বান্দা নয়। এতদিনে হয়ত তৈরি হয়েছে, এবার একহাত দেখাতে চায়। কিন্তু নিয়াপলিটান সুর কেন তাহলে?

আর অল্প দূরেই ভাইজেনটিনো! ওখানে পৌঁছবার আগেই একটা সাইড রোড ধরার নির্দেশ এল। এরপর মেঠো পথ। গাড়ি থেকে ওরা যখন নামবে, একটা ঝুঁকি নেয়া যায় কিনা দেখবে অগাস্টিন। তখন ওর ঘাড়ের ওপর পিস্তল থাকবে না। লোকটা কি জানে, তার এই বিশাল শরীরেও প্রয়োজনে বিদ্যুৎগতি খেলে যায়?

হেডলাইটের আলোয় নিচু একটা বাংলো দেখা গেল। এ-ধরনের সৌখিন কটেজ সাধারণত মিলানিজরা তৈরি করে, ছুটিছাটাতে এর্সে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে বলে। নির্দেশ পেয়ে বাংলোর পিছন দিকে গাড়ি নিয়ে এল অগাস্টিন। চাকার নিচে কাকর পেষার আওয়াজ।

থাম এখানে। হ্যাণ্ডব্রেক দাও। ইগনিশন অফ কর।

সামনের দিকে ঝুঁকল অগাস্টিন, ঠাণ্ডা পিস্তল তবুও ঘাড়ে লেগে থাকল। ধীরে ধীরে সিটে হেলান দিল সে। হঠাৎ করেই ঘাড়ের ওপর থেকে সরে গেল চাপটা। তার পেশীতে টান পড়ল, পরমুহূর্তে বিস্ফোরিত হল তার দৃষ্টি।

.

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল তার, মাথার পিছনে ব্যথা, দপ দপ করছে। ব্যথার জায়গাটা হাত দিয়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করল সে, কিন্তু হাতটা নাড়তে পারল না। তার চিবুক বুকে ঠেকে আছে, দৃষ্টি পরিষ্কার হতে দেখল, বাঁ হাতটা চেয়ারের হাতার সঙ্গে টেপ দিয়ে আটকানো। অনেক কষ্টে মাথাটা ডান দিকে ফেরাল সে, একইভাবে টেপ দিয়ে আটকানো ডান হাতটাও। সারা শরীর একটা ঝাঁকি খেল, এক নিমেষে সব কথা মনে পড়ে গেছে। সন্ত্রস্ত, সেই সঙ্গে সতর্ক হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে মাথা তুলে প্রথমে একটা কাঠের টেবিল দেখল। টেবিলের ওপর ছাড়াছাড়া ভাবে কয়েকটা জিনিস রাখা রয়েছে। একটা হাতুড়ি, বড় সাইজের দুটো ইস্পাতের পেরেক, পেরেকের পাশে ভারি একটা ছুরি, এক ফুট লম্বা একটা মেটাল রড। রডের এক প্রান্ত থেকে একটা ইলেকট্রিক কর্ড বেরিয়ে এসে টেবিলের কিনারা দিয়ে নেমে চোখের আড়ালে চলে গেছে। চোখ দুটো আরও একটু ওপরে তুলল সে। টেবিলের ওপারে, একটা চেয়ারে বসে আছে লোকটা। বয়স্ক লোক, চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়স, চোখ দুটো কুঁচকে আছে। এই লোককে কোথায় যেন দেখেছে সে!

লোকটার সামনে, টেবিলের কিনারায়, খোলা একটা নোটবুক আর কলম রয়েছে, কলমের পাশে চওড়া এক রোল অ্যাডহেসিভ টেপ।

আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

মাথা ঝাঁকাল অগাস্টিন, ব্যথাটা বেড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। যেই হও তুমি, এর জন্যে তোমাকে ভুগতে হবে।

তার কথা অগ্রাহ্য করে টেবিলের জিনিসগুলো ইঙ্গিতে দেখাল লোকটা। ভাল করে দেখ তোমার সামনে এগুলো কি রয়েছে, তারপর মন দিয়ে শোন।

কে তুমি? হিস হিস করে জিজ্ঞেস করল অগাস্টিন, ব্যথা সহ্য করার জন্যে। দাতে দাঁত চেপে আছে সে।

জবাব না দিয়ে লোকটা, বলল, অনেকগুলো প্রশ্ন করব। প্রতিটি প্রশ্নের পুরোপুরি উত্তর দেবে, আর সত্যি কথা বলবে।

ইউনিয়ন কর্স? অস্থির হয়ে জানতে চাইল অগাস্টিন। এ-ধরনের পরিস্থিতিতে শত্রুর পরিচয় না জানার চেয়ে বড় অশান্তি আর নেই।

উত্তর যদি মিথ্যে আর অসম্পূর্ণ হয়, টেপ খুলে তোমার বাঁ হাত টেবিলে রাখব, তারপর হাতুড়ি দিয়ে বুকে একটা পেরেক গাঁথব উল্টো পিঠে।

শিউরে উঠল অগাস্টিন। তোমাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি–কোথায়?

তারপর ছুরিটা দিয়ে তোমার আঙুল কাটব, লোকটা বলে চলেছে, একটা। একটা করে।

ছুরির দিকে তাকাল অগাস্টিন।

ভয় নেই, রক্ত পড়ায় তুমি মারা যাবে না, বলল লোকটা। একটা আঙুল। তুলে মেটাল রডটা দেখাল সে। এটা একটা শোল্ডারিং-আয়রন। কাটা আঙুল জোড়া লাগিয়ে ঝালাই করে দেব ক্ষতগুলো।

দরদর করে ঘামছে অগাস্টিন। লোকটা সাপের মত ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব।

তবু যদি কথা না বল, তোমার ডান হাত ধরব। এরপর পা, প্রথমে…

অনেক নিষ্ঠুর লোকের মত, গিয়াকোমো অগাস্টিনও আসলে কাপুরুষ। লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে উপলব্ধি করল, শুধু ভয়। দেখাচ্ছে না, এই লোক প্রতিটি কাজ করে দেখাবে। কিন্তু কেন? কে ও? কোথায়। ওকে দেখেছে সে?

অসহায় বোধ, করল অগাস্টিন, রেগে উঠে ভয় তাড়াবার চেষ্টা করল। জাহান্নামে যাও তুমি! খেঁকিয়ে উঠল সে, অশ্লীল গাল পাড়তে শুরু করল। কিন্তু আচমকা চুপ মেরে গেল সে, লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে।

টেপের রোল হাতে নিল লোকটা। খানিকটা খুলে ছিঁড়ল, এগিয়ে এল টেবিল ঘুরে।

কিছু বলার জন্যে মুখ খুলল অগাস্টিন, কিন্তু আওয়াজ বেরুবার আগেই তার। মুখে চেপে বসল টেপ। আলোর একটা ঝলকের মত লাগল লোকটার ডান হাত, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল অগাস্টিন, চোখে শর্ষে ফুল দেখল। দ্বিতীয় ঘুসিটা লাগল চোয়ালে, চেয়ারের পিঠে থেঁতলে গেল আহত মাথা।

কোনরকমে জ্ঞানটুকু থাকল তার, সারা শরীর অবশ, স্নায়ুগুলো ভোতা। অস্পষ্টভাবে বুঝল তার বাঁ হাত মুক্ত করা হয়েছে, টেনে লম্বা করা হয়েছে সামনের দিকে। এক মুহূর্ত পর অসহ্য যন্ত্রণায় তার শরীর ধনুকের মত বেঁকে গেল, জ্ঞান। হারাল সে।

দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফেরার পর মাথার দপদপে ব্যথাটা অনুভব করল না। অগাস্টিন। মনে হল বা হাতে আগুন জ্বলছে। চোখ খুলে হাতের দিকে তাকাল সে, টেবিলের ওপর চিৎ করে রাখা। তালু ফুটো করে টেবিলে গেঁথে রয়েছে পেরেকটা। আঙুলের ফাঁক গলে গড়িয়ে নামছে রক্ত, টেবিলের ওপর কয়েক জায়গায় জমেছে। বেশ অনেকটা করে।

চোখে দেখা দৃশ্যটা অবিশ্বাস করতে চাইল তার মস্তিষ্ক, কিন্তু এক চুল নড়তেই তীব্র ব্যথার পাগল করা ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে শুরু করল সারা শরীরে। টেপ দিয়ে মোড়া মুখ থেকে ভোতা একটু গোঙানির আওয়াজ বেরুল। চোখ দেখে বোঝা যায়, আতঙ্ক তাকে গ্রাস করেছে। নিষ্ঠুরতা নয়, অগাস্টিনকে আতঙ্কিত করে তুলেছে লোকটার শান্ত-নির্লিপ্ত ভাব-ভঙ্গি–একজন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে অথচ সে-ব্যাপারে তার কোন অনুভূতি নেই, এমনকি ব্যাপারটা উপভোগও করছে না।

ঠাণ্ডা চোখ দুটোর দিকে আবার তাকাল সে। পলক নেই, একবারও পলক, ফেলতে দেখেনি ওকে। এখনও কোন ভাব নেই চেহারায়। আবার লোকটা চেয়ার ছাড়ল, টেবিল ঘুরে এগিয়ে এল। শিউরে উঠে আহত পশুর মত পিছিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করল অগাস্টিন। লক্ষণ দেখে বোঝা যায়, বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে তার। ঘন। ঘন মাথা নাড়ার মানে হল নিঃশব্দে করুণা ভিক্ষা চাইছে। গলার ভেতর ঘড়ঘড় আওয়াজ। লোকটা মুঠো করে ধরল তার মাথার চুল। মাথাটা স্থির করে রেখে একটানে খুলে নিল মুখের টেপ। বমি করতে শুরু করল অগাস্টিন; কিন্তু সেদিকে খেয়াল না দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল ও।

থরথর করে কাঁপছে অগাস্টিন, ভয়ে আর ব্যথায়।

একটু শান্ত হতে অনেক সময় নিল ঘোড়ামুখো। ঘাম, চোখের পানি, বমি আর রক্ত, তার শরীর থেকে তরল পদার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। পেরেক গাঁথা বা হাত, শোল্ডারিং-আয়রন, আর ছুরি–পালা করে এই তিনটের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার। দৃষ্টি। মুখের থুথু আর ফেনা গিলে নিয়ে কথা বলল সে, কোন রকমে শোনা গেল, কি চাও তুমি?

নোটবুক টেনে নিয়ে কলমটা খুলল ও। লুবনা কিডন্যাপিং দিয়ে শুরু কর।

মুহূর্তে চেহারাটা মনে পড়ল অগাস্টিনের।

.

এক ঘন্টার বেশি ধরে জেরা চলল। শুধু একবার, হিনো ফটেলার প্রসঙ্গ উঠতে, ইতস্তত করল অগাস্টিন; কিন্তু হাতের কলম রেখে রানা আবার চেয়ার ছাড়তে যাচ্ছে দেখে গড় গড় করে জবাব দিতে শুরু করল সে।

কিডন্যাপের ঘটনা দিয়ে শুরু করল সে। গাড়িটা চালাচ্ছিল অগাস্টিন। প্রথমেই সে হড়বড় করে বলে নিল, বডিগার্ডকে গুলি করেছিল এলি, সে নয়। বাকি দুজন ছিল চারিন আর সাইমিয়ানো, গুলি খাবার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।

দাবি করা টাকা সম্পর্কে কিছুই জানে না অগাস্টিন। ওদেরকে শুধু নির্দেশ দেয়া হয়, নির্দিষ্ট একটা সময়ে, নির্দিষ্ট একটা জায়গা থেকে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে এসে নিগুয়াডা-র একটা বাড়িতে আটকে রাখতে হবে।

শুরুতেই গোটা ব্যাপারটা লেজেগোবরে হয়ে যায়। হিনো ফনটেলা ওদেরকে অভয় দিয়ে বলেছিল মেয়েটার সুঙ্গে একজন বডিগার্ড থাকবে বটে, কিন্তু সে তেমন। কোন কম্মের নয়, ওদের জন্যে, কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। চারিনের ওপর নির্দেশ ছিল, ফাঁকা দুটো গুলি করবে সে, তাহলেই বডিগার্ড ভয় পেয়ে পালাবে। কাজেই ওরা সবাই কাজটাকে হালকাভাবে নিয়েছিল, কেউই তেমন সতর্ক ছিল না।

মেয়েটাকে রেপ করল কে?

এলি, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল অগাস্টিন। চারিন মারা যাওয়ায় তার মাথায় আগুন ধরে যায়, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল ওরা। তাছাড়া, ছোট মেয়েদের ওপর বরাবরই তার খুব লোভ। এই মেয়েটা আবার ধস্তাধস্তি করার সময় তার মুখে খামচি দেয়… নার্ভাস ভঙ্গিতে জিভের ডগা দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজাল সে।

আর তুমি? শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করল রানা। তুমি ওকে রেপ করনি?

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল অগাস্টিন, তারপর অনেকটা যেন নিজের অজ্ঞাতসারেই ওপর নিচে মাথা দোলাল, কথা বলার সময় কাঁপা কাঁপা লাগল তার কণ্ঠস্বর, হ্যাঁ…মানে, এলির পর। ভাবলাম যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তাই আমিও… টেবিলের ওপর দিয়ে যমদুতের দিকে তাকাল সে। স্থির পাথর হয়ে আছে রানা। অগাস্টিনের মনে হল, লোকটার মন যেন এখানে নেই, অন্য কোথাও চলে গেছে। আবার শুরু হল জেরা।

আর কেউ?

মাথা নাড়ল অগাস্টিন। মেয়েটার সঙ্গে আমরা এই দুজনই ছিলাম। সময় কাটতে চাইছিল না, সাংঘাতিক একঘেয়ে লাগছিল–আমরা ভেবেছিলাম দুএক দিনের মধ্যে সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু দাবির টাকা নিয়ে কি যেন একটা গোলমাল দেখা দেয়, বাড়িটায় আমরা দুহপ্তা আটকা পড়ে গেলাম।

তাই তোমরা ওকে বারবার রেপ করলে?

ধীরে ধীরে নিচু হল অগাস্টিনের মাথা, চিবুক বুকে ঠেকল, ঘামে চকচক করছে চওড়া কপাল। অস্ফুট, কর্কশ শোনাল তার গলা, হ্যাঁ..মানে, তেমন কিছু করার ছিল না আমাদের আর মেয়েটা ছিল খুব সুন্দরী…।

ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর, মুখ তুলে দেখল টেবিলের ওপার থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে মৃত্যুদূত।

ফনটেলা? সে কি বলল?

উনি খেপে যান। মেয়েটা মারা গেল, সে তো আমাদের কোন দোষ না, স্রেফ একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু উনি কোন কথাই শুনলেন না। প্রত্যেকের আমাদের দশ। মিলিয়ন লিরা করে পাবার কথা ছিল, কিন্তু উনি আমাদের কিছুই দিলেন না।

নরম সুরে জিজ্ঞেস করল রানা, টাকা দিল না–ব্যস, এইটুকুই শাস্তি?

অগাস্টিনের চিবুক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম পড়ছে বুকে, মাথা ঝাঁকাল। সে। একদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান, কারণ বস্ ফনটেলার ভাগ্নে হয় এলি। আমাকে শাস্তি দিলে ভাগ্নেকেও দিতে হয়, তাই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলেন না।

কলম তুলে নিল রানা। হ্যাঁ, মৃদু গলায় বলল ও। ভাগ্যবানই বটে। এবার এলি সম্পর্কে বল।

এলি সম্পর্কে যা কিছু জানে অগাস্টিন, সব বের করে নিল রানা। কারা তার বন্ধু, তার গতিবিধি, তার অভ্যেস কিছুই বাদ দিল না। এরপর হিনো ফনটেলা। প্রসঙ্গ। একে একে সব জেনে নিল রানা।

জেরার এক পর্যায়ে অগাস্টিন অভিযোগ করল, হাতের ব্যথা সে আর সহ্য করতে পারছে না।

আর বেশি দেরি নেই, আশ্বাস দিয়ে বলল রানা। এবার ডন বেরলিংগার আর ডন বাকালার কথা বল।

কিন্তু এই মহারথীদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না অগাস্টিন। যতদূর শুনেছে, ডন বাকালা তার ভিলা কোলাসি থেকে কদাচ বের হন। না, অগাস্টিন তাঁকে কখনও দেখেনি।

তবে আমার বস সিনর ফনটেলা ভিলা কোলাসিতে ঘন ঘন যান, প্রতি মাসে একবার তো বটেই। বসু রোমেও যান, ডন বেরলিংগারের কাছে।

আর কোন প্রশ্ন নেই। নোটবুক বন্ধ হল, ক্যাপ লাগানো হল কলমে।

অগাস্টিনের আতঙ্ক মাথাচাড়া দিতে শুরু করল। আবার সে কথা বলছে, বক বক করে যাচ্ছে বেরলিংগার আর বাকালাকে নিয়ে, কিন্তু তার কথায় রানার আর। কোন আগ্রহ নেই। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ও, হাত ঢোকাল জ্যাকেটের ভেতর। ওর হাতে পিস্তল দেখে অগাস্টিনের বকবকানি থেমে গেল। এখন সে তার শরীরে কোথাও কোনরকম ব্যথা অনুভব করছে না। তার সামনে দাঁড়িয়ে পিস্তলের মাজলে। সাইলেন্সর ফিট করছে রানা, সম্মোহিতের মত সেদিকে তাকিয়ে আছে সে। টেবিল। ঘুরে এগিয়ে এল রানা। ওর চেহারায় কোন ভাব নেই, ঠাণ্ডা চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি।

সাইলেন্সর লাগানো পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে থাকল অগাস্টিন, ওটাকে তার বেটপ আর কুৎসিত লাগল। দেখল, পিস্তলটা ওর দিকে ভোলা হল। এগিয়ে। আসছে, এগিয়ে আসছে!

চোখের পাপড়িতে পিস্তলের স্পর্শ পেল অগাস্টিন। চোখ বন্ধ করল সে। তার বন্ধ ডান চোখের ওপর চেপে বসল ঠাণ্ডা ইস্পাত। শেষবারের মত ভারি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে।

নরকে যাচ্ছ, অগাস্টিন-ওখানে তোমার সঙ্গে আর সবার দেখা হবে।

.

গিদাস-এ ভিড় দেখলে মনে হবে, সুপুরুষ আর সুন্দরীদের মেলা বসেছে। শুক্রবার দুপুরের পরিচিত পরিবেশ, ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে লাঞ্চে বসে ভোজন রসিকরা গালগল্প করছে।

পিছনের অ্যালকোভ টেবিলে একা বসে খাচ্ছেন বার্নাদো গুগলি। বাইরে। কোথাও খেতে বসলে সংখ্যায় দুজন হওয়া চাই, প্রাচীন এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী। তিনি–কিন্তু, খাচ্ছেন আজ একা।

সুদর্শন চেহারাই তাকে আর সবার চেয়ে আলাদা করে তোলে। কাপন ম্যাগ্রো, খাচ্ছেন তিনি, অন্যান্য টেবিল থেকে রূপসী মেয়েরা চোরা চোখে বারবার দেখে নিচ্ছে তাঁকে। সুন্দরভাবে কাটা গাঢ় খয়েরি স্যুট পরে আছেন, আকাশি নীল শার্ট, সঙ্গে চওড়া তামাটে লাল সিল্ক টাই। কাফ লিঙ্ক আর প্যাটেক ফিলিপ হাতঘড়ি থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে আলো।

একটু সরু, রোদে ঝলসানো মুখ; প্রায় ঈগলের মত খাড়া নাক। এমনকি পুরুষরাও একবার তাকালে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে পারছে না। সবার মনেই কৌতূহল, কি উনি? সফল একজন অভিনেতা, প্রখ্যাত কোন ফ্যাশন ডিজাইনার, নাকি ইন্টারন্যাশনাল প্লে-বয়?

আসলে তিনি একজন পুলিস অফিসার। যদিও তার মা, একজন অভিজাত মহিলা, কথাটা শুনে নাক কোঁচকাবেন, তড়িঘড়ি শুদ্ধ করে দিয়ে বলবেন, কারাবিনিয়ারিতে ও একজন কর্নেল। কথাটা সত্যি। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে এই পদে খুব কম অফিসারই উঠতে পারে।

বার্নাদো গুগলি পুলিসের চাকরি বেছে নেয়ায় সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলেন তার মা। ছেলেকে তিনি চেনেন, জানেন রাজনীতি বা ব্যবসার লাইনে গেলে ছেলে তার জাদু দেখিয়ে দিত। একইভাবে তার বড় ছেলেও তাকে হতাশ করে। ডাক্তারী পড়া শেষ করে। সে এখন একজন সফল সার্জেন। মায়ের ধারণা, পেশাটা মন্দ নয়, কিন্তু বড়ই নিরস। এরচেয়ে পুলিসের চাকরি তবু ভাল। বার্নাদো গুগলি নিজেও মাঝে মধ্যে ভাবেন, কারাবিনিয়ারিতে তিনি কেন এলেন। হয়ত তার অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মনই এর জন্যে দায়ী। কিংবা অন্যায়ের ভেতর কখনও কখনও ন্যায় থাকলেও সেদিকে কারও কোন খেয়াল থাকে না দেখে তার বিবেক বিদ্রোহ করে ওঠে, তাই এ পথ বেছে নিয়েছেন–সাধ্যমত চেষ্টা করে দেখবেন এ ব্যাপারে কিছু করা যায় কিনা।

তাঁর শত্রুরাও একবাক্যে স্বীকার করবে, তিনি একজন ভাল পুলিস অফিসার। সততা, এবং ব্যক্তিগত বিশাল সয়-সম্পত্তি থাকায় দুর্নীতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ক্ষুরের মত ধারাল বুদ্ধি, অঢেল প্রাণচাঞ্চল্য, আর মানুষের মন বোঝার। দুর্লভ ক্ষমতা তাঁকে একজন সফল পুলিস অফিসার হিসেবে গড়ে তুলেছে।

তাঁর জীবনের চারটে দুর্বলতার একটা হল এই চাকরি। বাকি তিনটে–ভাল। খাবার, সুন্দরী মহিলা, আর ব্যাকগ্যামন। বার্নাদো গুগলির দৃষ্টিতে আদর্শ একটা দিন বলতে বোঝায়ঃ দিনের শুরুতেই তদন্তে নেমে চমকপ্রদ একটা সূত্র আবিষ্কার, দুপুরে মিলানের সেরা কোন রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ, বিকেলে অফিসে বসে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পাঠ, তারপর রাতে মনের মত ডিনারের জন্যে নিজের হাতে রান্নাবান্না, সেই রান্না মনের মত কোন সুন্দরী মেয়েকে খাওয়ানো, সেই মেয়ের অন্তত এইটুকু বুদ্ধি। থাকতেই হবে যাতে ব্যাকগ্যামন খেলায় দুএকবার সে তাকে ভড়কে দিতে পারে এবং সবশেষে, মেয়েটিকে নিয়ে বিছানায় যাওয়া।

গত চার বছর চাকরি জীবন তার ভালই কেটেছে। তিনি অনুরোধ করেছিলেন, কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়ে তাঁকে নতুন একটা ডিপার্টমেন্টে বদলি করেছেন। এই ডিপার্টমেন্ট সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পিছনে লেগে আছে। অর্গানাইজড ক্রাইমের ধরন, আর মাহাত্ম বোঝার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি, মাসের পর মাস ফাইল পড়েছেন, এবং মাফিয়া চক্রের জটিল সাংগঠনিক গোপনীয়তা সম্পর্কে যতই জেনেছেন ততই বিস্মিত হয়েছেন।

তাঁর প্রথম তিন বছর কেটেছে গবেষণায়। তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সেগুলো যাচাই করেছেন, ভুল হলে বাতিল করেছেন, একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়েছেন, তথ্যের সঙ্গে যোগ করেছেন নাম আর চেহারা। দক্ষিণ এবং উত্তরের শহরগুলো থেকে আসা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মিল খুঁজেছেন–মিলানের একটা নারী ব্যবসায়ী। চক্রের সঙ্গে কালাব্রিয়ার মদ চোলাইকারী দলের বা নেপলসের ড্রাগ-স্মাগলারদের। কি সম্পর্ক জানতে চেষ্টা করেছেন।

তিন বছর পর ইটালিয়ান মাফিয়া সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলেন বার্নাদো গুগলি। মাফিয়ার বাইরে থেকে মাফিয়া সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তাঁর সহকারী, ক্যাপ্টেন কোসিমা পাধানি একবার ঠাট্টা করে বলেছিল, তিনি যদি কখনও দল বদল করেন, প্রথম দিনই নতুন কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন।

গত এক বছর ধরে এই জ্ঞান কাজে লাগাচ্ছেন গুগলি। হুকুমদখল করা জমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটা জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে রেগিয়োর ডন। ব্যামবিনো ফেটুচিনিকে তিনি কোণঠাসা করে ফেলেন। এক শ্রেণীর সরকারী কর্মচারীর যোগসাজশে গরীব মানুষদের বিস্তর জমি হুকুমদখল করায় ফেটুচিনি, তাদেরকে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, তারপর সমস্ত জমি আরও একশো গুণ কম দরে নিলামে কিনে নেয় সে। দুবছরের জেল হয় তার। মাস কয়েক ধরে। মিলানের প্রধান দুটো পরিবারের ওপর নজর রাখছেন গুগলি, এ-দুটোর কর্তা হল। ডন গামবেরি, আর ডন ফনটেলা। নারী-ব্যবসা, ড্রাগ স্মাগলিং, আর ছিনতাই, এই তিন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ওরা। ধীরে ধীরে প্রমাণ আর সাক্ষী যোগাড় করছেন গুগলি। ওদের টেলিফোনে আড়িপাতা যন্ত্র ফিট করেছেন, ওদের দলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নিজের লোক, কর্তাদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করেছেন। দুএক বছরের মধ্যে তার হাতে যথেষ্ট প্রমাণ জমা হবে, আশা করছেন দুচারটে রুই-কাতলাকে আটকাতে পারবেন তিনি, তাদের মধ্যে সম্ভবত গামবেরি আর। ফনটেলাও থাকবে।

এদের বিরুদ্ধে লেগে থাকা তার জন্যে অনেক সহজ হয়ে গেছে, কারণ সাধারণ মানুষ এখন অত্যাচারী মাফিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার। যদিও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে এখনও অনেক দেরি। কারাদণ্ড এদের জন্যে কোন শাস্তিই নয়, অর্থাৎ আইন পাল্টানো দরকার। সাক্ষী পাওয়া এখনও সাংঘাতিক কঠিন, আরও, কঠিন সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে, একটু একটু করে পরিস্থিতি ভাল হচ্ছে। বড় ধরনের কোন অপরাধ হতে দেখলেই মাফিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটু বেশি খেপছে মানুষ।

লাঞ্চের পর তরুণী এক অভিনেত্রীর কাছে যাবেন। কাল সন্ধের এক পার্টিতে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়। জাপানী পুতুলের মত গড়ন, ছোটখাট, চোখ ধাঁধানো রূপ। খুশির খবর, মেয়েটি ব্যাকগ্যামন খেলে। তাঁকে দাওয়াত দিয়েছে, দুএক দান খেলা হবে। সেই আনন্দেই আজ তিনি লাঞ্চে বসে ডেজার্টের জন্যে জিলাটো ডি টুটি ফুটি-র অর্ডার দিয়ে ফেললেন।

মিষ্টি খাবার মুখ তাঁর, বিশেষ করে ফল আর আইসক্রীমের সঙ্গে মিষ্টি খেতে খুবই ভালবাসেন। কিন্তু যে লোক শরীরের যত্ন নেয়, সে কখনও পেটে চর্বি জমতে দিতে পারে না, তাই হপ্তায় মাত্র রোববারে ডেজার্ট খান তিনি। সত্যি বলতে কি, নিজেকে তিনি চিট করছেন, কারণ আজ মাত্র শুক্রবার। আসলে বিকেলে মেয়েটার সঙ্গ পাবেন এই আনন্দে উদার হয়ে পড়েছেন তিনি।

হেডওয়েটার এগিয়ে এল। কিন্তু ডেজার্টের বদলে তার হাতে ফোনের রিসিভার। আপনার অফিস, কর্নেল।

কথা বলল কোসিমো পাধানি, তাঁর সহকারী। কিছুক্ষণ শোনার পর তিনি বললেন; আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাব ওখানে। টেবিলে রিসিভার রেখে হেড ওয়েটারকে ডাকলেন তিনি, গাম্ভীর্যের সঙ্গে ডেজার্টের অর্ডার বাতিল করে দিলেন। এরপর তিনি ফোন করলেন তরুণী অভিনেত্রীকে, আজ ওঁদের দেখা হচ্ছে না। মেয়েটার কথায় মনে হল, মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে সে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গুগলি। জানালেন, রোববারে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে ওর জন্যে নিজের হাতে ডিনার তৈরি করবেন তিনি। বিল মেটাবার সময় হেডওয়েটারকে বললেন, কাপন ম্যাগ্রোতে রোজমেরী একটু বেশি হয়ে গেছে।

.

মিলান তুরিন মটর ওয়ের পাশেই একটা ডোবা, রাস্তা থেকে ত্রিশ মিটার দূরে। অনেকগুলো নর্দমা চারদিক থেকে এসে নেমেছে এই ডোবায়। আবর্জনার ওপর চিৎ হয়ে ভাসছে গিয়াকোমো অগাস্টিনের লাশ। রাস্তার পাশে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর কয়েকটা পুলিস কার দেখা গেল। স্ট্রেচারের ওপর ভাঁজ করা রয়েছে বড়সড় কালো একটা প্লাস্টিক ব্যাগ। একজন পুলিস ফটোগ্রাফার ঘুরেফিরে ছবি তুলছে।

সহকারী পাধানির পাশে দাঁড়িয়ে লাশের দিকে তাকিয়ে আছেন গুগলি, ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গ মেশানো ক্ষীণ একটু হাসির রেশ। একজন কালেক্টরকে কালেক্ট করা হয়েছে, তাই না?

কাল রাতে কোন এক সময়, বলল পাধানি। লাশ পাওয়া গেছে ঘন্টাখানেক আগে।

চোখে একটা মাত্র বুলেট, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন গুগলি। ব্যস, ফুরিয়ে গেল সব।

হ্যাঁ একেবারে ক্লোজ রেঞ্জ থেকে। লাশের মুখের দিকে আঙুল তুলল। পাধানি। চোখের চারপাশে পোড়া দাগ। ঠিক পাতার ওপর মাজল চেপে ধরে ট্রিগার টানা হয়েছে।

এ যেন খুনীর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ। ওর হাতে কি হয়েছিল?

তীক্ষ্ণ চোখে লাশের হাতের দিকে তাকাল পাধানি। ফুটো করা হয়েছে। হাতটা। কাঁধ ঝাঁকাল সে। কি দিয়ে বলতে পারব না।

ফটোগ্রাফার এসে তার প্রাথমিক কাজ শেষ করল। একজন পুলিস এগিয়ে এসে জানতে চাইল, কর্নেল, লাশ এবার নিয়ে যেতে পারি?

হ্যাঁ, বললেন গুগলি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্যাথোলজিস্টের রিপোর্ট চাই আমি।

পানির ওপর আধ হাত পুরু হয়ে আবর্জনা জমে আছে, লাশ তাই ডোবেনি। ডোবার কিনারায় দাঁড়িয়ে একজন অ্যাম্বুলেন্স কর্মী প্লাস্টিক ব্যাগের ভেতর লাশ ঢোকাতে শুরু করল। নিজের গাড়ির দিকে এগোলেন গুগলি, পিছু নিল পাধানি।

আপনার কি ধারণা, স্যার, আবার একটা যুদ্ধ শুরু হল?

গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন গুগলি, মনে মনে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা পাবার চেষ্টা করছেন। তিনটে সম্ভাবনা দেখতে পেলেন তিনি। এলাকার দখল নিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে পারে ফনটেলা আর গামবেরি। এর সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ। ব্যবসায়িক স্বার্থেই শহরটাকে তারা নিজেদের মধ্যে নিখুঁতভাবে ভাগ করে নিয়েছে, কেউ কারও ব্যাপারে নাক না গলিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে ওরা। তাছাড়া, যুদ্ধ করতে হলে প্রথমে বেরলিংগার, তারপর বাকালার সম্মতি আদায় করতে হবে ওদের, কিন্তু এই মুহূর্তে তারা কোন যুদ্ধ চায় না। আরেকটা সম্ভাবনা, আদায়করা টাকা হয়ত মেরে দিচ্ছিল অগাস্টিন, ব্যাপারটা ফাস হয়ে যায়। কিন্তু এ-ও প্রায় অসম্ভব। পনেরো বছর ধরে এই কাজ করছে অগাস্টিন। লোকটা হয়ত বোকা ছিল, কিন্তু তার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কখনও কোন প্রশ্ন ওঠেনি। আরেক হতে পারে, কাজটা বাইরের কারও।

কে সে?

কেন?

কাঁধ ঝাঁকালেন গুগলি, গাড়িতে উঠে বসলেন। সহকারীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, অগাস্টিনের ফাইল চাই আমি। গত বাহাত্তর ঘন্টায় আড়িপাতা যন্ত্রে। যা ধরা পড়েছে সব লিখে আমার কাছে পাঠাবে।

হাতঘড়ির ওপর চোখ বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পাধানি।

গুগলি বললেন, সন্ধেয় কোন প্রোগ্রাম থাকলে বাতিল করে দাও। তার। চেহারায় অস্বস্তির একটা ছায়া পড়ল। আমারটা আমি আগেই বাতিল করে দিয়েছি। এক সেকেণ্ড চিন্তা করলেন তিনি। রেড লিস্টে যারা আছে তাদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা আরও জোরদার কর।

এঞ্জিন চালু হল। জানালা দিয়ে মুখ বের করে বললেন, অফিসে দেখা হবে।

একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে গাড়িটার চলে যাওয়া দেখল পাধানি। তিন বছর ধরে ওঁর সহকারী হিসেবে কাজ করছে সে। প্রথম দিকে, প্রায় পুরো একটা বছর ধরে, এই মানুষটার কাছ থেকে পালিয়ে যাবার একটা ঝোঁক ছিল তার মধ্যে। কিন্তু বদলি হতে চাইলে সঙ্গত কারণ দেখানো চাই।

কর্নেল গুগলিকে যে সে পছন্দ করেনি তা নয়। ভদ্রলোক তাকে শুধু ভয়ঙ্কর। একটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বদলির আবেদন জানাবার জন্যে। কোন কারণই সে খুঁজে বের করতে পারেনি। তার শ্লেষ মেশানো মন্তব্য, হঠাৎ কঠোর হয়ে ওঠা, নায়কসুলভ সুন্দর চেহারা, এমনকি বংশ গৌরবও পাধানির জন্যে কোন সমস্যার সৃষ্টি করেনি। তার অস্বস্তি লাগার কারণ ছিল, একজন সিনিয়র কারাবিনিয়ারি অফিসারকে যা কিছু মানায় না বলে তার ধারণা, সেগুলো সবই রয়েছে কর্নেলের মধ্যে। বলা কঠিন পাধানি হয়ত নিজেও জানে না যে সে সম্ভবত ঈর্ষা করে তাঁকে।

দুটো কারণে পালিয়ে যাবার ঝোঁকটা তার মন থেকে দূর হয়ে যায়। এক বছর। কাজ করে হঠাৎ পাধানি তার বসের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অসাধারণ স্মরণশক্তির পরিচয় পেয়ে যায়। এই গুণ দুটো কর্নেলের মধ্যে আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এতদিন তার চোখে পড়েনি। দ্বিতীয় কারণ ছিল, তার বোন। ডাক্তারী পড়ার জন্যে কাটানযারো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায় সে, তার রেজাল্টও ভাল, কিন্তু ওপর মহলের কারও সঙ্গে ওদের পরিবারের দহরম-মহরম ছিল না। তার আবেদন। বিবেচনা না করেই বাতিল করে দেয়া হয়। পাধানির ঠিক মনে নেই, কথায় কথায় অফিসে হয়ত ঘটনাটা বলেছিল সে। কোথাও কিছু নেই, এক হপ্তা পর পাধানির বোন ইউনিভার্সিটি থেকে একটা চিঠি পেল, কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত বদলেছেন। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরু করার পরই শুধু তার বোন জানতে পারে, কে এক প্রফেসর গুগলি, নেপলসের কারদারেলি হাসপাতালের সিনিয়র সার্জেন, তার ব্যাপারে নাকি সুপারিশ করেন।

প্রসঙ্গটা একদিন তুলল পাধানি।

বিস্মিত দেখাল কর্নেলকে। বললেন, কি আশ্চর্য! তুমি আমার সঙ্গে কাজ কর, তোমার সুবিধে-অসুবিধে আমি দেখব না তো কে দেখবে!

বদলি হবার চিন্তাটা সেই মুহূর্তে বাতিল করে দেয় পাধানি। কর্নেল উপকার করেছেন বলে নয়। তাঁর প্রকাশভঙ্গিটা ওর ভাল লেগেছিল। তুমি কাজ কর আমার সঙ্গে, আমার জন্যে নয়।

তারপর দুবছর ধরে চমৎকার একটা টিম হিসেবে কাজ করছে ওরা। এখনও আগের মতই আছেন কর্নেল, তাঁর বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের ধার এতটুকু কমেনি, মাঝেমধ্যে অসম্ভব একগুঁয়ে হয়ে ওঠেন, এবং কোনরকম দ্বিধা না করেই বলা যায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও যেন সুপুরুষ ও সুদর্শন হয়ে উঠেছেন তিনি। কিন্তু। ভেতরের মানুষটাকে এখন বুঝতে পারে পাধানি, সেই সঙ্গে তাঁর কিছু কিছু অভ্যেস আর আচরণ অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আগের চেয়ে খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে, বেশি ভাড়া দিয়ে ভাল ফ্ল্যাটে থাকে, সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে নরম ব্যবহার করে। শুধু ব্যাকগ্যামন খেলাটা তার ধাতে সয় না।

.

প্যাথোলজিস্টের রিপোর্টটা জটিল পরিভাষার সাহায্যে লেখা, তাই প্রথমে একবার পড়ে নিয়ে সহজ করে পরিবেশন করছে পাধানি। মৃত্যুর সময়ঃ মাঝরাত থেকে সকাল ছটা, তেরো তারিখ।

রিভলভিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে গুগলি জানতে চাইলেন, পিসমেকার থেকে মাঝরাতে বেরোয় ও, ঠিক?

মাথা ঝাঁকাল পাধানি, ডেস্কের এ-ধারে একটা চেয়ারে সিধে হয়ে বসে আছে। সে। তাই তো বলছে ওরা। কিন্তু রেডসানে পৌঁছায়নি সে। পিসমেকার থেকে ওখানেই তার যাবার কথা ছিল।

পড়।

মৃত্যুর কারণঃ বুলেট ঢুকে ব্রেন ছাতু করে দিয়েছে। গুলি করা হয় ডান। চোখের ওপর পিস্তল ঠেকিয়ে। চোখের চারপাশে গানপাউডারের দাগ ছিল। মাথার পিছন দিকে বড় একটা গর্ত করে বেরিয়ে গেছে বুলেট, তারমানে বড় ক্যালিবারের। নরম নাকের বুলেট ছিল ওটা।

হাতের কথা কি লিখেছে? আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন গুগলি।

ধারাল, কিংবা উঁচাল কিছু হাতের উল্টো পিঠে গাঁথা হয়, সেটা তালু ফুটো করে অপরদিকে বেরোয়। কাঠের সূক্ষ্ম গুড়ো পাওয়া গেছে তালুতে, সম্ভবত সমতল কোন টেবিলে চেপে ধরা হয়েছিল হাতটা (কাঠের গুঁড়ো ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে)। জমাট বাঁধা রক্তের পরিমাণ দেখে আন্দাজ করা যায়, মৃত্যুর দুঘন্টা আগে ফুটো করা হয় হাত।

চেয়ারে হেলান দিলেন গুগলি, ঠোঁটে বিদ্রূপ মেশানো ক্ষীণ একটু হাসি। যীশুর মত ক্রুশ বিধে মরার মধ্যে গৌরব আছে, একটুর জন্যে সেই গৌরব থেকে বঞ্চিত হয়েছে অগাস্টিন।

মুচকি একটু হেসে রিপোর্টের ওপর চোখ বুলাল পাধানি। লাশের হাত-পা, আর মুখে আঠা পাওয়া গেছে, সম্ভবত অ্যাঢেসিভ টেপ লাগানো হয়েছিল। কাগজটা ভাঁজ করল সে।

চোখ বন্ধ করে বসে আছেন গুগলি, গভীর চিন্তায় মগ্ন। মন্তব্য শোনার জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে পাধানি।

পিসমেকার ছেড়ে বেরুবার পরপরই অগাস্টিনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, বললেন গুগলি। নির্জন কোথাও নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে টেপ দিয়ে আটকানো হয় হাত-পা। নিশ্চয়ই কিছু প্রশ্ন করা হয় তাকে, জবাবে সন্তুষ্ট না হয়ে হেঁদা করা হয় তার হাত। সব কথা আদায়ের পর ওরা তাকে গুলি করে, তারপর লাশটা ডোবায় ফেলে চলে যায়।

মন দিয়ে শুনছে পাধানি।

ঝুঁকে ডেস্কের ওপর থেকে একটা ফাইল টেনে নিয়ে খুললেন গুগলি, চোখ। বুলালেন কাগজে। সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে আজ বেলা দুটোয় অগাস্টিনের। ল্যানসিয়া পাওয়া গেছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না, শুধু একটা ওয়ার্নিং সিস্টেম বাদে।

ভুরু প্রায় কুঁচকে উঠল পাধানির। ওয়ার্নিং সিস্টেম, স্যার?

জাপানি পুতুলটার কথা বলছি। ওটা একটা স্প্রিং লাগানো পুতুল, গাড়িতে কেউ চড়লে ঘন ঘন ওপর-নিচে দোলার কথা। ক্লাবে বেশিক্ষণ ছিল না অগাস্টিন, কাজেই যখন বেরিয়ে এল, তখনও একআধটু দুলছিল পুতুলটা। আততায়ী মাত্র। কিছুক্ষণ আগে উঠেছিল তার গাড়িতে।।

কিন্তু অগাস্টিন পুতুলের দোল খাওয়া লক্ষ করেনি…

ভুলের খেসারত কিভাবে দিয়েছে দেখলেই তো। মাফিয়া সদস্যরা। টেলিফোনে কে কি আলাপ করেছে জানার জন্যে আরেকটা ফাইল খুললেন গুগলি। বেশি কিছু আশা করেন না তিনি, কারণ ফোনে আড়িপাতা যন্ত্র ফিট করা গোটা দেশেই আজকাল অতি সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে যাদের ফোনে জিনিসটা ফিট করা হয় তারাও ব্যাপারটা জেনে ফেলে।

ফাইলের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন গুগলি, পাধানি মৃদু কণ্ঠে বলল, তেমন কিছু নেই–আজ সকালে শুধু অগাস্টিনের খোঁজে ওরা সবাই সবাইকে ফোন করতে শুরু করে।

ফাইলটা বন্ধ করে রেখে দিলেন গুগলি। একটাই সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি ইউনিয়ন কর্স। ড্রাগসের চালান নিয়ে ওদের সঙ্গে ফনটেলার একটা গোলমাল বেধেছিল। হুমকি-ধামকি দিয়ে ফনটেলা ওদেরকে চুপ করে যেতে বাধ্য করলেও, রাগ পুষে রেখেছিল ওরা। সুযোগ পেয়ে ছোবল দিয়েছে। এ যদি সত্যি হয়, খুন এখন একটার পর একটা ঘটতেই থাকবে, আর ঘটবে নির্দিষ্ট একটা প্যাটার্ন নিয়ে। গ্রুপের খুদে একটা খুঁটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে বড়গুলোর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য আদায় করেছে ওরা। যে-কোন মুহূর্তে ব্যাপক হামলা শুরু হয়ে যেতে পারে।

পাধানি কিছু বলতে যাবে, তাকে বাধা দিলেন গুগলি। কিন্তু একটা জিনিস মিলছে না, পাধানি। চোখে গুলি করল কেন? এ তো ব্যক্তিগত আক্রোশের পরিচয়। ওই চোখ দিয়ে অগাস্টিন কিছু দেখেছিল, তার এই দেখাটা যেন পছন্দ করেনি খুনী। উঁহু, এর সঙ্গে ইউনিয়ন কর্সের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না…।

ব্যক্তিগত শত্রুতার জের বলছেন? সংশয় প্রকাশ করল পাধানি। কিন্তু সার্ভেইল্যান্স রিপোর্ট হল, আজ সকাল থেকে ফনটেলা আর তার লোকেরা সাংঘাতিক সতর্ক হয়ে গেছে। প্রত্যেকের জন্যে আরও বেশি করে বডিগার্ড, আস্তানাগুলোয় কড়া পাহারা, বাইরে কেউ এক রকম বেরুচ্ছেই না…।

হ্যাঁ। চিন্তিত দেখাল কর্নেলকে। এ-সব লক্ষণ দেখে বোঝা যায়, ইউনিয়ন কর্সকেই ভয় পাচ্ছে ওরা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। মশিয়ে দ্য জিলাম্বুকে ফোনে পাওয়া যায় কিনা দেখ দেখি।

ইটালিতে যেমন মাফিয়া, ফ্রান্সে তেমনি ইউনিয়ন কর্স। ইউনিয়ন কর্সের প্রধান ঘাঁটি মার্সেলেসে। কর্নেল গুগলির মত একই পদমর্যাদার পুলিস অফিসার দ্য জিলাম্বু দক্ষিণ ফ্রান্সে কাজ করেন। দুজনের মধ্যে ভাল সম্পর্ক রয়েছে, অনেকদিন থেকে পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। বেশ কয়েকটা কনফারেন্সে দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছে ওদের।

কিন্তু দ্য জিলাম্বু কোন সাহায্য করতে পারলেন না। কিছুই শোনেননি তিনি। তবে বললেন, এর পিছনে যদি ইউনিয়ন কর্স থাকে, তারা সম্ভবত কর্সিকা থেকে গানম্যান ভাড়া করেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বললেন, তিনি সজাগ থাকবেন, কিছু টের পেলেই সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন কর্নেলকে।

.

এ ইউনিয়ন কর্স না হয়েই যায় না, ডন বাকালার গম্ভীর, কর্কশ গলা গমগম করে উঠল।

পালার্মোয় আতুনি বেরলিংগারের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে ডন বাকালা। রোম থেকে এইমাত্র এসে পৌচেছে বেরলিংগার। ডন বাকলার স্টাডিরূমে তার দুজন প্রধান উপদেষ্টাও রয়েছে, ট্যানডন আর বোরিগিয়ানো। ডন আতুনি বেরলিংগারকে একটু চিন্তিত আর আড়ষ্ট দেখাচ্ছে–কারণ, মিলান সরাসরি তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ওখানে কিছু ঘটলে সব দায়-দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে।

কিছুদিন থেকে একের পর এক ভুল করে যাচ্ছে ফনটেলা, বলল সে। আমি তাকে বলেছি,-ড্রাগস স্মাগলিঙের ব্যাপারটায় ফরাসীদের ঠকানো বোকামি হয়ে গেছে তার। ওকে নিয়ে মুশকিল হল, মাঝে-মধ্যে অতি চালাক হয়ে ওঠে। ওটাই শেষ শিপমেন্ট ছিল, এরপর ব্যাংকক থেকে ড্রাগস আনার ব্যবস্থা হবে, মোটা একটা দাও মারার সুযোগটা তাই ছাড়েনি।

ট্যানডন মন্তব্য করল, কোন কাজই সুষ্ঠভাবে করতে পারছে না। কিডন্যাপিঙের ঘটনাটা ভাবুন একবার। একে একে সবার দিকে তাকাল সে। নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের–আভান্তি পরিবারের মেয়েটার কথা বলছি। তাকে, রাস্তা থেকে তুলে আনার সময়ই গোটা ব্যাপারটা লেজেগোবরে হয়ে গেল। তারপর, কি অন্যায়, গাড়ির ভেতর মারা গেল মেয়েটা। সাধারণ মানুষ এধরনের ঘটনা খুব খারাপভাবে নিচ্ছে। ঘটনাটার পর চারদিক থেকে চাপ আসতে শুরু করে।

এবার বোরিগিয়ানোর পালা। হ্যাঁ, বিশেষ করে ওই কাজটা সুষ্ঠুভাবে সারা উচিত ছিল। আর, যারা দায়ী, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত ছিল তাদের। ওদের একজন ফনটেলার ভাগ্নে, তাই সে কোনরকম শাস্তি না দিয়ে শুধু টাকার ভাগ থেকে বঞ্চিত করল ওদের। চেহারায় বিষাদ নিয়ে মাথা নাড়ল সে। ব্যবসার মধ্যে শৃংখলা না থাকলে চলে কি করে! আমার মনে হয় ফনটেলা বোধহয় নরম হয়ে পড়েছে।

বেরলিংগার মাথা ঝাঁকাল। ওই কাজটায় অগাস্টিনও ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, ওটা ছিল একটা বোকা পাঠা।

সবাই যে যার কথা শেষ করে এবার ডন বাকালার দিকে ফিরল, উনি এখন কি বলেন। ডন বাকালা মানুষটা মাঝারি গড়নের, কিন্তু ধড়টা চওড়া আর নিরেট। বুলেট আকৃতির মাথায় ছোট করে ছাটা কাঁচাপাকা চুল। এই মুহূর্তে তার চেহারায় কোন ভাব নেই। ভারি, কর্কশ কণ্ঠস্বর, কিন্তু শান্ত। নির্দেশ দেয়ার সময় কখনও তাকে উত্তেজিত হতে দেখা যায় না।

ট্যানডন, তুমি যদি ফ্রান্সে গিয়ে বেলোরির সাথে কথা বল, আমি খুশি হব। এটা যদি ওরা শুরু করে থাকে, আমি চাই ওদের সাথে তুমি একটা সমঝোতায় আসবে। ব্যাখ্যা করে বলবে, লোক ঠকানর ব্যবসায়ে আমরা নেই। ফনটেলা যদি কোন অন্যায় করেই থাকে, ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে তাকে। হঠাৎ একটু তীক্ষ্ণ হল তার কণ্ঠস্বর, কিন্তু ক্ষমা চাইবে না। বুঝিয়ে দেবে আপস করতে চাইছি ভয়ে নয়, আমরা সম্মানিত লোক বলে, আর ব্যবসায় কারচুপি পছন্দ করি না বলে।

কালই আমি রওনা দেব, রোম হয়ে, বলল ট্যানডন।

কিন্তু নেতাদের নেতা মাথা নাড়ল। না। দুতিন দিন অপেক্ষা করে। ওরা যেন ভেবে না বসে গোলমাল শুরু হতে না হতেই নাভসি হয়ে পড়েছি আমরা।

বোরিগিয়ানোর দিকে ফিরল বাকালা। মিলানে গিয়ে ফনটেলার সাথে কথা বল তুমি। তাকে বলবে, আমরা অসন্তুষ্ট। ভবিষ্যতে যেন তার কাজে বিশৃঙ্খলা না দেখি। আর, বেলোরিকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বাকালা এবার বেরলিংগারের দিকে ফিরল। সিনর, আমি জানি, ফনটেলা আপনার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবু অন্তত এই ব্যাপারে ধমকটা তার আমার কাছ থেকেই পাওয়া দরকার।

সায় দিয়ে সামান্য একটু মাথা দোলাল বেরলিংগার।

বাকালা আবার ট্যানডনের দিকে ফিরল। কাজটা তুমি গোপনে সারবে। আমি চাই না গামবেরি জানুক ফনটেলা এখন আর আমাদের গুড বুকে নেই। জানলে তার মাথায় হয়ত কুবুদ্ধি গজাবে। তাছাড়া, সব মিলিয়ে মিলানের পরিস্থিতি ভালই। কথা শেষ করে বেরলিংগারের দিকে তাকাল, সমর্থন জানিয়ে আবার সামান্য একটু মাথা দোলাল বেরলিংগার।

বলল, পরস্পরের ব্যাপারে ওরা নাক গলায় না, সেজন্যেই মিলানের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে সেটা নষ্ট করা ঠিক হবে না।

বৈঠকের ফলাফলে ডন বাকালা খুশি। উঠে গিয়ে কর্কটেল কেবিনেটের সামনে দাঁড়াল সে। নিজের হাতে সবাইকে স্কচ হুইস্কি পরিবেশন করল। মার্টিনি হলে ভাল হত, ভাবল বেরলিংগার। কিন্তু ডন বাকালা তার গ্লাসে বিষ ঢেলে। দিলেও হাসিমুখে সেটুকু তার গিলতে হবে।

.

নেপলস, শনিবার সকাল। টেরেসে বসে কফি খাচ্ছে রেমারিক। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ফেরাল সে, দেখল, খবরের কাগজ নিয়ে এগিয়ে আসছে ফুরেলা। টেবিলের ওপর কাগজটা রাখল ছেলেটা, আঙুল দিয়ে একটা খবরের দিকে রেমারিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অগাস্টিন নামে এক লোক খুন হয়েছে, গুলি করে মারা হয়েছে তাকে। ধারণা করা হচ্ছে, অর্গানাইজড ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত ছিল লোকটা। মাত্র এই কলাইনের খবর। খুন-খারাবির শহর মিলান, দুএকজন খুন হলে কাগজগুলো তেমন গুরুত্ব দেয় না। পড়া শেষ করে মুখ তুলল রেমারিক, বলল, তারমানে ব্যাপারটা শুরু হয়েছে। জিনিস-পত্র সব গুছিয়ে রাখ, কাল তুমি গোজোয় চলে যাচ্ছ।

.

০৬.
দুবার গড়ান দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সিনেল এলি, মাথার ওপর হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বেডসাইড টেবিল থেকে হাতঘড়ি নিয়ে ডায়ালে চোখ বুলাল–মাত্র দশটা বেজেছে। ন্যাংটো অবস্থাতেই জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। পর্দা সরিয়ে নিচের অন্ধকার রাস্তায় তাকাল। তার কালো আলফা রোমিও ঠিক নিচেই পার্ক করা রয়েছে, এতটা ওপর থেকে শুধু বারুন-এর ভাঁজ করা কনুই সহ। হাতের, খানিকটা দেখা যায়, ড্রাইভারের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আছে। সন্তুষ্ট হয়ে পর্দা ছেড়ে দিল সে, জানালার দিকে পিছন ফিরল। বিছানায় শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। চোখাচোখি হতে জিভের ডগা সামান্য একটু বের করে। এদিক-ওদিক নাড়াল এলি।

কেমন লাগছে, লক্ষ্মী সোনা? আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল সে। তোমাকে খুশি করতে পেরেছি তো?

যাহ, অসভ্য! লালচে হয়ে উঠে বলল মেয়েটা, এলির সুঠাম নগ্ন শরীরের ওপর চোখ। তোমার কি এখুনি না গেলেই নয়? জানতে চাইল সে। বড়জোর এক ঘন্টা, তার বেশি কোন দিন থাক না–একা একা থাকতে কি যে একঘেয়ে। লাগে আমার!

তোমার মত মেয়ে না থাকলে জীবনটা আমার কাছেও একঘেয়ে লাগত, ভাবল এলি। মনে মনে খুশি আর তৃপ্ত সে, আবার একই সঙ্গে একটা অস্বস্তিও বোধ করছে। খুশি এইজন্যে যে এই বয়সেও পনেরো বছরের একটা মেয়েকে সন্তুষ্ট করতে পারে সে। আর অস্বস্তির কারণ হল, এমন ভাব দেখাচ্ছে মেয়েটা যেন তার। ওপর ওর একটা অধিকার জনে গেছে।

কাপড় পরতে শুরু করে এলি ভাবল, কেউ যদি অল্পবয়েসী গার্লফ্রেণ্ড পছন্দ করে, এ-ধরনের ছেলেমানুষি আচরণ মেনে না নিয়ে তার কোন উপায়ও নেই। কাপড় পরে বিছানায় বসল সে, মেয়েটার বুকে হাত দেয়ার জন্যে ঝুঁকল। কিন্তু একটা গড়ান দিয়ে দূরে সরে গেল মেয়েটা। অস্বস্তি আরও একটু বাড়ল এলির।

সুখে থাকলে ভূতে কিলায়, বলল সে। এত সুন্দর একটা জায়গায় রেখেছি। তোমাকে, প্রচুর টাকা দিচ্ছি খরচ করতে–নাকি বেটোলায় ফেরত যেতে চাও?

মেয়েটার কোন জবাব নেই। বিছানা থেকে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল এলি। চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এটাকে বাদ দিয়ে নতুন আরেকটা যোগাড় করতে হবে। অর্গানাইজড ক্রাইমের এমন একটা পজিশনে রয়েছে সে, নারীদেহ উপভোগের রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটানো তার জন্যে কোন সমস্যাই নয়। মামা। ফনটেলার অনেক রকম ব্যবসা, তার মধ্যে নারী-ব্যবসাটা সে-ই দেখাশোনা করে।

দেশের সব জায়গা থেকে বড় শহরগুলোয় আসে ওরা। আসে টাকা, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর উত্তেজনার লোভে। পনেরো থেকে বিশের মধ্যে বয়স ওদের, দুনিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। এখানে-সেখানে ধাক্কা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বোকা। মেয়েগুলো এলি আর তার সহকারীদের খপ্পরে পড়ে। মেয়েগুলোকে ওরা বার, ক্লাব আর ব্রথেলে চাকরি দেয়–সব চাকরির একটাই শর্ত, দেহদান করতে হবে। এই শর্ত সহজে কেউ মেনে নিতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে সবাইকেই এক সময় মেনে নিতে হয়। এদের মধ্যে থেকে কাউকে মনে ধরলে, সে যদি খুব সুন্দরী আর অল্পবয়েসী হয়, নিজের ব্যবহারের জন্যে তাকে আলাদা করে রাখে এলি। কিছুদিন তাকে নিয়ে মৌজ করে, তারপর বাতিল করে আরেকটা খুঁজে নেয়।

কালই এটাকে মিজানোর হাতে তুলে দেবে সে, ঠিক করল এলি। মিজানো পাকা লোক, হপ্তাখানেকের মধ্যে মেয়েটাকে ড্রাগে আসক্ত করে তুলবে–তখন। অর্গানাইজেশনের ওপর ভরসা না করে আর উপায় থাকবে না সুন্দরীর।

নিজের ওপর সন্তোষ বোধ করল, এলি। ভাবাবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা জরুরি। একটা সমস্যা অবশ্য তৈরি হল নতুন একটা মেয়ে। যোগাড় করতে হবে। এবারেরটা আরও কমবয়েসী হলে ভাল হয়। বয়স যত বাড়ছে, ততই আরও অল্প বয়েসী মেয়েদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে সে। ওরা যে মেয়েটাকে কিডন্যাপ করেছিল, তার কথা মনে পড়ল..হ্যাঁ, শালা, মেয়ে ছিল বটে একখানা! কচি বলে কাকে! শরীরটা সবে মাত্র টসটসে হতে শুরু করেছিল। দেখ কাণ্ড, ওর কথা ভাবতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছে সে। মুহূর্তের জন্যে ইচ্ছে হল, আবার বিছানায় ওঠে। কিন্তু না, মামা তাকে এগারোটার সময় তৈরি থাকতে বলে। দিয়েছে। পালার্মো থেকে বোরিগিয়ানো এসেছে, নিশ্চয়ই অগাস্টিনের খুন হওয়া নিয়ে আলোচনা করবে। ফরাসীরা খেপেছে, তাদেরকে ঠাণ্ডা করার ব্যাপারটা নিয়েও আলাপ হবে।

বিছানার কিনারায় বসে জুতো পরছে এলি। ইউনিয়ন কর্স-কে নিয়ে ভাবছে। সে। কি যে একটা উটকো ঝামেলায় পড়া গেল! অন্তত কিছুদিন সবাইকে সাবধানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে মামা। তারমানে বডিগার্ড ছাড়া চলাফেরা করা যাবে না। সঙ্গে একটা লেজুড় রাখা ভারি অস্বস্তিকর। তবে তার ভাগ্যটা ভাল, বারুন তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। তাছাড়া, বারুনকে তার বডিগার্ড। হিসেবে পাঠানয় বোঝা গেল, দিনে দিনে তার গুরুত্ব আর মর্যাদা বাড়ছে। আত্মপ্রশংসায় কয়েক মুহূর্ত বুঁদ হয়ে থাকল এলি। তার ধারণা, এই উন্নতির মূলে। রয়েছে তার বুদ্ধি। অগাস্টিনের চেয়ে অনেক বেশি চালাক-চতুর সে। ওটা তো ছিল। এক নাম্বার গবেট আর ভোতা। দুহপ্তা একটা বাড়িতে অগাস্টিনের সঙ্গে আটকা পড়েছিল সে, ঘটনাটা মনে পড়ায় গম্ভীর হয়ে উঠল এলি। লুবনা নামের সেই কচি মেয়েটা ছাড়া একঘেয়েমি দূর করার আর কোন উপকরণ ছিল না।

উঠে দাঁড়িয়ে শোল্ডার হোলস্টার পরল এলি, তাতে পিস্তল ভরল। জ্যাকেট পরার সময় দেখল, মেয়েটা তাকিয়ে আছে তার দিকে।

আবার কখন আসবে তুমি? অভিমানের সুরে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।

বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার ঠোঁট আলতোভাবে চুমু খেল এলি। কাল, মুখে হাসি টেনে বলল সে। আজ বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, কাল তার ক্ষতিপূরণ দেব–বাইরে লাঞ্চ খেতে নিয়ে যাব তোমাকে। তারপর, আমার এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

ছোট অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলল সে, বেরিয়ে এল ল্যাণ্ডিঙে। ভারি একটা কণ্ঠস্বর শুনল, এলি। ঘুরতে শুরু করল এলি, জ্যাকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। সত্যিই বুদ্ধি রাখে সিনেল এলি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটা চিনতে পারল সে–একটা শটগানের কালো ব্যারেল, একেবারে চোখের সামনে। তারপরই সাদা আর হলুদ রঙের রিস্ফোরণ ঘটল।

.

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বার্নাদো গুগলির। অভিনেত্রীর ভাগ্য অস্বাভাবিক ভাল। মেয়েটা খেলে চমৎকার, খেলার সূক্ষ্ম কিছু কলা-কৌশলও জানা আছে তার, এ-সবই তিনি স্বীকার করেন, কিন্তু তার সঙ্গে পাঁচটা খেলার তিনটেতেই জিততে হলে অবশ্যই ভাগ্য দরকার। ছক্কাগুলো নেড়ে সবুজ পশমী আচ্ছাদনের ওপর ফেললেন তিনি, বিড়বিড় করে বললেন, ছক্কা! কিন্তু একটা দুই, আর একটা এক হল। ধেত্তেরি! হতাশায় তার চেহারা কালো হয়ে গেল। চেহারায়। সহানুভূতি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসল মেয়েটা-দক্ষ একজন অভিনেত্রী।

এবার মেয়েটার পালা। দাতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করছেন গুগলি। সবগুলোয় জিততে না পারলেও, ছয়টা খেলায় তিনটেয় জিতে সমান সমান তাকে হতেই হবে, তা না হলে ওকে নিয়ে বিছানায় ওঠার প্রশ্নই ওঠে না। অহঙ্কারে ঘা লাগছে, মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হাজার হোক তিনি একজন এক্সপার্ট। চট করে একবার ঘড়ির ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। প্রায় এগারোটা।

সন্ধেটা কিন্তু শুরু হয়েছিল সুন্দরভাবে। মেয়েটা যখন ঘরে ঢুকল, মনে হচ্ছিল আগুনের লাল শিখা তাকে জড়িয়ে আছে। ড্রেসটা পছন্দ হয় তার–ছোট করে। ছাটা, একটু ঢিলেঢালাভাবে গায়ে ফিট হয়েছে। ছক্কা ফেলার জন্যে যতবার ঝুঁকেছে মেয়েটা, প্রতিবার তার ভরাট স্তনের অনেকটা দেখতে পেয়েছেন তিনি। দেখেছেন, আর মনে মনে অস্থিরতায় ভুগেছেন। এই অস্থিরতার জন্যেই প্রথম দিকের খেলাগুলোয় মন লাগাতে পারেননি।

রান্নাবান্না আগেই সেরে রেখেছিলেন। কচি ভেড়ার মাংসের সঙ্গে ডিম আর। লেমন সস। শ্যাম্পেন আর হুইস্কি। ভোজন পর্ব শেষ হয়, স্বভাবতই জিলাটো ডি। টুটি ফুটি দিয়ে। তার হাতের রান্না খেয়ে এক কথায় মুগ্ধ হয় তরুণী অভিনেত্রী। তার ভাব দেখে গুগলি উপলব্ধি করেন, এরপর শুধু যদি তিনি ব্যাকগ্যামন খেলায় জিততে পারেন তাহলেই কেল্লা ফতে, ওকে বিছানায় ভোলা কোন সমস্যাই হবে না।

তার পালসের গতি বেড়ে গেল। ছয় দরকার ছিল মেয়েটার, কিন্তু ছক্কায় দেখা যাচ্ছে তিন আর এক। এখন শুধু যদি তার একটা ছয় পড়ে, জেতার সম্ভাবনা। শতকরা আশি ভাগ। আর এবার জিততে পারলে, দশ মিনিট লাগবে ওকে বিছানায় তুলতে…

অনেকক্ষণ ধরে নেড়ে ছক্কা ছুঁড়লেন তিনি। ছক্কা! উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু তার চিৎকার চাপা পড়ে গেল টেলিফোনের কর্কশ আওয়াজে।

.

আলফা রোমিওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে পাধানি। সামনেই একটা পুলিস ভ্যান, জেনারেটার সহ। গোটা দৃশ্যটা ফ্লাডলাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামলেন গুগলি। অত্যন্ত অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে তাঁকে। পনেরো মিনিট আগে যখন তিনি ফোনে কথা বললেন, তখনকার মতই বদরাগী লাগল। পাধানির। সঙ্গে চোখাচোখি হতে হুম করে একটা শব্দ করলেন, যেন সবকিছুর জন্যে পাধানিই দায়ী।

গাড়ির ভেতর উঁকি দিলেন গুগলি।

বারুন, তাঁর পাশ থেকে পাধানি বলল, এলি ওপরে।

এভাবেই ওকে পাওয়া গেছে? গুগলি জানতে চাইলেন।

না, জবাব দিল পাধানি। হুইলের পিছনে, ড্রাইভিং সিটে বসানো ছিল লাশ, জানালা দিয়ে বেরিয়ে ছিল ভাজ করা কনুই। টহলে এসে একজন পুলিস তাকে গাড়ি থেকে বেরুতে বলে। যখন বেরুল না, লোকটা তখন দরজা খোলে। লাশটা তার গায়ের ওপর ঢলে পড়ে, ইউনিফর্মে রক্ত লেগে যা তা অবস্থা।

আলফা রোমিওর ভেতর আবার তাকালেন গুগলি। সামনের সিটের ওপর। পড়ে আছে লাশ, ওদিকের দরজায় ঠেকে রয়েছে মাথা। সিট, ড্যাশবোর্ড আর মেঝেতে রক্ত দেখা যাচ্ছে। বারুনের চিবুকের নিচে, গলায়, বিশাল একটা গর্ত, সেটা থেকে এখনও একটু একটু রক্ত ঝরছে।

চোখ-মুখ বিকৃত করে ঘুরে দাঁড়ালেন গুগলি। কি করুণ মৃত্যু, অথচ এ ধরনের মৃত্যু এদের প্রাপ্য নয় সে-কথা বলা যাবে না। চল, ওপরে যাই।

একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট, তাকে আবার কাজ শুরু করার ইঙ্গিত দিয়ে বসের পিছু নিল পাধানি।

তিন তলার ল্যাণ্ডিঙে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে এলি। একটা তোয়ালে দিয়ে তার কাধ আর মাথা ঢেকে রাখা হয়েছে, এক সময় তোয়ালেটা সাদা ছিল। পুলিস। বিভাগের ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরা খাপে ভরে ঘুরে দাঁড়াল।

অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা, ল্যাণ্ডিং থেকে বেডরূমে দৃষ্টি চলে। বিছানায়, একটা মেয়েকে বসে থাকতে দেখলেন গুগলি। মেয়েটার পরনে কিছু আছে বলে মনে হল না, গাঁয়ে শুধু একটা চাদর জড়ানো। তার পাশে বসে একজন পুলিস। নোটবুকে কি যেন লিখছে। লেখার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদরের ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাচ্ছে সে, তবে কারও চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে খুব সাবধান।

মেয়েটাকে দেখিয়ে পাধানি বলল, গার্লফ্রেণ্ডের সাথে সময় কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল এলি।

বিড়বিড় করে গুগলি বললেন, তাহলে তো বলতে হয় আমার চেয়ে ভাগ্যবান। ও। ঝুঁকে তোয়ালের একটা কোণ তুললেন তিনি। তা বোধহয় না, আবার অস্কুটে বললেন, ছেড়ে দিলেন তোয়ালের কোণ। এলির ক্ষতবিক্ষত চেহারা দেখে মাথার ভেতরটা ঝা ঝা করে উঠল।

শটগান, বলল পাধানি। একেবারে কাছ থেকে।

মাথা ঝাঁকালেন গুগলি, রক্ত-লাল তোয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন। ক্ষীণ। একটু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। প্যাথোলজিস্টের রিপোর্টে কি লেখা হবে বুঝতে পারছি–ম্যাসিভ ব্রেন ড্যামেজ…ঘাড় ফিরিয়ে একবার বেডরূমের দিকে তাকালেন তিনি। কি জান তুমি?

যা জানে, সব বলে গেল পাধানি। এই অ্যাপার্টমেন্ট ছিল এলির-প্রেম নিকেতন। অ্যাপার্টমেন্টটা অনেক দিন থেকে ভাড়া নিয়ে রেখেছিল এলি, কিন্তু মেয়ে বদল হত ঘন ঘন। এখানে সে প্রায় রোজ রাতেই একবার করে আসত। কিছুদিন হল, অগাস্টিন খুন হবার পর থেকে, বারুনকে বডিগার্ড হিসেবে নিয়ে। আসত, তার জন্যে গাড়িতে অপেক্ষা করত বারুন। বারুনের গলা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত কেটে ফেলে খুনী, তারপর লাশটাকে ড্রাইভিং সিটের ওপর খাড়া করে বসিয়ে দেয়। রাস্তাটা ওখানে অন্ধকার, পথিকরা গাড়ির দিকে তাকালেও কিছু বুঝতে পারার কথা নয়। বারুনকে খুন করে এখানে উঠে আসে খুনী, এলির জন্যে অপেক্ষায় থাকে। লোকটা সম্ভবত ঢোলা একটা কোট পরে ছিল, শটগানটা তারই নিচে লুকানো ছিল। এলি দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই তার মুখের ওপর দুটো ব্যারেল বিস্ফোরিত হয়।

মেয়েটা কিছু দেখেনি? জানতে চাইলেন গুগলি।

না, বলল পাধানি। বয়স একেবারেই কম, কিন্তু খুব একটা বোকা নয়। বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা মাত্র বালিশের তলায় মুখ লুকিয়েছিল, পুলিস না। আসা পর্যন্ত ওভাবেই শুয়েছিল। ওপরতলার দিকে একটা আঙুল তাক করল সে। আওয়াজ শুনে চারতলা থেকে এক মহিলা নেমে এসেছিলেন, ল্যাণ্ডিঙে এলিকে ৬ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার জুড়ে দেন। স্বাভাবিক। মাথার অর্ধেকটাই উড়ে গেছে এলির। এই তো মাত্র মিনিট কয়েক আগে মহিলার চিৎকার থেমেছে। আমাদের কে যেন আছে তার সঙ্গে, শান্ত করার পর একটা জবানবন্দি নেবে।

ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং, মন্তব্য করলেন গুগলি।

জ্বী?

একটু আগে তুমি একবচন ব্যবহার করে বললে-খুনী একজন কেন? দুজন, বা আরও বেশি লোক নয় কেন?

কাধ ঝাঁকাল পাধানি। কি জানি এ স্রেফ আমার একটা অনুভূতি। কেন যেন মনে হচ্ছে, অগাস্টিন, আর এদের দুজনকে একই লোক খুন করেছে।

স্রেফ অনুভূতি, কিন্তু অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত, বলে খোলা দরজা দিয়ে অ্যাপার্ট মেন্টের ভেতর ঢুকলেন গুগলি। তরুণ পুলিস তাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে এসে থামল তার সামনে, নোটবুকে চোখ রেখে পড়তে শুরু করল।

পাননা বেলি, বয়স পনেরো, বেটোলা থেকে এসেছে–সম্ভবত বাড়ি থেকে পালিয়ে। ছয় হপ্তা আগের হারানো বিজ্ঞপ্তিতে নামটা থাকতে পারে, এলির সঙ্গে তখন থেকেই ছিল ও।

মেয়েটার দিকে তাকালেন গুগলি। ভাজ করা হাঁটুর ওপর চিবুক ঠেকিয়ে বিছানায় বসে আছে, চেহারায় সন্ত্রস্ত একটা ভাব। ওকে বল জিনিস-পত্র গুছিয়ে নিয়ে তৈরি হোক, হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে। ওর সম্পর্কে আরও জান, তারপর ওকে হারানো মেয়েদের বিভাগে পাঠিয়ে দাও। মিলানে যতদিন থাকবে, চব্বিশ ঘন্টা প্রোটেকশন দিতে হবে ওকে।

বেডরূম থেকে বেরিয়ে এলেন গুগলি, তার পিছনে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। কি মনে করে আবার তিনি বেডরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিলেন, তরুণ পুলিস লোকটাকে শুকনো গলায় বললেন, তুমি বরং বাইরে দাঁড়িয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা কর। হতাশ তরুণ মুখ কালো করে বেরিয়ে এল বাইরে।

পাধানি তার পাশে এসে দাঁড়াল। মনে হয় পুরোদস্তুর একটা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে।

মাথা ঝাঁকালেন গুগলি, অন্যমনস্ক। ইউনিয়ন কর্স–শটগান আর ছুরি ওদের প্রিয় অস্ত্র। তবু একটা কিন্তু থেকেই যায়।

কিন্তু, স্যার?

এরকম হবার কথা নয়। বড় বেশি রিয়্যাক্ট করছে ওরা। যতটা না উদ্বিগ্ন তারচেয়ে বেশি বিমূঢ় দেখাল তাকে। চারদিক থেকে হামলা শুরু হয়ে গেলে অবস্থা কি দাঁড়াবে ভাবতেও ভয় হয়। এলির লাশের দিকে তাকালেন তিনি। ওকে কোথায় পাওয়া যাবে অগাস্টিনের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল ওরা। ভাবছি। আর কি জেনেছে…।

যা জানতে চেয়েছে সবই গড়গড় করে বলে গেছে…।

আমার হাতে পেরেক গাঁথলে আমিও বলতাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গুগলি। কিন্তু ওদের প্রশ্নগুলো কী ছিল?

এলির লাশ প্রাস্টিক ব্যাগে ভরা হল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ওরা। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন গুগলি, কাঁধের ওপর দিয়ে বললেন, অফিসে এসো, অনেক কাজ।

.

এবার খবরের কাগজগুলো আগ্রহী হয়ে উঠল। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে তিনটে খুন, গুরুত্ব না দিয়ে আর পারা যায় না। বার এবং বিছানা থেকে ডেকে নেয়া হল ক্রাইম রিপোর্টারদের, ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করে রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ পেল তারা। সবাই অন্ধকারে রয়েছে, কাজেই সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছুল খুনগুলোর জন্যে ইউনিয়ন কর্সই দায়ী। পরদিন সকালের কাগজগুলোয় বড় বড় হেডিংয়ে ছাপা হল, ইটালিয়ান মাফিয়া চক্রের সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ইউনিয়ন কর্সের যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধের নিন্দা করা হল। সম্পাদকীয়তে লেখা। হল, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির এই অবনতি মেনে নেয়া যায় না।

ওপরমহল থেকে বার্নাদো গুগলির ওপর চাপ আসতে শুরু করল। জেনারেল, তার বস, বললেন, কিছু একটা করা দরকার। ইটালিয়ান ক্রিমিন্যালরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে, সেটা যথেষ্ট খারাপ; কিন্তু অন্য দেশের লোকেরা এসে ওদেরকে মেরে রেখে যাবে, এ অত্যন্ত মর্যাদা হানিকর।

গোজোয়ও পৌঁছুল খবরটা। বিশালদেহী বিদ্রোহী হাতে একটা কাগজ নিয়ে রুচিতাস-এ ঢুকল। কিন্তু, ক্ষতি কি, গুফো, অক্লান্ত, হাজির–ওরা সবাই রয়েছে। বারে। ওদেরকে ইঙ্গিতে কাছে ডাকল বিদ্রোহী। সবাই এক জায়গায় জড়ো হতে হাতের কাগজটার ভাঁজ খুলে টেবিলের ওপর ফেলল সে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই